Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ৫

সময় এগোবার সঙ্গে সঙ্গে রোদও চড়তে লাগল। এ পিরামিড থেকে ও পিরামিড ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মাঝে দু-একজন স্থানীয় মানুষ চোখে পড়ছে আমাদের। দূর থেকে তারা অদ্ভূত চোখে আমাদের দেখছে। ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একসময় আমরা এসে উপস্থিত হলাম তেজকাৎলিপোকা পিরামিডের কাছে। প্রায় চারশো ফুট উঁচু পিরামিডটা বিশাল এক চত্বরের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। পিরামিড সংলগ্ন চত্বরটা নিচু কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ঘেরা হয়েছে। সেখানে বেশ কিছু কর্মব্যস্ত লোকজন চোখে পড়ছে। কাঠের বালতিতে জল নিয়ে কেউ পিরামিডের ওপরে ওঠার সিঁড়ি ধুচ্ছে, কেউ বা চত্বর পরিষ্কার করছে ঝাঁট দিয়ে। তবে কোনো শোরগোল নেই। যেন যন্ত্রের মতো কাজ করে চলেছে ওরা। রাত নামলেই তো উৎসব।

ঘেরা জায়গার বাইরে দাঁড়িয়ে বিশাল পিরামিডের দিকে তাকিয়ে আমি প্রফেসরকে বললাম, “অ্যাজটেকদের সব মন্দিরেই কি বলি দেওয়া হত?” জুয়ান বললেন, “হ্যাঁ, প্ৰায় সব মন্দিরেই। আর তেজকাৎলিপোকা মন্দিরে তো অবশ্যই। তেজকাৎলিপোকা শব্দের অর্থই হল, ‘যে দেবতা কেবলমাত্র বলির রক্ত ভক্ষণ করেন।’ আমাদের সামনে যে পিরামিড দাঁড়িয়ে আছে তার সোপানশ্রেণি কত মানুষের রক্তে সিক্ত কে জানে? আসলে এ পিরামিড মন্দিরগুলো ছিল মশান। এত মানুষকে একসঙ্গে বলি দেওয়া হত যে অত উঁচু পিরামিডের গা বেয়ে রক্ত চুইয়ে ভূমি স্পর্শ করত।”

কথা বলছিলাম আমরা। হঠাৎ দেখি একজন মেসো-আমেরিকান পিরামিড চত্বর ছেড়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি কাছে আসার পর বুঝতে পারলাম তিনি আর কেউ নন, মিস্টার কমোলোল। ইউরোপীয় পোশাক ছেড়ে পুরোদস্তুর পালকের পোশাকে সজ্জিত তিনি। অদ্ভুত লাগছে তাঁকে দেখতে। ঠিক যেন ছবির বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো অ্যাজটেক। তাঁর কোমরে একটা ছুরিও ঝুলছে। তিনি আমাদের উদ্দেশে বললেন, “কী বেড়ানো কেমন হচ্ছে? রাতের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বলে আপনাদের সঙ্গ দেওয়া যাচ্ছে না, ক্ষমা করবেন।” প্রফেসর বললেন, “না না ঠিক আছে। ভালোই ঘুরছি আমরা। তা আপনার পরনে এ পোশাক কেন? রাতে কখন শুরু হবে অনুষ্ঠান?”

কমোলোল হেসে জবাব দিলেন, “আমিও তো খাঁটি অ্যাজটেক, তাই এই পোশাক। ঠিক মাঝরাতে আমি আপনাদের নিতে যাব। এ কথাটাই আপনাদের বলতে এলাম। আজ রাতের অনুষ্ঠানের অতিথি আপনারা।”

এরপর তিনি আর কথা বাড়ালেন না, আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে আবার চত্বরের দিকে ফিরতে শুরু করলেন। কিন্তু তিনি যখন বিদায় নিচ্ছেন তখন একটা জিনিস আমার চোখে পড়ল। ভদ্রলোকের ডান হাতের উন্মুক্ত বাহুতে বিরাট একটা সাপের উলকি আঁকা আছে। ঠিক ওরকমই সাপের ছবি খোদিত ছিল সেই ফ্লিন্ট পাথরের ছুরিতে। এর পরমুহূর্তেই আমার মনে পড়ল তিওতিহুকান পিরামিড চত্বরে সন্ধ্যাবেলা ছুরিটা ফেরত নিতে এসে মিস্টার কমোলোল সম্পর্কে বৃদ্ধের শেষ প্রশ্ন, “ওর হাতটা আপনারা লক্ষ করেছেন?”

কমোলোল চলে যাবার পর আমরা. আবার হাঁটতে শুরু করলাম অন্য দিকে। যেতে যেতে আমি প্রফেসরকে বললাম, “প্রাচীন অ্যাজটেকরা কি বাহুতে সর্প চিহ্ন আঁকত? কোমোলোল-র হাতে ওই দু-মুখওয়ালা সাপের উলকি দেখলাম। আপনি খেয়াল করেছেন?”

চলতে চলতে প্রফেসর হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন আমার কথা শুনে। তারপর বললেন, “না, খেয়াল করিনি, আশ্চর্য। ও উলকি কারা আঁকত জান? অ্যাজটেক পুরোহিতরা। সৃষ্টি আর ধ্বংসের প্রতীক দু-মুখওয়ালা সৰ্প আঁকা থাকত প্রত্যেক পুরোহিতের বাহুতে, যে বাহু নরবলির হৃৎপিণ্ড নিয়ে নিবেদন করত দেবতার উদ্দেশে।”

প্রফেসরের কথা শুনে নিজেরই অজান্তেই যেন চমকে উঠলাম আমি। বৃদ্ধ তাহলে কী বলতে চেয়েছিলেন?

জুয়ানও কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন এরপর। গভীরভাবে কী যেন ভাবতে ভাবতে হাঁটতে লাগলেন। আমরা আর এরপর কোথাও গেলাম না, সোজা আমাদের আস্তানার পথ ধরলাম।