Accessibility Tools

সাদা বিড়াল – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

দ্বীপের নাম, বাঘে খাওয়া – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

দ্বীপের নাম, বাঘে খাওয়া

প্রকৃতির ধ্বংসলীলা যে এত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা ঝড়ের পরে এই সুন্দরবন অঞ্চলে রিলিফের কাজে না এলে কোনও দিন কল্পনাও করতে পারত না রিপন। ছোট ছোট দ্বীপগুলোতে শুধু মহাপ্রলয়ের চিহ্ন। ঘরবাড়িগুলো আর একটাও আস্ত নেই। অধিকাংশ বাড়িগুলোই মাটিতে মিশে গেছে, কোথাও হয়তো-বা দাঁড়িয়ে আছে ঝড়ে ছাদ উড়ে যাওয়া নিঃসঙ্গ দেওয়াল। নোনাজল দ্বীপে উঠে এসে নষ্ট করে দিয়েছে খেতের ফসল।

সাত দিন পর জল নেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু কাদা মাটিতে গেঁথে আছে ফুলে ঢোল হয়ে যাওয়া গবাদি পশুর লাশ। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারপাশে। সরকারি লোকজন ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে কিছু দ্বীপ থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে গেছিল ঠিকই, কিন্তু ছোট ছোট দ্বীপগুলোতে বেশ কিছু লোকজন রয়েও গেছিল। হয় সরকারি লোকেরা তাদের কাছে পৌঁছতে পারেনি, আবার কেউ কেউ ঘরের মায়া কাটাতে না পেরে দ্বীপেই রয়ে গেছিল। যারা দ্বীপে রয়ে গেছিল তাদের অবস্থা বড় ভয়ঙ্কর। পানীয় জল নেই, খাদ্য নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই। সাত দিন কেটে গেলেও ওদের মুখ থেকে আতঙ্কের রেশ তখনও কাটেনি। যেন তারা সাক্ষাত মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছে। চারপাশে শুধু অসহায় মানুষদের হাহাকার আর কান্নার রোল। সামান্য একটু চিড়ে-মুড়ি, পানীয় জল অথবা একটা ত্রিপল পাবার জন্য মানুষগুলোর কী আকুতি!

ইতিমধ্যে এই সব ঝঞ্ঝা কবলিত নিঃস্ব দ্বীপবাসীদের ত্রাণের কাজে সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও। দ্বীপগুলো ঘুরে ঘুরে ত্রাণ বিলি করছে তারাও। তেমনই এক সংস্থার সঙ্গে জঙ্গল লাগোয়া এই ছোট ছোট দ্বীপে লঞ্চে করে ঘুরে বেড়াচ্ছে রিপন। তাদের এই সংস্থা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিসাবে সুপরিচিত। দীর্ঘ দিন ধরে তারা নানা দুর্যোগে মানুষের সেবাতে নিয়োজিত। তবে রিপন মাত্র মাস খানেক হল এক পরিচিতর মাধ্যমে এ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আর সুযোগ পেয়েই আরও জনা সাতেক লোকের সঙ্গে চলে এসেছে ঝঞ্ঝা কবলিত সুন্দরবনে। স্থানীয় মানুষরা বলছে, এবারের ঝড়ে যা ক্ষতি হয়েছে তা নাকি বছর বারো আগের আয়লা ঝড়েও হয়নি!

বিকাল হয়ে গেছে। সারাদিন ধরে বেশ কয়েকটা দ্বীপে ত্রাণ সামগ্রী বিলি করে ফিরছিল রিপনদের লঞ্চ। ত্রাণ সামগ্রী যা তারা এনেছিল তা প্রায় শেষের পথে। আলোচনায় ঠিক হয়েছে গতরাতের মতোই গোসাবাতে লঞ্চ ভিড়িয়ে লঞ্চেই রাত্রিবাস করে আগামী কাল কলকাতায় ফেরার জন্য রওনা হবে তারা।

লঞ্চের সারেঙ অর্থাৎ চালক প্রায় বৃদ্ধ মাধব মণ্ডল সুন্দরবনেরই মানুষ। দ্বীপগুলোতে চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে লোকটাই। নইলে এখানকার অজস্র দ্বীপের মধ্যে কোন কোন দ্বীপে মানুষ থাকে তা রিপনদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

সারেঙের ছোট্ট কেবিনটাতে চালকের আসনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল রিপন আর দুর্জয়দা। এই দুর্জয় রক্ষিতই রিপনদের সংস্থার প্রেসিডেন্ট। দুই দশক ধরে তিনি এই সংস্থার জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত। তিনিই এই রিলিফ টিমকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বড় কনস্ট্রাকশন বিজনেস আছে দুর্জয়দার। তার অর্থ এবং ইনফ্লুয়েন্স প্রচুর। রিলিফের কাজে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার সিংহভাগ কয়েকদিনের মধ্যে তিনি একাই সংগ্রহ করে দিয়েছেন। অসম্ভব পরিশ্রমী মানুষ তিনি। আর তার চেহারাটাও পরিশ্রম করার মতো।

দুর্জয় রক্ষিতের বয়স প্রায় রিপনের বয়সের দ্বিগুণ। মধ্য পঞ্চাশের দীর্ঘকায় দুর্জয়দার শরীর এখনও পেশীবহুল। হাতের থাবাগুলো বাঘের মতো বড়। অনায়াসেই তিনি একটা কুড়ি কেজি ওজনের বস্তা তুলে লঞ্চ থেকে নেমে পড়তে পারেন। হিরো গোছের একটা ব্যাপার আছে তার মধ্যে। যে কারণে তিনি সহজেই আকৃষ্ট করে ফেলেছেন রিপনকে। তাই লঞ্চে বা মাটিতে নেমে তার ছায়া সঙ্গীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে রিপন।

তবে, প্রত্যেক সংস্থাতেই এমন কিছু মানুষ থাকে যারা কাজের লোকদের পিছনে সমালোচনা করে। তেমনই একজন লোক, যাকে হারিয়ে দুর্জয়দা সংস্থার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সেই ধনঞ্জয় পাল একবার রিপনকে কান ভাঙাবার জন্য বলেছিল, ‘তোমরা ওই দুর্জয়কে যেমন লোক ভাব আদপে ও তেমন লোক নয়। আমি ওকে বহুকাল ধরে চিনি। যৌবনে ও নানা কুকীর্তি-মারদাঙ্গা করত। এখন সাধু সেজে বসেছে।’

স্বাভাবিকভাবেই রিপন ওই কুচুটে লোকটার কথায় পাত্তা দেয়নি। বরং সে দুর্জয়দাকে যত দেখছে তত তার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এমন পরোপকারী, পরিশ্রমী লোক বড় একটা দেখা যায় না। জল কাদা, সাপ-কুমিরের ভয়কে অতিক্রম করে তিনিই তো প্রথম নেমে পড়েছেন ঝঞ্ঝা কবলিত দ্বীপের মাটিতে। সব চেয়ে ভারী বস্তাটা তিনি সবার আগে তুলে নিচ্ছেন।

খাঁড়ি বেয়ে এগোচ্ছিল রিপনদের লঞ্চ। লঞ্চের সামনে, চারপাশে ঘোলা জল পাক খেয়ে ঘুরছে। কখনও কখনও তাতে ভাসতে দেখা যাচ্ছে খড়ের চাল, কাঠের টুকরো, দ্বীপ থেকে ভাসিয়ে আনা জিনিস। সারেঙ মাধব মণ্ডল হালের চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে এক সময় স্বখেদে বলল, ‘চল্লিশ বছর ধরে আমি সুন্দরবনে লঞ্চ চালাচ্ছি বাবু। কিন্তু এমন অবস্থা কোনওদিন দেখিনি! কত কষ্টে সাজানো সব কিছু একদম তছনছ করে দিল! বনবিবি, কালু রায়, দক্ষিণ রায়ের কি একটু মায়া হল না গরিব মানুষদের জন্য?’

তার কথা শুনে দুর্জয়দাও আক্ষেপের স্বরে বললেন, ‘সত্যিই যা দেখলাম, তা ভয়ানক! আগে এ অভিজ্ঞতা আমার কোন দিন হয়নি!

দুর্জয়দা এ কথা বলার পর মাধব মণ্ডল বলল, ‘আপনাকে দেখার পর থেকেই আমার কেমন চেনা মনে হচ্ছে! আপনি কি এর আগে কখনো আমাদের এই সুন্দরবনে এসেছিলেন?’

দুর্জয়দার জবাব দিলেন, ‘না, আমি আগে কখনও সুন্দরবনে আসিনি। এবারই প্রথম এলাম।’

মাধব মণ্ডল এরপর হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল দুর্জয়দাকে। কিন্তু কিছুটা দূরে একটা দ্বীপ চোখে পড়াতে তা দেখিয়ে রিপন জানতে চাইল, ‘ওটা কোন দ্বীপ? ওখানে মানুষ আছে নাকি?’

মাধব মণ্ডল বলল, ‘ওই দ্বীপে পনেরো-কুড়ি ঘর মানুষের বাস। জানি না তারা আছে নাকি ঝড়ের আগে দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছে। আমি বেশ কয়েকবার ওখানে গেছি। ওর নাম ‘বাঘে খাওয়া’ দ্বীপ।

দুর্জয়দা জানতে চাইলেন, ‘এমন নাম কেন?’

সারেঙ বলল, ‘ও দ্বীপে মানুষ বাস করে মাত্র বছর দশেক হল। দ্বীপটা অন্য দ্বীপের তুলনাতে সামান্য উঁচু বলে আয়লার পর কিছু মানুষ বসবাস শুরু করেছিল ওখানে। তার আগে ওখানে ঘন জঙ্গল ছিল। ওর পিছনে খাঁড়ির ওপারে এখনও গভীর বন। বহুদিন আগে যখন ওখানে জনবসতি হয়নি তখন ও দ্বীপে একজন নেমেছিল, তাকে বাঘে টেনে নিয়ে গেছিল। তারপর থেকেও দ্বীপের নাম ”বাঘে খাওয়া” দ্বীপ।’

সারেঙ মাধব মণ্ডলের কথা শুনে রিপন, দুর্জয়দাকে বলল, ‘একবার যাবেন নাকি ওই দ্বীপে। যদি কোনও মানুষ ওখানে থেকে থাকে।’

তার কথা শুনে দুর্জয়দা পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বললেন, ‘ব্র্যাভো। এই কথাটাই আমি বলতে যাচ্ছিলাম। তোমার মতো কর্মঠ ছেলেই তো এসব কাজে দরকার। অন্য সবাই তো দেখছি ইতিমধ্যে ক্লান্ত হয়ে ঝিমোচ্ছে। যদি বাঘে খাওয়াতে কোনও মানুষ থেকে থাকে তাহলে এখনও সামান্য যেটুকু জিনিস অবশিষ্ট আছে তো ওখানে বিলিয়ে দিয়ে ভারমুক্ত হওয়া যায়।’

রিপন বলল, ‘আর যতটুকু জিনিস আছে তা আমরা দুজনেই ওখানে নামিয়ে নিয়ে যেতে পারব। তেমন হলে অন্য কাউকে আর বিরক্ত না করলেও চলবে।’

তার কথা শুনে দুর্জয়দার মুখে হাসি ফুটে উঠল। দাড়িতে হাত বুলিয়ে তিনি সারেঙকে নির্দেশ দিলেন, ‘ওই দ্বীপের দিকে চলো। দেখি কোনও মানুষ ওখানে এখনও আছে কিনা?’

সারেঙ মাধব মণ্ডল এ অঞ্চলেরই মানুষ। এখানকার মানুষের দুঃখ-কষ্টর সে-ও শরিক। তাই সে ব্যাপারটাতে উৎসাহ জাগিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, বাবু চলুন। যদি কেউ ওখানে থেকে থাকে তবে আপনাদের জিনিসগুলো বড় কাজে আসবে।’

সারেঙের কেবিন ছেড়ে রিপনকে নিয়ে বেরিয়ে দুর্জয়দা লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়াল। তবে দ্বীপটা তাদের যতটা কাছে মনে হয়েছিল ততটা কাছে নয়। ধীরে ধীরে সেদিকে জল কেটে এগিয়ে চলল লঞ্চ।

দুই

এক সময় কাছে এগিয়ে এল সেই ‘বাঘে খাওয়া’ দ্বীপ। প্রথমে একটা ছোট জেটি চোখে পড়ল তাদের। মানুষের বসবাসের চিহ্ন। দ্বীপের গা ঘেঁসে সেদিকেই এগোল লঞ্চ। আর এরপরই যেন একজনকে জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল তারা।

জেটির পাড়ে একটা ঝাঁকড়া গাছ। তার তলায় দাঁড়িয়ে আছে সে। মিনিট খানেকের মধ্যেই তার অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল রিপনদের চোখে। একজন মেয়ে বা মহিলা! পরনে তার একটা হলুদ রঙের কাপড়। আর তার ধরন দেখে মনে হয় সে দ্বীপের বাসিন্দা। আর সে-ও যেন লঞ্চটার দিকেই তাকিয়ে দেখছে। আর এরপরই সেই মেয়ে বা বউটা হাতছানি দিল লঞ্চের উদ্দেশ্যে।

ব্যাপারটা দেখে দুর্জয়দা উল্লসিত হয়ে বললেন, ‘ওইতো মানুষ আছে এখানে! আমাদের ডাকছে বউটা!’—এই বলে তিনি মেয়েটার উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকবার হাত নাড়লেন, তাকে সংকেত জানাবার জন্য। তবে, মেয়েটা কিন্তু এরপর আর সেখানে দাঁড়াল না। দুর্জয়দার হাত নাড়ার প্রত্যুত্তরে বার কয়েক হাত নেড়ে ডেকে জেটির মাথা ছেড়ে রিপনদের চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। তা দেখে তাদের দুজনের মনে হল সম্ভবত গ্রামের লোকদের লঞ্চ আসার খবর জানাতে ছুটল সে। জেটির দিকে এগিয়ে চলল লঞ্চ।

লঞ্চ দ্বীপের দিকে এগোচ্ছে দেখে আর দুর্জয়দার গলার উল্লসিত চিৎকারে লঞ্চের খোল থেকে ওপরে উঠে এল রিপনদের সংস্থার কয়েকজন। তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। দু-দিন ধরে জল-কাদা ভেঙে মালপত্র নিয়ে দ্বীপে দ্বীপে ঘোরার ধকল কম কথা নয়। রিপন ছাড়া এ টিমের অন্য সবাই মাঝবয়সি বা তার বেশি বয়সের লোক। তাদের দেখে দুর্জয় রক্ষিত বললেন, ‘এ দ্বীপের নাম ”বাঘে খাওয়া”। মানুষ আছে এখানে। আমাদের ডাকল। এখানে নামব।’

তার কথা শুনে একজন ক্লান্ত স্বরে বললেন, ‘এখানে কি না থামলেই নয়। জেটির বেশ কিছুটা তো জলে ডুবে আছে দেখছি। শরীরটা ভালো লাগছে না। এখন ওই জল-কাদায় নামলে আমার শরীর আরও খারাপ হতে পারে।’

আর একজন বললেন, ‘বিকাল হয়ে গেছে। একটু পরেই তো সন্ধ্যা নামবে। দ্বীপের ভিতর কী অবস্থা কে জানে? আর কিছু না হোক সাপ-খোপ থাকতে পারে। সবাইতো এখন জল ছেড়ে ডাঙায় গিয়ে উঠেছে। গায়ে পা পড়লেই সর্বনাশ। আজ সকালে একটা দ্বীপে ঘটনা তো নিজের চোখেই দেখলেন। বিশাল একটা সাপ কেমন ভাবে আমাদের গা ঘেঁষেই ছুটে পালাল!’

তাদের কথা শুনে দুর্জয়দা আর রিপন দুজনেই বুঝতে পারল সঙ্গীদের কারোরই আর এই অবেলাতে জল-কাদা ঘেঁটে দ্বীপে নামার ইচ্ছা নেই। দুর্জয়দা তার সঙ্গীদের তাই বললেন, ‘ঠিকই আছে, আপনারা তবে বিশ্রাম নিন। আমি আর রিপনই নামব। যা মাল আর আছে, সেটুকু আমরাই দ্বীপে নিয়ে যেতে পারব। এই সামান্য মালপত্রও যদি একটু কষ্টর বিনিময় আমরা এই অসহায় মানুষদের হাতে তুলে দিতে পারি তবে তাদের কাছে এখন সেটা অনেক বড় ব্যাপার।’

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই লঞ্চ এসে উপস্থিত হল জেটির সামনে। সারেঙের সহকারী ছেলেটা নোঙর নামিয়ে দিল। একটু ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল লঞ্চটা। কাঠের পাটাতন ফেলা হল নীচে নামার জন্য। দুর্জয়দা আর অন্যদেরও অনুরোধ করলেন না দ্বীপে নামার জন্য। ত্রাণ সামগ্রীর শেষ দুটো বস্তা ডেকের ছাউনির নীচ থেকে কাঁধে নিয়ে তারা দুজন পাটাতন বেয়ে নীচে নামল।

জেটির শেষ অংশ জলের তলে ডুবে আছে। দ্বীপের এ অংশ এমন ভাবে হেঁতেল গাছের ঝাড়ে আবৃত যে বাইরে থেকে দ্বীপের ভিতর কিছু দেখা যাচ্ছে না। ত্রাণ সামগ্রীর বস্তা ঘাড়ে নিয়ে জল-কাদা ভেঙে জেটিতে উঠে পড়ল তারা। এরপরই তাদের চোখে পড়ল ইট বিছানো একটা সরু পথ চলে গেছে গ্রামের দিকে। হয়তো বা সরকারি লোকজন কোনও এক সময় এসে রাস্তাটা করে দিয়ে গেছিল।

এ দ্বীপের অবস্থান কিছুটা উঁচুতে হওয়ায় জল তেমন জমেনি, আবার ও দ্বীপে ঝড়ের প্রকোপ যেন অন্য দ্বীপগুলোর তুলনায় বেশি বলে মনে হল তাদের। সংকীর্ণ রাস্তার দু-পাশে ছোট-বড় গাছ সব নুইয়ে পড়েছে। কোথাও বা ভেঙে পড়েছে বড় বড় গাছের ডাল। তার মধ্যেই দুর্জয়দার পিছন পিছন হাঁটতে লাগল রিপন। হাঁটতে হাঁটতে দুর্জয়দা বললেন, ‘মেয়েটা হয়তো গ্রামের লোক নিয়ে এ পথেই আসবে। কেমন অসহায় ভাবে হাত নাড়ছিল খেয়াল করেছ?’

রিপন বলল, ‘আসলে আমরা যারা শহরে বসে খবরের কাগজ আর টেলিভিশনের মাধ্যমে সুন্দরবনের ঝড়ের কথা শুনি বা দেখি, তারা ধারণাই করতে পারি না এর আসল চেহারা কত ভয়ঙ্কর!’

রিপনরা অনুমান করেছিল সেই মেয়ে বা বউটা গ্রামের লোকদের সঙ্গে আনবে। কিন্তু তেমনটা ঘটল না। তবে সে রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে দূর থেকে চোখে পড়ল গ্রাম নয় বলা ভালো গ্রামের ধ্বংস স্তূপ।

ছোট দ্বীপটার আকৃতি অনেকটা মাকুর মতো। তার পেটের কাছে দ্বীপের অপর প্রান্তের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল গ্রামটা। কাঁধে বস্তা নিয়ে রিপনরা উপস্থিত হল গ্রামের মধ্যে। কুড়িটা মতো মাটির বাড়ি ছিল গ্রামটাতে। কিছুটা তফাতে তফাতেই ঘরগুলো বানানো হয়েছিল মাটির গাঁথনির ওপর গোলপাতা বা খড়ের ছাউনি দিয়ে। কিন্তু তাদের একটাও আজ অক্ষত ভাবে মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই। ঝড়ে অধিকাংশ বাড়ির চাল উড়ে গেছে অথবা মাটির দেওয়াল ধ্বসে পড়েছে। আর সেই ভাঙা দেওয়ালগুলোর ভিতর থেকে কোথাও দেখা যাচ্ছে গরিব মানুষদের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সস্তার আসবার, হাঁড়ি-বাসন, মাছ ধরার জাল এসব জিনিস।

প্রকৃতির রুদ্র রোষে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সব কিছু। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তারা চারপাশে তাকিয়ে বেশ একটু অবাকই হল। কোন ধ্বংস স্তূপের আড়াল থেকে তাদের দেখে অন্য গ্রামের লোকেদের মতো কেউ ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল না। গ্রামটা যেন জনশূন্য। তা দেখে দুর্জয়দা বললেন, ‘আশ্চর্য ব্যাপার তো! লোকজন সব গেল কোথায়?’

রিপন বলল, ‘তাদের কেউ উদ্ধার করে নিয়ে যায়নি তো? কেউ তো নেই বলেই মনে হচ্ছে!’

দুর্জয়দা বললেন, ‘তা নয় বুঝলাম। কিন্তু সেই মেয়েটা? মেয়েটা কোথায় গেল?’

চারপাশে আবারও ভালো করে তাকিয়ে সেই মেয়েটাকে দেখতে পেল না তারা। গ্রামের ভিতর তারা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে দ্বীপের ওপাশটা দেখা যাচ্ছে। একটা ছোট খাঁড়ি, আর তার ওপাশেই ঘন জঙ্গলময় একটা দ্বীপ! সূর্য ঢলতে শুরু করেছে তার মাথার আড়ালে।

রিপনদের চারপাশে অসম্ভব নিস্তব্ধ পরিবেশ! মেয়েটাকে দেখতে না পেয়ে দুর্জয়দা বললেন, ‘এই ভাঙা ঘর-বাড়িগুলোর আড়ালে হয়তো মেয়েটা আছে। তার সঙ্গে অসুস্থ শিশু বা বৃদ্ধও থাকতে পারে। যাকে ছেড়ে মেয়েটা ধ্বংসস্তূপের বাইরে আসতে পারছে না। বা আমাদের দেখে ফিরে এসে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়ল না তো? নইলে সে যাবে কোথায়? আমার মনে হয় চারপাশে খুঁজলেই তাকে পাওয়া যাবে। চলো একবার তাকে খুঁজে দেখি?’

গ্রামের ভিতর ঘুরতে শুরু করল তারা। উঁকি দিতে লাগল ভাঙা ঘরগুলো আনাচে-কানাচে। হঠাৎ একটা ঘরের সামনে এক ঝাঁক বাঁদর চোখে পড়ল তাদের। ধ্বসে পড়া দেওয়ালের চারপাশে খাদ্য অন্বেষণ করছে তারা। একটা বাঁদর একটা হাঁড়ি বার করে এনে তার ভিতর থেকে কী যেন চেটে খাচ্ছে! সম্ভবত এই বাঁদরের ঝাঁক খাঁড়ির ওপারের জঙ্গল থেকেই এসেছে। রিপনদের দেখার পর কিন্তু বাঁদরগুলো নিরাপদ দূরত্ব রেখে তাদের অনুসরণ করতে লাগল। তা দেখে দুর্জয়দা বললেন, ‘ওরা সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে বস্তাগুলোর মধ্যে খাবার আছে, তাই আমাদের পিছনে আসছে। তাছাড়া বাঁদর খুব কৌতূহলী প্রাণী।’

ধ্বংস স্তূপের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রায় গ্রামের পিছনে পৌঁছে গেল। আর এরপরই বাঁদরগুলো হঠাৎ রিপনদের চমকে দিকে একসঙ্গে ডেকে উঠল। আর এরপরই দুর্জয়দা বলে উঠলেন, ‘ওই তো! ওই তো মেয়েটা ওখানে বসে আছে!’

তিন

দুর্জয়দার দৃষ্টি অনুসরণ করে রিপন কিছুটা দূরেই দেখতে পেল মেয়েটাকে। হ্যাঁ, ওই তো হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটা একটা ভেঙে পড়া বাড়ির একটু উঁচু মতো মাটির দাওয়ায় বসে আছে। তাকে দেখেই রিপনরা এগোল সেই দাওয়ার দিকে।

মেয়েটা তাদের দেখেই ঘোমটা নামিয়ে নিল সম্ভবত গ্রামীণ সংস্কার বশত। এখনও অনেক গ্রামীণ মহিলা পর-পুরুষের কাছে মুখ দেখাতে চায় না। রিপনরা তার কয়েক হাত তফাতে গিয়ে কাঁধের বস্তা মাটিতে নামাল। তারপর ভালো করে তাকাল তার দিকে।

সে উবু হয়ে হাঁটুর ওপর চিবুক রেখে বসে আছে। পরনে হলুদ রঙের ডুরে শাড়ি, তার জায়গায় জায়গায় জল-কাদার দাগ। হাত-পা-কাঁধ, শরীরের উন্মুক্ত অংশগুলোও ধুলো মাখা। তার চিবুক ছাড়া মুখের অন্য অংশ ঘোমটার নীচে ঢাকা।

তাকে দেখে যুবতী বলেই মনে হল রিপনের। তবে মেয়েটার হাতে শাঁখা-লোহা দেখে তারা বুঝতে পারল এই রমণী একজন বউ—অর্থাৎ বিবাহিত।

ভালো করে দেখার পর দুর্জয়দা তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমিই তো জেটিতে দাঁড়িয়েছিলে, হাত নেড়ে আমাদের ডাকছিলে, তাই না?’

বউটা প্রশ্নের জবাবে মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল, হ্যাঁ, সেই সেখানে ছিল।

রিপন জানতে চাইল, ‘গ্রামের সব লোকজন কোথায়?’

বউটা এবার উত্তর দিল, ‘সবাই ঝড়ের আগে দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছে।’

তুমি কি তবে একলাই এখানে আছ? জানতে চাইলেন দুর্জয়দা।

বউটা সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, একাই।’

তার উত্তর শুনে রিপন বলল, ‘তুমি একলা এ দ্বীপে পড়ে আছ কেন?’

কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বউটা বিষণ্ণভাবে বলল, ‘এ দ্বীপ ছেড়ে আমার অন্য কোথাও যাবার জায়গা নেই, কোথাও কেউ নেই বলে।’

দুর্জয়দা বলল, ‘তোমার এই একলা দ্বীপে থাকতে ভয় করছে না? মাথার ওপর তো কোনও ছাদ নেই। খাঁড়ির ওপারেই তো জঙ্গল দেখা যাচ্ছে। যদি খাঁড়ি সাঁতরে বাঘ চলে আসে এখানে? তোমার বাঘের ভয় নেই?’

দুর্জয়দার প্রশ্ন শুনে ঘোমটার আড়ালে মেয়েটা যেন এবার হাসল বলে মনে হল রিপনের। তারপর সে বলল, ‘আগে বাঘের ভয় পেতাম। কিন্তু এখন আর পাই না। এ দ্বীপে যখন অন্য লোকেরা এসে ঘর বানাল, তার আগেই থেকেই আমি এখানে আছি।’

তার জবাব শুনে দুজনেই বেশ একটু আশ্চর্য হয়ে গেল। বাঘের ভয় নেই বউটার!

সূর্য দ্রুত চলতে শুরু করেছে খাড়ির ওপাশের জঙ্গলের আড়ালে। রিপনদের এবার লঞ্চে ফিরতে হবে। দুর্জয়দা বউটাকে বললেন, ‘শহর থেকে লঞ্চ নিয়ে দ্বীপে দ্বীপে ত্রাণ বিলি করতে এসেছিলাম আমরা। এখানেও সে কাজেই এসেছিলাম। এবার ফিরে যাব। তুমি যদি আমাদের সঙ্গে যেতে চাও তো যেতে পারো। আমরা তোমাকে কোনও বড় দ্বীপে ফেরার পথে নামিয়ে দেব। যেখানে লোকজন আছে। একলা এ দ্বীপে থাকা কিন্তু নিরাপদ নয়।’

একটু চুপ করে থেকে বউটা বলল, ‘না, আমি কোথাও যাব না।’

তার জবাব শুনে দুর্জয়দা প্রথমে একটু মজার ছলেই তাকে বললেন, ‘তুমি এই দ্বীপে কোনও সোনাদানা গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছ নাকি যে এ জায়গা আঁকড়ে পড়ে আছ?’

বউটা তার এ কথার কোনও জবাব দিল না। দুর্জয়দা এরপর তাকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যখন যেতে চাইছ না তখন থাকো এখানে। তবে বস্তা দুটো রেখে দাও। ওতে কিছুটা চিড়ে, মুড়ি, জলের বোতল আছে। তোমার কাজে লাগবে। কবে আবার সব কিছু স্বাভাবিক হবে, লোকজন এখানে ফিরে আসবে, তার তো ঠিক নেই।’

দুর্জয়দার এ কথা শুনে মেয়েটা তাদের একটু অবাক করে দিয়ে বলল, ‘না, ওসবেরও আমার কিছু দরকার নেই।’

এবার আর কিছু করার নেই রিপনদের। তাই দুর্জয়দা চোখের ইশারাতে রিপনকে বলল, ‘চলো এবার ফেরা যাক।’

দুর্জয়দা আর রিপন এরপর মাটি থেকে বস্তা দুটো উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ঠিক এই সময় দাওয়া থেকে মেয়েটা নেমে দাঁড়াল। তারপর দুর্জয়দার উদ্দেশ্যে বলল, ‘তুমি একটু দাঁড়িয়ে যাও বাবু। তোমাকে একটা জিনিস দেখাব। সেটা দেখে তারপর ফিরো।’

দুর্জয়দা মৃদু বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী জিনিস?’

কিছু দূরে খাঁড়ির দিকে একটা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। সেখানে একটা মাত্র দেওয়াল খাড়া হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সেই মাটির দেওয়ালটার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বউটা বলল, ‘ওর পিছনে গেলেই সেটা দেখতে পাবে। দেওয়ালের পিছনে যে বড় গরান গাছটা দাঁড়িয়ে আছে তার নীচেই।’

একথা বলার পর বউটা রিপনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে বস্তাগুলো পাহারা দিন বাবু। বাঁদরগুলো দূর থেকে দেখছে। বস্তা ছেড়ে গেলেই ওরা সঙ্গে সঙ্গে এসে বস্তা ছিঁড়ে খাবার নষ্ট করে দেবে। আমি বেশিক্ষণ সময় নেব না। ওই দেওয়ালের দিকে ভিজে মাটিতে বস্তা নিতে অসুবিধা হবে।’

বউটার কথা শুনে দুর্জয়দা একটু ভেবে নিয়ে রিপনকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি চট করে দেখে আসি ও কী আমাকে দেখাতে চায়?’

এ কথা বলে তিনি বউটাকে বললেন, ‘চলো, কী দেখাবে আমাকে?’

বউটা এরপর দুর্জয়দাকে নিয়ে রওনা হল সেই বাড়িটার ধ্বংসস্তূপের দিকে। একই জায়গাতে একলা দাঁড়িয়ে রইল রিপন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুর্জয়দাকে নিয়ে বউটা অদৃশ্য হয়ে গেল সেই মাটির দেওয়ালের আড়ালে।

কিন্তু মিনিট পাঁচেক সেখানে একলা দাঁড়িয়ে থাকার পর কেমন যেন অস্বস্তিবোধ শুরু হল রিপনের মধ্যে। দূরে দাঁড়ানো বাঁদরগুলো কেমন যেন অদ্ভুতভাবে একবার রিপনের দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার তাকাচ্ছে দুর্জয়দারা যেদিকে অদৃশ্য হয়েছেন সেই দেওয়ালটার দিকে।

সূর্য এবার অদৃশ্য হয়ে গেছে খাঁড়ির ওপাশের জঙ্গলের আড়ালে। আলো দ্রুত সরে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু দুর্জয়দার ওই দেওয়ালের আড়াল থেকে বাইরে আসছেন না কেন? জেটিতে ফিরতে তো অন্ধকার নেমে যাবে।

আরও মিনিট পাঁচেক সময়ের পরও যখন দুর্জয়দা ফিরল না তখন রিপন কোনওরকমে দুটো বস্তাই তুলে নিয়ে এগোল সেই দেওয়ালের দিকে। কয়েক পা সেদিকে এগিয়ে রিপন বুঝতে পারল এ অংশটা ঢালু। বউটা ঠিকই বলেছিল। এদিকের মাটিও ভিজে। সম্ভবত খাঁড়ির জল এখানে উঠে এসেছিল।

কাদা ভেঙে বাড়িটার কাছে রিপন পৌঁছে গেল। বাঁদরের দল এবার আর তাকে অনুরসণ করেনি। একই জায়গাতে তারা দাঁড়িয়ে। রিপনের সামনে ফুট দুয়েক উঁচু দেওয়াল আর তার ওপাশে বড় একটা গাছ। বস্তা দুটো মাটিতে নামিয়ে রিপন এগোল দেওয়ালের ওপাশে যাবার জন্য।

চার

কিন্তু দেওয়ালের কাছে গিয়েও দেওয়ালের ওপাশে গাছের নীচে দুর্জয়দা আর সেই বউটার অদ্ভুত কথোপকথন শুনতে পেয়ে রিপন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বউটা দুর্জয়দাকে বলছে—’তুমি এখনও চিনতে পারছ না এ জায়গা? এই গাছটা? খাঁড়িটা? তখনতো এখানে কেউ বাস করত না। এই খাঁড়িতেই তোমাদের লঞ্চটা এসে থেমেছিল। এই গাছের নীচেই ঘটেছিল সেই ঘটনাটা।’

বউটার কথার প্রত্যুত্তরে দুর্জয়দার গলা শোনা গেল, ‘তখন থেকে কী আবল তাবল বকে চলেছ তুমি?’

বউটা এবার বলল, ‘তুমি যখন এতবার আমি বলার পরও এ জায়গা চিনতে পারছ না তখন আমি তোমাকে ঘটনাটা মনে করিয়ে দিই বাবু। কাঁকড়া ধরতে দ্বীপে নেমেছিলাম আমি। যখন আমি এই গাছের নীচে গর্ত থেকে কাঁকড়া ধরছি তখন বাঘ এসে পিছন থেকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে আমার শাড়ি ছিড়তে শুরু করল। আমি বাঁচবার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু বাঘের শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হলাম।’

তার কথা শুনে দুর্জয়দা বলে উঠলেন, ‘কে! কে তুমি?’ কেমন যেন কাঁপা কাঁপা মনে হল দুর্জয়দার গলা।

বউটা বলল, ‘তুমি আমাকে চিনতে না পারলেও আমি কিন্তু দূর থেকেই লঞ্চে দাঁড়ানো সেদিনের বাঘটাকে দেখেই চিনতে পেরেছিলাম। তাই তো হাতছানি দিয়ে তোমাকে ডাকলাম। তুমি আবার কবে এই সুন্দরবনে ফিরে আস, তার জন্যই তো এত বছর ধরে আমি এখানে অপেক্ষা করছিলাম। নাও, আমি ঘোমটা সরালাম। আমাকে চিনতে পারছ তুমি?’

বউটার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই দুর্জয়দার বিস্মিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘বাসন্তী তুমি! তুমি বেঁচে আছ?’

বউটার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘যাক বাবু, তুমি আমাকে চিনতে পারলে। তুমি সেদিন শুধু আমার শরীরটাকেই খেলে না। তারপর বাঘের মতো হাত দুটো দিয়ে আমার গলা দুটোও চেপে ধরলে। সে থাবা থেকে কি আমার মতো লোক বাঁচতে পারে বাবু? ঘাড়টাই আমার ভেঙে গেল। তারপরই একটা সত্যিকারের বাঘ ডাকল কোথাও। আমাকে এখানে ফেলে রেখে লঞ্চের দিকে ছুটলে তুমি।’

এ কথা বলে একটু থেমে বাসন্তী নামের মেয়েটা হেসে উঠে বলল, ‘সেদিন তো তুমি বাঘ সেজেছিলে কিন্তু সুন্দরবনের বাঘ দেখেছ কখনো? বাঘ বা বাঘিনী?’

আর এরপরই দুর্জয়দার প্রচণ্ড আতঙ্কিত চিৎকার আর একটা ঝটাপটির শব্দ রিপনের কানে এল!

রিপন এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে তাদের দুজনের অদ্ভুত কথোপকথন শুনছিল। এবার আর সে নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে এক ছুটে দেওয়ালের ওপাশে গিয়ে উপস্থিত হল। কিন্তু তার পরই এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে থেমে গেল সে। হাত কুড়ি তফাতে বিরাট বড় গাছটার গুঁড়ির নীচে মাটির ওপর পড়ে দুর্জয়দা। আর তার বুকের ওপর বসে তার ঘাড়টা কামড়ে ধরেছে একটা হলুদ রঙের বিশাল বাঘ! না বাঘ নয়, বিশাল একটা বাঘিনী!

দৃশ্যটা দেখে নিজের অজান্তেই যেন একটা আতঙ্কিত চিৎকার বেরিয়ে এল রিপনের গলা থেকে। আর সেই চিৎকার শুনে ঘাড় কামড়ে ধরে থাকা অবস্থাতেই তার দিকে তাকাল বাঘিনী। কী ভয়ঙ্কর সেই চাহনি! আতঙ্কে কেঁপে উঠল তার শরীর। আর এর পরই ‘মট’ করে একটা শব্দ রিপনের কানে এল। সম্ভবত দুর্জয়দার ঘাড়টা ভেঙে দিল সে। তার পর দুর্জয়দার শরীর ছেড়ে রিপনের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ঢাল বেয়ে বাঘিনী ছুটল খাঁড়ির দিকে। ছোট খাঁড়িতে নেমে দ্রুত সাঁতরে ওপারে উঠে কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই ওপাশের জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই বাঘিনী।

রিপনের সম্বিত ফিরতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। আতঙ্কিত রিপন সে জায়গা থেকে পালাবার জন্য আবার দেওয়ালের এ পাশে এসে ছুটতে শুরু করল। যে ভাবেই হোক লঞ্চে ফিরতে হবে। কিন্তু একটু এগিয়েই সে মুখোমুখী হয়ে গেল সারেঙ মাধব মণ্ডলের। রিপনদের খোঁজে সে এসেছে।

তাকে দেখে রিপন আতঙ্কিত ভাবে বলল, ‘বাঘ! ওই যে সেই মেয়েটার সঙ্গে দুর্জয়বাবু, ওই যে ওই মাটির দেওয়ালের ওপাশে গাছের নীচে গেছিলেন। সেখানে তাকে একটা বাঘ এসে কামড়েছে। গাছের নীচেই পড়ে আছেন তিনি। আমার চিৎকার শুনে বাঘটা তাকে ছেড়ে খাঁড়ি সাঁতরে ওপারের জঙ্গলে পালিয়েছে।

মাধব মণ্ডল এই জল-জঙ্গলেরই মানুষ। সাহসীও বটে। সে কথাটা শুনেই একটা ভাঙা ঘর থেকে একটা লম্বা বাঁশ তুলে নিয়ে ছুটল সেই দেওয়ালের দিকে। রিপনও কিছুটা সাহস ফিরে পেয়ে ছুটল তার সঙ্গে।

চাপ চাপ অন্ধকার নামতে শুরু করেছে চারপাশে। দেওয়ালের ওপাশে গাছের নীচে পৌঁছে গেল তারা। সেখানে একইভাবে পড়ে আছে দুর্জয়দার দেহ। রক্ত আর বাঘের লোমে মাখামাখি সে দেহটা দেখেই রিপনরা বুঝতে পারল সে দেহে আর প্রাণ নেই। বাঘিনী দুর্জয়দার ঘাড়টা একদম ভেঙে দিয়েছে।

দুর্জয়দার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে মাধব মণ্ডল হঠাৎ বলে উঠল, ‘এ বাবুকে এবার আমি চিনতে পেরেছি। তাই আমার বাবুকে চেনা লাগছিল। সেবার যখন ইনি এখানে এসেছিলেন তখন এনার অর্ধেক বয়েস ছিল, আর দাড়িও ছিলো না। তাই চেনা লাগলেও চিনতে অসুবিধা হচ্ছিল। এখন চিনতে পারছি। সেবারও একজনকে বাঘে নিয়েছিল, এবারও মারল এই বাবুকে!’

সারেঙ মাধব মণ্ডলের কথা শুনে বিস্মিত রিপন জানতে চাইল, তার মানে?

সারেঙ খাঁড়ির ওপাশের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখানে আর আমাদের থাকা চলবে না। বাঘটা আবার খাঁড়ি পেরিয়ে ফিরে আসতে পারে। দেহটাকে এখনই উঠিয়ে ফিরতে হবে। চলুন আর দেরি নয়, যেতে যেতে সব বলছি।’

মাধব মণ্ডল এরপর নিজের কোমরের গামছাটা ছিঁড়ে কোনওক্রমে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে ফেলল দুর্জয় রক্ষিতের মৃতদেহ। তারপর মাধব মণ্ডল আর রিপন বাঁশের দু-প্রান্ত কাঁধে তুলে দুর্জয় রক্ষিতের ঝুলন্ত দেহ নিয়ে আধো অন্ধকারের মধ্যে দ্রুত রওনা হল জেটিতে ফেরার জন্য।

গ্রাম থেকে বেরিয়ে জেটির রাস্তা ধরে চলতে চলতে সারেঙ মাধব মণ্ডল বলতে শুরু করল, ‘হ্যাঁ, এ বাবুই বছর কুড়ি আগে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সুন্দরবনে বেড়াতে এসেছিলেন। আমি তখন একটা লঞ্চে সারেঙের সহকারি হিসাবে কাজ করি। সেই লঞ্চেই এসেছিলেন বাবুরা। আসার সময় নামখানা থেকে একটা অল্পবয়সি বউকে লঞ্চে তুলেছিলাম আমরা। বউটার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছিল।

সুন্দরবনে যারা বেড়াতে আসে তাদের লঞ্চে উঠে রান্না, বাসন ধোয়া এসব করত মেয়েটা। আর কখনও কখনও নানা দ্বীপের কাঁকড়া ধরে পেট চালাত। ওই রান্নার কাজেই মেয়েটাকে আমরা নিয়েছিলাম।

যেদিন আমরা লঞ্চ ছেড়েছিলাম তার পরদিন বেলা বারোটা নাগাদ আমরা এই দ্বীপের পিছনের খাঁড়িতে ঘুরতে ঘুরতে উপস্থিত হলাম। দ্বীপটা দেখেই বউটা বলল, সে নাকি এ দ্বীপে বার কয়েক এসেছে কাঁকড়া ধরতে। পয়সা দিলে সে দ্বীপে নেমে কাঁকড়া আনতে পারে। তার কথা শুনে বাবুরা বললেন, ‘কাঁকড়া আনো। আমরা পয়সা দেব। মদের সঙ্গে ভালো চাট হবে।

তখন এ দ্বীপে মানুষের বসবাস ছিল না। খাঁড়ির দুপাশে জঙ্গল। নীচে নামা বেশ ঝুঁকির কাজ। তবুও গরিব বউটা দুটো বাড়তি পয়সা পাবে ভেবে সারেঙ খাড়িতে নৌকা দাঁড় করাল। একটা হাড়ি নিয়ে লঞ্চ থেকে নেমে দ্বীপের জঙ্গলের আড়ালে ঢুকে পড়ল বউটা।

এ বাবু সে সময়তে খুব ডাকাবুকো ধরনের ছিলেন। তিনিই দলের নেতা। বউটা জঙ্গলে ঢোকার কিছু পরে তিনিও আমাদের নিষেধ না শুনে অন্য বন্ধুদের কাছে তার সাহস দেখাবার জন্য লঞ্চ ছেড়ে নেমে জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। বউটার কাঁকড়া ধরা দেখার জন্য।

আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম বউ আর এ বাবুর কাঁকড়া নিয়ে ফিরে আসার জন্য। কিন্তু আধ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই এই দ্বীপের ভিতর বাঘের ডাক শুনতে পেলাম আমরা। আর তার পরই এই বাবু জঙ্গল থেকে ছুটতে ছুটতে বাইরে বেরিয়ে লঞ্চে উঠে বললেন, তার চোখের সামনেই নাকি একটা গাছের নীচ থেকে একটা বিরাট বড় বাঘ তুলে নিয়ে গেছে বউটাকে!

তখন সেই বউটাকে খুঁজতে জঙ্গলে ঢোকা মানে আত্মহত্যার সামিল। সারেঙ তাই লঞ্চ ছাড়বার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। নামখানায় নেমে সে বলেছিল বউটা নাকি বাসন্তীতে নেমে গেছে। ঘটনাটা পুরো চেপে যাওয়া হয়েছিল হাঙ্গামা এড়াতে।

বউটার কেউ ছিল না। তাই খোঁজও করেনি কেউ। এর কিছুদিন পর এই ঘটনাটা কেমন ভাবে চাউর হয়ে যায়। এ দ্বীপের নাম হয় ‘বাঘে খাওয়া’ দ্বীপ। ভাগ্যের কী পরিহাস দেখুন, সে বার এই দ্বীপে বউটাকে বাঘে খেল! আর এবার বাবুকেই বাঘে মারল!’

এ কথা বলার পর চলতে চলতে মাধব মণ্ডল একটু পরে আবার বলল, ‘হ্যাঁ, বউটার নাম এবার মনে পড়েছে। তার নাম ছিল বাসন্তী।’

এ কথা শুনেই রিপনের শরীর বেয়ে একটা হিমেল রক্তের স্রোত বয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল বউটার সঙ্গে দুর্জয়দার কথোপকথন। আর বউটাই বা গেল কোথায়? মুহূর্তের মধ্যেই যেন পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল তার কাছে। সারেঙ এরপর এ প্রসঙ্গে আর কোনও কথা না বলে ‘জয় বনবিবি, জয় কানুরায়’ ইত্যাদি নাম জপ করতে করতে দ্রুত পা চালাল।

কোনও ক্রমে তারা যখন জেটিতে পৌঁছল তখন ঘন অন্ধকার নেমে গেছে। রিপনরা দেহটাকে লঞ্চে ওঠাতেই, সেই রক্তমাখা মৃতদেহ দেখে আর দুর্জয় রক্ষিতকে বাঘে মেরেছে শুনে ভয়ার্ত চিৎকার, শোরগোল শুরু হল। সারেঙ মাধব মণ্ডল অন্যদের থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘চুপ, কেউ গোল করবেন না। বাঘ এসে লঞ্চে উঠে পড়তে পারে। এখনই খোলে নেমে যান আপনারা। এখনই এ তল্লাট ছেড়ে যেতে হবে, লঞ্চ ছাড়তে হবে।’

তার কথা শুনে সবাই ভয় পেয়ে দুরদাড় করে নীচে খোলের মধ্যে নেমে গেল। সারেঙের সহকারী ছেলেটা নোঙর তুলে ফেলল। মাধব মণ্ডল তার কেবিনে গিয়ে ঢুকল। ঘর ঘর শব্দে লঞ্চের ইঞ্জিন চালু হয়ে গেল। জ্বলে উঠল সারেঙের কেবিনের মাথায় বসানো সার্চ লাইটের আলো। হতভম্ব, বাকরুদ্ধ রিপন তখনও ডেকের ওপর পড়ে থাকা বাঁশে বাঁধা রক্ষিতের রক্তাক্ত মৃহদেহর সামনে দাঁড়িয়ে।

মুখ ফিরিয়ে ফিরে যাবার জন্য লঞ্চের মুখটা এবার ঘুরতে শুরু করেছে। সার্চ লাইটের আলো দ্বীপের পাড়টাতে। হঠাৎ ঘুরন্ত আলোটা কয়েক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে গেল জেটিটাকে। আর সেই আলোতে রিপন হঠাৎই দেখতে পেল জেটির ওপরে গ্রামে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে লঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছে একজন। সেই হলুদ ডুরে শাড়িপরা বউ অথবা একটা বাঘিনী! আর তারপরই সে অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে।