আত্মজীবনীর অংশ-৪
ট্রেনে চেপে বসেছি। মস্তিষ্ক কোনও দিশা পাচ্ছে না। আরও দশ দিন কেটে গেছে, বাবার পরিস্থিতি একই রকম রয়েছে। জ্ঞান ফিরে আসেনি। এই দিকে টাকা পয়সা নেই। যা জোগাড় করা হয়েছিল, ওষুধ-ইঞ্জেকশনের ব্যয় নির্বাহের জন্য তা যথেষ্ট নয়। বাবাদের বাম-সরকার ক্ষমতায় এসে সরকারি অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন মোটামুটি ভদ্রস্থ করেছিল প্রথমেই। কিন্তু বাবারা ছিল অদ্ভুত প্রকৃতির। কোনও সঞ্চয় নেই। পেনশন পাবার সময় হলে তখন বাবা ব্যাংকে প্রথম একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। আমি ফালতু, পরিবারছাড়া। ভাই দরিদ্র। বাবা-মা পেনশনের সামান্য অর্থনির্ভর। এবার কঠিন অসুখ হতেই জোড়া-তাপ্পি মেরে যে-জীবনযাপন, তা ভয়ংকর বাস্তবের ধাক্কায় মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ছে। মা কাঁদছে, আঁচলে চোখের জল মুছছে। ভাই বাতাসকে গালাগাল করছে। আমি হাসপাতালের পিছনের গলিতে রাত্রে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি, ভাইয়ের বন্ধুদের কাউকে পেলে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানছি, টাকা যতদিন জোগাড় করতে পেরেছিলাম, ততদিন ওই সময়েই ওদের হাতে তুলে দিতাম। রাত কেটে গেলে ভাড়াঘরে ফিরে ঘোরের ভিতর লিখছি। এটা তো কোনও সমাধান হতে পারে না। সমাধান হচ্ছে, অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আমার জীবনে এটা নতুন পরিস্থিতি। আমি এতকাল দুর্যোগের সাধনা করেছি, স্বপ্নযাপন করেছি, তা রক্তাক্ত হলেও আমি নিজেই নিজেকে মর্যাদায় ভূষিত করতাম। অর্থসাধনা কোনও দিনও করিনি। এখন ধেবড়ে পড়েছি।
সকালে অজয় এসেছিল। তখন একগাদা লেখার কাগজের উপর ঘুমিয়ে পড়েছি। জানলা খোলাই ছিল। সেই পথে অজয় হাঁকডাক করে আমাকে জাগাল। আমি ধড়ফড় করে উঠলাম। অজয়কে ওই অবস্থায় দেখে ভাবলাম, বাবা বুঝি অবশেষে মুক্তি পেয়েছে। বললাম, “অজয়, বাবার কি তেমন কিছু…”
অজয় বলল, “জেঠুর অবস্থা আরও খারাপ। বেডসোর হয়েছে, জেঠিমা কি আসবে?”
বললাম, “মা এই অবস্থায় কী করবে? আয়া রাখা হয়নি?”
“প্রথম ক’দিন আয়া ছিল। তার পরে তো টাকার অভাবে…”
“অজয় কী করি বলো তো? আমার কাছে তো আর কোনও পয়সাই নেই।”
“আপনার ভাইও তো তাই বলছে।”
“হ্যাঁ, সে-ই বা কোথায় পাবে! তাহলে?”
“দাদা, আমি তো টাকা চাইতে আসিনি। আপনাকে বিষয়টা জানাতে এলাম। আমার কী?”
“রাগ করো না, অজয়। আমরা তোমার কাছে ঋণী। তুমি যা করছ! আমাদের চেয়ে অনেক বেশি করছ।”
“না-না। এটা তো কর্তব্য।”
“শোনো, একটা আয়া রাখো। আয়ার টাকা যেভাবেই হোক, আমি দেব।”
“দাদা, শুধু তো আয়ায় হবে না। পাউডার, মলম এসব কিনতে হবে। তাছাড়া রোজকার ওষুধ, ইঞ্জেকশন তো আছেই।”
“অজয়, তোমার হাত ধরি, ভাই। আজকের দিনটা ম্যানেজ করো তুমি। আমি পয়সা জোগাড় করতে বেরোচ্ছি।”
অজয় ছেলেটি কী ভাল! ইতিমধ্যেই তার নিশ্চয়ই ভাল টাকা খরচ হয়েছে। এখনও এই রকম ছেলে আমাদের সমাজে রয়েছে, ভাবতেই পারি না। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল। অজয়কে পরে আমি সবটাই হয়তো শোধ দেব। কিন্তু তার ভূমিকায় আমার চোখে জল এল। কেবল কৃতজ্ঞতায় নয়, ভালমানুষ দেখার আনন্দে।
সেই আনন্দ আমার মাথার একটি বিরল অংশ খুলে দিল। ওই অংশে বিরাজ করছে, এই জীবন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া আশ্চর্য কিছু মানুষ সম্পর্কে তথ্য। মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল আরতির মুখ। আরতি! আরতি! সে হচ্ছে হৃদয়বতী এক পথবেশ্যা, শীলিত সমাজ যাদের নামকরণ করেছে ‘চলমান যৌনকর্মী’। এক সাহিত্যসভায় আমি আরতির সাক্ষাৎ পাই প্রথম। কলেজ স্ট্রিটের এক গলিতে লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহশালা রয়েছে। সেইখানে প্রতি মাসে সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হয়।
আমিও কয়েক বার আমন্ত্রণ পেয়ে রচনাপাঠ করেছি। বিশিষ্ট মানুষদের সমাগম হয়ে থাকে। সেই রকম একদিন হাজির হয়েছি। সভা-সঞ্চালক জানালেন, একজন চলমান যৌনকর্মীর আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। জীবনীটি তার নিজের হাতে লেখা নয়। একজন গবেষক মেয়েটির মুখের কথার লিখিত রূপ দিয়েছেন। ভূমিকা চলল, তারপর আরতিকে সঞ্চালক ডাকলেন। কালো, ধারালো মেয়েটি উঠে দাঁড়াতে আমার ভিতর ঝন্ন, ঝন্ন শব্দ হল। আমার বিশ্বাস ছিল, আমিই কেবল নিজের মৃতদেহ আগলিয়ে তান্ত্রিকের মতো জীবনসাধনা ও সাহিত্যসাধনা করছি, তার লিখিত রূপ যে ইতিহাস তুলে ধরবে, সেই নগ্নতা আতুপুতু ভীরু সমাজকে ছিড়ে-খুঁড়ে দেবেই। পরবর্তীতে গ্রন্থটি পাঠ করে সেরকম অভিজ্ঞতাই হয়েছে। যা হোক, হাজার গুণিজন তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও আমার সঙ্গে আরতির সখ্য জমে উঠল। সন্ধ্যার পর সে শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে খদ্দেরের জন্য ঘুরে বেড়াত। আমার সঙ্গে তার দেখা হতে থাকল প্রায়ই। কলকাতায় মাঝে মাঝেই গিয়ে থাকি। একটু হাসি, একটু সৌজন্যমূলক কথা—এইভাবেই কয়েক মাস চলল। একদিন সাহস বাড়ল। বললাম, “কোথাও বসবে একটু?”
“আজ তো জোটেনি একটাও। খাব কী? মেয়ে কী খাবে?”
“আমি কিছু টাকা দেব। আমার কিছু কথা আছে।”
“কথা দিয়ে কী হবে? হোটেলে চলো। ওই দিকের হোটেলগুলোর সঙ্গে আমাদের বন্দোবস্ত আছে। ভয় নেই।”
“না, আরতি। আমার ইচ্ছে করছে না।”
“এখন সাহিত্য কপচাবে? আমার বিরক্তি ধরে গেছে!”
“বলো কী? তোমার বই পড়ে কত গুণী মানুষ তোমাকে নিয়ে ভাবছে! তুমি এরকম বলছ?”
“লাভ কী আমার! সেই তো লাইনে দাঁড়াই।”
ওকে বুঝিয়ে সেদিন চা-পান করেছিলাম একসঙ্গে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্কোয়ারের দিকে এলাম। পথে একটা গাছ দেখিয়ে বললাম, “এটা কী গাছ চেনো তুমি?”
আরতি বলল, “না।”
বললাম, “তোমার চেনা গাছ নয়। আমি খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি। অবশ্য চেনা গাছ হলেও রাস্তার ধুলো, গাড়ির ধোঁয়া খেয়ে কলকাতার গাছের যা রূপ হয়, চিনতে পারবে না।”
আরতি উদাস সুরে জানতে চাইল, “কী গাছ?”
জানালাম, “নাগলিঙ্গম। কুঁড়িগুলো দ্যাখো কেমন বেরিয়েছে গাছের গা থেকে। অদ্ভুত ফুল। সাপের ফণা তুলে থাকার মতো। এই ফুল তোমাকে উপহার দিলাম। আজ তো নেই। একদিন এসে গাছতলা থেকে কুড়িয়ে নিয়ে যেয়ো।”
আরতির চক্ষুজোড়ায় বিস্ময় কম। নিস্পৃহ তাকিয়ে থাকল সে আমার দিকে। যেন আমাকে ভেদ করে ফেলতে চায়। বুঝতে চায়, কাছে ভিড়ছি কী মতলবে? এটা স্বাভাবিক। তার জীবনী নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে তোলপাড় চলছে, তবু তার জীবন কোনও আলো পায়নি। কেন, তা জানবার চেষ্টা করব আজ। ফাঁকা একটা গলি পেয়ে গেলাম। একটা বাড়ির রোয়াক, বসলাম। ইতস্তত করে, শেষে আরতিও বসল। জিজ্ঞাসা করলাম, “আরতি, একটা কথা বলবে?”
উল্টে আরতি প্রশ্ন করল, “তার আগে বলো, তুমি কী করো? খবরের কাগজে চাকরি?”
শব্দহীনভাবে হাসলাম, “কিছুই করি না, আরতি। কোনও ক্রমে জীবন কাটাই। বাচ্চাদের আঁকা শিখিয়ে ভাত জোগাড় করি। ভাড়াবাড়িতে থাকি। যে-জীবন যাপন করি, তারই কিছু কথা লিখি। কিছু কিছু ছাপা হয়। বেশিটাই পড়ে থাকে। আমি একজন ফালতু লোক।”
শুনে আরতি ফর্মে এল। খান খান করে হাসল। পিঠে চাপড় মারল। বলল, “তা হলে টাকা দেবে কী করে? আমাকে যে নিয়ে এলে! শোও, না-শোও, টাকা তো দিতেই হবে।”
বললাম, “কিছু টাকা পকেটে আছে। সংবাদপত্রে একটা বই নিয়ে লিখেছিলাম। বুক-রিভিউ বলে ওরা। যা হোক, কিছু টাকা পেয়েছি। এরা নগদে দেয় আমাকে। ওটা তোমার মেয়ের জন্য দেব।”
আরতি গম্ভীর হল, “নেব কেন?”
বললাম, “তোমার জীবনী পড়ে তোমার মেয়ের জন্য আমার স্নেহ জন্মেছে। ওর জন্য দিচ্ছি।”
আরতি আর কথা বলল না। দূরে চেয়ে থাকল। ভাবছিলাম মেয়েটি ব্যতিক্রমী তো বটেই। আরতি তার আসল নাম নয়। সুন্দরপুর বলে একটা গণ্ডগ্রামের মেয়ে। ক্লাস সিক্স অবধি পড়েছিল। পরিবার আর উৎসাহিত করেনি। অতএব, আরতি বিড়ি বেঁধে সংসারকে সাহায্য করত অন্য মহিলা সদস্যদের মতোই। পুরুষেরা জন খাটত। ভিন্ন সম্প্রদায়ের একটা ছেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। জানাজানি হতেই তার ওপর অত্যাচার শুরু হয়। এক রাত্রে ছেলেটার সঙ্গে সে পালিয়ে আসে। সোনারপুরে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকত। এই রকম কাহিনি আমাদের সমাজে অজস্র রয়েছে। স্থানান্তরিত হলে সাধারণ মানুষের সংবাদ আর কেউ রাখে না। তারা ভিড়ে হারিয়ে দাম্পত্যজীবন কাটাচ্ছিল। দু’জনেই হিন্দু পরিচয় দিয়ে থাকত। মেয়ে হল অতঃপর। নাম রাখল পুতুল। পুতুল দু’ বছরে পা রাখতে না রাখতেই আরতির স্বামী পার্ক সার্কাসে চামড়া কারখানায় পুড়ে মারা গেল। আকাশ ভেঙে পড়ল আরতির মাথায়। বাড়ি বা গ্রাম তাকে ফেরত নেবে না। পুতুল বাঁচবে কী করে? বাবুদের বাড়ির কাজ জোগাড় করেছিল আরতি। কিন্তু টিকতে পারছিল না। ধর্ষিতা হবার উপক্রম। ভাড়াবাড়িতেও পুরুষের হামলা। নিজের উপর অভিমানে সে চরম সিদ্ধান্ত নিল। দেহ বিক্রি করবে। ভাল বাড়িতে মেয়েকে নিয়ে চলে যাবে। আলাপ করতে হল না, তার পাশে চলে এল টুলুদি। একই পাড়ায় থাকে। পড়শি হিসাবে কথাবার্তা হত। আরতির বর মারা যাবার পর টুলুদি নিজেই এগিয়ে এসে ওর পিছনে দাঁড়িয়েছিল। বাবুদের বাড়ি কাজ ছাড়বার পর সে বলল, নার্সিংহোমে কাজ করতে যাওয়ার কথা। এ তো মেঘ না চাইতেই জল পাওয়ার মতো প্রস্তাব। টুলুদি একটা নামী বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করে থাকে বলে সকলে জানে। টুলুদির সঙ্গে বাইরে বেরোবার সময় সমস্যা উপস্থিত হল, মেয়ে কোথায় থাকবে। সমাধান টুলুদিই করল। সোনারপুরেই একটি সংস্থা রয়েছে, যারা কর্মরত মায়ের বাচ্চাদের দেখভাল করে সারাদিন। তাদের কাছে সেদিনের জন্য রেখে আসা হল। টুলুদির কথায় তারা রাজি হয়ে গেল। পথে টুলুদি আসল কথা খুলে বলল। নার্সিংহোম প্রকৃত ব্যাপার নয়। কলকাতায় সকলের অজান্তে (পুলিশ ব্যতীত) পথবেশ্যাদের সংগঠন আছে। সেখানে নাম নথিভুক্ত করলে সংস্থার প্রতিনিধিরা পথবেশ্যাদের নিরাপত্তা দান করে, পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তি করে দেয় ইত্যাদি। একদিন প্রেম মুক্তজীবনের লোভ দেখিয়েছিল, আগু-পিছু ভেবে দেখেনি আরতি। তখন তো ভেসে পড়ার বয়স, এখন তার উপায়হীন পরিস্থিতি। টুলুদির বয়স পঞ্চাশ হয়েছে। সে এই সংগঠনের অন্যতম কত্রী। বয়স গেছে, এখন নথিভুক্ত বেশ্যাদের আয়ের অংশ থেকেই তার চলছে। বলাই বাহুল্য ভালই চলছে। বাইরে তার পরিচয়, বিপন্ন দরিদ্র নারীদের বন্ধু। পার্টির লোকজনও তাকে সমীহ করে চলে। টুলুদি তাকে জানাল, সন্ধ্যা থেকে কয়েক ঘণ্টায় আরতি যা আয় করবে, তার কুড়ি শতাংশ সংস্থায় জমা দিতে হবে, বাকিটা আরতির। মাত্র তিনজন খদ্দের ধরলেই কমপক্ষে পাঁচশো টাকা আরতি বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। দিনের বেলা মেয়েকে দেখভাল করতে পারবে। কিন্তু সন্ধ্যার পর? ঠিক হল, পুতুলকে কোনও মিশনে ভর্তি করে দেওয়া হবে। যোগাযোগ হল—সোনারপুর থেকে কয়েকটা স্টেশন পর একটা সদ্য-প্রতিষ্ঠিত মিশনে পুতুল ভর্তি হল। প্রয়োজনীয় অর্থ ঋণ হিসাবে দিল পথবেশ্যাদের সংগঠনটিই। পাঁচ বছর কেটে গেছে। পুতুল বেশ বড় হয়েছে। আরতি সচ্ছল। কিন্তু এই জীবন কি একটা আদর্শ জীবন? এই জীবনের ভবিষ্যৎই বা কী?
আরতির জীবনী থেকে আমি এইসব জেনেছি। সুকুমারবাবু, যিনি আরতির জীবনীর অনুলেখক, তিনি কোথা থেকে যুক্ত হলেন তার জীবনে? আরতি রাখঢাক করেনি। সুকুমারবাবুও। খদ্দের ও যৌনকর্মী সম্পর্কেই তারা পরিচিত হয়। সুকুমারবাবু একটা কাজের কাজ করেছেন।
আরতিকে সেদিন সেই গলিতে বসে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “তোমার নাম হল এত, জীবন পালটাচ্ছে না কেন?”
আরতি বিষণ্ণ গলায় জানাল, “কোনও লাভ হল না জানো! আমি তো বেশি দূর পড়িনি। সুকুমারদা আমার কাছে আসতেন। শিক্ষিত লোক। কত ভাল কথা বলতেন। শুনতে শুনতে আমি কেমন হয়ে গেলাম। একটা মনখারাপ। কীরকম একটা টনটন করল মন। তখন রেগে গিয়ে সব বললাম ধীরে ধীরে। বই বেরনোর ব্যাপারটা কি আমি কিছু বুঝি? বই বেরনোর সময় অত লোকজন দেখে লজ্জাও লাগছিল, আনন্দও হচ্ছিল। ভাবছিলাম এত সব ভালমানুষ এসেছে, হয়তো আমি উদ্ধার পাব। ও মা! কেউ সেসব বলে না। কেবল কথা বলতে চায়। ক্যামেরা নিয়ে আসে। সুকুমারদা মাঝে বলতে এসেছিলেন, বইটা নাকি ইংরেজি হচ্ছে, বিদেশেও আমার কথা জানবে। আমি ঝামেলার কথা বললাম। উনি বললেন, তুই তো বিখ্যাত, ছবি তো তুলবেই। ঝামেলাটা কী হল জানো, টুলুদি রেগে গেছে, বাড়িওয়ালা ভালমানুষ ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছে, মেয়ে বড় হয়েছে, তারও কি জানতে বাকি থাকবে?”
আমি বললাম, “তোমার খোলামেলা জীবনকথা এই সমাজের মুখে থাপ্পড় মেরেছে। আমাদের সমাজের ভিতরে যে একটা সমান্তরাল গোপন সমাজ আছে, তা জানাজানি হয়ে গেছে। তোমার বিপদ তো হবেই। তার ওপর শিয়ালদায় কত লোক যাচ্ছে-আসছে, তোমাকে চিনে তো ফেলবেই।”
আরতি দুঃখিত মুখে হাসল। বলল, “বই বেশি লোক পড়ে না। ওখানে ছবিও নেই। কিন্তু টেলিভিশন সবাই দেখে। ওই ভয়েই থাকি। ওরা একবার আমার ছবি তুলে নিলেই আমার সব খেলা শেষ।”
“সুকুমারবাবু কোনও সমাধানের কথা বলছেন না?”
“তাকে পাচ্ছি কই? আগে গতরের নেশায় আসত। এখন বইয়ের নেশায় ছুটে বেড়াচ্ছে।”
“তোমার যা টাকাপয়সা হয়েছে এত দিনে, কোনও ছোট ব্যবসায় নামতে পারবে না?”
খান-খান করে আরতি হাসল। বলল, “মাস্টার! তুমি বেশ আছ। তুমি অল্প আয় করো, তারপর একটা ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো, কত রকম জীবন আছে জানো? আমি নানারকম পুরুষ-মানুষ ঘাঁটি। কত রকমের লোক। জীবন কি সস্তার কথা? …তবে মাস্টার, তুমি ভাল লোক…কেমন বন্ধু-বন্ধু…একটা চুমু খাই?”
আমি আঁতকে উঠে লাফিয়ে পড়লাম, “না-না”! আবার খান খান হাসি! দু’জনকেই ট্রেন ধরতে হবে ভিন্ন ভিন্ন লাইনের। বললাম, “চলো। পরে কথা হবে। রাত হল বেশ।”
আরতির হাসি থামছে না। খানিক চুপ করে থাকছে। দুই পা হাঁটতে না হাঁটতেই আবার খান খান হাসি৷ কী একটা আলোড়ন-ভাবনাস্রোত চলছে তার ভিতরে। সেদিন জোর করে তাকে বুক-রিভিউয়ের পাঁচশো টাকা দিয়েছিলাম। কিছুতেই নেবে না। বলল, “মাস্টার, কাপতানি কোরো না। তোমার সারা মাসের আয় আমার তিন দিনের গতরবেচা। একদিন আয় না করলে কী?” মেয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম বার বার। ওই দুর্বল ক্ষেত্রে আরতি বেশি লড়তে পারল না। তখন বলল, “এই নাও আমার মোবাইল নম্বর। ফোন কোরো ইচ্ছে হলে। আর মাস্টার একদিন মেয়েকে দেখতে এসো, নেমন্তন্ন রইল। ফোন করলে দিন বলে দেব। আর…মাস্টার…কী হবে তো জানি না…তুমি একটু ভালমানুষ টাইপের…সত্যি যদি ভালমানুষ হও, জানানো থাকল, আমার কিছু হয়ে গেলে মেয়েটার একটা ব্যবস্থা করে দিয়ো কোথাও…কেমন?”
এইবার আরতির প্রকৃত রূপ দেখলাম। এমনিতেই তার উগ্রতা কম। সবুজ তাঁতের শাড়িতে তাকে লাজবতী রমণী মনে হচ্ছে। আকুল এক জননী রূপ প্রকাশিত হল মুহূর্তের জন্য আমার কাছে। আমার জীবনে শুষ্কতা আছে। মরুভূমির মেঘ দেখে আমার ধু-ধু বিস্তীর্ণ বালুরাশি বর্ষণ-গন্ধে আমোদিত হল। পরবর্তীতে, আরতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম, যদিও কখনওই আমাদের সম্পর্ক নির্ণীত হয়নি। জানতে পারিনি কখনও, সে আমার প্রেমিকা, না অল্পবয়সী মা, না গভীর কোনও বন্ধু! এটুকু টের পেয়েছি, পুতুলের মঙ্গল চাই, আরতির মঙ্গল চাই, তারাও তদ্রূপ। একটা আশ্চর্য সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি বছরখানেক।
বর্তমান বিপন্ন মুহূর্তটায়, অর্থাৎ বাবা অসুস্থ হবার পর, যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে, কী করি, কী করি, আরতিকে জানালাম সব কিছু ফোনে। ওরা এখন সোনারপুরে থাকে না। ঝামেলা পাকিয়ে উঠেছিল। আমি আরতিকে দমদমে ভাড়াবাড়ি খুঁজে দিয়েছি। আমার এক পরিচিত ছেলে দমদমে মেসে থাকে। তার মাধ্যমেই পেয়েছি। পুতুলকেও ভর্তি করা হয়েছে ব্যারাকপুরের এক আশ্রমে। সে ফাইভে উঠল।
সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে শিয়ালদা ছেড়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ চত্বরে চলে গিয়েছে আরতি। ওখানে ঝুঁকি বেশি। উপায় কী? তাকে খ্যাতির জন্য ইদানীং সতর্ক হতে হয়েছে। ভাবি, এমন দিন দ্রুত চলে আসুক, আরতি মুক্তি পেয়ে যাক। কিন্তু কীভাবে? বুঝতে পারছি কেবল সদিচ্ছা আর শুভেচ্ছাতে এরকম গভীর সমস্যার সমাধান হয় না।
যা হোক, শিয়ালদায় নেমে আরতির মোবাইলে ফোন করলাম। চারটে বেজে গেছে। সে খদ্দেরের সঙ্গে থাকলে ফোন বন্ধ রাখে। এখন ফোন বাজছে। আরতি ফোন ধরে জানাল, “তুমি কলেজ স্কোয়ার-এ চলে এসো।”
কিছু সময়ের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। এটিই গোলদিঘি বলে প্রসিদ্ধ ছিল। এই দিঘির জলে সুইমিং ক্লাবের সদস্যরা সাঁতার অভ্যাস করে থাকে। ডাইভিং-ও শেখানো হয়ে থাকে। অন্যত্র ওয়াটারপোলো খেলা চলে। এই মুহূর্তে দিঘিতে জল নেই। সংস্কারের কাজ চলছে। কী রকম মনে হল জলহীন দিঘিটিকে দেখে, ওর হৃদয় উধাও হয়েছে। ছেলেমেয়েরা চুম্বন, আলিঙ্গন শিক্ষা করছে বেঞ্চে বসে। সব দৃশ্য পার হয়ে মন্দির-সংলগ্ন ছাউনিতে পৌঁছে গেলাম। আরতি ওইখানেই থাকবে।
আরতি আমাকে দেখে উঠে এল। তার লাবণ্যের উপর ক্লান্তির ছাপ পড়েছে। ভবিষ্যৎহীনতা এক ধরনের হতাশার জন্ম দিয়ে থাকে, যার হাত থেকে মুক্তি অসম্ভব। আরতি বলল, “কোনও উন্নতি হচ্ছে না ওঁর?”
আমি যেন এই প্রশ্নে আরতির কাছে আশ্রয় পেলাম। বাবার অসুস্থতাপর্বে আমার কেবল পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ রয়েছে। আমি তাঁদের পরিত্যাগ করেছিলাম। তাঁরাও আমাকে পরিত্যাগ করেছিল। এখন অসুস্থ বাবাকে সাহায্য করবার তেমন কেউ পাওয়া যাচ্ছে বলেই আমি জড়িয়ে পড়েছি। বাবার অনেক সম্পদ থাকলে, ভাই সচ্ছল হলে, পার্টি বাবাকে দেখভাল করলে, আমার ডাক পড়ত না। আমি জড়াতামও না। এইবার বিপদে পড়েছি। কপর্দকহীন আমি ঝড়ে ভেঙে পড়া বাবার দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছি। এখন আমার অবস্থা গুরুতর। আরতির কাছে আশ্রয় পেয়ে কত অভিমানই না আমার ভিতরে খেলা করল।
আরতি ভয়ংকর বাস্তবে বাস করে। সে তৎক্ষণাৎ মূল প্রসঙ্গে এল, “টাকাপয়সা লাগবে তো, মাস্টার?”
আমি তো-তো করলাম।
খচে গেল আরতি, “অত লজ্জা, তা আমাকে ফোন করেছ কেন?”
“আমার তো কেউ নেই, আরতি।”
“তুমিই-বা আমার তেমন কে?”
“তোমাকে জানাতে পারলাম, এমন একজন কেউ।”
“শোনো মাস্টার, তোমার গতরেরও তো একপয়সা দাম নেই। ফুটানি না করে, কিছু টাকা এনেছি, নিয়ে যাও।”
“কোত্থেকে পেলে টাকা?”
“আমার আয় জানো?”
“আরতি আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকলাম।”
“ন্যাকামি করতে হবে না। এখন যাও। মেয়ে তোমার কথা বলছিল। একদিন এসো ঝামেলা মিটলে, মেয়ের কাছে দু’জনে যাব। কাটি। আয় করতে হবে।”
আরতি একটি খাম হাতে গুঁজে দিয়ে চলে গেল। আসন্ন সন্ধ্যায় সে শিকার ধরতে বার হল। অথবা শিকার হতে রাজি হয়ে, রক্তমাংস হয়ে, সে ঘুরবে রাস্তায়-রাস্তায়। কী হবে তার জীবনের পরিণতি? আমি কোনও উত্তরণের পথ দেখছি না। কিছু একটা হোক। আরতির ভাল কিছু হোক। হাঁটতে-হাঁটতে চকিতে চোখ মুছলাম। জীবন নিয়ে আদর্শের রোয়াবি করতাম। এইবার কেমন যেন বিমূঢ় বোধ করছি।
