Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ৩

পরদিন সকাল আটটায় হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পায়ে হেঁটে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেলাম আমরা। একটা কার্গো ভ্যান জাতীয় গাড়ির সামনে জনা চারেক সঙ্গী নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিস্টার কমোলোল। আমরা তাদের কাছে পৌঁছতেই তিনি আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, “নিন, উঠে পড়ুন। বিকালের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাব সেখানে।” এই বলে তিনি আর একজন সঙ্গীকে ইশারা করতেই সে আমাদের মালপত্র নিয়ে তুলে দিল গাড়ির পিছনে। কমোলোল-র সঙ্গীদের গঠন বেশ বলিষ্ঠ, সকলেই মেক্সিকান। তবে একটা জিনিস আমাদের নজর এড়াল না যে তাদের প্রত্যেকেরই অঙ্গহানি হয়েছে। দুজনেরই বাঁ হাত নেই। একজনের একটা অক্ষিকোটর শূন্য, আর একজনের কান নেই। তা যেন নিখুঁতভাবে কেটে নামানো হয়েছে। এ ব্যাপারগুলো আমাদের চোখে পড়েছে দেখে বুঝতে পেরেই মনে হয় কমোলোল আমাদের উদ্দেশে বললেন, “আমার সঙ্গীরাও সবাই আমার মতো প্রতিবন্ধী। আমার সোসাইটির সদস্য।”

গাড়িতে উঠে বসলাম আমরা। গাড়ির ভিতরটা দুটো ভাগে লোহার জাল দিয়ে বিভক্ত। লম্বা ধরনের গাড়িটার পিছনের অংশে কোনো জানলা নেই। ওখানে সম্ভবত মালপত্র রাখা হয়। আমাদের সঙ্গে সকলেই উঠে পড়ল জালের এক পাশে ড্রাইভারের আসন সংলগ্ন জায়গাতে! কমোলোল-র কানহীন সঙ্গী ড্রাইভারের আসনে বসে গাড়ি স্টার্ট করতেই আমাদের ঠিক পিছনে জালের ওপাশ থেকে এক দুর্বোধ্য চিৎকার শুনে চমকে উঠলাম সবাই। তাকিয়ে দেখি জাল ধরে ঝাঁকাচ্ছেন এক মহিলা। পরনের ছিন্ন পোশাক। জাল ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বিস্ফারিত চোখে তিনি যেন কী বলতে চাইছেন। কিন্তু তাঁর গলা দিয়ে আর্তনাদের মতো শব্দ ছাড়া অন্য কিছু শব্দ বেরোচ্ছে না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আমি দেখতে পেলাম তাঁর মুখগহ্বরে কোনো জিভ নেই। মেক্সিকোর রোদ প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলার চামড়ার রংকে কিছুটা পুড়িয়ে দিয়েছে, তথাপি তিনি যে ইউরোপীয় তা বুঝতে আমার অসুবিধা হল না। আমার মতো বিস্মিত জুয়ান কমোলোলকে জিজ্ঞেস করলেন, “কে উনি?”

মিস্টার কমোলোল আপসোসের সুরে বললেন, “ভদ্রমহিলা একদা ছিলেন এক ব্রিটিশ প্রত্নবিদ। বহু বছর আগে তেজকাৎলিপোকা গেছিলেন। হয়তো আশা ছিল সেখানে ধনরত্ন খুঁজে পাবেন। কিন্তু অভিযানের ব্যর্থতা ওঁকে পাগল করে দেয়। ওখানেই উনি পথে পথে ঘুরে বেড়ান। কেউ ওঁকে ওঁর দেশ থেকে খুঁজতে আসেনি। ক্যান্সারের কারণে ওঁর জিভ বাদ গেছে, মাথাও খারাপ, এই অসহায় মহিলাকে আমরা মাঝে মাঝে সাহায্য করি। ওঁকে এখানে আনা হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। তেজকাৎলিপোকাতে ফেরত দিতে যাচ্ছি।”

তার কথা শুনে প্রফেসর বললেন, “খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আপনারা যে এসব মানুষের জন্য কাজ করেন, এটা খুব প্রশংসনীয় ব্যাপার।”

কমোলোল বিনয়ীভাবে বললেন, “তেমন কিছু আমরা করে উঠতে পারি না অর্থাভাবের জন্য। তবে চেষ্টা করি

গাড়ি চলতে শুরু করল। সেই ভদ্রমহিলাও একসময় চিৎকার থামিয়ে চুপচাপ হয়ে গেলেন। শহর থেকে বেরিয়ে রুক্ষ মরুপ্রান্তরের পথ ধরল আমাদের গাড়ি। পথের চারপাশে কোনো জনবসতি নেই। মাঝে মাঝে শুধু চোখে পড়ছে ক্যাকটাসের ঝোপ। সবুজ বলতে শুধু ওইটুকুই। আমাদের গাড়িটা বেশ পুরোনো, লড়ঝড় করতে করতে চলছে। কোনো কোনো সময় হয়তো দুরে দেখা যাচ্ছে অ্যাজটেক পিরামিডের চুড়ো। অতীতের সাক্ষী হয়ে নিঃসঙ্গভাবে তারা দাঁড়িয়ে জনহীন মরুস্থলীর বুকে। প্রফেসর জুয়ান কমোলোলকে বললেন, “আমরা যে জায়গাতে যাচ্ছি সে জায়গা সম্বন্ধে কিছু বলবেন?”

কমোলোল বললেন, “১০০০ খ্রিস্টাব্দে অ্যাজটেকরা মেক্সিকোর স্বভূমি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে ১১৯৫ খ্রিস্টাব্দে মেক্সিকো উপত্যকায় পৌঁছে বসতি স্থাপন করে ও ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁরা তেনোকতিতলান নগরী স্থাপন করে সেখানে প্রথম মন্দির নির্মাণ করে। ১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম অ্যাজটেক রাজা আকামপিকৎলি সিংহাসনে বসেন। ইতিহাসের অধ্যাপক হিসাবে এই ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে। আমরা যে নগরীতে যাচ্ছি সে নগরী নির্মিত হয় সম্রাট হুইৎজিলিহুইল-এর আমলে। তিনি ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪১৭ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তার সময়তেই গড়ে ওঠে এই প্রাচীন মন্দির নগরী। বহু পিরামিড মন্দির আছে সেখানে। তেজকাৎলিপোকার মন্দির ছাড়াও ওখানে সূর্যদেব হুইজিলোপোকৎলি, পালকভূষিত সর্পদেব কোয়েৎজালকোয়াল, মৃত যোদ্ধাদের দেবতা তেওইয়াত্তমিকি-র মন্দির আছে। তবে তেজকাৎলিপোকার পিরামিডই তার মধ্যে টিকে আছে। তেজকাৎলিপোকা কীসের দেবতা জানেন আপনি?”

“তিনি হলেন রাত্রি ও মায়াজালের দেবতা!” জবাব দিলেন প্রফেসর।

উত্তর শুনে প্রশংসাসূচক শব্দ করে কমোলোল বললেন, “ঠিক বলেছেন। ওই পিরামিড মন্দিরে অ্যাজটেক সম্রাট ও পুরোহিতরা জাদুবিদ্যা চর্চা করতেন। ওই মন্দিরে এক অদ্ভুত বিগ্রহ আছে। প্রাচীন অ্যাজটেক ক্যালেন্ডারের শেষ দিনে প্রতি বছরে এক দিন খোলা হয় ওই পিরামিড মন্দিরের দরজা। সারারাত ধরে উৎসব হয়। যাদের দেহে এখনও খাঁটি অ্যাজটেক রক্ত প্রবহমান, যারা এখনও খাঁটি অ্যাজটেক ধর্ম ঐতিহ্যতে বিশ্বাসী, তারা প্রত্যেকে ওই রাতে উপাসনার জন্য উপস্থিত হয় সেখানে। আধুনিক সভ্যতার ঘৃণ্য বসন পরিত্যাগ করে অ্যাজটেক সাজে সজ্জিত হয়ে অন্তত একটা রাতের জন্য তারা ফিরে যায় সুদূর অতীতে, হয়ে ওঠে খাঁটি অ্যাজটেক। কালই সেই রাত। দেখবেন কেমন অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয় আপনাদের।”

জুয়ান শুনে কিছুটা আশ্চর্য হয়ে বললেন, “কিন্তু কোনো বইতে এ মন্দিরের কথা তেমনভাবে দেখিনি তো?”

মিস্টার কমোলোল মৃদু হেসে বললেন, “সব কথা কি আর বইতে লেখা থাকে? তাছাড়া বাইরের কোনো লোককে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেওয়া হয় না। খবরের কাগজ বা ওই জাতীয় লোককে তো কোনোভাবেই নয়। আপনারা আমার সঙ্গে যাচ্ছেন বলে ওই দুর্লভ অভিজ্ঞতার সঙ্গী হতে পারবেন।’

আমি জানতে চাইলাম, “আমরা কি ওই প্রাচীন বিগ্রহ দর্শন করতে পারব?”

তিনি জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, পারবেন।” এরপর মৃদু হেসে তিনি বললেন, “এই যে এত প্রাচীন স্থাপত্য আপনারা এখানে দেখেন এসবই আসলে ওই দেবতারই দান।”

সময় এগোতে থাকল, আমরাও নানা রকম কথাবার্তা, গল্প করতে করতে এগিয়ে চললাম। তার অধিকাংশই ইতিহাসকেন্দ্রিক গল্প। কমোলোল-র সঙ্গীরা কিন্তু একদম নিশ্চুপ। তারা নিজেদের মধ্যেও কোনো কথা বলছে না। সেই ভদ্রমহিলারও কোনো সাড়া নেই। দুপুরের দিকে বাইরে থেকে ভেসে আসা গরম বাতাসে যেন ঝলসে যেতে লাগলাম সবাই, ধীরে ধীরে কথাবার্তাও বন্ধ হয়ে গেল আমাদের, বাইরের দিকে জুয়ান বা আমি কেউই আর তাকাতে পারছি না। কিন্তু কমোলোল স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রৌদ্রদগ্ধ, রুক্ষ মরুপথের দিকে, যে পথ আমাদের নিয়ে চলেছে সেই প্রাচীন নগরীতে। বেশ কয়েক ঘণ্টা অতিক্রম করার পর অবশেষে একসময় আমাদের কষ্ট শেষ হল, বিকালের দিকে মিস্টার কমোলোল বললেন, “ওই দেখুন, আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। আর মাত্র ঘণ্টা খানেকের পথ।”

তাকিয়ে দেখলাম অনেক দূরে দিকচক্রবালে অস্পষ্টভাবে যেন ফুটে আছে এক পিরামিডের মাথা। ক্রমশই তা স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল আমাদের চোখে। বেলা সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা এক প্রাচীন তোরণ অতিক্রম করে প্রবেশ করলাম এক খণ্ডহর নগরীতে।