Accessibility Tools

মহাদেবী – অভীক সরকার

মহাদেবী – ৪

পাটলিপুত্র আর মাত্র একদিনের পথ। ধ্রুবা এখন যেখানে পৌঁছেছেন সেখানে নাকি মহর্ষি গৌতমের আশ্রম ছিল। পাষাণী অহল্যাকে এখানেই মুক্ত করেছিলেন পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র। সেখান থেকে কোসলের দক্ষিণপ্রান্ত ছুঁয়ে যাত্রা আরও পূর্বদিকে।

পথে পতিতোদ্ধারিনী গঙ্গা। তাঁর তীরে ষোড়শোপচারে পূজা দিলেন ধ্রুবা। না নিজের জন্য নয়, কুমার চন্দ্রগুপ্তর জন্য হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে প্রার্থনা করলেন। একান্নটি ছাগবলি দিলেন, তাদের মাংসে ভূরিভোজন করল গুপ্তসেনানী এবং সংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দারা।

ধ্রুবা দেখছিলেন পাটলিপুত্র যত কাছে আসছে, কুমার কচ ততই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। ওই দেখা যায় প্রাসাদের শিখরচূড়া। আর মাত্র অর্ধদিবসের পথ। কুমার কচ এতদিন বাদে স্বভূমে ফিরছেন। তাঁর মুখমণ্ডল তো উল্লাসে উজ্জ্বল হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁর মুখে অনিশ্চয়তার অন্ধকার কেন?

ধ্রুবা তাঁকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল ভাই। এত উৎকণ্ঠা কীসের?’

কচগুপ্ত উত্তর দিলেন, ‘এতক্ষণে তো যুবরাজের রাজ্যারোহনের সংবাদ নিয়ে দূত আসার কথা জ্যেষ্ঠা। গুপ্তবংশের ভাবী রাজমহিষী আসছেন, তাঁকে অভ্যর্থনা করার কোনও উদ্যোগ দেখছি না কেন?’

ধ্রুবার ভ্রু কুঞ্চিত হল। কচের কথার যুক্তি আছে বটে।

দেখতে দেখতে ধ্রুবার সৈন্যবহর পাটলিপুত্র নগরীতে প্রবেশ করল। ধ্রুবা বিস্মিত হয়ে দেখলেন তাঁকে ঘিরে অভ্যর্থনার আয়োজন হয়েছে বটে, তবে সে বড়ই নিষ্প্রাণ, নির্জীব। পুরোহিতরা স্বস্তিবাচন করছেন, পুরনারীরা পুষ্পবর্ষণ করছেন। কিন্তু সবই যেন যান্ত্রিক, পুত্তলিবৎ। রাজ্যের ভাবী রাজমহিষী রাজধানীতে পদার্পণ করছেন, তাঁর স্বাগত অনুষ্ঠান এত বিবর্ণ কেন?

ধ্রুবা ভাবলেন কুমার কচকে কিছু জিগ্যেস করবেন। কিন্তু তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন তাঁদের কাছে একদল সৈন্য এসে উপস্থিত হল। কচ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন মুখে তাঁদের সঙ্গে কোথায় যেন গেলেন, ধ্রুবার দিকে ফিরেও তাকালেন না।

এইবার অমঙ্গল আশ আশঙ্কায় ধ্রুবার হৃদয় কম্পিত হতে লাগল। নারীজাতির সহজাত অন্তর্সংবেদনে বুঝলেন পরিস্থিতি অনুকূল নয়, সহজ নয়, স্বাভাবিক নয়।

ধীরে ধীরে ধ্রুবার চতুর্দোলা প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়াল। দীর্ঘ সোপানশ্রেণী উঠে গেছে প্রাসাদের মূলদ্বার অবধি। সেখানে একদল সুবেশ নারী এবং পুরুষেরা দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে এক দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণের ব্রাহ্মণ সোপান বেয়ে নেমে এলেন। হাতজোড় করে বললেন, ‘সন্তানের প্রণাম নেবেন মা। আমি গুপ্তসাম্রাজ্যের এক অধীনস্থ কর্মচারী। অধীনের নাম শিখরস্বামী।’

ধ্রুবার আশ্চর্যচকিত হলেন। শিখরস্বামী এই সুবিশাল গুপ্তসাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতায় এবং প্রভাবে স্বয়ং সম্রাটের পরেই তাঁর স্থান। তাঁর কূটবুদ্ধি এবং রাজনীতি বিষয়ে গভীর জ্ঞান প্রবাদপ্রতিম।

প্রধানমন্ত্রী শিখরস্বামীর আদেশে দুইজন পরিচারিকা এসে ধ্রুবার দুইপাশে দাঁড়াল৷ শিখরস্বামী বিনম্রস্বরে বললেন, ‘আসুন রাজকুমারী। রাজমহিষী দত্তাদেবী আপনার অপেক্ষা করছেন।’

.

পাটলিপুত্রের রাজপ্রাসাদের প্রশস্ত অলিন্দ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ধ্রুবা চারিদিক দেখছিলেন। এমন সুরম্য হর্ম্য, এমন সুসজ্জিত প্রাসাদ ইতিপূর্বে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। মালব রাজপ্রাসাদ এর তুলনায় পর্ণকুটির বললেই চলে। কী অতুল বৈভব, কী অপ্রমেয় ঐশ্বর্য!

একটু পরেই একটি সুবিশাল দরজা দিয়ে একটি অতি সুরম্য কক্ষে প্রবেশ করলেন ওঁরা। অতুলনীয় বৈভবে সাজানো সেই কক্ষ। তার মধ্যে একটি সিংহাসনের ওপর বসেছিলেন এক বৃদ্ধা রমণী। বয়স এবং সদ্য বৈধব্যবেশ তাঁর সৌন্দর্য এবং আভিজাত্যকে বিন্দুমাত্র খর্ব করতে পারেনি।

তাঁর দুইদিকে দুইজন যুবক দাঁড়িয়েছিলেন। আর তাঁদের একজনকে দেখে ধ্রুবার হৃৎস্পন্দন যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত!

অন্য কোনও সাধারণ নারী হয়তো ওখানেই বিস্ময় বা উত্তেজনা প্রকাশ করে ফেলতেন। কিন্তু ধ্রুবা নিজেও একজন রাজকন্যা। রাজশিষ্টাচার তাঁর মজ্জাগত। ঠোঁটদুটি একবার থরথর করে কেঁপে ওঠা ছাড়া আর কিছু প্রকাশ পেল না।

শিখরস্বামী মৃদুস্বরে বললেন, ‘মহারানী দত্তাদেবী। প্রণাম করুন মা।’

ধ্রুবাদেবী এগিয়ে গিয়ে মহারাণীর চরণ স্পর্শ করতেই, তিনি দু-হাত দিয়ে ধ্রুবাকে জড়িয়ে ধরলেন। সুমিষ্ট অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘সৌভাগ্যবতী ভব, কল্যাণী। গুপ্ত বংশের ভবিষ্যৎ মহারাণীকে, সমগ্র গুপ্ত সাম্রাজ্য ও পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাগতম। গুপ্ত বংশের গৌরবকে তুমি বয়ে নিয়ে চলো, এই প্রার্থনা রাখি।’

আনন্দে ধ্রুবাদেবীর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। যাক, তিনি যা আশঙ্কা করেছিলেন সব মিথ্যে। অবশেষে তিনি তাঁর দয়িতের সঙ্গে মিলিত হতে চলেছেন। তিনি একবার তির্যক চাহনিতে যুবরাজ চন্দ্রগুপ্তর দিকে চাইলেন। কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত তখন নির্বাক প্রস্তরমূর্তির মতো সামনে তাকিয়ে আছেন। তিনি যেন এই পৃথিবীতেই আর নেই।

দত্তাদেবী বলে চললেন, ‘আমরা কুমার চন্দ্রগুপ্তর কাছ হতে তোমার ব্যাপারে সবকিছু অবগত হয়েছি কল্যাণী। কুমার কচ যে প্রতিশ্রুতি তোমার পিতাকে দিয়েছেন গুপ্তবংশ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।’

ধ্রুবা লজ্জাবিনতা হলেন।

‘কুমার চন্দ্রগুপ্ত যখন মালবে অবস্থান করছিলেন, তখন সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর শারীরিক অবস্থার আকস্মিক অবনতি হয়। আমরা সেই মর্মে দূত পাঠিয়েছিলাম তোমাদের কাছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে কুমার পাটলিপুত্র এসে পৌঁছবার পূর্বেই সম্রাট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।’

ধ্রুবা মুখ তুলে তাকালেন। তখনও তিনি বুঝতে পারছেন না এই উক্তির মর্ম কী।

দত্তাদেবী বলে চললেন, ‘সম্রাট সমুদ্রগুপ্তর অবর্তমানে তাঁর সিংহাসনাভিষিক্ত হতে চলেছেন যুবরাজ রামগুপ্ত। তাই কুমার কচের তোমার পিতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমি তোমার ও রামগুপ্তর বিবাহ স্থিরীকৃত করেছি। আর আমি চাই যুবরাজ রামগুপ্তর রাজ্যাভিষেকের পূর্বেই যেন এই বিবাহ অতি সত্বর সম্পাদিত হয়।’

ধ্রুবাকে দেখে মনে হল, এই কথাগুলির অর্থ তাঁর ঠিকমতো বোধগম্য হয়নি। অথবা তাঁর মস্তিষ্ক যেন শূন্য হয়ে গেছে। তাঁর উপর বজ্রাঘাত হয়েছে। তিনি বোধহয় কিছু বলতে গেলেন, কিন্তু তাঁর মুখে কোনও স্বর ফুটল না।

নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন ধ্রুবা, তিনি যা শুনলেন সে কি সত্যি? তিনি কি জেগে আছেন? স্বপ্ন দেখছেন না তো?

দত্তাদেবী আরও বলে চললেন, ‘কুমার চন্দ্রগুপ্ত পাটলিপুত্র পৌঁছবার কিঞ্চিৎ পূর্বেই সম্রাট স্বর্গারোহণ করেন। তাই গুপ্তবংশের উত্তরাধিকারনীতি সূত্রে এই বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর এখন রামগুপ্ত। কুমার কচ তোমার পিতাকে কথা দিয়েছেন যে তুমি গুপ্তসাম্রাজ্যের পট্টমহিষী হবে। কুমারের অনুরোধ সম্রাটের অনুরোধের সমতুল্য। তাই গুপ্তসম্রাট রামগুপ্তর সঙ্গেই তোমার বিবাহ স্থির করেছি।

গুপ্তবংশের রীতি হচ্ছে সচরাচর কোনও অবিবাহিত সম্রাট সিংহাসনে আরোহন করেন না। সম্রাট রামগুপ্তর অভিষেক মহোৎসব অতি শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হবে। তাই কালই তোমাদের বিবাহের দিন।’

চন্দ্রগুপ্ত মাথা নত করে, নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেদিকে তাকিয়ে জ্ঞান হারালেন ধ্রুবা। পড়েই যেতেন যদি না দুই সতর্ক পরিচারিকা তাঁকে ধরে ফেলত।

ধ্রুবাদেবী ও রামগুপ্তের বিবাহ সম্পন্ন হল পরের দিনই।

.

ধ্রুবা বাতায়নপথে নিষ্পলকে চেয়েছিলেন দূর আকাশের দিকে৷ মগধের আকাশে মেঘেদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। শুনেছেন এই গাঙ্গেয় উপত্যকার বৃষ্টিপাত নাকি ভয়ঙ্কর সুন্দর। মনে হয় যেন সারাদিন ধরে সমস্ত আকাশ তার ভারাক্রান্ত মনের করুণ বিষাদ ঢেলে চলেছে। সেই অবসন্ন বিষাদের রঙ ধূসর, শব্দ মৃত্যুর মতো নরম।

ধ্রুবাকে দেখলে মনে হয় যেন সমস্ত প্রাণের সাড়া, আনন্দের উচ্ছ্বাস সব অন্তর্হিত হয়েছে। তাঁকে ঘিরে রয়েছে এক তিক্ত ঔদাসীন্য, কটু বিষাদের ছায়া৷ বিবাহের পর মানুষের মনে এক অপার্থিব আনন্দ ছেয়ে থাকে। একজন সম্পূর্ণ মানুষকে নিজের মতো করে পাওয়ার আশ্চর্য আনন্দ। একজন অন্য মানুষের কাছে ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরার উন্মুখ আগ্রহ। তাকে আবিষ্কার করার উত্তেজনা, একটি নূতন দেশ আবিষ্কারের উত্তেজনার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।

কিন্তু ধ্রুবার মন তার ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের প্রতি ঘৃণায়, তিক্ততায় বিষিয়ে গিয়েছে। বিবাহের পর একটি সপ্তাহ তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেননি, নবলব্ধ সখীদের সঙ্গে আলাপ করেননি, দর্শনপ্রার্থীদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।

বিবাহের দিনই এই সুখবর জানিয়ে দূত যাত্রা করেছিল মালবদেশের উদ্দেশে। তিনি পত্র দিয়েছেন পিতার উদ্দেশে। তাতে কেবলমাত্র এই ক’টি বাক্য লেখা, ‘পিতা, আমি সুখে আছি। মন্দাকে জানিও, আমি সুখে আছি। তার কথা বড় মনে পড়ে।’ শেষ বাক্যের নীচে একফোঁটা জলের দাগ।

নববিবাহিতা ধ্রুবা, মালবরাজনন্দিনী ধ্রুবা সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসা আকাশের দিকে চেয়ে চোখ বুজলেন। নিজের বাসররাত্রির কথা ভেবে আবার বিবমিষা উদ্রেক হল তাঁর।

প্রতিটি নারী তাঁর স্বামীর সঙ্গে একান্তে পরিচিত হয় বাসরশয্যায়। সে চেনা শুধু শরীরী চেনা নয়, মনের সঙ্গে মনের মিলন আলাপের দিনও বটে। বাসর রাত আনন্দের রাত, শিহরনের রাত, সমর্পণের রাত। আর সেই রাত ধ্রুবার পায়ের কাছে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল যখন রামগুপ্ত তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন ক্ষুধার্ত পশুর মতো।

হায়, মালবরাজনন্দিনী ধ্রুবা! পিতার আদরের পুত্তলি ধ্রুবার ভাগ্যে এই অপমানও লেখা ছিল? বাসররাতেই স্বামীর দ্বারা সবলসম্ভোগ? চোখ বন্ধ করে ইষ্টদেবতা বিষ্ণুর কাছে বোধহয় এই অপমানেরই প্রতিকার চেয়েছিলেন তিনি। হে ভগবান, তুমি নাকি দুর্বলের সহায়? অনাথের নাথ? ভক্তের ডাকে নাকি সাড়া না দিয়ে তুমি নাকি থাকতে পারো না? কুরুরাজসভায় লাঞ্ছিতা দ্রৌপদীর সহায় হয়েছিলে তুমি। আর আজ কি এই অসহায়া ধ্রুবার আহ্বানে সাড়া দেবে না?

ভগবান বিষ্ণু সাড়া দিলেন বটে, তবে বড় করুণ বিদ্রুপের মধ্যমে। রামগুপ্তর প্রাথমিক জান্তব প্রচেষ্টার পরেই সেই তিক্ত কটু সত্যটি ধ্রুবার কাছে প্রতিভাত হল।

রামগুপ্ত একজন ক্লীব। পৌরুষহীন, স্ত্রীসম্ভোগে অক্ষম।

ধ্রুবা নিজের সমস্ত পোশাক শয্যা থেকে একত্রিত করে হাতে তুলে নিলেন, তারপর রামগুপ্তের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কেন? তবুও কেন চেয়েছিলেন আমাকে?’

রামগুপ্ত তাঁর দিকে কুটিল চোখে তাকিয়ে হাসতে থাকেন। সেই হাসিতে কতটা অক্ষম ঈর্ষা, কতটা তিক্ত হতাশা লুকিয়ে আছে সে আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।

পানপাত্রটি নিজের কাছে টেনে নিয়ে উৎকৃষ্ট মাধ্বীতে একটি চুমুক দিয়ে রামগুপ্ত বলেন, ‘জানো মহাদেবী, আমি যখন বালক ছিলাম, আমার প্রিয় ব্যসন কী ছিল? অন্য শিশুদের থেকে তাদের কন্দুক, ক্রীড়নক, পুত্তলি এসব বলপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া। আমার তো অর্থের অভাব ছিল না। অর্ধজম্বুদ্বীপাধিপতি সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত আমার পিতা। রাজকোষ আমার জন্য সদাসর্বদা উন্মুক্ত। তবুও এসব করতে আমার ভালো লাগত। জানো তার কারণ কী?

‘আনন্দ! অন্যের প্রার্থিত, কাঙ্ক্ষিত বস্তু ছলে বলে কৌশলে অধিগত করার আনন্দ। যার কাছ থেকে তার ঈপ্সিত বস্তুটি ছিনিয়ে নিচ্ছি তার চোখে অসহায় আকুল আর্তি দেখার অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস আছে ধ্রুবা, সেই আনন্দের তুলনা নেই। সে কাঁদবে, আমার পায়ে লুটোবে, আমার কাছে ভিক্ষা চাইবে, আর আমি তাকে উপেক্ষা করব, তার বড় ভালোবাসার বস্তুটিকে অবহেলায়, অশ্রদ্ধায় পথের ধুলায় ফেলে নষ্ট করব, এর থেকে বড় আনন্দ আমি জীবনে আর কিছুতে পাইনি।

‘তুমি প্রশ্ন করতে পারো, আমি কি সেইসব ক্রীড়াসামগ্রী দিয়ে খেলতাম? উত্তর হচ্ছে না, কখনই না। আমার তো ক্রীড়ায় কোনও উৎসাহ নেই। আমার উৎসাহ তো সেই দুর্ভাগার অসহায় নিরুচ্চার ক্রন্দন শোনার মধ্যে। সেই কান্নার স্বর আমার প্রতি রোমকূপে এক উন্মাদ উদ্দীপনা সঞ্চার করত মহাদেবী। করত কেন বলছি, এখনও করে। তার তুল্য আবেশ আর কিছুতে পাই না ধ্রুবা, আর কিছুতে না।’

ধ্রুবা শান্তশীতলস্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘ও, তার মানে এই সবই শুধু আমাকে চন্দ্রগুপ্তের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য, তাই তো?’

রামগুপ্ত মাধ্বীর পাত্রে চুমুক দিয়ে হাসতে থাকেন। সেই কুটিল হাসিতেই ধ্রুবা তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেন।

ধ্রুবার মধ্যে যেন এক বিস্ফোরণ ঘটে গেল। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে রামগুপ্তের গলা টিপে ধরে বললেন, ‘আজই প্রথম আর আজই শেষ মহারাজ। পুনরায় যেন আপনাকে আমার অন্তর্মহলে প্রবেশ করতে না দেখি। আর একবারও যদি আমাকে স্পর্শ করার স্পর্ধা করেছেন তাহলে আমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব, এই আমার শেষ কথা।’

রামগুপ্ত তাঁর সবল বাহু দিয়ে ধ্রুবার হাতখানি নিজের কণ্ঠদেশ থেকে সরালেন। তারপর ধীরেসুস্থে নিজের পোষাক পরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করলেন। শুধু যাওয়ার আগে মুখ ফিরিয়ে বলে গেলেন, ‘তোমাকে আদেশ দিচ্ছি, জনপ্রাণীর কাছেও আমার এই অক্ষমতার কথা প্রকাশ করবে না। মনে রেখো তোমার বা তোমার প্রেমাস্পদের জীবনদীপ নির্বাপিত করা আমার কাছে এক মুহূর্তের খেলা।’

.

‘মিত্র,

আশা করি ঈশ্বরের আশীর্বাদে কুশলে আছেন। অনুমান করি যে আপনার দিক থেকে সমস্ত পরিস্থিতি আমাদের পরিকল্পনার অনুকূলে।

মালব আক্রমণের অভিনয় যে অতি উত্তমভাবে পালিত হয়েছে, আশা করি সে সংবাদ যথাসময়েই প্রাপ্ত হয়েছেন। কুমার চন্দ্রগুপ্তকে সিংহাসন হতে বঞ্চিত করার পরিকল্পনা যে সফল হয়েছে সে সংবাদ পেয়ে আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। এবার সময় এসেছে পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়িত করার।

আমি গুপ্তচরসূত্রে কুমার চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে মালবের রাজকুমারী ধ্রুবার প্রণয়কাহিনি সম্পর্কে সম্যকরূপে অবগত হয়েছি। রাজমাতা দত্তাদেবী কুমার রামগুপ্তর সঙ্গে ধ্রুবার বিবাহ নিষ্পন্ন করে নিজের অজান্তেই আমাদের মস্ত বড় উপকার করেছেন। আশা করি এতদ্বারা কুমার চন্দ্রগুপ্ত এবং সম্রাট রামগুপ্তর মধ্যে চিরস্থায়ী বিরোধ এবং মনান্তরের পথ প্রশস্ত হবে। এবং তার ফলস্বরূপ গুপ্তসাম্রাজ্য ভিতর থেকে আরও দুর্বল হবে। বলবান পুরুষের যৌন ঈর্ষার থেকে বিধ্বংসী ক্রোধ আর দ্বিতীয়টি নেই। আর কুমার চন্দ্রগুপ্তর বীর্যবত্তা আমি স্বচক্ষে দেখেছি। তিনি স্বদেশের প্রতি বিরূপ হলে আমাদেরই সুবিধা।

মালব আক্রমণকালে আমি আরও একজনের পরাক্রম স্বচক্ষে দেখে বড় মুগ্ধ হয়েছি, তিনি হচ্ছেন রাজকুমারী ধ্রুবা। আপনি উত্তমরূপে অবগত আছেন যে এই অধম নারীপ্রতিভার উপযুক্ত সম্মান দিতে সদাই উন্মুখ হয়ে থাকে। তাই আপনার স্কন্ধে আরও একটি গুরুদায়িত্ব অর্পণ করতে চাই। আমার ইচ্ছা গুপ্তসিংহাসনের সঙ্গে গুপ্তবংশের গৃহলক্ষ্মীও আমার করতলগত হোন। এবং এর জন্য উপযুক্ত মূল্য আপনি অবশ্যই পাবেন।

আপাতত এই আমার শেষ পত্র। গত মাসাধিককালের মধ্যে আমাদের অন্তত তিনজন অতি বিশ্বস্ত এবং উচ্চপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর পাটলিপুত্রে ধৃত হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস দণ্ডপাশিক নাগদত্ত এবং মহাপ্রতিহার রুদ্রদেব দুইজনেই কুমার চন্দ্রগুপ্তর বিশেষ অনুগত। তাই আমি আর আপনার কাছে কোনও সংবাদ প্রেরণ করব না। আপনি কেবলমাত্র আপনার মূল পরিকল্পনাটি আমাকে প্রেরণ করবেন। আর সেটি প্রেরণ করবেন যে সঙ্গীটিকে আপনার হাতে দিয়েছি, তার মাধ্যমে। সংবাদ প্রেরণের উপায়ও সেইই আপনাকে বলে দেবে।

আপনার জনৈক কুশলাকাঙখী।’

.

পত্রটি পড়ে ধীরে ধীরে নিজের দীপাদানের দিকে নিয়ে গেলেন মানুষটি। তারপর তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন। তাঁর ওষ্ঠপ্রান্তে একটি দুর্বোধ্য হাসি ফুটে উঠল। পত্রটি সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হলে তিনি সংবাদবাহকের দিকে ফিরে তাকালেন। মৃদুস্বরে বললেন, ‘শাস্ত্রপাঠ করেছ বাছা? রথত্বং বামনং দৃষ্টা, পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে, কথাটা শুনেছ? না শুনে থাকলে শুনে নাও। পাটলিপুত্রবাসী আশু সেই মহাপুণ্যের অংশভাক হবে। যাও, যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করো।’

সংবাদবাহকের মুখখানি অমল হাসিতে ভরে গেল। মূক ও বধির মানুষটি কিছুই বুঝল না বটে, তবে এবার কী করতে হবে সে বিষয়ে সে উত্তমরূপে অবগত আছে। সে ধীরেসুস্থে একটি ভীষণদর্শন কুশাগ্রধার শস্ত্রী বার করল নিজের বস্ত্রাবরণ থেকে।

.

রামগুপ্ত আর ধ্রুবার অন্তর্মহলে এলেন না বটে তবে মহাদেবী ধ্রুবার বেঁচে থাকা আরও করুণ হয়ে উঠল। গুপ্তসাম্রাজ্যের অধীশ্বর রাজাধিরাজ রামগুপ্তের মহাদেবী হওয়ার দুর্ভোগ নেমে এল তাঁর জীবনে। ধ্রুবা বুঝতে পারলেন তিনি নামেই এই সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী, আসলে তাঁর অবস্থা পাটলিপুত্রের এক সাধারণ মালিনী বা নাপিতিনীর থেকেও অধম। তাঁর কোনও স্বাধীন সত্তা নেই। তাঁর মহলের প্রতিটি দাসী, প্রতিটি পরিচারিকা, প্রতিটি রক্ষী প্রকৃতপক্ষে রামগুপ্ত নিয়োজিত গুপ্তচর। গুপ্তসাম্রাজ্যের পট্টমহিষী ধ্রুবার প্রতিটি পল কে যেন অদৃশ্য থেকে নিরীক্ষণ করে। যেন তাঁর কোনও স্বাধীন সত্তা নেই, ইচ্ছা নেই, নিজস্ব মুহূর্ত যাপনের অধিকার নেই।

ধ্রুবা দিনদিন নিজেকে আরও সঙ্কুচিত করে নিলেন। তিনি জনসমক্ষে মহাদেবীর ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করে চললেন বটে, কিন্তু প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে অন্তরে অন্তরে ক্ষয়ে যেতে লাগলেন।

এদিকে রামগুপ্তর প্রতিটি দিন নর্তকী ও স্তাবক সমভিব্যাহারে পানাহারে মত্তযাপিত হতে থাকল। সুষ্ঠুভাবে সাম্রাজ্য চালনার কোনও যোগ্যতা রামগুপ্তের ছিল না। একথা পাটলিপুত্রের রাজসভার প্রতিটি সভাসদ জানতেন। মগধের প্রতিটি সুনাগরিক জানতেন। এমনকী দত্তাদেবীও জানতেন। কিন্তু কারও কিছু বলার উপায় ছিল না।

রামগুপ্ত সভায় আসেন চূড়ান্ত মদ্যপ অবস্থায়। সম্মানিত সভাসদদের সঙ্গে ইতরজনোচিত ব্যবহার করেন। নিজেরই চটুল এবং অশ্লীল রসিকতায় হো হো করে হাসতে থাকেন। আর সেই হাসিতে কেউ যোগ না দিলে তার জন্য তৎক্ষণাৎ কোনও কঠিন দণ্ডবিধান করেন। প্রিয় মিথ্যায় দ্রুত বিগলিত হন। উপকারী অথচ অপ্রিয় সত্য কথা বললে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। মানীকে অনায়াসে অবহেলা করেন। গুণীকে অসম্মান।

পাটলিপুত্র রাজসভায় সবার অলক্ষ্যে অসন্তোষ ধূমায়িত হতে লাগল।

কিন্তু ক্ষমতার মদে মত্ত রামগুপ্ত সেসব গ্রাহ্যই করলেন না। তিনি তখন নিজের গৌরব প্রচারে অন্ধ। মহামাত্য এবং সান্ধিবিগ্রহিকরা আদেশপ্রাপ্ত হলেন তাঁর গৌরবগাথা শিলালিপিতে খোদিত করে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিষ্ঠার জন্য। নিজের নামাঙ্কিত মুদ্রার প্রচলন করলেন তিনি। দূরদেশে নিজের গৌরবগাথা প্রচারিত করার জন্য নিয়োগ করলেন সংবাদবাহক। নিজ মূর্তি স্থাপন করলেন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। আর অনুগত স্তাবকের দল তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রবলবেগে শিরশ্চালন করে, সাধু সাধু রবে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলল।

এই স্তাবকমণ্ডলীর মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য ছিলেন শিখরস্বামীর পুত্র সূর্যস্বামী। শাস্ত্রে বলে যোগ্যং যোগ্যেন যোজ্যয়েৎ৷ শাস্ত্রবচনের এর থেকে উত্তম উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি হয় না। সম্রাট রামগুপ্ত যদি বলেন সূর্যদেব পশ্চিমে উদিত হন, সূর্যস্বামী ঘাড় নেড়ে বিজ্ঞের মতো বলেন, ‘তাই তো, এ তো আমরা লক্ষ্য করে দেখিনি। সম্রাট যখন বলছেন তখন সূর্যদেব পশ্চিমে উদিত না হয়ে যান কোথায়?’ সম্রাট যদি বর্ষার প্রবল ধারাপাতের মধ্যে বলেন, ‘ওহে সূর্যস্বামী, দেখেছ, আজ চারদিক কী শুষ্ক, আবহাওয়া কী মনোরম, মলয়পবন কী অনুপম,’ তাহলে সূর্যস্বামী বলেন, ‘অহো, ধরিত্রীর কী সৌভাগ্য! পশ্য পশ্য, সম্রাটের আদেশে আজ পাটলিপুত্রের আকাশে-বাতাসে অকাল বসন্ত।’

অবশেষে একদিন এই নিঃসংশয়, নির্বাধ এবং নির্লজ্জ কৈতববাদের অভিপ্রেত ফল ফললো।

গুপ্তসৈন্যবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ ছিলেন প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ সেনাপ্রধান দনুজদমন। রামগুপ্তর রাজ্যাভিষেকের অনতিকালের মধ্যেই এক অপদার্থ এবং অযোগ্য সম্রাটের কুশাসনের সমস্ত লক্ষণ বিশাল গুপ্তসাম্রাজ্যের শরীর জুড়ে পরিস্ফুট হতে লাগল। দিকে দিকে অসন্তোষ ধূমায়িত হতে হতে একদিন বিদ্রোহের আকার ধারণ করল। রামগুপ্ত অবাধ্যতা পছন্দ করেন না। তিনি সৈনিকদের নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমনের আদেশ দিলেন।

গুপ্তসৈন্যবাহিনী শত্রুদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণে পটু। অস্ত্রহীন স্বদেশবাসীর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে তারা অভ্যস্ত নয়। তাদের অসন্তোষ দনুজদমন অবধি পৌঁছল। তিনি সম্রাটকে পরামর্শ দিলেন বলপ্রয়োগের পরিবর্তে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে।

‘বলপ্রয়োগে অযথা বিপত্তি বৃদ্ধি পায় সম্রাট। প্রজাদের কাছে সম্রাট পিতৃতুল্য। আপনি যদি একবার বিক্ষুব্ধদের অন্তরের কথা শোনেন, তাহলে অনর্থক লোকক্ষয় এড়ানো সম্ভব।’

রামগুপ্ত সর্বদাই মদ্যপান করতেন। তিনি এক চুমুকে স্বর্ণভৃঙ্গারটি শূন্য করে গম্ভীরমুখে বললেন, ‘কোন বলপ্রয়োগ অযথা, আর কোনটি যথাযথ, সে সিদ্ধান্ত কে নেবেন সেনাপতি?’

দনুজদমন নম্রভাবে বললেন, ‘অবশ্যই আপনি নেবেন প্রভু। আপনি সম্রাট, আমি আপনার বেতনভোগী অন্নদাস। কিন্তু আমি আজীবন গুপ্তসাম্রাজ্যের সেবা করেছি প্রভু। আমার বুদ্ধিবিবেচনার ওপর প্রয়াত সম্রাটও কম আস্থা রাখতেন না৷ আমার অনুরোধ যদি শোনেন তাহলে আপনার উপকার বৈ অপকার হবে না মহারাজাধিরাজ।’

প্রবীণ সেনাপ্রধানকে ধমকে উঠলেন রামগুপ্ত, ‘ভুলে যাবেন না সেনাপতি, আমি গুপ্তবংশের সম্রাট, এই সসাগরা জম্বুদ্বীপে স্বয়ং ঈশ্বরের পরেই আমার স্থান। আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার স্পর্ধা আপনাকে কে দিয়েছে?’

আরও বিনত হলেন দনুজদমন, ‘আপনার আদেশ শিরোধার্য প্রভু। কিন্তু গুপ্তসাম্রাজ্যের একজন প্রবীণ সেবক তাঁর সম্রাটের কাছে অনুরোধ করছে যদি অন্য কোনও উপায়ে, লোকক্ষয় এড়িয়ে, গুপ্তসাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষা হয়।’

তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ঝলসে উঠল রামগুপ্তর স্বরে, ‘প্রবীণ সেনাপতির বুদ্ধিও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রবীণ হয়েছে মনে হয়। তাঁর বোধহয় কিছু বিশ্রামের প্রয়োজন। আপাতত আপনি বিশ্রামে যান দনুজদমন। আপনার পরিবর্তে আজ থেকে সূর্যস্বামীই সৈন্যাধ্যক্ষর দায়িত্ব পালন করবেন।’

দনুজদমন একবার আহত চোখে সম্রাটের দিকে তাকালেন। মুখে কিছু বললেন না৷ তারপর কোষবদ্ধ অসি এবং শিরস্ত্রান সম্রাটের পদতলে রেখে চোখ মুছতে মুছতে প্রস্থান করলেন।

চন্দ্রগুপ্ত নিশ্চল। প্রস্তরবৎ। তাঁর মুখে বিন্দুমাত্র রেখাপাত ঘটল না। কুমার কচগুপ্ত বিচলিত হলেন। কিন্তু জ্যেষ্ঠকে দেখে সংযত করলেন নিজেকে।

সভাস্থলে উপস্থিত কয়েকজনের হনুদেশ কঠিন হল। গুপ্তবংশের ভাগ্যলক্ষ্মী ব্যতীত কেউ তা লক্ষ্য করলেন না।

.

সূর্যস্বামী সেনাপ্রধান পদে বৃত হওয়ার কয়েকমাস পরের কথা। বর্ষারানি বিদায় নিয়েছেন। পাটলিপুত্রের আকাশে বাতাসে শরৎকুমারীর উচ্ছ্বল আগমনধ্বনি। পয়োধরা কাদম্বিনীর অঞ্চলপ্রান্ত থেকে উঁকি দিয়ে যায় ভাদ্রের আলোকপুষ্পশর। পাটলিপুত্রের কর্দম পথগুলি শুষ্ক হতে শুরু করেছে। শেফালী, গগনশিরীষ এবং পান্থপাদপের ফুলে ঢেকে গিয়েছে মগধের বীথি ও বনতল। সুরধুনী গঙ্গা বয়ে গিয়েছেন পাটলিপুত্রের বক্ষ ছুঁয়ে। তাঁর পলিবিধৌত তীরভূমিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে কুশফুলের শুভ্র গুচ্ছরাশি।

রাজসভাসদরা পাটলিপুত্রের রাজসভা আলো করে বসে আছেন। তাঁরা মৃদুস্বরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। এমন সময় প্রতিহারী উচ্চস্বরে ঘোষণা করল যে সম্রাট রামগুপ্ত পদার্পণ করছেন।

সভাসদরা ত্রস্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন। শ্রদ্ধা শুধু সম্মান থেকে নয়, ভয় হতেও উৎপন্ন হয়।

রামগুপ্ত সিংহাসনে আসীন হয়েই প্রসন্ন স্বরে বললেন, ‘আজকের আবহাওয়া বড় উত্তম। রাজপণ্ডিত, এমত মনোরম পরিবেশে সম্রাটের কর্তব্যকর্ম নিয়ে শাস্ত্রে কিছু লেখা আছে নাকি?’

প্রৌঢ় রাজপণ্ডিত গজাননমিশ্র বড়ই দুর্বলচিত্ত পুরুষ। অস্থিরচিত্ত মদ্যপ সম্রাটের ইতর কৌতুক এবং মুখরা গৃহিণীর সম্মার্জনীর মাঝে তিনি পদ্মপাতায় জলবিন্দুর মতো টলায়মান থাকেন। তদুপরি তাঁর গৃহে চারিটি অনূঢ়া কন্যা বিদ্যমান। তিনি দ্রুত স্বরে বলে উঠলেন, ‘আছে বৈ কি সম্রাট। প্রাচীনকালে এই সময়েই বলবান সম্রাটরা দিগ্বিজয়ে বেরোতেন। আমার মনে হয় আপনারও এবার দিগ্বিজয়ের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

সভাসদদের মধ্যে অনেকেই শিহরিত হলেন। গজাননমিশ্রর কাণ্ডজ্ঞান বা তার অপ্রতুলতা বিষয়ে অনেকের মনেই অনেকদিন ধরে সন্দেহ ছিল। আজ তাঁরা নিঃসন্দেহ হলেন। বুদ্ধিভ্রষ্ট উন্মাদ না হলে কেউ লুব্ধ শৃগালকে ভগ্ন উদ্যানবেষ্টনী দেখায় না!

অতি উৎকৃষ্ট গৌড়ী দ্বারা স্বহস্তে নিজ ভৃঙ্গারটি পূর্ণ করতে করতে সম্রাট প্রশ্ন করলেন, ‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু যেসব রাজ্য অধিগত করার ছিল সেসবই তো পিতা জয় করে বা করভারে অধীনস্থ করে রেখে গেছেন। মালবের মতো কিছু নপুংসক রাজ্য তো নিজেদের বিক্রয়ই করে দিয়েছে আমাদের কাছে। জয় করবার জন্য আর রয়েছেটাই বা কী?’

ক্ষমতাবান, বিজিগীষু এবং অপদার্থ পুরুষেরা সচরাচর লক্ষ করেন না যে তাঁদের কোন বাক্য কাকে কোথায় কীভাবে আহত করে। সম্রাটের উক্তি শুনে চন্দ্রগুপ্তর মুখ কঠিন এবং গম্ভীর হল। কচগুপ্ত সেদিকে চকিতে দৃষ্টিপাত করেই চোখ ফিরিয়ে নিলেন।

গজাননমিশ্র এসবের কিছুই বুঝলেন না। তিনি ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘কথা সত্য বটে৷ সমগ্র জম্বুদ্বীপই তো সম্রাটের অধীন। তবে শুনেছি যে উত্তর পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চলে নাকি বর্বর শকদের আধিপত্য এখনও বিদ্যমান। আমার মনে হয় সম্রাটের উচিত তাদের দমন করে উত্তর পশ্চিম জম্বুদীপের অধিকার স্বহস্তে নেওয়া।’

রামগুপ্ত ভ্রুকুটি করে বললেন, ‘বটে?’

গজাননমিশ্র উৎসাহ পেলেন। ‘সে আর বলতে! আর জনশ্রুতি এই যে ওই অঞ্চলে নাকি ধরিত্রীর শ্রেষ্ঠতম গঞ্জিকার চাষ হয়।’

রামগুপ্তর মুখমণ্ডল অমল প্রসন্নতায় ভরে গেল। তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘তবে তাই হোক। আমার বিজয়যাত্রার শিবির তাহলে এবার উত্তর পশ্চিমেই স্থাপিত হোক। আর হ্যাঁ, আমার আদেশ, আমার সমস্ত পারিষদ, সভাসদবর্গ এবং তাঁদের পরিবারের প্রত্যেক সদস্য যেন এই বিজয় যাত্রার অংশীদার হয়, যাতে, প্রত্যেকে স্বচক্ষে আমার এই শকবিজয়যাত্রার সাক্ষী থাকতে পারেন। এই আদেশের যেন অন্যথা না হয়।’

.

বিজয় যাত্রা শুরু হওয়ার আগের দিনের কথা। অন্যদিনের মতো এইদিনও ধ্রুবা বসেছিলেন বাতায়নের পাশে৷ নিষ্পলকে চেয়েছিলেন দিগন্তের দিকে। এত কর্মব্যস্ততা, এত কোলাহলমুখরতা, কিছুই যেন তাঁকে স্পর্শ করছিল না। স্বয়ং মহাদেবীও এই অভিযানে সম্রাটের সঙ্গী হবেন, মহাপরাক্রান্ত রাজাধিরাজ রামগুপ্তর এই ইচ্ছে। তাঁরও যাত্রাপ্রস্তুতি সম্পূর্ণপ্রায়।

একজন পরিচারিকা এসে সংবাদ দিলেন, ‘মহাদেবী, কুমার কচ আপনার দর্শনাভিলাষী।’

ধ্রুবা সচকিত হলেন। যে ধ্রুবা কুমার কচের সঙ্গে প্রথমবার আলাপিত হয়েছিলেন তিনি ছিলেন মালবসাম্রাজ্যের স্বাধীন রাজকুমারী। এখন তিনি মহামহিম গুপ্তসাম্রাজ্যের মহাদেবী, রাজ্ঞী ধ্রুবস্বামিনী। তাঁকে তাঁর নিজের ভ্রাতার সঙ্গে আলাপিত হওয়ার জন্যেও প্রস্তুতি নিতে হবে বৈ কি!

কুমার কচ প্রবেশ করলেন। পরিচারিকারা তখনও দণ্ডায়মান।

ধ্রুবা পরিচারিকাদের আদেশ করলেন, ‘তোমরা কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করো।’

পরিচারিকারা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। এবার ধ্রুবার ধৈর্যচ্যুতি হল। তিনি ধমকে উঠলেন, ‘কী হল, কথা কানে যাচ্ছে না? যাও, কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করো। আমি আদেশ না দেওয়া অবধি যে এই কক্ষে প্রবেশ করবে, কালই তাকে শূলে দেব।’

পরিচারিকারা সভয়ে কক্ষত্যাগ করলেন। দ্বার বন্ধ হওয়ার পর কুমার কচ অস্বস্তিজড়িত স্বরে বললেন, ‘গুপ্তসাম্রাজ্যের অধিশ্বরী মহাদেবী ধ্রুবাকে কুমার কচের প্রণাম। কুমার চন্দ্রগুপ্ত আপনার সুস্বাস্থ্যের কামনা করেন। তিনি জানতে চেয়েছেন আপনি এখন কেমন আছেন দেবী?’

এক মুহূর্তের জন্য ধ্রুবার হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই সুতিক্ত হাসি ফুটে উঠল তাঁর অধরে। শান্তস্বরে উত্তর দিলেন, ‘আমার বিষয়ে কুমারকে চিন্তা করতে বারণ করুন কুমার কচ। তাঁর কাছে বোধহয় আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।’

বলতে বলতেই তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে, ধীরস্বরে বললেন, ‘আর হ্যাঁ, আপনি যদি মহারাজাধিরাজের গুপ্তচর হন, তাহলে তাঁকে জানিয়ে দিন যে তার আর প্রয়োজন নেই। যে ধ্রুবা অনেক স্বপ্ন নিয়ে এই রাজপ্রাসাদে পা রেখেছিল, সে অনেক আগেই মৃত। এইসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আঘাত তার হৃদয়ে আর আলোড়ন তোলে না।’

কচগুপ্তর মুখে ব্যথার বিস্ময় ফুটে উঠল, ‘কী বলছেন মহাদেবী? আমি মহারাজাধিরাজের চর? এ কথা আপনি বলতে পারলেন? আমি গুপ্তবংশের মহাদেবী, বংশের জ্যেষ্ঠা বধূরানির ওপর চরবৃত্তি করব? ক্ষমা করবেন মহাদেবী, এমন নীচ মন আমার এখনও হয়নি দেবী। মহারাজ রামগুপ্ত এবং কুমার চন্দ্রগুপ্ত, দুজনেই আমার অগ্রজ। তাঁদের মধ্যে সিংহাসনের অধিকার নিয়ে কী মনান্তর বা মতান্তর হয়েছে সে আমি জানি না, জানতেও চাই না। আমি গুপ্তসিংহাসনের প্রতি অনুগত। কিন্তু আমাকে কেউ এই রাজনৈতিক কূটকচাল, এই কলহাবর্তের মধ্যে টেনে আনুক, সে আমার অভিপ্রায় নয়।’

বলতে বলতেই ফিরে যাওয়ার জন্য পিছন ফেরেন কুমার কচ, ‘হ্যাঁ, আরও একটা কথা। আমাকে ভরসা করতে পারেন, মহাদেবী। আমি আপনার মিত্র। এবং কুমার চন্দ্রগুপ্তও। তিনি স্বয়ং বলে পাঠিয়েছেন এই কথা।’

কুমার কচকে যতদূর দেখা গেল ততদূর চেয়ে রইলেন মহাদেবী ধ্রুবা। তারপর অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়লেন তাঁর শয্যায়।