Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/28
সোমনাথ সুন্দরী – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সোমনাথ সুন্দরী – ১১

১১

বেশ বেলা করেই অঙ্গিরার ঘুম ভাঙল। ত্রিপুরারিদেবের নির্দেশ মতো গত কয়েক রাত ধরে সে টহল দিচ্ছে দেবদাসীদের আবাস সংলগ্ন চত্বরের বাইরের সেই বাগিচাতে ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে। এক রাতে সে দেবদাসীদের কক্ষ ঘেরা সেই অঙ্গণেও প্রবেশ করেছিল। কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়েনি।

শীতের আগমন বার্তা হিসাবে সূর্যাস্তের সময় এগিয়ে এসেছে, সূর্যোদয়ও কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। রাত্রিতে কুয়াশার চাদর নেমে আসছে মন্দিরের মাথায়। রোজ যখন শুকতারা ফুটে ওঠে, শিকলধ্বনি বেজে ওঠে, জেগে উঠতে শুরু করে মন্দির, ঠিক সে সময় কক্ষে ফিরে শয্যা গ্রহণ করে অঙ্গিরা। ঘুম ভাঙতে প্রায় মধ্যাহ্ন হয়ে যায়।

এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। অঙ্গিরা যখন নিদ্রাভঙ্গ করে, শরীর পরিচ্ছন্ন ও ফলাহারের পর কক্ষ ত্যাগ করল তখন সূর্যদেব ঠিক মাথার ওপর। জনপ্লাবিত মন্দির চত্বর, সোমেশ্বর মহাদেবের নামে জয়ধ্বনিতে আকাশবাতাস মুখরিত। অবশ্য আর কিছু সময়ের মধ্যেই বিগ্রহের ভোজনের জন্য গর্ভগৃহর দ্বার বন্ধ হয়ে যাবে।

অতিথিশালা থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে নামার মুখেও একটি ছোট অঙ্গণ আছে। মাথায় তালপাতার ছাউনি দেওয়া বেশ কিছু পাথরের বেদিও আছে সেখানে বসার জন্য। সেখানেই একটা বেদিতে বসল অঙ্গিরা। বাইরের প্রাঙ্গণের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে।

একদল নারী পূজা দিয়ে ফিরছে। স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত বেশ বড় একটা দল। হয়তো দূর দেশ থেকে আসা পুণ্যার্থী তারা। দলের আগে একজন পতাকাবাহী আছে। নারীদের সবার পরনেই নীল রঙের কাপড়। আর তা দেখে সমর্পিতার কথা মনে পড়ে গেল অঙ্গিরার।

সেদিনের সেই দুর্ঘটনার পর প্রতিদিনই সন্ধ্যারতির সময় গর্ভগৃহর সামনে হাজির হয়েছে অঙ্গিরা। গতকালও ছিল। কিন্তু সন্ধ্যারতিতে আর নৃত্য প্রদর্শন করতে আসছে না সমর্পিতা। অঙ্গিরা রোজই তাকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়। এখন সে নিজে বুঝতে পারছে ওই সমর্পিতার টানেই সে রোজ হাজির হত গর্ভগৃহর সামনে।

সে কি অসুস্থ, নাকি ঋতুমতি নাকি অন্য কোনও কারণ আছে তার অনুপস্থিতির পিছনে? ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না অঙ্গিরা। আবার কাউকে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করতেও সংকোচ বোধ করছে।

অঙ্গিরা হঠাৎ দেখতে পেল খগেশ্বরকে। সামনের পথ দিয়ে যাচ্ছিল সে। অঙ্গিরাকে দেখতে পেয়ে প্রথমে থমকে দাঁড়াল। তারপর অঙ্গণে উঠে কিছুটা কৈফিয়তের সুরে বলল, ‘পুরোহিত নন্দিবাহনের কাছে গেছিলাম তার মস্তকে ক্ষুর লেপনের জন্য। প্রধান পুরোহিত আর সহ প্রধান পুরোহিতদের মাথায় এ কাজটা আমাকেই করতে হয়।’ এ কথা বলার পর একটু চাপাস্বরে বলল, ‘তার দেখা পেলেন?’

অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘কার দেখা?’

অঙ্গিরার পাশে বসল খগেশ্বর। তারপর তার হাতে রাখা কাষ্ঠ নির্মিত যে ক্ষুদ্র পেটিকাটা ধরা ছিল সেটা মাটিতে নামিয়ে রেখে বলল, ‘ওই যে সেই প্রেত, যে হানা দিয়েছিল দেবদাসীদের আবাস স্থলে। যাকে ধরার জন্য রাত পাহারাতে আপনাকে নিয়োজিত করেছেন প্রধান পুরোহিত।’

অঙ্গিরা কথাটা শুনে চমকে উঠল। ব্যাপারটা খেয়াল করে খগেশ্বর বলল, ‘আপনাকে বলেছি না, এখানে একটা পাতা নড়লেও সে খবর আমি পাই। যেদিন রাতে সেই প্রেতাত্মাকে দেখা গিয়েছিল সেদিন রাতে তো আপনি প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে দেবদাসীদের আবাসস্থলে গেছিলেন, আর তারপর থেকে তো আপনি প্রতি রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ওখানে।’

খগেশ্বরের কথা শুনে ব্যাপারটা চাপা দেবার জন্য অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি রাতে ওদিকে যাই বটে, তবে তার সঙ্গে সেই প্রেতাত্মাকে সন্ধান করার সম্পর্ক নেই। দেবদাসীদের বাসস্থানের গায়ে এই কাননটা উন্মুক্ত ও জনমানবহীন বলে রাত্রিতে আমি মন্দিরের ওই অংশে তিরন্দাজি অনুশীলন করতে যাই। প্রধান পুরোহিত আমাকে ওই স্থান নির্বাচন করে দিয়েছেন এটা অবশ্য সত্য কথা।’

নরসুন্দর অধিপতি কথাটা শুনে মৃদু হাসল। তার মুখ দেখে অঙ্গিরার মনে হল, ব্যাপারটা সে বিশ্বাস করেনি। খগেশ্বর এরপর স্বগোতক্তির স্বরে বলল, ‘আমি শুধু ভাবছি ওই প্রেত কে হতে পারে? হাঁ, একথা ঠিকই যে মানুষের মৃত্যুর পর প্রেতাত্মারা এসে প্রভাক্ষেত্রে সমবেত হয়। কিন্তু তারা তো সোমেশ্বর মহাদেবের কাছে নিজেদের মুক্তি প্রার্থনা করে প্রেতযোনি থেকে মুক্তি লাভ করে। একজন সামান্য দেবদাসীর কাছ থেকে সে মুক্তিলাভের প্রার্থনা করবে কেন? আর তার বিনিময়ে তাকে স্যমন্তক মণির প্রলোভনই বা দেখাবে কেন? তবে সে কি প্রেত নয়, মানুষ?’

খগেশ্বরের কানে যে-কোনও কথা যেতে বাকি থাকেনি তা বুঝতে অসুবিধা হল না অঙ্গিরার। এবং নাপিত শিরোমণির প্রশ্নও অবশ্যই যুক্তিযুক্ত।

খগেশ্বর এরপর তার সাদা সনের মতো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘তবে হ্যাঁ, ওই একটা ব্যাপারে এই খগেশ্বরেরও সঠিক কিছু জানা নেই!’

‘কী ব্যাপারে?’ জানতে চাইল অঙ্গিরা।

খগেশ্বর বলল, ‘ওই স্যমন্তক মণির ব্যাপারে। কেউ কেউ বলে সে মণি নাকি এ মন্দিরে রক্ষিত আছে। কিন্তু মন্দিরের তোষাগৃহতে যেখানে হিরা-জহরত, দুর্মূল্য দান সামগ্রী সঞ্চিত থাকে সেখানে যে তা নেই সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তবে রক্ষীপ্রধান বা সেবায়েত প্রধানদের থেকে আমি ব্যাপারটা নিশ্চিত জানতাম। একবার শ্রাবণী পূর্ণিমাতে নগরীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দর্শনের জন্য তোষাগৃহর দরজা উন্মুক্ত করা হয়েছিল। আমারও সেদিনে সেখানে প্রবেশের সুযোগ ঘটেছিল। নীলকান্ত মণি-সহ বহু হিরা-জহরত দেখলেও স্যমন্তক মণি সেখানে দেখিনি। হয়তো বা ওই মণি অন্য কোথাও থাকতে পারে। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা মানুষের কথাকেও অস্বীকার করা যায় না আবার!’

অঙ্গিরা জানতে চাইল ‘সেই তোষাগৃহ কোথায়?’

খগেশ্বর বলল, ‘সোপানশ্রেণী যেখানে নীচে নেমে শেষ হয়েছে তার দক্ষিণ পার্শ্বে সেই কক্ষে যাবার পথ। সাধারণ মানুষের সেদিকে প্রবেশ নিষেধ। সেখানে প্রবেশ পথের সমুখে এবং তোষাগৃহর লৌহ নির্মিত ভারী কপাটের সামনে সর্ব সময় অস্ত্রধারী রক্ষীরা প্রহরাতে থাকে। ওই সম্পদ-কক্ষর মেঝে, ছাদ, দেওয়াল সবই লৌহ চাদরে আবৃত, যাতে কেউ সুড়ঙ্গ খনন করে ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য।’

এ ব্যাপারটা জানা ছিল না অঙ্গিরার। বেশ কিছুদিন হয়ে গেলেও বিশাল এ মন্দিরের এখনও সবকিছু দর্শন করা হয়নি তার। অঙ্গিরা এরপর প্রশ্ন করল, ‘ওই স্যমন্তক মণি নিশ্চিত কোনও দামি মণি। ও মণির বিশেষত্ব কী?’

প্রশ্নটা শুনে নরসুন্দর অধিপতি বললেন, ‘ও মণি যে স্বয়ং দ্বারকাধীশ কৃষ্ণর মণি। তাঁর মানবলীলার সঙ্গে যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো জড়িয়ে আছে তার মধ্যে ওই স্যমন্তক মণির ঘটনা অন্যতম। এমনকী ভগবান কৃষ্ণকে ওই মণির জন্য চৌর্যবৃত্তির দায়েও অভিযুক্ত হতে হয়েছিল! সে কাহিনি আপনি জানেন না!’

অঙ্গিরা বলল, ‘ ”সামন্তক মণি” নামটা যেন পরিচিত হলেও সে কাহিনি আমার জানা নেই।’

খগেশ্বর একবার আকাশের সূর্যের দিকে তাকিয়ে সময়ের হিসাব পরিমাপ করে নিয়ে বলল, ‘ওঠার আগে সে কাহিনি সংক্ষেপে তবে বলি আপনাকে।’

‘সত্রাজিৎ নামে দ্বারকাতে এক যাদব বাস করতেন। যাঁর কাছে স্যমন্তক নামে অতি উজ্জ্বল এক বৃহৎ মণি ছিল। যার সমকক্ষ মণি স্বর্গ-মর্ত কোথাও ছিল না। সত্রাজিতের মনে সন্দেহ জাগে যে দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ সেই মণি তার কাছ থেকে হরণ করতে পারেন। এই ভয়ে তিনি সেই মণি তার ভ্রাতা প্রসেনকে দান করেন। প্রসেন সেই মণি ধারণ করেন, এবং একদিন একলা মৃগয়াতে গিয়ে এক সিংহর দ্বারা নিহত হন। সিংহ সে মণি মুখে করে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু প্রসেনের মৃত্যু ও সেই মণি অন্তর্হিত হওয়াতে সত্রাজিৎ ও দ্বারকাবাসীর মনে হয় ওই স্যমন্তক মণি কৃষ্ণই, প্রসেনকে হত্যা করে হরণ করেছেন!

দ্বারকাবাসীর এই মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্তি পেতে ভগবান কৃষ্ণ নিজে ওই মণির অনুসন্ধানে অবতীর্ণ হন। জঙ্গলে উপস্থিত হয়ে তিনি প্রসেনের মৃতদেহ যেখানে পতিত ছিল সেখান থেকে সেই সিংহের পদচিহ্ন অনুসরণ করলেন। কিছু দূর গিয়ে তিনি দেখলেন সেই সিংহ মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। তাকে পেট চিরে হত্যা করেছে কোন বিশালাকৃতির ভল্লুক। এবং সেই ভল্লুকের পদচিহ্ন এগিয়েছে এক গুহার দিকে।

সেই গুহাতে বাস করতেন ভল্লুকশ্রেষ্ঠ প্রাচীন জাম্বুবান, যিনি ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্রর বানর সেনার সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সিংহকে হত্যা করে জাম্বুবানই স্যমন্তক মণি হস্তগত করেছিলেন। জাম্বুবান সেই মণি কৃষ্ণর হাতে তুলে দিতে না চাওয়াতে যুদ্ধ শুরু হল কৃষ্ণ ও জাম্বুবানের মধ্যে।

অবশেষে যুদ্ধে পরাজিত হলেন জাম্বুবান। তিনি শুধু সেই স্যমন্তক মণি কৃষ্ণর হাতে দিলেনই না, তার সঙ্গে-সঙ্গে নিজ কন্যা জাম্ববতীকেও সমর্পণ করলেন তাঁর কাছে।

জাম্ববতীকে বিবাহ করে কৃষ্ণ দ্বারকাতে ফিরে এলেন এবং স্যমন্তক মণি ফিরিয়ে দিলেন সত্রাজিৎকে। মণি ফিরে পেলেও কৃষ্ণ যদি তাঁকে মিথ্যা কলঙ্ক লেপনের জন্য কোনও শাস্তি দেন সেই ভয়ে সত্রাজিৎ তাঁর কন্যা সত্যভামাকে তুলে দিলেন কৃষ্ণের হাতে। কৃষ্ণ হলেন সত্রাজিতের জামাতা। এই হল স্যমন্তক মণি আখ্যানের প্রথমাংশ।’ এই বলে কিছুটা থেমে খগেশ্বর আবার শুরু করলেন।

‘সেই কালে যাদবদের আরও তিনজন গোষ্ঠীপতি ছিলেন—শতধন্বা, মহাবীর কৃতবর্মা ও কৃষ্ণর পরম সেবক ও ভক্ত অত্রু্ুর। তাঁরা তিনজনই সত্রাজিতের পরম সুন্দরী কন্যা সত্যভামাকে কামনা করতেন। কিন্তু সত্রাজিৎ তাঁর কন্যাকে কৃষ্ণর নিকট সম্প্রদান করাতে ভীষণ অপমানিত বোধ করলেন তাঁরা তিনজন।

কৃতবর্মা ও অত্রু্ুর, শতধন্বাকে পরামর্শ দিলেন সত্রাজিৎকে বধ করে স্যমন্তক মণি হরণ করতে। তাঁরা দুজন শতধন্বাকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে কৃষ্ণ যদি সত্রাজিৎ বধের বিরোধিতা করেন তবে কৃষ্ণর বিপক্ষে শতধন্বার হয়ে অস্ত্র ধরবেন।

কৃষ্ণ বারণাবতে গমন করলে শতধন্বা মহাবীর কৃতবর্মা ও অত্রু্ুরের কথায় প্ররোচিত হয়ে সত্রাজিৎকে নিদ্রিত অবস্থায় হত্যা করলেন। পিতার মৃত্যুতে শোকাতুরা সত্যভামা সংবাদ প্রেরণ করলেন কৃষ্ণকে। তিনি দ্বারকাতে প্রত্যাগমনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন শতধন্বাকে বধের উদ্দেশে। কিন্তু অত্রু্ুর ও কৃতবর্মা কৃষ্ণর সংহার মূর্তির কথা স্মরণ করে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষাতে অপারগ বলে জানিয়ে দিলেন শতধন্বাকে।

বিপদ দেখে শতধন্বা অশ্বপৃষ্ঠে জঙ্গলে পলায়ন করলেন। এ সংবাদ কর্ণগোচর হতেই কৃষ্ণ, ভ্রাতা বলরামকে রথের সারথী করে শতধন্বার পশ্চাদ্ধাবন করলেন। কিন্তু রথের চেয়ে অশ্ব দ্রুতগামী। তাই শতধন্বাকে প্রাথমিক অবস্থাতে ধরতে পারলেন না কৃষ্ণ। কিন্তু এক সময় শতধন্বার অশ্ব পরিশ্রমক্লিষ্ট হয়ে মৃত্যু বরণ করল। অগত্যা শতধন্বা পদব্রজে পলায়ন শুরু করলেন।

কৃষ্ণ যখন শতধন্বার মৃত অশ্বকে দেখতে পেলেন তখন তিনি রথ থেকে নেমে পড়লেন যুদ্ধরীতি মেনে। যে শত্রু পদব্রজে যাচ্ছে সে শত্রুকে পদব্রজে অনুসরণ করা উচিত, পদব্রজেই তার সঙ্গে-সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত। শাস্ত্র সেকথাই বলে।

বলরামকে একলা রথে রেখে তিনি পদব্রজে জঙ্গলে অনুসরণ করলেন শতধন্বাকে। দুই ক্রোশ যাবার পর কৃষ্ণ সাক্ষাৎ পেলেন শতধন্বার। ন্যায় যুদ্ধে তিনি শতধন্বার মস্তকছেদন করলেন ঠিকই, কিন্তু শতধন্বার মৃতদেহ থেকে স্যমন্তক মণি মিলল না। তিনি ফিরে এসে একথা ভ্রাতা বলরামকে জানাতেই তিনি কৃষ্ণর প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করে বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই সে মণি পেয়ে জঙ্গলে কোথাও তা লুকিয়ে রেখেছ পাছে আমাকে সে মণির ন্যায্য ভাগ দিতে হয় বলে। সে কারণে তুমি আমাকে রথে রেখে একলা শতধন্বা নিধনে গেছিলে। তোমার মতো লোভীর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলাম আমি। আমি আর দ্বারকাতে ফিরব না।’ একথা বলে তিনি রথ নিয়ে অন্যত্র যাত্রা করলেন।

ব্যাপারটাতে কৃষ্ণ সংকটে পড়লেন। স্যমন্তক মণি হরণের মিথ্যা অপবাদ দ্বিতীয়বার কলঙ্কিত করছে তাঁকে। অত্রু্ুর আর কৃতবর্মা, সত্রাজিৎ হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকলেও তারা কিন্তু কখনও এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে আসেননি বা সত্রাজিতের হত্যালীলাতে সামিল হননি। কিন্তু কৃষ্ণ দ্বারকাতে ফিরে জানতে পারলেন তাঁর পরম ভক্ত অত্রু্ুর তাঁকে না জানিয়েই দ্বারকা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছেন। এ ব্যাপারটা তাঁর প্রতি সন্দেহের জন্ম দিল কৃষ্ণর মনে। তবে কি অত্রু্ুরের কাছেই ওই স্যমন্তক মণি আছে? সত্রাজিৎ নিধনের পর শতধন্বা তাঁর কাছেই গচ্ছিত রেখেছিল স্যমন্তক মণি? যদিও এটা কৃষ্ণর অনুমান মাত্র। তাঁর কাছে এ ব্যাপারে কোনও প্রমাণ নেই। তিনি যাদবদের চতুর্দিকে পাঠালেন অত্রু্ুরের খোঁজে, তাঁকে বুঝিয়ে দ্বারকাতে ফিরিয়ে আনার জন্য।

সময় এগিয়ে চলল। দেখতে দেখতে তিন বৎসর অতিক্রান্ত হল। এই তিন বৎসর ভাইয়ের প্রতি অভিমানী বলরাম আর দ্বারকায় ফিরলেন না। তিনি বিদেহ নগরে বাস করতে লাগলেন। আর এই তিন বৎসর কৃষ্ণকেও কাটাতে হল ভ্রাতা বলরামের অপবাদ মাথায় নিয়ে। মানব জন্মে ভগবান বিষ্ণুও শোক-তাপ-অপমান থেকে মুক্ত হতে পারেন না।

অবশেষে তিন বৎসর অতিক্রান্ত হলে যাদবরা অত্রু্ুরের সন্ধান পেয়ে তাকে বুঝিয়ে দ্বারকাতে ফিরেয়ে আনলেন। অতঃপর কৃষ্ণ গিয়ে হাজির হলেন তার ভক্ত অত্রু্ুরের কাছে। তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি যদি সত্যিই আমার ভক্ত হয়ে থাকো, আর স্যমন্তক মণি যদি শতধন্বা তোমার কাছে গচ্ছিত রেখে থাকে তবে তুমি সেই স্যমন্তক মণি যাদবকুলের কাছে প্রদর্শন করে আমাকে কলঙ্ক মুক্ত করো। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি সে মণির অধিকারী তুমিই হবে।’

সত্যভামার ঘটনাতে কৃষ্ণর ওপর অত্রু্ুর সাময়িক ভাবে ক্ষুব্ধ হলেও তিনি কৃষ্ণর পরম ভক্ত ছিলেন। ভগবানের আবেদন আর প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না ভক্ত। কৃষ্ণর অনুমান সত্যি ছিল। অত্রু্ুর সেই স্যমন্তক মণি দ্বারকাবাসীদের প্রদর্শন করে কৃষ্ণর কলঙ্কমোচন করলেন।

স্যমন্তক মণি উদ্ধার হয়েছে জেনে বলরাম দ্বারকাতে ফিরে এলেন এবং ওই মণি দাবি করে বসলেন। একই ভাবে সত্যভামাও ওই মণি দাবি করলেন। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁদের বললেন স্যমন্তক মণির অধিকারী অত্রু্ুর। তিনি তাঁকে কথা দিয়েছেন মণি তাঁর কাছে থাকবে। অত্রু্ুরের থেকে কেউ মণি হরণ করলে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন কৃষ্ণ।

এ কথা শুনে সেই মণির দাবি ত্যাগ করলেন বলরাম ও সত্যভামা। কিন্তু ভক্তের প্রতি ভগবানের এই ন্যায়পরায়ণতা মুগ্ধ করল শিষ্য অত্রু্ুরকে। তিনি কৃষ্ণর কাছে সেই স্যমন্তক মণি নিয়ে হাজির হয়ে বললেন, ‘প্রভু, আপনি ভক্তর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন। যাদব কুলপতি হিসাবে এ মণি আপনি আপনার মস্তকে ধারন করুন। আমি সামান্য মানুষ, এ মণি আমার ধারণ করা শোভা পাবে না। আর আপনি এ মণি ধারণ করলে ভবিষ্যতে এ মণির অধিকার নিয়ে যাদবকুলে পূর্বের ন্যায় কোনও অনর্থ ঘটবে না।’

ভক্তর বারংবার অনুরোধে কৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত তাঁর উষ্ণীষে ধারণ করলেন স্যমন্তক মণি। সে মণি হয়ে উঠল কৃষ্ণর মাথার মণি। কিন্তু তাঁর মানবলীলা সাঙ্গ হবার পূর্বে তিনি নাকি ওই স্যমন্তক মণি দান করেন সোমেশ্বর মহাদেবের এই মন্দিরে। দীর্ঘদিনের প্রবাদ ওই মণি নাকি এই মন্দিরের কোন গোপন স্থানে রক্ষিত আছে। কেউ কেউ তো এমনও বলেন যে সোমেশ্বরের শরীরের মধ্যেই ও মণির অবস্থান। এর বিনিময়ে শুধু কুশবর্ত নয়, সম্পূর্ণ আর্যাবর্ত ক্রয় করা যায়।’

অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘ ”কুশবর্ত” কোন স্থান?’

তার ক্ষৌরকার্যের কাষ্ঠ পেটিকাটা তুলে নিয়ে খগেশ্বর বলল, ‘প্রভাসপত্তনের মতো ছোট ছোট করদ রাজ্য নিয়ে গঠিত এদেশের প্রাচীন নাম ছিল ”কুশবর্ত”। যেমন, দ্বারকা নগরীর প্রাচীন নাম ছিল ”কুশস্থলি”।’

অঙ্গিরা, বৃদ্ধ খগেশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, ‘আপনার স্যমন্তক মণির কাহিনি শুনে বড় চমৎকৃত হলাম।’ তার কথা শুনে স্মিত হেসে কয়েক-পা এগিয়েও আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল খগেশ্বর। তারপর অঙ্গিরার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার পিতা-মাতার পরিচয় কিন্তু এখনও স্মরণ করতে পারছি না। নীলকণ্ঠর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে একবার জিগ্যেস করব তাঁর কিছু খেয়াল পড়ে কিনা?’

অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘তিনি কে?’

‘এ নগরীর সবথেকে প্রাচীন মানুষ। এক সময় মন্দিরের সেবায়েত প্রধান ছিলেন।’ জবাব দিয়ে নিজের কাজে পা বাড়ালেন নরসুন্দর প্রধান।

অঙ্গিরা এদিন আর সে সময় অতিথিশালার অঙ্গণ ত্যাগ করল না। নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে নিদ্রাদানের পর সায়াহ্নে কক্ষ ত্যাগ করে সোজা গিয়ে উপস্থিত হল গর্ভগৃহর সামনে। সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গেই তিলোত্তমা হাজির হল দেবদাসীদের নিয়ে। কিন্তু তাদের মধ্যে সমর্পিতা নেই।

তিলোত্তমা নিজেও অত্যন্ত রূপসী ও নৃত্যগীতে পারঙ্গম। একক নৃত্য পরিবেশন করল সে। কিন্তু তবুও অঙ্গিরার মনে হল সমর্পিতার অনুপস্থিতিতে এই নৃত্য-গীত কেমন যেন ম্লান, অনুজ্জ্বল। ব্যর্থ মনোরথে আবার অতিথিশালাতে ফিরে এল সে।

ঠিক মধ্যরাতে অঙ্গিরা প্রতিদিনের মতো অতিথিশালা ত্যাগ করে তার ধনুর্বাণ নিয়ে রওনা হল তাকে ত্রিপুরারিদেব প্রহরার যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে।