সোমনাথ সুন্দরী – ২১
২১
একটু বেলার দিকে নিজের কক্ষ ত্যাগ করল অঙ্গিরা। হ্যাঁ, ক্ষৌরকারপতি খগেশ্বরকে তার খুঁজে পাওয়া দরকার। হয়তো বা সে তাদের কোনও মুক্তির উপায় বার করতে পারে। অঙ্গিরা অতিথিশালা ত্যাগ করে মন্দির প্রাঙ্গণে নেমে এল।
শূন্য মন্দির প্রাঙ্গণ। সামান্য কয়েকজন সেবায়েত শুধু ইতস্ততভাবে ঘোরাঘুরি করছে। মন্দিরের দিকে একবার তাকাল সে। চত্বরের ওপরেও কেউ নেই। দিনের বেলাতেও আতঙ্কর ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছে সোমেশ্বর মহাদেব মন্দিরকে। চত্বরের বাইরে বেরোনোর তোরণের দিকে অঙ্গিরা এগোল। দ্বাররক্ষীরা রয়েছে সেখানে। তাদের সঙ্গে কিছু রাজসৈনিকও।
রাজা ভীম কানিথকোট দুর্গে প্রস্থানের আগে সামান্য কিছু সেনাকে মন্দির রক্ষার কাজে নিয়োজিত করে গেছিলেন। তারা এদিন সকালে এসে উপস্থিত হয়েছে। একজন সৈন্যাধ্যক্ষর নেতৃত্বে একশত জন সেনা। সবারই মুখে কেমন যেন চিন্তার ছাপ! সোমেশ্বর মুদ্রাটা সঙ্গেই এনেছিল অঙ্গিরা। প্রধান পুরোহিতের নির্দেশমতো দ্বাররক্ষীরা অঙ্গিরার গতিরোধ করল। অঙ্গিরা মুদ্রাটা দেখাতে তারা তোরণ উন্মুক্ত করল।
বাইরে বেরিয়ে এল অঙ্গিরা। জনশূন্য পথ। যে রাজপথ নগরীর কেন্দ্র থেকে সোজা প্রবেশতোরণের সঙ্গে এসে মিশেছে। তার দু-পাশে ফুল, বিল্ব, ধূপ ইত্যাদি পূজাসামগ্রীর পসরা নিয়ে পুণ্যার্থীদের জন্য বসে থাকে বিপণিরা। তারাও কেউ নেই। কি ভাবে যেন প্রচারিত হয়েছে যে মাধেরার যুদ্ধে যবন বাহিনীর কাছে নাকি পরাজিত হতে চলেছে রাজপুতবাহিনী। আরও তীব্র হয়েছে আতঙ্ক।
এমন জনশূন্য মন্দির, এমন জনশূন্য সোমনাথ নগরী ইতিপূর্বে অঙ্গিরা দেখেনি। মন্দিরকে বেড় দিয়ে অঙ্গিরা এসে উপস্থিত হল সমুদ্রতটে। মৃদু মন্দ ঢেউ এসে ভাঙছে বালুকারাশিতে। বিশালাকৃতির কি যেন একটা পক্ষী এসে বসেছে জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ভূভাগের শেষ সীমানায় প্রোথিত সেই স্তম্ভের মাথায়।
চারদিকে তাকাতে তাকাতে এগোল অঙ্গিরা। এবং সেই স্তম্ভের কাছাকাছি বালুতটে একটা কাষ্ঠখণ্ডের ওপর সে বসে থাকতে দেখল খগেশ্বরকে। অঙ্গিরা উপস্থিত হল তার সামনে। সমুদ্রর নোনা বাতাসে উড়ছে তার শনের মতো সাদা চুল। অসংখ্য বলিরেখাময় মুখমণ্ডলে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। অঙ্গিরাকে দেখে বিষণ্ণভাবে হাসল সে।
কাষ্ঠখণ্ডের অন্য প্রান্তে উপবেশন করল অঙ্গিরা। প্রথম মুখ খুলল ক্ষৌরকার শিরোমণি খগেশ্বর। সে স্তম্ভের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে ‘ওটা কী পক্ষী চেনে? শ্বেত গৃধিনি—শ্বেত শকুন। ওরা সাধারণ গৃধিনির মতো সব মৃতদেহ ভক্ষণ করে না। কেবল মানুষের মৃতদেহ ভক্ষণ করে। ওরা ঘোর অমঙ্গলের প্রতীক। কোথায় মানুষের মৃতদেহ পাবার সম্ভাবনা তা নাকি পূর্বেই জেনে যায় তারা। সেই স্থানে ওরা গিয়ে হাজির হয়। হয়তো বা তেমন কিছুই ঘটতে চলেছে এখানে!’
বহুদর্শী বৃদ্ধ খগেশ্বরের কথা সমর্থন করেই যেন একটা অদ্ভুত চিৎকার করল অশুভ পক্ষীটা। তারপর স্তম্ভ ছেড়ে তার বিশাল ডানা ঝাপটিয়ে সোজা উড়ে গিয়ে বসল মন্দির শীর্ষে স্বর্ণকলসের ওপর। অঙ্গিরা দেখতে পেল অনুরূপ আরও কয়েকটি নরমাংসভূক পক্ষী বসে আছে মন্দির শীর্ষে।
নিজের আসল কথা শুরু করার আগে অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘আপনার পৌত্র কেমন আছেন?’
খগেশ্বর জবাব দিল, ‘ভালো নেই। হয়তো আজকের বা কালকের রাত পর্যন্তই তার আয়ু। তার মুখে একটুকরো জ্বলন্ত কাঠকয়লা দেবার জন্য আমি অপেক্ষা করে আছি।’
খগেশ্বরের মুখমণ্ডলে জেগে থাকা বিষণ্ণতার কারণটা এবার বুঝতে পারল অঙ্গিরা। হতভাগ্য এক বৃদ্ধ তার পৌত্রর মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনছে।
তবুও তার কাছে কথাটা পাড়তেই হবে অঙ্গিরাকে। তাই সে মৃদু ইতস্তত করে বলল, ‘আপনার কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। একজনকে এ মন্দির ত্যাগ করার ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে আমাকে।’
জলরাশির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বলল, ‘কোনও নারী নাকি? কোনও দেবদাসীর প্রেমে পড়েছ? হ্যাঁ, যবন মামুদ হানা দিলে সবথেকে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা ওই দেবদাসীদের ভাগ্যেই লেখা আছে। ওই শ্বেত গৃধিনিদের থেকে ভয়ঙ্কর মামুদ বাহিনী। জীবন্ত অবস্থাতেই দেবদাসীদের কোমল শরীর তারা ছিঁড়ে খাবে। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেব কোনও অবস্থাতেই দেবদাসীদের মন্দির ত্যাগ করতে দেবেন না।
খগেশ্বরের কথা শুনে চমকে উঠল অঙ্গিরা। যবন হানার ফলে এ ব্যাপারটাও যে ঘটবে, তা ভেবে দেখেনি অঙ্গিরা। একটা হিম রক্তস্রোত যেন প্রবাহিত হল তার মেরুদণ্ড বেয়ে। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, সে আমার প্রেমিকা। তাকে যে ভাবেই হোক মুক্ত করতে হবে। সে দেবদাসী সমর্পিতা। সে এক চালুক্য রাজকন্যা।’
অঙ্গিরার শেষ কথাটা কানে যেতেই মৃদু চমকে উঠে খগেশ্বর সমুদ্রর দিক থেকে তার দিকে ফিরে তাকাল। তারপর বলল, ‘চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতা! তাকে মন্দির থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আর একজন তো এ নগরীতে উপস্থিত হয়েছেন! গতকালই এ স্থানে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি নগরীতেই এক পান্থশালাতে অবস্থান করছেন।’
বিস্মিত অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘কে তিনি?’
বৃদ্ধ জবাব দিল, ‘চালুক্যরাজ অম্বুজের মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব। মাধেরার যুদ্ধে চালুক্যরাজ নিহত হয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি চন্দ্রদেবকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে তাঁর মহামন্ত্রী যেন রাজকন্যা রাজশ্রীকে মন্দির থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে চালুক্য সিংহাসনে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। মন্ত্রী চন্দ্রদেব গতকাল এসে সাক্ষাৎ করেছিলেন ত্রিপুরারিদেবের সঙ্গে। কিন্তু প্রধান পুরোহিত চালুক্য মন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ, চালুক্যনারী এখন আর রাজনন্দিনী রাজশ্রী নন। তিনি এখন দেবদাসী সমর্পিতা।’
অঙ্গিরা, ক্ষৌরকার শিরোমণির কথা শুনে প্রবল বিস্মিত ভাবে বলল, ‘তিনি দেবদাসী সমর্পিতাকে রাজসিংহাসনে বসাবার জন্য নিয়ে যেতে এসেছেন! তবে যে ভাবেই হোক তার নিরাপদ আশ্রয়ে তুলে দিতে হবে দেবদাসী সমর্পিতাকে।’
ক্ষৌরকার শিরোমণি মৃদু হেসে বললেন, ‘কিন্তু তুমি যাকে মুক্ত করার কথা বলছেন, তিনি কি একবার এ মন্দির থেকে মুক্ত হবার পর তোমাকে প্রেমিক রূপে, স্বামী রূপে গ্রহণ করবেন? তিনি কিন্তু তখন আর সোমনাথ মন্দিরের দেবদাসী নন, তিনি তখন চালুক্য সাম্রাজ্ঞী।’
অঙ্গিরা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল খগেশ্বরের কথা শুনে। তারপর বলল, ‘সে আমাকে ভবিষ্যতে গ্রহণ করুক বা না করুক, এই মন্দির থেকে তাকে মুক্ত করতেই হবে। আপনি সেই সাহায্য করুন। কারণ, তাকে আমি ভালোবাসি। তার মঙ্গল কামনা ছাড়া আমার বেশি কোনও কামনা থাকতে পারে না।’
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ভাবে চেয়ে রইলেন অঙ্গিরার দিকে। হয়তো বা সে মনে মনে খুশিই হল দেবদাসী সমর্পিতার প্রতি অঙ্গিরার ভালোবাসা দেখে।
কর্মপন্থা ভেবে নিয়ে খগেশ্বর বলল, ‘তোমার ওই সোমেশ্বর মুদ্রাই পুরুষের ছদ্মবেশে তাকে মন্দির ত্যাগ করতে সাহায্য করবে। ঠিক যেভাবে নিজের সোমেশ্বর মুদ্রা প্রেয়সী তিলোত্তমার হাতে তুলে দিয়ে পুরুষের ছদ্মবেশে তাকে মন্দির ত্যাগ করিয়েছিলেন সেবায়েত প্রধান বিষধারী।
আমি মন্দিরের স্থায়ী বাসিন্দা নই। আমার মন্দিরে ঢুকতে বেরোতে কোনও বাধা নেই। দেবদাসী সমর্পিতার পশ্চাতেই মন্দির ত্যাগ করব আমি। মহামন্ত্রী চন্দ্রকে আমি আগাম খবর জানিয়ে রাখব। তাদের দুজনকে আমি নগরীর বাইরে কোনও নিরাপদ স্থানে রেখে আসব। তারা সেখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করবেন।
চালুক্য কন্যাকে তুমি মুদ্রাটা আমার হাতে সমর্পণ করতে বলবে। সেটা নিয়ে আমি মন্দিরে ফিরে এসে তোমাকে দেব। আপনি সেই মুদ্রা নিয়ে মন্দির ত্যাগ করে মিলিত হবেন তাদের সঙ্গে। এ কাজের প্রবল ঝুঁকি আছে। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে দ্বাররক্ষীরা ছদ্মবেশী দেবদাসীর তল্লাশি নেবার সময় সে যে নারী তা প্রকাশ পেতে পারে। তাকে অনুসরণও করতে পারে কেউ। কিন্তু এ পথ ছাড়া বর্তমানে আর অন্য কোনও পথ খোলা নেই।’ এরপর একটু থেমে খগেশ্বর বলল, ‘তবে এ কাজের জন্য দুটো রাত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। আমার হতভাগ্য পৌত্রর জীবনদীপ নিভে না যাওয়া পর্যন্ত, তার মুখে শেষ জলটুকু অন্তত দিতে চাই আমি।’
অঙ্গিরা বলল, ‘কিন্তু আজ বা কালই যবন বাহিনী মন্দিরে হানা দেবে না তো?’
এ প্রশ্ন শুনে খগেশ্বর মনে মনে একটি হিসাব করে নিয়ে বলল, ‘যদি ধরে নিই তিন-চার দিন আগেই মাধেরার যুদ্ধ শেষ হয়ে থাকে তবে অতবড় উষ্ট্রবাহিনী নিয়ে যবনদের সোমনাথ পৌঁছতে অন্তত আরও চারদিন সময় লাগবে। তার মধ্যেই আশা করি তোমরা মুক্ত হতে পারবে। দেবদাসী সমর্পিতার পোশাকের ব্যবস্থা করব। আমি যে তার কাছে যাব সেকথা জানিয়ে রাখবে।’
অঙ্গিরা, তার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনি সে চেষ্টাই করুন। আপনাকে কীভাবে যে ধন্যবাদ দেব আমি জানি না!’
বৃদ্ধ ক্ষৌরকার শিরোমণি ভারাক্রান্ত গলায় বলল, ‘আমাকে ধন্যবাদ জানাতে হবে না। শুধু কামনা কোরো, আমার পৌত্রর আত্মা যেন একটু শান্তি পায়।’ এ কথা বলার পর উঠে দাঁড়াল খগেশ্বর। অঙ্গিরা তার থেকে বিদায় নিয়ে মন্দিরে ফেরার পথ ধরল। আর ক্ষৌরকার শিরোমণি চলল নগরীর কেন্দ্রস্থলের দিকে চালুক্য মহামন্ত্রীকে বার্তা দেবার জন্য।
সমুদ্রতট থেকে ফিরে এসে অতিথিশালাতেই সারা দিন কাটিয়ে দিল অঙ্গিরা। দিবাবসানে সন্ধ্যা নামল। অঙ্গিরা শুনতে পেল সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি। তারপর একসময় সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অঙ্গিরার সময় যেন আর কাটতেই চায় না। তবে সময়ের নিয়মেই রাত্রি একসময় মধ্য যামে পৌঁছল।
অঙ্গিরা সোমেশ্বর মুদ্রা সঙ্গে করে রওনা হল দেবদাসীদের আবাসস্থলের দিকে। কুয়াশা মাখা রাত্রিতে সেই চন্দ্রমন্দিরের পাশ দিয়ে যাবার সময় অঙ্গিরা একবার থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল সেই অন্ধকার মন্দিরের দিকে। হয়তো খগেশ্বর এখন বসে আছে মৃত্যুপথযাত্রী অন্ধকারের প্রহরীর কাছে। এ কথাটা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার হাঁটতে শুরু করল সে।
কিছু সময়ের মধ্যেই অঙ্গিরা প্রবেশ করল দেবদাসীদের আবাসস্থলে। চত্বরে উঠে এসেই সে দেখতে পেল নির্দিষ্ট স্থানে তার প্রতীক্ষাতে দাঁড়িয়ে আছে দেবদাসী সমর্পিতা। অঙ্গিরা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেবদাসী সমর্পিতা তাকে দুই বাহু দিয়ে আলিঙ্গন করল।
অঙ্গিরা প্রবল মমতায় তার ওষ্ঠ চুম্বন করে বলল, ‘তুমি হয়তো বা চালুক্য সাম্রাজ্ঞী হতে চলেছ।’
দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘একথা বলার অর্থ? পরিহাস নয়তো?’
অঙ্গিরা বলল, ‘না, পরিহাস নয়। মাধেরার যুদ্ধক্ষেত্রে চালুক্য রাজের মৃত্যু হয়েছে। মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব তোমাকে নিতে এসেছেন চালুক্য সিংহাসনে বসাবার জন্য। যদিও ত্রিপুরারিদেব তোমাকে মন্দির ত্যাগ করতে দিতে রাজি হননি, কিন্তু তোমার মুক্তির ব্যবস্থা ক্ষৌরকার শিরোমণি খগেশ্বর করবেন।’
কথা শুনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল চালুক্য রাজকন্যা রাজশ্রী—দেবদাসী সমর্পিতার মুখ। সে বলে উঠল, ‘সত্যি, মহামন্ত্রী চন্দ্রদেব আমাকে চালুক্যরাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন?’
অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যি।’
এ কথা বলার পর অঙ্গিরা খগেশ্বরের মুখে শোনা কথাগুলি, তাদের পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করল দেবদাসী সমর্পিতাকে। আসন্ন মুক্তির সম্ভাবনায় ঝলমল করে উঠল দেবদাসীর মুখমণ্ডল। সে বলল, ‘সোমেশ্বর মহাদেব সত্যি করুণাময়। তিনি আছেন। আমার প্রার্থনা তিনি শুনেছেন। তিনিই আমাদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করছেন।’
এ কথা বলার পর একটু হেসে দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘আমি ওই ঘুঙুর ছড়াটা শুধু সঙ্গে করে নিয়ে যাব এ মন্দির থেকে। ওই ঘুঙুর ছড়াই তো আমাদের দুজনকে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। চালুক্য নগরীতে সোমনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেখানে সোমেশ্বর মহাদেবের এই দানকে দেবতা জ্ঞানে পুজা করব আমি।’
কিন্তু এ কথা বলার পর চালুক্য রাজদুহিতা খেয়াল করল অস্পষ্ট চাঁদের আলোতে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতা জেগে আছে অঙ্গিরার মুখমণ্ডলে।
দেবদাসী সমর্পিতা তা দেখে প্রশ্ন করল, ‘তোমার চোখে বিষণ্ণতার ভাব কেন?’
অঙ্গিরা প্রথমে হেসে বলল, ‘ও কিছু নয়।’
দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘তবে তোমার মুখে আনন্দের হাসি নেই কেন? কোনও ভাবনা গোপন কোরো না।’
অঙ্গিরা এবার বলেই ফেলল কথাটা, ‘তুমি চালুক্য দেশের রানি হতে চলেছ। তুমি কি আমার মতো সাধারণ মানুষকে তোমার সঙ্গী করতে পারবে। তার ওপর আমি আবার অজাচার। তবু আমি চাই, দেবদাসী জীবনের অন্ধকার থেকে মুক্তি ঘটুক তোমার। তুমি ফিরে যাও তোমার নিজের দেশে। রানি হও তুমি।’
রাজকন্যা রাজশ্রী কয়েক মুহূর্ত অঙ্গিরার দিকে চেয়ে থাকার পর বলল, ‘যখন তোমার সঙ্গে আমার ভালোবাসা, তখন এ সম্ভাবনা আমার সামনে উপস্থিত হবে তা আমরা কেউই জানতাম না। তুমি ভালোবেসেছিলে সামান্য একজন দেবদাসীকে। তোমার সে মহত্ত্ব, সে ভালোবাসাকে আমি অস্বীকার করব কী ভাবে? তোমার আমার মিলন ঘটাবার জন্যই হয়তো বা সোমেশ্বর মহাদেব তার পদতলে আমাদের দুজনকে হাজির করেছিলেন। আমি তোমার জন্য চালুক্য সিংহাসনও ফিরিয়ে দিতে পারি। আমার ভালোবাসা আমি ত্যাগ করব কী ভাবে? জন্ম-জন্মান্তরের সাথী আমরা।’
এ কথা বলার পর দেবদাসী সমর্পিতা হাত দিয়ে অঙ্গিরার মাথাটা টেনে নামিয়ে আনল নিজের মুখের ওপর। তার ওষ্ঠ স্পর্শ করল অঙ্গিরার ওষ্ঠ। প্রগাঢ় সেই চুম্বন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আদিম মানব-মানবীর রক্ত ছলকে উঠল নর-নারীর শরীরে। অঙ্গিরা, প্রেয়সীর শরীরটাকে নিয়ে গেল স্তম্ভের আড়ালে। গাঢ় কুয়াশা নামতে শুরু করেছে প্রাঙ্গণ জুড়ে। তার আড়ালে হারিয়ে গেল তারা দুজন।
শেষ রাতে প্রেয়সীর বাহুডোর থেকে নিজেকে মুক্ত করল অঙ্গিরা। সোমেশ্বর মুদ্রাটা দেবদাসী সমর্পিতার হাতে দিয়ে সে বলল, ‘হয়তো বা এমন গোপনে আর মিলিত হতে হবে না আমাদের। এবার আমি আসি?’
দেবদাসী সমর্পিতা বলল, ‘হ্যাঁ, সেই পরম নিশ্চিন্ত মিলনের জন্য আমিও অপেক্ষা করে রইলাম। কোনও শঙ্কা রেখো না মনে। আমার কথায় বিশ্বাস রেখো। জেনো তোমাকে পাবার জন্য রাজসিংহাসন ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।’
অঙ্গিরা হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করলাম তোমার কথা।’
অঙ্গিরা যখন অতিথিশালাতে ফিরে এসে শয্যা গ্রহণ করল তার কিছু সময়ের মধ্যেই বেজে উঠল সেই স্বর্ণ শৃঙ্খল। আরও একটা আশঙ্কার ভোর শুরু হল সোমনাথ মন্দিরে।
