সর্বনাশ
আজ বিদিশাদের কলেজ হল না। পুলিশের গুলিতে গ্রামীণ মানুষের হত্যাকাণ্ড নিয়ে দুই ছাত্র ইউনিয়নে জোর মারদাঙ্গা শুরু হয়েছে। সরকার-বিরোধী ছাত্র ইউনিয়ন আজ কয়েক জন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল বের করবে, কথা ছিল। এই দলের ছাত্রনেতারা ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলে সামিল হওয়ার জন্য বলছে। অন্য ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা মিছিলের ফাঁদে পা দিতে বারণ করছে ছেলেমেয়েদের। এই নিয়েই গণ্ডগোল। দীপ কোনও ঝামেলায় নেই। কিন্তু অর্ক মিছিলে ইন্টারেস্টেড। ছুটতে ছুটতে সে এসে বলল, “আমি তো পলিটিক্স করি না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একটা প্রতিবাদ হওয়া দরকার। পুলিশি জুলুম মেনে নেওয়া যায় না। যাবি তো?”
বিদিশা বলল, “না রে। কলেজ যখন হচ্ছে না, তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব। অনেক ফাঁকি দিয়েছি পড়াশুনোয়, কভার করতে হবে।”
অর্ক বলল, “সো হোয়াট! একদিনে কি পণ্ডিত হবি? দ্যাখ না, রাজনীতির বাইরের লোকজন এসেছে কত। থিয়েটার ডিরেক্টর, পেন্টার, কবি, ফিল্মস্টার, নাট্যকার—বিখ্যাত সব মানুষ। সব কলেজ থেকেই মিছিল আসছে ধর্মতলায়। কলকাতা অচল হয়ে যাবে।”
বিদিশা হাসল, “অচল হওয়ার আগেই তাহলে বাড়ি ফিরে যাই।”
অর্ক খোঁচাল, “কী ব্যাপার রে? হঠাৎ তুই গুডি হয়ে গেলি? ন্যাতমারা হয়ে গেলি? দীপ কী বলছে?”
বিদিশা ঠোঁট উল্টাল, “দীপ যাবে না। ও সিগারেট টানতে গেল। তুই হঠাৎ দেশোদ্ধারে নামলি, কী ব্যাপার?”
অর্ক বলল, “আমি তো কোনও দিন এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি। বাবা সেদিন রাতে কিছু কথা বললেন, আমি তা ভুলতে পারছি না। বাবা তো লিড করছেন তাঁর কলেজের মিছিল।”
বিদিশা হালকা সুরে বলল, “পিতা-পুত্র মিলে লড়াই?”
অর্ক খানকয়েক গালাগাল দিয়ে কলেজ গেটের দিকে ছুটল। বিদিশা এদিক-ওদিক তাকিয়ে ভাবল, কেটে পড়ার এটাই ঠিক সময়। গোলমালও বাড়ছে। ভিড়ও বাড়ছে। হঠাৎই তার আর উত্তেজনা পছন্দ হয় না। ঘরে একা বসে থাকতে ইচ্ছে করে। বাবার জন্য ভাবতে ভাল লাগে। বাবার লেখা পড়তে থাকে ঘুরেফিরে। ইদানীং রবীন্দ্রনাথের ছবিটাও আবছা মনে আসে বাবার পাশাপাশি। মা আর শ্যামলেশ সেনও তার বদলে যাওয়া দেখে অবাক। মুখে কিছু বলে না, কিন্তু ওদের মুখ দেখে বিস্ময়টা বুঝতে পারে বিদিশা। কিছুতেই তার আর কিছু যায়-আসে না। পুরনো রাগ ফিরে আসতে চাইলেই সে ভাবে, রবীন্দ্রনাথ মরে যাচ্ছেন…অপারেশনে তিনি অনিচ্ছুক..সবাই তবু তাঁর অপারেশনের ব্যবস্থাই করছে…এত দুর্বল যে একটা লাইন নিজের হাতে লিখতে পারছেন না…এত বড় কবি…। এ ভাবে তাঁর মনে বেদনা আসছে। এই বেদনা মুছে দিচ্ছে তার ব্যক্তিগত রাগকে। দূরে বাবা যেমন একলা, এখানেও নিজেকে সে তেমনই একলাই রাখছে। পড়াশুনোয় মন দিয়েছে পাশাপাশি। এই বছর ক’টা পার করলেই সে পৌঁছতে পারবে বাবার কাছে। জীবনের কাছে এক্ষুনি তার আর কোনও প্রার্থনা নেই।
কলেজের গেট পেরোতে গিয়ে বিদিশা একপলক দেখতে পেল শ্যামলেশ সেনের মুখ। সেলিব্রিটি হিসেবে মিছিলে যোগ দিতেই নিশ্চয়ই এসেছে। শ্যামলেশ তাকে একবার হাতছানি দিয়ে ডাকলও। না-দেখার ভান করে দ্রুত এগোল বিদিশা। শ্যামলেশের একাধিক গাড়ি। একটায় মাঝে মাঝে আসত বিদিশা। এখন আর ব্যবহার করছে না। মা তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চায় হয়তো, কিন্তু সুযোগ দিচ্ছে না বিদিশা। জিজ্ঞেস করলেও বিদিশা কোনও জবাব দেবে না। সম্ভবত মা’র আর কোনও নালিশ নেই। মেয়ে আবার লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে গিয়েছে। এতেই সে খুশি। আসল ব্যাপারটা তো আর কেউ জানে না। ভালবাসার কাছে কথা দিয়েছে বিদিশা, তাই সে আজ শান্ত, তরঙ্গহীন। লক্ষ্যহীন ছিল বলেই সে অস্থির ছিল, বোকা-বোকা চিন্তায় নিজেকে সর্বনাশের মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছিল। কত কিছু যে হয়ে যেতে পারত তার, হয়নি ভাগ্যিস!
ট্যাক্সি ধরবে বলে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে বিদিশা। দুটো মতন বাজে। জ্যাম না থাকলে সে আধ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবে। বিদিশা দেখছিল বিচিত্র গতির সব গাড়ি ছুটে যাচ্ছে মহানগরের রাস্তা দিয়ে, মাঝখানে দল বেঁধে একদল মানুষ ফাঁকে ফাঁকে রাস্তা পেরোচ্ছে। যেন একটা খেলার মতন লাগল। এমন সময় তার পাশে এসে দাঁড়াল চকোলেট রঙের একটা দামি গাড়ি। ভেতর থেকে দীপ বলল, “উঠে আয়।”
বিদিশা বলল, “কোথায় যাচ্ছিস?”
দীপ তাড়া লাগাল, “উঠে আয় না! যেতে যেতে বলছি।”
বিদিশা দ্বিধাগ্রস্ত হল, “আমি কিন্তু বাড়ি যাচ্ছি।”
দীপ বলল, “বাড়িতেই না হয় পৌঁছে দিয়ে আসব।”
অগত্যা বিদিশা উঠে দীপের পাশে বসল। দীপ একটু রাফ-ড্রাইভিং করে। মনে মনে তফাতটা টের পেল বিদিশা। ক’দিন আগে এই রাফ-ড্রাইভিং তার ভাল লাগত। সে এনজয় করত স্পিড। আর আজ সেই গতিকেই ভয় পাচ্ছে সে। ভেতরে-ভেতরে সিঁটিয়ে বসে রইল বিদিশা।
থম মেরে আছে আকাশ। আবহাওয়া অফিস বলছে, নিম্নচাপ ঘনীভূত হচ্ছে। মধ্য-শ্রাবণে নিম্নচাপের খবর ভাল না। টানা বৃষ্টি কয়েক দিন চলবে। কলকাতায় এক-দু’ঘণ্টা টানা বৃষ্টি হলেই অনেক জায়গায় জল জমে হাঁটুর ওপর। নোংরা জল কেমন ঘৃণা তৈরি করে। বৃষ্টির রোমান্টিকতাটাই শেষ হয়ে যায়। সামনের ক’দিন কেমন যাবে কে জানে!
এলোমেলো ভাবনার ভেতরেই আচমকা বিদিশা খেয়াল করল দীপের গাড়ি সল্টলেকে না ঢুকে বাইপাস ধরে ছুটছে তীব্র গতিতে। সে বলল, “কোথায় যাচ্ছিস? আমি বাড়ি যাব।”
দীপ স্টিয়ারিং সামলাতে সামলাতে নিস্পৃহ গলায় জানাল, “তোকে আমি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব বলেছি তো!”
দীপরা বিপুল বিত্তবান। ছেলেটা ভাল, কিন্তু নিজের গোঁ নিয়ে চলে। অন্যের মত তার কাছে গুরুত্ব পায় না। চাওয়া মাত্র সব পেতে পেতে তার মানসিক অভ্যাসই এরকম হয়ে গেছে যে, সে ধরেই নেয় তার ইচ্ছেটাই চূড়ান্ত। আগে বিদিশা দীপকে এভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেনি। তখন তো সে নিজেও নিজের মতকেই প্রাধান্য দিয়েছে। আশপাশটা ভেবে দেখছে না। এখন তার মধ্যে সংযম এসেছে। বিচারবোধ এসেছে। অতএব দীপের একতরফা সিদ্ধান্তে তার খটকা লাগল। মনের ভেতর একটা অস্বস্তি হল। সে দীপকে বলল, “আমি কিন্তু বাড়ি ফিরব জানিয়েই তোর গাড়িতে উঠেছিলাম।”
দীপ ভাবলেশহীন গলায় জানাল, “তুই তোর ইচ্ছেমতো আমাদের নাচাবি নাকি? হঠাৎ সতী-লক্ষ্মী হয়ে উঠছিস কেন?”
বিরক্ত বিদিশা বলল, “দীপ, তুই কিন্তু আমার প্রিয় বন্ধু। বন্ধুত্বের অমর্যাদা করিস না।”
দীপ বাঁক নিতে নিতে বলল, “কে বলল অমর্যাদা করছি। তোর ইচ্ছেতেই তো আমরা খুনি হতে পর্যন্ত চেয়েছি। দারুণ একটা গ্রুপের সঙ্গে আলাপ করেছি। ওরাই সব করবে। আমরা সেফ থাকব। খরচও আমার। ওদের সঙ্গে ফাইনাল করতে যাচ্ছি। তোকে আগে জানানো হয়নি, এই যা।”
মুখ কালো হয়ে গেল বিদিশার। সে আর্তনাদ করে উঠল, “না, দীপ! আমি আর ওসবে নেই। আমি মত পাল্টেছি।”
দীপ রাস্তার পাশে একটা নামকরা রিসর্টে গাড়ি ঢোকাতে-ঢোকাতে বলল, “কিন্তু আমি মত পাল্টাইনি। আমি তোকে চাই। তুই চাস না?”
কঠিন স্বরে বিদিশা বলল, “না। আমাকে নামিয়ে দে।”
দীপ চোয়াল শক্ত করে বলল, “প্লিজ দিশা, আমি তোর রহস্য জানতে চাই। তার বিনিময়ে আমি তোর অপছন্দের মানুষটাকে খুন করার পরিকল্পনা পর্যন্ত করছি। অর্ককে তুই বেশি গুরুত্ব দিস, ও তোর জন্য এটা করতে পারবে?”
বিদিশা এই সংকট কীভাবে সামলাবে বুঝতে পারছে না। অন্ধের মতো সে ছুটেছে কিছুকাল, বোকার মতো প্রলোভিত করেছে দুই কাছের বন্ধুকে। এখন তার পরিবর্তন এদের চোখে লাগছে। অর্ক সমাজ নিয়ে মেতেছে। সে অবশ্য বরাবরই কম তীব্রতাসম্পন্ন। কিন্তু দীপ ভীষণ ঝোঁকে চলে। দীপের এই পাগলামির হাত থেকে এখন কী করে বাঁচা যায়? ক’দিন আগে হলে বিদিশা হয়তো মেনেও নিত এই অ্যাডভেঞ্চার। এখন যে আর নষ্ট হবার উপায় নেই। ‘কবির মেয়ে’ এই উপলব্ধি তাকে দ্রুত বদলে দিয়েছে। অসহায় পরিস্থিতিতে সে প্রাণপণ বাবার মুখটা মনে আনতে চাইল। আর এই প্রথম বাবাকে সরিয়ে মনে চলে এল অসুস্থ, বিধ্বস্ত, মৃত্যুঘনিষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ। সেই রবীন্দ্রনাথ, যিনি ভাবতেন বয়স্ক বৃক্ষ যেমন সব পাতা ঝরিয়ে একদিন মারা যায়, তেমন মরবেন। কিছুতেই বিধাতার দেওয়া শরীরে কাটাছেঁড়া করতে দেবেন না শল্যচিকিৎসককে। অথচ তা-ই হল। নিরুপায়ভাবে তাঁকে মেনে নিতে হল অস্ত্রোপচার। রিসর্টে গাড়ি ঢুকিয়ে বিকেল নাগাদ যখন দীপ গাড়ির দরজা খুলে তাকে নেমে আসতে বলল, বিদিশার মনে পড়ল শেষ মুহূর্তের অসহায় রবীন্দ্রনাথকে। সে বিষণ্ণ গলায় বলল, “দীপ! উইল ইউ রেপ মি?”
দীপ উত্তর না দিয়ে তার হাত ধরে সুসজ্জিত বিলাসভবনে ঢুকে পড়ল। ফোনে কথা বলছে দীপ। একটা সুন্দর কুটিরে তারা গেল।
বসতে না বসতেই ড্রিংকস এল। দামি মদ। আপেল, কাজুবাদাম, আঙুর। সুস্বাদু চিংড়ির ডিশ। বোঝা যাচ্ছে দীপ এইসবে অভ্যস্ত। ছেলেটা দ্রুত হাতে গেলাসে মদ ঢালল। বিদিশা বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে আছে। কিছুদিন আগের নাইট ক্লাবের মেয়েটার সঙ্গে আজকের আড়ষ্ট মেয়ের কোনও মিলই নেই।
দীপ আড়চোখে একবার দেখে বলল, “এত সিরিয়াস কেন? ড্রিংক কর। স্মার্টনেস এসে যাবে।”
বিদিশা কিছু বলল না। আজ সে সুস্থ। এবার অসুস্থ হয়েছে দীপ৷ কী জানি তার ভাগ্যে কী আছে! এইসব জায়গা প্রভূত ধনের মালিকরা টাকা দিয়ে কিনে রাখে। চিৎকার করলে কোনও সুবিধা হবে না বলেই মনে হয়। বরং সে চুপচাপ দীপের দম দেখতে চায়। সাপ নিয়ে খেলা করেছে সে কিছুদিন, এখন সাপের ছোবলে নীল হবার সময়। যদি তাই-ই হয়, তবে সে তো নষ্ট হবে না, পরিস্থিতির শিকার হবে মাত্র। সেক্ষেত্রে শরীর নোংরা হবে তার, মন নোংরা হবে না। মরিয়া দীপকে চ্যালেঞ্জ ছুড়বার জন্য বিদিশা বলল, “দীপ, আমাকে এভাবে অপমান করছিস কেন?”
রাগী স্বরে দীপ বলল, “তুই আমাদের এই ক’মাস অপমান করিসনি? অর্কটা ভোঁদা, বোঝেনি। তুই হাত ধরলেই গলে জল হয়ে গেছে। কিন্তু আমি সব টের পেয়েছি। শরীরের লোভ দেখিয়ে তুই আমাদেরকে দিয়ে খুন করাতে পর্যন্ত চেয়েছিস!”
বিদিশা ঝুঁকে পড়ে বলল, “প্লিজ, আমাকে ক্ষমা কর দীপ। আই অ্যাপোলাইজ।”
দীপ গেলাস ফাঁকা করে বলল, “আমি তোর জন্য পাগল হয়ে আছি।”
বিদিশা আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তা বলে এভাবে? আমরা তো বন্ধু। সেই দিকটা ভাব।”
দীপ আবার গেলাস ভরল। চুমুক দিয়ে বলল, “খুব খোঁচা মারলি! রেপ করলে তো এতক্ষণে করতে পারতাম। তুই একবার অন্তত রাজি হ, আর তোর ত্রিসীমানা মাড়াব না। কথা দিচ্ছি।”
চুপ করে থাকল বিদিশা। ভেতরে ভয় নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবল। দীপ দ্রুত মদ খাচ্ছে। ও অস্থির হয়ে আছে বোঝা যাচ্ছে। একটা কিছু হেস্তনেস্ত করবেই যেন। বিদিশা বাবার মুখটা একবার মনে করল। আজকের পরিস্থিতির জন্য সে নিজেই দায়ী। এখন তার থেকে উদ্ধার চায় সে। দীপের সঙ্গে লড়েই তাকে এই যুদ্ধে জিততে হবে। এবং একা। দীপের বাবা বিজনেসম্যান হিসেবে প্রভাবশালী। কিন্তু শ্যামলেশ সেনের প্রভাবও কম নয়। ইচ্ছে করলে এখনই শ্যামলেশকে ফোন করে বিদিশা নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু ওই লোকটার সাহায্য সে নেবে না। মানসিক শক্তির প্রার্থনা করল সে বাবার কাছে, মনে মনে।
কিছু পরে দীপ কুটিরটার দরজা বন্ধ করল। বিশ্রীভাবে বলল, “যা চাই, তা না পেলে আমি পশু হয়ে যাই। তুই প্লিজ রাজি হ। একবার অন্তত। ঝম্ করে তুই লক্ষ্মীটি হয়ে গেলি, আর পাত্তা দিচ্ছিস না, কী ব্যাপার?”
বিদিশা বলল, “তুই তার কিছুই বুঝবি না। ইউ আর এ ক্রুয়েল ম্যান।”
দীপ রেগে একলাফে গিয়ে বিদিশাকে জাপটে ধরল। আহত হল কবির মেয়ের অন্তর। সে ধাক্কা দিয়ে সরাল দীপকে।
দীপ কেমন সিনেমার শয়তানের মতো হাসল। দু’চোখ কুটিল করে তাকাল।
মাথায় আগুন চড়ে গেল বিদিশার। সে হিসহিসিয়ে বলল, “অমন করে তাকাচ্ছিস কেন? এই তুই বন্ধু? ইডিয়েট! যদি আমি তোকে ভাল না বাসি, কী পাবি তুই? কিচ্ছু পাবি না। এই নে…কী নিবি? নে!”
বলে সে এক ঝটকায় কুর্তি খুলে ফেলল। দ্রুত খুলে ফেলল নীচের পোশাকও। অন্তর্বাসটুকু পরে সে এগিয়ে গেল দীপের দিকে। খ্যাপা গলায় বলল, “আমি তোকে ঘৃণা করব সারাক্ষণ! নে, তুই এবার যা ইচ্ছে কর!”
মাথা খারাপের মতো কথাগুলো বলে গেল বিদিশা। দীপ কেমন যেন হয়ে গেল। সরে গেল বিদিশার কাছ থেকে। মাথা নিচু করে থাকল। তারপর বিকৃত গলায় বলল, “এত অহংকার তোর! দ্যাখ তোর অবস্থা কী করি!”
বলে মোবাইলটা বের করে ফটাফট ছবি তুলে নিল বিদিশার। বিদিশা কিছু বোঝার আগেই বেরিয়ে গেল।
ঝাঁ-ঝাঁ রাগে বিদিশা ঘটনাটা ঘটিয়েছে। নিজের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তার আচরণের ফল কী হতে পারে, সে সম্পর্কেও তার আগাম ধারণা ছিল না। এবার দীপ চলে যেতে সে চেতনা ফিরে পেল। দ্রুত পোশাক পরে নিল সে। ওখান থেকে বেরিয়ে এল। ট্যাক্সি ধরে যখন সে ফিরছে, খুব ক্লান্ত লাগছিল নিজেকে। গ্লানি হচ্ছিল। নিজেকে নোংরা লাগছিল।
বাড়ি ফিরে সন্ধ্যা-সন্ধ্যা সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। অতলে তলিয়ে যাওয়া ঘুম। তাকে কেউ খেতে ডেকেছিল কি না সে টের পায়নি। এই বাড়িতে সে এখন একাই। নিজের সঙ্গে নিজে থাকে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে বিদিশা বাবার লেখার শেষ দিকটা পড়ছিল। রবীন্দ্রনাথের শেষ সময়টা এক ধরনের অসহায়তায় ভরা। বাবার দেবতা রবীন্দ্রনাথ একটু একটু করে তারও যেন বেশ আত্মীয় হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া বৃদ্ধ মানুষটার ইচ্ছার মূল্য যে কেউ দিল না, সেটা তার খুব খারাপ লেগেছে। বিধানচন্দ্র রায়ের ওপর বিদিশার খুব রাগই হল। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-পরিস্থিতি বিদিশার ভেতরে বেদনার জন্ম দিয়েছে। বারবার জায়গাগুলো সে পড়ছে, আর কষ্ট পাচ্ছে। বাবার দুঃখী জীবনটাও পাশে পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর নিজেরও মন ভার হয়ে আছে কালকের বিশ্রী ঘটনাটার জন্য।
এমন সময় বিদিশার মোবাইল বাজল। অর্ক এত সকালে? মিছিলে যেতে বলবে নাকি? ওর মাথায় তো এখন শুধু প্রতিবাদ আর প্রতিবাদ।
“কী রে অর্ক?”
“তুই কেমন আছিস?”
“ভাল। কেন?”
“দীপের সঙ্গে তুই কোথায় গিয়েছিলি? কী হয়েছে তোদের?”
এবার কঠিন স্বরে বিদিশা বলল, “কেন বল তো? দীপ একটা অমানুষ।”
“ও তোর একটা হাফ নুড ফোটো এম. এম. এস. করে পাঠিয়েছে আমাকে। এরপর সবাইকে পাঠাবে। কবে, কেন এসব হল রে দিশা?”
মাথা ঘুরে গেল বিদিশার। কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলল, “কী বলছিস অর্ক?”
“হ্যাঁ, তোরই ছবি। আমি তাকাতে পারছি না।”
“অর্ক! এবার আমাকে মরতে হবে। দীপ আমার সব শেষ করে দেবে।”
“তোকে ছবিটা পাঠাচ্ছি। দ্যাখ। আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। তোকে পরে আবার যোগাযোগ করছি। এসব কী হল আমাদের?”
বিদিশার সকালটাকে খুন করে ফোনটা কেটে গেল। গালে হাত দিয়ে বসে থাকল বিদিশা। সর্বনাশ ঘনাচ্ছে। বাবার ছবিটা মাথার ভেতর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
