Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

প্রেত লামার মন্দির – ১০

১০

বাইরে বেরোতে যাচ্ছিল সবাই। প্রথমে অ্যান আর তার পিছনে পিছনে অন্যরা। সবার শেষে দীপাঞ্জন। হঠাৎ দীপাঞ্জন বলল ‘একটু দাঁড়ান।’

দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই। দীপাঞ্জন অ্যানকে বলল ‘আপনার লাঠিটা একটু দেবেন ম্যাডাম?’

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অ্যান বললেন, ‘লাঠি দিয়ে কী হবে?’

দীপাঞ্জন বলল ‘কঙ্কালটার গা থেকে ঝুলগুলো একটু সরিয়ে দেই।’

বৃদ্ধা বললেন ‘দরকার নেই। ওকে তো একটু পরেই বার করা হবে।’

দীপাঞ্জন বলল যখন হবে তখন হবে। আমি কিছুটা পরিষ্কার করে দিয়ে যাই।’

বৃদ্ধা বললেন ‘বললাম তো থাক। তা ছাড়া আমার লাঠিটা নোংরা হয়ে যাবে।’

জুয়ান বললেন ‘ছেড়ে দাও। উনি যখন চাচ্ছেন না এখন দরকার নেই।’

দীপাঞ্জন জুয়ানকে বললেন, ‘লাঠিটা আমার দরকার আছে। উনি সেটা চান বা না চান।’ দীপাঞ্জনের এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মেরী অ্যান যেন দীপাঞ্জনের মনের কথা ধরে ফেললেন। তাড়াতাড়ি ফোকর গলে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। দীপাঞ্জন বলে উঠল ওনাকে থামাতে হবে। লাঠিটা দেখতে হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে সবাই এগোল তার পিছনে। ছোটঘর ছেড়ে বড় ঘরটাতে পৌঁছল সবাই। অ্যান এখন সে ঘর থেকেও বাইরে বেরোতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দীপাঞ্জনদের সঙ্গী লামার ইশারায় অন্য লামারা ঘিরে ধরল তাকে। মেরী অ্যান পালাবার পথ বন্ধ দেখে ছুটে গিয়ে দাঁড়ালেন ঘরের মাঝখানের মূর্তিটার সামনে

দীপাঞ্জন তার উদ্দেশে বলল ‘লাঠিটা এবার দিন।’

এবার একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল মেরী অ্যানের মুখে। তিনি বলে উঠলেন ‘না, আমি ধরা দেব না।’

আর এ কথা বলার পরই তিনি তার লাঠির বাঁট ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিলেন। লাঠির বাঁটের সাথে বেরিয়ে এল হাতখানেক লম্বা একটা তীক্ষ্ণ লৌহ শলাকা। লুকানো অস্ত্র!

একজন লামা তার হাত থেকে সেটা নিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই তিনি শলাকাটা দু-হাতে ধরে বিধিয়ে দিলেন নিজের বুকে। মাটিতে আছড়ে পরে স্থির হয়ে গেল মেরী অ্যানের শলাকাবিদ্ধ দেহ।

দীপাঞ্জনরা ছুটে গিয়ে দেখল যে দেহে আর প্রাণ নেই। সত্যি সব কিছুকে ফাঁকি দিয়ে পালালেন বৃদ্ধা মেরী অ্যান।

লামার পোশাকে সজ্জিত লোকটা এবার বিস্মিত ভাবে বললেন ‘তবে কি….।’

দীপাঞ্জন বলল ‘হ্যাঁ, আমার ধারণা অ্যানই খুন করেছেন অবনীবাবুকে। তার এই শলাকাটা মূর্তির থেকে বেরিয়ে আসা শলাকার থেকেও বেশি তীক্ষ্ণ। বৃদ্ধার সামান্য আঘাতেই ভিতরে ঢুকে যায়।’

লামা বললেন আপনি কীভাবে বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা?’

দীপাঞ্জন বলল ‘সব বলব। কিন্তু তার আগে আপনার পরিচয়টা আমার জানা দরকার।’

ভদ্রলোক বললেন ‘আমার আসল নাম বিনিত চামলিং। সিকিমে জন্ম। কাজ করি সেন্ট্রাল ইন্টেলেজেন্স ব্যুরোতে। আসলে এই মন্দিরে পরপর হত্যাকাণ্ড কেন্দ্রীয় সরকারেরও টনক নড়িয়ে ছিল। তাই আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছিল ব্যাপারটা অনুসন্ধানের জন্য। তবে সেদিন আপনারা আমাকে জিপে না তুললে শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীদের আসল পরিচয় আমাকে দিতেই হত। যদিও আমার সাথে আইডেনটিটি কার্ড আর রিভলবার ছিল তবুও কোনো অঘটন ঘটেই যেতে পারত। তদন্তের স্বার্থে এমন রিস্ক আমাদের মাঝে মাঝে নিতে হয়। অনুসন্ধান চালানোর জন্যই আমি লামার প্রেতাত্মা সেজে অনুসন্ধানে নেমেছিলাম। লামার পোশাক আর প্লাস্টিকের নকল দাঁত পরেছিলাম। শুধু স্থানীয় থানার কয়েকজন আমার পরিচয় জানত। অন্য লামা যাদের দেখছেন এরাও আসলে পুলিশকর্মী।’

জুয়ান বললেন ‘কিন্তু আপনাকে তো সেদিন আমরা দেখেছি, আবার ফিরে এসে এ মন্দিরে ঢুকেছিলেন। আমরা আপনাকে দেখতে পেয়েছিলাম। তারপর কোথায় উধাও হয়ে গেছিলেন আপনি?’

চামলিং বললেন, ‘হেড কোয়ার্টার থেকে ডাক এসেছিল তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট দেবার জন্য। একদিনের জন্য আমি কালিম্পঙ শহরে গেছিলাম ফ্যাক্স করে দিল্লিতে খবরটা পাঠানোর জন্য। আর তার মধ্যেই অবনী জোয়ারদারের মৃত্যুর ঘটনাটা ঘটে। এবার দীপাঞ্জনবাবু বলুন কী ভাবে আপনি ব্যাপারটা ধরতে পারলেন?

দীপাঞ্জন বলল, ‘মেরী অ্যানের একটা কথায় প্রথমে আমার খটকা লেগেছিল। তিনি বললেন যে মাথাটা ঘোরাবার ফলেই শলাকাবিদ্ধ হয়েছিলেন অবনীবাবু। আমি যখন মূর্তির মাথাটা ঘোরাতে গেলাম তখন বেশ ভালো রকম বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল। প্রফেসর জুয়ানেরও নিশ্চয়ই একই অভিজ্ঞতা?”

জুয়ান জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘অবনীবাবুর বাম হাত টিনের খোঁচায় কেটে গেছিল। সামান্য একটা চেয়ার তিনি হাত দিয়ে সরাতে পারছিলেন না তা আমি আর প্রফেসর জুয়ান দেখেছি। তাঁর পক্ষে কি অমন চাপ দিয়ে মাথাটা ঘোরানো সম্ভব?

দ্বিতীয়ত আপনি বললেন যে, কুলুঙ্গিতে আবার চাপ দিলেই দরজা বন্ধ হয়। অ্যানের স্বামী এই গোপন কক্ষের ভিতরে ঢুকেছিলেন ঠিকই। কিন্তু তিনিতো আর বেরোননি। তবে ওই ফোকরটা কুলুঙ্গিতে চাপ দিয়ে বন্ধ করল কে? অ্যান আমাদের বললেন যে তিনি অগ্নিকাণ্ডের পর এখানে এসে স্বামীর সন্ধান পাননি। কিন্তু গ্রামবাসীরা যদি কুলুঙ্গিতে চাপ দিয়ে দরজাটা বন্ধ করত, তবে তারা নিশ্চয়ই সে সম্পদ উদ্ধার করত। তবে তারা নিশ্চয়ই সে সম্পদ উদ্ধার করত। তবে কি অ্যান তার স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারটা জেনেছিলেন? হেনরী তাকে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে পুরো ব্যাপারটা জানিয়েছিলেন?

এবার আসি সব শেষ প্রসঙ্গে। অ্যান আমাদের নিজেই বললেন যে মূর্তির মাথাটা ঘোরাতে গিয়ে শলাকাবিদ্ধ হয়েছিলেন অবনী জোয়ারদার। তার মানে এখানে লামা বা লাামার প্রেতাত্মার কোনো ব্যাপার নেই। তবে আমাকে ফোন করে ‘লা-লা’ বলে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি? লাঠি নয়তো? লাঠির মধ্যে এমন একটা শলাকাতো লুকিয়ে রাখাই যায়! আমাদের দেশের এ এক প্রাচীন অস্ত্র। যাকে বলে ‘গুপ্তি।’ ব্যাপারটা এমন নয়তো যে অবনীবাবু এ মন্দিরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থর হিসাব মিলছে না বলে যে কথা আমাদের ও অ্যানকে বলেছিলেন তা শুনে অ্যানের আশঙ্কা জেগেছিল যে হয়তো ওই গুপ্তকক্ষ খুঁজে বার করতে পারেন তিনি? তাই তিনি কোনো কৌশলে অবনীবাবুকে এখানে আনেন। হয়তো বা সেই গুপ্তধনের লোভ দেখিয়েই। আমার ধারণা অবনীবাবু যখন মূর্তির মাথাটা ঘোরাতে পারছেন না, ও ভাবে তাঁকে মারা সম্ভব হয়নি তখন অ্যানই তাঁর লাঠিতে লুকানো শলাকাটা বিঁধিয়ে দেন তার বুকে। এবং সম্ভবত সেটা পিছন দিক থেকেই। পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট এলে সেটা পরিষ্কার হবে। তবে মৃত্যুর আগে অবনীবাবু সম্ভবত দেখেছিলেন যে কি অস্ত্রে তাঁকে বধ করা হল। হয়তো অ্যান সেটা অবনীবাবুর দেহ থেকে বার করে আবার খাপে পুরতে যাচ্ছিলেন। মেরী অ্যান কাণ্ডটা ঘটিয়ে আর সেখানে দাঁড়াননি। তিনি ঘর থেকে বেরোবার পরই মৃত্যুপথাত্রী অবনীবাবু আমাকে ফোন করে ওই লাঠির কথাই বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাক্যটা তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। লা…লা…’ মানে লামা নয়, লাঠি। আমরা সবাই যখন ওই গুপ্তকক্ষ থেকে মেরী অ্যানকে নিয়ে বাইরে বেরোতে যাচ্ছি তখনই বিদ্যুৎচমকের মতো শেষ ভাবনাটা আমার মাথায় আসে। আমি কিছুটা অনুমানের ভিত্তিতেই লাঠিটা চেয়ে বসি। তিনি প্রত্যাখ্যান করার পর আমার সন্দেহ দৃঢ় হল। আর তারপর যা ঘটল তাতো আমাদের চোখের সামনেই ঘটল। আমার ধারণা যে গুপ্তধন তার স্বামী অনেক কষ্টে উদ্ধার করেছিলেন, যার জন্য তাঁকে মরতে হয়েছিল সে গুপ্তধন জীবন্ত যক্ষিণীর মতো পাহারা দিতেন বৃদ্ধা মেরী অ্যান। তা অন্য কারো হস্তগত হোক তিনি তা চাননি। সে জন্য মরতে হল অবনী জোয়ারদারকে।’ —এই কথাগুলো বলে থামল দীপাঞ্জন। চামলিং এগিয়ে এসে তারিফের হাত রাখলেন দীপাঞ্জনের পিঠে।

জুয়ান বললেন, পুরো রহস্যটা উদ্ঘাটনের কৃতিত্ব পঞ্চাশ শতাংশ যদি আমার আর মিস্টার চামলিং-এর হয় তবে বাকি পঞ্চাশ শতাংশ কিন্তু তোমার। শেষ রহস্যটা তুমিই উদ্ঘাটন করলে। সেটা আসল রহস্য। আমরা তো শেষ পর্যন্ত মেরী অ্যানকে নিরপরাধই ভেবেছিলাম।’

চামলিং বললেন, ঠিক তাই। আমিও ভেবেছিলাম অবনী জোয়ারদারের মৃত্যুটা একটা দুর্ঘটনা। বৃদ্ধা মেরী অ্যান নির্দোষ।’

দীপাঞ্জন চামলিংকে বলল, ‘আমাদের কাল এ জায়গা ছেড়ে রওনা হতে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা নেই? ব্যাপারটা আপনি স্থানীয় থানাকে বলে দেবেন।’

চামলিং হেসে বললেন ‘না, নেই। আমি বলে দেব।’

মেরী অ্যানের মৃতদেহর বিস্ফারিত চোখ দুটো তখনও তাকিয়ে আছে দীপাঞ্জন আর জুয়ানের দিকে। আর তার সাথে সাথে সেই অপদেবতার ঘাতক মূর্তিটাও।