ঈশ্বরের প্রিয়ভূমি
ভারতবর্ষ ভগবানের বড় আদরের স্থান। ভগবান মানবদেহ ধারণ করিয়া নিজের অংশাবতার রূপে অনেক দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু এত বার তিনি কোনও দেশে জন্মগ্রহণ করেন নাই— তাই বলি, আমাদের জন্মভূমি ভারতমাতা ভগবানের বড় আদরের দেশ।
—সুভাষচন্দ্র বসু, মা প্রভাবতী দেবীকে লেখা চিঠি, ১৯১২
.
কটকনিবাসী আইনজীবী জানকীনাথ বসু ২৩শে জানুয়ারি ১৮৯৭ সালে তাঁর ডায়রিতে লিখেছিলেন: “ভোরে উঠি দেখি প্রভা তখনও কষ্ট পাচ্ছে। দুপুরবেলা এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। প্রভা বড় অসুস্থ হয়ে পড়ে, ঈশ্বরের দয়ায় সে কোনও রকমে ভাল হয়ে ওঠে।”১ জানকীনাথ এবং প্রভাবতীর নবম সন্তান বা ষষ্ঠ পুত্রটির নাম রাখা হল সুভাষ— “যে সুন্দর কথা বলে”। এই নাম আশ্চর্য সার্থক বলে প্রমাণিত হবে পরবর্তী কালে, ভারতের স্বাধীনতার সৈন্যবাহিনীকে সুভাষচন্দ্র যখন তাঁর ভাষার মন্ত্রে অনুপ্রাণিত করে তুলবেন। এই শিশুসন্তান যে পরিবারে ভূমিষ্ঠ হল, ঐশ্বর্যশালী না হলেও সেই পরিবারকে সম্পন্ন বলা চলত। কিন্তু যে দেশে তার জন্ম হল, সেই দেশের দারিদ্রের কোনও শেষ ছিল না সে দিন।
টাইমস অব লন্ডন সেই ২৩শে জানুয়ারি সকালে ‘ভারতের দুর্ভিক্ষ’ শিরোনামের সংবাদে জানিয়েছিল, “কুলি ছাউনিতেও অনেক শিশুর জন্ম হয়ে চলেছে।” সেই সময় পঞ্জাবে ইংরেজ সরকার বিতস্তা (ঝিলম) নদীর উপর নতুন সেচখাল তৈরির কাজ করছে, সেখানে খাটছে চল্লিশ হাজার ‘কুলি’, তাদের জন্য তৈরি হয়েছে অস্থায়ী ত্রাণশিবির— ছাউনি বলতে ওই শিবিরগুলিকেই বোঝানো হয়েছিল। রিপোর্ট বলছিল, মায়েদের দয়া করে সেখানে কিছু দিন রাখা হচ্ছে। বাচ্চা-পিছু দুই পয়সা অতিরিক্ত দেওয়া হচ্ছে। আর যে সব শিশু পরিত্যক্ত, কিংবা যে সব শিশুর মায়েরা তাদের খাওয়াতে অক্ষম, তাদের জন্য বরাদ্দ হচ্ছে ফিডিং বোতলে সুইস কোম্পানির দুধ। বিতস্তা-পাড়ের এই মানবকাহিনির সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে কলকাতা থেকে রয়টারের পাঠানো একটি তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট। ভারতবর্ষ জুড়ে সেই সময় সাড়ে সতেরো লক্ষেরও বেশি মানুষ নানা ধরনের ত্রাণশিবিরে থাকছিলেন, আর তাদের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার মানুষ নির্ভর করতেন সরকারের ‘দয়ার’ দানসামগ্রীর উপর। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আসতেন পুব ভারতের প্রদেশ বাংলা এবং উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ থেকে। দিন-প্রতি তাঁদের জন্য সরকারের খরচ ছিল দুই লক্ষ টাকার কাছাকাছি, অথবা কুড়ি হাজার পাউন্ড। অটাওয়া থেকে টাইমস-এর সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, ভারতের দুর্ভিক্ষ ত্রাণ ভাণ্ডারে ব্যাঙ্ক অব মন্ট্রিয়ল পাঁচ হাজার কানাডিয়ান ডলার সাহায্য করে সেই সময়।২
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে ১৮৯৭ বছরটি মোটেও কোনও সাধারণ বছরের মতো নয়। মহাসমারোহে সেই বছরে রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের হীরকজয়ন্তী পালিত হয়। তার উপর, সে বছরই ভিক্টোরিয়ার ‘ভারতসম্রাজ্ঞী’ উপাধি (ঔপনিবেশিক সাধারণ্যের স্বার্থে যে নামটির তর্জমা করা হয়েছিল কাইজার-ই-হিন্দ্) উপাধির গ্রহণের বিশ-তম বার্ষিকীও পালিত হয়। রমেশচন্দ্র দত্ত ১৯০৩ সালে তাঁর দি ইকনমিক হিস্টরি অব ইন্ডিয়া ইন দ্য ভিক্টোরিয়ান এজ বইটি শুরু করেন ছয় বছর আগে লন্ডনে এই উৎসব পালনের উল্লেখ দিয়ে। বলেন, “একটা কষ্টের চিন্তা” “অনেকের মনকেই তখন পীড়িত করছিল”: “সাম্রাজ্যের চতুর্দিকে উন্নতি আর সম্পন্নতার চিহ্ন ছড়িয়ে, তার মধ্যে কেবল ভারতের ছবিটাই দারিদ্র ও দুর্দশায় দীর্ণ। ১৮৯৭ সালে গোটা দেশকে বিধ্বস্ত করে দেয় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ, দেশ জুড়ে সেই দুর্ভিক্ষ এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে আজ অবধি সে রকম দেখা যায়নি।”৩ ভারতকেই একমাত্র ব্যতিক্রম ভাবাটা হয়তো রমেশচন্দ্রের ভুল হয়েছিল, কেননা শেষ-ভিক্টোরীয় যুগের এ হেন ‘হলোকস্ট’ আসলে দুনিয়ার অনেক দিকেই ছড়িয়ে পড়েছিল সে দিন।৪ তবে ভিক্টোরীয় রাজমুকুটের রত্নটিকে যে সংকট একেবারে ধ্বস্ত করে দিয়েছিল, তার পরিমাণ ও প্রসার সম্পর্কে রমেশচন্দ্রের মন্তব্যে কিন্তু কোনও ভুল ছিল না।
“বছর এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার আরও ঘনীভূত হল, ভয় আরও দানা বেঁধে বসল,” ১৮৯৭ সালে বিমর্ষ ভাবে লিখলেন মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, পশ্চিম ভারতের অন্যতম বুদ্ধিজীবী। “মনে হল, সেই প্রাচীন কালে ফারাও-এর দেশে যেমন সাত মহামারীর প্রকোপ দেখা গিয়েছিল, তা-ই যেন আবার ফিরে এসেছে আমাদের দেশে। প্রতিটি প্রদেশে মৃত্যুলীলা ও ধ্বংসকাণ্ড ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে— বহু প্রজন্মের স্মৃতি ঘাঁটলেও এর থেকে বেশি ভয়াবহ কোনও সময়ের হদিশ মিলবে না।”৫ ব্রিটেনের এক প্রধান মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এর হিসেবে: ১৮৯০-এর দশকে ভারতে দুর্ভিক্ষে মৃত এক কোটি নব্বই লক্ষ, অর্থাৎ ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।৬ ১৮৯৭-এর দুর্ভিক্ষের মৃত্যু-সংখ্যা সরকারি মতে ৪৫ লক্ষ, আর বেসরকারি মতে এক কোটি ষাট লক্ষের কাছাকাছি।৭ ১৮৯৯ সালে অল্প সময়ের ব্যবধানের পর আবার ১৯০০ সালে ভারতকে গ্রাস করল আর একটি ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ। প্রায় তিন বছর ধরে চলল সেই দুর্ভিক্ষ, তার শিকার দাঁড়াল সাড়ে বারো লক্ষ (সরকারি হিসেব) থেকে পঞ্চাশ লক্ষ (ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী)। ভারতের ভাইসরয় জজর্র্ নাথানিয়েল কার্জন যখন ভারতের রাজন্যবর্গ আর প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিদের সমাবেশ তৈরি করে তাঁর ঝাঁ-চকচকে দিল্লি দরবারটি সাজাচ্ছিলেন, ১৯০৩ সালের সেই জানুয়ারি মাসে তখনও লক্ষ লক্ষ দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ ত্রাণশিবিরগুলিতে কোনওমতে বাঁচার লড়াই-এ ব্যস্ত।
১৮৯৭ সালের দুর্ভিক্ষ ভারতবর্ষে কী দুঃসময় নিয়ে এসেছে, লন্ডন ও ম্যানচেস্টারের সংবাদপত্র-পাঠকরা তা জানতে পারছিলেন। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমিতে দাঁড়িয়ে সচেতন নাগরিকরা রানি ভিক্টোরিয়ার ভাগ্যহীন সহনাগরিকদের জন্য যেটুকু করতে পারলেন, তা হল— ভারতে যে সব ত্রাণকার্য চলছে তাতে সাহায্য করা। ভারতীয় সমালোচকদের কাছে স্বভাবতই, এই ধরনের ত্রাণসাহায্য কখনওই দারিদ্র ও দুর্ভিক্ষের সমস্যার যথার্থ সমাধান নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সে দিন যে ভাবে ক্রমাগত উপনিবেশকে নিংড়ে তার সমস্ত সম্পদ গ্রাস করছিল, এই অবস্থা তারই ফলাফল, সুতরাং একমাত্র সেই নীতির পরিবর্তন ঘটলেই পরিস্থিতির সত্যিকারের পরিবর্তন ঘটা সম্ভব। জাতীয়তাবাদীরা তাঁদের ঔপনিবেশিক কর্তাদের মনে করিয়ে দিলেন, ভারতের দারিদ্র মোটেই তার প্রাচীন ইতিহাসের উত্তরাধিকার নয়, এবং দুর্ভিক্ষও কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং গভীর ভ্রান্তিপূর্ণ ঔপনিবেশিক অর্থনীতিরই ফলাফল। এই ভাবে, দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষিতে যখন সাম্রাজ্যবাদী ও জাতীয়তাবাদী পক্ষের মধ্যে অর্থনীতির বিতর্ক ক্রমে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বাঁক নিচ্ছে, ব্রিটেনের ভারতীয় সাম্রাজ্যের এক সুদূর কোণে জন্ম নিলেন সুভাষচন্দ্র বসু।
কটক
কলকাতার ৩০০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে মহানদীর তীরে কটক শহর। ১৮৯০ সালে সেই শহরের বাসিন্দার সংখ্যা ৪৫০০০-এর বেশি ছিল না। পুরী, ভুবনেশ্বর বা কোনারকের মতো মন্দির-শহরগুলির পাশে কটক নেহাতই প্রশাসনিক শহর— ব্রিটিশদের কাছেও, আবার উড়িষ্যার যে সব রাজন্যবর্গ তত দিনে ব্রিটিশ রাজদণ্ডের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন, তাদের জন্যও। এই ভাবে বশ্যতা স্বীকারের শর্ত হিসেবে কিছুটা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পাওয়া যেত। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ শক্তি তাদের প্রথম রাজনৈতিক জয় পায় বাংলার বিস্তীর্ণ প্রদেশটিতে, ক্রমে সেই বিস্তীর্ণ প্রদেশের অন্তর্গত হল বিহার, অসম, উড়িষ্যাও। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ও দ্বিতীয় প্রধান শহর (লন্ডনের পরই) কলকাতা এবং উড়িষ্যার প্রধান শহর কটকের মধ্যে রেল যোগাযোগ তখনও তৈরি হয়নি। পশুচালিত গাড়িগুলিতে যাওয়া-আসার সময় থাকত ‘চোর-ডাকাত’-এর ভয়, আবার সাগরপাড়ি দিয়ে যেতে চাইলে লড়াই করতে হত ‘হাওয়া আর ঢেউ’-এর বিরুদ্ধে। নৌকোয় যাতায়াতই দস্তুর ছিল, ধরে নেওয়া হত “মানুষের চেয়ে ঈশ্বরের উপর নির্ভর করাই নিরাপদ।”৮ প্রথমে সমুদ্র-গামী জাহাজে চড়ে যেতে হত চাঁদবালি, সেখান থেকে ছোট স্টিমারে নদী-শাখানদী-খালের জাল কাটিয়ে কটক।
১৮৮৫ সালে পঁচিশ বছর বর্ষীয় জানকীনাথ কলকাতা থেকে কটক এলেন ইংরেজ আদালতে চাকরির খোঁজে। এই বসু-পরিবারের ইতিহাস জানা যায় সাতাশ পুরুষ আগে দশরথ বসুর সময় থেকে, যিনি তাঁদের বংশকে প্রথম দক্ষিণ বঙ্গে নিয়ে আসেন। বাংলার হিন্দুদের তিনটি প্রধান উচ্চ জাতের মধ্যে অন্যতম কায়স্থ জাতেই এঁরা পড়তেন। কলকাতার চোদ্দো মাইল দক্ষিণে মহীনগর বলে এক গ্রামের বাসিন্দা এই বসুদের সবচেয়ে বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল মুঘল-পূর্ব যুগে বাংলার সুলতান আমলে। দশরথের অধস্তন একাদশতম পুরুষ মহীপতি যুদ্ধবিগ্রহ করে এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে দক্ষতা দেখিয়ে সুবুদ্ধি খান উপাধি লাভ করেছিলেন— রাজা তাঁর থেকে ‘সুবুদ্ধি’ (সু-উপদেশ) লাভ করেছিলেন বলেই এই নাম, বোঝাই যায়। মহীপতির অন্যতম নাতি গোপীনাথ বসু ছিলেন ওয়াজির অথবা মন্ত্রী, মহান সুলতান হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)-এর দরবারে অর্থ-দফতর এবং নৌবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি অর্জন করেছিলেন বিশেষ উপাধি, পুরন্দর খান। তাঁর মধ্যে যোদ্ধৃক্ষমতার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য-ক্ষমতার এক বিশেষ সমন্বয় ঘটে: ভক্তিমূলক কবিতা লিখে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। সুভাষচন্দ্র বসু পরে তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লেখেন, “ভারতের ব্রিটিশ-পূর্ব যুগকে যখন মুসলিম যুগ বলে অভিহিত করা হয়, তার মধ্যে একটা বড় ভুল থাকে।” কেননা “তখনকার প্রশাসন হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের হাতেই পরিচালিত হত।”৯
শতাব্দীর পর শতাব্দী ভাগ্যের নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও ১৮০০ সালেও কিন্তু বসুরা কলকাতার দক্ষিণে তাঁদের চব্বিশ পরগনার গ্রামগুলিতেই বসবাস করতেন। নতুন ব্রিটিশ জমানায় তাঁদের বংশের বিভিন্ন লোক চাকরি এবং অন্যান্য নানা পেশায় ছড়িয়ে পড়ছেন। জানকীনাথের জন্ম ১৮৬০ সালে; কলকাতার অ্যালবার্ট স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ আর স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশোনা করার ফলে ইংরেজি শিক্ষায় রীতিমত দুরস্ত তিনি। পরে তিনি কটকের র্যাভেনশ’ কলেজ থেকে স্নাতক হন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্রি লাভ করেন। বাঙালি হিন্দু ধর্মের শাক্ত ধারার প্রতি ঝোঁক ছিল এই বসুদের, যে ধারা বিশ্বাস করত মাতৃরূপিণী দুর্গা কিংবা কালীই বিশ্বচরাচরের অদ্বৈত শক্তির আধার। বংশের কোনও কোনও ধারার মধ্যে অবশ্য বৈষ্ণব ভাবধারার প্রকাশও ঘটে— প্রেম ও ভক্তির পথে ঈশ্বরের সঙ্গে পরম মিলনের সন্ধান করত সেই ধারা। জানকীনাথ নিজে কিন্তু ব্রাহ্ম সমাজের সংস্কার-পন্থায় গভীর ভাবে প্রভাবিত ছিলেন— ১৮২৮ সালে রামমোহন রায়ের প্রতিষ্ঠিত এই ব্রাহ্ম সমাজ তখনকার হিন্দু সমাজের জাতপাত ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে উপনিষদের একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করত। ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেন তাঁর অসামান্য বাগ্মিতার কারণে সেই ১৮৮০-র দশকের বহু বাঙালি তরুণের অনুপ্রেরণা-স্বরূপ ছিলেন; জানকীনাথও ছিলেন তাঁর বিশেষ ভক্ত। পরবর্তী কালে সুভাষ অবশ্য কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন, যদিও “আমার বাবার সেই যৌবনকালে মানুষের মধ্যে গভীর নৈতিক জাগরণের কিছু চিহ্ন দেখা গেলেও,” “রাজনৈতিক ভাবে দেশ কিন্তু তখনও ঘুমন্ত।”১০
সুভাষের মা প্রভাবতীর জন্ম হয় ১৮৬৯ সালে। উত্তর কলকাতার হাটখোলার বিখ্যাত দত্তপরিবারের সন্তান তিনি। ব্রিটিশ আমলে শিক্ষা ও প্রভূত ধনসম্পদ অর্জন করে এই দত্ত পরিবার। বিয়ের পর কটকের বসবাসী এই দম্পতির মধ্যে দেখা গেল, পতির তুলনায় পত্নীর প্রথাগত ভক্তিভাব বেশি। ১৮৮৭ সালের পর থেকে সমানেই সন্তানসম্ভবা হতে শুরু করলেন তিনি, একের পর এক সন্তানের জন্ম দিলেন। তবে তীব্র ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী প্রভাবতীই কিন্তু সংসারের ‘হর্তাকর্তা’ ছিলেন, “সাধারণত তাঁর কথাই হত শেষ কথা।” পরবর্তী কালে তাঁর এক নাতি স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, “তিনিই ছিলেন বসু সাম্রাজ্যের রানি ভিক্টোরিয়া, অত্যন্ত কড়া ওপরওয়ালা।”১১ ছোটবেলায় নিজের ও জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাই-বোনের ভিড়ে নেহাতই অনুল্লেখ্য হয়ে থাকতেন সুভাষচন্দ্র। বাবার প্রতি এক ধরনের ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার ভাব ছিল তাঁর; বাবা-মা দু’জনের সঙ্গেই তাঁর খানিকটা দূরত্বের সম্পর্ক ছিল।
তাই ১৯০২-এর জানুয়ারিতে পাঁচ বছরের জন্মদিনের আগেই যে সুভাষ স্কুলে যাওয়ার জন্য বিশেষ ব্যাকুল হয়ে উঠবেন, তাতে আশ্চর্য কী। বাবা-মা স্থির করলেন, ব্যাপটিস্ট মিশন চালিত প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপিয়ান (“পি ই”) স্কুলে তাঁকে পাঠানো হবে। প্রধানত ইউরোপীয় ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছেলেমেয়েরা পড়ত সেই পি ই স্কুলে, তবে যে ১৫ শতাংশ ভারতীয় ছেলেমেয়েরা সেখানে ভর্তি হত, বসু পরিবারের সন্তানরা তাদের মধ্যেই পড়ত। সুভাষ ও তাঁর অন্যান্য সহপাঠীরা ক্লাসটিচার সারা লরেন্সকে রীতিমতো ভালবাসতেন, অন্য শিক্ষকদের কাউকে পছন্দ করতেন, কাউকে নেহাত সহ্য করতেন, কাউকে আবার ঘৃণা করতেন। গোড়াতেই ল্যাটিন ভাষার শিক্ষা ‘বোনাস বোনা বোনাম’ শিক্ষা শুরু হল, প্রতিদিন বাইবেল পড়ানো হত, একঘেয়ে রুটিন হিসেবে রোজ সেই পবিত্র বই-এর নানা অংশ মুখস্থ করতে হত। ইংরেজি ভাষার শিক্ষাটা হল জোরদার, কিন্তু কোনও ভারতীয় ভাষা শিক্ষা হল না। ছোট সুভাষের মানসজগৎ জুড়ে রইল ব্রিটিশ ইতিহাস আর ভূগোল। পাঠক্রম এমন ভাবেই বানানো হয়েছিল “যাতে মনে প্রাণে আমরা ইংরেজ হয়ে উঠতে পারি,” পরে বলেছিলেন সুভাষ।১২
প্রাথমিক স্কুলে তিনি আনন্দেই ছিলেন। পড়াশোনায় ভাল, ক্লাসে একেবারে উপরেই তাঁর স্থান হত। সেই সময়ে, ১৯০৫ সাল থেকে যে স্বদেশী আন্দোলনের ঝড় বইতে শুরু করল কলকাতায় আর বাংলা প্রদেশে, তাতে প্রভাবিত হওয়ার পক্ষে তিনি তখন বড়ই ছোট, অনেক দূরে কটক শহরে তাঁর বাস। সেই বছর কার্জন বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও অসম নামে একটি মুসলমান-প্রধান প্রদেশ বানালেন, হিন্দু-প্রধান প্রদেশটির অন্তর্গত হল বাংলার পশ্চিমাংশ, বিহার এবং উড়িষ্যা। বাংলা-বিভাগের বিষয়টি কার্জন একেবারে ‘পাকা সিদ্ধান্ত’ (‘settled fact’) হিসেবে ঘোষণা করলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা উঠে-পড়ে লাগলেন তা রদ করানোর জন্য। শুরু হল অহিংস বিরোধিতা, ব্রিটিশ সামগ্রী ও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানসমূহের বয়কট। বঙ্গভঙ্গবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে জন্ম নিল নতুন বাঙালি সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, এক নতুন সংস্কৃতি; তার সঙ্গে শুরু হল দেশি কলকারখানাগুলির পুনরুজ্জীবন, জাতীয় শিক্ষার প্রসার। উড়িষ্যার নেপথ্যভূমিতে পি ই স্কুল হয়ে রইল একটি বিচ্ছিন্ন ইউরোপীয় দ্বীপ। সেখানকার পড়ুয়াদের গায়ে বাইরের জগতের বাঙালি স্বাদেশিকতা, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কিংবা এশীয় বিশ্ববাদের নানাবিধ শক্তিশালী স্রোতের এতটুকু আঁচও লাগল না। বাইরে যে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়ে উঠছে সে দিন, স্কুলের পরিবেশ তার সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী হয়ে রইল। পি ই স্কুলের সাত বছর শেষ করার সময়েই সুভাষ উপলব্ধি করলেন যে “তাঁকে ঘিরে রয়েছে দুই সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ”, “যে দুটি জগৎ পরস্পরের সঙ্গে অনেক সময়েই খাপ খায় না।” নিজেকে তাঁর কেমন যেন “খাপছাড়া” লাগতে লাগল; “কোনও ভারতীয় স্কুলে পড়ার প্রবল ইচ্ছে জাগল মনে।” তাই, ১৯০৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপীয়ান স্কুলকে যখন বিদায় জানানোর সময় এল, “একটুও হৃদয়বেদনা ছাড়াই” তিনি বিদায় নিলেন।১৩
পি ই স্কুল থেকে র্যাভেনশ’ কলেজিয়েট স্কুলে আসার সময়ে এই খাপছাড়া বিচ্ছিন্নতার ভাব থেকেই তৈরি হল নতুন কিছু করার ইচ্ছে আর সম্ভাবনা, মনে জমা হতে লাগল উদ্বেগ।১৪ র্যাভেনশ’-তে শিক্ষকমহল ও ছাত্রমহলে প্রধানত বাঙালি আর ওড়িয়াদেরই দেখা যেত, সুতরাং সেখানে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব তৈরির অবকাশও ছিল বেশি। বাংলায় লিখতে ও পড়তে না জানায় প্রথম দিকটা বেশ অসুবিধা হত সুভাষের। প্রথম যে বাংলা রচনা লিখেছিলেন তিনি, সেটা যখন শিক্ষক ক্লাসে জোরে জোরে পড়লেন, সুভাষের ব্যাকরণের ভুলের বহর দেখে সহপাঠীরা হাসাহাসি শুরু করল। কিন্তু সুভাষ তাঁর বিরাট মনের জোর নিয়ে এগোতে লাগলেন, অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ছাড়লেন। এক দিকে পারিবারিক পরিচিতি, অন্য দিকে ইংরেজির উপর বিশেষ দখলের কারণে তাঁর আত্মপ্রত্যয়ের অভাব ছিল না, অন্যরাও তাঁকে মান্য করত। ওই স্কুলের এক হেডমাস্টার বেণীমাধব দাস ছাত্রদের বেশ অনুপ্রাণিত করতে পারতেন— সুভাষের মধ্যে অনেকগুলি দরকারি নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করে দিতে পেরেছিলেন তিনি। আর পেরেছিলেন তাঁর মধ্যে এমন এক প্রকৃতিপ্রেম তৈরি করতে, যার মধ্যে সৌন্দর্যবোধ ও নীতিবোধ দুই-ই মিলেমিশে থাকত। “প্রকৃতির উপাসনা শুরু করলেন” সুভাষ, নদীর পাশে বা পাহাড়ের ওপরে বা বিস্তীর্ণ মাঠে সুন্দর কোনও স্থান বেছে নিয়ে “ধ্যানের অভ্যাস” শুরু করলেন।১৫
মানসজগতে জীবনের অন্যতম ঝঞ্ঝাময় সময়টা এল যখন সুভাষ বারো বছর পেরিয়ে প্রবেশ করলেন প্রথম-তারুণ্যে। তার কিছুটা বয়ঃসন্ধির সাধারণ ওলোটপালোট, যৌনবোধের প্রথম উন্মেষের অভিঘাত। সুভাষ প্রাণপণ চেষ্টা করতেন সেটাকে “চেপে রাখার কিংবা সেটা পেরিয়ে যাওয়ার।” কিন্তু যেহেতু বয়সের তুলনায় তাঁর বেড়ে-ওঠার হার বেশি, এবং যেহেতু প্রকৃতিগত ভাবেই তাঁর প্রবণতা অন্তর্মুখী, অন্যান্য সমবয়সীদের তুলনায় সুভাষের যন্ত্রণা যেন আরও বেশি তীব্র হল। পরে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন, “কয়েকটা ক্ষেত্রে আমার মনোজগতে বেশ একটা অস্বাভাবিকতা ছিল।” তাঁর মধ্যে যে অসাধারণ সত্তাটি ছিল, যে কোনও সাধারণ পার্থিব পথ পেরিয়ে যাওয়ার জন্য যেন একটা বিরাট ঠেলা আসত সেখান থেকেই। নিজের “সমগ্র অস্তিত্বকে যাতে এক জায়গায় এনে ভর দিয়ে রাখা যায়”, সেই লক্ষ্য নিয়ে ক্রমাগত তিনি খুঁজে চললেন কোনও একটা “কেন্দ্রীয় নৈতিক বোধ।” এ কেবল তাঁর নিজের জীবনটা চালনা করার পথ নির্বাচনের বিষয় নয়, আসল চ্যালেঞ্জ হল “নিজের সমস্ত ইচ্ছাশক্তিকে একটি দিকে চালিত করতে পারা।” এ ভাবে যখন তাঁর অস্তিত্বের সংকটের সঙ্গে বোঝাপড়া চলছে, বড় হয়ে ওঠার যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি, বইয়ে পড়া এক জন মানুষের বেশ কিছু লেখা তাঁর কাছে যেন ঈশ্বরপ্রেরিত হয়ে এল। সেই লেখকটির নাম স্বামী বিবেকানন্দ।১৬
“তখন আমি সবে পনেরো,” লিখলেন সুভাষচন্দ্র, “আমার জীবনে তখনই বিবেকানন্দের প্রবেশ।” এই অসামান্য হিন্দু সাধক মানুষের কষ্ট-দুর্দশা দূর করতে জীবন উৎসর্গের বাণী প্রচার করে ১৯০২ সালে নেহাতই অল্প বয়সে প্রাণত্যাগ করেন। এঁরই বাণী থেকে সুভাষচন্দ্র তাঁর “সমগ্র অস্তিত্বের” ভর রাখার মতো “আদর্শ” খুঁজে পেলেন। একটা গোটা প্রজন্মকে বিবেকানন্দ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন, কিন্তু তরুণ সুভাষের মতো এত গভীর ভাবে প্রভাবিত বোধ হয় আর কেউ হননি। স্বামী বিবেকানন্দের চিঠি আর বক্তৃতা খুঁটিয়ে পড়ে “তাঁর বার্তার মূল আদর্শটি স্পষ্ট ভাবে ধরতে পারলেন” সুভাষ, “আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায়” সংস্কৃত শ্লোকটিই সেই আদর্শের ধারক। “নিজের মুক্তির জন্য এবং জগতের সকল মানুষের সেবার জন্য” জীবন উৎসর্গ করতে হবে: এই হল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। মানুষের “হিত” একমাত্র “সেবা”র মাধ্যমেই নিশ্চিত করা যায়। এর সঙ্গে সুভাষ যোগ করলেন আর একটি বিষয়: মানুষের সেবার পথ হল দেশের সেবা। স্বার্থ-গত ভাবে স্বার্থশূন্য সেবার এই যে ব্রত সুভাষের মনে প্রোথিত হল, তা কিন্তু “মধ্যযুগের স্বার্থপ্রণোদিত ধর্মচর্যার অংশ যে সেবাব্রত”, তার থেকে আলাদা, আবার “মিল ও বেন্থামের আধুনিক উপযোগিতাবাদের থেকেও আলাদা।” প্রাচীন ধর্মাদর্শের যে সম্পূর্ণ আধুনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বিবেকানন্দ, তাতেই সুভাষ এতখানি অনুপ্রাণিত হন। এই ধর্মাদর্শের ভিত্তি বেদান্তের “যুক্তিবাদী দর্শন”, নিজের জীবন বিবেকানন্দ উৎসর্গ করেছিলেন “বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য তৈরি করার লক্ষ্যে”। সে দিনের শ্রেণিবিভক্ত সমাজে তাঁর সাম্যপ্রতিষ্ঠার আহ্বান যেন আধুনিক গণতন্ত্রের পূর্বাভাস হিসেবে এল। ভারতের ভবিষ্যৎ চালনা করবে শূদ্রশ্রেণি, “পশ্চাদ্পর মানুষেরা”, এই ছিল তাঁর স্বপ্ন। আবেগমথিত ভাষায় তিনি যে ডাক দিয়েছিলেন, “হে বীর, সাহস অবলম্বন কর, সদর্পে বল— আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই। বল— মূর্খ ভারতবাসী,, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই”— সেই ডাক কেবল সাম্যপ্রতিষ্ঠার ডাক ছিল না, সেই ডাকে ছিল শ্রদ্ধা ও “আস্থা”র প্রকাশ— অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার ভাব থেকে নিজের প্রতি যে আস্থা বা বিশ্বাস তৈরি হয়, তার প্রকাশ। স্বামীজী যদি সেবা ও শ্রদ্ধার মূল্য শিখিয়ে থাকেন, বিবেকানন্দের ধর্মগুরু, কলকাতার কাছে দক্ষিণেশ্বরে কালীমন্দিরের শীর্ষ-পুরোহিত রামকৃষ্ণ পরমহংসের বাণী থেকে সুভাষ শিখেছিলেন ত্যাগের মাধ্যমে সত্য সন্ধানের মহিমা।১৭
বিবেকানন্দের দেখানো পথ ধরে সুভাষ ব্যক্তিগত যোগচর্যা এবং গ্রামে স্বেচ্ছাসেবীর কাজের মধ্য দিয়ে সমাজ-সেবার এক সমন্বয় তৈরি করলেন। যোগচর্যার মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন সম্ভব হয়, আর তার পরিপূরক হিসেবে থাকে মানবজীবনের ক্লেশ-যন্ত্রণার নিরাময়। আত্মসিদ্ধির জন্য বিদ্রোহ প্রয়োজন— গুরুর এই বাণীর জোরে পরিবার ও সমাজের বস্তাপচা যে সব নিয়মরীতি সমাজসেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সুভাষ সেগুলি বর্জন করে বেরিয়ে আসার জোর পেলেন। যে সব সংস্কৃত শ্লোকে ছিল বাবা-মার প্রতি ভক্তির কথা, এ বার সেগুলির জায়গা নিল সেই সব শ্লোক যেখানে উঠে আসে প্রতিবাদের কথা। পরিবারের সদস্যরা এ সব বিষয়ে কোনওই আগ্রহ বা সহানুভূতি দেখালেন না, তাই তাঁদের জায়গা নিল বন্ধুরা, বিবেকানন্দের আদর্শ মেনে চলতে যারা উৎসাহী। পরে স্মরণ করেছিলেন সুভাষ, তিনি “বাড়ি থেকে দূরে থাকলেই বেশি স্বচ্ছন্দ থাকতেন।” অবশ্য, এও বলতে হবে, ১৯১২ সালে এত যে সব নাটকীয় পরিবর্তন এল তাঁর মধ্যে, সে সব ধরা পড়ল পনেরো বছরে কিশোরটির মা-কে লেখা আবেগমথিত চিঠিপত্র থেকেই।১৮
১৯১১-র ডিসেম্বর। বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত রদ হয়েছে সে বছরই। “রাজনীতিতে তখনও এতটাই কাঁচা” সুভাষ, (আত্মস্মৃতিতে নিজেই বলছেন) যে রাজা পঞ্চম জর্জের রাজ-অভিষেকের উপর একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় নাম লেখালেন তিনি। ১৯০৫ সাল থেকে কটকে বাবা সরকারি উকিল হিসেবে কাজ করতেন, ১৯১২ সালে তিনি রায়বাহাদুর উপাধি পাবেন। এমন বাড়িতে রাজনীতি ছিল একেবারে নিষিদ্ধ, ছেলেরা পড়ার ঘরে বাংলার বিপ্লবীদের যে-সব ছবি সাজিয়ে রেখেছিল, সব তিনি একটানে সরিয়ে দেন।১৯ এর মধ্যে, ১৯১২ সালে সুভাষের জীবনে বিবেকানন্দের লেখার প্রবেশ বাড়িতে “বিপ্লব ঘটিয়ে দিল, সব যেন ওলোটপালট হতে বসল।”২০ নিজের দেশ, নিজের দেশের মানুষের মধ্য দিয়েই সুভাষ “মানবতার প্রকৃত রূপটির আস্বাদ পেলেন”।২১ স্বদেশকে পূজনীয়া মাতৃরূপে কল্পনা করেছিলেন বিবেকানন্দ। আর, এই সাধকের বাণীর জাদুমন্ত্রে দীক্ষিত সুভাষচন্দ্রের মনে যে দেশপ্রেম জন্ম নিল, তার মধ্যে মিশে রইল ধর্মভাব এবং মাতৃভক্তি। অবশ্য, দেশ ও ধর্মের বর্তমান রূপ তাঁকে মুহ্যমান করে তুলল: “আজকাল যেখানে ধর্মের নাম সেখানেই যত ভণ্ডামি এবং যত অধর্ম।” মা’র কাছে প্রশ্ন করলেন, “আমাদের দেশের অবস্থা কি দিন দিন এইরূপ অধঃপতিত হইতে থাকিবে— দুঃখিনী ভারতমাতার কোন সন্তান কি নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়া মা-এর জন্য জীবনটা উৎসর্গ করিবে না?”২২
১৯১২-১৩ সালে বাংলায় যে নয়টি চিঠি তিনি মাকে লিখেছিলেন, তাতে যে চেতনার স্রোত দেখতে পাওয়া যায়, সেই চেতনায় বয়সের তুলনায় এগিয়ে-থাকা অতি-সংবেদনশীল মনটির পরিচয় স্পষ্ট। “আমার হৃদয়কাননে সময়ে সময়ে যে ভাবকুসুম প্রস্ফুটিত হয় তাহার সহিত চোখের অশ্রুজল মিশাইয়া আপনার চরণকমলে উপহার দিই।” মাতৃপূজায় আড়ম্বরের থেকে আন্তরিকতা চাইতেন তিনি। বাবা-মা বিপুল ব্যয়ে যে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করছেন, সেই শিক্ষা যদি যথার্থ মানুষ তৈরি করতে না-ই পারে, তাকে ঈশ্বরসেবায় উদ্বুদ্ধ করতে না-ই পারে, তবে তার অর্থ কী, সেই প্রশ্ন তুলতেন। বাবু-গোত্রের লোকদের নিয়ে পরিহাস করতেন, হাঁটার জন্য তাঁরা নিজের পায়ের খামোখা ব্যবহার করেন না, কিংবা কায়িক শ্রমের কোনও কাজেই নিজেদের বহুমূল্য হাতগুলি খরচ করেন না। আরামপ্রিয়, সংকীর্ণ-চিত্ত, চরিত্রহীন, ঈর্ষাপরায়ণ বাঙালি ভদ্রলোকদের তীব্র সমালোচনা করতেন। জীবনের পার্থিব বিষয়গুলি নিয়ে চিঠি লেখা বা পড়া কোনওটাতেই তাঁর কোনও উত্সাহ ছিল না, তিনি চাইতেন চিঠির মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনা, আদর্শের আলোচনা। মানবজীবনের লক্ষ্য— ঈশ্বরের সন্ধান। নদী যেমন শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে মেশে, মানবজীবনেরও চরম সার্থকতা পরম সত্তার সঙ্গে সম্মিলনেই। আধুনিক জীবনের চার দিকে পাপ ও নীতিহীনতার ছড়াছড়ির মধ্যেও তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভারতবর্ষই হল ঈশ্বরের প্রিয়ভূমি, “ভগবানের বড় আদরের দেশ”, অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানেই অনেক বেশি বার তিনি অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করে “পাপক্লিষ্টা ধরণীকে পবিত্র করিয়াছেন এবং প্রত্যেক ভারতবাসীর হৃদয়ে ধর্মের ও সত্যের বীজ রোপণ করিয়া গিয়াছেন।”২৩
সুভাষের মাকে লেখা বাংলা চিঠিগুলি বলে দেশের কথা, ধর্মের কথা। একই সময়ে, বড় ভাই শরত্কে লেখা তাঁর চিঠিতে পাওয়া যায় বহির্জগৎ বিষয়ে অসীম কৌতূহল। জানকীনাথ ও প্রভাবতীর দ্বিতীয় সন্তান এই দাদাটির সঙ্গে সুভাষের এক বিশেষ নৈকট্যের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯১২ সালে যখন শরৎ আইন পড়তে বিলেত যান, সুভাষের অনুরোধ ছিল, যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা, বিদেশি মানুষজনের সঙ্গে কথাবার্তা, সব যেন তিনি সুভাষকে জানান। ভাবতেন, যখন জাহাজ সত্যিই বন্দর ছেড়ে দূরদেশে যাত্রা শুরু করবে, মার্কিন লেখক ওয়াশিংটন আরভিং-এর কোন্ পঙ্ক্তিটি মনে পড়বে তাঁর দাদার: একটি বই বন্ধ করে আর একটি বই খোলার মধ্যে খানিকক্ষণ “ধ্যানে বসছেন”, না কি মনে হবে “অনিশ্চিত দুনিয়ার বুকে ঠেলে ভাসিয়ে দেওয়া হল” তাঁকে? সমুদ্রের বুক থেকে সূর্যাস্ত কেমন লাগে জানতে চাইলেন তিনি, নিজের কল্পনায় সেই সূর্যাস্তের ছবিটি কেমন, তা-ও জানালেন। মেজদাদাকে রবীন্দ্রনাথের কথা লিখলেন। কবির নোবেল পুরস্কার পেতে তখনও এক বছর বাকি, সুভাষ দুঃখ করে বললেন, “বাঙালি এই কবিকে তাঁর উপযুক্ত সম্মান দিলই না”, অথচ বিদেশিরা “তাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবি বলে ভূয়সী প্রশংসা করেন।” মেজদাদার কাছ থেকে যাত্রাপথ এবং ইংল্যান্ড বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা পেয়ে সুভাষের আনন্দের সীমা রইল না, আরও আরও প্রশ্নে তিনি তাঁকে জেরবার করে তুললেন। ১৯১৩ সালের ৮ জানুয়ারি চিঠিতে লিখলেন, “আরও একটা বছর কাটল। গত বারো মাসে আমরা কোথায় কতটুকু এগোতে পেরেছি, সে বিষয়ে ঈশ্বরের কাছে আমাদের দায়ও বাড়ল।” তখনও ষোলো পেরোননি সুভাষ; তার মধ্যেই ভারতের চার দিকে তিনি অন্ধকার, হতাশা, অবক্ষয় দেখছিলেন, তবে “আশার আলোকশিখা”ও খুঁজে পাচ্ছিলেন “ঋষিপ্রতিম বিবেকানন্দে”র মধ্যে। কবি টেনিসনের মতো তাঁর হৃদয়েও যে অমোঘ আশার সঞ্চার হচ্ছিল, সেই আশার ভিত্তি বিবেকানন্দের মধ্যেই। সুভাষ মেজদাদাকে জানালেন, “ভারতবর্ষের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অবধারিত,” “হয়তো সে দিন এখনও কিছু দূরে, কিন্তু তা আসবেই।”২৪
সুভাষের জীবনে কটক-পর্ব এ বার শেষ হতে চলেছে। আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন উড়িষ্যায় ছেলেবেলা কাটানোর কতগুলি ভাল দিকের কথা। আন্তঃ-প্রাদেশিক সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ মিলেছিল এর ফলে, তাঁদের বাঙালি অভিবাসী পরিবার বেশ কিছু ওড়িয়াভাষী পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে তুলেছিল। কটকের মুসলিম-প্রধান অঞ্চলেই ছিল বসুদের বসবাস, ফলে প্রতিবেশী, শিক্ষক, সহপাঠীদের অধিকাংশ ছিল মুসলিম, মুসলিম পরবগুলিতে তাঁরা নিজেরাও অংশ নিতেন। প্রথম জীবনের এই সব সম্পর্ক থেকেই মুসলিমদের প্রতি তাঁর “মানসিক নৈকট্যবোধ” তৈরি হয়ে উঠেছিল। সুভাষ জানিয়েছিলেন যে, ছোটবেলার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে “কোনও সংঘর্ষ বা স্বার্থযুদ্ধ দেখেননি।” বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে এই খোলামেলা মুক্ত ভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চয়ই তাঁর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ ছিল, কিন্তু জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বড় হয়ে ওঠার যে ব্যক্তিগত যন্ত্রণাময় পথ, তার থেকে তাঁর নিস্তার মেলেনি। পরে ভাবতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, সন্দেহই নেই যে “অন্যরা তাঁকে জেদি, ছিটগ্রস্ত, উদ্ভ্রান্ত” বলে মনে করত।২৫ বাবা-মা চিন্তা করতেন, পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে কি না। ১৯১৩ সালের মার্চে স্কুল-শেষের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বসলেন সুভাষ, সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রচুর সংখ্যক স্কুল, সুতরাং এই ফলাফলকে সঙ্গতভাবেই বিরাট কৃতিত্ব বলা চলে। বাবা-মা নিশ্চিন্ত হলেন। স্থির করলেন, সুভাষকে এ বার কলকাতার কলেজে পাঠানো হবে।
কলকাতা
“এই মহানগরী আমাকে অসম্ভব অবাক করেছিল, আশ্চর্য করেছিল,” কলকাতা সম্পর্কে লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র।২৬ আগেও তিনি এই মহানগরে বেড়াতে এসেছেন, কিন্তু ১৯১৩ সালের বসন্তে তিনি এলেন বসবাস করার লক্ষ্য নিয়ে। অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা, কিন্তু ১৯১১ সালে ঔপনিবেশিক প্রভুরা সিদ্ধান্ত নেন যে, বাংলার টালমাটাল রাজনীতির কবল থেকে তাঁদের রাজধানী সরিয়ে বরং দিল্লির পুরনো মুঘল কেন্দ্রভূমিতে নিয়ে যাওয়া হবে। ১৯০৯-১০ সালে তাঁর বাবার তৈরি ৩৮/২ এলগিন রোডের তিনতলা বাড়িটিতে সুভাষ থাকবেন এখন থেকে। ১৯১৩ সালের মার্চে মা-কে লেখা এক চিঠিতে তিনি জানালেন, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে চান না।২৭ কিন্তু পাশ্চাত্য বিদ্যার পীঠস্থান সেই প্রেসিডেন্সি কলেজেই শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলেন তিনি, দর্শন স্নাতক পাঠক্রমে। অবশ্য তার আগেই তিনি স্থির করে ফেলেছেন যে “গতানুগতিক পথে না চলে” বরং “এমন জীবন যাপন করবেন যা তাঁকে তাঁর (নিজের) আত্মিক উন্নতির লক্ষ্যে, মানবজগতের মঙ্গলের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে।” “জীবনের যে কোনও একটি বিশেষ অর্থ ও বিশেষ লক্ষ্য আছেই”, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, আর তাই নিজের দেহ ও মনের কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার সাধনা নিয়ে এগোতে চাইলেন তিনি, “দর্শনের গভীর জ্ঞান” অর্জন করতে চাইলেন, “রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দকে অনুসরণ করতে চাইলেন।”২৮
প্রেসিডেন্সি কলেজের ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে নানা রকমের দল ছিল। এক দিকে ছিল প্রবল পড়ুয়ারা, অন্য দিকে বড়লোকের দুলালরা। গোপন বিপ্লবী কাজকর্মে আকৃষ্ট ছাত্ররাও যেমন ছিল, তেমনি ছিল কিছু ছাত্র যারা সব রকম চরমপন্থা-বর্জন করে আত্মিক সাধনার পথে চলতে চায়। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের ভক্ত দলটির সঙ্গেই সুভাষের প্রথম ভাব হল। ডাক্তারির ছাত্র সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এই দলের পাণ্ডা। আর এক জন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন হেমন্তকুমার সরকার, যাঁর সঙ্গে কলেজের প্রথম দিকটায় সুভাষের বিশেষ ভাব হয়। সুভাষের কাছে ধর্মের আকর্ষণের একটা “ব্যবহারিক আবশ্যিকতা” ছিল, “যুক্তিনিষ্ঠ দর্শন”-এর সঙ্গে যা তিনি সহজেই মেলাতে সক্ষম হয়েছিলেন।২৯ যৌন বোধের সঙ্গে তাঁর লড়াই জারি রইল সারাক্ষণ, কেননা তাঁর মতে আত্মিক সাধনার পথে চলতে হলে যৌন চেতনা সমূলে বর্জনীয়। তবে ব্যক্তিগত যোগ-চর্চার সূত্রে তিনি ক্রমশই ঝুঁকতে লাগলেন সমাজসেবার পথে।
বন্ধুদের সঙ্গে জোট বেঁধে বাংলার ইতিহাসের খোঁজে সুভাষ মুর্শিদাবাদ ঘুরে আসলেন, ১৯১৪ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে তাঁর পল্লিগঠনের কাজ বিষয়ে শুনলেন, কী ভাবে একটি উত্কৃষ্ট মানের বিদ্যাচর্চার প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব, তা নিয়ে কবির সঙ্গে আলোচনা করলেন, হিন্দু সন্ন্যাসীদের মতো গেরুয়াবসনে হুগলি নদীর তীরে তাঁবু খাটিয়ে ক’দিন থাকলেন। ১৯১৪ সাল থেকে আর্য পত্রিকায় অরবিন্দ ঘোষের লেখা প্রবন্ধ পাঠ করতে আরম্ভ করলেন। স্বদেশী যুগের বিপ্লবীদের কাছে অরবিন্দ ছিলেন এক বিরাট অনুপ্রেরণা, যদিও ১৯১০ সাল থেকে তিনি চলে গিয়েছিলেন ধর্মসাধনার পথে। শংকরের মায়া-তত্ত্ব বলে মানব জীবন অলীক, প্রপঞ্চময়। সেই তত্ত্ব পড়ে সুভাষের মনে কিছু কাল ধরেই বেশ অশান্তি তৈরি হয়েছিল। অরবিন্দের অধ্যাত্মতত্ত্ব তাঁকে সেই মায়াজাল থেকে বার হওয়ার একটা পথ দেখাল। অরবিন্দের অধ্যাত্মতত্ত্বের ভিত্তি ছিল “আত্মা ও বস্তুর মিলন, স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টির মিলন,”— এবং অবশ্যই যোগ-সাধনা, যা মানুষকে পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের মাধ্যমে সত্যে পৌঁছনোর পথ দেখায়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল কিন্তু অরবিন্দের প্রেরণাময় আহ্বান সুভাষকে বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, “আমি দেখতে চাই তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক বড় হও! নিজের জন্য নয়, ভারতবর্ষের জন্য, যাতে ভারতবর্ষ এক দিন সব স্বাধীন দেশের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে!”৩০
ছুটিতে কটক আসতেন সুভাষ। সেই সময় কলেরার প্রাদুর্ভাব হয় সেখানে। একটি দলের সঙ্গে জুটে সুভাষ রোগীদের সেবা করে বেড়াতেন। এই সেবার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি “সত্যকারের ভারতের একটা ছবি পেলেন, যে ভারতবর্ষের প্রাণ তার গ্রামসমাজের মধ্যে, যেখানে মাটির উপর বিস্তীর্ণ ছেয়ে থাকে দারিদ্রের ছায়া, পতঙ্গের মতো মারা পড়ে সাধারণ মানুষ, অশিক্ষা যেখানে সর্বব্যাপী।”৩১ নেহাতই অল্পবয়স, তখনও কুড়িতে পা দেননি, সুভাষচন্দ্রের ভারত আবিষ্কার কিন্তু তাঁর আর এক অসাধারণ সমসাময়িক নেতা জওহরলাল নেহরুর মতো হল না। ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের পরে নেহরু তাঁর ভারতকে আবিষ্কার করেছিলেন, সুভাষচন্দ্রের ক্ষেত্রে সেই আবিষ্কার ঘটে গেল ইউরোপ-অভিজ্ঞতার আগেই, আর তাই হয়তো তাঁর এই আবিষ্কার আত্মিক সাধনার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে গেল। ১৯১৪ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবা-মাকে না জানিয়েই এক বন্ধুর সঙ্গে কোনও গুরু কিংবা আত্মিক সাধনার পথপ্রদর্শকের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন সুভাষ। উত্তর ভারতের সব কয়েকটি প্রধান তীর্থস্থানে গেলেন তিনি— লছমনঝুলা, হৃষীকেশ, হরিদ্বার, মথুরা, বৃন্দাবন, কাশী এবং গয়া। হরিদ্বারে তৃতীয় এক বন্ধু এই অনুসন্ধান-দলে যোগ দিলেন। দুই মাস ধরে চলল এই সন্ধানযাত্রা, কয়েক জন সত্যিকারের মহান্ সাধকের সঙ্গে দেখাও হল, কিন্তু সব মিলিয়ে হতাশা আর ব্যর্থতা দিয়েই শেষ হল তাঁদের অভিযান। উত্তর ভারতের সমাজে জাতপাতের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ ভাবে দেখার সুযোগ পেলেন সুভাষ, দেখলেন ধর্মের নামে কী ধরনের দলাদলি, রেষারেষি চলে। “হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতার স্পষ্ট চেহারাটা” মুখোমুখি দেখার পর যখন কলকাতায় ফিরলেন, তখন “সাধুসন্ন্যাসীদের উপর শ্রদ্ধা প্রায় হারিয়ে ফেলে অনেক প্রাজ্ঞ” হয়েছেন সুভাষ। ফিরে আসার কয়েক দিনের মধ্যে টাইফয়েড বাধালেন, “এত তীর্থযাত্রা আর গুরু-সন্ধানের ফল।”৩২ অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শুয়েই খবর পেলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
এই সময় থেকেই সুভাষের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ। কলকাতা শহরে ভারতীয়রা অহরহ ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্য-বাদের শিকার হতেন। বাড়ি থেকে কলেজ যাওয়ার পথে ট্রামে চড়তে গিয়েও সুভাষ তা রোজ টের পেতেন। স্পর্ধিত বিলিতি সাহেবদের সঙ্গে প্রায়ই তিনি মৌখিক তর্জনগর্জন শুরু করে দিতেন। একেবারে সেই সময়েই, দুনিয়া-জোড়া যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাঁর মানসিক ক্ষোভ বাড়তে লাগল। বিছানায় শুয়ে কাগজ পড়তে পড়তে তাঁর মাথায় নানা প্রশ্ন জমা হল: “আচ্ছা, কোনও জাতির জীবনকে কি আদৌ দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া সম্ভব যাতে একটি ভাগ বিদেশিদের দিয়ে দেওয়া যায়, আর অন্য ভাগটি নিজেদের জন্য রাখা যায়?”৩৩ মনে হল, বহির্দুনিয়া থেকে অন্তর্দুনিয়ার এমন ভাগাভাগি, কিংবা কোনও জাতির আত্মিক জীবনের ক্ষেত্র থেকে বাইরের পার্থিব জীবনের ক্ষেত্রকে আলাদা করার চেষ্টা একেবারে অর্থহীন। যা হোক, ১৯১৫ সালটা তেমন কোনও সংকট ছাড়াই কেটে গেল। সুভাষ নিজেকে দর্শনপাঠের মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন: কান্ট, হেগেল, বার্গসঁ। পড়াশোনার বাইরেও নানা কিছু করতেন তিনি: কলেজের ছাত্র কমিটির নির্বাচিত ক্লাস-প্রতিনিধি ছিলেন তিনি, বিতর্ক গোষ্ঠী বা ডিবেটিং সোসাইটির সেক্রেটারি, পূর্ব বাংলার দুর্ভিক্ষ ত্রাণ কমিটির সেক্রেটারি, নতুন শুরু-হওয়া কলেজ পত্রিকার বোর্ডের অন্যতম সদস্য। বিতর্কের জন্য ছাত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁর পরিচয় হল এক সহপাঠী ছাত্রের সঙ্গে, যাঁর নাম দিলীপকুমার রায়, বিখ্যাত কবি ও গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র। এই বন্ধুত্ব আজীবন স্থায়ী হয়। দিলীপ পরবর্তী কালে বলেছিলেন, একেবারে প্রথম দিন থেকে তিনি খেয়াল করেছিলেন যে সুভাষের মধ্যে “নেতৃত্বদানের একটা জন্মগত ক্ষমতা আছে, সে নিজেও সেটা ভালই জানে।”৩৪
১৯১৬ সালের গোড়ায় একটা নাটকীয় ঘটনা ঘটল। প্রেসিডেন্সি কলেজের স্বাভাবিক ছন্দ যেন চুরমার হয়ে গেল সেই ঘটনায়। ১০ জানুয়ারি, সুভাষ কলেজের লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করছিলেন, হঠাৎ খবর পেলেন যে তাঁরই ব্যাচের কিছু ছাত্রের সঙ্গে ইতিহাসের শিক্ষক এডওয়ার্ড ফার্লে ওটেন রীতিমতো ‘দুর্ব্যবহার’ করেছেন। ক্লাস প্রতিনিধি হিসেবে সুভাষ বিষয়টা নিয়ে প্রিন্সিপাল হেনরি আর জেমস-এর সঙ্গে কথা বলতে গেলেন, দাবি করলেন, ওটেন যেন ছাত্রদের কাছে ক্ষমা চান। ওই শিক্ষক অবশ্য বললেন যে তাঁর ক্লাসের বাইরে ছেলেরা হইচই করছিল বলে তিনি বিরক্ত হয়ে “তাদের হাত ধরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন”, যে ব্যবহারকে কোনও ভাবেই অপমানজনক বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি আবার সরকারের শিক্ষা দফতরের সদস্য, সুতরাং তাঁর কাছ থেকে জোর করে ক্ষমাপ্রার্থনা আদায় করবেন, এমন কোনও ক্ষমতাই প্রিন্সিপালের ছিল না। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা পরের দিন সাধারণ ধর্মঘট ডাকল। প্রেসিডেন্সি কলেজের মতো একটি রাজভক্ত প্রতিষ্ঠানে এমন সফল ধর্মঘটের খবরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল শহরের চার দিকে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদেরও প্রেসিডেন্সির উদাহরণ বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করল। ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনের শেষ দিকে ওটেন ছাত্র-প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করলেন বিষয়টা মিটিয়ে ফেলার জন্য। প্রিন্সিপাল কিন্তু বেঁকে বসলেন, ধর্মঘটী ছাত্রদের উপর যে পাঁচ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে, তা বাতিল করতে তিনি নারাজ। পরের দিন ওটেনের ইতিহাস ক্লাসের বারো জন ছাত্রের দশ জনকেই তিনি ক্লাস থেকে বার করে দিলেন— তারা ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিল বলে।৩৫
১৫ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের কানে এল, কেমিস্ট্রি প্রথম বর্ষের একটি ছাত্রকে করিডরে বেশি আওয়াজ করার জন্য ওটেন আবার তার সঙ্গে ‘দুর্ব্যবহার’ করেছেন। এ বার কিছু ছাত্র মিলে ঠিক করল, “বিচারের ভার নিতে হবে নিজেদের হাতেই।” প্রেসিডেন্সি কলেজের সেই বিখ্যাত সিঁড়ির নীচে ভাল রকম উত্তমমধ্যম দেওয়া হল ওটেনকে। চল্লিশ সেকেন্ডের ঘটনা— সরকারি তদন্ত কমিটির মতে। ওটেন পরে বলেছিলেন, “কয়েকটা কাটাছেঁড়া ছাড়া তেমন কোনও আঘাত তিনি পাননি”। “সুভাষচন্দ্র বসু ব্যাপারটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে শুনেছি,” তবে “তার কোনও প্রমাণ আমার কাছে নেই।”৩৬ সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ে তিনি দশ-পনেরো জন ছাত্রকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন, একটা ক্রিকেট ম্যাচের নোটিস লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাই কারা তাঁকে প্রহার করেছিল ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারেননি। এক আর্দালি সুভাষ আর অনঙ্গ দাম নামে আর এক ছাত্রকে শনাক্ত করে, ওই জায়গা ছেড়ে পালানোর সময়ে সে নাকি তাদের খেয়াল করে।
এমন একটা ভয়ানক খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে দেরি হল না, কয়েক দিন ধরে খবরের কাগজগুলিতে এই একই সংবাদের চর্চা চলল। সরকার তত্ক্ষণাৎ অনির্দিষ্ট কালের জন্য কলেজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিল। প্রিন্সিপালের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই নির্দেশ জারি হল। প্রিন্সিপাল সোজা রাইটার্স বিল্ডিং-এ গিয়ে গভর্নরের কাউন্সিলে শিক্ষা-অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করলেন। আর একটি নির্দেশ এল তখন, যাতে সম্মানিত অধিকর্তাকে “ব্যক্তিগত অপমান” করার জন্য প্রিন্সিপালকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর নিজের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত লাগু হওয়ার আগেই জেমস সন্দেহভাজন ছাত্রদের তাঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন। সুভাষের দিকে ফিরে কর্কশ গলায় জানালেন, “বোস, তুমিই এই কলেজের সবচেয়ে বেশি গোলমেলে ছাত্র। তোমাকে বরখাস্ত করলাম।” গভর্নিং বডি প্রিন্সিপালের সিদ্ধান্ত সমর্থন করল, প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সুভাষ বিতাড়িত হলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তিনি আর্জি জানালেন অন্য কোনও কলেজে পড়ার অনুমতি চেয়ে। সেই আপিলও প্রত্যাখ্যাত হল। অর্থাৎ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে মোটের উপর বহিষ্কার করা হল।৩৭
অধ্যাপক-প্রহারের সেই ঘটনায় কি সুভাষ সত্যিই জড়িত ছিলেন? তদন্ত কমিটির সামনে তিনি নিজের কোনও অপরাধ স্বীকার করেননি, অন্য কারও নামও করেননি, আলাদা করে কোনও ছাত্রের সমালোচনা করেননি। সুভাষের মায়ের মতে, কোনও শিক্ষককে মারা তাঁর ছেলের পক্ষে একেবারে অসম্ভব, জীবনে এমন কাজ সুভাষ করতে পারেন না। ১৯৩৭ সালে নিজের আত্মজীবনীতে তিনি নিজেকে ওই ঘটনার ‘সাক্ষী দর্শক’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, যদিও ১৯২১ সালে শরৎ-কে লেখা এক চিঠিতে লেখেন যে, সে দিন অমন ভাবে অন্যদের নাম না করে কিংবা সম্পূর্ণ নীরব না থেকে, তাঁর উচিত ছিল ওই ঘটনার সমস্ত দায় আরও সরাসরি স্বীকার করা। পরবর্তী জীবনে, এ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলে, বিশেষ করে তাঁর অল্পবয়সী ভাইপোরা জানতে চাইলে তিনি কেবল হাসতেন, কোনও স্পষ্ট উত্তর দিতে চাইতেন না।৩৮ তিনি যদি সে দিন ওটেনকে মেরেও থাকেন, সম্ভবত সমবয়সীদের চাপে পড়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা যেমন প্রভাবিত হয়ে পড়ে, সে রকমই ঘটনা ছিল সেটা।
ওটেনের এই ঘটনা যখন ঘটে, এ দেশে জাতিবিদ্বেষ তখন বেশ তীব্র। ১৯০৫-৮ সালের বঙ্গবিভাজন-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের ফলে সাম্রাজ্যবাদী শাসক-সমাজ ও উপনিবেশের মানুষের মধ্যে দূরত্ব তখন বিরাট, দেশের তরুণদের হাবভাবের মধ্যেও সেই দূরত্বের চিহ্ন স্পষ্ট। ওটেনের মতো শিক্ষকরা সহজেই জাগিয়ে তুলছেন সাম্রাজ্যবাদীর জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অভিমান, তাঁদের সভ্যতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পবিত্র কর্তব্য ক্রুদ্ধ করে তুলছে বাংলার ১৯০৫-পরবর্তী গর্বিত প্রজন্মকে। ছাত্রদের লক্ষ্য করে কিছু ইউরোপীয় শিক্ষকের প্রায়শ আলটপকা মন্তব্য যে কত বড় ক্ষতি ডেকে আনছে, সরকারি তদন্ত কমিটিও তা উল্লেখ করে। তাতে পাওয়া যায়, এদের লক্ষ্য করে কোনও কোনও শিক্ষক এমনকী ‘বর্বর’ ধরনের শব্দও ব্যবহার করছেন, সেই ব্যবহারের সঙ্গে তাঁরা কিন্তু কোথাও স্পষ্ট করছেন না যে “সনাতন গ্রিক ব্যুত্পত্তি বিচার করলে” শব্দটি ‘নন-হেলেনিক’ অর্থাৎ ‘প্রাকৃত’ অর্থও বোঝাতে পারে।৩৯ ১৯১৬ জুড়ে ভারতীয় কাগজপত্রে পুরনো পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক ধ্যানধারণার পরিবর্তন বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়। সবচেয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ সম্ভবত পাওয়া যায় সেই রবীন্দ্রনাথের কলমেই, ইংরেজি বাংলা দুই ভাষাতেই লেখা তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে। তাঁর মনে হয়, বাঙালি তরুণসমাজের বিদ্রোহী সত্তারই প্রকাশ ঘটে এই ঘটনায়, ব্রিটিশ শিক্ষকদের স্পর্ধিত ব্যবহারে, কিংবা ভারতীয় শিক্ষকদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবহারে যাঁরা বিক্ষুব্ধ হয়ে থাকতেন। পারস্পরিক প্রীতির বদলে ভয় ও ঘৃণার উপর ভিত্তি করেই সে দিন শাসক ও শাসিত সমাজের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে চাইছিল ব্রিটিশরা, স্বাভাবিক ভাবেই ভারতীয় ছাত্রদের মনে এমন “অপমান মর্মে গিয়া বিঁধিয়া” থাকত।৪০ এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচিত ক্লাস প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ছাত্রদের ক্ষোভ ও স্বার্থ জানানোর ব্যবস্থাটি বাতিল করে দেওয়া হয় সরকারের তরফে। সরকারি মতে, এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হল “বক্তৃতাবাজ নেতা-ধরনের ছেলেপিলে, নৈতিক ভাবে কিংবা বোধবুদ্ধির দিক দিয়ে মোটেও বাঞ্ছিত প্রতিনিধিস্থানীয় নয়।”৪১ শিক্ষককে শারীরিক প্রহার করার জন্য ছাত্রদের শাস্তি দিয়ে কর্তৃপক্ষ হয়তো ভুল করেননি। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বাসনায় গণতান্ত্রিকতাকে কোনও জায়গা না দেওয়ার যে প্রয়াস তাঁরা করলেন, তার ফল দাঁড়াল, নতুন ছাত্র-প্রজন্ম যারা তাদের পূর্বসূরিদের মতো সাম্রাজ্যের প্রতি এমনিতেও ভক্তিভাবাপন্ন নয়— তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু তৈরির সম্ভাবনাটা গেল হারিয়ে।
পড়াশোনায় এ ভাবে বাধা পড়ায় সুভাষ সত্যিই দুঃখিত হয়ে পড়লেন, কিছু একটা ব্যবস্থা হবে, এই আশায় রইলেন। বাবা এবং মেজদাদা শরৎ বড় বড় জায়গায় পারিবারিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে, সাক্ষাৎ একনায়কের মতো উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে ধরে সুভাষকে অন্য কোথাও ভর্তি করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তেমন কোনও ফল হল না। তখনকার মতো তাঁরা স্থির করলেন, বিতাড়িত ছাত্রটিকে বরং ট্রেনে করে কটকেই ফেরত পাঠানো যাক। পিছন ফিরে ভাবলে মনে হয়, এই ওটেন-কাণ্ডটি সুভাষের জীবনে এক অত্যন্ত গুরুতর মুহূর্ত। তিন দশক পর, সুভাষ আত্মজীবনীতে লিখবেন, “রাতের বেলায় ট্রেনের বাঙ্কে শুয়ে পিছনের কয়েক মাসের ঘটনাগুলো ভাবছিলাম।” “১৯১৬-র সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার” “অন্তর্নিহিত গুরুত্ব” আরও কিছু কাল পরেই কেবল বোঝা যাবে, যখন তিনি উপলব্ধি করবেন যে কলেজ থেকে সে দিনের বিতাড়ন “সীমিত ক্ষেত্রে হলেও তাঁকে একটা নেতৃত্বের স্বাদ দিয়েছিল, তার সঙ্গে দিয়েছিল শহিদ হতে পারার এক রকম অভিজ্ঞতা।”৪২
সেই “দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা” অবশ্য ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে যতটা না, তার চেয়ে সামাজিক টানাপোড়েনের জন্যই অত বেশি দুর্ভাগ্যময় ছিল। বিশ শতকের প্রথম দিকে কলকাতার দেশী ছাত্রদের হাতে কেবল ওটেন সাহেব একাই প্রহৃত হননি। আসল কথা, ভারতের পরবর্তী দিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর প্রথম জীবনের কাহিনি এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে বলেই সে দিনের সেই ঘটনা এত স্মরণীয়। আরও যে সব শিক্ষক সে সময়ে ছাত্রদের কাছ থেকে এই ধরনের ব্যবহার পান, তাঁদের সম্পর্কে বলা হত, তাঁরা ‘ওটেনাইজড্’ হলেন। যে শিক্ষকের নাম এ ভাবে ক্রমে নামধাতুতে পরিণত হয়, বোঝা কঠিন নয় তিনি কী ভাবে এ দেশে দশকের পর দশক ধরে লোকমুখে খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত হয়ে চলেন। তবে স্বাধীনতার কুড়ি বছরেরও বেশি পরে, তরুণ ভারতীয় নেতাটির বিষয়ে লেখা এই শিক্ষকের একটি কবিতার খোঁজ পাওয়া গেল। শিক্ষকটির সম্পর্কে ধারণাও দ্রুত পাল্টাতে শুরু করল এরপর:
Did I once suffer, Subhas, at your hands?
Your patriot heart is stilled, I would forget!
Let me recall but this, that while as yet
The Raj that you once challenged in your land
Was mighty; Icarus-like your courage planned
To mount the skies, and storm in battle set
The ramparts of High Heaven, to claim the debt
Of freedom owed, on plain and rude demand.
High Heaven yielded, but in dignity
Like Icarus, your sped towards the sea.৪৩
এমন এক অসামান্য ঐতিহাসিক সন্ধিস্থাপন অবশ্য জমা রইল ভবিষ্যতেরই গর্ভে। ১৯১৬ সালের মার্চে, উজ্জ্বল তরুণ ছাত্রটি যখন কটকে ফিরছিলেন, সামনে তাকানোর মতো কিছুই ছিল না তাঁর। দেশের সমাজ অবশ্য তাঁকে সহানুভূতি ও সম্মান দিয়েই দেখল, নিজের পরিবার তাঁর অবস্থান ঠিকমতোই বুঝতে পারল। বরং, তাঁর আধ্যাত্মিক বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর একটা দূরত্ব তৈরি হল, জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনাবলির সময়ে যাঁদের সঙ্গে তিনি বিশেষ পরামর্শ করার প্রয়োজনও বোধ করেননি। এখন তিনি নিজেই নিজের পথ তৈরি করছেন, নানা গুহ্য তাত্ত্বিক ভাবনাচিন্তার বৃত্ত থেকে নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছেন। তার বদলে, আরও দৃঢ় ভাবে তিনি নিজেকে সমাজসেবায় নিযুক্ত করলেন। কলেজ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হওয়ার সেই বছরটি তিনি কাটালেন কটকের পরিপার্শ্বে, কলেরা ও বসন্তরোগের রোগীদের চিকিৎসার ব্যস্ততায়। সমাজসেবায় অল্পবয়সীদের উদ্বুদ্ধ করতেও সময় দিলেন। এক বার জানতে পারলেন, ছাত্র হস্টেলে অর্জুন মাঝি নামে এক সাঁওতাল ছাত্র উঁচু জাতের ছাত্রদের কাছ থেকে খারাপ ব্যবহার পাচ্ছে, যে রকম হামেশাই ঘটে থাকে। এই ছাত্রটির টাইফয়েড হয়। সুভাষ এই অন্যায় ব্যবহারের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন, বিশেষ যত্নের সঙ্গে তার শুশ্রূষার বন্দোবস্ত করলেন। তাঁকে “বিস্মিত ও খুশি” করে তাঁর মা-ও এই শুশ্রূষার কাজে তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন, ছেলের নিজেরই বেছে-নেওয়া পথে তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।৪৪
এক বছর পর সুভাষ আবার কলকাতার উদ্দেশে রওনা হলেন, আর এক বার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাবার্তা বলার জন্যে। শেষ-ঊনবিংশ শতকে যে অদ্ভুত সব নৃতাত্ত্বিক ধারণা তৈরি হয়েছিল সৈনিক-ভাবাপন্ন (‘মার্শাল’) জাতি ও উপজাতি বিষয়ে, সেই ধারণার অনুসরণে ব্রিটিশরা বাঙালিদের সৈনিক-গোত্রীয় বলে মনে করত না। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিকাংশই তৈরি হয়েছিল সেই সব তথাকথিত ‘মার্শাল’ জাতির লোক নিয়ে— যার মধ্যে পড়ত পঞ্জাবি, পাঠান কিংবা গুর্খা। তবে মহাযুদ্ধের প্রেক্ষিতে অবশ্য বাঙালিদেরও সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা শুরু হল, ১৯১৭-য় তৈরি হল ব্রিটিশ বাহিনীর ‘৪৯তম বাঙালি রেজিমেন্ট’। বাঙালির শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেই রেজিমেন্টে যোগ দিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দি ছেড়ে বিশ্বদুনিয়ার অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সাধ জাগল তাঁর। কলকাতার বিডন স্ট্রিটের আর্মি অফিসে এসে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য চুপচাপ আবেদনপত্র জমা দিলেন সুভাষও। আর সব ডাক্তারি পরীক্ষায় পাশ করলেও খারাপ দৃষ্টিশক্তির কারণে তাঁর আবেদন নাকচ হয়ে গেল। ফলে তিনি ফিরে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, স্কটিশ চার্চ কলেজের প্রিন্সিপাল ডক্টর আর্কুহার্ট-এর অফিসে গিয়ে দেখা করলেন। নিজের পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললেন, বললেন যে তিনি দর্শনে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করতে চান। আর্র্কুহার্ট প্রেসিডেন্সি কলেজের নতুন অধ্যক্ষের কাছ থেকে একটি ‘নোট’ চাইলেন যে তাঁর এতে কোনও আপত্তি থাকবে না। ভাই শরতের সাহায্যে সুভাষ সেই নোট জোগাড় করে ফেলতে পারলেন। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে, বিরাট উদ্দীপনা ও আত্মনিবেদনের সঙ্গে নতুন করে দর্শনের পড়াশোনা শুরু করলেন সুভাষ।৪৫
স্কটিশ চার্চ কলেজে আর্কুহার্ট-এর দর্শন-বিষয়ক বক্তৃতা ও বাইবেল-পাঠন খুব পছন্দ হল তাঁর, মনে হল আর্কুহার্ট এক জন সত্যিকারের ‘বিচক্ষণ ও সদয়’ অধ্যক্ষ। কলেজের ফিলজফিক্যাল সোসাইটি-র নানা সেমিনারে সুভাষ রীতিমতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠলেন। ১৯১৮-র ১ ফেব্রুয়ারি নিজে “আ ডিফেন্স অব মেটিরিয়ালিজম” নামে একটি প্রবন্ধ লিখে পড়লেনও বটে, সোসাইটির সদস্যরা তীব্র সমালোচনা করল সেই পেপারের। ৬ সেপ্টেম্বর যখন তিনি “আ ডিফেন্স অব আইডিয়ালিজম” বিষয়ে বক্তৃতা দিলেন, শ্রোতারা কিন্তু সাদর প্রশংসা জানালেন। এই দ্বিতীয় বার তিনি কেবল তাঁর বিশ্লেষণী শক্তির তীক্ষ্ণতা পরীক্ষা করার চেষ্টা না করে বরং নিজের ভেতরের বিশ্বাসের কথা বলেছিলেন। সোসাইটি-র ‘মিনিট্স’ বা কার্যবিবরণীতে লেখা হল, সে দিনের বক্তা “তিনি হেগেল-এর ভাববাদী অদ্বৈতবাদ সমর্থন করেন, কিন্তু পরম বা বিমূর্ত সত্তাকে হেগেল ও শোপেনহাওয়ার-এর মতো বিশুদ্ধ বুদ্ধি বা বিশুদ্ধ ইচ্ছা বলে মনে করেন না। তাঁর বিশ্লেষণে আত্মা স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যে বিরাজমান, সকল জাগতিক প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে, মনুষ্যচিত্তের সচ্চিদানন্দ স্তরে উত্থানের যে সংগ্রাম, সেখানে এই আত্মা নিরন্তর সাধনারত।”৪৬
মননচর্চার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণেও মন দিলেন সুভাষ। যুদ্ধের শেষ বছরে, ইন্ডিয়া ডিফেন্স ফোর্স-এর একটি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট তৈরি করল ব্রিটিশরা, সুভাষ মহা উত্সাহে তাতে যোগ দিলেন। লিখলেন, “কী বিরাট পরিবর্তন! নির্জনবাসী তপস্বীর পদতলে বসে ভগবান বিষয়ে জ্ঞানার্জন থেকে সোজা রাইফেল ঘাড়ে নিয়ে দাঁড়ানো, ব্রিটিশ আর্মি অফিসারের হুকুম মানা!” স্কটল্যান্ডের মানুষ ক্যাপটেন গ্রে-কে তাঁর বেশ পছন্দ হল। কর্কশ কণ্ঠ এবং রূঢ় হাবভাব সত্ত্বেও তাঁর ভিতরে “একটি সোনার হৃদয়” ছিল বলে মনে হয়েছিল সুভাষের। তাঁর অধীনে কর্মরত তরুণ যোদ্ধারা তাঁর জন্য ‘সব কিছু’ করতে রাজি ছিল। প্যারেড ও বন্দুক ছোড়ার প্রশিক্ষণ বিশেষ ভাবে পছন্দ হল। পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, প্রথম দিন যখন সব শিক্ষানবিশরা কুচকাওয়াজ করতে করতে ফোর্ট উইলিয়ামের নিষিদ্ধ অঙ্গনে ঢুকে রাইফেল সংগ্রহে গেলেন, সে দিন সকলের মনেই “কী যেন এক অদ্ভুত সন্তুষ্টির অনুভূতি”, যেন কিছু-একটায় তাঁদের “জন্মগত অধিকার” থাকা সত্ত্বেও এত দিন তাঁরা তার থেকে “অন্যায় ভাবে বঞ্চিত” ছিলেন, আজ এত দিন পর মিলল “তার অধিকারের স্বাদ।”৪৭ ১৮৫৭ সালের ব্যর্থ মহাবিক্ষোভের পর থেকেই অসামরিক ভারতীয়দের উপনিবেশের প্রজা হিসেবে কোনও রকম অস্ত্র বহন করা নিষিদ্ধ ছিল। একটা গোটা জাতির সেই বলপূর্বক অস্ত্রহরণ সকলের মনেই অগোচরে বেদনার কাঁটার মতো বিঁধে থাকত।
বি এ পরীক্ষা এগিয়ে আসতে সৈনিকগিরি ছেড়ে পড়াশোনায় মন দিলেন সুভাষ। দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স পেয়ে উত্তীর্ণ হলেন তিনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা-তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলেন। কৃতিত্বের জন্য অনেক মেডেল ও পুরস্কার জুটল, কিন্তু তাঁর নিজের মনে যে উঁচু মানদণ্ড, তার নিরিখে নিজের ফলাফল পছন্দ হল না তাঁর। মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য সুভাষ সিদ্ধান্ত নিলেন, দর্শন থেকে পরীক্ষণমূলক মনস্তত্ত্বে সরে যাবেন। সবে মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন, এমন এক সন্ধ্যায় বাবা ডেকে পাঠালেন। সুভাষ দেখলেন, বাবা জানকীনাথ ভাই শরতের সঙ্গে বসে আছেন। বাবার প্রশ্ন: ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস-এর জন্য পড়াশোনা করতে সুভাষ ইংল্যান্ডে যেতে চান কি না। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর চাই। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনের লৌহ-কাঠামো ছিল এই আই সি এস। মোটের উপর ব্রিটিশরাই সেখানে সুযোগ পেতেন। উনিশ শতকের শেষ থেকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা এই সার্ভিস-এর ভারতীয়করণের জন্য অনেক আন্দোলন করে এসেছেন, তবে যেটুকু যা অগ্রসর হওয়া গিয়েছিল সেই লক্ষ্যে, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তার গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। ১৮৯৩ সালে হাউস অব কমনস্ এই সার্ভিসের প্রবেশিকা পরীক্ষা একই সঙ্গে লন্ডন ও কলকাতায় নেওয়ার প্রস্তাব আনে, তবে সেই প্রস্তাব কার্যকরী হয় না। যে সব ভারতীয় ব্রিটিশ রাজের এই সার্ভিসে যোগ দিতে ইচ্ছুক হতেন, তাঁদের কাছে এ ছিল “স্বর্গীয় চাকরি”— হাতে গোনা কয়েক জন সৌভাগ্যবান ভারতীয়ের কপালেই জুটত ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টদের পাশাপাশি বসে আমলাতন্ত্রের একেবারে উপরের ধাপে কাজ করার এমন সুযোগ।
সুভাষ অনেক ভাবলেন। নিজেকে বোঝালেন, এত কঠিন আই সি এস পরীক্ষা কখনওই তিনি পাশ করতে পারবেন না, মাত্র আট মাস বাকি ইত্যাদি। তাও শেষ পর্যন্ত বাবার এই প্রস্তাব তিনি স্বীকার করে নিলেন। বিদেশে গিয়ে ইংল্যান্ডের কোনও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভ করার সুযোগটাতেই তাঁর প্রধানত আগ্রহ হল। এক সপ্তাহের মধ্যে রওনা হতে হবে। এ দিকে ইংল্যান্ডে যাওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জায়গা থেকে আপত্তি এল। পারমার্থিক অনুসন্ধানের লক্ষ্যে যে দলে তিনি যোগ দিয়েছিলেন, তার সদস্যরা মনে করলেন, “এই হল পথ আলাদা হওয়ার লক্ষণ”: “পুরো ব্যাপারটাতে তারা যেন ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিল।” তার পর তিনি গেলেন কেম্ব্রিজ-প্রত্যাগত প্রেসিডেন্সি কলেজের এর প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করতে, তিনিই ছিলেন ইংল্যান্ডে পড়াশোনার ব্যাপারে প্রাদেশিক উপদেষ্টা। সেই প্রফেসর বললেন, অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজের কৃতী ছেলেপিলেদের পাশে আই সি এস পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই সুভাষের নেই, তবে কেন আর মিছিমিছি এই দশ হাজার টাকা নষ্ট করা! সুভাষ অবশ্য তত দিনে স্থির করে ফেলেছেন নিজের পছন্দের পথেই চলবেন, সুতরাং তাঁকে নিরস্ত করা গেল না। যখন দেখলেন, কোনও ভাবেই কেম্ব্রিজে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করতে রাজি নন ওই প্রফেসর, তিনি কেবল একটি বাক্যই বললেন, “আমার বাবা চান, ওই দশ হাজার টাকা আমি মিছিমিছিই নষ্ট করি।” রওনা হলেন সুভাষ।
কেম্ব্রিজ
এস এস সিটি অব ক্যালকাটা: এই ছিল জাহাজের নাম। ১৯১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সুভাষচন্দ্র বসু বম্বে থেকে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হলেন এই জাহাজে। বেশ মন্থর, ক্লান্তিকর যাত্রা। সুয়েজ-এ কয়লা ধর্মঘটের জন্য এক সপ্তাহ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। অবশেষে ২৫ অক্টোবর, লন্ডনের অতি-পরিচিত ধূসর দিনে সিটি অব ক্যালকাটা প্রবেশ করল টিলবারি বন্দরে। ইংল্যান্ডের ‘অ্যাকাডেমিক ইয়ার’ তত দিনে শুরু হয়ে গিয়েছে। সুভাষ ছুটলেন ক্রমওয়েল রোডে, সেখানে ভারতীয় ছাত্রদের উপদেষ্টার অফিস। তিনি অবশ্য বিশেষ কোনও সাহায্যে এলেন না। বন্ধুদের পরামর্শে সুভাষ সোজা কেম্ব্রিজের ট্রেনে চেপে বসলেন। পৌঁছে ফিটজ্উইলিয়াম হলের সেন্সর বা হেড মাস্টার রেডাওয়ের সঙ্গে দেখা করলেন। তিনিই তাঁকে কেম্ব্রিজের দর্শনশাস্ত্রের ডিগ্রি কোর্সে অন্তর্ভুক্ত মরাল ও মেন্টাল সায়েন্সেস-এর ক্লাস করার অনুমতি দিলেন, যদিও তত দিনে সেই কোর্স-এ ভর্তি হওয়ার দিন পেরিয়ে গিয়েছিল। সুভাষ পরে লিখেছিলেন, “মিস্টার রেডাওয়েকে ছাড়া আমি যে কী করতাম ইংল্যান্ডে কে জানে।”৪৮
১৯১৮-র ডিসেম্বরে ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে শরিকি সরকার ক্ষমতায় এল। ডেভিড লয়েড জর্জের নেতৃত্বে লিবারেলরা এবং অ্যান্ড্রু বোনার ল’-র নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি হাত মেলাল সেই সরকারে। ১৯১৯ থেকে ১৯২১-এর মধ্যে লেবার পার্টির উত্থান হল। দেখা গেল খনি-শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমিকদের ধর্মঘটের পালা। সেই সময়ে অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একের পর এক সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে— আয়ার্ল্যান্ডে, মিশরে, ভারতে। যুদ্ধশেষে কেম্ব্রিজ তখন রাজনৈতিক ভাবে অক্সফোর্ডের থেকে অনেক বেশি রক্ষণশীল, বস্তুত অক্সফোর্ডে তখন লিবারেলরা ক্ষমতায় আসছে। তবে কলকাতার যুদ্ধকালীন সেই দমচাপা দিনগুলোর পরে কেম্ব্রিজের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে সুভাষের বেশ লাগছিল, তরুণ ছাত্রদের সাধারণ ভাবেই সেখানে কতটা সম্মান করা হয়, তা দেখে মুগ্ধ বোধ করছিলেন। ইউনিয়ন সোসাইটির বিতর্কে অংশ নিতেন, মুক্ত চিন্তার সেই পরিবেশ তাঁকে ‘আনন্দে উত্ফুল্ল’ করে তুলত। তিনি এসেছেন এমন এক ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে যেখানে প্রতিবাদ মানেই সরকারের চোখে রাষ্ট্রবিরোধিতা। সুতরাং এক আয়ার্ল্যান্ড-সমর্থক বক্তা যখন বললেন “এক দিকে ‘দ্য ফোর্সেস অব ল’, অন্য দিকে ‘বোনার ল’”, তাঁর তিক্তরসবোধ মুগ্ধ করল সুভাষকে (অ্যান্ড্রু বোনার ল’ সেই সময়ে ব্রিটিশ সরকারের স্বরাষ্ট্র-মন্ত্রী)। নানা রকম এক্সট্রা-কারিকুলার কাজকর্মে অংশ নেওয়ার বাইরেও সুভাষ নিয়মিত ভাবে তাঁর দর্শন কোর্সের অন্তর্গত নীতিবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব ও অধিবিদ্যার লেকচার শুনতে যেতেন। তবে অধিকাংশ সময়টাই দিতে হত আই সি এস পরীক্ষার পড়াশোনা ও প্রস্তুতিতে। নয়টি বিষয় পড়তেন তিনি: ইংলিশ রচনা, সংস্কৃত, দর্শন, ব্রিটিশ আইন, রাষ্ট্রবিদ্যা, আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাস, ইংল্যান্ডের ইতিহাস, অর্থনীতি ও ভূগোল। এর মধ্যে তিনি ডুব দিতে ভালবাসতেন রাষ্ট্রবিদ্যা, অর্থনীতি, ইংল্যান্ডের ইতিহাস ও আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসের মধ্যে, পরবর্তী কালে এগুলি তাঁর বিশেষ ‘উপকারে’ও লেগেছিল। বিসমার্কের আত্মজীবনী, মেটারনিক-এর স্মৃতিকথা, কাভ্যুর-এর পত্রসংকলন পড়ে তিনি ইউরোপীয় মহাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ব্রিটেনের ইতিহাসের সম্পর্ক বুঝতে পারলেন,“আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভেতরের স্রোত” সম্পর্কে জ্ঞান তৈরি হল। ইংল্যান্ডের ব্যক্তিস্বাধীনতার ইতিহাস পড়ে মনে হল, সমসাময়িক ভারতের সঙ্গে সেই ইতিহাসের বেশ যোগ আছে। যে যে বই তিনি তখন পড়ছিলেন,— যেমন এ এফ পোলার্ড-এর ফ্যাক্টরস অব মডার্ন হিস্টরি, আর্থার ডি আইনস্-এর আ হিস্টরি অব ইংল্যান্ড, অথবা জন মেনার্ড কেইনস্-এর ইন্ডিয়ান কারেন্সি অ্যান্ড ফিনান্স— তাঁর নিজস্ব কপিগুলি সব ক’টিই দাগে দাগে ভর্তি, পাশের মার্জিনে লম্বা লম্বা নোট।৪৯
সুভাষের অভিজ্ঞতায়, কেমব্রিজের ব্রিটিশ ও ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে সম্পর্ক মোটের উপর ভদ্র হলেও ঘনিষ্ঠ বলা যায় না। যে জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার-এর নির্দেশে ১৯১৯-এর এপ্রিলে অমৃতসর হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, তাঁর প্রতিও ব্রিটিশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে সমর্থন দেখা যেত, তাতে ভারতীয়রা বেশ দুঃখই পেতেন। একটি বদ্ধ পার্কে পুরুষ, মহিলা, শিশু মিলিয়ে প্রায় চারশো জন নিহত হয়েছিলেন সে দিন, আর তার তিনগুণেরও বেশি সংখ্যক মানুষ আহত হয়েছিলেন। ব্রিটেনে ফেরার পর কিন্তু উপনিবেশের উদ্ধত প্রজাদের বেশ কড়া দাওয়াই দিয়ে আসার জন্য সেই ডায়ারকেই রীতিমত নায়কের সংবর্ধনা দেওয়া হল, বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ-পুরস্কারও প্রদান করা হল। ছোটখাটো ঘটনাতেও জাতিদ্বেষের প্রমাণ মিলত। এক ভারতীয় টেনিস চ্যাম্পিয়নকে আন্তঃ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় কেমব্রিজের ইউনিভার্সিটি টিম-এর ক্যাপটেন হতে দেওয়া হল না। অফিসার্স ট্রেনিং কোর-এর ইউনিভার্সিটি ইউনিট-টিতে ভারতীয় ছাত্রদের নেওয়া হত না। কেমব্রিজ-এর ছাত্রদের অন্যতম অ্যাসোসিয়েশন ইন্ডিয়ান মজলিস-এর প্রতিনিধি করে সুভাষ ও আর এক ছাত্র কে এল গৌবাকে তাঁদের বক্তব্য পেশ করার জন্য সেক্রেটারি অব স্টেট ই এস মন্টেগু এবং ভারতের আন্ডার-সেক্রেটারি অব স্টেট আর্ল অব লিটনের কাছে পাঠানো হল। লিটন জানালেন, ইন্ডিয়া অফিসের কোনও আপত্তি নেই অফিসার্স ট্রেনিং-এ ভারতীয়দের নিতে, তবে ‘ওয়ার অফিস’-এর দুশ্চিন্তা যে ভারতীয়রা ট্রেনিং পাওয়ার পর না ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ চেয়ে বসে। সাদা চামড়ার সৈন্যদের ভারতীয় অফিসারদের অধীনে কাজ করার ব্যাপারটা তখনও ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। ভারতীয় ছাত্ররা কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করলেন যে তাঁরা কেবল ট্রেনিং-এই উত্সাহী, সেনাবাহিনীতে কাজ না চাইবার প্রতিশ্রুতিও দিলেন তাঁরা— কিন্তু ফল কিছুই হল না। ইন্ডিয়া অফিস এবং ওয়ার অফিস নিজেদের মধ্যে দায় চালাচালি করতে লাগল, মাঝখান থেকে ভারতীয় ছাত্ররা বুঝে গেলেন, তাঁদের এ সবের বাইরেই থাকতে হবে।৫০
কেমব্রিজের এই সময়টা জুড়ে বেশ কিছু ভারতীয় ছাত্রের সঙ্গে সুভাষের গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হল: দিলীপকুমার রায়, ক্ষিতীশপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সি সি দেশাই। বাঙালি ত্রিমূর্তি সুভাষ, দিলীপ ও ক্ষিতীশ ল্যাঙ্কাশায়ারের পঞ্জাবি ডাক্তার ধর্মবীর, তাঁর ইউরোপীয় স্ত্রী ও দুই কন্যা সীতা ও লীলার সংসারে একটি নতুন গৃহকোণ খুঁজে পেলেন। শ্রীমতী ধর্মবীরের সঙ্গে সুভাষের বেশ স্নেহের সম্পর্ক তৈরি হয়ে উঠল, তিনি তাঁকে ‘দিদি’ বলে ডাকতে শুরু করলেন। তাঁর কাছেই সুভাষ পরে স্বীকার করেছিলেন, ল্যাঙ্কাশায়ারের বার্নলি-তে ধর্মবীর পরিবারে থাকার স্বল্প সময়টা ছাড়া ইংল্যান্ডে থাকতে তাঁর একটুও ভাল লাগত না। ঠিক কীসে যে তিনি আনন্দ পেতেন সে কথা বুঝিয়ে বলতে পারতেন না, কিন্তু জানতেন, “আপনার আর ডাক্তারের জন্যই এমনটা হতে পারল।” শ্রীমতী ধর্মবীরকে এক বার ভারতে ঘুরে যেতে বলতেন তিনি, বলতেন ভারতের যে সভ্যতা, তাতে রয়েছে “মানুষের আত্মিক উন্নতি, আর সেই উন্নতির পথে আধ্যাত্মিকের কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টা।” সুভাষের নিভৃত চিন্তাভাবনাগুলি মন দিয়ে শুনতেন শ্রীমতী ধর্মবীর, আর তাতে ভারী কৃতজ্ঞ বোধ করতেন সুভাষ। ট্রেন ছাড়ার সময় যখন শ্রীমতী ধর্মবীর তাঁর ও তাঁর বন্ধুদের হাতে বাদাম কিংবা ফলের প্যাকেট ধরিয়ে দিতেন, সুভাষের তাঁকে ঠিক “ভারতীয় মায়েদের মতো” লাগত।৫১
ধর্মবীরদের বসার ঘরটি জমজমাট হয়ে উঠত ভারতীয় রাজনীতির আলোচনায়। দিলীপ পরে স্মরণ করেছিলেন, “আগুনের সামনে বসে কেম্ব্রিজের বন্ধুরা যে ভাবে কথা বলতে বলতে রাত কাবার করে দিতেন, একমাত্র তারুণ্যের তেজেই তা সম্ভব।” ইংল্যান্ডের লেবার পার্টির উত্থান, রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লব, কত বিষয়েই না কথা চলত। ভারত ও আয়ার্ল্যান্ডের মধ্যে তুলনা টেনে সুভাষ বন্ধুদের বলতেন, স্বদেশী যুগের বাঙালি বিপ্লবীদের মোটেই ব্যর্থ বলা যাবে না: “তা হলে তো বলতে হয় সিন ফেইন আন্দোলনও ব্যর্থ, তার অভীষ্ট তো এখনও সিদ্ধ হয়নি। ডি ভালেরা-কে যখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল, কে ভেবেছিল যে তাঁকে মুক্ত করে দেওয়া হবে, তার পর ১৯১৮ সালে আবার বন্দি করা হবে, লিঙ্কন জেল থেকে তিনি পালাবেন, আমেরিকা যাবেন, এবং সেখানে আইরিশ রিপাবলিকান আন্দোলনের জন্য ষাট লক্ষ ডলার সংগ্রহ করবেন?” বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনও সে রকম “প্রথম বড় মাপের আন্দোলন”, সাম্রাজ্যের প্রজাদের নির্জীব হৃদয়ে তা শক্তি জুগিয়েছিল, “জাতীয় চেতনার একটা কেন্দ্রীয় ভূমি তৈরি করতে পেরেছিল।”৫২
দেশের আর এক বন্ধু চারুচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে চিঠিতে সুভাষ লিখেছিলেন, ইংল্যান্ডে এসে তিনি জনশিক্ষার প্রয়োজন সম্যক ভাবে অনুধাবন করেছেন, শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন। ভারতের অগ্রগতি যে “চাষী, ধোপা, মুচি, মেথর”দের দ্বারাই সাধিত হবে, বিবেকানন্দের এই বাণী স্মরণ করতেন তিনি। “সাধারণ মানুষের শক্তি” যে কত বড় মাপের হতে পারে, পাশ্চাত্য সভ্যতা তা দেখিয়ে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল রাশিয়া, বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারতের শূদ্র বা অস্পৃশ্য জাতেরাই সেখানকার লেবার পার্টি। এত দিন এরা কেবল কষ্টই পেয়ে এসেছেন। এদের শক্তি, এদের ত্যাগেই ভারতের উন্নতি সম্ভব হবে।৫৩
অনেকের মতেই যা প্রায় ‘স্বর্গীয় চাকরি’, সেই আই সি এস হওয়ার পরীক্ষাটির কঠোর অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গেই চলছিল এই সব চিন্তাভাবনা। ১৯২০ সালের জুলাই-এর মাঝামাঝি পরীক্ষা শুরু হল, প্রায় মাসখানেক কাল ধরে চলল সেই যন্ত্রণা। সুভাষ নিশ্চিত ছিলেন, তাঁর পরীক্ষা সুবিধের হয়নি। একদম ‘ছাঁকা ১৫০ নম্বর’ ছেড়ে দিয়েছিলেন, একটি সংস্কৃত অধ্যায়ের অনুবাদের খসড়া করার পরেও আসল পরীক্ষার খাতায় সেটা আর কপি করেননি। ফলে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বিস্ময়। মধ্য-সেপ্টেম্বরের এক রাতে এক বন্ধুর তার এল: “অভিনন্দন, মর্নিং পোস্ট দেখেছ?” মর্নিং পোস্ট থেকে জানা গেল সুভাষ আই সি এস হতে পেরেছেন, মেধাতালিকায় তাঁর স্থান চতুর্থ।৫৪ আর এক জন ভারতীয় ছাত্রের সঙ্গে যুগ্ম ভাবে ইংরেজি রচনায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছেন। তাঁর উপরে যে তিন জনের স্থান, তারা ভাল করেছে ল্যাটিন, গ্রিক ও অঙ্কে; সুভাষ ভাল করেছেন ইতিহাস, নীতিদর্শন ও অধিবিদ্যা দর্শন, রাষ্ট্র-অর্থনীতিবিদ্যা ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, মনোবিদ্যা এবং তর্কবিদ্যায়।৫৫ ঔপনিবেশিক কর্তারা যে মান তৈরি করে রেখেছেন, তাতে অসামান্য কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছিলেন সুভাষ, কিন্তু এখন তাঁর সামনে এসে গেল একটা “বিরাট বিবেক-সংকট।”৫৬ মানবতার জন্য সেবার যে আদর্শ সামনে রাখতে চান তিনি, ব্রিটিশ রাজের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস-এ যোগ দিয়ে কি সেই আদর্শ সিদ্ধ হবে?
এর পরের সাত মাস কেটে গেল এই সংকটের মোকাবিলা করতে করতেই। মেজদাদা শরত্কে সব কথাই বলতেন তিনি, এ বার তাঁকে লম্বা লম্বা চিঠি লিখে পরামর্শ ও সমর্থন চাইলেন। ব্রিটিশ মানুষ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে যে একটা বড় পার্থক্য আছে, সে বিষয়ে তিনি খুবই সতর্ক থাকতেন। ১৯২০-র সেপ্টেম্বরে এসেক্সে লেই-অন-সি-তে গিয়ে মিস্টার বেটস-এর বাড়িতে অতিথি হন। যে সময় ব্রিটিশ রাজের চাকরি করার বিষয়টি নিয়ে নিজের মধ্যে বিপুল ভাবে আলোড়িত, তেমন সময়েই যাঁর বাড়িতে তিনি থাকছিলেন, সেই মিস্টার বেটস্-এর উষ্ণ ব্যবহারের কথা মেজদাদাকে লিখে জানান। লেখেন, “ইংরেজ চরিত্রের সব রকম ভাল গুণ মিস্টার বেটস্-এর মধ্যে পাওয়া যাবে। সংস্কৃতিবান, উদারভাবাপন্ন, আন্তরিক ভাবে বিশ্বজনীন।” কত রকম দেশের লোকের সঙ্গে মিস্টার বেটস্-এর যোগাযোগ, রুশ আইরিশ ভারতীয় কত সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর পরিচয়: প্রশংসা করতেন সুভাষ। এই উদারহৃদয় ইংরেজকে উপহার দেওয়ার জন্য মেজদাদাকে কলকাতা থেকে তাজমহলের একটি ছোট প্রতিকৃতি পাঠাতে বললেন তিনি। তবে ইংরেজ চরিত্র সম্পর্কে শ্রদ্ধার জন্য কিন্তু ব্রিটিশ রাজের বিষয়ে তাঁর মতামত পাল্টাল না।
আই সি এস-এ যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সুভাষ বেশ অনুত্সাহ বোধ করছিলেন তত দিনে। ব্যঙ্গ করে লিখলেন, “ক্ষমতা থাকলে, আর ভৃত্যসুলভ আনুগত্য থাকলে, প্রাদেশিক সরকারের চিফ সেক্রেটারি হওয়াই বা আটকাচ্ছে কে!” নানাবিধ বিদঘুটে ভাবনা সুভাষের মাথায় খেলত, মনোভাবটাই ছিল অন্য রকমের, “বিলাসবহুল জীবনের” প্রতি তাঁর কোনও টান ছিল না। “সংগ্রাম না থাকলে, ঝুঁকি না নিলে তো জীবনের অর্ধেক মজাই মাটি,” মেজদাদাকে বলেছিলেন। জোর দিয়ে অনুভব করলেন, “জাতীয়তার আদর্শ কিংবা আধ্যাত্মিকতার আদর্শ কোনওটাই সিভিল সার্ভিসের চাকরির বাধ্যতার সঙ্গে খাপ খায় না।” এই চাকরিতে না যোগ দিলে বাবা “খেপে যাবেনই”, তবে সে ঝুঁকিটা নেবেন কি না তখনও তিনি মনস্থির করে উঠতে পারছেন না। “সব পথ যদি খোলা থাকে”, সে ক্ষেত্রে “ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পক্ষে একেবারে শেষতম মানুষ” তিনি। আই সি এস হওয়া মানে বিয়ের বাজারে দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়া। সুভাষের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হল না। মেজদাদাকে লিখলেন, “ঘটকরা যদি আবার তোমাকে বিরক্ত করে, একদম পিছন ফিরে দৌড় লাগাতে বোলো।”৫৭
রমেশচন্দ্র দত্ত অর্থনৈতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ, ঔপনিবেশিক শাসনের কড়া সমালোচক। তাঁর মতো মানুষরাও তো সিভিল সার্ভিসের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এত রকম গুরুতর কাজ করে গিয়েছেন। — এ যুক্তি সুভাষকে শুনতেই হল। তাঁর অবশ্য মনে হল, এখানে একটা নীতির প্রশ্ন রয়েছে। যে শাসনযন্ত্রের “প্রয়োজনীয়তা অনেক আগেই ফুরিয়ে গিয়েছে,” এবং এখন যা কেবলই “রক্ষণশীলতা, স্বার্থপর ক্ষমতা, হৃদয়হীনতা ও লালফিতের ফাঁস” হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন একটা শাসনযন্ত্রের অংশ হওয়ার কথা তিনি কিছুতেই কল্পনা করতে পারেন না। কর্তব্যপথ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে এল। হয় তাঁকে “এই জঘন্য চাকরির মায়া ছাড়তে হবে”, নয়তো “(আমার) সব আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে বিদায় জানাতে হবে।” আত্মীয়স্বজনরা হায় হায় শুরু করলেন তাঁর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার খবর পেয়ে, তবে তাতে তাঁর কিছুই এসে গেল না। শরত্কে লিখলেন, “আপনার আদর্শবাদে আমার আস্থা আছে, আর সে জন্যেই আমি আপনার কাছে সব কথা খুলে আবেদন করছি।” ওটেন-কাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দিলেন তিনি, মনে করিয়ে দিলেন কী ভাবে শরৎ সে সময়ে তাঁকে সব রকমের নৈতিক সমর্থন জুগিয়েছিলেন। এ বার বাবার কাছে অনুমতি চাওয়ার পালা, ব্যারিস্টার দাদাটির সাহায্য তাঁর দরকার এখন, তাঁর ‘কেস’টি লড়ে দেওয়ার জন্য।৫৮
আই সি এস চাকরির ব্যাপারে সুভাষের একটা প্রবল নৈতিক দ্বন্দ্ব হয়েছিল: বাবার বিরুদ্ধচারণ করা উচিত কাজ কি না তা নিয়ে। শরত্কে জানালেন, বাবা-মা-র অনুমতি চেয়েছেন তিনি “দারিদ্র ও সেবার ব্রতে” নিজেকে উৎসর্গ করার জন্যে। বিদেশি প্রশাসনের হয়ে কাজ করার “মূল ভাবনাটাই” তাঁর কাছে “ভয়ানক আপত্তিকর” ঠেকতে শুরু করেছিল। স্বদেশী যুগের বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ যে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন, সেই পথটিই তাঁর মনে হল, নরমপন্থী রমেশচন্দ্র দত্তের তুলনায় “অনেক মহৎ, অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক, আদর্শযোগ্য, স্বার্থলেশহীন, তবে অনেক বেশি ঝুঁকির কাজ।” ভারতে যাঁকে সবাই ‘দেশবন্ধু’ বলে চেনে, সেই বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা চিত্তরঞ্জন দাশ যদি “সর্বস্ব ত্যাগ করে জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন,” তরুণ সুভাষই বা পারবেন না কেন।৫৯ এই চিত্তরঞ্জন দাশ যিনি পরে রাজনীতি-ক্ষেত্রে সুভাষের পিতৃপ্রতিম হয়ে উঠবেন, ১৯০৯ সালে আলিপুর বোমা মামলায় তিনিই অরবিন্দ ঘোষের উকিল হিসেবে লড়েন। এত দিনে তিনি বাংলা প্রদেশে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অগ্রগণ্য নেতা হয়ে উঠেছেন। চিত্তরঞ্জন দাশকে “বাংলার জাতীয়তাবাদের কর্মযজ্ঞের প্রধান পুরোহিত” বলে সম্বোধন করে সুভাষ জানতে চাইলেন সিভিল সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁকে কী ধরনের কাজ করতে দেবেন সেই নেতা। তাঁর নিজের বিশ্বাস, জাতীয় কলেজে তিনি পড়াতে পারবেন, কিংবা দেশবন্ধুর জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রিকাটিতে লেখালেখি করতে পারবেন। চিত্তরঞ্জনের কাছে পরামর্শ চাওয়ার সময় থেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সুভাষ চিঠি লিখে কংগ্রেসের বিষয় নিজের মতামত জানাতে শুরু করলেন। ভারতীয় মুদ্রা নিয়ে কিংবা দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে, বা নারীপুরুষনির্বিশেষে ভোটাধিকার প্রসঙ্গে কিন্তু এই প্রধান জাতীয়তাবাদী দলটির এখনও “কোনও স্পষ্ট নীতি নেই।” “পশ্চাত্পর শ্রেণির” বিষয়ে কংগ্রেসের “উদ্যোগহীনতার” কারণে ভারতের দুর্ভাগা অস্পৃশ্য জাতিসমূহ, মাদ্রাজের অব্রাহ্মণরা সমানেই “সরকারমুখী, জাতীয়তাবাদবিরোধী হয়ে পড়ছে।” কংগ্রেসের উচিত স্থায়ী বাসস্থান ও স্থায়ী কর্মী ও গবেষক জোগাড় করে জাতীয় সমস্যাগুলির দিকে সচেতন দৃষ্টি দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণ করা।৬০
কংগ্রেসের দুর্বলতা বিষয়ে কংগ্রেসেরই অন্যতম মুখ্য নেতা চিত্তরঞ্জন দাশকে লিখে জানিয়ে আশ্চর্য আত্মপ্রত্যয় দেখিয়েছিলেন সুভাষ। দুঃখ করে লিখেছিলেন, কর্মী আইন বা কারখানা আইন বানানো, কিংবা দারিদ্র দূরীকরণ বা দরিদ্রের জন্য ত্রাণসাহায্য সংগ্রহের প্রসঙ্গে কংগ্রেসের কোনও স্পষ্ট নীতিই নেই। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার, কংগ্রেস এখনও জানেই না “কী ধরনের সংবিধান” দেশের জন্য যথার্থ হবে। ১৯১৬ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ যে প্রস্তাব তৈরি করেছিল, সুভাষের চোখে তা নিতান্তই যুগের অনুপযোগী বলে মনে হয়েছিল। “স্বরাজ-এর ভিত্তিতে আমাদের এ বার দেশের সংবিধানটি বানানোর দিকে মন দেওয়া দরকার,” চিত্তরঞ্জন দাশকে অনুরোধ করলেন সুভাষ। কংগ্রেস বর্তমান ব্যবস্থা ভাঙার বিষয়টির দিকেই বেশি মনোযোগী, কিন্তু গড়ার কাজটাতেও তো মন দেওয়া প্রয়োজন।৬১
১৯২১-এর ফেব্রুয়ারির শেষে সুভাষ আই সি এস ছেড়ে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। ২৩ তারিখ শরৎকে লিখলেন, অরবিন্দ ঘোষের “জ্বলন্ত উদাহরণ” তো তাঁর সামনে রয়েছেই, সেই উদাহরণ অনুসরণ করে তিনি নিজেও আত্মত্যাগে প্রস্তুত। শরতের প্রতিক্রিয়া যে “সদয়” হবে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তবে এও জানতেন, আত্মীয়দের মধ্যে “আর প্রায় কেউই” তাঁর এই “পাগলামি” সমর্থন করবেন না। আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, এর আর নড়চড় হবে না, তবে আমার ভাগ্য এই মুহূর্তে তোমারই হাতে। তোমার আশীর্বাদ কি আমি আশা করতে পারি না? আমার এই নতুন যাত্রাপথ শুরুর মুহূর্তে তুমি কি আমায় আশিস জানাবে না?”৬২
স্নেহশীল দাদা তো ভাই-এর পাশে দাঁড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, কিন্তু মার্চের গোড়ায় তাঁর দৃঢ় আপত্তির কথা জানিয়ে দিলেন পিতা জানকীনাথ। ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের প্রতি বিরাগপ্রকাশের সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে চাইলে এ বার সুভাষকে বাবার প্রকাশ্য ইচ্ছার বিরুদ্ধতা করতেই হবে, গত্যন্তর নেই। ১৯২১-এর ৬ এপ্রিল বাবার যুক্তির উত্তরে যুক্তি সাজিয়ে শরত্কে একখানি লম্বা চিঠি লিখতে বসলেন সুভাষ, অক্সফোর্ডে। আরম্ভ করলেন তাঁর নিজস্ব সংকট দিয়ে: এক দিকে বাবা-মার প্রতি কর্তব্য, অন্য দিকে নিজের প্রতি কর্তব্য, এ দুয়ের মাঝখানে পিষ্ট হয়ে তাঁর মন তখন অসহনীয় কষ্টে জর্জর। বুঝতে পারছেন কত কঠিন আঘাত তিনি বাবা-মাকে দিচ্ছেন, বিশেষত যখন বেশ কিছু আত্মীয় তাঁদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন ইতিমধ্যেই, পরিবারের মধ্যে তিনিই তখন মূল অশান্তির কারণ হয়ে উঠেছেন। পিতা মনে করতেন, ১৯১৯-এর সংস্কার যেহেতু প্রাদেশিক স্তরে কিছু অধিকার দান করেছে, কোনও ভারতীয় সরকারি আমলার চাকরি করতে চাইলে তাতে আত্মসম্মান নষ্ট হওয়ার প্রশ্ন আর ওঠে না। “তবে কি বর্তমান অবস্থায় বিদেশি আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করব, আত্মবিক্রয় করে দেব?” সুভাষের প্রত্যুত্তর। পিতার যুক্তি— দশ বছরের মধ্যে ভারত স্বায়ত্তশাসন (হোম রুল) পেতে চলেছে। সংশয়ী পুত্রের যুক্তি— সেটা ঘটবে একমাত্র যদি ভারতীয়রা তার জন্য যথেষ্ট মূল্য ধরে দেয়। “একমাত্র ত্যাগ আর ক্লেশ স্বীকারের ভিত্তির উপরেই জাতীয় সৌধ তৈরি করা সম্ভব।” সুভাষ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছিলেন, “ভারতে সমগ্র ব্রিটিশ শাসনকালে এক জন ব্যক্তিও দেশসেবার ইচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সিভিল সার্ভিসের কাজ বর্জন করেননি।” “অথচ এই সার্ভিসের সদস্যরা যদি তাঁদের আনুগত্য অস্বীকার করেন, কিংবা এমনকী অস্বীকার করার ইচ্ছেটুকুও পোষণ করেন— কেবলমাত্র তা হলেই আমলাতন্ত্রের যন্ত্র ভেঙে পড়তে পারে।”৬৩
সুভাষ যখন নিজের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে এমন বিষম সংকটে, ভারতে তখন শুরু হয়েছে মহাত্মা গাঁধীর অসহযোগ আন্দোলন। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসী ভারতীয় হিসেবে দুই দশক থেকে এসেছেন মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, সেখানে অহিংস বিরোধিতার পথপ্রদর্শক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন, দেশে ফিরেছেন ১৯১৫ সালে। ১৯১৭ আর ১৯১৮ সালে তাঁর নিজের রাজ্য গুজরাতে দুটি স্থানীয় অহিংস আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বিহারের চম্পারন জেলায় ইউরোপীয় নীলচাষিদের বিরুদ্ধেও একটি আন্দোলন করেছেন। যুদ্ধের শেষে গণ-অংশগ্রহণের রাজনীতির মাধ্যমে প্রথম সর্বভারতীয় সত্যাগ্রহ (“সত্যের সন্ধান”) শুরু করলেন তিনি। যুদ্ধের সময়কার আপত্কালীন নির্দেশ বা অর্ডিন্যান্সকে শান্তির সময়ে আইনে রূপান্তরিত করে ভারতীয়দের বিনা বিচারে বন্দি করার যে পদক্ষেপ করে ব্রিটিশ সরকার, গাঁধীর নিজের ভাষায় সেই “দানবীয়” অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘোষিত হল এই আন্দোলন। তুরস্কে খলিফার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায় তখন উদ্বিগ্ন, বিক্ষুব্ধ, তাঁদের সমর্থন নিয়ে ১৯২০-র মধ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃপদে আরোহণ করলেন তিনি। দলের নির্দেশে গণবিক্ষোভ শুরু হল, শুরু হল বয়কট, বিলিতি কাপড়, বিদ্যালয়, আদালত, প্রতিনিধিত্ব-সূচক প্রতিষ্ঠান বর্জন।
সুভাষের বাবা মনে করতেন, এই আন্দোলনের তথাকথিত নেতারা মোটেও পুরোপুরি স্বার্থলেশহীন নন। কিন্তু সেই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে কি তিনি সুভাষকে সচেতন, প্রত্যক্ষ ত্যাগের পথে স্বার্থহীন ভাবে এগোতে বাধা দিতে পারেন? সুভাষ বুঝতে পারছিলেন না, কী ভাবে বাবাকে বোঝাবেন যে, সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বেরিয়ে আসার এই দিনটি তাঁর জীবনের “সবচেয়ে অহঙ্কারের, সবচেয়ে খুশির দিন”। শরৎ নরম সুরে প্রস্তাব করলেন, হয়তো দেশে ফিরে পদত্যাগ করাটাই ভাল হবে। সুভাষ সে কথা শুনতেই রাজি নন। “দাসত্বের প্রতীক চুক্তিপত্রে সই করা” তাঁর পক্ষে “অত্যন্ত পীড়াদায়ক”। আবার শরতের মতে, যে আন্দোলনে ভাই যোগ দিতে চাইছেন, সেই আন্দোলন তখনও “অবয়বহীন, বিশৃঙ্খল।” সুভাষ যুক্তিটি তাঁর দিকেই ঘুরিয়ে দিলেন: ঠিক সেই কারণেই, “বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই” তো তিনি ঝাঁপ দিতে চান, আন্দোলন “বিফল হয়ে পড়তে পারে, শিথিল হয়ে যেতে পারে,” সেই ভয়েই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চান। যদি নিজের মত কোনও কারণে পাল্টান, “অশান্তি থেকে মুক্ত হতে” বাবাকে তার পাঠিয়ে দেবেন সুভাষ।৬৪
১৯২১ সালের ২০ এপ্রিল সুভাষ শরত্কে জানালেন, “আগামী পরশু” তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। মেজদাদার “উদার মনোভাব” তাঁকে মুগ্ধ করেছিল, এর থেকে “বেশি আন্তরিক ও সমমর্মী প্রতিক্রিয়া” আর কী-ই বা হতে পারত। “কত মানুষকে দুঃখ দিলাম, সে কথা আমি জানি,” লিখলেন সুভাষ, “কত গুরুজনের কথা অমান্য করলাম। কিন্তু এই বিপদময় যাত্রার মুখে দাঁড়িয়ে আমার একমাত্র প্রার্থনা— আমাদের প্রিয় জন্মভূমির পক্ষে যেন এ কাজ শুভ হয়।”৬৫ যা যা তিনি এত কাল ধরে অর্জন করেছেন, সব ছাড়তে এখন প্রস্তুত সুভাষ, অনিশ্চিত পথে পা বাড়াতে প্রস্তুত। ব্রিটিশ রাজের চৌহদ্দির বাইরে তাঁর জায়গা হল এই সিদ্ধান্তের ফলে, এবং তাঁর জীবনও অন্য পথে ঘুরে গেল। ১৯২১-এর ২২ এপ্রিল, কেম্ব্রিজের ১৬ হারবার্ট স্ট্রিটের বাড়ি থেকে সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় সিভিল সার্ভিস থেকে অব্যাহতি চেয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলেন ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেট ই এস মন্টাগুর কাছে।৬৬
“দান ফেলা হয়ে গেল।” পর দিন শরত্কে লিখলেন সুভাষ। “আমার ঐকান্তিক আশা, এতে মঙ্গলই হবে।” তিনি “যে পথই নেবেন,” শরৎ যদিও “তার জন্যই তাঁর উষ্ণতম অভিনন্দন” পাঠিয়ে রেখেছিলেন, সুভাষ জানতেন, তিনি তাঁর বাবার কথা অমান্য করেছেন, মেজদাদার উপদেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। মনে হয়েছিল, আবারও তাঁর অবস্থানের পক্ষে কিছু বলা দরকার। ক্রমে তাঁর বিশ্বাস জন্মেছে, “আপস ব্যাপারটা ভাল নয়। এতে মানুষকে নীচে নামতে হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার লক্ষ্যও।” নরমপন্থী কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যে পথ ধরে এগোচ্ছিলেন, সুভাষের তাতে একেবারেই মত ছিল না। এডমন্ড বার্ক-এর অনুসারে সুবিধা আদায়ের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন সুরেন্দ্রনাথ, এই পথে চলে জীবনের উপান্তে এসে ব্রিটিশের কাছ থেকে নাইটহুড উপাধি পর্যন্ত অর্জন করতে পেরেছিলেন। সুভাষের কিন্তু দৃঢ় মত: আমরা একটি নতুন জাতিরাষ্ট্র তৈরি করতে চলেছি, এবং একমাত্র হ্যাম্পডেন ও ক্রমওয়েলের আপসহীন আদর্শবাদের মাধ্যমেই তা করা সম্ভব।” তাই, “ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যে কোনও রকম সংযোগ থেকে শতহস্ত দূরে থাকার” সময় এসে গিয়েছে। এই সরকারকে অস্বীকার করার একমাত্র পথ এই সরকারকে সর্বপ্রকারে ত্যাগ করা। এ তো কেবল গাঁধীর মুখে টলস্টয়ের তত্ত্ব নয়, এ সুভাষের নিজস্ব গভীর বিশ্বাস। সম্প্রতি মায়ের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়ে ভারী খুশি হয়েছিলেন তিনি। মা জানিয়েছিলেন, তাঁর পিতা ও অন্যান্যরা যা-ই মনে করুন না কেন, “মহাত্মা গাঁধী যে আদর্শের কথা বলেন”, তাঁর নিজেরও সেটাই পছন্দ। চিত্তরঞ্জন দাশ জানিয়েছিলেন, দেশে একনিষ্ঠ দেশকর্মীর অভাব। ফিটজউইলিয়াম হল-এর প্রধান মিস্টার রেডাওয়ে এক দিন সুভাষকে কেম্ব্রিজে পড়াশোনা শুরুর অনুমতি দিয়েছিলেন, আজ তিনিই আবার তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা শুনে “সর্বান্তঃকরণে অনুমোদন” জানালেন।৬৭
ক্ষমতার অলিন্দে সুভাষের এই পদত্যাগ নিয়ে হতাশার দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেল। পরের দু’-এক মাস জুড়ে তাঁর উপর চলল মত পাল্টানোর জোরাজুরি। অনেক দিন আগে উড়িষ্যায় কিছু কাল কাটিয়ে এসেছিলেন ভারতের পার্মানেন্ট আন্ডারসেক্রেটারি অব স্টেট স্যার উইলিয়াম ডিউক, সেই সময়ে তাঁর কিছু যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল এই পরিবারের সঙ্গে, এখন সেই যোগাযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন তিনি, সুভাষের জ্যেষ্ঠ ভাই সতীশকে চিঠি লিখলেন। কেম্ব্রিজের অধ্যাপকরাও সুভাষকে সিদ্ধান্ত পাল্টানোর অনুরোধ করলেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, কেম্ব্রিজের সেক্রেটারি অব দ্য সিভিল সার্ভিস বোর্ড-এর সেক্রেটারি মিস্টার রবার্টসও মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন। কিছু দিন আগেই “ভারতে অশ্বের পরিচর্যা” বিষয়ে আই সি এস শিক্ষানবিশিদের যে সব নির্দেশ পাঠানো হয়, তা নিয়ে সুভাষের সঙ্গে এই সেক্রেটারির সংঘর্ষ উপস্থিত হয়। অদ্ভুত সব কথাবার্তা ছিল তাতে, যেমন ঘোড়া ও ঘোড়ার সহিসরা ভারতে একই খাবার খেয়ে থাকে, কিংবা ভারতীয় বণিকরা সকলেই চূড়ান্ত অসাধু ইত্যাদি। সুভাষ এই সব মন্তব্যের প্রতিবাদ জানালে মিস্টার রবার্টস জানান, সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি মানতে না পারলে সুভাষ যেন “বিদায় নেন”। তাঁর উপদেশ, সুভাষ যেন কোনও ভাবে “দোষ খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টায় না থাকেন”। সুভাষের উত্তর, তিনি তো “দোষ খুঁজে বেড়াননি”, নির্দেশগুলি তো তাঁর সামনেই শোভা পাচ্ছিল। পদত্যাগের খবর শোনার পর অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য এক মিস্টার রবার্টসকে দেখলেন সুভাষ: এই মানুষটি ভারী সহৃদয়, ধৈর্য ধরে অনেকক্ষণ যুক্তি দিয়ে সুভাষকে বোঝালেন, অন্তত বছর-দুয়েকের জন্য এই চাকরিতে যোগ দিতে। এই উদ্বেগের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানালেন সুভাষ, কিন্তু এও বলে দিলেন যে তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন। “দুই জন মনিবের সেবা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব।”৬৮
১৮ মে, ১৯২১, সুভাষ শরত্কে বললেন যে স্যার উইলিয়াম ডিউককে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত তাঁর “সুচিন্তিত ভাবনারই” ফল। ১ জুন তাঁর ট্রাইপস পরীক্ষা শেষ হবে, তার পর জুনের শেষ কিংবা জুলাই-এর গোড়াতেই তিনি মার্সেই বন্দর থেকে দেশের জন্য জাহাজ ধরবেন। যেই পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়ে যাবে, তখনই তিনি নিপ্পন ইয়াসেন কায়সা জাহাজে টিকিট কিনবেন।৬৯ ২২ এপ্রিল ১৯২১ তারিখে লেখা তাঁর সেই পদত্যাগপত্র অবশ্য নেহাতই সাদামাটা। “ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের তালিকা থেকে (তাঁর) নাম সরিয়ে দেওয়ার” অনুরোধ ছিল সেখানে। ১০০ পাউন্ডের যে ভাতা পেয়েছিলেন, “পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়ে যাওয়ামাত্রই” তিনি তা ফিরিয়ে দেবেন।৭০ যে দিন তিনি সেই পদত্যাগপত্র পাঠালেন, সে দিনই কলেজের এক পুরনো বন্ধুকে একটি চিঠি লেখেন সুভাষ। সেই চিঠিটিতে বরং ধরা থেকে যায় সে দিনের সেই মুহূর্তটির অসামান্যতা:
তুমি জানো কর্তব্যের আহ্বানে এক বার জীবনতরী ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। সেই তরী এখন রম্যকাননে উপনীত হয়েছে যেখানে Power, Property, Wealth করতলগত। কিন্তু হৃদয়ের অন্তঃস্তল থেকে সাড়া আসছে— “তোমার এতে আনন্দ নাই। তোমার একমাত্র আনন্দ— সাগরের ঊর্মিমালার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে বেড়ানো।”
সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজ তাঁরই হাতে জীবন-তরী ভাসিয়ে দিলাম। তিনি জানেন, এ তরী কোথায় পৌঁছবে।
.
১. জানকীনাথ বসু, ডায়রি, ২৩ জানুয়ারি, ১৮৯৭ (এন আর বি)।
২. “দ্য ফেমিন ইন ইন্ডিয়া,” দ্য টাইমস্, ২৩ জানুয়ারি, ১৮৯৭।
৩. রমেশচন্দ্র দত্ত, দি ইকনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া ইন দ্য ভিক্টোরিয়ান এজ: ফ্রম দি অ্যাকসেশন অব কুইন ভিক্টোরিয়া ইন ১৮৩৭ টু দ্য কমেন্সমেন্ট অব দ্য টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি, দ্বিতীয় খণ্ড (নিউ ইয়র্ক: অগাস্টাস এম কেলি, ১৯৬৯; প্রথম সংস্করণ ১৯০৪), পৃ: v.
৪. মাইক ডেভিস, লেট ভিক্টোরিয়ান হলোকস্টস্: এল নিনো ফেমিনস্ অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড (নিউ ইয়র্ক: ভার্সো, ২০০১)।
৫. এম জি রানাডে, মিসলেনিয়াস রাইটিংস্ অব দ্য লেট অনারেবল মিস্টার জাস্টিস এম জি রানাডে, রমাবাঈ রানাডে [সম্পাদিত] (দিল্লি: সাহিত্য অকাদেমি, ১৯৯২), পৃ: ১৮০।
৬. উইলিয়ম ডিগবি, “প্রসপারাস” ব্রিটিশ ইন্ডিয়া: আ রিভিলেশন ফ্রম অফিশিয়াল রেকর্ডস্ (লন্ডন: টি এফ আনউইন, ১৯০১)।
৭. ডেভিস, লেট ভিক্টোরিয়ান হলোকস্টস্, পৃ: ১৫৮।
৮. সুভাষচন্দ্র বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম: অ্যান আনফিনিশড্ অটোবায়োগ্রাফি অ্যান্ড লেটারস্ টু ১৯২১, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, কালেকটেড ওয়ার্কস্, প্রথম খণ্ড, শিশিরকুমার বসু এবং সুগত বসু [সম্পাদিত] (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো; দিল্লি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৭), পৃ: ৩। আসল পাণ্ডুলিপিটি নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো-র মহাফেজখানায় সংরক্ষিত।
৯. তদেব, পৃ: ১৫।
১০. তদেব, পৃ: ১৯।
১১. তদেব, পৃ: ৫। শিশিরকুমার বসু, “মাই মাদার’স্ ফেস,” দি ওরাকল, ১৮, ৩-৪ নম্বর (জুলাই-অক্টোবর ১৯৯৬), ২।
১২. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ২২-২৩।
১৩. তদেব, পৃ: ২৫-২৭।
১৪. রণজিৎ গুহ, “ন্যাশনালিজম অ্যান্ড দ্য ট্রায়ালস্ অব বিকামিং,” দি ওরাকল, ২৪, ২ নম্বর (অগস্ট ২০০২), পৃ: ১১।
১৫. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৩৪-৩৫।
১৬. তদেব, পৃ: ৩৫-৩৬; গুহ, “ন্যাশনালিজম”।
১৭. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৩৬-৩৮, ৪৮; গুহ, “ন্যাশনালিজম,” পৃ: ১৫-১৭।
১৮. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৩৯-৪০, ৪৯-৫০।
১৯. তদেব, পৃ: ৪৫।
২০. তদেব, পৃ: ৩৮।
২১. গুহ, “ন্যাশনালিজম,” পৃ: ১৬।
২২. সুভাষচন্দ্র বসু, প্রভাবতী বসুকে লেখা চিঠি, ১৯১২, বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ১৪৩। মা’কে লেখা সুভাষচন্দ্রর মূল বাংলা চিঠিগুলি নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো-র মহাফেজখানায় সংরক্ষিত আছে।
২৩. সুভাষচন্দ্র বসু, প্রভাবতী বসুকে লেখা চিঠি, ১৯১২, তদেব, পৃ: ১২৮, ১৩৬-১৩৮, ১৪৪।
২৪. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ২২ অগস্ট, ১৯১২; তদেব, ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯১২; তদেব, ১১/১৬ অক্টোবর, ১৯১২; তদেব ৮ জানুয়ারি, ১৯১৩; প্রতিটি তদেব, পৃ: ১৪৮-১৫৬। মেজদাদা শরত্কে লেখা সুভাষের মূল ইংরেজি চিঠিগুলি নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর মহাফেজখানায় সংরক্ষিত। যে লাইনগুলি তিনি ওয়াশিংটন আরভিন থেকে উদ্ধৃত করেছিলেন, সেগুলি রয়েছে আরভিন, দ্য স্কেচবুক অব জিওফ্রে ক্রেয়ন: দ্য ভয়েজ, প্রথম প্রকাশিত ১৮১৯-১৮২০। পনেরো বছর বয়সেই সুভাষ যে কত কিছু পড়ে ফেলেছিলেন, এটি তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ।
২৫. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৪৯-৫০।
২৬. তদেব, পৃ: ৫১।
২৭. সুভাষচন্দ্র বসু, প্রভাবতী বসুকে লেখা চিঠি, মার্চ ১৯১৩, তদেব, পৃ: ১৪৮।
২৮. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৫১, ৫৩।
২৯. তদেব, পৃ: ৫৪।
৩০. তদেব, পৃ: ৬৩-৬৪।
৩১. তদেব, পৃ: ৬৭।
৩২. তদেব, পৃ: ৬৮-৬৯, ৭১।
৩৩. তদেব, পৃ: ৭৪।
৩৪. দিলীপকুমার রায়, নেতাজি, দ্য ম্যান: রেমিনিসেন্সেস (মুম্বই: ভারতীয় বিদ্যা ভবন, ১৯৬৬), পৃ: ১০।
৩৫. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৭৬-৭৭; “ডিসিপ্লিন ইন প্রেসিডেন্সি কলেজ: গভর্নমেন্ট স্টেটমেন্ট অ্যান্ড রিপোর্ট অব দি এনকোয়্যারি কমিটি,” শিশিরকুমার বসু (সম্পাদিত), নেতাজি অ্যান্ড ইন্ডিয়া’জ ফ্রিডম (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, ১৯৭৫), পৃ: ৩৯-৫৩; গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন, জুন ১৯১৬, ১২২-১২৭ নম্বর; আরও দ্রষ্টব্য, গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, এল/পি অ্যান্ড জে/১৮৬১/১৯১৬ (আই ও আর, বি এল)।
৩৬. এডওয়ার্ড ফারলে ওটেন, “দ্য বেঙ্গল স্টুডেন্ট অ্যাজ আই নিউ হিম,” বসু, নেতাজি অ্যান্ড ইন্ডিয়া’জ ফ্রিডম, পৃ: ৩৩।
৩৭. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৭৭-৭৮।
৩৮. তদেব, পৃ: ৭৭, ২৩৩; কৃষ্ণা বসু, “বাসন্তী দেবীর কাছে শোনা কাহিনি,” প্রসঙ্গ সুভাষচন্দ্র (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৩), পৃ: ৫৭; শিশিরকুমার বসুর সঙ্গে লেখকের কথোপকথন।
৩৯. “ডিসিপ্লিন ইন প্রেসিডেন্সি কলেজ,” বসু, নেতাজি অ্যান্ড ইন্ডিয়া’জ ফ্রিডম, পৃ: ৪৮।
৪০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস্ অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন টিচারস্,” মডার্ন রিভিউ (এপ্রিল, ১৯১৬); একই ধরনের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা বাংলা প্রবন্ধ সবুজ পত্র মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
৪১. “ডিসিপ্লিন ইন প্রেসিডেন্সি কলেজ,” বসু, নেতাজি অ্যান্ড ইন্ডিয়া’জ ফ্রিডম, পৃ: ৫০। এনকোয়্যারি কমিটির সদস্যদের মধ্যে তিন জন ব্রিটিশ আর দু’জন ভারতীয় সদস্য ছিলেন। ভারতীয় সদস্যদের মধ্যে এক জন, হেরম্বচন্দ্র মৈত্র, এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী ছিলেন। আরও দ্রষ্টব্য, গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন, জুন ১৯১৬, ১২২-১২৭ নম্বর; গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, এল/পি অ্যান্ড জে/১৮৬১/১৯১৬ (আই ও আর, বি এল)।
৪২. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৭৯-৮০।
৪৩. দ্রষ্টব্য কৃষ্ণা বসু, “দ্য প্রফেসর হু মেড আ ভার্ব,” দ্য স্টেটস্ম্যান, ৩১ অক্টোবর, ১৯৭১।
৪৪. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৮২-৮৫।
৪৫. তদেব, পৃ: ৮৮-৮৯।
৪৬. স্কটিশ চার্চেস কলেজ ম্যাগাজিন, ৮, ৫ নম্বর, (মার্চ ১৯১৮), ২১৮-২১৯; তদেব, ৯, ২ নম্বর (সেপ্টেম্বর ১৯১৮), ৫৯-৬০।
৪৭. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ৯১-৯২।
৪৮. তদেব, পৃ: ৯৭-৯৮।
৪৯. তদেব, পৃ: ৯৯-১০১, ১০৫। কেমব্রিজে থাকাকালীন সুভাষচন্দ্রর পড়া বইগুলি নিয়ে আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য লিওনার্ড এ গর্ডন, ব্রাদার্স এগেনস্ট দ্য রাজ: আ বায়োগ্রাফি অব ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিস্টস্ শরৎ অ্যান্ড সুভাষ চন্দ্র বোস (নিউ ইয়র্ক: কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯০), পৃ: ৫৬, ৬৩।
৫০. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ১০১-১০৪।
৫১. সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীমতী ধর্মবীরকে লেখা চিঠি, ৭ মে, ১৯২১।
৫২. রায়, নেতাজি, পৃ: ১৬১-১৬২।
৫৩. সুভাষচন্দ্র বসু, চারুচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা চিঠি, ২৩ মার্চ, ১৯২০, বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ২০৫-২০৬।
৫৪. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ১০৫-১০৬।
৫৫. ফাইল এল/পি অ্যান্ড জে/৬২৩৮/২০ (আই ও আর, বি এল)।
৫৬. গুহ, “ন্যাশনালিজম,” পৃ: ১৯।
৫৭. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯২০, বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ২০৬-২০৯। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে শরত্কে লেখা সুভাষের আসল চিঠিগুলির প্রত্যেকটি নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো-র মহাফেজখানায় সংরক্ষিত আছে।
৫৮. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ২৬ জানুয়ারি, ১৯২১, তদেব, পৃ: ১০৯-১১০।
৫৯. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২১৭-২১৯।
৬০. সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে লেখা চিঠি, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২১০-২১৪।
৬১. সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে লেখা চিঠি, ২ মার্চ, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২১৪-২১৭।
৬২. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২১৯-২২২।
৬৩. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ৬ এপ্রিল, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২২২-২২৫।
৬৪. তদেব, পৃ: ২২৫-২২৭।
৬৫. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ২০ এপ্রিল, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২২৭-২২৯।
৬৬. সুভাষচন্দ্র বসু, ই এস মন্টেগু, সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়াকে লেখা চিঠি, ২২ এপ্রিল, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২২৯। আসল চিঠিটি পাওয়া যাবে এল/পি অ্যান্ড জে/৬২৩৮/২০ (আই ও আর, বি এল)।
৬৭. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ২৩ এপ্রিল, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২৩০-২৩৬।
৬৮. বসু, অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম, পৃ: ১১৫-১১৭।
৬৯. সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি, ১৮ মে, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২৩৬-২৩৭।
৭০. সুভাষচন্দ্র বসু, ই এস মন্টেগু, সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়াকে লেখা চিঠি, ২২ এপ্রিল, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২২৯।
৭১. সুভাষচন্দ্র বসু, চারুচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা চিঠি, ২২ এপ্রিল, ১৯২১, তদেব, পৃ: ২৩০।
