Accessibility Tools

সাদা বিড়াল – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

উকিলবাবু – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

উকিলবাবু

এক

কলকাতা থেকে দূরবর্তী এই জেলাতে বলাই ঘোষালকে উকিল হিসেবে সবাই একডাকে চেনে। এদিনও শেষ পর্যন্ত জেলা আদালতে সরকারি পক্ষের উকিলকে কথার মারপ্যাঁচে নাস্তানাবুদ করে পাঁচজন আসামিকে বেকসুর খালাস করে দিলেন প্রবীণ আইনজীবী বলাই ঘোষাল।

এক ভয়ঙ্কর মারদাঙ্গার ঘটনায় ফৌজদারি মামলা চলছিল বলাইবাবুর মক্কেল ওই লোকগুলোর বিরুদ্ধে। মামলা শেষ হতে বিকেল গড়িয়ে গেল, তারপর আনুষঙ্গিক কাগজপত্রের কিছু কাজ মিটিয়ে কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে আদালত চত্বরে নিজের ঘরে গিয়ে বলাইবাবু যখন বসলেন তখন বেলা পাঁচটা। প্রায় ঘণ্টা তিনেক টানা সওয়াল করেছেন তিনি। তার উপর নিজের গ্রামে ফেরার জন্য বেশ অনেকটা রাস্তাই তাকে গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে। তার আগে সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বলাইবাবু নিজের চেম্বারে এসে বসলেন। অন্যবার হলে এইদিন কোর্টে বলাইবাবু আসতেন না। আজ কৌশিকী অমাবস্যা। বলাইবাবুর বাড়িতে কালীপুজো হয় এইদিন। নেহাত জরুরি মামলা পড়ে গিয়েছিল বলে তাকে কোর্টে আসতে হয়েছিল।

কোর্টরুমে আইনজীবী অর্থাৎ উকিলদের মধ্যে নিজেদের মক্কেলদের স্বার্থ রক্ষার যতই ঝগড়া বা বাকবিতণ্ডা হোক না কেন আদালতের বাইরে তারা অনেকেই পরস্পরের বন্ধু হন, সহকর্মী হন। তাই বলাইবাবু নিজের ঘরে প্রবেশ করার পর তাঁকে অভিনন্দন জানাতে তাঁর ঘরে এসে উপস্থিত হলেন সরকারি উকিল বা পাবলিক প্রসিকিউটর অভয় মিত্র। বিপক্ষের আইনজীবীকে তিনি অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, ‘আমি তো ভাবলাম নির্ঘাত জেল হবে আসামিদের। আর আপনি ওদের বেকসুর খালাস করিয়ে মামলা জিতে গেলেন।’

বলাইবাবু প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আপনিও বেশ সওয়াল করেছিলেন, নইলে মামলা এত দিন গড়াতই না। তাই আপনাকে অভিনন্দন।’

সরকারি আইনজীবী এরপর বললেন, ‘সেই যে আপনি কৃষ্ণপদ নামের লোকটাকে নিশ্চিত ফাঁসির থেকে বেকসুর খালাস করেছিলেন, তারপর থেকে আপনি যে এ জেলার সেরা ক্রিমিনাল লইয়ার তা সবাই স্বীকার করে। তাই আপনার কাছে মামলা হারলে আমার ইজ্জত নষ্ট হয় না। লোকে বলে স্বয়ং ভগবানের সঙ্গে ওকালতি করে আপনি মামলা জিততে পারেন।’

অভয় মিত্রের কথা শুনে স্মিত হাসলেন বলাই ঘোষাল। সরকারি কৌসুলি অতিরঞ্জিত করে কিছু বলেননি। হ্যাঁ, স্টেট ভার্সাস কৃষ্ণপদ বিশ্বাসের ওই মামলাটাই বলাইবাবুর খ্যাতি অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিল। যা সেই ঘটনার একযুগ পরেও অক্ষুন্ন রয়েছে। বেশ চমকপ্রদ ছিল সেই মামলা। সেই সময় আসামি কৃষ্ণপদ বিশ্বাসের বয়স ছিল চল্লিশ বছর। পেশায় ধীবর ছিল সে চোরা বাওড়ে।

‘চোরা বাওড়’ একটা বিরাট জলাশয়। তার পাড়ের একটা অংশ বেশ কর্দমাক্ত। সেই কাদার কিছু স্থানে পা দিলে নাকি চোরাবালির মতো তার নীচে মানুষ তলিয়ে যায়। তাই ওই বাওড় বা জলাশয়ের নাম ‘চোরা বাওড়’।

কৃষ্ণপদর মামলা হাতে নেওয়ার আগে বলাইবাবু তাকে না চিনলেও ঘটনাচক্রে ওই চোরা বাওড় বলাইবাবুর গ্রামের একদম পাশেই। যাই হোক, সেই মামলায় আসল বিষয় ছিল যে, আসামি কৃষ্ণপদ বিশ্বাস তার এক সহযোগী পরান মণ্ডলকে নিয়ে এক সন্ধ্যায় ডিঙি নিয়ে বাওড়ের জলে মাছ ধরতে যায়। তার পরের দিন থেকে পরান মণ্ডল নিখোঁজ হয়ে যায়। এ ঘটনার অনেকদিন আগে মাছের ভাগকে কেন্দ্র করে বচসা হয়েছিল দুই জেলের মধ্যে। যদিও পরে তা নাকি উপরে উপরে মিটেও যায়। কিন্তু পরান মণ্ডলের নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্ত্রী পুলিশের কাছে অভিযোগ জানায় তাঁর স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার পিছনে কৃষ্ণপদর-ই হাত আছে।

পরান মণ্ডলের স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্তে নামে এবং কৃষ্ণপদর বাড়ি থেকে পরান মণ্ডলের জামা ও একটা রক্তমাখা কোঁচ বা মাছ মারা বর্শা উদ্ধার করে। যদিও পুলিশ পরান মণ্ডলের দেহ উদ্ধার করতে পারেনি, তবুও তারা এই মর্মে মামলা সাজিয়ে দিল যে কৃষ্ণপদ মাছ ধরার কোঁচের সাহায্যে পরানকে নৃশংসভাবে খুন করে বিশাল বাওড়ের পাঁকের মধ্যে কোনও অজ্ঞাত স্থানে পুঁতে দিয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষাতেও প্রমাণিত হয়েছিল সে কোঁচ আর জামায় যে রক্ত লেগেছিল তা পরান মণ্ডলেরই। কৃষ্ণপদ আদালতে দাঁড়িয়ে বারবার যে কিছু জানে না বললেও সরকার পক্ষ তার বিরুদ্ধে এমন সুনিপুণভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ সাজায়, তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এমন বিবরণ আদালতের সামনে হাজির করেছিল যে মহকুমা আদালত কৃষ্ণপদকে দোষী সাব্যস্ত করে। এই হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত, বিরলতম, নৃশংস হত্যাকাণ্ড আখ্যা দিয়ে আদালত কৃষ্ণপদকে ফাঁসির সাজা শুনিয়ে দেয়।

কৃষ্ণপদ এই রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজের কোর্টে আবেদন করে। সেখানেও নিশ্চিত একই শাস্তি বহাল থাকত কৃষ্ণপদর জন্য, যদি না তার হয়ে সওয়াল করতে নামতেন বলাইবাবু। সরকারি উকিলদের যুক্তিজালকে নিজের যুক্তিবাণে তীক্ষ্নভাবে ছিন্ন করে শেষপর্যন্ত কৃষ্ণপদকে বেকসুর খালাস করিয়ে দেন বলাইবাবু। আর তারপর থেকেই উকিল হিসেবে বলাইবাবুর নাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তারপর থেকে এ যাবৎকাল কত মানুষকে যে নিশ্চিত শাস্তির মুখ থেকে বাঁচিছেন তার হিসাব নেই।

হয়তো ঔচিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কেউ বলতেই পারেন যে অপরাধীকে রক্ষা করা কি উচিত? কিন্তু ডাক্তারের যেমন রোগীর জাত দেখলে চলে না, তেমনই উকিলেরও এসব দেখলে চলে না। কারণ মক্কেল অপরাধী হোক বা না হোক, তার স্বার্থরক্ষাই আইনজীবীদের পেশা। মক্কেলের উপর নির্ভর করেই আইনজীবীদের অন্নসংস্থান হয়।

ধন্যবাদ দিতে আসা সরকারি উকিলের কথা শুনে বলাইবাবুর মনে পড়ে গেল কৃষ্ণপদ এ রাতে আসবে। এইদিন প্রতিবার সে যেমন আসে।

দুই

বলাইবাবুকে ধন্যবাদ জানিয়ে কিছু কথাবার্তা বলে অভয় মিত্র চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই চেম্বার তালা বন্ধ করে নিজের পুরোনো অ্যাম্বাসাডর নিয়ে বলাইবাবু বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হয়ে গেলেন।

জেলা সদর থেকে নিজের গ্রামের বাড়িতে গাড়ি ড্রাইভ করে পৌঁছতে ঘণ্টা দেড়েক মতো সময় লাগে বলাইবাবুর। গাড়ি চালাতে চালাতে বলাইবাবু ভাবলেন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে, প্রয়োজনে পুজোর জোগাড়যন্তরের কাজে হাত লাগিয়ে রাত ন’টা নাগাদ তিনি বাওড়ের পাড়ে যাবেন কৃষ্ণপদর সঙ্গে দেখা করতে। কাজ মিটিয়ে তিনি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসতে পারবেন। ঠাকুরমশাই বলেছেন মধ্যরাতে তিনি পুজোয় বসবেন, কাজেই কোনও অসুবিধে হবে না।

বলাইবাবু বারো বছর পরেও কেন অন্ধকার রাতে বাওড়ের পাড়ে একদা এক খুনের আসামির সঙ্গে দেখা করতে যান বা মুক্তিপ্রাপ্ত সেই আসামিই বা কেন বলাইবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে, এ ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত মনে হলেও নির্দিষ্ট কারণ আছে এর পিছনে।

কৃষ্ণপদর মামলা হাতে নেওয়ার আগে তার সঙ্গে উকিল বলাই ঘোষালের কোনওদিন দেখা হয়নি। বিশাল চোরা বাওড়ের একপাশে বলাইবাবুদের গ্রাম আর অন্যপাড়ের জেলে পাড়ায় কৃষ্ণপদর বাড়ি। তাছাড়া বলাইবাবু ছিলেন শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান আর কৃষ্ণপদ নিরক্ষর জেলে। বলাইবাবু যৌবনে ওকালতি পাশ করার পরই তাঁর গ্রামের বাড়ি ছেড়ে পেশার সুবিধার্থে বসবাস শুরু করেন জেলা সদরে। কাজেই তাদের দুজনের মধ্যে সাক্ষাতের সুযোগ এই মামলার পূর্বে ঘটেনি।

বলাইবাবু প্রথম কৃষ্ণপদ বিশ্বাসকে দেখেন জেলা কোর্টের লকআপে। তিনি জানতে পেরেছিলেন মহকুমা আদালতের ফাঁসির আসামিকে জেলা জজের আদালতে হাজির করার জন্য আনা হয়েছে। তাই কৌতুহলবশত সেই আসামিকে দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কালো কোট পরা বলাইবাবু কোর্ট লকআপে উপস্থিত হতেই সেই আসামি কৃষ্ণপদ বিশ্বাস বলাইবাবুর পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলেছিল, ‘বাবু, আপনি আমাকে বাঁচান। আমি গরিব, মূর্খ মানুষ। সত্যি বলছি আমি খুন করিনি। পরান মণ্ডলের ব্যাপারে বিশ্বাস করুন আমি সত্যিই কিছু জানি না, কেউ আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। দোহাই বাবু, আমাকে রক্ষা করুন। আমার ঘরে বউ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আছে। আমার ফাঁসি হলে ওদের কী হবে বাবু? দোহাই আমাকে আপনি বাঁচান!’

বলাই ঘোষালের পা ধরে ‘আমি খুন করিনি, আমাকে বাঁচান’ বলেই কেঁদেই চলেছিল কৃষ্ণপদ। কিছুতেই সে পা ছাড়ে না। তাকে দেখে আর তার কথা শুনে হঠাৎ-ই উকিল বলাইবাবুর কেন যেন মনে হয়েছিল লোকটা সত্যি কথা বলছে। খুন সে করেনি। আইনের মারপ্যাঁচে সে ফেঁসে গিয়েছে। অনেকসময় নিরপরাধ লোক যেমন ফেঁসে যায়। বলাইবাবু জানতে পেরেছিলেন জেলা আদালতে কোনও উকিলই এই আসামির হয়ে সওয়াল করতে রাজি হচ্ছেন না। কারণ হল, গরিব মানুষ কৃষ্ণপদর উকিলের ফি দেওয়ার সার্মথ্য ছিল না। আর সবথেকে বড় কথা হল, সরকারপক্ষ যেভাবে মামলা সাজিয়েছিল তা থেকে আসামিকে রক্ষা করা একপ্রকার অসম্ভব বলেই মনে করেছিলেন জেলা আদালতের উকিলবাবুরা। তাই সবদিক বিচার বিবেচনা করে কৃষ্ণপদর কাতর আবেদনে সাড়া দিয়ে বলাইবাবু শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন এ মামলা তিনি লড়বেন, এবং তা লড়বেন বিনা পারিশ্রমিকেই।

এরপরের ঘটনা অবশ্য ইতিহাস হয়ে রয়েছে জেলা জজের আদালতে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ফাঁসির আসামি কৃষ্ণপদকে বেকসুর খালাস করতে সক্ষম হন বলাইবাবু। সে দিনটার কথা আজও মনে আছে বলাইবাবুর। জজ সাহেব যখন কৃষ্ণপদকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে বেকসুর খালাসের রায় দান করলেন তখন কৃষ্ণপদর মুখমণ্ডলে জীবনের কী উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছিল! যদিও ঠিক সেইসময় আদালতে উপস্থিত পরান মণ্ডলের স্ত্রী, কৃষ্ণপদর উদ্দেশে প্রচণ্ড রাগে বলে উঠেছিল, ‘আজ তুই এই আদালতে উকিলবাবুর জন্য বেঁচে গেলি। কিন্তু ভগবানের আদালতে একদিন তোর বিচার হবে। সেদিন তোকে কে বাঁচায় দেখব?’—একথা পরান মণ্ডলের স্ত্রী বললেও তাতে কারও কিছু যায় আসেনি। কারণ, জেলা জজ খালাস করে দেওয়ার হুকুম দিয়েছিল কৃষ্ণপদকে।

ফাঁসির সাজা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে কৃষ্ণপদ বলাইবাবুকে প্রণাম করে বলেছিল, ‘আপনি আমার প্রাণরক্ষা করলেন উকিলবাবু। কিন্তু তার বদলে আপনাকে কী দিই বলুন তো? আমি গরিব মানুষ। আপনাকে দেওয়ার মতো টাকা পয়সা আমার নেই, কিন্তু আপনাকে কিছু দেওয়ার বড় সাধ জেগেছে মনে।’

কদিন পরেই ছিল কৌশিকী অমাবস্যা। কৃষ্ণপদর কথা শুনে হঠাৎ-ই একটা কথা মনে পড়ে গিয়েছিল বলাইবাবুর। তাই তিনি কৃষ্ণপদকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো জেলে? মাছ ধরো? কৌশিকী অমাবস্যায় তুমি আমাকে একটা শোলমাছ দিতে পারবে? যা পয়সা লাগবে আমি দেব। আসলে প্রতিবছর কৌশিকী অমাবস্যার দিন কালীপুজো হয় আমাদের বাড়িতে। দেবীকে জ্যান্ত শোলমাছ উৎসর্গ করা আমাদের বাড়ির প্রাচীন প্রথা। স্থানীয় বাজারে শোলমাছ না উঠলে বড় মুশকিলে পড়তে হয় তখন।’

একথা শুনে কৃষ্ণপদ বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই দেব উকিলবাবু। বাওড়ে বিরাট বিরাট সব শোলমাছ আছে। শুধু সামনের কৌশিকী অমাবস্যায় কেন, প্রতিবছর কৌশিকী অমাবস্যার রাতে আমি আপনার জন্যে শোলমাছ নিয়ে আসব। পয়সা নেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই বাবু। আপনি আমার জীবনরক্ষা করেছেন। আর আপনার মায়ের পুজোর জন্য বছরে আমি আপনাকে একটা শোলমাছ দিতে পারব না বাবু?’

আর এরপর থেকেই গত বারো বছর ধরে চোর বাওড়ের পাড়ে শোলমাছ নিয়ে রাতের বেলায় হাজির হয় কৃষ্ণপদ। আর বলাইবাবু গিয়ে তার কাছ থেকে পুজোর জন্য মাছ নিয়ে আসেন।

কৃষ্ণপদর সঙ্গে বছরে এই একবারই দেখা হয় বলাইবাবুর। কিছুক্ষণ তাদের দুজনের মধ্যে কথাবার্তা, কুশল সংবাদ বিনিময় হয়। তারপর বলাইবাবুকে মাছ দিয়ে ফিরে যায় কৃষ্ণপদ। বলাইবাবু কৃষ্ণপদর মুখে যতটুকু জেনেছেন তাতে কয়েক বছর জেলে কাটিয়ে ফাঁসির সাজা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে আগের জীবিকাতেই ফিরে গিয়েছে সে। অর্থাৎ বাওড় থেকে মাছ ধরে সে বিক্রি করে। বাড়ি ফেরার পথে কৃষ্ণপদর কথা মনে করতে করতে বলাইবাবুর মনে পড়ল গতবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পর তিনি তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি আছ কেমন?’

জবাবে কৃষ্ণপদ বলেছিল, ‘গরিবরা যেমন ভালো থাকে তেমন ভালো আছি। বাওড়ের মাছ ধরে সংসারটা চলে যাচ্ছে। তবে আপনাকে একটা কথা জানাই। পরান মণ্ডলের বউটা পাগল হয়ে গেছে। আমাকে দেখলেই সে খালি বলে, ‘ভগবানের আদালতে তোর বিচার হবে। তখন তোকে কে বাঁচাবে শুনি? ওই বলাই উকিল? সে কি তোর সঙ্গে যাবে?’ আমার কথাগুলো শুনে কেমন যেন ভয় ভয় লাগে!’

বলাইবাবু একথা শুনে হেসে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, একথা বউটা আদালতে বলেছিল বটে। তবে খুন তো তুমি করোনি? উপরওয়ালার দরবারে যদি তোমার বিচারও হয় তবে তোমার ভয় কী? এসব ব্যাপার নিয়ে মনখারাপ করবে না। একদম পাত্তা দেবে না এসব কথায়।’

বলাইবাবুর কথা শুনে কৃষ্ণপদ বলেছিল, ‘ঠিক বলেছেন, এসব কথায় কান না দেওয়াই ভালো। তবে লোকে বলাবলি করে ভগবানের আদালতেও ওকালতি করে মামলা জিততে পারেন, এত বড় উকিলবাবু আপনি!’

কৃষ্ণপদর কথা, তার মামলার কথা, আরও নানা কথা ভাবতে ভাবতে গাড়ি চালিয়ে সন্ধ্যার কিছু সময় পর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে গেলেন বলাইবাবু।

তিন

ঠাকুরদার আমলের বিশাল বাড়ি বলাইবাবুদের। বলাইবাবুর পরিবার জেলা সদরে থাকলেও তাঁর জ্ঞাতি ভাইরা থাকেন এখানে। প্রাচীন পুজোটার আয়োজক তারাই। বলাইবাবু অবশ্য বেশ কিছু টাকা দেন এই পুজোর জন্য। আর হ্যাঁ, দেবীকে উৎসর্গ করার জন্য শোল মাছটা তিনি জোগাড় করে থাকেন।

বলাইবাবু বাড়িতে উপস্থিত হয়ে দেখলেন প্রতিবারের মতো এবারও পুজোর সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। বড় বড় আলো লাগানো হয়েছে, ঢাক বাজছে, শামিয়ানার নীচে স্থাপন করা হয়েছে দেবী প্রতিমা। তার সামনে সাজানো হয়েছে পুজোর নানান উপচার। সেখানে পৌঁছে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা সময় বলাইবাবুর গল্পগুজব করেই কেটে গেল। তারপর রাত ন’টা নাগাদ বাড়ি থেকে শোলমাছ আনার জন্য রওনা দিল বলাইবাবু।

গ্রামের সীমানার ওপাশে চোরা বাওড়ের দূরত্ব বলাইবাবুর বাড়ি থেকে দু-মাইল মতো। চেনা রাস্তা। অমাবস্যার রাত্রি হলেও তাই পথ চলতে বিশেষ সমস্যা নেই বলাইবাবুর। তবে রাত একটু বেড়েছে বলে পথেঘাটে লোকজন নেই। তবে চোর-ডাকাতের ভয় বলাইবাবুর নেই। এ তল্লাটে বলাইবাবুকে সবাই চেনে। আর তিনি উকিল বলে চোর-ডাকাত তাকে চট করে ঘাঁটাবে না, এও তিনি বেশ ভালোমতোই জানেন। তাই অমাবস্যার নির্জন রাত হলেও বেশ শান্তভাবেই হাঁটছিলেন বলাইবাবু।

হাঁটতে হাঁটতে তিনি গ্রামের সীমানায় যখন পৌঁছে গিয়েছেন তখন হঠাৎই পিছনে পায়ের শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখলেন তাঁর কয়েক পা তফাতেই আরও একজন লোক আসছে। আধো অন্ধকারে লোকটাকে দেখে বলাইবাবু তাকে গ্রামের লোক বলেই মনে হল। লোকটার পরনে লুঙ্গি, খালি গা, খালি পা। সম্ভবত মাঝবয়সি। বলাইবাবু লোকটাকে দেখে পাত্তা দিলেন না, নিজের মনেই হাঁটতে লাগলেন।

লোকটা হাঁটতে হাঁটতে বলাইবাবুর উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ‘বাবু, আপনি তো বলাই উকিল, তাই না?’

বলাইবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ। কেন বলো তো?’

লোকটা চলতে চলতে বলল, ‘আপনার অনেক নাম শুনেছি।’

গাঁয়ের অনেক লোকই বলাইবাবুকে চেনেন। এ লোকটাও হয়তো কোনওভাবে অনুমান করেছে তাঁর পরিচয়। এ কথা ভেবে তিনি নিজের মতো হাঁটতে লাগলেন।

আরও বেশ কিছুটা এগোনোর পর লোকটা বলল, ‘কৃষ্ণপদ বিশ্বাসের মামলায় কিন্তু খুব লড়েছিলেন আপনি। আপনার জন্যেই সে ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে গেল!’

এবার বলাইবাবু চলতে চলতে লোকটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি ওই ঘটনার কথা জানলে কী ভাবে?’

লোকটার কোমরে লুঙ্গির উপর একটা গামছাও বাঁধা ছিল। কোমর থেকে গামছাটা খুলে নিয়ে মাথায় বাঁধতে বাঁধতে লোকটা বলল, ‘তা আর জানব না? আমি কেন, আশেপাশের সব গাঁয়ের লোক জানে আপনি কৃষ্ণপদকে কীভাবে বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু একজন খুনিকে বাঁচানো কি ঠিক কাজ বাবু?’

বলাইবাবু এবার বেশ অসন্তুষ্ট হলেন তার কথায়। বলাইবাবুকে এ তল্লাটে সবাই বেশ সমীহ করে চলে। তাঁর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথা বলার সাহস পায় না। লোকটা যে শুধু গায়ে পড়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলছে তাই নয়, আবার জ্ঞান দিতেও শুরু করেছে!

লোকটার প্রশ্নের জবাবে বলাই ঘোষাল বেশ অসন্তোষের ভঙ্গিতে বললেন, ‘সে যে খুনি ছিল তা তুমি জানলে কীভাবে? আর কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সে ব্যাপারে তোমাকেই বা বলতে যাব কেন? আর তা জেনে তোমারই বা কী দরকার?’

বলাইবাবুর ধমক খেয়ে চুপ করে গেল লোকটা। চুপচাপ সে বলাইবাবুর সঙ্গে চলতে লাগল।

একসময় গ্রামের বাইরে পৌঁছে গেলেন বলাইবাবু। তার সামনে একখানি লম্বা জমি আর তারপরই শুরু হয়েছে সেই বিশাল জলা। জমিটা অতিক্রম করে বাওড়ের দিকে এগোতে যাবেন বলাইবাবু, ঠিক সেই সময় লোকটা শেষ প্রশ্নটা করল, ‘লোকে বলে, ভগবানের আদালতেও মামলা লড়লে আপনি সে মামলা জিতবেন। এ কথাটা কি সত্যি?

বলাই উকিল গম্ভীরভাবে বললেন, ‘হয়তো তাই। এবার তোমার কোথাও কাজ থাকলে সেখানে যাও। আমি এখন একটা কাজে যাচ্ছি। তোমার আমার কাছে কোনও প্রয়োজন থাকলে কাল সকালে আমার বাড়িতে এসো।’

বলাইবাবুর কথা শুনে অন্ধকারেই যেন অস্পষ্টভাবে হাসল লোকটা। তারপর বলল, ‘ওই চোরা জলা জায়গাটা কিন্তু ভালো নয় বাবু।’

এ কথার প্রত্যুত্তরে বলাইবাবু লোকটাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু লোকটা কথাটা বলেই হাঁটতে শুরু করল অন্যদিকে।

লোকটা অবশ্য কথাটা খুব একটা খারাপ বলেনি। চোরা বাওড়ের নানা বদনাম আছে, বলাইবাবুও তা জানেন, ছোটবেলা থেকে এই বাওড় সম্বন্ধে শুনে এসেছেন নানারকম কথা! কৃষ্ণপদ একবার তাঁকে বলেওছিল যে, ‘আপনার বাওড়ে আসার দরকার নেই বাবু। আমি আপনার বাড়িতে মাছ দিয়ে আসব।’

কিন্তু তার কথায় বলাইবাবু রাজি হননি। কারণ, হাজার হোক খুনের মামলায় কৃষ্ণপদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল, মামলা চলাকালীন বেশ কয়েক বছর সে জেলেও ছিল। গ্রামাঞ্চলে নানা সংস্কার থাকে, ভাবনা থাকে। কৃষ্ণপদ বাড়িতে মাছ দিতে গেলে তার উপস্থিতি বাড়ির লোকের অসন্তোষ বা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

তাই চোরা বাওড়ে এসে তার থেকে মাছ নিয়ে যাওয়াই ভালো মনে করেন বলাইবাবু। তাঁর নিজের ভূত-প্রেতে কোনওরকম ভয় নেই, চোর-ডাকাতেরও ভয় নেই। কাজেই প্রতিবছর অমাবস্যার রাত্রে বাওড়ে এসে মাছ নিয়ে যেতে কোনওদিন বলাইবাবুর অসুবিধা হয়নি।

চার

বলাইবাবু এসে দাঁড়ালেন চোরা বাওড়ের ধারে। জলাশয়ের পাড়ে বেশ কিছুটা জমি কর্দমাক্ত, পাঁকে ভরা। তারপর বাওড়ের জল শুরু হয়েছে। অমাবস্যার রাত হলেও একটা আবছা আলো ছড়িয়ে আছে জলার উপর। বাওড়কে ঘিরে যে কর্দমাক্ত জমি তার স্থানে স্থানে মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত আলো দপদপ করে উঠছে। লোকে যাকে ‘আলেয়া’ বলে, ভূত বা ভৌতিক আলো মনে করে। বলাইবাবু অবশ্য জানেন যে, ওই আলো আসলে জলাভূমির পচা মাটি পাতা থেকে উত্থিত একধরনের গ্যাসের আলো। তবে যাই হোক না কেন, চোরা বাওড়ের পরিবেশের মধ্যে যে একটা ভৌতিক ভাব আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বাওড়ের ধারে কাদা জমির মধ্যে বেশ কয়েকটা গাছও আছে। তারা যেন ঠিক মানুষের অবয়ব নিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে!

বাওড়ের গায়ে কাদা জমি যেখানে শুরু হয়েছে ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে বলাইবাবু ভালো করে জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে বাওড়ের জলে একটা সালতি বা ছোট মাছ ধরার নৌকা দেখতে পেলেন। কৃষ্ণপদর সালতি। অর্থাৎ সে এসে গিয়েছে। তারপরই জলার পাড় ধরে একটা ছায়ামূর্তিকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন বলাইবাবু।

কৃষ্ণপদ এসে দাঁড়াল বলাইবাবুর সামনে। হাঁপাচ্ছে কৃষ্ণপদ। বলাইবাবু তার নিঃশ্বাসের শব্দ টের পেলেন। কিন্তু কৃষ্ণপদর হাতে মাছ নেই। হাঁপাতে হাঁপাতেই সে হাত জোড় করে বলাইবাবুকে মাথা ঝাঁকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘কেমন আছেন উকিলবাবু? বাড়ির সবাই ভালো তো?’

বলাইবাবু হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ ভালো। তুমি কেমন আছ?’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘আমার খবর ভালো নয়। বড় ব্যামো হয়েছে বুকে। চলতে ফিরতে গেলে হাঁপ ধরছে। সেবার আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার মনে হয় আর বাঁচব না। ডাক্তারবাবু মোটামুটি তেমনই বলে দিয়েছেন। এবারই হয়তো শেষ মাছ দিতে আসা।’

কৃষ্ণপদর কথা শুনে মন খারাপ লাগল বলাইবাবুর। তিনি সান্ত্বনার সুরে বললেন, ‘বড় ডাক্তার দেখালে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। তেমন হলে আমি কোনও বড় ডাক্তারকে বলব। বিনা পয়সায় তোমার চিকিৎসা করে দেবেন।’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘আমার মন বলছে ওসব করে আর লাভ নেই। আমার ডাক এসে গেছে উপর থেকে। এবার পাঁচ কেজি ওজনের একটা বড় শোলমাছ পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু সেটাকে এ পর্যন্ত বয়ে আনার সামর্থ্য হল না, এমনই আমার শরীরের অবস্থা।’

একথা বলার পর হাঁপাতে হাঁপাতে কৃষ্ণপদ কিছুটা দূরে জলার মধ্যে কাদা জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাছ দেখিয়ে বলল, ‘আজ আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে বাবু। মাছটা ওখানে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আমার এখান অবধি বয়ে আনার ক্ষমতা নেই। আপনি বরং আমার সঙ্গে সঙ্গে সাবধানে আসুন। মাছটা আপনাকে দিয়ে আমি সালতি নিয়ে কোনওরকমে বাড়ি ফিরে যাব।’

কৃষ্ণপদর শরীরের অবস্থা দেখে বলাইবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে চলো।’ একথা বলে তিনি বাওড়ের কাদা জমির পাড়ে চটি খুলে, ধুতিটা গুটিয়ে নিয়ে কাদায় নেমে পড়লেন।

কৃষ্ণপদর পিছন পিছন কাদা ভেঙে সেই গাছটার দিকে এগোলেন তিনি। প্যাচপ্যাচে নরম কাদায় বলাইবাবুর গোড়ালির উপরের বেশ খানিকটা অংশ পর্যন্ত ডুবে যেতে লাগল। ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল গাছটা। সে গাছটার আনুমানিক তিরিশ হাত কাছে পৌঁছে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কৃষ্ণপদ। বড় বড় শ্বাস টেনে সে বলল, ‘বাবু আমি আর চলতে পারছি না। আপনি গাছের তলা থেকে মাছটা নিয়ে আসুন। আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি।’

তার কথা শুনে বলাইবাবু এগোলেন গাছটার দিকে। সে দিকে কয়েক পা এগোনোর পরই তিনি বুঝতে পারলেন এদিকের কাদা আরও অনেক বেশি নরম। প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে তাঁর। তবুও তারই মধ্যে দিয়ে এগোলেন তিনি। কিন্তু আরও কয়েক পা এগোতেই হঠাৎই একটা কণ্ঠস্বর কাদাজমির অন্ধকার থেকে ভেসে এল, ‘মাছটা ওখানে নেই। এই যে ওটা আমার কাছে আছে।’

কথাটা কানে যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে যেদিক থেকে কথাটা এল সেদিকে বলাইবাবু তাকালেন। গাছটার ঠিক বিপরীতে একপাশে হাত পঞ্চাশেক তফাতে কাদার মধ্যে বেশ কয়েকবার দপ-দপ করে আলেয়ার আলো জ্বলে উঠল। আর সেই আলোয় বলাইবাবু আর কৃষ্ণপদ দুজনেই দেখতে পেল, একজন লোক সেখানে বিরাট একটা শোলমাছ কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার খালি পা, পরনে লুঙ্গি, মুখটা গামছা দিয়ে বাঁধা। একঝলক লোকটাকে দেখেই বলাইবাবুর মনে হল, এ যেন সেই লোক যে তার সঙ্গে আসছিল! কিন্তু লোকটাকে তো তিনি চলে যেতে দেখেছিলেন। সে ওখানে এল কীভাবে?

বলাইবাবু ভালো করে ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই কৃষ্ণপদ লোকটার উদ্দেশে বলে উঠল, ‘তুই কে? ওখান থেকে মাছটা নিয়েছিস কেন? মাছটা ফেরত দে।’

কৃষ্ণপদরও যে লোকটাকে দেখে বিস্ময় জেগেছে তা তার কণ্ঠস্বর শুনেই বলাইবাবু বেশ বুঝতে পারলেন। মাছ হাতে লোকটা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে জায়গাটা বলাইবাবু অপেক্ষা কৃষ্ণপদর কাছাকাছি। কৃষ্ণপদর কথার জবাবে লোকটা বলল, ‘ঠিক আছে, মাছ ফেরত দিচ্ছি। নিয়ে নাও।’

একথা বলে মাছ কোলে কাদা ভেঙে কৃষ্ণপদর দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়াল লোকটা। কৃষ্ণপদ মৃদু ইতস্তত করে মাছটা নেওয়ার জন্য এগোল লোকটার দিকে। দুজনের মধ্যে হাত কুড়ি ব্যবধান।

কিন্তু লোকটার দিকে অর্ধেক এগোনোর পরই কৃষ্ণপদর দেহটা হঠাৎ যেন কোমর পর্যন্ত ডুবে গেল কাদার মধ্যে। কৃষ্ণপদর কণ্ঠ থেকে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল, ‘এ যে চোরা কাদায় পড়ে গেলাম আমি!’ একথা বলে সে হাত ছুঁড়ে সেই কাদা থেকে মুক্ত হবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু বলাইবাবু হতভম্ব হয়ে দেখলেন কৃষ্ণপদর দেহটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে চোরা বাওড়ের চোরা কাদা বালির মধ্যে। যে চোরা কাদার কথা বলাইবাবু বহুদিন ধরে শুনে এসেছেন। কিন্তু বলাইবাবুর সাহসে কুলাল না সেই ভয়ঙ্কর চোরা কাদার দিকে এগিয়ে গিয়ে কৃষ্ণপদকে উদ্ধারের চেষ্টা করার। কৃষ্ণপদর দেহ এখন প্রায় বুক পর্যন্ত ডুবে গিয়েছে। বলাইবাবুর উদ্দেশে সে আতঙ্কিতভাবে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আমি যে মরে যাচ্ছি উকিলবাবু। আপনাকে যে আমার সঙ্গে নেওয়া হল না। ভগবানের আদালতে কে আমাকে বাঁচাবে উকিলবাবু?’

কৃষ্ণপদর এটাই শেষ কথা। একথা বলার পরই কৃষ্ণপদর দেহ অদৃশ্য হয়ে গেল। চোরা বাওড়ের চোরা কাদা গ্রাস করে নিল একদা ফাঁসির আসামি কৃষ্ণপদকে। বলাইবাবু এবার আর তাকে বাঁচাতে পারলেন না।

একইভাবে একই জায়গায় স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন বলাইবাবু। সেই লোকটা এবার মাছ হাতে এগিয়ে আসতে লাগল বলাইবাবুর দিকে। কৃষ্ণপদ যেখানে তালিয়ে গিয়েছে ঠিক এই জায়গাটা পেরিয়েই সে বলাইবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটার মুখের গামছাটা খসে গিয়েছে। কাছেই একটা আলেয়া জ্বলে উঠল। বলাইবাবু লোকটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন তাঁর অনুমানই ঠিক। এই লোকটাই তাঁর সঙ্গে এসেছিল!

লোকটা বলাইবাবুর উদ্দেশে বলল, ‘আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। ভালো করে মাছটাকে খেয়াল করবেন।’—একথা বলে সে মাছটাকে কয়েকবার হাতে দুলিয়ে সোজা ছুঁড়ে দিল গাছটার দিকে। গাছের কিছুটা আগে গিয়ে পড়ল মাছটা। আলেয়ার আলোয় বলাইবাবু দেখলেন কাদায় পড়ে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল বিরাট মাছটা। আতঙ্কে হিম হয়ে গেল বলাইবাবুর শরীর। ওই পথেই যে মাছটা আনতে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি বললেন, ‘আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না!’

লোকটা বলল, ‘আমার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ে উঠুন। তারপর সব বুঝিয়ে বলছি আপনাকে। আমি যেভাবে হাঁটছি ঠিক সেভাবেই আমার পিছনে আসুন। নইলে বিপদ হতে পারে। চোরা বাওড়ের চোরা কাদায় আপনিও কৃষ্ণপদ আর তার শোলমাছের মতো তলিয়ে যেতে পারেন।’

বলাইবাবু এরপর লোকটাকে ভয়ে ভয়ে অনুসরণ করে কাদা ভেঙে পাড়ে উঠে পড়লেন। লোকটার তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াল। একটু ধাতস্থ হবার পর বলাইবাবু রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে লোকটাকে বললেন, ‘ব্যাপারটা এবার আমাকে বুঝিয়ে বলো। আমার মাথার মধ্যে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।’

লোকটা জবাব দিল, ‘ব্যাপারটা হল কৃষ্ণপদ আপনাকে মারতে যাচ্ছিল। সে জানত ওই গাছের সামনের জমিতে চোরা কাদা আছে। ঘুরপথে গিয়ে সে গাছের তলায় মাছটা রেখে এসেছিল। আপনি আর একটু এগলেই গাছের তলায় মাছটি দেখতে পেতেন আর সেটা আনতে যাবার পথে চোরা কাদায় ডুবে যেতেন।’

লোকটার কথা শুনে বলাইবাবু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘ও পথে আর একটু এগোলে আমিও যে কাদায় ডুবে যেতাম তা মাছটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দেখেই বুঝেছি। কিন্তু আমাকে কৃষ্ণপদ প্রাণে মারতে চাইছিল কেন? আমি তো তার কোনও ক্ষতি করিনি, বরং আমি তো তাকে নিশ্চিত ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা করেছিলাম!’

বলাইবাবুর কথার প্রত্যুত্তরে লোকটা তাঁকে আরও অবাক করে দিয়ে বলল, ‘ওটাই তো ভুল করেছিলেন আপনি! যার জন্য আজ নিজে মরতে বসেছিলেন। আপনি কৃষ্ণপদকে প্রাণে বাঁচালেও সে নিজে জানত সে খুনি। বন্ধুকে খুন করে সে তার লাশ পুঁতে দিয়েছিল চোরা বাওড়ের কাদায়।

পুলিশ আর বেশ কিছু লোকের অনুমান একেবারে ঠিক ছিল। নিহত পরান মণ্ডলের স্ত্রী সহ বেশ কিছু লোক তাকে দেখলেই বলত আপনি তাকে এখানকার আদালতে বাঁচালে কী হবে? উপরওয়ালার আদালতে একদিন তার বিচার হবে। তখন তো আর আপনি তার সঙ্গে থাকবেন না। তখন তার শাস্তি হবে।

বারবার লোকজনের মুখে একথা শুনে কৃষ্ণপদর মনে বিশ্বাস জেগেছিল সে কথায়। আবার লোকমুখে প্রচারিত আপনি নাকি ভগবানের আদালতে সওয়াল করলেও মামলা জিতবেন। এ কথাটাও কৃষ্ণপদ প্রবলভাবে বিশ্বাস করত। সে যে অসুস্থ হয়ে পড়ে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছিল এ কথাটাও মিথ্যা নয়। তাই সে মারা যাওয়ার আগে কৌশলে আপনাকেও উপরে পাঠাতে চেয়েছিল, যাতে আপনি তার হয়ে উপরওয়ালার আদালতে মামলা লড়তে পারেন। ব্যাপারটাকে তার মনের বিকারও বলতে পারেন।’

লোকটার কথা শুনে বলাইবাবুর মনে পড়ে গেল ডুবে যাওয়ার সময় কৃষ্ণপদর কথাগুলো ‘আপনাকে যে আমার সঙ্গে নেওয়া হল না! ভগবানের আদালতে কে বাঁচাবে উকিলবাবু?’

লোকটা এবার বলল, ‘কৃষ্ণপদ হয়তো কিছুদিন পরেই মরত। কিন্তু তার আগে তাকে মেরে আজ সেই খুনের প্রতিশোধ নিলাম। ও বোঝেনি যে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানেও চোরা কাদা। নিজের ফাঁদে নিজেই মরল। এবার আপনি বাড়ি যান। আর ভয় নেই আপনার। আমিও এবার যাই।’

বিস্মিত, হতভম্ব বলাইবাবু কোনওক্রমে লোকটাকে বললেন, ‘তুমি কে? কৃষ্ণপদকে মারলেও তুমি আমার প্রাণ রক্ষা করলে কেন? আমি তো তার উকিল ছিলাম!’

কাছেপিঠে বেশ কয়েকটা আলেয়ার আলো হঠাৎই দপ-দপ করে জ্বলতে শুরু করল! জলের মধ্যে হঠাৎই ডেকে উঠল নিশাচর পাখির দল! বলাইবাবুর কথা শুনে লোকটা অস্পষ্ট হেসে বলল, ‘ওই যে লোকে বলে আপনি ভগবানের আদালতেও মামলা জিততে পারেন। সে আদালত সত্যি যদি কোথাও থেকে থাকে তবে সেখানে যেতে আপনি কৃষ্ণপদকে বাঁচাতে না পারেন সেই কারণেই আপনাকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিলাম। আমিই যে সেই খুন হয়ে যাওয়া পরান মণ্ডল!’—এ কথাগুলো বলার পরমুহূর্তেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল। আলেয়ার আলো মুছে গিয়ে গাঢ় অন্ধকার নেমে এল চোর বাওড়ের পাড়ে। জেলা আদালতের দুঁদে উকিল বলাই ঘোষাল সেই অন্ধকার ভেঙে কোনওরকমে বাড়ি ফেরার পথ ধরলেন।