Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ম্যামথের খোঁজে – ৫

পরদিন ভোরে হাতির দল যখন রওনা হল তখন সুদীপ্তরা তাদের অনুসরণ শুরু করল। আগের মতো মন্থর ছন্দে চলছে তারা। হয়তো তারা ভাবছে কেউ তাদের অনুসরণ করছে না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদিন রোদ যেন ঝলসে উঠল। আফ্রিকার প্রখর সূর্য আগুন ছড়াচ্ছে চারপাশে। কিন্তু তাদের থামার কোনো উপায় নেই। এখানকার মাটি এত শক্ত যে চলতে চলতে ঠোকর খেতে খেতে জুতোর ভিতরেও পা টনটন করে উঠছে। শুধু হাতিগুলো যখন আসছে গায়ে মাটি মাখার জন্য, তখনই একটু জিরোবার সুযোগ পাচ্ছে ওরা।

হেরম্যান, লুমানিকে বলল ‘আমাদের হাতে কিন্তু সময় আজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। হাতিগুলোকে ছোটাবার কোনো উপায় ভাবলে? লুমানি জবাব দিল হ্যাঁ, গুলি চালিয়ে ওদের ভয় দেখিয়ে ছোটাবার চেষ্টা করতে হবে। দেখা যাক তাতে কাজ হয় কিনা? এতে অবশ্য আমাদের উপস্থিতি জানতে পারবে ওরা। প্রতি আক্রমণও করতে পারে। কিন্তু আর তো কোনো উপায় দেখছি না।’

চলতে চলতে দুপুর গড়িয়ে গেল এক সময়। শেষ দুপুরে হাতির দল একটা ডোবায় নেমে বেশ কিছুক্ষণ জলকেলি করল। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল। সুদীপ্ত আর হেরম্যান ভিতরে ভিতরে বেশ উত্তেজনা বোধ করছে। আর কিছু সময়ের মধ্যেই তো তাদের সময়সীমা শেষ হয়ে আসবে। পরদিন সকালে উঠেই নিশ্চয়ই ফাউলিং আর বারকিন এ দিকে আসার জন্য যাত্রা শুরু করবে। যে পথ মন্থর গতিতে পেরোতে একটা দিন সময় লেগেছে, সে পথ ঘণ্টা তিন-চারেকের মধ্যে গাড়িতে অনায়াসে পেরিয়ে আসবে সেই লোক দুজন।

দূরে দিক-চক্রবালে এক সময় একটা কালো রেখা দেখা গেল। লুমানি সেই কালো রেখাটা দেখিয়ে বলল ‘ওখান থেকেই বাঁশবনের শুরু। হাতিগুলোকে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলে অনেকটা নিরাপদ। ওর পরই পাহাড়। সেটা অবশ্য এত দূর থেকে দেখা যাচ্ছে না।

এর পর কিছুটা এগিয়ে থেমে গেল হাতিগুলো। সূর্য ঢলে পড়েছে। হাতিগুলোর হাবভাব দেখে মনে হল এ জায়গাটাই তারা রাত্রিবাসের জন্য নির্বাচন করেছে। সূর্যের রাঙা আলোতে অলসভাবে দাঁড়িয়ে কান নাড়াতে লাগল দাঁতালগুলো। মাঝে মাঝে আবার ধুলো তুলে নিয়ে ছুঁড়তে লাগল আকাশের দিকে।

লুমানি বলল ‘আমাদের আর হাতিগুলোর কিছু সময়ের জন্য বিশ্রামের প্রয়োজন, সারারাত ছুটতে হলে। খাওয়াও সেরে নিতে হবে এখনই।’

সেই মতো খাওয়া সেরে আধঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে উঠে দাঁড়াল সবাই। সূর্য ডুবতে চলেছে। তার শেষ আলোটুকু গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে হাতিগুলো।

লুমানি বলল ‘আমাকে একটা রাইফেল দাও।’

হেরম্যান তার রাইফেলটা তাকে দিল।

সুদীপ্তর উদ্দেশ্যে লুমানি বলল ‘তুমি আগে ফাঁকা আওয়াজ করো।’

আকাশের দিকে মুখ করে রাইফেলের ঘোড়া টেনে দিল সুদীপ্ত। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল উন্মুক্ত প্রান্তর। সেই শব্দে চঞ্চল হয়ে কান ঝাপটাতে শুরু করল হাতিগুলো। তারা বোঝার চেষ্টা করতে লাগল শব্দ কোথা থেকে আসছে?

লুমানির ইঙ্গিতে দ্বিতীয়বার গুলি চালালো সুদীপ্ত। আবারও রাইফেলের শব্দ বিদীর্ণ করে দিল প্রান্তরের নিস্তব্ধতা। হাতিগুলো এবার ঘুরে দাঁড়াল। আর দেখতে পেয়ে গেল দুপেয়ে জীবগুলোকে। একটা আস্কারি হাতি ক্রুদ্ধ ভাবে আকাশের দিকে অজগরের মতো শুঁড় ছুঁড়ে দিয়ে ক্রুদ্ধ গর্জন করে উঠে যেন বলল ‘তফাত যাও!’

লুমানি বলল ‘পালিও না, তবে বিপদ হবে।’

রাজা হাতিটা প্রচণ্ড অসন্তোষে মাথা নাড়াচ্ছে। দ্বিতীয় আস্কারি হাতিটাও এরপর চিৎকার করে উঠল।

পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সুদীপ্তরা। হাতিগুলো এরপর বেশ কয়েকবার শুঁড় দুলিয়ে গর্জন করে সুদীপ্তদের ভয় দেখাবার চেষ্টা করল। কিন্তু তারা পালাচ্ছে না দেখে একটা রক্ষী হাতি এগোতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে হাতিটার পায়ের কাছে বেশ বড় একটা পাথরের ঢেলা লক্ষ করে গুলি চালালো লুমানি। শব্দের সাথে সাথে মাটির ঢেলাটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আকাশের দিকে ছিটকে উঠল মাটি। থমকে গেল হাতিটা। এরপর লুমানি কার্তুজ ভরে নিয়ে আরও দুবার গুলি চালাল হাতিগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার কাছাকাছি মাটিতে। বুলেটের আঘাতে ধুলোর ঝড় উঠল তাদের চারপাশে। এবার ভয় পেয়ে গেল সেই হস্তিবাহিনী। জঙ্গলে থাকার কারণে বন্দুকের ভয়ঙ্কর শব্দর সাথে তারা কমবেশি পরিচিত। তারা দেখেছে এই শব্দ গাছের ডাল থেকে মাটিতে পেড়ে ফেলে চিতা বা সিংহকে, ধরাশায়ী করে বিশাল দাঁতালকে। হাতি খুব বুদ্ধিমান প্রাণী। এই শব্দ হল বিপদ বুঝতে পেরে পিছন ফিরে তারা ছুটতে শুরু করল। পরিকল্পনা সফল হল। নিরাপদ দূরত্ব রেখে তাদের পিছন ছুটতে লাগল সুদীপ্তরাও। সূর্য ডুবে গেল। অন্ধকার নেমে এল। সুদীপ্তরা যে তাদের পিছনে যাচ্ছে তা হাতিগুলোকে জানান দেবার জন্য অন্ধকারের মধ্যেই আবার দু-বার শূন্যে গুলি চালালো সুদীপ্তরা। অন্ধকারের জন্য কিছুক্ষণের জন্য সুদীপ্তদের চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেছিল হাতিগুলো। কিন্তু চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের চোখের সামনে জেগে উঠল তিনটে ধাবমান শরীর। রাজা হাতিটার দু-পাশে সমান্তরালে ছুটছে তার দেহরক্ষীরা। যাতে পাশ থেকে ছুটে আসা কোনো আঘাত তাদের রাজার দেহে না লাগে সে জন্য। চন্দ্রালোকে ধাবমান সেই হস্তিযুথের পিছনে ছুটে চলল সুদীপ্তরাও। তবে হাতির সাথে কি ছুটে পারা যায়? ক্রমশ ব্যবধান বাড়তে লাগল দু-দলের মধ্যে, তারপর হারিয়ে গেল হাতিগুলো। তাদের যাত্রাপথ অনুমান করে এগোল সুদীপ্তরা। রাত শেষ হয়ে ভোর হল এক সময়। দূরের কালো রেখাটা এবার স্পষ্ট হল তাদের সামনে। আর তার পিছনে গিরিশ্রেণীও ধীরে ধীরে জেগে উঠল আকাশের প্রেক্ষাপটে। অনুচ্চ পর্বতমালা বিস্তৃত হয়ে আছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। মাউন্ট কিনিয়ার কোনো ক্ষয়িষ্ণু অংশ হবে এটা।

হাতির দল সুদীপ্তদের চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য। তবে দিনের আলো ফোটার পর কিছুটা এগিয়ে আবার তারা হাতির পায়ের ছাপ দেখতে পেল। লুমানি বলল ‘ঠিক পথেই এগোচ্ছে ওরা, তবে ওরা বাঁশবনে প্রবেশ করার আগেই যদি বারকিন আর সেই শিকারি পৌঁছে যায় তবে মুশকিল। তাছাড়া ওই হাতিগুলো পাহাড়ের গোলোকধাঁধায় প্রবেশের আগে আমাদেরও তাদের দেখা পেতে হবে।’

কিন্তু সুদীপ্তরা কেউই আর ছুটতে পারছে না। কাজেই বাধ্য হয়ে এক ঘণ্টার মতো বিশ্রাম নিতে হল। তারপর আবার তারা চলতে শুরু করল। ক্রমশই সামনের কালো রেখাটা চওড়া হয়ে উঠতে লাগল। তারপর হেরম্যানের দুরবিনে ধরা পড়ল হাতিগুলোও। এখন ধীর পায়ে জঙ্গলের দিকে তারা এগোচ্ছে। তবে হাতিগুলোর সাথে জঙ্গলের ব্যবধান মাইল তিনেক হবে। আর সুদীপ্তদের সাথে হাতিগুলোর ব্যবধান মাইল খানেক। সুদীপ্তরা হাঁটার গতিবেগ বাড়িয়ে দিল। সময় এগোতে থাকল। চলার সাথে সাথেই এবার মাঝে মাঝে পিছনে তাকাতে লাগল সুদীপ্তরা। বেলা নটা নাগাদ সুদীপ্তদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল জঙ্গলটা। তার পিছন দিকেই পাহাড়ের ঢাল। নেড়া পাহাড়ের ঢালের কিছুটা নীচ থেকে জঙ্গলটা নেমে এসেছে। সুদীপ্তরা তখন হাতির দলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে আর হাতি তিনটে জঙ্গলে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে হয়তো বা জিরোবার জন্য। হেরম্যান জানতে চাইলেন ওই জঙ্গলে কি কি প্রাণী আছে?

লুমানি বলল ‘সেবার আমরা শুধু এক ধরনের বাঁদর দেখেছিলাম। পাহাড়ের গোলকধাঁধাতেও বেশ কয়েকবার তারা আমাদের চোখে পড়েছিল। তাছাড়া অন্য কোনো প্রাণী দেখিনি।’

ঠিক এই সময় পিছনে ফিরে সুদীপ্ত দেখতে পেল সেই ধুলোর ঝড় আবার আসছে। সে বলে উঠল ‘ওরা এসে গেছে!’

হাতিগুলোও যেন বুঝতে পারল তারা আসছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা বাঁশ বনের ভিতরে ঢুকে গেল। সুদীপ্তরা বাঁশবনের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে সুযোগ তারা পেল না। বাঁশবনে ঢোকার মুখেই ধুলো উড়িয়ে এসে গাড়িটা তাদের সামনে থামল। স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে বারকিন। আর তার পাশে গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপরটা এক হাতে ধরে, অন্য হাতে রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফাউলিং।

সুদীপ্তদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন ‘কাল সন্ধ্যাতেই তো আপনাদের সময় সীমা শেষ হয়ে গেছে। তবে ওদের পিছু ধাওয়া করে এ পর্যন্ত এসেছেন কেন?

লুমানি বলল ‘আমরা গুলি চালিয়েছিলাম। মনে হয় হাতিটার গুলি লেগেছে। তাই অনুসরণ করে এসেছি।’ বারকিন বলল ‘সারাটা রাস্তা আমরা হাতিগুলোর পায়ের ছাপ দেখতে দেখতে এসেছি। কোথাও কোনো রক্তের চিহ্ন দেখিনিতো?

ফাউলিং এবার হেরম্যানকে বলল ‘যাই হোক না কেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তোমরা হাতিটাকে মারতে পারোনি। এবার আমার পালা। ওই তো যেখানে বাঁশগুলো নুইয়ে পড়েছে ও জায়গা দিয়েই হাতিগুলো জঙ্গলে ঢুকেছে। জঙ্গলে ঢুকব আমি। এবার তোমরা ফিরে যাও।’ —এই বলে গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামলেন তিনি। বারকিনও নামল। তার মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি।’

হেরম্যান বললেন ‘দেখুন, আপনি আমাদের চলে যাবার কথা বলতে পারেন না। আপনার কাছে তো একটাই হাতি শিকারের পারমিট। অন্য দুটো হাতির মধ্যে অন্য একটাকে আমরা নিশ্চই মারতে পারি?’

কথাটা শুনি ফাউলিং তির্যক হেসে বললেন, তা মারতে পারেন, তবে আমরা ফিরে আসি তারপর। তেমন হলে রাজা হাতির দাঁত দুটো কেটে আনার পর আমরা এখানে আপনাদের জন্য অপেক্ষাও করতে পারি যাতে হাতির দাঁত কাঁধে করে পায়ে হেঁটে আপনাদের এতটা পথ ফিরতে না হয় সে জন্য।” –এই শেষ কথাগুলো যে ফাউলিং ব্যঙ্গ করে বললেন তা বুঝতে অসুবিধা হল না সুদীপ্তদের।

আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রাইফেল হাতে বারকিনকে নিয়ে বাঁশবনের দিকে এগোলেন ‘ফাউলিং’।