প্রেত লামার মন্দির – ৮
৮
প্রফেসর জুয়ান যখন বাড়ি ফিরলেন তখন বিকাল চারটে বাজে। তিনি ঘরে ঢুকতেই দীপাঞ্জন প্রশ্ন করলেন কী কাজে গেছিলেন? কাজ হল?
দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে প্রফেসর জুয়ান বললেন ‘কী কাজে গেছিলাম তা একটু পর জানতে পারবে। হ্যাঁ কাজ হল। আচ্ছা তুমি তোমার ফোন থেকে দেখোতো যে কাল ঠিক কটার সময় অবনী জোয়ারদারের ফোনটা এসেছিল?’
দীপাঞ্জন মোবাইল ফোনের কললিস্ট চেক করে বলল, ‘রাত তিনটে পাঁচ।’
জুয়ান শুনে বললে ‘যদি ধরে নেওয়া যায় যে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি সোজা জঙ্গলের মধ্যে মন্দিরে গিয়ে ঢোকেন, এবং তারপরই তিনি আক্রান্ত হন তবে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে তিনি আড়াইটা নাগাদ এই বাড়ি ছেড়েছিলেন।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘হ্যাঁ, হিসাবে তাইতো বলছে।’
জুয়ানের মুখে যেন মুহূর্তের জন্য একটা আবছা হাসি ফুটে উঠল। এরপর তিনি বললেন, “খুব খিদে পেয়েছে। কিছু আছে? নাকি সবটা খেয়ে ফেলেছ?’
দীপাঞ্জন বলল ‘আছে। কিন্তু ঠান্ডায় জমে রুটিগুলো মনে হয় চামড়ার মতো শক্ত হয়ে গেছে। ডালও বরফ হয়ে গেছে।’
জুয়ান বললেন, ‘ওতেই আমার চলে যাবে।’—এই বলে তিনি টেবিলের কাছে গিয়ে সেই ঠান্ডা ডাল আর শক্ত রুটিই খেতে শুরু করলেন।
খাওয়া শেষ হল জুয়ানের। মুখ হাত ধুয়ে তিনি তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসলেন। দীপাঞ্জনও তার পাশে গিয়ে বসল। তারপর প্রশ্ন করল, ‘আপনি কী কাজে গেছিলেন বললেন না তো?’
জুয়ান বললেন, ‘আর সামান্য সময় ধৈর্য ধরো জানতে পারবে।’ –এই বলে তিনি তাকিয়ে রইলেন দূরে পর্বতশ্রেণির দিকে। বিকাল হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে দিন শেষের সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে পাহাড়ের মাথায়। দীপাঞ্জনও তাকিয়ে রইল সে দিকে।
ঠিক পাঁচটায় ঘরের দরজাতে টোকা দেবার শব্দ কানে এল। মিসেস অ্যানের লাঠির টোকা। শব্দটা পেয়ে বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকল তারা। দীপাঞ্জন দরজা খুলল। চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন মেরী অ্যান। গম্ভীর, বিষণ্ণ মুখ। তাঁকে দেখে দীপাঞ্জনের মনে হল, তিনি এখনও অবনীবাবুর মৃত্যুর ধকলটা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। নিশ্চুপভাবে টেবিলের ওপর ট্রে-টা নামিয়ে রাখলেন অ্যান। তারপর তিনি ঘর ছাড়ার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন! কিন্তু জুয়ান তাঁকে বললেন ‘আপনার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে?”
‘বলুন?’-লাঠিতে ভর দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন অ্যান।
জুয়ান বললেন ‘এ ভাবে হবে না। বসে কথা বলতে হবে।’
‘আচ্ছা” বলে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন অ্যান। দীপাঞ্জন আর জুয়ান দুটো চেয়ার টেনে তার মুখোমুখি বসল।
জুয়ান তাঁকে প্রথমে প্রশ্ন করলেন, ‘কাল রাতে বাড়ির বাইরে কোনো ডাক শুনেছিলেন? অনেক সময় অচেনা লোকজন রাতে বাড়ির আশেপাশে ঘুরলে কুকুর ডাকে।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘না, শুনিনি, কারণ গ্রামে দু-চারটে কুকুর থাকলেও আমার বাড়ির এখানে কোনো কুকুর আসে না। কাজেই রাতে বাড়ির বাইরে কেউ এলেও কুকুর ডাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেন? আপনার কি মনে হয় যে বাড়ির কাছাকাছি কেউ এসেছিল?’
জুয়ান বললেন, ‘আসতেও তো পারে। তাই জিজ্ঞেস করলাম।’
জুয়ান এরপর জানতে চাইলেন, ‘আপনি আজ কখন ঘুম থেকে উঠে সদর দরজার তালা খুলেছিলেন? তারপর কখন দেখলেন তিনি নেই?”
বৃদ্ধা বললেন ‘ঘুম থেকে আজ একটু সকাল সকালই উঠেছিলেন। ওই ছটা নাগাদ ই হবে। তারপর দরজার তালা খুলি। এরপর ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে পোশাক পালটিয়ে কিচেনে ঢুকি। বেশ কিছু কাজ ছিল কিচেনে। তারপর সাতটা নাগাদ যখন আপনাদের জন্য চা নিয়ে বাইরে বেরোই তখন দেখি ওর ঘরের দরজা খোলা, উনি নেই।’
জুয়ান বললেন, “তার মানে আপনিই তালা খুলেছিলেন এটাই সত্যিতো?’
মেরী অ্যান বললেন, ‘হ্যাঁ, খুলেছিলাম। কিন্তু তাতে কি হল?’
জুয়ান বললেন, “কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না যে রাত তিনটে নাগাদ তিনি আমাদের ফোন করেছিলেন। এবং তিনি তখন বাড়ির বাইরে।’
কথাটা শুনে হঠাৎই কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে গেল বৃদ্ধার মুখ। অ্যান প্রশ্ন করলেন, “তিনি কি বলেছিলেন আপনাদের?”
জুয়ান জবাব দিলেন ‘সে কথা আপনাকে পরে বললেও চলবে। কিন্তু দরজাটা আপনি খুলেছিলেন এবং কাল রাতে এই লোকটার সাথে পাইন বনে ঢুকেছিলেন।’
কথাটা শুনে উত্তেজিত ভাবে বৃদ্ধা বলে উঠলেন, ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? এ সব কী গল্প বলছেন?’
জুয়ান শান্ত স্বরে বললেন, ‘যা বলছি ঠিকই বলছি। আপনি পায়ে এখন যে চটি পড়ে আছেন সে চটিটা নতুন। খুব সুন্দর চটি।’
অ্যান বললেন, ‘তার মানে?’
মৃদু হেসে জুয়ান বললেন, ‘মানে হল, কাল ওই মন্দিরে কী হয়েছিল তা আপনি জানেন। আর ঘটনাটা ঘটার পর আপনি দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে আসার সময় চটি খুলে যায় আপনার পা থেকে। হয় অন্ধকারের মধ্যে আপনি চটিটা খুঁজে পাননি অথবা তখন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করার সুযোগ আপনার ছিল না। আপনার বাড়িতে কুকুর আসে না, আপনি নিজেই বললেন। কাজেই আপনার চামড়ার চটি নিশ্চয়ই কুকুর মুখে করে জঙ্গলে নেয়নি।’ এই বলে জুয়ান তার পোশাকের ভিতর থেকে একটা কাগজের মোড়ক বার করলেন। সেটা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল একটা চামড়ার তৈরি লেডিজ চটি! তার অর্ধেক কুকুরে চিবিয়ে ফেলেছে।’
দীপাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে চটিটা দেখিয়ে জুয়ান মৃদু হেসে বললেন ‘এই চটিটা খুঁজতেই আমি জঙ্গলে গেছিলাম। কিন্তু খুঁজে পেতে অনেক দেরি হল। কুকুরটা একটা ঝোপের ভিতর এটা লুকিয়ে রেখেছিল।’
চেয়ার ছেড়ে মাটিতে ভর দিয়ে এবার উঠে দাঁড়ালেন বৃদ্ধা। তারপর উত্তেজিত ভাবে বললেন, ‘আপনারা কি আমাকে ফাঁসাতে চাচ্ছেন? আমি ওকে খুন করতে যাব কেন? জুয়ান বললেন ‘আমাদের বলা আপনার কথার অসঙ্গতি আর এই চটি সেরকমই একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
বৃদ্ধা উত্তেজিত ভাবে বলে উঠলেন, ‘আপনাদের এসব কথা আমি বলেছি তার কি প্রমাণ? এমনও তো হতে পারে যে দরজা আমি খুলিনি। সে নিজেই চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েছিল? আর চটিটাও যে ওখানে পাওয়া গেছে তার এমন কি প্রমাণ আছে? কুকুরতো বাড়ি থেকে চটিটা জঙ্গলে নিয়ে যেতে পারে।’
জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, তা হতে পারে। কিন্তু আপনি যে এসব আমাদের বলেছেন তা হল আমার কোটের পকেট থেকে বাইরে বেরিয়ে থাকা মোবাইল ফোনটা। এর ক্যামেরাতে যে আমাদের কথোপকথন ততক্ষণ ধরে ভিডিও রেকর্ডিং হচ্ছিল। আপনার সব কথা যে ধরা রইল এখানে।’
এবার সত্যিই ফ্যাকাসে হয়ে গেল বৃদ্ধার মুখ। তিনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘বিশ্বাস করুন আমি তাকে খুন করিনি।’
জুয়ান শান্ত স্বরে বললেন, ‘আমি কিন্তু এখনও বলছি না যে খুনটা আপনি করেছেন। কিন্তু আপনি নিশ্চিত ভাবে জানেন যে গত রাতে কী ঘটেছিল।’
প্রশ্ন শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন ভদ্রমহিলা। উত্তেজনায় মৃদু মৃদু কাঁপছেন তিনি।
জুয়ান বললেন, ‘দেখুন পুলিশ আমাদেরও সন্দেহ করছে। আমরা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। আপনি খুন করুন বা না করুন কীভাবে লোকটার মৃত্যু হল তা না বললে আপনি যে কাল পাইনবনে উপস্থিত ছিলেন সে কথাটা আমাদের পুলিশকে বলতেই হবে। আপনি যদি খুন নাও করে থাকেন তবু সন্দেহের বশে পুলিশ আপনাকে অ্যারেস্ট করতে পারে। তারপর কোর্টে যা হবার হবে। নির্দোষ হলে আপনি ছাড়া পাবেন। কিন্তু এই বয়সে যদি সাতদিনও আপনাকে জেলে থাকতে হয় সেটা কি আপনার পক্ষে ভালো হবে?’
কথাটা শুনে ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, ‘বিশ্বাস করুন আমি একে খুন করিনি।’ এবার বেশ নরম শোনাল ভদ্রমহিলার গলা। দীপাঞ্জন এতক্ষণ অবাক হয়ে জুয়ান আর ভদ্রমহিলার কথোপকথন শুনছিল। এবার সে অ্যানকে বলল ‘মেনে নিচ্ছি আপনি অবনীবাবুকে খুন করেননি। আপনাকে ফাঁসাবার কোনো অভিপ্রায় আমাদের নেই। তবে সত্যি কথাটা যদি আপনি আমাদের বলেন তাহলে অন্যায় না করে থাকলে আপনি বিপদমুক্ত হবেন। আমরা কথা দিচ্ছি।’
‘কথা দিচ্ছেন?’ বৃদ্ধা বললেন।
জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।’
লাঠিতে ভর দিয়ে আবার মাথা নীচু করে চেয়ারে বসে পড়লেন ভদ্রমহিলা। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন তিনি। বাইরে পাহাড়ের মাথায় সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। বারান্দার দিক থেকে খোলা দরজা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে শুরু করেছে ঘরে। এক সময় মুখ তুললেন অ্যান। তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, ব্যাপারটা আমি জানি। তবে তাকে কেউ খুন করেনি। নিজের মৃত্যুর জন্য তিনি নিজেই দায়ী।’
কথাটা শুনে জুয়ান বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘তার মানে?’
তিনি বললেন, ‘মানেটা বোঝাতে হলে ওই মন্দিরে নিয়ে যেতে হবে আপনাদের।’
দীপাঞ্জন বলল ‘তবে সেখানেই চলুন।’
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘হ্যাঁ, যাব। তার আগে আমাকে একটু সামলে উঠতে দিন। সূর্য ডুবে যাক। অন্ধকার নামলে আমি আপনাদের ওখানে নিয়ে যাব।’
জুয়ান বললেন “আচ্ছা তাই হবে। আপাতত আপনি এখানেই বসে থাকুন।’
মাথা নীচু করে চেয়ারেই বসে রইলেন বৃদ্ধা। বাইরে সূর্য ডুবতে চলল। অন্ধকার নামতে শুরু করল ঘরের ভিতর। ঘণ্টাখানেক নিশ্চুপ থাকার পর বাইরের দিকে তাকালেন অ্যান। হ্যাঁ, তখন অন্ধকার নেমে গেছে। বৃদ্ধা বললেন, ‘হ্যাঁ, এবার সেখানে যাওয়া যেতে পারে। টর্চ-মোমবাতি নিয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়েছিল দীপাঞ্জনরা। জুয়ান বললেন, হ্যাঁ, চলুন!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল তারা। টর্চ জ্বালালো দীপাঞ্জন। লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলেন মেরী অ্যান। আর দীপাঞ্জনরা অনুসরণ করল তাঁকে।
