Accessibility Tools

সাদা বিড়াল – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

কুইক বয় – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

কুইক বয়

বর্ষাকালে এবার প্রায় নিয়মিত ভাবেই রোজ বৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষত সন্ধ্যার দিকটাতে, ঠিক যখন শ্রীপর্ণার অফিস থেকে তার ফ্ল্যাটে ফেরে, তখন। এসপ্লানেড থেকে ফেরার সময় অফিসের গাড়ি তাকে এসে নামিয়ে দিয়ে যায় বৈষ্ণব নগরের মোড়ে। সেখান থেকে শ্রীপর্ণা মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই পৌঁছে যায় গলির ভিতর ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে।

ফার্স্ট ফ্লোর অর্থাৎ দোতলায় শ্রীপর্ণার ফ্ল্যাট। কিন্তু এটুকু রাস্তাও তাকে প্রায়ই ভিজে ফিরতে হচ্ছে ক’দিন ধরে। এত জোরে এসময় বৃষ্টি নামে যে ছাতা খুলে মাথা বাঁচানো গেলেও শরীর ভিজে যায়। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না।

সন্ধ্যার কিছু সময় পর সাতটা নাগাদ শ্রীপর্ণা যখন গাড়ি থেকে নামল, তার কিছু সময় আগে থেকেই মুশলধারে বৃষ্টি নেমেছে। ছাতা খুলে ব্যাগটাকে বুকে জড়িয়ে গলিতে ঢুকে তার ফ্ল্যাটের দিকে এগোল শ্রীপর্ণা। তখন তার খেয়াল হল বাড়িতে কোনও খাবার নেই। সাধারণত সকালে রান্না সেরে রাখে সে। রাতে ফিরে তা গরম করে খায়।

সারা দিন অফিসের চাপ সামলে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরে আর কিচেনে যেতে তার ভালো লাগে না। তাই দুবেলার রান্না সে সকালেই সেরে ফেলে। কিন্তু এদিন অফিসে বিশেষ কাজ থাকার জন্য ভোরবেলায় ফ্ল্যাট থেকে বেরোতে হয়েছিল তাকে। তাই রান্না করার সুযোগ হয়নি। এ কথাটা মনে পড়ার পরই তার মনে হল অবশ্য এতে চিন্তার কিছু নেই, ‘কুইক ফুড সার্ভিস’-এর মাধ্যমে সে রাতের খাবার আনিয়ে নেবে। যেমন সে রাতে মাঝেমধ্যেই আনায়। কখনও রাতের খাবার ঘরে না থাকার কারণে, আবার কখনও বা হোটেলের ভালো-মন্দ-খাবার খাওয়ার ইচ্ছা হলে।

মোবাইল ফোনে অনলাইন অর্ডার দিলেই আধ ঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই গরম খাবার পৌঁছে দিয়ে যায় ‘কুইক বয়’ রা। তাদের মধ্যে একটা ছেলে প্রায়সই খাবার দিতে আসে। শ্রীপর্ণার সে ছেলেটার সঙ্গে মৃদু পরিচয়ও হয়ে গেছে। পল্লব নাম তার। শ্রীপর্ণার থেকে বেশ কিছু ছোটই হবে ছেলেটা। গোলগাল হাসিখুশি চেহারা। সাদা ক্যারিব্যাগে ঝোলানো খাবার হাতে ধরিয়ে চলে যাবার আগে একগাল হেসে রোজ বলে যায়, ‘রেটিং-টা প্লিজ করে দেবেন ম্যাডাম।’

ওই রেটিং-এর ওপরই নাকি ওদের প্রাপ্যর ব্যাপারটা নির্ভর করে। কুইক ফুড সার্ভিসের মাধ্যমে খাবার অর্ডার দেবার কথা ভাবার পর হঠাৎই ছেলেটার মুখটা মনে পড়ে গেল শ্রীপর্ণার।

ভিজতে ভিজতে ফ্ল্যাট বাড়িটার কাছে পৌঁছে গেল শ্রীপর্ণা। বাড়িটাতে ঢোকার মুখেই রাস্তার গায়ে একটা বাইক দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। তাকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে, ছাতা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় উঠতে উঠতেই সে শুনতে পেল তার ঠিক মুখোমুখি ফ্ল্যাটের মিসেস মজুমদার বেশ জোরালো গলায় কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। দোতালাতে উঠে নিজের ঘরের সামনে পৌঁছতেই শ্রীপর্ণা দেখতে পেল তার ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে মিসেস মজুমদার। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কুইক বয় পল্লব। ছেলেটার গায়ের পুরোনো রেনকোট আর পিঠে নেওয়া কুইক ফুডের লোগো আঁকা খাবার রাখার চৌক ব্যাগটা থেকে জল ঝরছে। তার হাতে ধরা খাবারের প্যাকেট সহ সাদা ক্যারি ব্যাগ। ভদ্রমহিলা ছেলেটার উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো গলায় বললেন, ‘ইয়ার্কি মারার জায়গা পাওনি! আধ ঘণ্টার মধ্যে খাবার পৌঁছবার কথা, এক ঘণ্টা পর হাজির হলে!’

ছেলেটা নরম গলাতে হাতের প্যাকেটটা ভদ্রমহিলার উদ্দেশ্যে এগিয়ে বলল, ‘রাগ করবেন না ম্যাডাম, প্লিজ খাবারটা নিয়ে নিন। আমি বৃষ্টিতে ভিজলেও খাবারটা গরম আছে।’

তার অনুরোধে কর্ণপাত না করে মিসেস মজুমদার বললেন, ‘বললাম তো খাবার নেব না। অর্ডার ক্যানসেল করে দিচ্ছি। আধ ঘণ্টার মধ্যে খাবার আনার কথা আর বাবু এলেন এক ঘণ্টা পরে!’

মিসেস মজুমদারের কথা শুনে ছেলেটা বিনীতভাবে বলল, ‘এমন করবেন না ম্যাডাম। খাবারটা নিন। হ্যাঁ, আধ ঘণ্টার মধ্যে খাবার পৌঁছনোর কথা ছিল। হ্যাঁ, দেরি কিছুটা হয়েছে সেটা দশ মিনিট। এক ঘণ্টা সময় লাগেনি। আসলে এত জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল যে বাইক চালানো যাচ্ছিল না। তাই রাস্তাতেই দশ মিনিট দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। বলছি তো তার জন্য আমি দুঃখিত।’

ছেলেটার কথার জবাবে মিসেস মজুমদার বলে উঠলেন, ‘একে তো ঠিক সময় এলে না। তার ওপর আমাকে ঘড়ি দেখা শেখাচ্ছে?’ শ্রীপর্ণার মনে হল ভদ্রমহিলা একটু টলছেন। নেশাগ্রস্থ তিনি।

পল্লব নামের ছেলেটা বলল, ‘না, ম্যাডাম, আমি ঘড়ি দেখা শিখতে বলিনি। আমি শুধু বলতে চাইছি এতটা দেরি হয়নি। রাগ করবেন না প্লিজ। খাবারটা রাখুন।’

তাদের দুজনের কথোপকথন শুনতে শুনতে নিজের ফ্ল্যাটের তালা খুলতে শুরু করেছিল শ্রীপর্ণা। চাবির গোছার শব্দ কানে যেতেই পিছনে ফিরে তাকাল ছেলেটা। তারপর শ্রীপর্ণাকে দেখতে পেয়ে মিসেস মজুমদারকে বলল, ‘এই ম্যাডামকেও আমি খাবার পৌঁছে দিই। ওনাকে জিগ্যেস করুন, আমি কোনও দিন খাবার পৌঁছে দিতে দেরি করেছি কিনা?’

কদিন আগে সিঁড়ির মুখে মিসেস মজুমদারের ফাঁকা বিয়ারের বোতল রাখা নিয়ে শ্রীপর্ণা আপত্তি জানিয়েছিল। তাই সম্ভবত শ্রীপর্ণার ওপর মনে মনে চটেছিলেন ভদ্রমহিলা। কুইক বয় কথাটা বলতেই তিনি আরো বেশি খেপে গেলেন। চিৎকার করে বললেন, ‘অন্যায় করে আবার অন্যকে সাক্ষি ডাকা হচ্ছে! জানো, তিনি কত বড় সরকারি চাকরি করেন? আমি খাবার তো নেবই না, তিনি ফিরলে তোমার ব্যবস্থা করছি।’—এই বলে ছেলেটাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মিসেস মজুমদার দড়াম করে তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন।

শ্রীপর্ণা তখন ঘরের তালা খুলে ফেলেছে। মিসেস মজুমদার আর দরজা খুলবেন না বুঝতে পেরে এবার পল্লব নামের ছেলেটা ফিরে দাঁড়াল শ্রীপর্ণার দিকে। শ্রীপর্ণা তা দেখে দরজা খুলে ঘরের ভিতর ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল।

ছেলেটার মুখে কেমন যেন একটা অসহায়ভাব ফুটে উঠেছে। যে রেনকোটটা সে গায়ে পরে আছে তার চেনটা ছেঁড়া। তার বুকের কাছটা অনেকটা ফাঁক হয়ে গেছে। আর তার ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে কুইক ফুড কোম্পানির ভিজে যাওয়া লাল শার্টটা। শ্রীপর্ণা তার দিকে তাকাতেই ছেলেটা যেন কষ্ট করেই পরিচিত হাসিটা ফুটিয়ে তুলল।

মিসেস মজুমদারের সঙ্গে ছেলেটার যা ঘটল তা নিয়ে পল্লব নামের কুইক বয়কে কিছু বলা উচিত হবে কিনা তা শ্রীপর্ণা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। যদিও মিসেস মজুমদারের ছেলেটার প্রতি আচরণ তার মোটেও ভালো লাগেনি। ছেলেটা মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতেই শ্রীপর্ণাও হেসে বলল, ‘ঘরে ঢুকে আপনাদের ওখানেই ফোন করব রাতের খাবারের জন্য।’

ছেলেটা শুনে বলল, ‘আমি তো বেশ কয়েকটা খাবারের অর্ডার নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি ম্যাডাম। তবে আমি না এলেও নিশ্চয়ই কেউ খাবার পৌঁছে দেবে। ম্যাডাম আপনি চিন্তা করবেন না।’

ছেলেটা এরপর সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলল, ‘রেটিং-টা প্লিজ করে দেবেন ম্যাডাম।’

এবার ছেলেটার কথা শুনে মৃদু হাসি পেল শ্রীপর্ণার। ছেলেটা তো এখন তাকে খাবার দিতে আসেনি। শ্রীপর্ণার মনে হল, ‘অভ্যাস বশতই সম্ভবত, চলে যাবার সময় ছেলেটা তাকে কথাটা বলে ফেলল!’ কিন্তু ছেলেটা মনে হয় কোনও কারণে ধরতে পারল শ্রীপর্ণার মনের ভাবনা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে বলল, ‘আমি না আসলে তো আমার মতোই কেউ আসবে এই ঝড়-জল মাথায় নিয়ে আপনাকে খাবার দিতে। আমি তার কথা ভেবেই আপনাকে অনুরোধ জানিয়ে গেলাম। তাতে ছেলেটার সুবিধা হবে।’—এ কথা বলে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল কুইক বয়।

শ্রীপর্ণাও এরপর ঘরে ঢুকে পড়ল। ফ্রেশ হয়ে নেবার পর কুইক ফুডের মাধ্যমেই সে খাবার অর্ডার দিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অন্য একজন কুইক বয় এসে তার হাতে খাবার তুলে দিল। সে লোকটা রেটিং-এর কথা বলার আগেই পল্লবের কথা মনে পড়ে যাওয়াতে শ্রীপর্ণা তাকে বলল, ‘চিন্তা নেই। আপনার রেটিং আমি এখনই করে দিচ্ছি।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম’, বলে চলে গেল লোকটা।

কুইক ফুডের দেওয়া খাবার খেয়েই রাতে শুয়ে পড়ল শ্রীপর্ণা।

দুই

দুদিন পর এদিন বৃহস্পতিবার। যে সংবাদপত্রর অফিসে শ্রীপর্ণা চাকরি করে সে অফিসে বৃহস্পতিবার তার অফ-ডে থাকে। অর্থাৎ ছুটির দিন। একটু বেলা করে ঘুম ভাঙার পর সে দেখতে পেল বাইরে সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এই ছুটির দিন দুপুরে মাঝে মাঝে সে কুইক ফুডের মাধ্যমে খাবার আনায়। প্রথমে সে তাদের মাধ্যমেই খাবার আনাবে ভেবেছিল, কিন্তু একথা ভাবার পরই শ্রীপর্ণার খেয়াল হল গত সন্ধ্যায় ফেরার সময় সে নিউ মার্কেট থেকে ইলিশ মাছ কিনে এনেছে। এই বর্ষার দিনে জমিয়ে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়া যাবে।

ঘরের নানা টুকিটাকি কাজ সেরে, স্নান সেরে খিচুড়ি চাপাল সে। বাইরে বৃষ্টির বিরাম নেই। খিচুড়ি শেষ হলে সবে সে নুন হলুদ মাখিয়ে দুটো মাছ ভেজে তুলেছে, তার ছোট্ট ফ্ল্যাটটা মাছ ভাজার গন্ধে আমোদিত হচ্ছে, বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ এমন সময় জোর বেল বাজল। গায়ে হাউসকোট জড়িয়ে দরজাটা খুলে বেশ একটু অবাক হয়ে গেল সে। পল্লব নামের ছেলেটা এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্যোগ মাথায় নিয়েই এসেছে ছেলেটা। মাথায় চুল আর ছেঁড়া রেনকোট থেকে জল ঝরছে। রেনকোটের বুকের কাছটা আজ আরো বেশি খোলা বা ছেঁড়া। আগের দিনের মতোই রেনকোটের ভিতর তার ভিজে জামা দেখা যাচ্ছে। তাকে দেখে শ্রীপর্ণা বলল, ‘আমি তো আজ কোনও খাবারের অর্ডার দিইনি।’

পল্লব নামের কুইক বয় বলল, ‘না, ম্যাডাম, আমি আজ খাবার দিতে আসিনি। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছিলাম।’

শ্রীপর্ণা এবার খেয়াল করল ছেলেটার পিঠে এখন কুইক ফুড কোম্পানির সেই চৌকোনা ঢাউস ব্যাগটা নেই, অর্থাৎ সে খাবার দিতে বেরোয়নি। মৃদু বিস্মিত ভাবে শ্রীপর্ণা প্রশ্ন করল, ‘কী কথা বলবেন ভাই?’

তার প্রশ্ন শুনে কুইক বয় একবার মিসেস মজুমদারের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘ম্যাডাম যদি একটু ভিতরে ঢুকে কথা বলার অনুমতি দেন তবে ভালো হয়। জানি এ অনুরোধ জানানো উচিত নয়, তবে কিছুটা বাধ্য হয়েই অনুরোধ করছি।’

ছেলেটার হাবভাব দেখে শ্রপর্ণা অনুমান করল, সম্ভবত মিসেস মজুমদার যদি দরজা খুলে ঘরের বাইরে আসেন, সেই আশঙ্কাই প্রশ্ন করছে ছেলেটা।

শ্রীপর্ণা এই কুইক বয়ের মধ্যে বেচাল কিছু কোনওদিন দেখেনি। তাছাড়া ছেলেটার মুখমণ্ডলে একটা ভদ্রঘরের ছাপ আছে। শ্রীপর্ণা তাই বলল, ‘আসুন ভাই, ভিতরে আসুন।’

ভিতরে ঢোকার আগে ছেড়া রেনকোটটা গা থেকে খুলে বাইরে রাখল সে। গায়ের শার্টটা তার পুরোটাই জলে ভেজা। ভিতরে ঢোকার পর একটু জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল সে। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে একটা ফাইবার চেয়ার তার দিকে এগিয়ে দিয়ে শ্রীপর্ণা বলল, ‘বসুন।’

ইতস্তত করে কুইক বয় পল্লব চেয়ারটাতে বসল। আর একটা চেয়ার ঠেলে ছেলেটার মুখোমুখি বসে শ্রীপর্ণা জানতে চাইল, ‘বলুন কী বলবেন?’

মৃদু চুপ করে থেকে ছেলেটা বলল, ‘দু-দিন আগের ঘটনা তো আপনি নিজের চোখেই দেখলেন। আমি তো বেশ কয়েকবার আপনাকেও খাবার দিতে এসেছি। আমাকে কোনও সময় কোনও খারাপ আচরণ করতে দেখেছেন কি?’

শ্রীপর্ণা বলল, ‘না, কোনও খারাপ আচরণ আপনি আমার সঙ্গে করেননি। তবে সেদিন আপনাদের দুজনের কথাবার্তার মধ্যে আমার কথা বলা উচিত ছিল না বলে আমি কিছু বলিনি।’

ছেলেটা বলল, ‘মজুমদার ম্যাডামের স্বামী আমাদের কোম্পানিতে ফোন করে কমপ্লেন করেছেন। আমি এক ঘণ্টা দেরিতে খাবার পৌঁছেছি, এ কথাই শুধু তিনি বলেননি। তিনি আমার বিরুদ্ধে যে মূল অভিযোগ করেছেন তা হলে আমি নাকি ভদ্রমহিলার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছি, তাকে অশ্লীল গালি দিয়েছি।’—এ কথা বলে থেমে গেল ছেলেটা।’

‘তারপর?’ জানতে চাইল শ্রীপর্ণা।

ছেলেটা বলল, ‘বিশ্বাস করুন সেদিন দশ মিনিটের বেশি আমি লেট করিনি। অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবেই আমাদের কিছুটা লেট হয়। কখনও ট্রাফিক জ্যামের কারণে, কখনও আগের কাস্টমার ডেলিভারি নিতে দেরি হবার কারণে, আবার কখনও খুব ঝড়বৃষ্টি হলে। সবাই তো আর আমাদের সমস্যা বোঝেন না। একটু দেরি হলে অনেক কাস্টমার বকাঝকা করেন, কোম্পানিতে আমাদের নামে কমপ্লেন করেন, আর তার জন্য কোম্পানি থেকেও আমাদের বকুনি খেতে হয়। কিন্তু এ ব্যাপারটা অন্যরকম। ভদ্রমহিলার স্বামী কমপ্লেন করেছেন, আমি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মিসবিহেভ করেছি, তাকে অশ্লীল গালাগাল করেছি। আর এই গুরুতর অভিযোগের কারণে কোম্পানি কাল থেকে আমাকে বসিয়ে দিয়েছে।’

শ্রীপর্ণা কথাটা শুনে মৃদু বিস্মিত ভাবে বলল, ‘চাকরি চলে গেছে?’

পল্লব নামের কুইক বয় আশঙ্কিত ভাবে বলল, ‘না, এখনও যায়নি। তবে হয়তো যাবে। কোম্পানি পনেরো দিনের জন্য আমাকে বসিয়ে দিয়েছে। তারা তদন্ত করবে, তারপর আমাকে ফাইনালি জানিয়ে দেবে আমার কাজ থাকবে কিনা? তবে এসব ক্ষেত্রে দেখছি কোম্পানি কাস্টমারদের বক্তব্যকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। আর মহিলা কাস্টমাররা এ অভিযোগ জানালে কাজ যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, এর ওপর কোম্পানির গুড উইল নির্ভর করে। প্রায়সই আমাদের নানান জায়গাতে খাবার দিতে যেতে হয় যেখানে মহিলারা একা থাকেন। তাই এসব অফিযোগের ক্ষেত্রে কড়া ব্যবস্থা নেয় কোম্পানি। কুইক বয়দের বসিয়ে দেওয়া মানেই তার চাকরি আর ফেরে না।’

একটানা কথাগুলো বলে থামল ছেলেটা। বাইরের বর্ষণসিক্ত আকাশের মতোই তার মুখেও কালো মেঘের ছায়া। তা দেখে বেশ খারাপ লাগল শ্রীপর্ণার। সে বলল, ‘ঘটনাটা দুঃখজনক। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি কী করতে পারি।’

কুইক বয় বলল, ‘আমি আপনাদের ম্যানেজারকে ফোনে ধরে দিচ্ছি। আপনি শুধু ওনাকে যা দেখেছেন, শুনেছেন তাই বলবেন। ব্যস, এইটুকু বললেই হবে। হয়তো বা তা হলে আমার চাকরিটা থেকে যেতে পারে।’—একটা কাতর আবেদন ঝরে পড়ল বছর পঁচিশের ছেলের গলা থেকে।

এরপর পল্লব বলল, ‘আমি বি. কম অনার্স পাশ করেছি। পয়সার জন্য এম.কম না পড়ে এই কুইক বয়ের কাজে ঢুকেছি। বাঘাযতীনে বাড়ি। বাবার কোম্পানি অনেকদিন বন্ধ হয়ে গেছে। বুড়ো বয়সে কাজ করার ক্ষমতা তার আর নেই। তাছাড়া কেই-বা তাকে কাজ দেবে। বোনের বিয়ে হয়নি। মা অসুস্থ। তাই এ কাজে যোগ দিয়েছি। সে পুরনো বাইকটা কাজের জন্য কিনেছি তার ধার এখনও পুরো শোধ করা হয়নি। এখন কাজটা গেলে কী হবে জানি না? আমি বাড়ির ঠিকানা দিতে পারি। খোঁজ নিতে পারেন সত্যি বলছি কিনা?’

ছেলেটার কথা শুনে শ্রীপর্ণার মনে হল, ‘মিথ্যা বলছে না সে। তার প্রস্তাব নিয়ে ভাবতে ভাবতে শ্রীপর্ণা প্রশ্ন করল, ‘একটা কথা জানতে চাই। মিসেস মজুমদার হঠাৎ এতটা খেপে গেলেন কেন? আগেও কি আপনি ওনাকে দেরি করে খাবার দিয়েছিলেন? বা তাঁর সঙ্গে আপনার কোনওদিন বাদানুবাদ হয়ছিল?’

কুইক বয় বলল, ‘না, হয়নি। অনেক সময় কাস্টমাররা আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। তবুও আমরা হাসি মুখে সব সামাল দেবার চেষ্টা করি। কারণ, সেটাই আমাদের কাজের অন্যতম শর্ত। এর আগেও আমি বেশ কয়েক বার আপনার সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলাকে খাবার দিতে এসেছি, ঠিক সময়ই এসেছি। তাকে আমি কোনও বাজে কথা বলিনি। তবে…।’ কিছু একটা বলতে গিয়েও সঙ্কোচ বশে থেমে গেল ছেলেটা।

শ্রীপর্ণা বলল, ‘তবে কী?’

কুইক বয় প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মাথা নীচু করে রইল।

তা দেখে শ্রীপর্ণা বলল, ‘দেখুন ভাই, পুরো ব্যাপারটা খোলসা না করে বললে তো আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারব না।’

 ছেলেটা এবার যেন একটু নিরুপায় হয়ে বলল, ‘আমি যা বলছি তা কাউকে বলবেন না ম্যাডাম। তা হলে গণ্ডগোল বাড়বে। ব্যাপারটা আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আট দশ দিন আগে আমি দুপুরবেলা দুটো নাগাদ ভদ্রমহিলাকে খাবার দিতে এসেছিলাম। তিনি দরজা খুলতেই আমি বুঝতে পারলাম তিনি নেশা করে আছেন। আমি তার হাতে খাবারের ব্যাগটা দিতেই তিনি আমাকে বললেন, ‘এখন আমার বাড়িতে কেউ নেই। এসো ভিতরে এসো। আমি তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে চাই। তুমিই হয়তো খাবার দিতে আসবে বলে আমি খাবারের অর্ডার দিয়েছি। এমনিতে আমার খাবারের কোনও দরকার ছিল না।’

ভদ্রমহিলার ইঙ্গিত ভালো ছিল না। আমি তাই কোনও রকমে খাবারটা তাকে দিয়েই চলে যাই। কোম্পানিকে তো আর এ কথা বলা যায় না। কারণ, আমার কাছে এ ঘটনার কোনও প্রমাণ নেই। আর কোম্পানির ম্যানেজারকে তাই আমি এ-ও বলতে পারিনি যে অমুক বাড়িতে আমি খাবার পৌঁছতে পারব না। কাজেই তারপরও আমি সেদিন সন্ধ্যায় খাবার দিতে এসেছিলাম।’

মিসেস মজুমদার নিয়মিত মদ্যপান করে তা জানে শ্রীপর্ণা। সে নিজে মদ্যপান না করলেও এ ব্যাপারে তার ছুৎমার্গ নেই। কিন্তু কুইক বয় যা বলল, তা শুনে বেশ বিস্মিত হল শ্রীপর্ণা। মিসেস মজুমদারের বয়স অন্তত পয়তাল্লিশ হবে। কুইক বয় তার থেকে বয়সে কুড়ি বছরের ছোট হবে। ছেলেটার কথা শুনে শ্রীপর্ণার মনে হল না সে মিথ্যা কথা বলছে। তাই একটু ভেবে নিয়ে শ্রীপর্ণা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল সে কথা বলবে কুইক বয়ের ম্যানেজারের সঙ্গে।

পল্লব নামের কুইক বয় তার নিজের মোবাইল থেকে তাদের ম্যানেজারের লাইনটা ধরিয়ে দিল শ্রীপর্ণাকে। সে বলল, ‘আমি শ্রীপর্ণা বসু। আপনাদের কুইক বয়ের বিরুদ্ধে যিনি কমপ্লেন করেছেন আমি ঠিক তার উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। আপনাদের একজন কাস্টমারও বটে। দু’দিন আগে পুরো ঘটনাটা আমার চোখের সামনে ঘটেছে। আপনাদের কুইক বয় কোনও মিসবিহেভ করেনি মিসেস মজুমদারের সঙ্গে। বরং, তিনিই কিছুটা রুক্ষ ব্যবহার করেছেন কুইক বয়ের সঙ্গে। এই কুইক বয়ের থেকে আমিও বেশ কয়েকবার খাবার ডেলিভারি নিয়েছি।’

ওপাশ থেকে ম্যানেজার ভদ্রলোক হাই তুলে বললেন, ‘ও আপনি মজুমদার ম্যাডামের উল্টোদিকে থাকেন। আমাদের কাছে কমপ্লেনটা খুব ইনফ্লুয়েনশিয়াল জায়গা থেকে এসেছে। তা আপনি কী করেন?’

ম্যানেজার হাই তুলে এমন ঢঙে কথাগুলো বললেন, যেন তিনি শ্রীপর্ণার কথায় খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না। শ্রীপর্ণা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গলা একটু শক্ত করে বলল, ‘আমি কী করি যদিও তা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না তবু আপনি জানতে চাইছেন বলে বলছি, আমি একটা সংবাদপত্রে চাকরি করি।’

এ কথা বলার পর সংবাদপত্রের নামটাও বলল শ্রীপর্ণা।

শ্রীপর্ণাদের কাগজটা একটা নামি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্র। সবাই তার নাম জানে। সে নিজের পরিচয় দেওয়াতে কাজ হল। ম্যানেজার চমকালেন কথাটা শুনে। তিনি এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম, কী বলছেন, বলুন বলুন? আমি শুনছি আপনার কথা।’

শ্রীপর্ণা গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, ‘আমার কথা তো বললামই। কুইক বয় কোনও মিসবিহেভ করেননি মিসেস মজুমদারের সঙ্গে। অভিযোগটা মিথ্যা।’

ওপাশ থেকে ম্যানেজার বললেন, ‘আপনি যখন বলছেন তখন তাই হবে। তবে আমার অনুরোধ, এ খবর যেন খবরের কাগজে না আসে। আমি দেখছি কী করা যায়?’

শ্রীপর্ণা বলল, ‘হ্যাঁ, দেখুন। নইলে আমাকেই ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখতে হবে।’—এ কথা বলে ফোনের লাইন কেটে দিল শ্রীপর্ণা।

পল্লব বিস্মিতভাবে তাকিয়ে আছে সুপর্ণার দিকে। সুপর্ণা মোবাইলটা তার হাতে ফেরত দিতেই সে বলল, ‘ম্যাডাম আপনি সাংবাদিক।’

সুপর্ণা মৃদু হেসে বলল, ‘না ঠিক সাংবাদিক নই। সংবাদপত্রর অফিসে অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার। দিন-রাত অনেক সাংবাদিকের সঙ্গেই দেখা হয়। তবে সংবাদপত্র অফিসে কাজ করি শুনে আপনার ম্যানেজার একটু ঘাবড়ে গেছে বলেই মনে হল। দেখা যাক কী হয়?’

পল্লব নামের কুইক বয় ছেলেটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না ম্যাডাম। আমি এবার যাই। আর সময় নষ্ট করব না আপনার।’

পল্লব নামের ছেলেটা এরপর দরজা খুলে বাইরে বেরোল। একপাশে রাখা ছিল তার রেনকোটটা। সেটা তুলে নিয়ে গায়ে দিতে গিয়েই যেন রেনকোটের বুকের কাছটা আরও একটু ছিড়ে অনেক বেশি ফাঁক হয়ে গেল। সেটা শ্রীপর্ণার চোখে পড়েছে বুঝতে পেরে মৃদু লজ্জিত ভাবে বলল, ‘একটা নতুন কেনা দরকার, কিন্তু কিনতে পারছি না। এদিকে বর্ষা শেষ হতে আরও অনেক দেরি। সেদিন ছেঁড়া রেনকোট দিয়ে গায়ে জল ঢুকে যাচ্ছিল বলেই রাস্তা দশ মিনিট দাঁড়াতে হয়েছিল।’—কথাগুলো বলে সিঁড়ির দিকে এগোল কুইক বয়।

তিন

আজ শ্রীপর্ণার জন্মদিন। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে শ্রীপর্ণা। রাতে কয়েকজন বন্ধু আসবে সেলিব্রেট করতে। তাদের জন্য রাঁধতে হবে তাকে। ঘুম থেকে উঠে মোবাইলে আসা একগুচ্ছ উইশ মেসেজের জবাব দেবার পর কাছেই বাজারে গিয়ে চিকেন ইত্যাদি কিনে আনল শ্রীপর্ণা।

রান্না ইত্যাদি কাজ সারার পর তার মনে হল, লোকজন আসবে তাই ঘরটা একটু গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন। অন্তত বিছানায় একটা ভালো বেডশিট, টেবিলে একটা ভালো টেবিল কভার পাতা, এটুকু করা প্রয়োজন।

আলমারি খুলে টেবিল ক্লথ বার করতে গিয়ে হঠাৎই একটা জিনিস হাতে উঠে এল তার। এক সেট নতুন রেনকোট। ছেলেদের জামা ও পা ওয়ালা রেনকোট। বছর খানেক আগে শ্রীপর্ণাই তার বাবার জন্য রেনকোটটা কিনে এনেছিল। শ্রীপর্ণার বাবা-মা এসে সে সময় বেশ কয়েক মাস মেয়ের কাছে ছিলেন। সে সময়টাও বর্ষাকাল ছিল। বাবাকে যাতে বৃষ্টিতে ভিজে বাজারে যেতে না হয় সেজন্যই শ্রীপর্ণা রেনকোটটা কিনেছিল। কিন্তু তার বাবার লম্বা-চওড়া শরীরে রেনকোটটা মাপে একটু খাটো হওয়াতে তিনি আর ব্যবহার করেননি সেটা। নতুন অবস্থাতেই পড়ে আছে রেনকোটটা।

আলমারি থেকে রেনকোটটা বার করে হাতে নিয়ে হঠাৎই শ্রীপর্ণার মনে পড়ে গেল কুইক বয় পল্লবের ছেঁড়া রেনকোটটার কথা। শ্রীপর্ণা ভাবল, এ রেনকোটটা তো তাকে দেওয়াই যেতে পারে। ছোটখাট চেহারা ছেলেটার। নিশ্চয়ই এটা গায়ে ফিট হবে তার। জিনিস ফেলে রেখে নষ্ট করার থেকে কাউকে দিলে তা তার কাজে লাগে, উপকার হয়। ছেলেটা হয়তো বা পয়সার অভাবেই রেনকোট কিনতে পারছে না। শ্রীপর্ণা ভাবল, এরপর ছেলেটা এলে একবার রেনকোটের ব্যাপারটা সে তাকে বলে দেখবে যে ছেলেটা উপহার হিসাবে রেনকোটটা সে নিতে রাজি হয় কিনা?’

ছেলেটা দুপুরে আসার পর আরও তিন দিন কেটে গেছে। তার কাজের জায়গায় ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কী হল তা অবশ্য জানা নেই শ্রীপর্ণার। ছেলেটার কোন ফোন নম্বরও জানা নেই তার। রেনকোটের প্যাকেটটা সে বাইরে বের করে রেখে ঘর সাজাবার কাজে মন দিল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্যা নামল এক সময়। সারা দিন ধরে মাঝে মাঝে কিছুক্ষণ থামার পরই আবার বৃষ্টি শুরু হচ্ছে। তেমনই সন্ধ্যা থেকে আবারও বৃষ্টি নামল। তবে অবশ্য তাতে শ্রীপর্ণার তিন-চারজন বন্ধুর সমস্যা হবে না। একজন বন্ধু তার গাড়িতে সবাইকে আনবে। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে তৈরি হয়ে আসতে তাদের রাত আটটা বাজবে। তেমনই জানিয়েছে তারা।

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ স্নান সেরে বার্থ ডে গার্ল-এর নতুন পোশাক পরে বন্ধুদের আগমনের জন্য তৈরি হয়ে নিল শ্রীপর্ণা। এর পর সে রান্না ঘরে গিয়ে যখন অতিথি আপ্যায়নের জন্য শেষ কিছু কাজ সারছে তখন ডোর বেল বাজল।

তার বন্ধুরা কী তবে আগেই চলে এল? তাড়াতাড়ি গিয়ে সে দরজা খুলতেই দেখতে পেল কুইক বয় পল্লব এসে উপস্থিত হয়েছে। তার পরনে সেই ছেঁড়া রেনকোট, পিঠে কুইক বয়দের সেই ঢাউস ব্যাগ, আর হাতে ধরা সাদা রঙের ক্যারি ব্যাগ। জল ঝরছে তার শরীর থেকে। ভিতরের জামাটাও ভেজা। যদিও তার পিঠে কোম্পানির ব্যাগ তবুও প্রথমে তাকে দেখে কেমন যেন বিষণ্ণ বলে মনে হচ্ছে! কুইক বয় মুহূর্তের মধ্যে তার মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই ম্যাডাম। আপনার জন্যই আমার কাজটা বেঁচে গেল। ওই যে আপনি বলেছেন যে আপনি সংবাদপত্রের অফিসে চাকরি করেন, তা শুনেই ঘাবড়ে গেছে ওরা। কাল থেকে কাজে যোগ দিয়েছি আমি।’

কথাটা শুনে শ্রীপর্ণা হেসে বলল, ‘ভালো লাগল খবরটা শুনে। আপনি যে কাজে যোগ দিয়েছেন তা আপনার পিঠের ব্যাগটা দেখেই অনুমান করেছিলাম। নিন এবার আগের মতো কাজ শুরু করে দিন। এ সব নিয়ে আর ভাববেন না।’

পল্লব নামের কুইক বয় এরপর তার হাতের ক্যারি ব্যাগটা শ্রীপর্ণার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা ধরুন ম্যাডাম।’

শ্রীপর্ণা বলল, ‘কই আমি তো কোনও খাবার অর্ডার দিইনি।’

ছেলেটা মৃদু হেসে বলল, ‘অর্ডার নয় ম্যাডাম। এর মধ্যে একটা ছোট কেক আছে। এর থেকে বেশি আমার আর ক্ষমতা নেই ম্যাডাম।’

শ্রীপর্ণা বলল, ‘আপনি আমার জন্য কেক আনতে গেলেন কেন? যা উচিত মনে হয়েছে আমি তাই করেছি।’

শ্রীপর্ণার কথা শুনে কুইক বয় তাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘দয়া করে এটা নিন ম্যাডাম। আজকের দিনে কুইক বয়ের উপহার হিসাবে এটা নিন। হ্যাপি বার্থ ডে ম্যাডাম।’

বিস্মিত শ্রীপর্ণা জানতে চাইল, ‘আজ যে আমার বার্থ ডে, তা আপনি জানলেন কীভাবে?’

ছেলেটা মৃদু লজ্জিত ভাবে বলল, ‘অপরাধ নেবেন না দিদি। আপনার ফেসবুক প্রোফাইলটা সেদিন এখান থেকে কথা বলে বাড়ি ফেরার পর খুঁজে পেয়েছিলাম আমি। সেখানেই আপনার জন্মদিনের তারিখ লেখা আছে। আজ দেখলাম অনেকে উইশও করেছেন আপনাকে। একবার ভাবলাম আমিও করি। তারপর ভাবলাম এখানে এসেই চমকে দেব আপনাকে।’

ছেলেটা এই প্রথম ম্যাডামের পরিবর্তে ‘দিদি’ বলে শ্রীপর্ণাকে সম্বোধন করল।’

কুইক বয়ের থেকে কেকটা না নিলে ছেলেটা মনে দুঃখ পাবে। তাকে ফেরানো উচিত হবে না। তাই সেটা তার থেকে নিয়ে শ্রীপর্ণা বলল, ‘থ্যাঙ্কু, ভাই।’

ছেলেটা এরপর বলল, ‘আমি এবার আসি। শুভ জন্মদিন ভালো করে সেলিব্রেট করুন।’

কুইক বয় পল্লব যখন খাবার দিতে আসে, তখন প্রতিবার ফেরার সময় বলে ‘রেটিং-টা করে দেবেন ম্যাডাম।’

এ কথা মনে পড়ায় শ্রীপর্ণা তার উদ্দেশ্যে একটা মজা করে বলল, ‘কেকের জন্য রেটিং-টা কোথায় করব?’

তার প্রশ্ন শুনে ছেলেটা নির্মল হেসে বলল, ‘ভালোবাসার উপহারের কি কোনও রেটিং হয় দিদি? তাছাড়া আমি আর কোনওদিন কোনও কাস্টমারকে রেটিং দিতে বলব না।’—এ কথাগুলো বলে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল সে।

ছেলেটা চলে যাবার পর দরজা বন্ধ করে কেকের প্যাকেটটা ঘরের টেবিলে রাখার সময় হঠাৎই শ্রীপর্ণার খেয়াল হল রেনকোটটা তো তাকে দেওয়া হল না! আসলে ছেলেটা এত আকস্মিকভাবে এসে উপস্থিত হল যে রেনকোট তাকে দেবার কথা শ্রীপর্ণার মাথাতেই আসেনি। ছেলেটা আজও ভিজতে ভিজতেই এসেছিল ছেঁড়া রেনকোট পরে। সম্ভবত তাকে রেনকোটটা দিলে সে ফেরাত না। আর তার ফোন নম্বর নিয়ে রাখার কথাও শ্রীপর্ণার মনে ছিল না। যাই হোক সামনের কোনও দিন ছেলেটা এলে মনে করে তাকে রেনকোটটা দিতে হবে।—এ কথাটা ভেবে রাখল শ্রীপর্ণা। এরপর শ্রীপর্ণা কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। নির্ধারিত সময় তার বন্ধুরা এসে উপস্থিত হল। কুইক বয় পল্লবের দেওয়া কেকটাও কেটে খাওয়া হল সবাই মিলে।

চার

পরদিন অফিসে শ্রীপর্ণার খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটল। আগের দিন জন্মদিন উপলক্ষে অফিস কামাই করাতে বাড়তি কাজ জমে গেছিল। অফিস থেকে বাইরে বেরোতে সন্ধ্যাও হয়ে গেল তার। গত রাতে বন্ধুরা ফিরে যাবার পর বেশ দেরি করেই ঘুমিয়েছিল শ্রীপর্ণা। তার ওপর সারাদিন অফিসের প্রচণ্ড কাজের চাপ। এ কারণে গাড়িতে উঠে বসার পরই শ্রীপর্ণা ঘুমে তলিয়ে গেল যা অন্যদিন হয় না।

এক সময় একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল শ্রীপর্ণা। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে শ্রীপর্ণা দাঁড়িয়ে, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে কুইক বয় পল্লব। তার হাত থেকে খাবারের প্যাকেট নিয়ে শ্রীপর্ণা বলল, চিন্তা নেই, রেটিং করে দেব।’

ছেলেটা বলল, ‘না, রেটিং-এর দরকার নেই।’

শ্রীপর্ণা জানতে চাইল, ‘কেন দরকার নেই?’

এ কথার জবাব না দিয়ে হাসতে থাকল ছেলেটা। শ্রীপর্ণা যতবার তাকে এই প্রশ্ন করতে থাকল ততবারই তার কথার জবাব না দিয়ে হাসতে লাগল কুইক বয়।

আর এর পরই ড্রাইভারের ডাকে ঘুম ভেঙে সে দেখল বাড়ির কাছে পৌঁছে গেছে!

বেশ কদিন পর এদিন আর বৃষ্টি হয়নি। অদ্ভুত স্বপ্নটার কথা ভাবতে ভাবতে গাড়ি থেকে নামার পর বাড়ির পথ ধরল সে।

ঘরে ফেরার পর স্নান সেরে শ্রীপর্ণা ফ্রেশ হল ঠিকই, কিন্তু তার ক্লান্তিভাব দূর হল না। ফ্রিজে যা আছে তা খেতে ইচ্ছা হল না তার। আর এই ক্লান্ত দেহে নতুন কিছু রান্না করার ইচ্ছাও হল না শ্রীপর্ণার। সে ভাবল কুইক ফুড থেকে একটা ভেজ বা চিকেন বিরিয়ানির অর্ডার করলেই সব ঝামেলা মিটে যায়। তাছাড়া পল্লব যদি খাবারটা দিতে আসে তবে রেনকোটটাও তাকে দিয়ে দেওয়া যাবে। সামনেই সেটা রাখা আছে। এ কথা ভেবে মোবাইলে শ্রীপর্ণা কুইক ফুডে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিল।

খাবার অর্ডার দিয়ে সোফায় শুয়ে একটু চোখ বুজে গেছিল তার। আধ ঘণ্টা পর কলিং বেলের শব্দে উঠে পড়ল সে। কুইক ফুড থেকে কুইক বয় এসেছে বিরিয়ানি নিয়ে। যদি পল্লব এসে থাকে তবে তাকে দেবে বলে রেনকোটের প্যাকেটটা হাতে নিয়েই শ্রীপর্ণা দরজা খুলল।

না। পল্লব নয়, অন্য একজন কুইক বয় খাবারের প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

শ্রীপর্ণার হাতে খাবারের প্যাকেটটা তুলে দিল সে। শ্রীপর্ণা সেটা নতুন ছেলেটার হাত থেকে নিয়ে বলল, পল্লব নামের যে কুইক বয় আছে, তার ফোন নাম্বারটা আপনার কাছে আছে?’

পল্লবের নামটা শুনেই মৃদু বিস্মিতভাবে এই নতুন কুইক বয় বলল, ‘হ্যাঁ, আছে। কিন্তু কেন বলুন তো?’

শ্রীপর্ণা বলল, ‘ওর সঙ্গে আমার একটা দরকার ছিল। এদিকে কোথাও খাবার দিতে এলে তাকে আমার সঙ্গে দেখা করে যেতে বলতাম।’

শ্রীপর্ণার কথা শুনে কুইক বয় বলল, ‘সে আর খাবার পৌঁছতে আসবে না ম্যাডাম।’

কথাটা শুনে শ্রীপর্ণা বলে উঠল, ‘খাবার পৌঁছতে আসবে না কেন? সে যে আমাকে বলে গেল তার কাজের জায়গাতে সব ঝামেলা মিটে গেছে, সে আবার কাজের জায়গাতে যোগ দিয়েছে?’

কুইক বয় বলল, ‘হ্যাঁ, সে আপনাকে ঠিকই বলেছিল।’

শ্রীপর্ণা বলল, ‘তবে সে আসবে না কেন?’

কুইক বয় কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, ‘গতকাল দুপুরে একটা খাবারের অর্ডার এসেছিল। খাবার দেবার জন্য বেরিয়ে ছিল সে। পার্টি বার বার করে ফোন করে খাবারের জন্য তাড়া দিচ্ছিল। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল সে সময়। সদ্য সে গন্ডগোল থেকে মুক্ত হয়েছিল। ঠিক সময় খাবার পৌঁছে দিতে না পারলে যদি আবার কাস্টমার কমপ্লেন করে বসে সে জন্য বৃষ্টির মধ্যেই বাইক নিয়ে খাবার ডেলিভারি দিতে রওনা হয়েছিল পল্লব। হয়তো বা জোরেই বাইক চালাচ্ছিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাবার ডেলিভারির দেবার জন্য। ভেজা রাস্তাতে সম্ভবত বাইকের চাকা পিছলে গেছিল তার। তারপর সে উল্টো দিক থেকে আসা একটা বাসের তলায় ঢুকে গেছিল। একেবারে স্পট ডেড।’

বিষণ্ণভাবে কথাগুলো বলে থামল ছেলেটা।

কুইক বয়ের কথা শুনে হতভম্ব শ্রীপর্ণা বলে উঠল, ‘ঘটনাটা ঠিক দুপুরে হয়েছিল, নাকি রাতে?’

ছেলেটা জবাব দিল, ‘দুপুরেই ম্যাডাম। যে কারণে তারপর সারা দিন আমাদের খাবার ডেলিভারি দেওয়া বন্ধ ছিল। শ্মশানের কাজ মিটতে আমাদের ভোর হয়ে গেল।’

এ কথা বলার পর নতুন কুইক বয় অভ্যস্ত স্বরে যাবার আগে বলে গেল, ‘গুড নাইট ম্যাডাম। কাইন্ডলি রেটিং-টা একটু করে দেবেন।’

কুইক ফুডের প্যাকেটটা নিয়ে শ্রীপর্ণা বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কুইক বয় পল্লবের হাসি মুখ। কানে বাজতে লাগল তার বলে যাওয়া শেষ কথাগুলো—’ভালোবাসার উপহারের কি কোনও রেটিং হয় দিদি? তাছাড়া আমি আর কোনও দিন কোনও কাস্টমারকে রেটিং দিতে বলব না।’

শ্রীপর্ণার বুকের মধ্যে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা যেন মোচড় দিয়ে উঠল, সেই কুইক বয়ের জন্য। খাবারের প্যাকেটটা খসে পড়ল তার হাত থেকে।