জলঙ্গীর অন্ধকারে – ১৩
চূর্ণীর ডাকেই মল্লারের ঘুম ভাঙল৷ হাতঘড়িতে সাতটা বাজে৷ অর্থাৎ ঘন্টা-দুই আগেই ভোরের আলোর ফুটেছে৷ বিছানাতে উঠে বসে মল্লারের মনে পড়ে গেল গত রাতে সেই কালো ঘরের ভিতরের দৃশ্য আর তমসাময় ও সোহমের কথোপকথন৷ মল্লার উঠে বসতেই চূর্ণী বলল, ‘এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিলি কেন? আমি তো ভোরের আলো ফুটতেই উঠে পড়েছি৷ দাওয়া থেকে নীচে নেমে একটু হেঁটেও এলাম৷ সোহম মনে হল এখনও ঘুমাচ্ছে৷ চল ওকে ডেকে তুলি৷ সোহম যদি রাজি হয় তবে আজই এখান থেকে রওনা হয়ে যাব৷’
চূর্ণীর কথা শুনে মল্লার বলল, ‘হ্যাঁ, আজই আমাদের এ জায়গা ছেড়ে রওয়া হয়ে যাওয়া উচিত৷ আমার মনে হচ্ছে এখানে কোনও ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসতে চলেছে আমাদের ওপর৷’
চূর্ণী বলল, ‘তার মানে? কী বিপদ?’
মল্লার একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘পাছে তুই ভয় পাস তাই তোকে আমি কিছু বলিনি এতদিন৷ রাত নামলেই এই আশ্রমে, জলঙ্গীর পাড়ে কেমন যেন এক অদ্ভুত পরিবেশ নেমে আসে৷ তমসাময় বা তাঁর সঙ্গী বুনোর আচরণ যেন ঠিক স্বাভাবিক নয়৷ এমনকী বাচ্চা ছেলেগুলোর আচরণও আমার স্বাভাবিক বলে মনে হয়নি৷ রাত নামলেই তমসাময় ওদের নিয়ে আশ্রমের বাইরে যেতেন, শ্মশানে নিয়ে যেতেন৷ আমি কৌতূহলবশত কয়েক রাতে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে ব্যাপারটা কী ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করেছিলাম৷ পরশু রাতে দেখি তমসাময় বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আশ্রমের বাইরে বেরিয়ে গেলেন৷ তারপর দেখি সোহমও তাদের পিছু নিচ্ছে৷ পাছে সোহমের কোনও বিপদ হয়, এই ভেবে আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে এগলাম সোহমকে থামাবার জন্য৷ জলঙ্গীর পাড়ে তখন ঘন কুয়াশা৷ বাইরে বেরিয়ে মনে হল সোহম সেই কুয়াশার মধ্যে দিয়ে শ্মশানের দিকে হাঁটছে৷ আমিও এগলাম তাকে থামাবার জন্য৷ কিন্তু তাকে গিয়ে ধরতেই সে যখন মুখ ফেরাল, তখন দেখি তা সোহমের মুখের পরিবর্তে একটা ভয়ঙ্কর মুখ! ও মুখ কোনও মানুষের হতে পারে না৷
আমার মনে হচ্ছিল যেন কোনও অপদেবতা বা পিশাচ আবির্ভূত হয়েছে আমার সামনে৷ সেই ভয়ঙ্কর মূর্তিটা আমাকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে কুয়াশার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ তারপর কোনওরকমে ঘরে ফিরে এসেছি৷ গতকাল যে বাচ্চাটাকে শ্মশানে পুঁতে দিয়ে লোকজন আমাদের সামনে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরছিল, সেই বাচ্চাটাকে কাল রাতে কবর থেকে কালো ঘরে তুলে আনা হয়েছে৷ সে ঘরের ভিতর তমসাময়ের সঙ্গে সোহমও ছিল৷ ওরা তোকে নিয়েও আলোচনা করছিল৷ এ জায়গা ছেড়ে ওরা অন্য জায়গাতে চলে যাবার আগে তোকেও নাকি সঙ্গে নিয়ে যাবে! তুইও কি তবে সবকিছু ছেড়ে ওদের মতো শ্মশানে ঘুরে বেড়াবি?’
একটানা কথাগুলো বলে দম নেবার জন্য থামল মল্লার৷ তার কথা শুনে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে চূর্ণীর মুখ৷ অজানা আতঙ্কে যেন কাঁপতে শুরু করেছে চূর্ণী৷ তা দেখে মল্লার খাট থেকে নেমে চূর্ণীর হাত ধরে তাকে পাশে বসাতে যাচ্ছিল৷ ঠিক সেই সময় ঘরের আধখোলা দরজার দিকে মল্লারের চোখ পড়ল। চায়ের কেটলি আর কাপ হাতে বুনো দাঁড়িয়ে আছে সেখানে৷ তার দৃষ্টি ঘরের ভিতর নিবদ্ধ৷ বুনোর সঙ্গে মল্লারের চোখাচোখি হয়ে গেল৷ এরপর বুনো ঘরে প্রবেশ করল৷ টেবিলের উপর কাপ রেখে তাতে চা ঢেলে, গত রাতের এঁটো বাসন তুলে নিয়ে নিঃশব্দে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷ বুনো কি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মল্লারের বলা কথাগুলো শুনেছে?
চূর্ণী একইভাবে দাঁড়িয়েছিল৷ তাকে ধরে পাশে বসাল মল্লার৷ চায়ের কাপ তুলে নিয়ে চূর্ণীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘গরম চা’টা খেয়ে নে? নার্ভে জোর পাবি৷’
নিঃশব্দে চা-পান শেষ করল তারা দু’জন৷ গরম চা’তে চূর্ণী সম্ভবত সত্যিই কিছুটা মনের জোর ফিরে পেল৷ সে বলল, ‘আমার তবে কী করা উচিত বল তো?’
মল্লার বলল, ‘যে ভাবেই হোক আজ রাতের আগেই এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাদের৷ আমার মন বলছে, আজ রাতেই ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে৷’
চূর্ণী বলল, ‘কিন্তু সোহম তো আজকের দিনটা থাকবে বলেছে৷ ওকে ছাড়া আমি যাব কীভাবে?’ মল্লার বলে উঠল, ‘ওকে আজই ফেরার জন্য যে ভাবেই হোক রাজি করাতে হবে৷ এখানে আর একটা রাতও কাটানো চলবে না৷ সময় নষ্ট করা যাবে না৷ এখনই সোহমের কাছে চল৷ সে যদি আমাদের সঙ্গে যেতে রাজি না হয় তবে জোর করে তাকে নিয়ে যেতে হবে৷ যেভাবেই হোক, যেভাবেই হোক…৷’—এ কথাগুলো বলতে বলতে উত্তেজিত ভাবে উঠে দাঁড়াল মল্লার৷ চূর্ণীও উঠে দাঁড়াল৷ সে বলল, ‘হ্যাঁ, সোহমের কাছে চল৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওই তমসাময়ই কোনও তুকতাক করেছে ওকে৷ সোহমকে যেভাবেই হোক ওর কবল থেকে মুক্ত করতে হবে৷’ মল্লার চূর্ণীর কথা শুনে বুঝতে পারল, কিছুটা হলেও নিজেকে শক্ত করতে পেরেছে চূর্ণী৷ মল্লার আর দেরি না করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এগলো সোহমের রাত্রিবাসের জায়গার দিকে৷
সোহম যেখানে আছে, ব্যারাকের মতো বাড়িটার দাওয়াতে উঠে পড়ল মল্লার আর চূর্ণী৷ দু-পা এগিয়ে সামনের ঘরের দরজার কাছে পৌঁছতেই তারা বেশ অবাক হয়ে গেল৷ ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসছে বাচ্চাদের গলার শব্দ৷ তাদের মধ্যে একজন আবার খিলখিল করে হাসছে! মল্লার আর চূর্ণী নিজেদের মধ্যে মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি বিনিময় করে দরজার ঝাঁপ ঠেলে প্রবেশ করল সেই ঘরে৷ এরপর সত্যিই চমকে উঠল তারা৷ নবজীবন, সঞ্জীবন থেকে শুরু করে সবাই ফিরে এসেছে! ঘরের ঠিক মাঝখানে বসে আছে সোহম। তার কোলে ছয়-সাত বছর বয়সি একটা নতুন বাচ্চা। মল্লাররা ঘরে পা রাখতে ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল৷ মল্লার আর চূর্ণীর মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে থাকার পর সোহম ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে কিছুটা কৈফতের ঢঙে বলল, ‘বক্সী এদের নিয়ে যাবার পথে এরা সবাই এত কান্নাকাটি শুরু করেছিল যে লোকটার কঠিন হৃদয়ও গলে গিয়েছে৷ শেষ রাতে উনি আবার এদেরকে এখানে ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন৷’
সোহমের কোলে যে নতুন বাচ্চাটা বসে আছে তার পরিচয় আন্দাজ করতে অসুবিধা হল না মল্লারের৷ তবুও সে সোহমকে প্রশ্ন করল, ‘নতুন বাচ্চাটা কোথা থেকে এল?’
সোহম এবার যেন একটু থতমত খেয়ে বলল, ‘এই বাচ্চাটা নদীর ধারে একলা ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ জীবনবাবা ওকে দেখতে পেয়ে গত রাতে এখানে নিয়ে এসেছেন?’
সোহম যে নির্ভেজাল মিথ্যা বলছে তা বুঝতে পারল মল্লার৷ সে বলল, ‘তোর সঙ্গে কথা আছে আমাদের৷ বাইরে আয়৷’
চূর্ণীও বলল, ‘হ্যাঁ, কথা আছে৷’
বাচ্চাটাকে কোল থেকে নামিয়ে ছেলেগুলোর উদ্দেশে বলল, ‘নতুন ভাইয়ের সঙ্গে তোমরা গল্প করো, আমি একটু পরেই আসছি৷’
ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল তিনজন৷ দাওয়া থেকে নীচে নেমে মল্লার সোহমকে বলল, ‘আমাদের ঘরে চল, সেখানে বসে কথা হবে৷’
সোহম যেন একটু অনিচ্ছাকৃতভাবেই বলল, ‘আচ্ছা চল৷’
হাঁটতে শুরু করল তারা৷ কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই সোহম জানতে চাইল, ‘কী এমন কথা যে ঘরে বসে বলতে হবে? এখানে বলা যেত না?’
চূর্ণী এবার তার কথা চেপে না রাখতে পেরে বলে উঠল, ‘তোকে আমাদের সঙ্গে কলকাতা ফিরে যেতে হবে এবং আজই ফিরতে হবে৷’
কথাটা শুনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সোহম বলল, ‘ও, এই কথা৷ কিন্তু আজ তো ফেরা সম্ভব নয়৷ ছেলেগুলোও তো আবার ফিরে এসেছে৷’
চূর্ণী এবার বেশ কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘আমি কোনও কথা শুনতে চাই না৷ তোকে আজই আমাদের সঙ্গে ফিরতে হবে৷’ মল্লারও বলল, ‘তোকে নিয়ে আজই, এখনই আমরাও এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে চাই৷’
সোহম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি তো তোদের আগেই বলেছি যে আজকের রাতটা আমি এখানে কাটাব৷’
তার কথা শুনে মল্লার বলে উঠল, ‘না, আর একটা রাতও আমরা কেউ এখানে কাটাব না৷ এখনই মালপত্র নিয়ে এখান থেকে রওনা হয়ে যাব৷’
সোহম যেন এবার কিছুটা ব্যঙ্গের স্বরে বলে উঠল, ‘তবে জোর করে আমাকে ধরে নিয়ে চল৷’
চূর্ণী বলে উঠল, ‘দরকার হলে তাই করব৷’
সোহম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে চূর্ণীকে বলল, ‘তুই কি মল্লারের কথাতে পরিচালিত হচ্ছিস?’
ঠিক এই সময়ে মল্লার খেয়াল করল তমসাময় তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন?
চূর্ণী জাবাব দিল, ‘না, আমি মল্লারের কথাতে পরিচালিত হচ্ছি না৷ তবে আমরা দু’জন নিশ্চয়ই আলোচনা করেছি তোর ব্যাপার নিয়ে৷ আর তাতেই আমাদের মনে হচ্ছে যে, এ জায়গাতে আর একদণ্ডও আমাদের থাকা উচিত নয়৷’—এ কথা বলার পরই চূর্ণীও তমসাময়কে দেখতে পেয়ে কথা থামিয়ে দিল৷
তমসাময় এসে দাঁড়ালেন তাদের সামনে৷ তাঁর হাতে একটা বাজারের থলে৷ সেটা একটু উঁচিয়ে ধরে তিনি সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আজ তো আপনারা এখানে থাকছেন৷ যাই কিছু বাজার করে আনি৷’
মল্লার সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘না, আমরা কেউই আর আজ এখানে থাকব না৷ এখনই কলকাতার উদ্দেশে রওনা হব৷’
তমসাময় এ কথার উত্তরে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন একটা শব্দ শুনে৷ বেশ কয়েকজন লোকের গলার শব্দ৷ সেটা আসছে জলঙ্গীর পাড়ের গেটের কাছ থেকে৷ শব্দটা শুনে তমসাময়সহ মল্লাররা সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল চার-পাঁচ জন লোক ঢুকে পড়েছে আশ্রমের ভিতর৷ মল্লারদের দেখতে পেয়ে তারা উত্তেজিতভাবে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে৷ বলতে গেলে প্রায় হুড়মুড় করেই লোকগুলো এসে উপস্থিত হল৷ লোকগুলোর মধ্যে মল্লার একজনকে চিনতে পারল৷ গতকাল চায়ের দোকানে দেখা সেই বুড়োটা, বিকালে শ্মশান থেকে ফেরা লোকগুলোর মধ্যেও সে ছিল৷ বুড়োটা ছাড়া বাকি সব মাঝবয়সি লোক৷ মল্লারদের তারা ঘিরে ধরার পর একজন লোক সরাসরি তমসাময়কে প্রশ্ন কর, ‘ছেলেটার দেহটা কই?’
মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে তমসাময় পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘কার দেহ?’
লোকটা বলল, ‘আমার ভাইপোর দেহ৷ সাত বছরের একটা বাচ্চা ছেলে৷ যাকে আমরা গতকাল বিকালে জলঙ্গীর শ্মশানে নদীর পাড়ে কবর দিয়ে গিয়েছিলাম৷’
সেই বৃদ্ধ এরপর বলল, ‘আমি যা ধারণা করেছিলাম ঠিক তাই৷ সে জন্যই তো জায়গাটা দেখতে এসেছিলাম৷ এসে দেখি বাচ্চাটাকে গর্ত থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে!’
তমসাময় এবার বললেন, ‘অনেক সময়ই শিয়ালের দল কবর খুঁড়ে বাচ্চা তুলে নেয় খাবে বলে৷ তেমনই হয়েছে মনে হয়৷’ ঠিক এই সময় বুনোও এসে হাজির হল সেখানে৷
তমসাময়ের কথা শুনে লোকগুলোর একজন বলল, ‘না, শিয়ালের দল মাটি খুঁড়ে ছেলেটাকে তোলেনি৷ চার হাত গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে ছেলেটাকে নামিয়ে তার ওপর খুব শক্ত করে দুরমুশ করে মাটি চাপা দিয়েছিলাম৷ শিয়াল চার হাত নীচ থেকে বাচ্চাটাকে উপরে ওঠাবে কীভাবে? এটা নিশ্চয়ই তোমাদেরই কাজ৷ তোমরাই ছেলেটাকে এখানে এনেছ৷’
বুনো বলে উঠল, ‘ওই মড়া বাচ্চা নিয়ে আমরা কী করব?’
বৃদ্ধ লোকটা বলল, ‘কেন, তন্ত্রসাধনা? তোমরা যেটা কর৷ মড়া তো তন্ত্র সাধনার কাজে লাগে৷ আমরা কিছু জানি না ভেবেছ?’
তার কথা শুনে বুনো বলল, ‘না, আমরা কোনও বাচ্চা আনিনি৷ তোমরা চলে যাও এখান থেকে৷’ ছেলেটার কাকা এবার বলে উঠল, ‘যাব৷ কিন্তু তার আগে ছেলেটার দেহ আমাদের ফেরত দাও৷ ওর দেহ নিয়ে আমরা তোমাদের কিছু করতে দেব না৷’
তমসাময় এবার লোকগুলোর উদ্দেশে বেশ ঝাঁঝালো গলাতে বলে উঠলেন, ‘কী উল্টোপাল্টা কথা বলছেন আপনারা? বলছি তো আমরা কোনও দেহ তুলে আনিনি৷ চলে যান আপনারা৷ এখানে কেউ নেই৷’
লোকগুলোর মধ্যে একজন বলে উঠল, ‘আমরা আশ্রমের ঘরগুলো খুঁজে দেখব৷ কোথাও তাকে পাওয়া যায় কি না?’
তমসাময় বললে, ‘আপনারা যাই ভাবুন না কেন, বাইরের লোককে আমরা কোনও ঘরে ঢুকতে দেব না৷’
সোহমও এবার বলে উঠল, ‘জোর করে আপনারা কিছু করতে চাইলে আমরা কিন্তু বাধা দেব৷’
সোহমের কথা শুনে এবার একটু থমকে গেল লোকগুলো৷ তাদের চোখে সংখ্যার বিচারে উভয় পক্ষ সমান সমান৷ তাই হয়তো ঠিক এই মুহূর্তে কোন সংঘাত হলে তাদের নিজেদেরও ক্ষতি হতে পারে এই আশঙ্কায় লোকগুলো আর জোর করে আশ্রমে ছেলেটাকে খোঁজার চেষ্টা করল না৷
বুড়োটা তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল, ‘চল, এখন গ্রামে ফিরে সবাইকে আগে ব্যাপারটা জানাই৷ তারপর দেখা যাবে ছেলেটার দেহ উদ্ধার করা যায় কি না?’
পরামর্শটা মনে ধরল বৃদ্ধর সঙ্গীদের৷ এরপর তারা বুড়োর পিছন পিছন পা বাড়াতে যাচ্ছিল, মল্লার ঠিক সেই সময় খেয়াল করল যে তমসাময় আর বুনোর মধ্যে মুহূর্তের জন্য যেন দৃষ্টি বিনিময় হল৷ আর তার পরই বুনো লোকগুলোর উদ্দেশে বলল, ‘একটু দাঁড়াও৷ নিজেদের মধ্যে অহেতুক ভুল বোঝাবুঝি করে লাভ নেই৷ তোমাদের, আমাদের সবাইকে এই একই জায়গাতে থাকতে হবে, হাটেবাজারে মুখ দেখাদেখি করতে হবে৷ যাবার আগে আমার কথা শুনে যাও৷’
‘কী কথা?’ থমকে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল একজন লোক৷
বুনো বলল, ‘শ্মশানের মড়াখেকো শিয়ালগুলো কত ধূর্ত তোমরা জানো না! চার হাত কেন, আট হাত নীচে পোঁতা লাশ, আমি ওদের বার করে আনতে দেখেছি৷ শ্মশানের গায়ে নদীর পাড়ে জঙ্গলের মধ্যে ওদের সার সার গর্ত৷ সাধারণত ওরা সারা রাত ধরে গর্ত খুঁড়ে বাচ্চাদের লাশ বার করে ভোরের আলো ফোটার আগে সেই লাশটাকে নিজেদের গর্তে টেনে নিয়ে যায়৷ আমার বিশ্বাস এটাই ঘটেছে৷ শিয়ালরা নিজেদের গর্তে লাশ টেনে নিয়ে গেলেও সেখানে তা খায় না৷ কারণ, দিনের বেলা ওরা ঘুমায়৷ তারপর রাতের বেলা গর্ত থেকে লাশ বাইরে এনে খায়৷ আমাকে তোমরা যদি আজকের রাতটা সময় দাও, তাহলে আশা করছি ছেলেটার দেহ খুঁজে বার করতে পারব৷’
তমসাময়ও বুনোর কথা সমর্থন করে বললেন, ‘বুনো যখন বলছে তখন ও নিশ্চয়ই দেহটা উদ্ধার করে আনতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস৷ ওর ওপর আস্থা রাখুন আপনারা৷ উত্তেজনার বশে এমন কোনও কাজ করবেন না, যার ফলে দেহটাই আর খুঁজে না পাওয়া যায়৷’
লোকগুলো যেন এবার একটু ধন্দে পড়ে গেল বুনো আর তমসাময়ের কথা শুনে। যে লোকটা তার ভাইপোর শবদেহর খোঁজে এসেছিল সে বলল, ‘সত্যিই ওর দেহটা শিয়ালে নিয়ে গেছে! তোমরা ওর দেহ খুঁজে দেবে?’
বুনো এবার বেশ যেন দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, রাত্রিতে শিয়ালের গর্ত থেকে ছেলেটার লাশ খুঁজে আনব আমি৷’
বুনোর কথা শুনে লোকটা বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, দেখি তোমরা লাশটা উদ্ধার করে দিতে পার কি না? নইলে ফল কিন্তু ভালো হবে না।’
তমসাময় আর বুনোর প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি ছুঁড়ে দিয়ে লোকগুলো এরপর ফেরার জন্য পা বাড়াল৷ আশ্রমের বাইরে বেরিয়ে গেল তারা৷
গ্রামের লোকেরা চলে যাবার পর কিছুক্ষণ নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন তমসাময়৷ স্পষ্টতই যেন চিন্তিত দেখাল তাকে৷ বুনো এরপর তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘ঘরে চলুন, কথা আছে৷’ কথাটা শুনে তমসাময় তাঁর ঘরের দিকে এগবার আগে সোহমকে বললেন, ‘আপনিও আসুন আমার সঙ্গে৷’
এ কথা শুনে সোহম তাঁর সঙ্গে পা মেলাতে যাচ্ছিল, কিন্তু চূর্ণী তার হাত টেনে ধরে বলল, ‘তুই কোথাও যাবি না৷ আমাদের সঙ্গে এখন কলকাতা ফিরবি৷’
সোহমের মুখে এবার স্পষ্ট বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল৷ সে বলল, ‘আমার হাত ছাড়৷ তোদের ইচ্ছা হলে এখনই চলে যেতে পারিস৷’
চূর্ণী তার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা যাব, আর তোকেও সঙ্গে নিয়ে যাব৷’
বুনো এবার চূর্ণীর উদ্দেশে বলে উঠল, ‘উনি যখন আপনাদের সঙ্গে যেতে চাইছেন না, তখন আপনারা ওনাকে জোর করছেন কেন?’
বুনোর কথা শুনে দপ করে জ্বলে উঠে চূর্ণী বলে উঠল, ‘চুপ কর৷ তুমি আমাদের মধ্যে কথা বলার কে?’
বুনো কিন্তু চূর্ণীর কথা শুনে থামল না৷ সে বলল, ‘আচ্ছা, দেখি কীভাবে আপনি ওনাকে নিয়ে যান?’
বুনোর কথা শুনে মল্লারও এবার উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘ওকে এখান থেকে আমাদের সঙ্গে যেতে যদি বাধা দেওয়া হয়, তবে কিন্তু আমি অন্য ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব৷’
‘কী ব্যবস্থা?’ জানতে চাইল বুনো৷
মল্লার এবার তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করল, সে বলল, ‘যে বাচ্চাটাকে ওরা খুঁজতে এসেছিল সে তো এখানেই আছে৷ কাল ও যে কালো ঘরের মধ্যে ছিল আমি দেখেছি৷ একটু আগে সে সোহমের কোলে চেপে বসেছিল ছেলেদের ঘরে৷ তোমরা ওকে কী কৌশলে জীবিত করে তুলেছে তা আমি জানি না৷ তবে আমি নিশ্চিত ও-ই সেই ছেলে৷ সোহমকে নিয়ে যেতে যদি আমাদের বাধা দেওয়া হয়, অথবা ও আমাদের সঙ্গে না যেতে চায়, তবে আমি গ্রামে গিয়ে জানিয়ে দেব যে ছেলেটা এখানে লুকানো আছে৷’
মল্লারের কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই যেন বেশ কয়েক মুহূর্তর জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল চারপাশে৷ থমথমে হয়ে উঠল তমসাময়, বুনো আর সোহমের মুখ৷ তবে এরপরই তমসাময় যেন নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, বাচ্চাটাকে আমরা গর্ত থেকে প্রথমে তুলেছিলাম আমাদের সাধনার জন্য৷ তারপর দেখলাম ওর শরীরে তখনও প্রাণের স্পন্দর রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না৷ তারপর আমি ওকে বাঁচিয়ে তুলেছি৷ বিশেষ কারণবশত আমি এখন ওকে ফিরিয়ে দিতে অপারগ৷’
একথা বলে তমসাময় একটু থামলেন৷ তারপর তিনি সোহমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার বন্ধুরা যখন আপনাকে নিয়ে যেতে চাইছেন, তখন আপনি ওদের সঙ্গে ফিরে যান৷ আমি চাই না আপনাকে নিয়ে আমার এখানে কোনও অশান্তির সৃষ্টি হোক৷ হ্যাঁ, আপনি ফিরে যান৷’
তমসাময়ের কথা শুনে সোহম বিস্মিতভাবে আমতা আমতা করে বলল, ‘আমি ফিরে যাব!’
তমসাময় বেশ দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনাকে আর এখানে আশ্রয় দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমি শান্তি চাই৷’ একথা বলে তিনি বুনোকে নিয়ে অন্যদিকে রওনা হলেন৷ মল্লার বুঝতে পারল, তার ওষুধে কাজ হয়েছে৷ তাই তমসাময় সোহমকে ফিরে যেতে বললেন৷ মল্লার বলল, ‘এবার চল, চটপট জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে রওনা হয়ে যেতে হবে৷’
এ কথা বলে মল্লার এগলো তাদের ঘরের দিকে৷ আর তার পিছন পিছন সোহমের হাত ধরে চূর্ণীও এগলো৷
ঘরে ঢুকে সোহম যেন একটু হতাশ ভাবেই খাটের ওপর বসল৷ চূর্ণী পার্টিশানের ওপাশে চলে গেল তার জিনিসপত্র আনতে৷ মল্লারও তার জিনিসগুলো দ্রুত ব্যাগে ভরে ফেলতে লাগল৷ সে কাজ করতে করতেই হঠাৎ দেখতে পেল, খাটে বসা সোহম দু-হাত দিয়ে নিজের কপালটা চেপে ধরেছে৷ তা দেখে মল্লার প্রশ্ন করল, ‘কী হল তোর?’
সোহম তার কথার কোনও জবাব দিল না৷ এক মিনিটের মধ্যেই এরপর চূর্ণী তার ব্যাগ নিয়ে পার্টিশানের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল৷ মল্লারেরও ব্যাগে জিনিসপত্র ভরা শেষ৷ সোহমকে ওভাবে কপাল চেপে বসে থাকতে দেখে চূর্ণী তাকে বলল, ‘এ ভাবে বসে আছিস কেন? ওঠ চটপট বেরিয়ে পড়তে হবে৷’
সোহম উঠে দাঁড়িয়ে কিছুটা ক্লান্ত স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, চল৷ তবে আমার জামা, কাপড়, পার্স, এসব আমার শোওয়ার ঘরে পড়ে আছে৷ সেগুলোও নিতে হবে৷ আমার মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে৷ মল্লার তুইও আমার সঙ্গে সে ঘরে চল৷’
মল্লার আর চূর্ণী নিজেদের ব্যাগ আর সোহমকে নিয়ে ঘর থেকে বেরল৷ মল্লার দাওয়া থেকে নীচে নেমে চারপাশে তাকিয়ে তমসাময় বা বুনকে দেখতে পেল না৷ মল্লার তার ব্যাগ আর গাড়ির চাবিটা চূর্ণীকে দিয়ে বলল, তুই গাড়িতে উঠে বস৷ সোহমের জিনিসগুলো নিয়ে আসি৷’
চাবি আর ব্যাগ নিয়ে চূর্ণী এগলো গাড়ির দিকে, আর সোহমকে সঙ্গে করে মল্লার পা বাড়াল বাচ্চা ছেলেগুলোর থাকার জায়গার দিকে৷
সোহমের সঙ্গে বাড়িটার দাওয়ায় উঠে বাড়িটাকে কেমন যেন ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধ মনে হল মল্লারের৷ যে ঘরটাতে সোহম ছেলেগুলোর সঙ্গে বসেছিল, সে ঘরের পাল্লাটা হাট করে খোলা৷ ঘরের ভিতরে কেউ নেই! তবে কি ছেলেগুলো এর মধ্যেই বাড়িটা ছেড়ে আশ্রমের অন্য কোথাও চলে গেল? লম্বা দাওয়ার শেষ প্রান্তে একটা ঘরের দরজা খুলে সোহম মল্লারকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। ঘরের ভিতরে পা রাখতেই কেমন যেন একটা বিশ্রী পচা গন্ধ এসে লাগল তার নাকে৷ ঘরের মধ্যে একটা চৌকি আছে৷ সেই চৌকিতে, ঘরের নানা জায়গাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আছে সোহমের ব্যাগ, জামাকাপড় ইত্যাদি৷
সোহম সেগুলো ধীরে ধীরে তুলতে শুরু করল৷ তারপর অতি যত্ন করে সেগুলো পরিপাটি করে ভাঁজ করতে বসল৷ তাকে দেখে মল্লারের মনে হল সোহমের যেন ঘর থেকে বাইরে বেরোবার কোনও তাড়া নেই৷ এমন ধীরে জিনিসগুলো গোচ্ছাচ্ছে সে! হাতই যেন তোর চলছে না! ব্যাপারটা দেখে মল্লার বলল, ‘এমন ধীরে ধীরে পরিপাটি করে জিনিস গোছাবার কী দরকার? তাড়াতাড়ি সব ব্যাগে ভরে ফেল৷ ঘরটায় যা গন্ধ তাতে আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না৷ আর চূর্ণীও গাড়িতে অপেক্ষা করছে৷’
সোহম কথাটা শুনে মুখ তুলে মল্লারের দিকে তাকাল৷ কেমন যেন একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল তার মুখে! মল্লার তা দেখে বলল, ‘কীরে, হাসছিস কেন?’
আর এরপরই মাথার ওপর একটা শব্দ শুনে মল্লার মাথার উপর দিকে তাকাতেই মাথার উপরে ছাদের বাঁশের মাচা থেকে তার ওপর লাফিয়ে পড়ল একটা বাচ্চা ছেলে৷ মল্লারের গলা ধরে ঝুলে পড়ল ছেলেটা৷ মল্লার একটু টাল খেয়ে ঝুঁকে সেই ছেলেটাকে মাটিতে নামাতে গেল, ঠিক সেই সময় ওপর থেকে তার পিঠের ওপর ঝাঁপ দিল আরও দুটো বাচ্চা৷ টাল সামলাতে না পেরে মল্লার এরপর মাটিতে পড়ে গেল৷ ছেলেগুলোকে গা থেকে সরাবার জন্য মল্লার বলে উঠল, ‘এসব কী হচ্ছে!’
পর মুহূর্তে সিলিং-এ অদ্ভুত ভাবে ঝুলতে থাকা আরও ছেলেগুলো একের পর এক ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল মল্লালের ওপর৷ ব্যাপারটা কী ঘটতে চলেছে তা বুঝতে না পেরে মল্লার সোহমের উদ্দেশে বলল, ‘আরে, বাচ্চাগুলোকে সরা৷ ওরা এমন করছে কেন?’
কথাটা শুনে সোহম যেন কেমন একটা অদ্ভুত স্বরে হেসে উঠল৷
মল্লার এরপর ছেলেগুলোকে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না৷ সম্মিলিতভাবে তাকে মেঝেতে চেপে ধরেছে আট-দশজন ছেলে৷ তাদেরই কারও হাত যেন চেপে বসতে লাগল মল্লারের গলাতে৷ ছোট্ট একটা হাত, কিন্তু কী দানবীয় শক্তি সেই হাতে! মল্লার চিৎকার করে উঠতে গেল, কিন্তু কোনও শব্দ বেরল না তার গলা থেকে। আবারও হাসতে শুরু করল সোহম৷ সেই ছোট্ট হাতটা আরও চাপতে লাগল মল্লারের গলা৷ মল্লারের মনে হতে লাগল তার গলা-ঘাড় যেন এখনই মট করে ভেঙে যাবে৷ চোখ ঝাপসা হয়ে এল তার৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মল্লারের চোখে অন্ধকার নেমে এল৷
মল্লারের মনে হচ্ছিল সে যেন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে অন্তহীন পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে৷ চোখ মেলতে পারছে না সে৷ চারপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার৷ মাঝে মাঝে শুধু নানারকম শব্দ ভেসে আসছে কানে৷ মল্লারের শরীরটা হঠাৎ যেন একটা ঝাঁকুনি খেল৷ আর তার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ মেলতে না পারলেও যেন কিছুটা হুঁশ ফিরে এল তার৷ বেশ ঠান্ডা অনুভূতি হতে লাগল তার শরীরে৷ প্রথমে খুব কাছ থেকে নদীর জলের শব্দ শুনতে পেল সে৷ এরপর ধীরে ধীরে কথাবার্তার শব্দও কানে এল মল্লারের৷ কিছুক্ষণের মধ্যে কণ্ঠস্বর দুটোও চিনতে পারল সে৷ সোহম আর তমসাময়ের গলা৷ মল্লার চোখ খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোখের পাতা এক ভারী হয়ে এসেছে যে সে ব্যর্থ হল৷ তবে কথার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল সে—
সোহম বলল, ‘ওকে এখানে আনা হল কেন?’
তমসাময় বললেন, ‘বলা যায় না, গ্রামের লোকেরা আশ্রমে চলে আসতে পারে৷ তারা ওকে খুঁজে পেলে বিপদের সম্ভাবনা থাকত৷ ও তো আর তোমার আর বাচ্চা ছেলেগুলোর মতো নয় যে গুরুদেব ওকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন৷ আশ্রমের ভিতর জ্ঞান ফিরলে ও সমস্যা তৈরি করতে পারত৷ এই শ্মশানের পারে অবশ্য সে সমস্যা নেই৷ তাছাড়া…৷’
—এই বলে থামলেন তমসাময়৷
তারপর বললেন, ‘ওকে এখানে আনার আর একটা কারণ, গুরুদেব ওকে আজ রাতে তাঁর তন্ত্রসাধনার কাজে উৎসর্গ করবেন৷ সে কাজ মিটলে ভোরের আলো ফোটার আগেই সবাইকে নিয়ে আশ্রম ছেড়ে চলে যাব আমরা৷ ভোরবেলা একটা গাড়ি নিতে আসবে আমাদের৷ আমি গুরুদেবের নির্দেশ মতো সবকিছু ঠিক করে এসেছি৷ তবে গুরুদেবের যে বাড়িতে গিয়ে আমাদের আশ্রয় নেবার কথা ছিল সেখানে আমরা যাব না৷ পুলিশ আমাদের পিছু ধাওয়া করতে পারে৷ কাছেই বাংলাদেশ সীমান্ত৷ আমরা তা পেরিয়ে ওপারে যাব৷ তখন আর এ দেশের পুলিশ চট করে আমাদের কিছু করতে পারবে না৷’
এ কথা বলার পর তমসাময় বললেন, ‘চলো এবার৷ চূর্ণীর কাজটা মিটিয়ে আমাকে আবার এখানে ফিরে এসে এই শ্মশানে গুরুদেবের অন্তিম সাধনার জন্য কিছু জিনিস প্রস্তুত করতে হবে৷ তোমার বন্ধু এখন আপাতত এই গর্তে পড়ে থাক৷’
তমসাময়ের এই কথার পর আর কোনও গলার শব্দ শোনা গেল না৷ কিন্তু সোহম আর তমসাময়ের কথোপকথনই যেন মল্লারের সংবিৎ ফিরিয়ে দিল৷ ধীরে ধীরে তার মনে পড়ে যেতে লাগল সব কথা৷ সোহমের জামা-কাপড় আনতে সে তার সঙ্গে তার ঘরে ঢুকেছিল৷ তারপর মল্লারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছেলেগুলো! একটা হাত চেপে ধরেছিল তার গলা…
একটু নড়া চড়া করে মল্লার বুঝতে পারল তার হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা৷ পুরো ঘটনাটা এবং সোহম আর তমসাময়ের বলা কথাগুলো প্রচণ্ড উত্তেজনার সৃষ্টি করল মল্লারের স্নায়ুতন্ত্রে৷ আর সে জন্যই হয়তো শেষ পর্যন্ত মল্লার আরও কিছুক্ষণ চেষ্টার পর চোখ মেলতে পারল৷ দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ থাকাতে চোখের পাতা খুললেও প্রথমে চারপাশে শুধু নিকষ কালো অন্ধকারই রয়েছে বলে মনে হল তার৷
তারপর আস্তে আস্তে সে অন্ধকার ফিকে হয়ে এল৷ মাথার ওপর আকাশের এক কোণে এক ফালি চাঁদ প্রথমে ভেসে উঠল তার চোখে৷ গলাতে প্রচণ্ড ব্যাথা, মাথাও প্রচণ্ড ভার হয়ে আছে৷ তবুও কোনওক্রমে মাথাটা চারপাশে ঘুরিয়ে মল্লার বুঝতে পারল একটা গর্তের মধ্যে পড়ে আছে সে৷ অন্তত ছয়-সাত হাত গভীর হবে গর্তটা৷ তার মাথায় গর্তর মুখ ঘিরে ঝোপ জঙ্গল দেখা যাচ্ছে৷ সম্ভবত ওপর থেকে এ গর্তর উপস্থিতি চট করে বোঝা যায় না৷
আকাশের চাঁদটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে মল্লারের মনে হল সেটা যেন সদ্য উঠতে শুরু করেছে৷ সে মনে মনে হিসাব করে দেখল অজ্ঞান হওয়ার পর প্রায় দশ ঘণ্টা সময় কেটে গেছে! আর এরপরই তার মনে পড়ল চূর্ণীর কথা৷ সে এখন কোথায়? তমসাময় চূর্ণীকে নিয়ে কী কাজ মেটাতে চলেছেন? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই মল্লার উঠে বসার চেষ্টা করল৷ কিন্তু তার হাত-পা এমনভাবে বাঁধা যে সে উঠে বসতে পারল না৷
মল্লার অনুমান করল তমসাময়রা সম্ভবত আর তাকে বাঁচিয়ে রাখবে না৷ সোহম যে তমসাময়ের নির্দেশ দ্বারা বর্তমানে সম্পূর্ণ পরিচালিত, তার থেকে যে বাঁচার জন্য বিন্দুমাত্র সাহায্য পাওয়া যাবে না তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না মল্লারের৷ সে বুঝতে পারল, এ জায়গা ছেড়ে যদি সে পালাতে না পারে তবে নিশ্চিত মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে তার জন্য৷ কিন্তু মল্লার কীভাবে পালাবে? তার হাত-পা এমনভাবে বাঁধা যে সে উঠে বসতে পর্যন্ত পারছে না৷ তার মনে হল সে চিৎকার করলে উল্টো ফল হবে৷ হয়তো বা তারা এখনই শেষ করে দেবে তাকে৷ তাই চিৎকার করতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে থেমে গেল মল্লার তার কানে বাজতে লাগল তমসাময় আর সোহমের বলা কথাগুলো৷ তমসাময় তো বললেন, তার গুরুদেব তন্ত্রসাধনার কাজে মল্লারকে উৎসর্গ করবেন! কিন্তু তিনি তো এর আগে মল্লারদের বলেছিলেন তাঁর গুরুদেব মৃত৷ তবে কি তমসাময়ের গুরুদেব প্রেতাত্মা রূপে আবির্ভূত হন? দু-রাত আগে মল্লার যে ভয়ঙ্কর মানুষটাকে দেখেছিল সেই কি তবে তমসাময়ের গুরুদেব? মল্লার অসহায়ের মতো ছটফট করতে লাগল৷ ধীরে ধীরে চাঁদ ওপরে উঠতে শুরু করল৷ নদীর জলের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনও শব্দ নেই৷
প্রায় এক ঘণ্টা সময় কেটে গেল এভাবেই৷ তারপর হঠাৎই জলঙ্গীর পাড়ের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে চারপাশ কাঁপিয়ে ডেকে উঠল শিয়ালের দল৷ যেন কোনও অশুভ শক্তির আগমন বার্তা লুকিয়ে আছে তাদের সে ডাকের মধ্যে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই খসখস শব্দ শুরু হল গর্তর চারপাশে৷ তারপর বেশ কয়েক জোড়া জ্বলজ্বলে চোখ ওপর থেকে উঁকি দিল গর্তের ভিতর৷ শিয়ালের চোখ! তা দেখে আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল মল্লার৷ শিয়ালগুলো কি ছিঁড়ে খাবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর? নরমাংসর স্বাদ তো জানা আছে এই শিয়ালদের৷ নিজের অজান্তেই যেন একটা চিৎকার বেরিয়ে এল তার গলা থেকে৷ অবশ্য তাতে একটা কাজ হল, শিয়ালের দল সরে গেল গর্তর মুখ থেকে৷ আবারও নিস্তব্ধতা নেমে এল চারপাশে৷ সময় এগিয়ে চলল৷
মল্লারের শরীরে স্নায়ুতন্ত্রগুলো এরপর ধীরে ধীরে যেন শিথিল হতে শুরু করল৷ প্রবল হতাশা নেমে আসতে লাগল তার মনে৷
মল্লারের মনে হল ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া তার কিছু করণীয় নেই৷ নিস্তেজ ভাবে আকাশের চাঁদের দিকে চেয়ে রইল সে৷ হঠাৎই চাঁদের আলো ঢাকা পড়তে শুরু করল৷ মল্লার দেখল বিশাল বিশাল বাদুড় ভেসে চলেছে আকাশের বুকে৷ তাদের ডানার আড়ালে মাঝেমধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে চাঁদ৷ বেশ কিছুক্ষণ ওড়াউড়ি করে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল বাদুড়ের ঝাঁক৷ তার পরই গর্তের মাথার ওপর থেকে একটা অদ্ভুত খচমচ শব্দ ভেসে এল৷ শিয়ালের দল আবার ফিরে এল নাকি? মল্লার ঘাড় ঘুরিয়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করতে লাগল মাথার ওপরে গর্তের কিনারগুলো৷ শব্দটা এসে থামল গর্তের মুখে৷ তারপর গর্তর ভিতর উঁকি দিল একটা মুখ৷ না, সে শিয়াল নয়৷ তাকে দেখে আতঙ্কে হিম হয়ে গেল মল্লারের শরীর৷ এ সেই বীভৎস, ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডল! যে ভয়ঙ্কর মুখ সে ইতিপূর্বে দেখেছিল কুয়াশাবৃত রাতে এই জলঙ্গীর পাড়ে৷ এমন ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডল কখনও কোনও মানুষের হতে পারে না৷ এই কি তবে তমসাময়ের গুরুদেব, তার প্রেতাত্মা? মল্লারকে নিয়ে যেতে এসেছে তন্ত্রসাধনার কাজে উৎসর্গ করবে বলে? একদৃষ্টে সেই ভয়ঙ্কর মুখটা চাঁদের আলোতে চেয়ে আছে মল্লারের দিকে৷
মানুষ যখন চূড়ান্ত কোনও বিপদের সম্মুখীন হয়, নিশ্চিত মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করে তখন সে প্রকৃতির নিয়মেই শেষ একবার সাহস সঞ্চয় করে বাঁচার চেষ্টায়৷ মল্লারের ক্ষেত্রেও তাই হল৷ সেই ভয়ঙ্কর মুখের নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা সে আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে উঠল ‘কে তুমি? আমাকে ছেড়ে না দিলে ফল ভালো হবে না৷’
তার কথাটার সঙ্গে-সঙ্গেই সেই ভয়ঙ্কর প্রেত মূর্তি বলে উঠল, ‘চুপ, চুপ, চিৎকার করবেন না৷ চিৎকারের শব্দ ওদের কানে যেতে পারে৷’
তার এ কথা শুনে মল্লার একটু গলা নামিয়ে বলল, ‘তুমি কে?’
লোকটা এবার তার মুখোশটা খুলে ফেলল৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মল্লার লোকটাকে চিনে ফেলল৷ লোকটা হল সেই নদী গবেষক খাস্তগীর৷
বিস্মিত মল্লারের উদ্দেশে খাস্তগীর বললেন, ‘চিৎকার করবেন না, ভয় পাবেন না৷’—এ কথা বলে তিনি এক লাফে নেমে পড়লেন গর্তের মধ্যে৷ তারপর তাকে অবাক করে দিয়ে কোমর থেকে ছুরি বার করে মল্লারে হাত-পায়ের বাঁধন কাটতে লাগলেন৷ এক মিনিটের মধ্যেই দড়ির বাঁধন মুক্ত হয়ে উঠে বসল মল্লার৷
খাস্তগীর বললেন, ‘বসলে চলবে না৷ আপনাকে যারা এখানে ফেলে রেখে গেছে তারা আবার চলে আসতে পারে৷ উঠে পড়ুন৷ অন্য জায়গাতে গিয়ে কথা হবে৷’
খাস্তগীরের সাহায্য নিয়েই গর্ত ছেড়ে ওপরে উঠে এল মল্লার৷ হালকা চাঁদের আলোতে চারপাশটা দেখা যাচ্ছে৷ নদীর একদম পাশেই ঝোপঝাড় পূর্ণ গর্তের মধ্যে ফেলা হয়েছিল তাকে৷ তাদের একপাশে কয়েক হাত নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে জলঙ্গীর কালো জল, আর অন্যপাশে বেশ অনেকটা উন্মুক্ত জায়গা৷ জলঙ্গীর শ্মশান৷ তার বেশ কয়েকটা জায়গাতে নিভে যাওয়া চিতার পোড়া কাঠ জমা হয়ে আছে৷ কোথাও বা পড়ে আছে মাটির হাঁড়ি, শবের কাপড়, বিছানা, পচা ফুলের স্তূপ৷ চিতার পোড়া কাঠের স্তূপগুলোর আড়ালে বিন্দু বিন্দু আলো নড়ছে—শিয়ালের চোখ৷ শ্মশানের এক কোণে টিনের ছাউনি দেওয়া একটা ভাঙাচোরা কাঠামো সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে৷ সেই ছাউনির নীচে জমাট বাঁধা অন্ধকার৷ মল্লারের মনে হল ওই ছাউনিটা সম্ভবত শ্মশান যাত্রীদের ঝড়-জল থেকে বাঁচাবার জন্য কোন সময় বানানো হয়েছিল৷ জলঙ্গীর পাড়ে নির্জন এই গ্রাম্য শ্মশানটাকে এই প্রথম দেখল মল্লার৷ চাঁদের আলোতে কেমন যেন অপার্থিব মনে হচ্ছে চারপাশ৷ যেন এই শ্মশানভূমি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও এক জায়গা!
খাস্তগীর আবার মল্লারকে তাড়া দিয়ে বললেন, ‘চলুন, এ জায়গায় দাঁড়ানো ঠিক হবে না৷ আমার সঙ্গে চলুন৷ আর ভয় নেই আপনার৷ বলতে পারেন, এ যাত্রায় আপনি বেঁচে গেলেন৷ ওরা আপনাকে নিয়ে কী করত কে জানে?’
মল্লার বলল, ‘আশ্রমটা যাঁর, সেই তমসাময় বলছিলেন, তাঁর গুরুদেব নাকি তন্ত্রসাধনার কাজে আমাকে উৎসর্গ করবেন। তমসাময় তার প্রস্তুতির জন্য আজ রাতে আবার শ্মশানে ফিরে আসবেন বলেও বললেন৷’—একথা বলে মল্লার অনুসরণ করল খাস্তগীরকে৷ যেদিকে তমসাময়ের আশ্রম তার বিপরীত দিকে নদীর পাড় বরাবর হাঁটতে শুরু করল তারা৷ শ্মশান অতিক্রম করে বেশ কিছুটা এগবার পর কয়েকটা বড় বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে৷ সেখানে পৌঁছে সেই গাছের আড়ালে এক বেশ বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল মল্লার। গাড়িটা এমনভাবে অন্ধকারে মিশে আছে যে, কাছে না গেলে তার অস্তিত্ব বোঝাই যায় না৷ মল্লাররা গাড়ির কাছকাছি পৌঁছতেই বেশ কয়েজন লোক বেরিয়ে এল গাড়িটা আর আশপাশের গাছগুলোর আড়াল থেকে৷ তাদের দেখে মল্লার জানতে চাইল, ‘গাড়িটা কার? লোকগুলো কারা?’
খাস্তগীর বললেন, ‘ওই যাদের কাল বিকেলে নদীর পাড়ে নাচানাচি করতে দেখেছিলেন, পিকনিক পার্টি বলে ভেবেছিলেন, তারা৷ গাড়িটাও তখন ওখানেই ছিল, কাল শেষ রাতে অন্য পথে এখানে এনে রাখা হয়েছে৷ তবে পিকনিকের ব্যাপারটা নাটক ছিল৷ আসলে এরা সবাই তদন্তকারী সংস্থার লোক৷ আমরা আসলে ওখান থেকে আশ্রমের ওপর নজর রাখছিলাম৷’
কথাটা শুনে মল্লার বলল, ‘তদন্তকারী সংস্থা মানে? আপনার সঙ্গে এই লোকগুলোর কী সম্পর্ক?’
খাস্তগীর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনি, ‘এন.আই.এ’-র নাম শুনেছেন? ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা?’
মল্লার জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এন.আই.এ নামটা কাগজে পড়েছি৷’
খাস্তগীর বললেন, ‘আমি এন.আই.এ-র একজন সিনিয়ার অফিসার৷ আর যাঁদের দেখছেন তাঁরা কেউ আমার সাব অর্ডিনেট অফিসার ও কর্মী৷ তদন্তের স্বার্থেই আপনাদের কাছে আমাকে নদী গবেষক বলে পরিচয় দিতে হয়েছিল৷’
তাঁর কথা শুনে মল্লার বিস্মিত হয়ে বলল, ‘আপনার আসল নাম কী?’
খাস্তগীর হেসে বললেন, ‘পেশাগত নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের আসল নাম বাইরের মানুষের কাছে গোপন রাখতে হয়৷ আপনি তাই আমাকে খাস্তগীর বলেই ডাকবেন৷ তবে আমার পেশাগত পরিচয় যে মিথ্যা নয়, তা আপনি আমার সঙ্গে একদিন থাকলেই বুঝতে পারবেন৷’
মল্লার বলল, ‘আচ্ছা, তাই বলেই ডাকব৷ কিন্তু কোন তদন্তে আপনারা নেমেছেন তা বলা যাবে?’
খাস্তগীর বললেন, ‘হ্যাঁ, এখন আর আপনাকে সেটা বলতে বাধা নেই৷ বেশ কিছুদিন ধরে জলঙ্গীর এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শিশু পাচারকারিরা সক্রিয়৷ এখান থেকে প্রথমে অবৈধভাবে পাশের দেশে শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর সেখান থেকে তাদের আবার পাচার করে দেওয়া হয় আরব দেশগুলোতে৷ সেই তদন্তেই নেমেছিলাম আমরা৷ প্রাথমিক অবস্থায় আমরা ভেবেছিলাম আপনারা হয়তো বা এইসব পাচার কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত৷ কারণ, শহরের লোকেরা অনেক সময়ই আড়াল থেকে এসব কাজ পরিচালনা করে৷ যে কারণে আপনাদের আসল পরিচয় অনুসন্ধানের জন্য আমি বা আমার সঙ্গীরা বিভিন্ন সময় আপনাদের অনুসরণ করেছি, আপনাদের সম্পর্কে জানার জন্য আপনাদের কর্মস্থলে, বাসস্থানের চারপাশে খোঁজখবর করেছি, এমনকী আপনাদের ফোন কলও ট্যাপ করেছি৷ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছি আপনি আর চূর্ণী ম্যাডাম অন্তত শিশু পাচারের সঙ্গে যুক্ত নন৷ যদিও আপনাদের অপর বন্ধুর আচরণ সন্দেহজনক৷ শিশু পাচারের তদন্তে নামলেও এখন আমাদের মনে হচ্ছে অন্য কোনও একটা অদ্ভুত ব্যাপার এই আশ্রমে লুকিয়ে আছে৷ আশা করি আপনি এই আশ্রম সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলে আমাকে সাহায্য করবেন৷’—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন এন.আই.এ অফিসার৷
মল্লার জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, বেশ কয়েকটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে চলেছে এই আশ্রমকে ঘিরে৷ তা যেন বিশ্বাস করা যায় না৷ আমি নিশ্চয়ই আপনাকে সেসব কথা বলব৷’
খাস্তগীর এরপর তার দু’জন সঙ্গীকে ডেকে বললেন, ‘আপনারা গিয়ে শ্মশানের উপর নজর রাখুন৷ সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লেই আমাকে এসে জানাবেন৷’
লোক দু’জন চলে যাবার পর গাড়ির কাছে একটা গাছের গুঁড়ির সামনে মল্লারকে নিয়ে বসলেন খাস্তগীর৷ তারপর নিজের কোমর থেকে সার্ভিস রিভলভারটা বার করে সামনের ঘাসের উপর নামিয়ে রেখে বললেন, ‘কেন, কীভাবে আপনাদের এই আশ্রমের সঙ্গে যোগাযোগ হল, এই আশ্রমে দু-বার এসে আপনার কী অভিজ্ঞতা হল, আপনার বন্ধুর অদ্ভুত আচরণ, এসব কিছুর ব্যাপারে আমাকে খুলে বলুন—৷’
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলঙ্গীর পাড়ে কুয়াশা নামতে শুরু করেছে৷ শ্মশানের দিক থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে এল৷ মল্লার বিস্তৃতভাবে বলতে শুরু করল তার কথা৷ খাস্তগীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতে লাগলেন৷ মল্লার সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগল সে সব প্রশ্নের জবাব দেবার৷ মল্লারের কথা শুনতে শুনতে কখনও বা বিস্ময় ফুটে উঠল তদন্তকারী সরকারি অফিসারের মুখে, অবার কখনও বা গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ৷ প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগল মল্লারের সব কথা শেষ হতে৷
তার কথা শোনার পর খাস্তগীর বললেন, ‘নিঃসন্দেহে তমসাময়ের আশ্রমে, এই জলঙ্গীর পাড়ে কোনও একটা অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে আছে৷ আপনাকে আমি দুটো ঘটনার কথা জানাই৷ আপনাদের যিনি শিশুকল্যাণ বিভাগের আধিকারিক বলে পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি কিন্তু বাচ্চা ছেলেদের শেষ রাতে ফিরিয়ে দিয়ে যাননি৷ কাল শেষ রাতে ছেলেগুলো নিজেরাই আশ্রমে ফিরে এসেছে তা আমরা দেখেছি৷ সেই ভুয়ো সরকারি অফিসার মিস্টার বক্সী আর তার দু’জন সঙ্গীর মৃতদেহ এ জায়গা থেকে দশ মাইল দূরে গাড়ির ভিতর থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ৷ সম্ভবত তারা ওই পথ ধরে ছেলেগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে যাচ্ছিল৷ কিন্ত তার আগেই তাদের মৃত্যু ঘটে৷’
বিস্মিত মল্লার বলে উঠল, ‘মিস্টার বক্সী তবে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার অফিসার ছিলেন না?’
খাস্তগীর জবাব দিলেন, ‘না, তারা তিনজনে কেউই সরকারি কর্মী ছিলেন না৷ পুলিস ফাইল দেখে তাদের শনাক্ত করা গিয়েছে৷ ওরাই আসলে শিশু পাচারকারীর দল৷ ইতিপূর্বে একবার শিশু পাচারের অভিযোগে জেলেও ছিল, বর্তমানে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই কাজে নেমেছিল৷ তবে ওদের তিনজনের মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়, খুন৷ পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা গিয়েছে, লোকগুলোর ঘাড় কেউ বা কারা মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে৷ সে কারণেই ওদের মৃত্যু হয়েছে৷ আরও অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, ওদের গলায় নাকি ছোট বাচ্চাদের আঙুলের ছাপ মিলেছে! কিন্তু ঘাড় ভাঙার মতো শক্তি ছোট বাচ্চাদের আঙুলে থাকবে কীভাবে?’—এই বলে তার প্রথম বক্তব্য শেষ করলেন মিস্টার খাস্তগীর৷ তাঁর কথা শুনে মল্লারের মনে পড়ে গেল আজকে যখন একটা বাচ্চা ছেলে তার গলাটা চেপে ধরেছিল তখন মনে হচ্ছিল তার ঘাড়টা বুঝি মট করে এখনই ভেঙে যাবে! কী আসুরিক শক্তি ছিল সেই ছোট হাতটাতে! সেই হাতের চাপেই তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল মল্লার৷ এখনও মল্লারের গলাটা টনটন করছে!
এন.আই.এ অফিসার এরপর আবার মুখ খুললেন—‘সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপারটা এবার বলি আপনাকে৷ তমসাময় যে আশ্রমের অনুমোদনের জন্য সরকারের ঘরে আবেদপত্র জমা দিয়েছিলেন, এ ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি৷ সেই আবেদনপত্রর সঙ্গে বাচ্চাগুলোর ছবিও জমা দেওয়া হয়েছিল নির্দিষ্ট ফর্মে আটকে৷ তদন্তে নেমে এই বাচ্চাগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গিয়েছে৷ বিস্ময়ের ব্যাপার হল সরকারি নথি অনুসারে তারা মৃত! ছেলেগুলোর পরিবারের লোকেরাও সরকারি নথিকেই সমর্থন জানিয়েছেন৷ এই ছেলেগুলোর কাউকে তাদের পরিবারের লোকেরা নিজের হাতে কবর দেন জলঙ্গীর শ্মশান সহ অন্যান্য শ্মশান বা গোরস্থানে৷ সাপে কেটে মৃত্যু হয়েছিল বলে আবার একটা ছেলেকে প্রচলিত গ্রামীণ সংস্কার অনুযায়ী কলার ভেলায় করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল জলঙ্গী নদীতে৷ আমি যাদের কথা বললাম তাদের সকলেরই কিন্তু সরকারি অথবা বেসরকারি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট আছে৷ সে সব দেখেছি আমি৷ তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, কোনও ডাক্তার হয়তো কোনও জীবন্ত ছেলেকে ভুলবশত মৃত বলে ঘোষণা করেন, এবং তমসাময় ছেলেটা জীবন্ত আছে বুঝতে পেরে তাকে সুস্থ করে তোলেন৷ কিন্তু এতজন ডাক্তার এতগুলো ছেলের ক্ষেত্রে একই ভুল করবেন কীভাবে?’
এরপর একটু থেমে খাস্তগীর বললেন, ‘রাতে শ্মশানে ঘুরে ছেলেগুলো কী করে তা আমি দেখেছি৷ পোড়া মাংসর সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়৷ নিভে যাওয়া চিতার মধ্যে কোথাও মাংস লেগে থাকলে তা মুখে দেয়৷ আপনার বন্ধুও কিন্তু একই কারণে শ্মশানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ কিন্তু এদের এই অদ্ভুত আচরণ কেন? এমন বিকৃত খাদ্যাভাস কেন তৈরি হল? আপনি হয়তো শুনে থাকবেন যে কাঁচা কাঁঠাল বা এঁচোড়কে লোকে অনেক সময় ‘গাছ পাঁঠা’ বলে ডাকে৷ কারণ, তা পাঁঠার মাংসর মতো রাঁধা যায়৷ তেমনই কোনও কোনও জায়গাতে শোল মাছকে ‘জলের মাংস’ নামেও ডাকা হয়৷ কারণ, শোল মাছের স্বাদের সঙ্গে মাংসের স্বাদের মিল আছে৷ আবার শুনেছি মানুষের মাংস নাকি মাছের মাংসের মতোই নরম হয়৷ মানুষের পোড়া মাংস সহজলভ্য নয় বলেই কি আপনার বন্ধু আর ছেলেগুলো পোড়া শোল মাছ খায়? সোহম কিন্তু আজও গঞ্জের বাজারে গিয়ে একটা শোল মাছ কিনে এনেছেন৷ আমার লোকেরা ওকে ফলো করেছিল৷’
তিনি কথা শেষ করার পর মল্লার বলল, ‘তবে আমার অনুমানই কি সত্যি? সোহম আর ওই ছেলেগুলো কি কেউ আর স্বাভাবিক মানুষ নয়? কিন্ত আমাদের স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি আবার এই অনুমানকে সমর্থন করতে পারে না৷ একবার কারও মৃত্যু হলে কীভাবে আবার তার শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব? বিজ্ঞান তো এ কাজ করতে পারে না৷ তন্ত্র কি পারে?’
খাস্তগীর বললেন, ‘আপনার মতো একই ধন্দে রয়েছি আমি৷ আমার মনের বিজ্ঞান চেতনা কিছুতেই মৃত মানুষের জীবিত হয়ে ওঠাকে সমর্থন করে না৷ আবার যা দেখছি, শুনছি, যার ইঙ্গিত মিলছে তাকেই বা অস্বীকার করি কীভাবে? একবার একটা লেখা পড়েছিলাম৷ এক ধরনের মানুষদের নিয়ে, মৃত্যুর পরও যাঁরা জীবিত মানুষের মতোই হেঁটে চলে বেড়ায়! কী যেন একটা নামে ডাকা হয় তাদের৷ কিন্তু সে সব তো নেহাতই গল্পকথা বলেই জানি৷’
মল্লার জানতে চাইল, ‘আপনি কি ভ্যাম্পায়ারের কথা বলছেন? তাদের গল্প আমিও পড়েছি৷ একই সঙ্গে মানুষ আর বাদুড়ের রূপ ধরতে পারে তারা৷’
খাস্তগীর বললেন, ‘না, ভ্যাম্পায়ার নয়৷ আমি যাদের কথা বলছি তারা মানুষের রূপেই থাক৷ যে তাদের মৃতদেহে পুনরায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে তার নির্দেশ মতোই পরিচালিত হয় তারা৷ জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করা এই মানুষদের নামটা ঠিক এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না৷ বহুদিন আগে গল্পের বইতে পড়েছিলাম এদের কাথা৷’
মল্লার বলল, ‘আমার মাথার ভিতর সব যেন কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে৷ আপনি এখন কী করবেন?’
তদন্ত সংস্থার আধিকারিক একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘যা করার আজ রাতেই করতে হবে৷ ছেলেগুলোকে নিয়ে তমসাময়কে পালাতে দেব না৷ আশ্রম থেকে বাইরে পালাবার নানা পয়েন্টে স্থানীয় পুলিস মোতায়েন করা হয়েছে৷ গঞ্জের লোকেরা আর স্থানীয় গ্রামবাসীরাও খুব উত্তেজিত হয়ে আছে৷ তাদের স্থির বিশ্বাস, বাচ্চা ছেলেটাকে তমসাময়রাই কবর থেকে তুলেছেন তন্ত্রসাধনার জন্য৷ তারাও নজর রাখছে আশ্রমের ওপর৷ আজ রাতেই তমসাময় সহ আশ্রমের সবাইকে আটক করে দিনের বেলা শহরে নিয়ে যাব৷ আপনার বন্ধুকেও নিয়ে যাব৷ তমসাময়কে গ্রেপ্তার করতে আমার আর আইনগতও সমস্যা নেই। আপনার সঙ্গে যা ঘটেছে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে৷ তাকে লকআপে রেখে ইন্টারোগেশন করলেই সত্য উদ্ঘাটন হবে বলে আমার ধারণা৷ আর আপনার বন্ধু আর ছেলেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলেও এই অদ্ভুত রহস্যর উন্মোচন হতে পারে৷’
মল্লার বলল, ‘কিন্তু চূর্ণীর কী হল তা কিছুই বুঝতে পারছি না!’
খাস্তগীর বললেন, ‘তাঁকে আশ্রমের বাইরে এখনও পর্যন্ত বার করা হয়নি বলেই আমার ধারণা৷ করলে খবর পেতাম৷ যেমন আপনারটা পেলাম৷ তিনি সম্ভবত আশ্রমেই আছেন৷ তল্লাসি করলে খোঁজ মিলবে৷’
এ কথা বলার পর খাস্তগীর প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি একটু ভালো করে ভেবে দেখুন তো, তমসাময়ের আশ্রমে তাকে আর বুনোকে ছাড়া তৃতীয় কোনও ব্যক্তিকে কখনও দেখেছিলেন? তমসাময় তাঁর যে গুরুদেবের কথা বলেছেন তিনিও কি ওই আশ্রমেই আত্মগোপন করে থাকেন?’
মল্লার জবাব দিল, ‘তাঁদের দু’জন ছাড়া কোনও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে আমি কখনও আশ্রমে দেখিনি৷ তবে গত রাতে হুডি পরা একজনকে দেখেছিলাম যে সোহমকে অনুসরণ করে কালো ঘরের কাছে পৌঁছে হারিয়ে গেল!’
কথাটা শুনে খাস্তগীর মৃদু হেসে বললেন, ‘না সে নয়, ওই হুডি পার লোকটা আমিই ছিলাম৷’
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা নামতে শুরু করেছে জলঙ্গীর পাড়ে৷ মল্লারের ঘড়িতে রাত দশটা বাজে৷ একজন লোক একটা জলের বোতল আর বিস্কুটের প্যাকেট এনে দিল মল্লারকে৷ খাস্তগীর বললেন, ‘খেয়ে নিন৷ ঠিক রাত বারোটায় আশ্রমে হানা দেব আমরা৷ আপনাকেও সঙ্গে নেব৷’
সারাদিন এক দানা খাবার পড়েনি মল্লারে পেটে৷ বিস্কুটের পুরো প্যাকেট আর জলের বোতলটা শেষ করে সে শরীরে একটু বল ফিরে পেল৷ এরপর খাস্তগীরের পাশে বসে চুপ করে প্রতীক্ষা করতে লাগল রাত বারোটা বাজার জন্য৷
কিন্তু রাত এগারোটা নাগাদই খাস্তগীর যে দু’জন লোককে নজরদারির জন্য পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন এসে হাজির হল৷ সে খাস্তগীরকে বলল, ‘স্যার, তমসাময় ছেলেগুলোকে নিয়ে শ্মশানে এসেছে৷’
কথাটা শুনে খাস্তগীর একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘না, আর দেরি করা উচিত হবে না৷ এমন হতে পারে তারা আশ্রমে না ফিরে পালাবার চেষ্টা করল! এখনই যেতে হবে আমাদের৷’ উঠে পড়লেন খাস্তগীর৷ উঠে পড়ল মল্লারও৷ খাস্তগীর ডেকে নিলেন তার লোকদের৷ সাত-আট জন শক্তসমর্থ চেহারার লোক৷ তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে সবাইকে নিয়ে জলঙ্গীর পাড় বেয়ে নিঃশব্দে খাস্তগীর যাত্রা করলেন শ্মশানের দিকে৷
