Accessibility Tools

জলঙ্গীর অন্ধকারে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

জলঙ্গীর অন্ধকারে – ৫

‘নে, আর কত ঘুমাবি? এবার উঠে পড়৷’

সোহমের ধাক্কাতে ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসল মল্লার৷ খোলা দরজা দিয়ে বাইরের ঝলমলে রোদ দেখা যাচ্ছে৷ চূর্ণী আর সোহমের পোশাকের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল ওরা ঘরের বাইরে বেরবার জন্য ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে৷ চূর্ণী বলল, ‘বুনো কখন চা দিয়ে গেছে তা এখন ঠান্ডা জল হয়ে গেল৷’ মল্লার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে৷ বেশ লজ্জা লাগল তার৷ আসলে গত রাত্রে শ্মশান থেকে ঘরে ফেরার পর সেই অভিজ্ঞতার রেশ থেকে মুক্ত হয়ে ঘুম আসতে আরও অনেকক্ষণ লেগেছিল৷ তাই তার উঠতে এত দেরি হল৷

মল্লারের প্রথমে মনে হল, গতরাতের অভিজ্ঞতার কথা জানায় দু’জনকে৷ কিন্তু তারপরেই ভাবল কথাটা জানার পর তার এই হঠকারিতার জন্য নিশ্চয়ই তাকে সকালে বন্ধুদের থেকে গালাগালি খেতে হবে৷ সকালে উঠে কারই বা তিরস্কার শুনতে ভালো লাগে? তাই সে সম্ভাবনা এড়াবার জন্য মল্লার ভাবল পরে যে কোনও সময় কথাটা বলবে তাদের৷

বিছানা ছেড়ে উঠে চটপট তৈরি হয়ে নিল মল্লার৷ তারপর ঠান্ডা চা আর কেক-বিস্কুট দিয়ে টিফিন সেরে চূর্ণী আর সোহমের সঙ্গে ঘর ছেড়ে আশ্রমের মাঠে নেমে এল৷ চারপাশে কোথাও কুয়াশার লেশমাত্র নেই৷ সূর্যালোকে ঝলমল করছে চারদিক৷ তারা তমসাময়কে দেখতে পেল না৷ ছেলেদের ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে তাদের দেখতে না পেয়ে চূর্ণী বলল, ‘একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেছিস? বাচ্চাগুলো কিন্তু বিকালের আগে খুব একটা ঘরের বাইরে বেরোয় না৷’

সোহম বলল, ‘এ সময় হয়তো ওরা লেখাপড়া করে৷ তবে কাল রাতে যখন ওদের ঘরের সামনে আগুন জ্বালিয়ে মাংস রান্না হচ্ছিল তখন ওরা ওখানে খুব নাচনাচি করছিল তা আমি আর মল্লার দেখেছি৷ ওদের দেখে মনে হল খুব আনন্দ করছিল ওরা৷’

চূর্ণী বলল, ‘চল, নদীর পাড়ে একবার ঘুরে আসি, তারপর ছেলেগুলো কী করছে দেখতে যাব৷’

চূর্ণীর কথা শুনে মল্লার আর সোহম তাকে নিয়ে এগলো জলঙ্গীর পাড়ে যাবার জন্য৷ সোহম হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘আজ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার৷ কারা যেন জোর গলায় হরিধ্বনি দিতে দিতে শ্মশানে মড়া পোড়াতে যাচ্ছিল৷ সেই শব্দ ঘরে শুয়েও আমার কানে এসেছিল৷ তোরা টের পেয়েছিস?’

ভোরের দিকে গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল মল্লার৷ তার সে শব্দ টের পাওয়ার কথা নয়৷ চূর্ণী বলল, ‘না, পাইনি৷ আর না পেয়ে ভালোই হয়েছে৷ শববাহকদের হরিবোল শব্দ পাখির ডাকের মতো নয় যে তা শুনে ঘুম ভাঙাতে হবে৷’

নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেড়ার ঝাঁপ টেনে তারা আশ্রমের বাইরে বেরিয়ে পড়ল৷ আর এরপরই দেখতে পেল শ্মশানের দিক থেকে একদল লোক আসছে৷ তাদের মধ্যে ভেজা শরীরে কাছা পরা লোকও আছে৷ তাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে শবদাহ করে ফিরছে৷ সম্ভবত ভোরবেলা এই লোকগুলোর দেওয়া হরিধ্বনি শুনেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল সোহমের৷ লোকগুলো মল্লারদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বেশ একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল তাদের দিকে৷ মল্লারের কানে গেল, একজন লোক অপর একজনকে বলল, ‘মড়ার আশ্রমে লোকজনও আসে দেখছি৷’

ওরা চলে যাওয়ার পর মল্লাররা গিয়ে দাঁড়াল নদীর পাড়ে৷ পানকৌড়ির দল উড়ে বেড়াচ্ছে জলের উপর৷ জলের দিকে তাকিয়ে আজ জলের স্রোত একটু বেশিই মনে হল তাদের৷ জলঙ্গীর কালো জলে কচুরিপানাগুলো যেন একটু দ্রুত গতিতেই ভেসে যাচ্ছে৷ নদীর দু’পাশে বেশ অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সূর্যালোকে৷ শ্মশানের দিকে যাবার পথটাও দেখা যাচ্ছে৷ সেদিকে তাকিয়ে মল্লারের গত রাতের কথা মনে পড়ল৷ দিনের আলোতে দেখা এ পথটাই গত রাতে কেমন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল কুয়াশার আড়ালে৷ তিন হাত দূরের জিনিস পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না! চারপাশের এই দেখা জায়গাই কেমন অজানা অপার্থিব হয়ে উপস্থিত হয়েছিল মল্লারের সামনে৷

নদীর পাড়ে শীতের মিঠে রোদে দাঁড়িয়ে গল্প শুরু করল ওরা৷ কিছুক্ষণ পর দেখতে পেল বুনো আসছে শ্মশানের দিক থেকে৷ সে মল্লারদের কাছাকাছি আসার পর খেয়াল করল বুনোর হাতে ধরা আছে সরা চাপা দেওেয়া একটা মাটির ছোট হাঁড়ি৷ সোহম তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কোথায় গিয়েছিলে?’

বুনো হেসে বলল, ‘মাছ ধরার চার আনতে৷ দুপুরে মাছ ধরব৷’—এ কথা বলে সে আশ্রমের ভিতরে ঢুকে গেল৷ সে চলে যাবার পর আরও কিছুক্ষণ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করে তারাও আশ্রমে ফিরে গেল বাচ্চা ছেলেগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য৷ ছেলেদের থাকার জায়গা সেই ব্যারাকের মতো বাড়িটার দাওয়াতে উঠে পড়ল৷ কিন্তু ছেলেগুলোর কোনও গলার শব্দ তাদের কানে এল না৷ গতকাল ছেলেগুলো সামনের যে ঘরটাতে ছিল যে ঘরে উকি দিল মল্লাররা৷ সে ঘরে কেউ নেই৷

বাড়িটাতে আরও বেশ কয়েকটা ঘর আছে৷ মল্লাররা দেখল যে ঘরগুলোর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷ কাউকে দেখতে না পেয়ে সোহম হাঁক দিল, ‘কেউ আছ?’

চূর্ণী বলে উঠল, ‘সঞ্জীবন, নবজীবন তোমরা কেউ আছ?’

বার কয়েক হাঁক দেবার পর একটা দরজার ঝাঁপ খুলে দাঁড়াল সঞ্জীবন৷ তাকে দেখেই মল্লাররা বুঝতে পারল তাদের হাঁকডাক শুনেই ঘুম থেকে উঠে এল সে৷ হাত দিয়ে চোখ ঘষে নিয়ে মল্লারদের দেখে হাসল৷ এরপর আরও দুটো ঘরের দরজা খুলে গেল৷ দরজা খুলে দাঁড়াল আরও কয়েকটা বাচ্চা৷ তাদের অবিন্যস্ত পোশাক দেখে মল্লাররা বুঝতে পারল তারাও সদ্য ঘুম ভাঙার পর দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে৷

ছেলেগুলোর শোবার ব্যবস্থা কেমন দেখার জন্য তারা সঞ্জীবনের সঙ্গে সে ঘরটাতে ঢুকল৷ আলো থেকে অন্ধকার ঘরে ঢোকাতে কয়েক মূহূর্ত প্রথমে কিছুটা ঠাহর করতে পারল না৷ তারপর সোহম দেখল ঘরে জানলার মতো যে জায়গাটা আছে সেখানে সম্ভবত শীত আটকাবার জন্যই পর্দার মতো করে মোটা চটের কাপড় টাঙানো হয়েছে৷ মল্লার এগিয়ে গিয়ে চটটা সরিয়ে দিতেই পুবের আলো প্রবেশ করল ঘরে৷ মাঝারি একটা ঘর৷ তার উপর মামুলি বিছানা, চাদর, কম্বল৷ দেওয়ালের গায়ে টাঙানো দড়িতে ঝুলছে ছেলেগুলোর জামা৷ সঞ্জীবন একটা খাট ছেড়ে নেমে দরজা খুলছে৷ অন্য দুটো খাটের একটাতে বসে চোখ কচলাচ্ছে একটা ছেলে৷ আর একটা খাটে আর একটা বাচ্চা তখনও কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমচ্ছে৷ মল্লার সঞ্জীবনকে প্রশ্ন করল, ‘তোমরা এত দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে কেন? সকালে পড়তে বসবে না?’

 সঞ্জীবন জবাব দিল, ‘কাল চড়ুইভাতি করে রাতে ঘুমতে দেরি হয়েছিল, তাই ঘুম ভাঙতে দেরি হল৷’

মল্লারদের দেখতে পেয়ে অন্য ঘরগুলো থেকেও বেশ কয়েকটা ছেলেও এরপর সে ঘরে ঢুকে দাঁড়াল। সবাই ঘুম থেকে উঠে এসেছে। কেউ চোখ কচলাচ্ছে বা কেউ হাই তুলছে। চূর্ণী প্রশ্ন করল, ‘কাল মাংস কেমন খেলে তোমরা? পেট ভরে খেয়েছ তো?’

এবার ছেলেগুলোর মুখে হাসি ফুটে উঠল। একসঙ্গে বেশ কয়েকজন ছেলে বলে উঠল ‘হ্যাঁ, খেয়েছি৷ পেট ভরে খেয়েছি৷’

মল্লার বলল, ‘এই যে তোমরা বেড়ার ঘরের মধ্যে এত কষ্ট করে থাকো, ভালো পোশাক পরতে পারো না, ইচ্ছা হলে মাংস খেতে পারো না, কিন্তু কেউ যদি বলে যে, তোমাদের ভালো ঘরে থাকতে দেবে, ভালো জামা পরতে দেবে৷ তাহলে তার সঙ্গে এখান থেকে যাবে তোমরা?’

কয়েক মুহূর্তর জন্য ঘরের ভিতর নিস্তব্ধতা নেমে এল৷ তারপর নবজীবন নামের ছেলেটা প্রথমে বলল, ‘জীবনবাবা আমাদের সঙ্গে গেলে যাব, নইলে যাব না৷’

মল্লার এবার তাকাল অন্য ছেলেগুলোর মুখের দিকে৷ সঞ্জীবন এরপর বেশ দৃঢ়ভাবে বলল, ‘জীবনবাবাকে ছেড়ে আমরা কোথাও যাব না৷’

সোহম হেসে প্রশ্ন করল, ‘কেন যাবে না?’

উজ্জীবন সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘জীবনবাবা আমাদের নতুন জীবন দিয়েছেন, তিনি আমাদের খুব ভালোবাসেন তাই৷’

উপস্থিত অন্য ছেলেগুলো বলল, ‘আমরা জীবনবাবাকেও খুব ভালোবাসি৷’

কিন্তু এরপরই মল্লারের মনে হল ছেলেগুলোর মুখের হাসি মুছে গিয়ে তাদের মুখমণ্ডলের কেমন যেন শঙ্কার ভাব ফুটে উঠতে শুরু করেছে৷ মল্লারদের প্রশ্ন শুনে ছেলেগুলো হয়তো ভাবতে শুরু করেছে যে মল্লাররা তাদের নিয়ে যাবার জন্য আশ্রমে এসে হাজির হয়েছে! ছেলেগুলোর মনের ভাব অনুমান করে মল্লার তাদের আশ্বস্ত করার জন্য বলল, ‘আমি তোমাদের এমনি জিগ্যেস করলাম কথাটা৷ আমরা তোমাদের কোথাও নিয়ে যাবার জন্য এখানে আসিনি৷ যদি তোমাদের সাহায্য করা যায় সে জন্যই আশ্রমটা দেখতে এসেছি৷ বুঝতে পারলাম জীবনবাবাকে তোমরা খুব ভালোবাসো৷ আর তিনিও তোমাদের ভালোবাসেন৷’

মল্লারের কথা শুনে ছেলেগুলোর মুখে আবার ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। বাচ্চাগুলোর মধ্যে আকারে যে সব থেকে ছোট, সে নিষ্পাপভাবে জানতে চাইল, ‘আজও কি তোমরা আমাদের মাংস খাওয়াবে?’

প্রশ্নটা শুনে মল্লার একটু অস্বস্তিবোধ করল৷ আজও তাদের মাংস খাওয়াতে হলে অন্তত দু-হাজার টাকা খরচ করতে হবে তাদের৷ চূর্ণী ব্যাপারটা সামলে নিয়ে বলল, ‘পর পর দু-দিন মাংস খাওয়া ঠিক নয়৷ তবে দেখি তোমাদের অন্য কিছু খাওয়াতে পারি কিনা?’

সে কথা শুনে হাসল ছেলেগুলো৷ এরপরই সোহমেরই প্রথম একটা ব্যাপার চোখে পড়ল৷ এ ঘরের তৃতীয় তক্তপোশে যে ছেলেটা ঘুমোচ্ছিল, সে কথাবার্তার শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠে বসেছে৷ কম্বলটা খসে গেছে তার শরীর থেকে৷ জানলার মতো বেড়ার ফোকর দিয়ে আলো সোজা এসে পড়েছে তার গায়ে৷ সোহম তার দিকে তাকিয়ে বিস্মিতভাবে জানতে চাইল ‘ওটা কীসের দাগ?’

সোহমের দৃষ্টি অনুসরণ করে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে মল্লার আর চূর্ণীও বেশ অবাক হয়ে গেল৷ বছর আটেকের ছেলেটার বুক থেকে পেট পর্যন্ত একটা লম্বা দাগ দেখা যাচ্ছে৷ যেন সে জায়গা কোনও সময় চেরা হয়েছিল বা অপারেশন করা হয়েছিল৷

ছেলেটা কোনও জবাব দেওয়ার আগেই জবাবটা এল তমসাময়ের কাছ থেকে৷ দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি৷ সোহমের প্রশ্নর জবাবে তমসাময় বললেন, ‘রেল স্টেশনে ঘুরে বেড়াত ও৷ একদিন ট্রেনের ধাক্কায় এই অবস্থা হয়৷ ওর বাঁচারই কথা ছিল না৷ তারপর আমি ওকে এখানে এনে আশ্রয় দিয়েছি৷’

ছেলেটাকে দেখে বেশ কষ্ট হল মল্লারদের৷ কেমন যেন করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বাচ্চাটা৷

ছেলেগুলোর সঙ্গে আরও কিছু মামুলি কথাবার্তার পর তারা সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল৷ দাওয়া থেকে একসঙ্গে নামার পর তমসাময় বললেন; আমার ঘর থেকে দেখলাম আপনারা এদিকে আসছেন তাই আমিও চলে এলাম৷ কাল ওরা খুব আনন্দ করে মাংস খেয়েছে৷ ছেলেগুলোর সঙ্গে কথা বলে আর কী বুঝলেন?’

সোহম হেসে বলল, ‘বুঝলাম, আপনাকে ওরা খুব ভালোবাসে আর আপনিও ওদের ভালোবাসেন৷’

তমসাময় মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘আমি যথা সম্ভব চেষ্টা করি ওদের ভালো রাখার জন্য৷ আরও অনেক কিছু করার সাধ আছে কিন্তু সাধ্য নেই৷ তবে শিশুরা সরল নিষ্পাপ হয়৷ ওরা বোঝে যে আমি ওদের ভালো রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি৷’

হাঁটতে হাঁটতে চূর্ণী তাঁর পার্স থেকে একটা দুশো টাকার নোট বার করে সেটা তমসাময়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা ছেলেদের জন্য দিলাম৷ সম্ভব হলে আজ ওদের একটু মিষ্টি কিনে দেবার ব্যবস্থা করবেন৷’

তমসাময় এরপর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠিক সেই সময় আশ্রমের প্রবেশ পথের বাইরে বেশ কয়েকবার গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল৷ যেন কেউ দরজা খোলার জন্য হর্ন বাজাচ্ছে৷

শব্দটা শুনে মৃদু বিস্মিতভাবে তমসাময় বললেন, ‘গাড়ি নিয়ে কে এল, কারও তো আসার কথা নয়!’

আবারও বাজতে শুরু করল গাড়ির হর্ন৷ সেই শব্দে রান্না ঘরের বাইরে বেরিয়ে তমসাময়ের দিকে তাকাল বুনো৷ তিনি দূর থেকে হাতের ইশারায় বুনোকে বললেন, ‘ব্যাপারটা দেখার জন্য৷ বুনো সেদিকে গিয়ে আশ্রমের প্রবেশ পথের বাঁশের ঝাপটা ফাঁক করে সম্ভবত যারা এসেছে তাদের পরিচয় জানতে চাইল৷ তারপর সে প্রবেশ মুখটা উন্মুক্ত করতেই একটা কালো রঙের এসইউভি গাড়ি প্রবেশ করল৷ তারপর সম্ভবত মল্লারদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই এগিয়ে আসতে লাগল তাদের দিকে৷

গাড়িটা সোজা এসে থামল তাদের সামনে৷ গাড়ির মাথায় নীল আলো বসানো৷ সামনে লাগানো আছে পিতলের অশোকস্তম্ভ৷ যা দেখে মনে হচ্ছে সরকারি গাড়ি৷ চালকের আসনের পাশে বসে আছে একজন লোক৷ আর পিছনের আসনে আরও একজন৷ চালক আর তার পাশের আসনের লোকটা প্রথমে গাড়ি থেকে নামল৷ তাদের গায়ে জ্যাকেট, পায়ে জুতো৷ বেশ শক্ত সমর্থ চেহারা তাদের৷ সেই লোক দু’জনের একজন গাড়ির পিছনের দরজাটা খুলে দিতেই একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক নামলেন গাড়ি থেকে৷ তাঁর পরনে ধূসর রঙের কোট-প্যান্ট, লাল রঙের টাই, চোখে দামি চশমা, পায়ে পালিশ করা শ্যু৷ ভদ্রলোকের চেহারাতে বেশ একটা গাম্ভীর্য আছে৷

গাড়ি থেকে নেমে তিনি কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে মল্লারদের ভালো করে দেখে নিয়ে গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘এই অনাথ আশ্রম কে চালান?’

প্রশ্ন শুনে তমসাময় হাত জোড় করে ভদ্রলোককে নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘আমার নাম তমসাময় শাস্ত্রী৷ এই আশ্রম আমিই চালাই৷’

জবাব শুনে কোট পরা লোকটা বললেন, ‘শুনছিলাম এক সন্ন্যাসী এই আশ্রম চালান৷ কিন্তু আপনার পোশাক দেখে তো সন্ন্যাসী বলে মনে হয় না৷’

তমসাময় হেসে বললেন, ‘ঠিকই শুনেছেন৷ তবে এক সময় রক্তাম্বর পরতাম৷ প্রয়োজন না হলে সে বস্ত্র এখন আর পরি না৷’

এ কথা বলে তমসাময় বললেন, ‘আপনাদের পরিচয়? কোথা থেকে আসছেন আপনারা?’

কোট প্যান্ট পরা লোকটা জবাব দিলেন, ‘আমার নাম রমেন বক্সী৷ চাইল্ড ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট অর্থাৎ সরকারি শিশু কল্যাণ দপ্তরের অফিসার আমি৷ এই আশ্রমের খবর পেয়ে আমি খোঁজ নিতে এসেছি৷’

ভদ্রলোকের পরিচয় জানার পর তমসাময় বললেন, ‘বলুন কী জানতে চান?’

‘আপনার এই আশ্রমের সরকারি অনুমোদন আছে? জানেন নিশ্চয়ই অনাথ আশ্রম চালাতে হলে সরকারি অনুমতির দরকার হয়?’—প্রশ্ন করলেন সরকারি আধিকারিক৷

তমসাময় বললে, ‘হ্যাঁ জানি৷ এখনও সরকারি অনুমোদন না পেলেও তা পাবার জন্য আমি সরকারের কাছে আবেদনও করেছি৷ বেশ কয়েকবার সরকারি অফিসে তদ্বিরও করেছি৷ একবার সরকারি লোকেরা আশ্রম দেখেও গিয়েছেন৷ আমি আপনাকে আবেদনপত্রর কপি দেখাতে পারি৷’

মিস্টার বক্সী বললেন, ‘ও, বুঝলাম৷ তা কতজন বাচ্চা আছে এখানে? আর তাদের দেখাশোনার জন্য কতজন লোক আছেন?’

তমসাময় বললেন, ‘দশজন বাচ্চা আছে এখানে৷ আর লোক বলতে দু’জন৷ যে আপনাদের দরজা খুলে দিল সে, আর আমি৷ আমরা দু’জনই ছেলেদের দেখাশোনা করি৷’

বক্সী এরপর মল্লারদের দেখিয়ে তমসাময়কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এনারা কারা?’

তমসাময় জবাব দিলেন, ‘ওনারা কলকাতা থেকে এই আশ্রম দেখতে এসেছেন, এই আশ্রমকে সাহায্য করার ইচ্ছা নিয়ে৷’

কথাটা শুনে অফিসার মল্লারদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘আপনারা এনজিও চালান?’ সোহম জবাব দিল ‘না, আমরা এনজিও-র লোক নই৷ আমরা তিন বন্ধু মিলে ঠিক করেছি কোনও অনাথ আশ্রমকে কিছু সাহায্য করব৷ সেই মর্মে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম৷ তমসাময়বাবু আবেদন জানিয়েছেন, তাই আশ্রম দেখতে এসেছিলাম৷’

‘কবে এসেছেন?’ প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক৷

সোহম জবাব দিল, ‘পরশু রাতে এসেছি৷ কাল সকালে ফিরে যাব৷’

‘কী করেন আপনারা? সঙ্গে পরিচয়পত্র আছে?’

মল্লারের পার্সেই তার সরকারি ব্যাঙ্কের পরিচয়পত্র ছিল৷ সেটা সে বার করে বাড়িয়ে দিল মিস্টার বক্সীর দিকে৷

সেই সচিত্র পরিচয়পত্রটা লোকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন৷ সোহম বলল, ‘আর আমাদের দু’জনের পরিচয়পত্র ঘরে রাখা আছে৷ দেখতে চাইলে নিয়ে আসছি৷’

বক্সী আই কার্ডটা মল্লারের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘থাক, আর আনার দরকার নেই৷’

এ কথা বলার পর তিনি তমসাময়কে বললেন, ‘চলুন বাচ্চাগুলোকে এবার দেখব৷’

তমসাময় বলল, ‘চলুন, আপনাকে দেখাই ওদের৷ কোনও কিছু প্রশ্ন করলে করবেন৷’

মিস্টার বক্সী আর তার সঙ্গী দু’জনকে নিয়ে তমসাময় এগলেন বাচ্চাদের থাকার জায়গার দিকে৷ কৌতূহলবশত মল্লাররাও অনুসরণ করল তাদের৷ মিস্টার বক্সী আর তার সঙ্গীরা ভালো করে চারপাশে তাকাতে তাকাতে আশ্রমটাকে যেন জরিপ করতে করতে হাঁটতে লাগলেন৷ বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছে সরকারি অফিসার জানতে চাইলেন, ‘যাদের দেখতে চাইছি তারা এ আশ্রমে কীভাবে এসেছে?’

তমসাময় বললেন, ‘ওদের কাউকে রেল স্টেশন থেকে, কাউকে বাস স্ট্যান্ড বা বাজার থেকে এখানে এনেছি৷ পিতৃমাতৃহীন, অভিভাবকহীন অবস্থায় ওরা সেখানে ঘুরে বেড়াত৷ দেখার কেউ ছিল না৷ ওদের কোনও দাবিদারও নেই৷ ওদের কাউকে আবার কেউ শ্মশান বা গ্রামের হাসপাতালের বাইরেও ফেলে গিয়েছিল মৃতপ্রায় অবস্থায়৷’

তমসাময় সবাইকে নিয়ে পৌঁছে গেলেন ছেলেগুলোর থাকার জায়গাতে৷ গতদিন যে ঘরটাতে মল্লাররা প্রথম ছেলেগুলোকে দেখেছিল বাড়ির সে ঘরে মিস্টার বক্সীকে দাঁড়াতে বলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাশের ঘরগুলো থেকে বাচ্চাদের নিয়ে সে ঘরে উপস্থিত হলেন তমসাময়৷

মিস্টার বক্সী আর তার সঙ্গীরা বেশ কিছুক্ষণ ধরে প্রত্যেকটা বাচ্চাকে ভালো করে দেখলেন৷ সরকারি আধিকারিক ছেলেগুলোর উদ্দেশে এরপর প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাদের এখানে কেউ জোর করে ধরে আনেনি তো? আটকে রাখেনি তো?’

নবজীবন জবাব দিল, ‘না, কেউ জোর করেনি৷’ অন্য বাচ্চাগুলোও মাথা নাড়িয়ে তার কথা সমর্থন করল৷

‘তোমরা এখানে দু’বেলা খেতে পরতে পাও? তার জন্য তোমাদের দিয়ে কি কোন কাজ করানো হয়?’ জানতে চাইলেন বক্সী৷

সঞ্জীবন এবার জবাব দিল ‘হ্যাঁ, খেতে, পরতে পাই৷ তার জন্য আমাদের কোনও কাজ করতে হয় না৷’

‘এখানে তোমাদের কেউ মারধর করে?’ প্রশ্ন করলেন তিনি৷

সব ছেলেগুলো একসঙ্গে বলে উঠল, ‘না, কেউ মারে না আমাদের৷’

ছেলেদের কথা শুনে মিস্টার বক্সী, তমসাময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আশা করি ওরা আপনার শেখানো বুলি বলছে না৷’

তমসাময় বললেন, ‘আমি ওদের কিছু শেখাইনি৷ ইচ্ছা হলে আমার অবর্তমানে আপনারা ওদের যত খুশি প্রশ্ন করতে পারেন৷’

সরকারি আধিকারিক এরপর ছেলেগুলোর উদ্দেশে শেষ প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাদের বাবা-মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছা করে না? বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে না?’

তমসাময়ের কথার সত্যতা যাচাই করার জন্যই সম্ভবত প্রশ্নটা করলেন তিনি৷ কিন্তু তার এই প্রশ্নের জবাবে উজ্জীবন নামের ছেলেটা বলল, ‘আমাদের বাবা-মা নেই, কোনও ঘর-বাড়িও নেই৷ এটাই আমাদের বাড়ি৷’

‘তমসাময়ের ঠোঁটের কোণে এবার যেন আত্মপ্রত্যয়ের হাসি ফুটে উঠল৷’

সরকারি আধিকারিক মিস্টার বক্সী বললেন, ‘ঠিক আছে৷ ওদের সঙ্গে যা কথা বলার তা হয়ে গেছে৷ চলুন এবার বাইরে যাই৷’

সকলে এরপর সেই বাড়ি ছেড়ে মাঠে নেমে পড়ল৷ বক্সী বললেন, ‘এই ছেলেগুলোর নাম আর বয়সের তালিকা দিতে হবে আমাকে৷ অফিসে জমা রাখতে হবে৷ আর সরকারের কাছে আবেদনপত্রর একটা কপিও আমাকে দেবেন৷ ব্যাপারটা আমি ভেরিফাই করে দেখব৷’

তমসাময় বললেন, ‘আমার ঘরে চলুন সব দিচ্ছি৷ একটু চেষ্টা করে দেখবেন, যদি তাড়াতাড়ি অনুমতিটা মেলে৷ আশ্রম ফেলে রেখে সরকারি দপ্তরে বার বার ছোটাছুটি সম্ভব হয়ে ওঠে না৷’ সরকারি অফিসার মিস্টার বক্সী এরপর মল্লারদের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনারা শহরের মানুষ৷ আপনাদের হয়তো জানা আছে যে আমাদের দপ্তর শিশুদের উন্নতির জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া আরও বেশকিছু কাজ করে থাকে৷ তার মধ্যে অন্যতম হল শিশুরা যাতে কোথাও অত্যাচারিত না হয়, তাদের দিয়ে কোনও বেআইনি কাজ যাতে কেউ না করায় সেসব দেখা৷ আর সর্বোপরি তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা৷ এই সব সীমান্তবর্তী এলাকাতে শিশুদের নিয়ে মাঝে মাঝে নানা ধরনের বেআইনি কাজের খবর আসে৷ সে খবরগুলো হল শিশুদের মাধ্যমে মাদক পাচার, হিউম্যান ট্রাফিকিং অর্থাৎ অন্য দেশে বা ভিন রাজ্যে শিশুদের চালান করা, এমনকী শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রি করার মতো জঘন্য ঘটনাও কখনও কখনও অপরাধীরা সংগঠিত করে৷ আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি এসব অপরাধ বন্ধ করার৷ তাই নতুন কোনও আশ্রমের সন্ধান পেলেই তা পরিদর্শন করছি আমরা৷ যদি আমাদের মনে হয় যেখানে বাচ্চাদের নিরাপত্তার অভাব আছে তবে সেই আশ্রম থেকে শিশুদের উদ্ধার করে সরকারি হোমেও পাঠিয়ে দিই৷’

চূর্ণী বলল, ‘হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে শিশুদের পাচার করার বা তাদের কিডনি পাচার করার মতো ভয়ঙ্কর সব খবর ছাপা হয়৷ ও সব দেখলেই বুকটা কেমন করে ওঠে!’

তার কথা শুনে মিস্টার বক্সী বললেন, ‘আপনাদের পরিচয়পত্র দেখতে চাইলাম বলে কিছু মনে করবেন না৷ বুঝতেই পারছেন আমাদের সতর্ক থাকতে হয়৷’

মল্লার বলল, ‘না, কিছু মনে করিনি৷ আপনাদের ডিউটি তো আপনারা করবেনই৷ আর আমাদের অর্থাৎ জনসাধারণেরও উচিত ওসব জঘন্য কাজ বন্ধে আপনাদের পাশে থাকা৷’

মিস্টার বক্সী বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ৷’

মল্লার বলল, ‘ঠিক আছে আমরা তবে এবার যাই৷ আপনার আপত্তি নেই তো?’

মিস্টার বক্সী বললেন, ‘না, না, আপনাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷ আপনারা যেতে পারেন৷’

মিস্টার বক্সী এরপর তার সঙ্গীদের নিয়ে এগলেন তমসাময়ের সঙ্গে আর মল্লাররা এগল অন্যদিকে৷ সোহম, মল্লারকে জিগ্যেস করল, ‘এখন কোথায় আর যাব? একটু হাঁটাহাঁটি করে ঘরের দাওয়াতে বসে গল্প করি৷ আর তো কোনও কাজ নেই৷ খেয়ে লম্বা ঘুম দেব। আজকের দিনটাতেও ভালো করে রেস্ট নেব৷ কাল কলকাতা ফিরব আর পরশু থেকেই তো অফিসের চাপ শুরু হবে৷’

সোহম বলল, ‘রাতে বসে আলোচনা করে টাকা দেবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে৷ আমার কিন্তু আশ্রমটা মন্দ লাগেনি৷ সবাই এক মত হলে কাল সকালে তমসাময়ের হাতে চেকটা ধরিয়ে দেব৷

চূর্ণী বলল, ‘ছেলেগুলোর কথা শুনে কিন্তু একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে তাদের ব্যাপারে তমসাময় কিন্তু খুব যত্নবান৷ ত্রুটি-বিচ্যুতি যতটুকু আছে তা আছে অর্থাভাবের কারণে৷’

মল্লার বলল, ‘আমাদের টাকাগুলো পেলে তমসাময় হয়তো সে সব ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে পারবেন৷ লোকটাকে দেখে আমার অসাধু প্রকৃতির বলে মনে হচ্ছে না৷’

এই আলোচনার মধ্যে দিয়ে তারা প্রাথমিকভাবে অনেকটাই যেন একমত হয়ে গেল টাকাটা তমসাময়কে দেওয়ার ব্যাপারে৷

আশ্রমের মধ্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল তারা৷ চূর্ণী এক সময় বলল, ‘একটা সত্যি কথা বলছি, কোথাও যাওয়ার নেই বলে আমার এবার কেমন যেন বোর ফিল হচ্ছে৷’

সোহম বলল, ‘আমিও ঠিক এই কথাটাই বলতে যাচ্ছিলাম৷ সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পরই আমারও যেন এ জায়গাটা আর তেমন ভালো লাগছে না৷ আসলে চারপাশে এখানে তেমন কিছু দেখার নেই তো তাই৷ একটু ভালো লাগার জায়গা বলতে শুধু এই নদীর পাড়টা৷ তাও সেখানে কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে?’

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তারা পৌঁছে গেল শনের ছাউনি দেওয়া, বেড়ার গায়ে কালো রং করা ঘরটার সামনে৷ সেখানে গিয়ে সোহম দাঁড়িয়ে পড়ল৷ আর তার সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও দাঁড়াল৷ অন্য ঘরগুলোর থেকে বেশকিছুটা তফাতে এই ঘরটা আশ্রমের সীমানার বেড়ার প্রায় গা ঘেঁষে একলা দাঁড়িয়ে আছে৷ তমসাময় বলেছিলেন, ‘এ ঘরটাই তাঁর ডেরা ছিল যখন তিনি তন্ত্র সাধনা করতেন৷ পরে তিনি জমি কিনে আশ্রমের অন্য বাড়ি-ঘরগুলো তৈরি করেন৷ কুঁড়ে ঘর হলেও এই কালো রঙের ঘরটা আর তার চারপাশে কেমন যেন একটা গাম্ভীর্য ছড়িয়ে আছে৷ চারপাশে কোথাও কোনও শব্দ নেই, একটা পাখির ডাক পর্যন্ত নয়৷ ঘরটার কোনও জানলা নেই, একটাই মাত্র দরজা, সেটার গায়ে তালা ঝুলছে৷ দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা বেশ বড় ফণিমনসা গাছ৷

সোহম বলল, ‘এই আশ্রমে যতগুলো ঘর বা বাড়ি আছে তার মধ্যে শুধু এ ঘরটার দরজাতেই তালা ঝোলানো আছে দেখছি৷ ঘরের ভিতর কী রাখা আছে বলত?’

মল্লার বলল, ‘তমসাময় তো বলেছিলেন, তাঁর তন্ত্র সাধনার জিনিসপত্র রাখা আছে এ ঘরে৷ কঙ্কাল-টঙ্কাল থাকতে পারে হয়তো৷’

মল্লারের প্রত্যাশা মতোই তার এ কথা শুনে চূর্ণী মৃদু আঁতকে উঠে বলল, ‘চল, এখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এখানে দেখার কী আছে!’

চূর্ণীকে আর একটু খ্যাপাবার জন্য সোহম বলল, ‘দেখি তো, বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে কঙ্কালটা দেখা যায় কি না?’

এই বলে সে ঘরটার দিকে এগতে যাচ্ছিল৷ ঠিক সেই সময় তাদের হাত দশেক তফাতে ঘরের দরজার পাশের ফণিমনসা গাছ থেকে একটা খসখস শব্দ হল৷ আর তারপরই চূর্ণী চিৎকার করে উঠল, সাপ! সাপ!

সঙ্গে সঙ্গে সোহম আর মল্লার ছিটকে পিছনে সরে এসে গাছটার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল সাপটাকে৷ বিরাট বড় একটা সাপ ফণিমনসার ঝোপের আড়াল থেকে মাথা বার করে মল্লারদের দিকে দেখছে আর মাঝে মাঝে তার চেরা জিভটা বাতাসে ছুড়ে দিচ্ছে৷ মল্লাররা অনুমান করল সাপটা বেশ বড়ই হবে৷ সে যেন মল্লারদের বলছে, ‘তফাত যাও৷’

সাপটাকে দেখার পর তারা আর কেউ সেখানে দাঁড়ানো সমীচীন বোধ করল না৷ সে জায়গা ছেড়ে দ্রুত তারা ফিরতে শুরু করল৷ কিছুটা এগবার পর গাড়ির শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখল মিস্টার বক্সীর গাড়িটা ফিরে যাচ্ছে৷ এসইউভি গাড়িটা যখন আশ্রম ছেড়ে বেরিয়ে গেল তখন আশ্রমের মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে তারা৷ তমসাময় এগিয়ে আসছিলেন৷ তিনি তাদের সামনে এসে দাঁড়াতেই চূর্ণী উত্তেজিত স্বরে তার উদ্দেশে বলল, ‘আপনার ওই কালো ঘরটার সামনে বিশাল বড় একটা সাপ দেখে এলাম৷’

তমসাময় কথাটা শুনে বিস্মিত না হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, ও ওখানেই থাকে৷ পদ্ম গোখরো৷ অনেক দিন ধরেই আছে৷ বাস্তু সাপও বলতে পারেন৷ শীতকালে দরজার সামনে শুয়ে রোদ পোহায়৷’

মল্লার এরপর জানতে চাইল, ‘মিস্টার বক্সী যাওয়ার আগে আর কিছু বললেন?’

তমসাময় জবাব দিলেন, ‘ছেলেদের নাম তালিকা সব নিয়ে গেলেন৷ সরকারের ঘরের আবেদনপত্রর একটা কপিও নিলেন, বলে গেলেন ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজঘবর করবেন তিনি৷ প্রয়োজন হলে আবার এখানে আসবেন৷ আর হ্যাঁ, গাড়িতে ওঠার আগে আর একটা কথাও বলে গেলেন তিনি৷ বললেন, ‘তারা যে এখানে এসেছিলেন তা যেন আমরা কাউকে না জানাই৷ ওই যারা শিশু পাচার-টাচার করে, খবরটা সে সব লোকদের কানে গেলে তারা সতর্ক হয়ে যাবে৷’ একথা বলার পর তিনি বললেন, ‘গঞ্জে একটা কাজ ছিল৷ ভেবেছিলাম আপনাদের টাকা দিয়ে ছেলেগুলোর জন্য মিষ্টি কিনে আনব, কিন্তু এখন আর তা হবে না৷ লোকগুলো আসাতে দেরি হয়ে গেল৷’

চূর্ণী বলল, ‘ঠিক আছে আপনি সময় মতো ছেলেগুলোকে খাবার কিনে দিলেই হবে৷’

তমসাময়ের সঙ্গে আরও টুকটাক কিছু কথা বলে মল্লাররা রওনা হল তাদের ঘরের দিকে৷ সেখানে ফিরে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে তারা স্নান সেরে নিল৷ নির্ধারিত সময় বুনো খাবার দিয়ে গেল৷ খাওয়া সেরে মল্লাররা দিবা নিদ্রা দেওয়ার জন্য চাদর কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল৷