মৃত্যুহীন প্রাণ
তাঁর মতো সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল, তাঁকে হারিয়ে আজ আমাদেরও সাহসী হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে।
—শিশিরকুমার বসু, বিভাবতী বসুকে লেখা, ২৭ অগস্ট ১৯৪৫
.
১৯৪৫-এর অগস্টের শেষ। এমিলি তাঁর ভিয়েনার বাড়ির রান্নাঘরে ব’সে, সঙ্গে তাঁর মা আর বোন। এমিলির হাতে একটা উলের গোলা, উল পাকাতে পাকাতে প্রতি দিনের মতো রেডিয়োয় সন্ধের খবর শুনছেন তাঁরা। হঠাৎই সংবাদপাঠকের ঘোষণা, ভারতের “দেশদ্রোহী” সুভাষচন্দ্র বসু তাইহোকু (তাইপে) বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত। মা এবং বোন স্তব্ধ বিস্ময়ে ফিরে তাকালেন এমিলির দিকে। ধীরে উঠে দাঁড়ালেন এমিলি, নিজের শয়নকক্ষে চলে গেলেন। সেখানে ঘুমিয়ে রয়েছে তাঁর শিশুকন্যা অনিতা। শয্যার পাশে হাঁটু মুড়ে বসলেন তিনি, এবং— অনেক দিন পর নিজের মুখে বলেছিলেন— “এবং, কাঁদতে লাগলাম।”১
২৪ অগস্ট, শুক্রবার বিকেল। পঞ্জাবের লায়লাপুর জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট তাঁর তরুণ বন্দি শিশিরকুমার বসুর সেল-এ এসে দাঁড়ালেন। “সত্যিই ভীষণ, ভীষণ দুঃখিত আমি,” বলে শিশিরের হাতে সে দিন সকালের ট্রিবিউন সংবাদপত্রটি ধরিয়ে দিলেন তিনি। শিশির দেখলেন— কাকার ছবি— ফরমোসা (তাইওয়ান) দ্বীপে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর খবর। সপ্তাহে যত চিঠি লেখার অনুমতি আছে তাঁর, সেই সীমা ইতিমধ্যেই শেষ, তাই পরের সোমবার, ২৭ অগস্ট, পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল তাঁকে। তার পর মাকে লিখলেন, কী ভাবে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সাহসী মানুষটিকে হারিয়ে তাঁদের আজ সাহসী হতে চেষ্টা করতে হবে। মাঝের দুই দিন সমানেই বাবার কথা ভেবেছেন শিশির। “বাড়িতে তোমরা সবাই কেমন আছ, বিশেষত বাবার শরীর কেমন আছে, জানতে উৎকণ্ঠায় রইলাম,” মা-কে লিখলেন। “প্লিজ আমার জন্য চিন্তা কোরো না, আমি ঠিকই থাকব।”২
শরৎচন্দ্র বসু তখন সুদূর দক্ষিণ ভারতের কুন্নুরে বন্দি। তিনি সেখানে অন্য সংবাদপত্র পেতেন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং দ্য হিন্দু। কিন্তু— “বিমান দুর্ঘটনার ফলে সুভাষের মৃত্যু”-র সেই “হৃদয়বিদারক খবর” ছিল তাতেও। একেবারে ভেঙে পড়লেন শরৎ। তিক্ত শোক বেরিয়ে এল তাঁর কলমে: “হায় মাতা! আর কত প্রাণ তোমার যূপকাষ্ঠে বলি দেব আমরা! নিষ্ঠুর মাতা, এত কঠিন তোমার আঘাত! এই শেষ আঘাত যেন সবচেয়ে কঠোর, সবচেয়ে নিষ্ঠুর.. তুমিই জানো তোমার কী ইচ্ছা পূর্ণ হল এতে। কী দুর্বোধ্য তোমার প্রকাশ!” চার-পাঁচটি রাত্রি আগে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন সুভাষ। “এই বাংলোর বারান্দায় সে দাঁড়িয়ে, আরও যেন দীর্ঘদেহী হয়ে উঠেছে সে। তার মুখটি দেখতে ঝাঁপিয়ে সামনে গেলাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে মিলিয়ে গেল।”৩
ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতাদের মধ্যে সরোজিনী নাইডু ছিলেন কবি। দেশ জুড়ে সে দিন শোক ও সম্মানের যে প্রবাহ, তার অসামান্য প্রকাশ ঘটল তাঁরই হাতে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, দেশের “কোটি কোটি নারীপুরুষের কাছে” নেতাজির মৃত্যুসংবাদ কেমন “গভীর, ব্যক্তিগত শোকের” সমান। নেতাজির জাপানি সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি সমর্থন করেননি, তবে বুঝেছিলেন কেন, কোন্ তাড়নায় সুভাষ এই পথে এগোতে চাইছেন। “তাঁর মধ্যে একটি আত্মপ্রত্যয়ী, নাছোড়বান্দা, জোরালো সত্তা” রয়েছে, সেই সত্তা যেন “কোষমুক্ত দীপ্ত তরবারির মতো। তাঁর মাতৃভূমিকে তিনি সর্বস্ব দিয়ে আরাধনা করেছেন, তার প্রতিরক্ষার জন্যই উন্মুক্ত সেই তরবারি। তাঁর দেশ এবং দেশবাসীর জন্য যে ভাবে তিনি নিজের প্রাণ বিসর্জন দিলেন, এর চেয়ে বড় কোনও ভালবাসা কি মানুষের পক্ষে ভাবাও সম্ভব।”৪
যুদ্ধশহিদ
১৯৪৫-এর ১৭ অগস্ট শেষ-বিকেলে, সায়গন বিমানবন্দর থেকে নেতাজি রওনা হয়ে গেলেন। যে পাঁচ জন ভারতীয় সঙ্গী পিছনে পড়ে থাকলেন, তাঁরা তাড়াতাড়ি আর একটি বিমানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য জাপানিদের অনুনয়-বিনয় শুরু করলেন, যাতে তাঁরা চটপট তাঁদের নেতার সঙ্গে মিলিত হতে পারেন। লাভ হল না কোনও। শেষ পর্যন্ত ২০ অগস্ট, টোকিয়োগামী একটি বিমানে একটিমাত্র আসন দিতে পারল জাপানিরা। ভারতীয়রা এস এ আইয়ারকে নির্বাচন করলেন এই সুযোগ গ্রহণ করতে। আইয়ার বিমানে উঠতে যাবেন, এমন সময়ে জাপানি নৌবাহিনীর রিয়ার-অ্যাডমিরাল চুডা কী একটা বলে উঠলেন চেঁচিয়ে, আইয়ারের মনে হল “আথারজি মৃত” জাতীয় কিছু একটা বললেন তিনি। আইয়ার ভাবতে লাগলেন, উনি কি চ্যাটার্জি বলতে চাইলেন? “না, নেতাজি,” বম্বার ইঞ্জিনের গর্জন ক্রমেই বেড়ে চলেছে, “চন্দ্র বোস ‘ককা’ (এক্সেলেন্সি)।” ক্যান্টনে বিমান পৌঁছলে আইয়ারকে সমস্ত ঘটনা জানালেন কর্নেল টাডা। ১৭ অগস্ট সায়গন ছেড়েছিলেন নেতাজি, সেই সন্ধেতেই তাঁর বিমান পৌঁছেছিল তুরেন (দা নাং)। সেখানে নেতাজি ও তাঁর সঙ্গী যাত্রীরা রাতের বিশ্রাম নেন। ১৮ অগস্ট সকালে আবার রওনা হন, নিরাপদেই বিকেল নাগাদ তাইপে পৌঁছন। তাইপে থেকে ছাড়ার পরই বিমান ভেঙে পড়ে।৫
“বিমান কি সমুদ্রের উপর ভেঙে পড়ল?” জানতে চাইলেন আইয়ার। উত্তর যদি হ্যাঁ হত, তবে তিনি ভাবতেন আবার একটা সাংঘাতিক পলায়ন-কাহিনি গোপন করার প্রয়াস চলছে, যাতে শেষতম প্রমাণটুকুও না থাকে সেই ব্যবস্থা ক’রে। কিন্তু তাঁকে হতাশ করে উত্তর এল, এয়ারফিল্ড-এর কাছেই বিমান মাটির উপর ভেঙে পড়ে। রুশ-বিশেষজ্ঞ জেনারেল সুনামাসা শিদেই-ও নেতাজির সঙ্গে যাচ্ছিলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ মারা যান। নেতাজি ও হাবিবুর রহমানকে মারাত্মক আহত অবস্থায় কাছেই একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। “নেতাজির জন্য আমাদের মেডিকেল অফিসাররা যথাসাধ্য করলেন, কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও নেতাজি…”। কর্নেল-এর গলা ধরে এল। “হাবিব কি বেঁচে আছেন, না তিনিও..?” আইয়ার জানতে চাইলেন। জানলেন, হাবিব বেঁচে আছেন। আইয়ার তক্ষুণি তাইপে যেতে চাইলেন, যাতে কী হয়েছে নিজের চোখে দেখতে পারেন। তাঁর বিমান কিন্তু তাইপে গেল না, গেল তাইচু, টোকিয়োর পথে পড়ে সে জায়গা। খুবই নাকি খারাপ আবহাওয়া সেখানে, আপাত ভাবে সেই জন্য এই সিদ্ধান্ত। তিক্ত স্বরে জাপানিদের বললেন আইয়ার, “তোমাদের এই নেতাজির বিমান-দুর্ঘটনার গল্প ভারত বা পূর্ব এশিয়ায় কোনও ভারতীয় বিশ্বাস করবে না।”৬
২৩ অগস্ট, পাঁচ ঘণ্টা বিলম্বের পর জাপানের ডোমেই এজেন্সি নেতাজির মৃত্যুসংবাদ সম্প্রচার করল। তাইপে থেকে খবরের জন্য টোকিয়োয় আবারও দু’ সপ্তাহের বেশি উদ্বিগ্ন অপেক্ষা। জাপানে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের প্রধান রামা মূর্তির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গেলেন আইয়ার, নেতাজির সাময়িক সরকারের সদস্য আনন্দ মোহন সহায়ের স্ত্রী ও কন্যার অতিথি হয়ে থাকলেন। ৮ সেপ্টেম্বর আয়ার ও রামা মূর্তি জাপানি ইম্পিরিয়াল আর্মির হেডকোয়ার্টার্সের থেকে খবর পেলেন, তাইপে থেকে টোকিয়ো এসেছেন হাবিব, তাঁর সঙ্গে নেতাজির দেহভস্ম। সেই দিন কিছু পরে তাঁর সঙ্গে তাঁদের দেখা হবে। যে ভস্মাধারে দেহভস্ম রাখা ছিল, সেটা আইয়ারের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। “প্রথমে একটি সাত-আট ইঞ্চি সাদা কাপড়ের টুকরো গোল করে তাঁর গলায় জড়িয়ে দেওয়া হল,” লেখেন আইয়ার, “তার পর কর্নেল সেই কাপড়ের মধ্যে ঘটটি রাখলেন, আমি দুই হাতে সেটি ধরলাম।” রামা মূর্তির বাড়িতে ভস্মাধারটিকে আনা হলে তাঁর স্ত্রী একটি উঁচু টেবিলে সেটিকে রেখে দুই পাশে ধূপ জ্বালিয়ে দিলেন, সামনে রাখলেন পুষ্পস্তবক। নেতাজির একটি ছোট্ট ছবি রাখা হল ভস্মাধারের উপর।৭
সেই রাতে রামা মূর্তির বাড়ি থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে মিসেস সহায়ের বাড়ি এলেন হাবিবুর রহমান। পরস্পরকে জয় হিন্দ্ বলাটুকুর অপেক্ষা, তার পরই প্রশ্নে প্রশ্নে হাবিবকে জর্জরিত করে দিলেন আইয়ার। হাবিবের বিষণ্ণ বর্ণনার সঙ্গে মিলে গেল জাপানি কর্নেলের কথা। তাইপে-তে ১৮ অগস্ট জ্বালানি নিতে থেমেছিল তাঁদের বিমান, যাত্রীরা ঠিক করলেন সেই সুযোগে কিছু খেয়ে নেবেন। তাইপে থেকে ওড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা কানফাটানো শব্দ। প্রথমটায় হাবিবের মনে হয়, নিশ্চয়ই শত্রুবিমান তাঁদের জাপানি বম্বারের দিকে গোলা চালাচ্ছে। পরে জানতে পেরেছিলেন, পোর্ট ইঞ্জিনের প্রপেলারটি ভেঙে গিয়েছিল। বিমান একেবারে সোজা মাটিতে আছড়ে পড়ে। চেতনা ফিরে এলে দেখেন বিমানের পিছন দিকটা সম্পূর্ণ মালপত্রে আটকানো, এ দিকে সামনে আগুনের লেলিহান শিখা। “আগেসে নিকলিয়ে নেতাজি!” হাবিব নেতার উদ্দেশে চিৎকার করে ওঠেন। দুই হাতে কোনওক্রমে আগুন থেকে বেরোনোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন নেতাজি, হাবিব পিছনে আসছেন। “বিমান আছড়ে পড়তে নেতাজির সুতির খাকি পোশাকের উপর ছিটকে পড়ল এক রাশ পেট্রোল, বিমানের সামনের দিকটা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করতে তাঁর গায়ে আগুন ধরে গেল।” সমস্ত পোশাক জ্বলছে, বিমানের বাইরে এসে তিনি বুশকোটের বেল্ট খুলে বেরোনোর চেষ্টা করছেন। তাঁকে সাহায্য করতে গিয়ে হাবিবের হাতদুটি গেল পুড়ে। বেল্ট নিয়ে ধস্তাধস্তির মধ্যেই নেতাজির মুখের দিকে তাকিয়ে প্রায় তাঁর হৃত্স্পন্দন থেমে যাওয়ার জোগাড়, তাঁর সমস্ত মুখ “লোহায় ক্ষতবিক্ষত, আগুনে ঝলসানো।” কয়েক মিনিট পর তাইপে এয়ারফিল্ডের মাটিতে পড়ে গেলেন দু’জনেই, শরীরের সব শক্তি নিঃশেষিত তখন।৮
এর পরই হাবিবের স্মৃতিতে যা রয়েছে— হাসপাতালের বিছানায় নেতাজির পাশে তিনি শুয়ে। পরের ছয় ঘণ্টা ধরে সমানেই নেতাজি চেতনা হারাচ্ছেন, আবার চেতনা ফিরে পাচ্ছেন, আবার হারাচ্ছেন। সমস্ত শরীরে নিশ্চয়ই অসহ্য যন্ত্রণা, কিন্তু এক বারও বলছেন না সে কথা। প্রলাপের মধ্যে আবিদ হাসানকে ডাকছেন। “হাসান ইয়াহাঁ নহি হৈ সাব, ম্যায় হুঁ, হাবিব”, বলার চেষ্টা করলেন হাবিবুর রহমান। জাপানি ডাক্তাররা অতিমানবিক চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাঁকে বাঁচানোর জন্য। নেতাজি কিন্তু জানেন, এই শেষ। হিন্দুস্থানিতে হাবিবকে বললেন, তাঁর যাওয়ার সময় হয়েছে। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত দেশের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন তিনি। হাবিব যেন তাঁর দেশবাসীকে বলে দেন, ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই না ছাড়তে, যেন বলে দেন, ভারত স্বাধীন হবেই, সে দিন আর বেশি দূরে নেই। সেই সন্ধেয়, ন’টা নাগাদ, শেষ হল নেতাজির নশ্বর জীবন। শান্তিতে।৯
শোকবিহ্বল হাবিব জাপানিদের অনুরোধ করলেন নেতাজির দেহ সিঙ্গাপুরে নিয়ে যেতে, বা সিঙ্গাপুর যদি খুব দূরে মনে হয়, তা হলে অন্তত টোকিয়োতে নিয়ে যেতে। তারা বলল নিশ্চয়ই চেষ্টা করবে। কিন্তু পরে জানা গেল, কিছু ব্যবহারিক অসুবিধা আছে। সুতরাং হাবিব তাইপে-তেই নেতাজির শেষকৃত্যে সম্মতি দিলেন। ২০ অগস্ট শেষকৃত্য হল। নেতাজির দেহভস্ম একটি ভস্মাধারে রেখে সেটিকে হাসপাতালের কাছেই নিশি হোনগানজি মন্দিরে রাখা হল। ৫ সেপ্টেম্বর হাবিব নেতাজির নশ্বর দেহের অবশিষ্ট বহন করে তাইপে-র অ্যাম্বুল্যান্স প্লেনে চড়লেন। লক্ষ্য— জাপান। তাঁর স্বপ্নের নেতার এই ভবিতব্য কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না আইয়ার, হাবিবের কাঁধে হাত রেখে পাগলের মতো বলে যাচ্ছেন, “কর্নেল সাহেব, ঈশ্বরের দিব্যি, আমাকে সত্যি কথা বলুন!” চোখে জল নিয়ে হাবিব উত্তর দিলেন, “আইয়ার সাহেব, কী করব আমি, যা যা বললাম সে সবই যে ভয়ানক রকম সত্যি।”১০
নেতাজি পুত্রস্নেহে দেখেছিলেন যে জনা-চল্লিশ তরুণ সেনাকে, রামা মূর্তির বাড়িতে তিন দিন ধরে দিনরাত তারা ভস্মাধারটি পাহারা দিল। তার পর সেটিকে নিয়ে যাওয়া হল মিসেস সহায়ের বাড়ি, তিন দিন ধরে চলল প্রার্থনা। ১৪ সেপ্টেম্বর টোকিয়োর সুগিনামি জেলায় ছোট একটি বৌদ্ধ মন্দির রেনকোজি-তে নিয়ে যাওয়া হল সেই ভস্মাধার। মন্দিরের পুরোহিত রেভারেন্ড মোকিজুকি একটি অন্ত্যেষ্টি-অনুষ্ঠান করলেন, রইলেন আইয়ার, রামা মূর্তি, তাঁর ভাই জয়া মূর্তি, রামা মূর্তির স্ত্রী, টোকিয়োর সেই ভারতীয় সেনানীরা, এবং জাপানি ফরেন অফিস ও ওয়ার অফিসের প্রতিনিধিরা। হাবিবুর রহমান আসতে পারলেন না, তাঁকে দখলকারী মার্কিন বাহিনী ডেকে নিয়ে গিয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ১৮ সেপ্টেম্বর, নেতাজির শেষ নিশ্বাস ত্যাগের ঠিক এক মাস পর, আরও এক বার পুষ্পার্ঘ্য নিয়ে সেই মন্দিরে এলেন ভারতীয়রা: তাঁর আত্মার শান্তি প্রার্থনার জন্য।১১
আইয়ার, হাবিব এবং মূর্তি ভ্রাতারা প্রায় রোজ দেখা করলেন টোকিয়োর সেই বিষণ্ণ শরতে। “টোকিয়োর ওমিয়া পার্কে দীর্ঘ গাছের ছায়ায় বেঞ্চের উপর বসে হাতে বাইবেল নিয়ে ফিরে ফিরে অ্যাক্টগুলি পড়তে” লাগলেন আইয়ার। “প্রার্থনা করলাম যাতে পিটার আমাকে শক্তি দেন, প্রার্থনা করলাম যাতে নেতাজির এই অবিশ্বাস্য কৃতিত্বের সত্যকারের বিবরণ দেওয়ার সুযোগ কখনও পাই।” প্রার্থনার ফল ফলল ৭ নভেম্বর। জেনারেল ম্যাকআর্থারের হেডকোয়ার্টার্স জাপানি ফরেন অফিসের মাধ্যমে তাঁকে নোটিস পাঠালেন, লাল কেল্লার বিচারের সূত্রে ভারতে মাউন্টব্যাটেনের হেডকোয়ার্টার্স থেকে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। ১৯ নভেম্বর আইয়ার এবং হাবিবুর রহমানকে বিচারের সাক্ষী হিসেবে টোকিয়ো থেকে দিল্লি উড়িয়ে আনা হল একটি মার্কিন বিমানে। ২২ নভেম্বর দিল্লি পৌঁছে দূর থেকে কেল্লার লাল চুনাপাথরের প্রাচীর চোখে পড়তেই হাবিব আইয়ারকে ছোট্ট করে একটা ঠেলা দিলেন। এই সেই জায়গা যেখানে ভারতের তেরঙা পতাকা উড়িয়ে দিয়ে বিজয়-কুচকাওয়াজ করার কথা ছিল নেতাজির। চার দিকে তারের বেড়া পেরিয়ে যেই তাঁরা দুর্গের মধ্যে ‘খাঁচা’ অংশটিতে পা রাখলেন, “জয় হিন্দ্” রবে তাঁদের অভ্যর্থনা জানাল উত্তাল বন্দিরা। লাল কেল্লার সেই খাঁচায় প্রবেশ করার পর আইয়ার চট করে এক কাপ চা গলায় ঢেলেই হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এক রাশ খবরের কাগজের উপর, ৫ নভেম্বর থেকে কাগজগুলিতে আই এন এ বিষয়ে একের পর এক রিপোর্ট। বুঝতে পারলেন, “দেশে আক্ষরিক অর্থেই একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছে আই এন এ, হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত উত্তেজনায় জ্বলছে, ইতিহাসে এমন কখনও ঘটেনি।” সামনে কাগজগুলি ছড়িয়ে রয়েছে— আমার “অবর্ণনীয় কষ্ট হতে লাগল, নেতাজিই বেঁচে রইলেন না, দিল্লি আসতে পারলেন না, নিজের চোখে দেখে যেতে পারলেন না তাঁর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অবিশ্বাস্য সেই অভিযান নিয়ে আজ কী প্রবল উন্মত্ততা চলছে গোটা দেশ জুড়ে।”১২
বিস্ময়, শোক, অবিশ্বাসে যখন গ্রস্ত ভারতীয়রা, ব্রিটিশ শাসনকর্তারা কিন্তু সুভাষের মৃত্যুর খবরে রীতিমতো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। তাঁদের সবচেয়ে নাছোড় পথের কাঁটাটি দূর হয়েছে, এ বার ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তাঁদের সিদ্ধান্ত, দীর্ঘ দিন কারাবদ্ধ রাজনৈতিক বন্দি শরৎচন্দ্র বসু ও বসু-পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তা হলে ছাড়া যেতে পারে। এ দিকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর-পরই সুভাষের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে, সম্ভব হলে তাঁকে গ্রেফতার করতে নয়া দিল্লি ফিনি এবং ডেভিস-এর নেতৃত্বে দুই দল গোয়েন্দা অফিসার পাঠায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ইতিহাসের পরিহাস, এই দলে সে দিন দু’জন বাঙালি পুলিস অফিসারও ছিলেন— এইচ কে রায় এবং কে পি দে। এইচ কে রায় ছিলেন মিস্টার ডেভিসের দলে। সেপ্টেম্বরে তাঁরা প্রথমে যান সায়গন, সেখান থেকে তাইপে। সায়গন বিমানবন্দরের দায়িত্বে থাকা জাপানি সামরিক অফিসার, তাইপে হাসপাতালের প্রধান মেডিকেল অফিসারের সাক্ষাৎকার নেন তাঁরা। যে দলটি ব্যাঙ্ককে যায়, তাদের হাতে এল ২০ অগস্টের একটি টেলিগ্রাম। সায়গনের জাপানের সাদার্ন আর্মির প্রধান সেনাপতি সেই টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন ব্যাঙ্ককের হিকারি কিকান-এর অফিসার-ইন-চার্জকে: তাতে ১৮ অগস্ট বিমান দুর্ঘটনার কথা লেখা, সেই রাতে সুভাষের মৃত্যুর কথাও। ওই তারের রিপোর্ট অনুযায়ী, সুভাষের দেহ টোকিয়োতে উড়িয়ে আনা হয়েছে। এই বিভ্রান্তির অংশটি ব্যাখ্যা করার জন্য কর্নেল টাডাকে টোকিয়ো থেকে সায়গনে ডেকে পাঠানো হয়। জানা যায় যে, এই বিভ্রান্তির কারণ: প্রথমে সুভাষের দেহ টোকিয়ো নিয়ে যাওয়ার নির্দেশই দেওয়া সত্ত্বেও পরে সেই পরিকল্পনামাফিক কাজ করা যায়নি। ফিনি-র রিপোর্টের নিশ্চিত সিদ্ধান্ত, ১৯৪৫-এর ১৮ অগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় সত্যিই মৃত্যু ঘটেছে সুভাষের।১৩
১৯৪৫-এর নভেম্বর থেকে ১৯৪৬-এর ফেব্রুয়ারি— আই এন এ-র নায়করা যে তুমুল অভিনন্দন পেলেন গোটা দেশ জুড়ে, ব্রিটিশরা তাতে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন। আবার চিন্তায় পড়লেন তাঁরা, এও সুভাষের একটা চাল নয়তো? আবারও তাঁদের ধোঁকা দিয়ে তিনি পালাননি তো? লালকেল্লার বিচারের পর প্রেমকুমার সহগল, শাহনওয়াজ খান আর গুরবক্স সিং ধিলোঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন ব্রিটিশ কম্যান্ডার-ইন-চিফ, এবং ছাড়া পাওয়ার পর তাঁরা তিন জন তখন ভারতের অভ্যন্তরেই আই এন এ-র রাজনৈতিক বিজয়ের জ্বলন্ত প্রতীক। ব্রিটেনের ইন্ডিয়ান আর্মি, রয়্যাল ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স এবং রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি-র ভারতীয় সৈন্যরা উত্তরোত্তর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির সৈন্যদের নৌবিদ্রোহ পূর্ণমাত্রায় শুরু হওয়ার পর, নয়া দিল্লির গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানের কাছ থেকে ১৯৪৬-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরে তাঁর সম-অবস্থানের প্রধানকর্তা একটি চিঠি পেলেন: ব্রিটিশদের প্রবল উদ্বেগ ফুটে উঠেছে সেই চিঠিতে, বোস “বাস্তবিক চিরতরে মারা গিয়েছেন” কি না জানার উদ্বেগ। এ দিকে ১৯৪৬-এর জানুয়ারির গোড়ায় গাঁধীজি জানিয়েছেন— তাঁর বিশ্বাস নেতাজি নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন, যথার্থ সময়ে তিনি নিশ্চয়ই এসে উপস্থিত হবেন। স্বভাবতই ব্রিটিশরা আরওই উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ল তা শুনে। নৌবিদ্রোহের ঠিক এক সপ্তাহ আগে সুভাষের বিষয়ে কথা বলার সময়ে বর্তমান কালের ক্রিয়া ব্যবহারের উপর জোর দিলেন গাঁধী। এ তাঁর অন্তরের প্রার্থনা। এ দিকে কংগ্রেসিরা ভুল করে ভাবতে শুরু করল, তিনি নিশ্চয়ই নেতাজির কাছ থেকে কোনও গোপন বার্তা পেয়ে থাকবেন। পাশাপাশি অন্যান্য গুজবও চলছে সমান তালে। একটি গুজব শোনা যাচ্ছে, নেহরু নাকি নেতাজির কাছ থেকে চিঠি পেয়েছেন যে তিনি এখন রাশিয়ায়, ভারতের দিকে পালাচ্ছেন। চিত্রল হয়ে তিনি আসবেন, শরৎ বসুর এক পুত্র সেখানে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসবেন। গাঁধী আর শরৎ বসু নাকি সবই জানেন। গোয়েন্দা রিপোর্ট অবশ্য বলল, এই সংবাদ “সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা কম”, তবে ভারতে যে ভাবে “বোস জীবিত বলে বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ছে”, সেটাই যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়।১৪
১৯৪৬-এর ৩০ মার্চ গাঁধী হরিজন পত্রিকায় তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করে জানালেন। ১৯৪২ সালে সুভাষের ভুয়ো মৃত্যুসংবাদটি তো তিনি সে দিন বিশ্বাসই করেছিলেন। তার পর থেকে তাঁর “কেমন যেন মনে হয়, নিজের স্বপ্নের স্বরাজ না আসা পর্যন্ত নেতাজি কিছুতেই আমাদের ছেড়ে যেতে পারেন না।” তার উপর, “এই ভাবটা আরও পেয়ে বসল যখন জানলাম কী অসামান্য ভাবে নিজের স্বপ্ন পূর্ণ করতে তিনি শত্রুদের চোখে, এমনকী গোটা বিশ্বের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছেন।” আর কিছুই জানেন না তিনি, কেবল তাঁর অন্তরাত্মা বলছে “নেতাজি জীবিত”। তবে “এই অকারণ বিশ্বাসের” উপর তো আর ভরসা করা যায় না— স্বীকার করলেন তিনি— এও ঠিক যে “নানা তথ্যপ্রমাণ মিলছে যাতে এই বিশ্বাসের উল্টো ইঙ্গিতটাই মেলে।” ব্রিটিশ সরকারের কাছে সেই তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। হাবিবুর রহমান এবং এস এ আইয়ারের সাক্ষ্যও তিনি শুনেছেন। “এই সব প্রমাণের ভিত্তিতে,” মহাত্মা লিখলেন, “সকলের প্রতি আবেদন এই যে, আগে যা বলেছি তা ভুলে যান, সামনে যে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে তার ভিত্তিতে নেতাজি যে আর আমাদের মধ্যে নেই, তা মেনে নিন। মানুষের সব প্রয়াসের উপরেই তো সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ইচ্ছার স্থান।”১৫
বহু দূরদেশে ভিয়েনায় বসে এমিলি কিন্তু মন থেকে মেনে নিয়েছেন তাঁর এই মর্মান্তিক ক্ষতি। যুদ্ধশেষে রুশরা যে অঞ্চলের দখল পেয়েছে, তাঁর বাড়িটি তারই অন্তর্গত এখন। সুভাষ জানতেন এমনটাই হওয়ার সম্ভাবনা, তাই ১৯৪৫-এর মে থেকে তিনি যে রাশিয়া যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, তার পিছনে রাজনৈতিক কারণের সঙ্গে সম্ভবত এই ব্যক্তিগত কারণটিও ছিল। এমিলি তাঁর আইরিশ বন্ধু মিসেস উড্সকে ১৯৪৬-এর ১৮ জানুয়ারি লেখেন, আগের বছর গ্রীষ্মকালে রুশরা এসে তাঁদের বাড়ি পরিদর্শন করে যায়। যখন রুশরা আসে, তাঁদের পরিবার “কার্যত অনাহারে ছিল”, “কয়েক সপ্তাহ ধরে বাচ্চাও দুধ পায়নি।” মিসেস উড্স সম্ভবত লেখেন যে সুভাষের মৃত্যুর খবরটা সত্যি না-ও হতে পারে। এমিলির অবশ্য তা মনে হয় না: “আমাদের দু’জনেরই বন্ধু যিনি, তাঁর বিষয়ে আপনি যা লিখেছেন, আমি কিন্তু সে আশা পোষণ করতে পারছি না, দুঃখিত। কেন যেন আমার মনে হচ্ছে, তিনি আর নেই। যদি আমার এই ধারণা সত্যি না হত, আমার চেয়ে সুখী আর কে-ই বা হত। খবরটা আমার কাছে এত বড় আঘাত যে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেবল যন্ত্রের মতো বাড়ির আর অফিসের কাজ করে গিয়েছি। একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে থেকেছে, ছোট্ট অনিতা।” অনিতা এ দিকে “ভারী মিষ্টি শিশু”, সকলেই তাকে ভালবাসে। “এখানে বলা যাবে না এমন কিছু কারণে আমি আমার পুরনো নামটিই এখনও ব্যবহার করছি,” মিসেস উড্স-কে বলেন এমিলি। “পরে হয়তো তোমাকে সব কথা আরও খুলে লেখার সুযোগ পাব”। এখনকার মতো, অসুখ প্রতিরোধের কোনও শক্তি নেই শরীরে, ওজনও অনেকখানি কমে গিয়েছে, “অভুক্ত থেকে থেকে পুষ্টির অভাবে এই দশা” সকলের। যোদ্ধা মানুষটির একাকিনী বিধবার কলমে সে দিন উঠে এল যুদ্ধ বিষয়ে বিষণ্ণ গভীর কিছু বাক্য: “খুব কি দরকার ছিল এই যুদ্ধের? মানুষকে কত যন্ত্রণা, কত শোক পেতে হল, কত দেশের কত ক্ষতি হল। যুদ্ধে মৃত মানুষগুলির জন্য কাঁদছে তাদের মায়েরা, স্ত্রীরা, সন্তানরা, অন্যান্য আরও কত মানুষ। তবুও আজও ধ্বংসের নতুন নতুন পথ সন্ধান। গোটা দুনিয়াটাই বোধহয় উন্মাদ হয়ে গিয়েছে।”১৬
১৯৪৬ সালে ক্যান্ডি-র মাউন্টব্যাটেনের হেডকোয়ার্টার থেকে সুভাষচন্দ্র বসু বিষয়ে আরও একটি তদন্ত হল। সুভাষের আই এন এ-র সঙ্গে মাউন্টব্যাটেনের বাহিনীর সম্পর্ক ছিল বেশ খারাপ। সিরিল জন স্ট্রেসি তাঁর নেতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে আই এন এ শহিদদের স্মারকস্তম্ভ রেকর্ড সময়ে তৈরি করে দিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরের দায়িত্ব যাঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন সুভাষ, সেই মহম্মদ জামান কিয়ানি আই এন এ-র বাণী “বিশ্বাস, ঐক্য ও ত্যাগ’ এই স্মারকস্তম্ভে উত্কীর্ণ করে সেটির উদ্বোধন করেন। শেষ পর্যন্ত এই স্তম্ভ ভারতের মুক্তি বাহিনীর প্রথম যোদ্ধা নেতাজি এবং অন্যান্য মৃত সৈনিকদের স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদিত হয়। ১৯৪৫-এর ৫ সেপ্টেম্বর যখন ব্রিটিশরা সিঙ্গাপুরে নামে, বন্দরের উপরে গরিমামণ্ডিত সেই স্মারকস্তম্ভ ব্রিটিশদের অভিবাদন জানাতে ভোলে না। সুতরাং, ৮ সেপ্টেম্বর, মাউন্টব্যাটেনের সৈন্যরা (অর্থাৎ তাঁর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় সৈন্যরা) গিয়ে ডায়নামাইট দিয়ে সেই স্তম্ভ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়— আই এন এ সৈন্যদের অসহায় ক্রুদ্ধ দৃষ্টির সামনেই। যুদ্ধশহিদদের প্রতি এই বর্বরতার কথা ভারতীয়রা ভোলেওনি, ক্ষমাও করেনি। ১৯৪৫-৪৬-এর গোটা শীতকাল জুড়ে সুভাষচন্দ্র বসুর করাল ছায়া যেন ব্রিটিশদের তাড়া করে বেড়ায়। কর্নেল জে জি ফিগেসকে দিয়ে মাউন্টব্যাটেন নতুন করে সন্ধান চালালেন, সুভাষ আদৌ বেঁচে আছেন কি না। মিত্রশক্তির সুপ্রিম কম্যান্ড অ্যালায়েড পাওয়ার্স (SCAP)-এর হেডকোয়ার্টার্সে কর্মরত এক মার্কিন গোয়েন্দা অফিসারের তত্ত্বাবধানে এই ফিগেস আগে টোকিয়োয় জেনারেল ম্যাকআর্থারের হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ২৫ জুলাই ফিগেস রিপোর্ট পাঠালেন, তাঁদের পরম শত্রুর সত্যিই দেহান্ত হয়েছে— ১৯৪৫-এর ১৮ অগস্ট।১৭
তবু এখানেও শেষ নয়। এক দিকে এই বিশ্বাস যে নিশ্চয়ই তিনি বেঁচেই আছেন, আর অন্য দিকে তাঁর মৃত্যুর বিবিধ তথ্যপ্রমাণ— এই দ্বন্দ্ব চলতে লাগল দশকের পর দশক জুড়ে। ১৯৩৯ সালের একটি রাত্রে সুভাষ বম্বের মেরিন ড্রাইভ-এ তাঁর বন্ধু নাথালাল পারিখের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, কী রকম ভাবে তাঁর মৃত্যু হলে ভাল হয়। বললেন, এমন যদি হয়, তিনি উড়তে উড়তে ওই তারাদের পেরিয়ে চলে যাবেন অনেক দূর, তার পর— হঠাৎ এই পৃথিবীর বুকে এসে চুরমার হয়ে পড়বেন।১৮ কিন্তু তাঁর দেশের মানুষ তো তাঁকে এ ভাবে যেতে দিতে চায় না, বিশেষ করে ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে তো নয়ই। বস্তুত স্বাধীনতা ও দেশভাগের ঠিক পর-পর যেন নেতাজির প্রত্যাবর্তনের জন্য জনগণের আকুলতা আরও বেড়ে গেল। পাশপাশি, ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত নানা রকম প্রমাণ মিলল যে বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেছিল সে দিন, ওজনে বেশ ভারী সেই প্রমাণের পাল্লা। হাবিবুর রহমানকে নিয়ে আরও ছয় জাপানি সেই দুর্ঘটনার পর প্রাণে বেঁচেছিলেন, হাসপাতালেও ছিলেন কয়েক জন সাক্ষী। ১৯৪৬-এর অগস্টে হারিন শাহ নামে এক ভারতীয় সাংবাদিক তাইওয়ান গিয়ে আরও কিছু তথ্য জোগাড় করে আনলেন— তাঁর ভাষায়, নেতাজির ‘শৌর্যময় মৃত্যু’ বিষয়ক তথ্য। যাদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন সান পাই শা নামে এক চিনা নার্স। তিনি বললেন ১৯৪৫-এর ১৮ অগস্ট নানমোন (সাউথগেট) মিলিটারি হাসপাতালে তিনি শেষ ক’ ঘণ্টায় নেতাজির সেবা করেছিলেন, নেতাজি ও হাবিবুর রহমানের একদম ঠিকঠাক বর্ণনা দিলেন তিনি। অকুস্থলে গিয়ে সাংবাদিক-সুলভ তদন্ত চালিয়ে হারিন সাহ নিশ্চিত হন যে বিমান-দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর তত্ত্বটিই যথার্থ।১৯
১৯৪৬-এর ১৯ অক্টোবর অ্যালফ্রেড রেমন্ড টার্নার নামে এক ব্রিটিশ ক্যাপটেন হংকং-এর স্ট্যানলি জেল-এর মধ্যে তাইপে হাসপাতালের ক্যাপটেন ইয়োশিমি তানেওশির বক্তব্য রেকর্ড করলেন। বিমানবন্দর থেকে আহতদের হাসপাতালে আনার পর এক জাপানি মিলিটারি অফিসার তাঁকে “চন্দ্র বোস”কে দেখিয়েছিলেন। তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, সুভাষের জন্য সব রকম সম্ভাব্য চেষ্টা করতে, “সবচেয়ে উচ্চমানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে”। তাঁর রোগীর সমস্ত গায়ে দগদগে পোড়া ক্ষত। “প্রথম চার ঘণ্টায়” ডাক্তার ইয়োশিমির মতে, “তিনি অর্ধচেতন, মোটামুটি স্বাভাবিক, বেশ অনেক কথা বলছিলেন।” ডাক্তারের মনে হয়েছিল, প্রথম যে ক’টি শব্দ বলেছিলেন সুভাষ, সেগুলি সব জাপানি। জল চাইছিলেন। হাসপাতালের নল-দেওয়া কাপে তাঁকে জল দেওয়া হল। সুভাষ জল চাইতে গিয়ে জলের জাপানি শব্দ “মেজু” ব্যবহার করবেন, এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য ঠেকায় মনে করা হল, হয়তো তিনি বলতে চাইছিলেন “মেজদা” অর্থাৎ তাঁর দাদা শরত্কে ডাকছিলেন। “যেহেতু তাঁর বেশির ভাগ কথাই ইংরেজিতে, এক জন সংলাপ-সহায়ক চাওয়া হল। নাকামুরা নামে এক জনকে পাঠাল সিভিল গভর্নমেন্ট অফিস। নাকামুরা জানালেন, অনেক বারই তিনি চন্দ্র বোস-এর সহায়তা করেছেন এ ভাবে, তাঁর সঙ্গে অনেক কথা বলেছেন। তাঁর অন্তত মনে কোনও সন্দেহ দেখা গেল না যে— যে মানুষটার সঙ্গে তিনি কথা বলছেন, তিনিই চন্দ্র বোস।” চার ঘণ্টা পর রোগীর চেতনা চলে যেতে শুরু করে, সেই রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সঙ্গী যিনি, আর এক জন কর্নেল, তিনিও ইয়োশিমির তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেই কর্নেল চাইলেন, সুভাষের দেহ টোকিয়ো নিয়ে যাওয়া হোক। ডাক্তাররা তাই বোসের দেহে ফরমালিন ইঞ্জেকশন দিয়ে, কফিনে লেবু দিয়ে রাখেন। ২০ অগস্ট কফিন বিমানবন্দরে নিয়ে যান ওয়্যারান্ট অফিসার নিশি। অফিসার ফিরে এসে বলেন যে “কোনও অজ্ঞাত কারণে” দেহ জাপানে নিয়ে যাওয়া হল না, তাই তাইপে-তেই শেষকৃত্যের ব্যবস্থা হচ্ছে। যত দূর মনে হয়, বিমানের তুলনায় কফিনটি একটু বেশি বড় ছিল বলেই এই সিদ্ধান্ত। শেষকৃত্য করার জন্য ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করে দিলেন। “চন্দ্র বোস”-এর দেহভস্ম তুলে দেওয়া হল ওই ভারতীয় কর্নেলের হাতে।২০
১৫ অগস্ট, ১৯৪৭। লাল কেল্লায় ইউনিয়ন জ্যাক নেমে আসছে, উঠে যাচ্ছে ভারতের তেরঙা পতাকা। আশ্চর্য, শারীরিক ভাবে অনুপস্থিত থেকেও সে দিন কী ভাবে যেন নেতাজির রহস্যময় উপস্থিতি ছড়িয়ে রইল সমস্ত মানুষের মনে। সেই সময়কার বিভিন্ন ক্যালেন্ডারে একটি ছবি দেখা যায়: অনেক উঁচুতে, স্বর্গ থেকে সুভাষ তাকিয়ে আছেন লালকেল্লার স্বাধীনতা উৎসবের দিকে, তাঁর শুভেচ্ছা আর আশীর্বাদ পাঠাচ্ছেন। সুভাষ-বিষয়ক রক্তরঞ্জিতছবিও কম নয়। একটি ছবিতে তিনি ভারতমাতার হাতে তুলে দিচ্ছেন তাঁর ছিন্ন মস্তক, ভারতমাতাকে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মোৎসর্গ।২১ স্বাধীনতার উত্তেজনা অবশ্য দ্রুত সরে গেল দেশভাগের হিংসা-বিভীষিকায়। হতচেতন জাতির আর্ত আকুতি, তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারতেন যে নেতা, তিনি আজ কোথায়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা এল, কিন্তু গভীরতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্যায়ের তেমন কোনও প্রতিকার এল না। তাই বোধহয়, নেতাজির মৃত্যুর বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ল নতুন স্বাধীন দেশটির বাসিন্দাদের পক্ষে।
১৯৫১ সালে জাপানে গিয়ে এস এ আইয়ার ওই বিমান দুর্ঘটনায় আহত ছয় জাপানির মধ্যে দুই জনের সঙ্গে দেখা করলেন— কর্নেল নোনোগাকি এবং ক্যাপটেন আরাই। হাবিবুর রহমান যে কাহিনি বলেছিলেন, দুই জনই সেই একই ঘটনা বললেন। ১৯৫১-র ২৬ সেপ্টেম্বর টোকিয়োর এই তদন্তের ভিত্তিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে একটি রিপোর্ট জমা দিলেন, নেতাজির মৃত্যু বিষয়ে যা তখনও জানা গিয়েছে, তারই স্বীকৃতি রইল তাতে। ১৯৫২ সালে এই রিপোর্ট পার্লামেন্টে পেশ হল।২২ এত সব সত্ত্বেও পঞ্চাশের দশকের ভারতে নেতাজির মৃত্যু মোটের উপর যেন একটি অস্বীকৃত ঘটনাই থেকে গেল। কত মানুষ যে চাইলেন— নেতাজি ফিরে এসে দেশের নানা রকম সংকটের সমাধান করুন। মানুষের ক্রমাগত দাবির চোটে নেহরু সরকার ১৯৫৬ সালে একটি সরকারি তদন্ত কমিটি তৈরি করলেন, যাতে সমস্ত রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ আবার করে খুঁটিয়ে দেখা হল। তিন জন সদস্য এই কমিটিতে: লালকেল্লার বিচারখ্যাত শাহনওয়াজ খান, নেতাজির জীবিত দাদাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ সুরেশচন্দ্র বসু, এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অভিজ্ঞ সিভিল সার্ভেন্ট এস এন মৈত্র। দিল্লি ও টোকিয়োর প্রভূত সংখ্যক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলল কমিটি, সায়গন ও তুরেন (দ্য নাং)-এ ঘুরে এল। তবে তাইপে তাঁরা যেতে পারলেন না, পিপল্স রিপাবলিক অব চায়নাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে তাইওয়ানের চিয়াং কাই শেক-এর সরকারের সঙ্গে কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারেনি ভারত।২৩
জেনারেল ইসোডা শাহনওয়াজ কমিটির সামনে বললেন যে ১৬ অগস্ট ব্যাঙ্ককে যে পরিকল্পনা হয়, তাতে নেতাজির সায়গন হয়ে টোকিয়ো যাওয়ার কথা, এবং সেখান থেকে মাঞ্চুরিয়া হয়ে রাশিয়ায় প্রবেশ করার কথা। যদি রুশ-অধিকৃত মাঞ্চুরিয়ায় যাওয়া একান্ত অসম্ভব হয়, সে ক্ষেত্রে মোটের উপর ভাবা হয়েছিল— ব্রিটিশদের হাতে পড়ার থেকে জাপানের মার্কিনি হেফাজতে পড়া বরং ভাল। সায়গনে এসে জানা গেল, জেনারেল শিদেই সেই দিনই বিকেলে মাঞ্চুরিয়া যাচ্ছেন জাপানের কোয়ানটুং আর্মির চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব নিতে। জাপানি সংলাপ-সহায়ক মিস্টার নেগিশিকে সিঙ্গাপুর থেকে নেতাজির সঙ্গে থাকতে বলা হয়েছিল। নেগিশি জানালেন, শিদেই কিন্তু রুশদের বিষয়ে অত্যন্ত অভিজ্ঞ, এবং “রুশদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাতে সিদ্ধহস্ত”। জার্মানও জানেন তিনি, নেতাজির সঙ্গে সেই ভাষায় কথাও বললেন। “যদিও জেনারেল শিদেই-র সঙ্গে একই বিমানে নেতাজি যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে একটু অনিশ্চিতি ছিল”, কমিটির তথ্য বলছে, “সম্ভবত জেনারেল শিদেই-র সঙ্গেই দাইরেন (মাঞ্চুরিয়া) পৌঁছতে পারবেন আশা করে নিশ্চিন্ত বোধ করেন নেতাজি।” যে বিমানটিতে তাঁর চড়লেন, সেটি হল দুই-ইঞ্জিনবিশিষ্ট ভারী বম্বার, ৯৭/২ (স্যালি) টাইপ, সিঙ্গাপুরের জাপানের থার্ড এয়ার ফোর্স আর্মি-র সম্পত্তি।২৪
শাহনওয়াজ কমিটির কাছে সেই ভয়াবহ রাতের নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পাকিস্তান থেকে দিল্লি এলেন হাবিবুর রহমান। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশদের কাছে যা জানিয়েছিলেন, সেই একই কথা আবার নতুন করে ১৯৫৬ সালে বললেন ডক্টর ইয়োশিমি। এর সঙ্গে, সুভাষের চিকিৎসার ব্যাপারে জড়িত ছিলেন, এমন অন্যান্য কিছু লোকের বয়ানও শুনল কমিটি। তার মধ্যে ছিলেন ডক্টর ইয়োশিমির সহকারী ডক্টর সুরুতা, নানমোন হাসপাতালে তিনি সুভাষের চিকিৎসা করেছিলেন। বিমান দুর্ঘটনায় যে ছয় জন জাপানি বেঁচে যান, তাঁদের চার জন— লেফটেনান্ট কর্নেল শিরো নোনোগাকি, মেজর তারো কোনো, মেজর আইহাহো তাকামাশি, ক্যাপটেন কেইকিচি আরাই— এঁরা সকলেই টোকিয়োয় সশরীরে কমিটির সামনে হাজির হলেন। পঞ্চম জন— লেফটেনান্ট কর্নেল তাদেও সাকাই ১৯৫৬-য় টোকিয়োয় ছিলেন না, তাইওয়ানে কোনও একটা বিশেষ কাজে পাঠানো হয়েছিল তাঁকে। অবশ্য একটি লিখিত সাক্ষ্য এল তাঁর কাছ থেকেও। আর ষষ্ঠ জন, সার্জেন্ট ওকিশতাকে ১৯৫৬ সালে খুঁজেই পাওয়া গেল না। যে সব গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা ওড়ার আগে বিমানটির পরিচর্যা করেছিলেন এবং তার পর সেটিকে দ্রুত মাটিতে নেমে আসতে দেখেছিলেন, তাঁরাও বর্ণনা করলেন ব্যাপারটা ঠিক কেমন ভাবে ঘটেছিল। একই কথা বললেন অন্যান্য গ্রাউন্ড স্টাফ-ও।২৫
সবচেয়ে জোরদার প্রমাণ অবশ্য পাওয়া গেল সংলাপ-সহায়ক জুইকি নাকামুরার কথায়। তিনি সুভাষকে আগে থেকেই ভাল করে চিনতেন, ১৯৪৩-৪৪-এ নেতাজি যখন টোকিয়ো হয়ে তাইপে সফরে যান, সেই সময় অন্তত চার বার নাকামুরা তাঁকে সহায়তা করেন। সেই সব সময়ে নেতাজি তাইপে-র রেলওয়ে হোটেলে থাকেন, নাকামুরা সেই সময় তাঁর সঙ্গে রাতের খাবারও খেয়েছিলেন। ১৯৪৫-এর ১৮ অগস্ট বিকেলে নানমোন হাসপাতালে পৌঁছে তিনি দেখেন, বিছানার উপর আপাদমস্তক ব্যান্ডেজে মোড়া নেতাজি শুয়ে আছেন, তিন ফুট মতো দূরে আর একটি বিছানায় শুয়ে হাবিবুর রহমান। নেতাজি কী বলছেন বোঝার জন্য নাকামুরা হাবিবকে একটু কাছে আসতে বলেন। নাকামুরা আসার পর নেতাজির প্রথম কথাই ছিল: “আমার আরও কিছু সঙ্গী পিছনে পিছনে আসছে। ওরা ফরমোসায় পৌঁছলে ওদের একটু দেখো।” ঘণ্টাখানেক পর জিজ্ঞেস করলেন, “জেনারেল শিদেই কোথায়?” একটু পর বললেন, তাঁর মনে হচ্ছে যেন মাথার দিকে সমানে অনেক রক্ত ছুটে আসছে। রাত ন’টা নাগাদ বললেন, “একটু ঘুমোতে চাই।” “গোটা সময়টা ধরে,” নাকামুরার বর্ণনায়, “কোনও কষ্ট বা যন্ত্রণার উচ্চারণ বেরোল না তাঁর মুখ থেকে। ঘরের অন্য দিকে জাপানি অফিসারেরা তখন ব্যথায় গোঙাচ্ছেন, আর্তনাদ করছেন যে, এই কষ্ট সহ্য করা সম্ভব নয়, তাঁদের যেন মেরে ফেলা হয়। পাশাপাশি নেতাজির শান্ত ভাব আমাদের সকলকে অবাক করে দিচ্ছিল।” নেতাজি যখন শেষ নিশ্বাস ফেললেন, জাপানিরা সকলে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর দেহকে স্যালুট জানালেন। হাবিবুর রহমান এসে নেতাজির বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পাঁচ-ছয় মিনিট প্রার্থনা করলেন, তার পর জানলাটা খুলে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার দশ মিনিট প্রার্থনা করলেন। তার পর নিজের বিছানায় ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন।২৬
শেষ কাজের সময়ও নাকামুরা উপস্থিত ছিলেন, আর ছিলেন হাবিবুর রহমান, আর জনৈক মেজর নাগাতোমো। সে দিনেরও বিশদ বিবরণ দিলেন নাকামুরা। আহত হাবিবুর রহমান আঙুল দিয়ে ধরতে পারবেন না বলে দুই হাতের পাশ দিয়ে কয়েকটি ধূপকাঠি ধরে ছিলেন। পরের দিন দেহভস্ম নিতে এসে ব্যান্ডেজ-বাঁধা হাতে দশ-ইঞ্চি চপস্টিক দিয়ে ভস্মীভূত অস্থি তুলতে বেশ বেগ পাচ্ছিলেন হাবিব। তাই ভস্মাধারে ভস্ম রাখার কাজে নাকামুরাও হাত লাগালেন। মেজর নাগাতোমোও সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন, বৌদ্ধ রীতি অনুযায়ী অস্থিভস্ম তোলার একই ধরনের আর একটি পদ্ধতির কথা বললেন তিনি। তার পর সেই ভস্মাধার নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালের কাছে নিশি হোনগানজি মন্দিরে। জেনারেল শিদেই-র দেহভস্মপূর্ণ আর একটি আধার ইতিমধ্যেই সেখানে রাখা। নাকামুরা পুরোহিতকে বোঝালেন যে তিনি যাঁর দেহভস্ম এনেছেন, মর্যাদায় তিনি শিদেই-র থেকে বড়। পুরোহিতকে তাই বলা হল এই ভস্মাধারটি আরও একটু উঁচু তলে রাখতে, রোজ সকালে তাতে ফুল দিতে। তাতসুয়ো হায়াশিদার বক্তব্যও শুনল শাহনওয়াজ কমিটি— এই হায়াশিদাই ১৯৪৫-এর ৫ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তাইপে থেকে জাপানে ভস্মাধারটি এনেছিলেন। এস এ আইয়ার, হাবিবুর রহমান, রামা মূর্তি, জয়া মূর্তি এবং রেভারেন্ড মোচিজুকি সকলেই সাক্ষ্য দিলেন, জাপানিজ ইম্পিরিয়াল আর্মির কাছ থেকে ভস্মাধারটি পাওয়ার পর কী কী হল, এবং শেষ পর্যন্ত কী ভাবে সেটিকে শেষ পর্যন্ত রেনকো-জি মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হল।২৭
১৯৫৬ সালের এপ্রিল ও জুন পর্যন্ত যা যা শুনানি হল, তার ভিত্তিতে কমিটির তিন সদস্য ২ জুলাই প্রধান প্রামাণ্য তথ্যগুলির একটি খসড়া তৈরি করলেন। এই খসড়ায় তিন সদস্যই স্বীকার করেন যে “নেতাজি যে বিমানে ছিলেন, সেটি সত্যিই ভেঙে পড়েছিল।” সাক্ষীদের সন্দেহ করার মতো কোনও কারণ পাওয়া যায়নি, তাঁরা এক-এক জন এক-এক দেশের নাগরিক, জীবনেও ভিন্ন ভিন্ন পথে তাঁদের চলাফেরা— সকলেই বলছেন, বিমান দুর্ঘটনা হওয়ার ফলেই নেতাজির মৃত্যু হয়। খসড়ায় সই করার পর অবশ্য এক জন সদস্য, সুরেশচন্দ্র বসু অকস্মাৎ তাঁর মত পাল্টালেন, এবং হুড়মুড় করে একটি অসম্মতিপত্র তৈরি করে ফেললেন। তাতে লেখা হল, না, বিমান ভেঙে পড়েনি, এবং তাঁর ভাই জীবিতই আছেন। এটা ঠিকই, ঘটনার এগারো বছর পর বর্ণনা দিতে গিয়ে বিভিন্ন সাক্ষীর বয়ানের মধ্যে কিছু ছোটখাটো অসঙ্গতি রয়েই গিয়েছিল। যেমন, ১৯৪৫-এর ১৮ অগস্ট মৃত্যুর সময় বলতে সন্ধে আটটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের কথা বলেছেন সাক্ষীরা। আবার, নেতাজিকে রক্ত দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ডক্টর ইয়োশিমি এবং ডক্টর সুরুতার মধ্যে কথা মেলেনি। ডক্টর ইয়োশিমির সই করা মূল ডেথ সার্টিফিকেটটিও কোথাও পাওয়া যায়নি। সে যাই হোক, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের মূল বক্তব্য কিন্তু মোটের উপর একই থেকেছে। শাহনওয়াজ খান ও এস এন মৈত্র অত্যন্ত দক্ষ ভাবে সেগুলি একত্র করে জোরালো যুক্তি তৈরি করলেন, পরে যথাসময়ে সেটি ভারত সরকারের কাছে জমা পড়ল।২৮
রিপোর্ট নিশ্চিত ভাবে বলল: তাইপে-র প্লেন দুর্ঘটনার ফলে ১৯৪৫-এর ১৮ অগস্ট নেতাজির দেহান্ত হয়। “জাপানি এবং অ-জাপানিদের মধ্যে থেকে এত জন সাক্ষীর বয়ান অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই,” বলা হল রিপোর্টে। “তাইহোকুতে বিমানের দুর্ঘটনা যে হয়নি, এমন কোনও প্রমাণও আমাদের কাছে নেই।” রিপোর্ট এও বলে যে, নেতাজির দেহভস্ম শেষ কাজের জায়গা থেকে তাইপে-র নিশি হোনগানজি মন্দির, সেখান থেকে মিনামি এরোড্রোম, সেখান থেকে টোকিয়ো ইম্পিরিয়াল হেডকোয়ার্টার্স, সেখান থেকে রামা মূর্তির বাড়ি, সেখান থেকে মিসেস সহায়ের বাড়ি, এবং শেষ পর্যন্ত রেনকো-জি মন্দিরে আনার মধ্যেও “কোনও ফাঁক”-এর চিহ্ন মেলেনি। সই, রসিদ, সর্বক্ষণের পাহারা ইত্যাদির মাধ্যমে “বিষয়টিকে নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ করার জন্য সাবধানতা” নেওয়া হয়নি, স্বীকার করল রিপোর্ট। তবে এত সত্ত্বেও কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের সতর্ক সিদ্ধান্ত: “রেনকো-জি মন্দিরে যে দেহভস্ম রাখা আছে, খুব সম্ভবত সেটা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুরই দেহভস্ম।”২৯
শাহনওয়াজ কমিটির চূড়ান্ত বক্তব্যে তিনটি বাক্যে একটি দ্ব্যর্থহীন প্রস্তাব ছিল: “কমিটি এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, একটি বিমান দুর্ঘটনার ফলেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়, এবং যে দেহভস্ম রেনকো-জি মন্দিরে রাখা আছে, তা তাঁরই দেহভস্ম।.. তাঁর দেহভস্ম যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে ভারতে নিয়ে আসার সময় হয়েছে। কোনও যোগ্য স্থানে সেটি রেখে একটি সমাধিস্থল বানানো হোক.. যদি নেতাজির দেহের এই চিতাভস্মকে সম্মান করা হয়, তাঁর আদর্শকে ধরে রাখা যায়, তা হলে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, “কোথায় মৃত্যুর দংশন, কোথায়ই বা, সমাধি, তোমার জয়?”৩০
নেহরু সরকার প্রতিবাদী মতটি স্বীকার না করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সঙ্গেই একমত হয়েও কিন্তু এই স্পষ্টাক্ষরে লিখিত প্রস্তাবটি কাজে পরিণত করতে ব্যর্থ হল। বিষয়টি সুতরাং অমীমাংসিতই থেকে গেল, ১৯৬০-এর দশকে “নেতাজি জীবিত” গুজব আবার বাড়তে শুরু করল। অদ্ভুত অদ্ভুত মানুষের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্যের খবর ছড়িয়ে পড়ল। কেউ নাকি তাঁকে ভারতেই এক সাধুর বেশে দেখেছেন, কেউ জানেন যে রাশিয়ায় এক বন্দির চেহারার সঙ্গে তাঁর খুব মিল। কোনও কোনও গুজব-রটয়িতা আবার ব্যক্তিগত ভাবে নেহরুর চক্রান্ত খুঁজতেও বাকি রাখলেন না। ১৯৭০ সালে ইন্দিরা গাঁধী ঠিক করলেন, ব্যাপারটা আবার গোড়া থেকে তদন্ত করা দরকার, সুতরাং একটি এক-ব্যক্তি-কমিশন তৈরি হল, তাতে নিযুক্ত হলেন বরেণ্য আইনজ্ঞ জি ডি খোসলা। অনেকটা সময়ের ব্যবধান হয়ে গিয়েছে, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের অনেককেই আর পাওয়া গেল না, যত রকম মানুষের যত রকম তত্ত্ব, কোনও কিছুই শুনতে বাকি রাখল না এই কমিশন। তবু জাপানিদের মধ্যে সেই দুর্ঘটনায় যাঁরা বেঁচেছিলেন, তাঁদের চার জন— সাকাই, নোনোগাকি, কোনো এবং তাকাহাশি— খোসলা কমিশনের সামনে আবারও তাঁদের সাক্ষ্য দিলেন। ১৯৭৪ সালে জাস্টিস খোসলা প্রধানত যা বললেন, তার সঙ্গে শাহনওয়াজ খান এবং এস এন মৈত্র-র বক্তব্যের খুব একটা তফাত দেখা গেল না। তাঁর সিদ্ধান্ত— বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি ভয়ঙ্কর আহত হন, এবং ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট রাত্রে এই আঘাত থেকেই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়। এর সঙ্গে অবশ্য নেহরুর হয়ে একটু বিশেষ ওকালতি করে দিলেন খোসলা: নেহরু ও সুভাষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কত ভাল ছিল, সুভাষ নেহরুকে কত শ্রদ্ধা করতেন, নেহরুও তাঁকে কত ভালবাসতেন, এ সবের উপর অনেকখানি জোর দিলেন। যাঁরা কমিশনের সামনে অবিশ্বাস্য সব কাহিনি বলতে এসেছিলেন, তাঁদের বিষয়ে নির্দয় খোসলা। “১৯৪৫ সালের পর সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে দেখা হওয়ার যে অসংখ্য কাহিনি,” লিখলেন তিনি, “সেগুলি সম্পূর্ণ মিথ্যা, অগ্রহণযোগ্য। হয় এঁরা মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রলাপ তৈরি করেছেন, কিংবা নিজেদের দিকে মনোযোগ টানতে বা তারা নিজেরা কত গুরুত্বপূর্ণ লোক, তা বোঝাতে এই সব কাহিনি বানিয়েছেন।”৩১
খোসলা রিপোর্ট বার হয় ১৯৭৪ সালে। ফলত, সেই সময়ের রাজনৈতিক দলাদলির মধ্যে গ্রস্ত হয়ে পড়ে এটিও। ইন্দিরা গাঁধীর যে সরকার এই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল, ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার পতন হয়। নয়া দিল্লিতে ক্ষমতায় আসার পর জনতা পার্টি খোসলা রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে। আরও দুই দশক পর, ১৯৯৯ সালে সরকারের তত্ত্বাবধানে আবার গঠিত হয় আরও একটি এক-ব্যক্তি-কমিশন, আবার নতুন তদন্তের লক্ষ্যে। এ বার এক জন অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি বিচারপতি মনোজ মুখার্জি পরের ছয় বছর যাবৎ তদন্ত চালিয়ে গেলেন,— ক্রমশ তাঁর ভাণ্ডারে এল ১৯৪৫-এর অগস্টের পর নেতাজিকে কবে কোথায় দেখা গিয়েছে, সেই সব আশ্চর্য রং-চড়ানো গল্পমালা। বিচারপতি নিজেই এ বিষয়ে আগে থেকে একটা মতে বিশ্বাসী, ২০১০ সালে তিনি সে কথা স্বীকারও করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস— উত্তর ভারতে ফৈজাবাদে নাকি ১৯৪৫-এর পর বেশ কয়েক দশক সুভাষ সন্ন্যাসী-রূপে বাস করতেন। ২০০২-এর অক্টোবরে “কোনও এক গুমনামি বাবার” ডি এন এ পরীক্ষার কাজে লাগবে বলে বসু পরিবারের সদস্যদের কাছে চিঠি লিখে তাঁদের থেকে এক মিলিলিটার রক্ত চান তিনি। “কিছু লোক” নাকি বলছে, “ইনিই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।”৩২ স্বভাবতই এই আষাঢ়ে দাবি শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করা যায়নি। কিন্তু মাঝখান থেকে এই ধরনের বিদঘুটে সব দাবিকে প্রশ্রয় দিয়ে এই বিচারপতি যা করে গেলেন— তাতে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মহান নেতার জীবন ও মৃত্যু বিষয়ে জনসাধারণের মনে বিভ্রান্তি আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
যে ব্যাখ্যা সত্য হওয়া খুবই সম্ভব এবং যে ব্যাখ্যা একেবারে আজগুবি অসম্ভব, মুখার্জি কমিশনের তদন্তে এই দুই-এর মধ্যে কোনও ইতরবিশেষই করা হল না। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৬ সালের মে মাসে একটি রিপোর্ট জমা করল এই কমিশন, তাতে বলা হল ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট আদৌ কোনও বিমান দুর্ঘটনাই হয়নি। এই বক্তব্যের ভিত্তি কী? ভিত্তি হল— তাইওয়ান সরকারের একটি বার্তা যাতে বলা হচ্ছে সেই দিনের কোনও দুর্ঘটনার তথ্য তাদের কাছে নেই। অবশ্য সেটা থাকারও কথা নয়, কেননা ১৯৪৫ সালের অগস্টে তাইওয়ান ছিল জাপানি সামরিক দখলের অধীন। ১৯৪৬ সালের শেষ অবধি তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখে জাপানিরা। ১৯৪৯ সালে চিনের মূল ভূখণ্ডে কমিউনিস্ট জয় নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল চিয়াং কাই-শেক সরকার এই দ্বীপটিতে নিজের জমি শক্ত করতে পারে। মনমোহন সিংহ সরকার এই রিপোর্ট পার্লামেন্টে পেশ করলেও সরকার নিজে এটিকে সোজাসুজিই খারিজ করে দেয়, সঙ্গত ভাবেই। তবে এও ঠিক, ১৯৫৬ সালে শাহনওয়াজ খান কমিটি স্পষ্ট প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও এত দিন ধরে একটি কাজে কিন্তু ভারত সরকার কোনও মনোযোগই দিয়ে উঠতে পারেনি— নেতাজির দেহাবশিষ্টকে সম্মান জানাতে যথাযোগ্য পদক্ষেপ করা কিংবা তাঁর আদর্শকে চলমান রাখা।৩৩
স্বাধীনতার পর-পরই নেতাজির মৃত্যু মেনে নেওয়ার বিষয়ে জনমানসে প্রাথমিক ভাবে যে প্রত্যাখ্যান দেখা যায়, কিংবা কোনও না কোনও দিন তিনি দেশকে উদ্ধার করতে ফিরে আসবেনই বলে যে বিশ্বাস দেখা যায়, সে দিনের সেই সংকটদীর্ণ সময়ে তা স্বাভাবিকই ছিল। বার বার তাঁকে পুনর্জীবন দেওয়ার এই প্রয়াসই বুঝিয়ে দেয়, ভারতের ঐক্যবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি-ধারী, স্বার্থলেশহীন নেতা হিসেবে কত বিরাট গ্রহণযোগ্যতা ছিল তাঁর। কিন্তু ক্রমশই দেখা গেল— এই জন-আবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু মানুষ এবং কিছু ছোটখাটো রাজনৈতিক দল বিষয়টিকে তাদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে, নিজেদের স্বার্থে নেতাজি বিষয়ে উল্টোপাল্টা দাবি তৈরি করছে। গোটা দেশ জুড়ে নেতাজির জীবন ও কর্ম বিষয়ে সত্যিই উদ্বুদ্ধ হয়ে আছেন যে অসংখ্য মানুষ, তাঁদের সঙ্গে কিন্তু কোনও যোগ ছিল না সেই লোকগুলির, যারা তাঁর মৃত্যু বিষয়ে বিচারবিভাগীয় কমিশনগুলির সামনে সাক্ষ্য দিতে স্বপ্ররোচিত ভাবে এগিয়ে এসেছিলেন। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য থেকে পাওয়া যে সব প্রমাণসাবুদ মেলে, তাতে দৃঢ় ভাবেই প্রতিপন্ন হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে নিয়ে যেতে যেতে ১৯৪৫ সালে ১৮ অগস্ট তাইপে-র বিমান দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয় সুভাষের। এর পর তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাওয়ার যে সব গল্প— হয় সেগুলি গুজব, কিংবা জল্পনা— আর নয়তো সোজাসুজি মিথ্যাচার। বিশেষত, নেতাজি যে সত্যিই সোভিয়েত ইউনিয়ন বা সোভিয়েত-শাসিত মাঞ্চুরিয়ায় পৌঁছতে পেরেছিলেন, তেমন কোনও প্রমাণই আজ পর্যন্ত মেলেনি।
নেতাজির ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সঙ্গী ছিলেন যাঁরা, অর্থাৎ উচ্চপদস্থ আই এন এ অফিসার ও আজাদ হিন্দ্ আন্দোলনের নেতারা— তাঁরা কিন্তু সকলেই নেতাজির মৃত্যু সম্পর্কে হাবিবুর রহমানের বক্তব্যই বিশ্বাস করেছিলেন। ১৯৯৭ সালে নেতাজির জন্মশতবার্ষিকী পালনের সময় সেই লাল-কেল্লা-ত্রয়ীর মধ্যে এক জনই জীবিত সদস্য ছিলেন, গুরবক্স সিং ধিলোঁ। আবারও আবেগাভিভূত আহ্বান তাঁর— নেতাজির দেহাবশিষ্ট জাপান থেকে ভারতে নিয়ে আসা হোক, দিল্লিতে একটি সমাধি-সৌধ প্রতিষ্ঠা হোক তাঁর জন্য। এস এ আইয়ার, প্রেমকুমার সহগল, শাহনওয়াজ খান, মেহবুব আহমেদ, দেবনাথ দাস, লক্ষ্মী সহগল, জানকী আথিনাহাপ্পান এবং আরও অনেকেরই একই মত। প্রেমকুমার সহগল ছিলেন এমন এক জন মানুষ, যিনি ১৯৪০-এর দশকেও আশা রেখেছিলেন যে নেতাজি হয়তো কোনও ভাবে পালাতে পেরেছেন। তবে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ সতর্ক ভাবে খুঁটিয়ে দেখে তিনিও কিন্তু বিমান ভেঙে পড়ার ঘটনাটাই শেষ অবধি মেনে নেন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী জোরালো দাবি জানান, নেতাজির দেহাবশিষ্ট ভারতে ফিরিয়ে আনা হোক। শরৎচন্দ্র বসু ও শিশিরকুমার বসু জেলবন্দি হিসেবেই সে দিন এই দুঃসংবাদ পেয়েছিলেন, শোক ও দৃঢ়তার সঙ্গে সত্যকে গ্রহণ করেছিলেন। তবে পরবর্তী কালে দুই জনেই আবার কোথাও আশা করতে শুরু করেছিলেন, হয়তো তাঁদের ভয়ঙ্করতম আশঙ্কাটি ভুল। বিশেষত শরতের মনে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ছিল, প্রিয় ভাইকে এ ভাবে হারানোর বিষয়টি তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। ১৯৫০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়— ১৯৫৬ সালে সব রকম প্রাসঙ্গিক তথ্যপ্রমাণ সংগৃহীত হওয়ার অনেকটাই আগে। শিশিরকুমার বসু নিজে সব কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখেন, ১৯৬৫ সালে নিজে জাপানে ও তাইওয়ানে একটি তদন্ত চালান। শেষে তিনি সন্দেহমুক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত করেন যে নেতাজি সত্যিই ১৯৪৫ সালে ১৮ অগস্ট শহিদের মৃত্যু বরণ করেন।৩৪
জেনারেল সুনামাসা শিদেই-র পরিবার অবশ্য এই মৃত্যুর ঘটনায় কোনও দিনই কোনও প্রশ্ন তোলেননি। শাহনওয়াজ খান তদন্ত কমিটি তাঁর সার্ভিস রেকর্ড জোগাড় করে, তাতেও তাঁর মৃত্যুর দিন হিসেবে ১৯৪৫-এর ১৮ অগস্ট, এবং স্থান হিসেবে “তাইহোকু এয়ারফিল্ড” লেখা রয়েছে। “মৃত্যুর কারণ” লেখা আছে “যুদ্ধে মৃত্যু”। “নেতাজি বিষয়েও একই কথা সত্য,” ১৯৫৬ সালের রিপোর্টের সঙ্গত দাবি, “কেবল তাঁর ক্ষেত্রে এ এক আলাদা যুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধ। সে যুদ্ধ তাঁর চলছিলই। কেবল এক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অন্য যুদ্ধক্ষেত্রে সরে যাচ্ছিলেন তিনি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মাঞ্চুরিয়া চলে যাচ্ছিলেন।”৩৫ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনেক মহান শহিদের জন্ম দিয়েছে ঠিকই, তবে এও ঠিক যে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতাদের মধ্যে নেতাজিই কিন্তু একমাত্র যিনি প্রত্যক্ষ ভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন।
উত্তরাধিকার
১৯৪০-এ অনশন ধর্মঘট করার আগে যে রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রটি লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, তাতে বলেছিলেন, যন্ত্রণা আর ত্যাগে কারও পরাজয় হয় না। খ্রিস্টের পুনরুজ্জীবনের পরোক্ষ উল্লেখ ফুটে উঠেছিল তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে: “যদি বা ‘পার্থিব’ জগতে পরাজয় ঘটেও, অপার্থিব যে পরজীবন, সেখানে সে জয়ী হবেই।”৩৬ নেতাজির সে দিনের পার্থিব মৃত্যুর উত্তরণ ঘটল এক অপার্থিব মহত্ত্বে— এই ত্যাগ-মন্ত্রের কারণেই।
সুভাষ জানতেন, তাঁর জীবনের একটি বিশেষ লক্ষ্য আছে। বিদেশির অধীনতা থেকে ভারতের মুক্তিই সেই লক্ষ্য। জীবনের গোড়াতেই ঔপনিবেশিক অধীনতার সব বাধা পেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন তিনি। চব্বিশ বছর বয়সে যখন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস থেকে পদত্যাগের গুরুতর সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন, ভারতে ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে তখনই তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। জেলে বন্দি অবস্থায় এবং নির্বাসিত দশায় দীর্ঘ কাল আসলে ভিতরে ভিতরে এক জন স্বাধীন মানুষ হিসেবে বেঁচেছেন তিনি, অর্থাৎ ব্রিটিশের অধীনতা তিনি কোনওমতেই মেনে নেননি। সেই জন্যই তাঁর দেশবাসীর মধ্যে কখনও দাসত্বভাব দেখলেই মর্মজ্বালা অনুভব করেছেন। ১৯২১-এ বিদেশি ব্যুরোক্র্যাসির অনুগত হতে অস্বীকার করলেন, ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সৈন্যবাহিনীর মধ্যে যে সব ভারতীয় তাঁদের আনুগত্যে চিড় ধরানোর প্রবল যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, পরিবর্তে তাদের ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে অস্ত্র হাতে তুলতে উদ্বুদ্ধ করলেন। আই এন এ-র সামরিক পরাজয় ঘটেছিল ঠিকই, কিন্তু— যদি তাঁর নিজেরই তৈরি মানদণ্ডটি মনে রাখা যায়— তবে ১৯৪৫ সালে তাঁর জীবনের ‘মিশন’টি পূর্ণ করতে তিনি যে সম্পূর্ণ সফল, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা সম্ভব। ২৩ জানুয়ারি ১৯৪৭— যে দিন তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল— নেতাজির কৃতিত্ব বিষয়ে গাঁধীজি বলেছিলেন:
দেশের জন্য নিজের অসাধারণ কেরিয়ারের মায়া ত্যাগ করেছিলেন তিনি। বহু বার বন্দিত্ব বরণ করেছেন, দুই বার কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, অসম্ভব দক্ষতায় বাংলার সরকারের কড়া পাহারার চোখ এড়িয়ে পালিয়েছেন, প্রবল সাহস ও অসামান্য সংযোগ-ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে কাবুল পৌঁছে গিয়েছেন, ইউরোপীয় দেশগুলি পেরিয়েছেন, শেষে জাপানে উপস্থিত হয়েছেন, নানা স্থানে ছড়ানো-ছিটানো নানা সম্প্রদায়ের, দেশের নানা অঞ্চলের অসাধারণ তরুণদের সংগ্রহ করে নিজের বাহিনী তৈরি করেছেন, এবং শক্তিমান সরকারের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। যে সব ভয়ানক বিপদ পেরিয়েছেন তিনি, কোনও সামান্য মানুষ তাতে সহজেই পরাভূত হয়ে পড়তেন— তিনি কিন্তু নিজের জীবন দিয়ে তুলসীদাসের কথাই প্রমাণ করলেন, “ভাগ্য সাহসীরই সহায়”।৩৭
ব্রিটেনের বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যের ভিতটিকে এ ভাবে টলিয়ে দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। আর এই জন্যই ব্রিটিশ রাজ কোনও দিন তাঁকে ক্ষমা করেনি। দেড় শতকেরও বেশি উপনিবেশের সমস্ত বিদ্রোহী, অবাধ্য প্রজাদের বাগে আনতে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিই ছিল ব্রিটিশ রাজের প্রধান ভরসা। যুদ্ধের সময়ে নেতাজির অক্লান্ত কার্যক্রম তাই কেবল ভারতের স্বাধীনতালাভের পথই প্রশস্ত করেনি সে দিন, তার সঙ্গে ঔপনিবেশিক পৃথিবীর সামরিক দখল-পুনর্দখলের কাজটিও বিষম কঠিন করে দিয়েছিল। যুদ্ধশেষে আবার যখন নবোদ্যমে জেগে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রাম, সেখানেই লুকিয়ে ছিল তাঁর কৃতিত্বের অভ্রান্ত স্বাক্ষর— অবশ্য পর্বতপ্রমাণ ব্রিটিশ দম্ভের অবদানও এর পিছনে বিরাট। বন্ধু দিলীপকুমার রায় বিশদ ভাবে বর্ণনা করেছেন কী ভাবে সুভাষের “ছবিটি জনমানসে হঠাৎই বিশালাকার হয়ে ওঠে, সঙ্গে যুক্ত হয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ছবিও। যেন দিল্লির দিকে এগিয়ে চলেছে সেই বাহিনী, মুখে মুক্তির গান। হতাশায় অবশ জাতি যেন হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে উঠে বসে, স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সম্ভাবনায় মানুষের স্বতোত্সারিত উদ্দীপনার ঢেউয়ে ভেসে যায় এত দিন ধরে পাশে সরে থাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীও।”৩৮ সাময়িক উপশম দিয়ে বার বার স্বাধীনতার জ্বলন্ত স্পৃহাকে দমিয়ে রাখা, ঔপনিবেশিক শাসনের আরও খানিকটা ভারতীয়করণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া— এ সবের দিন তখন শেষ। ইংল্যান্ডের পক্ষে সে দিন বর্মায় অং সান রাজত্বের বিরুদ্ধে কিংবা ভিয়েতনামি ও ইন্দোনেশীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখে ফরাসি ও ডাচদের সাহায্য করতে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিকে পাঠানোর কথাও আর ভাবা সম্ভব নয়।
নেতাজির আর একটি যুদ্ধকালীন কৃতিত্ব— ভারতের বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়কে একটিমাত্র সংগ্রামের অঙ্গনে টেনে আনতে পারা। এমন আশ্চর্য ঐক্য যিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন সেই নেতার অনুপস্থিতি প্রবল ভাবে অনুভূত হয় লালকেল্লা বিচার ঘিরে সেই উন্মাদনার সময়ে। লালকেল্লায় গাঁধী যখন এক দল বন্দি আই এন এ সৈন্যের সঙ্গে দেখা করতে যান, তাঁরা স্পষ্ট বলেন, আই এন এ-তে থাকাকালীন তাঁরা কখনও ধর্ম বা মতামতের পার্থক্য টের পাননি, কিন্তু এখানে এসে তাঁদের শুনতে হচ্ছে “হিন্দু চা” বা “মুসলিম চা”-এর মতো কথা! গাঁধী জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারা মেনে নিচ্ছেন কেন?” “না, আমরা মোটেই মেনে নিচ্ছি না,” তাঁরা বলেন, “‘হিন্দু চা’ আর ‘মুসলিম চা’ অর্ধেক অর্ধেক করে মিশিয়ে নিই আমরা, তার পর ঢেলে খাই। খাবার নিয়েও একই ব্যাপার।” গাঁধী তো শুনে উচ্ছ্বসিত, “দারুণ ব্যাপার।”৩৯ মহাত্মাও তাঁর অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের সময় থেকে এত দিনে অনেকটাই সরে এসেছেন। আগে তিনি এমনকী ঘনিষ্ঠতম মুসলিম রাজনৈতিক সহযোগীদের সঙ্গেও একসঙ্গে খেতে বসতেন না। গাঁধীর প্রাসঙ্গিকতা তবু ফুরোনোর নয়, অন্তত যত দিন ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার জন্য আবারও কোনও গণ-আন্দোলনের প্রয়োজন থেকেছে। ১৯৪৬-এর বসন্তকাল নাগাদ ব্রিটিশরা ভবিতব্যের লিখনটি অবশেষে পড়ে ফেলল, ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। স্ট্যাফোর্ড ক্রিপ্স-এর নেতৃত্বে তিন-সদস্য-বিশিষ্ট ক্যাবিনেট মিশন এল সেই সময়ে, ব্রিটিশ রাজ-এর দিন শেষ হলে ক্ষমতার ভাগাভাগি কী রকম হবে, তা স্থির করতে।
নেতাজি-ভক্তরা আবেগবশত বিশ্বাস করতেন যে, তাঁদের নেতা যদি সে দিন থাকতেন, ভারত কিছুতেই ধর্মের ভিত্তিতে এ ভাবে খণ্ডিত হতে পারত না। এ হল ইতিহাসের সেই অমীমাংসা-যোগ্য যদিগুলির একটি, যে সব “যদি”র উত্তর মেলা কখনও সম্ভব নয়। মোটের উপর নিশ্চিত ভাবে যেটুকু বলা যায়— সংখ্যালঘুদের প্রতি খুবই উদার হতেন তিনি, বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক মানুষের মধ্যে সমানুপাতে ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার প্রশ্নে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যেতেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতালাভের ঠিক আগে, গাঁধীও কিন্তু অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের তুলনায় মুসলিম লিগ এবং তার অবিসংবাদী নেতা মহম্মদ আলি জিন্নার দাবির প্রতি অনেক বেশি উদার হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মহাত্মার এত কালের রাজনৈতিক সেনাপতিরা— জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল— তাঁরা সে দিন আর তাঁর সদুপদেশে কান দিতে রাজি ছিলেন না। কংগ্রেস দলের যান্ত্রিক রাজনীতির নেতারা সে দিন ব্রিটিশ রাজের কেন্দ্রীভূত প্রশাসনে আসীন হতে বড়ই বেশি ব্যস্ত, তার জন্য যদি দেশভাগের মূল্য দিতে হয়, তাতেও সই। গাঁধী নাকি ১৯৪৭ সালে বিলাপ করেছিলেন যে তাঁর সব “ইয়েস-মেন”রা এখন “নো-মেন”-এ পরিণত হয়েছেন। দেশবিভাজক কুড়ালের কোপ যতই এগিয়ে আসছিল, মহাত্মা হয়তো ততই তাঁর বিদ্রোহী সন্তানটির অভাব অনুভব করছিলেন, ১৯৩৯ সালে আরও বাধ্য অনুগত অনুচরদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে যাঁকে তিনি ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলেন। দেশভাগের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বহ্ন্যুত্সবের সময়ে, গাঁধী দাঁড়িয়ে থাকলেন মর্মন্তুদ একাকিত্বের মধ্যে। কে জানে, মহাত্মা আর যোদ্ধা যদি সে দিন একসঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারতেন, হয়তো ১৯৪৭ সালের ভয়াবহ দুর্ভাগ্য উপমহাদেশকে গ্রাস করত না। কিন্তু তা তো হওয়ার ছিল না।
অগ্নিসম উজ্জ্বল নেতা সুভাষ যে পথ গ্রহণ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন, সে পথ বিষয়ে গাঁধীর আপত্তি ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এত দিনে যে তাঁর মনে সুভাষ বিষয়ে সত্যিই শ্রদ্ধার উদ্রেক হয়েছে, সেটাও স্পষ্ট। তাঁর মতে, আই এন এ-র প্রতি নেতাজির শেষ বার্তা এই যে ভারতের বাইরে সশস্ত্র সংগ্রাম চালালেও দেশের মধ্যে তাঁদের স্বাধীনতার অহিংস সেনানীই হতে হবে। ১৯৪৫-এর নভেম্বর থেকে নেহরুও যে আই এন এ-র আদর্শকে তুলে ধরতে শুরু করলেন, তার মধ্যে হয়তো খানিক রাজনৈতিক সুবিধাবাদের চিহ্ন ছিল। তবে এও ঠিক যে ১৯৪৬ সালে সিঙ্গাপুর সফরে গিয়ে আই এন এ মেমোরিয়াল দেখে তিনি আন্তরিক ভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন।৪০ তা সত্ত্বেও কিন্তু লর্ড এবং লেডি মাউন্টব্যাটেনের প্রভাবে নেহরু তাঁর ভ্রাতৃসম সহযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বীটির প্রতিপালিত বাহিনীকে স্বাধীন ভারতের বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করতে রাজি হননি। আই এন এ অফিসারদের মধ্যে যাঁরা বিশেষ কুশলী, বিশেষ দক্ষ, তাঁদের স্থান হল কূটনৈতিক বিভাগে, বিদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখালেন তাঁরা। সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে নেহরু উপনিবেশের অবসান সত্ত্বেও উত্তর-ঔপনিবেশিক অবিচ্ছিন্নতাই বজায় রাখলেন। উল্টো দিকে, জিন্নার পাকিস্তানে কিন্তু আই এন এ অফিসার ও সৈন্য, দুই পক্ষই ১৯৪৮ সালে কাশ্মীর যুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় সৈন্যবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারলেন।৪১
কাশ্মীর যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে যাঁরা লড়াই করলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন সেই হাবিবুর রহমান— নেতাজির শেষ বিমানযাত্রায় যিনি তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তাতসুয়ো হায়াশিদা তাইপে থেকে টোকিয়ো সুভাষের দেহভস্মাধারটি বয়ে এনেছিলেন, ১৯৬৬ সালে তাঁকেই হাবিব লিখে জানান— স্বাধীনতা সংগ্রামের ফলাফল যে নেতাজি নিজে দেখে যেতে পারলেন না, এ এক “বিরাট ট্র্যাজেডি”। “কত বার যে মনে হয়, তিনি যদি ফিরে আসতেন।” “ভারতীয় রাজনীতিতে তা হলে খুব বড় একটি জায়গা নিতে পারতেন উনি,” ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কও হয়তো “এত তিক্ত না হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ হত”, “এতই বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ নেতা” হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।৪২ দেশভাগের পঞ্চাশ বছর পর, তাঁর আরও এক অনুগামী রাজা মহম্মদ অরশদ পাকিস্তান থেকে ভারতে এসে নেতাজির বর্ণনা দেন “ঐক্যের মহান প্রবক্তা, কোনও সংকীর্ণ বৈষম্য বা পক্ষপাতের চিহ্ন ছিল না তাঁর মধ্যে।” “হয়তো তিনি আজ এ দেশে থাকলে” “এই উপমহাদেশের মানুষের অনেক তীব্র সংকটই সৌহার্দ্যময় ভাবে মিটে যেত। কে জানে, হয়তো কোনও রক্তপাত হত না, এত মতবিরোধিতাও হত না।”৪৩
সুভাষের বিরোধীরা অবশ্য অভিযোগ করেন, সুভাষ যদি ভারতে বিজয়ীর মতো প্রবেশ করতেন, শেষ অবধি এক জন একনায়ক হয়েই দাঁড়াতেন তিনি। ব্রিটেনের যে স্বৈরতান্ত্রিক শত্রুদের সঙ্গে তিনি হাত মিলিয়েছিলেন, তাঁর নিজের আদর্শবাদও তাঁদের কাছাকাছিই ছিল বলে মনে করেন তাঁরা। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যে অক্ষশক্তির সহায়তা সুভাষ প্রার্থনা করেন, তাদের বিপজ্জনক দর্শনের সঙ্গে যে তাঁর নিজের কোনও সংযোগই ছিল না, এ বিষয়ে সন্দেহের লেশমাত্র রাখা যায় না। ভারতের সম্মানের প্রশ্নে সাহসিকতার সঙ্গে তিনি এই নেতাদের মোকাবিলা করেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই সব দেশের যে সাধারণ মানুষ তাঁদের নেতাদের নীতির বলি হয়েছিলেন, তাঁদের হয়ে রুখে দাঁড়াননি সুভাষ। তাঁর চিন্তার জগৎ সম্পূর্ণত অধিকার করে ছিল ঔপনিবেশিক বিশ্বের অত্যাচারিত পদদলিত মানুষগুলির ভবিষ্যৎ, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে তিনি দেখেন পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল ছিন্ন করে এই মানুষগুলির মুক্ত হতে পারার একটা সুযোগ। এটা ঠিক যে অন্তত তিনটি বিশেষ মুহূর্তে তিনি এমনও বলেন যে, স্বাধীনতার পর কিছু দিন দেশের হাল কড়া কর্তৃত্ববাদী হাতে ধরা দরকার, যাতে ভারতের যে যুগান্তকারী সামাজিক-অর্থনৈতিক সংস্কারের স্বপ্ন তিনি দেখেন, সেগুলি কাজে পরিণত করা সম্ভব হয়। তাঁর সেই রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার গোড়াতেই ছিল নারীসমাজ, কৃষকসমাজ, শ্রমিকসমাজ, এবং অনুন্নত জাতি-জনজাতিগুলির ক্ষমতায়নের প্রশ্ন। পরবর্তী কালে নামে গণতান্ত্রিক হয়েও ভারতীয় রাষ্ট্র দারিদ্র, অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য ইত্যাদি সমস্যার মোকাবিলার প্রশ্নে যে ঔদাসীন্য দেখায়, সুভাষ থাকলে নিশ্চয়ই এতে তিনি বিরক্তই হতেন। এবং এই পরিস্থিতিতে হয়তো সত্যিই শক্তিশালী দল ও রাষ্ট্র তৈরি করে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার কথাই ভাবতেন। তা সত্ত্বেও নিজেই রাষ্ট্রক্ষমতার লালসায় জড়িয়ে পড়ছেন সুভাষ, এ কথা ভাবাই অসম্ভব। সারা জীবন তাঁর কেটেছে সমৃদ্ধি, বৈভব, জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য কিংবা ব্যক্তিগত মোহ ত্যাগ করেই। আত্ম-প্রতিষ্ঠার থেকে আত্মত্যাগের স্পৃহাই তাঁর চরিত্রে আজীবন প্রবলতর হয়ে থেকেছে।
ভারতে আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠনের প্রশ্নে নেহরু ও সুভাষের চিন্তাধারার মধ্যে অনেক সাদৃশ্য ছিল। বৈসাদৃশ্যও ছিল। সমাজতন্ত্রের পৃথক ধারার পন্থী তাঁরা দু’জনই, তবে ন্যায়বিচার ও সাম্য বিষয়ে ভারতীয় ধ্যানধারণার বিষয়ে সুভাষের একটু বেশি ঔত্সুক্য। আবার, ধর্মীয় কিংবা ভাষাভিত্তিক বৈষম্যের প্রশ্নের সামনেও নেহরুর থেকে সুভাষ অনেক বেশি ধৈর্যশীল। ধর্মনিরপেক্ষ একত্ববাদের অসহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী নন তিনি, বরং তাঁর আগ্রহ প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে, তাদের অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে পেরিয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারা নিয়ে। অন্তর্নিহিত বৈচিত্রগুলিকে এ ভাবে এক জায়গায় স্থান দেওয়ার যে ভাবনা তাঁর মধ্যে দেখা যায়, তার সঙ্গে বরং গাঁধীর মতবাদেরই কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে সুভাষের এও বিশ্বাস যে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্যবোধ নির্মাণ করা নিশ্চয়ই সম্ভব। বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার মতো অনেক সমাজতন্ত্রী— যাঁদের সুভাষ নেহরু-পরিচালিত ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটিতে স্থান দিয়েছিলেন— ক্রমে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সমালোচক হয়ে ওঠেন, কেননা তিনি শেষ পর্যন্ত স্বাধীন দেশের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক ব্যুরোক্র্যাসির ধারণাটিই প্রতিষ্ঠিত করেন, এবং ভাষাগত ভিত্তিতে দেশের প্রদেশগুলিকে পুনর্বিন্যস্ত করার বিষয়ে জাতীয় কংগ্রেসের দীর্ঘ দিনের প্রতিশ্রুতি কার্যকরী করতে বাধাদান করেন।৪৪ ভারতীয় ঐক্যের ধারণায় আদ্যন্ত বিশ্বাসী হয়েও নেতাজি কিন্তু সত্তা-পরিচয়ের বহুত্বে বিশ্বাস রাখতেন— ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে গঠিত সাংস্কৃতিক সত্তার উপর তো বটেই।
প্রেমকুমার সহগল পরে এক সময় বলেন— ১৯৪৪ সালের ইম্ফল অভিযানের চূড়ান্ত মুহূর্তে নাকি বর্মার পাহাড়ি শহর মেমিয়ো-য় বসে জওহরলাল নেহরুর “মহত্ত্ব ও দুর্বলত্ব”-র বিশ্লেষণ করেছিলেন সুভাষ। সারা দিনের কাজের শেষে প্রায়ই রাতের বেলায় তরুণ সামরিক সেক্রেটারিটি এসে নেতাজির কাছে বসে “মুগ্ধ ভাবে তাঁর কথা” শুনতেন, আর নেতা নানা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মতামত বলে যেতেন। নেহরুর কথা ছাড়াও আরও কত কথা বলতেন তিনি— অহিংসার দর্শনের কথা, ভারতের রাজনীতিতে মহাত্মা গাঁধীর ভূমিকার কথা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের কথা, এই মুহূর্তে ইউরোপে তারা যে সব ভুলভ্রান্তি করছে, সে সব কথা, মুসোলিনির ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ, কিংবা “যুদ্ধে মিত্রশক্তির চূড়ান্ত জয়ের আগেই যদি ভারত থেকে ব্রিটিশদের না তাড়ানো হয়, তবে দেশভাগের অবশ্যম্ভাবিতার কথা”। তাঁর নেতার “অসামান্য ধীশক্তি এবং দৃষ্টির স্বচ্ছতা” বিষয়ে উচ্ছ্বসিত সহগল— দুর্ভাগ্যক্রমে “দাসত্ব-শৃঙ্খলে বদ্ধ” একটি দেশে জন্মেও যে মানুষটি কত অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী। কোনও স্বাধীন দেশে যদি নেতাজির জন্ম হত, তিনি “তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের অন্যতম হিসেবে পরিগণিত হতেন,”— সহগলের বিশ্বাস।৪৫
স্বাধীন ভারতে সুভাষকে সাধারণত এক জন অসাধারণ জনপ্রিয় নেতা হিসেবেই দেখা হয়ে এসেছে। তবে নেতা হিসেবে তাঁর কৃতিত্বের সরকারি মূল্যায়ন কিন্তু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জওহরলাল নেহরুর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় জুড়ে, ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত, কিছুটা অনুচ্চারিতই থেকে যায়। নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গাঁধী নেতাজিকে তাঁর সাহস ও দূরদৃষ্টির জন্য খুবই শ্রদ্ধা করতেন। তবু, যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে দুই-দুই বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র, সেই কংগ্রেস কিন্তু প্রথম তাঁকে কংগ্রেসের নিজের তারকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ১৯৯০-এর দশকেই— নরসিংহ রাও-র প্রধানমন্ত্রিত্বে যখন কংগ্রেস বংশানুক্রমিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের তারকাদের মধ্যে উজ্জ্বলতম তারকা হয়েও নেতাজি বার বার ব্যবহৃত হয়েছেন সংকীর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্যে, বিশেষত বিভিন্ন নির্বাচনের আগের সময়গুলিতে। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহের বিষয়টি ভুলে গিয়ে হিন্দু দক্ষিণপন্থীরা গেয়েছে তাঁর সামরিক বীরত্বগাথা। তাঁর ভারতীয় সমালোচকদের মধ্যে একেবারে শীর্ষে যে কমিউনিস্টরা, যাঁরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তাঁকে “তোজোর দালাল” বলে উপহাস করেছে, তারাই আবার সত্তরের দশকের শেষে মত পাল্টেছে। তার পর থেকে প্রতি ২৩ জানুয়ারি নেতাজির স্ট্যাচুতে তারা মালা পরাতে ভোলেনি, এমনকী এই মহান দেশনেতার বিষয়ে তাদের মূল্যায়ন যে ভুল ছিল, তা নিয়েও দুঃখপ্রকাশ করেছে।৪৬
আমাদের সমসাময়িক এক তীক্ষ্ণদৃষ্টি বক্তা এক বার বলেছিলেন, “স্ট্যাচুই হোক আর ছবিই হোক, যত বার তাঁকে দেখি, কী যেন এক অপূর্ণ তৃষ্ণা জেগে ওঠে, কী যেন এক অধরা প্রতিশ্রুতি মনে পড়ে যায়, কী একটা আশার আলো মনের মধ্যে ঝলসে ওঠে, তবে কি না, বেশির ভাগ আশার আলোর পাশেই যে ছায়া-ছায়া ভাব, সেই ছায়া কিন্তু এই আলোটিতে লেগে থাকে না।” নেতাজি যেন “জাতির ক্ষমতা-তন্ত্রের মূর্ত বিকল্প”।৪৭ যেখানেই ন্যায়ের স্খলন, যেখানেই স্বাধীনতার সংকট— সেখানেই দেখা যায় তাঁর আবাহন। তাঁর জীবনের আশ্চর্য সব অভিযান তাঁকে দেশের সীমানার বহু দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল। সেই বিশ্বমঞ্চে সত্যিকারের তারকা হয়ে উঠেছিলেন তিনি, কত নাটকীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, কত বাধাবিপদ পেরিয়েছিলেন। তাঁর বিরাট ভাবনাজগতের পরিসর জুড়ে থাকত যে সাম্রাজ্যবাদহীন পৃথিবীর স্বপ্ন, ঔপনিবেশিক শাসনের অবমাননা ও অত্যাচারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ইতিহাসে তাঁর স্থান নির্ধারিত হওয়া উচিত।
“এই নশ্বর দুনিয়ায় সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যায়, সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে,” ১৯৪০ সালে লেখেন সুভাষচন্দ্র বসু, “বেঁচে থাকে কেবল ভাবনা, আদর্শ এবং স্বপ্ন।” আমরণ অনশনের জন্য তৈরি হতে হতে তাঁর প্রত্যয় হয়— “যে ধারণার জন্য কোনও ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করতেও প্রস্তুত থাকে, সহস্র জীবনের মধ্য দিয়েই সেই ধারণার বারংবার পুনর্জন্ম হয়।” তাঁর বিশ্বাস— এই ভাবেই ক্রমবিবর্তনের চাকা ঘোরে, এই ভাবেই ভাবনা, আদর্শ ও স্বপ্ন এক প্রজন্ম থেকে “অন্য প্রজন্মে বাহিত হয়ে চলে”। “এ জগতে ত্যাগ ও ক্লেশস্বীকার ছাড়া কোনও আদর্শ পূর্ণতা পায়নি,” দৃঢ় উচ্চারণ তাঁর।৪৮ এই সেই ত্যাগ— রামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দ যে ত্যাগ-এর কথা বলে গিয়েছেন, আই এন এ স্মারকস্তম্ভে যে কুরবানি-র কথা খোদিত ছিল। এই ত্যাগই তাঁকে মৃত্যুহীন প্রাণে পরিণত করে দেয়।
.
১. কৃষ্ণা বসু, ইতিহাসের সন্ধানে (কলকাতা: আনন্দ, ১৯৭২), পৃ: ৩৬।
২. শিশিরকুমার বসু, বিভাবতী বসুকে লেখা চিঠি, ২৭ অগস্ট, ১৯৪৫ (এন আর বি), প্রতিরূপ শিশিরকুমার বসু, বসুবাড়ি (কলকাতা: আনন্দ, ১৯৮৫), পৃ: ১৯৬।
৩. প্রিজন ডায়রি, শরৎচন্দ্র বসু, ২৫ অগস্ট, ১৯৪৫ (এন আর বি), প্রতিরূপ শিশিরকুমার বসু, বসুবাড়ি, পৃ: ১৯৪।
৪. দ্য হিন্দু, ২৯ অগস্ট, ১৯৪৫।
৫. এস এ আইয়ার, আনটু হিম আ উইটনেস: দ্য স্টোরি অব নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ইন ইস্ট এশিয়া (মুম্বই: থ্যাকার, ১৯৫১), পৃ: ৭৮-৭৯, ৮৩।
৬. তদেব, পৃ: ৮৩-৮৬।
৭. তদেব, পৃ: ১০০, ১০৩-১০৫, ১০৭-১০৮।
৮. তদেব, পৃ: ১১০-১১৩।
৯. তদেব, পৃ: ১১৩-১১৪।
১০. তদেব, পৃ: ১১৪-১১৫।
১১. তদেব, পৃ: ১১৬-১১৭। মূর্তি পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে রাম মূর্তি চিতাভস্মকে ভাগ করে একটি অংশ তাঁর নিজের বাড়িতেই লুকিয়ে রাখেন। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র আনন্দ জে মূর্তি স্বাক্ষরিত হলফনামায় এ কথা বলেছেন। হলফনামাটি প্রত্যয়িত করেছিলেন টোকিয়োর ভারতীয় দূতাবাস, ১৮ অগস্ট, ২০০৮ (অনুলিপিটি আমার কাছে রয়েছে)।
১২. আইয়ার, আনটু হিম আ উইটনেস, পৃ: xiv, ১১৭, ১২০-১২১, ১২৫-১৩০।
১৩. শাহনওয়াজ খান এবং এস এন মৈত্র, নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটি রিপোর্ট (নয়া দিল্লি: গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, ১৯৫৬), পৃ: ৩২-৩৩। আরও দ্রষ্টব্য, অ্যাপেনডিক্স এ থেকে সি এস ডি আই সি (I) ২, সেকশন রিপোর্ট ১০৮৯, বি১১৮৯: “দ্য লাস্ট মুভমেন্টস্ অব এস সি বোস (এপ্রিল-অগস্ট ১৯৪৫),” ডব্লিউ ও ২০৮/৩৮১২ (টি এন এ)।
১৪. “সুভাষ চন্দ্র বোস (এ) নোটস্,” ফাইল ২৭৩/আই এন এ (এন এ আই)।
১৫. হরিজন, ৭ এপ্রিল, ১৯৪৬, লেখা হয় ৩০ মার্চ, ১৯৪৬, উরুলি থেকে, উদ্ধৃত হয়েছে ডি জি তেন্ডুলকর, মহাত্মা: লাইফ অব মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, সপ্তম খণ্ড, ১৯৪৫-১৯৪৭ (নয়া দিল্লি: গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, ১৯৫৩), পৃ: ৮৪-৮৫।
১৬. এমিলি শেঙ্কল, শ্রীমতী উড্সকে লেখা চিঠি, ১৮ জানুয়ারি, ১৯৪৬ (এন এ আই এবং এন আর বি)।
১৭. ম্যানাস্ক্রিপ্টস্. ইইউআর. সি ৭৮৫ (আই ও আর, বি এল)।
১৮. আইয়ার, আনটু হিম আ উইটনেস, পৃ: ৬২।
১৯. হারিন শাহ, ভার্ডিক্ট ফ্রম ফরমোসা: দ্য গ্যালান্ট এন্ড অব নেতাজি, সুভাষ চন্দ্র বোস (দিল্লি: আত্মা রাম অ্যান্ড সন্স, ১৯৫৬), পৃ: ৫১-৭২।
২০. “স্টেটমেন্ট অব ইয়োশিমি তানেয়োশি, ক্যাপ্টেন (মেডিক্যাল) অব দি ইম্পিরিয়াল জাপানিজ আর্মি, উইথ রিগার্ড টু দ্য ডেথ অব ওয়ান চন্দ্র বোস, হু ডায়েড অ্যাট তাইহোকু, ফরমোসা, অন এইটিন্থ ডে অব অগস্ট ১৯৪৫,” স্ট্যানলি জেইল, হংকং, ১৯ অক্টোবর, ১৯৪৬, ডব্লিউ ও ২০৮/৩৮১২ (টি এন এ)। ডক্টর ইয়োশিমি ১৯৫৬ সালে নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটির কাছে বার বার এই বিবৃতি দিয়েছিলেন। অগস্ট ১৯৯৫ সালে বিবিসি থেকে সম্প্রচারিত, চার্লস ব্রুস-এর এনিমি অব এম্পায়ার চলচ্চিত্রে ক্যামেরার সামনেও তিনি এই কথা বলেন। আরও দ্রষ্টব্য, লেনার্ড এ গর্ডন, ব্রাদার্স এগেনস্ট দ্য রাজ: আ বায়োগ্রাফি অব ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিস্টস্ শরৎ অ্যান্ড সুভাষ চন্দ্র বোস (নিউ ইয়র্ক: কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯০), পৃ: ৫৪১-৫৪৩, ৬০৫।
২১. দ্রষ্টব্য, ছবি এবং মন্তব্য, সুমথি রামস্বামী, দ্য গডেস্ অ্যান্ড দ্য নেশন (ডারহাম, নর্থ ক্যারোলাইনা: ডিউক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১০), পৃ: ১৭৭-২৩৬; মারিয়া আন্তোনেল্লা পেলিত্জারি (সম্পাদিত), ট্রেসেস্ অব ইন্ডিয়া (নিউ হাভেন: ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৩), পৃ: ৫৪-৫৫, ২৭৬, ২৮৮-২৮৯।
২২. অ্যানেক্সর ২১, অ্যাপেনডিক্স ৭, পার্লামেন্টারি ডিবেটস্, পঞ্চম অধিবেশন, ১৯৫২, পৃ: ১০৩।
২৩. খান এবং মৈত্র, নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটি রিপোর্ট, পৃ: ১-৪।
২৪. তদেব, পৃ: ৯-১০, ১৪।
২৫. তদেব, পৃ: ১৫-২৬। ঊনিশশো সত্তরের দশকের প্রথম দিকে কোনো, সাকাই এবং নোনোগাকি-র আরও এক বার সাক্ষাত্কার নেয় খোসলা কমিশন, এবং লেনার্ড এ গর্ডন ১৯৭৯ সালে নেতাজি-কন্যা অনিতার উপস্থিতিতে। দ্রষ্টব্য, গর্ডন, ব্রাদার্স এগেনস্ট দ্য রাজ, পৃ: ৫৩৯-৫৪৩, ৭৪০-৭৪১।
২৬. খান এবং মৈত্র, নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটি রিপোর্ট, পৃ: ২৯-৩০। জুইচি নাকামুরার বিবৃতির পূর্ণ রচনা (এন আর বি)।
২৭. খান এবং মৈত্র, নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটি রিপোর্ট, পৃ: ৪০-৪২; নাকামুরার বিবৃতি (এন আর বি)।
২৮. খান এবং মৈত্র, নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটি রিপোর্ট, পৃ: ৬৭-৬৮; সুরেশচন্দ্র বসু, ডিসেনশিয়েন্ট রিপোর্ট (কলকাতা: সুবর্ণ প্রকাশনী, ১৯৫৬)। ভিন্নমত-সম্বলিত রিপোর্টটির সমালোচনার জন্য দ্রষ্টব্য, গর্ডন, ব্রাদার্স এগেনস্ট দ্য রাজ, পৃ: ৬০৬।
২৯. খান এবং মৈত্র, নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটি রিপোর্ট, পৃ: ২৪, ৩৫, ৫০।
৩০. তদেব, পৃ: ৬১, উদ্ধৃত ১ করিন্থিয়ানস্ ১৫:৫৫।
৩১. জি ডি খোসলা, রিপোর্ট অব দি ওয়ান-ম্যান কমিশন অব এনকোয়্যারি ইনটু দ্য ডিস্যাপিয়ারেন্স অব নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস (নয়া দিল্লি: গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া, ১৯৭৭), পৃ: ১২৩-১২৫।
৩২. মনোজ মুখার্জী, সাক্ষাত্কার, স্টার আনন্দ নিউজ (ফেব্রুয়ারি ২০১০); মুখার্জী কমিশন, সুগত বসুকে লেখা চিঠি, ৪ অক্টোবর, ২০০২ (আমার সংগ্রহে)।
৩৩. মনোজ মুখার্জী, রিপোর্ট অব দ্য কমিশন; সংসদীয় কার্যপদ্ধতি, ২০০৬। মূর্তির বাড়িতে রাখা নেতাজির দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনা হয় ২০০৬ সালের মার্চ মাসে নেতাজি-কন্যা অনিতার সঙ্গে আলোচনার পর এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এই অগ্রগতির বিষয়ে জানানো হয়। টোকিয়োর রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত ভস্মাধারটি এখনও (২০১০ সাল পর্যন্ত) ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়নি।
৩৪. নেতাজির সহযোগীদের সঙ্গে আমার কথোপকথন এবং তাঁদের দেওয়া অসংখ্য বক্তৃতা এবং সাক্ষাত্কার। নেতাজির অন্তর্ধান ঘিরে তৈরি হওয়া ‘সো-কল্ড মিস্ট্রি’র সমর্থক এবং এক ‘স্ট্রেঞ্জ অ্যান্ড স্পুরিয়াস নিউ বোস কাল্ট,”-এর ভক্তদের প্রতি শিশিরকুমার বসুর সমালোচনার জন্য দ্রষ্টব্য, এস কে বসু, “এডিটরস্ নোট,” শিশিরকুমার বসু (সম্পাদিত), নেতাজি অ্যান্ড ইন্ডিয়া’জ ফ্রিডম (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, ১৯৭৫), পৃ: vii.
৩৫. খান এবং মৈত্র, নেতাজি এনকোয়্যারি কমিটি রিপোর্ট, পৃ: ৩৫, ৬৩।
৩৬. “মাই পলিটিক্যাল টেস্টামেন্ট,” সুভাষচন্দ্র বসু, বাংলার রাজ্যপালকে লেখা চিঠি, ২৬ নভেম্বর, ১৯৪০, সুভাষচন্দ্র বসু, দি অলটারনেটিভ লিডারশিপ: নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, কালেকটেড ওয়ার্কস্, দশম খণ্ড, শিশিরকুমার বসু এবং সুগত বসু [সম্পাদিত] (কলকাতা: নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, দিল্লি: পার্মানেন্ট ব্ল্যাক, ২০০৪), পৃ: ১৯৭।
৩৭. তেন্ডুলকর, মহাত্মা, পৃ: ৩১৩-৩১৪।
৩৮. দিলীপকুমার রায়, নেতাজি, দ্য ম্যান: রেমিনিসেন্সেস্ (মুম্বই: ভারতীয় বিদ্যা ভবন, ১৯৬৬), পৃ: ১৪৭।
৩৯. তেন্ডুলকর, মহাত্মা, পৃ: ৯২।
৪০. কে টি জন, এস আর নাথনকে লেখা চিঠি, ৩০ অগস্ট, ২০০০। এই চিঠির একটি কপি আমাকে পাঠিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপতি এস আর নাথন। সে জন্য আমি ওঁর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। এস আর নাথন, সুগত বসুকে লেখা চিঠি, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ (আমার সংগ্রহে)।
৪১. এ সি এন নাম্বিয়ার, যিনি ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেতাজি এশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলে বার্লিনের ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ফেডেরাল রিপাবলিক অব জার্মানিতে স্বাধীন ভারতের প্রথম দূত নিযুক্ত হন। পরবর্তী কালে আবিদ হাসান ডেনমার্ক-এ দূত নিযুক্ত হন; মেহবুব আহমেদ, কানাডা; সিরিল জন স্ট্রেসি, নেদারল্যান্ডস্ এবং এন রাঘবন, সুইজারল্যান্ড। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে আই এন এ অফিসারদের ভূমিকা জানতে দ্রষ্টব্য, মহম্মদ জামান কিয়ানি, ইন্ডিয়া’জ ফ্রিডম স্ট্রাগ্ল অ্যান্ড দ্য গ্রেট আই এন এ (নয়া দিল্লি: রিলায়েন্স পাবলিশিং হাউস, ১৯৯৪), পৃ: xiv-xvi, ২০৯-২১৩। কিয়ানি নিজেই ঊনিশশো পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে গিলগিটে রাজনৈতিক প্রতিনিধি ছিলেন।
৪২. হাবিবুর রহমান খান, “শর্ট নোট অন মিস্টার সুভাষ চন্দ্র বোস, স্পেশালি অন হিজ লাস্ট ডেজ” (তাত্সুয়ো হায়াশিদাকে প্রেরিত, ১৯৬৬), পূর্ণ অংশটি রয়েছে এন আর বি-তে; উদ্ধৃতিগুলি রয়েছে শিশিরকুমার বসু, আলেকজান্ডার ওয়ের্থ এবং এস এ আইয়ার, আ বিকন অ্যাক্রস এশিয়া (মুম্বই: ওরিয়েন্ট লংম্যান, ১৯৭৩), পৃ: ২৩০।
৪৩. রাজা মহম্মদ আরশাদ, “নেতাজি ওরেশন, ১৯৯৬,” দি ওরাকল, ২৮, ২ নম্বর (এপ্রিল ১৯৯৬), ৭-১৫।
৪৪. সুগত বসু, “ইনস্ট্রুমেন্টস্ অ্যান্ড ইডিয়মস্ অব কলোনিয়াল অ্যান্ড ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট: ইন্ডিয়া’জ এক্সপেরিয়েন্স ইন কমপ্যারেটিভ পারস্পেকটিভ,” ফ্রেডরিক কুপার এবং র্যানডল প্যাকার্ড (সম্পাদিত), ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড দ্য সোশাল সায়েন্সেস্ (বার্কলে: ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ১৯৯৮), পৃ: ৪৫-৬০।
৪৫. প্রেমকুমার সহগল, দি “ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি” (নেতাজি ওরেশন, ১৯৬৬), দি ওরাকল, ১৫, ১ নম্বর (জানুয়ারি ১৯৯৩), ১৮।
৪৬. জ্যোতি বসু, “লুকিং ব্যাক: নেতাজি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান কমিউনিস্টস্,” দি ওরাকল, ১, ১ নম্বর (জানুয়ারি ১৯৭৯), ৪৭-৫১। “প্রথম সারির দু-এক জন নেতার মধ্যেই তিনি ছিলেন,” জ্যোতি বসু বলেন। “বাঙালি হিসেবে আমি এ কথা বলছি না, যখন তিনি আই এন এ সংগঠিত করেন, কত জন বাঙালিই বা তাতে ছিলেন?” ২৩ জানুয়ারি, ২০১০, পশ্চিমবঙ্গের সদ্য প্রাক্তন কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী আরও এক বার কমিউনিস্টদের ‘ভুল’ স্বীকার করে নেন; এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক বসুর জন্মদিবসকে ‘দেশপ্রেমিক দিবস’ হিসেবে পালন করার বামপন্থী দলগুলির দাবিকে নেতৃত্ব দেন।
৪৭. গোপালকৃষ্ণ গাঁধী, “অ্যান আইকন অব আইকনস্,” দি ওরাকল, ৩১, ১ নম্বর (জানুয়ারি ২০০৯), ১১-১৫।
৪৮. “মাই পলিটিক্যাল টেস্টামেন্ট,” সুভাষচন্দ্র বসু, বাংলার রাজ্যপালকে লেখা চিঠি, ২৬ নভেম্বর, ১৯৪০, বসু, দি অলটারনেটিভ লিডারশিপ, পৃ: ১৯৭।
***
