তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ১
১
তিওতিহুকান পিরামিড চত্বরের এক পাশে একটা ফাঁকা জায়গাতে পাথরের বেঞ্চে বসে ছিলাম আমি আর প্রফেসর জুয়ান। মেক্সিকো সিটি থেকে আজই আমরা পিরামিড নগরী তিওতিহুকানে পৌঁছেছি এখানকার ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্যগুলো দেখব বলে। তিওতিহুকান শব্দের অর্থ, ‘যে পবিত্র স্থানে মানুষ দেবতা হয়ে ওঠে।’ এ নগরী তৈরি হয়েছিল একশো পঞ্চাশ খ্রিস্টাব্দ থেকে সাতশো খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। এ শহরের প্রাচীন স্থপতিদের সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। তাদের কাছ থেকে পরবর্তীকালে এ নগরীর দখল নেয় অ্যাজটেকরা। সেও প্রায় দ্বাদশ শতাব্দীর কথা। অ্যাজটেকরা নিজেদের স্থাপত্যশৈলীতে সাজিয়ে নেয় এই নগরীকে। যার অসংখ্য নিদর্শন ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশের স্তম্ভ, মিনার, পিরামিডের গায়ে।
প্রায় দুপুর হতে চলেছে। পিরামিড চত্বরে ভিনদেশি ট্যুরিস্টদের বেশ ভিড়। সিঁড়ি বেয়ে পিরামিডের ওপরে ওঠানামা করছে লোকজন। নীচের চত্বরে মাথায় বিরাট পালকের টুপিওয়ালা প্রাচীন অ্যাজটেক যোদ্ধার সাজে সজ্জিত কিছু লোক বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে টুরিস্টদের মনোরঞ্জন করছে। তাদের সঙ্গে ছবি তুলছে টুরিস্টরা। তিওতিহুকান পিরামিড দেখে জিরিয়ে নিচ্ছি আমরা। প্রফেসর মেসো-আমেরিকান সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে মাঝে মাঝে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন আমাকে। মেক্সিকোতে আমি প্রথমবার এলেও টোলটোক-অ্যাজটেক সভ্যতার ভিত্তিভূমিতে প্রফেসর তার পুরাতাত্তিক জ্ঞান সংগ্রহের কারণে বার কয়েক এসেছেন। প্রবীণ প্রফেসর তাঁর স্বদেশ স্পেনের গ্রানাডা ইউনিভার্সিটিতে মেসো-আমেরিকান সভ্যতার ইতিহাস পড়ান। এ বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট জ্ঞান আছে। আমরা যে জায়গাতে বসে আছি তার কাছের একটা প্রাচীন স্তম্ভগাত্রে একটা ঈগল মূর্তি খোদিত। সেটার প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘শেন, অ্যাজটেক সভ্যতার যে কোনো স্থাপত্যের গায়ে তুমি অন্তত একটা ঈগলের মূর্তি দেখতে পাবে।’
আমার নাম দীপাঞ্জন সেন। খাঁটি বাঙালি নাম-পদবি। প্রফেসরের স্পেনীয় জিভে আমার নামটা জড়িয়ে যায়, আর ‘সেন’-টা হয়ে যায় ‘শেন’। আমি তাঁর কথা শুনে বললাম, “এর কারণ?”
জুয়ান বললেন, “এই ঈগল হল অ্যাজটেকদের জাত্যাভিমানের প্রতীক। পৃথিবীর সব জাতির উৎপত্তির পিছনে দেখবে একটা করে দৈব কাহিনি আছে। যাকে বলে ‘মায়া কাহিনি।’ অ্যাজটেকদের মায়া কাহিনি অনুসারে বহু শতাব্দী পূর্বে তারা ‘আজৎলান’ নামে এক উষর মরু অঞ্চলে ‘নাহুয়া উপজাতি’ পরিচয়ে অতি কষ্টে বাস করত। একদিন তারা আকাশ থেকে দেবতা ‘হুইজিলোপোকৎলি’র কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ‘তোমরা এ মরু অঞ্চল ছেড়ে সুর্যোদয়ের দিকে যাত্রা করো। যেতে যেতে একদিন তোমরা দেখবে একটা ক্যাকটাস গাছের মাথায় এক বিশাল ঈগল বসে আছে। তার নখের ধারে এক অজগর সর্প। সর্পের দুই মুখ, এক মুখে বৃষ্টি অন্য মুখে বজ্র। সৃষ্টি ও ধ্বংসের প্রতীক ওই দুই মুখ। যেখানে তোমরা ওই ঈগল দেখবে সেখানে বসতি স্থাপন করবে তোমরা। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কেউ যদি তোমাদের পরিচয় জানতে চায়, বলবে, আমরা ‘মেকসিকা’, আর বসতি স্থাপন করলে বলবে, ‘আমরা অ্যাজটেক’। দেবতার কথামতো বেরিয়ে পড়ে দীর্ঘ যাত্রা শেষে এইখানে নাকি ঈগল দেখে বসত করতে লাগল মানুষেরা। ঐতিহাসিকদের মতে, এই ভূমিতে তাদের আগমনের সময়কাল ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে। তারপর থেকে ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে স্পেনীয় অভিযাত্রী হার্নান্দো কর্তেজের মেক্সিকো বিজয়ের আগে পর্যন্ত এখানে ছিল লাল মানুষের সাম্রাজ্য। সে সময়কালের মধ্যে অ্যাজটেকরা তাদের কয়েক হাজার মাইল ব্যাপী সাম্রাজ্য জুড়ে গড়ে তুলেছিল অসংখ্য পিরামিড, মন্দির, এইসব স্থাপত্য। আর তাদের গায়ে খোদিত ছিল পবিত্র ঈগলের মূর্তি।”
প্রফেসর জুয়ান এরপর কী যেন আরও বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু আমাদের কানে এল এক পরিচিত শব্দ— ‘ওলা?’। স্প্যানিশ ভাষায় এই শব্দের অর্থ হল, ‘হ্যালো?’। শব্দটা কানে যেতেই তাকিয়ে দেখি, আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বছর দশেকের একটা বাচ্চা ছেলে। তার পরনে মেসো ইন্ডিয়ানদের বিবর্ণ পোশাক, খালি পা, মাথায় ঘাসের দড়িতে বোনা পালক গোঁজা টুপি। তবে তার পোশাক বিবর্ণ হলেও বড় বড় চোখ দুটোতে একটা ঔজ্জ্বল্য আছে। আমরা তার উদ্দেশে ‘ওলা’ বলতেই সে একটু ইতস্তত করে বলল, “তোমাদের কাছে খাবার আছে? খুব খিদে পেয়েছে আমার।” ভিখিরি বলতে যা বোঝায় তা এ চত্বরে আমাদের চোখে পড়েনি। ছেলেটার পোশাক বিবর্ণ হলেও তাকে ঠিক ওই গোত্রের বলে মনে হচ্ছে না। জুয়ান জবাব দিলেন, “না, খাবার তো আমাদের সঙ্গে নেই। তবে কয়েকটা পেসো তোমাকে দিতে পারি খাবার কেনার জন্য।”
‘পেসো?’ এই বলে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভেবে নিয়ে ছেলেটা বলল, “কিন্তু আমার কাছে তেমন কিছু নেই। পেসোর বদলে কী দেব তোমাকে?”
জুয়ান হেসে বললেন, “তোমাকে কিছু দিতে হবে না। আমি এমনিই দিচ্ছি তোমাকে। এই বলে পকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা বার করে এগিয়ে দিলেন বাচ্চাটার দিকে।
ছেলেটা প্রথমে পয়সাগুলো কিন্তু নিল না। অস্পষ্ট স্বরে সে বলল, “আমি কিন্তু ভিখারি নই। আমি একজনের সঙ্গে এখানে এসেছি। তাকে কোথায় যে বসিয়ে রাখলাম খুঁজে পাচ্ছি না! এদিকে আমার খুব খিদে পাচ্ছে।”
আমি এবার বললাম, “বুঝলাম তুমি ভিখারি নও। তবে খিদে যখন পাচ্ছে তখন পয়সাটা নাও। ওই তো চত্বরের ওপাশে খাবার বিক্রি হচ্ছে।” ছেলেটা আবার কিছুক্ষণ যেন কী ভাবল, তারপর জুয়ানের হাত থেকে পেসোগুলো নিয়ে তার জামার তলা থেকে লম্বা দণ্ডের মতো একটা কাগজের মোড়ক বার করে পাথরের বেঞ্চে নামিয়ে রেখে বলল, “এটা তোমরা রাখো। যাকে খুঁজছি, সে এখানেই কোথাও আছে। তাকে খুঁজে পেসো ফেরত দিয়ে এটা নিয়ে যাবখন।”
জুয়ান বললেন, “না না এসবের দরকার নেই। বললাম তো তোমাকে এমনি দিলাম পয়সাগুলো।”
ছেলেটা জবাব দিল, “পয়সা নিলে সে যদি আমাকে বকে?” এই বলে সে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি মোলায়েম স্বরে তার উদ্দেশে এবার বললাম, ‘তোমার বাড়ি কোথায়? কার সঙ্গে এখানে এসেছ তুমি?’
ছেলেটা শুধু জবাব দিল, ‘যেখানে তেজকাৎলিপোকার মন্দির আছে সেখানে।” এরপরই হঠাৎ চত্বরের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত কাণ্ড করল ছেলেটা, সে সোজা ছুটতে লাগল সেদিকে, তারপর সেই ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
তার ওই কাণ্ড দেখে প্রাথমিক অবস্থায় আমরা মনে করলাম সে বুঝি তার সঙ্গীকে দেখতে পেয়েছে। আমরা তার প্রতীক্ষা করতে করতে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মন দিলাম। আমরা মেক্সিকোতে আরও পাঁচদিন থাকব। তার মধ্যে কোথায় কোথায় যাওয়া যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পরও যখন ছেলেটা ফিরে এল না তখন জুয়ান বললেন, “চলো, আমাদের তো হোটেলে ফিরতে হবে। ছেলেটাকে ভিড়ের মধ্যে খুঁজে ওর জিনিসটা ফিরিয়ে দিই।”
কাগজের মোড়কটা উঠিয়ে নিলাম আমি, তারপর দুজনে এগোলাম ভিড়ের দিকে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে বেশ অনেকক্ষণ খোঁজার পরও চত্বর বা তার আশেপাশে কোথাও তাকে দেখতে পেলাম না আমরা। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। পিরামিডে ওঠানামা করতে গিয়ে বেশ খিদেও পেয়ে গেছে দুজনেরই। জুয়ান বললেন, “ছেলেটা আমাদের জিনিসটা গছিয়ে দিয়ে বেশ মুশকিলে ফেলল দেখছি। কতক্ষণ এভাবে অপেক্ষা করব? কী করা যায় বলো তো?”
আমারও আর খিদের জ্বালায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিল না। চত্বরের ওপাশে রাস্তার ওপারে একটা গলির মধ্যে আমাদের হোটেল। বেশি দূর নয়। আমি তাই বললাম, “চলুন আমরা হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসি। ছেলেটাও এখানে আমাদের না পেলে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে।”
জুয়ান বললেন, “ঠিক আছে, তাই করা যাক।”
আমরা রওনা দিলাম হোটেলের দিকে।
