জলঙ্গীর অন্ধকারে – ৭
রবিবার মল্লাররা কলকাতা ফিরেছিল৷ পরদিন থেকেই সবার অফিস৷ মল্লারের ব্যাঙ্ক চাঁদনি চকে৷ সোহম আর চূর্ণী দু’জনের অফিস সল্টলেক৷ সোহমের করুণাময়ী, চূর্ণীর সেক্টর ফাইভ৷ মল্লারের ব্যাঙ্কটা বাণিজ্যিক অঞ্চলে অবস্থিত বলে তার কাজের চাপ প্রচুর৷ দশটায় ব্যাঙ্কে ঢুকে বেরোতে বেরোতে এক এক দিন সন্ধ্যা সাতটাও বেজে যায়৷ সোমবার অফিস জয়েন করার পর শুক্রবার পর্যন্ত কাজের চাপে মল্লার মাথা তুলতে পারেনি৷ বাড়ি ফিরে আসার পর সোহমকে দু-দিন ফোন করতে পারেনি মল্লার৷ তবে অফিস থেকে ফেরার পর তিন দিন মল্লারের সঙ্গে চূর্ণীর কথা হয়েছে ফোনে৷ চূর্ণী তাকে জানিয়েছে অফিসের কাজের চাপে তার আর সোহমের দেখা না হলেও একটা টেলিফোন বুথ থেকে সোহম তাকে রাতের দিকে ফোন করে খবরা খবর নেয়৷ এখনও সে নতুন মোবাইলের ব্যবস্থা করেনি৷ সোহমের অফিসেও নাকি কাজের প্রচণ্ড চাপ চলছে৷
এদিন মাসের দ্বিতীয় শনিবার৷ তাই ব্যাঙ্ক বন্ধ৷ রবিবার অথবা শনিবার ছুটি থাকলে মল্লার সারা সপ্তাহর বাজার করে রাখে৷ কাছেই মানিকতলা বাজার৷ পায়ে হেঁটে পনেরো মিনিট৷ ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে থলে হাতে মল্লার বাজারের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল৷ সকাল সাতটা বাজেনি৷ শীতের কলকাতা এখনও বেশ জড়সড়ো হয়ে আছে৷ রাস্তায় স্থানীয় লোক ছাড়া খুব বেশি লোক নেই৷ মল্লার হাঁটতে হাঁটতে বাজারে পৌঁছে গেল৷ সব্জি কেনার পর সে মাছ বাজারে গিয়ে ঢুকল৷ বেশ বড় মাছ বাজার৷ এই সাত সকালেও হাঁকডাকে সরগরম৷ কয়েক পা এগতেই হঠাৎই সে দেখতে পেল সোহমকে৷ তার দিকে পিছন ফিরে এক মাছওলাকে টাকা দিচ্ছে৷ মল্লার সোহমকে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল৷ শ্যামবাজার থেকে সাতসকালে মনিকতলার বাজারে সোহম এসেছে কেন? তার বাড়িতে তো রান্নার পাট নেই৷ দুপুরবেলা সে অফিসের ক্যান্টিনে লাঞ্চ সারে আর রাতে ও ছুটির দিন হোম সার্ভিসের মাধ্যমে খাবার আসে, সে কথা মল্লারের জানা৷ তবে সে মাছ কিনছে কেন?
মল্লার এগিয়ে গিয়ে সোহমের পিছনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে টোকা দিল৷ মাছের ব্যাগ হাতে সোহম ঘুরে দাঁড়াল৷ মল্লারকে দেখে মুহূর্তের জন্য যেন একটা অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল সোহমের মুখে৷ তারপরই অবশ্য সে হেসে বলল, ‘তুই একদিন বলেছিলি যে এখানে ভালো মাছ পাওয়া যায় তাই মাছ কিনতে চলে এলাম৷’
মল্লার জানতে চাইল, ‘তুই আমার মতো রান্নার মাসি রেখেছিস? নাকি চূর্ণী তোর ওখানে গিয়ে রান্না করবে?’
সোহম জবাব দিল, ‘দুটোর কোনওটাই নয়৷ আসলে বছরের পর বছর ধরে বাইরের রান্না খেতে আর ভালো লাগছে না৷ তাই এবার থেকে নিজেই রান্না করে খাব ভাবছি৷ প্রথমে একটু অসুবিধা হলেও আশা করি ক’দিনের মধ্যেই পেরে উঠব৷’
শনিবার সোহমের অফিসে হাফ-ডে থাকে তা জানে মল্লার৷ তাই সে সোহমকে বলল, ‘আমার আজ ছুটি৷ তুই বিকালে কী করবি৷’
সোহম মৃদু ভেবে নিয়ে জবাব দিল, ‘তেমন কাজ নেই৷ বাড়িতেই থাকব৷’
মল্লার বলল, ‘তাহলে তোর বাড়িতে গিয়ে আড্ডা দেব৷ চূর্ণীকেও খবর দেওয়া যেতে পারে৷ যদি সে অফিসে ম্যানেজ করে আসতে পারে তবে আরও ভালো হবে৷’
সোহম বলল, ‘তুই আয়, তবে চূর্ণীকে আজ ডাকার দরকার নেই৷’
কথাটা শুনে মল্লার বলল, ‘কেন, চূর্ণীর সঙ্গে ঝগড়া করেছিস নাকি?’
সোহম বলল, ‘ব্যাপারটা তা নয়৷ একজন একটা স্কচ হুইস্কির বোতল গিফট করেছিল। সেটা পড়ে আছে৷ বহুদিন ওসব খাওয়া হয়নি৷ তুই গেলে দু’জনে মিলে পানাহার করা যাবে৷ চূর্ণী তো আবার বোতল দেখলেই খেপে যায়৷ ও এলে গালাগালির চোটে আমাদের পানাহারের বারোটা বেজে যাবে৷ তাই তোকে একলা আসতে বললাম৷’
মল্লার বলল, ‘ঠিক আছে৷ আমি তবে বিকেল পাঁচটা নাগাদ তোর বাড়ি পৌঁছে যাব৷ যাওয়ার সময় কিছু স্ন্যাক্সও কিনে নিয়ে যাব৷’
মল্লার এ কথা বলার পর সোহমের ব্যাগের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘দেখি কী মাছ কিনলি?’
মল্লার এরপর সোহমের থলেটা ফাঁক করতেই দেখতে পেল একটা বেশ বড় আকারের শোল মাছ রয়েছে তার থলের মধ্যে৷ কাটা নয়, গোটা শোল মাছ৷
মুহূর্তের জন্য মাছটা দেখে মল্লারের হঠাৎই মনে পড়ে গেল জলঙ্গী নদীর ধারে নবজীবন আশ্রমের বুনোর মুখ থেকে শোনা শোল মাছের সেই টোপের কথা৷
সোহম এরপর আর দাঁড়াল না৷ ‘বিকেলে দেখা হচ্ছে’ বলে তাড়াতাড়ি সে বাজার ছেড়ে বেরোবার জন্য পা বাড়াল৷ আর মল্লারও সোহম যার থেকে মাছ কিনেছিল তার থেকেই মাছ কিনে বাড়ির পথ ধরল৷
সোহমের সঙ্গে হওয়া কথা মতোই বিকাল চারটে নাগাদ মল্লার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তার বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে৷ পথে একটা দোকান থেকে কাবাব আর তন্দুরি কিনে মল্লার যখন শ্যামবাজারের মোড় পেরিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ সোহমের পাড়ার গলিতে ঢুকল তখন রাস্তার আলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে৷
গলিটা বেশি চওড়া নয়৷ সোহম যে বাড়িতে ভাড়া থাকে সে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে উল্টোদিক থেকে একটা মোটর বাইক আসছে দেখে তাকে রাস্তা দেবার জন্য মল্লার তার গাড়ির গতি কমিয়ে রাস্তার এক পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল৷ বাইকে দু-জন আরোহী৷ বাইকটা মল্লারের গাড়ির গা ঘেঁষে যাবার সময় এক ঝলকের জন্য চালকের পিছনে বসা লোকটার মুখটা মল্লারের চোখে পড়ল৷ মল্লারের যেন মনে হল সে লোকটা, সেই নদী গবেষক খাস্তগীর! কিন্তু সে লোক সোহমের পাড়াতে আসবে কেন? লোকটা সত্যি খাস্তগীর নাকি ব্যাপারটা আসলে দেখার ভুল তা ঠিক বুঝতে পারল না মল্লার৷ বাইকটা পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার পর সে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়ল সোহমের ভাড়া বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে৷
তিনতলা বাড়িটাতে আট-দশটা পরিবার বা ভাড়াটে থাকে৷ মল্লার বহুদিন এসেছে বাড়িটাতে৷ গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে উঠে সে সোজা পৌঁছে গেল তিন তলার কোণার দিকে সোহমের ঘরের দরজাতে৷ বেশ কয়েকবার বেল বাজার পর দরজা খুলল সোহম৷
মল্লার ঘরে ঢুকল৷ ঘর অন্ধকার৷ তাছাড়া যেন একটা অদ্ভুত গন্ধও তার নাকে লাগল৷ মল্লার বলল, ‘কী রে, সন্ধ্যাবেলা সারা বাড়ি অন্ধকার করে রেখেছিস কেন?’
দরজা বন্ধ করে লাইট জ্বালিয়ে সোহম বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷’
সোহমের বাসস্থান বলতে একটা ড্রইং কাম ডাইনিংকে ঘিরে বেডরুম, কিচেন আর বাথরুম৷ মল্লার এখানে সোহমের সঙ্গে বেশ কয়েকবার রাত্রিবাসও করেছে৷ মল্লার জানে সোহম বিয়ের পর চূর্ণীর ফ্ল্যাটে চলে যাবে৷
ডাইনিং টেবিলের উপর মদের বোতল, গ্লাস আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছিল সোহম৷ মল্লার সেই টেবিলে খাবারের প্যাকেট নামিয়ে চেয়ার টেনে বসে নাক কুঁচকে বলল, ‘কীসের যেন একটা পোড়া গন্ধ পাচ্ছি! কোথাও ইলেকট্রিক তার পুড়ছে না তো?’
সোহম এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে বলল, ‘দাঁড়া, ধূপ জ্বালাচ্ছি।’
ধূপ জ্বালাল সোহম৷ তারপর কিচেনে গিয়ে দুটো প্লেট আর জলের বোতল নিয়ে ফিরে এসে মল্লারের মুখোমুখি চেয়ারে বসল৷
খাবার সাজানো হল প্লেটে৷ তারপর গ্লাসে হুইক্সি ঢেলে তাতে জল মিশিয়ে মল্লার বলল, ‘একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম৷ জানি না ঠিক দেখলাম কি না। তোর বাড়ির রাস্তার সামনে দিয়ে একজনের বাইকের পিছনে বসে ওই খাস্তগীর নামের লোকটাকে যেতে দেখলাম! ওই যার সঙ্গে সেই জলঙ্গীর গঞ্জে দেখা হয়েছিল৷’
সোহম একটা গ্লাস উঠিয়ে নিয়ে চিয়ার্স করে বলল, ‘ওঁর মতো দেখতে অন্য লোক হতে পারে আবার উনিও হতে পারেন৷ মানুষ তো কত প্রয়োজনে কত জায়গায় ঘুরে বেড়ায়৷ কোথাও যেতে তো কারও বাধা নেই৷’
মল্লার বলল, ‘তা বটে৷’
গ্লাসে চুমুক দিয়ে মল্লার জানতে চাইল, ‘মোবাইল ফোন কিনেছিস? কানেকশন নিলি?’ সোহম জবাব দিল, ‘পুরোনো নাম্বারে কানেকশন নেওয়ার জন্য সিম হারিয়েছে বলে থানাতে ডায়েরি করতে হবে৷ কাজের চাপে করা হচ্ছে না, মোবাইলও কেনা হয়নি৷’
মল্লার প্রশ্ন করল, ‘মোবাইল ছাড়া তোর অসুবিধা হচ্ছে না? এখন তো মোবাইল ছাড়া কারও একবিন্দু চলে না৷’
সোহম মৃদু হেসে বলল, ‘ব্যাপারটা আসলে অভ্যাস৷ পরিবর্তন করলেই করা যায়৷ নবজীবন আশ্রমে কি আমাদের ফোন কাজ করছিল? জীবনবাবার কি মোবাইল আছে?’
এ কথার জবাবে মল্লার বলতে যাচ্ছিল যে, ‘আমাদের শহুরে জীবনে মোবাইল ছাড়া কি চলে?’ কিন্তু তার আগেই সোহম বলল, ‘আশ্রমটা কিন্তু বেশ ছিল তাই না? বিশেষত জীবনবাবা আর বাচ্চাগুলোকে আমি চোখ বন্ধ করলেই স্পষ্ট দেখতে পাই৷ আমার কেমন যেন মনে হয় ছেলেগুলো আমাকে ডাকছে৷ যদি ওখানে চলে যাওয়া যায় তবে বেশ হয়৷’
মল্লার গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ‘এ কথা ঠিকই আশ্রমটা বেশ নিরিবিলি, শান্ত৷ আর তমসাময়ের মতো লোকও হয় না৷ কিন্তু এখন এখানে বসে তোর ওখানে গিয়ে থাকার কথা মনে হলেও দু-দিনের বেশি থাকতে পারবি না৷ আসলে আমরা শহুরে জীবনে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে ওসব জায়গাতে বেশিদিন থাকা মুশকিল৷ তোরও তো ওখানে দু’দিন থাকতে না থাকতেই আর ভালো লাগছিল না৷ আমাদের কারওরই ভালো লাগছিল না৷’ কথাটা শুনে হাতের গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে সোহম যেন স্বগতোক্তির স্বরেই বলল, ‘হয়তো এবার সেখানে গেলে আমার আর খারাপ লাগবে না৷’
মল্লার কথাটা শুনে হেসে বলল, ‘আর ক’দিন পর তো তোদের দুজনের বিয়ে হবে৷ তারপর চূর্ণীকে নিয়ে নবজীবন আশ্রমে হানিমুন করতে যাস৷ বিয়ে মানেই তো স্বামী-স্ত্রীর নতুন জীবন৷ নবজীবন আশ্রমের সঙ্গে ব্যাপারটা বেশ ম্যাচ করবে৷’
সোহম কী যেন ভেবে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘হ্যাঁ, নবজীবনই বটে!’
মল্লার আর সোহম এরপর আশ্রমের প্রসঙ্গ ছেড়ে অন্য আলোচনায় চলে গেল৷ তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল মদ্যপান৷ মল্লার এক সময় খেয়াল করল তার আনা খাবারগুলো সোহম খুব একটা খাচ্ছে না৷ কাবাবের একটা টুকরো হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকছে৷ তা দেখে মল্লার জিগ্যেস করল, ‘কী রে খাচ্ছিস না কেন?’ খেতে ভালো লাগছে না?’
সোহম জবাব দিল, ‘দুপুরে দেরি হয়েছে খেতে, পেটটা ভার লাগছে, তাই অল্প খাচ্ছি৷’ সোহমের জবাব শুনে মদ্যপান আর গল্প করার সঙ্গে সঙ্গে মল্লার যথাসম্ভব খাবারগুলো উদরস্থ করার চেষ্টা করতে লাগল৷ বাইরে বেড়ে চলল রাত৷
তিন-চার পেগ খাবার পর মল্লারের একটু ঝিমুনি শুরু হল৷ কদিন অফিসে প্রচণ্ড কাজের চাপ গেছে তাই শরীরের ভিতর একটু ক্লান্তি বোধও কাজ করছিল৷ মদ্যপান আর খাওয়া শেষ হয়ে গেছে তার৷ একটু রিল্যাক্স করার জন্য টেবিলে ঝুঁকে পড়ে দু-হাতের মধ্যে মাথা গুঁজে শুয়ে পড়ল সে৷
কিছুটা সময়ের জন্য গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল মল্লার৷ তারপর সেই তন্দ্রাভাব কাটিয়ে উঠে চোখ মেলে সে দেখল সোহম তার সামনে নেই৷ সোহম সম্ভবত তার বেডরুমে বা অন্য কোথাও গিয়ে ঢুকেছে৷ ঘড়িতে রাত ন’টা বাজে৷ এবার মল্লারকে তার বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হতে হবে৷ চেয়ার থেকে উঠে মল্লার গিয়ে দাঁড়াল ডাইনিং সংলগ্ন বেসিনের সামনে৷ কল খুলে মুখে কয়েবার জলের ঝাপটা দিয়ে রুমাল বার করে মুখ মুছে বেসিনের আয়নার দিকে তাকাতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল তার৷ সোহমের কিচেনের দরজাটা খোলা৷ আয়না দিয়ে কিচেনের ভিতরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ সেখানে সোহম দাঁড়িয়ে৷ দু-হাত দিয়ে সে তার মুখের কাছে আস্ত একটা মাছ তুলে ধরে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে৷ তার চোখেমুখে জেগে আছে স্পষ্ট উল্লাসের ভাব!
কিছুক্ষণ আগেই তো সোহম বলল যে তার খিদে নেই৷ তাহলে সে ওভাবে গোগ্রাসে মাছ খাচ্ছে কেন? আর ওভাবে সে মাছের গা থেকে কামড়ে কামড়ে মাংস খাচ্ছে কেন! এর আগে এভাবে কাউকে মাছ খেতে দেখেনি মল্লার৷ কৌতূহলী হয়ে সে বেসিন ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল কিচেনের সামনে৷ সোহমের বাড়িতে ঢোকার পরই যে গন্ধ তার নাকে এসে লেগেছিল তা এবার চিনতে পারল সোহম৷ পোড়া মাছের গন্ধ৷ সোহম মল্লারকে দেখে প্রথমে চমকে উঠল৷ পোড়া শোল মাছটা তখন তার মুখের কাছে ধরা৷ পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া গোটা একটা মাছ! তার মাথা, চামড়া, লেজ কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি৷ উৎকট গন্ধ বেরোচ্ছে তার থেকে৷ মল্লারকে দেখে প্রথমে সোহম চমকে উঠলেও সে মাছটা নামিয়ে হেসে বলল, ‘বাড়িতে মাছটা কিনে আনার পর কীভাবে রান্না করব বুঝে উঠতে না পেরে মাছটা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম৷ খেতে কিন্তু মন্দ লাগছে না৷’
সোহমের কথা শুনে মল্লার বলল, কিন্তু তুই গোটা শোল মাছটা এভাবে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছিস কেন? কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে দেখতে!’
সোহম বলল, ‘হাতের কাছে টুকরো করার জন্য ছুরি পেলাম না তাই এভাবে খাচ্ছি৷ পোড়া মাছ বলে তোকে আর দিইনি৷’
সোহমের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই আঁশটে পোড়া গন্ধে গা গুলিয়ে উঠতে শুরু করেছে মল্লারের৷ সে বলল, ‘দিসনি ভালো করেছিস৷ আমি এবার যাই৷ অনেক রাত হল৷’—এই বলে মল্লার কিচেনের দরজা ছেড়ে এগলো সদর দরজার দিকে৷ দরজা খুলে দেবার জন্য তার পিছন এল সোহম৷ আর তার সঙ্গে সঙ্গে সেই গা গোলানো গন্ধটাও৷ মল্লার দরজার বাইরে বেরোতেই ভিতর থেকে সোহম দরজা বন্ধ করে দিল৷ ঘরের বাইরের খোলা বাতাসে বেরিয়ে এসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল মল্লার৷ নীচে নেমে এসে গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করে একবার নীচ থেকে মল্লার তিনতলার দিকে তাকাল৷ তিনতলার কোণার দিকে একটা ঘরের কাচের শার্শির ভিতর আলো দেখা যাচ্ছে৷ কুয়াশা নামতে শুরু করেছে বাড়ির মাথায়৷ সেই কুয়াশায় কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে জানলার হলদেটে আলোটা৷ সোহম কি ও ঘরে গিয়ে একইভাবে উৎকট গন্ধওয়ালা পোড়া শোল মাছটা খাচ্ছে? দৃশ্যটা আর একবার ভেসে উঠল মল্লারের চোখে৷ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল মল্লার৷
সে বাড়ি ফিরে এল রাত দশটা নাগাদ৷ গাড়ি গ্যারেজ করে ঘরে ঢোকার পরই মল্লারের ফোন বেজে উঠল৷ চূর্ণীর ফোন৷ কলটা রিসিভ করতেই চূর্ণী বলল, ‘সোহমের সঙ্গে দু-দিনের মধ্যে কোন যোগাযোগ হয়েছিল?’
মল্লার যে সোহমের বাড়ি গিয়েছিল তা প্রথমে চূর্ণীকে বলবে কি না বুঝতে না পেরে মল্লার বলল, ‘কেন বলতো?’
চূর্ণী বলল, ‘কাল সোহম ফোন করেনি৷ আজও সারাদিন ওর ফোনের জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু রাত দশটা বেজে গেল ওর ফোন এল না, খুব চিন্তা হচ্ছে রে৷ এত রাত হয়ে গেছে বলে ওর বাড়ি যেতে পারছি না৷ সারা রাত দুশ্চিন্তায় কাটবে আমার।’
সোহম চূর্ণীর হবু স্বামী৷ তার জন্য চূর্ণীর দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক৷ মল্লার এবার অনুভব করল চূর্ণীকে দুশ্চিন্তা মুক্ত করার জন্য সত্যিটা বলা প্রয়োজন৷ তাই সে বলল, ‘তোর চিন্তার কোনও কারণ নেই৷ বিকেলে সোহমের বাড়ি গিয়েছিলাম৷ খাওয়া-দাওয়া আড্ডা দিয়ে ওখান থেকে এখনই বাড়ি ফিরলাম৷ সোহম ঠিকই আছে৷’
কথাটা শুনেই চূর্ণী বলল, ‘যাক বাঁচলাম৷ সোহম কেমন দিন দিন ইরেসপন্সেবল হয়ে যাচ্ছে দেখেছিস? দু’দিনের মধ্যে ফোন করার সময় পেল না! তুই ওখানে গিয়েছিলিস যখন তখন তোর মোবাইল থেকে তো আমাকে কল করতে পারত৷ তাছাড়া একটা ব্যাপার শুনে আমার টেনশন আরও বেড়ে গেল৷’
মল্লার জানতে চাইল, ‘কী ব্যাপার?’
চূর্ণী বলল, ‘সোহম তোকে ওর অফিস নিয়ে কিছু বলল?’
‘না, ওর অফিস নিয়ে কোনও কথা হয়নি৷’
চূর্ণী বলল, ‘আজ আটটা নাগাদ অফিস থেকে যখন বাড়ি ফিরছি তখন বাসে সোহমের এক অফিস কলিগ তাপসবাবুর সঙ্গে আমার দেখা৷ সোহমই একটা পার্টিতে ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়েছিল কিছুদিন আগে৷ আমার সঙ্গে যে সোহমের বিয়ে হতে চলেছে সেটা ভদ্রলোক জানেন৷ আমাকে তিনি বললেন, সোহমের খবর কী? সে সুস্থ আছে কি না? তিন দিনের ছুটি নিয়ে সোহম যেখানে গিয়েছিল, সেখান থেকে সে ফিরেছে কি না? সোমবার সোহমের অফিসে জয়েন করার কথা থাকলেও আজ শনিবার পর্যন্ত সে নাকি অফিসে যায়নি! অফিস থেকে সোহমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ বলছে৷’
চূর্ণীর মুখে ব্যাপারটা শুনে মল্লারও বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল৷ সে বলল, ‘অদ্ভুত ব্যাপার! তুই লোকটাকে কী বললি? লোকটা আর কী বলল?’
চূর্ণী বলল, ‘লোকটার মুখ থেকে কথাগুলো শুনে আমি এতটাই বিস্মিত হয়ে গেলাম যে কী বলব সেটাই প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি৷ আমি শুধু বললাম, ‘সোহমের মোবাইল ফোনটা হারিয়ে গিয়েছে বলে শুনেছি৷’ আর এরপরই বাস স্টপ চলে এল৷ আমিও বাস থেকে নেমে পড়লাম৷’
মল্লার বলল, ‘এতক্ষণ ধরে আমাদের আড্ডা হল, কিন্তু অফিস সংক্রান্ত ব্যাপারে একটা শব্দও আমাকে সে বলেনি৷ ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না৷ ভদ্রলোক তোর সঙ্গে কোনও প্র্যাক্টিকাল জোক করেননি তো?’
চূর্ণী বলল, ‘আমিও ঠিক ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছি না৷ প্র্যাক্টিক্যাল জোক করার মতো সম্পর্ক তো ভদ্রলোকের আমার সঙ্গে নয়৷ যাক তোর মুখ থেকে সোহমের খবরটা পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম৷ কাল রবিবার৷ সকালে উঠে নিজেই চলে যাব সোহমের ওখানে৷ এবার তুই শুয়ে পড়৷ গুডনাইট৷’
মল্লারও ‘গুডনাইট’ বলে, চূর্ণীর ফোনটা কেটে দিল৷
পরদিন পাড়ারই একজনের বিয়ের বরযাত্রী হিসাবে মল্লারকে চন্দননগর যেতে হল৷ ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা হয়ে গেল৷ বাড়ি ফিরে তার মনে হল চূর্ণীকে একবার ফোন করে জিগ্যেস করে যে সোহমের বাড়ি সে গিয়েছিল কি না। অফিস না যাওয়ার ব্যাপারে সোহম চূর্ণীকে কিছু জানিয়েছে কি না। কিন্তু রাত বেশি হয়ে যাওয়াতে রবিবার রাতে চূর্ণীকে আর শেষ পর্যন্ত ফোন করল না মল্লার৷ সোমবার থেকে আবার যথারীতি তার অফিসের কাজের চাপ শুরু হল৷ সারাদিন অফিসের কাজ থেকে মল্লারের মাথা তোলার সুযোগ হল না৷ তবে সোমবার রাতে মল্লারকে নিজেই ফোন করল চূর্ণী৷ সে জানাল, খবরটা নাকি সত্যি৷ সোহম নাকি অফিস যাচ্ছে না৷ তার নাকি অফিস যেতে ভালো লাগছে না৷ আর অফিসের লোকদের ডাকাডাকি থেকে দূরে থাকতেই নাকি সে মোবাইল কানেকশন নিচ্ছে না৷
চূর্ণীর মুখ থেকে কথাটা শুনে মল্লার জানতে চাইল, ‘ভালো লাগছে না কেন, সে ব্যাপারে সোহম কিছু বলল?’
চূর্ণী বলল, ‘না, সেসব কিছু বলেনি সোহম৷ শুধু বলল, তার নাকি অফিসে যেতে ভালো লাগছে না, এমনকী কলকাতাতে থাকতেও ভালো লাগছে না৷ জীবনবাবার আশ্রমে নাকি তার চলে যেতে ইচ্ছা করছে৷ কেমন যেন অন্যমনস্ক মনে হল সোহমকে৷ জানি না কোনও ডিপ্রেশন কাজ করছে কি না?’
চূর্ণীর সব কথা শুনে সোহম বলল, ‘ঠিক আছে৷ এর মধ্যে একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় ঘুরে আসব সোহমের ওখান থেকে৷ জানার চেষ্টা করব, ব্যাপারটা কী? অনেক সময় মানুষের এমন হয়৷ ডিপ্রেশন আসে, আবার তা কেটেও যায়৷ তুই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি চিন্তা করিস না৷’ এরপর আরও টুকটাক কিছু কথা হবার পর ফোন ছেড়ে দিল মল্লার৷
এরপর মাঝের তিনটে দিন ঝড়ের মতো কেটে গেল মল্লারের৷ কাজের চাপ এত বেশি ছিল আর অফিস থেকে বেরোতে এত দেরি হচ্ছিল যে তারপর ক্লান্তিতে আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করেনি তার৷ সাড়ে সাতটা, আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরে মল্লার খাওয়া সেরেই বিছানায় শুয়ে পড়েছিল৷ চূর্ণীও এই তিনদিন আর তাকে ফোন করেনি৷ তবে শুক্রবার কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই সোহমের বাড়ি যাওয়ার একটা সুযোগ এসে গেল মল্লারের সামনে৷ শ্যামবাজারেও মল্লারদের ব্যাঙ্কের একটা ব্রাঞ্চ আছে৷ সেখানে একটা কাজে যাবার জন্য মল্লারকে জানানো হল তার ব্যাঙ্ক থেকে৷ ব্যাঙ্কে এসে খবরটা পেয়েই মল্লার মনে মনে ভেবে নিল যে, সে শ্যামবাজার ব্রাঞ্চের কাজ মিটিয়ে ফেরার সময় একবার সোহমের বাড়ি হয়ে আসবে৷
ব্যাঙ্কের নিজস্ব কাজকর্ম সাধারণত কাস্টমার আওয়ার্সের পর হয়৷ কারণ সকাল দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ব্যাঙ্ক কর্মীদের কাস্টমারদের সার্ভিস দিতেই কেটে যায়। মল্লারদের ব্যাঙ্কের শাখাগুলোর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই৷ নিজের ব্যাঙ্ক থেকে তাই বেলা সাড়ে চারটে নাগাদ শ্যামবাজারের ব্রাঞ্চের উদ্দেশে গাড়ি নিয়ে রওনা হল মল্লার৷ পাঁচটা নাগাদ যথাস্থানে পৌঁছে সেখানকার ব্যাঙ্ক কর্মীদের সঙ্গে সে কাজ শুরু করল৷ কাজ শেষ করে সে যখন সেই ব্যাঙ্কের বাইরে বেরোল তখন প্রায় রাত আটটা৷ বাইরের রাস্তার আলো অনেকক্ষণ আগেই জ্বলে গেছে৷ শীতের রাত বলে রাস্তা কিছুটা ফাঁকাও হতে চলেছে৷ শুধু মল্লারদের মতো কিছু লোক যাদের কাজ শেষ হবার সময়ের ঠিক নেই তারাই পথে আছে৷ ব্যাঙ্কের শ্যামবাজার ব্রাঞ্চ থেকে সোহমের বাড়ি মিনিট পনেরোর পথ৷ মল্লার গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে গেল তার বাড়ি যাওয়ার জন্য৷
গাড়ি নিয়ে গলি বেয়ে সে পৌঁছে গেল সোহমের বাসস্থানে৷ গাড়ি থেকে নেমে মল্লার তাকাল তিনতলার মাথাতে সোহমের রান্নাঘরের দিকে৷ মুহূর্তের জন্য মল্লারের মনে পড়ে গেল ওই রান্নাঘরে দেখা সোহমের পোড়া মাছ খাবার দৃশ্য৷ যখনই সেটা মনে পড়ে তখনই তার ওই ঘটনা কেমন যেন অদ্ভুত মনে হয়৷ তবে মল্লার নীচ থেকে তাকিয়ে দেখতে পেল সোহমের কিচেনে এখন কোনও আলো জ্বলছে না৷
বাড়িটাতে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে মল্লার, সোহমের ঘরের দরজার সামনে পৌঁছে দেখল সোহম নেই৷ তার ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে৷ কোথায় গেল সোহম? দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মল্লার ফোন করল সোহমের নাম্বারে৷ যান্ত্রিক কণ্ঠ জানাল সোহমের মোবাইল বন্ধ৷ অর্থাৎ সোহম মোবাইলের কানেকশন চালু করেনি৷ অগত্যা একটু হতাশভাবেই সিঁড়ি বেয়ে আবার নীচে নেমে এল৷ নীচে নেমে সে দেখল সোহমের বাড়ির মালিক তার ঘরের দরজার আগলে চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ মল্লারের এ বাড়িতে বেশ অনেকদিন ধরে যাওয়া আসার সুবাদে তাকে চেনেন বাড়ির মালিক উমাপতিবাবু৷ তাকে দেখে মল্লার বলল, ‘সোহম কোথায় গেছে বলতে পারেন? ওর কাছে এসেছিলাম, দেখছি ওর ঘরে তালা ঝুলছে৷ ও কখন ফিরবে কিছু জানেন?’
ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, জানি৷ অফিসে বেরিয়েছেন উনি৷ ফিরতে ফিরতে ধরুন ভোর পাঁচটা—আমিই তো তাঁকে দরজা খুলে দিই৷’
কথাটা শুনে মল্লার বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করল, ‘অফিস থেকে ভোর পাঁচাটায় ফিরছে মানে? কখন অফিসে বেরচ্ছে ও?’
উমাপতিবাবু বললেন, ‘এইতো রাত আটটা নাগাদ উনি অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন৷ সোমবার থেকে ওনার অফিসে নাইট ডিউটি চালু হয়েছে৷ রাত আটটা বা ন’টা নাগাদ উনি অফিসের জন্য বেরচ্ছেন, আর ফিরছেন ভোর পাঁচটা ছটায়৷’
বাড়িওয়ালার কথা শুনে বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল মল্লার৷ এর আগে সে কোনওদিন সোহম বা চূর্ণী কারও মুখ থেকেই শোনেনি যে সোহমকে নাইট ডিউটি করতে হয়! বাড়িওয়ালাকে মল্লার বলল, ‘সোহম ফিরলে বলবেন আমি এসেছিলাম৷ আর সম্ভব হলে আমার নাম্বারে সে যেন ফোন করে৷’
বাড়ি ফিরেই চূর্ণীকে ফোন করল মল্লার৷ চূর্ণী কলটা রিসিভ করতেই মল্লার বলল, ‘কেমন আছিস? তোর তো কোনও পাত্তাই নেই৷’
চূর্ণী বলল, ‘আসলে অফিসে খুব কাজের চাপ চলেছে৷ বাড়ি ফেরার পর এত ক্লান্ত লাগছে যে তোকে ফোন করব ভেবেও করা হয়নি৷’
মল্লার প্রশ্ন করল, ‘সোহমের খবর কী? এর মধ্যে কথা বা দেখা হয়েছে ওর সঙ্গে?’ চূর্ণী বিমর্ষ গলায় বলল, ‘না, দেখা হওয়ার সুযোগ হয়নি, তবে দু-দিন ও ফোন করেছিল৷ সামান্য কয়েকটা কথা হল ওর সঙ্গে৷ তারপরই ফোন রেখে দিল৷ বলেছে আমি যেন ফোন না পেলে চিন্তা না করি৷ সময় সুযোগ মতো ও ফোন করবে৷’
চূর্ণী বেশ আশঙ্কিত গলায় বলল, ‘আমরা নবজীবন আশ্রম থেকে ঘুরে আসার পর থেকেই ওর যেন কী একটা হয়েছে! যেদিন ওর বাড়ি গেলাম সেদিন দেখলাম ও কেমন যেন আনমনা৷ ভালো করে কথাও বলছে না৷ ফোনগুলো যেন নিয়ম রক্ষার জন্য করছে৷ সব থেকে বড় কথা, ও অফিস যাওয়া বন্ধ করল কেন, ওর কেন ভালো লাগছে না সেটা আমার কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না৷ কোথায় যেন শুনেছিলাম যে, কেউ বড় দুর্ঘটনা থেকে ফেরার পর ট্রমা কাটিয়ে না উঠতে পারার জন্য অনেক সময় অবসাদে ভোগে৷ তেমন হলে তো ওকে কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে৷ দেখতে দেখতেই তো আমাদের বিয়ের সময় চলে আসবে৷ কত কাজ বাকি! জানি না কী হবে৷’
চূর্ণী একটানা কথাগুলো বলার পর মল্লার বলল, ‘শুনলাম সোহম নাকি সোমবার থেকে অফিস যাচ্ছে! তুই জানিস না খবরটা!’
এ কথা শুনে চূর্ণী বেশ উৎফুল্ল ভাবে বলল, ‘তাই নাকি! সোহম আমাকে মঙ্গলবার আর কালকেও ফোন করেছিল৷ একবারের জন্যও কথাটা বলেনি তো! ঠিক খবর? তুই কোথা থেকে খবরটা শুনলি?’
ওই প্রশ্নের জবাবে মল্লার তার সোহমের বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারটা আর বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টা খুলে বলল চুর্ণীকে৷ ঘটনাটা শুনে চূর্ণী বেশ বিস্মিত ভাবে বলল, ‘ওর অফিসে নাইট শিফট থাকতেই পারে৷ কিন্তু ও কোনওদিন নাইট শিফটে কাজ করেছে বলে শুনিনি তো৷ সোহম ফোন করলে জিগ্যেস করব ওকে৷’—এ কথা বলে তার অফিসের একটা জরুরি ফোন আসতে মল্লারের লাইনটা চূর্ণী কেটে দিল৷
