ম্যামথের খোঁজে – ৮
৮
বৃত্তাকার একটা পাথুরে চত্বর। দেখতে যেন ঠিক রোমান অ্যাম্পিথিয়েটারের মতো। এক পাশে একটা বিরাট গুহা। আর তাকে কেন্দ্র করে চারদিকে কৃশের দেওয়ালের মতো ওপর দিকে বৃত্তাকার জায়গাটাকে ঘিরে ওপরে উঠে যাওয়া দেওয়ালগুলোর গায়ে সার সার ঘরের মতো খোপ। যেন মানুষের হাতে গড়া জায়গাটা। বৃত্তাকার জায়গাটার কেন্দ্রবিন্দুতে একটা অনুচ্চ বেদির মতো জায়গা। সে জায়গা আর তার চারপাশে গিসগিস করছে সেই বাঁদরের দল। সুদীপ্ত যাদের নাম দিয়েছে ‘ওলা ওলা।’ সংখ্যায় তারা অন্তত কয়েকশো হবে। ওলা-ওলা-দের চোখ মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে তারা বেশ উত্তেজিতভাবে যেন কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু শব্দ করছে না।
পাথুরে দেওয়ালের আড়াল থেকে সুদীপ্তরা দেখতে লাগল তাদের।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কোথাও যেন কীসের একটা শব্দ হল। এবার স্পষ্টতই উত্তেজনার ভাব ধরা দিল ওলাওলাদের ব্যবহারে। যে যেভাবে তারা বসে বা দাঁড়িয়ে ছিল তারা ফিরে দাঁড়াল গুহাটার দিকে তাকিয়ে। আর এর কয়েক মুহূর্তর মধ্যে সেই বিশাল অন্ধকার গুহার মধ্যে থেকে পর পর যে দুটো মহাকলেবর বাইরের সূর্যালোকে এসে দাঁড়াল। তাদের দেখে পাথরের মূর্তি বনে গেল সুদীপ্তরা। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সুদীপ্ত আর হেরম্যান। বৃত্তাকার জায়গার মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে বিশালাকৃতির দুটো ম্যামথ। কাস্তের মতো তাদের বিশাল দাঁতগুলো আকাশের দিকে তোলা। গায়ে পুরু লোমের আস্তরণ। যেন ছবির বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে তারা এখানে হাজির হল।
বাঁদরগুলো তাদের দেখে সম্মিলিত ভাবে কান ফাটানো চিৎকার করতে লাগল ওলা ওলা’ বলে।
ম্যামথগুলো এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল জমিটার কেন্দ্রস্থলে সেখানে বেদি আর বাঁদরগুলো আছে সেখানে। আর বাঁদরগুলো অবিশ্রান্ত চিৎকার করে যেতে লাগল ‘ওলা-ওলা-ওলা, ওলা…।’
বেদিটার কাছে এসে সেই মহা ঐরাবত দুটো দাঁড়াতেই হঠাৎই শব্দ থামিয়ে দিল বাঁদরের দল। বেদি আর তার গায়ের জমিটা ফাঁকা করে ম্যামথ দুটো আর বেদিটাকে মাঝখানে রেখে বেশ বড় একটা বৃত্ত রচনা করে জায়গাটা ঘিরে দাঁড়াল তারা। বেদিটার ওপর এবার ভালো করে নজর পড়তেই এবার আরও বিস্মিত হয়ে গেল সুদীপ্তরা। বেদির ওপর পড়ে আছে দুটো মানুষ। এতক্ষণ বাঁদরগুলোর দেহর আড়ালে থাকায় তাদের দেখতে পায়নি সুদীপ্তরা। কিন্তু উপুড় হয়ে পড়ে থাকলেও তাদের পোশাক দেখে সুদীপ্তরা তাদের চিনে ফেলল।
শিকারি ফাউলিং আর তার মাসাই গাইড বারকিন! সম্ভবত তাদের হাত দুটো বাঁধা।
বাঁদরের দল সরে যাওয়ায় সেই বেদির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আরও কিছু জিনিস নজরে এল সুদীপ্ত- হেরম্যানের। কিছু খুলি আর মানুষের হাড়গোড় পড়ে আছে সেখানে।
ম্যাসথ দুটো বেদিটার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ফুট চারেক উঁচু বেদি। একটা ম্যামথ শুঁড় দিয়ে দেহ দুটোকে উলটে দিয়ে দু-দিকে একটু তফাতে সরিয়ে দিল। নড়ে উঠল দেহ দুটো। অর্থাৎ এখনও জীবিত আছে তারা দুজন। এবং সম্ভবত তাদের জ্ঞান আছে। দুটো দেহর সামনে এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল হাতি দুটো। কয়েক মুহূর্তর নিস্তব্ধতা। তারপর হঠাৎই ওলা-ওলা বলে চিৎকার শুরু করল বাঁদরগুলো। আর হাতি দুটোও যেন ধীরে ধীরে তাদের সামনের একটা পা বেদির ওপর তুলত শুরু করল। এবার হুঁশ ফিরল হেরম্যানের হাতি দুটো ফাউলিংদের পায়ের নীচে পিষে মারার জন্য পা তুলছে। বেদির চারদিকে মানুষের হাড়গোড় কেন পড়ে তা বুঝতে অসুবিধা হল না হেরম্যানের। ফাউলিং আর তার সঙ্গী যেমন মানুষই হোক না কেন এভাবে চোখের সামনে দুটো মানুষকে মরতে দেওয়া যায় না।
হেরম্যান গলির ভিতর থেকে ছুটে সেই ফাঁকা জমিতে প্রবেশ করলেন। তার পিছন পিছন সুদীপ্ত আর লুমানিও। হাতি দুটো এখন দেহ দুটোর ওপর পা তুলে দিতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় শূন্যে গুলি চালালেন হেরম্যান। রাইফেলের প্রচণ্ড গর্জনে কেঁপে উঠল চারপাশ। যে শব্দ প্রতিধ্বনি হতে লাগল নেড়া পাহাড়গুলোর মাথায়। থেমে গেল ওলা ওলা চিৎকার। আর হাতিগুলোও শব্দ শুনে পা নামিয়ে নিল। এরপর কয়েক মুহূর্তর জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল জায়গাটাতে।
যদি হাতি দুটো আবার ফাউলিং আর বারকিনকে মেরে ফেলতে উদ্যত হয় তাই হেরম্যান আর সুদীপ্ত এবার রাইফেল তাগ করল ম্যামথ দুটোর দিকে। তারা পা ওঠালেই গুলি চালাবে সুদীপ্তরা। কিন্তু এর পর মুহূর্তেই একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল—
‘থামো। গুলি চালিও না।’—ইংরাজিতেই কথাগুলো শোনা গেল!
সেই কণ্ঠস্বর লক্ষ করে সুদীপ্তরা যাকে দেখতে পেল সে বাঁদর নয় মানুষ! সুদীপ্তদের দৃষ্টি এতক্ষণ বেদির দিকে ছিল বলে জমিটার অন্য অংশগুলো বেশ কিছুক্ষণ তারা খেয়াল করেনি। সেই বৃত্তাকার জমিতে এসে দাঁড়িয়েছে একজন মানুষ। তার পরনে লম্বা ঝুলের পোশাক। একটা কাঠের মুখোশে তার মুখ ঢাকা।
লোকটা এরপর অদ্ভুত স্বরে আবারও বলল ‘গুলি চালিও না। বন্দুক ফেলে দাও।’
হেরম্যান তার কথায় জবাব দিল ‘আগে হাতিগুলোকে বেদি থেকে দূরে সরে যেতে বলো তারপর বন্দুক নামাবো। আমরা কোনো রক্তপাত ঘটাতে এখানে আসিনি।’
লোকটা এবার বলে উঠল ওরা একজন নর-বানরকে খুন করেছে। দুটো হাতিকেও মেরেছে। শাস্তি ওদের পেতেই হবে।’
হেরম্যান বলে উঠলেন ‘তা হয়তো হতে পারে। অন্যায় করেছে ওরা। কিন্তু তার জন্য ওদেরকেও এভাবে মারার অধিকার নেই। আইন আছে, আদালত আছে, প্রয়োজনে সেখানে বিচার হবে ওদের।”
লোকটা বলে উঠল ‘ওসব তোমাদের সভ্য সমাজের নিযম এখানে চলে না। জঙ্গলের কানুন হল খুনের বদলা খুন।”
সুদীপ্ত বলল “কিন্তু আমরা চোখের সামনে এ ব্যাপারটা ঘটতে দিতে পারি না। আমরা সভ্য জগতের মানুষ।”
লোকটা এবার বলে উঠল “তোমরা কেমন সভ্য তা আমি ভালো জানি। তোমরা লোভের জন্য মানুষ খুন করতে পার, নির্বিচারে পশু-পাখিদের মারতে পার।”
সুদীপ্ত বলে উঠল ‘না সবাই এক রকম হয় না। আমরা কোনো মানুষ বা পশুপাখি মারিনি। এদিকে একটা দাঁতাল হাতি আসছিল তার দুই সঙ্গীসহ। বিশাল একটা হাতি। মফলম টেম্বো-রাজাহাতি। সে যখন খানায় পড়ে তখন আমরা তাকে উদ্ধার করি। ওই বাঁদরের দলও তখন সেখানে ছিল।”
কথাটা শুনে লোকটা একটু থমকে গিয়ে কি যেন বলল বাঁদরগুলোর উদ্দেশ্যে। আর তারাও কী যেন বলল তার কথার জবাবে।
লোকটা এরপর বলল ‘তোমরা তবে এখানে এসেছ কেন?”
হেরম্যান জবাব দিলেন ‘এত দূর থেকে এত কথা বলা যাবে না। কাছে এসো।’
লোকটা বলল, ‘হাতের রাইফেল ফেলে দাও তবে।’
সুদীপ্ত বলল “আগে ম্যামথ গুলোকে বেদিটা থেকে দূরে সরে যেতে বলো তারপর ফেলব।”
কয়েক মুহূর্ত যেন ভেবে নিল লোকটা। তারপর অদ্ভুত একটা শব্দ করল প্রাণী দুটোর উদ্দেশ্যে। সেটা শুনে ধীরে ধীরে বেদির কাছ থেকে পিছু হঠতে শুরু করল প্রাণীদুটো। বেশ কিছুটা পিছনে হঠে গিয়ে গা ঘেঁসাঘেসি করে দাঁড়াল সেই প্রাচীন ঐরাবত দুটো।
সুদীপ্ত এবার তার রাইফেল মাটিতে নামিয়ে রাখল। একই কাজ করলেন হেরম্যানও এমনকি লুমানিও তার বর্শাটা মাটিতে নামাল।
এরপরই গোটা কয়েক বাঁদর এগিয়ে এসে রাইফেল আর বল্লম কুড়িয়ে নিয়ে দূরে চলে গেল। হেরম্যান চাপা স্বরে সুদীপ্তকে বললেন ‘সম্ভবত এই বাঁদরগুলো প্রশিক্ষিত বাঁদর।’
সুদীপ্তরা এখন নিরস্ত্র। সেই লোকটা ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল সুদীপ্তদের দিকে। সুদীপ্তদের সামনে এসে দাঁড়াল লোকটা। কাঠের মুখোশের আড়ালে ঢাকা তার মুখ। সে সুদীপ্তদের প্রশ্ন করল—‘তোমরা কারা? তোমরা কি ওই দুজনের সঙ্গী? এখানে এসেছ কেন?’
হেরম্যান জবাব দিলেন ‘না, ওদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে পথে দেখা হয়েছিল ওদের সাথে। একটা বড় দাঁতালকে অনুসরণ করে আমরা ওদিকে আসছিলাম, ওরাও আসছিল আলাদা ভাবে।’
‘তোমরা তো সেই দাঁতালটাকে বাঁচিয়েছিলে বলে শুনলাম। তার মানে তাকে শিকারের উদ্দেশ্য ছিল না। তবে তাকে অনুসরণ করলে কেন?
সুদীপ্ত জবাব দিল ‘এখানে পৌঁছবার জন্য। আমাদের অনুমান ছিল সে এখানে আসবে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য আমরা নিজেরাই এখানে পৌঁছেছি। পাহাড়ে ওঠার পর ওই রাজাহাতিটা আমাদের চোখের আড়াল থেকে হারিয়ে যায়।’
লোকটা বিস্মিত ভাবে বলল ‘তবে কি তোমরা হাতির গোরস্থানের খোঁজে এসেছ?’
হেরম্যান বললেন ‘ঠিক তা নয়। আমরা আসলে এসেছিলাম ওই ম্যামথগুলোকে দেখতে। আমাদের এই গাইড লুমানি বহু বছর আগে একবার এখানে এসেছিল একটা হাতিকে অনুসরণ করে। ও তখন দেখেছিল হাতি দুটোকে। সেই সূত্র ধরেই এত বছর পর আমাদের এখানে আসা। অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই আমাদের।’
লোকটা কথাটা শুনে বলল ‘ম্যামথ দেখতে এতদূর ছুটে এলে? তোমরাতে ভিনদেশী বলেই মনে হয়।’
হেরম্যান বললেন ‘হ্যাঁ, ভিনদেশী আমরা। আমরা হলাম ‘ক্রিপ্টোলজিস্ট।’
তাদের কথা শুনে লোকটা যেন মুখোশের আড়াল থেকে বিড়বিড় করে ‘ক্রিপ্টোজ্যুলজিস্ট’ শব্দটা একবার বলল।
হেরম্যান এবার শব্দটা ব্যাখ্যা করার জন্য বলতে যাচ্ছিলেন ‘এ শব্দের অর্থ হল যারা…’
কিন্তু তার কথা শেষ হবার আগেই লোকটা বলল ‘যারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাণী খুঁজে বেড়ায় তাইতো?”
আফ্রিকার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে অদ্ভুত পরিবেশে কেউ যে এই শব্দের মানে জানতে পারে তা জেনে প্রচণ্ড বিস্মিত হল সুদীপ্তরা।
হেরম্যান লোকটাকে প্রশ্ন করলেন ‘আপনি কে? নিশ্চয়ই সভ্য পৃথিবীর সাথে আপনার যোগাযোগ আছে। নইলে এ শব্দর অর্থ জানলেন কীভাবে?”
একটু চুপ করে থেকে লোকটা বলল ‘এক সময় ছিল। তবে এখন আর আমার পরিচয় জেনে লাভ নেই। তোমাদের দেখে যদিও ভালো মানুষ বলেই মনে হচ্ছে তবুও আমি সভ্য পৃথিবীর মানুষদের আর বিশ্বাস করি না। তবে হাতিটাকে তোমরা বাঁচিয়েছ। তাই তোমাদের মুক্তি দেব আমি। আজ রাতে তোমাদের চোখ বেঁধে আমি নীচে নামাবার ব্যবস্থা করব। এখানে আর কোনো দিন এস না। বেদির পাশে কঙ্কালগুলো দেখতে পাচ্ছতো? ফিরে এলে ওদের মতোই তোমাদেরও অবস্থা হবে।’
হেরম্যান বললেন ‘না আমরা আর আসব না। যাদের দেখার জন্য আমরা এখানে এসেছিলাম তাদের দেখা পেয়ে গেছি। জ্ঞান সঞ্চয়টাইতো আসল।”
লোকটা বলল “তাহলে তোমরা সত্যিই সেই কবরখানার জন্য আসনি?”
হেরম্যান বললেন ‘না। তবে একটা অনুরোধ আছে। ব্যক্তিগত সংগ্রহতে রাখার জন্য যদি ম্যামথ দুটোর ছবি তুলতে দেন। কথা দিচ্ছি সে ছবি অন্য কেউ দেখবে না।’
লোকটা বলল ‘না, সে অনুমতি আমি দেব না। আমি বললাম তো সভ্য পৃথিবীর লোকদের আমি আর তেমন বিশ্বাস করি না।’
এরপর আর কোনো কথা বলা যায় না এ ব্যাপারে। হেরম্যান শুধু জানতে চাইলেন ‘ওই লোক দুজনের কি হবে?’
লোকটা বলল ‘ওদের ব্যাপারে আমি এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আগে কথা বলে ওদের মতিগতি দেখি তারপর। আপাতত ওরা বন্দি থাকবে।”
লোকটা তারপর বলল ‘এসো আমার সঙ্গে। রাত পর্যন্ত তোমাদের থাকার জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছি।’
একথা বলে লোকটা এগোল কাছেই একটা ছোট ঘরের মতো গুহার দিকে। গুহা হলেও মনে হয় মানুষেরই তৈরি এসব। সে জায়গায় ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যাবার সময় লোকটা বলল ‘সূর্য ডোবার পর আমি আবার আসব। তোমাদের ফিরে যাবার ব্যবস্থা করব। তবে পালাবার চেষ্টা কোর না। বিপদ হবে। দৈবাৎ তোমরা ওখানে পৌঁছলেও এ জায়গা থেকে বেরোতে পারবে না। পাহাড়গুলোর ভিতর ঘুরে ঘুরে মরবে তোমরা।’
এই বলে লোকটা এগোল মাঠের মাঝখানে।
ঘরের মতো জায়গাটার পাথুরে মেঝেতে বসে পড়ল সুদীপ্তরা। সুদীপ্ত হেরম্যানকে বলল ‘কে হতে পারে লোকটা?’ হেরম্যান বললেন ‘যেই হোক সে নিজের পরিচয় দিতে নারাজ। সে জন্য মুখোশে মুখ ঢেকে রেখেছে আর গলার স্বরটাও বদলাবার চেষ্টা করছে। তাই অদ্ভুত লাগছে ওর গলাটা। এটা নিশ্চিত যে লোকটা সভ্য জগতের মানুষ এবং শিক্ষিতও তবে লোকটাকে মন্দ বলে মনে হচ্ছে না। যদিও কোনো কারণবশত ও সভ্য পৃথিবীর লোকদের বিশ্বাস করে না।’
ঘরের ভিতর প্রবেশ করার জন্য যে মুখটা আছে, তার ফাঁক দিয়ে সুদীপ্তরা দেখতে পেল লোকটা প্রথমে গিয়ে দাঁড়াল বেদিটার কাছে। হাতি দুটোর উদ্দেশ্যে সম্ভবত কিছু বলল। ম্যামথ দুটো পিছন ফিরে এগোল যেখান থেকে তারা বেরিয়ে এসেছিল সেই বিশাল গুহাটার দিকে। তারপর সেই গুহার অন্ধকারে হারিয়ে গেল তারা। হেরম্যান বললেন ‘অদ্ভুত! অবিশ্বাস্য! হয়তো এ কথা সভ্য পৃথিবীর কেউ কোনো দিন বিশ্বাস করবে না। না করুক ক্ষতি নেই। আমরা তো জানব যে আমাদের দেখা সত্যি ছিল। এ দৃশ্য আমি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ভুলব না। ক্যামেরাতে তুলতে না পারি, মনের ক্যামেরায় তোলা হয়ে গেল এই ছবি।”
লোকটার কথাতেই এবার সম্ভবত উঠে বসে বেদি থেকে নামলেন শিকারী ফাউলিং আর বারকিন। তবে তাদের হাত বাঁধা। লম্বা দড়ির শেষ প্রান্ত মাটিতে লুটাচ্ছে। বেশ কয়েকটা বাঁদর উপস্থিত হল সেখানে। হাতে ধরা দড়ির প্রান্ত তারা মাটি থেকে উঠিয়ে নিল। তারপর সেই অদ্ভুত লোকটা তার বন্দিদের নিয়ে বাঁদরগুলোর সাথে অদৃশ্য হয়ে গেলেন জমির অন্য পাশে একটা গুহার মধ্যে। ফাঁকা হয়ে গেল ঘরটা।
হেরম্যান বললেন ‘ওদের অদৃষ্টে কি আছে কে জানে? আশা করব ওরাও যেন মুক্তি পায়। কেমন ভাবে ধরা পড়ল কে জানে?’
সুদীপ্ত বলল ‘বাঁদরগুলোকে কিন্তু অদ্ভুত ট্রেনিং দিয়েছে লোকটা। দেখলেন বাঁদরগুলো কেমন আমাদের অস্ত্রগুলো কুড়িয়ে নিল। কেমন ভাবে দড়ি ধরে ফাউলিংদের নিয়ে গেল!’
হেরম্যান বলল ‘এমনও হতে পারে লোকটা কোনো সময় চিড়িয়াখানায় বা সার্কাসদলের ট্রেনার ছিল। সে বিদ্যাই সে কাজে লাগিয়েছে। তবে আমাদের এত দুর আশা কিন্তু সার্থক হল। চর্মচক্ষে ম্যামথ দেখতে পেলাম আমরা। লুমানি তোমাকে ধন্যবাদ।’—এই বলে লুমানির দিকে তাকালেন তিনি।
লুমানি প্রথমে বলল তাহলে ওরা প্রেত টেম্বো নয়? জ্যান্ত প্রাণী?”
সুদীপ্ত বলল ‘না, প্রেত নয়। রক্ত মাংসর প্রাণী। তবে এমন হাতি আর কোথাও নেই। ওরা হাজার হাজার বছর আগে হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। ভাগ্যিস বহু বছর আগে তুমি ওদের দেখেছিলে। তোমার জন্যইতো ওদের আমরা দেখতে পেলাম।’ লুমানি বলল ‘কিন্তু হাতির গোরস্থানের ব্যাপারটা? যার জন্য আমি এখানে এলাম। লোকটার কথা শুনেও মনে হল গোরস্থানটা এখানেই কোথাও আছে।’
হেরম্যান বললেন তো থাকতে পারে। কিন্তু সে কথা বললে লোকটা আমাদের বেরোবার রাস্তা নাও দেখাতে পারে।’
লুমানি বলল অন্য কোনো লোক দেখলাম না। সম্ভবত লোকটা একাই থাকে এখানে। সভ্য জগত থেকে অপরাধ করে এসে অনেক সময় মানুষেরা এ সব জায়গায় আশ্রয় নেয়। এই লোকটা তেমন কেউও হতে পারে। হাঁটা-চলা আর আঙুলের চামড়া দেখে মনে হল লোকটা বুড়োও হয়েছে। আমাদের সাথে বন্দুক না থাকলেও লোকটা একা আর আমরা তিনজন। আমরা যদি কবরখানা খুঁজতে যাই তবে ও আমাদের বাধা দেবে কি ভাবে? আমার ধারণা বারকিনরা প্রথমে এখানে আসার পর কোনো ভাবে খাদ্য বা পানীয়তে কোনো কিছু মিশিয়ে অজ্ঞান করে তাদের হাত-বাঁধা হয়েছে। তাছাড়া লোকটা আমাদের চোখ বাঁধবে বলল। তারপর যদি ওর অন্যকিছু মতলব থাকে?”
হেরম্যান একটু চুপ করে থেকে বললেন ‘তোমার কথার মধ্যে সত্যি থাকতে পারে। তবে লোকটাকে এখন বিশ্বাস করতে হবে। জোর করে কিছু করতে গেলে অন্য কোনো বিপদ আসতে পারে। তোমার জন্যই ম্যামথগুলোকে দেখতে পেলাম আমরা। এ জন্য ফিরে গিয়ে যে টাকা তোমাকে দিয়েছি তার আরও দ্বিগুণ টাকা দিয়ে তোমাকে পুরষ্কৃত করব। এ ব্যাপারে নিশিন্ত থাকো।’
হাসি ফুটে উঠল লুমানির মুখে। সে বলল ‘তবে তাই হবে বাওয়ানা।’
পরপর দুটো রাত জেগেছে তারা। নিশ্চিত ভাবে আজকের রাতও জাগতে হবে। ঘুমিয়ে নেবার প্রয়োজন আছে। সঙ্গে থাকা সামান্য কিছু খাবার আর জল খেয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল হেরম্যান আর সুদীপ্ত। হেরম্যান বললেন দেওয়ালের গায়ে আঁকা ম্যামথের ছবি আর ও জায়গাটা দেখে আমি একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে এ জায়গায় এক সময় প্রাচীন মানুষের বসবাস ছিল। যখন মানুষ গুহাবাসী হয়েছে, আগুন জ্বালাতে শিখেছে। পাথর ঘসে অস্ত্র বানাতে শিখেছে, তারপর ছবি আঁকতেও শিখেছে। আফ্রিকা মহাদেশকে আমরা অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ বললেও আদি মানবগোষ্ঠীর অনেকের উৎপত্তি এ মহাদেশেই।’
নানা কথা আলোচনা করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুম নেমে এল তাদের চোখে।
সুদীপ্তদের ঘুম ভাঙল সেই বাঁদরগুলোর চিৎকারে—ওলা ওলা ওলা ওলা!
তারা যখন বাইরে এসে দাঁড়াল তখন সূর্য অস্ত গেছে। পাহাড়ের ফাঁক গলে সূর্যের লাল আভাটুকু ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশ ঘেরা বৃত্তাকার চত্বরে। সেখানেই এসে জমা হয়েছে বাঁদরগুলো। দিন শেষে সুর করে ডাকছে তারা। হেরম্যান বললেন বেশ কিছু প্রজাতির বাঁদর ও পাখি সূর্যাস্তের সময় এমন ডাকে। বিশেষত যারা গোষ্ঠীবদ্ধ প্রাণী। ও ডাক ডেকে তারা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে দূরে ছিটিয়ে থাকা অন্যদের এক সাথে ঘরে ফেরার আহ্বান জানায়। এই ডাক অনেকটা টাইমক্লকের মতো ব্যাপার।’ সুদীপ্ত চারপাশে তাকিয়ে বলল “কিন্তু লুমানি কোথায় গেল?”
হেরম্যান বললেন “আশেপাশে কোথাও গেছে হয়তো। কবরখানায় যাচ্ছি না শুনে প্রথমে ও বিমর্ষ হয়েছিল, তারপর টাকাটা দেব শুনে খুশি হল।
তাদের গুহাটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল সুদীপ্তরা। ধীরে ধীরে বাঁদরগুলোর ডাক থেমে গেল। লাল আভাটুকুও মুছে যেতে শুরু করল। বাঁদরগুলোও ধীরে ধীরে চত্বর ছেড়ে প্রবেশ করতে লাগল আশেপাশের পাথুরে দেওয়ালের খোপগুলোতে। সুদীপ্তরা বুঝতে পারল ওগুলো আসলে বাঁদরদের রাত্রিবাসের জায়গা। শূন্য হয়ে গেল চত্বর। আর এরপরই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসতে লাগল। আবার তাদের ঘরের মতো জায়গাতে ঢুকে পড়ল সুদীপ্তরা। হেরম্যান তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট ব্যাটারি ল্যাম্প বার করে জ্বালালেন।
হেরম্যান বললেন ‘কি ইচ্ছা হচ্ছে জানো? যাবার আগে যদি শেষবারের জন্য ম্যামথগুলোকে দেখে যেতে পারতাম।’
সুদীপ্ত বলল ‘হাতিদের কবরখানাটাও দেখা হল না।’
হেরম্যান হেসে বললেন ‘তা হল না, তবে তোমাকেও গুপ্তধনের ভুতে পেল নাকি?’
সুদীপ্ত মজা করে বলল “তা পেলে মন্দ হত না।”
বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল তারা। বাইরে অন্ধকার নেমে গেছে। হেরম্যান এক সময় বললেন “কিন্তু লুমানি কই? সে এখনও এল না কেন?
সুদীপ্ত বলল ‘চলুন, আলোটা নিয়ে বাইরে একবার দেখে আসি?’
হেরম্যান বললেন ‘হ্যাঁ, চলো।’
আলোটা নিয়ে তারা দুজন উঠে দাঁড়াল। ঠিক সেই সময় ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল সেই মুখোশ আঁটা মানুষ। হেরম্যানদের উদ্দেশ্য সে বলল ‘একটু পরে চাঁদ উঠলেই আপনাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। সকালের আলো ফুটতেই আপনারা পাহাড়ের বাইরে বেরিয়ে যেতে পারবেন। তবে আপনাদের চোখ বাঁধা থাকবে।’
সুদীপ্ত বলল ‘কিন্তু চোখ বাঁধা অবস্থায় আমরা যাব কীভাবে?”
লোকটা বলল ‘আপনাদের হাতে একটা দড়ি ধরা থাকবে। তার অন্য প্রান্ত ধরে কেউ আপনাদের পথ দেখাবে।
এ কথা বলার পর চারপাশে তাকিয়ে লোকটা বলল ‘তোমাদের সেই সঙ্গী কই? মাসাই গাইড?’
হেরম্যান বললেন ‘হয়তো এখানেই কোথাও আছে। তাকেই আমরা খুঁজতে যাচ্ছিলাম।’
‘খোঁজার দরকার নেই। সে আমাদের সাথেই আছে।’ গুহার বাইরে থেকে প্রথমে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল। আর তার পরই প্রবেশ করল শিকারি ফাউলিং আর তার পিছন পিছন বারকিন আর লুমানি
ফাউলিংদের দেখে মুখোশধারী বিস্মিতভাবে বলে উঠল ‘তোমরা মুক্ত হলে কীভাবে? বাঁধন খুলল কে?’
লুমানি প্রথমে লোকটার উদ্দেশে জবাব দিল ‘আমি খুলেছি। তারপর সুদীপ্তদের দিকে তাকিয়ে বলল কবরখানার কাছে এসে খালি হাতে আমি ফিরে যাব না। তাই বাওয়ানাদের খুঁজে বার করে মুক্ত করলাম।’
ফাউলিং এরপর হেরম্যানের উদ্দেশ্যে বললেন হ্যাঁ, মিস্টার হেরম্যান। ব্যপারটা আমি আগে না জানলেও এখন যখন জেনেছি তখন ওই রাজঐশ্বর্যের এত কাছে এসে ফিরে যাওয়া অর্থহীন। আপনারা আমাদের সঙ্গী হন। দু-পক্ষের আধাআধি বখরা হবে। আর এই লোকটা আমাদের সেখানে নিয়ে যাবে।”
ফাউলিং-এর কথা শুনে হেরম্যান শান্তভাবে বললেন ‘দেখুন মিস্টার ফাউলিং। আমরা এখানে লুট করতে আসিনি। যে কারণে এসেছিলাম সে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখান থেকে এবার খুশি মনে ফিরে যাচ্ছি আমরা।’
মুখোশপরা লোকটা এবার বলে উঠল ‘আমি তোমাদের সে গেরস্তানে নিয়ে যাব না!’
ফাউলিং বলে উঠলেন ‘আলবাত নিয়ে যাবে।’ সুদীপ্তরা দেখতে পেল ভোজবাজির মতো ফাউলিং-এর হাতে উঠে এসেছে একটা রিভলবার!
সুদীপ্ত বলে উঠল ‘এসব আপনি কি করছেন ফাউলিং। ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা ভাবুন।’
ফাউলিং হিমশীতল কণ্ঠে বললেন ‘ব্যাপারটা ভাবা হয়ে গেছে আমার। শেষ বারের জন্য প্রশ্ন করছি ‘কি করবে তোমরা?”
হেরম্যান বললেন ‘আমাদের বক্তব্য জানিয়ে দিয়েছি। আপনাকেও এ কাজ করতে বারণ করছি।’
লোভ মানুষকে সত্যি বিপথগামী করে। ফাউলিং-এর নির্দেশ শুনে সুদীপ্তদের দিকে দড়ি হাতে প্রথমে এগিয়ে এল লুমানিই। যার সাথে, যাকে বিশ্বাস করে এতটা পথ এসেছে সুদীপ্ত আর হেরম্যান। সম্পদের স্বপ্নে বিভোর লুমানির চোখ জ্বলজ্বল করছে। ও যেন এক অন্য লুমানি!
লুমানি প্রথমে সুদীপ্তর দিকে এগিয়ে আসতেই সেই মুখোশধারী লোকটা এসে সুদীপ্ত আর লুমানির মাঝে পথ আটকে দাঁড়াল। সেই হাতির দাঁতের স্বপ্ন যেন পাগল করে দিয়েছে লুমানিকে। যে সজোরে ধাক্কা মারল মুখোশধারীকে। ঘরের এক কোণে ছিটকে পড়ল লোকটা। মুখোশটাও খসে গেল লোকটার মুখ থেকে! তার মুখের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল সুদীপ্তরা। এমনকি তাতে দেখে ফাউলিং…বারকিন আর লুমানিও আশ্চর্য হয়ে গেল। মুখোশের আড়ালে যে লুকিয়ে ছিল সে পুরুষ নয় একজন নারী! বলি রেখা আঁকা মুখ তার। বৃদ্ধাই বলা যেতে পারে। সুদীপ্তরা বুঝতে পারল, পাছে তাকে নারী হিসাবে বোঝা যায় স্বর শুনে তাই গলার স্বর বিকৃত করে কথা বলছিল মহিলা। তাই তার গলা অদ্ভুত শোনাচ্ছিল।
প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ফাউলিং বললেন ‘এ যে লেডি টারজন দেখছি। কিন্তু মহিলা বলে কোনো রেয়াত করা হবে না। এই বলে ছাদের দিকে পিস্তল তুলে একটা গুলি চালালেন ফাউলিং। প্রচণ্ড শব্দ আর ধোঁয়ায় ভরে গেল গুহাটা। ছাদের সঙ্গে বুলেটের সংঘর্ষে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ ঝিলিক দিয়ে উঠল। কিন্তু এরপরই যেন জেগে উঠল পাহাড়ের গায়ে খুপরিগুলোতে আশ্রয় নেওয়া বাঁদরের দল। ‘ওলা ওলা’ শব্দ উঠল বাইরে। আর তার সঙ্গে শোনা যেতে লাগল ‘বৃংহতি’-হাতির চিৎকার। ম্যামথের ডাক? ফাউলিং এরপর সুদীপ্ত- হেরম্যান আর মাটিতে পড়ে থাকা সেই মহিলার উদ্দেশ্যে বললেন ‘কেউ বাধা দিলেই দ্বিতীয় গুলিটা তাকে চালাব।’ তারপর তিনি সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বললেন ‘সময় নষ্ট করা যাবে না। বেঁধে ফেল ওদের।’
বারকিন আর লুমানি এরপর কাছে এসে বাঁধতে শুরু করল হেরম্যান আর সুদীপ্তকে। সম্ভবত এই দড়িগুলো দিয়েই বাধা হয়েছিল ফাউলিং আর বারকিনকে। দড়ি বাঁধার সময় বাইরে নানা শব্দও শুনতে পেল সুদীপ্তরা। তাদের মনে হতে লাগল বাঁদরগুলো যেন এ দিকে ছুটে আসছে!
তাদের অনুমান যে সত্যি তার এরপরই প্রমাণিত হল এক নৃশংস ঘটনার মধ্যে দিয়ে। সুদীপ্তদের হাত-পা বেঁধে ঘরের মেঝেতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার পর ফাউলিং মাটিতে পড়ে থাকা মহিলাকে বললেন ‘উঠে দাঁড়াও। আমাদের নিয়ে যেতে হবে সেই গোরস্তানে। মহিলা চুপ করে রইলেন।
আর এরপরই অস্পষ্ট শব্দ শুনে পিছনে তাকালেন ফাউলিং আর তার সঙ্গীরা। সুদীপ্তরাও দেখতে পেল বাইরে থেকে দরজার মতো জায়গাটা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে বেশ কিছু বাঁদরের মুখ। কৌতূহলী হয়ে গুহার ভিতর তাকাচ্ছে তারা!
কিন্তু তাদের দেখেই ফাউলিং যেন প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। তাদের দিকে একটা গুলি চালিয়ে দিলেন তিনি। ‘ওলা-থা- থা’—বলে আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ল একটা গুলিবিদ্ধ বাঁদর। প্রাণভয়ে বাঁদরের দল এবার ছুটতে শুরু করল বাইরের অন্ধকারে। মাটিতে পড়ে থাকা মহিলা এবার আর্তনাদ করে বলে উঠলেন ‘ওদের মেরোনা, মেরোনা। আমি তোমাদের সে জায়গাতে নিয়ে যাচ্ছি। যত ইচ্ছা হাতির দাঁত নিয়ে যাও তোমরা।’ মহিলা কণ্ঠেই কথাগুলো বললেন তিনি।
ফাউলিং-এর মুখে ধূর্ত হাসি ফুটে উঠল। লোভে চকচক করছে বারকিন আর লুমানির চোখ। ফাউলিং মহিলাকে বললেন ‘উঠে পড়ো। কিছুক্ষণের মধ্যে মহিলার কোমরে পিস্তল ঠেকিয়ে অনুচরদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন ফাউলিং। বেরোবার সময় বাতিটা তুলে নিয়ে হেরম্যানের গায়ে ইচ্ছাকৃত ভাবেই যেন পা দিয়ে ঠোকোর মেরে গেল বারকিন। অন্ধকার ঘরটাতে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রইল সুদীপ্ত আর হেরম্যান।
বেশ কিছুক্ষণ অন্ধকার ঘরে চুপচাপ শুয়ে থাকার পর হেরম্যান বললেন ‘লোভ মানুষকে কোথায় টেনে নামায় এটাই তার নিদর্শন। বিশেষত লুমানির কথাটা তুমি ভাবো। মহিলা ঠিকই বলেছেন। সভ্য পৃথিবীর মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই।”
সুদীপ্ত বলল ‘কিন্তু ওই বৃদ্ধা কে? এভাবে একলা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাতি আর বাঁদরদের মধ্যে পড়ে আছেন?’ হেরম্যান বললেন ‘জানি না। আপাতত এখন আমাদের ভোরের আলো ফোটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারপর দেখা যাক কি হয়?’
নিশ্চুপ ভাবে ঘরের মধ্যে পড়ে থেকে ভবিষ্যতের কথা অনুমান করার চেষ্টা করতে লাগল হেরম্যান আর সুদীপ্ত। বাইর চাঁদ উঠতে শুরু করল। পূর্ণিমার চাঁদ। সেই আলো প্রবেশ করতে লাগল ঘরের মধ্যে।
হঠাৎই কতগুলো মুখ ঘরের মধ্যে উঁকি মারতে লাগল দরজার মতো জায়গাটা দিয়ে। সেই বাঁদরের দল আবার ফিরে এসেছে। সুদীপ্তদের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে তারা। সুদীপ্তরা উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।
বাঁদরগুলো মনে হয় বুঝতে পারল ব্যাপারটা। ভয় ভেঙে কয়েকটা বাঁদর প্রবেশ করল ঘরের মধ্যে। যদি বাঁদরগুলো বুঝতে পারে তাই হেরম্যান কোনোক্রমে হাত তুলে হাতে বাঁধা দড়িটা দেখাতে লাগলেন। আর তাতে কাজ হল কিছুক্ষণের মধ্যে। একটা বাঁদর কাছে এসে হেরম্যানের হাতে দড়ির গিঁটটা দাঁত দিয়ে কাঁটার চেষ্টা করতে লাগল। হেরম্যানও চাপ দিয়ে দড়িটা ছেঁড়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পট করে দড়িটা ছিঁড়ে গেল। এরপর নিজের দড়ি খুলে তারপর সুদীপ্তকে বাঁধন থেকে মুক্ত করতে বেশি সময় লাগল না হেরম্যানের। উঠে দাঁড়াল সুদীপ্তরা। তারপর বাঁদরগুলোর সাথে গুহার বাইরে বেরিয়ে এল।
বাইরে বেরিয়ে একটা আশ্চর্য দৃশ্য চোখে পড়ল তাদের। সামনেই চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে সেই ম্যামথ দুটো। আর তাদের ঘিরে বাঁদরের দল। সুদীপ্তদের দেখেই কিছুক্ষণের মধ্যে মাটিতে বসে পড়ল ম্যামথগুলো। আল সুদীপ্তদের উদ্ধারকারী বাঁদরগুলোর মধ্যে দুটো বাঁদর ছুটে গিয়ে ম্যামথদুটোর পিঠে উঠে বসল। আর তারপর যেন অঙ্গভঙ্গি করে সুদীপ্তদের ডাকতে থাকল! হেরম্যান বিস্মিতভাবে বললেন ‘ওরা আমাদের ম্যামথগুলোর পিঠে উঠতে বলছে!
সুদীপ্ত বলল ‘আমারও তাই মনে হয়। ম্যামথ হলেও ওরাও নিশ্চয়ই সুশিক্ষিত। যা আছে কপালে, চলুন উঠে পড়ি। দেখি ওরা আমাদের কোথায় নিয়ে যায়?’
সাহসে ভর দিয়ে হাতি দুটোর কাছে উপস্থিত হল তারা। তারপর তাদের বড় বড় লোম আঁকড়ে ধরে দুটো হাতির পিঠে উঠে বসল দুজন। একটা করে বাঁদরও আছে তাদের সাথে। ম্যামথ দুটো এবার উঠে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করল। আর তার সাথে বাঁদরগুলোও। এ জীবনে বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে সুদীপ্তদের। কিন্তু তারা কোনোদিন ম্যামথের পিঠে চাপবে এ ভাবনা তারা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। চন্দ্রালোকে সুদীপ্তদের পিঠে নিয়ে এগিয়ে চলল প্রাগৈতিহাসিক দুই হাতি।
হাতি দুটো প্রথমে চত্বর সংলগ্ন সেই বিরাট গুহাটার মধ্যে প্রবেশ করল। কিছুক্ষণের জন্য সুদীপ্তদের চোখের সামনে থেকে মুছে গেল সবকিছু। তারপর আবার গুহার অপর প্রান্ত দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। চন্দ্রালোকে সুড়ঙ্গর মতো পথ ধরে চলতে লাগল তারা। পথের দু-পাশে খাড়া দেওয়াল। হাতিগুলোর পিঠ পর্যন্ত উঁচু সেগুলো। অনায়াসেই হাতির পিঠ থেকে তার ওপর চড়ে বসা যায়। ম্যামথ দুটো চলতে চলতে মাঝেমাঝে হঠাৎ দাঁড়িয়েও পড়ছে। বাতাসে শুঁড় তুলে কোনো কিছুর উপস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। তারপর আবার এগোচ্ছে। পেরিয়ে যাচ্ছে নানা বাঁক। এতগুলো প্রাণী পথ চলছে কিন্তু কোনো শব্দ নেই। সুদীপ্তর মনে হতে লাগল যেন সে কোনো স্বপ্ন দেখছে অথবা টাইম মেশিন চড়ে পৌঁছে গেছে কোন সুদূর অতীতে। এই প্রাগৈতিহাসিক দুটো হাতি, এই জ্যোৎস্না বিধৌত নেড়া পাহাড়, সত্যিই যেন এ এক অচেনা পৃথিবী!
একের পর এক বাঁক অতিক্রম করে পাহাড়ের গোলোক ধাঁধার ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলার পর হঠাৎই এক জায়গাতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হাতি দুটো। শুঁড় তুলে বাতাসে তার গন্ধ শুকতে লাগল। বাঁদরগুলোর মধ্যেও যেন কেমন চঞ্চলতা লক্ষ করল সুদীপ্তরা। শব্দ না করলেও যেন উত্তেজিত হয়ে উঠেছে প্রাণীগুলো। তারা যেখানে এসে থেমেছে সে জায়গাতে চারদিক থেকে চারটে পথ এসে মিশেছে। পথগুলোর দু-পাশেই হাতির পিঠ সমান উঁচু চওড়া প্রাচীর! হঠাৎই উলটোদিকের একটা পথের দিকে বাঁদরের দল ঘুরে দাঁড়াল। হাতির পিঠ থেকে সুদীপ্ত আর হেরম্যান দেখতে পেল সে পথ থেকে একটা আলোক বিন্দু যেন এগিয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই সুদীপ্তরা বুঝতে পারল ওটা কীসের আলো! ওটা তাদের সেই ব্যাটারি লণ্ঠনটা। ফাউলিংরা আসছে সেই বৃদ্ধাকে নিয়ে!
বাঁদরগুলো এবার পথের দু-পাশের প্রাচীরের ওপর উঠে শুয়ে পড়তে লাগল। হাতি দুটো প্রাচীরের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হল না হেরম্যানদের। প্রাচীরের ওপরে উঠে তারা লম্বাভাবে শুয়ে পড়ল। তাদের নামিয়ে দিয়ে ম্যামথ দুটো পিছু হটতে শুরু করল গলির ভিতর। ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল সেই আলোক বিন্দু। এক সময় খুব কাছে এসে পড়ল তারা। প্রথমে বাতি হাতে বারকিন। তার পিছনে সেই বৃদ্ধা। তার কয়েক হাত পিছনে পিস্তল হাতে ফাউলিং লুমানিকে নিয়ে।
চার রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছল তারা। ওপর দিকে দৃষ্টি নেই তাদের। তাদের চোখ সামনের দিকে। যে পথে সেই হাতির গোরস্থানের দিকে ফাউলিংদের নিয়ে চলেছেন সেই অসহায় বৃদ্ধা। দেওয়ালের মাথার মাঝে মিশে শুয়ে আছে সুদীপ্ত আর বাঁদরগুলো। চারটে রাস্তার মুখে ছোট্ট জায়গাতে এসে কয়েক মুহূর্তর জন্য থামল সবাই। সুদীপ্তরা স্পষ্ট শুনল ফাউলিং কর্কশ স্বরে বৃদ্ধাকে বলল ‘এবার কোন দিকে? ভুল পথে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলে বাঁদরগুলোর মতো গুলি করে মারব তোকে।’
বৃদ্ধা আঙুল তুলে সবচেয়ে সরু যে পথটা আছে সেটা দেখালেন। আলো হাতে সবার প্রথমে বারকিন সে পথে প্রবেশ করল, তারপর সেই বৃদ্ধা। এরপর যখন ফাউলিং লুমানিকে নিয়ে সে পথে ঢুকতে যাচ্ছে তখন হঠাৎই এক সাথে বাঁদরগুলো উঠে দাঁড়াল। তারপর নীচে ঝাঁপ দিল ফাউলিং আর লুমানিকে লক্ষ করে। মাথার ওপর থেকে এভাবে উড়ন্ত বিপদ নেমে আসবে তা ভাবতে পারেননি ফাউলিংরা। টাল সামলাতে না পেরে ফাউলিং আর লুমানি মাটিতে পড়ে গেল। ফাউলিং-এর হাত থেকে ছিটকে পড়ল পিস্তল। প্রচণ্ড শব্দ তুলে একটা গুলি ছিটকালো। মুহূর্তর মধ্যে একটা নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হল সেখানে। ফাউলিংদের চিৎকার আর বাঁদরগুলোর ‘ওলা ওলা’ ডাকে রাত্রির নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যেতে লাগল। গলিতে ঢুকে পিছন ফিরে বেরিয়ে এলেন সেই বৃদ্ধা আর বারকিনও। আর কাল বিলম্ব না করে ওপর থেকে বারকিনকে ধরার জন্য লাফ দিল সুদীপ্ত আর হেরম্যানও সুদীপ্ত বারকিনের ওপর গিয়ে পড়ল। দুজনেই গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। বারকিনের হাতে ধরা বাতিটা মাটিতে আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। ঝটাপটি শুরু হল দুজনের মধ্যে হেরম্যান আড়াল করে দাঁড়ালেন সেই বৃদ্ধাকে। ওদিকে ফাউলিং আর লুমানিকে আঁচড়ে কামড়ে ফালা ফালা করতে শুরু করেছে বাঁদরগুলো। ঝাঁকে ঝাঁকে বাঁদর উন্মত্ত ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তাদের ওপর। আর তার সাথে হিংস্র ওলা ওলা চিৎকার। ফাউলিংদের টেনে নিয়ে তারা ঢুকে গেল একটা গলির ভিতর।
সুদীপ্ত আর বারকিনও মাটিতে গড়াগড়ি দিতে দিতে সরে যাচ্ছে সুদীপ্তদের সেই গলির মুখটাতে। কখনও সুদীপ্ত উঠে বসছে বারকিনের বুকে, আবার কখনও বারকিন সুদীপ্তর ওপর সুদীপ্ত এক সময় বারকিনের বুকের ওপর উঠে বসে তার গলা চেপে ধরল। সেই চাপে বারকিন যেন নেতিয়ে পড়তে লাগল। চোখ বুজে আসতে লাগল তার। কাউকে খুন করা সুদীপ্তর উদ্দেশ্য নয়। বারকিনের চাতুরি বুঝতে না পেরে হাতটা একটু শিথিল করতেই পা দিয়ে সুদীপ্তকে বুকের ওপর থেকে ছিটকে ফেলে মাটি থেকে কি যেন একটা কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল বারকিন। সুদীপ্তও তার পরমুহূর্তে বারকিনের মুখোমুখি উঠে দাঁড়াল ঠিকই কিন্তু সে দেখতে পেল চাঁদের আলোতে বারকিনের হাতে চক্চক্ করছে একটা পিস্তল! ফাউলিং-এর হাত থেকে খসে পড়া পিস্তলটা কুড়িয়ে নিয়েছে সে। গলির দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো জ্বলছে। সুদীপ্তদের উদ্দেশ্যে হিসহিস করে সে বলল ‘যাবার আগে তোদের মেরে যাব আমি।’
পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সুদীপ্তরা। কাছে বাঁদরগুলোও নেই। ফাউলিংদের নিয়ে তারা গলির ভিতর ঢুকে গেছে! সেখান থেকে তাদের বীভৎস চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
বারকিনের কথা শুনে বৃদ্ধ বলে উঠলেন ‘তবে আমাকে আগে মারো।’
বারকিন হিংস্রভাবে হেসে উঠে বলল ‘তবে তাই হোক।’
বারকিনের পিস্তলের নল ঘুরে গেল সেই বৃদ্ধা আর হেরম্যানের দিকে। হেরম্যান আগলে আছেন বৃদ্ধাকে। গুলি করলে আগে তাকেই মারতে হবে। বারকিনের পিস্তলের নল স্থির হল হেরম্যানের বুক লক্ষ করে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা কালো অজগর সাপ যেন গলির অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল বারকিনের কোমর। তারপর তাকে শূন্যে তুলে নিল। বারকিন সেই অবস্থাতেই গুলি চালাল ঠিকই, কিন্তু তা হেরম্যানেদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পাথরের দেওয়ালে লাগল। ম্যামথের বিশাল শুঁড়টা বারকিনকে বেশ শূন্যে ঘুরিয়ে আছাড় মারল পাথরের দেওয়ালে। বারকিনের শেষ চিৎকার বেশ কিছুক্ষণ ধরে অনুরণিত হতে লাগল নেড়া পাহাড়গুলোর বুকে। ওদিকে অন্য গলির ভিতর থেকে বাঁদরগুলোর ওলা ওলা ডাকও যেন এবার উল্লাসধ্বনিতে পরিণত হল। শত্রু নিধন করেছে তারাও। বৃদ্ধা মাথা নেড়ে আপশোসের স্বরে বললেন ‘জঙ্গলের এটাই আইন। সঙ্গীদের হত্যার প্রতিশোধ নিল ওরা। লোভের জন্য প্রাণ গেল লোকগুলোর।’
বাঁদরগুলোর উল্লাসধ্বনি এক সময় থেমে গেল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। চন্দ্রালোকে বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে রইল সবাই। ফাউলিং-লুমানি-বারকিন যত খারাপ লোকই হোক না কেন যেকোনো মানুষের মৃত্যুই বেদনাদায়ক।
হেরম্যান এক সময় বৃদ্ধাকে বললেন ‘চলুন, এবার তবে আমাদের ফেরার ব্যবস্থা করুন।’
মৃদু হাসলেন বৃদ্ধা। তারপর তিনি বললেন ‘হ্যাঁ, করব। তবে তার আগে তোমাদের সে জায়গা দেখিয়ে আনি। এত কাছে এসে সে জায়গা না দেখে তোমরা ফিরে যাবে?’
সুদীপ্ত আর হেরম্যান বিস্মিত হয়ে গেল বৃদ্ধার কথা শুনে। সুদীপ্তদের তাকে অনুসরণ করতে বলে ধীর পায়ে এগোলেন বৃদ্ধা। তার পিছন পিছন পাথুরে পথের গোলকধাঁধা দিয়ে এগোতে লাগল সুদীপ্তরা। চাঁদও যেন মাথার ওপর দিয়ে ভেসে চলল তাদের সাথে।
