ম্যামথের খোঁজে – ৭
৭
সূর্য ডুবল এক সময়। সুদীপ্তদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে পাহাড়ের নিচের বাঁশ বনটা ঘন কালো আবরণে ঢেকে গেল। বেশ কিছুক্ষণ চারপাশে নেমে এল গাঢ় অন্ধকার। তারপর ধীরে ধীরে যখন চাঁদ উঠতে শুরু করল তখন আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। আধো অন্ধকারে পথ উঠে গেছে ওপর দিকে। সে পথ ধরেই এগোল তারা। কিছুটা এগোবার পর তারা এমন এক জায়গাতে উপস্থিত হল যেখান থেকে বেশ কয়েকটা পথ এঁকেবেঁকে এগিয়েছে নানা দিকে। গলির মতো সব পথ। তার দুপাশে খাড়া দেওয়াল। সুদীপ্তরা থমকে দাঁড়াল সে জায়গাতে। একটু ভেবে নিয়ে হেরম্যান বললেন ‘যে পথ গুলোর আকার হাতিদের স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করার মতো সে পথগুলোই আমরা ধরব। অর্থাৎ সংকীর্ণ রাস্তাগুলোর মধ্যে যেটা অপেক্ষাকৃত চওড়া হবে সেটাই। তেমনই একটা রাস্তা ধরে এগোনো শুরু হল। মাথার ওপর চাঁদ জেগে উঠতে লাগল। বাঁকের পর বাঁক। এ রাস্তার পর সে রাস্তা। মাঝে মাঝে ছোট একটা টর্চ জ্বালিয়ে দেওয়ালের গায়ে চক দিয়ে তির চিহ্ন আঁকতে লাগলেন হেরম্যান। সময় এগিয়ে চলল। এগিয়ে চলল সুদীপ্তরাও। সত্যিই এ এক গোলকধাঁধা! কোন দিকে তারা এগোচ্ছে তা সঠিক বুঝতে পারছে না সুদীপ্তরা। শুধু তারা বুঝতে পারছে যে ক্রমশ তারা ওপরে উঠছে। মাঝে মাঝে কোনো কোনো সময় অবশ্য তার কিছুটা উন্মুক্ত জায়গায় পৌঁছচ্ছে। তাদের চার দিকে চাঁদের আলোতে শুধু জেগে আছে ছোটবড় নেড়া পাহাড়। কোথাও কোনো শব্দ নেই, একটা রাতচরা পাখির ডাক পর্যন্ত নয়। এই পাহাড়ি গোলকধাঁধায় সুদীপ্তদেরই মতো কোথাও নিশ্চয়ই আছে ফাউলিং আর বারকিন। হয়তো তারা সেই হাতিটাকে অনুসরণ করছে সুযোগ বুঝে গুলি চালানোর জন্য।
সুদীপ্ত বলল ‘এখন যদি হঠাৎ কোনো বাঁকের মুখে ফাউলিংদের সাথে দেখা হয়ে যায় তখন?’
হেরম্যান বললেন ‘দেখা হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়, তবে হলে হবে। সে তো আর আমাদের যাওয়া-আসা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাছাড়া আমাদের ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না। আমরা দলে ভারী। আর ওদের মতো আমাদেরও বন্দুক আছে।’
লুমানি বলল ‘আসলে ওই বারকিনই যত নষ্টের গোড়া। আসলে ও আমাকে দেখতে পারে না। বেশ কয়েকবার সে আমাকে প্রলোভন দেখিয়েছিল তার সাথে হাতির দাঁতের চোরা কারবারে সামিল হবার জন্য। তাছাড়াও বেশ কয়েকবার গোপনে চেষ্টা চালিয়ে ছিল বড় টেম্বোটাকে মারার। কিন্তু পারেনি। আমি রাজা হাতিটাকে চোখে চোখে রাখতাম। বেশ কয়েকবার হাতিটাকে অন্যত্র তাড়িয়ে ওর পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছি। তাই আমার ওপর রাগ।’
সুদীপ্ত বলল ‘হ্যাঁ, লোকটা বলেছিল বটে যে তুমি টুরিস্টদের ওই বুড়ো দাঁতালটাকে দেখিয়ে বেড়াও। ওর পিছন পিছন ঘোরো।’
লুমানি বলল ‘হ্যাঁ, সেটা করি ওই দাঁতালটাকে চোরা শিকারিদের থেকে আগলে রাখার জন্যই।’
এরপর সে বলল ‘পাহাড়ের এই সংকীর্ণ গোলকধাঁধায় ওরা হাতিটাকে সহজে মারতে পারবে না। কারণ তাকে মারতে হলে তো মুখোমুখি গুলি চালাতে হবে। ওই সুড়ঙ্গগুলোর মতো রাস্তাতে তো আর হাতি পিছু ফিরতে পারবে না। এ সব রাস্তা ধরে হাতি যখন এগোয় তখন দু-পাশে আর এক হাতও জায়গা থাকে না।’
লুমানির কথা শেষ হবার পর একটা বাঁকের মুখে দাঁড়াল সুদীপ্তরা। রাস্তা সেখান থেকে দু-দিকে ভাগ হয়েছে। তার মধ্যে যেটা হাতি চলাচলের উপযোগী সে পথটা ধরার আগে টর্চ জ্বালিয়ে দেওয়ালের গায়ে চিহ্ন আঁকতে যাচ্ছিলেন হেরম্যান। কিন্তু দেওয়ালের গায়ে টর্চের আলো ফেলতেই হঠাৎ কি যেন একটা জিনিস চোখ পড়তেই থমকে গেলেন হেরম্যান। টর্চের আলোটা তিনি ঘোরাতে লাগলেন দেওয়ালের ওপর। ভালো করে দেওয়ালটা দেখেই চমকে উঠল তারা। পাথর কুঁদে দেওয়ালের গায়ে বিশাল একটা হাতির মূর্তি আঁকা আছে। প্রকৃতির নিয়মে ছবিটা স্থানে স্থানে অস্পষ্ট হয়ে গেলেও তাকে চিনতে অসুবিধা হল না সুদীপ্তদের। হাতিটার বাঁকানো দাঁত উঠে আছে চাঁদের দিকে। ম্যামথ!
হেরম্যান বলে উঠলেন ‘আরে এযে মানুষের কীর্তি। তার মানে এক সময় মানুষ বাস করত এখানে।’
সুদীপ্ত দেখে বলল ‘ছবিটাতো বহু প্রাচীন বলে মনে হচ্ছে।’
হেরম্যান বললেন ‘ঠিক তাই। হতে পারে এটা স্পেনের আলতামিরা গুহা চিত্রর সেই বাইসনের মতোই হাজার হাজার বছরের কোনো প্রাচীন চিত্র। যখন মানুষ গুহাবাসী ছিল। সেই প্রাচীন মানুষরা নিশ্চিত ম্যামথকে চাক্ষুষ করেছিল। নইলে কল্পনা থেকে তো এই ছবি আঁকা যায় না! এমনও হতে পারে তারা এখনও টিকে আছে আফ্রিকার এই গোপন অঞ্চলের বুকে?”
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ছবিটা ভালো করে দেখল সুদীপ্তরা। হেরম্যান বললেন ‘এখন তো রাত, তাই এ ছবিটার ছবি তোলা যাবে না। ফেরার পথে দিনের আলোতে ছবি নিতে হবে। ম্যামথের দেখা আমরা পাই বা না পাই এটা প্রমাণ করবে যে এক সময় এ অঞ্চলে ম্যামথের অস্তিত্ব ছিল। বিশেষজ্ঞরা এখানে এসে ছবিটার বয়স নির্ধারণ করতে পারবেন। নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানে হয়তো নতুন অধ্যায় সংযোজিত হবে।’
ম্যামথের ছবিটা সুদীপ্তদের উৎসাহ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। পাহাড়ের অলিন্দ বেয়ে অবার চলতে লাগল তারা। তবে মাঝে মাঝে দেওয়ালের গায়ে টর্চের আলো ফেলেও আর কোনো আঁকা চোখে পড়ল না।
রাত কেটে গেল, ভোর হল। সুদীপ্তদের মনে হল তারা যেন ওপরে না উঠে আবার নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে। তবে ঢালের গতি খুব মন্থর। ভালো করে না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না। দিনের আলোতে বেশ কিছুটা পথ সেই গোলকধাঁধার ভিতর অতিক্রম করার পর হঠাৎ লুমানি সুদীপ্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল ‘বাওয়ানারা। ওই দেখুন আবার সেই বাঁদরগুলো!’
সুদীপ্তরা দেখতে পেল তাদের যাত্রাপথের কিছুটা তফাতে একটা পাথুরে প্রাচীরের মাথার ওপর বসে আছে বাঁদরগুলো। অবিকল মানুষের মতো মুখ নিয়ে তারা বিস্মতভাবে তাকিয়ে দেখছে সুদীপ্তদের। যেন তারা সুদীপ্তদের উপস্থিতি আশা করেনি এখানে। সুদীপ্তরা কয়েক পা এগোতেই তারা অদৃশ্য হয়ে গেল সে জায়গা থেকে। সুদীপ্ত হেসে জানতে চাইল “এই বাঁদগুলোর নাম কি ‘ওলা ওলা’?”
হেরম্যান হেসে বললেন ‘জানি না। কয়েকশো প্রজাতির বাঁদর আছে। তার মধ্যে কটাকেই বা চিনি?”
নতুন একটা সুড়ঙ্গে প্রবেশ করল তারা। পথটা এবার সত্যিই ঢালু হয়ে নীচের দিকে নেমেছে। পথের দু-পাশে উঁচু দেওয়াল। চলতে চলতে হেরম্যান বললেন ‘দেওয়ালগুলো কী মসৃণ দেখেছ। যেন ঘষে মেজে দেওয়ালগুলোকে মসৃণ করে তোলা হয়েছে।”
আরও বেশকিছুটা নীচে নামার পর হঠাৎই সেই গলিপথ শেষ হয়ে গেল। সামনে একটা উন্মুক্ত জায়গা। গলির মুখে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা তিনজন। সামনে ফাঁকা জায়গার ভিতর ভালো করে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল তারা।
