ম্যামথের খোঁজে – ৪
৪
আর গাড়ি যাবে না। পরদিন ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সেই উন্মুক্ত জমিতে যাত্রা শুরু করল তারা। সঙ্গে জিনিসপত্র বলতে হালকা একটা তাবু, শুকনো খাবার, পানীয় জল আর রাইফেল। এছাড়াও লুমানি সঙ্গে নিল তার নিজস্ব জিনিপত্রগুলো। জমিটা মসৃণ নয়, আফ্রিকার প্রখর সূর্য মাটিটাকে চৌচির করে ফাটিয়ে রেখেছে। কোথাও পড়ে আছে জমাট বেঁধে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যাওয়া মাটির ঢেলা। তাছাড়া ধুলো তো আছেই। চলতে লাগল সুদীপ্তরা। মাঝে মাঝে তারা দূরবিন দিয়ে দেখতে লাগল সেই কালো বিন্দুগুলোকে। তারাও এগোচ্ছে, কিন্তু এগোচ্ছে খুব মন্থর গতিতে। সুদীপ্তদের যাত্রাপথে চোখে পড়তে লাগল ধূলোর ওপর হাতির পদচিহ্ন, তাদের পায়ের চাপে গুঁড়ো হয়ে যাওয়া মাটির ঢেলা। তিনটে সঞ্চারণশীল কালো বিন্দু ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে লাগল। এক সময় খালি চোখেই দেখা যেতে লাগল তাদের। ঘণ্টা চারেক চলার পর হাতিগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে গেল তারা। বড় হাতিটার কলেবর দেখে অবাক হয়ে গেল সুদীপ্ত আর হেরম্যান। তার রাজা হাতি নামকরণ সার্থক। এর আগেও আফ্রিকাতে এসে অনেকবার হাতি দেখেছে তারা। কিন্তু এত বড় হাতি কোনোদিন দেখেনি। উচ্চতায় অন্তত সে তের ফুট হবে। দাঁত দুটো প্রায় মাটি ছুঁয়ে অগ্রভাগটাকে ঈষৎ গুটিয়ে নিয়েছে। যেন সে চলমান একটা পাহাড়। আর তার সঙ্গী রক্ষী হাতি দুটোও আকারে অন্তত দুশ ফুট হবে। তাদের দাঁতের আকৃতিও বিশাল। যে দাঁত দিয়ে কোনো মানুষকে তুলে নিয়ে শূন্যে লোফালুফি খেলতে পারে। অজগর সাপের মতো শুঁড়গুলো যে কোনো প্রাণীকে টেনে দু-টুকরো করতে পারে। উপরে ফেলতে পারে কোনো গাছকে!
লুমানি বলল ‘দেখলেন তো আমি কি বলেছিলাম?’
হেরম্যান বললেন “সত্যি এটা রাজা হাতি “মফালম টেম্বো!”
লুমানি বলল ‘আমরা এখন যে দূরত্বে আছি সেই দূরত্বেই ওদের অনুসরণ করব। এর চেয়ে কাছে গেলে ওদের চোখে পড়ে যেতে পারি। আর কখনও যদি ওরা ফিরে দাঁড়ায় তবে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়বে। তবে এখন ওদের দিক থেকে আমাদের দিকে বাতাস বইছে। চট করে ওরা আমাদের উপস্থিতি টের পাবে না।’—এ কথা বলে সে মুখোশটা মাথা থেকে টেনে মুখ ঢেকে নিল। সুদীপ্ত জানতে চাইল ‘তুমি মুখোশ পরলে কেন?’
লুমানি বলল ‘এটা জাদু মুখোশ, এটা পরলে কোনো বিপদ আসে না।’
আফ্রিকান উপজাতিদের নানারকম সংস্কার থাকে। তাই সুদীপ্ত আর কথা বাড়াল না। অত্যন্ত মন্থর গতিতে চলছে সেই হস্তিযূথ। কখনও বা তারা দাঁড়িয়ে পড়ছে। আস্কারি হাতি দুটো মাটি থেকে শুঁড়ে করে ধুলো তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে তাদের রাজার গায়ে। কখনও আবার নিজেরাও মাখছে। লুমানি বলল ‘ওরা গায়ে ধুলো মাখে সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার জন্য। ধুলোর আস্তরণ থাকলে রোদের তাপ সরাসরি চামড়া স্পর্শ করে না।’ সত্যিই খুব গরম। ঘামে পোশাক ভিজে যাচ্ছে সুদীপ্তদের। মাঝ দুপুরে পথে একটা ডোবা মতো পড়ল। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে জলপান করল। তারপর আবার এগোল তাদের যাত্রাপথে।
কিন্তু এরপরই চলতে চলতে হাতিগুলো পিছন ফিরে তাকাতে শুরু করল। মাটিতে শুয়ে পড়তে লাগল সুদীপ্তরা। হেরম্যান, লুমানিকে জিজ্ঞেস করলেন ‘ওরা কি আমাদের উপস্থিতি অনুমান করেছে?’
লুমানি বলল ‘ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে ওদের আচরণে পরিবর্তন ঘটেছে।’
এভাবে আরও কিছুক্ষণ এগোবার পর সেই হস্তিযূথেরা হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পরে ধীরে ধীরে পিছন ফিরল। সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ল সুদীপ্তরা। একটা আস্কারি হাতি তার শুঁড়টাকে সাপের ফনার মতো আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে একটা ডাক ছাড়ল। হ্যাঁ, তারা কিছু দেখেছে! তারা কি সুদীপ্তদের দেখে ফেলেছে? যথা সম্ভব মাটির সাথে মিশে গিয়ে নিজেদের আত্মগোপন করার চেষ্টা করতে লাগল সুদীপ্তরা। ওই মহামাতঙ্গরা তাদের দিকে ছুটে এলে এই উন্মুক্ত জমিতে পালাবার পথ নেই। কিন্তু হাতিগুলো তা করল না। তারা আবার ঘুরে দাঁড়াল। তারপর যেন বেশ দ্রুতগতিতে এগোতে শুরু করল।
মাটি থেকে উঠে দাঁড়াবার সময় হঠাৎই পিছনে নজর গেল হেরম্যানের। তিনি বলে উঠলেন ওটা কি?
উঠে দাঁড়িয়ে সুদীপ্ত আর লুমানি হেরম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পিছনে তাকাল। সুদীপ্তরা দেখতে পেল যে পথ দিয়ে তারা এসেছে সে পথে দূর থেকে একটা ধুলোর ঝড় যেন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।
লুমানি বলল ‘এবার বুঝতে পারছি টেম্বোগুলো ঘুরে দাঁড়াবার পর আবার এমনভাবে দ্রুত এগোচ্ছে কেন? ওটাই ওরা দেখেছে। সম্ভবত ওটা একটা গাড়ি!’
সেই ধুলোর ঝড়ের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সুদীপ্তরা। আর রাজা হাতি তার দেহরক্ষীদের নিয়ে সোজা ছুটতে শুরু করল তাদের পথে।
সেই ধুলোর ঝড় যখন তাদের সামনে এসে দাঁড়াল তখন হাতির দল বেশ অনেকটা দূরে সরে গেছে।
হ্যাঁ, একটা গাড়ি। হুড খোলা একটা ল্যান্ড রোভার। তার চালকের আসনে বসে মাসাই গ্রামের সেই গাইড বারকিন আর একজন শ্বেতাঙ্গ। তার কোলে রাখা আছে একটা রাইফেল।
সুদীপ্তরা তাদের দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নামল সেই শ্বেতাঙ্গ আর বারকিন বলে লোকটা। সুদীপ্তরাও কয়েক পা এগিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। বারকিন দেঁতো হেসে বলল ‘এই বাওয়ানা হাতি শিকার করতে এসেছে। তাই এদিকে আসতে হল।’
মাঝবয়সি শ্বেতাঙ্গ লোকটা হেরম্যানের দিকে করমর্দনের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন ‘আমার নাম রজার্স ফাউলিং। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ নাগরিক, আর বর্তমানে কর্মসূত্রে থাকি নাইরোবিতে। শিকারের শখ আছে। হাতি শিকার করতে এসেছি। আপনারা?’
হেরম্যান এবার তার আর সুদীপ্তর নাম ঠিকানা বললেন।
ফাউলিং-এরপর কোনো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই লুমানি মুখের ওপর থেকে মুখোশটা সরিয়ে নিয়ে বারকিনকে বলল ‘হাতি শিকারের জন্য বাওয়ানাকে তুমি এদিকে আনলে কেন? হাতি তো আমাদের ওদিকেই বেশি আছে।’ বারকিন কথাটা শুনে ধূর্ত হেসে বলল ‘কারণ, তোমার ওই বুড়ো হাতিটা এদিকেই এসেছে। বাওয়ানা হাতি শিকারের জন্য ফার্স্টক্লাস পাশ পেয়েছে। তেমন হাতি তো এই একটাই আছে। ফার্স্ট ক্লাস পারমিট যখন তখন বাওয়ানা অন্য হাতি শিকার করবে কেন?’
কথাটা শুনেই চমকে উঠল সুদীপ্তরা। হাতি শিকারের জন্য তিন ধরনের পাশ বা পারমিট দেওয়া হয় এখানকার সরকারি দপ্তর থেকে। একশ পাউন্ড এক একটা দাঁতের ওজন পর্যন্ত নরমাল বা থার্ডক্লাস পারমিট, একশ থেকে দেড়শ পাউন্ড ওজনের জন্য সেকেন্ড ক্লাস। আর যে সব হাতির দাঁতের ওজন দেড়শ পাউন্ডের বেশি সেই সব মহামাতঙ্গ শিকারের জন্য ফার্স্ট ক্লাস পাশ। অর্থাৎ এই শ্বেতাঙ্গ শিকারীর লক্ষ সেই রাজা হাতি!
ফাউলিং বললেন “হ্যাঁ, ফার্স্ট ক্লাস পাশ আছে আমার কাছে। পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করার পর আমি এ পাশ পেয়েছি। দ্বিতীয়বার হয়তো এ পাশ পাব না।”
বারকিন এবার লুমানিকে প্রশ্ন করল ‘কিন্তু তুমি বাওয়ানাদের এদিকে এনেছ কেন? কয়েক মুহূর্তর জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল সবার মধ্যে। ওর লুমানিই বুদ্ধি করে ব্যাপারটা সামাল দিল। সে বলল ‘আমরাও এদিকে এসেছি ওই হাতিটা শিকারের জন্যই। আমার বাওয়ানাদের কাছেও ফার্স্ট ক্লাস পাশ আছে।’
কথাটা শুনে বারকিন হেরম্যানকে বলল ‘তোমাদের তো আমি টুরিস্ট ভেবেছিলাম। তোমরা যে শিকারী তা বলনি তো?’ বাধ্য হয়ে হেরম্যানকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল। তিনি বললেন ‘বলার প্রয়োজন হয়নি তাই বলিনি।”
ফাউলিং ও লুমানি আর হেরম্যানের কথা শুনে বিস্মিতভাবে বললেন “কিন্তু সরকারি দপ্তর থেকে ওরা যে আমাকে বলল যে একটা ফার্স্ট ক্লাস পাশ এবার আমাকেই দেওয়া হয়েছে।
যতক্ষণ না সেই রাজা হাতি আর তার সঙ্গী দুজন সেই কবরখানায় পৌঁছচ্ছে ততক্ষণ তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হেরম্যান তাই বললেন আপনি ঠিকই শুনেছেন। তবে এটা স্পেশাল পাশ। নাইরোবিতে আমার এক বন্ধু থাকেন। সরকারি উঁচু মহলে তার জানাশোনা। সেই জোগাড় করে দিয়েছে পাশটা।’
কথাটা শুনে ফাউলিং উষ্মাপ্রকাশ করে বললেন ‘যে পাশের জন্য আমাকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হল সে পাশ আপনি এত সহজেই পেয়ে গেলেন পিছনের দরজা দিয়ে! এ জন্যই এ দেশের এমন দুরবস্থা! এখন আমরা দু-দলই একটা হাতির পিছনেই ধাওয়া করব নাকি?”
সুদীপ্ত হেসে বলল ‘আমরাই কিন্তু আগে পিছু ধাওয়া করেছি হাতিটার।
ফাউলিং বললেন ‘তা করেছেন ঠিকই কিন্তু ওই হাতিটাকে শিকার করার অধিকার আমারও আছে। আগে কার শিকারের অধিকার তা নিশ্চয়ই পারমিটে লেখা নেই?
সুদীপ্ত বলল ‘আবারও বলছি আমরা কিন্তু আগে এদিকে এসেছি। হাতিটাকে মারার নৈতিক অধিকার কিন্তু আমাদেরই! বারকিন বলল জঙ্গলে কিন্তু নৈতিক অধিকার চলে না। জোর যার মুলুক তার এই নিয়মই চলে। আমার বাওয়ানা যা ঠিক করবেন তাই হবে।’
ফাউলিং সুদীপ্তদের উদ্দেশে বলল ‘আপনাদের সাহস দেখে আমি আশ্চর্য হচ্ছি! এই উন্মুক্ত ভূমিতে আপনারা পায়ে হেঁটে হাতি শিকার করতে বেরিয়েছেন। ওরা যদি আপনাদের তাড়া করে তখন কোথায় পালাবেন? তাছাড়া আপনাদের বন্দুকগুলো দেখে মনে হচ্ছে ও বন্দুকে হরিণ-অ্যান্টিলোপ বা চিতা শিকারের উপযোগী হলেও ওই অস্ত্র হাতি শিকারের জন্য যথার্থ নয়। নির্ঘাত বিপদে পড়বেন আপনারা। তার চেয়ে বরং সুযোগটা আমিই সফল ভাবে কাজে লাগাতে পারি।’ হেরম্যান বললেন ‘বিপদ তো সবার জীবনেই হঠাৎ আসতে পারে। হয়তো আপনি হাতির কাছাকাছি পৌঁছে গুলি চালালেন কিন্তু রাইফেল থেকে গুলি বেরোল না বা লক্ষভ্রষ্ট হলেন আপনি। অথবা আপনাকে যখন হাতি তাড়া করল ঠিক তখনই আপনার গাড়ির এঞ্জিন থেমে গেল। বিপদ অকস্মাৎ বজ্রপাতের মতোই মানুষের জীবনে নেমে আসে। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে বিবাদ করি তবে লাভ তো হবেই না, উভয় পক্ষের ক্ষতিও হতে পারে। তার চেয়ে বরং কোন সমাধান সূত্রে আসা যাক।”
ফাউলিং বললেন “কি সমাধান সূত্র?’
হেরম্যান বললেন ‘আমরা আগে হাতিটাকে মারার চেষ্টা করি তারপর আপনারা।’ ফাউলিং একটু ভেবে নিয়ে হেসে বললেন ‘আপনাদের যা অবস্থা দেখছি তাতে উলটো ব্যাপারটাই না ঘটে। আপনারাই হয়তো শিকার হলেন তাদের। হয়তো আপনাদের দেহগুলো আমাকেই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হল। ঠিক আছে আরও একটা দিন সময় পাবেন আপনারা। কাল সূর্যাস্তের মধ্যে আপনারা যদি হাতিটাকে মারতে না পারেন তবে পরশু সকাল থেকে আমি তাদের পিছু ধাওয়া করব। কাল সূর্যাস্তের সময় আপনারা যেখানে পৌঁছবেন সেখানেই আপনারা থেমে যাবেন। যদি আপনারা বেঁচে থাকেন তবে হাতিটা শিকার করে দাঁত দুটো কেটে নেবার পর আমার গাড়িতে আপনাদের অবশ্যই তুলে নেব। কাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত এখানেই তাঁবু গাড়লাম আমরা।’
হেরম্যান তার কথার প্রত্যুত্তরে বললেন আমাদের প্রথম সুযোগ দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। এবার তবে চলি। আমাদের হাতে সময় কম।’
বারকিন এবার লুমানির উদ্দেশ্যে কটাক্ষ করে সুদীপ্তদের উদ্দেশ্যে বলল “তোমরা যার সাথে যাচ্ছ সে জন্য তোমাদের জন্য চিন্তা রইল। সাবধানে থেক।’
সুদীপ্ত তার কথার জবাবে বলল ‘তোমার পরামর্শর জন্য ধন্যবাদ। হয়তো আবার দেখা হবে তোমাদের সাথে।’
আবার হাঁটতে শুরু করল সুদীপ্তরা। সেই মাতঙ্গর দল ততক্ষণে তাদের দৃষ্টি পথের বাইরে চলে গেছে।
কিছুটা এগোবার পর হেরম্যান বললেন ‘মিথ্যা কথা বলতে আমার খারাপ লাগল ঠিকই, কিন্তু এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ওই মফালম টেম্বোকে তো বাঁচাতে হবে।’
সুদীপ্ত এবার লুমানিকে বলল ‘তোমাদের গ্রামের বারকিন কিন্তু পরশু রাতে আমাদের ল্যান্ড রোভোরে দেখা করতে এসেছিল তাকে গাইড হিসাবে নিয়োগ করার জন্য। যদিও সে আমাদের সাধারণ টুরিস্টই ভেবেছিল।’
কথাটা শুনে লুমানি বলল, ‘ওই হল আসল শয়তান। হাতির দাঁত আর সিংহর চামড়ার চোরা চালানের জন্য বেশ কয়েকবার জেল খেটেছে বারকিন। গ্রামের লোকেরা ওকে ভয় পায় বলে গ্রাম থেকে তাড়াতে পারে না।’
সুদীপ্ত বলল ‘কিন্তু এখন কী হবে। আমাদের হাতে সময় আছে কাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত। পরদিন সকালেই হয়তো ওরা গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যাবে। তারপর?’
লুমানি বলল ‘আজ নিয়ে চারদিন হল টেম্বোরা যাত্রা শুরু করেছে। পরশু বিকাল নাগাদ তাদের বাঁশ বনে পৌঁছে যাবার কথা। সেখানে পৌঁছলে অবশ্য তাকে মারা অত সহজ হবে না, কিন্তু পরশু দুপুর নাগাদই হয়তো ওরা ধরে ফেলবে টেম্বোগুলোকে। যাতে তার আগেই তাদের বাঁশ বনের ভিতর প্রবেশ করানো যায় সে চেষ্টা করতে হবে।’
সুদীপ্ত জানতে চাইল ‘কিন্তু কী ভাবে?’
লুমানি জবাব দিল ‘ভেবে দেখি, কী উপায় বার করা যায়?’
আবার চলতে থাকল তারা।
সূর্য তখন প্রায় অস্ত যেতে বসেছে। ঠিক সেই সময় আবার সেই হস্তিযুথের দর্শন পেল তারা। বেশ অনেকটা পথ দৌড়ে এসে সূর্য অস্ত যাচ্ছে দেখে থেমেছে হাতিগুলো। তাদের সাথে নিরাপদ দূরত্ব রেখে সুদীপ্তরাও থামল। দিনের শেষ আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। সেই আলোতে ফুটিফাটা ঘাসহীন এই রুক্ষ প্রান্তরকেও যেন আশ্চর্য সুন্দর মনে হচ্ছে। ধুলোখেলা শুরু করল হাতিগুলো। চোখে দুরবিন লাগিয়ে সুদীপ্তরা সে দৃশ্য অনুভব করতে লাগল। এক সময় সূর্য ডুবে গেল এই নিঃসঙ্গ প্রান্তরের বুকে। চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই তিনটে কালো অবয়ব। সুদীপ্তরা তাবু খাটিয়ে ফেলল। আগুন জ্বালানো যাবে না। হাতিগুলোর চোখে পড়তে পারে অগ্নিশিখা। আর আগুন জ্বালাবার কোনো উপকরণও মজুত নেই। কোনো গাছপালা নেই কোথাও। তাঁবু খাটাবার পর সুদীপ্তরা খেতে বসল। তাদের খাওয়া যখন শেষ হল তখন মাথার ওপর চাঁদ উঠতে শুরু করেছে। সেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে হেরম্যান বললেন ‘মনে হয় আর দু-তিন দিন বাদেই পূর্ণিমা।’
লুমানি বলল ‘আমি যেদিন হাতিদের কবরখানার দরজায় পৌঁছে ছিলাম সেদিনও পূর্ণিমা ছিল! হয়তো বা পূর্ণিমার রাতেই সেখানে পৌঁছয় টেম্বোরা। প্রেত হাতিরা তাদের ভিতরে নিয়ে যায়। সেই হিসাব মতোই যাত্রা শুরু করে টেম্বোরা, যাতে পূর্ণিমার রাতে তারা সেখানে পৌঁছতে পারে।’
হেরম্যান বললেন ‘ব্যাপারটা অসম্ভব কিছু নয়। পশুপাখিরা প্রাকৃতিক ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন। আর হাতিতো বটেই, ওরা বেশ বুদ্ধিমান প্রাণী।
খাওয়া সাঙ্গ হবার পর বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে তাঁবুর ভিতর শুতে গেল সুদীপ্ত আর হেরম্যান। লুমানি বলল সে বাইরেই থাকবে। বলা যায় না হাতির দল কোনো কারণে এদিকে চলে আসতে পারে।
