Accessibility Tools

সাদা বিড়াল – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

রক্তাক্ত ফরমান (উপন্যাস) – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

রক্তাক্ত ফরমান

এক

মধ্যভারতের ‘নারওয়ার’ নামের এ জায়গাতে রজতাভবাবু ইতিপূর্বে কোনওদিন আসেননি। ভূপাল থেকে বাসে চেপে নারওয়ার পৌঁছতে তাঁর দু-ঘণ্টা মতো সময় লাগল। এ জায়গাটা আধা শহর, আধা গ্রামের মতো। বাস থেকে নামার পরই তাঁর চোখে পড়ল একটা প্রাচীন কেল্লার ধ্বংসাবশেষ। রজতাভ বুঝতে পারলেন ওটাই সাতশো বছরের প্রাচীন নারওয়ার ফোর্ট।

বাসে করে এখানে আসার পথে এ জায়গা সম্পর্কে ইন্টারনেট থেকে যে তথ্য তিনি পেয়েছেন তাতে ওই কেল্লার উল্লেখ আছে। ওরছা রাজ বীর সিংদেও বুন্দেলা এক সময় এ অঞ্চলের অধিপতি ছিলেন। তাঁর নাম অনুসারে বর্তমান মধ্যপ্রদেশের এ জায়গাকে এক সময় বলা হতো বুন্দেলখণ্ড।

রজতাভ তাঁর ব্যাগ নিয়ে বাস থেকে নেমে দাঁড়াতেই একদল লোক তাঁকে ঘিরে ধরল। অটো চালক আর টাঙাওয়ালার দল সবাই তাকে ট্যুরিস্ট ভেবে কেল্লায় নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু এখানে কেল্লা দেখার জন্য আসেননি রজতাভ। তিনি এসেছেন তাঁর ব্যবসায়ীক প্রয়োজনে। তিনি একজন সরকার অনুমোদিত অ্যান্টিক ডিলার। অর্থাৎ প্রাচীন জিনিস কেনাবেচা করেন।

কলকাতার রাসেল স্ট্রিটে অ্যান্টিক সামগ্রীর ছোট একটা দোকানও আছে তাঁর। আর এই অ্যান্টিক সামগ্রী কেনার জন্যই মাঝে মাঝে দেশের নানান জায়গাতে ছুটে বেড়াতে হয় তাকে। দিন সাতেক আগে একটা ইংরাজি দৈনিকে একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, এখানকার বাসিন্দা বন্দিশ সিং নামের এক ভদ্রলোক তাঁর পারিবারিক কিছু প্রাচীন জিনিস বিক্রি করতে চান। রজতাভ বিজ্ঞাপনটা দেখে কলকাতা থেকে টেলিফোন করেছিলেন ভদ্রলোককে। বন্দিশ সিং তাঁকে জানিয়ে ছিলেন এখানে চলে আসার জন্য। আর সে কাজেই তাঁর নারওয়ারে আসা।

তিনি দুর্গ দেখতে যাবেন না, এ কথা লোকগুলোকে জানাতেই তাঁর চারপাশের ভিড়টা হালকা হয়ে গেল। গন্তব্যর দিকে রওনা হবার আগে তিনি একটা খাবারের দোকানে গিয়ে ঢুকলেন টিফিন সেরে নিতে। চা-পুরি খেতে খেতে তিনি দোকানির কাছে বন্দিশ সিং-এর হাবেলির ঠিকানা জানতে চাওয়ায় সে বলল, সেই হাবেলি কেল্লার ঠিক নীচেই। বাসস্ট্যান্ড থেকে আধ ঘণ্টার পথ। ওর সঙ্গে লোকটা এ-ও জানাল যে গত কদিন ধরে নাকি রজতাভবাবুর মতোই বেশ কয়েকজন বাইরের লোক ‘সিং সাবের মকানের’ খোঁজ করেছে। কোই অটোওয়ালা বা টাঙাওয়ালাকে বললেই সে রজতাভকে সেখানে পৌঁছে দেবে। দোকানির কথা শুনে তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন টাঙাতেই যাবেন। তাতে জায়গাটা ভালো ভাবে দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে।

সেই মতো দোকান থেকে খাওয়া সেরে বেরিয়ে দরদাম করে এক বৃদ্ধ টাঙাওয়ালার টাঙায় বসলেন তিনি। বেলা দশটা বাজে। পিচের রাস্তায় খটখট শব্দ তুলে টাঙা তাকে নিয়ে ছুটল রাস্তা ধরে। রাস্তার দু-পাশে যেমন চোখে পড়ছে অনেক পুরোনো দিনের বাড়ি, প্রাচীন স্থাপত্যের চিহ্ন, তেমনই রজতাভবাবুর চোখে পড়তে লাগল আধুনিক ঘরবাড়ি, মোবাইলের দোকান, এটিএম কাউন্টার এসব।

ধীরে ধীরে নগরায়নের পথে এগোচ্ছে এ জায়গা। তবে স্থানীয় লোকজনের পরনে এখনও সাবেকি পোশাক। ধুতির ওপর ফতুয়ার মতো জামা, মাথায় পাগড়ি, পায়ে নাগরা, কারো কারো কানে ‘লঙ’ বা কর্ণকুণ্ডল আর হাতে লাঠিও আছে। মধ্যভারতের শক্তসমর্থ মানুষ সব। হয়তো বা এদেরই কারো কারো পূর্বপুরুষ এক সময় বুন্দেলরাজের বাহিনীতে ছিল, এই দুর্গ রক্ষা করত, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করত—এ কথা মনে মনে ভাবলেন রজতাভবাবু।

পিচ রাস্তা ছেড়ে এক সময় পাথুরে রাস্তায় এসে পড়ল টাঙা। রাস্তা এবার ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল। ক্রমশ আধুনিকতার চিহ্ন মিলিয়ে যেতে লাগল পথের পাশ থেকে। পাহাড় আর তার মাথার ওপরের দুর্গটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। বুড়ো টাঙাওয়ালা বলল, ‘ওই যে দুর্গ দেখেছেন, ওখান থেকে এক সময় রাজা বীর সিংদেও বুন্দেলা লড়াই করতেন আকবর বাদশার সেনাদের সঙ্গে। সম্রাট জাহাঙ্গির ওই কেল্লাতে এসে থেকেছেন। তখন ওই কেল্লার চারপাশে ঘন জঙ্গল ছিল। শুধু সে সময় কেন, পঞ্চাশ বছর আগেও অনেক জঙ্গল ছিল ওখানে। আপনি যে হাবেলিতে যাচ্ছেন তাঁর মালিক রাজা বীর সিং বুন্দেলার বংশধর। তাই আমরা ওনাকে ‘রাজা বন্দিশ’ নামে ডাকি। এখানকার পুরোনো লোক উনি। সবাই চেনে ওঁকে।’

রজতাভবাবুর এ ব্যাপারটা জানা ছিল না বন্দিশ সিং সম্পর্কে। খবরটা জেনে তিনি বেশ খুশিই হলেন। কারণ, যদি তিনি সস্তা দামে সে আমলের কোনও জিনিস তাঁর কাছ থেকে পেয়ে যান তবে তা ভবিষ্যতে বিক্রি করার ক্ষেত্রে খদ্দেরের অভাব হবে না।’

রজতাভবাবু টাঙাওয়ালার কাছে জানতে চাইলেন, ‘বন্দিশ সিং লোক কেমন?’

টাঙাওয়ালা বলল, ‘ভালো লোক। উনি বিয়ে করেননি। কয়েকজন চাকর নিয়ে ওই হাবেলিতে থাকেন।’

টাঙাওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে বলতে রজতাভবাবু একদম দূর্গের কাছে চলে এলেন। একটা অতি প্রাচীন পাথরের তোরণের একটা অংশ আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। আর তারপরই শুরু হয়েছে পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে ওঠার রাস্তা। টাঙা সেই তোরণ অতিক্রম করল ঠিকই, কিন্তু আরও ওপরের দিকে না এগিয়ে এক পাশের একটা রাস্তা ধরল। বেশ কয়েকটা প্রাচীন অট্টালিকা যেখানে পাহাড়ের ঢালের গায়ে তফাতে তফাতে দাঁড়িয়ে আছে। তেমনই একটা পাথরের তৈরি দোতলা বাড়ি বা হাবেলির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল টাঙা। বাড়িটা দেখিয়ে টাঙাওয়ালা বলল, ‘এই হল রাজা বন্দিশ সিংয়ের মকান।’

লোহার পাত আর গুল বসানো বিরাট একটা কাঠের দরজা রয়েছে বাড়িটার ভিতর প্রবেশ করার জন্য। তার দু-পাশের দেওয়ালে প্রমাণ আকৃতির অস্ত্রধারী রক্ষীর ছবি আঁকা। যদিও তা সময়ের প্রভাবে অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে এসেছে। টাঙা থেকে নেমে, ভাড়া মিটিয়ে রজতাভ এগোলেন সেই বাড়ির দিকে।

বন্দিশ সিংয়ের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন রজতাভ। বেশ বড় লোহার কড়া বসানো আছে দরজার গায়ে। তা নাড়িয়ে কয়েকবার শব্দ করার পরই দরজা খুলে গেল। একজন শক্তপোক্ত চেহাড়ার মাঝবয়সি লোক এসে দাঁড়াল তাঁর সামনে। পরনে ধুতি, জামা, হাতে পিতল বাঁধানো লাঠি।

তাকে দেখে দারোয়ান বলেই মনে হল রজতাভর। তিনি তাকে বললেন, ‘আমি কলকাতা থেকে আসছি। রাজা বন্দিশ সিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’ হয়তো বা এমন কেউ বন্দিশ রাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারে তা জানাই ছিল না লোকটার। সে বলল, ‘অন্দর আইয়ে সাব।’

লোকটার পিছন পিছন হাবেলিতে প্রবেশ করলেন রজতাভবাবু। সদর দরজা অতিক্রম করেই একটা পাথর বাঁধানো উঠানের মতো বিরাট জায়গা। উঠানে একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। তার গাড়িটাও পাশে রাখা। আর উঠানকে ঘিরেই দাঁড়িয়ে আছে হাবেলিটা। এখনও তার বারান্দার গায়ে পাথরের তৈরি জাফরির কারুকাজ তাক লাগিয়ে দেবার মতো। স্তম্ভগুলো, দেওয়ালগুলোর গায়েও আঁকা আছে হাতি, ঘোড়া, অস্ত্রধারী সৈনিকের প্রাচীন চিত্র।

দেখেই বোঝা যায় কোনও এক সময় এই হাবেলি ঝলমল করত। সেই উঠান পেরিয়ে লোকটা রজতাভবাবুকে নিয়ে প্রবেশ করল বৈঠকখানার মতো একটা ঘরে। শ্বেতপাথরের মেঝের ওপর ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা নীচু টেবিলকে ঘিরে পুরোনো আমলের সোফা সেট রাখা। সেই সোফাসেট দেখিয়ে লোকটা বলল, ‘আপনি বসুন। আমি মালিককে খবর দিচ্ছি।’—এ কথা বলে লোকটা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

দুই

লোকটা চলে যাবার পর রজতাভ ঘরটার চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। আরও বেশ কয়েকটা বন্ধ দরজা আছে ঘরটাতে। ঘরের দেওয়ালের গায়ে কোনও এক প্রাচীন রাজপুরুষের তৈলচিত্র টাঙানো আছে। বলশালী এক পুরুষ। তার মাথায় পাগড়ি, গলায় মুক্তমালা, কানে স্বর্ণকুণ্ডল, পরনে জমকালো পোশাক, কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে দীর্ঘ তরবারি। দেখেই বোঝা যায় লোকটা রাজা-মহারাজা গোছের কেউ হবেন। ছবিটা দেখে রজতাভ অনুমান করলেন এ ছবিটার বয়স অন্তত দেড়-দুশো বছর হবে।

তিনি যখন টেলিফোনে বন্দিশ সিংয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তখন তিনি অবশ্য তাকে বলেছিলেন যে তাঁর বিক্রয় যোগ্য পণ্যগুলোর মধ্যে বেশ কিছু প্রাচীন অয়েল পেন্টিং-ও আছে। তবে ঘরের দেওয়ালগুলোর দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেওয়ালের গায়ে বসানো ছবি ঝোলাবার বেশ কিছু লোহার হুক চোখে পড়ল। যাদের চারপাশে দেওয়ালের গায়ের দাগ দেখে রজতাভবাবুর মনে হল, ওই সব হুক থেকেও ছবি ঝুলত, যেগুলো সম্প্রতি খুলে নেওয়া হয়েছে।

একলা ঘরে তিনি মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর হঠাৎই ঘরের একটা দরজা ক্যাঁচ করে শব্দ তুলে খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ করলেন প্রায় বৃদ্ধ একজন লোক। তাঁর পরনে লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবির মতো পোশাক, চোস্ত পায়জামা, পায়ে নাগরা। লোকটার পাগড়ির আড়াল থেকে দু-পাশের গালে সাদা রঙের চওড়া ঝুলপি নেমে এসেছে। তাঁর কানে স্বর্ণকুণ্ডল আর পাঞ্জাবির মতো পোশাকের ওপরই গলা থেকে একটা সোনার চেন ঝুলছে। কৃষ্ণ বর্ণের লোকটার চেহারা দেখেই অনুমান করা যায় যে এক সময় তাঁর শরীর বেশ শক্তপোক্ত ধরনের ছিল। বৃদ্ধ হলেও লোকটার শরীর, মুখ-মণ্ডলে একটা আভিজাত্যের ভাব আছে।

লোকটা ঘরে ঢুকে রজতাভবাবুকে দেখে হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘আমি বন্দিশ সিং বুঝলে।’

রজতাভবাবু তাঁর পরিচয় পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘নমস্কার। আপনার বিজ্ঞাপন দেখে আমি কলকাতা থেকে এসেছি। টেলিফোনে আপনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল।’

বন্দিশ সিং সোফার কাছে এগিয়ে এসে রজতাভাবাবুকে বললেন, ‘বাঙালিবাবু আপনি বসুন। রজতাভ তাঁর কথা শুনে আবার বসে পড়লেন। আর বন্দিশ সিং তাঁর মুখোমুখি সোফায় বসলেন। রজতাভবাবুর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর বন্দিশ সিং বললেন, ‘কলকাতা থেকে এত দূর ছুটে আসতে বেশ কষ্ট হল তাই না?’

রজতাভ প্রশ্ন শুনে তাঁর পকেট থেকে নিজের পরিচয়পত্র, কিউরিও ব্যবসার সরকারি অনুমতি পত্র, এসব বার করে বন্দিশ সিং-এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আসলে, ট্রেনের রিজার্ভেশনের জন্য দু-তিন দিন অপেক্ষা করার পরও যখন তা পেলাম না, তখন বাধ্য হয়ে জেনারেল বগিতেই আসতে হল। বসার জায়গা কোনও রকমে পেয়েছিলাম। রাতটা জেগেই কাটাতে হয়েছে। আজ ভোরেই আমি ভূপালে নেমেছি। তারপর বাস ধরে সোজা এখানে।’

বন্দিশ সিং কাগজগুলো নিয়ে তাতে একটু চোখ বুলিয়ে তা আবার ফিরিয়ে দিলেন রজতাভবাবুর হাতে। তারপর একটু আফসোসের স্বরে বললেন, ‘কিন্তু বাঙালিবাবু, আপনার আসতে যে দেরি হয়ে গেল।’

রজতাভ বললেন, ‘দেরি হয়ে গেল মানে? বিজ্ঞাপন বেরোবোর পর এখনও তো সাতদিন কাটেনি।’

বন্দিশ সিং বললেন, ‘তা কাটেনি ঠিকই। কিন্তু এ কদিনের মধ্যে বেশ কয়েকজন কিউরিও ডিলার বা পুরোনো জিনিসের সংগ্রাহকরা আমার কাছে এসেছিলেন। মিউজিয়ামের একজন লোকও এসেছিলেন। অয়েল পেন্টিং, পুরোনো দিনের ঢাল তলোয়ার, আতরদান, রূপোর গড়গড়া ইত্যাদি যা ছিল তাঁরা সব একে একে এ কদিনের মধ্যেই কিনে নিয়ে গেলেন। এখন শুধু দেওয়ালের গায়ের ওই অয়েল পেন্টিং-টা আছে। ওটার বয়েস দুশো বছর। আমার পূর্ব পুরুষ রাজা বীর সিং বুন্দেলার ছবি। তবে ওটা আমি বেচব না।’

বন্দিশ সিং-এর কথা শুনে রজতাভ বিস্মিতভাবে বললেন, ‘তবে কি বিক্রি করার মতো কোনও পুরোনো জিনিস নেই আপনার কাছে?’

তিনি জবাব দিলেন, ‘না, নেই। থাকলে আমারই ভালো হতো। আপনি নিশ্চয়ই অনুমান করতে পেরেছেন, আমি আমার পারিবারিক প্রাচীন জিনিসগুলো কেন বিক্রি করছি? টাকার দরকার না থাকলে এসব জিনিস কেউ বিক্রি করে না। শেয়ার মার্কেটে আমি অনেক টাকা লগ্নি করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎই শেয়ার বাজারে ধ্বস নামাতে আমি প্রায় সর্বশান্ত হয়ে গেছি। বাজারে প্রচুর টাকা দেনাও হয়ে গেছে। যদিও সেই দেনার জন্য আমাকে কেউ চাপ দেয়নি। কিন্তু পাওনাদারদের টাকা আমি শোধ দিতে চাই। সেজন্যই জিনিসগুলো বিক্রি করলাম। আমার বয়স হয়েছে। রাজা বীর সিং বুন্দেলার বংশধর যদি অন্যের টাকা শোধ না দিয়ে মারা যায় তবে সে বড় কলঙ্কর ব্যাপার হবে। তবে, জিনিসগুলো বিক্রি করে যে টাকা পেলাম তাতে ধার পুরো শোধ হবে না।’

যে লোকটা এ ঘরে এনে রজতাভবাবুকে বসিয়ে গেছিল সে আবার ঘরে ঢুকে একটা পাথরের গ্লাসে শরবত নামিয়ে রেখে গেল রজতাভবাবুর টেবিলের সামনে। বন্দিশ সিং বললেন, ‘শরবতটা খেয়ে নিন। আমার খুব খারাপ লাগছে আপনাকে কোনও কিছু দিতে পারলাম না বলে। তবে ইচ্ছা হলে আপনি আমার এই হাবেলিতে থাকতে পারেন। কেল্লা ঘুরে দেখতে পারেন। ওখানে দেখার মতো বেশ কিছু জিনিস আছে। একটা ছোট মিউজিয়ামও আছে। আমি আপনাকে সে সব দেখাবার ব্যবস্থা করে দেব। কেল্লার যে সব জায়গাতে সাধারণ টুরিস্টকে ঢুকতে দেওয়া হয় না সে সব জায়গাও দেখতে পারেন আপনি।’

যে কাজের জন্য রজতাভবাবু এখানে এলেন, সে কাজই যখন হল না তখন কেল্লা দেখার প্রস্তাব শুনে খুব একটা উৎসাহ বোধ করলেন না তিনি। বন্দিশ সিংয়ের অনুরোধে শরবতের গ্লাসটা তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দেবার আগে শেষ বারের মতো বন্দিশ সিংকে বললেন, ‘আর একবার একটু ভেবে দেখুন না, দেবার মতো কোনও জিনিস কী নেই? ভালো জিনিস হলে নিশ্চয়ই ভালো দামে কিনে নেব আমি, আসলে এত দূরে এসে খালি হাতে ফেরত যেতে আমার খুব খারাপ লাগবে।’

রজতাভবাবুর কথা শুনে বন্দিশ সিং কোনও জবাব দিলেন না। স্থির দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে রইলেন দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো তাঁর প্রাচীন পূর্বপুরুষ রাজা বীর সিং দেও বুন্দেলার তৈলচিত্রর দিকে।

রজতাভবাবুর তাঁকে দেখে মনে হল নতুন কিছু আর বলার নেই তাঁর। রজতাভবাবু ভেবে নিলেন, কাজ যখন আর হল না, তখন উঠে পড়াই ভালো। ভূপালে ফিরে তিনি চেষ্টা করবেন রাতের ট্রেন ধরার জন্য।

শরবতটা ধীরে ধীরে পান করলেন রজতাভবাবু। তার পর গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে নিজের ব্যাগটা তুলে নিয়ে ঘর ছাড়ার জন্য যখন উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছেন, ঠিক সে সময় বন্দিশ সিং হঠাৎ রজতাভবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘একটা জিনিসের কথা হঠাৎ আমার মনে পড়ল। ঠিক আছে, আপনি যখন এত করে বলছেন, তবে সে জিনিসটা আপনাকে দেখাই।’

বন্দিশ সিং বুন্দেলার কথা শুনে রজতাভবাবু উঠতে গিয়েও থেমে গিয়ে উৎসাহিত ভাবে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখান দেখান? আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, তেমন জিনিস হলে ভালো দামে আমি কিনে নেব সেটা।’

বন্দিশ সিং বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি জিনিসটা নিয়ে আসছি।’—এই বলে সোফা ছেড়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। রজতাভবাবু আগ্রহভরে অপেক্ষা করতে লাগলেন বন্দিশ সিং কী আনেন তা দেখার জন্য।

তিন

মিনিট দশেকের মধ্যেই বন্দিশ সিং ঘরে ফিরে এলেন আট-দশ ইঞ্চি লম্বা অনেকটা নলের মতো দেখতে একটা জিনিস নিয়ে। সেটা নিয়ে তিনি রজতাভবুর সামনে বসার পর ভালো করে সেটার দিকে তাকিয়ে রজতাভবাবু বুঝতে পারলেন সেটা আসলে কৌটো ধরনের একটা জিনিস। তার একদিকে ঢাকনা লাগানো আছে। জিনিসটার মুখের ঢাকনাটা খুলে তার ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে অতি সাবধানে রোল করা একটা কাগজ বার করে আনলেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে সেটা খুলে মেলে ধরলেন রজতাভবাবুর সামনে। ইঞ্চি চারেক চওড়া আর ইঞ্চি দশেক লম্বা হলদেটে হয়ে যাওয়া একটা তুলোট কাগজ সেটা। তার গায়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কিছু কথা লেখা আছে কালো কালিতে। আর গায়ে বেশ কয়েকটা মোহরের ছাপও আছে।’

প্রাচীন জিনিসটা দেখে রজতাভবাবু জানতে চাইলেন, ‘কী এটা?’

বন্দিশ সিং বুন্দেলা বললেন, ‘এটা একটা প্রাচীন হুকুম নামা। সরকারি মোহর লাগানো আছে কাগজে। বাপ-ঠাকুর্দার মুখে শুনেছি এটা নাকি রাজা বীর সিং-এর আমলের জিনিস। অর্থাৎ আকবরের আমলের। এটাই সব চাইতে পুরোনো জিনিস। এই কাগজটা বংশ পরম্পরায় আমাদের কাছে আছে। কাগজের খাপটা অবশ্য পুরোনো নয়। সে সময় পালিশ করা সরু বাঁশের চোঙের মধ্যে অথবা ফাঁপা হাতির দাঁতের মধ্যে এই সব সরকারি হুকুমনামা পাঠানো হতো। ওরকম খাপ কেল্লার মিউজিয়ামে আছে। শুনেছি এই ফরমান বা আদেশনামা নাকি একটা হাতির দাঁতের খোল বা কৌটোর মধ্যে ছিল। আমার ঠাকুর্দা নাকি সেটা কাউকে বেচে দেন। আমরা রাজ বংশধর। জমিজমা এক সময় আমাদের যা ছিল তা স্বাধীনতার পর সরকার সব অধিগ্রহণ করে নিল। বিনিময়ে দেওয়া হল সামান্য ভাতা। আমরা রাজ বংশধর বলে কারো অধীনে চাকরি করতে আমাদের ইজ্জতে বাঁধে। তাই দুঃসময় টাকার প্রয়োজনে আমার পূর্বপুরুষরাও অনেক পারিবারিক জিনিস বিক্রি করেছেন।’—একটানা কথা বলে থামলেন তিনি।

রজতাভবাবু আগ্রহ ভরে কাগজটা হাতে নিলেন। দীর্ঘ দিন ধরে কিউরিওর ব্যবসা করেন রজতাভবাবু। এ সব ব্যাপারে কিছুটা অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত কারণেই আছে। একবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশীর যুদ্ধর আমলের একটা কাগজও কেনা-বেচা করেছিলেন তিনি। এ কাগজটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, জিনিসটা সে কাগজের থেকেও প্রাচীন বলে মনে হল। যদিও রজতাভবাবু ফারসি পড়তে পারেন না, তবুও কাগজের গায়ে লেখা হরফ দেখেছেন তিনি। রজতাভবাবুর মনে হল কাগজটা মোগল আমলের মুদ্রার গায়ে এমন হরফ দেখেছেন তিনি। রজতাভবাবুর মনে হল কাগজটা মোগল আমলের হওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়।

তুলোট কাগজটা কিছুক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর রজতাভবাবু জানতে চাইলেন, এই সরকারি হুকুমনামাতে কি লেখা আছে আপনি জানেন?’

প্রশ্ন শুনে একটু চুপ করে থেকে প্রায় বৃদ্ধ বন্দিশ সিং জবাব দিলেন, ‘না জানি না। জানার প্রয়োজনও হয়নি কোনওদিন। আমার বাপ-ঠাকুর্দাও জানতেন না কী লেখা আছে এই কাগজে। তবে তাঁদের মুখ থেকে এটুকু শুনেছি কাগজের লেখাগুলো হল ফারসি।’

রজতাভবাবুর অনুমানের সঙ্গে মিলে গেল বন্দিশ সিং-এর কথা। রজতাভবাবু মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলেন কাগজে লেখা হরফগুলো ফারসিই হবে।

বীর সিং বুন্দেলার উত্তর পুরুষ এরপর প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি যদি এ জিনিসটা কিনতে আগ্রহী হন, আর আমি যদি আপনাকে বিক্রি করতে রাজি হই, তবে কী দাম পাওয়া যেতে পারে?’

রজতাভ একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘জিনিসটা যে প্রাচীন তা দেখে বুঝতে পারছি। এসব কাগজের দাম নির্ভর করে, কাগজটা ঠিক কোন সময়ের? কাগজের কোনও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে কিনা?—এসব পরীক্ষা করার পর। আর সে সব পরীক্ষা করার জন্য বেশ কিছুদিন সময়ের দরকার। তবে, আপনি যদি রাজি থাকেন তবে এ কাগজের জন্য আমি দু-লাখ টাকা আপনাকে দিতে পারি। তারপর যদি পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, এ কাগজের কোনও গুরুত্ব নেই তাহলে যা ক্ষতি হবার তা আমারই হবে। আর যদি দেখা যায় আছে, তবে যা লাভ হবার আমারই হবে। তবে এটুকু আমি আপনাকে বলতে পারি, যে দাম আমি আপনাকে দিচ্ছি তাতে আপনি ঠকবেন না, আর আপনাকে কোনও ঝুঁকি বহন করতে হবে না।’

মৃদু বিস্ময়ের স্বরে বন্দিশ সিং বলে উঠলেন, ‘দু-লাখ!’

রজতাভবাবুর তাঁর মুখ দেখে মনে হল, তিনি যে জিনিসটার এত দাম দেবেন তা যেন বন্দিশ সিং আশা করেননি।’

রজতাভ বললেন, ‘হ্যাঁ, দু-লাখ। আমি সৎ ভাবে ব্যবসা করি। কাউকে ঠকাই না, তাই এই দাম বললাম। আমি এই হুকুমনামাটা কিনতে চাই। আপনি ঠকবেন না।’

তাঁর কথা শুনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপভাবে বসে রইলেন বন্দিশ সিং। তারপর বললেন, ‘এ কথা ঠিকই আপনার টাকাটা পেলে আমার দেনাটা অনেকটাই মিটে যায়, কিন্তু আমি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, জিনিসটা আপনাকে দেওয়া উচিত হবে কিনা?’

রজতাভ হেসে বললেন, ‘দিলে মনে হয় আপনিই লাভবানই হবেন।’

রজতাভর প্রস্তাব নিয়ে আরো কিছুক্ষণ ভাবার পর পুরোনো কাগজটা তাঁকে বিক্রি করার ব্যাপারে মোটামুটি যেন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তিনি তাকে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি আপনাকে জিনিসটা দিতে রাজি আছি, কিন্তু এ ব্যাপারে আমার একটা শর্ত আছে।’

‘কী শর্ত?’ জানতে চাইলেন রজতাভবাবু।

বৃদ্ধ বন্দিশ সিং বুন্দেলা বললেন, ‘আমি আপনাকে কাগজটা হাতে তুলে দেবার পর অন্তত তিনটে রাত আপনাকে এ বাড়িতে কাটাতে হবে। অর্থাৎ আজ, কাল, পরশু, এই তিনটে রাত। তবে চিন্তা নেই। থাকা, খাওয়ার সব ব্যবস্থা আমিই করব। এ বাড়িতেই থাকবেন আপনি।’

এ প্রস্তাব শুনে রজতাভ বললেন, ‘তিনদিন থাকতে হবে কেন বলুন তো? আমি কিন্তু এ ঘরে বসেই অন লাইনে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করে দেব।’

বন্দিশ সিং বললেন, ‘না, টাকার কারণে নয়, বলতে পারেন এ কাগজটার ব্যাপারে আমার মনের মধ্যে একটা সংস্কার আছে। তবে এ ব্যাপারে আর কিছু আমি আপনাকে বলব না। আর হ্যাঁ, আমি আপনাকেও একটা সুযোগ দেব। এই তিনদিনের মধ্যে যদি আপনার মনে হয় যে জিনিসটা নেওয়া আপনার পক্ষে ভুল হয়েছে তবে তা আমাকে আবার ফেরত দিতে পারেন। আমি টাকা ফিরিয়ে দেব।’

রজতাভবাবুও কয়েক মিনিট ভাবলেন বন্দিশ সিং-এর প্রস্তাব নিয়ে। তাঁকে তিনদিনের মধ্যেই কলকাতা ফিরতেই হবে তেমন নয়। আর বন্দিশ সিং তাঁকে যে প্রস্তাবটা দিচ্ছেন তা রজতাভবাবুর পক্ষেও ভালো। এ বাড়িতে থেকেই তিনি এই ফরমানটার বা লেখাটার কতটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে সে ব্যাপারে খোঁজ খবরও নিতে পারবেন আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে। তেমন মনে হলে কাগজটা তিনি ফেরতও দিয়ে দিতে পারবেন মালিককে। কাজেই রজতাভবাবু শেষ পর্যন্ত বলেই দিলেন, ‘ঠিক আছে আমি আপনার প্রস্তাবে রাজি।’

পুরোনো জিনিস কেনার জন্য, টাকা লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রজতাভবাবু সঙ্গে করেই এনেছিলেন। সে সব কাগজপত্রতে সইসাবুদ করা, বন্দিশ সিং-এর একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করা, ইত্যাদি মিটতে মিটতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা সময় কেটে গেল। অবশেষে রাজা বীর সিং বুন্দেলার বংশধর সেই প্রাচীন কাগজটা ধাতব খোল বন্দি করে রজতাভবাবুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘চলুন এবার আপনাকে আপনার থাকার জায়গাতে নিয়ে যাই?’

সে ঘর ছেড়ে বেশ কয়েকটা ঘর, থামওয়ালা বারান্দা অতিক্রম করে এরপর রজতাভবাবুকে নিয়ে বন্দিশ সিং পৌঁছলেন তার হাবেলির পিছনের অংশে একটা ঘরের সামনে। সেখানে এসে ইতিমধ্যেই দাঁড়িয়েছিলেন যে লোকটা রজতাভবাবুকে সদর দরজা খুলে ঘরে বসিয়েছিল, সে। লোকটাকে দেখিয়ে গৃহকর্তা বললেন, ‘ওর নাম ছত্তর সিং। আপনার চিন্তা নেই, আপনার যা প্রয়োজন হবে তা ও করে দেবে।’

ঘরের সামনের থামওয়ালা বারান্দা থেকে নীচে নামলেই কিছুটা তফাতে কোন একটা প্রাচীন কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আর তার পিছন দিক থেকে পাথরের সিঁড়ির ধাপ সোজা উঠে গেছে মাথার ওপরের দূর্গ প্রাকারের দিকে। ঘরে ঢোকার আগে সেই পাথুরে ধ্বংসস্তূপের দিকে চোখ পড়তেই রজতাভ জানতে চাইলেন, ‘ওই জায়গাতে কী ছিল?’

রাজা বন্দিশ সিং বললেন, ‘ওখানেই আমাদের পুরোনো হাবেলিটা ছিল। পাঁচশো বছরেরও পুরোনো বাড়ি ছিল ওটা। আর আমাদের এই নতুন হাবেলির বয়সও প্রায় তিনশো বছর হয়ে গেল।’

তাঁদের সঙ্গে ঘরে ঢুকলেন রজতাভবাবু। ছিমছাম পরিচ্ছন্ন ঘর। পুরোনো আমলের পালঙ্কর ওপর পরিষ্কার বিছানা, আসবাব সবই আছে। ঘরটা বেশ পছন্দ হল রজতাভর।

বন্দিশ সিং-এর সঙ্গে রজতাভবাবু আরো টুকটাক কিছু কথা বলার পর বাড়ির সামনের দিকের অংশ থেকে কার যেন ডাক ভেসে এল। তা শুনে বন্দিশ সিং বললেন, ‘আবার কোনও নতুন লোক এসেছে বলে মনে হয়!’ এ কথা বলার পর গৃহকর্তা তাঁর সঙ্গীকে নিয়ে কে এসেছেন তা দেখার জন্য ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর অবশ্য ছত্তর সিং রজতাভবাবুর দুপুরের খাবার দিয়ে গেল। খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে পড়লেন রজতাভবাবু। পথশ্রমের কান্তিতে ঘুম নেমে এল তাঁর চোখে।

চার

রজতাভবাবু যখন ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন। তখন তিনি জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, অনেকক্ষণ আগেই বিকাল হয়ে গেছে। শেষ বিকালের নরম আলো এসে পড়েছে ঘরের কিছুটা দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেই ধ্বংসস্তূপের গায়ে আর পাহাড়ের ঢালের মাথার ওপর প্রাচীন দূর্গ প্রাকারে।

খাটের ওপর তার মাথার কাছে রাখা ব্যাগের ভিতর থেকে প্রাচীন কাগজ ভরা সেই খোলটা বার করলেন তিনি। রজতাভবাবু একটা কাজ করবেন বলে মনে মনে ভেবে রেখেছেন। ডক্টর সমাদ্দার নামের তাঁর এক পরিচিত ভদ্রলোক আছেন কলকাতাতে। তিনি আরবি, ফারসি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেন। রজতাভবাবু ইতিমধ্যে ভেবে রেখেছেন তাঁকে প্রাচীন লেখাটার ছবি তুলে পাঠাবেন যদি তিনি লেখাটার পাঠোদ্ধার করে দিতে পারেন সে জন্য।

খাপের ভিতর থেকে যত্ন করে প্রথমে কাগজটা বার করলেন তিনি। তারপর মোবাইল ফোনে কাগজটার ছবি ভালো করে তুলে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা লিখে ছবিটা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডক্টর সমাদ্দারের তরফ থেকেও জবাব এল, লেখাটা প্রাচীন ফারসি। আর কাগজটাতে কী লেখা আছে তার পাঠোদ্ধার তিনি দু-এক দিনের মধ্যেই করে ফেলতে পারবেন বলে আশা রাখেন।

ডক্টর সমাদ্দারের কাছ থেকে মেসেজটা পেয়ে কাগজটার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেলেন রজতাভবাবু। এরপর তিনি যখন কাগজটাকে তার খাপে পুরে ব্যাগের মধ্যে রাখতে যাচ্ছেন ঠিক তখনই দরজাতে কে যেন টোকা দিল। রজতাভ খাট থেকে নেমে দরজা খুলে দেখলেন বন্দিশ সিং এসে হাজির হয়েছেন। আর তার সঙ্গে আছেন মাঝবয়সি একজন অপরিচিত ভদ্রলোক। নবাগত লোকটার পরনে জামা, ট্রাইউজার, হাতে দামি ঘড়ি, পায়ে জুতো। তার চেহারা যেন বলে দিচ্ছে লোকটা শহুরে মানুষ।

বন্দিশ সিং তার সঙ্গের লোকটার পরিচয় দান করে বললেন, ‘ইনি, বাঘেলা সিং, সম্পর্কে আমার জ্ঞাতি ভাই। অর্থাৎ ইনিও একজন রাজবংশধর, ভূপাল শহরে থাকেন।’

বন্দিশ সিং-এর কথা শুনে রজতাভ নমস্কার বিনিময় করলেন বাঘেলা সিং-এর সঙ্গে।

বন্দিশ সিং বললেন, ‘বাঘেলা ওই ফরমানটা একটু দেখতে চায়। আসলে ও এসেছিল বংশের প্রাচীন জিনিসগুলো কেনার জন্য। আমি ওকে জানিয়েছি যে শেষ জিনিসটা আপনাকে বিক্রি করে দিয়েছি। জিনিসটা এখন আপনার। আপনি ফরমানটা ওঁকে দেখাবেন কিনা এখন আপনার সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।’

লোকটা বন্দিশ সিং-এর আত্মীয় জেনে রজতাভবাবু আর আপত্তি না করে বললেন, ‘হ্যাঁ, দেখাচ্ছি। ভিতরে আসুন।’

বন্দিশ সিং বললেন, ‘আপনাদের দুজনের মধ্যে যখন পরিচয় হয়ে গেল তখন আপনারা এবার কথা বলুন। আমাকে এখনই একটা জরুরি কাজে বাইরে বেরোতে হবে। টাঙা তৈরি হয়ে আছে।’—বাঘেলা সিংকে রেখে চলে গেলেন নিজের কাজের জন্য।

ঘরে পা রেখে বাঘেলা সিং হেসে বললেন, ‘আমার নামের মধ্যে ”বাঘ’ এবং সিং অর্থাং ‘সিংহ’ শব্দটা থাকলেও আমি কিন্তু খুব নিরীহ মানুষ। ভূপাল শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। ইতিহাস পড়াই ছাত্রদের। বন্দিশ সিং যে বিজ্ঞাপনটা করেছে সেটা কালই আমার চোখে পড়েছে। তা দেখার পর আমি ভাবলাম যদি বংশের জিনিসগুলো কিনে রাখি তবে সে সব আর বাইরের লোকের হাতে যায় না। কিন্তু এখানে এসে জানতে পারলাম সে সব বিক্রি করে দিয়েছে। তাই একবার জিনিসটা আপনার কাছে দেখতে এলাম।’

বাঘেলা সিং-এর কথা শুনে রজতাভবাবু মৃদু হেসে খাপ থেকে কাগজটা বের করে বাড়িয়ে দিলেন বাঘেলা সিং-এর দিকে। বাঘেলা কাগজটা খুলে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন কাগজের গায়ের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কালির আঁচড়গুলোর দিকে।

বাঘেলা সিং একভাবে কাগজের লেখাগুলোর দিকে চেয়ে আছেন দেখে রজতাভবাবু তাঁকে বললেন, ‘যতটুকু জানলাম তাতে কাগজের লেখাগুলো ফার্সি। আপনি ফার্সি ভাষা জানেন?’

প্রশ্ন শোনার পর কাগজটা আবার রোল করে রজতাভবাবুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বাঘেলা সিং হেসে বললেন, ‘না, আমি হিন্দি, ইংরাজি ছাড়া অন্য ভাষা জানি না। এত পণ্ডিত হলে বিদেশে গিয়ে ছাত্র পড়াতাম। তবে হ্যাঁ, নিজেদের বংশ গরিমা নিয়ে আমি বেশ গর্ব বোধ করি। আমি বীর সিং দেও বুন্দেলার বংশধর!’

রজতাভবাবু বললেন, ‘গর্ব বোধ থাকাই স্বাভাবিক। রাজরক্ত বইছে আপনার শরীরে।’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘হ্যাঁ, সেই রক্তের টানের জন্যই তো পারিবারিক জিনিসগুলো নিজে কিনে নেবে ভেবেছিলাম। তাছাড়া আমি ইতিহাস পড়াই বলে ইতিহাস নিয়ে আমার বাড়তি আগ্রহ আছে।’

এ কথা বলার পর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘আপনাকে একটা কথা বলি? বন্দিশ সিং-এর মুখে শুনলাম, এই ফরমানটা নাকি আপনি দু-লাখ টাকায় কিনেছেন। আমি আপনাকে আরো বিশ হাজার দেব। জিনিসটা আমাকে বিক্রি করবেন?’

এ প্রস্তাব শুনে রজতাভবাবু বললেন, ‘আমি জিনিসটা সবেমাত্র হাতে পেলাম। আমি জিনিসটা বিক্রির জন্য কিনেছি ঠিকই তবে কী দামে বিক্রি করব তা ঠিক করিনি। আমি আপনাকে ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। আমি কলকাতাতে ফিরলে আপনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’—একথা বলার পর রজতাভবাবু তাঁর পার্স থেকে নিজের ভিজিটিং কার্ড বার করে সেটা বাঘেলা সিং-এর হাতে তুলে দিলেন। কার্ডটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বাঘেলা সিং সেটা পকেটে রাখলেন। তারপর বললেন, ‘এ বাড়ির মালিকের মুখে শুনলাম, আপনি নাকি তিন রাত এ বাড়িতে থাকবেন। এই সময়ের মধ্যে যদি আপনার মতের পরিবর্তন হয় আমাকে জানাবেন। আমরা রাজবংশধর বলে দুর্গের মধ্যে এখনও আমাদের থাকার ব্যবস্থা আছে। ওখানেই কয়েকদিন আমিও আছি। নিশ্চয়ই এর মধ্যে আবারও আমাদের দেখা হবে।’

রজতাভবাবু বললেন,’যদিও কখনই আমার মত পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, তবুও জিনিসটা বিক্রির ব্যাপারে আমার মনে যদি কোন ভাবনা আসে, তবে তা নিশ্চয়ই জানাব আপনাকে।’

এরপর সামান্য কিছু কথাবার্তা বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

রজতাভবাবু কাগজটা খোলে ভোরে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সূর্য ঢলে পড়েছে মাথার ওপর দূর্গ প্রাকারের আড়ালে। সন্ধ্যা নামার আগে কেমন যেন একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে সামনের ধ্বংসস্তূপের গায়ে। সেদিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঘরে ফিরে এলেন রজতাভবাবু। বাইরে অন্ধকার নামল কিছু সময়ের মধ্যেই। ঘরের বাতি জালালেন তিনি। ভোল্টেজ কম বলে ঘরের বাতিটা যেন ফ্যাকাসে ম্যাট ম্যাটে। আসার পথে হাওড়া স্টেশন থেকে একটা বই কিনেছিলেন রজতাভবাবু। ট্রেনে আসতে আসতে বইটা প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন রজতাভবাবু। সেই বইটাই আবার তিনি খুলে বসলেন।

পাঁচ

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই রজতাভবাবুর বইটা পড়া শেষ হয়ে গেল। বাইরে তখন চাঁদের আলো ফুটে উঠেছে। জানলা দিয়ে তা চোখে পড়ার পর ঘর থেকে বারান্দাতে বেরিয়ে এলেন তিনি। চাঁদের আলোতে সামনের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন হাবেলি, মাথার ওপরের দুর্গে, চারপাশে কেমন একটা অদ্ভুত অপার্থিবভাব ছড়িয়ে আছে! কোনও কাজ নেই রজতাভবাবুর। একটু হেঁটে আসার জন্য বারান্দা থেকে নীচে নেমে পড়লেন তিনি।

বেশ কয়েকবার পুরোনো হাবেলির ধ্বংসস্তূপ আর নতুন হাবেলির মধ্যবর্তী জমিতে পায়চারি করার পর হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন একজন লোককে। ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে লোকটা। ভালো করে তাকে দেখার পর রজতাভবাবুর মনে হল, দু-হাত পিছনে দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে সে লোক!

রজতাভবাবু কৌতূহলবশত এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন লোকটার সামনে। লোকটার পরনে চোস্ত পাজামার ওপর হাঁটুর নীচ পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা ঝুলের শেরওয়ানির মতো পোশাক, চওড়া কোমর বন্ধনী, পায়ে নাগরা, মাথায় পাগড়ি। হ্যাঁ, একটু ঝুঁকে মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে লোকটা! রজতাভবাবু একটু ইতস্তত করে তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনি কি কিছু খুঁজছেন?’

প্রশ্ন শুনে লোকটা মুখ তুলে তাকাল তার দিকে। তার গালের দু-পাশ বেয়ে চিবুকের বেশ কিছুটা নীচ পর্যন্ত নেমে এসেছে সাদা দাঁড়ি। লোকটার চেহারা, পোশাক সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে তার মধ্যে একটা ইসলামিক ছাপ আছে।

প্রশ্ন শুনে প্রৌঢ় লোকটা কয়েক মুহূর্ত রজতাভবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘হ্যাঁ, খুঁজছি। আপনার পরিচয়টা?’

রজতাভ বললেন, ‘আমি এই হাবেলির মালিক রাজা বন্দিশ সিং বুন্দেলার অতিথি। কলকাতা থেকে এখানে কাজে এসেছিলাম। দুটো দিন থাকব এখানে। আপনার পরিচয়?’

স্মিত হেসে লোকটা জবাব দিল, ‘আমিও বুন্দেলার অতিথি হয়েই প্রথমে এখানে এসেছিলাম। তারপর এখানেই রয়ে গেছি। আমাকে এখন স্থানীয় মানুষই বলা যায়। আমার নাম, ইবনে মোবারক।’

মোবারক তারপর রজতাভবাবুকে বললেন, ‘জনাব, আপনার যদি কোনও কাজ না থাকে তবে আসুন একটু বসে গল্প করি?’

ভদ্রলোকের প্রস্তাব শুনে খুশি হয়ে রজতাভবাবু বললেন, ‘না, না, আমার কোনও কাজ নেই। আপনার সঙ্গে কথা বললে বরং ভালোই হবে, সময় কাটবে।’

মোবারক সামনের ধ্বংসস্তূপটা দেখিয়ে বললেন, ‘চলুন ওখানে গিয়ে বসি।’

পাথরের স্ল্যাব, স্তম্ভ, ইত্যাদি খসে পড়ে আছে সেই ধ্বংসস্তূপে। মোবারকের সঙ্গে একটু এগিয়ে গিয়ে ঢালের মাথায় অবস্থিত দুর্গর দিকে মুখ করে বসলেন রজতাভ। আর তার কিছুটা তফাতে একলা দাঁড়িয়ে থাকা একটা স্তম্ভর গায়ে পিঠ দিয়ে বসলেন মোবারক নামে লোকটা। ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দুর্গের দিকে। সেদিকে চোখ রেখে মোবারক জানতে চাইলেন, ‘আপনি দুর্গর ভিতরে গেছেন?’

রজতাভ বললেন, ‘না, যাইনি। আমি আজই এখানে এসেছি। কাল একবার যাব ভাবছি। দুর্গর ভিতর কী কী আছে বলুন তো?’

মোবারক বললেন, ‘ওই যেমন থাকে দুর্গর ভিতর। প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, মন্দির, মসজিদ, অস্ত্রশালা, তোষাখানা, তালাব এসব। আসলে এ দুর্গ তৈরি হয়েছিল সুলতান আমলে, অর্থাৎ মোগল আমলেরও আগে। লোদী বংশের পতনের পর এ দুর্গ পরিত্যক্ত হয়ে যায় বেশ কিছু সময়ের জন্য। তখন এখানে চারপাশে ঘন জঙ্গল, দিনের বেলাতেও বাঘ ঘুরে বেড়াত। আর এ দুর্গে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না থাকায় প্রথম অবস্থায় মোগল সম্রাটরা নারোয়ার দুর্গ নিয়ে মাথা ঘামাননি। তারপর বুন্দেলা রাজপুতরা এ দুর্গে বসবাস করতে শুরু করে। বীর সিং বুন্দেলা ছিলেন তাঁদের দলপতি। তিনি এই দুর্গর কিছুটা সম্প্রসারণ ঘটান। তখন অবশ্য তিনি রাজা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই অরণ্য প্রদেশের একজন বড় ভূস্বামী। এই দুর্গ থেকেই তিনি সম্রাট আকবরের সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। তবে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গির যখন ভারত সম্রাটের সিংহাসন লাভ করেন তখন তিনি বীর সিং বুন্দেলাকে ওরছার রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। ওরছা নগরী হয় এই জঙ্গল প্রদেশের রাজধানী। রাজা বীর সিং বুন্দেলাও তখন এ দুর্গ ত্যাগ করে ওরছা নগরীতে গিয়ে বসাবাস শুরু করেন। আবারও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এ দুর্গ।’—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন মোবারক।

রজতাভবাবু তাঁর কথা শুনে বললেন, ‘বাঃ, আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারলাম দেখছি! তবে আপনার কথা শুনে যতটুকু বুঝলাম তাতে আগ্রা, চিতোর বা গোয়ালিয়র দুর্গর মতো এ দুর্গ ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাই ইতিহাস বইতেও এ দুর্গর কথা পড়িনি।’

মোবারক বললেন, ‘তা ঠিক। তবে এখানেও এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যা না ঘটলে হয়তো বা মোগল বংশের ইতিহাস একটু অন্য ভাবে লেখা হত। বলতে গেলে সবাই সেই ঘটনার কথা ভুলে গেছে। হয়তো বা ইতিহাস বইয়ের কোনও পাতায় নিতান্তই অবহেলায় এক লাইন লেখা থাকে সে ঘটনা সম্পর্কে।’—এ কথা বলে যেন দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মোবারক নামের লোকটা।

‘ঘটনাটা কী?’ জানতে চাইলেন রজতাভবাবু।

তিনি এবার রজতাভবাবুর কথা শুনে যেন একটু উৎসাহিত ভাবে বললেন, ‘শুনবেন সেই ঘটনাটার কথা? তবে সে কাহিনি বলি আপনাকে?’

রজতাভ বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন? ইতিহাসের গল্প শুনতে আমার ভালোই লাগে।’

চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সামনের ঢালের মাথার অবস্থিত প্রাচীন দুর্গ প্রাকার আর তার ভিতর থেকে উঁকি দেওয়া সৌধগুলোর গায়ে। সেদিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে থাকার পর মোবারক বলতে শুরু করলেন তাঁর কথা—

‘এ কাহিনি ঠিক যে সময়কার তখন মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠান করছেন সম্রাট আকবর আর ওই নারোয়ার দুর্গের অধিপতি বুন্দেলা রাজপুত বীর সিং দেও বুন্দেলা। আকবর জাঁহাপনা তখন মোগল সিংহাসনে থাকলেও তিনি তখন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন। একে একে এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন মহেশ দাস অর্থাৎ বীরবল, মিঁয়া তানসেন, কবি ফৈজী সহ নবরত্ন সভার ছয়জন সদস্য। জীবিত আছেন শুধু প্রধান সেনাপতি রাজা মান সিংহ, আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা মোল্লা ওমর ও সম্রাটের প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর জীবনীকার, আইনি আকবরি গ্রন্থর প্রণেতা আবুল ফজল। এই তিনজনের মাধ্যমেই, তাঁদের পরামর্শ মতোই এখন সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেন সম্রাট।

সম্রাটের তখন তিন পুত্র। সেলিম, মুরাদ ও দানিয়েল। জ্যেষ্ঠ পুত্র সেলিমকেই তাঁর শৈশব কৈশোরে সর্বাপেক্ষা স্নেহ করতেন সম্রাট। মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসাবে তাকে গড়ে তোলার জন্য চেষ্টার কোনও ক্রটি রাখেননি সম্রাট। তিরিশজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল যুবরাজ সেলিমকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য। তাঁরা কেউ শাহজাদাকে ফারসি, আরবি, সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা দিতেন, কেউ চিত্রকলা বা নান্দনিক বিষয় শিক্ষা দিতেন, আবার কেউ বা দিতেন অস্ত্র শিক্ষা।

যুবক বয়সে পদার্পণ করার পর থেকেই সেলিম আয়েসি ও ভোগ বিলাসি হয়ে উঠলেন, যদিও মোগল সিংহাসনে বসার জন্য তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। কিন্তু তাঁর উৎশৃঙ্খলতার কারণে এক সময় তাঁর প্রতি বিরূপ হয়ে উঠে ভারত সম্রাট ঠিক করলেন মধ্যম পুত্র মুরাদকে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত করবেন। কিন্তু ভাগ্য এবারও সম্রাটকে সাহায্য করল না। হঠাৎ কোন অজানা কারণে তীব্র পানাসক্ত হয়ে পড়লেন মুরাদ। সম্রাট নানা ভাবে চেষ্টা করেও তাকে নেশা মুক্ত করাতে পারলেন না। তিনি রক্ষীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন কোনও ভাবেই একবিন্দু পানীয়ও যেন মুরাদের কাছে পৌঁছতে না পারে। বন্দুকের নলের মধ্যে ভরে লুকিয়ে পান করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটল শাহজাদা মুরাদের। হয়তো বা মধ্যম ভ্রাতার মৃত্যুর পর নিজের বিশ্বাসের স্থান পিতার পাশে সেই দুঃসময় দাঁড়িয়ে আবার ফিরিয়ে আনতে পারতেন সেলিম। কিন্তু তিনি তা না করে পিতার অপছন্দের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে শুরু করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই বীর সিং বুন্দেলা।

যাই হোক, বয়সের ভারে, দীর্ঘ দিনের ক্লান্তিতে, একের পর এক সুহৃদদের চলে যাওয়াতে, পুত্র শোকে একসময় তাঁর শাসন কার্যে অতি সামান্য হলেও স্লথতা এসেছিল। আর সেই সুযোগকেই কাজ লাগালেন কিছু মানুষ। দাক্ষিণাত্যের রাজারা একের পর এক বিদ্রোহ ঘোষণা করতে লাগলেন, কেউ বা কর দেওয়া বন্ধ করলেন, এই নাওয়ার দুর্গের অধিপতিও নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেছিলেন। তাঁকে বশ্যতা স্বীকার করাবার জন্য দু-দুবার সেনা পাঠাতে হল সম্রাটকে। তবে তাঁর বড় আঘাতটা এল জ্যেষ্ঠপুত্র সেলিমের থেকে।

যুবরাজ তখন এলাহাবাদে। মোগল সিংহাসনে বসার জন্য আর ধৈর্য না রাখতে না পেরে তিনি নিজেকে স্বাধীন রাজা বলে ঘোষণা করেছিলেন। রাজা বা সম্রাটদের মতো শাহজাদা সেলিমও জায়গির বিলোতে শুরু করলেন ভূস্বামীদের। আর যে সব ভূস্বামীরা সম্রাটের পরিবর্তে শাহজাদাকে খাজনা পাঠাতে লাগল। বলতে পারেন আমার আসল কাহিনি শুরু ঠিক এই পটভূমিতেই।’—এ কথাগুলো একটানা বলে মোবারক নামের লোকটা তাকালেন রজতাভবাবুর দিকে।

রজতাভবাবু মন দিয়ে লোকটার কথা শুনে যাচ্ছিলেন। তাই তিনি থামতেই রজতাভ বললেন, ‘থামলেন কেন? আমার কিন্তু বেশ লাগছে শুনতে।’

কাছেই একটা ভাঙা দেওয়ালের ছায়া পড়েছে লোকটার গায়ে। আলো-ছায়া খেলা করছে লোকটার মুখ-মণ্ডলে। রজতাভবাবুর কথা শুনে যেন মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

ছয়

‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম, সম্রাট তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। একে একে বিদায় নিয়েছেন তাঁর প্রিয় সহচররা। তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজল দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত। প্রধান সেনাপতি মান সিংহ নিয়োজিত নানা রাজকার্যে। সম্রাট তার সঙ্গে কাজকার্যের আলোচনা ব্যতিরেকে তেমন সময় কাটাতে পারেন না। আর এ সব কারণে ধীরে ধীরে একাকীত্বও গ্রাস করতে শুরু করল সম্রাটকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে একটা দুশ্চিন্তাও উদয় হল সম্রাটের মনে। তা হল, হঠাৎ যদি তাঁর মৃত্যু হয় তবে মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী কে হবেন? এই চিন্তাই কুরে কুরে খেতে লাগল সম্রাটের মনকে।

পিতার বিরুদ্ধে কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করা জেষ্ঠ পুত্র সেলিমকে সম্রাট নিজে তো বটেই এমন কী তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজল বা মান সিংহ কেউই মোগল সিংহাসনে দেখতে চান না। তাঁরা সিংহাসনের জন্য বেছে নিতে চান সম্রাটের কনিষ্ঠ পুত্র দানিয়াল অথবা সেলিমের পুত্র খসরুকে। কিন্তু তাঁদের দুজনের মধ্যে ভাবী মোগল সম্রাট হিসাবে কাকে বেছে নেবেন তিনি?

শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করার জন্য একদিন তিনি মান সিংহকে ডেকে পাঠালেন। তাঁকে তিনি বললেন যে, যথা সম্ভব দ্রুত তিনি তাঁর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে দিতে চান। মানসিংহ সম্রাটকে বললেন আলোচনার জন্য দাক্ষিণাত্য থেকে আবুল ফজলকে ডেকে পাঠানো হোক। তারপর তিনজনে বসে আলোচনা করে খসরু অথবা দানিয়ালের মধ্যে থেকে কাউকে নির্বাচিত করা যাবে মোগল সিংহাসনের জন্য। তার সঙ্গে তিনি এ কথাও সম্রাটকে বললেন যে, সম্রাট তাঁর উত্তরাধিকারী নির্বাচন করার পর শাহজাদা সেলিমের সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করার সম্ভাবনা আছে। সে পথ বন্ধ করতে হবে। তেমন কোনও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটলে নারওয়ার দূর্গের অধিপতি যাতে সেলিমকে কোনওরকম সাহায্য না করেন সেই মর্মে তাকে ফরমান পাঠাতে হবে। আবুল ফজল যখন মধ্যভারত হয়ে আগ্রাতে ফিরবেন, তখন যেন তিনি বীর সিং বুন্দেলার হাতে সম্রাটের সে ফরমান তুলে দিয়ে আসেন।

প্রধান সেনাপতির পরামর্শ মতো বীর সিং বুন্দেলার উদ্দেশ্যে একটা ফরমান প্রস্তুত করলেন সম্রাট। হাতির দাঁতের খোলে গালা দিয়ে মুখ বন্ধ করা সেই ফরমান নিয়ে বার্তাবাহক রওনা হয়ে গেল দাক্ষিণাত্যের দিকে।

কিন্তু এ খবর দ্রুত পৌঁছে গেল শাহজাদা সেলিমের কাছে। সরকারি নির্দেশ বা ফরমান, চিঠি যে দপ্তরে প্রস্তুত করা হয় সেখানে একজন চর নিয়োজিত করে রেখেছিলেন শাহজাদা। সম্রাটের সুহৃদ আবুল ফজলের বিরুদ্ধে তিনটে কারণে ক্ষুব্ধ ছিলেন শাহজাদা। এই কারণগুলো হল সম্রাট প্রবর্তিত ‘দীন ই ইলাহী’ ধর্ম ভাবনার প্রধান প্রচারক ছিলেন আবুল ফজল। আর শাহজাদা সেলিম ছিলেন ইসলামের প্রতি আস্থাবান।

আবুল ফজলের প্রতি সেলিমের ঘৃণা পোষণ করার আর একটা কারণ ছিল, যৌবনে একবার এক নর্তকীর প্রেমে পড়েছিলেন বাদশাজাদা। শোনা যায় সম্রাটও নাকি সেই সুন্দরী নর্তকীর প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলেন। যদিও সম্রাটের হারেমে সুন্দরী নারীর কোনও অভাব ছিল না। নর্তকী, শাহজাদার প্রগাঢ় প্রেমে ভেসে চলেছিলেন। কিন্তু যৌন ঈর্ষা বড় ভয়ঙ্কর জিনিস, তা পিতা-পুত্রর সম্পর্ক মানে না। ব্যাপারটা সম্রাট জানতে পারার পর সেই নর্তকীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেলিমের অনুমান সেই নর্তকীকে কোনও অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়, আর এ ঘটনার পিছনে ছিলেন সম্রাটের প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজল। তবে আবুল ফজলের প্রতি শাহজাদার ঘৃণার প্রধান কারণ হল, তিনি এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে আবুল ফজলের কারণেই সম্রাট তাঁকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করতে চলেছেন! যা আবুল ফজল দাক্ষিণাত্য থেকে আগ্রা ফেরার পর বাস্তবয়িত হবে।

এদিকে এই নারওয়ার দুর্গের অধিপতি বীর সিং দেও বুন্দেলা দুবার সম্রাটের পাঠানো সেনাদলের কাছে পরাস্ত হয়ে পুনরায় তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনচেতা এই সামন্ত রাজপুত কখনোই ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি গোপনে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন শাহজাদার সঙ্গে। সেলিম তাকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, প্রয়োজনে যদি তিনি বীর সিং-এর সাহায্য পান, তবে যেদিন সেলিম মোগল সিংহাসনে আরোহন করবেন, সেদিনে বীর সিংকে ওরছার অধিপতি হিসাবে ঘোষণা করবেন। এবং মোগল দরবারে তাঁকে সম্রাটের উপদেষ্টার সম্মান দেবেন। সম্রাটের বার্তাবাহক দাক্ষিণাত্যে রওনা হয়েছে শুনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন সেলিম।

আগ্রা থেকে দাক্ষিণাত্য অশ্বপৃষ্ঠে এক মাসের পথ। তার মধ্যে কিছুটা পথ আবার গেছে মধ্যভারতের অরণ্যাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে। সে পথে প্রায়সই তস্কর বা ডাকাতদের উপদ্রব হয়। তাই বার্তাবাহকের সঙ্গে তিনজন রক্ষীও ছিল। কিন্তু বার্তাবাহকরা যখন সে জঙ্গল অতিক্রম করে এক সন্ধ্যায় রাত্রিবাসের জন্য তাঁবু ফেলেছে, তখন একদিন হঠাৎই বেশ বড় একটা ডাকাতদল এসে ঘিরে ধরল তাদের। অতজন ডাকাতের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা ছিল না রক্ষী দলের। তাই ডাকাতদের হাতে বন্দি হল বার্তাবাহক আর তাঁর সঙ্গীরা।

ডাকাত দলের লোকেরা প্রথমে তাঁদের থেকে টাকা, অলঙ্কার এসব কেড়ে নিল, তারপর তাঁবুর ভিতর গিয়ে ঢুকল সেখানে লুঠ-পাট করার জন্য। কয়েকজন ডাকাত বেশ কিছু সময় তাঁবুর ভিতরে থাকার পর বেশ কিছু জিনিস নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তবে ডাকাত দলকে ভালোই বলতে হবে। কারণ, জিনিসপত্র লুঠে নিয়ে যাবার সময় তারা বার্তাবাহকদের প্রাণে মারল না আর ঘোড়াগুলোকেও নিল না। ভোরের আলো ফোটার পর বার্তাবাহক তাঁবুতে ঢুকে দেখল ডাকাত দল তাঁবুর ভিতরের সব জিনিস লুঠে নিয়ে গেলেও তাঁবুর এক কোণে হাতির দাঁতের খোলে সেই ফরমানটা পড়ে আছে। বার্তাবাহক অনুমান করল অন্ধকারে সম্ভবত জিনিসটা লুঠেরাদের কাছ থেকে পড়ে গেছে বা জিনিসটা তারা খেয়াল করেনি। যাই হোক, গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা রক্ষা পেয়েছে দেখে স্বস্তি পেলেন বার্তাবাহক। সেটা নিয়ে তাঁবু গুটিয়ে সে আবার রওনা হল গন্তব্যের দিকে।

পথে আর কোনও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হল না বার্তাবাহকদের। আগ্রা থেকে যাত্রা শুরু করার এক মাস পর দাক্ষিণাত্যে আবুল ফজলের কাছে পৌঁছল তারা। আবুল ফজল বার্তাবাহকের হাত থেকে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন সম্রাটের মোহর লাগানো, গালা দিয়ে আঁটা ফরমানের খোলটা অক্ষতই আছে। বার্তাবাহককের উপযুক্ত পারিতোষক দিয়ে বিদায় জানালেন আবুল ফজল।

অধস্তন সেনাপতির দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে সাতদিন মতো সময় লাগল আবুল ফজলের। তারপর তিনি মাত্র কয়েকজন দেহরক্ষী দিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছর পর দাক্ষিণাত্য ছেড়ে রওনা হলেন আগ্রা ফেরার জন্য। বহুদিন পর সম্রাট আর পরিজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে বলে বেশ উৎফুল্ল মনেই পথ চলতে লাগলেন তিনি। সপ্তাহ দুয়েক অতিক্রান্ত হবার পর তারা এসে উপস্থিত হলেন সে সময়ে জঙ্গল প্রদেশের মধ্যে অবস্থিত এ অঞ্চলে। দূর থেকে তিনি দেখতে পেলেন দুর্গর মাথায় উড়ছে সম্রাট আকবরের পতাকা। যার অর্থ হল দুর্গ অধিপতি সম্রাট আকবরের অনুগত অথবা সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করেছেন। পতাকাটা দেখে আবুল ফজল নিশ্চিন্ত মনে এগোলেন দুর্গের দিকে। এরপর দুর্গ থেকে জঙ্গলে শিকার করতে আসা বীর সিং বুন্দেলার কিছু অনুচরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল মোগল সম্রাটের মহামন্ত্রীর। তারা তাকে নিয়ে চলল দুর্গের দিকে। আবুল ফজল যে আসছেন সে খবর পৌঁছে গেল বীর সিং-এর কাছে। কী উদ্দেশ্যে আবুল ফজল আসছেন তা এখনও ঠিক জানা ছিল না বীর সিং বুন্দেলার। তিনি দুর্গ ছেড়ে নীচে এই হাবেলিতে নেমে এলেন। এটি তখন ছিল একটি অতিথিশালা। এখানেই প্রথম সাক্ষাত হল আবুল ফজল ও বীর সিং বুন্দেলার।’—এ পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন মোবারক নামের লোকটা।

পিছনের হাবেলির বারান্দা থেকে রজতাভবাবুর উদ্দেশ্যে ছত্তর সিং হাঁকা দিচ্ছে—’সাব? সাব? খানা লায়া?’

মোবারক বলে লোকটার গল্প তখনও শেষ হয়নি। রজতাভবাবুর বেশ লাগছে লোকটার বলা কাহিনি। এদিকে খাবার নিয়ে এসেছে ছত্তর সিং। রজতাভবাবু তাকালেন লোকটার দিকে। লোকটা সেই হাঁক শুনে রজতাভবাবুকে বললেন, ‘আপনাকে ডাকছে যখন এখন আপনি যান। আপনি তো দু-দিন আছেন এখানে। নিশ্চয়ই আবার আমার সঙ্গে আপনার দেখা হবে। তখন বাকি গল্পটা শোনাব আপনাকে। আমাকেও এখন দুর্গে ফিরতে হবে।’

মোবারক নামের লোকটার কথা শুনে রজতাভবাবু আশস্ত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, সেই ভালো। বাকি গল্প পরে শুনব।’

এরপর নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন দুজনেই। মোবারক এগোলেন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দুর্গে ফেরার জন্য। আর রজতাভবাবু ফিরে এলেন হাবেলিতে। রাতের খাবার সেরে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। এক রাত কেটে গেল।

সাত

পরদিন সকাল আটটা নাগাদ ঘুম ভাঙল রজতাভবাবুর। বাইরে এখন আলো ঝলমল করছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে পুরোনো হাবেলির ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেশ কয়েকটা ময়ূরকে ঘুরে বেড়াতে দেখলেন রজতাভবাবু। সেদিকে তাকিয়ে গত রাতের লোকটার কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। ময়ূরগুলো যেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঠিক ওখানেই বসে গতরাতে গল্প বলছিল লোকটা।

রজতাভবাবুর ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাতরাশ দিয়ে গেল ছত্তর সিং। রজতাভবাবু হাত-মুখ ধুয়ে প্রাতরাশ খেয়ে বাইরে বেরোবোর জন্য তৈরি হলেন। ঠিক এই সময় তাঁর খবর নেবার জন্য হাজির হলেন বন্দিশ সিং। সুপ্রভাত বিনিময় করে তিনি জানতে চাইলেন, ‘রাত কেমন কাটল?’

রজতাভবাবু জবাব দিলেন, ‘ভালোই। নানান জায়গাতে কাজের প্রয়োজনে রাত কাটানো আমার অভ্যাস আছে।’

বীর সিং বুন্দেলার বংশধর এরপর প্রশ্ন করলেন, ‘কাল কী কথা হল আমার জ্ঞাতি ভাইয়ের সঙ্গে?’

রজতাভবাবু বলেন, ‘উনি ফরমানটা দেখার পর কিনতে চাইছিলেন। আমি ওনাকে বলেছি আমি কলকাতায় ফেরার পর যোগাযোগ করতে। তবে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম উনি আপনাদের বংশ গরিমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’

রজতাভাবাবুর কথা শুনে বন্দিশ সিং প্রথমে বললেন, ‘হ্যাঁ, ও পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। লেখাপড়া জানা লোক। সেজন্যই পরিবারের পুরোনো জিনিসগুলো কিনতে এসেছিল।’

এ কথা বলে বৃদ্ধ বন্দিশ সিং যেন একটু আক্ষেপের স্বরে বললেন, ‘বাঘেলা সিং পড়াশোনা জানা ভদ্রলোক। কিন্তু ওর ভাই বিছুয়া সিং একেবারে উল্টো প্রকৃতির। বিছুয়া বদ সঙ্গে পড়ে লেখাপড়া করেনি, জুয়ার নেশায় পড়ে একদম গোল্লায় গেছে। আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখি না।’ এরপরই এ প্রসঙ্গে আর কোনও কথা না বলে বন্দিশ সিং বললেন, ‘বেরোচ্ছেন যখন, তখন ওপরে উঠে দুর্গটা একবার ঘুরে আসুন। এখন আমার পায়ে জোর কমে যাওয়াতে ওপরে উঠতে কষ্ট হয়। নইলে আপনার সঙ্গী হতাম। তবে আপনি চাইলে আমি সঙ্গে কোনও লোক পাঠাতে পারি।’

বন্দিশ সিং-এর কথা শুনে রজতাভবাবু বললেন, ‘লোক লাগবে না। আমি নিজেই ঘুরে দেখে নেব।’

বন্দিশ সিং বললেন, ‘আপনার যা ইচ্ছা। তবে পুরোনো হাবেলির ধ্বংশস্তূপের গা বেয়ে যে রাস্তা আছে সেটা বেয়ে ওপরে উঠুন। কেউ যদি আপনাকে কিছু জিগ্যেস করে তবে তাকে বলবেন, আপনি রাজা বন্দিশ সিং বুন্দেলার অতিথি। তা জানলে কেউ আপনাকে বাধা দেবে না বা বিরক্ত করবে না।’

হাবেলির মালিক রজতাভবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চলে যাবার পর দরজায় তালা দিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। বন্দিশ সিং-এর পরামর্শ মতো পুরানো হাবেলির ধ্বংস্তূপের গায়ের রাস্তা বেয়ে রজতাভবাবু ওপরে উঠতে লাগলেন। সে পথে উঠতে উঠতে তাঁর মনে হল, গতরাতের লোকটার সঙ্গে হয়তো বা দুর্গের মধ্যে তাঁর দেখা হয়ে যেতে পারে। তা হলে তাঁর মুখ থেকে বাকি গল্পটাও হয়তো শোনা হয়ে যাবে। এরপর কী ঘটল আবুল ফজলের সঙ্গে বীর সিং বুন্দেলার পর? ঢালের রাস্তা বেয়ে ওপরে উঠে এক সময় দুর্গে প্রবেশ করলেন রজতাভবাবু।

নীচ থেকে ঠিক বোঝা না গেলেও ওপরে ওঠার পর রজতাভবাবু বুঝতে পারলেন বিরাট জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে আছে এ দুর্গ। তার মধ্যে রয়েছে বহু বাড়ি, ঘর, মন্দির, জীর্ণ প্রাসাদ বা প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এসব। গাইড ছাড়া এই দুর্গ নগরীর দ্রষ্টব্য স্থানগুলো ঘোরা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েকজন গাইড দুর্গর ভিতরই ঘোরাফেরা করছিল। রজতাভবাবুকে দেখে তাদের কয়েকজন এগিয়ে আসতেই তাদের মধ্যে সব থেকে বেশি বয়সি লোকটাকে বেছে নিয়ে রজতাভবাবু দুর্গ পরিক্রমা শুরু করলেন।

গাইড চলতে চলতে রজতাভবাবুকে বলতে লাগল দুর্গ সম্পর্কে— ‘নল-দময়ন্তীর কাহিনি হয়তো আপনি শুনে থাকবেন স্যার। সেই নল রাজার রাজত্ব মহাভারতের যুগে ছিল এখানেই। পৌরাণিক রাজার নাম অনুসারে প্রথমে এ জায়গার নাম ছিল ‘নলপুর’ বা ‘নলওয়ার’। তার থেকেই নারওয়ার কথাটা এসেছে। গোয়ালিয়রের রাজারা এক সময় এই দুর্গের অধিপতি ছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে এ দুর্গের দখল নেয় রাজপুতরা। আকবরের আমলে বীর সিং দেও বুন্দেলা ছিলেন এই দূর্গের মালিক। সিপাহি বিদ্রোহের সময় তাঁতিয়া টোপী একবার এ দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন—।’ ইত্যাদি নানা কথা বলতে বলতে গাইড রজতাভবাবুকে নিয়ে দুর্গ ঘোরাতে শুরু করল। দুর্গর ওপর থেকে যতদূর চোখ যায় চারপাশে ছড়িয়ে আছে চম্বল উপত্যকা। শুধুই সবুজের সমারোহ। পাঁচ-সাতশো বছর আগে আরও গভীর জঙ্গল ছিল। মনে মনে সেদিন এ দুর্গের দুর্গমতা যেন কল্পনা করতে পারলেন রজতাভবাবু।

একে একে দুর্গের নানা দর্শনীয় স্থান ‘তাল কাটোরা’ জলাশয়, চন্দনখেত মহল, কোচৌরি মহল, রাজা নলের মন্দির, ইত্যাদি দেখে বেড়াতে লাগলেন রজতাভবাবু। জীর্ণ হয়ে গেলেও এখনও বেশ কিছু মহলের শিল্প সুষমা তাক লাগিয়ে দেবার মতো। দুর্গর ভিতর এক জায়গাতে বিরাট একটা কুস্তির আখড়া আছে। যেখানে কুস্তি শিখতেন রাজারা। বিশাল দুর্গের ভিতর নানা জায়গা ঘুরতে ঘুরতে কখন যে তিন ঘণ্টা সময় কেটে গেল রজতাভবাবু বুঝতেই পারলেন না। গাইড এক সময় রজতাভবাবুকে এনে দাঁড় করালেন দুর্গর প্রাচীনতম অংশে। বিরাট একটা প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে সেখানে। চারপাশে যে ঘর বাড়িগুলো আছে যেগুলোও জীর্ণ। বেশ কয়েকটা কুয়োও আছে সেখানে। তবে তাদের কোনও রেলিং নেই। পাছে কেউ তার ভিতরে পড়ে যায় সেজন্য তাদের মুখগুলো লোহার জাল দিয়ে ঢাকা। মরচে পড়ে স্থানে স্থানে ভেঙে গেছে জালগুলো।

রজতাভবাবু একটা কুয়োর ভিতর উঁকি দিলেন। এত গভীর যে তল দেখা যায় না! গাইড বলল, ‘এখানেই বীর সিং বুন্দেলার প্রাসাদ ছিল। আর এই কুয়োগুলো দিয়ে জায়গাটা ঘেরা ছিল। দুর্ঘটনা এড়াতে অধিকাংশ কুয়োরই মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সরকার থেকে। কয়েকটা কুয়ো শুধু রেখে দেওয়া হয়েছে টুরিস্টদের দেখার জন্য।

এই কুয়োগুলো এক সময় প্রাসাদের জলের অভাব মেটাত। তেমনই প্রাসাদের নিরাপত্তা বিধানও করত। রাতের অন্ধকারে অপরিচিতর কেউ প্রাসাদের দিকে এগোলে, তার এই কুয়োগুলোর অবস্থান জানা না থাকলে, কুয়োর ভিতর পড়ে মৃত্যু ঘটত।’

বীর সিং বুন্দেলার প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ দেখাবার পর গাইড জানিয়ে দিল তার দুর্গ ঘোরানো এবার শেষ। শুধু মিউজিয়ামটা দেখাতে পারল না। রিনভেশনের কাজ চলার কারণে সেটা বন্ধ আছে বলে।

এরপর রজতাভবাবুর কাছ থেকে গাইড তার পাওনা বুঝে নিয়ে চলে গেল।

দুর্গের ভিতর অনেকক্ষণ রজতাভবাবু ঘুরে বেড়িয়েছেন, বেশ অনেকবার পাথরের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামাও করতের হয়েছে তাঁকে। শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছিল তার। তাই তিনি ভাবলেন, একটু জিরিয়ে নিয়ে তিনি ফেরার পথ ধরবেন। এ কথা ভেবে নিয়ে তিনি বীর সিং-এর প্রাসাদের কাছেই একটা গাছের নীচে পাথরের বেদিতে বসলেন। জায়গাটা বেশ ঠান্ডা। সেখান থেকে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সবুজ মাখা চম্বল উপত্যকা। রুপোলি ফিতের মতো নদী বয়ে চলেছে তার ভিতর দিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ সে জায়গায় বসে নয়নাভিরাম সবুজ উপত্যকার দিকে তাকিয়ে থাকার পর রজতাভবাবুর মনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। তিনি উঠে পড়লেন ফেরার জন্য।

রজতাভবাবু কয়েক পা এগোবার পরই হঠাৎ একটা লোককে দেখতে পেলেন। কাছেই একটা প্রাচীন পাথুরে বাড়ির আড়াল থেকে লোকটা বেরিয়ে এল। তার পরনে স্থানীয় লোকদের মতো পোশাক, মাথায় পাগড়ি, পায়ে নাগরা। কিন্তু এ পোশাকেও লোকটাকে চিনতে পারলেন রজতাভবাবু। লোকটা বাঘেলা সিং। তিনিও দেখতে পেলেন রজতাভবাবুকে। হাসি মুখে তিনি কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘দুর্গ কেমন দেখলেন?’

রজতাভবাবু বললেন, ‘বেশ লাগল! নীচের থেকে দেখে ধারণাই করতে পারিনি যে দুর্গটা এত বড়! একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম, এবার ফিরব।’

রজতাভবাবু এ কথা বলে জানতে চাইলেন, ‘আপনি কোথায় থাকেন?’

বাঘেলা সিং যে জায়গা থেকে বেরিয়ে এলেন, সেদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, ‘ওদিকে একটা ঘরে। যদিও ঘরটাকে কিছুটা মেরামত করে নিতে হয়েছে। আসলে এ জায়গাতেই এক সময় আমার পূর্বপুরুষরা থাকতেন। এখানেই ছিল বীর সিং বুন্দেলার প্রাসাদ ও নানা মহল। এ জায়গাতে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে। যেন আমি এখানে আমার পূর্ব-পুরুষদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। তারা তো আমার মতো দুর্বল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন শক্তিশালী, বীর। আকবর বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁরা তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করতেন। আমার বাড়িতে সে আমলের একটা তলোয়ার আছে। সেটা আমি দু-হাতে তুলেও ধরতে পারি না! তাহলেই বুঝুন তাঁরা কেমন শক্তিশালী লোক ছিলেন!’ এ কথাগুলো বলতে বলতে পূর্ব-পুরুষদের গৌরবে যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল বাঘেলা সিং-এর মুখ।

রজতাভবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, সে যুগের ব্যাপারটাই অন্য রকম ছিল!’

বাঘেলা সিং এরপর বললেন, ‘ভাবছিলাম নীচে নেমে একবার আপনার সঙ্গে দেখা করে আসব। ওই ফরমানের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবলেন? আসলে ওই প্রাচীন জিনিসটার সঙ্গে আমাদের বংশের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই জিনিসটার প্রতি আমার এত আগ্রহ।’

রজতাভবাবু বললেন, ‘না, তেমন কিছু ভাবিনি। আপনাকে তো বলেইছি যে কলকাতায় ফিরে সিদ্ধান্ত নেব।’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘আমি না হয় আপনাকে আরও পাঁচিশ হাজার বেশি দেব। আপনি তো দুটো রাত আছেন এখানে, আমার প্রস্তাবটা একবার ভেবে দেখবেন।’

রজতাভবাবু হেসে বললেন, ‘সিদ্ধান্ত বদলালে আমি জানাব আপনাকে। এবার আমি যাই, বেশ বেলা হল।’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘হ্যাঁ, চলুন। আমি আপনাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিচ্ছি।’

বাঘেলা সিং-এর সঙ্গে পা বাড়াতে গিয়ে রজতাভবাবুর হঠাৎই চোখ পড়ল কিছুটা তফাতে একটা ভাঙা দেওয়ালের দিকে। তার সামনে একটা ছায়া পড়েছে। যেন দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে কেউ! কিন্তু সেদিকে ভালো করে তাকাতেই ছায়াটা যেন মুহূর্তর মধ্যে সরে গেল।

ফেরার সময় রজতাভবাবু জানতে চাইলেন, ‘এখানে থাকতে আপনার কোনও সমস্যা হয় না? এমন পুরোনো নির্জন জায়গা!’

বাঘেলা সিং হেসে বললেন, ‘না, হয় না। এ জায়গা বেশ শান্ত। চোর-ডাকাতের উপদ্রব নেই। আর ভূত-প্রেত, এ সব আমি বিশ্বাস করি না।’

রজতাভবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘আর কারা থাকেন এখানে?’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘বিশাল এই দুর্গের নানা স্থান ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখনও কিছু মানুষ বাস করেন। তাদের সকলের পূর্ব-পুরুষরাই এক সময় এ দুর্গের বাসিন্দা ছিলেন। আর থাকেন এ দুর্গের দায়িত্বে থাকা কিছু সিকিওরিটি গার্ড আর সরকারি কর্মচারি।’

দুর্গ সম্পর্কে নানা কথা বলতে বলতে বাঘেলা সিং তাকে প্রায় নীচে নামার সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।

রজতাভবাবু নীচে হাবেলিতে যখন ফিরলেন তখন বেলা প্রায় একটা। স্নান খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।

তাঁর যখন ঘুম ভাঙল তখন প্রায় সন্ধ্যা। খাট থেকে নামতেই পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলেন তিনি। দীর্ঘক্ষণ ধরে দুর্গে হেঁটে বেড়ানোর ফল। কাজেই ইচ্ছা থাকলেও আর তিনি ঘরের বাইরে বেরোলেন না। সন্ধ্যা রাত তিনি ঘরেই কাটিয়ে দিলেন। রাত ন’টা নাগাদ ছত্তর সিং খাবার দিয়ে চলে গেল। খাবার পর ব্যথার ওষুধ খেয়ে যখন তিনি শুতে যাচ্ছেন তখনই হঠাৎ বাইরের দিকে চোখ গেল তাঁর। জানলা দিয়ে তিনি দেখতে পেলেন চাঁদের আলোতে পুরোনো হাবেলির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে মোবারক নামের লোকটা। মাথা ঝুঁকিয়ে যেন কিছু খুঁজছে! পায়ে ব্যথা নিয়ে এত রাতে আর বাইরে বেরোনো সমীচীন বোধ করলেন না রজতাভবাবু। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি।

আট

আগের দিনের মতোই এদিনও সকালে রজতাভবাবুর প্রাতরাশ সাঙ্গ হবার পর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন বন্দিশ সিং। সুপ্রভাত বিনিময় করে তিনি জানতে চাইলেন, ‘দুর্গ কেমন দেখলেন? কোনও অসুবিধে হয়নি তো?’

রজতাভবাবু বললেন, ‘ভালোই দেখলাম। তবে এত হাঁটার তো অভ্যাস নেই, ফেরার পর কাল পায়ে বেশ ব্যথা হয়েছিল। তবে আমার সঙ্গে টুকটাক ওষুধ থাকে। ব্যথা কমার ওষুধ খেয়ে রাতে শুয়েছিলাম। সকালে উঠে দেখছি ব্যথাটা আর নেই।’

বন্দিশ সিং হেসে বললেন, ‘যাক দুটো রাত আপনি আমার হাবেলিতে কাটিয়ে দিলেন। আর একটা রাত কাটিয়ে দিতে পারলেই হল। আজকে কি আবার দুর্গ দেখতে যাবেন?’

রজতাভবাবু বললেন, ‘দুর্গতে যা আছে তা দেখা হয়ে গেছে। এখানে কোনও রেল স্টেশন আছে? তবে, সেখানে গিয়ে খোঁজ নিতাম ওখান থেকে কোনও গাড়ি সরাসরি কলকাতা যায় কিনা?’

বন্দিশ সিং বললেন, ‘রেল স্টেশন একটা আছে। কিন্তু কলকাতাতে গাড়ি যায় কিনা বলতে পারব না। ছত্তর সিং এখনই টাঙা নিয়ে বেরোচ্ছে রেল স্টেশনের ওদিকে একটা কাজে। সে আপনাকে স্টেশনে নামিয়ে দেবে। আপনি খোঁজ নিয়ে আসতে পারেন।’

বন্দিশ সিং বুন্দেলার কথা মতোই কিছুক্ষণের মধ্যেই ছত্তর সিং-এর টাঙা চেপে হাবেলি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন রজতাভবাবু। সে তাকে নামিয়ে দিল রেল স্টেশনে। রজতাভবাবু খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে একটা গাড়ি জেলা সদর শিবপুরী থেকে নারওয়ার স্টেশন ছুঁয়ে ভূপাল যায়। সেখান থেকে সে গাড়ির একটা বগি কেটে জুড়ে দেওয়া হয় ভূপাল থেকে কলকাতাগামী ট্রেনের সঙ্গে। পরদিন সকালে নারওয়ার স্টেশনে শিবপুরী থেকে ট্রেন আসবে। সে ট্রেনে চাপলে রজতাভবাবুর সুবিধেই হবে। কাজেই সে ট্রেনে রিভারভেশন করে ফেললেন তিনি। প্লাটফর্মের বাইরে বেরিয়ে রজতাভবাবু টাঙা স্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছেন, ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন বাঘেলা সিংকে। কিন্তু রজতাভবাবু তাঁর কাছে পৌঁছবার আগেই তিনি একটা টাঙা ধরে রওনা দিয়ে দিলেন। রজতাভবাবুও এরপর হাবেলিতে ফেরার পথ ধরলেন।

বন্দিশ সিং-এর বাড়িতে ফিরে দুপুর বেলা যখন স্নান খাওয়া সেরে রজতাভবাবু দিবানিদ্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই কড়া নাড়ার শব্দ শুনে তিনি দরজা খুলে দেখলেন, বাঘেলা সিং উপস্থিত হয়েছেন। বাঘেলা সিং তাঁকে বললেন, ‘আমি সকালের দিকে আপনার খোঁজে একবার এখানে এসেছিলাম। শুনলাম আপনি বাইরে গেছেন। মার্জনা করবেন, তাই এ সময় বিরক্ত করতে এলাম।’

রজতাভবাবু ভদ্রতা করে বললেন, ‘না, না, বিরক্ত হইনি। আপনাকে তো আমি রেল স্টেশনের বাইরে দেখলাম। কিন্তু আমি আপনাকে ডাকার আগেই আপনি টাঙায় উঠে পড়লেন।’

কথাটা শুনে বাঘেলা সিং হঠাৎ কেমন থমকে গেলেন।

রজতাভবাবু এরপর বাঘেলা সিং-এর আসার উদ্দেশ্যটা আন্দাজ করে মৃদু হেসে বললেন, ‘আমি কিন্তু ফরমানটার ব্যাপারে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি।’

রজতাভবাবুর কথা শুনে ভদ্রলোকের মুখটা ম্রিয়মান হয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘আপনার মতামত জানা ছাড়াও আমি আর একটা কারণে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। বলতে পারেন একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি। যদিও সে অনুরোধও ওই ফরমান সম্পর্কিত।’

এ কথা শুনে রজতাভবাবু জানতে চাইলেন, ‘কী অনুরোধ?’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘দুর্গে যে মিউজিয়ামটা আছে তার রিনোভেশনের কাজ চলছে, আরও সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার কাজ চলছে। আর সেই কাজের তদারকি করতে দিল্লি থেকে ডক্টর ট্যান্ডন নামে এক ভদ্রলোক এসেছেন। পণ্ডিত ভদ্রলোক। দিল্লির এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। মোগল ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন তিনি। পুরোনো ফার্সি ভাষা পড়তে জানেন তিনি। কাল বিকালে আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হবার পর আমি তাঁকে ফরমানটার ব্যাপারে বলি। তিনি বলেছেন, ফরমানটা পড়ে দেবেন। আপনি যদি একবার ফরমানটা তাকে দেখান তবে ভালো হয়। আমার খুব কৌতূহল আছে ফরমানে কী লেখা আছে তা জানার জন্য।’

বাঘেলা সিং-এর কথা শুনে রজতাভবাবু বললেন, ‘বেশ তো। আমি তো ঘরেই আছি। আপনি নিয়ে আসুন তাঁকে।’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘না, এখানে তিনি আসবেন না। বড় বড় মানুষদের নানান রকম ইগো থাকে। সব সময় চট করে কারো বাড়ি যেতে চান না। তাছাড়া সারা দিন তিনি মিউজিয়ামের কাজে ব্যস্ত থাকেন। দিনের বেলা তাঁর সময় নেই। আমি তাঁকে রাজি করিয়েছি রাতে আমার বাড়ি আসার জন্য। সোজা কথায় তাকে নৈশ ভোজের নিমন্ত্রণ জানিয়েছি। আপনাকেও জানাচ্ছি। যদি আপনি ফরমানটা নিয়ে কেল্লায় আমার বাড়িতে যান তবে লেখাটা সম্পর্কে জানা যেতে পারে। আর তাতে আপনিও অনুমান করতে পারবেন, কাগজটার কী মূল্য আছে?’

ফরমানটাতে কী লেখা আছে তা জানার জন্য রজতাভবাবুর মনেও প্রবল আগ্রহ আছে। ডক্টর পাকড়াশির কাছ থেকে এখনও কোনও খবর আসেনি লেখাটা সম্পর্কে। এখানে থাকতে থাকতেই যদি কেউ লেখাটার পাঠোদ্ধার করে দিতে পারে তবে ভালোই হয়। কিন্তু রাত্রিবেলা দুর্গে যেতে হবে বলে রজতাভবাবু বাঘেলা সিং-এর প্রস্তাব শুনে একটু ইতস্তত করতে লাগলেন।

ব্যাপারটা অনুমান করে বাঘেলা সিং বললেন, ‘আপনার কোনও অসুবিধা হবে না। আমি এই হাবেলিতে এসে আপনাকে নিয়ে যাব, আবার পৌঁছে দিয়ে যাব। আর আমাকে দেখে নিশ্চয়ই চোর-ডাকাত বলে মনে হয় না? আমার খুব জানার ইচ্ছা কাগজে কী লেখা আছে। তাই অনুরোধ করছি।’

বাঘেলা সিং-এর কথা শোনার পর রজতাভবাবু আর তাঁর অনুরোধ ফেরাতে পারলেন না। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি যাব।’

তাঁর জবাব শুনে বাঘেলা সিং খুশি হয়ে বললেন, ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমি সন্ধ্যার পর এসে আপনাকে নিয়ে যাব।’

এ কথা বলার পর বাঘেলা সিং হেসে বললেন, ‘এবার আমি চলি। আমাকে অতিথি আপ্যায়নের বন্দোবস্ত করতে হবে।’

বাঘেলা সিং বিদায় নেবার পর রজতাভবাবু দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন।

তাঁর যখন ঘুম ভাঙল তখন শেষ বিকাল। সূর্য ঢলে পড়েছে দুর্গের আড়ালে। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে রজতাভবাবু ছত্তর সিংকে হাঁক পাড়লেন। সে এসে উপস্থিত হলে রজতাভবাবু তাকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি রাতে খাবেন না। কেল্লায় যাবেন বাঘেলা সিং-এর নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। ফিরতে তাঁর রাতও হতে পারে।’

ধীরে ধীরে বিকালের আলো শেষ হয়ে আসতে লাগল। তারপর এক সময় সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল। বাইরে অন্ধকার নেমে আসার পর রজতাভবাবুও প্রস্তুত হতে লাগলেন তাঁর নৈশ অভিযানের জন্য।

নয়

ঘড়ির কাঁটায় যখন সাতটা বাজল তখন ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন রজতাভবাবু। কাঁধের ব্যাগে খোলে ভরা ফরমানটা। আকাশে ধীরে ধীরে চাঁদ উঠতে শুরু করেছে। অন্ধকার মুছে গিয়ে মাথার ওপরের দুর্গ প্রাকার ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রজতাভবাবু প্রতীক্ষা করতে লাগলেন বাঘেলা সিং-এর জন্য। সময় এগিয়ে চলল।

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে প্রতীক্ষার পর বাঘেলা সিং যখন তাঁকে নিতে এলেন না, তখন রজতাভবাবুর মনে সংশয় দেখা দিল। তবে কি তিনি আসবেন না? অধৈর্য হয়ে উঠলেন তিনি।

আরও কিছুটা সময় কেটে যাবার পর রজতাভবাবুর ধারণা হল, বাঘেলা সিং আর আসবেন না। কোনও কারণে হয়তো তিনি তাঁর পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছেন।

এ কথা ভেবে নিয়ে তালা খুলে আবার ঘরের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিলেন তিনি, ঠিক সেই সময় পুরোনো হাবেলির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রজতাভবাবু দেখতে পেলেন মোবারক নামের লোকটাকে। মাথা ঝুঁকিয়ে সেখানে লোকটা ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু খোঁজার ভঙ্গিতে।

তাঁকে দেখে রজতাভবাবুর মনে হল, দুর্গে যখন যাওয়াই হল না তখন এই মোবারক নামের লোকটার সঙ্গে বসে গল্প করা যাক। আগের দিনের গল্পটা অসমাপ্ত ছিল। সেটা শুনে নেওয়া যাবে লোকটার থেকে। এ কথা ভেবে নিয়ে রজতাভবাবু বারান্দা থেকে নীচে নেমে এগোলেন সেই লোকটার দিকে।

তাঁর কাছাকাছি পৌঁছে রজতাভবাবু বললেন, ‘এ ভাবে কী খুঁজছেন বলুন তো?’

রজতাভবাবুর দিকে মাথা তুলে তাকালেন মোবারক। ঠোঁটের আবছা হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, খুঁজছি। দুর্গর ভিতরে খুঁজি, এখানেও খুঁজি।’

রজতাভবাবু জানতে চাইলেন, ‘কী খোঁজেন?’

লোকটা জবাব দিল, ‘আমারই একটা জিনিস, পুরোনো জিনিস।’

মোবারক যখন নিজে থেকে এর থেকে বেশি কিছু বললেন না তখন এ ব্যাপারে আর প্রশ্ন করা রজতাভবাবু উচিত বলে মনে করলেন না। তিনি বললেন, ‘আপনার আপত্তি না থাকলে বসে কথা বলা যেতে পারে? গল্পের বাকি অংশটা শোনাবেন বলেছিলেন।’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, বসা যাক।’

আগের দিনের মতোই তাঁরা বসলেন ধ্বংসস্তূপের ওপরে। মাথার ওপর চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে আছে নারওয়ার দুর্গ। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মোবারক বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, এর আগের দিন যা বলেছিলাম—শাহজাদা সেলিমের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বাদশাহ সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর কনিষ্ঠপুত্র দানিয়েল অথবা সেলিম পুত্র খসরুকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করবেন। সেনাপতি মান সিং-এর পরামর্শ মতো তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার আগে দাক্ষিণাত্য থেকে ডেকে পাঠালেন তার প্রধান উপদেষ্টা আবুল ফজলকে। এর সঙ্গে তিনি আবুল ফজলকে পাঠালেন একটা ফরমান। সেটা আবুল ফজল মধ্য ভারত থেকে ফেরার সময় তুলে দেবেন নারোয়ার দুর্গের অধিপতি বীর সিং বুন্দেলার হাতে। সম্রাটের নির্দেশ পেয়ে আবুল ফজল আগ্রা ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করলেন এবং পথি মধ্যে এখানে এসে উপস্থিত হলেন।

এই অতিথিশালাতেই সাক্ষাৎ হল সম্রাটের প্রতিনিধি আর বীর সিং বুন্দেলার মধ্যে। আবুল জফল তার হাতে তুলে দিলেন সম্রাটের ফরমান।

বীর সিং হাতির দাঁতের ফরমানের খোলটা হাতে নিয়ে মৃদু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘কী লেখা আছে এতে?’

আবুল ফজল হেসে বললেন, ‘আপনি দেখে নিন। গালা-মোহর করা সম্রাটের ফরমান একমাত্র প্রাপক ছাড়া কারো খোলার অধিকার নেই। আমি খুলিনি ওটা।’

যদিও আবুল ফজল ফরমানটা না পাঠ করলেও বার্তাবাহকের কথা শুনে অনুমান করেছিলেন, বীর সিং-এর উদ্দেশ্যে সম্রাট কী বার্তা দিয়েছেন।

বীর সিং বুন্দেলা গালা-মোহর ভেঙে ফরমানটা বার করলেন, তারপর তাতে চোখ বুলিয়ে আবার খাপের মধ্যে রেখে আবুল ফজলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘সম্রাটকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলবেন। আমি কোনও অবস্থাতেই শাহজাদা সেলিমকে সাহায্য করব না।’

তাঁর কথা শুনে হাসি ফুটে উঠল আবুল ফজলের মুখে। তিনি ভাবলেন দু-দুবার সম্রাট বাহিনীর কাছে নতি স্বীকারের পর তাঁর বশ্যতা এবার সত্যিই মেনে নিয়েছেন বীর সিং বুন্দেলা।

বুন্দেলা এরপর আবুল ফজলকে বললেন, ‘আপনি মোগল সম্রাটের বার্তাবাহক ও আমার অতিথি। দয়া করে দুর্গে চলুন, আমাকে অতিথি সৎকারের সুযোগ দিন। আমার এখানে একজন ভালো গায়ক আছেন। আপনাকে আমি তাঁর সঙ্গীত শোনাতে চাই।’

আবুল ফজলের শরাব বা অন্য কিছুর প্রতি কোনও আসক্তি ছিল না। তাঁর এক মাত্র দুর্বলতা ছিল সঙ্গীতের ওপর। কোনও ভাবে এ খবরটা সংগ্রহ করেছিলেন বীর সিং। হয়তো বা শাহজাদা সেলিমের কাছ থেকেই খবরটা পেয়েছিলেন বুন্দেলা।

যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ দিন থাকার ফলে সঙ্গীত রস থেকে বঞ্চিত ছিলেন আবুল ফজল। তাছাড়া দক্ষিণ ভারত থেকে মধ্য ভারত পর্যন্ত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে একটু পরিশ্রান্তও হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কাজেই একটু ভেবে তিনি সম্মতি জানালেন বীর সিংহর প্রস্তাবে।’

যথাযথ মর্যাদা সহকারে বীর সিং তাঁকে নিয়ে তুললেন নারোয়ার দুর্গে। তাঁর আপ্যায়নের জন্য এলাহি আয়োজনের ব্যবস্থা হল। বীর সিং বুন্দেলার সঙ্গে কথাবার্তা বলে আবুল ফজলের মনে হল যে বীর সিং সত্যি সত্যি আবুল ফজলের সম্মানে এক সঙ্গীতের আসর বসালেন। এক গাইয়ে অসাধারণ সঙ্গীত পরিবেশন করলেন। তা শুনে আবুল ফজল সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল পর দিনই তিনি আবার যাত্রা শুরু করবেন। কিন্তু বীর সিং তাঁকে বললেন, ‘আপনি যদি আর দুটো রাত থেকে যান তবে বড় ভালো হয়। আপনার থেকে একটি বিশেষ ব্যাপারে জানতে আগ্রহী।’

আবুল ফজল জানতে চাইলেন, ‘কী ব্যাপার?’

বীর সিং বললেন, ‘শুনেছি সম্রাট ”দীন-ই-ইলাহী” নামের এক ধর্মমতের প্রবর্তন করেছেন। আর আপনি সেই ধর্মমতের প্রধান প্রচারক। মানুষকে সেই ধর্মমতে দীক্ষা দেন। আমি আপনার থেকে সে ধর্মমত জানতে আগ্রহী। তেমন হলে আমি আর আমার প্রজারা সেই ধর্মমত গ্রহণ করব।’

সম্রাট আকবর ‘দীন-ই-ইলাহী’ ধর্ম ভাবনার প্রবর্তন করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু বাস্তব সত্য হল সম্রাটের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি ব্যতিরেকে অন্য কেউ-ই ইসলাম অথবা সনাতন হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে সম্রাট প্রবর্তিত ধর্মমত গ্রহণে আগ্রহী হননি, তাই আগ্রা বা দিল্লির বাইরে কোথাও এ ধর্মমত ছড়িয়ে পড়েনি। আর সম্রাটও নিজের ধর্ম ভাবনা কারো ওপর জোর করে চাপিতে দিতে চাননি।

সারা দিন ধরে কথা বলার পর বীর সিং তখন আবুল ফজলের কাছে বেশ কিছুটা আস্থা অর্জন করে ফেলেছেন। বীর সিং বুন্দেলার প্রস্তাব শুনে আবুল ফজল ভাবলেন, ‘হয়তো বা সম্রাটকে খুশি করার জন্যই বীর সিং এই ধর্মমত গ্রহণ করতে চান। কিন্তু তা হলেও এ সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না। বীর সিং-এর হাত ধরে দিল্লির বাইরে মধ্য ভারতে ‘দীন-ই-ইলাহী’ বিকশিত হবার একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে। দুটো দিন তো দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।—এ কথা ভেবে নিয়ে বীর সিং-এর প্রস্তাবে সম্মত হলেন আবুল ফজল।’

এ কথা বলে একটু থামলেন মোবারক। দুর্গের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। রজতাভবাবু আগ্রহ ভরে শুনছেন তাঁর কথা। মোবারক নামের লোকটা এরপর আবার বলতে শুরু করলেন—’হ্যাঁ, ওই নারোয়ার দুর্গে দ্বিতীয় দিন থেকে বীর সিং বুন্দেলাকে ‘দীন-ই-ইলাহী’ ধর্মমত সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন আবুল ফজল। সারা দিন তাঁকে ধর্ম ভাবনা ব্যক্ত করার পর আবুল ফজলের ধারণা হল, বীর সিং বুন্দেলা আকৃষ্ট হতে শুরু করেছেন এই নতুন ধর্ম ভাবনার প্রতি। এবং দ্বিতীয় দিনও আবুল ফজলের আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি রাখলেন না বুন্দেলা।

তৃতীয় দিন দ্বিপ্রহরে মধ্যাহ্নভোজ সাঙ্গ হলে এক কক্ষে বীর সিংহ বুন্দেলাকে আবার তাঁর ধর্মমত বোঝাতে বসলেন আবুল ফজল। মনোযোগী ছাত্রর মতো দীন-ই-ইলাহী ধর্ম মত শুনতে লাগলেন বীর সিং। কোনও কোনও সময় কোনও বক্তব্যর বিস্তৃত ব্যাখ্যাও জানতে চাইলেন তিনি। বীর সিং এই ধর্মমতের ব্যাপারে প্রবল ভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন ভেবে আবুল ফজলও উৎসাহভরে সে সম্পর্কে বলে যেতে লাগলেন। বাইরে এক সময় সূর্য ডুবে গেল, তাঁর কথা বলে চললেন আবুল ফজল। আর তা শুনে যেতে লাগলেন বীর সিং।

তখন প্রায় মধ্যরাত। ‘দীন-ই-ইলাহী’ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পেশ করলেন আবুল ফজল। কেল্লাবাসীরা তখন প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

কয়েকজন রক্ষী সে সময় সে কক্ষে প্রবেশ করল। তাদের দেখে আবুল ফজল ভাবলেন তারা এসে উপস্থিত হয়েছে তাঁকে ও বীর সিং বুন্দেলাকে ভোজন কক্ষে নিয়ে যাবার জন্য। ঠিক যেমন গত দু-রাতে তারা তাদের দুজনকে নিয়ে গেছিল সেখানে। আবুল ফজলের কথা শেষ হয়ে গেছে। বেশ রাত হয়েছে, পর দিন ভোরে উঠে তাঁর যাত্রা শুরু করার কথা। তাই তিনি আর রাত না বাড়িয়ে বীর সিংকে বললেন, ‘এ দু-দিন ধরে ”দীন-ই-ইলাহী” সম্পর্কে আমি আপনাকে বিস্তৃতভাবে বললাম। আমি আশা রাখি আপনি এ ধর্ম ভাবনা গ্রহণ করবেন। সুতরাং এ ধর্ম ভাবনার মানুষের সংখ্যা একজন বৃদ্ধি পেতে চলেছে বলে আমার মনে হয়।’

এ কথা শুনে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল বীর সিং বুন্দেলার ঠোঁটে। তিনি বললেন, ‘আমার ধারণা এ ধর্ম ভাবনার লোকের সংখ্যায় একজন কমতে চলেছে।’

বীর সিং-এর কথা শুনে আবুল ফজল মৃদু বিস্মিতভাবে জানতে চাইলেন, ‘এ কথার অর্থ?’

বীর সিং হেসে উঠলেন। আর তার পরক্ষণেই একজন রক্ষী চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই তার হাতের খড়গ চালিয়ে দিল আবুল ফজলকে লক্ষ্য করে। এক কোপেই বীর সিং-এর পায়ের কাছে ছিটকে পড়ল সম্রাট আকবরের প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজলের মুণ্ডু। আবুল ফজলের যে কয়েকজন অনুচর তাঁর পথসাথী ছিলেন, কিছু সময়ের মধ্যেই তাঁদের একই অবস্থা হল। বীর সিং বুন্দেলা আর তার কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর বা ঘাতক বাহিনী ছাড়া এই দুর্গের অন্য কেউও জানতে পারল না কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল! বীর সিং-এর নির্দেশে সবার অগোচরে এরপর তাঁর অনুচররা দুর্গ থেকে আবুল ফজল আর তাঁর সঙ্গীদের মৃতদেহগুলো নিঃশব্দে বার করে রেখে এল অন্ত্রীর জঙ্গলে। সে জঙ্গলের পথ ধরেই আবুল ফজলের দিল্লি- আগ্রার পথে ফেরার কথা ছিল। সে জঙ্গলে ডাকাতদের উপদ্রব ছিল। বন পথে গিয়ে দেহগুলো ফেলা হল এক কারণে, যাতে মনে হয় যে ডাকাতের হাতেই নিহত হয়েছেন অনুচররা।’—এ কথা বলে পাহাড়ের ঢালের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন মোবারক নামের লোকটা।

রজতাভবাবু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘এ কথা আমার জানা ছিল না। এই নারোয়ার দুর্গেই খুন হয়েছিলেন আবুল ফজল!’

মোবারক বললেন, ‘হ্যাঁ, এখানেই শাহজাদা সেলিমের চক্রান্তে বুন্দেলার অনুচরদের হাতে নিহত হন তিনি।’

রজতাভবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘সেলিম এই গুপ্ত হত্যার পরিকল্পনা সাজিয়ে ছিলেন কী ভাবে?’

তাঁর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মোবারক নামের লোকটা হঠাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে উঠে বললেন, ‘এখন আমি যাই।’

এ কথা বলে রজতাভবাবুকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত সেই ধ্বংসস্তূপের একটা প্রাচীরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল লোকটা। এমন ভাবে তার চলে যাওয়া দেখে তাকে এবার যেন একটু খ্যাপাটে গোছের লোক বলেই মনে হল রজতাভবাবুর। এরপর তিনি সেই ধ্বংসস্তূপের বাইরে বেরিয়ে হাবেলিতে ফিরতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই রজতাভবাবু দেখতে পেলেন, ঢালের গায়ের সিঁড়ি বেয়ে চাঁদের আলোতে নীচে নেমে আসছে কেউ একজন! রজতাভবাবু তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। লোকটা নীচে নেমে এল। তাকে রজতাভবাবু চিনতে পারলেন—বাঘেলা সিং!

রজতাভবাবুকেও দেখতে পেয়ে বাঘেলা সিং তাঁর কাছে এরপর এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। তারপর বেশ লজ্জিতভাবে বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি দুঃখিত। একলা মানুষ, কাজ সেরে আসতে দেরি হয়ে গেল।’

রজতাভবাবু বললেন, ‘আপনি আসছেন না দেখে প্রতীক্ষা করতে করতে আমি তো ঘরে ফিরে যাচ্ছিলাম। অনেক রাত হয়ে গেছে।’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘তা একটু হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আমি আপনার বেশি সময় নেব না। এক ঘণ্টার মধ্যেই আমি আবার আপনাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাব। আপনি না গেলে আমার সারা দিনের আয়োজন বৃথা যাবে। তাছাড়া ডক্টর ট্যান্ডনও আসবেন। আপনি না উপস্থিত থাকলে তিনি হয়তো আমাকে মিথ্যাবাদী ভাববেন। আমি খুব বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ব। আমি আবারও বলছি দেরি হবার জন্য আমি খুব লজ্জিত।’

বাঘেলা সিং এ কথা বলার পর তাঁকে মুখের ওপর আর না বলতে পারলেন না রজতাভবাবু। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে চলুন। তবে আমি কিন্তু ডক্টর ট্যান্ডনকে ফরমানটা দেখিয়ে, সে ব্যাপারে তাঁর মতামত জেনেই ফিরে আসব। কাল সকালে উঠেই আমাকে ট্রেন ধরার জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে।’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘আচ্ছা তাই হবে। আমি আপনাকে জোর করে বেশিক্ষণ আটকে রাখব না। আপনার যা ভালো মনে হয় তাই করবেন। এবার চলুন।’

রজতাভবাবু এরপর এগিয়ে গিয়ে বাঘেলা সিং-এর সঙ্গে পাহাড়ের গায়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন ওপর দিকে। কিছুক্ষণ পর দুর্গের ভিতর উঠে এলেন তারা।

দশ

চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল নারওয়ার দুর্গ। তাঁর উন্মুক্ত চকগুলো যেমন চাঁদের আলোতে আলোকিত তেমনই বিশাল বিশাল জীর্ণ সৌধ মহলগুলোর ভিতর জমা হয়ে আছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কোথাও আবার চাঁদের আলো আর স্তম্ভ, দেওয়ালের ছায়া মিলেমিশে এক অদ্ভুত আলো-আঁধারি পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গের ভিতর যে ঝাঁকড়া গাছগুলো আছে তারা যেন কেমন একটা ভৌতিক অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। নিজেদের পায়ের শব্দ শুধু শুনতে পাচ্ছেন রজতাভবাবু। সব মিলিয়ে মিশিয়ে কেমন যেন একটা অপার্থিব পরিবেশ বিরাজ করছে চারপাশে। টুকটাক কথা বলতে বলতে এগিয়ে চললেন তারা দুজন।

পাথর বাঁধানো নানা প্রাঙ্গণ-চক অতিক্রম করে, বিভিন্ন মহল-প্রাসাদের মধ্যবর্তী পথ পেরিয়ে রজতাভবাবুরা এক সময় পৌঁছে গেলেন কেল্লার প্রাচীনতম অংশে, বীর সিং বুন্দেলার প্রাসাদের ধ্বংস্তূপের কাছে। রজতাভবাবু গতকাল যে জায়গা থেকে বাঘেলা সিং-কে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলেন, সে পথই ধরলেন বাঘেলা। একটা গলি পথ বেয়ে বাঘেলা সিং এসে উপস্থিত হলেন একটা ফাঁকা জায়গাতে। তার চারপাশে বেশ কিছু জীর্ণ মহল আর ঘর এখনও মহাকালকে পরাস্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাঁদের ছায়া ফাঁকা জমিটার গায়ে কোথাও কোথাও গাঢ় অন্ধকারের সৃষ্টি করেছে। বাঘেলা সিং, রজতাভবাবুকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘আমার ঠিক পিছন পিছন আসুন। এ জায়গা বীর সিং বুন্দেলার পশ্চাতভাগ। বেশ কয়েক প্রাচীন কূপ আছে এখানে। ভিতরে পড়ে গেলে সর্বনাশ।’

বাঘেলা সিং-এর কথা মতোই সতর্কভাবে তাকে অনুসরণ করলেন রজতাভবাবু। তাদের চলার পথের পাশে জমির ওপর বেশ কয়েকটা গাঢ়, অন্ধকারময় বৃত্ত দেখতে পেয়ে রজতাভবাবু বুঝতে পারলেন, সেগুলো আসলে কূপ। ঘর-বাড়িগুলোর ছায়ার সঙ্গে তারা এমনভাবে মিশে আছে যে ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না।

সতর্কভাবে সে স্থান অতিক্রম করে বাঘেলা সিং এসে দাঁড়ালেন একটা প্রাচীন বাড়ির সামনে। পকেট থেকে চাবি বার করে সদর দরজা খুললেন তিনি। তারপর দরজার পাশে কুলুঙ্গি হাতড়ে একটা বড় মোমবাতি নিয়ে সেটা জ্বালালেন। সামনেই একটা ঘর। পুরোনো দিনের পাথরের টপ বসানো একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার রাখা সেখানে। টেবিলের ওপর মোমবাতিটা রাখলেন বাঘেলা সিং। সে আলোতে ভালো করে ঘরটার চারপাশে তাকালেন রজতাভবাবু। ঘরটাতে তেমন কিছু নেই, শুধু দেওয়ালের গায়ে ঝুলছে একটা পুরোনো আমলের ঢাল আর তলোয়ার। দেওয়ালের গায়ে এক সময় বেশ কিছু ছবি আঁকা ছিল, সেগুলো এখন বিবর্ণ হয়ে গেছে। ঘরে দেওয়ালের গায়ে অন্য একটা দরজাও আছে।

বাঘেলা সিং আর রজতাভবাবু টেবিলে মুখোমুখি বসলেন। ঘড়ি দেখলেন রজতাভবাবু। ইতিমধ্যেই রাত প্রায় ন’টা বাজে। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার ডক্টর ট্যান্ডন কখন আসবেন?’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘এই চলে এলেন বলে। ফরমানটা একটু দিন তো। আর একবার ভালো করে দেখি।’

তাঁর কথা শুনে রজতাভবাবু সেটা ব্যাগ থেকে বার করে এগিয়ে দিলেন বাঘেলা সিংয়ের হাতে। বাঘেলা সিং খোল থেকে ফরমানটা বার করে সেটা ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। তারপর সেটা খোলে পুরে নিজের হাতেই রাখলেন। ঠিক এই সময় মুহূর্তর জন্য একটা শব্দ হঠাৎ কানে এল। যেন একটা চাপা গোঙানির শব্দ!

রজতাভবাবু বলে উঠলেন, ‘কীসের শব্দ ওটা?’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘পুরোনো বাড়ি। এ বাড়িতে অনেক ছোট প্রাণীর বাসা আছে। বেজি, গন্ধ গকুল, বিড়াল এসব প্রাণীর। তাদেরই কারো শব্দ হবে ওটা।’

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল, বাইরে বেড়ে চলল রাত। বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপভাবে বসে থাকার পর, রজতাভবাবু দেওয়ালের গায়ে ঢাল তলোয়ার দুটোর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘ওগুলো কোন অমলের জিনিস?’

প্রশ্ন শুনে বাঘেলা সিং বললেন, ‘এগুলোও বীর সিং বুন্দেলার আমলেরই। দাঁড়ান আপনাকে তলোয়ারটা দেখাই।’

এ কথা বলে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে দেওয়াল থেকে তলোয়ারটা নামিয়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর একটানে খাপ থেকে খুলে ফেললেন তলোয়ারটা। মোমের আলোতেও ঝিলিক দিয়ে উঠল সেটা!

তালোয়ারটা দেখে রজতাভবাবু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘এত পুরোনো দিনের তলোয়ার অথচ এমন চকচক করছে?

বাঘেলা সিং-এর মুখে এবার একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘এটা ধার দিতে গিয়েই তো আপনাকে আনতে যেতে দেরি হয়ে গেল।’

তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই গোঙানির শব্দটা শোনা গেল। এবার শব্দটা বেশ তীব্র আর স্পষ্ট। শব্দটা শুনে রজতাভবাবু বিস্মিতভাবে বলে উঠলেন, ‘আরে! এ যে মানুষের গলার শব্দ মনে হচ্ছে!’

বাঘেলা সিং টেবিল থেকে বাঁ-হাতে খোল সমেত ফরমানটা উঠিয়ে নিলেন, তারপর ডান হাতে তলোয়ারটা উঁচিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, মানুষের গলার শব্দ।’

রজতাভবাবু কথাটা শুনে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কার গলার আওয়াজ?’

এ কথার জবাব না দিয়ে বাঘেলা সিং তাঁর তলোয়ারের শীতল তীক্ষ্ম ছুঁচালো ফলাটা রজতাভবাবুর কাঁধে স্পর্শ করিয়ে বললেন, ‘চলুন এবার, বাইরে চলুন।’ কেমন যেন অদ্ভুত তাঁর কণ্ঠস্বর!

গোঙানির শব্দ, বাঘেলা সিং-এর আচরণ, কণ্ঠস্বর শুনে রজতাভবাবুর মনে হল, কিছু যেন একটা ঘটতে চলেছে।

রজতাভবাবু বললেন, ‘বাইরে কোথায় যাব? আমি কিন্তু অন্য কোথাও এখন যাব না। অনেক রাত হয়েছে। আমার পক্ষে আর এখানে অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ফরমানটা দিন। আমি এবার ফেরার পথ ধরব।’

বাঘেলা সিং প্রথমে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘এ ফরমান আর আপনাকে দেওয়া যাবে না। এ ফরমানে কী লেখা আছে তা আমি পারিবারিক সূত্রে জানি। এটা বিক্রি করলে হয়তো কোটি টাকাও পাওয়া যেতে পারে। এটা এখন আমার।’

এ কথা বলে তিনি সাপের মতো হিস হিস করে বললেন, ‘এ ফরমানে যা লেখা আছে সে নির্দেশ আমাকে পালন করতে হবে তো। ঠিক যেমন তা পালন করেছিলেন বীর সিং বুন্দেলা।’

রজতাভবাবু হতভম্ব হয়ে গেলেন বাঘেলা সিং-এর কথা শুনে।

বাঘেলা সিং-এর চোখ দুটো যেন শ্বাপদের মতো জ্বলছে। তাঁর চোয়ালে ফুটে উঠছে কাঠিন্য। আর তাঁর তলোয়ারের ফলাটা যেন ক্রমশ চেপে বসেছে রজতাভবাবুর কাঁধে।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে রজতাভবাবু। বাঘেলা সিং এরপর ধমকে উঠে বসলেন, ‘চলুন বলছি। নইলে এখনই আপনার ধড় মুণ্ডু আলাদা করে দেব।’—এই বলে তলোয়ারটা মাথার ওপর তুললেন তিনি। আতঙ্কিত রজতাভবাবু এবার বাধ্য হয়েই দরজার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। বাঘেলা সিং তাঁর পাঁজরে তলোয়ারের খোঁচা দিতে দিতে তাঁকে নিয়ে চললেন বাড়ির বাইরের দিকে।

এগারো

রজতাভবাবুকে বাড়ির বাইরে এনে দাঁড় করানো হল কুঁয়ো ঘেরা আধো অন্ধকার জমিটার মধ্যে। কিছুটা তফাতেই একটা কুঁয়োর মুখ। বাঘেলা সিং এরপর রজতাভবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমি আপনাকে কেটে দু-টুকরো করে কুয়োতে ফেলব, নাকি আপনি নিজে থেকেই সামনের কুঁয়োতে ঝাঁপ দেবেন বলুন? নিজে ঝাঁপ দিলে অবশ্য যন্ত্রণা কম হবে। তারপর বেশ আরামে আপনি যুগ যুগ ধরে ওই কুঁয়োর মধ্যে ঘুমিয়ে থাকবেন।’

উপায়ান্তর না দেখে রজতাভবাবু এবার ফিরে দাঁড়ালেন বাঘেলা সিং-এর মুখোমুখি। তারপর বললেন, ‘এ কী বলছেন আপনি? ঝাঁপ দেব মানে? আপনি কি আমাকে সত্যিই খুন করতে চাইছেন?’

বাঘেলা সিং বললেন, ‘হ্যাঁ, চাইছি। সারা কেল্লা এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কোনও দিন জানতে পারবে না আপনার কথা। আগে আপনাকে কুঁয়োতে ফেলি, তারপর যার গোঙানি শুনেছেন সেটাকে কেটে কুঁয়োতে ফেলব।’

রজতাভবাবু বলে উঠলেন, ‘আপনি কি পাগল? এ কাজ করতে পারেন না আপনি।’

বাঘেলা শীতল কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আপনি যখন নিজে ঝাঁপ দেবেন না তখন আপনার ধড়-মুণ্ডু আলাদা করে আমিই কুঁয়োতে ফেলছি।’

এ কথা বলে তিনি তলোয়ারটা মাথার ওপর ওঠাতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাদের সামনে ভোজবাজির মতো উদয় হল একজন লোক!

তাকে দেখে থমকে গেলেন বাঘেলা সিং। লোকটাকে দেখে চিনতে পারলেন রজতাভবাবু। মোবারক নামের সেই লোকটা কোথা থেকে এসে যেন উপস্থিত হয়েছেন।

বাঘেলা সিং তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কে তুমি?’

প্রত্যুত্তরে মোবারক বললেন, ‘তলোয়ার নামাও। আর ফরমানটা যার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দাও।’

তাঁর কথা শুনে বাঘেলা সিং বললেন, ‘তুমি যেই হও এখান থেকে এখনই না পালালে তোমাকেও কেটে দু-টুকরো করব।’

মোবারক বললেন, ‘যা বলছি তোমার ভালোর জন্যই বলছি। ফরমানটা ফেরত দাও।’

মোবারক নামের লোকটার কণ্ঠেও যেন কেমন অদ্ভুত শীতলতা।

বাঘেলা সিং-এর চোখ দুটো দপ করে জ্বলে উঠল। হিংস্রভাবে তিনি বলে উঠলেন, ‘দেখছি তুই প্রথমে মরবি! হ্যাঁ, তোকে মরতে হবেই। কারণ আমি আজ রাতে কোনও সাক্ষী রাখব না।’

রজতাভবাবু খেয়াল করলেন চাঁদের আলোতে মোবারকের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠেছে। আবারও শান্ত স্বরে তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে কাটো আমাকে। একটা মানুষকে কবার কাটবে!’

এ কথা বলে তিনি এক পা এক পা করে এগোতে লাগলেন বাঘেলা সিং-এর দিকে। বাঘেলা সিং-ও তলোয়ারটা তুললেন তাকে লক্ষ করে। আতঙ্কে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রজতাভবাবু।

মোবারক নামের লোকটা পৌঁছে গেলেন বাঘেলা সিং-এর তলোয়ারের নাগালের মধ্যে। আর এর পর বাঘেলা সিং তলোয়ার চালিয়ে দিলেন লোকটাকে লক্ষ করে। রজতাভবাবু প্রবল আতঙ্কে চোখ বুঝতে যাচ্ছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল এখনই হয়তো মোবারক নামের লোকটার দেহটা দু-টুকরো হয়ে মাটিতে ছিটকে পড়বে! কিন্তু ব্যাপারটা তা হল না। তলোয়ারের আঘাতে মোবারকের শরীরটা মৃদু কেঁপে উঠল, আর তারপরই তিনি ঝাঁপ দিলেন বাঘেলা সিং-কে লক্ষ করে।

আকস্মিক এ ঘটনায় টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেলেন বাঘেলা সিং। তালোয়ারটা তাঁর হাতে ধরা থাকলেও ফরমানের খোলটা ছিটকে পড়ল তাঁর হাত থেকে। মাটির মধ্যে পরস্পরকে পরাস্ত করার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু হল বাঘেলা সিং আর মোবারক নামের লোকটার মধ্যে। ধস্তাধস্তি করতে করতে গড়াতে লাগলেন তাঁরা। কখনও মোবারক, বাঘেলা সিং-এর ওপর, আবার কখনও তিনি তাঁর নীচে।

এ ভাবে গড়াতে গড়াতে এক সময় হঠাৎই তারা দুজন যেন মাটির মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। আর এর পর মুহূর্তেই মাটির গভীরে কোনও ভারী জিনিস আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলেন রজতাভবাবু। তিনি বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা কী ঘটেছে! ধস্তাধস্তি করতে করতে কুয়োতে পড়ে গেছেন তারা দুজন! ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আতঙ্কে হিম হয়ে গেল রজতাভবাবুর শরীর। লোক দুটো তবে মারা পড়ল!

তাঁর কী করা উচিত তার বুঝতে না পেরে সে জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। বেশ কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর মনে মনে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করলেন রজতাভবাবু। তিনি দেখলেন চাঁদের আলোতে কিছুটা তফাতে পড়ে আছে ফরমানের খোলটা। তিনি এগিয়ে গিয়ে সেটা কুড়িয়ে নিলেন। তারপর চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন, কী ভাবে সে জায়গা ছেড়ে নিরাপদে বাইরে বেরোনো যায়?

ঠিক এই সময় একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে তিনি দেখতে পেলেন যে কুঁয়োতে মোবারক আর বাঘেলা সিং অদৃশ্য হয়েছিলেন সেই কুঁয়োর ভিতর থেকে উঠে আসছেন মোবারক।

কুঁয়োর ভিতর থেকে উঠে মোবারক এসে দাঁড়ালেন রজতাভবাবুর সামনে। এক হাতে তিনি তাঁর বুকের কাছে ধরে রেখেছেন অনেকটা হাড়ির মতো দেখতে একটা মুখবন্ধ ধাতব পাত্র।

রজতাভবাবু তাঁকে দেখে বিস্মিতভাবে বললেন, ‘আপনি বেঁচে আছেন! বাঘেলা সিং-এর কী হল?’

মোবারক বললেন, ‘লোকটা ওর কৃতকর্মের শাস্তি পেয়েছে। সে আর কোনওদিন কুঁয়োর ভিতর থেকে উঠে আসতে পারবে না।’

এ কথা বলে মোবারক বললেন, ‘এখনই এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে। নইলে নতুন কোনও বিপদ ঘটতে পারে আপনার। আসুন আমি আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। দুর্গ থেকে নীচে নেমে বাকি কথা হবে।’

বুকের মধ্যে সেই ধাতব পাত্রটা আগলে রেখে মোবারক সেই মৃত্যুকূপ পূর্ণ জায়গা ছেড়ে এগোলেন বাইরে যাবার জন্য।

তাঁকে অনুসরণ করে ফরমানটা নিয়ে নির্বিঘ্নেই বাইরে বেরিয়ে এলেন রজতাভবাবু। তারপর মোবারক নামের লোকটার সঙ্গে ঘুমন্ত প্রাচীন দুর্গ নগরী ছেড়ে ফেরার পথ ধরলেন।

দুর্গ ত্যাগ করে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এক সময় তারা নীচে নেমে পুরোনো হাবেলির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন। কাছেই বন্দিশ সিং-এর হাবেলি। রজতাভবাবুর রাত্রিবাসের জায়গা। যে ভয়ঙ্কর ঘটনার সাক্ষী হলেন রজতাভবাবু, তার প্রভাব থেকে তখনও তিনি মুক্ত হতে না পারলেও পরিচিত পরিবেশে উপস্থিত হয়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেন তিনি। কিছুক্ষণ দুজনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর মোবারক বললেন, ‘তখন আপনি জানতে চাইছিলেন না যে সেলিম কী ভাবে চক্রান্ত সাজিয়েছিল?’

রজতাভবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ।’

মোবাকরক নামের লোকটা বললেন, ‘সম্রাটের বার্তা বাহকরা আবুল ফজলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবার পথে ডাকাতের খপ্পড়ে পড়েছিল মনে আছে? আসলে ডাকাতির ব্যাপারটা ছিল একটা সাজানো ঘটনা। ওরা ডাকাত সেজে হামলা চালিয়ে তাঁবুর ভিতর ঢুকে হাতির দাঁতের খোলের ভিতরের ফরমানটা পাল্টে দিয়েছিল। সম্রাট আকবরের ফরমানটা বার করে তার ভিতর পুরে দেওয়া হয়েছিল বীর সিং বুন্দেলার প্রতি শাহজাদা সেলিমের নির্দেশ। তাতে লেখা ছিল, ‘যে তোমার হাতে এই ফরমান তুলে দেবে তাকে তিন রাতের মধ্যে হত্যা করবে।’

আপনার হাতে যে ফরমানটা আছে সেটা বীর সিং বুন্দেলাকে পাঠানো সেলিমের ফরমান। এত নিখুঁত ভাবে সেলিমের লোকরা ফরমানের খোলে জাল গালা মোহর লাগিয়েছিল যে আবুল ফজল ধরতে পারেননি ব্যাপারটা। তিনি সেটা বীর সিং বুন্দেলার হাতে তুলে দিয়ে নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছিলেন।’

মোবারকের কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলেন রজতাভবাবু। লোকটা কি সত্যি বলছে?

মোবারক নামের লোকটা এরপর তাঁর বুকে আগলে রাখা পাত্রটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘কুঁয়োতে পড়ার ফলে একটা বড় ভালো ব্যাপার হল। এতদিন ধরে এ জিনিসটা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। কুঁয়োর ভিতর খুঁজে পেলাম। এটা নিয়ে আমি এবার অন্ত্রীতে ফিরে যাব। সেখানে আবুল ফজলের দেহ উদ্ধার করার পর তা কবর দিয়েছিল আকবরের সেনারা।’

বিস্মিত রজতাভবাবু জানতে চাইলেন, ‘কী আছে ওই ধাতবপাত্রের মধ্যে?’

মোবারক নামের লোকটা একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে আমার আর কোনওদিন দেখা হবে না। তাই শেষ কথাগুলো আপনাকে জানিয়ে যাই। আবুল ফজলকে হত্যা করার পর বীর সিং বুন্দেলার নির্দেশে তাঁর অনুচররা আবুল ফজলের ধড়টাকে অন্ত্রীর জঙ্গলে ফেলে এল। আর তাঁর মুণ্ডটা আরকে চুবিয়ে পাত্রে ভরে একজন লোক মারফত সেটা পাঠিয়ে দিলেন এলাহাবাদে সেলিমের কাছে। সেলিম সম্রাটের প্রধান পরামর্শদাতা আবুল ফজলের ওপর এতটাই ক্ষিপ্ত ছিলেন যে কাটা মুণ্ডুটা দেখার পর তিনি সেটা বিষ্ঠার জালাতে নিক্ষেপ করতে বললেন। শাহজাদার নির্দেশে মৌখিক সম্মতি জানালেও মুণ্ডুটা যে নিয়ে গেছিল এ কাজ করতে তার সংস্কারে বেধেছিল। সে আবুল ফজলের মুণ্ডুটা নিয়ে ফিরে এসে সবার অগোচরে এই কুয়োতে নিক্ষেপ করেছিল। সেটাই আজ খুঁজে পেলাম।’

এই অদ্ভুত কথা শুনে বিস্মিত রজতাভবাবু বললেন, ‘তার মানে আপনার এই পাত্রর মধ্যে আবুল ফজলের পাঁচশো বছরের প্রাচীন কাটা মুণ্ডু রাখা আছে?’

মোবারক নামের লোকটা শান্ত স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, সেই মুণ্ডু আছে এর মধ্যে।’ এ কথা বলতে বলতে মোবারক খুলে ফেললেন পাত্রর ঢাকনাটা, তারপর সেটা বাড়িয়ে ধরলেন রজতাভবাবুর দিকে। রজতাভবাবু দেখলেন চাঁদের আলোতে সেই পাত্রর ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা প্রাচীন নর করোটি! আবুল ফজলের ছিন্ন মুণ্ডু!

মোবারক এরপর পাত্রর মুখটা বন্ধ করে দিয়ে বললেন, আজকের রাত্রির কোনও ঘটনার কথা কাউকে আপনি জানাবেন না। জানালে কেউ ভাবতে পারেন যে আপনি ওই শয়তান লোকটাকে কুঁয়োতে ফেলে দিয়েছেন। তাতে বিপদ হতে পারে আপনার। আর এই অভিশপ্ত ফরমানটাও সম্ভব হলে যাদের জিনিস তাঁদেরকেই দিয়ে দেবেন। নইলে হয়তো এটা আপনার অথবা অন্য কারো জীবনে বিপদ ডেকে আনতে পারে। এবার আমি আসি।’—এ কথাগুলো বলে সেই পাত্রটা বুকে জড়িয়ে মোবারক নামের লোকটা হাঁটতে শুরু করলেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি রজতাভবাবুর চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। রজতাভবাবু আচ্ছন্নের মতো টলতে টলতে কোনও রকমে তাঁর ঘরে ফিরে এলেন।

বারো

সারা রাত জেগেই কাটিয়েছিলেন রজতাভবাবু। বার-বারই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল দুর্গের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো। বাঘেলা সিং তলোয়ার চালাচ্ছেন! মোবারক আর বাঘেলা সিং-এর কুঁয়োতে পড়ে যাবার ঘটনা! মোবারকের দেখানো সেই প্রাচীন খুলিটা! তাঁর বলা কাহিনি! রজতাভবাবু একটা ব্যাপার স্পষ্ট বুঝতে পারলেন ওই মোবারক নামের লোকটা না থাকলে তাঁর মৃতদেহটা ওই প্রাচীন কুঁয়োতে পড়ে থাকত! যতবারই এ কথাটা তার মনে হল, ততবারই তিনি কেঁপে উঠতে লাগলেন!

সব রাতেরই শেষ থাকে, প্রকৃতির নিয়মে একসময় রাত কেটে গিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। আলোর একটা গুণ আছে, সে মনের ভয় দূর করতে সাহায্য করে। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রজতাভবাবুও নিজেকে অনেকটা সামলে নিলেন। তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলেন তিনি। তাঁকে কিছু সময়ের মধ্যেই ট্রেন ধরতে বেরোতে হবে। চা-প্রাতরাশ খেয়েই বেরিয়ে পড়বেন তিনি। প্রতিদিনের মতোই সকালে ছত্তর সিং চা-জল খাবার নিয়ে এল। রজতাভবাবু তাকে বললেন, ‘তোমার মালিক কোথায়? আমি একটু পরই রওনা হব ট্রেন ধরার জন্য।’

ছত্তর সিং বলল, ‘আমি মালিককে খবর দিচ্ছি। বাঘেলা সিং এসেছেন, মালিক তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন।’

ছত্তর সিং-এর কথা শুনে রজতাভবাবু চমকে গেলেন। তবে কি বাঘেলা সিং-ও শেষ পর্যন্ত কুঁয়ো থেকে উঠে এলেন!

ছত্তর সিং প্রাতরাশ রেখে চলে যাবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রজতাভবাবুর ঘরে ঢুকলেন বন্দিশ সিং বুন্দেলা। আর তাঁর সঙ্গে বাঘেলা সিং!

বন্দিশ সিং রজতাভবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘যাক, তিন রাত আপনি এখানে সুস্থ ভাবে কাটিয়ে দিলেন। এবার আর ফরমানটা নিয়ে যেতে কোন বাধা নেই। ছত্তর সিং-কে টাঙায় ঘোড়া লাগাতে বললাম। সে আপনাকে স্টেশনে পৌঁছে দেবে।’

বন্দিশ সিং-এর কথার জবাব না দিয়ে রজতাভাবাবু স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন বাঘেলা সিং-এর দিকে। বাঘেলা সিং-এর চোখে-মুখেও রাত্রি জাগরণের স্পষ্ট চিহ্ন ফুটে আছে। তাঁর দিকে তাকিয়ে রজতাভবাবুর চোখে আবারও ভেসে উঠল সেই দৃশ্য। মোবারক আর বাঘেলা সিং জড়াজড়ি করে কুঁয়োর ভিতর পড়ে গেলেন।’

রজতাভবাবুকে এমন ভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাঘেলা সিং তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন। আপনাকে নিমন্ত্রণ করেও গত রাতে আমি নিতে আসতে পারিনি। আমার সঙ্গে একটা বাজে ঘটনা ঘটার কারণে।’

রজতাভবাবু কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘নিতে আসতে পারেননি মানে?’

বাঘেলা সিং-এর হয়ে প্রথমে জবাবটা দিলেন বন্দিশ সিং। তিনি বললেন, ‘আপনাকে বলেছিলাম না বাঘেলা সিং-এর এক বদমাশ ভাই আছে বিচ্ছু সিং নামে? যমজ ভাই। কিন্তু ওর চরিত্র বাঘেলার ঠিক বিপরীত। খুন, জখম, চুরি সব কিছুতেই সে সিদ্ধহস্ত। ক’দিন আগেই সে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। সে এখানে এসেছে। গতকাল দুপুরে সে বাঘেলাকে হাত-মুখ বেঁধে ঘরে ফেলে রাখে। আজ ভোরবেলা ওঁর কাজের লোক গিয়ে ওকে উদ্ধার করে। সম্ভবত বাঘেলা সিং সেজে বিচ্ছু সিং কোনও দুষ্কর্ম করেছে বা করার মতলব এঁটেছে। ভোর থেকে অবশ্য তাকে দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয়ই কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে।’

বাঘেলা সিং রজতাভবাবুকে বললেন, ‘আপনি যখন গতকাল আমাকে বললেন যে, আপনি আমাকে স্টেশনে দেখেছেন, তখনই ব্যাপারটাতে আমার কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল। পরশু দিনও আমাকে একজন পরিচিত লোক বলেছিল যে আমাকে অন্য জায়গাতে দেখেছে, সেখানে আমি যাইনি। কাল আপনাকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে বারান্দা থেকে নামতেই দেখি বিচ্ছু দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত সে আমাদের কথাবার্তা আড়াল থেকে শুনেছিল। আমাকে সে বলল, আমার খোঁজেই সে এখানে এসেছে। সে ভালো হতে চায়, তাই আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছে। আমি তাকে দুর্গে নিয়ে গেলাম। বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই পিছন থেকে ডাণ্ডার বাড়ি মেরে অজ্ঞান করে আমাকে বেঁধে ফেলল সে। এই দেখুন—’

এ কথা বলে বাঘেলা সিং তার পাগড়িটা খুলে মাথা ঝোঁকালেন। রজতাভবাবু দেখলেন বাঘেলা সিং-এর মাথার এক জায়গাতে রক্ত আর চুল মাখামাখি হয়ে আছে!

রজতাভবাবু বুঝতে পারলেন যে, গোঙানির শব্দ গতকাল তিনি শুনেছিলেন, আর বিচ্ছু সিং যাকে কেটে কুয়োতে ফেলবে বলে রজতাভবাবুকে বলেছিলেন, তিনি বাঘেলা সিং-ই। পারিবারিক সূত্রে বিচ্ছু সিং কোনওভাবে জানতে পেরেছিল যে ফরমানে কী লেখা আছে। তাই সে বাঘেলা সিং-এর ছদ্মবেশে ফরমানটা লুঠ করার চেষ্টা করেছিল। কুঁয়োর অতলে এখন যে শুয়ে আছে সে বিচ্ছু সিং।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রজতাভবাবু বন্দিশ সিং-কে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, এই ফরমানে কী লেখা আছে তা কি আপনি সত্যি জানেন না? আপনি আমাকে তিন রাত এ বাড়িতে থাকতে বলেছিলেন কেন?’

তাঁর প্রশ্নর জবাবে বন্দিশ সিং একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘কাগজটাতে কী লেখা আছে তা আমি সত্যি জানি না। তবে বংশ পরম্পরায় আমি শুনেছি যে এ কাগজটা কাউকে দিলে, যে দেবে তার তিন রাতের মধ্যে ভয়ঙ্কর ক্ষতি হতে পারে। সে জন্য আপনাকে আমি তিন রাত থাকতে বলেছিলাম। যাক আমার বা আপনার কারোরই তিন রাতে কোনও ক্ষতি হয়নি। ব্যাপারটা তবে নেহাতই কথার কথা ছিল!’

বাঘেলা সিং এরপর রজতাভবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘যদিও আমার আর আপনার কাছ থেকে ফরমানটা চাইবার মুখ নেই, তবুও বলি, আমি কিন্তু ফরমানটা এখনও কিনতে আগ্রহী।’

রজতাভবাবুর মনে পড়ে গেল ওই মোবারক নামের লোকটা চলে যাবার আগে তাঁর পরামর্শের কথা।

একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, ফরমানটা আপনাকে দিচ্ছি।’

রজতাভবাবু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফরমানটা বাঘেলা সিং-এর হাতে তুলে দিয়ে টাকা বুঝে নিয়ে স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরলেন।

ট্রেন চলতে শুরু করল। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সূর্যালোকে পাহাড়ের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বীর সিং নারওয়ার দুর্গ। যে দুর্গে গত রাতে এক ভয়ঙ্কর ঘটনার সাক্ষী রইলেন তিনি। রজতাভবাবু তার মোবাইল ফোনটা বার করে চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে একটা ছবি তুললেন। তারপর হোয়াটস অ্যাপ-টা খুলতেই তিনি দেখলেন, কলকাতা থেকে ডক্টর সমাদ্দারের মেসেজ এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, কাগজটাতে নাকি লেখা আছে, ‘যে, তোমার হাতে এই ফরমান তুলে দেবে, তিন রাতের মধ্যে তার মুণ্ডু কেটে এলাহাবাদে পাঠিয়ে দেবে।’

রজতাভবাবু এবার নিশ্চিত হয়ে গেলেন, যে ফরমান সম্পর্কে মোবারক যা বলেছেন তা মিথ্যা নয়! কৌতূহলবশত রজতাভবাবু আবুল ফজল সম্পর্কে জানার জন্যে ইন্টারনেট থেকে আবুল ফজল নামের পাতাটা খুললেন। সেখানে আবুল ফজলের ছবিটা দেখেই তিনি চমকে উঠলেন। এ যেন হুবহু মোবারকের ছবি! আর ছবির নীচে সম্রাটের প্রধান পরামর্শদাতার নামটাও লেখা আছে—আবুল ফজল ইবনে মোবারক!