Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
দেশনায়ক : সুভাষচন্দ্র বসু ও ভারতের মুক্তি সংগ্রাম – সুগত বসু
দেশনায়ক : সুভাষচন্দ্র বসু ও ভারতের মুক্তি সংগ্রাম – সুগত বসু
0/9
দেশনায়ক : সুভাষচন্দ্র বসু ও ভারতের মুক্তি সংগ্রাম – সুগত বসু

একক বিদ্রোহী ও এক যুধ্যমান বিশ্ব

এই হল আত্মার সার কথা। ব্যক্তিকে প্রাণ উৎসর্গ করতে হয় যাতে জাতি বেঁচে থাকতে পারে। আজ আমাকে প্রাণ উৎসর্গ করতেই হবে, যাতে ভারতবর্ষ বেঁচে থাকে এবং স্বাধীনতার গৌরব অর্জন করতে পারে।

সুভাষচন্দ্র বসু, “মাই পলিটিক্যাল টেস্টামেন্ট”, ২৬ নভেম্বর, ১৯৪০

.

লন্ডন, ১৯৪০— ব্রিটেনে যুদ্ধ শুরু হয়েছে পূর্ণোদ্যমে। ভারতের সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা কিন্তু প্রবলতম প্রতিরোধী মানুষটিকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলের খাঁচায় রেখে দিয়ে নিশ্চিন্তেই রয়েছেন। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন সুভাষ। কোন পথে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সম্ভাবনা তৈরি করা যায়, এই চিন্তা থেকেই তাঁর মাথায় এসেছিল বাংলার ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্রের সামনে যে হলওয়েল মনুমেন্টটি শোভা পাচ্ছে, সেটিকে উত্খাত করার লক্ষ্যে এক আন্দোলনের কথা। এই মনুমেন্ট এক দিন তৈরি হয়েছিল কলকাতার প্রবাদসম “ব্ল্যাক হোল” ঘটনার স্মারক হিসেবে— শোনা যায়, নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার আমলে ব্রিটিশ যুদ্ধবন্দিদের নাকি একটি ছোট ঘরে আটকে রেখে মেরে ফেলা হয়। বাংলার হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই অবশ্য মনে করতেন, ১৭৫৭ সালে রবার্ট ক্লাইভের কাছে পরাজিত হন বাংলার যে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা, তাঁর সম্মানহানির লক্ষ্যেই এই প্রবাদ-কাহিনির প্রচলন। সে যা-ই হোক, ১৯৪০-এর ২ জুলাই কলকাতায় আইন অমান্য আন্দোলন শুরুর ঠিক আগের দিন দেশদ্রোহের অভিযোগে ভারত প্রতিরক্ষা আইন মোতাবেক সুভাষকে গ্রেফতার করা হল। হিন্দু, মুসলিম— দুই সম্প্রদায়ই প্রবল বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল এতে। বিক্ষোভের ধাক্কায় সরকার ওই মনুমেন্টটি উঠিয়ে নিয়ে জনচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে দিতে বাধ্য হল। কী আর করা, যুদ্ধ চলাকালীন সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর অগ্নিগর্ভ বক্তব্য বা কাজকর্ম যদি বন্ধ রাখতে হয়, এইটুকু দাম তো দিতেই হবে।

সুভাষের মনে অবশ্য তখন অন্য ভাবনা। ১৯৪০ সালের ২৯ নভেম্বর জেলে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অনশন ধর্মঘট শুরু করলেন তিনি: “মুক্তি দিন, নয়তো আমি মৃত্যু বরণ করব।” ঠিক তিন দিন আগেই একটি দীর্ঘ তেরো-পৃষ্ঠা হাতে-লেখা চিঠি লিখেছেন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নরকে, বলেছেন এটিই তাঁর “রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র”। চিঠির প্রথমে ও শেষে দুটি অনুরোধ। চিঠি আরম্ভ হচ্ছে এই বলে যে এটি যেন “সরকারের দস্তাবেজখানায় সযত্নে রক্ষিত হয়, ভবিষ্যতে আমার যে সব দেশবাসী আপনাদের জায়গা গ্রহণ করবেন, তাঁরা যেন এটা হাতে পান।” দেশবাসীর প্রতি তাঁর স্পষ্ট বার্তা: “একটি আদর্শের জন্য কোনও ব্যক্তিতার প্রাণ দিতেই পারে, কিন্তু তার মৃত্যুর পরও সেই আদর্শ থেকেই যায়, সহস্র জীবনের মধ্য দিয়ে তা নবজীবন লাভ করে।” দীর্ঘ উক্তিটি ক্রমে পরিণত হয় তীব্র আর্তির স্বরে, কাব্যিক ছন্দোময়তায় উচ্চারিত হয় এক আদর্শের অনুসন্ধান, যে অনুসন্ধান এক দিন “ক্লেশ ও আত্মত্যাগের” মাধ্যমে পূর্ণ হয়ে উঠবে মহান আদর্শে :

কোনও একটি আদর্শের জন্য প্রাণ ধারণ এবং মৃত্যু বরণের থেকেও বড় কোনও পূর্ণতার অনুভূতি কি হওয়া সম্ভব? কোনও মানুষ যদি জানে যে তার অসম্পূর্ণ কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে এগিয়ে আসছে আরও বহু জীবন, তার চেয়ে বড় সন্তোষ আর কীসেই-বা থাকতে পারে? পাহাড় উপত্যকা সমভূমি পেরিয়ে তার বার্তা দিকে দিগন্তরে ছড়িয়ে পড়বে, এ কথা নিশ্চিত ভাবে জানার পর আর কোন্ উপহার মানুষ আশা করতে পারে? নিজেরই আদর্শের চরণমূলে নিজেকে শান্তিপূর্ণ ভাবে বলি দেওয়ার থেকে বড় সম্পূর্ণতা জীবনে আর কী-ই বা হতে পারে?

জীবনের চেয়েও প্রিয় সেই আদর্শ তাঁর কাছে, তাঁর দেশবাসীর স্বাধীনতা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে ঐক্যের ভিত্তিতে স্বাধীনতা। সরকার যেন হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ঘটানোর প্রয়াস ত্যাগ করে, তাঁর সহযোদ্ধারা যেন জীবনেও “অবিচার ও অন্যায়ের সঙ্গে আপস” না করেন, এই তাঁর দাবি। “ক্লেশ ও আত্মত্যাগের পথে চললে কারও পরাজয় ঘটতে পারে না”: “যদি বা ‘পার্থিব’ জগতে পরাজয় ঘটেও, অপার্থিব যে পরজীবন, সেখানে সে জয়ী হবেই।”২

দ্বিতীয় অনুরোধটি রইল চিঠির শেষে। সরকারকে তাঁর অনশনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে বললেন তিনি। মনে করিয়ে দিলেন, অন্যান্য কত ক্ষেত্রে অন্যান্য কত ব্যক্তি রাজনৈতিক আদর্শের তাড়নায় সরকারের বিরুদ্ধে অনশন করেছেন— আয়ার্ল্যান্ডে টেরেন্স ম্যাকসুইনি, ১৯২৯ সালে লাহোর জেলে যিনি মৃত্যুবরণ করেন সেই যতীন দাস, স্বয়ং মহাত্মা গাঁধী, এবং তাঁর নিজের ১৯২৬ সালের অনশন। আর একটি পৃথক চিঠিতে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে আবেদন জানালেন, জোর করে তাঁকে খাওয়ানোর নির্দেশ না দিতে, সতর্ক করলেন, তাঁর অনশন কোনও সাধারণ অনশন নয়, “কয়েক মাসের বহু চিন্তাভাবনার পর কালীপূজার পবিত্র দিনটিতে প্রার্থনার সময়” এই সিদ্ধান্তে তিনি এসেছেন।৩

বাংলার সরকার স্বভাবতই তার নিজ দায়িত্বে সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু ঘটাতে অনিচ্ছুক। ১৯৪০-এর জুলাই থেকে ভাইসরয় লিনলিথগো তাঁর গভর্নর জন হারবার্টকে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন, যে কোনও ভাবে সুভাষকে জেলে বন্দি রাখতে হবে। এই প্রদেশে তখন কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লিগের যুগ্ম মন্ত্রিসভা। অগস্টে মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হককে শরৎচন্দ্র বসু একটি চিঠি দিলেন, তাতে রইল তাঁর ভাই সুভাষ-সহ সব রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি। হারবার্ট “হককে উপদেশ দিলেন, খুব সন্তর্পণে একটি উত্তর দিতে (যদি আদৌ দিতে চান), কেননা আবেগের বশে কী-যে তিনি লিখে ফেলবেন, তার ঠিক নেই।”৪ বাংলার অসাধারণ কৃষক নেতাটির সম্পর্কে এমনই ভাবতেন তিনি। আর পাশাপাশি, মুসলিম লিগের খোজা নাজিমুদ্দিন সম্পর্কে আরও কয়েক গুণ বেশি অবজ্ঞা মিশিয়ে কথা বলতেন। নাজিমুদ্দিন তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তাঁরই হাতে প্রদেশের আইনশৃঙ্খলার ভার। লিনলিথগোর কাছে হারবার্ট জানালেন, সুভাষকে অভিযুক্ত করার ব্যাপারে নাজিুমদ্দিন খুবই “সন্ত্রস্ত”। সিমলায় নাজিমুদ্দিন ভাইসরয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলে এই মুসলিম নেতাকে দেখে তাঁরও একই কথা মনে হল, “অত্যন্ত টলোমলো ভাব, সব কিছু নিয়েই যেন ভয়ে কাঁটা” সুভাষের ব্যাপারে তো বটেই। ভাইসরয় ও গভর্নর একমত, সুভাষকে আপাতত বন্দি রাখাই দরকার। এ দিকে সরকার তাঁর প্রার্থীপদ অস্বীকার করার জন্য যা যা সম্ভব সবই করে যাওয়া সত্ত্বেও জেলে বসেই সুভাষ ঢাকা নির্বাচনী অঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় আইনসভার জন্য নির্বাচিত হয়ে গেলেন। ১৯৪০-এর ২০ সেপ্টেম্বর হারবার্ট একটি অদ্ভুত রিপোর্ট পাঠালেন, যাতে লেখা “বেশ ষোড়শোপচারে খাওয়াদাওয়া সত্ত্বেও” সুভাষ বসু “কিন্তু জেলে আসার পর ২৪ পাউন্ড ওজন কমিয়ে ফেলেছেন।” ২৯ নভেম্বর সুভাষ খাদ্যগ্রহণ একেবারেই থামিয়ে দেওয়ার পর হারবার্টের প্রত্যয় ও দৃঢ়তা দুই-ই বড় রকম ধাক্কা খেল।

আমরণ অনশন শুরু করার ঠিক এক সপ্তাহ পর, ৫ ডিসেম্বর হারবার্ট ঠিক করলেন জেলে সুভাষের মৃত্যুবরণ ঠেকানোর জন্য তাঁকে অ্যাম্বুল্যান্সে চাপিয়ে বাড়ি ফেরত পাঠানোই ভাল। যে-ই তাঁর স্বাস্থ্য একটু ফিরবে, অমনি না-হয় তাঁকে আবার গ্রেফতার করা যাবে। এত ফন্দি আঁটতে হারবার্টের মনে গভীর অনিচ্ছা, কিন্তু “জেল সুপারিন্টেন্ডেন্ট যা লিখছেন তার পর এ ছাড়া কোনও উপায়ও তো দেখছি না।” সুপারিন্টেন্ডেন্ট এই অসুস্থ বন্দিকে জোর করে খাওয়ানোর দায় নিতে ঘোর অরাজি। ৬ ডিসেম্বর ভাইসরয় লিনলিথগো লন্ডনে ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেট-কে জানালেন যে তিনি আশা করছেন, তিন সপ্তাহ সুভাষ মোটের উপর চুপচাপ থাকবেন, তার পর বাংলার গভর্নর আবার “বেড়ালের ইঁদুর ধরার” কায়দায় তাঁকে জেলে পুরে ফেলবেন।৫ “আর আবার অনশন শুরু করলে,” ১১ ডিসেম্বর হার্বার্ট লিনলিথগোকে খুশিমনে জানালেন, “বেড়াল-ইঁদুর খেলা চলতেই থাকবে— তাতে সুভাষ কোনও বিপদ ঘটাতেও পারবেন না, আবার বুঝতেও পারবেন, অনশন করে কোনও লাভ নেই।”৬

৫ ডিসেম্বর দুর্বল অশক্ত সুভাষকে স্ট্রেচারে করে ৩৮/২ এলগিন রোডের তিনতলা পৈতৃক বাড়িটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ১৯৩৪-এ জানকীনাথ বসুর মৃত্যু হয়েছে, সদর দরজার কাছাকাছি মাঝের তলার তাঁর বাবার ব্যবহৃত শয়নঘরটিতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হল। তবে চার ধারে ছত্রী লাগানো জানকীর নিজের বিরাট খাটটি খালিই পড়ে রইল, সুভাষ একটি ছোট খাটে শুতেই মনস্থ করলেন। বিরাট আলোকোজ্জ্বল ঘর। তিন পাশে সাতটি রঙিন শার্সি লাগানো বড় বড় জানলা। পরিবারের পূর্বসূরিদের তৈলচিত্রের সঙ্গে শোভা পাচ্ছে কালীমাতার একটি বড় ছবিও: সুভাষ এ সবের সঙ্গে নিজের পছন্দের জায়গা অস্ট্রীয় পার্বত্য রিসর্ট বাডগাস্টাইনের ছবিও দেওয়ালে লাগিয়ে দিলেন।৭ মার্বল-এর মেঝের এক দিকে পুজোর আসন হিসেবে একটি বাঘছাল বিছানো। নিচু বইয়ের তাকে রাখা ভগবদ্গীতা। সুভাষের বৃদ্ধা মাতা প্রভাবতী থাকেন পাশের ঘরটিতেই, তবে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে মাঝের দরজা বন্ধই রাখা হয়। ইলা নামে এক ভ্রাতুষ্পুত্রীর ঘরও ওই তলাতেই, কাকার শরীরের দিকে নজর রাখবে সে। পরিবারের অন্যান্যরা রয়েছেন বাড়ির উপরের তলায়। গোটা বাড়িতে সারাদিন ধরে মানুষের গুঞ্জন, কখনও সাংসারিক, কখনও রাজনৈতিক।

সরকারের “বেড়াল-ইঁদুর খেলার” সুবিধের জন্য ৩৮/২ এলগিন রোডের চার পাশ নিরাপত্তা বলয় দিয়ে ঘিরে দেওয়া হল। হারবার্ট সকলকে বোঝালেন যে সরকার “ভারত প্রতিরক্ষা আইনের ২৬ নম্বর ধারা কিংবা বর্তমান দুটি চালু মামলার কোনওটিই প্রত্যাহার করার কথা ভাবছে না।” সুভাষ “বন্দিও নন, জামিনপ্রাপ্তও নন”। তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হবে, কেবল “আপাতত তাঁকে বন্দিত্ব থেকে সাময়িক মুক্তি” দেওয়া হয়েছে।৮ বাড়ির বাইরে সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন হল, সরকার অন্তত জনা-বারো গোয়েন্দা চর নিযুক্ত করল, তাদের কেউ কেন্দ্রীয় সরকারের, কেউ প্রাদেশিক সরকারের কর্মী, বাড়ির অভ্যন্তরে কী হচ্ছে সেই তথ্য জানার চেষ্টা চলছে রাত্রিদিনব্যাপী। তেমনই এক জন চর দায়িত্ব-সহকারে জানালেন, ৫ ডিসেম্বর বাড়ি ফেরার পর সুভাষ ওটমিল পরিজ এবং ভেজিটেব্ল স্যুপ খেয়েছেন, তাঁর গলার স্বরও বেশ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। সেই দিন থেকে তাঁর কাছে যত অতিথি আসতেন, সকলকে তল্লাশি করে ছাড়া হত, চিঠিপত্র সব পোস্ট-অফিসেই বাজেয়াপ্ত করে কপি বানিয়ে কিংবা পড়ে নিয়ে তবে তাঁকে দিয়ে আসা হত। বাড়ি ফেরার পরের সপ্তাহে চর-রা খবর দিয়ে গেল, কংগ্রেস পার্লামেন্টারি বোর্ডের সঙ্গে কথাবার্তা চালাচ্ছেন সুভাষ, কিংবা বন্দিমুক্তির দাবিতে সর্বভারতীয় প্রতিবাদ আন্দোলন তৈরির চেষ্টা করছেন। ১২ ডিসেম্বর শোনা গেল, সেই আন্দোলনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় গোষ্ঠী তৈরি করে ফেলেছেন তিনি।৯

বেশ কড়া পাহারায় তাঁকে রাখা গিয়েছে বলে যাঁরা সে দিন নিশ্চিন্ত, তাঁরা কিন্তু জানেনই না সুভাষ ইতিমধ্যে একটি সাংঘাতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, আশ্চর্য সিদ্ধান্ত। ৫ ডিসেম্বর বিকেলে সুভাষ ভ্রাতুষ্পুত্র শিশিরের হাতটি নিজের হাতের উষ্ণতার মধ্যে নিয়ে একটু যেন দীর্ঘ ক্ষণই বসে রইলেন। শরৎচন্দ্র বসুর তৃতীয় পুত্র শিশির, কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র, বয়স ২০। পরের সপ্তাহে অতিথিদের প্রাথমিক ভিড় একটু কমলে সুভাষ শিশিরের বাসস্থান, অর্থাৎ বিশ শতকের প্রথমার্ধের কলকাতার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাড়ি— ১ উডবার্ন পার্কে লোক পাঠিয়ে শিশিরকে ডেকে আনলেন। শরতের বাড়ির ঘরগুলি বিরাট, উঁচু সিলিং, মার্বেলের সিঁড়ি, কারুকার্যময় দক্ষিণের বারান্দা, আধুনিক পাশ্চাত্য আসবাব। মহাত্মা গাঁধী ও জওহরলাল নেহরু কলকাতায় এসে সেখানে থেকেছেন শরতের অতিথি হিসেবে। গাঁধী সে বাড়ির ছাতে প্রার্থনা করেছেন, জাতীয় কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের স্থান হিসেবে সম্মানিত হয়েছে সেই বাড়ি। কাকার ডাক পেয়ে শিশির সে দিন তাড়াতাড়ি তাঁদের এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়ি হাঁটা লাগালেন।

‘ওয়ান্ডারার’

রাঙাকাকাবাবুকে চির কালই ভারী সমীহ করেন শিশির। অসামান্য উজ্জ্বল মানুষ, তাঁর কাকাবাবু। এই মুহূর্তে রোগা দুর্বল শরীর, গালে না-কামানো দাড়ি, বালিশে ভর দিয়ে শুয়ে আছেন তিনি, এমন সময়ে ডিসেম্বরের সেই বিকেলে ঘরে ঢুকলেন শিশির। সুভাষ তাঁর শয্যার ডান দিকে তাঁকে বসতে বললেন। গভীর ভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মিনিট। তার পর জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার একটা কাজ করতে পারবে?”১০ কী কাজ না বুঝেই শিশির ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। কাজটা হল— ভারত থেকে সুভাষের পালানোর পরিকল্পনা ও তার ব্যবস্থা করে দেওয়া। গভীর রাতের অন্ধকারে শিশিরকে তাঁর কাকাকে গাড়িতে নিয়ে পালাতে হবে, কলকাতা থেকে দূরের কোনও রেলওয়ে স্টেশন অবধি। সুভাষ জোর দিয়ে বললেন, পরিকল্পনাটা একদম পাকা হওয়া দরকার, কোথাও যেন ফাঁক না থাকে। কেউ জানবে না, কেবল শিশিরের বোন ইলা ছাড়া, সে এমন ভাব করবে যাতে লোকে মনে করবে সুভাষ বাড়িতেই আছেন। কাকা-ভাইপো-র এই কথোপকথন শেষ হল কাকার নির্দেশ দিয়ে— পরের সন্ধেয় যেন শিশির পুরোপুরি পরিকল্পনাটা ছকে নিয়ে আবার আসেন। “বিস্ময়-বিহ্বল মনে চাপা উত্তেজনা” নিয়ে ১ উডবার্ন পার্কে হেঁটে ফিরে গেলেন শিশির।১১

পরের সন্ধে— সুভাষ ও শিশিরের বহু পরিকল্পনা-অধ্যুষিত সন্ধেগুলির প্রথম। পলায়ন-ছক একেবারে নিখুঁত ভাবে ভাবছেন তাঁরা। অসুস্থ কাকাকে দেখতে যাওয়া কোনও ভাইপো-র পক্ষে খুবই স্বাভাবিক কাজ, তবু বার বার দেখাশোনা হওয়াটা আরও স্বাভাবিক দেখানোর জন্য একটি অতিরিক্ত অজুহাত বানিয়ে নেওয়া হল। শিশির বেশ ভাল রেডিয়ো চালাতে পারতেন, সুতরাং আপাত-ভাবে তাঁর আসার লক্ষ্য কাকাকে বিদেশি বেতার-বার্তা শুনতে সাহায্য করা। বস্তুত সুভাষ সত্যিই যুদ্ধের খবর পেতে উন্মুখ, সমানেই লন্ডন, বার্লিন, মস্কো আর রোমের নানা সংবাদ ও সংবাদ-বিশ্লেষণ শুনে যাচ্ছেন। জার্মান ব্লিত্জক্রিগ-এর পরে ফ্রান্স সম্পূর্ণ পদানত। লুফ্তওয়াফ-এর বোমাবর্ষণে ব্রিটেনের দশা কাহিল। ১৯৩৯ সালের জোয়াচিম ফন রিবেনট্রপ ও ভ্যাচেস্লাভ মলোটভের জার্মান-সোভিয়েত চুক্তি এখনও অটুট। ব্রিটেনের সংকটের সময়ের অর্থ সুভাষের কাছে অত্যন্ত সরল— ভারতের স্বাধীনতা লাভের সুযোগ। কিন্তু আপাতত তাঁর প্রথম চ্যালেঞ্জ— কী ভাবে এই আন্তর্জাতিক সংকটের সুযোগকে কাজে লাগাবেন, সেটা বুঝে নেওয়া।

৩৮/২ এলগিন রোড থেকে পালানোর নানা পথ আলোচনার পর সুভাষ ও শিশির স্থির করলেন, স্বাভাবিক ভাবে গাড়ি চালিয়েই প্রধান দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবেন। দুটো গাড়ির মধ্যে একটি বাছতে হবে। একটি গাড়ি— শিশিরের মা বিভাবতীর নামে, সেটি একটি মার্কিন স্টুডবেকার প্রেসিডেন্ট। অন্যটি— জার্মান গাড়ি ওয়ান্ডারার, শিশিরের নিজের নামেই। মার্কিন গাড়িটি বড়, বেশি জোরালো, কিন্তু শরতের গাড়ি হিসেবে সবাই চেনে সেটিকে। সুভাষ আর শিশিরের মনে হল ওয়ান্ডারার-ই তাঁদের পক্ষে ঠিকঠাক। সুভাষকে ছদ্মবেশ পরাতে হবে, আর পালানোর তারিখটি ঠিক করতে হবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (NWFP) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা সব হয়ে যাওয়ার উপর নির্ভর করে।

১৯৪০-এর ১৬ ডিসেম্বর সরকারের এক চর খবর দিল— সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে দেখা করতে সীমান্ত থেকে মিঞা আকবর শাহ আসছেন। তিনি সীমান্ত প্রদেশের নৌশেরার লোক। ১৯৩৯ সালে জাতীয় কংগ্রেস যাতে ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে আরও র‌্যাডিক্যাল আদানপ্রদান করতে শুরু করে, সেই চাপ দিতে সুভাষ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লক নামক দল; সেই দলের সীমান্ত প্রদেশের নেতা এই আকবর শাহ। তাঁকে কলকাতায় আসতে বলে ‘তার’ করেছিলেন সুভাষ, এবং পুলিশ সেই তথ্যটি জোগাড় করতে পেরেছিল— সরকারের জন্য এই প্রথম একটি সঠিক এবং বিপজ্জনক তথ্য। ১৯২০ সালে তরুণ আকবর শাহ আফগানিস্তানের উপজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চল পেরিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আর এ বার সুভাষ তাঁকে বললেন, তাঁর জন্য পেশোয়ার থেকে কাবুল পর্যন্ত পলায়ন-পথটির পরিকল্পনা করে দিতে। পরিকল্পনার যুক্তি হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হল যে সুভাষ তাঁকে ফরওয়ার্ড ব্লকের বড় আকারের একটি সম্মেলন করতে অনুরোধ করেছেন। এই মিথ্যা খবরটিই সরকারি গোয়েন্দা দফতরে সে দিন জমা পড়েছিল।১২

শিশিরের সঙ্গে মিঞা আকবর শাহ-র আলাপ হল। দুই জনে মিলে গেলেন মধ্য কলকাতার ওয়াচেল মোল্লার দোকানে। আকবর শাহ সেখানে সুভাষের ছদ্মবেশ হিসেবে ঢিলে সালওয়ার আর একটি কালো টুপি কিনলেন। তার পর শিশির তাঁকে হাওড়া রেল স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এলেন, ট্রেন ধরে তিনি ফিরে যাবেন সীমান্তে। পরের ক’দিনে শিশির কিনলেন একটি সুটকেস, একটি অ্যাটাচি কেস, একটি বেড-রোল, তা ছাড়া দুটো ফ্লানেল সার্ট, টয়লেটের ব্যবহার্য, বালিশ, গায়ের চাদর। পরনে ইউরোপীয় পোশাক, মাথায় টুপি— শিশির গেলেন একটি প্রিন্টিং-এর দোকানে, কার্ডের অর্ডার দিলেন সেখানে। কার্ডে লেখা থাকবে: “মহম্মদ জিয়াউদ্দিন, বিএ, এলএলবি, ট্র্যাভেলিং ইনস্পেকটর, দি এম্পায়ার অব ইন্ডিয়া লাইফ ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, স্থায়ী ঠিকানা: সিভিল লাইনস, জব্বলপুর।”১৩

১৯৪০-এর ক্রিসমাসের দিন সকালবেলা শিশির নিজেই নিজের পরীক্ষা নিতে গাড়ি নিয়ে চললেন কলকাতা থেকে বর্ধমানের রেল জংশন। স্টেশনে লাঞ্চ সারলেন, একই দিনে ফিরেও এলেন। জানুয়ারির গোড়ায় মা ও পরিবারের আরও কয়েক জনকে নিয়ে আসার নাম করে গেলেন ধানবাদে নিজের বড় ভাই অশোকের কাছে, এই ছুতোয় ভাল ভাবে রাস্তাঘাট সরেজমিন দেখে এলেন। ফেরার পথে তাঁর বাবা-মা’র স্টুডবেকার প্রেসিডেন্ট গাড়িটি (যেটাতে তিনি নিজেও যাত্রী হিসেবেই বসে ছিলেন সে দিন) খারাপ হয়ে গেল, তাঁকে ও অন্যান্যদের ট্যাক্সি ভাড়া করে কলকাতা ফিরতে হল। ওই একই সময়ে শরৎও কালিম্পং-এর পাহাড়ে তিন সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে কলকাতায় ফিরে এলেন, এসেই সুভাষের কাছে জানতে পারলেন তাঁদের পরিকল্পনার কথা। ভাইয়ের পরিকল্পনা খানিকটা পাল্টে দিলেন দাদা, যেমন বললেন, ইলার মতো একটি অল্পবয়সী মেয়েকে একা কাজে লাগানোটা মোটেই সুবুদ্ধির কাজ নয়। তাকে হয়তো পলায়ন-পর্বের পর পুলিশি জুলুমের মুখে পড়তে হবে। বদলে, তাঁর প্রস্তাব, সুভাষের পালানোর পর বাড়িতে ব্যাপারটা চেপে রাখার জন্য শিশিরের জ্যাঠতুতো ভাই দ্বিজেনকেও বরং কাজে লাগানো হোক।

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক কর্মী-সহকর্মী, সকলের সঙ্গেই কথোপকথনের সময় সুভাষ তাঁর জেলে ফেরার আশু সম্ভাবনার কথা বলে গেলেন। নানাবিধ উচ্চস্তরের যোগাযোগ তাঁর— সেই সংযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারের দফতরে তাঁর বিষয়ে যে গোপনীয় ফাইলটি তৈরি হয়েছে, সেটি আনিয়ে ভাল করে দেখে-টেখে আবার ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে বাড়ির চারপাশে যে সব পুলিশ মজুত, শিশির তাদের হাবভাব ভাল করে লক্ষ করছেন— তারা এলগিন রোড আর উডবার্ন রোডের কোনায় একটা চারপাই খাটিয়ে দুটি বাড়ির উপরই একযোগে নজর রাখে, দিনের বেলাটা পায়চারি করে নজরদারি করে, কিন্তু শীতের রাতে দেখা যাচ্ছে চারপাই-এর উপর কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকাটাই তাদের বেশি পছন্দ। সুভাষচন্দ্র ও গাঁধীর চিঠিপত্রও সরকারের শ্যেনদৃষ্টি এড়াল না। ২৩ ডিসেম্বর সুভাষ গাঁধীকে লিখলেন, মহাত্মা গাঁধী স্বাধীনতার লক্ষ্যে যে আন্দোলনই শুরু করুন না কেন, সুভাষের সর্বান্তঃকরণ সমর্থন থাকবে তাতে। ২৯ ডিসেম্বর গাঁধীর উত্তর এল। যত দিন পর্যন্ত না তাঁদের কেউ এক জন স্বাধীনতা-অর্জনের নিজের পছন্দের রাস্তাটি বিষয়ে অন্য জনকে পুরোপুরি বোঝাতে পারছেন, তত দিন তাঁরা “আলাদা নৌকোতেই ভাসবেন”: “সুস্থই থাকো আর অসুস্থই থাকো, তোমাকে আটকানো কারও সাধ্য নয়,” বিদ্রোহী সন্তানটিকে লিখলেন বাপু: “ফায়ারওয়ার্কস শুরু করার আগে বরং শরীরটা সারিয়ে ফেলো।”১৪ ১৯৪১ সালের ৩ জানুয়ারি সরকারি সেন্সরের হাতে পড়ল চিঠিটি, সেটি খোলা হল।১৫ “ফায়ারওয়ার্কস”-এর প্রস্তুতি যে তত দিনে পাকা, সে খবর তারা কিছুই জানে না, সুতরাং নিশ্চিন্ত হয়ে তারা অপেক্ষায় রইল, তাঁকে ধরে ফেলার শুভমুহূর্তটির জন্য।

সব ধর্মের প্রতিই যথেষ্ট শ্রদ্ধা সুভাষের, তবু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিশেষ ভাবে মাতৃরূপিণী দেবীর উপাসক। এক সন্ধেয় সুভাষের নির্দেশে শিশির ইলাকে নিয়ে দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে গেলেন তাঁদের আসন্ন অভিযানের জন্য দেবীর আশীর্বাদ চাইতে। পালানোর দিনটির আগে সুভাষ ঠিক দু’দিনের নোটিশ দিলেন শিশিরকে। শিশির এলগিন রোডে বেডরোলটি পাঠিয়ে দিলেন, কোরান-এর দুটি কপি এবং কিছু ওষুধ নিয়ে গেলেন উডবার্ন পার্কে বসে অ্যাটাচি কেসটি গুছিয়ে ফেলার জন্য। পালানোর আগের রাতটিতে মনে হল, নতুন সুটকেসটি যেন গাড়ির পক্ষে বড্ড বেশি বড়। আবার আর একটি ছোট সুটকেস জোগাড় হল। এই দ্বিতীয় সুটকেসে লেখা ছিল “SCB”, সেটা ভাল করে মুছে তাতে চাইনিজ ইঙ্ক দিয়ে “MZ” লিখলেন। ১৬ জানুয়ারি গাড়িটি ভাল করে ‘সার্ভিস’ করিয়ে নিলেন, মেডিকেল কলেজ থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলেন। সেই সন্ধেয় উডবার্ন পার্কের আলো-জ্বালানো ছাতে বসে পিতাপুত্রের কথা হল খানিকক্ষণ। চন্দননগরের ফরাসি অঞ্চলে সুভাষ-শিশিরকে পুলিশে ধরতে পারে ভেবে বড় উদ্বিগ্ন বোধ করছিলেন শরৎ। তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে নিলেন শিশির, মা পাশে বসে রইলেন শান্ত ভাবে। যাত্রার আগে তিনি ছেলেকে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে অল্প হেসে বললেন, “জানি না বাবা তোমরা কী সব করতে যাচ্ছ।” সকলের চোখ এড়িয়ে মালপত্র গাড়িতে তুলে উডবার্ন পার্ক থেকে গাড়ি চালিয়ে শিশির বেরিয়ে গেলেন এলগিন রোডের দিকে, ঘড়িতে তখন সন্ধে সাড়ে আটটা। বাড়ির পিছনের সিঁড়ির কাছে রাখলেন গাড়িটি।১৬

দুর্ভাগ্য এটাই— ব্রিটিশকে ঠকানোর জন্য সুভাষ ও শিশিরকে তাঁদের বাড়ির লোকজনকেও ঠকাতে হল, এমনকী সুভাষের বৃদ্ধা মাকেও। শিশির দেখলেন, রাঙাকাকাবাবু সিল্কের ধুতি-চাদর পরে প্রাত্যহিক রীতি অনুযায়ী নৈশাহারে বসছেন, মা এবং পরিবারের অন্যান্যদের সামনে তাঁর শ্বেতপাথরের থালা বাটি সাজানো। কিছু দিনের জন্য ধর্মীয় আচার পালন করতে চলেছেন বলে জানিয়েছেন সুভাষ, কয়েক দিন তাঁকে বিরক্ত করা যাবে না। তাই এখন থেকে খাবার দিতে হবে পর্দার পিছনে। ইতিমধ্যে অনেক ছোট ছোট কাগজে অতিথিদের জন্য ছোট ছোট ‘নোট’ লিখে রেখেছেন তিনি, নানা জনের নানা কাজ অনুসারে বানানো সেই সব ‘নোট’। পরের তারিখ-বসানো কতগুলি চিঠিও লিখে রেখেছেন, সবগুলিই জেলের নানা বন্দি সহকর্মীদের— এই সব চিঠি তিনি পালিয়ে যাওয়ার পর ক্রমে ক্রমে ডাকে দেওয়া হবে। “তাড়াতাড়ি আমিও ফিরছি জেলে, আমার বিরুদ্ধে দুটো মামলা ঝুলছে জানোই তো,” হরি বিষ্ণু কামথকে লিখলেন। তারিখ বসালেন ১৮ জানুয়ারি। ধরেই নিলেন ব্রিটিশ পুলিশ সেটি খুলে পড়বে। বাড়ির ছোটরা যতক্ষণ পর্যন্ত না রাতে শুয়ে পড়ল, বেরোনো গেল না। সেই দিনই কিছু আগে হঠাৎ শিশিরের খুড়তুতো ভাই অরবিন্দের মনে কিছু-একটা সন্দেহ জেগেছিল, ফলে শেষ পর্যন্ত তাকেও ষড়যন্ত্রের অংশী হিসেবে ঢুকিয়ে নিতে হল। তবে এর চেয়ে বেশি কথাটা ছড়াতে দিতে একেবারেই নারাজ সুভাষ।

শেষ পর্যন্ত রাত ১:৩৫ নাগাদ মনে হল, পরিস্থিতি অনুকূল। সুভাষ “মহম্মদ জিয়াউদ্দিন”-এর পোশাক পরে ফেললেন। লম্বা খয়েরি উঁচু-গলা কোট, ঢিলে সালওয়ার, কালো টুপি। সরু সোনালি ফ্রেমের যে চশমাটি পরা বন্ধ করে দিয়েছিলেন প্রায় এক দশক আগে, আবার সেটি পরলেন। শিশিরের কিনে-আনা কাবুলি চপ্পলটি পরতে কষ্ট হচ্ছিল, তাই নিজের ইউরোপীয় জুতোই পরলেন এই দীর্ঘ যাত্রার মুখে। ওপরের একটা ঘর থেকে দ্বিজেন ইশারায় জানালেন, কোনও পুলিশের চর কিংবা লোকজন বাড়ির ধারেকাছে নেই। ইলাকে চুমু খেয়ে বিদায় জানালেন সুভাষ। বাইরে চাঁদের আলো। অরবিন্দর হাতে বেডরোল, পিছনে সুভাষ আর শিশির। লম্বা বারান্দার দেওয়াল ধরে ধরে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন তাঁরা। সুভাষ চুপচাপ বাঁ দিকের আসনে বসে গেলেন, শিশির বসলেন চালকের আসনে। ইঞ্জিন স্টার্ট হল। ৩৮/২ এলগিন রোড ছেড়ে ওয়ান্ডারার বিএলএ ৭১৬৯ রওনা হয়ে গেল, যেমন অনেক বারই সে গিয়েছে। সুভাষের শয়নকক্ষের আলোগুলি জ্বালা রইল আরও ঘণ্টা-খানেক।১৭

এলগিন রোড ও উডবার্ন রোডের মোড়টি দিয়ে যাতে না যেতে হয়, তাই গেট দিয়ে বেরিয়েই ওয়ান্ডারার ডান দিকে বাঁকল, তার পরই আবার ডান দিকে, অ্যালেনবি রোডে। এ বার শিশির বাঁ দিকে ঘুরে ল্যান্সডাউন রোডে পড়লেন, শুরু হল তাঁদের উত্তরমুখী যাত্রা। কলকাতা ঘুমন্ত— কাকা-ভাইপো চললেন লোয়ার সার্কুলার রোড, শিয়ালদা, হ্যারিসন রোড, গঙ্গার উপর দিয়ে হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে। এ বার তাঁরা শহরের বাইরে। তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে আইরিশ জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম নিয়ে— যার থেকে অনেক অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন সুভাষ। ফ্লাস্ক থেকে শিশিরকে গরম কফি ঢেলে দিতে দিতে সুভাষ জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁর ভাইপো কি জানেন ১৯১৯ সালে লিঙ্কন জেল থেকে ইমন ডি ভালেরার পলায়নের কথা? শিশির জানতেন ডি ভালেরা তার জেলের ঘরটির চাবির একটি মোমের প্রতিলিপি বানিয়েছিলেন, সেই প্রতিলিপি একটি কেক-এর মধ্যে করে বাইরে চালান করেছিলেন। এও জানতেন যে আইরিশ সংগ্রামের আর এক নায়ক মাইকেল কলিন্স বাইরের গেটের চাবি একটি সংকট-মুহূর্তে হারিয়ে ফেলেছেন বলে ভাবেন, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে চাবিটি পাওয়া যায়, কলিন্স তাঁর বন্ধু ‘ডেভ’-কে পালাতে সাহায্য করতে পারেন।১৮ ডি ভালেরার এই পলায়ন-কাহিনির মধ্যেই শিশিরকে হঠাৎ করে ব্রেক কষতে হল, সামনে রেলওয়ে ক্রসিং, তার গেট বন্ধ। এই ব্রেক-বিভ্রাটে বেশি পেট্রোল বেরিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের তীব্র উদ্বেগ। তার পর আবার চলতে শুরু করল ওয়ান্ডারার।

শরতের ভয় অমূলকই ছিল। চন্দননগর দিয়ে গাড়ি নিরাপদে চলে এল, কিছু ঘটল না। কোনও পুলিশ গাড়ি থামাল না। কাকা-ভাইপো-কে সত্যিই থামতে হলে সুভাষ এমন ভাব করতেন যে তিনি মুসলিম গাড়িচালক, বাচ্চা ভাইপো-র গাড়ি চালানোর আবদার রাখছেন। তবে সে সব কিছুরই দরকার হল না। বর্ধমান পেরিয়ে দুর্গাপুরের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলেছেন শিশির, হঠাৎ এক পাল মোষের সঙ্গে মোলাকাত। আবার প্রবল জোরে ব্রেক। ভোর হয়ে আসছে, আসানসোলের কাছাকাছি। কলকাতা থেকে বেরোতে একটু দেরি হওয়ার ফলে আসানসোল থেকে ধানবাদ এ বার সকালের উজ্জ্বল আলোর মধ্য দিয়েই যেতে হবে। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ধানবাদের কাছে বরারিতে ভাই অশোকের বাড়ির কয়েকশো গজ দূরে তাঁর সহযাত্রীকে নামিয়ে দিলেন শিশির।

অশোককে সব কথা খুলে বলছেন শিশির, এমন সময়ে মহম্মদ জিয়াউদ্দিন নামে এক উত্তর ভারতীয় মুসলিমের প্রবেশ, কী সব দালালি ব্যবসার কাজে। অশোক তাঁকে জানালেন, ক’দিনের জন্য তিনি কাজে বেরিয়ে যাচ্ছেন, কথা বলতে হলে সেই সন্ধে অবধি তাঁকে অপেক্ষা করতে হবে। চাকরবাকরদের বলা হল, বাড়ির অতিরিক্ত ঘরটি তাঁর জন্য তৈরি করে দিতে, সকলের উপস্থিতিতে শিশিরকে জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল, কথাবার্তা হল ইংরেজিতেই। দিনের শেষে, অশোকের কাজ ফুরোলে, এবং অতিথিদের বেশ খানিকটা বিশ্রাম নেওয়া হলে, অশোকের সঙ্গে অতিথির কথা শুরু হল— আপাত ভাবে— কয়লাখনি অঞ্চলে কাজের নানা সমস্যা বিষয়ে। সুভাষ জানালেন, বাংলার আসানসোলের বদলে তিনি বিহারের গোমো থেকে ট্রেনে উঠতে চান। শিশির ভাল চেনেন না গোমো-র রাস্তা, তাই তিনি ভাইকে বললেন গাড়িতে তাঁর সঙ্গী হতে। অশোক এ দিকে এই দেহাত অঞ্চলে স্ত্রীকে রাতে একা রেখে বেরোতে চান না, তাই স্থির হল শিশিরের বৌদি মীরাও যাবেন সঙ্গে। তাড়াতাড়ি নৈশাহার সেরে মহম্মদ জিয়াউদ্দিন বসুদের কাছে বিদায় নিয়ে রওনা হলেন। তাঁরা স্থির করলেন বন্ধুদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতে বেরোবেন। বরারি-র বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে জিয়াউদ্দিনকে আবার তুলে নিল শিশিরের ওয়ান্ডারার, সকলে মিলে রওনা হলেন গোমো-র উদ্দেশে।১৯

গোমো স্টেশনে দিল্লি-কালকা মেল আসতে গভীর রাত। তাই ওয়ান্ডারার পথে দুই বার থামল। গাছের তলায় দাঁড়িয়ে তাঁরা শুনলেন, গলার ঘণ্টি বাজিয়ে চলেছে গোরুর গাড়ির দল। গোমোর কাছাকাছি ধানক্ষেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখলেন দূর আকাশে চাঁদের আলোয় পরেশনাথ পাহাড়ের হালকা ছায়া। গোমো স্টেশনে আধ-ঘুমন্ত কুলি এসে জিনিসপত্র তুলে নিল। “আমি চললাম—তোমরা ফিরে যাও,” বললেন রাঙাকাকাবাবু। শিশির তাকিয়ে থাকলেন, “নির্জন ওভারব্রিজ দিয়ে রাঙাকাকাবাবু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ দৃপ্ত অথচ ধীর ভঙ্গিতে হেঁটে চলে যাচ্ছেন, আগে আগে চলেছে কুলি মাথায় মালপত্র নিয়ে। ও পারের সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাঙাকাকাবাবু প্ল্যাটফর্মের দিকে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।” কলকাতার দিক থেকে গর্জন-সহকারে প্রবেশ করল দিল্লি-কালকা মেল। একটু পর, শিশির দেখলেন, “ট্রেনের চাকার ছন্দোময় ঝঙ্কারের সঙ্গে অন্ধকারের বুকে একটা আলোর মালা দুলে দুলে দূরে চলে গেল।”২০

মহম্মদ জিয়াউদ্দিন

১৯ জানুয়ারি রাতের দিকে দিল্লি থেকে ফ্রন্টিয়ার মেল এসে ঢুকল পেশোয়ার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে। বাইরের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিঞা আকবর শাহ, দেখলেন এক জন সম্ভ্রান্ত চেহারার মুসলিম ভদ্রলোক বেরিয়ে আসছেন। ইনিই নিশ্চয়ই ছদ্মবেশী সুভাষ, তাই পাশে এসে তাঁকে একটা টঙ্গায় উঠতে বললেন। টঙ্গাওয়ালাকে বললেন ডিন’স হোটেলে ওঁকে নিয়ে যেতে। নিজে আর একটা টঙ্গায় চললেন পাশে পাশে। আকবরের টঙ্গাওয়ালা জানতে চাইলেন এত সাচ্চা মুসলিম মেহমানকে কেন ডিন’স হোটেলে নিয়ে যাচ্ছেন, ও তো কাফেরদের হোটেল! তার চেয়ে তাজ মহল হোটেলে গেলে হয় না— সেখানে নমাজের ব্যবস্থা রয়েছে, ওজু-র জন্য আলাদা পানির বন্দোবস্ত রয়েছে। শুনতে শুনতে আকবরের মনে হল, কথাটা মন্দ নয়, তাজ মহল হোটেলেই বোধহয় যাওয়া ভাল, ডিন’স হোটেলে নিশ্চয়ই এ দিক ও দিক পুলিশ টহল দেবে। সুতরাং টঙ্গার মুখ ঘুরানো হল। তাজ মহলের ম্যানেজারও টঙ্গাওয়ালার মতোই মহম্মদ জিয়াউদ্দিনকে দেখে মুগ্ধ, বেশ ভাল একটি ঘর দিলেন তাঁর থাকার জন্য। সেই ঘরে চালু ফায়ার প্লেস রয়েছে, রয়েছে নমাজের আসন জায়নমাজ-ও। আকবরের পরিকল্পনা ছিল পরের দিন তাঁর এক সম্পন্ন বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে তুলবেন সুভাষকে, কিন্তু ফেরার পথে দেখা হল ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী আবাদ খানের সঙ্গে, তিনি পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন সুভাষকে তাঁর বাড়িতে এনে রাখার জন্য। ফলে পর দিন ভোর হতে না হতে সুভাষ চলে এলেন আবাদ খানের বাড়ি, পরের কয় দিন সেখানেই থাকতে থাকতে উত্তর ভারতীয় মুসলিম মানুষটি পরিণত হলেন বোবা-কালা এক পাঠানে। এ ছাড়া উপায় কী, সুভাষ যখন সেখানকার স্থানীয় ভাষা পশতু একটুও জানেন না।২১

তাঁর নেতা এসে পৌঁছনোর আগেই আকবর তাঁর ব্রিটিশ ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে পরবর্তী যাত্রার জন্য দুই জন সম্ভাব্য ‘এসকর্ট’-এর কথা ভেবে রেখেছেন— মহম্মদ শাহ এবং ভগত রাম তলোয়ার। দুই জনেই সেই সময় ফরওয়ার্ড ব্লকের সক্রিয় সদস্য। ভগত রামের প্রবল আগ্রহেরই জয় হল শেষে, আকবর তাঁকেই সুভাষকে কাবুল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দিলেন। ঠিক হল, রহমত খান ছদ্মনাম নিয়ে ভগত রাম এই মূক-বধির বয়স্ক আত্মীয় জিয়াউদ্দিনকে তাঁর মানসিক অসুস্থতার নিরাময়ের জন্য আড্ডা শরিফ-এর তীর্থে নিয়ে যাবেন। আবাদ খান জিয়াউদ্দিনকে শেখালেন কী ভাবে কানডোলি থেকে জল খেতে হয়, কী ভাবে অন্য পাঠান সঙ্গীদের সঙ্গে এক পাত্র থেকে খাবার খেতে হয়। নতুন জামাকাপড়, নতুন স্থানীয় পাগড়ি পরে সুভাষচন্দ্র বসু তখন দস্তুরমতো পাঠান— কেবল প্রবল সতর্ক হয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁকে যাতে মুখে একটিও বাক্য না সরে।২২

সেই সময় ভারতের সর্বত্র স্বাধীনতা দিবস পালিত হয় ২৬ জানুয়ারি, কেননা ১৯৩০ সালে ওই দিনটিই ছিল লাহোরে ইরাবতী নদীর তীরে জাতীয় কংগ্রেসের পূর্ণ স্বরাজ অর্জনের আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণের দিন। ১৯৪১-এর ২৬ জানুয়ারি মহম্মদ জিয়াউদ্দিন ও রহমত খান পেশোয়ার থেকে মহম্মদ শাহ এবং এক আফ্রিদি পথপ্রদর্শকের সঙ্গে রওনা হলেন, আবাদ খান একটি গাড়ি ঠিক করে দিলেন তাঁদের জন্য। সীমান্ত থেকে আধ মাইল দূরে তাঁদের নামিয়ে মহম্মদ শাহ ফিরে এলেন। স্বাধীনতা দিবসের সন্ধের মধ্যে ব্রিটেনের ভারতীয় সাম্রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে গেলেন সুভাষচন্দ্র বসু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের উপজাতি-অধ্যুষিত পার্বত্য ভূমি ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। দুর্গম পথ, চড়াই-উতরাই, পাহাড় পেরিয়ে যাওয়া, যাত্রীরা সকালের দিকেই এই পথ ধরে এগোলেন, পথের প্রত্যন্ত গ্রাম দেখতে পেলে প্রথম দুটি রাত সে সব জায়গায় কাটিয়ে দিলেন। প্রধানত পায়ে হেঁটেই চলা, মাঝে মধ্যে অবশ্য অশ্বতরের পিঠেও চড়া হল। একটি অশ্বতর এক বার বরফের পাহাড়ে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম করতে পিঠের যাত্রীটি একটু আহত হলেন, তবে ভাগ্যক্রমে আঘাত তেমন গুরুতর না হওয়ায় বেঁচে গেলেন। ২৭-২৮ জানুয়ারির মধ্যরাত্রির পর তাঁরা পৌঁছলেন আফগানিস্তানের প্রথম গ্রামটিতে। এই স্থান থেকে পিছনে ফিরে গেলেন উপজাতীয় পথ-প্রদর্শক মানুষটি। পর দিন, জিয়াউদ্দিন ও রহমত খান এগিয়ে চললেন আফগান রাজধানীর দিকে। শেষ পর্যন্ত গঢ়দি গ্রামের কাছাকাছি এসে পেশোয়ার-কাবুল হাইওয়ে ধরা গেল। চা-পাতা বোঝাই একটি ট্রাক যাচ্ছিল, সেটিকে থামিয়ে তাতে উঠে পড়লেন যাত্রীদ্বয়, জালালাবাদ পৌঁছলেন ২৮ জানুয়ারি রাত্রে। পর দিন জালালাবাদের কাছে আড্ডা শরিফ দর্শন করার পর এক রাজনৈতিক কর্মী হাজি মহম্মদ আমিনের সঙ্গে দেখা হল তাঁদের। ৩০ জানুয়ারি কাবুলের দিকে রওনা হলেন— প্রথমে টঙ্গায়, তার পর ট্রাকে, পরের সকালে এলেন বুড খক-এর চেক-পয়েন্টে। আবার টঙ্গা। এ বার কাবুল। সে দিন ৩১ জানুয়ারি, ১৯৪১।২৩

ইতিমধ্যে কলকাতায় ২৬ জানুয়ারি সুভাষের এলগিন রোডের বাড়িতে বেশ একটা নাটক হয়ে গেল। শিশির ১৮ জানুয়ারি সন্ধেতেই কলকাতা ফিরে এসেছিলেন, তার পর বাবার সঙ্গে গিয়েছিলেন সুভাষের রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতনির বিবাহ-অনুষ্ঠানে। কাকার অসুস্থতা নিয়ে সেখানে বহু লোকের বহু প্রশ্নের উত্তর দিলেন তিনি। কাকা যে এখনও ঘরেই আছেন, সেটা বোঝাতে কাকার জন্য পাঠানো খাবার খেয়ে নিলেন ভাইপো-ভাইঝিরা, যাঁরা ব্যাপারটা জানতেন। শিশিরকে সুভাষ বলেছিলেন, চার-পাঁচটি দিন যদি এই ভাবে কাটিয়ে দেওয়া যায়, তা হলেই পগার পার, দেশ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারবেন তিনি। এ দিকে ২৭ জানুয়ারি যেহেতু আদালতে সেই দেশদ্রোহের মামলার শুনানি, ফলে চক্রান্তকারীরা পরিকল্পনা করলেন— পুলিশের হাতে ব্যাপারটা ছেড়ে না দিয়ে নিজেরাই আগেভাগে জানিয়ে দেবেন যে কাকাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী ভাবে সুভাষের নিখোঁজ হওয়ার খবরটা জানানো হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশাবলি দিয়ে শরৎ ও শিশির চলে গেলেন তাঁদের রিষড়ার বাগানবাড়ি। এত দিন সুভাষের খাবার খেতেন তাঁর ভাইপো-ভাইঝিরা, এ বার সেই খাবার অভুক্তই পড়ে রইল, রাঁধুনি টের পাওয়ামাত্র বিরাট শোরগোল শুরু হল। দুই জন ভাইপো উদ্বিগ্ন হয়ে রিষড়া ছুটলেন সুভাষের নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর দিতে। শিশির তাঁর বাবাকে গাড়িতে নিয়ে এলগিন রোডের বাড়ি ফিরে এলেন, এসেই শুনলেন পরিবারের অন্যান্যদের বয়ানে এই সাংঘাতিক কাণ্ডের খবর। সুভাষের মা প্রভাবতী অস্থির হয়ে পড়েছেন সংবাদ শুনে। তাঁকে আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করলেন শরৎ, ব্যাপারটা চাপা দেওয়ার যা-কিছু বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, সব এ বার চালান করে দিলেন উডবার্ন পার্কের বাড়িতে। শিশিরকে সেই ওয়ান্ডারার গাড়ি দিয়েই পাঠানো হল কাকাকে খোঁজার জন্য, কেওড়াতলা শ্মশান থেকে কালীঘাটের মন্দির সব ঘুরে এলেন তিনি কাকার সন্ধানে। এক পুরুত বললেন— তিনি কিন্তু দৃঢ় নিশ্চিত যে সুভাষ সংসারের মায়া ত্যাগ করেই চলে গিয়েছেন। রাতে দেবী জাগ্রত হলে তাঁর কাছে বাকি সব সংবাদ জেনে নেবেন, কথা দিলেন।২৪

সুভাষ নিরুদ্দেশ— ২৭ জানুয়ারি এই সংবাদ দুটি মিত্রভাবাপন্ন সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকা ও হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড-এ প্রকাশিত হল। সেখান থেকে খবরটা তুলে নিল রয়টার, ছড়িয়ে পড়ল সারা দুনিয়ায়। ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসাররা যুগপৎ বিস্মিত, বিব্রত।২৫ পুলিশবাহিনী এলগিন রোডের বাড়িতে হাজির হয়ে সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। বাড়ি থেকে বেরোনোর যত ভুল জায়গাগুলিতে আপ্রাণ তল্লাশি চালাচ্ছে তারা— দেখলেন শিশির। এক চর এসে খবর দিল, ২৫ জানুয়ারি বাড়ি ছেড়ে সুভাষ নাকি পণ্ডিচেরির দিকে চলে গিয়েছেন, পুরনো বন্ধু দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে দেখা করতে।২৬ কায়দা করে এই সংসারত্যাগের তত্ত্বটি ছড়াতে শুরু করলেন শরৎ এবং শিশিরও। মহাত্মা গাঁধী উদ্বিগ্ন হয়ে টেলিগ্রাম করলেন, উত্তরে শরতের তিন-শব্দের বার্তা: “সংসারত্যাগ বলেই ধারণা।” তবে ১৯৩৯ সালের সুভাষ-গাঁধীর রাজনৈতিক লড়াইয়ে দৃঢ় ভাবে সুভাষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন যিনি, সেই রবীন্দ্রনাথকে ইচ্ছা করে ভুল তথ্য দিতে মন সরল না তাঁর। কবি তাঁর প্রশ্নের উত্তরে শরতের কাছ থেকে যে তার পেলেন, তাতে লেখা: “সুভাষ যেখানেই থাকুক, সে যেন আপনার আশীর্বাদ পায়।”২৭

পুলিশ দেখল, প্রভাবতী সত্যিই ভেঙে পড়েছেন। অধিকাংশ পুলিশ অফিসার এবং গোয়েন্দা চররা যখন পরস্পরকে তুমুল দোষারোপে ব্যস্ত, তাঁদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন, কলকাতা স্পেশাল ব্রাঞ্চের সেই ডেপুটি কমিশনার জে ভি বি জানভ্রিন-এর কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস হল, সুভাষের নিরুদ্দেশ হওয়ার পিছনে আকস্মিক ধর্ম-উদ্দীপনাই “আসল কারণ” নয়, এই তত্ত্বে “গভীর সন্দেহের অবকাশ” রয়েছে। ২৭ জানুয়ারি জানভ্রিন মাঝপথে বাজেয়াপ্ত একটি চিঠি দিল্লিতে পাঠালেন— চিঠিটি ২৩ জানুয়ারি লেখা, অসাবধানী ভাবে অরবিন্দ লিখেছেন তাঁর এক সতীর্থকে যে ২৭ জানুয়ারি বোঝা যাবে কেন তিনি এই সময়ে বাংলার বাইরে যাওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারছেন না। তবে এই ভুল থেকেও পুলিশ সত্যি ঘটনার কোনও হদিশে পৌঁছতে পারল না। পঞ্জাব থেকে একটা রিপোর্ট এল: সুভাষকে রাশিয়ার দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা জানতে পেরেছে তারা। আর একটি রিপোর্ট বলল, সুভাষের বন্ধু নাথালাল পারিখ ডিসেম্বরে বম্বে থেকে এসে ঘুরে গিয়েছিলেন, তিনিই বোধহয় তাঁকে জাপান যাওয়ার জন্য ভুয়ো পাসপোর্ট দিয়ে গিয়েছেন। এমনও একটা সন্দেহ প্রবল হয়ে দাঁড়াল যে,— ১৭ জানুয়ারি সুভাষ তাইসুং নামের জাহাজে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছেন, সেই জাহাজ গিয়েছে পেনাং, সিঙ্গাপুর হয়ে হংকং-এর দিকে।২৮

এই সব কেলেঙ্কারির মধ্যে ভাইসরয় লিনলিথগো কিন্তু গভর্নর হারবার্ট-এর উপর চটে একশা। হারবার্ট নাকি মন্তব্য করেছেন, সত্যিই যদি তাঁদের চরম শত্রুটি ভারত ছেড়ে চলে গিয়েই থাকেন, মন্দ কী। লিনলিথগো-র মতে, সুভাষের উপর নজরদারির দায়িত্ব যাঁদের উপর ছিল, তাঁরা যে কতটাই অকর্মণ্য এই ঘটনা সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আর তিনি যদি এতই সহজে পালাতে পেরে থাকেন, তবে তো তিনি তাঁদের জ্বালাতে সহজেই ফিরেও আসতে পারেন।২৯ দিল্লির হোম ডিপার্টমেন্ট-এর রিচার্ড টটেনহ্যামের স্পষ্ট কথা, সুভাষ যাতে “ভারতের মধ্যে কিংবা বাইরে কোনও ক্ষতিজনক কাজে লিপ্ত না হতে পারেন, সেটাই চেয়েছিল” সরকার, কিন্তু সুভাষ তাদের চোখে ধুলো দিয়েছেন। “কী ভাবে পালাতে পারলেন, কোথায় তাঁর খোঁজ মিলবে,” ১৩ ফেব্রুয়ারি লিখলেন তিনি, “এ সব এখনও রহস্য।” লিনলিথগোকে লিখলেন, হারবার্ট এই পরিস্থিতিতে “মরমে মরে আছেন”। এ দিকে কলকাতায় যদিও জানভ্রিন-এর কথা খুব একটা পাত্তা পেল না, তিনিই কিন্তু সত্য ঘটনার কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছিলেন। সুভাষ যদি বাড়ি থেকে সন্ন্যাসী হওয়ার জন্যও বেরিয়ে গিয়ে থাকেন, পুলিশ গোয়েন্দা নিশ্চিত যে তিনি ধর্মকর্মের লক্ষ্যে যাননি, গণ-আন্দোলন তৈরির লক্ষ্যেই পালিয়েছেন। অন্য সম্ভাবনাও আছে একটা— সুভাষ হয়তো দেশের স্বাধীনতার জন্য বিদেশি সহায়তা চাইতে গিয়েছেন। “আমার মনে হয়, ওঁর জীবনের যে আসল লক্ষ্য— ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা— সেটা ছেড়ে উনি অন্য কিছু করতেই পারেন না।”৩০

এ দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে কাবুলে তখন আন্তর্জাতিক গুপ্তচরদের সমারোহ। সুভাষচন্দ্র বসু তারই মধ্যে নিজের জীবনের লক্ষ্য নিয়ে তীব্র যন্ত্রণাময় অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। ৩১ জানুয়ারি আফগান রাজধানীতে পৌঁছনোর পর রহমত খান ও তাঁর মূক-বধির আত্মীয়-সঙ্গী জিয়াউদ্দিন লাহোরি গেট-এর কাছে একটি সরাইতে আশ্রয় নিলেন। কিন্তু এর পর? এর পর কোথায়? গোমো স্টেশনে কাকাকে ছেড়ে দেওয়ার সময় অশোক বলেছিলেন, ভারতের বিপ্লবীদের চিরাচরিত পথটি ধরে সুভাষও বোধ হয় আবার সেই রাশিয়ার দিকেই চলেছেন। শিশির চিরাচরিত বিপ্লবী ধারার ব্যাপারটা মেনে নিয়েও ভাবলেন, যুদ্ধের দুনিয়ায় বোধহয় জার্মানির পথই বাঞ্ছিত পথ।৩১ কাবুলে পৌঁছনোর পর প্রথম কয়েক দিন ভগত রাম ওরফে রহমত খান কয়েক বার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করতে।৩২

ব্যাপারটা এ বার নিজের হাতেই নিতে হবে, দেখলেন সুভাষ। জার্মান দূতাবাসে ঢুকে পড়লেন এক দিন। ব্রিটেনের সঙ্গে জার্মানিরই যুদ্ধ চলছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের তো নয়। তা ছাড়া জার্মান ও ইতালীয়দের হাতে ভারতীয় যুদ্ধবন্দিরাও আছেন। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে আছে কেবল— জার্মানির সঙ্গে একটি অনাক্রমণ চুক্তি। কাবুলে জার্মান মন্ত্রী হানস্ পিলগার ৫ ফেব্রুয়ারি বার্লিনে জার্মান বিদেশমন্ত্রীকে একটি তার পাঠালেন: “দূতাবাসে জোর করে ঢুকে পড়তে বোসকে জানিয়েছি স্থানীয় আফগান নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী রকম বলেছি বাজারের কাছে ভারতীয় বন্ধুদের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে তাঁর হয়ে রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।” রুশ যোগাযোগকারীর অবশ্য অদ্ভুত সন্দেহ হল, সুভাষের এই রাশিয়ার ভিতর দিয়ে যাত্রার পরিকল্পনার মধ্যে হয়তো ব্রিটিশদেরই কোনও একটা গোপন চক্রান্ত রয়েছে— রাশিয়া ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক বিষিয়ে দেওয়ার চক্রান্তই নিশ্চয়ই। যা দাঁড়াল, তাতে পিলগারের সিদ্ধান্ত, “যাত্রার পরের অংশটি নিশ্চিত করতে মস্কোর সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে বসাটা খুবই জরুরি।” কাবুলের ইতালীয় রাষ্ট্রদূত রোমকে ইতিমধ্যেই সব জানিয়েছেন, জানালেন পিলগার।৩৩ ৮ ফেব্রুয়ারি বার্লিনের ইতালীয় কূটনীতিক জার্মান বিদেশমন্ত্রকের আর্নস্ট ওরমান-এ সঙ্গে কথা বললেন। জানালেন মস্কোর যে ইতালি দূতাবাস, তারা দেখবে যাতে রাশিয়া হয়ে ঠিকঠাক জার্মানি পৌঁছতে পারেন সুভাষ। ওরমান লিখলেন, জার্মান মন্ত্রীর অনুমতি পেলে ইতালীয় রাষ্ট্রদূত মস্কোর জার্মান রাষ্ট্রদূত “কাউন্ট শুলেনবার্গ-এর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন”।৩৪

বার্লিন আর মস্কোর উচ্চতম স্তরের অনুমতি মেলার আগে অবধি সুভাষকে কাবুলের জার্মানদের সঙ্গে সংযোগ রেখে চলতেই হবে। সিমেন্স কোম্পানির হের টমাস-এর মাধ্যমে সেই সংযোগ রইল। এ দিকে রহমত খান ও জিয়াউদ্দিনের পক্ষে সরাই-এ থাকাটা ক্রমশই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, এক জন সন্দিহান আফগান পুলিশ সমানে সেখানে যাওয়া-আসা করছে। শেষ তাকে ঘুষ দিতে হল, প্রথমে টাকা, তার পর অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাবার দেওয়া সুভাষের সোনার হাতঘড়িটি। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ভগত রাম পেশোয়ারের এক পুরনো পরিচিতকে খুঁজে বার করলেন— উত্তমচাঁদ মালহোত্র, কাবুলের ভারতীয় চত্বরে তাঁর একটি দোকান আছে, সুভাষকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে যেতে সম্মত হলেন। তবে প্রতিবেশীরা কী প্রশ্ন করবে এই সব ভেবে উত্তমচাঁদ এমনই দুশ্চিন্তা শুরু করলেন যে সুভাষ ক’দিনের মধ্যেই সেই জায়গা ছেড়ে দিলেন। কিন্তু তাঁর শরীরের এমনই মন্দ হাল তখন যে অবস্থা একটু নিরাপদ হতেই আবার তাঁকে ফিরতে হল সেখানেই। জার্মানি থেকে খবর আসতে দেরি হচ্ছে দেখে ভগত রাম ক্রমেই উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। ভাবতে লাগলেন, তবে কি আফগান-সোভিয়েত সীমান্তের কাছে তখন তাঁর পেশোয়ারের যে পরিচিত ব্যক্তি পলাতক অবস্থায় রয়েছে, তার সাহায্য নিয়েই সুভাষকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পার করে দেওয়ার বন্দোবস্ত করবেন?৩৫

এমন এক সংকটময় মুহূর্তে সিমেন্স-এর হের টমাসের কাছ থেকে খবর এল, সুভাষচন্দ্র বসু যদি নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে এখনও প্রস্তুত থাকেন, তিনি যেন ইতালির রাষ্ট্রদূত পিয়েত্রো কুয়ারোনির সঙ্গে দেখা করেন। ১৯৪১-এর ২২ ফেব্রুয়ারি সুভাষ কাবুলের ইতালীয় কূটনৈতিক দফতরে এলেন, সারা রাত ধরে কুয়ারোনির সঙ্গে তাঁর আলোচনা চলল। কুয়ারোনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন মানুষটিকে দেখে, কিছু দিন পর তিনি যাঁর বর্ণনা দেবেন: “বুদ্ধিদীপ্ত, করিত্কর্মা, আবেগপূর্ণ মানুষ, অথচ ভারী বাস্তববাদী, সম্ভবত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতাদের মধ্যে একমাত্র বাস্তববাদী মানুষ।”৩৬ আফগানিস্তান থেকে বেরোনোর আর কী কী উপায় থাকতে পারে, সেই আলোচনা হল। কুয়ারোনি তখন ইতালি থেকে কিছু কাগজপত্রের অপেক্ষায় রয়েছেন: তার মধ্যে থাকার কথা সুভাষের ব্যবহারের জন্য একটি পাসপোর্ট, যদি অবশ্য রুশরা তাঁকে ট্রানজিট ভিসা দিতে রাজি হয়, তবেই। অন্যথা সুভাষ ইরান ও ইরাকের মধ্য দিয়ে ইউরোপে যেতে পারেন। আফগান-সোভিয়েত সীমান্ত দিয়ে সুভাষের নিজের দায়িত্বে এগিয়ে চলার পরিকল্পনাটি শোনামাত্রই বাতিল করে দিলেন তিনি।৩৭

সুভাষের প্রতি খুবই সদয় ব্যবহার করলেন ইতালীয়রা। এ দিকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশদের হাতে পড়ল একটি ইতালীয় টেলিগ্রাম, তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি, তাতে ইঙ্গিত মিলল যে তাঁদের অধরা শত্রু সম্ভবত এই মুহূর্তে কাবুলে রয়েছেন। ৭ মার্চ ব্রিটেনের স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ (SOE) ইস্তানবুল ও কায়রোয় তাঁদের প্রতিনিধিদের জানিয়ে দিল যে, “মনে হচ্ছে বোস এখন আফগানিস্তান থেকে ইরান, ইরাক ও তুরস্ক হয়ে জার্মানির দিকে যাচ্ছেন, তাঁর হাতে কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে,” সুতরাং “তাঁর নিধনের কী ব্যবস্থা হতে পারে তারযোগে জানাও।”৩৮ বাস্তবে অবশ্য সুভাষ মধ্য প্রাচ্যের পথ ধরলেন না। ৩ মার্চ জার্মান রাষ্ট্রদূত মস্কো থেকে বার্লিনে কাউন্ট শুলেনবার্গ-এর তার গেল: ‘কমিসারিয়াট ফর এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স’ জানাচ্ছে সোভিয়েত সরকার সুভাষকে রাশিয়া হয়ে আফগানিস্তান থেকে জার্মানি যাওয়ার ভিসা দিতে প্রস্তুত। কমিসারিয়াটকে অনুরোধ করা হয়েছে কাবুলের সোভিয়েত দূতাবাসকেও এই খবর জানিয়ে দিতে।৩৯

সুভাষ এ দিকে নিজেকে তখন ব্যস্ত রেখেছেন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রবন্ধ লেখার কাজে। এই প্রবন্ধে তিনি নিজের রাজনৈতিক কর্মপন্থা ব্যাখ্যা করছেন। হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ ব্যবহার করে বলেছেন, ইতিহাসের প্রতিটি পর্বেই কোনও দক্ষিণপন্থী ভাবনার যোগ্য একটি বামপন্থী ভাবনা উঠে আসে, এবং দুয়ে মিলে তৈরি হয় উচ্চতর ভাবনা বা পরিস্থিতি। মজার ব্যাপার, তিনি দেখালেন গাঁধী কী ভাবে তাঁর “ইয়ং ইন্ডিয়া” পর্বে (১৯২০-১৯২২) নরমপন্থী সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদের দক্ষিণপন্থী ‘থিসিস’-এর উত্তরে তাঁর বামপন্থী “অ্যান্টিথিসিস”টি নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর মতে ভারতীয় রাজনীতির “সত্যিকারের বামপন্থা”র দুটিই শর্ত— আবার সেগুলি উল্লেখ করলেন এখানে— বর্তমানে আপসহীন সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পর সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন। কংগ্রেসের মধ্যে তাঁর যে নেহাতই শিশু ‘প্রেশার গ্রুপ’ ফরওয়ার্ড ব্লক— যাকে ত্যাগ করে তিনি বিদেশে মুক্তি বাহিনী তৈরি করতে উদ্যোগী, সেই দল সম্বন্ধে তাঁর চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি প্রকাশ করলেন, “ইতিহাস ক্রমে বেনো জল সরিয়ে দেবে, সত্যিকারের বামপন্থীদের থেকে তথাকথিত বামপন্থীদের আলাদা করে দেবে।” তাঁর দাবি, তাঁর ফরওয়ার্ড ব্লক কংগ্রেসকে এক দিন “কানাগলি এবং মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল,” “কংগ্রেসকে আবার আন্দোলনের পথে নিয়ে এসেছিল, যতই অপর্যাপ্ত হোক সেই আন্দোলন,” এবং “কংগ্রেসের ভাবগত ও আদর্শগত অগ্রগতির অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল”। জোর দিয়ে বললেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে” “কংগ্রেসের মধ্যে বামপন্থারই উত্থান হবে যাতে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ উন্নতি অব্যাহত থাকে।” “আর তথাকথিত বামপন্থীরা সুযোগমতো ব্রিটেনের যুদ্ধের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রটি ভুলে যাবেন, এও ভুলে যাবেন যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন কিন্তু নাত্সি সরকারের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।”৪০

জার্মান, রুশ, ইতালীয়রা সকলে একসঙ্গে সাহায্য করল যাতে ব্রিটিশ ঘাতকদের নজর এড়িয়ে আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন সুভাষ। ১৯৪১-এর ১০ মার্চ ইতালীয় রাষ্ট্রদূতের অভিজাত-গোত্রীয় পত্নী মিসেস কুয়ারোনি সুভাষের জন্য বার্তা নিয়ে এলেন উত্তমচাঁদের দোকানে। সুভাষের ছবি তোলা দরকার, নতুন এক সেট জামাকাপড়ও দরকার। সেই ছবি লাগানো হবে ইতালীয় কূটনৈতিক দূত অরল্যান্ডো মাজোটার পাসপোর্টে, জিয়াউদ্দিন তার পর নতুন পরিচয় লাভ করবেন। ১৭ মার্চের রাতে আর এক ইতালীয় কূটনীতিক সিনিয়োর ক্রেসিনির বাড়ি নিয়ে যাওয়া হল তাঁকে। তাঁর হাতে সুভাষ তুলে দিলেন নিজের ওই রাজনৈতিক লেখাটি, যার মাথায় কয়েক দিন পরের তারিখ ২২ মার্চ বসানো রয়েছে।— দেশবাসীর প্রতি তাঁর এক বার্তা— “ইউরোপের কোনও এক স্থান থেকে”। সঙ্গে দিলেন একটি ব্যক্তিগত চিঠিও— ভগত রাম সেটি কলকাতায় তাঁর ভাই শরৎ কিংবা ভাইপো শিশিরের হাতে দিয়ে আসবেন। অরল্যান্ডো মাজোটার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ভোর হওয়ার আগেই একটি গাড়িতে কাবুল থেকে বেরিয়ে পড়লেন সুভাষ, সঙ্গে রইলেন ওয়েগনার নামে এক জার্মান ইঞ্জিনিয়ার এবং আরও দুই ব্যক্তি। হিন্দুকুশ পাহাড় পেরিয়ে, অক্সাস নদীর কাছে আফগান সীমান্ত ছাড়িয়ে গাড়ি ঢুকল ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ শহর সমরখন্দ্-এ। এখান থেকে সুভাষ ও তাঁর সঙ্গীরা মস্কোর ট্রেনে চড়বেন। “অরল্যান্ডো মাজোটার ইতালীয় পাসপোর্ট-সহ বোস আজ দূতাবাসে এসেছিলেন,” ৩১ মার্চ মস্কো থেকে কাউন্ট শুলেনবার্গ তার করলেন— সঙ্গে এও যোগ করলেন, বার্লিন পৌঁছেই সুভাষ “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদেশ মন্ত্রকে” দেখা করতে চান।৪১

“আমার এই চিঠি পেয়ে তুমি একেবারে অবাক হয়ে যাচ্ছ নিশ্চয়ই,” এমিলিকে লিখলেন সুভাষ, “আরও অবাক হবে জেনে যে এই চিঠি লিখছি বার্লিনে বসে।”৪২ আগের দিন বিকেলে জার্মান রাজধানীতে উড়ে এসেছেন তিনি। ইতিহাসের মস্ত পরিহাস— সুভাষচন্দ্র বসু, ১৯৩৮-’৩৯-এ যিনি জাতীয় কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বামপন্থী সমাজবাদের ধ্বজাধারী ছিলেন, আজ এই যুদ্ধের পৃথিবীতে তিনিই এখন বার্লিনে বসে। তবে এই আশ্চর্য ঘটনার আসল হেতুটি কিন্তু লুকিয়ে আছে জার্মান ও ইতালির যুদ্ধবন্দি ক্যাম্পের মধ্যে। ১৯২১-এ আই সি এস ছেড়ে দিয়ে সুভাষ গাঁধীর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন। দুটি দীর্ঘ দশক ধরে দেখেন কী ভাবে এই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণ-আন্দোলনগুলিতে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি-র সৈন্যরা কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রভাবিত থেকে গিয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকদের হুকুমই তারা নির্বিকার ভাবে পালন করে গিয়েছে। গোটা বিশ্ব জুড়ে উপনিবেশবিরোধী বিদ্রোহ দমন করেছে তারাই। ব্রিটিশ সম্রাটের প্রতি ভারতীয় সৈন্যদের এই প্রশ্নহীন আনুগত্যের উপর প্রবল ভাবে নির্ভর করে এসেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সুভাষ কিন্তু সর্বদা ভেবে গিয়েছেন: সাম্রাজ্যের প্রতি তাদের আনুগত্যের পাল্টা হিসেবে আরও এক বড় আদর্শ— ভারতের স্বাধীনতার আদর্শ— কি কোনও ভাবেই এদের মধ্যে প্রবেশ করানো যায় না? সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবীদের মনে এই প্রশ্ন অনেক বারই এসেছে, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যরক্ষার দায়-দায়িত্ব থেকে সৈন্যদের জোর করে বার করে আনার কাজটি মোটেই তেমন সাফল্য পায়নি। আবার এক বার আন্তর্জাতিক যুদ্ধের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আবার এক বার এসেছে সেই সুযোগ। ভারতীয় সৈন্যরা যখন ব্রিটিশ শত্রুদেশের হাতে বন্দি হচ্ছে, সেই সুযোগ ব্যবহার করে আরও এক বার সুসংগঠিত প্রয়াসে তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড় করিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের বাইরে ভারতের মুক্তি বাহিনী যদি এই ভাবে গড়ে তোলা যায়, তবে তাদের দেখে দেশের মধ্যেও গণ-আন্দোলন শুরু হয়ে যেতে পারে। সুভাষ নিশ্চিত: দেশের অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি বাইরে থেকে সশস্ত্র আন্দোলন সংগঠিত করে তবেই ব্রিটিশ রাজকে ভারতের দাবি মানতে বাধ্য করা সম্ভব।

ইউরোপে গিয়ে কী ভাবে তাঁর রাজনৈতিক কর্তব্যকর্ম সাধন করবেন, সেই পরিকল্পনার মধ্যেই আর একটি বাসনাও সুভাষের মনে তীব্র হয়ে উঠছিল সে দিন: তাঁর এমিলির সঙ্গে আবারও মিলিত হওয়ার বাসনা। ১৯৩৯-এর জুন ও জুলাই-এ এমিলিকে লিখেছিলেন সম্ভবত সেপ্টেম্বরের গোড়ায় আবার সলজ্বার্গ-এ তাঁদের প্রিয় পার্বত্য রিসর্ট বাডগাস্টাইনে যেতে পারবেন।৪৩ ১ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে সেই ভ্রমণসূচির পরিবর্তন করতেই হয়েছিল। এই বার, ১৯৪১-এর এপ্রিলে সুভাষ এমিলিকে বার্লিনে তাঁর কাছে ডেকে পাঠালেন। বললেন, “প্লিজ তাড়াতাড়ি চিঠি দাও— অরল্যান্ডো মাজোটা, বার্লিন, হোটেল ন্যুর্নবার্গার হফ, আনহাল্টের বানহফ-এ কাছে।” “প্লিজ তোমার মা-কে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ো, তোমার বোনকে আমার শুভেচ্ছা।”৪৪ বেশি অপেক্ষা করতে হল না, বার্লিনে তাঁরা পুনর্মিলিত হলেন।

তবু, সুভাষের কাছে তো চির দিনই রাজনীতির পরে ব্যক্তিজীবনের স্থান। ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদবিরোধীর কাছে সে দিন বার্লিন কেবলই জার্মানির রাজধানী নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। বিশ শতকের গোড়ায় স্বদেশী যুগ থেকে বহু মানুষ ব্রিটিশ রাজ-এর বিরুদ্ধতা করতে এখানে এসে বসবাস করেছেন, ভারতীয় প্রবাসী সমাজ তৈরি করে তুলেছেন।৪৫ আপাতত সুভাষেরও গন্তব্য-লক্ষ্য এই বার্লিন— কেননা ব্রিটেনের সঙ্গে আজ জার্মানিই আরও এক বার যুদ্ধে প্রবৃত্ত। তবে যদি ভারতের স্বাধীনতার জন্য যথেষ্ট আশ্বাস না জোগাড় করা যায়, কিংবা কোনও কারণে যদি পরিস্থিতিই পাল্টে যায়, অবশ্যই বার্লিন ছাড়তে এক মুহূর্ত দ্বিধা করবেন না তিনি। ব্রিটিশ ভারত থেকে নাটকীয় ভাবে পালাতে পেরেছেন সুভাষ। জেলবন্দি জীবন না কাটিয়ে বিশ্ব জুড়ে তীব্রগতিতে বহমান ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে নিজেকে নিক্ষেপ করতে পেরেছেন। সুভাষ নিরাপদে ইউরোপে পৌঁছে যাওয়ার পর এ বার শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন শরৎচন্দ্র বসু। কবিকে জানালেন, তাঁর ভাই ঠিক কী করতে চলেছেন এখন। মৃত্যুর ঠিক আগে ১৯৪১-এ একটি ছোট গল্প লিখলেন রবীন্দ্রনাথ— তাতে দেখা গেল এক একাকী ভাগ্যান্বেষী মুক্তির লক্ষ্যে আফগানিস্তানের দুস্তর দুর্গম ভূমি পেরিয়ে চলেছেন।৪৬ যুধ্যমান বিশ্বের বিস্তীর্ণ পটভূমিতে একাকী মানুষটির সংগ্রামের বহু পথ, বহু পর্ব তখনও বাকি।

.

১. জোনাথন হলওয়েল-এর অতিরঞ্জিত “প্রত্যক্ষদর্শী” বিবরণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এই প্রচলিত কাহিনি। পরবর্তী কালে মেকলে এবং কার্জনের মাধ্যমে কাহিনিটি ছড়িয়ে পড়ে। দ্রষ্টব্য, নিকোলাস ডার্কস্, দ্য স্ক্যান্ডাল অব এম্পায়ার (কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস্ হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৬), পৃ: ১-৫; ব্রিজেন কে গুপ্তা, সিরাজ-উদ্-দৌলা অ্যান্ড দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৭৫৬-১৭৫৭: ব্যাকগ্রাউন্ড টু দ্য ফাউন্ডেশন অব ব্রিটিশ পাওয়ার ইন ইন্ডিয়া (লাইডেন: ই জে ব্রিল, ১৯৬৬), পৃ: ৭০-৮০।

২. সুভাষচন্দ্র বসু, “হিজ এক্সেলেন্সি” বাংলা প্রদেশের গভর্নর, মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রি-পরিষদকে লেখা চিঠি, ২৬ নভেম্বর, ১৯৪০, সুভাষচন্দ্র বসু, দি অলটারনেটিভ লিডারশিপ: নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, কালেকটেড ওয়ার্কস্, দশম খণ্ড, শিশিরকুমার বসু এবং সুগত বসু [সম্পাদিত] (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, দিল্লি: পার্মানেন্ট ব্ল্যাক, ১৯৯৮, ২০০৪), পৃ: ১৯৭।

৩. সুভাষচন্দ্র বসু, মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রি-পরিষদকে লেখা চিঠি, ২ ডিসেম্বর, ১৯৪০, তদেব, পৃ: ১৯৯।

৪. গভর্নর জন হারবার্ট, ভাইসরয় লিনলিথগোকে লেখা চিঠি, ২২ অগস্ট, ১৯৪০, এল/পি অ্যান্ড জে/এস/১৪৭ (আই ও আর, বি এল)।

৫. ভাইসরয় লিনলিথগো, ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেটকে লেখা চিঠি, ৬ ডিসেম্বর, ১৯৪০, এল/পি অ্যান্ড জে/৫৫৬২ (আই ও আর, বি এল)।

৬. গভর্নর জন হারবার্ট, ভাইসরয় লিনলিথগোকে লেখা চিঠি, ১১ ডিসেম্বর, ১৯৪০, এল/পি অ্যান্ড জে/এস/১৪৭ এবং আর/৩/২/১৬ (আই ও আর, বি এল)।

৭. ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে বাডগাস্টাইনে যে ব্যক্তি ছবিগুলি তোলেন, ১৯৪০ সালে তিনি বসুর শয়নকক্ষে এগুলি দেখতে পান। দ্রষ্টব্য, এ কে চেট্টিয়ার, আই মিট সুভাষ-বাবু, দি ওরাকল, ২৮, ১ নম্বর (জানুয়ারি ২০০৮)।

৮. হারবার্ট, লিনলিথগোকে লেখা চিঠি, ১১ ডিসেম্বর, ১৯৪০, এল/পি অ্যান্ড জে/এস/১৪৭ এবং আর/৩/২/১৬ (আই ও আর, বি এল)।

৯. এজেন্ট সি ২০৭, “সিক্রেট” ফাইলের রিপোর্ট, “অ্যাক্টিভিটিস্ অব সুভাষ চন্দ্র বোস সিন্স হিজ রিলিজ ফ্রম জেল অন ৫.১২.৪০,” আর/৩/২/১৬-১৭-১৮ (আই ও আর, বি এল), পৃ: ২। অন্তত চোদ্দো জন পুলিশের চর বসুর ওপর নজর রাখছিল; তাদের সংখ্যা এ এস ৯৫, এ এস ২৪৯, সি ১০৭, সি ১১২, সি ১১৫, সি ১১৬, সি ১৯৫, সি ২০৭, সি বি ১৮, সি বি ২১, জে পি ৯৭, জে পি ৩১২, টি এল ৩১, এবং টি পি ৫২। এদের রিপোর্টগুলি এই তথ্যপঞ্জিতে সংকলিত আছে।

১০. শিশিরকুমার বসু, দ্য গ্রেট এসকেপ (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, ২০০০), পৃ: ৪।

১১. তদেব, পৃ: ৭।

১২. এজেন্ট সি ২০৭, “সিক্রেট” ফাইলের রিপোর্ট, “অ্যাক্টিভিটিস্ অব সুভাষ চন্দ্র বোস,” পৃ: ২।

১৩. শিশিরকুমার বসু, গ্রেট এসকেপ, পৃ: ১৪-১৮; মিঞা আকবর শাহ, “নেতাজি’স্ এসকেপ: অ্যান আনটোল্ড চ্যাপ্টার,” বসু, গ্রেট এসকেপ, অ্যাপেনডিক্স ১, পৃ: ৭৫।

১৪. বসু, অলটারনেটিভ লিডারশিপ, পৃ: ১৫৫।

১৫. “সিক্রেট” ফাইল, “অ্যাক্টিভিটিস্ অব সুভাষ চন্দ্র বোস,” পৃ: ৫। একই দিনে সি বি ২১ নামক চর রিপোর্ট করল যে, ২৬ জানুয়ারির (১৯৪১) স্বাধীনতা দিবসে বিক্রয় করের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন শুরু করার পরিকল্পনা করছেন সুভাষ।

১৬. শিশিরকুমার বসু, গ্রেট এসকেপ, পৃ: ২৪-২৮।

১৭. তদেব, পৃ: ২৮-৩১।

১৮. শিশিরকুমার বসু, বসুবাড়ি (কলকাতা: আনন্দ, ১৯৮৫), পৃ: ১১১।

১৯. শিশিরকুমার বসু, গ্রেট এসকেপ, পৃ: ৩১-৩৯।

২০. তদেব, পৃ: ৩৯-৪০। শিশিরকুমার বসু, মহানিষ্ক্রমণ, (কলকাতা: আনন্দ, ১৯৭৫), পৃ: ৫২।

২১. মিঞা আকবর শাহ, “নেতাজি’স্ গ্রেট এসকেপ,” পৃ: ৭৮-৮১; কৃষ্ণা বসু, “নেতাজির সঙ্গে মিঞা আকবর শাহ,” কৃষ্ণা বসু, প্রসঙ্গ সুভাষচন্দ্র (কলকাতা: আনন্দ, ১৯৯৩), পৃ: ১১৭-১২৫।

২২. মিঞা আকবর শাহ, “নেতাজি’স্ গ্রেট এসকেপ,” পৃ: ৭৮-৮১; ““ভগত রাম’স্ স্টোরি,”” ১৯৪২ সালের নভেম্বরে গ্রেফতার হওয়ার পর ভগত রাম তলওয়ারকে জেরার রিপোর্ট, ডব্লিউ ও ২০৮/৭৭৩ (টি এন এ), পৃ: ১-২; ভগত রাম তলওয়ার, “মাই ফিফ্‌টি-ফাইভ ডেজ্ উইথ নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস,” শিশিরকুমার বসু (সম্পাদিত), নেতাজি অ্যান্ড ইন্ডিয়া’জ ফ্রিডম (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, ১৯৭৫), পৃ: ১৫৯-১৬১। ভগত রাম তলওয়ারের বিবরণ কিছুটা ভ্রান্ত। প্রকৃত তারিখগুলি আমি অন্যান্য সূত্র থেকে মিলিয়ে নিয়েছি। দ্রষ্টব্য, শিশিরকুমার বসু, গ্রেট এসকেপ, পৃ: ৬০।

২৩. মিঞা আকবর শাহ, “নেতাজি’স্ গ্রেট এসকেপ,” পৃ: ৮৫; ““ভগত রাম’স্ স্টোরি,”” ডব্লিউ ও ২০৮/৭৭৩ (টি এন এ), পৃ: ২; ভগত রাম তলওয়ার, “মাই ফিফ্‌টি-ফাইভ ডেজ্,” পৃ: ১৬১-১৭৭; শিশিরকুমার বসু, গ্রেট এসকেপ, পৃ: ৬০। ভগত রাম তলওয়ারের বিবরণের অশুদ্ধ অংশগুলি আমি প্রকৃত তারিখ বসিয়ে সংশোধন করে দিয়েছি।

২৪. শিশিরকুমার বসু, গ্রেট এসকেপ, পৃ: ৪০-৪৩।

২৫. ভাইসরয় লিনলিথগো, সেক্রেটারি অব স্টেটকে লেখা চিঠি, ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪১, এল/পি অ্যান্ড জে/৪০০ (বি এল, আই ও আর)।

২৬. গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, হোম ডিপার্টমেন্ট, পলিটিক্যাল কনফিডেনশিয়াল ফাইল ১৩৫/৪১ (এন এ আই)।

২৭. শিশিরকুমার বসু, রিমেমবারিং মাই ফাদার (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, ১৯৮৮), পৃ: ১০৮-১০৯।

২৮. হোম পলিটিক্যাল ১৩৫/৪১ (এন এ আই); জে ভি বি জ্যানভ্রিন, গোপন রিপোর্ট “সুভাষ বোস”, ২৭ জানুয়ারি, ১৯৪১; স্পেশাল ব্রাঞ্চ, কলকাতা থেকে জে ভি বি জ্যানভ্রিন লিখছেন, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো, নয়া দিল্লির জি এইচ পাক্ল-এর উদ্দেশ্যে, ২৯ জানুয়ারি, ১৯৪১, আর/৩/২/২০-২১-২২ (আই ও আর, বি এল)।

২৯. জে জি লেইথওয়েট, ভাইসরয়’স হাউস, নয়া দিল্লি থেকে লিখছেন এম ও কার্টারকে, গভর্নর’স্ হাউস, কলকাতা, ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১, আর/৩/২/২০ (আই ও আর, বি এল)।

৩০. হোম পলিটিক্যাল ১৩৫/৪১ (এন এ আই)।

৩১. শিশিরকুমার বসু, গ্রেট এসকেপ, পৃ: ৪০।

৩২. ““ভগত রাম’স্ স্টোরি,”” ডব্লিউ ও ২০৮/৭৭৩ (টি এন এ), পৃ: ২; ভগত রাম তলওয়ার, “মাই ফিফ্‌টি-ফাইভ ডেজ্,” পৃ: ১৮০-১৮৫।

৩৩. কাবুল থেকে পিলজারের টেলিগ্রাম, বার্লিনে রাইখ-এর বিদেশমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে, ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১, পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (জি এফ ও আর্কাইভস্)।

৩৪. ওরমান, স্টেট সেক্রেটারিকে লেখা চিঠি, ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১, পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (জি এফ ও আর্কাইভস্)।

৩৫. “ভগত রাম’স্ স্টোরি,” ডব্লিউ ও ২০৮/৭৭৩ (টি এন এ), পৃ: ৩; ভগত রাম তলওয়ার, “মাই ফিফ্‌টি-ফাইভ ডেজ্,” পৃ: ১৯২-২১০।

৩৬. কাবুল থেকে কুয়ারোনির চিঠি, রোমে ইতালীয় বিদেশমন্ত্রকের উদ্দেশ্যে, “প্ল্যান অব ইন্ডিয়ান রেভোলিউশন: রিপোর্ট অব অ্যান ইন্টারভিউ, কাবুল, এপ্রিল ২, ১৯৪১, সাব: সুভাষ চন্দ্র বোস— হিজ প্রোপোজালস্ অ্যাবাউট ইন্ডিয়া, ইন কন্টিনিউয়েশন অব টেলিগ্রাম নম্বর ১২৪,” সুভাষচন্দ্র বসু, আজাদ হিন্দ: রাইটিংস্ অ্যান্ড স্পিচেস্ ১৯৪১-১৯৪৩, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, কালেকটেড ওয়ার্কস্, একাদশ খণ্ড, শিশিরকুমার বসু এবং সুগত বসু [সম্পাদিত] (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, দিল্লি: পার্মানেন্ট ব্ল্যাক, ১৯৯৮, ২০০২), পৃ: ৩৬।

৩৭. ভগত রাম তলওয়ার, “মাই ফিফ্‌টি-ফাইভ ডেজ্,” পৃ: ২১৫।

৩৮. স্পেশাল অপারেশনস্ এগজিকিউটিভ (এস ও ই) ওয়ার ডায়রি, ৭ মার্চ, ১৯৪১, এইচ এস ৭/২১৭ (টি এন এ)।

৩৯. মস্কো থেকে কাউন্ট ফ্রেডরিখ ওয়ার্নার ফন ডের শুলেনবুর্গের চিঠি, বার্লিনে জার্মান বিদেশমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে, ৩ মার্চ, ১৯৪১, পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (জি এফ ও আর্কাইভস্)।

৪০. সুভাষচন্দ্র বসু, “ফরওয়ার্ড ব্লক: ইটস্ জাস্টিফিকেশন,” কাবুল থিসিস, মার্চ ১৯৪১, বসু, আজাদ হিন্দ, পৃ: ১৩-১৪, ২৭-২৯, ৩১। হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপিটি রয়েছে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর মহাফেজখানায়।

৪১. মস্কো থেকে কাউন্ট ফ্রেডরিখ ওয়ার্নার ফন ডের শুলেনবুর্গের চিঠি, বার্লিনে জার্মান বিদেশমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে, ৩১ মার্চ, ১৯৪১ (জি এফ ও, মাইক্রোফিল্ম, এন আর বি)।

৪২. সুভাষচন্দ্র বসু, লেটারস্ টু এমিলি শেঙ্কল, ১৯৩৪-১৯৪২, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, কালেকটেড ওয়ার্কস্, সপ্তম খণ্ড, শিশিরকুমার বসু এবং সুগত বসু [সম্পাদিত] (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, দিল্লি: পার্মানেন্ট ব্ল্যাক, ১৯৯৪, ২০০৪), পৃ: ২১৬।

৪৩. সুভাষচন্দ্র বসু, এমিলি শেঙ্কলকে লেখা চিঠি, ১৫/২১ জুন, ১৯৩৯, এবং ৪/৬ জুলাই, ১৯৩৯, তদেব, পৃ: ২১৪-২১৫।

৪৪. সুভাষচন্দ্র বসু, এমিলি শেঙ্কলকে লেখা চিঠি, ৩ এপ্রিল, ১৯৪১, তদেব, পৃ: ২১৭।

৪৫. দ্রষ্টব্য, ক্রিস মাঞ্জাপ্রা, “দ্য মিররড্ ওয়ার্ল্ড” (পি এইচ ডি ডিসার্টেশন, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ২০০৭)।

৪৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে শরৎচন্দ্র বসুর সাক্ষাৎ, দ্রষ্টব্য, শিশিরকুমার বসু, বসুবাড়ি, পৃ: ১৪২। রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পটির নাম “বদনাম”।