তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ৭
৭
পিরামিডের ওপর মন্দিরের বিশাল দরজার সামনে আমাদের একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন কমোলোল। চাঁদের আলোতে কেমন যেন অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছে তার ঠোটের কোণে। তিনি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “কী, এ জায়গাতে এসে আপনাদের ভয় করছে নাকি?”
জুয়ান তাঁর গলার স্বর যতটা সম্ভব শান্ত রেখে বললেন, “না, ভয় করবে কেন? যদিও এখানকার পরিবেশটা একটু অদ্ভুত একথা মানতেই হয়।” কমোলোল-র মুখে এরপর বাঁকা হাসিটা আরও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রফেসরের উদ্দেশে তিনি যেন বিদ্রুপের সুরে বললেন, “আপনি তো স্পেনিয়ার্ড। বহু শতাব্দী আগে আপনার পূর্বপুরুষরাই ধ্বংস করে ছিল আমাদের সুমহান সভ্যতাকে। না, তার সব কিছু ধ্বংস করতে পারেনি কর্তেজরা। এখনও তার অনেক কিছু টিকে আছে। অ্যাজটেক জনগোষ্ঠীকে তারা বর্বর ভাবত, কিন্তু তাদের চেয়ে আসলে হাজার গুণে এগিয়ে ছিলাম আমরা। আমাদের সভ্যতার গূঢ় রহস্য অনুধাবন করার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না। আপনারা যে মূর্তি দেখতে যাচ্ছেন তার সামনে কর্তেজ এসে দাঁড়ালে ইতিহাসটাই ঘুরে যেত। এ মূর্তির সামনে দাঁড়াবার ক্ষমতা তাঁর ছিল না।”
এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, “যান, এবার আপনারা তেজকাৎলিপোকার বিগ্রহ দর্শন করে আসুন। ভিতরে ঢুকে পরপর তিনটে ঘর পার হবেন আপনারা। চতুর্থ ঘরেই আছে সেই বিগ্রহ। সেই ঘরের ভিতর লাল আভা দেখতে পাবেন। গর্ভগৃহ চিনতে অসুবিধা হবে না।” এই বলে তিনি দরজাটা দেখিয়ে দিলেন।
আমি তার উদ্দেশে বললাম, “আপনি যাবেন না আমাদের সঙ্গে?”
তিনি জবাব দিলেন, “অনুষ্ঠানের কাজ সবে শুরু হয়েছে, তা শেষ না হলে আমাদের কারও দেবদর্শন নিষেধ। আপনারা দেখে আসুন।” তাঁর কথা শোনার পর একটু ইতস্তত করে আমরা এগোলাম মন্দিরের দরজার দিকে।
মন্দিরের ভিতরটা অন্ধকার। অনেকদিন দরজা বন্ধ থাকায় বাতাসটা বেশ ভারি। প্রথম ঘরটা বেশ লম্বা। পাল্লার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের অস্পষ্ট আলোতে দেখতে পেলাম ঘরের দেওয়ালে খোদিত আছে ভয়ংকর সব মূর্তি। যুগ যুগ ধরে তারা পাহারা দিচ্ছে দেবতা তেজকাৎলিপোকাকে। দ্বিতীয় ঘরটাতে পৌঁছে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার এখানে, বাইরের আলো এ ঘরে আসছে না। কোনোরকমে হাতড়ে হাতড়ে সে ঘর অতিক্রম করে তৃতীয় ঘরে পৌঁছতেই ঘরের এক পাশে শেষ ঘরে যাবার পথটা দেখতে পেলাম আমরা। গর্ভগৃহের খোলা দরজা দিয়ে একটা লাল আভা বাইরে এসে পড়েছে। জুয়ান তা দেখে বললেন, “ওটাই তাহলে গর্ভগৃহ।”
আমরা এরপর সেদিকে পা বাড়াতে যাচ্ছি, ঠিক সেই সময় ঘরের অন্ধকারের মধ্যে থেকে চাপা স্বরে কে যেন বলল, “ওদিকে এগোবেন না।” কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে তাকাতেই দেখি ঘরের এক পাশ থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে অস্পষ্ট দুটো অবয়ব। তার একটা বাচ্চা ছেলের অন্যটা পূর্ণবয়স্ক মানুষের। আমাদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে উত্তেজিতভাবে বৃদ্ধ বললেন, “হাতে একদম সময় নেই। জীবনমৃত্যুর মাঝামাঝি জায়গাতে এখন আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন। যা বলছি তা চটপট করুন। কালো কাপড়গুলো এনেছেন তো। ওগুলো চোখে বেঁধে ফেলুন, তারপর গর্ভগৃহের ভেতর ঢুকে যে আপনাদের এখানে এনেছে তার উদ্দেশে বলুন, “বিগ্রহ আমাদের দেখা হয়ে গেছে। কত সোনা এখানে। আমরা কি কিছু নেব?” এমনভাবে চিৎকার করবেন যাতে বাইরে তার কানে সে শব্দ যায়। যতক্ষণ না সে ভিতরে আসছে ততক্ষণ তাকে ডাকতেই থাকবেন। আর গর্ভগৃহে চোখের কাপড় খুলবেন না। তাহলেই অবধারিত মৃত্যু। চটপট-চটপট…” তাড়া লাগল লোকটা
প্রফেসর জুয়ান তার কথা শুনে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাচ্চা ছেলেটা এবার বলে উঠল, “তোমরা ওর কথা না শুনলে বাঁচবে না। নীচের লোকগুলো হয়তো এখনই ওপরে উঠে আসবে।” উত্তেজনায় কাঁপছে বাচ্চাটার গলা।
আমরা আর কথা বাড়ালাম না। একটা অজানা আশঙ্কা আমাদের পেয়ে বসেছে। জুয়ানের পকেট থেকে ফেট্টি দুটো বের করে চোখে বেঁধে ফেললাম আমরা। এরপর সেই বৃদ্ধই আমাদের হাত ধরে গর্ভগৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়ালের মুখে মুখ করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। যদিও আমাদের চোখ বন্ধ তবু সে ঘরে কেমন যেন একটা অশুভ পরিবেশ অনুভব করলাম আমি।
এরপর সেই বৃদ্ধর কথামতো আমি চিৎকার করে উঠলাম, “মিস্টার কমোলোল, মূর্তি দেখা আমাদের হয়ে গেছে, কত সোনা! আমরা কি নেব?” আমার চিৎকার অনুরণিত হতে লাগল বদ্ধ পাথুরে ঘরগুলোতে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চিৎকার করার পর অবশেষে তার কানে শব্দ পৌঁছল। বাইরে থেকে তার বিস্ময়সূচক গলার স্বরও শোনা গেল, “কী, মুর্তি দেখা আপনাদের হয়ে গেছে? কী বলছেন আপনারা?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, হয়ে গেছে, কত সোনা এখানে…”
এরপর কিছু সময়ের নিস্তব্ধতা, তারপর মনে হল বাইরে থেকে একটা পায়ের শব্দ যেন একটার পর একটা ঘর অতিক্রম করে এগিয়ে আসছে আমাদের ঘরের দিকে। ওদিকে অন্য দুজনেরও কোনো সাড়া নেই। তারা মনে হয় কোথাও আত্মগোপন করে আছে। পায়ের শব্দ এসে দাঁড়াল গর্ভগৃহের দরজার বাইরে। তারপর স্পষ্ট শোনা গেল, কমোলোলর কণ্ঠস্বর, “আপনারা তো ঘরের ভেতর, সত্যিই আপনারা তাকে দেখতে পাচ্ছেন? সত্যি বলছেন!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ,আমরা তো তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছি। আপনি তো তাঁকে দেখার জন্য বললেন।”
আবার কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর সম্ভবত কমোলোল ঘরের মধ্যে পা রাখলেন। আর তারপরই প্রচণ্ড যন্ত্রণায় একটা ভয়ংকর চিৎকার বেরিয়ে এল তার গলা থেকে। কী যেন একটা মাটিতে ছিটকে পড়ল! কমোলোল-র চিৎকার, নানা রকম শব্দ ভেসে উঠল চারিদিকে। আমি আর জুয়ান শক্ত করে ধরে আছি পরস্পরের হাত। সেই গোলমালের মধ্যেই সেই বৃদ্ধের হাত আমার দেহ স্পর্শ করল। তিনি বললেন, “চলুন, এবার এ ঘরের বাইরে চলুন।”
তার হাত ধরে সে ঘরের বাইরে পা রাখতেই আমাদের চোখের পর্দা সরিয়ে দিলেন তিনি। দেখলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য—কমোলোল গর্ভগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে অন্ধকার ঘরের মধ্যে চিৎকার করে ঘুরপাক খাচ্ছেন! যেন তিনি খুঁজছেন বাইরে যাবার রাস্তা। চিৎকার করতে করতে বারবার পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছেন তিনি। উনি কেন এমন করছেন তা কিছুই বুঝতে পারছি না আমরা। দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে একসময় তিনি বাইরে যাবার রাস্তা পেলেন, তারপর অন্য ঘর দুটো অতিক্রম করে মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলেন, আর তার পিছন পিছন আমরা চারজনও নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চাঁদের আলোতে মন্দিরের সামনে ছোট্ট পাথুরে চত্বরে অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে ছোটাছুটি করতে লাগলেন কমোলোল। যেন আমাদের প্রতি তাঁর দৃষ্টি নেই। হঠাৎ একটা কাণ্ড হল। প্রফেসর জুয়ান হঠাৎ সেই বৃদ্ধর উদ্দেশে বলে উঠলেন, “উনি এরকম করছেন কেন?”
বৃদ্ধ কোনো জবাব দিলেন না। কিন্তু কথাটা মনে হল কানে গেল কমোলোল-র। মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর কোমর থেকে একটা ছুরি খুলে নিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় আক্রোশে চিৎকার করে ছুটে এলেন আমাদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বাঁচাতে ছিটকে সরে গেলাম আমরা। ছুরি হাতে আমাদের পাশ দিয়ে হাওয়া কেটে প্রচণ্ড জোরে ছুটে বেরিয়ে গেলেন কমোলোল, কিন্তু চত্বরের কিনারে এসে তিনি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না, একটা আর্ত চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে তার দেহটা মিলিয়ে গেল বাতাসে। ওপর থেকেও আমরা শুনতে পেলাম তার দেহ মাটিতে আছড়ে পড়ার শব্দ আর তার পরক্ষণেই নীচে প্রতীক্ষারত সমবেত জনতার উল্লাস। বলি গ্রহণ করেছেন দেবতা তেজকাৎলিপোকা!
সেই বৃদ্ধ এবার বললেন, “চলুন, এবার আমাদের পালাতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে নীচের লোকগুলোর ভুল ভেঙে যাবে, আমাদের ধরতে ওপরে উঠে আসবে ওরা।” এই বলে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে আবার মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করলেন বৃদ্ধ। আমরা তাদের অনুসরণ করলাম। দ্বিতীয় ঘরটায় ঢুকে অন্ধকার হাতড়ে একটা মশাল কোথা থেকে এনে জ্বালিয়ে ফেলল বাচ্চাটা। আলোকিত হয়ে উঠল ঘর। ঘরের এক কোনায় রাখা আছে বীভৎস এক মূর্তি। সে মূর্তি যেন মুর্তিমান জিঘাংসার প্রতীক। তার দত্তশোভিত বিরাট মুখগহ্বর যেন গিলে খেতে আসছে আমাদের। অন্ধকারের জন্য আমরা আগে খেয়াল করিনি এ মূর্তি। বেশ কিছু নর করোটিও ছড়িয়ে আছে মূর্তির বেদির কাছে। সেই বৃদ্ধ এবার তার পোশাকের ভিতর থেকে সেই ফ্লিন্ট পাথরের ছুরি বের করে তুলে দিলেন বাচ্চা ছেলেটার হাতে। ছেলেটা এগিয়ে গিয়ে সেই ছুরিটা দিয়ে মূর্তির বক্ষে একটা ছিদ্রে চাবির মতো ঘোরাতেই ঘড় ঘড় শব্দে ফাঁক হয়ে গেল মেঝের কিছুটা অংশ। মশালের আলোতে আমাদের চোখে পড়ল সার সার সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে। বৃদ্ধ বললেন, “এই পথেই মন্দিরে প্রবেশ করেছি আমরা। ওই পথেই আমাদের যেতে হবে।”
প্রফেসর বললেন, “কিন্তু কোথায় যাব আমরা?”
বৃদ্ধ বললেন, “এই পিরামিড থেকে অনেক দূরে। চলুন, এখন আর কথা বলার সময় নেই। ওরা নীচ থেকে ওপরে উঠে এল বলে। শব্দ শোনা যাচ্ছে।”
আমরা এবার শুনতে পেলাম সত্যিই জনতার কলরব। পিরামিডের গায়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। তাদের পদধ্বনি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
বৃদ্ধ এবার ছেলেটার কাঁধ ধরে সেই গহ্বরে প্রবেশ করলেন। আর তাকে অনুসরণ করলাম আমরা। একের পর এক কক্ষ, সুড়ঙ্গ, সিঁড়ি পার হয়ে তাদের পিছন পিছন আমরা ছুটতে থাকলাম। আমাদের সে পথে কত অদ্ভুত জিনিস যে চোখে পড়ল তার হিসেব নেই। বীভৎস সব মূর্তি। তাদের সব কিছুর ভয় বা প্রলোভন উপেক্ষা করে ছুটে চললাম আমরা। বাচ্চা ছেলেটাই যেন পথ প্রদর্শক। তার কাঁধ ছুঁয়ে বৃদ্ধ আর তার পিছনে আমরা। ঘণ্টখানেক ছোটার পর অবশেষে একসময় আমরা সুড়ঙ্গ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম চন্দ্রালোকিত উন্মুক্ত প্রান্তরে।
