তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ৮
৮
একটা পাথরের ওপর বসে ছিলাম আমরা। আমাদের সামনেই বসে আছে সেই বৃদ্ধ আর বাচ্চা ছেলেটা। বৃদ্ধর টুপিটা আগেকার মতোই তার মুখমণ্ডলের ওপরের অংশকে ঢেকে রেখেছে। চাঁদের আলোতে বেশ রহস্যময় দেখাচ্ছে তাকে। বাচ্চাটা তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। আমাদের আশেপাশে আর কোনো পিরামিড চোখে পড়ছে না। মনে হচ্ছে সেই প্রাচীন নগরীকে আমরা অনেক দূরে ফেলে এসেছি। বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর প্রফেসর জুয়ান সেই বৃদ্ধর উদ্দেশে বললেন, “আপনি এবার আমাদের সব কথা খুলে বলুন। এখানকার কোনো ঘটনাই তো বোধগম্য হল না। আপনি একজন ইউরোপীয় বলেই আমাদের ধারণা। আপনি এখানে কী করছেন?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বৃদ্ধ বললেন, “তাহলে প্রথমে আমার কাহিনিটাই আপনাদের আমি সংক্ষেপে বলি।”
একটু দম নিয়ে বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন, “আপনাদের ধারণাই ঠিক, আমি একজন ইউরোপীয়, নাম রিচার্ড বার্টন। ইংল্যান্ডের বাসিন্দা। পেশায় আমি ছিলাম ইঞ্জিনিয়ার। প্রাচীন স্থাপত্য নিয়ে আমার ভীষণ আগ্রহ ছিল। সে বিষয় নিয়ে আমি পড়াশোনা করতাম। বছর তিরিশ আগে আমি আর আমার স্ত্রী প্রাচীন স্থাপত্যের জাদুঘর মেক্সিকোতে পদার্পণ করি। এখানে আসার পর লাল মানুষদের কীর্তিগুলো দেখে আমার মনে এক প্রশ্নের উদয় হয়। প্রাচীন এক অর্ধসভ্য জাতি, যারা আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার জানত না, লোহার ব্যবহার জানত না, তারা কীভাবে বিশাল পাথর কেটে মন্দির-মূর্তি রচনা করল? তাহলে তাঁদের কাছে কি এমন কোনো কিছু ছিল যা দিয়ে সহজেই পাথর কাটা যায়? এ প্রশ্নের উদয় হতেই তার উত্তরের সন্ধানে নেমে পড়লাম আমি। এখানকার বিখ্যাত লাইব্রেরি, মিউজিয়ামগুলোতে স্থাপত্য সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য ঘুরতে লাগলাম আমি। একদিন একটা বইতে এক অদ্ভুত তথ্য পেলাম। কয়েকশো বছরের প্রাচীন বইতে লেখা ছিল, ‘প্রাচীন মন্দির নগরীর তেজকাৎলিপোকা পাথরও গলিয়ে দিতে পারেন।’ একথাটা আমার কাছে খুব ইঙ্গিতবাহী মনে হল। কিন্তু, প্রাচীন মন্দিরময় নগরী তো এখানে অনেক আছে। অ্যাজটেকদের রাত্রি ও জাদুবিদ্যার দেবতা কোন প্রাচীন নগরীতে অবস্থান করছেন তা জানব কীভাবে? খুঁজতে লাগলাম আমি। এ পরিশ্রমের ফল মিলল। একদিন তিওতিহুকান পিরামিড চত্বরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল পেশায় ডাক্তার এক ভদ্রলোকের। সে ভদ্রলোক বললেন, সে মূর্তির খবর জানা আছে তার। তিনি আমাকে সেখানে নিয়ে যাবেন। সে ভদ্রলোকের হাতেও আঁকা ছিল সাপের উলকি। যদিও তার সঠিক অর্থ আমার তখনো জানা ছিল না। তা জানা থাকলে হয়তো সতর্ক হতাম। যাইহোক তার সঙ্গে আজ থেকে আঠারো বছর আগে অ্যাজটেক ক্যালেন্ডারের শেষ দিন আমরা উপস্থিত হলাম মন্দির নগরীতে। রাতে নগরীতে উৎসব হবে। সেই ভদ্রলোক আমাদের দেখাবেন সেই মায়ময় মূর্তি, জাদুর দেবতা তেজকাৎলিপোকা, যিনি পাথর গলাতে পারেন।
সারাদিন তাকে দেখার জন্য প্রতীক্ষা করলাম আমি। রাতে সে লোক এল। ওই মন্দিরে নাকি স্ত্রীলোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ, তাই আমি একলাই হাতে সাপ আঁকা লোকটার সঙ্গে উঠলাম পিরামিডের ওপর। আজকের মতো সেদিনও নীচে প্রতীক্ষা করছিল সমবেত জনতা। সে লোকটা নিজে মন্দিরে না ঢুকে যেমন আপনাদের কমোলোল নির্দেশ দিয়েছিল তেমনই আমাকে বলল, বিগ্রহ দর্শন করে আসার জন্য। সরল বিশ্বাসে আমি পৌঁছে গেলাম পিরামিডের ওপর মন্দিরের গর্ভগৃহে। মুহূর্তের জন্য আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম সেই বীভৎস মূর্তি। আর তারপরই….।” কথা থামিয়ে কেঁপে উঠলেন ভদ্রলোক।
আমি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম, “তারপর কী হল?”
আমার প্রশ্নের উত্তরে ভদ্রলোক তার টুপিটা সরিয়ে নিলেন। চাঁদের আলো এসে পড়ছে তার মুখে। আমি দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের চোখের মণি দুটো সম্পূর্ণ সাদা! তিনি দৃষ্টিহীন।
আমি শিউরে উঠে বললাম, “তার মানে আমাদেরও কি এখানে দৃষ্টিহীন করার জন্য আনা হয়েছিল?”
বৃদ্ধ বললেন, “হ্যাঁ। প্রথমে আপনাদের দৃষ্টিহীন করে, তারপর ফ্লিন্ট পাথরের ছুরি দিয়ে বলি দেওয়া হত। আমি অবশ্য সেবার বেঁচে গেছিলাম আমার দৃষ্টি হারিয়ে যাবার পরমুহূর্তেই দৈবক্রমে ভূমিকম্প হয়েছিল। ওরা ভয় পেয়ে গেছিল। রাত শেষ হয়ে ‘শূন্য মাস’ পড়ে যাওয়াতে বেঁচে যাই আমি। দেবতার প্রত্যাখাত ব্যক্তিকে বলি দেওয়া হয় না। তারপর থেকে এখানেই ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি।”
আমি জানতে চাইলাম, “আচ্ছা ওই দেবতার চোখে কী আছে?”
বৃদ্ধ জবাব দিলেন, “সম্ভবত লেসার রশ্মি জাতীয় কিছু, যা দিয়ে পাথর কাটত ওরা। এখানকার লোকরা তাই মূর্তির সামনে যায় না। কমোলোৎলও কোনোদিন যায়নি ওর সামনে আপনাদের কথা শুনে কমোলোল ফাঁদে না পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু ছিল আপনাদের। দরজার সামনে দাঁড়াতেই আমি ওকে ঠেলে দিয়েছিলাম ঘরের ভেতর। ধর্মীয়ভাবে ও খুব হিংস্র ছিল। নিজের হাত কেটে নিবেদন করেছিল দেবতাকে। এখানকার অনেকেই অঙ্গ নিবেদন করে দেবতাকে।” বৃদ্ধর কথা শুনে আমার মনে পড়ে গেল কমোলোৎলের অঙ্গহীন সঙ্গীদের কথা।
প্রফেসর জুয়ান বললেন, “আপনি এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করেননি?”
বৃদ্ধ বললে, “সর্বত্র ওরা আছে। পালানো কি সহজ? এই ছেলেটাকে ওরা এখানে ধরে এনেছিল বলি দেবার জন্য। বহু বছর পর এই ছেলেটার সাহায্যে আমার স্ত্রীকে নিয়ে তিওতিহুকান পর্যন্ত পালাতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি। সেখানেই তো ঘটনাচক্রে আপনাদের সঙ্গে আমাদের দেখা। কিন্তু আমার স্ত্রী ধরা পড়ে গেলেন। আমাদের আবার ফিরে আসতে হল এখানে। কিন্তু তাকে শেষপর্যন্ত আমি বাঁচাতে পারলাম না। ওরা অনেক আগেই তার জিভ কেটে দিয়েছিল। বিকালে তারা ওকে পালকভূষিত সর্পদেব কোয়েৎজালের মন্দিরে বলি দিয়ে তার দেহ নিয়ে এসেছিল তেজকাৎলিপোকার মন্দিরে ধর্মাচারের জন্য।”
তাঁর কথা শুনে চমকে উঠলাম আমি। বুঝতে পারলাম আমাদের সঙ্গে আসা সেই ইউরোপীয় ভদ্রমহিলাই হলেন তাঁর স্ত্রী।
রাত শেষ হয়ে আসছে। শুকতারা ফুটে উঠেছে। ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনারা এবার এগোন। উত্তরে কিছুটা এগোলেই হাইওয়ে পাবেন। সেখানে গাড়ি চলাচল করে। সভ্য শহরে ফিরে যেতে পারবেন আপনারা। আমি যাব দক্ষিণে, এই ছেলেটার গ্রামে। আর এটা আপনারা রাখুন,” এই বলে তিনি ফ্লিন্ট পাথরের ছুরিটা এগিয়ে দিলেন আমাদের দিকে। আমি ছুরিটা নিলাম।
বাচ্চা ছেলেটা একবার আমাদের দিকে হাত নেড়ে বৃদ্ধকে নিয়ে অন্য দিকে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্ত তাদের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধের নির্দেশ মতো আমরাও হাঁটতে লাগলাম উত্তরমুখী। আমাদের অনেক পিছনে পড়ে রইল তেজকাৎলিপোকার পিরামিড।
