Accessibility Tools

সাদা বিড়াল – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সাদা বিড়াল (উপন্যাস) – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সাদা বিড়াল

এদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পরই কৌশিকের গা কেমন যেন ম্যাজ ম্যাজ করছিল। একটু বেলার দিকে যখন তার বেশ কয়েকবার কাশি হল, তখনই সে ভেবে রেখেছিল সন্ধ্যাবেলা একবার গিয়ে খোঁজ নেবে ডাক্তার অরিত্র মুখার্জিকে পাওয়া যায় কিনা।

এ পাড়াতেই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে তিনি একলাই থাকেন। না, তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন না। তিনি সরকারি ডাক্তার। তবে কৌশিকের মতো তার পরিচিত পাড়ার কয়েকজন মাঝে মাঝে কখনও সখনও তার শরণাপন্ন হলে তিনি তাকে সাহায্য করেন, পরামর্শ দেন, ওষুধ লিখে দেন। কিন্তু তার জন্য কোনও ফিজ নেন না।

কলকাতাতেই এক সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন অরিত্র। সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সারাদিন ডিউটি করে তিনি সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফেরেন। সাধারণত সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ তার বাড়ি গেলে তাকে পাওয়া যায়।

কৌশিক দিন পনেরো আগে শেষ তার বাড়ি গিয়েছিল, পাড়ার ক্লাবের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। তখন অবশ্য তিনি জানিয়েছিলেন সেই অনুষ্ঠানে তার থাকা সম্ভব হবে না। কারণ এই দমদম ছেড়ে বেশি দূরে কোন একটা জায়গাতে আট-দশ দিনের জন্য তাকে সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশে যেতে হচ্ছে। তারপর দু-সপ্তাহ কেটে গেছে। হিসাব মতো ডাক্তার অরিত্র মুখার্জির ফিরে আসার কথা।

শনি-রবি কৌশিকের অফিস ছুটি থাকে। আজ শনিবার বলে কৌশিকের অফিসে বেরোবার তাড়া নেই। বাজার-হাটও কৌশিককে করতে হয় না। ওদিকটা তার ভাই কৌস্তভই সামলায়। কাজেই কৌশিকের কোনও চাপ নেই। অন্য শনিবার হলে হয়তো সে বেলার দিকে পাড়ার চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যেত, কিন্তু শরীরটা ভালো না লাগার কারণে দুপুর পর্যন্ত নিজের ঘরে শুয়ে একটা বই পড়ে কাটাল।

দুপুরে মা ওকে ঘরেই খাবার দিয়ে গেলেন। খাওয়া সেরে টানা ঘুম দিয়ে কৌশিক যখন উঠল তখন সূর্য ডুবে গেছে। ঘুম ভাঙার পরও কৌশিক বুঝতে পারল তার শরীরে অস্বস্তিভাব কাটেনি। বেশ কয়েকবার কাশিও হল তার। কাজেই সে পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো ঘুম থেকে ওঠার পর চা খেয়ে তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বেরোল ডাক্তার অরিত্র মুখার্জির বাড়ি যাবার জন্য।

এয়ারপোর্টের কাছেই কৌশিকদের এ পাড়াটা বেশ পুরোনো। অনেক বড় বড় পুরোনো বাড়ি এখনও টিকে আছে। বলা যেতে পারে স্বচ্ছল মধ্যবিত্তদের পাড়া এটা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুটা এগোবার পরই ঠান্ডা বাতাসের ঝলক এসে গায়ে লাগল তার।

বৈশাখ মাস। দু-দিন ধরেই বিকাল-সন্ধ্যা নাগাদ মৃদু ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। কৌশিকের মনে হল এই ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটাটা কালবৈশাখীর পূর্বাভাসও হতে পারে। তবে ডাক্তারের বাড়ি খুব দূর নয়, মাত্র মিনিট দশেকের পথ গলি বেয়ে।

কৌশিক পা চালাল সেদিকে। গলিতে লোকজন তেমন নেই। তার এগোবার সাথে সাথে ঠান্ডা বাতাসটাও যেন বেড়ে চলল। কৌশিক অরিত্রবাবুর বাড়ির কাছাকাছি উপস্থিত হতেই ইলেকট্রিসিটি চলে গেল।

কৌশিক এবার বুঝতে পারল, হ্যাঁ, তবে কালবৈশাখী আসছে। পাছে ঝড়ে তার ছিঁড়ে কোনও বিপত্তি ঘটে তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ঝড় এলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বাতাসের ঝাপটা সত্যিই এবার অনেকটা বেড়েছে। কৌশিক দ্রুত পা চালিয়ে গিয়ে দাঁড়াল ডাক্তার মুখার্জির বাড়ির সামনে।

পুরোনো আমলের মাঝারি আকৃতির একটা দোতালা বাড়ি। এ বাড়ির মালিক বৃদ্ধ রতনলাল বাবুকেও কৌশিক চেনে। পাড়ার পুরোনো বাসিন্দা তিনি। দোতালায় তিনি বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন, আর বাড়ির একতলাটা তিনি ভাড়া দিয়েছেন ডাক্তার অরিত্র মুখার্জিকে।

রাস্তার গায়েই বাড়িটার একতলাতে একটা থামওয়ালা উন্মুক্ত বারান্দা। দু-ধাপ সিড়ি বেয়ে বারান্দাতে উঠলেই সামনেই যে দরজা সেটাই ডাক্তার অরিত্র মুখার্জির বাসার দরজা। সে দরজা ঠেললেই ডাক্তারবাবুর বসার ঘর। বেশ কয়েকবার সেখানে বসে তার সঙ্গে কথা বলেছে কৌশিক।

লোডশেডিং হয়ে যাওয়াতে বাড়িটা অন্ধকার। অন্যদিন এ সময় অরিত্র ডাক্তারের বৈঠকখানার দরজাটা খোলা থাকে। বাইরে থেকেই ডাক্তারাবুকে ভিতরে বসে থাকতে দেখা যায়। সেই দরজার দিকে কোনও আলো প্রথমে চোখে না পড়লেও বারান্দাতে উঠে পড়ল কৌশিক।

দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। ঘরের ভিতর একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পেল সে। কেউ যেন চলে ফিরে বেড়াচ্ছে। একটু ইতস্তত করে সে দরজায় টোকা দিতেই ভিতর থেকে আসা সেই অস্পষ্ট শব্দ থেমে গেল। কৌশিক বলল ‘ডাক্তারবাবু, আপনি আছেন নাকি? আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’

কয়েক মুহূর্তর নিস্তব্ধতা। তারপর দরজাটা খুলে গেল। ডাক্তার অরিত্র মুখার্জিই দরজা খুললেন, কৌশিককে দেখে মাঝবয়সি ডাক্তারবাবুর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘আসুন, ভিতরে আসুন।’

ঘরে পা রাখল কৌশিক। ঘরের মাঝখানে অরিত্রবাবুর টেবিলে একটা মোমবাতি জ্বলছে, ঘরটার অন্য পাশের গলির গায়ের খোলা জানালা দিয়ে আসা বাতাসে মোমবাতির শিখাটা মাঝে মাঝে কাঁপছে। কৌশিক ঘরে ঢুকে এগিয়ে গিয়ে বসল টেবিলের একপাশে একটা চেয়ারে, অরিত্রও ঘরের দরজাটা বন্ধ করে ফিরে এসে বসলেন, কৌশিকের মুখোমুখি টেবিলের অপর দিকে নিজের গদি আঁটা রিভলভিং চেয়ারে।

টেবিলে রাখা আছে মেডিক্যাল জার্নাল, রাইটিং প্যাড, কলমদানি, প্রেশার মাপার যন্ত্র, স্টেথো ইত্যাদি। যেমন থাকে তেমনই। বাড়তি জিনিস বলতে এদিন টেবিলে এক গোছা পুরোনো সংবাদপত্র আর একটা কাঁচি রাখা আছে কৌশিক দেখল।

সে সংবাদপত্রগুলো আর কাঁচিটার দিকে তাকাতেই অরিত্র ডাক্তার বললেন, ‘সংবাদপত্রতে মেডিক্যাল বিষয়ক খবরের কাটিং জমানো আমার অভ্যাস। সে কাজই করছিলাম। এমন সময় বাইরে বাতাস উঠলো, ইলেকট্রিসিটিও চলে গেল।’

কৌশিক প্রথমে সৌজন্যবশত তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি ফিরলেন কবে? আসলে পাড়ার ফাংশন আর অফিসের চাপ নিয়ে পরপর ব্যস্ত ছিলাম। তাই এদিকে আসা হয়নি।’

প্রশ্নের জবাবে কয়েকমূহূর্ত চুপ করে থেকে ডাক্তার অরিত্র বললেন, ‘ফিরেছি কিছুদিন হল। তা আপনাদের অনুষ্ঠান কেমন হল?’

কৌশিক বলল ‘ভালোই হয়েছে। আপনি থাকলে আরো ভালো লাগত।’

এ কথা বলার পর সে বলল, ‘আমার খবর অন্য দিকে ভালোই। কিন্তু আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শরীরটা কেমন যেন ম্যাজ ম্যাজ করছে। কয়েকবার কাশিও হয়েছে। তবে জ্বর নেই। তাই ভাবলাম একবার আপনার পরামর্শ নিই। তাছাড়া আপনার সঙ্গে বেশ কিছুদিন দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি, সেটাও আপনার কাছে আসার একটা কারণ।’

কৌশিকের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে বেশ শব্দ করে কালবৈশাখী শুরু হল। জানলা দিয়ে আসা বাতাসে কাঁপতে লাগল মোমবাতির শিখা। কৌশিকের কথা শোনার পর সেই কম্পমান আলোতে অরিত্র ডাক্তার কৌশিককে পর্যবেক্ষণের জন্যই যেন তার দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর তিনি জানতে চাইলেন, ‘বৃষ্টিতে ভিজে ছিলেন নাকি?’

কৌশিক জবাব দিল, ‘কাল সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি মাথায় পড়েছে। তেমন ভিজিনি।’

কৌশিকের কথা শুনে তিনি বললেন, ‘দু-এক ফোঁটা হলেও সম্ভবত ওতেই ঠান্ডাটা লেগেছে। দুটো ওষুধ আর একটা সিরাপ লিখে দিচ্ছি। দু-দিন খেলেই ঠিক হয়ে যাবেন আশা করি।’

কথাটা বলে রাইটিং প্যাড টেনে নিয়ে খসখস করে ওষুধগুলো লিখলেন তিনি। তার লেখা শেষ হতেই ঝড়ের সাথে সাথে বাইরে বাজের গুরু গুরু গর্জন শোনা গেল। জানলার বাইরে বাজের ঝিলিকও দেখা গেল। প্যাডের কাগজটা ছিড়ে নিয়ে ভাজ করে একটা খামে ঢুকিয়ে সেটা কৌশিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টিও শুরু হবে মনে হচ্ছে। একটু বসে যান। আবারও বৃষ্টিতে ভিজলে সমস্যা হতে পারে।’

প্রেসক্রিপশনের খামটা বুক পকেটে ঢুকিয়ে কৌশিক হেসে বলল, ‘আমার কোনও তাড়া নেই। তাছাড়া আমি আপনাকে প্রথমেই তো বললাম, শুধু আপনার পরামর্শ নিতেই নয়, খোঁজ-খবর নিতে, আপনার সঙ্গে গল্প করতেও আমি এসেছি।

ডাক্তারবাবুর মুখ দেখে কৌশিকের মনে হল তিনি যেন খুশি হলেন তার কথা শুনে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন, ‘যে জায়গাতে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে ফেরার পর বাড়িতেই আছি। সত্যি কথা বলতে কী সেখান থেকে ফেরার পর আমার সঙ্গে কারো কথা হয়নি। আপনি এলেন ভালোই হয়েছে।’

কৌশিক বলল, কোথায় গিয়েছিলেন আপনি?’

তিনি উত্তর দিলেন ‘এ জেলারই শেষ প্রান্তে ষষ্ঠীতলা নামের এক জায়গাতে। যাকে বলে রিমোট ভিলেজ। গ্রামের থেকে কিছুটা দূরেই ইছামতী নদী। তার ওপাশেই বাংলাদেশ। ওখানেই এক ছোট স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডেপুটেশনে অর্থাৎ সেখানকার ডাক্তারবাবু ছুটিতে যাওয়াতে তার বদলি ডাক্তার হিসাবে আমাকে সেখানে স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে পাঠানো হয়েছিল।’

কৌশিক জানতে চাইল, ‘কেমন দেখলেন সে জায়গা? কেমন কাটালেন সেখানে?’

ডাক্তারবাবু প্রথমে বললেন, ‘জায়গাটা এমনিতে খারাপ নয়। ফ্রেশ এয়ারের গ্রাম্য পরিবেশ। শহরের মতো লোকজন চিৎকার-চেঁচামেচিও নেই। কেউ বেড়াতে গেলে তার ভালো লাগারই কথা। আমার কর্মজীবনে সরকারি নির্দেশে এর আগেও বার কয়েক ওই রকম গ্রামে গেছি আমি।’

এ কথা বলার পর একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘আর কেমন কাটিয়েছি যদি জানতে চান, তবে বলি। যে অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি সেখান থেকে ফিরেছি তা এক অদ্ভুত বিচিত্র অভিজ্ঞতা। যা আমার জীবনে কোনও দিনও ঘটেনি আর ভবিষ্যতের কোনও দিন ঘটার সম্ভবনা নেই।’

ডাক্তার অরিত্র মুখার্জির কথাটা শুনেই কৌশিক কৌতূহল চাপতে না পেরে বলে উঠল, ‘কী সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা? আমাকে বলা যাবে কি?

কৌশিকের প্রশ্ন শুনে ডাক্তারবাবু কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, ‘এখন সে কথা বললে আমার কোনও সমস্যা হবে না। তবে ঘটনাটা শুনলে আপনি সেটা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না।’

কৌশিক বলল, ‘আপনি বলবেন আর সে কথা আমার অবিশ্বাস করার কারণ আছে বলে মনে করি না। আপনি বলুন?’

কৌশিকের কথা শুনে আবারও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ডাক্তারবাবু। বাইরে ঝড়ের সাথে সাথে গুম গুম শব্দে কোথায় যেন বাজ পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর কৌশিকের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার অরিত্র মুখার্জি বলতে শুরু করলেন তার অভিজ্ঞতার কথা—

দুই

‘ষষ্ঠীতলা নামের জায়গাতে ইতিপূর্বে আমি কোনও দিন যাইনি। যাত্রার দিন সকালে ব্যাগ-পত্তর নিয়ে আমি প্রথমে গিয়ে হাজির হলাম সল্টলেকে আমাদের সদর দপ্তর স্বাস্থ্য ভবনে। সেখান থেকে বেলা এগারোটা নাগাদ সরকারি গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম গন্তব্যের দিকে।

কলকাতা শহর ছেড়ে প্রথমে মফস্বল, তারপর গঞ্জ মতো জায়গা ছেড়ে গাড়ি গ্রামের পথ ধরল এক সময়। রাস্তার দু-পাশে ফসলের খেত, কোথাও পুকুর-দিঘি, কোথাও বা সবুজের সমারোহ, সত্যি কথা বলতে কী যাত্রাপথটা শহুরে মানুষের চোখে বেশ মনোরমই লেগেছিল।

ড্রাইভার ছেলেটা এর আগে একবার গেছিল ষষ্ঠীতলাতে। কাজেই পথ চিনতে অসুবিধা নেই। যে ডাক্তারবাবু ছুটিতে যাচ্ছেন ফেরার সময় তাকে নিয়েই ফিরবে সে। পুরো যাত্রাপথেই তার সঙ্গে গল্প করতে করতে গেলাম আমি। পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল আমাদের সে জায়গাতে পৌঁছতে।

পাকা রাস্তা ছেড়ে মেঠো কাঁচা রাস্তা ধরে বেশ অনেক এগিয়ে আমরা এক সময় পৌঁছে গেলাম ষষ্ঠীতলাতে। গ্রামে পাকা বাড়ি খুব সামান্য, অধিকাংশ বাড়িরই মাটির দেওয়াল, খড় বা টিনের চাল। রাস্তাতে যে কয়েকজন লোক চোখে পড়ল তাদের দেখে মনে হল এ গ্রামে গরিব মানুষেরই বাস।

গ্রামে ঢুকে বেশ খানিকটা এগিয়ে হঠাৎই গাড়িটা একটু থামাল ড্রাইভার ছেলেটা। রাস্তার গায়েই একটা অশ্বত্থ গাছের নীচে টিনের ছাউনিওয়ালা ছোট একটা মন্দির। ভিতরে বেদির ওপর বসানো দেবী মূর্তিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বাইরে থেকে। তার বাহন হিসাবে প্রথমে বাঘ বা সিংহ বলে প্রথম দর্শনে ভেবেছিলাম। ড্রাইভার ছেলেটার কথা শুনে ভালো করে প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম সেটা একটা বিড়াল। সেই বাহনের ওপর একটা শিশু কোলে নিয়ে বসে আছেন মুকুট-ফুলমালা শোভিত দেবী। সত্যি কথা বলতে কী এই মূর্তি ইতিপূবে আমি কোথাও দেখিনি।

ড্রাইভার ছেলেটা ইতিপূর্বে একবার এখানে এসেছে বলে মূর্তিটার পরিচয় সে জানে। আমাকে সে বলল, ‘ইনি মা ষষ্ঠী। তার বাহন বিড়ালের ওপর বসে আছে। খুব জাগ্রত দেবী। যাদের বাচ্চাকাচ্চা হয় না তারা এ মন্দিরে মায়ের কাছে মানত করলে নাকি বাচ্চা হয়। শুনেছি দূর-দূরান্ত থেকে এ মন্দিরে মানত করতে আসে লোকেরা। এ জায়গার নাম ষষ্ঠীতলা। আর তার থেকে গ্রামের এই নাম।’

ষষ্ঠীদেবীর নাম আর তিনি যে সন্তান হবার দেবী, এ কথা আগে জানা থাকলেও তাঁর মূর্তি আমি এই প্রথম দেখলাম। মন্দিরে সে সময় কোনও লোকজন না দেখলেও খেয়াল করলাম নানা আকারের বেশ কয়েকটা বিড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে—মা ষষ্ঠীর বাহন!

আমাকে কথাগুলো জানিয়ে ড্রাইভার ছেলেটা এরপর মা ষষ্ঠীর উদ্দেশ্যে ভক্তি ভরে হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে আবার রওনা হল সামনের দিকে। সেই মন্দির ছেড়ে মিনিট পাঁচেক চলার পরই আমরা পৌঁছে গেলাম ষষ্ঠীতলা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।

গ্রামের ঘর-বাড়িগুলো থেকে বেশ তফাতে, বলতে গেলে গ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একতলা পাকা বাড়িটা। বাইরে থেকেই বোঝা যায়। সার সার বেশ কয়েকটা ঘর আছে বাড়িটাতে। একটা ফাঁকা জমি আছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে। সেখানে রোগী বা তার পরিজনদের বসার জন্য কয়েকটা বেদি আছে সেখানে। আর জমিটার এক পাশে পড়ে আছে মাটিতে বসে যাওয়া একটা ভাঙা অ্যাম্বুলেন্স।

আমাদের গাড়িটা গিয়ে সোজা থামল স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দরজাতে। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুজন পুরুষ আর একজন মহিলা। আমি গাড়ি থেকে ব্যাগ নিয়ে নামতেই সে তিনজন এগিয়ে এলেন। পুরুষ দুজনের মধ্যে যার বয়স বেশি সেই প্রৌঢ় লোকটা আমার পরিচয় অনুমান করে আমাকে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘আমি এই গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইনচার্জ ডাক্তার সরখেল। আমারই কাজের দায়িত্ব আপনাকে সাত দিনের জন্য নিতে হবে। আসলে কলকাতায় বাড়িতে হঠাৎ এমন একটা জরুরি কাজ পড়ে গেল যে ছুটি না নিয়ে কোনও উপায় রইল না। চলুন ভিতরে চলুন।’

আমি তার কথা শুনে প্রতি নমস্কার জানিয়ে তাদের তিনজনের সঙ্গে পা বাড়ালাম বাড়িটার ভিতরে ঢোকার জন্য। আমি তাদের সঙ্গে বাড়িটার ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছি ঠিক সেই সময় কোথা থেকে একটা বেশ বড় বিড়াল এসে আমাকে চমকে দিয়ে প্রায় আমার পায়ের ওপর লাফ দিয়ে অন্য দিকে চলে গেল!

ডাক্তার সরখেল আর আর সঙ্গীদের সঙ্গে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে আমি গিয়ে উপস্থিত হলাম একটা ঘরে। সেখানে বসেই রোগী দেখেন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তারবাবু, আর তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় অন্য কাজকর্মও করেন। সে ঘরে আমাকে নিয়ে গিয়ে বসাবার পর বাকি দুজনের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিলেন ডাক্তার সরখেল। তাদের একজন হল এখানকার স্বাস্থ্যকর্মী পরিমল দাস। বছর পঁচিশের যুবক সে। আর মাঝবয়সি মহিলার নাম বীণা মণ্ডল। তিনি হলেন সেখানকার সেবিকা, অর্থাৎ নার্স। তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর ডাক্তার সরখেল বললেন, ‘এছাড়াও এখানে একজন থাকে। হরিয়া ডোম। সুইপারের কাজ করে। সে অবশ্য সরকারি কর্মী নয়। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পিছনেই তার ঘর।’

আমি ডাক্তার সরখেলের কথা শুনে জানতে চাইলাম, ‘এখানে রোগীর চাপ কীরকম? কোনও রোগী আছে নাকি এখানে?’

ডাক্তার সরখেল বললেন, ‘এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঁচটা বেড থাকলেও কোনও রোগী ভর্তি নেই। রোগীর কোনও চাপ নেই বললেই চলে। দশ কিলোমিটারের মধ্যেই নতুন মহকুমা স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে বছর তিনেক আগে। সেখানে অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। নানা পরীক্ষারও সুবিধা আছে। তাই এখন সেখানেই সবাই যায়। সাধারণ জ্বর, পেট খারাপ, ছোটখাট কাটা-ছেঁড়া এ সব সমস্যা নিয়ে লোকে এখানে আসে। প্রতিদিন মাত্র তিন-চারজন আসে। এমন অনেকদিন হয় যে এখানে কোনও রোগীই এল না। আপনার কোনও সমস্যা হবে না। আমার এই সঙ্গী দুজন সব সামলে দেবে।’

আমি এরপর জানতে চাইলাম, ‘আমার থাকার ব্যবস্থাটা কোথায়?’

পরিমল নামের ছেলেটা আমার প্রশ্নর জবাবে বলল স্বাস্থ্য কেন্দ্রর ঠিক পিছনেই ডাক্তার কোয়ার্টাস স্যার। আপনার ঘটা পরিষ্কার করে রাখা আছে। আমি সেখানে আপনাকে নিয়ে যাব স্যার। রান্নার সরঞ্জাম সেখানে আছে। আপনি বললে আমি বাজার-হাট করে দেব।’

ডাক্তার সরখেলের থেকে এরপর জরুরি কিছু সরকারি কাগজও বুঝে নিলাম আমি। কয়েকটা সই-সাবুদও করতে হল আমাকে। ডাক্তার সরখেলের ফেরার তাড়া আছে। তাই তিনি আমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবার পর চেয়ার থেকে উঠে বললেন, ‘এবার আমি যাই। পাঁচটা বাজে। নইলে কলকাতা পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে।’

ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। ডাক্তার সরখেল আমার থেকে বিদায় নিয়ে এগোলেন স্বাস্থ্য কেন্দ্রর বাইরে যাবার জন্য। আর পরিমল আমাকে নিয়ে করিডোর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে একটা দরজা খুলে নেমে পড়ল বাড়িটার পিছন দিকে।

সেখানে পৌঁছে বেশ কয়েকটা জিনিস চোখে পড়ল আমার। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আনুমানিক একশো হাত তফাতে রয়েছে একটা ছোট্ট পাকা বাড়ি। আর তার পাশে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে টালির চালওয়ালা দরমার ঘর। এছাড়া আরও একটা জিনিস দেখলাম আমি। পাকা ঘরটার দিকে যাবার পথে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রায় গা ঘেঁষেই একটা পুরানো ইঁদারা বা কুঁয়ো। পরিমল নামের স্বাস্থ্যকর্মী আমাকে জানাল, ‘স্যার, ওই পাকা বাড়িটা হল ডক্টরস কোয়ার্টার, আপনার থাকার জায়গা। আর ওই টালির ঘরটা, ওখানে হরিয়া ডোম তার বউকে নিয়ে থাকে।’

বিকাল হয়ে গেছে। রোদের তেজ এবার কিছুটা সরে আসতে শুরু করেছে। পরিমল আমাকে নিয়ে এগোল আমার অস্থায়ী বাসস্থানের দিকে। কুঁয়োটার পাশ দিয়ে যাবার সময় সেটা দেখিয়ে আমি জানতে চাইলাম, ‘এই কুঁয়োর জলেই কাজ চালাতে হয় নাকি?’

পরিমল বলল, ‘না, না, ট্যাপ ওয়াটার আছে। তবে শুনেছি এই কুঁয়োটা অনেক পুরানো, এই স্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি হবার আগে থেকেই আছে। তবে আর এখন জল তোলা হয় না। আবর্জনা ফেলা হয় ওর মধ্যে। কুঁয়োটা খুব গভীর। আমি একদিন উঁকি দিয়ে দেখেছি।’

আমরা গিয়ে উপস্থিত হলাম সেই ছোট বাড়িটাতে। দরজা খোলার সময় আমি জানতে চাইলাম ডাক্তার সরখেলও কি এখানেই থাকেন?

পরিমল বলল, ‘আগে থাকতেন। তবে বছরখানেক হল গ্রামের ভিতর একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। আমার বাড়িও ও গ্রামেই। আর বীণাদির বাড়ি মহকুমা শহরে। এখানে বাসে আসতে তার এক ঘণ্টা সময় লাগে।’

বাড়ির ভিতরে পা রাখলাম আমি। দুটো ছিমছাম ঘর। তার সঙ্গে রান্না ঘর-টয়লেট আছে। আলো-পাখা সব কিছুরই বন্দোবস্ত আছে। হাসপাতালেরই একটা লোহার খাটে পরিষ্কার বিছানা পেতে আমার শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিমল সে ঘরের জানলাগুলো খুলে দিতেই আমি দেখলাম যে ঘর থেকে চারপাশের প্রায় সব কিছুই দেখা যায়। হরিয়া ডোমের কুঁড়ে ঘর, সেই কুয়োটা আর স্বাস্থ্য কেন্দ্রর পিছনের সম্পূর্ণ অংশটাই।

পরিমল রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে দেখাল সেখানে রান্নার গ্যাস, বাসন সব কিছুরই ব্যবস্থা রাখা আছে। আমি বুঝতে পারলাম ও বাড়িতে সাতদিন কাটাতে আমার কোনও অসুবিধা হবে না।

আমাকে সব কিছু বুঝিয়ে দেবার পর পরিমল বলল, ‘স্বাস্থ্য কেন্দ্র সকালে আমি এসে রোজ খুলি। দু-সেট চাবি আছে। এক সেট আপনি রেখে দেন। অন্যটা দিয়ে আমি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তালা দিয়ে যাচ্ছি। কাল আমি ঠিক সকাল ন’টায় চলে আসব, দরজা খুলব। আপনি বেলা দশটায় ঢুকলেই হবে স্যার।’—এ কথাগুলো বলে আমার হাতে এক সেট চাবি ধরিয়ে সে-ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

সে চলে যাবার পর স্নান সেরে পোশাক পরিবর্তন করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। দেখতে দেখতে সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নামল। প্রগাঢ় একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল চারপাশে। বাতি জ্বালালাম। তবে তার তেজ নেই। হলদেটে ম্যাড়ম্যাড়ে আলো। তবুও সময় কাটাবার জন্য একটা বই নিয়ে বসলাম। রাত আটটা নাগাদ একটা শব্দ কানে এল আমার। জড়ানো গলাতে গান ধরেছে কেউ। আমি অনুমান করতে পারলাম সেটা সেই কুঁড়ে ঘর থেকে আসছে। মোটা গলার পুরুষের কণ্ঠস্বর।

জানলার দিয়ে কুঁড়ে ঘরটার দিকে তাকিয়ে সেদিকে একটা আলোক বিন্দুও দেখতে পেলাম। সম্ভবত লন্ঠন বা কোনও তেলের বাতি জ্বলছে ঘরটার ভিতর। বেড়ার ফাঁক দিয়ে সেটা দেখা যাচ্ছে। যাই হোক বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলার পর সে গান থামল। আর আমিও রাত ন’টা নাগাদ সঙ্গে আনা শুকনো খাবার দিয়ে খাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম।

মাঝ রাতে একটা অদ্ভুত শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। সে শব্দ সেই ঘুম জড়ানো অবস্থাতে যা আমার মনে হল তা বিড়ালের ডাক! এক সঙ্গে অনেকগুলো বিড়াল মনে হয় কোথাও ডাকছে! যাই হোক, সে শব্দ শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম আমি।’

তিন

পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙল আমার। বিছানা ছেড়ে উঠে প্রথমে জানলাগুলো খুলে দিলাম। চোখে পড়ল সেই কুঁড়েটা। দেখলাম তার ঝাঁপটা অর্থাৎ দরজা খোলা। দুটো মুরগি চরে বেড়াচ্ছে তার সামনে। কুঁড়ের পিছন দিকে বেশ কিছু গাছগাছালি আছে। পাখির ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকে। সব মিলিয়ে বেশ শান্ত পরিবেশ।

আমি ব্রাশ করার জন্য ব্রাশ নিয়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সামনেই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পিছনের অংশটা দেখা যাচ্ছে। তার গায়ে সার সার কাচের জানলাগুলো বন্ধ অবস্থাতেই আছে।

বাইরে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করছি ঠিক সেই সময় কুঁড়ে ঘরের দিক থেকে আমার কাছে এসে হাজির হল দুজন। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ, অন্যজন মহিলা। লোকটার বয়স বছর পঞ্চাশ হবে। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, স্বাস্থ্যবান চেহারা। মাথায় কাঁচা-পাকা অবিন্যস্ত ঝাঁকড়া চুল। পরনে লুঙ্গি আর নেটের হাতকাটা গেঞ্জি, ডান বাহুতে একটা তাগা বাঁধা আছে। লোকটা আমার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাবু আমি হরিয়া ডোম, এখানেই আমি থাকি। আপনার চাকর বাবু। আপনি দয়া করবেন আমাকে। যা বলবেন করে দেব।’

এই তবে সেই হরিয়া ডোম। এখনও মৃদু জড়ানো ভাব আছে লোকটার কণ্ঠস্বরে। চোখ দুটোও জবা ফুলের মতো লাল। বুঝলাম, গতরাতে বেশ নেশা করেছিল লোকটা। সে রেশ এখনও পুরো কাটেনি।

আমাকে নিজের পরিচয়দানের পর সে তার ঠিক পেছনে দাঁড়ানো বউটাকে হাত ধরে টেনে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে বলল, ‘এ হল আমার বউ ফুলমতি। আপনি বললে ও ঘর ঝাড়ু দিয়ে দেবে, বরতন মেজে দেবে।’

আমি তাকালাম ফুলমতির দিকে। একটা ছাপা শাড়ি তার পরনে। তার আঁচল দিয়ে ঘোমটা টানা। মুখ বোঝা যাচ্ছে না। তবে তার উন্মুক্ত বাহু দেখে বুঝলাম ফুলমতির গাত্রবর্ণও তার স্বামীর মতোই, অর্থাৎ ঘোর কৃষ্ণবর্ণের। তবে ফুলমতির শরীরের যে অংশ কয়েক মুহূর্তর জন্য আমার দৃষ্টি আটকে গেল তা হল তার পেট। বেশ ফুলে আছে সেটা! সেদিকে তাকিয়েই আমার ডাক্তারের চোখ বুঝতে পারল ফুলমতি পূর্ণগর্ভা।

আমি হরিয়ার কাছে জানতে চাইলাম, ‘তোমার বউয়ের বাচ্চা কবে হবে জানো? ওষুধ-পত্র কিছু খাওয়াচ্ছ?

এ প্রশ্নের জবাবে হরিয়া জানাল যে, পুরোনো ডাক্তারবাবু অর্থাৎ ডাক্তার সরখেল যা বলেছে তাতে নাকি ফুলমতির এর মধ্যেই সন্তান প্রসব করার কথা। আর স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে যে ওষুধ দেওয়া হয় তাই নাকি খাচ্ছে ফুলমতি। তবে এর সঙ্গে হরিয়া এ কথাও বলল যে এ অবস্থাতেও নাকি ফুলমতির ঘর ঝাড়ু দিতে, ইত্যাদি কাজ করতে কোনও অসুবিধা হবে না। আমি ডাকলেই পাব। এ অবস্থাতে ফুলমতিকে দিয়ে কোনও কাজ করানোর কোনও প্রশ্নই নেই আমার। কাজেই আমি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে হরিয়াকে জিগ্যেস করলাম, ‘স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিষ্কার রাখার জন্য তুমি কত টাকা পাও?’

সে জবাব দিল, ‘ডাক্তারবাবু মাসে সাতশো টাকা দেন। এক সময় যখন ও হাসপাতালে অনেক রোগী থাকত, এখন একটা ছোট মুর্দা ঘরও ছিল এখানে। লাশ ওঠানো, নামানো, রোগীদের পরিষ্কার রাখা এ সব কাজে বেশ কিছু আয় হত। এখন সব বন্ধ।’

আমি প্রশ্ন করলাম, ‘সাতশো টাকাতে কী ভাবে চলে তোমার? আর কিছু করো?’

হরিয়া বিমর্ষভাবে বলল, ‘চলে না তো। মাঝে মাঝে গ্রামের কেউ কেউ গরু কুকুর মরা ফেলার জন্য ডেকে নিয়ে যায়। তাই কোনও রকমে বেঁচে আছি।’

আমি এরপর আর তার সঙ্গে কোনও কথা না বাড়িয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে এখন তোমরা যাও। কোনও দরকার হলে নিশ্চয়ই তোমাকে ডাকব।’

আমার কথা শুনে আরও একবার প্রণাম জানিয়ে বউকে নিয়ে তার কুঁড়ে ঘরের দিকে চলে গেল হরিয়া।

বেলা ন’টার মধ্যেই স্নান ও অন্যান্য কাজ সারা হয়ে গেল আমার। ঠিক সাড়ে ন’টার সময় স্বাস্থ্যকর্মী পরিমল এসে হাজির হল আমার কাছে। সে বলল, ‘আমি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দরজা-জানলাগুলো খুলে দিয়েছি স্যার। আপনি আসতে পারেন। আমি ভিতরেই আছি।’

আমাকে এ কথা বলে সে চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই পোশাক পাল্টে ঘর ছেড়ে এগোলাম স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে। হ্যাঁ, পিছনের দিকের সার সার কাচের জানলা গুলো খুলে ফেলেছে পরিমল। যে দরজা দিয়ে আমি গতকাল বিকালে এদিকে এসেছিলাম সেটাও খোলা। সেই দরজা দিয়েই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রবেশ করলাম।

স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আমার বসার ঘরের সামনেই দাঁড়িয়েছিল পরিমল। তাকে নিয়েই ঘরে ঢুকে বসলাম আমি। ঠিক দশটাতেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নার্স বীণা দেবী চলে এলেন। তবে কোনও রোগী উপস্থিত হয়নি তখনও। আমার সহকর্মীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বাক্যালাপের পর আমি তাদের বললাম, ‘চলুন, আপনাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘরগুলো একটু ঘুরে দেখি?’

তিনজনেই একসঙ্গে আমার ঘর ছেড়ে বেরোলাম। করিডোরের একপাশে সার সার বেশ কটা ঘর। প্রথম ঘরটাতে ঢুকলাম আমি সহকর্মীদের সঙ্গে। দুটো শূন্য বেড রয়েছে সে ঘরে। পরিষ্কার-পরিছন্ন ঘর। তবে সে ঘরের এক কোণে দুটো বিড়াল শুয়ে ঘুমোচ্ছে। হয়তো বা তারা খোলা জানলা দিয়েই ভিতরে ঢুকেছে বলে মনে হল। এর পর আমি দ্বিতীয় ঘরে প্রবেশ করলাম। যেখানেও দুটো শূন্য বেড। কিন্তু তাদের তলায় আমি বেশ কয়েকটা বিড়ালকে শুয়ে বসে থাকতে দেখলাম।

অনেক সরকারি হাসপাতালেই বিড়ালের আধিক্য দেখা যায়। পেশেন্টদের দেওয়া খাবারের লোভে ঘুরে বেড়ায় তারা। যদিও সেটা রোগীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনও ভাবে কাম্য নয়। আমার আবার বিড়ালগুলোর হাবভাব দেখে মনে হল, তারা যেন এখানকারই বাসিন্দা।

মনে মনে একটু অসন্তুষ্ট হলেও আমি মুখে কিছু না বলে এগোলাম পরের ঘরটার দিকে। কিন্তু সে ঘরে ঢুকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি। আগের ঘরের তুলনায় এ ঘরটা অনেক বড়। তবে এ ঘরে একটাই বেড। ঘরের খোলা জানলা দিয়ে বাইরে কিছুটা তফাতে সেই বড় কুঁয়োটা। আমার বাসস্থান, হরিয়া ডোমের কুঁড়ে সব কিছু দেখা যাচ্ছে।

ঘরটায় ঢুকে আমি অবাক হয়ে গেলাম এ কারণে, ঘরে কোনও মানুষ না থাকলেও এ ঘরের নানা কোণে, নানা জায়গাতে শুয়ে, বসে দাঁড়িয়ে আছে সাদা কালো, ছাই, নানা রঙের নানা আকৃতির প্রচুর বিড়াল! সংখ্যায় তারা অন্তত কুড়ি পঁচিশটা হবে! এক সঙ্গে এত বিড়াল আমি কোথাও কোনও দিন দেখিনি!

বেডের ওপরেও একটা বেশ বড় সাদা রঙের বিড়াল থাবায় ভর দিয়ে বসে আছে। তাকে দেখে আমার মনে হল যে সাধারণ বিড়ালের তুলনায় আকৃতিতে কিছু যেন বড় সেই হুলো বিড়ালটা। স্থির দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমরা ঘরে ঢোকার পর অন্য বিড়ালগুলোও আমাদের দিকে তাকালেও বিড়ালগুলোর মধ্যে কোনও ভাবান্তর, উত্তেজনা লক্ষ করলাম না।

আমি বুঝতে পারলাম এ জায়গাটাকে প্রাণীগুলো তাদের নিশ্চিন্ত আশ্রয় বলেই মনে করে, ব্যাপারটা দেখার পর আমি আমার মনের ভাব চেপে রাখতে না পেরে আমি একটু উষ্মা প্রকাশ করে বললাম ‘এটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নাকি বিড়াল প্রতিপালন কেন্দ্র? এত বিড়াল কীভাবে এখানে এল?’

একটু চুপ করে থেকে পরিমল ইতস্তত করে জবাব দিল, ‘ওই ষষ্ঠীতলার মন্দিরে লোকে বিড়াল ছেড়ে দিয়ে যায়। সেখান থেকেই ওরা এখানে এসে আশ্রয় নেয়। সারাদিন এখানেই থাকে, সন্ধা হলে বাইরে যায়। দরজা বন্ধ থাকলেও নানা ‘ফাঁকফোকর দিয়ে ওরা ভিতরে চলে আসে।’

আমি জানতে চাইলাম। ‘মন্দিরে বিড়াল ছেড়ে দিয়ে যায় কেন?’

পরিমল বলল, ‘সন্তান লাভের জন্য এ গ্রামের তো বটেই, আশেপাশের অনেক গ্রামের লোক এসে মন্দিরে মা ষষ্ঠীর কাছে মানত করে। মা ষষ্ঠীর বাহন হল বিড়াল। যারা মানত করে, তাদের সন্তান লাভ হবার পর তারা মন্দিরে এসে পুজো দেবার সঙ্গে সঙ্গে একটা করে বিড়াল ছেড়ে দিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামীণ প্রথা চলে আসছে এখানে।’

ব্যাপারটা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম ঠিকই, কিন্তু মুখে বললাম, ‘ব্যাপারটা বুঝলাম, তবে সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তো আর বিড়াল থাকার জায়গা নয়। ডাক্তার সরখেল এদের ব্যাপারে কিছু বলেন না?’

আমার প্রশ্ন শুয়ে নার্স বীণা মণ্ডল বললেন, ‘না, সরখেল স্যার কিছু বলেন না ওদের ব্যাপারে। এখন তো কোন রোগী ভর্তি থাকে না এ হাসপাতালে। হয়তো সে জন্যই বলেন না। ফাঁকা ঘরে বিড়ালগুলো নিজের মতো থাকে। ঝড়-জল থেকে রক্ষা পায়। তাছাড়া এ গ্রামে বিড়ালকে লোকে মা ষষ্ঠীর বাহন বলে মঙ্গলকারী প্রাণী হিসাবে মনে করে। কেউ বিড়ালকে মারে না এখানে।’

বিড়াল সংক্রান্ত ব্যাপারটা মোটামুটি বোধগম্য হল আমার। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই বিড়াল সমাগম আমার চূড়ান্ত অপছন্দের হলেও আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘আমি তো মাত্র সাতদিনের জন্য এসেছি এখানে। ছয় দিন পর চলে যাব। এ সব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমার লাভ নেই। তাই এ প্রসঙ্গে আর কথা না বলে সে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোলাম আমি।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটা ছোট অপারেশন সেন্টার আছে। এরপর সে ঘরে গেলাম আমি। সে ঘরের দরজা অবশ্য বাইরে থেকে বন্ধই ছিল, আর সে ঘরের ভিতর কোনও বিড়ালও ছিল না। সেই শেষ ঘরটা দেখার পর স্বাস্থ্য কেন্দ্রটা মোটামুটিভাবে পরিদর্শন শেষ করে সঙ্গীদের নিয়ে নিজের বসার ঘরে ফিরে এলাম। নানা কথার ফাঁকে আমি পরিমলকে বললাম, সে যদি আমার জন্য কিছু বাজার করে দেয় তবে আমার সুবিধা হয়। পরিমল বলল, আমার চিন্তার দরকার নেই, সন্ধ্যায় সে আমার প্রয়োজন মতো বাজার এনে দেবে। সন্ধ্যা বেলায় নাকি নদীর ঘাটে টাটকা মাছও পাওয়া যায়। আর তা দামেও বেশ সস্তা।

সেদিন দুপুরে ঘণ্টা খানেকের ব্যবধানে দুটো মাত্র রোগী এল। একটা সাত-আট বছরের বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে তার মা এসেছিল বাচ্চাটার জ্বর হয়েছে বলে। আর একজন বুড়ো লোক এলো সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে সামান্য চোট পেয়েছে বলে। দুজনকেই দেখে ওষুধের ব্যবস্থা করার পর তারা চলে গেল। আর কোনও রোগী না এলেও আমি কিন্তু নিয়ম মাফিক ঠিক বিকাল পাঁচটা পর্যন্তই রইলাম স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। তারপর আমরা সবাই সে জায়গা ছেড়ে বেরোলাম। আমি সোজা ফিরে এলাম নিজের কোয়ার্টারে।

 কোয়ার্টারে ফিরে আবার স্নান সেরে টিফিন সারতে সন্ধ্যা নেমে গেল। অন্ধকার নামার কিছু সময় পর পরিমল এল মাছ-তরিতরকারি ইত্যাদি বাজার নিয়ে। বাজারের দাম নিয়ে সে চলে যাবার পর রান্না বসালাম। সে কাজ শেষ হতে রাত সাড়েআটটা বেজে গেল। নিজের কুঁড়েতে মদ খেয়ে হেঁড়ে গলাতে আগের দিনের মতোই গান ধরেছে হরিয়া ডোম। সে গান শুনতে শুনতে খাওয়া সেরে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিনও কিন্তু মাঝ রাতে একই ভাবে ঘুম ভেঙে গেল আমার। বিড়ালের চিৎকার! নানা স্বরে নানা ভাবে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিক থেকে বিড়ালের ডাক ভেসে আসছে। দু-চারটে বিড়াল মনে হয় আমার কোয়ার্টারের চারপাশেও ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের ডাক শোনার পর ঘুমিয়ে পড়লাম আমি।’

দীর্ঘক্ষণ ধরে একটানা কথা বলার পরে এবার কয়েক মুহূর্তর জন্য থামলেন ডাক্তার অরিত্র মুখার্জি।

চার

ঝড়ের সাথে সাথে ঝমঝম শব্দে বাইরে বৃষ্টি শুরু হল এবার। কৌশিক চেয়ে আছে অরিত্র ডাক্তারের দিকে। টেবিলে রাখা মোমবাতির শিখাটা মাঝে মাঝে নেচে উঠছে। জানলার বাইরে অন্ধকার বর্ষণমুখর পৃথিবীর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ডাক্তার আবার তার কথা শুরু করলেন—

‘পরের দুটো দিন বলা যেতে পারে নিস্তরঙ্গ ভাবেই কেটে গেল একটা মৃদু সমস্যা ছাড়া। ও দুদিনই আমি সকাল দশটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই থেকেছি। দু-চারজন মাত্র পেশেন্ট এসেছিল। এ-দুদিনে বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ নেবার জন্য। সেই বিড়ালের দলও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভিতর তেমন কোনও গোলযোগ ঘটায়নি। তবে যে বিরাট বড় সাদা বিড়ালটাকে আমি প্রথমদিন বেডের ওপর বসে থাকতে দেখেছিলাম তার সঙ্গে বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে সাক্ষাৎ হয়েছে আমার।

নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে আমার দিকে তাকিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। যেন আমাকে পাত্তা দেবার মতো কোনও ব্যাপার নেই। আমি খেয়াল করে দেখেছি ওই একটা বিড়ালই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সর্বত্র কেমন একটা যেন রাজকীয় ভঙ্গিমায় ঘুরে বেড়ায়। অন্য বিড়ালগুলো খুব একটা আমার ঘরের কাছে আসে না। তবে যে মৃদু সমস্যার কথা বললাম তা কিন্তু এই বিড়ালগুলোর জন্যই।

দু-দিন রাতেই আমি মাতাল হরিয়া ডোমের গান শুনতে শুনতে খাওয়া সেরে ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু আগের দু-রাতের মতোই মাঝ রাতে ওই বিড়ালগুলোর ডাকে ঘুম ভেঙে গেল আমার। নানা স্বরে নানা রকম চিৎকার।

তার পরদিন অর্থাৎ আমার অস্থায়ী কর্মক্ষেত্রের চতুর্থ দিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই আমি উঠে পড়লাম। আগের দিন একটা ভ্যান-রিক্সাকে আসতে বলা হয়েছিল। তাতে চেপে আমি রওনা হলাম ইছামতি নদী দেখার জন্য। আধ ঘণ্টাও লাগল না সেখানে পৌঁছতে। বিশাল নদী। এর আগে সে নদী দেখিনি আমি। ওপারে বাংলাদেশ।

নদীর বুকে সবে সূর্যোদয় হয়েছে। পাখির দল উড়ে বেড়াচ্ছে নদীর ওপর ঠান্ডা বাতাসে। ছোট ছোট নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ছে মাছ শিকার করে। ভারি মনোরম পরিবেশ। সেখানে থাকলেই সতেজ বাতাসে দেহমন জুড়িয়ে যায়। সত্যি কথা বলতে কি ষষ্ঠীতলাতে যে ক’দিন আমি ছিলাম তার মধ্যে ওই নদী তীরের সকালটাই আমার সব চেয়ে ভালো লেগেছিল।

ঘণ্টাখানেক আমি সময় কাটালাম সেখানে, তারপর কিছু টাটকা মাছ কিনে ফেরার পথ ধরলাম। স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছে আমার কোয়ার্টারের কাছে যেতেই দেখলাম সেখানে হরিয়া এসে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে একটু ঝুঁকে হাত জোড় করে সে প্রণাম করল। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি কিছু বলবে?’

সে আমাকে বলল, ‘ঘরে ঝাড়ু দিতে হবে নাকি বাবু? বরতন সাফ বা অন্য কোনও কাজ?’ ও সব কাজ আমি নিজেই করি। তাই আমি জবাব দিলাম, ‘না দরকার নেই।’

আমার জবাব শুনে হরিয়ার মুখে যেন স্পষ্ট হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। এরপর সে হাত কচলে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘বাবু আমাকে কুড়িটা টাকা ধার দেবেন?’

এবার হরিয়ার কাজ করার প্রস্তাবের পিছনে আসল কারণটা বুঝলাম। তার টাকার দরকার। এরপর সে আবার বলল, ‘আসলে ক’দিন ধরে ময়লা পরিষ্কারের কোনও কাজ পাইনি। ঘরে আর কোনও পয়সা নেই। এখন দেখি গ্রামের ভিতর যাব। যদি কোনও কাজ হয়। তবে টাকাটা আমি যে ভাবেই হোক দু-তিন দিনের মধ্যে ফেরত দিয়ে দেব।’

মাত্র কুড়িটা টাকা। তাই আমি পকেট থেকে টাকা বার করে সেটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘ধার নয়, তোমাকে টাকাটা এমনিই দিলাম। শোধ দিতে হবে না।’

টাকাটা পাবার পর মৃদু উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চোখ-মুখ। যদিও তার চোখে যে লাল ভাবটা থাকে সেটা তখনও রয়েছে। সে বলল, ‘বড় উপকার হল বাবু। চাল কিনব। নইলে আজ হাঁড়ি চড়ত না।’

আমি হরিয়াকে বললাম, ‘তোমার তো বেশ শক্ত সমর্থ চেহারা। তবে তুমি শুধু ওই ময়লা পরিষ্কারের কাজের আশাতে বসে থাকো কেন? অন্য কাজও তো করতে পারো?’

আমার কথা শুনে হরিয়া বলল, ‘আমি জাতে ডোম। এক সময় এখানেই লাশ ওঠানো নামানোর কাজ করতাম। তাই অন্য কাজে কেউ আমাকে নিতে চায় না বাবু। আমি লাশ ঘাঁটা লোক।’

এ কথা বলার পর একটু থেমে সে বলল, ‘ভাবছিলাম মুরগির ব্যবসা করব। কিছু মুরগি আর মোরগ কিনে ডিম বেচব, ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তুলে বড় করে বিক্রি করব। কিন্তু দুটো মুরগির বেশি আর কেনা হয়ে উঠল না টাকার অভাবে। হয়তো ও দুটোকেও শেষ পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হবে।’

আমি আর এরপর কিছু বললাম না তাকে। আমাকে আবারও প্রণাম জানিয়ে চলে গেল হরিয়া ডোম। আমিও কোয়ার্টারে ঢুকে পড়লাম।

আগের কদিনের মতনই বেলা ঠিক দশটাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত আমি। পরিমল আর সেই নার্সও যথা সময়ই উপস্থিত হয়েছে। নিজের ঘরেই বসেছিলাম আমি। কোনও পেশেন্ট আসেনি। দুপুর নাগাদ জেলা স্বাস্থ্য অধিকর্তার ফোন এল আমার কাছে। রোগী কল্যাণ সমিতি নামের একটা কমিটি আছে। তাদের কাজ হল বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শন করা এবং তার ভিত্তিতে সরকারকে বিভিন্ন সুপারিশ করা। সরকারি কমিটি হলেও ও কমিটি ঠিক স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীনে নয়। স্বাধীন ভাবে তারা কাজ করেন, সরকারের কাছে সুপারিশ দেন বা পরামর্শ দেন।

জেলা স্বাস্থ্য অধিকর্তা আমাকে টেলিফোনে জানালেন সেই রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্যরা আগামী তিন দিন এই মহকুমার বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভিজিট করবেন, এবং আগামী পরশু অথবা তার পরদিন এই ষষ্টিতলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রও ভিজিট করতে আসবেন।

এ কথা শুনে আমি আমার বড়কর্তাকে বললাম, আমি তো এখানে ডেপুটেশনে কাজ করতে এসেছি। আর তিনদিনই তো এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমার থাকার মেয়াদ। সমিতির সদস্যদের আমার থেকে ভালো এই স্বাস্থ্য কেন্দ্র সম্পর্কে বলতে পারবেন এখানকার স্থায়ী ডাক্তার সরখেল। কোন ভাবে কি এই পরিদর্শনের ব্যাপারটা পিছিয়ে দেওয়া যায় না?

আমার এ কথা শুনে ওপরওলা জানালেন যে, এ ব্যাপারে তার কোনও হাত নেই। আমি এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডেপুটেশনে এলেও এখন যাবতীয় দায়-দায়িত্ব আমারই। এবং এর সাথে সাথে তিনি এ কথাও মনে করিয়ে দিলেন যে কোনও ডাক্তার বা স্বাস্থ্য কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিদানের সুপারিশ করার ক্ষমতাও কিন্তু ওই সমিতির আছে। কাজেই আমি যেন সেই পরিদর্শনকারী দলকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্যবস্থা সম্পর্কে যথাসম্ভব সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি।

ফোনটা রেখে আমি আমার সহকর্মী দুজনকে ঘটনাটা জানালাম। পরিমল বলল, ‘ওষুধ-ইনজেকশন, স্যালাইন ওসবের স্টক মেলানোই আছে। প্রয়োজনীয় জিনিসও যথেষ্ট সংখ্যায় আছে। এদিক থেকে কোনও অসুবিধা হবে না।’

নার্স বললেন, ‘শুধু একবার হরিয়াকে ডেকে ঘর-বারান্দাগুলো ঝাঁট দিয়ে ফিনাইল দিয়ে ভালো করে ধুইয়ে নিলেই সব একদম সাফ-সুতরো।’

আমার এবার মাথায় এল বিড়ালগুলোর কথা। আমি বললাম, ‘কিন্তু বিড়ালগুলোর ব্যবস্থা কী হবে? রোগী কল্যাণ সমিতির লোকেরা যদি এখানে এসে দেখে যে স্বাস্থ্য কেন্দ্র বিড়ালদের অতিথিশালায় পরিণত হয়েছে তবে কিন্তু আমাদের তিনজনেরই অকল্যাণ ঘটার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তার ওপর আপনারা দুজন আবার এখানকারী স্থায়ী কর্মী। দিনকাল ভালো নয়, কখন যে কার ওপর কী নেমে আসে কেউ বলতে পারে না।’

কথাটা শুনেই আমার সহকর্মী দুজন বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। পরিমল বলল ‘কি করা যায় বলুন তো?’ একটু ভেবে নিয়ে আমি বললাম, ‘দেখা যাক আপাতত ভয় দেখিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বাইরে বার করা যায় কিনা।’

পরিমল সম্মতি প্রকাশ করে বলল, ‘আপনি যে দরজা দিয়ে যাওয়া-আসা করেন সে দরজাটা ছাড়াও ঘরগুলোর শেষ মাথায় আরও একটা দরজা আছে। ওই দরজা দিয়ে বিড়ালগুলোকে তাড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই পিছনের দরজাটা খুলে তিনটে লম্বা লাঠি নিয়ে হাজির হল পরিমল। তবে তা বিড়াল মারার জন্য নয়, তাদের ভয় দেখাবার জন্য। সদর দরজা বন্ধ করে লাঠি হাতে প্রথম ঘরে ঢুকে আমরা দু-তিনটে বিড়ালকে ঘরের বাইরে বার করে ভালো করে দরজা-জানলা বন্ধ করে দিলাম। এর পর দ্বিতীয় ঘরটাতে ঢুকেও বেশ কয়েকটা বিড়ালকে ঘরের বাইরে বার করে একই কাজ করলাম। এর পর আমরা ঢুকলাম বড় ঘরটাতে। সেই সাদা বড় বিড়ালটা আজও সেই বেডের ওপর একলা রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে। যেন এটা তার সাম্রাজ্য। মার্জার কুলের সম্রাট সে। আর অন্য বিড়ালগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘরের নানা প্রান্তে।

মেঝের ওপর লাঠি ঠুকে অথবা লাঠি তুলে ভয় দেখিয়ে ঘরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিড়ালগুলোকে দরজার দিকে তাড়াতে শুরু করলাম আমরা। আমি বিড়ালগুলোর হাবভাব দেখে বুঝতে পারলাম তাদের এই নিশ্চিন্ত বিশ্রাম স্থল থেকে হঠাৎ আমরা তাদের খেদাতে এসেছি দেখে তারা বেশ বিস্মিত। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও একে একে দরজা দিয়ে তারা ঘরের বাইরে বেরোতে থাকল। তবে সেই সাদা বিড়াল কিন্তু ভয় না পেয়ে একই ভাবে বসে রইল।

অন্য সব বিড়ালগুলোকে ঘর থেকে তাড়াবার পর আমি এগিয়ে গেলাম খাটটার দিকে। তবুও কিন্তু বিরাট বিড়ালটা প্রথমে নড়ল না। সবুজ চোখে সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার দিকে। আমি আমার হাতের লাঠিটা দিয়ে বেশ জোরে জোরে বাড়ি মারলাম লোহার খাটের গায়ে। ঠং করে শব্দ তুলে কেঁপে উঠল খাটটা। তখনও সে নড়ল না। আমি এরপর তাকে খোঁচা দিয়ে নামাবার জন্য লাঠিটা তুললাম। এবার মনে হয় ব্যাপারটা অনুমান করতে পারল প্রাণীটা। এক লাফে বিছানা ছেড়ে নামল সে। তারপর ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

বড় ঘরটার জানলা-দরজা ভালো করে বন্ধ করে করিডোরে বেরোলাম। সেই সাদা বিড়ালটাকে না দেখলেও বিড়ালদের বেশ বড় ঝাঁক যেখানে তখনও বসে ছিল। তাদের সেই পিছনের দরজাটা দিয়ে খেদিয়ে বাইরে বের করে, দরজা দিয়ে অবশেষে আমার নিজের ঘরে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পর পরিমল গেল হরিয়াকে খবর দেবার জন্য। ফিরে এসে সে বলল, হরিয়া ইতিমধ্যেই একপ্রস্থ মদ গিলে ফিরেছে। সে বলেছে আগামী কাল সকালে যে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে।

দেখতে দেখতে বিকাল হল এরপরে। পাঁচটাও বাজল। তার কিছুক্ষণ আগেই লোডশেডিং হল। কোয়ার্টারে ফেরার পথে আমি কয়েকটা বিড়ালকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। কোয়ার্টারে ফিরে স্নান করলাম। কিন্তু রোদের তেজ কমলেও অসহ্য গুমোট গরম। তার ওপর লোডশেডিং, পাখা বন্ধ। সূর্য ডোবার পরও যখন সেই গুমোট ভাব কাটল না, আমি ভাবলাম গ্রামের ভিতর হেঁটে এলে ওই গুমোট পরিবেশের থেকে একটু মুক্তি পাব।

আমার বাসস্থান থেকে বেরিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে পিছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করলাম। সত্যি এবার যেন একটু স্বস্তি পেলাম। গাছগাছালি থাকার জন্য রাস্তায় সেই গুমোট ভাবটা নেই। বরং কিছুটা বাতাসও আছে। রাস্তায় কিছু মানুষজনও চোখে পড়ল আমার। তাদের কেউ বা গরুর পাল নিয়ে ফিরছে, কেউ বা অন্য কাজ সেরে।

রাস্তার পাশে খড়ের চালঅলা বাড়ির সামনে ছোট্ট তুলসি মঞ্চে প্রদীপ জ্বালাবার প্রস্তুতি শুরু করেছে কোনও বউ, কেউ বা আবার গোয়ালে ধুঁয়ো দিচ্ছে। অন্ধকার নামতে চলেছে। এ সব দেখতে দেখতে এক সময় আমি কী ভাবে যেন বেশ খানিকটা দূরে সেই মন্দিরের সামনে পৌঁছে গেলাম। মন্দিরে এদিনও কোনও লোকজন চোখে পড়ল না।

আমি মন্দিরের ভিতর তাকালাম। কেউ যেন সেখানে সদ্য একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। সেই আলোতে একটা সাদা বিড়ালের ওপর বসে আছেন মা ষষ্ঠী। বাম হাত দিয়ে তিনি ধরে রেখেছেন কোলের শিশুটাকে, আর তাঁর ডান হাত আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ওপরে তোলা।

আমি কিছুক্ষণ মূর্তিটাকে দেখার পর ফেরার জন্য পা বাড়ালাম। মন্দিরের সামনে থেকে কয়েক-পা এগিয়েই দেখি রাস্তার এক পাশে একটা সাদা বিড়াল দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার গায়ের রঙ আর আকৃতি দেখে আমি চিনে ফেললাম তাকে। সেই বিরাট সাদা বিড়ালটা। সে কি স্বাস্থ্য কেন্দ্রর কাছ থেকে আমাকে অনুসরণ করে এত দূর এসেছে? নাকি ঘুরতে ঘুরতে এত দূর চলে এসেছে? এ ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। আর এর পরই হঠাৎ ঝুপ করে চারপাশে গাঢ় অন্ধকার নামল। তার মধ্যে হারিয়ে গেল বিড়ালটা। আমিও ফেরার পথ ধরলাম।

আমি যখন বাড়ি ফিরলাম তখন ইলেকট্রিসিটি চলে এসেছে। ঘরে ফিরে রোজকার মতো রান্না চাপালাম। নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিনের মতো হরিয়ার গান ভেসে আসতে লাগল। মনে মনে ভাবলাম হয়তো সে মদ গেলার জন্যই আমার থেকে টাকা নিয়েছিল! যাই হোক হরিয়াকে দিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটা পরিষ্কার করিয়ে নিতে হবে। রান্না শেষে খাওয়া সেরে নিলাম আমি। হরিয়ার গান থেমে গেল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। আর আমিও বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

কিন্তু যথারীতি মাঝরাতে সেদিনও ঘুম ভেঙে গেল। বিড়ালগুলো ডাকতে শুরু করেছে। আগের রাতে এই বিড়ালের ডাকের কারণেই ভালো ঘুম হয়নি আমার। তাছাড়া খুব ভোরেও উঠেছি। আমি ঘুমাবার চেষ্টা করতে লাগলাম, কিন্তু ঘুমাতে পারলাম না। এদিন আর আমার ঘরের তফাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিক থেকে নয়, বিড়ালগুলো যেন আমার কোয়ার্টারের চারপাশ ঘিরে নানা স্বরে ডাকতে থাকল। যেন তাদের বেঘর করার অন্য সম্মিলিতভাবে মাঝরাতে তারা প্রতিবাদ জানাতে এসেছে!

অবিশ্রান্ত সেই ডাকের ঠেলায় মাঝরাতে আমি একবিন্দু ঘুমাতে পারলাম না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে ভাবতে লাগলাম আর দুটো রাত কোনওমতে এখানে কাটিয়ে কলকাতা ফিরতে পারলে বাঁচি। বিড়ালগুলোর ডাক শেষ পর্যন্ত যখন থামল তখন ভোরের আলো ফুটতে খুব বেশি দেরি নেই। সে সময়টুকু জেগেই রইলাম আমি। ওটুকু সময় ঘুমোবার কোনও মানে ছিল না। কাচের জানলা দিয়ে ভোরের প্রথম আলো ঘরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে আমি উঠে পড়লাম।

পাঁচ

সকাল সাতটা নাগাদ ঘরের দরজার বাইরে হরিয়ার গলার শব্দ শুনলাম, ‘বাবু আমি এসেছি। হাসপাতালের দরজা খুলে দিতে হবে।’

চাবি নিয়ে ঘরের বাইরে বেরোতেই দেখলাম, বালতি, ঝাঁটা এসব নিয়ে হরিয়া দাঁড়িয়ে আছে।

তবে তার মুখটা কেমন যেন গম্ভীর। আমাকে দেখে অন্য দিনের মতো কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণামও করল না। তাকে নিয়ে আমি এগোলাম স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে সে আক্ষেপের সুরে আমাকে বলল ‘ওপরওয়ালা সব সময় গরিবকেই মারে!’

আমি জানতে চাইলাম, ‘কেন কী হয়েছে?’

সে জবাব দিল, ‘মুরগি দুটোও গেল!’

প্রশ্ন করলাম, ‘কী ভাবে?’

হরিয়া বলল, ‘আমার ঘরের পিছনে বাখারি দিয়ে ঘেরা একটা ছোট ঘরের মতো জায়গাতে রাতে ওরা থাকত। নিজেরাই সেখানে ঢুকত-বেরোত। পোষ মানা মুরগি বলে ঘরের দরজা দিতে হতো না। কাল রাতে কেউ এসে মুরগি দুটো চুরি করে নিয়ে গেছে। কয়েকটা পালক শুধু সেখানে পড়ে আছে।’

হরিয়ার কথা শুনে বেশ খারাপ লাগল আমার। তাকে নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলাম আমি। তাকে বললাম ঘরের দরজাগুলো সব খোলো। ঘর-বারান্দা সব ভালো করে ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করবে। দাঁড়াও আমি তোমাকে আমার ঘর থেকে ফিনাইল এনে দিচ্ছি।’

তাকে এ কথা বলে আমি এগোলাম আমার বসার ঘরের দিকে। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে ফিনাইলের বড় জারটা নিয়ে বারান্দাতে বেরিয়ে দেখি সেই বড় ঘরটার দরজা ইতিমধ্যে খুলে সে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। আমাকে দেখেই সে বলল, ‘একবার ঘরটা দেখুন বাবু!’

আমি এগিয়ে গেলাম সে ঘরের সামনে। ঘরের ভিতর তাকাতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। বিড়ালগুলো আবার ফিরে এসেছে! কিন্তু কী ভাবে বন্ধ ঘরে ফিরল তারা? হরিয়াকে নিয়ে ঘরে পা রাখলাম আমি। আর তারপরই হরিয়া আর্তনাদ করে উঠল, ‘আমার মুরগি!’ শুধু যে বিড়ালগুলো এসে ঘরটাতে জমা হয়েছে তাই নয়। সারা ঘর জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মুরগির পালক। দু-একটা বিড়াল তখন ঘরের কোনায় বসে মুরগির মাংস চিবোচ্ছে! আর সেই বিরাট সাদা বিড়ালটা খাটের ওপর বসে স্থিরভাবে চেয়ে আছে আমার দিকে।

সে যেন ব্যঙ্গ করছে আমাকে। কিন্তু কীভাবে এরা ঘরে ফিরে এল। জানলাগুলোর দিকে ভালো করে তাকাতেই ব্যাপারটা আমার কাছে মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেল। ফ্রেম থেকে খুলে বেশ কয়েকটা জানলার কাচ মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে আছে।

আমি একটা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। পরীক্ষা করে দেখলাম যে পুডিং আঠা দিয়ে কাচগুলো জানলার লোহার ফ্রেমের সঙ্গে আটকানো ছিল তা পুরানো হয়ে যাওয়াতে একেবারে ক্ষয়ে গেছে। হাত দিয়ে একটু জোরে আঘাত করলেই ফ্রেম থেকে কাচ খসে যাবে। আমি বুঝতে পারলাম ঘরের ভিতরে ঢোকার জন্য বিড়ালগুলো কাচের জানলার ওপর ঝাঁপিয়ে ছিল আর সেই আঘাতেই কাচ খসে গেছে। হয়তো বা বড় বিড়ালটাই এই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। তারপর ফাঁকগুলো দিয়ে অন্য বিড়ালগুলো ঘরে ঢুকেছে।

হরিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম অসহায়ভাবে সে তাকিয়ে আছে মাটিতে পড়ে থাকা মুরগির পালকগুলোর দিকে। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, ‘বিড়ালগুলো এর আগে কোনওদিন আমার মুরগি মারতে যায়নি। কাল এমন করল কেন?’

আমি বললাম, ‘কাল ওরা আমার ঘরের চারপাশেও দাপিয়ে বেড়িয়েছে। ওদের চিৎকারে সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। ওদের এ জায়গা থেকে তাড়িয়ে দেবার আক্রোশেই হয়তো ওরা মুরগিগুলোকেও মেরে খেয়েছে।’

সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে অন্য ঘর দুটোতে ঢুকলাম আমরা। সে দুটো ঘরেও একই অবস্থা। জানলার কাচ ভাঙা। বেশ কয়েকটা করে বিড়ালও আছে সেই ঘর দুটোতেও।

গত রাতে বিড়ালগুলোর ডাকে এমনিতেই আমার ঘুম হয়নি তার ওপর বিড়ালগুলোর এভাবে ফিরে আসাতে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার। হাতে মাত্র আজকের দিন সময়। কিছুতেই কাচ ঠিক করার ব্যবস্থা করা যাবে না। সরকারি কাজ এভাবে হয় না। কিন্তু যা অবস্থা, বিড়ালগুলোকে বাইরে খেদালেও ঠিক তারা আবার জানলা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়বে। তাহলে উপায়?

একটু ক্ষিপ্ত ভাবেই আমি হরিয়াকে বললাম, ‘যে কোনও ভাবেই হোক বিড়াল গুলোকে এ জায়গা থেকে দূর করতে হবে তোমাকে? কাজটা করতেই হবে।’

হরিয়া প্রথমে আমার প্রশ্নের জবাবে চুপ করে রইল।

আমি এরপর মাথাটা একটু ঠান্ডা করে হরিয়াকে বললাম, ‘তুমি যে মুরগির ব্যবসা করতে চাইছিলে তার জন্যে কত টাকা লাগবে বলো তো?’

হরিয়া মনে মনে হিসাব কষে জবাব দিল, ‘গোটা ছয়েক মুরগি আর দুটো মোরগ, হাজার টাকা মতো খরচ।’

আমি শুনে বললাম, ‘ওই হাজারটাকাই আমি তোমাকে দেব। কিন্তু বিড়ালগুলোকে দূর করতে হবে তোমাকে। ওদের এমন জায়গাতে পাঠাতে হবে যে অন্তত আগামী দু-দিনের মধ্যে যেন তারা ফিরে না আসে। অন্য কোথাও বিড়ালগুলোকে আটকে রাখার ব্যবস্থা করতে পারো? বা দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে আসতে পারো?

আমার প্রস্তাবটা নিয়ে একটু ভাবল হরিয়া। তারপর সে আমাকে বলল, ‘পারব, তার জন্য আলাদা দুশো টাকা দিতে হবে। মাছ-মাংসর ছাট কিনে রান্না করে খাবারের লোভ দেখিয়ে ওদের ধরতে হবে। তবে কাজটা রাতে করতে হবে। টাকাটা দিলে করে দেব।’

আমি উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠলাম, ‘পারবে! পারবে তুমি?’

হরিয়া ডোম ঠান্ডা গলাতে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, পারব। আমাকে পারতেই হবে। টাকা দিয়ে আমি মুরগির ব্যবসা শুরু করব। বছর খানেক সে ব্যবসা করে আমি টাকা জমাব। আমার বউয়ের যে বাচ্চাটা হবে ততদিনে সে একটু বড় হবে। তারপর তাকে নিয়ে আমরা শহরে চলে যাব। সেখানে আমাকে ডোম বলে কেউ চেনে না। সেখানে অন্য কাজ পেতে আমার অসুবিধা হবে না।

আমি বুঝতে পারলাম ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বহুদূর পর্যন্ত ভেবে নিয়েছে হরিয়া। অথবা এ পরিকল্পনা বহুদিন থেকেই ছিল। আমি আর বাক্য ব্যয় না করে পার্স থেকে দুশো টাকা বার করে হরিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলাম। টাকাটা নিয়ে সে বলল, পিছনের দরজাটায় বাইরে থেকে হুড়কো দেবেন। ওই দরজা দিয়েই আমি বিড়াল ধরতে ঢুকব। আর আমি যে বিড়ালগুলো সরাচ্ছি তা কাউকে জানাবেন না বাবু। এখানকার দাদা দিদিমণিকেও নয়। গ্রামের লোকেরা বিড়ালকে খুব মান্য করে। অনেক দূরে গ্রামের বাইরে ছাড়ব ওদের। যাতে ওরা ফিরে না আসে। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, ‘তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, কাকপক্ষীও জানবে না। তবে কাজটা কিন্তু হওয়া চাই। এরপর সে সময়ের মতো আমি হরিয়াকে নিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।

এরপর আমি আবার নির্ধারিত সময় অর্থাৎ বেলা দশটাতে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উপস্থিত হলাম। আমার সঙ্গী দুজন হাজির হবার পর আমি তাদের জানালাম যে কী ভাবে বিড়ালগুলো আবার ভিতরে ঢুকেছে!

আমার কথা শুনে তারা চিন্তিতভাবে জানতে চাইল, ‘তাহলে কী করা যাবে?

আমি আসল ব্যাপারটা না ভেঙে তাদের বললাম, ‘কাল সকালে হরিয়াকে দিয়ে বিড়ালগুলোকে বাইরে বার করাব। তারপর আমাদের খেয়াল রাখতে হবে দিনের বেলাতে যাতে বিড়ালগুলো আর ভিতরে না ঢোকে। আর কাল যদি সমিতির লোকেরা না আসে তাহলে পরশু সকালেও একই কাজ করতে হবে। এছাড়াতো কোনও উপায় দেখছি না।’

তাদের এ কথা বলে আমি মনে মনে ভাবলাম, হরিয়া যদি কোনও কারণে ব্যর্থ হয় তবে সত্যিই এ পথ নিতে হবে আমাকে।

এরপর এ প্রসঙ্গ ছেড়ে খাতা-পত্র নিয়ে স্টকের হিসাব ইত্যাদি আরও একবার মিলিয়ে দেখার জন্য বসলাম। যা দেখলাম কাগজ-পত্র সব ঠিকই আছে, কোনও সমস্যা হবেন না। এদিনও মাত্র দুজন রোগী এল এবং ফিরেও গেল ওষুধ নিয়ে। পরদিনই হয়তো সমিতির লোকেরা আসবে সেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ঠিক পাঁচটাতে সেদিনের মতো স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বাইরে বেরোলাম আমরা। হরিয়ার কথা মতো আমি বেরোলাম সেই পিছনের দরজা দিয়ে, যেখান দিয়ে বিড়ালগুলোকে বাইরে বের করা হয়েছিল।

আমি বাইরে বেরিয়ে আমার কোয়ার্টারের দিকে এগোতে গিয়ে দেখলাম হরিয়া তার কুঁড়ের কাছে একটা জায়গাতে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে কাঠকুটো দিয়ে একটা উনুন জ্বালিয়েছে। তার ওপর একটা হাঁড়িও চাপানো। তা দেখে আমার মনে হল হরিয়া কাজে নেমে পড়েছে। বিড়ালগুলোকে ধরার জন্য সম্ভবত মাছ-মাংসের ছাট রান্না করছে সে। ঠিক সেই সময় আরও একটা কথা খেয়াল হল আমার। প্রথম দিনের সেই সকালের পর তার বউকে কিন্তু আর একবারও দেখিনি। শরীর খারাপ হল নাকি তার? সে সন্তান প্রসব করতে চলেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম বউয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে হরিয়ার কাছে।

ঘরে ফিরে রোজকার মতো কাজে নিয়োজিত হলাম আমি। স্নান সেরে রান্না ইত্যাদি কাজ। সেদিন কিন্তু অন্য দিনের মতো নির্দিষ্ট সময় হরিয়ার গান শোনা গেল না। আমি তার কুঁড়ের দিকটাতে দেখলাম উনুন নিভে গেছে। হরিয়া কখন যেন তার রান্না শেষ করে হাঁড়ি নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে।

রাতের খাওয়া সেরে নিলাম আমি। তারপর নিছকই খেয়ালের বসে দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিকে চোখ পড়তেই আমি দেখলাম কাচের জানলা দিয়ে বাইরে আলো আসছে। সেই বড় ঘরটার ভিতর আলো জ্বলছে। আমি অনুমান করলাম বিড়াল ধরার জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভিতরে ঢুকেছে হরিয়া। কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম আমি। হরিয়ার কাজ হরিয়া করুক। গতরাতে ঘুম হয়নি আমার। বিছানায় শোবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম নেমে এল আমার চোখে। না রাতে আর বিড়ালের ডাক আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাল না। এক ঘুমেই ভোর হয়ে গেল।

ছয়

সকাল সাতটা নাগাদ হরিয়ার ডাক শুনে আমি দরজা খুললাম। ভোরের বাতাসে দেশী মদের কড়া গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। হরিয়ার চোখ দুটো লাল। আমাকে দেখে সে বলল ‘সব বিড়াল সরিয়ে দিয়েছি বাবু। ঘরগুলোও ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছি।’

আমি জিগ্যেস করলাম, কোথায় রেখে এলে ওদের? বিড়ালগুলো আবার ফিরে আসবে না তো? হরিয়া একটু জড়ানো গলাতে বলল, ‘অনেক দূরে তাদের পৌঁছে দিয়েছি। নিশ্চিন্তে থাকুন, একটাও আর ফিরতে পারবে না।’ বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই সে কথাটা বলল।

আমি তার কথা শুনে বেশ আনন্দিত হলাম। আমি তাকে বললাম, ‘খুব বড় একটা কাজ করে দিলে তুমি।’ এ কথা বলে আমি ঘরের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হরিয়া বলল ‘একটা কথা ছিল বাবু?’

আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে জানতে চাইলাম, ‘কী কথা?’

সে বলল আজ হাটবার। টাকাটা যদি এখন দেন তবে মুরগিগুলো কিনে আনতে পারি। আপনি আমার কথাতে ভরসা রাখুন, বিড়ালগুলো আর ফিরবে না। দেবেন টাকাটা?’

আমি বুঝতে পারলাম হরিয়া ডোম জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক। সে যখন এত জোরের সঙ্গে বলছে যে বিড়ালগুলো আর ফিরবে না এবং কাজটার জন্য যখন তাকে টাকা দিতেই হবে তখন টাকাটা তাকে দিতে সমস্যা নেই। কাজেই আমি এরপর ঘর থেকে হাজার টাকা এনে হরিয়ার হাতে দিলাম। হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। চলে যাবার আগে আবারও সে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে গেল, ‘বিড়ালগুলো আর ফিরবে না।’

এদিন বেশ কিছুটা আগেই স্নান খাওয়া সেরে তৈরি হয়ে সকাল ন’টা নাগাদ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আমি উপস্থিত হলাম। না, কোনও ঘরে একটাও বিড়াল দেখতে পেলাম না। উপরন্তু দেখলাম ঘরগুলো সব ধুয়ে মুছে ঝকঝকে তকতকে করে রেখেছে হরিয়া ডোম। মনে মনে ভাবলাম, সত্যিই, লোকটা খুব কাজের।

বেলা দশটার মধ্যেই পরিমল আর নার্স দিদিমণিও উপস্থিত হলেন। আমি তাদের বললাম, বিড়ালগুলোকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে বার করে সব পরিষ্কার করেছে হরিয়া। তবে খেয়াল রাখতে হবে বিড়ালগুলো যেন আর ঘরে না ঢোকে। শেষের কথা আমি বললাম, যাতে বিড়ালগুলোকে দূরে পাঠানো হয়েছে বলে তারা কোনও সন্দেহ না করে তার জন্য।

বেলা এগারোটা নাগাদ একজন রোগী এসে ওষুধ নিয়ে যাবার পরই আমার কাছে টেলিফোন এল। হ্যাঁ, রোগী কল্যাণ সমিতির পরিদর্শক দল আজই এই স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। আমরা প্রতীক্ষা শুরু করলাম তাদের জন্য। পরিমল মাঝে মাঝে আমার ঘর ছেড়ে উঠে গিয়ে দেখে আসতে লাগল কোনও বিড়াল আবার ঢুকে পড়েছে কিনা? আমি মনে মনে একটু মজাই পেলাম ব্যাপারটাতে।

বেলা তিনটে নাগাদ একটা গাড়ি এসে থামল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে। দুজন পুরুষ আর একজন মহিলা। অর্থাৎ তিনজনের পরিদর্শক দল। আমি তাদের সদর দরজা থেকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়ে আমার ঘরে বসালাম। পরিমল আসার সময় ব্যবস্থা করে এনেছিল। ডাবের জল আর সন্দেশ দিয়ে আপ্যায়ন জানানো হল তাদের।

রোগীদের জন্য ওষুধের স্টকের খাতাটা দেখতে চাইলেন তারা। খাতা দেখানো হল। তারপর কিছু মামুলি প্রশ্ন। এই যেমন এখানে পালস পোলিও কর্মসূচী কেমন হয় ইত্যাদি জানতে চাইলেন তাঁরা। আমরা তিন জন মিলে তাদের প্রশ্নের জবাব দিলাম। একবার শুধু পরিদর্শক দলের এক সদস্য জানতে চাইলেন, কোনও রোগী এখানে ভর্তি আছে কিনা?

আমার জবাব শুনে তারা আর ঘরগুলো ঘুরে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। খুব বেশি হলে পঁয়তাল্লিশ মিনিট তারা রইলেন আমার ঘরে। তাদের তাড়া ছিল অন্য একটা স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিদর্শনে যাবার। মাত্র এটুকু সময় অতিবাহিত করে তারা আমাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছেড়ে রওনা হয়ে গেলেন তাদের পরবর্তী গন্তব্যে। মজার ব্যাপার হল যে ঘরগুলো আমরা বিড়ালদের নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলাম, সে ঘরগুলো না দেখেই তারা ফিরে গেলেন।

লোকগুলো চলে যাওয়াতে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। নার্স বীণা মণ্ডল বললেন, ‘জানেন স্যার, আজ এখানে আসার পথে বাস থেকে নামার পর আমি ষষ্ঠীতলার মায়ের মন্দিরে পুজো দিয়ে এসেছিলাম। মাকে মনে মনে বলেছিলাম, ‘তোমার বাহন গুলোকে আজ একটু সামলে রেখো। মা খুব জাগ্রত। আমার কথা শুনেছেন। দেখলেন আজ একটাও বিড়াল ভিতরে ঢুকল না। আর সব কিছু কেমন অল্প সময়তেই ভালোয় ভালোয় মিটে গেল!’ এ কথা বলে তিনি মা ষষ্ঠীর উদ্দেশ্যে ভক্তি ভরে প্রণাম জানালেন।

এরপর আমার সঙ্গী দুজন আমার কাছে তাদের একটা বক্তব্য নিবেদন করলেন। তা হল জেলা সদরে স্বাস্থ্য দপ্তরে তাদের দুজনের বেতন সংক্রান্ত ফাইল নাকি দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে আছে। পরদিন যদি আমি তাদের দুজনকে ছুটি দিই তবে তারা জেলা সদরে স্বাস্থ্য দপ্তরে যেতে পারে তাদের ফাইলগুলোর তদ্বির করার জন্য। যেহেতু সব কাজ ভালোয় ভালোয় মিটেছে তাই আমার মনটা ভালো হয়ে গেছিল। তাই আমি তাদের আবেদন শুনে বললাম, ‘ঠিক আছে। কাল আপনাদের আসতে হবে না। আমি একলাই সামলে নেব।’

এদিন একটু আগে আগেই, অর্থাৎ বিকাল চারটে নাগাদ স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে আমরা বেরোলাম। আমি আমার কোয়ার্টারের দিকে এগোচ্ছি, ঠিক সেই সময় দেখলাম হরিয়াকে। তার হাতে দুটো বড় ব্যাগ। সম্ভবত হাট থেকে ফিরছে সে। আমার অনুমান সঠিক। আমাকে দেখে হরিয়া সামনে এসে দাঁড়াল।

আমাকে দেখাবার জন্য প্রথম ব্যাগটা খুলল সে। তার মধ্যে গাদাগাদি করে রয়েছে মাঝারি আকৃতির ঠ্যাঙবাঁধা মোরগ-মুরগি। সেগুলো আমাকে দেখিয়ে সে বলল, ‘সস্তাতেই পেলাম। কিছু টাকাও বেঁচে ছিল। তাই দিয়ে খাবার জিনিসও কিনলাম। আমি আর বউ মিলে আজ ভালো করে খাব।’ এই বলে সে সম্ভবত তার কথার প্রমাণ দেবার জন্য দ্বিতীয় ব্যাগটাও ফাঁক করে দেখাল। আমি দেখলাম তার ভিতর রয়েছে একটা শাল পাতায় কিছুটা মাংস, কিছু আনাজ আর তার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া একটা দেশী মদের বোতল।

হরিয়া তার বউয়ের কথা উল্লেখ করাতে আমি তার কাছে জানতে চাইলাম। ‘তোমার বউকে দেখতে পাইনা কেন? কেমন আছে সে?’

হরিয় জবাব দিল, ‘তিনচার-দিন ধরে ফুলমতির শরীর ভালো যাচ্ছে না। তাই ঘর ছেড়ে বেরোচ্ছে না। রান্না, সব কাজ আমিই করছি।’

ফুলমতি আসন্ন সন্তান প্রসবা। ব্যাপারটা যখন আমি জানি তখন যতক্ষণ আমি আছি ততক্ষণ ডাক্তার হিসাবে আমরাও একটা দায়িত্ব আছে। তাই আমি হরিয়াকে বললাম, ‘পরশু সকাল পর্যন্ত আমি তো এখানেই আছি, তোমার বউয়ের তেমন কিছু অসুবিধা হচ্ছে মনে হলে, দিন হোক বা রাত, আমাকে ডাকবে, বউকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে আসবে।’

হরিয়া বলল, ‘হ্যাঁ বাবু।’ একথা বলে ব্যাগ হাতে সে রওনা হল তার কুঁড়ের দিকে। আর আমিও ফিরে এলাম কোয়ার্টারে।

মনটা বেশ খুশি আমার। দুটো রাত কাটাতে পারলেই পরশু গাড়ি আসবে। ডাক্তার সরখেলকে এখানে পৌঁছে দিয়ে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল এক সময়। আমি রান্না চাপালাম। সে কাজও প্রতিদিনের মতো শেষ হল।

হরিয়ার গানও শুরু হল এক সময়। এদিন যেন একটু বেশি স্ফুর্তি মনে হল তার গলায়। গরিব মানুষ, মুরগিগুলো কিনতে পেরে আর আজ দুটো ভালো-মন্দ খেয়ে তার বেশি স্ফুর্তি জেগেছে মনে হল। আমার রাতের খাবার খাওয়া যখন শেষ হল তখন শেষ হয় হরিয়ার গান। আর তার পরপরই বাইরেটাও কেমন নিঝুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমিও বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

কিন্তু এদিন রাতেও ঘুম ভেঙে গেল। রাত তখন দুটো হবে। না, বিড়ালের ডাকের জন্য নয়, হঠাৎই কেন জানি না ঘুম ভেঙে গেল আমার। ঘরের ভিতর কেমন যেন একটা গুমোট ভাব। মশারি টাঙিয়ে ঘুমবার অভ্যাস আমার নেই। কিন্তু মশার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য আমি জানলা বন্ধ করে ইলেকট্রিক প্লাগে মশা মারার তেল জ্বালিয়ে শুই। এদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

যাই হোক, আধো অন্ধকার ঘরে মিনিট খানেক আমি একই ভাবে চুপ করে শুয়ে রইলাম। আর এর পরই আমার নাকে একটা জিনিস অনুভূত হল। একটা মৃদু পচা গন্ধ যেন পাচ্ছি আমি। হ্যাঁ, ওই ইঁদুর-টিদুর বা কোনও প্রাণী মরলে পরে যেমন পচা গন্ধ পাওয়া যায়, তেমনই একটা পচা গন্ধ!

শরীরের ভিতর একটা মৃদু অস্বস্তি শুরু হল। গলাটাও যেন কেমন শুকিয়ে এসেছে। খাটের গায়েই একটা টেবিলে জলের বোতল রাখা। উঠে বসে আমি হাত বাড়িয়ে জলের বোতল নিয়ে বেশ কয়েক ঢোঁক জল খেলাম। তারপর বোতলটা রেখে আমি যখন শুতে যাচ্ছি তখনই ঘরের জানলাতে চোখ আটকে গেল আমার। ঘষা কাচ বসানো জানলার ওপাশে একটা বিরাট ছায়ামূর্তি বসে আছে! না মানুষ নয়, একটা বিরাট বাঘ যেন বসে আছে জানলার ওপাশে! সঙ্গে সঙ্গে আমি চোখ কচলে তাকালাম সেদিকে। স্পষ্ট বুঝলাম আমি ভুল দেখছি না।

বাঘের আকারেরই একটা ছায়ামূর্তি জানলার বাইরে রয়েছে। মাঝে মাঝে লেজও নাড়াচ্ছে সেই অবয়ব! আর এর সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার আমার মনে হল—যে পচা গন্ধ আবার নাকে এসে লাগছে, তা যেন কোনও ভাবে জানলার কোনও ফাঁক গলেই ঢুকছে! সত্যি কথা বলতে কী অন্য কেউ হলে বেশ ভয় পেয়ে যেত এ পরিস্থিতিতে। আমি যে একটু ঘাবড়ে যাইনি তা নয়! কিন্তু আমি মনকে বললাম, ‘এ কী ভাবে সম্ভব? এখানে বাঘ আসবে কী ভাবে?’

তবে আসল ব্যাপারটা কী তা আমাকে দেখতে হবে। তাই সাহসে ভর করে উঠে পড়লাম আমি। ঘরের কোণে একটা লাঠি রাখা ছিল তা নিয়ে এগোলাম জানলার দিকে। জানলাতে লোহার গ্রিল বসানো আছে। যদি আসলে কোনও প্রাণীর উপস্থিত থেকেও থাকে, তবে তা অতবড় শরীর নিয়ে গ্রিলের ফাঁক গলে ঘরে ঢুকতে পারবে না। আমি ধীর পায়ে এগোলাম জানলার দিকে। ছায়াটা কিন্তু তখনও আছে এবং সে নড়ছে।

আমি জানলার কাছে গিয়ে ছিটকিনি সরিয়ে এক টানে খুলে ফেললাম জানলার পাল্লা। আর সেটা খুলে ফেলে যাকে আমি দেখতে পেলাম সে বাঘ না হলেও তাকে দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। জানলার ওপাশে কিছুটা তফাতে একটা অনুচ্চ প্রাচীর আছে। তার ওপর বসে আছে সেই সাদা রঙের বিরাট হুলো বিড়ালটা!

প্রাচীরের কোণে বাঁশের মাথায় একটা বাল্ব ঝোলে, সারা রাত বাতিটা জ্বলে। সেই আলোতে আমি স্পষ্ট দেখলাম তাকে। প্রাণীটার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। সে তাকিয়ে আছে জানলার দিকে। আর ওই পচা গন্ধটা তার দিক থেকেই আসছে। এবার ছায়া রহস্য আমি বুঝতে পারলাম। বিড়াল আর ঝুলন্ত বাতিটা পারস্পরিক এমন স্থানে অবস্থান করছে যে বিড়ালের ছায়া দশগুণ পরিবর্ধিত হয়ে জানলায় পড়েছিল। আমি জানলা খোলার পর বেশ কয়েক মূহূর্ত সে চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর লাফ দিয়ে প্রাচীর থেকে এগোল হরিয়ার কুঁড়ের দিকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই পচা গন্ধটাও যেন দূরে সরে যেতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিড়ালটা হরিয়ার ঘরের পিছন দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর আমিও জানলা বন্ধ করে বিছানায় ফিরে এলাম।

হরিয়া খুব জোরের সঙ্গে বিড়াল ফিরবে না বললেও সাদা বিড়ালটা ফিরে এসেছে। হয়তো অন্য বিড়ালগুলোও ফিরেছে বা ফিরবে। তবে তারা ফিরে এলেও আমার তখন আর কোনও সমস্যা ছিল না। কাজেই আমি আবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।’ একটানে আবারও অনেকক্ষণ কথা বলে থামলেন ডাক্তার অরিত্র মুখার্জি।

বাইরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে, মোমবাতিটা অনেকটাই ক্ষয়ে গিয়ে অনুজ্জ্বল হয়ে আসছে। ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেছে ইতিমধ্যে। কাহিনি থামিয়ে অরিত্র ডাক্তার কৌশিকের কাছে জানতে চাইলেন, ‘এই যে এত কথা বলে যাচ্ছি আপনি বোর ফিল করছেন না তো?

কৌশিক জবাব দিল, ‘মোটেও না। আপনি চালিয়ে যান। শুনতে আমার বেশ লাগছে। তাছাড়া কোথায় যেন এবার একটা রহস্যের গন্ধও পাচ্ছি ওই বিড়ালটার ফিরে আসার ব্যাপারটা নিয়ে।’

কৌশিকের কথা শুনে অরিত্র ডাক্তারের ঠোঁটের কোণে কেমন যেন একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এক রহস্যই বটে! তবে কাহিনির বেশি বাকি নেই। আশাকরি আমার কথা শেষ হতে হতে বৃষ্টি থেমে যাবে।’

ঘড়ি দেখল কৌশিক। রাত আটটা সবে বাজে। বেশি রাত হয়নি। ডাক্তারবাবুর কথা শুনতে তার কোনও অসুবিধাই নেই। তিনি আবার শুরু করলেন তার কথা।—

সাত

‘পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙল আমার। বিছানাতে শুয়ে আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম গতরাতের বিড়ালটার কথা। এভাবেই তো মানুষ রাতে আলো-ছায়ার খেলা দেখে ভয় পায়। আমরা জায়গাতে কোনও দুর্বল চিত্তের লোক থাকলে হয়তো ওই বাঘের মতো ছায়া দেখে ভয়ে আধমড়া হয়ে যেত। মনে মনে ভাবলাম আমি। এর পর বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। ব্রাশ করে, অন্য কাজ সেরে যখন চায়ের কাপ শেষ করলাম তখন ঠিক আটটা বাজে। আর এরপরই বাইরে থেকে হরিয়া ডোমের ডাক শুনলাম ‘বাবু, দরজা খুলুন বাবু?’

আমি দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই সে উত্তেজিত ভালে বলল, ‘দয়া করে একবার আমার সাথে চলুন বাবু।’

আমি অনুমান করলাম ফুলমতির সম্ভবত কিছু হয়েছে! আমি তাড়াতাড়ি স্নিপারে পা গলিয়ে কোয়ার্টার ছেড়ে অনুসরণ করলাম তাকে। হরিয়া তার কুঁড়ের কাছে পৌঁছল ঠিকই, কিন্তু সে কুঁড়ের ভিতর না ঢুকে কুঁড়েটাতে বেড় দিয়ে তার পিছন দিকে নিয়ে দাঁড় করাল আমাকে।

সেখানে বাখারির তৈরি ছোট একটা ঘরের মতো জায়গা। তার ঝাঁপটা খোলা। ইশারা করে হরিয়া ডোম আমাকে সেই নীচু ছাদ অলা বাখারির ঘরের ভিতর দেখতে বলল। তার কথা শুনে আমি মাথা নীচু করে বাইরে থেকে উঁকি দিলাম সে জায়গাতে। আমি দেখলাম সেখানে চারপাশে ছড়িয়ে আছে গতকালের কিনে আনা মৃত মোরগ মুরগি গুলো! তখনও তাদের পায়ে দড়ি বাঁধা। পালকও ছড়িয়ে আছে তাদের চারপাশে। কেউ যেন মেরে রেখে গেছে মুরগিগুলোকে!!

আমি বললাম, ‘ব্যাপারটা বিড়ালের কাণ্ডই মনে হচ্ছে!’

হরিয়া বলল, ‘বিড়াল কী ভাবে ঢুকবে? দরজা বন্ধ ছিল। আমি সকালে দরজা খুলে দেখলাম মুরগিগুলো মরে আছে! বিড়াল ঝাঁপের হুড়কো খুলবে কী ভাবে? তাছাড়া এখানে কোনও বিড়াল নেই।’

আমি এবার তাকে বললাম, ‘মা ষষ্ঠীর বাহন কিন্তু আবার এখানে ফিরে এসেছে। মানে ওই সাদা বিড়ালটা। কাল মাঝরাতে জানলা খুলে আমি তাকে দেখেছি। ঘরের গায়ে প্রাচীরটার ওপর বসে ছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে সে প্রাচীর থেকে নেমে এদিকে এসে মিলিয়ে গেল। সম্ভবত তোমার ঘরের পিছনে অর্থাৎ এই জায়গাতেই সে এসেছিল।

আমার কথা শুনে হরিয়ার মুখ বিস্ময় হাঁ হয়ে গেল। সে বলল, ‘তা কীভাবে হবে? সে কোনও ভাবেই ফিরে আসতে পারে না। ফুলমতিও বলছিল সে নাকি গত রাতে তাকে দেখেছে। আমি তাকেও বললাম, নেশার ঘোরে ভুল দেখেছ তুমি। সাদা বিড়ালটা কোনও ভাবেই ফিরে আসতে পারে না। কখনোই পারে না।’

আমি বললাম, ‘ফুলমতি কোথায় দেখেছে বিড়ালটাকে?’

হরিয়া বলল, ‘গত রাতে আমরা দুজনেই নেশা করে শুয়েছিলাম। আমি মেঝেতে শুই আর ফুলমতি খাটিয়াতে। শেষ রাতে ফুলমতির ঘুম ভেঙে যায়। তখন নাকি সে দেখতে পায় সাদা বিড়ালটা খাটিয়ার ওপর উঠে তার পেটের ওপর থাবা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ফুলমতি তো দেখে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। আর তা শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি কিন্তু কোনও বিড়াল দেখতে পাইনি। দেখা সম্ভবও নয়। কারণ, ওই বিড়ালটার ফিরে আসার কোনও সম্ভাবনাই নেই।’

আমি তার কথা শুনে বললাম, ‘আমি আর তোমার বউ দুজনেই কি তবে ভুল দেখলাম। হয়তো তুমি তাদের যেখানে রেখে এসেছিলে সেখান থেকে কোনও ভাবে বিড়ালটা ফিরে এসেছে।’

আমার কথা শুনে হরিয়া তার মাথাটা এমন ভাবে ঝাঁকাল যে আমার কথা কিছুতেই সে মানতে পারছে না। ব্যাপারটা আমার অদ্ভুত লাগলেও আমি এ ব্যাপার নিয়ে হরিয়ার সঙ্গে তর্কে গেলাম না। আমি হরিয়াকে বললাম, ‘যে ভাবেই হোক মুরগি গুলো মারা যাওয়াতে তোমার বেশ ক্ষতি হল বুঝতে পারছি।’

হরিয়া আক্ষেপের স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ বাবু, খুব ক্ষতি হল আমার। আর সেটাই আপনাকে দেখাতে আনলাম।’

তার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমি তাকে বললাম, ‘কাল সকালে আমি ফিরে যাব। তার আগে তোমাকে আমি কিছু টাকা দেব স্বাস্থ্য কেন্দ্র ধোয়া মোছা করেছ বলে। আর একটা কথা, এই অবস্থায় বউকে মদ খেতে দিও না, তাতে ক্ষতি হতে পারে।’

হরিয়া জবাব দিল, ‘আচ্ছা বাবু। এখন দেখি মরা মুরগিগুলোকে নিয়ে কী করি?’

হরিয়াকে ছেড়ে আমি এরপর রওনা হলাম ফেরার জন্য।

বেলা দশটায় স্নান খাওয়া সেরে আমি গিয়ে হাজির হলাম স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। এদিনই তো আমার শেষ দিন এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ভিতরে প্রবেশ করে আমি প্রথমেই ঘরগুলো পরিদর্শন করতে শুরু করলাম। সেই সাদা বিড়াল বা অন্য কোনও বিড়াল ফিরে এসেছে কিনা তা দেখার জন্য। না, কোনও বিড়ালেরই চিহ্ন দেখলাম না কোনও ঘরে। তবে সেই বড় ঘরটা অর্থাৎ যে ঘরে সাদা বিড়াল সহ ষষ্ঠীদেবীর অন্য বাহনরা থাকত সেই ঘরে পা রেখেই আমার নাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা পচা গন্ধ লাগল। সে গন্ধটা ঠিক গত রাতের গন্ধের মতোই। বাইরে থেকে আসা আলোতে ঘরের সব কিছু স্পষ্ট। হরিয়ার ধুয়ে মুছে যাওয়া ঝকঝকে ঘর। সে ঘরের ভিতর সবখানে ভালো করে তাকিয়েও সে গন্ধের উদ্রেক ঘটাবার মতো কোনও জিনিস চোখে পড়ল না। যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আমি সোজা এসে বসলাম আমার ঘরে।

অন্যদিন আমার সহকর্মীরা আসে। তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করে সময় কেটে যায়। একলা বসে নানা কথা আমি ভাবতে লাগলাম। কিন্তু কেন জানি মাঝে-মাঝেই আমার মনে পড়ে যেতে লাগল গত রাতে দেখা সাদা বিড়ালটার সেই বাঘের মতো ছায়ার কথা। বেলা বারোটা নাগাদ একজন পেশেন্ট এল আমার কাছে। বৃদ্ধ মানুষ, গ্রামেরই লোক।

বার্ধক্য জনিত কিছু সমস্যা নিয়ে তিনি ডাক্তার দেখাতে এসেছেন। ভালো করে তাকে দেখার পর আমি ভদ্রলোককে ওষুধপত্র আর প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবার পর আমি সময় কাটাবার জন্যই একটু গল্প জোড়বার চেষ্টা করলাম। গ্রামের সম্পর্কে নানা কথা জিগ্যেস করতে লাগলাম। আমি শহরে মানুষ তার গ্রামের খবর জানতে চাইছি দেখে বৃদ্ধও আগ্রহ ভরে আমার প্রশ্নের জবাবে তার গ্রাম সম্পর্কে নানা কথা শোনাতে লাগলেন। কথা প্রসঙ্গে একবার তিনি আমাকে বললেন, ‘এখানে একটা বড় সাদা বিড়াল ঘুরে বেড়ায়, তাকে দেখেছেন নিশ্চয়ই?’

আমি জবাব দিলাম হ্যাঁ, দেখেছি। অত বড় বিড়াল আমি আগে দেখিনি!’

বৃদ্ধ বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার আশি বছর বয়স হল আমিও দেখিনি। গ্রামের কেউই দেখেনি। ঠিক যেন একটা বাঘের বাচ্চা! আর বিড়াল হলেও বাঘের মতোই তার রাজকীয় চাল-চলন। গ্রামের অনেকে বলে ওই বিড়ালটা নাকি সাক্ষাৎ মা ষষ্ঠীর বাহন। নইলে অমন চেহারা কোনও বিড়ালের হয়?’

বৃদ্ধর কথা শুনে আমার আবার মনে পড়ে গেল গত রাতে দেখা বাঘের মতো সেই বিশাল ছায়ার কথা! আমি বৃদ্ধকে জিগ্যেস করলাম, ‘কত দিন ধরে ওকে আপনারা দেখছেন?’

বৃদ্ধ একটু ভেবে নিয়ে প্রথমে জবাব দিলেন ‘তা অন্তত কুড়ি-বাইশ বছর হল আমি ওকে দেখছি।’

তারপর তিনি তার উত্তরের সঙ্গে যোগ করলেন, ‘বাড়ির পোষা বিড়ালকে খুব যত্নে রাখলে সাধারণত চোদ্দো-পনেরো বছর বাঁচে। মা ষষ্ঠী যদি ওর ওপর কৃপা না করে থাকেন তবে কী ও এতদিন বাঁচত। বহু বছর আগে একবার মা ষষ্ঠীর পুজোর দিন মন্দিরের পুরোহিত ওকে দেবীমূর্তির সামনে বসে থাকতে দেখে। সেই থেকে ও এই গ্রামেই রয়েছে।’

আমি শুনেছি, ‘কাবুলে বিড়াল’ নামে এক ধরনের বড় আকৃতির বিড়াল পাওয়া যায়। বড় লোকেরা সে বিড়াল পোষেনও। এমনও হতে পারে মনস্কামনা পূর্ণ হওয়াতে সে বিড়াল কেউ ছেড়ে দিয়ে গেছে?’

আমার বক্তব্য শুনে বৃদ্ধ বললেন, ‘তেমন হলে আমরা ঠিক জানতে পারতাম। আর এ গ্রামে আর আশেপাশের বেশির ভাগ মানুষই কাবুলতো অনেক পরের ব্যাপার, কোনওদিন কলকাতা যায়নি।’

বৃদ্ধর কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম, ‘গ্রামের বহু মানুষের মতো তাঁরও দৃঢ় বিশ্বাস যে ওই বিরাটাকৃতির সাদা বিড়ালটা সাক্ষাৎ মা ষষ্ঠীরই বাহন।’

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে নানা কথাবার্তা হল ভদ্রলোকের সঙ্গে। তারপর তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। আগের মতো একলা বসে রইলাম আমি।

বেলা প্রায় চারটে নাগাদ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শুনে দেখি হরিয়া এসে দাঁড়িয়েছে। আমি বললাম ভিতরে এসো?’

ঘরে ঢুকল হরিয়া। সঙ্গে-সঙ্গেই দেশী মদের কড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। হরিয়ার চোখ লাল। বাইরে থেকে নেশা করে এসেছে সে। মৃদু জড়ানো গলায় সে বলল, ‘অনেক ঘুরে শেষে মুরগিগুলোর একটা গতি করলাম। দুশো টাকা পেলাম।’

আমি বিস্মিতভাবে জানতে চাইলাম, ‘মরা মুরগি তুমি কোথায় বেচলে?’

হরিয়া কোনও রাখঢাক না করেই বলল, ‘নদীর পাড়ে বেশ কয়েকটা হোটেল আছে। শহর থেকে বাবুরা যেখানে মেয়েছেলে নিয়ে আসে। সময় কাটিয়ে আবার ফিরে যায়। চোরাই মদও বিক্রি হয় ওই সব হোটেলে। তেমনই একটা হোটেল কিনে নিল মরা মুরগিগুলো।’

তার কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম এমন শান্ত গ্রামীণ পরিবেশেও লোকচক্ষুর আড়ালে নানা গোপন খেলা চলে! আমি তাকিয়ে রইলাম হরিয়ার দিকে। সে আমার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার অমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ, আমি অনুমান করতে পারলাম। পকেট থেকে পার্স বার করে একটা পাঁচশো টাকার নোট তার দিকে এগিয়ে দিলাম। যদিও এত টাকা প্রাপ্য ছিল না, তবুও লোকটার ক্ষতি হয়েছে বলেই দিলাম।’

টাকাটা হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে হরিয়া বলল, ‘আপনি বড় ভালো লোক ডাক্তারবাবু, আবার আসবেন এখানে।’

আমি মনে মনে বললাম, ‘আজকের রাতটা কোনওক্রমে কাটিয়ে এই গণ্ডগ্রাম ছেড়ে যেতে পারলে বাঁচি। এখানে থাকতে আমার আর ভালো লাগছে না।’

মনে মনে এ কথা বললেও আমি মুখে হেসে হরিয়াকে বললাম, সরকার পাঠালে নিশ্চয়ই আসব। সব টাকা কিন্তু মদ খেয়ে উড়িয়ে দিও না। সামনে তোমার সন্তান আসছে। তার পিছনে তখন কিন্তু খরচ হবে। আর ফুলমতিকেও একটা দিন সাবধানে রাখবে।’

হরিয়া জবাব দিল ‘আচ্ছা বাবু।’

আর এরপরই হরিয়া হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করল, ‘সাদা বিড়ালটা বা অন্য কোনও বিড়ালকে আপনি কি আর দেখতে পেলেন বাবু?’

আমি বললাম ‘না পাইনি।’

আমার জবাব শুনে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল হরিয়ার মুখে। নেশাগ্রস্ত হরিয়া বলল, ‘না, দেখতে পাবেন না। কেউ পাবে না। এত দূরে তারা চলে গেছে যে তাদের আর ফেরা সম্ভব নয়। কাল রাতে আপনি ভুল দেখেছিলেন।’ এ কথা বলে আমাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হরিয়া ডোম।

আবারও একলা বসে রইলাম আমি। কিন্তু মিনিট দশেকের মধ্যেই আবার ঘরে ঢুকল হরিয়া! চোখে-মুখে তার প্রবল উত্তেজনার ভাব…।’

আট

মোমবাতিটা গলতে গলতে শেষ হয়ে একবার দপ করে জ্বলে উঠে নিভে গেল। ডাক্তার অরিত্র মুখার্জি সে জন্যই হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য তার কথা থামিয়ে দিলেন। বাইরে বৃষ্টি এবার কমতে শুরু করেছে। কৌশিক মন দিয়ে শুনে চলেছিল অরিত্র ডাক্তারের কথা। তিনি থামতেই কৌশিক বলল, ‘আপনি বলুন? অন্ধকারে আমার অসুবিধা হবে না।’

টেবিলের ঠিক উলটো দিকে বসে থাকলেও মুখ দেখা যাচ্ছে না অরিত্র ডাক্তারের। কৌশিকের তবু মনে হল তার গল্প শোনার আগ্রহ দেখে যেন হাসলেন। অন্ধকার ঘর। অরিত্র ডাক্তার বলতে শুরু করলেন তাঁর কাহিনির শেষাংশ—

‘হরিয়ার চোখে-মুখে উত্তেজনার ভাব দেখে আমি বলে উঠলাম, ‘কী হল তোমার?’ হরিয়া জবাব দিল, ‘ফুলমতি উঠছে না, কথা বলছে না!’

আমি বললাম, ‘তার মানে?’

হরিয়া উত্তর দিল। ‘অনেকবার ডাকলাম, গায়ে ধাক্কা দিলাম, কিন্তু সে উঠছে না!’

তার জবাব শুনে আমি উৎকণ্ঠিতভাবে বললাম, ‘অজ্ঞান হয়ে গেছে?’

হরিয়া বলল, ‘বুঝতে পারছি না বাবু। সে জন্য আপনাকে ডাকতে এলাম।’

হরিয়ার কথা শুনে আমি চেয়ার থেকে প্রথমে স্টেথো হাতে উঠে দাঁড়ালাম তার সঙ্গে যাবার জন্য। কিন্তু এর পরই আমার মনে হল ফুলমতিকে যদি স্যালাইন, অক্সিজেন দিতে হয় তবে একেবারে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আনাই ভালো। সময় নষ্ট করা উচিত নয়।

আমাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একটা ট্রলি আছে। আমি হরিয়াকে বললাম। ‘তুমি ট্রলিটা নিয়ে গিয়ে ওকে বড় ঘরে আনতে পারবে?’

হরিয়ার শক্ত চেহারা। ট্রলি ঠেলতে অসুবিধা হবে না। সে বলল ‘পারব বাবু।’

আমি বললাম, ‘তবে আর সময় নষ্ট কোরো না। তাড়াতাড়ি আনো তাকে।’

আমার কথা শুনে হরিয়া ছুটল তার কাজে। আমি ট্রলির চাকার শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম ট্রলি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হরিয়া। আমিও প্রস্তুত হলাম পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখার জন্য। দুটো চাদর, স্যালাইনের বোতল, আর চাকা লাগানো অক্সিজেন সিলিন্ডারটা টানতে টানতে আমি এগোলাম সেই বড় ঘরটার দিকে। ঘরটাকে নির্বাচন করলাম দুটো কারণে।

ঘরটার কিছু তফাতেই বাইরে বেরোনোর দরজা আর ছোট অপরেশন থিয়েটারটাও সে ঘরের কাছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আমি সে ঘরে ঢুকলাম। প্রথমেই আমি একটা পরিষ্কার চাদর পেতে দিলাম। লোহার খাটে, স্যালাইনের বোতলও ঝুলিয়ে দিলাম বেডের গায়ের স্ট্যান্ডের সঙ্গে। এ সব সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই এরপর আমি জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম ট্রলিতে বউকে উঠিয়ে ঠেলতে ঠেলতে স্বাস্থ্য কেন্দ্রর দিকে আসছে হরিয়া।

মিনিট খানেকের মধ্যেই সে ট্রলিসমেত ঘরে প্রবেশ করল। আমার ইশারাতে সে ফুলমতিকে ট্রলি থেকে পাঁজাকোলা করে বেডে নামাল। এই প্রথম ফুলমতির মুখ দেখলাম আমি। গায়ের রঙ কালো হলেও বেশ সুন্দর মুখশ্রী। আর বয়সও হরিয়ার থেকে অনেকটাই কম হবে। খুব বেশি হলে ফুলমতির বয়স তিরিশ হবে। যেন চোখ বন্ধ করে ঘুমোচ্ছে ফুলমতি।

আমি ফুলমতিকে পরীক্ষা করার জন্য তার কবজিটা ধরলাম। আর তারপরই আমি চমকে উঠলাম! এত ঠান্ডা কেন তার হাত! আর ফুলমতির হাতে কোনও স্পন্দন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! আমি এরপর ফুলমতির চোখ দুটো ফাঁক করলাম, তার চোখের তারা স্থির। আমি স্টেথো দিয়ে দেখলাম ফুলমতির বুক আর পেট। না, কোথাও কোন স্পন্দন নেই!

হরিয়া নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল ফুলমতির দিকে তাকিয়ে। এবার সে কোনও কিছু একটা আন্দাজ করে জানতে চাইল ‘ফুলমতির কি হয়েছে?’

আমি জবাব দিলাম, ‘ফুলমতি বেঁচে নেই। সম্ভবত ঘণ্টাখানেক আগেই সে মারা গেছে।’

আমার কথা শুনে হরিয়া আঁতকে উঠে বলল, ‘আর ওর পেটের বাচ্চাটা?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘সে-ও আর বেঁচে নেই।’

হরিয়া বলে উঠল, ‘কেন এমন হল?’—এই বলে পাথরের মূর্তির মতো জানলার বাইরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।

হ্যাঁ, হঠাৎ কেন এমন হল! আমি মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলাম তার কারণ। হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম ফুলমতির ঠোঁটের একপাশে যেন এক ফোঁটা শুকনো রক্ত লেগে আছে! ব্যাপারটা দেখে আমি ফুলমতির চোয়াল চেপে তার মুখটা হাঁ করলাম। ফুলমতির জিভেও শুকনো রক্ত লেগে আছে! অর্থাৎ মৃত্যুর আগে ফুলমতির গলা দিয়ে রক্ত উঠেছিল! আমি তার মুখের ভিতরটা আরও ভালো করে দেখার জন্য আমার মুখটা তার মুখের ওপর আরও নামিয়ে আনলাম। আর তখনই তার খোলা মুখ থেকে একটা গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। রাসায়নিকের ঝাঁঝাল গন্ধ! সম্ভবত কীটনাশক!

আমি চমকে উঠে হরিয়াকে বললাম, ‘তোমার বউ তো দেখছি বিষ খেয়েছে!’

কথাটা শুনেই কেঁপে উঠল হরিয়া।

আমি উত্তেজিতভাবে তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘সে বিষ খেল কেন? বিষ কোথায় পেল?’

আমাকে চমকে দিয়ে হরিয়া স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘বিড়ালগুলোকে মারার জন্য যে বিষ এনেছিলাম তার কিছুটা ঘরে রাখা ছিল। সেটাই ভুল করে ফুলমতি খেয়ে ফেলেছে।’

তার কথা শুনে আমি বিস্মিতভাবে বলে উঠলাম, ‘এ তুমি কী বলছ হরিয়া!’ হরিয়া এবার হাউমাউ করে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার পাপেই সব শেষ হয়ে গেল! ষষ্ঠীর বাহনদের মেরে ফেলেছিলাম, তার শাস্তি পেলাম আমি। ফুলমতির পেটের বাচ্চাটাও রক্ষা পেল না। সব শেষ হয়ে গেল আমার।’ বলতে বলতে সে উন্মাদের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি তাকে পিছন থেকে চিৎকার করে ডাকলাম, কিন্তু সে কর্ণপাত করল না। আমি শুনতে পেলাম তার আর্তনাদ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বাইরে রাস্তার দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ঘটনার তীব্র আকস্মিকতায় আমিও একটু বেসামাল হয়ে গেলাম, কিছু সময়ের জন্য। ফুলমতির মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। তারপর আমার সম্বিত ফিরল। একটা সাদা চাদর দিয়ে ফুলমতির মৃতদেহটা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে সে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলাম।

হাত ধুয়ে, চোখ-মুখে জল দিয়ে একটু শান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগল আমার। এর পর একটু ভেবে নিয়ে আমি আমার আশু কর্তব্য ঠিক করলাম। মৃত্যুটা যখন বিষক্রিয়াতে ঘটেছে তখন স্থানীয় থানাকে খবরটা দিতে হবে। পুলিশ সদর হাসপাতালে বডি নিয়ে যাবে পোস্ট মর্টেমের জন্য। তারাই তদন্ত করে দেখবে ব্যাপারটা খুন, নাকি আত্মহত্যা?’

কিন্তু স্থানীয় থানার ফোন নম্বর তো আমার কাছে নেই। আমি ফোন করলাম পরিমলকে। কিন্তু তার ফোন সুইচড অফ। সে সদরে গেছে এবং মোবাইল ফোন কোনও কারণে বন্ধ করে রেখেছে। আর নার্স বীণা মণ্ডলের ফোনে রিং হয়ে গেল। কিন্তু তিনি ফোন ধরলেন না। আমি এরপর গুগল সার্চ করে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের একটা ল্যান্ড লাইন নম্বর পেলাম ঠিকই, কিন্তু যতবারই সে নম্বরে ফোন করি ততবারই ফোন এনগেজড!

হরিয়া তার বউকে এনেছিল চারটের সময়, দেখতে দেখতে এক ঘণ্টা কেটে গেল। বাইরে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। এর পরও প্রায় আধ ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম আমি গ্রামে গিয়ে থানায় যাবার রাস্তা জেনে নিয়ে নিজেই খবরটা পৌঁছতে যাব। এ কথা ভেবে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠতেই বাইরে একটা গাড়ি এসে থামার শব্দ পেলাম।

বাইরে বেরিয়ে আমি একটু অবাকই হলাম। একটা পুলিশের গাড়ি থেকে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে নামছেন একজন পুলিশ অফিসার। তার কি হরিয়াই থানায় খবর দিয়েছে?

আমি তার দিকে এগিয়ে যেতেই, আমার গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলতে দেখে তিনি আমার পরিচয় অনুমান করে জানতে চাইলেন, ‘আপনি এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তারবাবু?’

আমি আমার পরিচয় দিতেই পুলিশ অফিসার বললেন, ‘স্যার, একটা খারাপ খবর আছে। আপনাদের হাসপাতালে যে হরিয়া ডোম থাকে সে মারা গেছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ অনুসারে গ্রাম থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তা ধরে লোকটা নাকি কী কারণে কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মতো ছুটছিল। একটা লরি পিষে দিয়েছে তাকে। খবর পেলাম তার বউ এখানে থাকে। তাই তাকে খবরটা দিতে এসেছি। তাকে ডেকে দিতে পারবেন?’

কথাটা শুনে আমি চমকে উঠলাম। তারপর আমার কথা শুনে পুলিশ অফিসারও চমকে উঠলেন। আমি বললাম, ‘হরিয়ার বউ ফুলমতিও বেঁচে নেই। হরিয়া তাকে মৃত অবস্থাতেই ঘণ্টা দেড়েক আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এনেছিল। সম্ভবত বিষ খেয়ে মৃত্যু হয়েছে আসন্নপ্রসবা ফুলমতি ও আর গর্ভস্থ সন্তানের। বডিটা এখানেই আছে। বউয়ের দেহ ফেলে রেখে হরিয়া চলে যায়। আমি ফোনে আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টার ব্যর্থ হয়ে এখন থানাতে খবর দেবার জন্য রওনা দিচ্ছিলাম।’

অফিসার বললেন, ‘অদ্ভুত ব্যাপার! চলুন তো দেখি, বডিটা দেখব?’

আমি অফিসার আর তার সঙ্গীদের নিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভিতর প্রবেশ করে সেই ঘরে উপস্থিত হলাম। ঘরে ঢুকতেই একটা পচা গন্ধ এসে লাগল নাকে! পুলিশ অফিসারও সেটা টের পেয়ে মৃদু সন্দিগ্ধ ভাবে বললেন, ‘আপনি যে বললেন, ঘণ্টা দেড়েক আগের ঘটনা, কিন্তু লাশ যে গন্ধ হয়েছে!’

আমি তাকে আশস্ত করে বললাম, ‘পচা গন্ধটা বাইরে থেকে আসছে। আমি আগেও পেয়েছি। লাশ দেখলেই বুঝতে পারবেন এখন টাটকাই বলা যায়, পচন ধরেনি।’

বেডের পাশে গিয়ে আমি ফুলমতির মুখের ওপর থেকে কাপড়টা সরালাম। তারপর বললাম, ‘ওর মুখের ভিতর শুকনো রক্ত আছে, রাসায়নিকে গন্ধ আছে, তা দেখেই আমার অনুমান ও বিষ খেয়েছিল। পোস্ট মর্টেম করলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আপনিও ওর মুখ খুলে ব্যাপারটা একবার দেখতে পারেন।’

পুলিশ অফিসর অবশ্য সে পথে হাঁটলেন না। ফুলমতির মুখের ওপর কাপড়টা টেনে দেবার পর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ওর নাম কী? কী ভাবে ও বিষ খেল এসব ব্যাপার কিছু জানেন?’

স্বাভবিক ভাবেই হরিয়া আমাকে যা বলেছে তা আমি বললাম না অফিসারের কাছে। কারণ, তাতে এই মৃত্যুর সঙ্গে পরোক্ষ ভাবে আমারও জড়িয়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। যদিও আমি হরিয়াকে বিড়াল মারার জন্য বিষ আনতে বলিনি। আমি অফিসারকে বললাম, হরিয়ার মুখ থেকে শুনেছি ওর নাম ফুলমতি। ওর বা হরিয়ার সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। আমি বদলি ডাক্তার হিসাবে মাত্র সাত দিন এখানে এসেছি। কাল সকালেই আমার কলকাতা ফিরে যাবার কথা। ফুলমতি কী ভাবে বিষ খেল, কেন খেল—এ সব নিয়ে হরিয়া কিছু বলেনি আমাকে। তার স্ত্রী মৃত জানার সঙ্গে সঙ্গেই সে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছিল।

আমার কথা শুনে পুলিশ অফিসার একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘কয়েকজন লোকের মুখে শুনলাম হরিয়া ডোম নাকি খুব মদ খেত। হয়তো স্ত্রীর সঙ্গে তার কোনও ঝামেলা হয়ে থাকবে যেমন হয়, মাতালদের ঘরে। সম্ভবত তার পরিনামেই এই মৃত্যু। তবে বউটা বিষ নিজে খেয়েছিল নাকি হরিয়াই খাইয়ে ছিল তা আর এখন আর জানার উপায় নেই। দুজনের কেউ বেঁচে নেই।’

এ কথা বলার পর অফিসার আর ডায়েরিতে প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে নিলেন, আমার নাম ঠিকানাও নিলেন। সে কাজ মেটার পর আমি অফিসারকে প্রশ্ন করলাম, বডিটা কখন নিয়ে যাবেন আপনারা?’

পুলিশ অফিসার বললেন, ‘আমাদের ছোট থানা। একটাই লাশ টানা গাড়ি। আমাদের তো আগে এ ঘটনার কথা জানা ছিল না। হরিয়ার লাশটা দিয়ে সে গাড়িকে সদর হাসপাতালে পোস্ট মর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটু পরেই তো অন্ধকার নেমে যাবে। রাত্রে বরং লাশাটা এখানেই থাক। কাল ভোরে আমি এখানে আসব লাশ নিয়ে যাবার জন্য।’

এরপর অফিসারের সঙ্গে আমার কিছু মামুলি কথাবার্তা হল সে ঘরে দাঁড়িয়ে। অবশেষে সে ঘরের দরজা বন্ধ করে অফিসারের সঙ্গে আমি এগোলাম তাকে তার গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্য। অফিসার যখন গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন তখন আমি তাকে বললাম, ‘স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তারবাবুর কাল আসার কথা, আমারও ফিরে যাবার কথা, সেক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা নেই তো?’

অফিসার আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আপাতত আপনার ফিরে যাবার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা নেই। আপনার নাম ফোন নাম্বারটা তো রইলই। ভবিষ্যতে কোনও প্রয়োজন হলে পুলিশ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে। তাছাড়া কাল ভোরে তো আপনার সঙ্গে আমার একবার দেখা হচ্ছেই।’ এ কথা বলে অফিসার গাড়িতে উঠে পড়লেন।

পুলিশ অফিসার চলে যাবার পর আমি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভিতরে ঢুকে প্রথমে সদর দরজা বন্ধ করলাম, তারপর পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সেটা বন্ধ করে রওনা হলাম কোয়াটার্সের দিকে। সূর্য ডুবে গেছে, বাতাসে একটা গুমোট ভাব। কোয়াটার্সের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আবারও সেই পচা গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। কিন্তু একটু থেমে চারপাশে তাকিয়েও আমি তার উৎস সন্ধান করতে পারলাম না। দূর থেকে হরিয়ার কুঁড়েটা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি উঠলাম ঘরের বারান্দাতে, ঘরের দরজা খুললাম। প্রায় ঘণ্টা তিনেক ধরে বেশ বড় মানসিক ধকল গেছে আমার। আমি পোশাক ছেড়ে প্রথমেই ছুটলাম স্নান ঘরে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে স্নার করার পর শরীর-মন কিছুটা আমার ঠান্ডা হল।

নয়

বাইরে অন্ধকারে নেমেছে। স্নান সেরে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে বাতি নিভিয়ে অন্ধকারেই আমি শুয়েছিলাম। হঠাৎ একটা গুড় গুড় শব্দ আমার কানে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম সেটা বাজের শব্দ, মেঘ ডাকছে, আমি বিছানা ছেড়ে উঠে জানলা খুলতেই একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা আমার গায়ে এসে লাগল। বুঝতে পারলাম বৃষ্টি নামতে চলেছে এই পাড়া-গাঁয়ের বুকে। আমার অনুমানই সত্যি হল, কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল, আর তার সঙ্গে বিদ্যুতের ঝলক আর বাজের গর্জন। দিনের শেষে ওই বৃষ্টিভেজা বাতাসের ঝাপটা বেশ ভালোই লাগছিল আমার। শরীর মন, সব যেন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। যেন এই বর্ষণ মুখর পৃথিবীর বুকে আমি একলা মানুষ, পৃথিবীতে আর কোথাও কোনও মানুষের অস্তিত্ব নেই। এক বিচিত্র সুন্দর অনুভূতি সৃষ্টি হল আমার মনে। এদিনের যাবতীয় দুর্ঘটনার কথা, দু-দুটো মানুষের অপমৃত্যুর ঘটনা সব যেন কিছু সময়ের জন্য আমি ভুলে গিয়ে ভাবতে লাগলাম আমার ফেলে আসা জীবনের সুখ-স্মৃতির কথা। বৃষ্টি হয়েই চলল।

কিন্তু এরপরই এক সময় হঠাৎ আমার ভাবনার ছন্দপতন ঘটল। আমাকে বেশ চমকে দিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশ বিদ্যুৎ শিখাতে আলোকিত হয়ে উঠল। আর সেই আলোতে আমি স্পষ্ট দেখলাম, আমি ঘরের যে জানলাতে দাঁড়িয়ে আছি তার ঠিক নীচে হাত পঁচিশ তফাতে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিরাট শাদা বিড়ালটা! সে যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকেই! আকাশে বিদ্যুতের চমক যতক্ষণ ছিল, অর্থাৎ সেই এক সেকেন্ড বা দু-সেকেন্ডই আমি দেখতে পেলাম তাকে, আর তারপরই পৃথিবী কাঁপিয়ে বাজ পড়ল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালটা যেন মিলিয়ে গেল! আমার মনে হল, তবে কি ওই বিড়ালটাকেই শুধু হরিয়া বিষ দিয়ে মারতে পারেনি? নইলে আমি তাকে বার বার দেখছি কেন? আবার এর পরক্ষণেই আমার মনে হল, হয়তো আমি ভুল দেখছি! ওই যাকে বলে হ্যালুসিনেশন—অবচেতন মনের প্রভাবে দৃষ্টি বিভ্রম! নইলে মুহূর্তর মধ্যে বিড়ালটা অদৃশ্য হয়ে যায় কী ভাবে! যাই হোক তারপর আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে কাছে-পিঠে এত বজ্রপাত শুরু হল যে খোলা জানালার সামনে আমি আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সমীচীন বোধ করলাম না। জানলা বন্ধ করে দিলাম। এই ঝড়-জলের রাতে আমার আর রান্না করার ইচ্ছা হল না। যদি রাতে খিদে পায় তখন না হয় শুকনো খাবার খেয়ে নেওয়া যাবে। এই ভেবে বিছানাতে শুয়ে পড়লাম আমি। বাইরে থেকে ভেসে আসা বাজের গর্জন, আর বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঠান্ডা পরিবেশে আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা খেয়াল যেই।

টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুম দেবার পর রাত বারোটা নাগাদ যখন আমার ঘুম ভাঙল তখন বাইরে বাজের শব্দ, বৃষ্টির শব্দ থেমে গেছে। ঘুম ভাঙার পর চুপচাপ কিছুক্ষণ বিছানাতে শুয়ে থাকার পর, মৃদু খিদে অনুভব হওয়াতে বিছানা থেকে উঠলাম আমি।

আলোটা সবে জ্বালিয়েছি, ঠিক তখন শব্দটা কানে এল আমার। বিড়ালের সন্মিলিত কণ্ঠস্বর! কান খাড়া করে শব্দটা শোনার চেষ্টা করে আমি বুঝতে পারলাম, সেটা ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিক থেকেই আসছে! কিন্তু তা কি করে সম্ভবত? তবে কী বিড়াল মারার জন্য হরিয়া বিষ এনেছিল আর সেই বিষ ফুলমতি খেয়েছে, এ কথা হরিয়া মিথ্যা বলেছিল আমাকে? হ্যাঁ, ওই সম্মিল্লিত বিড়ালের ডাক তো স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিক থেকেই ভেসে আসছে! সন্দেহ নিরসনের জন্য দরজা খুলে আমি বারান্দায় দাঁড়াতেই কিন্তু সে শব্দ থেমে গেল!

আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে নিঝুম স্বাস্থ্য কেন্দ্র। অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই ঘরটাও, যেখানে চাদর চাপা দিয়ে রাখা আছে ফুলমতির বডিটা। কোথাও কোনও শব্দ নেই! মিনিট খানেক সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। তবে হয়তো আমি যা শুনেছি তা আমার মনের ভূল। ও কথা ভেবে ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম আমি। কিন্তু এর পর মিনিট তিনেকও কাটল না, সবে আমি দুটো বিস্কুট মুখে দিয়েছি, আবার শুরু হল, বিড়ালদের সেই সম্মিল্লিত ডাক! আবার দরজা খুলে বাইরে এলাম আমি, কিন্তু কী আশ্চর্য সেই মুহূর্তেই সে ডাক বন্ধ হয়ে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তবে কি বিড়ালগুলো আমাকে দেখতে পেয়ে ডাক থামিয়ে দিচ্ছে? কিন্তু হরিয়ার কথা যদি সত্যি হয় তবে বিড়াল কোথা থেকে আসবে আমার বোধগম্য হল না।

দ্বিতীয় বারের জন্য ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম আমি। ক’টা বিস্কুট আর জল খেয়ে বাতি নিভিয়ে আমি শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ওই সম্মিল্লিত বিড়ালের ডাক যেন আমার সঙ্গে নিষ্ঠুর রসিকতার অপেক্ষায় ছিল!

আমি বিছানাতে শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার তাদের ডাক শুরু হলো। এবার সেই শব্দ আরো জোরে। মা ষষ্ঠীর বাহনদের সম্মিল্লিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে লাগল স্বাস্থ্য কেন্দ্রর দিক থেকে। অবিরাম চিৎকার। আমি কানে বালিশ চাপা দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম সে শব্দ যাতে কানে না প্রবেশ করে সে জন্য। কিন্তু তাতে ফল মিলল না। উপরন্তু যেই সম্মিল্লিত মার্জার ধ্বনি যেন ক্রমশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিক থেকে এগিয়ে আসতে লাগল আমার ঘরের দিকে!

বাইরের নিস্তব্ধতাকে যেন ফালা ফালা করে চিরে ফেলছে সেই মার্জার সঙ্গীত! এক সময় আমি আর তা সহ্য না করতে পেরে খাট ছেড়ে নেমে পড়লাম। ব্যাপারটা কী ঘটেছে তা আমাকে দেখতে হবে। স্লিপারে পা গলিয়ে বাতি না জ্বালিয়ে আমি দরজার কাছে গিয়ে সন্তর্পণে দরজাটা খুলে ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল শব্দ! এ তো আশ্চর্য ব্যাপার!

বারান্দাতে বেরিয়ে এলাম আমি। তবে বিড়ালের ডাক না শুনলেও একজনকে বারান্দার কিছুটা তফাতে সামনের জমিতে স্পষ্ট বসে থাকতে দেখলাম। সেই বিরাট সাদা বিড়ালটা! তবে কি ওই অদ্ভুত বিড়ালটার কণ্ঠ থেকেই বেরোচ্ছে সন্মিল্লিত মার্জার ধ্বনি?

এক অদম্য অজানা কৌতূহল যেন আমাকে সেই মুহূর্তে পেয়ে বসল। আমার মনে হল এতক্ষণ ধরে যা ঘটেছে তার সঙ্গে ওই প্রাণীর নিশ্চয়ই কোনও যোগসূত্র আছে। উত্তেজনার বশে বারান্দা ছেড়ে নীচের জমিতে আমি নেমে পড়লাম। আর আমি নীচে নামতেই মা ষষ্ঠীর বাহন হাঁটতে শুরু করল স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিকে।

কৌতূহল যখন মানুষকে পেয়ে বসে তখন তা মানুষের পক্ষে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়, আমার মন বলতে লাগল কদিন ধরে হরিয়ার মুরগি মারা যাওয়া থেকে শুরু করে অন্য যে ঘটনা, দুর্ঘটনাগুলো ঘটল তার সঙ্গে এই বিড়ালটার সম্পর্ক আছে। আমি যুক্তিবাদী মানুষ, তবুও কেন জানি আমার মন ও কথাই বলতে লাগল। ভেজা মাটি আর ভেজা বাতাসের মধ্যে আমি অনুসরণ করলাম বিড়ালটাকে।

বিড়ালটা চলতে চলতে মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে আমাকে দেখছে। তা দেখে আমার মনে হল সে যেন দেখছে আমি তাকে অনুসরণ করছি কিনা? তবে তার মধ্যে ভয়ের কোনও চিহ্ন নেই। তাকে অনুসরণ করে আমি স্বাস্থ্য কেন্দ্রর কাছে পৌঁছে গেলাম। বিড়ালটা গিয়ে দাঁড়াল সেই ঘরটার পিছনে। যে ঘরে শোয়ানো আছে ফুলমতির দেহটা।

ভেজা বাতাসে এবার সেই পচা গন্ধটা আমার নাকে এসে লাগল। জানলার কয়েক হাত তফাতেই সেই পুরোনো কুঁয়োটা। কোমর সমান বাঁধানো কুয়োর ছায়াটা জানলার নীচের অংশকে আবৃত করে রেখেছে। বিড়ালটা কুয়োটার দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে এক বার ডাক ছাড়ল, তারপর জানলার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল! আমি অনুমান করলাম কাচ ভাঙা জানলা দিয়ে সম্ভবত ঘরটার ভিতর প্রবেশ করেছে প্রাণীটা।

আমার মনে হল, আমারও ওই ঘরে ঢোকা প্রয়োজন। ফুলমতির দেহটা ঘরের মধ্যেই আছে। যদিও বিড়ালের মৃত মানুষের মাংসের প্রতি কোনও লোভ থাকে কিনা আমার জানা নেই, তবুও আমার মনে হল ওই প্রকাণ্ড বিড়ালটা দেহটার কোনও ক্ষতি করবে না তো? আর এর সঙ্গে-সঙ্গেই আমার মনে হল আমারও ঘরটার ভিতরে ঢোকা প্রয়োজন। তেমন হলে সারারাত জেগে মৃতদেহ পাহারা দিতে হবে।

আমার ডাক্তার জীবনে বেশ কয়েকবার প্রয়োজন বোধে মৃতদেহের সঙ্গে রাত কাটিয়েছি আমি। মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় তো একবার এক সহপাঠীর সঙ্গে বাজি ধরে একটা মর্গেও রাত কাটিয়েছিলাম। কাজেই ব্যাপারটা আমার কাছে ভয়েরও নয়। কিন্তু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভিতরে ঢুকতে গেলে তো চাবির দরকার। আরে, সেটা তো আমার ঘরে রাখা আছে, সঙ্গে নেই। কিন্তু এরপরই আমার মনে পড়ে গেল, হরিয়া যে দরজা দিয়ে ট্রলি করে তার বউকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ঢুকেছিল সে দরজাটা ভুলক্রমে বন্ধ করা হয়নি। কথাটা মনে হতেই কুঁয়োটাকে পাশ কাটিয়ে একটু বাঁক নিয়ে আমি এগোলাম সেই দরজার দিকে।

হ্যাঁ, দরজার পাল্লা খোলাই ছিল, স্বাস্থ্য কেন্দ্রর ভিতর খেলা করছে জমাট বাঁধা অন্ধকার। ভিতরে প্রবেশ করলাম আমি। তারপর অন্ধকার হাতড়ে করিডোরের বাতি জ্বালালাম। তারপর গিয়ে দাঁড়ালাম ফুলমতির মরদেহ যে ঘরে রাখা আছে তার দরজার সামনে। দরজা বাইরে থেকে আগের মতোই বন্ধ আছে।

হ্যাচবোল্ট খুলে দরজার পাল্লা খুললাম। ভিতরে অন্ধকার বিরাজ করছে। ঘরের ভিতর আমি পা রাখলাম। তবে দরজার গায়ের দেওয়ালেই সুইচ বোর্ড। সেটা খুঁজে নিয়ে বাতি জ্বালাতে আমার অসুবিধা হল না। আলোকির হয়ে উঠল ঘর। আমি দেখলাম ঘরের মাঝাখানে একই ভাবে বেডের ওপর পড়ে আছে ফুলমতির মরদেহ। শুধু কাচ ভাঙা জানলা দিয়ে আসা বাতাসে তার পায়ের দিকের চাদরটা কিছুটা সরে গিয়ে ফুলমতির পা-দুটো হাঁটু পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে আছে।

দু-দিকে ঈষৎ ছড়ানো ফুলমতির পায়ের পাতা দুটো যেন আমার দিকে চেয়ে আছে। ফুলমতির বডিটার দিকে তাকাবার পর তার খাটের নীচে, ঘরের চারপাশে তাকালাম। কিন্তু সেই সাদা বিড়াল বা অন্য কোনও বিড়ালের অস্তিত্ব নেই সে ঘরে! তবে কি সাদা বিড়ালটা জানলা দিয়ে আবার বাইরে চলে গেল? রিস্ট ওয়াচে সাড়ে বারোটা বাজে।

গ্রীষ্মকালে ভোর সাড়ে চারটেতেই আলো ফুটতে শুরু করে। অর্থাৎ আমি যদি সে ঘরে আর ঘণ্টা চারেক সময় কাটিয়ে দিতে পারি তবেই দিন হয়ে যাবে। আমি বুঝলাম এ পরিস্থিতিতে যদি আমি আমার ঘরেও ফিরে যাই তবেও আমার ঘুম হবে না। ঘরে ফিরলেই আবার হয়তো শুরু হবে বিড়ালের অদ্ভুত, অপার্থিব চিৎকার! আমি একটু ভেবে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, বাকি রাতটা আমি এ ঘরটাতেই কাটাব।

বেডের কাছেই ট্রলিটা ছিলো। সেটা বেডের থেকে বেশ একটু তফাতে দেওয়ালের গায়ে টেনে এনে সেই ট্রলিতে পা ঝুলিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে আমি বসলাম। সময় এগিয়ে চলল, ঘরের বাইরে বা ভিতরে কোথাও কোনও শব্দ নেই।

দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকতে থাকতে আমার মৃদু তন্দ্রা মতো এসে গেছিল। কিন্তু সে অবস্থাতেই আমি সেই দুর্গন্ধ টের পেতে লাগলাম। কাজেই আমার চোখ খুলে গেল। আমি বুঝতে পারলাম বাইরে বৃষ্টি থেমে গেলেও ভেজা বাতাস আবার বইতে শুরু করেছে। হয়তো বা আবার দ্বিতীয় বার বৃষ্টি নামতে পারে। কাচ ভাঙা জানলার ফাঁক গলে ওই ভেজা বাতাসের সঙ্গেই পচা গন্ধটা ঘরে প্রবেশ করছে। আমি তাকালাম জানলার দিকে। সেদিকে তাকাতেই একটা জিনিস আমি খেয়াল করলাম। ঘরের ভিতর জ্বলতে থাকা বাতির আলো কাচ ভাঙা জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে কুঁয়োটার গায়ে গিয়ে পড়েছে। সেই আলোতে আমি অস্পষ্ট ভাবে দেখলাম কুঁয়োর রেলিং বা প্রাচীরের ওপর কিছু-একটা যেন নড়াচড়া করছে! হ্যাঁ, কিছু একটা নড়ছে সেখানে!

সেই সাদা বিড়ালটা ওখানে নাকি? ট্রলি থেকে নেমে আমি এগোলাম সেই জানলার দিকে। সেই পচা গন্ধটা যেন এবার আরও বেশি করে আমার নাকে এসে লাগতে থাকল। কাচ ভাঙা জানলার ফাঁক দিয়ে আমি বাইরে তাকালাম। সেই সাদা বিড়ালটাকে না দেখতে পেলেও কুঁয়োর রেলিং-এর ওপর আমি বেশ কয়েকটা বিড়ালকে হেঁটে চলে বেড়াতে দেখলাম। এ বিড়ালগুলো কি সেই আগের বিড়ালগুলোই? নাকি অন্য কোনও জায়গা থেকে ওখান থেকে এসেছে?

কয়েক মুহূর্ত সে দিকে তাকিয়ে থাকতেই আমাকে বেশ একটু অবাক করে দিয়ে কয়েকটা বিড়াল কুঁয়োর ভিতর থেকেই সিমেন্টের রেলিং-এ উঠে বসল! তবে কি কুঁয়োটা গভীর নয়? তাতে জল নেই? অথবা আবর্জনা স্তূপ কি কুয়োর মুখ পর্যন্ত উঠে এসেছে? নইলে ওর ভিতর থেকে বিড়াল উঠে আসবে কী ভাবে? তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হলাম যে পচা গন্ধটা ওই কুঁয়ো থেকে অথবা ওই প্রাণীগুলোর শরীর থেকেই আসছে!

দেখতে দেখতে আরও বেশ কয়েকটা বিড়াল কুঁয়োর ভিতর থেকে ওপরের রেলিং-এ উঠে এল, তারপর আরও কয়েকটা! দেখতে দেখতে কুঁয়োর রেলিং এর ওপরটা ভরে যেতে লাগল নানা আকৃতির বিড়ালে।

প্রাণীগুলো রেলিং-এ উঠে এলেও তারা কোনও শব্দ করছে না। নিঃশব্দে নড়ছে তারা। আধো অন্ধকারে রেলিং-এর ওপর থাকা প্রাণী গুলোকে দেখে আরও একটা ব্যাপার আমার মনে হল। বিড়াল গুলো রেলিং-এর ওপর যে ভাবেই দাঁড়িয়ে বসে থাকুক না কেন তারা তাকিয়ে আছে আমার এই জানলার দিকেই! আর এরপরই একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে আমি ঘরের ভিতর ফিরে দাঁড়ালাম। লোহার খাটটা যেন কেঁপে ওঠার শব্দ।

আমি তাকালাম খাটটার দিকে। যেখানে রয়েছে ফুলমতির দেহ। আমার মনে হল চাদরটা যেন আরও খানিকটা উঠে গেছে। ফুলমতির উরু পর্যন্ত দৃশ্যমান। অত্যন্ত বিসদৃশ লাগছে সেই দৃশ্য। মৃতদেহেরও তো একটা সম্মান আছে। তাই আমার মনে হল চাদরটা পা পর্যন্ত নামিয়ে দেওয়া উচিত।

আমি ধীর পায়ে এগোলাম খাটের দিকে। আর আমি পায়ে পায়ে সেদিকে এগোতেই আমার চোখে দৃশ্যমান হল মৃত ফুলমতির দুই উরুর মধ্যবর্তী গভীরতম স্থান। আর তারপরই হঠাৎ থমকে গেলাম আমি। কী একটা জিনিস যেন নড়াচড়া করছে ফুলমতির দু-পায়ের ফাঁকে! ফুলমতির পেটটাও যেন আগের মতো সন্তান ভারে ফোলা লাগছে না। আমি চোখ কচলে আবার ভালো করে তাকালাম ফুলমতির পায়ের ফাঁকে। হ্যাঁ কোনও ভুল নেই, একটা ভেজা মাংসর দলা নড়ছে সেখানে! আমি চমকে উঠলাম। মাথার মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল আমার। অন্তত দশ ঘণ্টা আগে যার মৃত্যু হয়েছে সে সন্তান প্রসব করবে কী ভাবে? কিন্তু আসল ভয়ংকর ঘটনাটা তখনও দেখা বাকি ছিল আমার।

বিস্মিতভাবে আমি তাকিয়ে ছিলাম সেই রক্ত ক্লেদ মাখা মাংস পিণ্ডর দিকে। সেই মাংস পিণ্ডটা এরপর ধীরে ধীরে ফুলমতির দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে আসতে শুরু করল। জন্মের পর কোনও বাচ্চা হামাগুড়ি দিয়েছে বলে শুনিনি। কিন্তু সে হামাগুড়ি দিয়েই বাইরে বেরিয়ে এল।

বিদ্যুৎ বাতির আলোতে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে যে ফুলমতির দু-পায়ের ফাঁকে দাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখার চেষ্টা করছে। তখনও তার শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত আছে ফুলমতির কর্ডটা। অর্থাৎ যে ফিতে দিয়ে শিশুর শরীরের সঙ্গে মায়ের শরীর সংযুক্ত থাকে। ঘরের চারদিকে তাকাবার পর সেই সদ্যজাত মুখ দিয়ে কামড়ে সেই ফিতে ছিঁড়ে নিজেকে ফুলমতির শরীর থেকে মুক্ত করে নিল। তারপর এক অদ্ভুত স্বরে ডেকে উঠল। তবে সে ডাক মানুষের নয়, বিড়ালের। আর এই ডাকের জন্যই অপেক্ষা করছিল বাইরের বিড়ালগুলো।

কুয়ো থেকে উঠে তারা একে একে ভাঙা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকতে শুরু করল। ভিজা শরীর তাদের। তবে তা অক্ষত নয়, কোনও বিড়ালের শরীর থেকে খসে পড়ছে চামড়া, কারো চোখ গলে গেছে, পচে যাওয়া কান ঝুলে পড়েছে। বীভৎস শরীর সব। আমি বুঝতে পারলাম হরিয়া তবে বিড়ালগুলোর দেহ ওই কুয়োর মধ্যেই ফেলেছিল। তীব্র পচা গন্ধে ভরে উঠল ঘর।

বিড়ালগুলোকে ঘরের ঢুকতে দেখে তাদের দিকে আমার দৃষ্টিটা কয়েক মুহূর্তর জন্য ঘুরে গেছিল। কিন্তু আবার চিৎকার করে উঠল নবজাতক। এবার আরো জোরে, যেন একটা ঘৃণা মিশানো চিৎকার। আমি তার দিকে তাকাতেই একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল আমার শরীরে। ফুলমতির দু-পায়ের ফাঁকে যে দাঁড়িয়ে আছে, যে মানব শিশু নয়, রক্ত মাখা একটা সাদা বিড়াল! প্রতি মুহূর্তে সে যেন বেড়ে চলেছে।

আমি চিনতে পারলাম তাকে। মা ষষ্ঠীর বাহন সেই সাদা বিড়ালটা! তার সবুজ চোখ দুটো যেন অপরিসীম ঘৃণায়, প্রতিশোধ স্পৃহায় জ্বলছে আমার দিকে তাকিয়ে। তার সেই দৃষ্টি থেকে আমিও চোখ সরাতে পারলাম না কিছুতেই। আমার চোখের সামনেই তার অবয়বটা আরও বড় আরও বড় হতে লাগল। এক সময় যে রূপ নিল আমার দেখা তার সেই ছায়ার মতো, বাঘের মতো। তা দেখে যেন উল্লাসধ্বনি করে উঠল অন্য বিড়ালগুলো।

রক্ত জল করা বীভৎস মার্জার সঙ্গীত আর দুঃসহ পচা গন্ধে ভরে উঠল ঘর। দানবাকৃতির সেই অপার্থিব বিড়ালটা তার মুখ ফাঁক করল। সাদা বিড়ালটার তীক্ষ্ন সাদা দাঁতগুলো দেখতে পেলাম আমি। বাঘের আকৃতির সেই বিড়ালটা এরপর লাফ দিয়ে খাট ছেড়ে মেঝেতে নেমে দাঁড়াল। তার সবুজ চোখের দৃষ্টি আমার ওপরই নিবদ্ধ। আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম। আমার পালাবার আর কোনও জায়গা নেই। আমার চারপাশে শুধু জীবন্ত হয়ে ওঠা মা ষষ্ঠীর মৃত বাহনের দল, সেই বিরাট সাদা মার্জার রাজের মতো তারাও এগিয়ে আসছে আমার দিকে….।’

থেমে গেলেন অরিত্র ডাক্তার। কৌশিক কৌতূহল চাপতে না পেরে জানতে চাইল, ‘তারপর? তারপর কী হল?’

অন্ধকারের মধ্যে থেকে তিনি জবাব দিলেন, ‘তার আর পর নেই?’

কৌশিক বলল, ‘পর নেই মানে?’

ডাক্তার অরিত্র মুখার্জি বললেন, ‘বাকি ঘটনাটা না হয় আপনি নিজের মতো করে কল্পনা করে নেবেন। বৃষ্টি থেমে গেছে। আপনি এবার বেরিয়ে পড়ুন। আমার ল্যান্ড লর্ড রতনবাবুর ফেরার সময় হলো। আমাকে এবার উঠতে হবে।’

অরিত্র ডাক্তারের এই শেষ কথা গুলোর মধ্যে এমন একটা ভাব মেশানো ছিল যা শুনে কৌশিক আর অরিত্র ডাক্তারের সময় নষ্ট করা সমীচীন বোধ করল না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অরিত্র ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনার গল্পটা খুব রোমাঞ্চকর। তবে গল্পের শেষ অংশটা আর একদিন এসে নিজের মুখেই শুনব।’

তিনি কৌশিকের এ কথার কোন জবাব দিলেন না। অন্ধকারে যদিও তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। তবুও কৌশিকের মনে হল তার কথা শুনে যেন হাসলেন অরিত্র ডাক্তার। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল কৌশিক।

দশ

সে রাস্তায় নামতেই আলো ফিরে এল। বৃষ্টি থেমে গেলেও রাস্তাতে একটু জল জমেছে। কৌশিক ভেবে নিলো আপাতত সে বাড়িতেই ফিরবে। ওষুধের দোকানের সামনের রাস্তাতে খুব বেশি জল জমে। অত জল মাড়ালে তার আরও বেশি শরীর খারাপ হতে পারে। বাড়ি ফিরে অন্য কাউকে সে পাঠাবে ওষুধ কিনে আনার জন্য। এ কথা ভেবে নিয়ে গলি বেয়ে এগোতে লাগল সে। ডাক্তার অরিত্রর বাসা ছেড়ে কিছুটা এগোতেই উলটো দিক থেকে জলের মধ্যে ছপ ছপ করতে করতে একজনকে সে আসতে দেখল। একটা ল্যাম্পপোস্টের সামনে তারা দুজন মুখোমুখি হয়ে গেল। দুজনই দুজনকে চিনতে পারল তারা। কৌশিকের উলটো দিক থেকে যিনি হেঁটে এলেন তিনি ডাক্তার অরিত্র চ্যাটার্জির বাড়ির মালিক কৌশিকের পরিচিত রতনলালবাবু।

কৌশিককে দেখে তিনি বললেন, ‘কী বৃষ্টিটাই না হল মশাই। বাইরে কাজে বেরিয়ে আটকে গেছিলাম। এখন বাড়ি ফিরছি। তা আপনি কোথা থেকে?’

কৌশিক জবাব দিল ‘আপনার বাড়ি থেকেই।’

রতনলাল বললেন, ‘ও আমার বাড়ি থেকেই। আপনার কানেও তবে খবরটা গেছে। খবরটা চাউর হবার পর আপনার মতোই আরো বেশ কয়েকজন ঘটনাটা সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেছিল আমার কাছে। সত্যি কথা বলতে কী ডাক্তারের বাড়ির লোকজন তার জিনিসপত্র নিতে আসার আগে পর্যন্ত আমি তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানতামই না। অরিত্রবাবুর শেষে কিনা অপঘাতে মৃত্যু হল!

রতনবাবুর কথা শুনে কৌশিক বলল, ‘এ কী বলছেন! এ কথা আমি কী করে বিশ্বাস করব?’

তিনি বললেন, ‘বিশ্বাস কি আমারও প্রথমে হয়েছিল। বিশেষত অমন মৃত্যুর কথা আমি কখনও শুনিনি। কিন্তু তার বাড়ির লোকেরই বা মিথ্যা বলতে যাবে কেন? তারা যখন বলল তখন বিশ্বাস করতেই হল।’

কৌশিক বলল, ‘মৃত্যু মানে?’

রতনলাল বললেন, ‘সপ্তাহ খানেক আগে ডাক্তার পাড়া গাঁয়ে এক স্বাস্থ্য কেন্দ্রতে গেছিলেন সেখানকার দায়িত্ব নিয়ে। সে গ্রামে নাকি অনেক বিড়ালের বাস। তারাই নাকি কোন কারণে ক্ষেপে উঠে একযোগে আঁচড়ে কামড়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভিতর ডাক্তারকে মেরে রেখে যায়। বিড়াল কোনও দিন মানুষ মারে বলে আমি শুনিনি। পুলিশ ডাক্তারের বাড়ির লোককে এ কথাই বলেছে। আর ডাক্তারের বাড়ির লোকরাও দেখেছে যে ডাক্তারের সর্বাঙ্গ নাকি দাঁত-নখের আঘাতে ফালা ফালা করে চেরা ছিল! বুঝুন কী কাণ্ড মশাই!’

বাড়িওয়ালার কথা শুনে এবার স্বর আটকে গেল কৌশিকের। তার মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না। রতনলাল তারপর বললেন, ‘এবার আমি যাই। গিন্নি বাড়িতে একলা আছে। তার আবার ভূত-প্রেতের ভয় আছে।’ এ কথা বলে তিনি তার বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন।

কৌশিক কিছুক্ষণ সেই গলির ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথার ভিতরটা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। জল মাড়িয়ে কোনও রকমে টলতে-টলতে বাড়ির দিকে এগোল সে।

বাড়ি পৌঁছে সোজা নিজের ঘরে ঢুকল সে। জামা খোলার আগে বুক পকেট থেকে অরিত্র ডাক্তারের দেওয়া খামটা বার করল কৌশিক। কাঁপা কাঁপা হাতে ভিতরের কাগজটা খুলল। সাদা কাগজ। কোনও কিছু লেখা নেই তাতে। আর তারপরই একটা শব্দ শুনে কৌশিক চমকে উঠল। বিড়ালের ডাক। কৌশিক দেখল তার দরজার সামনে একটা সাদা বিড়াল এসে দাঁড়িয়েছে! কিন্তু পরক্ষণেই বিড়ালটাকে উদ্দেশ্য করে কৌশিকের মায়ের গলা শোনা গেল, ‘ওদিকে নয়, এদিকে আয়, খেতে দিয়েছি।’

না এটা ডাক্তার অরিত্রর দেখা সেই মা ষষ্ঠীর বাহন নয়। নিতান্তই সাধারণ আকৃতির একটা সাদা বিড়াল। পাড়াতেই ঘুরে বেড়ায় এ-বাড়ি ও-বাড়ি। কৌশিকের মা খেতে দেন তাকে। মায়ের ডাক শুনে কৌশিকের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল নিরীহ বিড়ালটা। কিন্তু কৌশিকের কানে যেন বেজে উঠল অন্ধকার ঘরে শোনা অরিত্র ডাক্তারের কথা গুলো ‘দানবাকৃতির সেই অপার্থিব বিড়ালটা তার মুখ ফাঁক করল। সাদা বিড়ালটার তীক্ষ্ম সাদা দাঁতগুলো দেখতে পেলাম আমি। বাঘের আকৃতির সেই বিড়ালটা এরপর কার্যত মেঝেতে নেমে দাঁড়াল।…আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম আমার পালাবার আর কোনও জায়গা নেই। আমার চারপাশে শুধু জীবন্ত হয়ে ওঠা মা ষষ্ঠীর মৃত বাহনের দল…।’