জলঙ্গীর অন্ধকারে – ১০
অতিরিক্ত উত্তেজনা আর পরিশ্রমের ফলেই হয়তো শেষ পর্যন্ত ঘুম নেমে এসেছিল তার চোখে৷ একসময় সে স্বপ্ন দেখল সোহমের পিছন পিছন সে হেঁটে চলেছে কুয়াশা মাখানো অন্ধকার জলঙ্গীর পাড় ধরে৷ স্বপ্নের মধ্যে মল্লার সোহমকে জিগ্যেস করল, ‘তুই কোথায় যাচ্ছিস?’ সোহম কেমন একটা অদ্ভুত গলায় জবাব দিল, ‘শ্মশানে যাচ্ছি৷’
মল্লার বলল, ‘এত রাতে শ্মশানে যাচ্ছিস কেন? সেখানে গিয়ে কী হবে?’
সোহম উত্তর দিল, ‘ওখানে গেলেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবি৷’
মল্লার বলল, ‘না, আমি ওখানে যাব না৷’
হাঁটতে হাঁটতে সোহম যেন অস্পষ্ট হাসল৷ তারপর বলল, ‘আজ হোক বা কাল তোকেও তো ওখানেই যেতে হবে৷ শ্মশানই তো মানুষের শেষ ঠিকানা৷ তবে সময় নষ্ট করে কী লাভ? যেতে যখন হবে এখন আজই চল৷’
মল্লার এরপর থমকে দাঁড়িয়ে বেশ বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলল, ‘না, আমি এখন কিছুতেই ওখানে যাব না৷ আমি ফিরে যাচ্ছি৷’
মল্লার দাঁড়িয়ে পড়তেই সোহমও দাঁড়িয়ে পড়ে ফিরে তাকাল মল্লারের দিকে৷ চমকে উঠল মল্লার৷ সোহম কই? তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাংস-চর্মহীন ভয়ঙ্কর একটা মুখ৷ তার হিংস্র দাঁতগুলো মুখের বাইরে বার করা, চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে! মল্লারের দিকে তাকিয়ে সেই ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডলে একটা পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল৷ সেই ভয়ঙ্কর মূর্তি বলে উঠল, ‘এত দূর যখন আমার পিছনে এসেছিস এখন আর তোকে ফিরতে দেব না৷’—একথা বলে সে মল্লারে হাত চেপে ধরে তাকে শ্মশানের দিকে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে লাগল৷ আর মল্লার চেষ্টা চালাতে লাগল হাতটা ছাড়িয়ে নেবার৷ আর তার সঙ্গে বলতে লাগল, ‘আমি যাব না, কিছুতেই সেখানে যাব না৷’
এই পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল মল্লারের৷ চোখ মেলে সে দেখল তার হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে চূর্ণী৷ ভোর হয়ে গিয়েছে৷ তুই কোথায় যাবি না বলছিস?’
হঠাৎ এই প্রশ্নে সত্যি কথাটা বেরিয়ে এল মল্লারের মুখ থেকে৷ সে বলে ফেলল ‘শ্মশানে৷’ জবাব শুনে চূর্ণী প্রশ্ন করল, ‘তার মানে? কে তোকে শ্মশানে যেতে বলেছে?’
মল্লারের এবার হুঁশ ফিরল৷ গতরাতের ঘটনা বা সেই ভয়ঙ্কর লোকটার কথা শুনলে চূর্ণী ভয় পাবে৷ কথাটা বলা যাবে না তাকে৷ তাই মল্লার উঠে বসে বলল, ‘না, কিছু না৷ একটা স্বপ্ন দেখছিলাম৷’
চূর্ণী আর মল্লারকে প্রশ্ন করল না তার স্বপ্ন নিয়ে৷ সে বলল, ‘আমি ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে পড়েছি৷
তোকে এর আগে কয়েকবার ডাকলাম, কিন্তু তোর হুঁশ ছিল না৷ সোহমের ঘুম এখনও ভাঙেনি বোধহয়৷ তাকে বাইরে দেখছি না৷ তবে তমসাময় আর বুনো উঠে পড়েছে দেখলাম৷ তমসাময় নদীর দিকে গেলেন৷’
এ কথা বলে একটু থেমে চূর্ণী বলল, ‘সোহমের মুখ থেকে আজ কী শুনব কে জানে! তবে ও যাই করে থাকুক না কেন আমি ওর পাশে থাকব৷’
মল্লার বলল, ‘ও যাই বলুক না কেন, আমাদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে৷ দেখা যাক কী হয়৷’
সকাল সাতটা বেজে গিয়েছে৷ মল্লার এরপর চটপট উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল৷ বুনো এসে উপস্থিত হল চা নিয়ে৷ চূর্ণী তাকে জিগ্যেস করল, ‘সোহম কি ঘুম থেকে উঠেছে?’
বুনো জবাব দিল, ‘আমি ওদিকে যাইনি৷ তবে ছেলেরা সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে৷’ এ কথা বলে সে জানতে চাইল, ‘আপনারা কি দুপুরে খাবেন? তবে সেই মতো খাবারের ব্যবস্থা করব৷’
মল্লার জাবাব দিল, ‘এখনও ঠিক বলতে পারছি না৷ তোমাকে জানিয়ে দেব৷’
বুনো এরপর গত রাতের এঁটো বাসন নিয়ে চলে গেল৷ মল্লার আর চূর্ণী এরপর চা শেষ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে বেরিয়ে নীচে নেমে দাঁড়াল৷ সকাল সাড়ে সাতটা বাজে, কুয়াশা কেটে গিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে৷ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাড়িটা, যেখানে ছেলেগুলো আর সোহম আছে৷ তবে সে বাড়িটাকে তখনও যেন ঘুমন্ত বলেই মনে হল৷ দাওয়াতে কোনও ছেলে দাঁড়িয়ে নেই, কোনও শব্দও আসছে না সেখান থেকে৷
সেদিকে তাকিয়ে চূর্ণী বলল, ‘গিয়ে দেখবি নাকি সোহম উঠেছে কি না?’
মল্লার বলল, ‘না, দরকার নেই৷ ও নিশ্চয়ই বাইরে বেরবে৷ চল আমরা বরং আশ্রমের মধ্যে ঘুরে বেড়াই৷’
চূর্ণী একটা আক্ষেপের স্বরে বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম ও রাতে একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে! কিন্তু এল না৷’
চূর্ণীকে সঙ্গে নিয়ে মল্লার মাঠের মধ্যে হাঁটতে হাটতে ভাবতে লাগল গত রাতের ঘটনাটা নিয়ে৷ ওই ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডল কার? নাকি সে ভুল দেখেছ? আর সে যদি ভুলও দেখে থাকে তবে কে ওই লোক?
সকালের আলোতে আশ্রমের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে আগের থেকে এবার কোনও তফাত চোখে পড়ল না মল্লারদের৷ ঘরগুলো একইভাবে আগের মতোই নিজেদের জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে৷ ঘুরতে ঘুরতে একসময় তারা এসে উপস্থিত হল সেই কালো রঙের বেড়ার ঘরের কাছে৷ যে ঘরে সোহমকে তুলে এনে তার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তমসাময়৷ ঘরের দরজাটা আগের মতোই বাইরে থেকে বন্ধ৷ সকালের আলোতে আশ্রমের জন্য জায়গাগুলোতে পাখির ডাক শোনা গেলেও ঘরটার চারপাশে কেমন যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধ ভাব৷ ঘরটার দিকে তাকিয়ে চূর্ণী বলল, ‘আমি যতবারই এই ঘরটার দিকে তাকাই ততবারই আমার গা যেন কেমন ছমছম করে ওঠে৷ ব্যাপারটা আমি ঠিক তোকে বোঝাতে পারব না৷’
চূর্ণীর কথা শুনে মল্লার বলতে যাচ্ছিল, ‘হ্যাঁ, আমারও তেমনই একটা অনুভূতি হয়৷’ কিন্তু ঠিক সেই সময় তারা দেখল সোহম আসছে৷
সোহমকে দেখে তারা সে জায়গা ছেড়ে এগলো তার দিকে৷ সোহমও এসে দাঁড়াল তাদের সামনে৷ তাকে যেন প্রথম দর্শনে বেশ গম্ভিরই লাগল মল্লারের৷ কিন্তু এরপর সোহম তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘রাতে তোদের ঘুম ভালো হয়েছিল তো?’ চূর্ণী জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, হয়েছে৷ কিন্তু তুই রাতে একবার আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলি না কেন?’ মৃদু অনুযোগের সুর ফুটে উঠল চূর্ণীর কণ্ঠে৷
সোহম জবাব দিল, ‘আসব ভেবেছিলাম৷ কিন্তু ছেলেগুলো গল্প করার নেশায় কিছুতেই আমাকে উঠে আসতে দিল না৷’
এ কথা বলার পর সোহম বলল, ‘চল নদীর পাড়ে গিয়ে কথা বলি৷’
তার কথা শুনে নদীর পাড়ে যাবার জন্য এগলো মল্লাররা৷ সোহম আর কোনও কথা বলল না নদীর ধারে যাবার পথে৷ আশ্রমের বেড়ার আগল ঠেলে তিনজনে বাইরে বেরিয়ে এল৷ তারপর গিয়ে দাঁড়াল নদীর কিনারে৷
সকালের আলোতে একইভাবে বয়ে চলেছে জলঙ্গীর কালো জল৷ ভেসে চলেছে কচুরিপানা৷ নদীর পাড়ে জলজ উদ্ভিদের ঝোপে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডাহুক পাখি৷ একটা মাছরাঙা গাছ থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সম্ভবত কোনও ছোট মাছ মুখে নিয়ে আবার ডালে গিয়ে বসল৷ নদীর ওপারে অনেক দূরে ছোট একটা ডিঙি নৌকা ভাসতে দেখল তারা৷ সম্ভবত মাছ ধরতে নেমেছে কেউ৷ নদীর জল ঘোলা বা কালচে হলেও তার স্থানে স্থানে ভোরের আলো পড়ে চিকচিক করছে৷ সব মিলিয়ে চারপাশের পরিবেশ প্রভাতী আলোতে মল্লার আর চূর্ণীর ভালোই লাগল৷ মল্লার একবার তাকাল শ্মশানের দিকটাতে৷ মল্লাররা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে ওদিকের বেশ কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে৷
মিনিট খানেক তারা সেখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল৷ হয়তো প্রত্যেকেই ভাবছিল কীভাবে কথা শুরু করা যাবে!’
সোহমই প্রথম মুখ খুলল৷ চূর্ণীদের দিকে তাকিয়ে যে প্রশ্ন করল, ‘তোরা কী বলবি বল?’ চূর্ণী নরম স্বরে বলল, ‘তোর কী হয়েছে এবার আমাদের খুলে বল।’
সোহম জবাব দিল, ‘কিছুই হয়নি৷ আমি তো ঠিকই আছি৷’
চূর্ণী বলল, ‘না, নিশ্চয়ই তোর কিছু হয়েছে৷ তুই রাত বিরেতে কলকাতার শ্মশানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি কেন? তোর পরিচয় কেউ জেনেছে কি না জানি না৷ তবে তোকে টিভিতে দেখিয়েছে, খবরের কাগজে ছবিও বেরিয়েছে৷ তা দেখে আমরা তোকে চিনেছি৷ তুই যে পুলিসের ভয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছিলি সে কথাও কাগজে লিখেছে৷ আমাকে এবার সত্যিটা বল? এর কারণ কী?’
চূর্ণীর কথা শুনে সোহম বলল, ‘শ্মশানে ঘুরে বেড়ানো কি অপরাধ? কত মানুষই তো শ্মশানে ঘুরে বেড়ায়৷’
মল্লার এবার বলল, ‘না, ঘুরে বেড়ানো কোনও অপরাধ নয় ঠিকই৷ কিন্তু সবকিছুর পিছনে তো একটা কারণ থাকে৷ সেটাই আমরা জানতে চাইছি৷ তুই বুঝিয়ে বললে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারব৷ হঠাৎ তোর আচরণে এমন পরিবর্তন হল কেন?’
মল্লারের কথা শুনে সোহম একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘সব কথা সবসময় মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব হয় না৷ তবে এটুকু বলতে পারি আমি কোনও অন্যায় বা অপরাধ করিনি৷’
চূর্ণী বলল, ‘আমি জানি তুই নিজে কোনও অপরাধ করতে পারিস না৷ কিন্তু তুই নিজের অজান্তে কোনও খারাপ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়িসনি তো৷ নইলে তুই হঠাৎ এমন পাল্টে গেলি কেন? দেখ, দু-দিন পর আমাদের বিয়ে হতে চলেছে৷ আমার থেকে তুই কিছু গোপন করিস না৷ যাই হোক না কেন আমরা সবাই মিলে সামলে নেব৷ সব কথা খুলে বল।’
মল্লার এরপর বলল, ‘তুই যদি শুধু চূর্ণীর সঙ্গে কথা বলতে চাস বল৷ আমি সরে দাঁড়াচ্ছি৷’
এ কথা বলে মল্লার অন্যদিকে এগতে যাচ্ছিল, কিন্তু সোহম বলে উঠল, ‘না, তোর অন্যদিকে যাবার দরকার নেই৷ চূর্ণীকে আমার আলাদাভাবে কিছু বলার নেই৷’
মল্লারের মনে হল চূর্ণী যেন সোহমের এ কথা শুনে মনে মনে একটু আহত হল৷ ছলছল চোখে সে তাকিয়ে রইল সোহমের দিকে৷
মল্লার একটা সিগারেট ধরাল৷ আর তার পরই মল্লারের মাথায় একটা সম্ভাবনার কথা উদয় হল৷ সে বলল, ‘তুই তমসাময়ের থেকে কোন তন্ত্রসাধনার শিক্ষা নিচ্ছিস না তো? সে জন্য কি তুই শ্মশানে ঘুরে বেড়াচ্ছিস? কাল রাতেও তো তোকে আমি তমসাময় আর ছেলেদের পিছন পিছন এখানেও শ্মশানের দিকে যেতে দেখেছি৷ তারপর ঘন্টাখানেক বাদে সেখান থেকে একসঙ্গে ফিরেও এলি তোরা৷’
মল্লারের মুখে একথা শুনে চূর্ণী মৃদু চমকে উঠল৷ তবে সোহমের মুখমণ্ডলে তেমন কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না৷ মল্লারের কথার জবাব না দিয়ে সে চেয়ে রইল জলঙ্গীর ঘোলা জলের দিকে৷ বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ ভাবে কেটে গেল৷ চূর্ণী এরপর সোহমকে বলল, ‘কী রে, চুপ করে আছিস কেন? কিছু তো বলবি৷’
সোহম এবার জবাব দিল, ‘তোরা ফিরে যা৷’
‘ফিরে যা মানে?’ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল চূর্ণী৷
একটু চুপ করে থেকে সোহম বলল, ‘আমি এখন এখানেই থাকব৷ চিন্তার কিছু নেই, ভালোই থাকব৷ তোদের কাজকর্ম আছে৷’
‘কেন, তোর কোনও কাজ নেই?’ আবার প্রশ্ন করল চূর্ণী৷
‘না, কলকাতায় আমার এখন তেমন কোনও কাজ নেই৷ চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি৷’ সোহম এই প্রথম মল্লারদের কাছে সত্যি কথাটা স্বীকার করল৷
মল্লার এবার জানতে চাইল, ‘তুই ক’দিন থাকবি এখানে?’
সোহম জবাব দিল, ‘ঠিক বলতে পারছি না৷ এক মাস, দু-মাস, হয়তো বা তারও বেশি৷’ কথাটা শুনেই চূর্ণী এবার একটু ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘তুই কি ইয়ার্কি মারছিস, নাকি তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
সোহম বলল, ‘না, কোনওটাই নয়৷ আমি যে এখন এখানে থাকব, এ কথাটাই তোদের বলার ছিল৷’
মল্লার বলল, ‘কিন্তু দেখতে দেখতে তো তোদের বিয়ের সময় কাছে চলে আসছে৷ তুই এখানে থাকলে কাজগুলো কীভাবে হবে? একটা বিয়ের জন্য অনেক প্রস্তুতি লাগে৷’
কথাটা শুনে সোহম তাদের চমকে দিয়ে বলল, ‘আমি তিন মাসের মধ্যে কলকাতা ফিরব কি না জানি না৷ হয়তো এখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিলাম৷’
চূর্ণী এরপর আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না৷ চিৎকার করে সে বলে উঠল, ‘তুই পাগল হয়ে গেছিস! নিশ্চিত পাগল হয়ে গেছিস! নইলে এমন কথা কেউ বলতে পারে? নিশ্চয়ই তমসাময় তোকে কোনও তুকতাক করেছেন! তোকে আমি এখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব৷ এবং আজই যাব৷ দেখি তোকে কে এখানে আটকে রাখে?’
‘আমি তো কাউকে এখানে আটকে রাখিনি৷’ তমসাময়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল কিছুটা তফাত থেকে৷ কখন যেন তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন তাদের কাছে৷ কথা থামিয়ে সকলে তাকাল তাঁর দিকে৷ মল্লারের মনে হল তিনি বাইরে থেকে আশ্রমে ফিরছিলেন৷ তার হাতে একটা থলে৷ চূর্ণীরা তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন৷ হয়তো আপনাদের কথার মাঝে আমার কথা বলা উচিত নয়, কিন্তু কথাটা কানে এল বলে বলছি৷ আমি কিন্তু কাউকে আটকে রাখিনি৷ উনি নিজের ইচ্ছায় এসেছেন, ইচ্ছা হলে যখন খুশি চলেও যেতে পারেন৷ আপনাদের কাছ আমি কৃতজ্ঞ৷ আপনারা যে কেউ এখানে এসে যতদিন খুশি থাকতে পারেন, আবার চলেও যেতে পারেন৷’—এ কথা বলে তিনি ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন আশ্রমের দিকে৷
তমসাময় আশ্রমের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যাবার পর চূর্ণী বলল, ‘চল তবে আর দেরি করে লাভ নেই৷ আমরা তিনজন ফেরার জন্য রওনা হয়ে যাই৷’
‘তোরা যা৷ আমি যাব না৷ আমাকে জোর করিস না, লাভ হবে না৷’ গলার স্বরে কাঠিন্য ফুটে উঠল সোহমের৷
চূর্ণী বলে উঠল, ‘আমাদের এত দিনের সম্পর্ক৷ তোর ওপর কি কোনও জোর নেই, অধিকার নেই আমার?’
সোহম তার কথার কোনও জবাব দিল না৷ চূর্ণী এবার বুঝতে পারল তাকে এভাবে জোর করে কোনও লাভ হবে না৷ তাই সে বলল, ‘ঠিক আছে তুই যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিস এখানে থাকবি তখন আমিও এখানে থাকব৷ তোকে না নিয়ে আমি কলকাতা ফিরব না৷ দেখি তুই ক’দিন এখানে থাকিস?’
চুর্ণী এ কথা বলে মল্লারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই বরং ফিরে যা। কতদিন আর তুই কাজ নষ্ট করে আমাদের জন্য এখানে পড়ে থাকবি?’
হয়তো দুটো দিন সোহমকে বোঝালে সে মত পরিবর্তন করতে পারে৷ তাছাড়া সোহমের আচরণও স্বাভাবিক নয়৷ এ আশ্রমের যে একটা রহস্যময়তা আছে মল্লারের তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না৷ এই আশ্রমে চূর্ণীকে ফেলে রেখে যাওয়া মল্লারের কিছুতেই উচিত হবে না৷ এ কথা দ্রুত ভেবে নিয়ে মল্লার পরিস্থিতি এই মুহূর্তে কিছুটা স্বাভাবিক করার জন্য হেসে বলল, ‘আজকের দিনটা তো থাকি এখানে৷ তারপর ফেরার কথা ভাবব৷ কাছে-পিঠে কোনও ঘোরার জায়গা থাকলে ঘুরে আসা যেতে পারে৷ গঞ্জের হাটেও যাওয়া যেতে পারে৷’
সোহম বলল, ‘তোদের ইচ্ছা হলে তোরা ঘুরে আয়৷ রাতে আমার ঘুম ভালো হয়নি৷ ঘুম পাচ্ছে৷ আমি বরং একটু ঘুমোই গিয়ে৷’ এ কথা বলে সোহম এগলো আশ্রমের দিকে৷
সে আশ্রমে প্রবেশ করার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল মল্লার আর চূর্ণী৷ মল্লার দেখল চূর্ণীর চোখের কোণে চিকচিক করছে৷ কান্না চাপার চেষ্টা করছে সে৷ তাকে ভরসা দেবার জন্য মল্লার বলল, ‘ভেঙে পড়িস না। আমি আছি৷ আবারও আমরা ওকে বোঝাবার চেষ্টা করব৷ হয়তো শেষ পর্যন্ত ও মত পরিবর্তন করবে৷ দেখা যাক কী হয়? তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা৷’
চূর্ণী কান্না ভেজা গলাতে বলল, ‘ও তো ভালোভাবে কথাই বলল না৷ ওর কী হয়েছে তা জানাই হল না আমাদের৷ ওকে না নিয়ে আমি সত্যিই ফিরব না এখান থেকে৷ তেমন প্রয়োজন বোধ করলে পুলিশ ডাকব৷ তাদের বলব সোহমের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক নয়৷ ওর চিকিৎসার প্রয়োজন৷ যে ভাবেই হোক ওকে কলকাতা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে৷’
মল্লার চূর্ণীর এ কথায় কোনও মন্তব্য করল না৷ বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তারা আশ্রমে ফেরার পথ ধরল৷
ভিতরে প্রবেশ করে কাউকে দেখতে পেল না তারা৷ সোহম নিশ্চয়ই তার ঘরে ফিরে গিয়েছে৷ ছেলেদের ঘুম ভেঙেছে কি না কে জানে? তাদের ঘরের দাওয়াতে কেউ নেই৷ মল্লাররা ধীর পায়ে নিজেদের ঘরের দিকে ফিরতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় গাড়ির হর্নের শব্দ শুনে বুনো রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এগলো গেটের দিকে৷ গেট খুলে দিল বুনো৷ অনেকটা পুলিশ ভ্যানের মতো দেখতে বেশ বড় একটা গাড়ি প্রবেশ করল আশ্রমের ভিতর৷ গাড়িটা সোজা এসে দাঁড়াল মল্লারদের কাছাকাছি৷ সরকারি গাড়ি, গায়ে অশোকস্তম্ভ আঁকা৷ গাড়ি থেকে প্রথমে যিনি নামলেন তাকে চিনতে পারল মল্লাররা৷ তিনি সেই শিশুকল্যাণ বিভাগের সরকারি অফিসার মিস্টার বক্সী৷ তার দুই সঙ্গীও নামলেন গাড়ি থেকে৷
