Accessibility Tools

বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিপিনের সংসার – ১৩

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

বিপিনের ডাক্তারখানায় সম্প্রতি মাসখানেক একটিও রোগী আসে নাই।

রোজই সকালে বিকালে নিয়মিত ডাক্তারখানায় গিয়া তীর্থের কাকের মতো বসিয়া থাকে। হাতের পয়সাকড়ি ফুরাইয়া গেল। কোনো দিকে রোগবালাই নাই, দেশটা হঠাৎ যেন মধুপুর কি শিমুলতলা হইয়া দাঁড়াইয়াছে!

জীবনটাও যেন বড় ফাঁকা-ফাঁকা। সকাল-সন্ধ্যা একেবারে কাটে না। দত্ত মশায় অবশ্য আছেন, কিন্তু তাঁহার মুখে ধর্মতত্ব শুনিয়া শুনিয়া একঘেয়ে হইয়া পড়িয়াছে, আর ভালো লাগে না।

মনোরমার জন্য মন-কেমন করে আজকাল। মনোরমাকে সাপে কামড়ানোর পর হইতে বিপিন লক্ষ করিতেছে স্ত্রীর উপর তাহার মনোভাব অদ্ভুত ভাবে পরিবর্তিত হইয়াছে। মনে হয় মনোরমা তো চলিয়া যাইতেছিল, একদিনও সে মনোরমাকে মুখের একটি মিষ্ট কথা বলে নাই, এ অবস্থায় যদি সেদিন সে সত্যই মারা পড়িত—বিপিনকে চিরজীবন অনুতাপ করিতে হইত সে সব ভাবিয়া। সুখের মুখ কখনো সে দেখে নাই, বিপিন তাহাকে এবার সুখী করিবে। মানুষের মনের এই বোধ হয় গতি, বড় বড় অবলম্বন যখন চলিয়া যায়, তখন যে আশ্রয়কে অতি তুচ্ছ, অতি ক্ষুদ্র বলিয়া মনে হইত, তাহাই তখন হইয়া দাঁড়ায় অতি প্রিয়, অতি প্রয়োজনীয়। মনোরমার চিন্তা কখনো আনন্দ দেয় নাই, আজকাল দেয়। তাহার প্রতি একটা অনুকম্পা জাগে, স্নেহ হয়, তাহাকে দেখিতে ইচ্ছা হয়। কি আশ্চর্য ব্যাপার এ সব!

বিপিন মাস দুই বাড়ি যায় নাই, কিছু টাকা হাতে আসিলে একবার বাড়ি যাইত, কিন্তু এই সময়ই হাত একেবারে খালি।

দত্ত মহাশয় একদিন বলিলেন, ডাক্তারবাবু, শান্তি কাল পত্র লিখেচে, আপনার কথা জিগ্যেস করেচে, আপনি কেমন আছেন, ডাক্তারি কেমন চলচে। আর একটা কথা লিখেচে, ওর শ্বশুরের চোখ অস্ত্র হবে কলকাতা বা রানাঘাটের হাসপাতালে। আপনি সে-সময়ে সময় করে দু’দিনের জন্যে ওদের ওখানে থেকে শ্বশুরের সঙ্গে রানাঘাট বা কলকাতা যেতে পারবেন কি না লিখেচে। শান্তি থাকবে, আমার জামাই থাকবে। অবিশ্যি আপনার ফি এবং যাতায়াতের খরচা ওরা দেবে। একটা দিন কিংবা দুটো দিন লাগবে। আপনি থাকলে ওদের একটা বলভরসা। ওরা পাড়াগেঁয়ে মানুষ হাসপাতালের সুলুকসন্ধান কিছুই জানে না। আপনার কত বড় বড় ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ, আপনি পড়েচেন সেখানে, তাই আপনাকে নিয়ে যেতে চায়।

 

বিপিন বলিল, বেশ লিখে দেবেন আমি যাব তবে ফি দিতে চাইলে যাব না। যাতায়াতের খরচ দিতে চান দেবেন তাঁরা, কিন্তু ফি’র কথা যেন না ওঠান।

দত্ত মশায় আর কিছু বলিলেন না।

দিন পাঁচ ছয় পরে দত্ত মশায় একদিন সকালে বিপিনকে ডাকিয়া ঘুম ভাঙাইলেন। পূর্বরাত্রে শান্তির শ্বশুরবাড়ি হইতে লোক আসিয়াছে, রানাঘাট হাসপাতালে শান্তির শ্বশুরকে লইয়া যাওয়া হইবে, বিপিনকে আজ এখনি রওনা হইতে হইবে, বেশি রাত হইয়া গিয়াছিল বলিয়া দত্ত মশায় বিপিনকে গত রাত্রে কিছু বলেন নাই।

.

সাত ক্রোশ পথ গরুরগাড়িতে অতিক্রম করিয়া প্রায় বেলা দুইটার সময় বিপিন শান্তির শ্বশুরবাড়ি গিয়া পৌঁছিল। শান্তির স্বামী গোপাল প্রথমেই ছুটিয়া আসিল। বলিল, ওঃ, এত বেলা হয়ে গেল ডাক্তারবাবু! বড্ড কষ্ট হয়েচে এই রোদ্দুরে! ও কতক্ষণ থেকে আপনার জন্যে নাইবার জল চায়ের যোগাড় করে নিয়ে বসে আছে। আমরা তো আশা ছেড়েই দিয়েছিলুম।

বিপিন গিয়া বাহিরের ঘরে বসিল। তাহার বুকের মধ্যে ঢিপ-ঢিপ করিতেছে, এখনি আজ শান্তির সঙ্গে দেখা হইবে। বিপিন ভাবিয়া অবাক হইল, শান্তির সঙ্গে দেখা হইবার আগ্রহে মনের এই রকম অবস্থা—এ কি কল্পনা করা সম্ভব ছিল এক বছর পূর্বেও? মানী নয়, শান্তি! কে শান্তি? ক’দিন তাহার সহিত পরিচয়? উত্তেজনা ও আনন্দের মধ্যেও কেমন এক প্রকার অস্বস্তিতে তাহার মন ভরিয়া উঠিল।

শান্তি একটু পরেই আধঘোমটা দিয়া ঘরে ঢুকিল এবং বিপিনের পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিল। হাসিমুখে বলিল—আমি বেলা দশটা থেকে কেবল ঘরবার করচি—এত বেলা হবে তা ভাবিনি। একটু জিরিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে ডাব খান।

—তোমার শ্বশুর মহাশয়কে একবার দেখব।

 

—এখন না। বাবা খেয়ে ঘুমুচ্চেন একটু, বুড়োমানুষ—আপনি নেয়ে নিয়ে রান্না চড়িয়ে দিন, তারপর—

বিপিন বিস্ময়ের সুরে বলিল—সে কি শান্তি! রান্না চড়িয়ে দেব কি? এত বেলায়—

শান্তি হাসিয়া বলিল—ও সব চলবে না এখানে। ব্রাহ্মণ মানুষকে আমরা কিছু রেঁধে দিতে পারিনে। আমি সব যোগাড় করে দেব, আপনি শুধু নামিয়ে নেবেন। আকাশ-পাতাল ভাবতে হবে না আপনার সেজন্যে!

শান্তির আশ্বাস দেওয়ার মধ্যে এমন একটা জিনিস আছে, যাহাতে বিপিনের মন একেবারে লঘু ও নিশ্চিন্ত হইয়া উঠিল। শান্তি সেবাপরায়ণা মেয়ে বটে, কাজের মেয়েও বটে, তাহার উপর নির্ভরশীলতা কেমন যেন আপনিই আসে।

গোপাল আসিয়া বলিল—চলুন, নদীতে নাইয়ে নিয়ে আসি।

বিপিন বলিল—নদী পর্যন্ত আপনার কষ্ট করে যাওয়ার কি দরকার? আমায় দেখিয়ে দিলেই তো…গোপাল তাহাতে রাজি নয়, বিপিন বুঝিল, শান্তিই বলিয়া দিয়াছে তাহাকে নদীর ঘাটে লইয়া গিয়া স্নান করাইয়া আনিতে। শান্তির প্রভাব ও প্রতিপত্তি এখানে খুব বেশি, এমন কি মনে হইল বাপেরবাড়ি অপেক্ষা বেশি।

স্নানাহারের পর শান্তি বাহিরের ঘরে নিজে বিপিনের বিছানা করিয়া দিল। বিপিন বলিল—শান্তি, আমি দুপুরে ঘুমুই নে তুমি জানো, বিছানা কিসের—তার চেয়ে বোসো এখানে, দুটো কথাবার্তা বলি।

শান্তি হাসিয়া বলিল—না, তা হবে না, একটু বিশ্রাম করে নিতেই হবে। কাল আবার এখান থেকে আট ক্রোশ রাস্তা গরুরগাড়িতে গিয়ে ট্রেন ধরতে হবে।

—ও কষ্ট কিছু না, তোমার শ্বশুর উঠেচেন কিনা দেখ। একবার তাঁর চোখটা দেখি। বিপিন চোখের সম্বন্ধে কিছুই জানে না, তবুও তাহাকে ভান করিতে হইল যে সে অনেক কিছু বুঝিতেছে। শান্তির শ্বশুরের দুই-চারটি চক্ষুপীড়া-সংক্রান্ত অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তরও তাহাকে দিতে হইল।

 

গ্রামখানি বিকালে ঘুরিয়া দেখিল, পিপলিপাড়া বা সোনাতনপুরের মতোই জঙ্গলে ভরা, এ অঞ্চলের অধিকাংশ গ্রামই তাই। শান্তিদের বাড়ির পিছনেই তো প্রকাণ্ড বাগান, চারিধার বাঁশবনে ঘেরা, দিনমানেও রোদ ওঠে না সেদিকটাতে বলিয়া মনে হয়।

সন্ধ্যাবেলা বেড়াইয়া ফিরিল। বাড়ির পিছনে ঘন বন-বাগানের ধারে একটি বাতাবি লেবুতলায় ঢেঁকি পাতা। সেখানে শান্তি ও আর একটি প্রৌঢ়া বিধবা মেয়েমানুষ চিঁড়ে কুটিতেছে—শান্তি তাহাকে সেখানে ডাকিল। বিপিন সেখানে গিয়া দাঁড়াইল, প্রৌঢ়া বিধবা মেয়েমানুষটি ঢেঁকিতে পাড় দিতেছিল, শান্তি ঢেঁকির গড়ে ধান দিয়া যাইতেছে, তাহাকে বসিতে একখানা পিঁড়ি দিয়া হাসিয়া বলিল—বসুন। এখানে বসে গল্প করুন, আমি সরু ধান দুটো ভেনে চাল করে নিচ্চি, কাল সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। বাবা অন্য চাল খেতে পারেন না।

বিপিন চাহিয়া দেখিল বন-বাগানের আড়াল হইতে চাঁদ উঠিতেছে। কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়া, প্রায় পূর্ণচন্দ্রের মতোই বড় চাঁদখানা। বাঁশবন নিস্তব্ধ, ঝিঁঝিঁপোকা ডাকিতেছে সন্ধ্যায়, খুব নির্জন গ্রামখানা, লোকজন বেশি নাই, পিপলিপাড়ার হাটতলার চেয়েও নির্জন।

কিন্তু বেশ লাগিল এই বন-বাগানের মধ্যে ঢেঁকিশালের জায়গাটা, চাঁদ-ওঠা এই সুন্দর সন্ধ্যা, শান্তির সুমিষ্ট অভ্যর্থনাটি, বাতাবি লেবুফুলের সুগন্ধ। সে বলিল, তুমি ভারি কাজের মেয়ে কিন্তু শান্তি। আবার দিব্যি ধান ভানতেও পারো দেখচি।

শান্তি হাসিয়া ফেলিল। বিধবা মেয়েমানুষটি মুখে কাপড় দিয়া হাসিল। শান্তি বলিল, এ না করলে গেরস্তঘরে চলে কি, বলুন আপনি? এখন ধরুন আমার শ্বশুরের তিন গোলা ধান হয় বছরে, রোজ ধান ভানা, চিঁড়ে কোটার জন্যে কাকে আবার খোশামোদ করে বেড়াব? ওই মতির মা আছে আর আমি আছি—

—বেশ গাঁখানা তোমাদের, বেড়িয়ে এলাম।

—চড়কতলার দিকে গিয়েছিলেন?

 

—চিনি তো নে, কোন তলা! এমনি খানিকটা ঘুরলাম—

শান্তি উঠিয়া বলিল, দাঁড়ান, আপনার চা করে আনি, এখানে বসে খাবেন আর গল্প করবেন, মতির মা রাখো—আমি আসি আগে, যাব আর আসব—

চা ও খাবার লইয়া সে খুব শীঘ্রই ফিরিল বটে।

বিপিন বলিল, হালুয়া গরম রয়েচে, এখন করে আনলে নাকি?

—আমি না, মা করেচেন। আমি শুধু চা করে আনলাম। সেকেলে বুড়ি, চা করতে জানেন না। ভারি আমোদ হচ্ছে আমার, আপনি এসেচেন বলে।

—সত্যি?

—সত্যি না তো মিথ্যে! রাত্রে আপনাকে আর রাঁধতে হবে না, আমি লুচি ভেজে দেব।

—কেন, আমি ভাত রেঁধেই নিতাম, আবার লুচির হাঙ্গামা—

—হাঙ্গামা কিছু না। আমার শ্বশুরবাড়িরা বড়লোক, এদের এককাঁড়ি টাকা আছে, খাইয়ে দিলাম বা কিছু টাকা বাপেরবাড়ির লোককে?

শান্তির কথার ভঙ্গি শুনিয়া বিপিন হাসিয়া উঠিল, প্রৌঢ়া মতির মাও অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া (কারণ বিপিনের সামনে হাসা তাহার পক্ষে অশোভন) হাসিয়া বলিল—কি যে বলেন বড় খুড়িমা আমাদের! শুনতেই এক মজা!

শান্তি যে এমন হাসাইতে পারে, বিপিন তাহা জানিত না। রসিকা মেয়ে সে খুব পছন্দ করে—পছন্দ করে বলিয়াই এটুকু জানে, ভালো হাসাইতে পারে এমন মেয়ের সংখ্যা বেশি নয়। শান্তির একটা নূতন দিক যেন সে দেখিল।

 

শান্তি ছেলেমানুষের মতো আবদারের সুরে বলিল, একটা ভূতের গল্প বলুন না?

—ভূতের গল্প! নাও ধান ভেনে, আর এখন রাত্তির দুপুরে ভূতের গল্প করে না!

—না বলুন।

বিপিন একটা গল্প বানাইয়া বলিল। অনেকদিন আগে কাহার মুখে একটা গল্প শুনিয়াছিল, সেটিও বলিল। চাঁদ এবার অনেকদূর উঠিয়াছে, বিপিন শান্তির সহিত গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ভাবিতেছিল মানীর কথা, মৃতা বাগদি মেয়েটির কথা, মনোরমার কথা, কামিনী মাসির কথা।

মানীর সঙ্গে এই রকম ভাবে গল্প করিতে পারিত এই রকম সন্ধ্যায়! না, তাহা হইবার নয়। মানীর শ্বশুরবাড়ি এরকম পাড়াগাঁয়েও নয়, মানী এরকম বসিয়া বসিয়া ধানও ভানিবে না।

ইতিমধ্যে মতির মা কি কাজে একটু বাড়ির মধ্যে ঢুকিতেই বিপিন জিজ্ঞাসা করিল—আচ্ছা শান্তি—মতির মা বলে ডাকচ, ওর মতি বলে মেয়ে ছিল?

শান্তি বিস্মিত হইয়া বলিল—আপনি ওকে চেনেন?

—ও কি জাত?

—বাগদি কিংবা দুলে। আপনি ওর কথা জানলেন কি করে?

—বলচি। ওর বাড়ি কি ভাসানপোতা ছিল?

শান্তি আরও অবাক হইয়া বলিল—ভাসানপোতা ওর শ্বশুরবাড়ি। এ গাঁয়ে ওর বাপের বাড়ি। ওর স্বামী ওকে নেয় না অনেকদিন থেকে। ওর মেয়ে মতি ওর বাপের কাছেই ছিল, তার বিয়ে হয়েছে এই দিকে যেন কোথায়। আমি তাকে কখনো দেখিনি, সে এখানে আসে না।

 

—আচ্ছা, তুমি জানো মতির সঙ্গে ওর মার দেখা হয়েছিল কতদিন আগে?

—না। কেন বলুন তো? এত কথা জিজ্ঞেস করচেন কেন?

—ওকে কথাটা জিজ্ঞেস করবে। নয়তো থাক, আজ জিগ্যেস কোরো না—পরে বলব এখন। ইতিমধ্যে মতির মা আসিয়া পড়াতে বিপিন কথা বন্ধ করিল। প্রৌঢ়া আবার ঢেঁকিতে পাড় দিতে আরম্ভ করিল। বিপিন ভাবিল, হয়তো এ জানে না তাহার মেয়ে পিতৃগৃহ ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছিল এবং তাহার সম্প্রতি মৃত্যু হইয়াছে, আজ কৃষ্ণা দ্বিতীয়া, ঠিক এই পূর্ণিমার আগের পূর্ণিমার রাত্রে। বল্লভপুরের বিলের ধারে সে ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাত, বিপিন ভুলে নাই। সে রাতটিতে বাগদির মেয়ে মতি তাহার মনে একটা খুব বড় দাগ রাখিয়া গিয়াছে, অন্য এক জগতের সহিত পরিচয় করাইয়া গিয়াছে।

অভাগিনী বৃদ্ধা জানেও না তাহার মেয়ের কি ঘটিয়াছে।

পরদিন শান্তি যখন চা দিতে আসিল, তখন নির্জনে পাইয়া বিপিন মতির কাহিনী শান্তিকে শুনাইয়া দিল। শান্তি যেমন বিস্মিত হইল, তেমনি দুঃখিত হইল। বলিল—আমার মনে হয় মেয়ে যে ঘর থেকে চলে গিয়েছে একথা ও জানে, কারো কাছে প্রকাশ করে না সেকথা—তবে সে যে মরে গিয়েচে একথা জানে না। জানবার কথাও নয়, বল্লভপুরে ওরা লুকিয়ে এসে ঘর বেঁধে থাকত, কাউকে পরিচয় তো দেয়নি—কি করে জানবে কোথাকার কার মেয়ে? ভাসানপোতা থেকে জেয়ালা-বল্লভপুর কতদূর?

—তা আট ন’ ক্রোশ খুব হবে।

—তা হলে ও কিছুই জানে না, মেয়ে ঘর ছেড়ে বের হয়ে গিয়েচে, একথাও শোনে নি। এত দূর থেকে কে খবর দেবে! ওকে আর কোনো কথা জিগ্যেস করার দরকার নেই।

পরদিন বিকালে দুইখানি গরুরগাড়িতে শান্তি, শান্তির স্বামী গোপাল, বিপিন ও শান্তির শ্বশুর স্টেশনে আসিল এবং সন্ধ্যার পরে রানাঘাটে পৌঁছিয়া সিদ্ধান্তপাড়ার বাসায় গিয়া উঠিল। শান্তির এক মামাশ্বশুর বাসা পূর্ব হইতেই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। দু’খানি মাত্র ঘর, একখানা ছোট রান্নাঘর, ছোট একটু উঠান। ভাড়া পাঁচ টাকা।

 

শান্তি অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, দরাজ জায়গায় হাত-পা ছড়াইয়া খেলাইয়া বাস করা অভ্যাস। সে তো বাসা দেখিয়া স্বামীকে বলিল—এখানে কেমন করে থাকব হ্যাঁগো—ওমা, একি উঠোন—আর এইটুকু রান্নাঘরে কি রাঁধা যায়? আর ঐ পাতকুয়োর জলে নাইবো?

রানাঘাটে বিপিন আসিল অনেকদিন পরে। মানীদের বাড়িতে কাজ করিবার সময় কোর্টে তখন আসিতেই হইত। এইজন্যই রানাঘাটের অনেক জিনিসের সঙ্গে মানীর কথা যেন জড়ানো। গোপালের সহিত বাজার করিতে বাহির হইয়া বিপিন দেখিল পূর্বপরিচিত কত দৃশ্য তাহার মনে কষ্ট দিতেছে—মানীর কথা অনেকটা চাপা পড়িয়া গিয়াছিল, আবার অত্যন্ত নূতন রূপে সে সব দিনের স্মৃতি মনের দ্বারে ভিড় করিতে লাগিল। কষ্ট হয়, সত্যই কষ্ট হয়।

সকালে গোপাল এবং শান্তির শ্বশুরকে লইয়া বিপিন রানাঘাট হাসপাতালে ডাক্তার আর্চারের কাছে গেল। বলাই যখন হাসপাতালে ছিল, তখন আর্চার সাহেবের সঙ্গে বিপিনের আলাপ হয়। আর্চার সাহেব বিপিনকে দেখিয়াই চিনিতে পারিলেন। বলিলেন—আপনার ভাই কোথা? মারা গিয়েচে? তা যাবে, বাঁচবার কোনো আশা ছিল না।

শান্তির শ্বশুরের চোখ দেখিয়া বলিলেন—এখন এঁকে দশ-বারোদিন এখানে থাকতে হবে। চোখে একটা ওষুধ দিচ্চি—চোখ কেমন থাকে, কাল আমায় এসে জানাবেন। কাটাবার এখন দরকার নেই। বলাই যে জায়গাটাতে শুইয়া থাকিত খাটে—বিপিন সেখানটা গিয়া দেখিয়া আসিল। এখন অন্য রোগী রহিয়াছে।

বলাই, মানী…কামিনী মাসি…স্বপ্ন…

হাসপাতাল হইতে ফিরিয়া আসিয়া বিপিন দেখিল শান্তি বাসা বেশ চমৎকার গুছাইয়া লইয়াছে। দুটি ঘরের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ছোট ঘরটিতে বিপিনের একা থাকিবার এবং বড় ঘরটিতে উহারা তিনজনের একত্রে থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়াছে। দু’টি ঘরই ইতিমধ্যে ঝাড়িয়া পরিষ্কার করিয়াছে, মেঝে জল দিয়া ধুইয়া ফেলিয়া শুকনো নেকড়া দিয়া বেশ করিয়া মুছিয়া ফেলিয়াছে। বিছানাপত্র পাতিয়াছে দুটি ঘরেই, বাহিরে বসিবার জন্য একটি সতরঞ্চি পাতিয়া রাখিয়াছে। উহাদের দেখিয়া বলিল—কি হল বাবার চোখের?

 

বিপিন বলিল—চোখ কাটাতে হবে না—তবে এখানে দশ-বারো দিন এখন থাকতে হবে। ওষুধ দিয়ে ছানি নষ্ট করে দেবে বললে। ওঃ, তুমি যে শান্তি! বেশ গুছিয়ে ফেলেছ ঘরদোর।

শান্তি হাসিয়া বলিল—এখন নেয়ে ধুয়ে নিন সব। আমি বাবাকে নাইয়ে নি।

শান্তির শ্বশুর চোখে ভালো দেখিতে পান না, শান্তি তাঁহাকে কি করিয়াই সেবা করিতেছে, দেখিয়া বিপিন মুগ্ধ হইল। মা যেমন অসহায় ছোট ছেলের সব কাজ নিজে করিয়া দেয়, সকল অভাব-অভিযোগের সমাধান নিজে করে, তেমনি করিয়া শান্তি অসহায় বৃদ্ধকে সকল দিক হইতে আগুলিয়া রাখিয়া দিয়াছে।

অথচ সে বালিকার মতো খুশি শহরে আসিয়াছে বলিয়া। সোনাতনপুরের মতো অজ পাড়াগাঁয়ে বাপেরবাড়ি, শ্বশুরবাড়িও ততোধিক অজ পাড়াগাঁয়ে—রানাঘাট তাহার কাছে বিরাট শহর। এখানকার প্রত্যেক জিনিসটি তাহার কাছে অভিনব ঠেকিতেছে। সে চিরকাল সংসারে খাটিতেই জানে, কিন্তু বাহিরের আনন্দ কখনও পায় নাই—জীবনে বিশেষ কিছু দেখেও নাই, তাহার শ্বশুরবাড়ির গ্রামে মনসাপূজার সময় মনসার ভাসান হয় প্রতি শ্রাবণ মাসে, বৎসরের মধ্যে এই দিনটিই তাহার কাছে পরম উৎসবের দিন। সাজিয়াগুজিয়া মনসাতলায় পাড়ার অন্যান্য বৌঝিয়ের সঙ্গে সন্ধ্যাবেলা ভাসান শুনিতে যাইবে, এই আনন্দে শ্রাবণ মাসের পয়লা হইতে দিন গুনিত। তাহার মতো মেয়ের রানাঘাট শহরে আসিয়া অত্যন্ত খুশি হইবারই কথা।

শান্তির শ্বশুর বিপিনকে বলিলেন—ডাক্তারবাবু, এখানে টকি বায়োস্কোপ হয় তো?

বিপিনও পাড়াগাঁয়ের লোক, সেও কখনো দেখে নাই—কিন্তু ইহাদের কাছে সে কলিকাতার পাশ-করা ডাক্তারবাবু, তাহাকে পাড়াগাঁয়ের ভূত সাজিয়া থাকিলে চলিবে না। সে তখনই জবাব দিল—ও টকি! হয় বৈকি, খুব হয়।

—আপনি বৌমাকে নিয়ে গিয়ে একদিন দেখিয়ে আনুন। আমার কখন কি দরকার হয়, গোপাল থাকুক। বৌমা কখনও জীবনে ওসব দেখেনি—বেচারি দেখুক একটু—

 

—কেন, গোপালও তো দেখে নি—সে-ই যাক শান্তিকে নিয়ে!

—গোপাল না থাকলে আমার কাজকর্ম—আপনি ব্রাহ্মণ, আপনাকে দিয়ে তো হবে না ডাক্তারবাবু, তারপর বৌমা আমার কাছে থাকলে—গোপাল একদিন যাবে এখন।

শান্তি রান্নাঘরে রান্না করিতেছে—গোপাল বসিয়া তরকারি কুটিতেছে, বিপিন গিয়া:বলিল—শান্তি, টকি বায়োস্কোপ দেখতে যাবে? মিত্তির মশায় বললেন তোমাকে নিয়ে দেখিয়ে আনতে!

শান্তি বালিকার মতো উচ্ছ্বসিত হইয়া বলিল—কোথায়, কোথায়, কখন হবে? চলুন না, আজই চলুন—কখন হয় সে, আমি কখনো দেখিনি। আমার মেজ ননদের মুখে টকির গল্প শুনেছি, সেই থেকে ভারি ইচ্ছে আছে দেখবার।

বিপিনও টকির খোঁজ বিশেষ কিছু জানে না—দুপুরের পর বাহির হইয়া সন্ধান করিয়া জানিল বড়বাজারে ফেরিফ্যান রোডের ধারে এক কোম্পানি কলিকাতা হইতে আসিয়া মাস দুই টকি দেখাইতেছে—অদ্যকার পালা ‘নরমেধ যজ্ঞ’, ছ’টার সময় আরম্ভ।

বেলা চারিটার সময় সে শান্তির শ্বশুরের ঔষধ কিনিতে ডাক্তারখানায় গেল—যাইবার সময় শান্তিকে তৈরী থাকিতে বলিয়া গেল। সাড়ে পাঁচটার সময় ফিরিয়া দেখিল, শান্তি সাজিয়াগুজিয়া অধীর আগ্রহে ঘর-বাহির করিতেছে। বলিল—উঃ বাপরে, বেলা কি আর আছে! টকি শেষ হয়ে গেল এতক্ষণ—চলুন শীগগির!

বিপিন বলিল—গাড়ি আনব, না হেঁটে যেতে পারবে? মিত্তির মশাই কি বলেন?

শান্তির শ্বশুর বলিলেন—আপনিও যেমন, কে-ই বা ওকে চিনচে এখানে, হেঁটেই যাক না।

পথে বাহির হইয়াই শান্তি বলিল—উঃ, পায়ে বড্ড কাঁকর ফুটচে, খালিপায়ে এ পথে হাঁটা যায় না।

অগত্যা বিপিন একখানা গাড়ি করিল। শান্তি বলিল—বাবাকে বলবেন না গাড়ির কথা, আমি পয়সা দিচ্চি, আমার কাছে আলাদা পয়সা আছে।

 

বিপিন হাসিয়া বলিল—তোমার সব দুষ্টুমি শান্তি, আমি সব বুঝি। তোমার ঘোড়ারগাড়ি চড়বার সাধ হয়েছিল কিনা বল সত্যি করে। কাঁকর ফোঁটা কিছু না, বাজে ছল। ধরে ফেলেচি, না?

শান্তি হাসিয়া ফেলিল।

—পয়সা তোমায় দিতে হবে—একথা ভাবলে কেন?

—আপনি দিতে যাবেন কেন? আমার সাধ হয়েছিল, আপনার তো হয়নি?

—যদি বলি আমারও হয়েছিল?

—বেশ, তবে দিন আপনি।

টকি দেখিতে বসিয়া শান্তি বলিল—আচ্ছা বলুন তো, আপনার সঙ্গে বসে এমনভাবে টকি দেখব একথা কখনো ভেবেছিলেন?

—কি করে ভাবব বলো?

—আপনি খুশি হয়েচেন বলুন?

বিপিন প্রথম হইতেই নিজেকে অত্যন্ত সতর্ক করিয়া দিয়াছিল মনে মনে। শান্তিকে একা লইয়া বাড়ির বাহির হইয়াছে—তাহার সঙ্গে কোনোপ্রকার ভালোবাসার কথা বলা হইবে না। ও পথে আর নয়। বিশেষত তাহার স্বামী ও শ্বশুর বিশ্বাস করিয়া তাহার সঙ্গে ছাড়িয়া দিয়াছে যখন, তখন শান্তিকে একটিও অন্য ধরনের কথা সে বলিবে না।

বিপিন জবাব দিতে পারিত—কেন, আমি খুশি হই-না-হই তোমার তাতে আসে যায় কিছু নাকি?

কিন্তু সে বলিল—খুশি না হবার কারণ কি? আমিও যে ঘন ঘন টকি দেখি তা তো নয়, থাকি তো সোনাতনপুরে—খুশি হবার কথাই তো। আর এই যে পালাটা হচ্ছে, নতুন পালা একেবারে।

 

কথাটা অন্য দিক দিয়া ঘুরিয়া গেল।

বিপিন দেখিল শান্তি খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। টকি কখনও না দেখিলেও সে গল্পের গতি এবং ঘটনা তাহার অপেক্ষা ভালো বুঝিতেছে। অনেক জায়গায় শান্তি এমন আবিষ্ট ও মুগ্ধ হইয়া পড়িতেছে যে বিপিন কথা বলিলে সে শুনিতে পায় না। একবার দেখিল শান্তি আঁচল দিয়া চোখের জল মুছিয়া কাঁদিতেছে।

বিপিন হাসিয়া বলিল,—ও কি শান্তি, কান্না কিসের?

শান্তি হাসিকান্না মিশাইয়া বলিল,—আপনার যেমন কঠিন মন, আমার তো অমন নয়, ছেলেটার দুঃখ দেখলে কান্না পায় না?

—তা হবে, আমার চোখের জল অত সস্তা নয়।

—তা জানি। আচ্ছা আমি মরে গেলে আপনি কাঁদবেন?

—ও কথা কেন? ও সব কথা থাক।

শান্তি খপ করিয়া বিপিনের হাত ধরিয়া অনেকটা আব্দার এবং খানিকটা আদরের সুরে বলিল,—না বলুন, বলতেই হবে।

বিপিন হাসিয়া বলিল—নিশ্চয়ই কাঁদব।

—সত্যি?

—মিথ্যে বলচি?

পরক্ষণেই সে শান্তির সঙ্গে কোনো ভালোবাসার কথা না বলিবার সঙ্কল্প ভুলিয়া গিয়া বলিয়া ফেলিল,—আমি মরে গেলে তুমি কাঁদবে?

 

শান্তি গম্ভীর মুখে বলিল—অমন কথা বলতে নেই।

—না, কেন আমার বেলায় বুঝি বলতে নেই! তা শুনব না, বলতেই হবে।

—না, ও কথার উত্তর নেই। অন্য কথা বলুন।

—এর উত্তর যদি না দাও, তোমার সঙ্গে আর কথা বলব না।

—না বলবেন, না বলবেন।

—বলবে না?

—না, আমি তো বলে দিয়েচি।

অগত্যা বিপিন হাল ছাড়িয়া দিল। মনে মনে ভাবিল—শান্তি বেশ একটু একগুঁয়েও আছে, যা ধরিবে, তাই করিবে।

ইন্টারভ্যালের সময় শান্তি বাহিরে আসিয়া বলিল—সবাই চা খাচ্ছে, আপনি চা খাননি তো বিকেলে, খান না চা, আমি পয়সা দিচ্চি—

—তুমি কেন দেবে! আমার কাছে নেই নাকি—চল দুজনে খাব।

শান্তির একগুঁয়েমি আরও ভালো করিয়া প্রকাশ পাইল। সে বলিল,—সে হবে না, আপনার চা খাওয়ার পয়সা আমি দেবো, নয়তো আমি চা খাব না।

বিপিন দেখিল ইহার সহিত তর্ক করা বৃথা, অগত্যা তাহাতেই রাজি হইয়া দুজনে চায়ের স্টলে একখানা বেঞ্চের উপর বসিল। শান্তি বলিল, আপনি ওই যে বোতলের মধ্যে কি রয়েচে, ওই দুখানা নিন—শুধু চা আপনাকে খেতে দেব না।

—তুমিও নাও, আমি একা খাব বুঝি?

বিপিনের এই সময়ে মনে হইল মনোরমার কথা। বেচারি কখনো টকি বায়োস্কোপ দেখে নাই—সংসারে শুধু খাটিয়াই মরে। একদিন তাহাকে রানাঘাটে আনিয়া টকি দেখাইতে হইবে—বীণাকেও। সে বেচারিই বা সংসারের কি দেখিল! মা বুড়োমানুষ, তিনি এসব পছন্দ করিবেন না, বুঝিবেনও না, তিনি চান ঠাকুরদেবতা, তীর্থধর্ম।

পুনরায় ছবি আরম্ভ হইবার ঘণ্টা পড়িল। দুজনে আবার গিয়া ভিতরে বসিল। শেষের দিকে ছবি আরও করুণ হইয়া আসিল। এক জায়গায় শান্তি ফুঁপাইয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিতেছে দেখিয়া বিপিন বলিল—ও কি শান্তি, তুমি এমন ছেলেমানুষ! কাঁদে না অমন করে—ছিঃ—চল বাইরে যাবে?

শান্তি ঘাড় নাড়িয়া বলিল—উঁহু—

—উঁহু তো কেঁদো না, লোকে কি ভাববে?

ছবি শেষ হইতে বাহিরে আসিয়া শান্তি চুপচাপ থাকিয়া পথ চলিতে লাগিল। স্টেশনের কাছে আসিয়া বিপিন বলিল, চলো—ইস্টিশান দেখবে।

—চলুন।

আলোকোজ্জ্বল প্ল্যাটফর্ম দেখিয়া শান্তি ছেলেমানুষের মতো খুশি। শান্তিকে সুন্দরী মেয়ে বলা যায় না, কিন্তু তাহার নিজস্ব এমন কতকগুলি চোখের ভঙ্গি, হাসির ধরন প্রভৃতি আছে যাহা তাহাকে সুন্দরী করিয়া তুলিয়াছে। বাহির হইতে প্রথমটা তত চোখে পড়ে না এসব। বিপিন এতদিন শান্তিকে দেখিয়া আসিতেছে বটে, কিন্তু আজ প্রথম তাহার মনে হইল—শান্তি যে এমন সুন্দর দেখতে, এমন চোখের ভঙ্গি ওর—এ এতদিন তো ভাবিনি?

আসল কথা, কোথা হইতে বিপিন এতদিন শান্তির রূপ দেখিবে? আজ ছাড়া পাইয়া মুক্ত, স্বাধীন অবস্থায় শান্তির নারীত্বের যে দিক ফুটিয়াছে তাহাই তাহাকে সুন্দরী করিয়া তুলিয়াছে। এ শান্তি এতদিন ছিল না। কাল হইতে আবার হয়তো থাকিবেও না। শান্তির মধ্যে যে নায়িকা এতকাল ছিল ঘন ঘুমে অচেতন, আজ সে জাগিয়াছে। অপরূপ তার রূপ, অদ্ভুত তার ঐশ্বর্য। বিপিন ইহা ঠিক বুঝিল না।

সে ভাবিল, আজ তাহার সহিত একা বাহির হইয়া শান্তি নিজের যে রূপ দেখাইতেছে—তাহা এতদিন ইচ্ছা করিয়াই ঢাকিয়া রাখিয়া দিয়াছিল। এটুকু অভিজ্ঞতা বিপিনের বহুদিন হইয়াছে যে, মেয়েরা সকলকে নিজের রূপ দেখায় না—যখন যাহার কাছে ইচ্ছা করিয়া ধরা দেয়—সে-ই কেবল দেখিতে পায়।

বিপিন কিছু অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিল।

শান্তিকে একা লইয়া আর কোনোদিন সে বাহির হইবে না। শান্তি তাহাকে জালে জড়াইতে চায়।

কিন্তু বিপিন আর নিজেকে কোনো বন্ধনের মধ্যে ফেলিতে চায় না। মনের দিক হইতে স্বাধীন না থাকিলে সে নিজের কাজে উন্নতি করিতে পারিবে না। এই তো কাল আর্চার সাহেবকে বলিয়া আসিয়াছে, হাসপাতালে একটি শক্ত অস্ত্রোপচার করা হইবে একটি রোগীর, বিপিন কাল দেখিতে যাইবে। তবুও যতটুকু শেখা যায়।

শান্তিকে লইয়া খানিক এদিক ওদিক ঘুরিয়া বলিল,—চল এবার বাসায় যাই—

—আর একটুখানি থাকুন না, বেশ লাগচে।

একখানা ট্রেন কলিকাতার দিক হইতে আসিয়া দাঁড়াইল এবং কিছুক্ষণ পরে ছাড়িয়া চলিয়া গেল। বহু যাত্রী উঠিল, বহু যাত্রী নামিল।

শান্তি এসব অবাক চোখে চাহিয়া দেখিতেছিল। সে এসব ভালো করিয়া কখনো দেখে নাই। দু-তিন বার সে রেলে চড়িয়া এখান ওখান গিয়াছে—একবার গিয়াছিল শিমুরালি গঙ্গাস্নানের যোগে মা-বাবার সঙ্গে, তখন তাহার বয়স মোটে এগার বছর, আর একবার স্বামীর সঙ্গে পিসতুতো ননদের ছেলের বিবাহে এই লাইনে গিয়াছিল শ্যামনগর মূলাজোড়। সেও আজ দু-তিন বৎসর হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এমন করিয়া যদৃচ্ছাক্রমে বেড়াইয়া কখনও সে এত বড় ইস্টিশানের কাণ্ডকারখানা দেখে নাই।

বিপিনের নিজেরও বেশ লাগিতেছিল। কোথায় পড়িয়া থাকে বারো মাস, কোথা হইতে এ সব দেখিবে? রানাঘাটের মতো শহর বাজার জায়গায় থাকিতে পাইলে সামান্য টাকা রোজগার হইলেও সুখ। পাঁচজনের সহিত মিশিয়া পাঁচটা জিনিস দেখিয়া সুখ।

সে কথা শান্তিকে সে বলিল।

শান্তি বলিল,—সত্যি! আচ্ছা আমরা কোথায় পড়ে থাকি ডাক্তারবাবু, গরুর মতো কিংবা মোষের মতো দিন কাটাই, কি বা দেখলাম জীবনে, আর কি বা—

—সত্যি, কি দেখতে পাই?

—শুনতেই বা কি! এই যে ধরুন আজ টকি দেখলাম, এ কেউ দেখেছে আমাদের গাঁয়ে কি আমাদের শ্বশুরবাড়ির গাঁয়ে? আহা, ও বোধ হয় দেখেনি, ও কাল দেখুক এসে।

—কে, গোপাল? গোপাল কখনো টকি দেখেনি?

—কোত্থেকে দেখবে? আপনিও যেমন—ওরা কেউ দেখেনি। কাল পাঠিয়ে দেব বিকেলে।

—আমিও সত্যি বলচি শান্তি—এই প্রথম দেখলাম টকি। বায়োস্কোপ দেখেছি অনেক দিন আগে—সে তখনকার আমলে। বাবার পয়সা তখনও হাতে ছিল, একবার কলকাতায় গিয়ে বায়োস্কোপ দেখি। তখন টকি হয় নি। তারপর বহুকাল হাতে পয়সা ছিল না, নানা গোলমাল গেল—

বিপিন নিজের জীবনের কথা এত ঘনিষ্ঠ ভাবে কখনও শান্তির কাছে বলে নাই। শান্তির বোধ হয় খুব ভালো লাগিতেছিল, সে আগ্রহের সহিত শুনিতেছিল এ সব কথা।

খানিকক্ষণ দুজনে চুপচাপ। মিনিট পাঁচ ছয় কাটিয়া গেল।

বিপিন হঠাৎ বলিল,—কি কথা মনে হচ্ছে জানো শান্তি?

শান্তি যেন সলজ্জ আগ্রহের সহিত বলিল,—কি?

—সেই মতি বাগদিনীর কথা!

শান্তির মুখে নিরাশা ও বিস্ময় একই সঙ্গে ফুটিল। অবাক হইয়া বলিল,—কেন, তার কথা কেন?

বিপিন ভাবিল, যদি মানী আজ থাকিত, এ প্রশ্ন করিত না। মনের খেলা বুঝিতে তার মতো মেয়ে বিপিন আজও কোথাও দেখে নাই।

তবুও বলিল,—তুমি দেখনি শান্তি, কি করে সে মরেচে, সেই শীতের রাত, গায়ে লেপ কাঁথা নেই, খড় বিচুলি আর ছেঁড়া কাঁথার বিছানা। অথচ কত অল্প বয়সে…আমি এখানে দাঁড়িয়ে চোখ বুজলে সেই জেয়ালা-বল্লভপুরের বিল, সেই চাঁদের আলো, বিলের ধারে চিতা, চিতার এদিকে আমি, ওদিকে বিশ্বেশ্বর, এসব চোখের সামনে দেখতে পাই—

কিন্তু শান্তি বুঝিল না শান্তি যে উত্তর দিল, বিপিন তাহা আশা করে নাই। বলিল—ডাক্তারবাবু, সে জায়গাটা আমায় একবার দেখিয়ে আনবেন তো, সেদিন আপনার মুখে ওর সব কথা শুনে পর্যন্ত আমিও ভুলতে পারিনি। হোক নিচু জাত, ওই একটা জিনিসে বড্ড উঁচু হয়ে গেছে। চলুন, ওই বেঞ্চিখানায় বসি একটু।

—আবার বসবে কেন? রাত হল, বাসায় ফিরি।

—আমার পা ধরে গিয়েচে। ওখানে কি বিক্রি হচ্ছে—চা? আর একটু চা খান—

—আমি আর নয়। তোমার জন্যে আনব?

—তবে পান কিনে আনুন, আমার জন্যে আমি বলিনি। আপনি চা ভালোবাসেন, তাই বলছিলাম।

পানের দোকান নিকটে নাই, কিছু দূরে প্ল্যাটফর্মের ওদিকে। শান্তিকে বেঞ্চে বসাইয়া বিপিন পান আনিতে গিয়া হঠাৎ এক জায়গায় দাঁড়াইয়া গেল। আপ প্ল্যাটফর্ম হইতে কিছু সরিয়া ওভারব্রিজের কাছে একটি মেয়ে তাহার দিকে পিছন ফিরিয়া একটা ট্রাঙ্কের উপর বসিয়া আছে, তাহার আশেপাশে আরও দু-একটা ছোটখাট সুটকেস, বিছানা, আরও কি কি। এইমাত্র যে ট্রেনখানা গেল, সেই ট্রেন হইতেই নামিয়া থাকিবে, বোধ হয় সঙ্গের লোক বাহিরে গাড়ি ঠিক করিতে গিয়াছে, মেয়েটি জিনিস আগুলিয়া বসিয়া আছে। মেয়েটি অবিকল মানীর মতো দেখিতে পিছন হইতে। সেই ভঙ্গি, সেই সব।…কতকাল কাটিয়া গিয়াছে, এখনও তাহার মতো অন্য মেয়ে দেখিলেও তাহারই কথা মনে পড়ে।…

এই সময় মেয়েটি একবার পিছনের দিকে চাহিল।

বিপিন চমকিয়া উঠিল।

পরম বিস্ময়ে ও কৌতূহলে সে স্থানকালপাত্র সব কিছু ভুলিয়া গেল ওভারব্রিজের তলায়। তাহার বুকের মধ্যে কে যে হাতুড়ি পিটিতেছে!

বিপিন নিজের চক্ষুকে যেন বিশ্বাস করিতে পারিল না, কারণ যে মেয়েটি পিছন ফিরিয়া চাহিয়াছিল, সে মানী!

কয়েক মুহূর্তের জন্য বিপিনের চলিবার শক্তি যেন রহিত হইল। মানী এদিকে চাহিয়া আছে বটে, কিন্তু তাহার দিকে নয়—তাহাকে সে দেখিতে পায় নাই। বিপিন অগ্রসর হইয়া মানীর সামনে গিয়া বলিল—এই যে মানী! তুমি এখানে?

মানী চমকিয়া উঠিয়া অন্য দিক হইতে মুহূর্তে দৃষ্টি ফিরাইয়া তাহার দিকে চাহিল। তাহার মুখে বিস্ময়—গভীর, অবিমিশ্র বিস্ময়!

বিপিন হাসিয়া বলিল—চিনতে পারচ না? আমি—

মানীর মুখ হইতে বিস্ময়ের ভাব তখনও কাটে নাই। পরক্ষণেই সে ট্রাঙ্কের উপর হইতে উঠিয়া হাসিমুখে বিপিনের দিকে আগাইয়া আসিয়া বলিল—বিপিনদা! তুমি কোথা থেকে?

বিপিন মানীকে ‘তুই’ বলিতে পারিল না, অনেকদিন পরে দেখা, কেমন সঙ্কোচ বোধ হইল। বলিল—আমি, আমি রানাঘাটে এসেচি কাজে। বলচি—কিন্তু তুমি এমন সময় এখানে?

মানী চোখ নামাইয়া নীচু-দিকে চাহিয়া ধরা গলায় বলিল—তুমি কি করেই বা জানবে! বাবা মারা গিয়েচেন—কাল চতুর্থীর শ্রাদ্ধ, তাই পলাশপুর যাচ্চি আজ। এই ট্রেনে নামলাম।

বিপিন বিস্ময়ের স্বরে বলিল—অনাদিবাবু মারা গিয়েচেন? কবে? কি হয়েছিল?

—কি হয়েছিল জানিনে। পরশু টেলিগ্রাম করেচে এখানকার নায়েব হরিবাবু। তাই আজ আমার দেওরকে সঙ্গে নিয়ে আসচি, উনি আসতে পারলেন না—কেস আছে হাতে। বোধ হয় কাজের দিন আসবেন। দেওর গাড়ি ডাকতে গিয়েচে—তাই বসে আছি।

বিপিন দুই চক্ষু ভরিয়া যেন মানীকে দেখিতেছিল। এখনও যেন তাহার বিশ্বাস হইতেছিল না যে এই সেই মানী। সেই রকমই দেখতে এখনও। একটুকু বদলায় নাই।

—বিপিনদা, ভালো আছ? কোথায় আছ, কি করচ এখন?

—এখন যে আমি ডাক্তার, নাম-করা পাড়াগাঁয়ের ডাক্তার। রুগী নিয়ে রানাঘাটের হাসপাতালে এসেচি, রুগীর বাসাতেই আছি। আমাদের দেশের ওই দিকে সোনাতনপুর বলে একটা গাঁ, সেখানেই থাকি। মনে আছে মানী, ডাক্তারি করার পরামর্শ তুমিই দিয়েছিলে প্রথম—তাই আজ দুটো ভাত করে খাচ্চি।

—সত্যি, বিপিনদা? সত্যি বলচ এসব কথা?

—সাক্ষী হাজির করতে রাজি আছি, মানী। বিশ্বাস করো আমার কথা।

—ভারী আনন্দ হল শুনে। কিন্তু বিপিনদা, তোমার সঙ্গে যে একরাশ কথা রয়েছে আমার! একটি রাশ কথা!

বিপিন ঠিকমতো কথাবার্তা বলিতে পারিতেছিল না। আজ কি সুন্দর দিনটা, কার মুখ দেখিয়া যে উঠিয়াছিল আজ! এই রানাঘাট স্টেশনে জীবনের এমন একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা—মানীর সঙ্গে দেখা—

সে শুধু বলিল—আমারও একরাশ কথা আছে, মানী!

মানী বলিল—আমার একটি কথা রাখবে বিপিনদা? পলাশপুরে এসো, বাবার কাজের দিন পড়েচে সামনের বুধবার, তুমি তার দু’দিন আগে এসো। তোমার আসা তো উচিতও, এসময় তোমায় দেখলে মাও যথেষ্ট ভরসা পাবেন।

—যাওয়া আমার খুব উচিতও। বাবার আমলের মনিব, আমার একটা কর্তব্য তো আছে, কিন্তু একটা কথা হচ্চে—

মানী ছেলেমানুষের মতো মিনতি ও আবদারের সুরে বলিল—ও সব কিন্তু-টিন্তু শুনব না…আসতেই হবে, তোমার পায়ে পড়ি, এসো বিপিনদা—আসবে না?

এই সময় শান্তি আসিয়া সলজ্জ ভাবে অদূরে দাঁড়াইল।

মানী বলিল—ও কে বিপিনদা?

বিপিন অপ্রতিভ হইয়া পড়িল। মানী জানে সে কি রকম চরিত্রের লোক ছিল পূর্বে, হয়তো ভাবিতে পারে, পয়সা হাতে পাইয়া বিপিনদা আবার আগের মতো—যাহাই হোক, শান্তি কেন এ সময় এখানে আসিল? আর কিছুক্ষণ বেঞ্চিতে বসিলে কি হইত তাহার?

বলিল—ও গিয়ে আমাদের গাঁয়েরই—মানে ঠিক আমাদের গাঁয়ের নয়, আমি যেখানে ডাক্তারি করি সে গাঁয়েরই—ওর বাবা আমার রুগী।

মানী বলিল—ডাকো না এখানে, বেশ মেয়েটি!

বিপিন শান্তিকে ডাকিয়া মানীর সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিল। মানী তাহার হাত ধরিয়া ট্রাঙ্কের উপর বসাইয়া বলিল—বসো না ভাই এখানে, তোমার বাবার কি অসুখ?

—চোখের অসুখ, তাই ডাক্তারবাবুকে সঙ্গে করে আমরা রানাঘাটের সায়েব ডাক্তারের কাছে দেখাতে এসেচি পরশু। আপনি বুঝি ডাক্তারবাবুর গাঁয়ের লোক?

—না ভাই, আমার বাপের বাড়ি পলাশপুর, এখান থেকে চার ক্রোশ—

এই সময় মানীর দেওর আসিয়া বলিল—বৌদি, গাড়ি এই রাত্তিরবেলা যেতে চায় না—অনেক কষ্টে একখানা ঠিক করেচি, চলুন উঠুন।

মানী দেওরের সহিত বিপিনের পরিচয় করাইয়া দিল। মানীর দেওর বেশ ছেলেটি, কোন কলেজে বি.এ. পড়ে—এইটুকু মাত্র বিপিন শুনিল, তাহার মন তখন সেদিকে ছিল না।

মানী গাড়িতে উঠিবার সময় বার বার বলিল—কবে আসচো পলাশপুরে বিপিনদা? কালই এসো—এরা এখানে দু’দিন থাকবেন তো, তুমি সেই ফাঁকে ঘুরে এসো আমাদের ওখান থেকে, আসাই চাই; মনে থাকে যেন।

বাড়ি ফিরিবার পথে শান্তি যেন কেমন একটু বিমনা। সে জিজ্ঞাসা করিল—উনি কে ডাক্তারবাবু? আপনার সঙ্গে কি করে আলাপ?

বিপিন বলিল—আমি আগে যে জমিদার-বাড়ি কাজ করতাম, সেই জমিদারবাবুর মেয়ে। আমার বাবাও ওখানে কাজ করতেন কিনা, ছেলেবেলায় ওদের বাড়ি যেতাম—ওর সঙ্গে একসঙ্গে খেলা করেছি—অনেক দিনের জানাশুনো।

শান্তি বলিল—বেশ লোক কিন্তু। অত বড় মানুষের মেয়ে, মনে কোনো ঠ্যাকার নেই। দেখতেও ভারি চমৎকার।

রাত্রে সেদিন বিপিনের ঘুম হইল না। মনের মধ্যে কি এক প্রকারের উত্তেজনা, কি যে আনন্দ, তাহা প্রকাশ করিয়া বলা যায় না। যত ঘুমাইবার চেষ্টা করে—বিছানা যেন গরম আগুন, মানীর সহিত দেখা হইয়াছে—আজ মানীর সহিত দেখা হইয়াছে—মানী তাহাকে পলাশপুর যাইতে বার বার অনুরোধ করিয়াছে—অনেকবার করিয়া বলিয়াছে—সেই মানী, এসব জিনিসও জীবনে সম্ভব হয়?

শুধু মানীর অনুরোধেই বা কেন—অনাদিবাবু তাহার বাবার আমলের মনিব। তাঁহার মৃত্যুসংবাদ পাইয়া তাহার সেখানে একবার যাওয়াটা লৌকিক এবং সামাজিক উভয় দিক দিয়াই একটা কর্তব্য বই কি।

সকালে উঠিয়া সে শান্তির শ্বশুরকে লইয়া যথারীতি হাসপাতালে গেল। সেখান হইতে ফিরিয়া শান্তিকে বলিল—শান্তি, ভাত চড়িয়ে দাও তাড়াতাড়ি, আমি আজই পলাশপুর যাব।

শান্তি নিজে ভাত রাঁধিয়া বিপিনকে দিত না, তবে হাঁড়ি চড়াইয়া দিত, বিপিন নামাইয়া লইত মাত্র। তরকারি রাঁধিবার সময় নিজে রান্না করিতে করিতে ছুটিয়া আসিয়া দেখাইয়া দিত কি ভাবে কি রাঁধিতে হইবে।

শান্তি মনমরাভাবে বলিল—আজই?

—হ্যাঁ, আজই যাই। বলে গেল কিনা কাল—যাওয়া উচিত আজ। বাবার অন্নদাতা মনিব, বুঝলে না?

—আমাকে নিয়ে চলুন না সেখানে?

বিপিন অবাক হইয়া গেল। শান্তি বলে কি! সে কোথায় যাইবে?

শান্তি আবার বলিল—যাবেন নিয়ে? চলুন না, ওদের বাড়িঘর দেখে আসি—কখনো তো কিছু দেখিনি—থাকি পাড়াগাঁয়ে পড়ে!

—তা হয় না শান্তি, কে কি মনে করবে, বুঝলে না? আর তুমি চলে গেলে তোমার শ্বশুর কি করবেন?

—একদিনের জন্যে ও চালিয়ে নিতে পারবে এখন। ও সব কাজে মজবুত, আপনার মতো অকেজো নয় তো কেউ।

—তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু কে কি ভাবতে পারে—গেলে গোপালকেও নিয়ে যেতে হয়—তা তো সম্ভব হচ্ছে না, বুঝলে না?

শান্তি নিরুত্তর রহিল—কিন্তু বোঝা গেল সে মনঃক্ষুণ্ণ হইয়াছে।

বেলা তিনটার সময় শান্তির স্বামী ও শ্বশুরকে বলিয়া-কহিয়া দু’দিনের ছুটি লইয়া সে পলাশপুর রওনা হইল। যাইবার সময় শান্তি পান সাজিয়া একখানা ভিজা নেকড়ায় জড়াইয়া হাতে দিয়া বলিল—বড্ড রোদ্দুর, জলতেষ্টা পেলে মাঠের মধ্যে পান খাবেন। পরশু ঠিক চলে আসবেন কিন্তু। বাবা কখন কেমন থাকেন, আপনি না এলে মহা ভাবনায় পড়ে যাব আমরা।

স্টেশনের পাশের সেগুনবাগান ছাড়াইয়া সোজা মেটে রাস্তা উত্তরমুখে মাঠের মধ্য দিয়া চলিয়াছে। এখনও রৌদ্রের খুব তেজ, যদিও বেলা চারটা বাজিতে চলিল। এই পথ বাহিয়া আজ পাঁচ বছর পূর্বে বিপিন ধোপাখালির কাছারি বা মানীদের বাড়ি হইতে কতবার কাগজপত্র লইয়া রানাঘাটে উকিলের বাড়ি মোকর্দমা করিতে আসিয়াছে, এই পথের প্রতিটি বৃক্ষলতা তাহার সুপরিচিত—শুধু সুপরিচিত নয়, সেই সময়কার কত স্মৃতি, মানীর কত হাসির ভঙ্গি, কত আদরের কথা ইহাদের সঙ্গে জড়ানো—কত কথা—সে সব কথা আজ ভাবিয়া লাভ কি?

বেলা পাঁচটার সময় কলাধরপুরের বিশ্বাসদের বাড়ির সামনে আসিতেই পথে হঠাৎ বিশ্বাসদের বড় ছেলে মোহিতের সঙ্গে দেখা। মোহিত আশ্চর্য হইয়া বলিল—একি, নায়েব মশায় যে! এতদিন কোথায় ছিলেন? চলেচেন কোথায়? পলাশপুরেই? ও, তা আবার কি ওদের স্টেটে—অনাদিবাবু তো মারা গিয়েচেন—

বিপিন সংক্ষেপে বলিল, স্টেটে চাকুরি করিবার জন্য নয়, অনাদিবাবুর শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রিত হইয়াই সে পলাশপুর যাইতেছে—বর্তমানে সে ডাক্তারি করে।

মোহিত ছাড়ে না, বেলা পড়িয়াছে, একটু কিছু খাইয়া তবে যাইতে হইবে, পূর্বে রানাঘাট হইতে যাতায়াতের পথে তাহাদের বাড়িতে বিপিনের কত পায়ের ধুলা পড়িত ইত্যাদি।

অগত্যা কিছুক্ষণ বসিতে হইল।

কতকাল পরে আবার পলাশপুরের বাড়িতে মানীর সঙ্গে দেখা হইবে। সেই বাহিরের ঘর, সেই দালান, সেই দালানের জানালাটি, যেখানটিতে মানী তাহার সহিত কথা বলিবার জন্য দাঁড়াইয়া থাকিত!

সন্ধ্যার পর সে অনাদিবাবুদের বাড়িতে পৌঁছিয়া গেল। প্রথমেই বীরু হাড়ির সঙ্গে দেখা—সেই বীরু হাড়ি, পাইক, যে ইহাদের স্টেটে এক হইয়াও বহু এবং বহু হইয়াও এক। তাহাকে দেখিয়া বীরু ছুটিয়া আসিয়া সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া বলিল—নায়েববাবু যে? কনে থেকে আলেন এখন?

—ভালো আছিস রে বীরু?

—আপনার ছিচরণ আশীব্বাদে—তা ঝান, মা-ঠাকরোণের সঙ্গে একবার দেখাডা করে আসুন।

বিপিন বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া প্রথমে অনাদিবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করিল। তিনি বিপিনকে দেখিয়া চোখের জল ফেলিয়া অনেক পুরনো কথা পাড়িলেন। তাহার বাবা বিনোদবাবুর সময় স্টেটের অবস্থা কি ছিল, আর এখন কি দাঁড়াইয়াছে! আয় বড়ই কমিয়া গিয়াছে, বর্তমান নায়েবটিও বিশেষ কাজের লোক নয়, তাহার উপর কর্তা মারা গেলেন—এখন যে জমিদারি কে দেখাশুনা করিবে তাহা ভাবিয়াই তিনি নাকি কাঠ হইয়া যাইতেছেন। পরিশেষে বলিলেন—তা তুমি এখন কি করছ বাবা?

বিপিন এ প্রশ্নের উত্তর দিল। সে চারিদিকে চাহিতেছিল, সেই অতি সুপরিচিত ঘরদোর, আগেকার দিনের কত কথা স্বপ্নের মতো মনে হয়—আবার সেই বাড়িতে আসিয়া সে দাঁড়াইয়াছে—ওই সে জানালাটি—এসব যেন স্বপ্ন—সত্য বলিয়া বিশ্বাস করা এখনও যেন শক্ত।

অনাদিবাবুর স্ত্রী বলিলেন—তা বাবা, কর্তা নেই, আমি মেয়েমানুষ, আমার হাত-পা আসচে না। তুমি বাড়ির ছেলে, দেখ শোনো, যাতে যা হয় ব্যবস্থা করো—তোমাকে আর কি বলব?

—মা, ওপরের চাবিটা একবার দাও তো—সিন্দুক খুলে রুপোর বাটিগুলো—

বলিতে বলিতে মানী বারান্দা হইতে বাহিরে আসিয়া রোয়াকে পা দিতেই বিপিনকে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। বিস্মিত মুখে বলিল—ওমা, বিপিনদা কখন এলে? এখন? কিছু তো জানিনে—তা একবার আমাকে খোঁজ করে খবর পাঠাতে হয়—এসো এসো, এসে বসো:দালানে।

মানীর মা বলিলেন—হ্যাঁ, বসো বাবা। মানী সেদিন বলছিল রানাঘাট ইস্টিশানে তোমার সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়েছিল, তোমাকে আসতে বলেচে—আমি বললুম, তা একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এলি নে কেন, কতদিন দেখিনি—

মানী বলিল—বোসো বিপিনদা, আমি একটু চা করে আনি—হেঁটে এলে এতটা পথ। কিছুক্ষণ পরে চা ও খাবার লইয়া মানী ফিরিল। বলিল—বিপিনদা, তোমায় এ বাড়িতে আবার দেখে মনে হচ্ছে, তুমি কোথাও যাওনি, আমাদের এখানেই যেন কাজ কর—পুরনো দিন যেন ফিরে এসেচে, না?

—সত্যি। বোস না এখানে মানী—তোর দেওর কোথায়?

মানী হাসিয়া বলিল—তবুও ভালো, পুরনো দিনের মতো ডাকচো। রানাঘাট ইস্টিশানে যে ‘আপনি’ ‘আজ্ঞে’ শুরু করেছিলে! আমার দেওরকে কলকাতায় পাঠিয়েচি চতুর্থীর শ্রাদ্ধের জিনিসপত্র কিনতে। এখানে না এসে এস্টিমেট ঠিক না করে তো আগে থেকে জিনিসপত্র কিনে আনতে পারিনে।

—সে কবে?

—কাল রাত পোয়ালেই। ভালোই হয়েচে তুমি এসেচ। আমার কাজের দিন তোমাকে পেয়ে আমার সাহস হচ্চে। দেখার কেউ নেই—তুমি দেখেশুনে যাতে ভালোভাবে সব মেটে, নিন্দে না হয় তার ব্যবস্থা করো।

—তুই এখানে এসেছিলি আরও, আমি চলে গেলে?

—হুঁ—কতবার এসেচি গিয়েচি—

—আমার কথা মনে হত?

—বাপরে! প্রথম যখন আসি তখন টিকতে পারিনে বাড়িতে। সেই যে আমি রাগ করে ওপরে গেলাম, তার পরেই সকালে উঠে দেখি তুমি রানাঘাটে চলে গিয়েচ—আর কোনোদিন দেখা হয়নি তারপর—সেই কথাই কেবল মনে পড়ত।

—আচ্ছা, কলকাতায় থাকলে আমার কথা মনে পড়ে?

—পড়ে না যে তা নয়, কিন্তু সত্যি বলতে গেলে কলকাতায় ভুলে থাকি পাঁচ কাজ নিয়ে। সেখানে তুমি কোনোদিন যাওনি, সেখানকার বাড়িঘরের সঙ্গে যাদের যোগ বেশি, তাদের কথাই মনে হয়। কিন্তু এখানে এলে—বাপরে! আচ্ছা চা খেয়ে একটু বাইরে গিয়ে দেখাশুনো কর, আমি এরপর তোমার সঙ্গে কথা বলব আবার। এখন বড় ব্যস্ত—

রাত্রে বিপিন পুরনো দিনের মতো রান্নাঘরে বসিয়া খাইল, পরিবেশন করিল মানী নিজে। আহারান্তে বাহির হইয়া আসিবার সময় বিপিন দেখিল, মানী কখন আসিয়া সেই জানালাটিতে দাঁড়াইয়াছে। হাসিমুখে বলিল—ও বিপিনদা!

সাধে কি বিপিনের মনে হয়, মানীর সঙ্গে তাহার পরিচিত আর কোনো মেয়ের তুলনা হয় না! আর কোন মেয়ে তাহার মন বুঝিয়া এ রকম করিত? মানীর সঙ্গে ইহা লইয়া কোনো কথাই তো হয় নাই এ পর্যন্ত, অথচ সে কি করিয়া বুঝিল, বিপিনের মন কি চায়!

বিপিন হাসিয়া জবাব দিল—ও, মানী!

—মনে পড়ে?

—সব পড়ে।

—ঠিক?

—নিশ্চয়। নইলে কি করে বুঝলুম! বাবা, তুমি অন্তর্যামী মেয়েমানুষ!

মানী জিব বাহির করিয়া দুই চোখ বুজিয়া মুখ ভ্যাঙাইল।

—সত্যি মানী, তোর তুলনা নেই!

—সত্যি?

—নির্ভুল সত্যি।

—কখনো ভেবেছিলে বিপিনদা, এমন হবে আমার?

—স্বপ্নেও না! কিন্তু মানী, তোর সঙ্গে আমার কথা আছে, কখন হবে?

—বাইরের ঘরে গিয়ে বসো। আমি পান নিয়ে যাচ্চি।

একটু পরেই মানী বৈঠকখানায় ঢুকিয়া চৌকির উপর পানের ডিবাটি রাখিয়া কবাট ধরিয়া দাঁড়াইল। বলিল—তুমি এখন কি করচো, কোথায় আছ ভালো করে বল। সেদিন কিছুই শুনিনি, সেদিন কি আমার ওসব শোনবার মন ছিল বিপিনদা—কতকাল পরে দেখা বল তো?

বিপিন তাহার ডাক্তারি জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলিয়া গেল। সোনাতনপুরের দত্তবাড়ির কথা, শান্তির কথা, মনোরমাকে সাপে কামড়ানোর কথা।

রাত হইয়াছে। ইতিমধ্যে দু’বার মানী বাড়ির মধ্যে গেল মায়ের ডাকে, আবার ফিরিল। সব কথা শুনিয়া বলিল—বিপিনদা, তুমি আমার চিঠি একখানা পেয়েছিলে একবার?

—নিশ্চয়।

—ওই সময়টা আমার মন বড্ড খারাপ হয়েছিল পুরনো কথা ভেবে। তাই চিঠিখানা লিখেছিলুম। আমার কথা ভাবতে? সত্যি বল তো—

—সর্বদাই। বেশি করে একদিন মনে পড়েছিল, সে দিনটির কথা বলি। তারপর জেয়ালা-বল্লভপুরের বিলের ধারের সেই রাত্রির ব্যাপার বিপিন বলিল। মতি বাগদিনীর সর্বত্যাগী প্রেমের কথা, তাহার অতীব দুঃখজনক মৃত্যুর কথা।

সব শুনিয়া মানী দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—অদ্ভুত!

—তোকে বলব বলে সেদিনই ভেবেছি। তোর কথাই মনে হয়েছিল সকলের আগে সেদিন।

—আচ্ছা, কেন এমন হয় বিপিনদা? দুঃখের সময় কেন এমন করে মনে পড়ে? সত্যি বলচি, তবে শোনো—আমার খোকা যখন মারা গেল, এক বছর বয়স হয়েছিল, আজ বাঁচলে তিন বছরেরটি হত, রাত তিনটের সময় মারা গেল ভবানীপুরের বাড়িতে—একশো কান্নাকাটির মধ্যে তোমার কথা মনে পড়ল কেন আমার?

—এ রোগের ওষুধ নেই মানী। কেন কি বলব!

—অথচ ভেবে দ্যাখো, সে সময় কি তোমার কথা মনে পড়বার সময়? তবে কেন মনে পড়ল?

তারপর দু’জনেই চুপচাপ। নীরবতার ভাষা আরও গভীর হয়, নীরবতার বাণী অনেক কথা বলে। কিছুক্ষণ পরে বিপিন বলিল—কাল সকালে আমি চলে যাব মানী। ডাক্তার লোক, রুগী ফেলে এসেচি—

—বেশ, আমি বাধা দেবো না।

—তুই আমায় মানুষ করে দিয়েছিস মানী।

—শুনে সুখী হলুম।

—জানিস মানী, ওই যে তোর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি এখান থেকে চলে যাবার পরে, সেই দুঃখটা মনের মধ্যে বড্ড ছিল। আজ আর তা রইল না। সুতরাং চলে যাই।

—না, যেও না বিপিনদা। বাবার চতুর্থীর শ্রাদ্ধটা আমি করচি, থেকে যাও। একটু দেখাশুনা করতে হবে তোমাকে।

—তবে থাকি, তুই যা বলবি।

—তোমার সঙ্গে সেদিন যে বউটিকে দেখলুম, ও তোমার সঙ্গে বেড়ায় কেন?

—বেড়ায় না মানী। সিনেমা দেখতে এসেছিল সেদিন, শ্বশুর অন্ধ, তার কাছে কে থাকে, তাই ওর স্বামী সেখানে ছিল।

—মেয়েমানুষের চোখ এড়ানো বড় কঠিন বিপিনদা, ও মেয়েটি তোমায় ভালোবাসে।

—কে বললে?

—নইলে কক্ষনো তোমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে আসতে চাইত না পাড়াগাঁয়ের বউ। তোমার বয়েসও বেশি নয় কিছু—আসতে পারত না!

—ও!

—আমার কথা শোনো, তোমার স্বভাবচরিত্র ভালো না, ওর সঙ্গে আর মিশো না বেশি।

বিপিন হি হি করিয়া হাসিয়া বলিল—বেহ্মধম্মের লেকচার দিচ্ছিস যে! পাদ্রি সাহেব!

মানীও হাসিয়া ফেলিল! পুনরায় গম্ভীর হইবার চেষ্টা করিয়া বলিল—না, সত্যি বলচি, শোনো। ওকে কষ্ট দেবে কেন মিছিমিছি? ওর সঙ্গে মেলামেশা করো না—মেয়েমানুষ বড্ড কষ্ট পায়, মতি বাগদিনীর কথা ভাবো!

বিপিন বলিল—ধোপাখালিতে এক বুড়ি ছিল, সেও তোর সম্বন্ধে আমায় একথা বলেছিল।

—আমার সম্বন্ধে? কে বুড়ি? ওমা, সে কি—শুনিনি তো কক্ষনো!

বিপিন সংক্ষেপে কামিনীর কাহিনী বলিয়া গেল।

মানী নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল—ঠিক বলেছিল বিপিনদা। এ কষ্ট সাধ করে কেউ যেন বরণ করে না! তবে কামিনী বুড়ি যখন বলেছিল, তখন আর উপায় ছিল কি?

—নাঃ!

—শান্তির সঙ্গে দেখাশুনো করবে না। সোনাতনপুর ওদের বাড়ি যদি ছাড়তে হয়, তাও করবে এজন্যে। বউদিদিকে নিয়ে যাও না, যেখানে থাকো সেখানে?

—বেশ। তুমি শান্তির বরের একটা চাকরি করে দাও না কলকাতায়। বড় ভালো ছেলেটি। শান্তির একটা উপায় করো অন্তত।

—চেষ্টা করব। ওঁকে বলে দেখি—হয়ে যেতে পারে।

—জানিস মানী, শান্তির তোকে বড্ড ভালো লেগেছে। ও এখানে আসতে চাচ্ছিল।

—সে আমার জন্যে নয় বিপিনদা। সে তোমার জন্যে—তোমার সঙ্গ পাবে এই জন্যে। ওসব আর আমায় শেখাতে হবে না। আমি মনকে বোঝাচ্ছি, তোমার সঙ্গে কাল শ্রাদ্ধের কথাবার্তা বলতে এসেচি—কিন্তু তাই কি এসেচি? এতক্ষণ বসে তোমার সঙ্গে বকবক করচি কি সেই জন্যে?

.

পরদিন সকাল হইতে কাজকর্মের খুব ভিড়। জমিদারের বড় মেয়ে বড় মানুষের বউ, খুব জাঁক করিয়াই চতুর্থীর শ্রাদ্ধ হইবে। বিপিন খাটিতে লাগিয়া গেল সকাল হইতেই। আশেপাশের অনেকগুলি গ্রামের ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত। লোকজনের কোলাহলে বাড়ি সরগরম হইয়া উঠিল।

মানী একবার বলিল—আহা, শান্তিকে আনলে হত বিপিনদা! নিজে মুখফুটে বলেছিলো, আনলে না কেন, সব তোমার দোষ।

—না এনেই অত মুখনাড়া শুনলাম, আনলে কি আর রক্ষে ছিল?

—কীর্তনের দল আনতে রানাঘাটে গাড়ি যাচ্চে, তুমি গিয়ে ওই গাড়িতে তাকে নিয়ে আসবে?

—সে উচিত হয় না, মানী। অন্ধ শ্বশুর দু’ দিন পড়ে থাকবে কার কাছে? থাকগে ওসব।

ধোপাখালির অনেক প্রজা নিমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছিল। তাহাকে দেখিয়া সকলেই খুব খুশি। নরহরি দাসও আসিয়াছিল, সে বিপিনকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া বলিল—লায়েববাবু যে! অনেক দিনের পর আপনার সঙ্গে দ্যাখা—ভালো আছেন? আপনি চলে যাবার পর ধোপাখালি অনুপায় হয়ে গিয়েচে বাবু। সবাই আপনার কথা বলে।

বিপিন তাহার কুশলপ্রশ্নাদি জিজ্ঞাসা করিল। বলিল—হ্যাঁরে, তোদের গাঁয়ে ডাক্তারি চলে? আমি আজকাল ডাক্তারি করি কিনা?

নরহরি দাস বলিল—আসুন, এখুনি আসুন বাবু। ডাক্তারের যে কি কষ্ট, তা তো নিজের চোখে তুমি দেখেই এসেচ। আপনারে পেলি লোকে আর কোথাও যাবে না। ওষুধ খেয়েই মরবে।

সারাদিন বিপিন বাহিরের কাজকর্মের ভিড়ে ব্যস্ত রহিল। মানীর সঙ্গে দেখাশুনা হইল না। অনেক রাত্রে যখন কীর্তন বসিয়াছে, তখন মানী আসিয়া বলিল—বিপিনদা, খাবে এসো, রান্নাঘরে জায়গা করেচি।

রান্নাঘরের দাওয়ায় মানী নিজের হাতে তাহার পাতে লুচি তরকারি পরিবেশন করিতে করিতে বলিল—আমি জানি তুমি সারাদিন খাওনি, পেটভরে খাও এখন।

বিপিন বিস্মিত হইয়া বলিল—তুই কি করে জানলি?

—আমি সব জানি।

—সাধে কি বলি, অন্তর্যামী মেয়েরা?

—নাও, এখন ভালো করে খাও দিকি। বাজে কথা রাখো। দই আর ক্ষীর নিয়ে আসি—তুমি ক্ষীর ভালোবাসতে খুব।

আরও ঘণ্টা দুই পরে নিমন্ত্রিতদের আহারের পর্ব মিটিল। বাড়ি অনেক নিস্তব্ধ হইল। বাহিরের উঠানে কীর্তনসভা ভঙ্গ হইল।

বিপিন মানীকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া বলিল—মানী, কীর্তনের দল গাড়ি করে রানাঘাট যাচ্চে, আমি ওই সঙ্গে চলে যাই!

—তাই যাবে? বেশ যাও। যা কিন্তু বলে দিয়েচি, মনে থাকবে?

—নিশ্চয়। তুই যা বলবি, তাই করব।

—শান্তির সঙ্গে আর মিশবে না, ও ছেলেমানুষ—তার ওপর অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে।

—মানী, সে কথা আমিও ভেবেছিলুম বহুদিন আগেই। তবে চালাবার লোক না পাওয়া গেলে আমাদের মতো লোকে সব সময় ঠিক পথে চলে না। এবার থেকে সে ভুল আর হবে না। আমি ভাবছি, ধোপাখালিতে যদি ডাক্তারি করি তবে কেমন হয়?

—সত্যি ভেবেছ বিপিনদা? খুব ভালো হয়। তুমি ওখানে নায়েব ছিলে, সবাই চেনে, বেশ চলবে। ওদিকে ছেড়ে দিয়ে এদিকে এসো।

—তোর সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে মানী?

মানী হাসিয়া বলিল—আর জন্মে! এ জন্মে যাদের ওপর যা কর্তব্য আছে, করে যাই বিপিনদা।

বিপিন কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—বেশ, ভুল হবে না?

মানী হাসিতে হাসিতে বলিল,—আবার ভুল? আমি নির্বোধ, এ অপবাদ অন্তত তুমি আমায় দিও না বিপিনদা। দাঁড়াও, প্রণামটা করি।

তারপর মানী গলায় আঁচল দিয়া প্রণাম করিয়া উঠিয়া বলিল—আমার আর একটা কথা রেখো। যেখানেই থাকো, বৌদিদিকে নিয়ে এসো সেখানে। অমন করে কষ্ট দিও না সতীলক্ষ্মী মেয়েকে। যদি সাপের কামড়ে মারাই যেতেন, সে কষ্ট জীবনে কখনো দূর হত ভেবেছ?

বিপিন বিদায় লইয়া গরুরগাড়িতে উঠিতে যাইবে, মানী পিছন হইতে ডাকিল—শোন বিপিনদা!

—কি রে?

মানী কথা বলে না। বিপিন দেখিল, তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতেছে।

—মানী! ছিঃ লক্ষ্মীটি—আসি।

—মানী তখন কথা বলিল না। বিপিনও আধ-মিনিট চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল মানীর সামনে। তারপরে মানী চোখ মুছিয়া বলিল—আচ্ছা এসো, বিপিনদা।

গরুরগাড়ি ছাড়িল। অনেকখানি রাস্তা—মেঠো নির্জন পথ, কৃষ্ণপক্ষের ভাঙ্গা চাঁদের জ্যোৎস্নায় মেটে পথের ধারের গ্রাম্য বাঁশবন, ক্বচিৎ কোনো আমবাগান কিংবা বেগুন-পটলের ক্ষেত, আখের ক্ষেত, অস্পষ্ট ও অদ্ভুত দেখাইতেছে। বিপিনের মনে অন্য কোনো জগতের অস্তিত্ব নাই—কোথায় সে চলিয়াছে—এই আনন্দ ও বিষাদের আলোছায়া-ঘেরা পথে কত দূর-দূরান্তের উদ্দেশে তার যাত্রা যেন সীমাহীন লক্ষ্যহীন—সে চলার বিজন পথে না আছে শান্তি, না আছে মনোরমা। কেহ নাই, সেখানে সে একেবারে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, সম্পূর্ণ একা। কিংবা যদি কেহ থাকে, মনের গহন গভীর গোপন তলায় যদি কেহ থাকে, ঘুমাইয়া থাকুক সে, গভীর সুষুপ্তির মধ্যে নিজেকে লুকাইয়া রাখুক সে।

রানাঘাটে যখন গাড়ি পৌঁছিল, তখন বেশ রোদ উঠিয়াছে।

শান্তি তাহাকে দেখিয়া বলিল—একি চেহারা হয়েচে আপনার ডাক্তারবাবু? রাতে ঘুম হয়নি বুঝি? আর হবেই বা কি করে গরুরগাড়িতে—নেয়ে ফেলুন, আমি ঠাণ্ডা জল তুলে দিই।

দুপুরবেলা বিপিন চুপ করিয়া শুইয়া আছে, শান্তি ঘরে ঢুকিয়া বলিল—ওবেলা চলুন আর একবার টকি ছবি দেখে আসি—আর তো চলে যাচ্ছি দু-তিন দিনের মধ্যে। হয়তো আর দেখা হবে না।

—গোপাল ছবি দেখেছিল?

—উঃ, দুদিন! আপনি যেদিন যান, আর যেদিন আসেন।

—চল যাই।

শান্তি খুশি হইয়া সকালে সকালে সাজিয়া-গুজিয়া তৈয়ারি হইল। বিপিন বেলা তিনটার সময় তাহাকে লইয়া বাহির হইল, কারণ বিপিনের ইচ্ছা সন্ধ্যার পূর্বেই সে শান্তিকে বাসায় ফিরাইয়া আনিবে, নতুবা শান্তির শ্বশুরের খাওয়া-দাওয়ার বড় অসুবিধা হয়।

ছবি দেখিতে বসিয়া শান্তি অত্যন্ত খুশি। আজকার ছবিতে ভালো গান ছিল, সে ও ধরনের গান কখনো শোনে নাই—মুগ্ধ হইয়া শুনিতে লাগিল।

ইণ্টারভ্যালের সময়ে বলিল—চলুন বাইরে, চা খাবেন না?

তাহার ধারণা ছবিতে যাহারা আসে, তাহাদের চা খাইতেই হয় এবং চা খাওয়ার জন্য ছুটি দেওয়া হইয়াছে। শান্তি আবদারের সুরে বলিল—আমি কিন্তু পয়সা দেব আজও!

বিপিন হাসিয়া বলিল—পয়সা ছড়াবার ইচ্ছে হয়েচে? বেশ ছড়াও—

শান্তি লজ্জিত হইল দেখিয়া বিপিন বলিল—না না, কিছু মনে কোরো না শান্তি, এমনি বললুম। আমি তোমাকে কিন্তু কোনো একটা জিনিস খাওয়াব—কি খাবে বল?

শান্তি বালিকার মতো আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল—ওই যে কাঁচের বোয়েমে রয়েচে, ওকে কি বলে—কেক?…বেশ, ওই কেক নিন তবে—আপনার জন্যেও নিন—

সিনেমার পরে শান্তি বলিল—চলুন, একটু ইস্টিশানে বেড়িয়ে যাই। আর তো দেখতে পাব না ওসব—চলে যাচ্চি পরশু!

ডাউন প্ল্যাটফর্মে একখানা বেঞ্চির উপরে নিজে বসিয়া বলিল—বসুন এখানে।

বিপিন বসিল।

—একটা সিগারেটের বাক্স কিনে আনুন, আমি পয়সা দিচ্চি।

—না, তুমি কেন দেবে?

—আপনার পায়ে পড়ি—ক’টা আর পয়সা, দিই না কিনে।

সে এমন মিনতির সুরে বলিল যে, বিপিন তাহার অনুরোধ ঠেলিতে পারিল না। সিগারেট টানিতে টানিতে বিপিন শান্তির নানা প্রশ্নের জবাব দিতে লাগিল—এ লাইন কোথায় গিয়াছে, ও লাইন কোথায় গিয়াছে, সিগন্যালে লাল আলো সবুজ আলো কেন, কি করিয়া আলো বদলায় ইত্যাদি।

আধঘণ্টা বসিবার পরে বিপিন বলিল—চল আমরা যাই—দেরি হয়ে গেল।

—বসুন না আর একটু—আচ্ছা, আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করি—

—কি?

—আমার জন্যে আপনার মন-কেমন করে একটুও?

বিপিন বড় মুশকিলে পড়িল, এ কথার জবাব কি ধরনে দেওয়া যায়! শান্তি আরও কয়েকবার এভাবের প্রশ্ন করিয়াছে ইতিপূর্বে।

 সে ইতস্তত করিয়া বলিল—তা করে বই কি—বিদেশে থাকি, তোমার মতো যত্ন—

—ওসব বাজে কথা। ঠিক কথার জবাব দিন তো দিন—নইলে থাক।

—এ কথা কেন শান্তি?

—আছে দরকার।

—করে বই কি?

—ঠিক বলছেন?

—ঠিক।

শান্তি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—চলুন যাই। রাত হয়ে যাচ্ছে।

বাসায় ফিরিয়া আহারাদির পরে অনেক রাত্রে বিপিন শুইল।

মাঝরাতে একবার কিসের শব্দে তাহার ঘুম ভাঙিল। বাহিরের রোয়াকে কিসের শব্দ হইতেছে! বিপিন জানালা দিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখিল, শান্তি রোয়াকের পৈঠায় বাঁশের আলনার খুঁটি হেলান দিয়া একা বসিয়া আছে; এবং শুধু বসিয়া আছে নয়, বিপিনের মনে হইল, সে হাপুসনয়নে কাঁদিতেছে—কারণ রোয়াকের পৈঠা বিপিনের ঘরের জানালার ঠিক কোণাকুণি।

বিপিন নিঃশব্দে জানালা হইতে সরিয়া গেল। শান্তি কেন কাঁদে এত রাত্রে? তাহাকে কি দোর খুলিয়া ডাকিয়া শান্ত করিবে? তাহাতে শান্তি লজ্জা পাইবে হয়তো—যে লুকাইয়া কাঁদিতে চায়, তাহাকে প্রকাশের লজ্জা দেওয়া কেন?

বিপিনের আর ঘুম হইল না।

হয়তো ভোরের দিকে একটু তন্দ্রা আসিয়া থাকিবে, গোপালের ডাকে তাহার ঘুম ভাঙিল। শান্তি চা লইয়া আসিল, সে সদ্য স্নান করিয়াছে, পিঠের উপর ভিজা চুলটি এলানো, মুখে চোখে রাত্রিজাগরণের কোনো চিহ্ন নাই। হাসিমুখে বলিল—উঃ এত বেলা পর্যন্ত ঘুম! কতক্ষণ থেকে থেকে শেষে ওকে বললুম ডেকে দিতে!

অদ্ভুত মেয়ে বটে শান্তি। বিপিনের মন দুঃখ, সহানুভূতি ও স্নেহে পূর্ণ হইয়া গেল। সে বুঝিয়া ফেলিয়াছে অর্ধেক কথা।

শান্তিকে আর সে দেখা দিবে না। এইবারই শেষ।

মানী বুদ্ধিমতী মেয়ে, সে ঠিকই বলিয়াছিল।

ডাক্তারি চলুক না চলুক, সোনাতনপুরের নিকট হইতে তাহাকে চিরবিদায় গ্রহণ করিতে হইবে। হয় ধোপাখালি, নয় যে কোনো স্থানে—কিন্তু সোনাতনপুরে বা পিপলিপাড়ায় আর নয়। মানীর কথা সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করিবে।

.

পরদিন দুপুরের পর সকলে দুইখানি গরুরগাড়িতে করিয়া রানাঘাট হইতে রওনা হইয়া গ্রামের দিকে ফিরিল। কাপাসপুরের মধ্য দিয়া পূর্ব দিকে তাহাদের নিজেদের গ্রামের পথ বাহির হইয়া গিয়াছে— রানাঘাট হইতে ক্রোশ চার পাঁচ দূরে। এই পর্যন্ত আসিয়া বিপিন বলিল—আপনারা যান তবে, আমি অনেকদিন বাড়ি যাই নি, একবার বাড়ি হয়ে যাব। সামান্য পথ, হেঁটে যাব।

শান্তি বলিল—কেন ডাক্তারবাবু, আমাদের ওখানে আসুন আজ। তারপর না হয় কাল বাড়ি আসবেন।

বিপিন রাজি হইল না। বাড়ির সংবাদ না পাইয়া মন খারাপ হইয়া আছে, বাড়ি যাইতে হইবেই। বিপিন বুঝিল, শান্তি দুঃখিত হইল।

কিন্তু উপায় নাই, শান্তিকে বড় দুঃখ হইতে বাঁচাইবার জন্য এ দুঃখ তাহাকে দিতে হইবেই যে!

শান্তি গাড়ি হইতে নামিয়া বিপিনকে প্রণাম করিল, গোপালও করিল। উহাদের বংশের নিয়ম, ব্রাহ্মণের উপর যথেষ্ট ভক্তি চিরদিন।

একটা বড় পুষ্পিত শিমুলগাছতলায় দাঁড়াইয়া আছে, শান্তি গাছের গুঁড়ির কাছে দাঁড়াইয়া একদৃষ্টে তাহার দিকে চাহিয়া আছে, গোপাল বৃদ্ধ বাপের হাত ধরিয়া নামাইয়া বিপিনের পরিত্যক্ত গাড়িখানায় উঠাইতেছে—ইহাদের সম্বন্ধে বিশেষত শান্তির সম্বন্ধে এই ছবিই বিপিনের স্মৃতিপটের বড় উজ্জ্বল, বড় স্পষ্ট, বড় করুণ ছবি। সেইজন্য ছবিটা অনেকদিন তাহার মনে ছিল।

***