টিসিয়াস – নির্বেদ রায়

টিসিয়াস
টিসিয়াস (Ctesias of Knidos বা Cridian) ছিলেন একজন গ্রীক চিকিৎসক। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তিনি পারস্যের রাজা আর্টাজেরক্সিস মনেমন-এর সভায় ছিলেন। পেশায় ডাক্তার।
টিসিয়াসের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি সময়ে, সম্ভবত খ্রিস্টঃ পূঃ ৪৪৪ থেকে ৪৩৪-এর মধ্যে। পণ্ডিতদের একাংশের মত অনুযায়ী; যদিও অন্য মতও আছে, তবে সেটা আরেকটু পরে তাঁর জন্ম নির্ধারণ করে। বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে ‘কেরিয়া’র নাইডাস শহরে টিসিয়াস জন্মগ্রহণ করেন। নিডিয়া বা নাইডাস তখন আকিমিনিড সাম্রাজ্যভুক্ত।
খ্রিস্টপূর্ব ৪০১ সালে সম্রাট দ্বিতীয় আর্টাজেরক্সিস মনেমনের সঙ্গে কুনাক্সা-র যুদ্ধে যান টিসিয়াস, যুদ্ধ হয় রাজভ্রাতা সাইরাসের (Cyrus, the Younger) সঙ্গে। যুদ্ধে রাজা আর্টাজেরক্সিস আহত হন, তার চিকিৎসা করেন টিসিয়াস। সাইরাসের সঙ্গে অনেক গ্রীক সৈন্য ছিল। তাঁর অর্থাৎ সাইরাসের মৃত্যুর পর তারা বন্দী হয়। কিন্ত টিসিয়াস যুদ্ধের সময় বা কাছাকাছি সময়ে যুদ্ধবন্দী হলেও কারাগারে বোধহয় ছিলেন না। গ্রীকদের সঙ্গে আলোচনাতেও অংশ নেন টিসিয়াস। ‘কুনাক্সা’ তখন আকিমিনিড সাম্রাজ্যের মধ্যে, ওই যুদ্ধে সাইরাস এগিয়ে গেলেও তিনি মারা যাওয়ার পর আর্টাজেরক্সিস তাঁর সাম্রাজ্যের অংশ পুনরুদ্ধার করেন।
টিসিয়াস যে সমস্ত লেখা লিখেছেন, তার মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি—’পারসিকা’ (Persica) এবং ‘ইন্ডিকা’ (Indica)। যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে পারসিকদের সঙ্গে যোগাযোগ টিসিয়াসকে যে ভাবে পারস্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করেছিল, ভারত সম্পর্কে তাঁর সেই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ কাজ করেনি। কিন্তু সম্রাটের রাজসভায় বিভিন্ন মানুষের আনাগোনা এবং গল্পগাথা তাঁকে ভারত সম্পর্কে যে কৌতূহল নিকট প্রাচ্যের (Near East) অধিবাসী হিসাবে তাঁর গড়ে উঠেছিল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। টিসিয়াসের বিবরণে তাই আশ্চর্য সব জীবজন্তু বা মানুষের সঙ্গে একটি মনোযোগী ভারতচিন্তা খুঁজে পাওয়া যায়। তা হল—প্রাচ্য পৃথিবীর বা মূলতঃ অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং তার কিছুটা আশপাশের পরিসীমা জুড়ে যে অঞ্চল বিস্তৃত, সে সম্পর্কে যে ধারণা ছিল পশ্চিমের তার সারমর্ম এই বিবরণে পাওয়া যায়—আর পাওয়া যায় আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের আগে পর্যন্ত ভারত সম্পর্কে পশ্চিমের যে ধারণা ছিল তার!
টিসিয়াস নদী সম্পর্কে, পারসিক কর ব্যবস্থা আর ভারত সম্পর্কে প্রায় তেইশ খণ্ডে লেখেন, যে লেখা কার্যত হারিয়ে যায়; তার ফলে আমাদের আশ্রয় করতে হয় পরবর্তী লেখকদের বা ঐতিহাসিকের সূত্র, যেমন ফোটিয়াস (Photius)।
ফোটিয়াসের ‘বিবলিওথেকা’ গ্রন্থে এই ভারত-বিবরণের সারমর্ম আছে। ফোটিয়াসের সময়, অর্থাৎ নবম খ্রিস্টাব্দে টিসিয়াসের বিবরণ পাওয়া যেত বলেই মনে হয়। ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধে, অন্যান্য বহু পুঁথিপত্রের মতো এগুলোও হারিয়ে যায়।
ফোটিয়াসের এই বর্ণনা অত্যন্ত গুরুপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে আধুনিক সময়ে।
টিসিয়াসের বিবরণে ভারত
১. সিন্ধুনদ সম্পর্কে টিসিয়াস বলেছেন যে, যেখানে এই নদী সবচেয়ে কম চওড়া সেখানে সাত কিলোমিটার আর যেখানে সবচেয়ে বেশি চওড়া সেখানে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার বিস্তৃত।
২. টিসিয়াস বলেন যে, পৃথিবীর বাকি অংশের মোট জনসংখ্যার থেকে ভারতের জনসংখ্যা হয়তো বেশিই হবে।
৩. এই নদীতে এক ধরণের কীট বা পোকা পাওয়া যায়, যারা নদীতেই জন্মায় আর বংশবৃদ্ধি করে।
৪. ভারতবর্ষ পেরিয়ে আর কোনো দেশ নেই যেখানে মানুষ বসবাস করেন।
৫. এখানে বৃষ্টি হয় না, দেশটা নদ-নদীতে ভর্তি। সেখান থেকে জমিতে জলসেচনের কাজটাও হয়ে যায়।
৬. টিসিয়াস ‘পন্তর্ব’ নামে এক ধরনের রত্নপাথরের কথা বলেছেন, যে রত্নপাথর নদীতে ছুঁড়ে ফেললে এটি পুনরুদ্ধারের সময় সঙ্গে ৪৭৭টি মণি, রত্ন ও দামি পাথর সঙ্গে নিয়ে চুম্বকের মতো উঠে আসে। এক ব্যাকট্রিয় ব্যবসায়ীর কাছে ওই পাথর বা মণিরত্নগুলো আছে।
৭. টিসিয়াস দেওয়াল ভেঙে ফেলার প্রয়োজনে হাতি ব্যবহার করতে দেখেছেন, বর্ণনা দিয়েছেন। ছোট বানর কিন্তু তার লেজ চার হাত লম্বা, তাও দেখেছেন।
৮. আর বিরাট আকারের মোরগ দেখেছেন। ‘বিট্টাকোস’ বলে বাজপাখির মতো বড় একটা পাখির কথা বলেছেন টিসিয়াস, যারা মানুষের মতো কথা বলতে পারে। পাখিটার মুখ গাঢ় লাল, থুতনি বা দাড়ির অংশ কালো, গলার পালক পর্যন্ত গাঢ় নীল…(বাকি অংশ) সিঁদুরের মতো টকটকে লাল রং-এর। পাখিটি ভারতীয়দের ভাষায় কথা বলতে পারে; গ্রীক ভাষা শেখালে, সে ভাষাতেও কথা বলতে পারে।
৯. একটা ঝরনা বা কুঁয়োর কথা টিসিয়াস জানিয়েছেন, যেখানে প্রতিনিয়ত তরল সোনা উৎসারিত হয়ে সেটি ভর্তি হয়ে যায়। বছরে একশো কলস সোনা সেখান থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই কলসিগুলো মাটির কলস হয়, কারণ সোনা তুলে আনার পরই তরল সোনা জমে কঠিন হয়ে যায়, তখন এই কলসগুলো ভেঙে ফেলে, সোনার তাল বের করতে হয়। এই আধারটি বর্গাকার, পরিসীমা ষোলো কিউবিট মাপের আর এক ওরজিইয়া গভীর। এক কলস সোনার ওজন এক ট্যালেন্ট। এই কূপের তলদেশে লোহা পাওয়া যায়, যে লোহায় তৈরি দু-দুটো তরবারি টিসিয়াসের সংগ্রহে আছে বলে তিনিই জানিয়েছেন। একটি তাকে রাজা নিজেই উপহার দিয়েছিলেন, অন্যটি তাকে দেন রাজমাতা পেরিসাটিস। এই তরোয়াল মাটিতে বিদ্ধ করে ঝড়-ঝঞ্ঝা-মেঘ এসব দূরে সরিয়ে রাখা যায়। রাজাকে অন্তত দু’বার এই তরবারির ক্ষমতা পরীক্ষা করতে টিসিয়াস নিজে দেখেছেন।

১০. ভারতীয় কুকুর বিরাট আকারের হয়, এরা সিংহকে পর্যন্ত আক্রমণ করে থাকে।
১১. এখানে অনেক বড় বড় পাহাড় আছে, যে পাহাড় খনন করে সারেডোনিক্স, ওনিক্স-এর মতো অন্যান্য বহুমূল্য পাথর পাওয়া যায়।
১২. এখানে প্রচণ্ড গরম। মনে হয়, সূর্য এখানে দশগুণ বড় হয়ে ওঠে। অনেক মানুষ গরমে শ্বাসকষ্টে মারা যায়।
১৩. টিসিয়াস এক সমুদ্রের কথা বলেছেন, যে সমুদ্র গ্রীক সাগরের থেকে আকারে ছোট নয়, কিন্তু সাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রায় চার ড্যাকটিল গভীরতা অবধি জল এতটা গরম থাকে যে, কোনো মাছ সেখানে ঘোরাফেরা করতে পারে না, গরমের জন্য মারা যায়। ফলে, ওই গভীরতার নিচে তারা থাকে, উপরে তাদের দেখতে পাওয়া যায় না।
১৪. সিন্ধুনদ পাহাড় আর সমতলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে, আর যত নল-খাগড়া অর্থাৎ ভারতীয় নল-খাগড়া সেখানে বেড়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে কোনো-কোনোটা এত বড় যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দু-দিক থেকে চার হাতে বেড় দিলে তবে হয়তো জড়িয়ে ধরতে পারে। আর কতটা উঁচু হয়? বড় আর ভারী পণ্যবাহী বা মাল বহন করে যে সব জাহাজ, তাদের মাস্তুলের মতো লম্বা বা উঁচু হয়। কোনো কোনোটা তার থেকেও বড়, আবার কোনোটা ছোট হয়। বড় বড় পাহাড়ের ওপর এভাবে ছোট-বড় মিলেই জন্মায়। এই উদ্ভিদের মধ্যে স্ত্রী আর পুরুষ ভেদ আছে। স্ত্রী জাতের উদ্ভিদের কাণ্ডের মধ্যে কোমল আঁশ বা তন্তু দেখা যায়, পুরুষ জাতীয় উদ্ভিদের সেগুলো থাকে না, কিন্তু খুবই শক্তপোক্ত হয়।
১৫. ভারতে ‘মার্টিখোর’ বা ‘মার্টিচোর’ বলে একটি জন্তু আছে। তার মুখ মানুষের মতো, আকার-আয়তনে সিংহের মতো, গায়ের রং সিঁদুর বা হিঙ্গুলের মতো টকটকে লাল। এদের তিন সারি দাঁত, মানুষের মতো কান, আর চোখের রং হালকা নীল, যেমন মানুষের হয়। পাহাড়ি কাঁকড়াবিছের মতো এদের ল্যাজে এক কিউবিটের চেয়ে লম্বা হুল আছে। ল্যাজের দু-দিকে হুল থাকে, আর বিছের মতো ল্যাজের শেষ প্রান্তেও থাকে। ওদের আক্রমণ করতে গেলে ওই হুল দিয়ে সে পাল্টা আক্রমণ করে শত্রুকে মারাত্মকভাবে আহত করে। দূর থেকে আক্রান্ত হলে সে শত্রুর দিকে লক্ষ্য করে তার লেজ থেকে তীরের মতো হুল নিক্ষেপ করে। শত্রু আহত হয়, যেন ধনুক থেকে তীর ছোঁড়া হচ্ছে। তবে পেছন থেকে শত্রু আসলে সে লেজ সোজা করে রাখে। মার্টিখোর-এর নিক্ষেপ করা হুল প্রায় একশো ফুট দূরত্ব অতিক্রম করে শত্রুকে পর্যুদস্ত করে। একমাত্র হাতি ছাড়া। প্রত্যেকটা হুল এক ফুট লম্বা, আর সবচেয়ে সরু নল-খাগড়ার মতো দেখতে।
‘মার্টিখোরা’ মানে মানুষখেকো, গ্রীক ভাষায়। এরা মানুষ শিকার করে, তবে অন্য জন্তুও এদের কবল থেকে রেহাই পায় না। আবার মানুষও এদের শিকার করে, হাতির ওপর চড়ে এবং তীর ছুঁড়ে। মার্টিখোর লড়াই করার সময় বা শিকার ধরতে তার হুল আর নখরযুক্ত থাবা দুটোই ব্যবহার করে; টিসিয়াস বলেছেন যে, হুল ছুঁড়ে মারার পর সেটা আবার মার্টিখোর-এর শরীরে গজিয়ে ওঠে। ভারতবর্ষে এরা বহু সংখ্যায় বাস করে, আর ভারতীয়রাও হাতির পিঠে চড়ে তীর-ধনুক দিয়ে এদের শিকার করে।
১৬. টিসিয়াস দাবি করেছেন যে, ভারতীয়রা খুবই ন্যায়নিষ্ঠ। তিনি ভারতীয়দের আদব-কায়দা আর আচার-বিচার নিয়েও আলোচনা করেছেন।
১৭. পবিত্র একটি জায়গা আছে যেটি নির্জন, জনমানবশূন্য। সেখানে হেলিওস আর সেলেনের পুজো হয়। সার্ডো পাহাড় থেকে সেখানে যেতে পনেরো দিন সময় লাগে। এখানে সূর্য বছরে পঁয়ত্রিশ দিন উত্তাপ কম করে, ঠান্ডা করে দেয়, ফলে তারা উৎসব আর পুজো-অর্চনার মধ্যে দিয়ে তাকে সম্মান জানায় আর ফিরে আসে দাবদাহ এড়িয়ে।
১৮. ভারতে বজ্র-বিদ্যুৎ বা প্রবল বর্ষা না হলেও বিপুল ঝঞ্ঝাবাত্যা সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়। সূর্য ওঠার পর প্রায় দুপুর পর্যন্ত পরিবেশ ঠান্ডা থাকে, কিন্তু তারপর থেকে প্রচণ্ড গরম প্রায় গোটা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯. ভারতীয়রা এই সূর্যের উত্তাপে কালো হয়ে যায় না। তাদের এই গায়ের রং প্রাকৃতিক কারণে হয়ে থাকে। কারণ টিসিয়াস নিজে দুজন স্ত্রীলোক আর পাঁচজন পুরুষকে দেখেছেন, যারা খুবই ফর্সা, যদিও তারা সংখ্যায় কম। এই সাতজনই ভারতীয়।
২০. ভারতের পঁয়ত্রিশ দিন ধরে সূর্য ঠান্ডা হয়ে থাকে, প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়ায় না। এই তথ্য প্রমাণ করার জন্য টিসিয়াস বলেন যে, এটনা পর্বত থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনের শিখা ভারতের মধ্যভাগকে ছেড়ে দেয়, পোড়ায় না কারণ ভারতীয়রা ন্যায়পরায়ণ—কিন্তু বাকি সবকিছু এই আগুনের প্রকোপ থেকে রক্ষা পায় না।
জ্যাকিনথাসে একটা ঝরনা আছে যেটা মাছে ভর্তি, আর সেই ঝরনা থেকে পিচ বা আলকাতরা নির্গত হয়। নেস্কোস-এর প্রস্রবণ থেকে মাঝে মধ্যে সুমিষ্ট মদ পাওয়া যায়। ফ্যাসিলিসের কাছে লিসিয়া বলে অঞ্চলে পাহাড়ের ওপরে একটা আগুন সমস্ত দিন-রাত জুড়ে জ্বলে, যেটা জল দিলে আরও জোরে জ্বলে ওঠে, নেভে না। বরং আবর্জনা ফেললে নেভে।
২১. ভারতের মধ্যভাগে একদল কালো মানুষ বসবাস করে তাদের পিগমি বলা হয়। তাদের ভাষা অন্যান্য ভারতীয়দের মতো। এরা ক্ষুদ্র আকার আকৃতির মানুষ; সবচেয়ে লম্বা মানুষটি ২ কিউবিট-এর বেশি নয়—অধিকাংশ দেড় কিউবিট হয়ে থাকে। তাদের চুল খুবই দীর্ঘ, প্রায় তাদের মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত অথবা তারও নিচ পর্যন্ত পৌঁছয়। আর সমস্ত মানুষদের মধ্যে তাদের দাড়ি সব থেকে লম্বা—এত লম্বা দাড়ি যে তারা কোনো জামাকাপড় পরে না, বরং দাড়ি পিছনে ঘাড় ও পিঠের ওপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে দুই পায়ের মাঝখান থেকে টেনে এনে সমস্ত শরীর আবৃত করে নেয়। তাদের লিঙ্গ দীর্ঘ আর স্থুল। দীর্ঘ এতটাই যে গোড়ালি স্পর্শ করে। অথচ, মানুষগুলোর খাঁদা নাক আর দেখতেও কুৎসিত।
২২. ওদের ভেড়াগুলো মেষশাবকের মতো, গাধা আর ষাঁড় বা এঁড়ে গরুগুলো একটা ভেড়ার মাপের চেয়ে বড় হয় না।
২৩. অসাধারণ তীরন্দাজ এই পিগমিদের হাজার তিনেক জন ভারতের রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধে যায়। তারা নীতিনিষ্ঠ ও কঠোরভাবে যুদ্ধের নিয়মনীতি মেনে চলে।
২৪. এই পিগমিরা খরগোশ আর শেয়াল শিকার করে, তবে কুকুর পাঠিয়ে শিকার করে না। এই শিকারের জন্য তারা দাঁড়কাক, চিল, কাক আর ঈগল পাখির সাহায্য নেয়।
২৫. তাদের অঞ্চলে একটা হ্রদ আছে, যার পরিসীমা বা ঘের ৮০০ ষ্ট্যাডিয়া। হ্রদের ওপরে তেল জমা হয়, যখন হাওয়া চলাচল আস্তে হয় বা ধীরগতিতে বয়। তখন হালকা ডিঙিতে চেপে লোক ওই হ্রদের মাঝামাঝি গিয়ে ছোট বাটি দিয়ে তেল সংগ্রহ করে। অনেক ডিঙি এভাবে সংগ্রহ করার কাজ করে। এই তেল আর তিল থেকে তৈরি তেল তারা ব্যবহার করে। হ্রদে মাছও আছে। তবে তিল তেল আর হ্রদের তেল ছাড়াও এরা আখরোটের তেলও ব্যবহার করে, তবে হ্রদের তেলটাই ভালো।
২৬. এখানে পর্যাপ্ত রুপো পাওয়া যায়, আর রুপোর খনিগুলো গভীর নয়, যদিও ব্যাকট্রিয়াতে যে রুপোর খনি আছে সেগুলো গভীর। ভারতে সোনাও পাওয়া যায়, আর সেই সোনা নদীর জলে ধুয়ে যায় না, যেমন প্যাকেটোলোস নদীতে হয়ে থাকে। বরং এই সোনা বিশাল সব পাহাড়ের ওপরে জমা আছে, যেখানে বিশালকায় গ্রিফিনরা বাস করে। এই গ্রিফিন পাখির চার পা, পায়ের আকৃতি আর থাবা সিংহের মতো, আর শরীরের আকার বন্য নেকড়ের মতো, সারা দেহ কালো পালকে ঢাকা, শুধু বুকের পালক টকটকে লাল রঙের। এই পাখি বাস করে বলে এখান থেকে সোনা আহরণ করা কষ্টকর, তবে এখানে মজুত আছে প্রচুর সোনা।
২৭. ভারতে ছাগল আর ভেড়াগুলো গাধার চেয়ে আকারে বড় আর চার থেকে ছ’টি করে বাচ্চা জন্ম দেয় ও লালন করে।
২৮. ভারতের তালগাছ আর তার ফলগুলো ব্যাবিলনের ওই গাছ এবং ফলের তুলনায় তিন গুণ বড়।
২৯. টিসিয়াস বলেছেন, একটা নদীর কথা, যেটি পাহাড় থেকে নেমে এসেছে এবং সেই নদীতে মধু প্রবাহিত হয়।
৩০. টিসিয়াস পরে বিস্তারিত বলেছেন, ভারতীয়দের ন্যায় ও নীতি পরায়ণতা নিয়ে, তাদের রাজাকে তারা কতটা শ্রদ্ধা করে এবং মৃত্যুকে কতটা অপছন্দ করে, সে সব নিয়ে।
৩১. এখানে একটি ঝরনা আছে, যেখান থেকে জল তুললে সেই জল চীজ বা পনিরের মতো জমে যায়। আর সেই জমে যাওয়া জল সামান্য একটু কোনো মানুষকে যদি খাওয়ানো হয় তাহলে সারাদিনের জন্য তার জ্ঞান-বুদ্ধি সব লোপ পেয়ে যায়; সে তখন সারা জীবন যা কিছু করেছে, সবকিছু বলে ফেলে। রাজা এই জল ব্যবহার করেন, যখন কোনো অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে তার কাছে আসে আর সেই অভিযোগের সত্যতা এভাবে যাচাই করে দেখতে হয়। অভিযুক্ত মানুষ তার দোষের কথা স্বীকার করলে, রাজা তাকে অনাহার বা উপবাসে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকেন, আর সে নির্দোষ প্রমাণিত হলে ছাড়া পায়।

৩২. ভারতীয়রা শিরঃপীড়া বা মাথাব্যথা, অভিস্যন্দ বা চোখের অসুখ, দাঁতব্যথা, কালশিটে বা পচন জাতীয় অসুখে আক্রান্ত হয় না। তারা ১২০, ১৩০ বা ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচে, কেউ কেউ ২০০ বছরের দীর্ঘজীবন লাভ করে।
৩৩. এই অঞ্চলে গাঢ় লাল রঙের সাপ বসবাস করে, লম্বায় তারা বিঘতখানেক বা নয় ইঞ্চির মতো, কিন্তু সারা দেহ টকটকে লাল রঙের হলেও মাথাটা উজ্জ্বল সাদা, বা শ্বেতবর্ণের হয়। এদের দাঁত নেই আর জ্বলন্ত পাহাড় যেখানে সারডোনিক্স পাথর পাওয়া যায়, সেখানে এদের খোঁজ মেলে। এই সাপ কামড়ায় না। কারণ দাঁত নেই— কিন্তু যখন পেট থেকে কিছু উগরে দেয় তখন চারদিকের এলাকা নষ্ট করে দেয়। লেজ ধরে ঝুলিয়ে রাখলে, নিচে ঝোলানো মুখ থেকে দু’রকমের তরল পদার্থ নির্গত হয়। একটা গাঢ় হলুদ রঙের, অন্যটি কালো রঙের। বাদামি-হলুদ রঙের তরল, সাপটি বেঁচে থাকতে বের করা হয়, আর কালো রঙের তরল বের হয় সাপ মারা গেলে। জীবন্ত সাপের মুখ থেকে নির্গত বিষ একটি তিলের পরিমাণ কোনো মানুষ গ্রহণ করলে সে তৎক্ষণাৎ মারা যায়। নাকের মধ্যে দিয়ে তার মগজটা নির্গত হয়ে আসে। অন্য বিষটি প্রয়োগ করলে, এক বছরের মধ্যে শরীর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যু অবধারিত।
৩৪. ‘ডাইকাইরন’ নামে একটা পাখি আছে, যার গ্রিক ভাষার অর্থ ‘যথাযথ’। আয়তনে একটা তিরি পাখির ডিমের মতো। এরা নিজের বর্জ্য মাটির মধ্যে লুকিয়ে রাখে, যেন কেউ খুঁজে না পায় সেজন্য। এক তিল পরিমাণে সেই বর্জ্য কেউ সকালবেলা গ্রহণ করলে সারাদিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে আর সুর্যাস্তের মধ্যেই মারা যাবে।
৩৫. ‘পারেবন’ নামে একটা গাছ আছে। জলপাই গাছের মতো দেখতে, আকার-আয়তনও তাই। তবে গাছটিতে কোনো ফুল হয় না, আর কেবল রাজার বাগানে বা রাজকীয় বাগানেই থাকে। গাছটির পনেরোটা শিকড় মাটিতে প্রোথিত, আর শিকড়গুলো প্রত্যেকটি একটা মানুষের পুরোবাহুর সবচেয়ে সরু অংশের মতো দেখতে। যেখানে এই শিকড়গুলো বেড়ে ওঠে, সেখানে সবকিছু এই শিকড় আকর্ষণ করে নেয়—সবকিছু বলতে সোনা, রুপো, ব্রোঞ্জ, রত্ন বা পাথর সহ সব কিছু, শুধু অ্যাম্বার বা পীতাভ পাথরটি বাদ দিয়ে।
যদি এক হাত লম্বা শিকড় কোথাও রাখা হয়, তাহলে ভেড়া, ছাগল কি পাখি তাতে আকর্ষিত হয়, এভাবে টেনে এনে বা আকর্ষণ করে বেশির ভাগ শিকার করে তারা। যদি তুমি এক পাত্র জল, বা মদ ঘনীভূত করতে চাও তা হলে এক টুকরো শিকড় দিয়ে করতে পারো। মৌমাছির মোমের মতো হাতে ধরে থাকলে পরের দিন সকালে তা দ্রবীভূত হয়ে যায়। এই দ্রবণ পেটের অসুখের ভালো ওষুধ।
৩৬. ভারতের একটি নদী আছে, যেটা খুব বড়সড় আকারের নয়— চওড়ায় দুই ষ্ট্যাডিয়া হবে। ভারতীয়রা তাকে হিপারকোস নামে জানে, যার গ্রীক ভাষার অর্থ ‘সব ভালো বস্তু বহনকারী’। এই নদী বছরের মধ্যে তিরিশ দিন অ্যাম্বার বয়ে নিয়ে আসে। তারা বলে, পর্বতশ্রেণির উপরে যেখান থেকে নদী শুরু হয় আর বয়ে আসে সেখানে এই গাছ নদীর ওপর ঝুঁকে থাকে। যখন ঋতু আসে তখন গাছ থেকে বিন্দু বিন্দু রস নির্গত হয়। একে গাছের প্রাণরস বলা যায়, বাদাম বা পাইন বা অন্যান্য গাছের মতো; তবে এ গাছের রস শুধু বছর ত্রিশ দিন নির্গত হয়। ভারতীয়রা এই গাছকে সিপটাকোরা বা ‘সুমিষ্ট’ গাছ বলে। কেউ আবার ‘মনোরম’ও বলে। গাছের ওই রস নদীতে পড়ল জলের সংস্পর্শে এসে শক্ত হয়ে যায় আর ভারতীয়রা নদী থেকে ওই অ্যাম্বার সংগ্রহ করে। ওই গাছের ফলও হয়, আঙুরের থোকার মতো থোকা থোকা; অনেকটা পন্তদেশের ‘বেরি’ বা জামের মতো দেখতে।
৩৭. টিসিয়াসের মতে, এইসব পাহাড়ে যে মানুষরা বসবাস করে তাদের মাথা কুকুর-সদৃশ। বন্যজন্তুর চামড়া থেকে তারা পরিধেয় সংগ্রহ করে, তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে কুকুরের মতো ডাকাডাকি করে, অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করে না। কুকুরের থেকে তাদের দাঁত বড় হয়, থাবার নখগুলোও বড়, তবে আরও সুগঠিত ও গোলাকার। তারা পর্বতের উপরে থাকে, যেখান থেকে সিন্ধু নদ প্রবাহিত হয় সেখানে, বহুদূরে। তাদের গায়ের রং কালো। তারা খুব ন্যায়পরায়ণ, অন্য ভারতীয়দের মতোই, তাদের সঙ্গেই বসবাস করে। অন্য ভারতীয়রা কী বলছে তারা বুঝতে পারে, কিন্তু তার উত্তর দিতে পারে না, বা কথাবার্তা চালাতে পারে না। সেজন্য তারা প্রত্যুত্তরে ঘেউ ঘেউ করে আর বোবা-কালা মানুষদের মতো হাত আর আঙুল দিয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে। ভারতীয়রা এদের ‘কেলিসস্ট্রিওই’ বলে; গ্রীক ভাষায় যার অর্থ ‘সাইনোসেফলাই’ (কুকুরমাথা মানুষ, বা কুকুরের মাথাওয়ালা মানুষ) ওদের গোষ্ঠীতে প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার মানুষ আছে।
৩৮. নদীর উৎসমুখে রক্তবর্ণের এক ধরনের ফুল ফোটে, যা থেকে লাল রং উৎপন্ন হয়, গ্রীসদেশে উৎপন্ন রঙের থেকে যা বেশি উজ্জ্বল।
৩৯. সিঁদুরের মতো লাল রঙের একটি পোকা পাওয়া যায়, গুবরে পোকার মতো আকার, তাদের পা অবিশ্বাস্য রকমের বড় আর এরা কেঁচো বা শুঁয়োপোকার মতো নরম দেহের প্রাণী। এই প্রাণী, অ্যাম্বার গাছে থাকে। গাছের ফল খায় আর গাছটিকেও মেরে ফেলে, যেরকম গ্রীসদেশে পোকারা আঙুরলতা খেয়ে ফেলে। ভারতীয়রা এই প্রাণীগুলোকে মেরে, লাল রং তৈরি করে কাপড়, জামা বা অন্যান্য জিনিসপত্র ছোপায়। এই ছোপানো রঙের জামাকাপড় পারস্যের রং করা কাপড়ের থেকে ভালো মানের।
৪০. সাইনোসেফলাই বা কুকুরের মতো মাথাওয়ালা মানুষরা পাহাড়ের ওপর থাকে, কাজকর্ম করে না, শুধু পশু শিকার করে খেয়ে বেঁচে থাকে। শিকার করে তারা সেই পশুর মাংস রোদের তাপে পরিপাক করে নেয়। এরা ছাগল, ভেড়া আর গাধা প্রতিপালন করে আর তাদের দুধ খেয়ে থাকে— তাজা আর টকে যাওয়া দু-ধরনের দুধ। তারা অ্যাম্বার গাছের (সিপটাচোরা) ফল, যা খুবই মিষ্টি হয়, সেটা খেয়ে থাকে। বড় ঝুড়িতে তারা শুকনো ফলগুলোকে রেখে দেয়, যেমন গ্রীকরা কিসমিস বা শুকনো আঙুর রাখে।
৪১. এরা ভেলা তৈরি করে। ভেলায় এই ফল, ফুল থেকে তৈরি রঞ্জক আর ২৬০ ট্যালেন্ট সংবৎসরে জমা করে। এইসব জিনিসপত্রের সঙ্গে লাল রং তৈরির আর ১০০০ ট্যালেন্ট অ্যাম্বার ভারতীয়দের রাজার কাছে প্রতি বছর পাঠাতে হয়। উদ্বৃত্ত যতটা তারা আহরণ করে, সেটুকু তারা বিক্রি করে অন্য ভারতীয়দের কাছ থেকে রুটি, খাবার আর সুতির কাপড় নেয়, পরিবর্তে। ফলের পরিবর্তে তারা তরোয়ালও নিয়ে থাকে, বন্যজন্তু শিকার করার জন্য (যদিও বর্শা আর তীর-ধনুক দিয়েও তারা শিকার করে, কারণ দুই অস্ত্রেই তারা অত্যন্ত পারদর্শী)। তারা যেহেতু উঁচু পাহাড় পর্বতে থাকে, সেই সব অঞ্চল দুরতিক্রম্যও বটে, তাই যুদ্ধ বলে কোনো কিছু তারা জানে না। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাজা তাদের তিন লক্ষ ধনুক, একই সংখ্যার বল্লম, এক লক্ষ কুড়ি হাজার ঢাল আর পঞ্চাশ হাজার তরবারি উপহার দেন।
৪২. এই মানুষরা গুহাতে থাকে, বাড়িঘরে বসবাস করে না। তারা যেসব বুনো জন্তু শিকার করে ধনুক আর বল্লম দিয়ে, তারা দৌড়ে ধরে ফেলে সেসব জন্তুদের, যারা আহত হয়েও পালিয়ে যেতে চায়— কারণ তারা খুব দ্রুত দৌড়য়। মেয়েরা মাসে একবার মাত্র স্নান করে, যখন তারা রজঃস্বলা হয়, অন্য সময় স্নান করে না। পুরুষরা কখনো স্নান করে না, শুধু হাত ধোয়, আর মাসে তিনবার নিয়ম মেনে ঘৃত দিয়ে সারা দেহে মাখে ও প্রক্ষালন করে, শেষে পশুচর্মের সাহায্যে তা পরিষ্কার করে, তারা রুক্ষ চর্ম পরিধান করে না, রুক্ষ কাপড়ও পরে না, বরং পাতলা চামড়ার পরিধেয় পরে। পুরুষ আর স্ত্রী উভয়ই এই রকম রীতি মেনে চলে। এদের মধ্যে যারা সবচেয়ে ধনশালী, তারা অবশ্য লিনেন-এর কাপড় পরে— তবে সেরকম লোক খুবই অল্প। বিছানায় না শুয়ে এরা সব খড়ের ওপর শয়ন করে। সব থেকে বেশি ভেড়া যার আছে, সে তত ধনী। বাকি সব সম্পত্তির দাম প্রায় সমান সমান।

৪৩. এদের মেয়ে-পুরুষ সবার কুকুরের মতো লেজ আছে, ঠিক কুকুরের মতো জায়গায় হয় সেই লেজ, তবে আকারে আরও বড়, আরও রোমশ। দৈহিক মিলনের সময় তারা সারমেয়দের মতোই চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বা উপুড় হয়ে মিলিত হয়, অন্য কোনোভাবে মিলিত হতে তারা লজ্জাবোধ করে। সমস্ত মানবগোষ্ঠীর মধ্যে এরা সবচেয়ে বেশিদিন বেঁচে থাকে, সাধারণভাবে ১৭০ বছর পর্যন্ত এদের আয়ু, কেউ কেউ আবার ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
৪৪. ওরা বলে, এর পরেও নদীর উৎসমুখ পার করে একদল মানুষ বসবাস করে। তাদের গায়ের রং ভারতীয়দের মতো কালো, তারা কোনো কাজকর্ম করে না, শস্য বা জল খেয়েও জীবনধারণ করে না। ওখানে গরু-ভেড়া ছাগলের পাল ঘুরে বেড়ায়, ওরা তাদের দুধ খেয়ে থাকে, অন্য কিছু খায় না। এই মানুষদের শিশু সন্তানেরা যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন সেই সন্তানের পায়ুদ্বার বা মলদ্বার থাকে না, মলত্যাগও করে না। তাদের নিতম্ব থাকে, কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিদ্রপথটি উন্মুক্ত হয়। অতএব, তারা মলত্যাগ করে না বটে, কিন্তু ওরা বলে যে ওদের মূত্র দুর্গন্ধযুক্ত হয়, পনিরের দুর্গন্ধের মতো। ওদের কাছে শোনা যায় যে, ভোরবেলা আর দিনের মাঝামাঝি দুবার তারা যখন দুগ্ধপান করে, তারপরে তারা একটা সুমিষ্ট শিকড় খায়, যে শিকড় তাদের পেটে ওই দুধকে জমতে দেয় না। শিকড় চিবিয়ে খাওয়ার পর সন্ধ্যার দিকে তারা একেবারে দুধ-সহ সবকিছুই বমন করে ফেলে। স্বাভাবিকভাবেই সেটা হয়।
৪৫. ভারতে বন্য গাধা, ঘোড়ার মতো আকারের বা তারচেয়ে বড় হয়। তাদের গায়ের রং সাদা, মাথা গাঢ় লাল রঙের আর চোখ দুটো গাঢ় নীল। কপালের ঠিক মাঝখানে এদের প্রায় দেড় হাত লম্বা একটা শিং থাকে। এই শিং নিচের দিকে কপালের কাছে দুটো হাত মুঠো করে ধরলে যতটা হয় ততটাই, আর উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণের। শিং-এর চূড়াটা ধারালো আর ছুঁচোলো গাঢ় লাল রং-এর। আর মাঝখানটা কালো রঙের। বলা হয় যে ওই শিং থেকে কাপ বা পেয়ালা তৈরি করে, যদি ওই পেয়ালায় তারা কিছু পান করে, সেটা জল বা মদ যেটাই হোক, তারপর তাদের ওপর কোনো বিষ কাজ করে না। এমনকি তাদের হৃদরোগ বা সন্ন্যাস রোগ আর হয় না।
ওরা বলে যে অন্য জাতের বুনো বা পোষ্য গাধা বা কোনো খুরবিশিষ্ট প্রাণীদের গোড়ালির হাড় বা পাকস্থলীতে পিত্তরস থাকে না। কিন্তু এদের দুটোই আছে। এদের গোড়ালির হাড় অবিকল ষাঁড়ের মতো—একই মাপ আর আকারের, এত চমৎকার দেখতে যে আমি কখনো দেখিনি। সীসার মতো ভারী আর গভীর পর্যন্ত সিঁদুর বা হিঙ্গুলের মতো লাল। এই প্রাণী চূড়ান্ত ক্ষিপ্র আর বলশালী আর ঘোড়া কিংবা অন্য কোনো জন্তু দৌড়ে এদের হারাতে পারে না। এরা প্রথমে আস্তে আস্তে দৌড় শুরু করে, পরে যত দূর যায়, তত জোরে এরা দৌড়তে পারে। সাধারণত এই প্রাণী শিকার করা যায় না, তবে এরা যখন বাচ্চা নিয়ে প্রান্তরে এসে ঘোরাফেরা করে তখন অনেক অশ্বারোহী মিলে এদের ঘিরে ধরে। এরা পালায় না। বাচ্চাটিকে আলাদা করে সরিয়ে দিয়ে তারা শিং আর খুর দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। তাদের কামড়, খুরের আঘাত আর শিং-এর গুঁতোর মতোই মারাত্মক। অনেক ঘোড়া আর মানুষ ওই জন্তুর সঙ্গে যুদ্ধে মারা যায়, শেষ পর্যন্ত তীর আর বল্লমের আঘাতে জন্তুটার মৃত্যু হয়। ওদের জীবিত অবস্থায় ধরা সম্ভব নয়। ওদের মাংস খাওয়া যায় না। কারণ তেতো স্বাদ বলে। কিন্তু ওদের মাথার ওই শিং আর গোড়ালির হাড়-এর জন্য এদের শিকার করা হয়।
৪৬. সিন্ধু নদে এক ধরনের পোকা বাস করে, যেটা ডুমুর গাছে যে পোকা থাকে তার মতো দেখতে হলেও প্রায় সাত হাত লম্বা হয়। আর এতটা চওড়া যে দশ বছরের বালক দু-হাত বেড় দিয়ে তাকে কোনোরকমে হয়তো ধরতে পারে। এই পোকাটার দুটো দাঁত, একটা ওপরের দিকে আর একটা নিচের দিকে— এই দাঁত দিয়ে যেটা ধরে ফেলে সেটাকেই খেয়ে নেয়। সারাদিন তারা নদীর কাদায় শুয়ে থাকে, রাত হলে বেরোয়। আর যখন পথে কোনো উট বা ষাঁড়ের দেখা পায়, তখন তাকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে, টেনে নদীতে নিয়ে যায়— গোটা উট বা ষাঁড়টাকে খেয়ে ফেলে, শুধু অন্ত্র বা নাড়িভুঁড়ি বাদ দিয়ে। ছাগল বা ভেড়ার ছানা টোপ দিয়ে অতিকায় মাছ-ধরা বঁড়শির সাহায্যে এদের ধরার রীতি। লম্বা লোহার শিকলে বঁড়শি বাঁধা থাকে। একটা ‘পোকা’ ধরতে পারলে তিরিশ দিন তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয় একটা কাঠের পাত্রের ওপরে— তিরিশ দিন ধরে ফোঁটা ফোঁটা ঘন তেল তার শরীর থেকে বেরিয়ে এসে পৌনে তিন লিটার তেল, বয়ামের মতো দেখতে সেই পাত্রে জমা হয়। তিরিশ দিন হয়ে গেলে তারা ‘পোকা’ টাকে সরিয়ে ফেলে, তেলটা রেখে দেয়, তারপর ভারতের রাজার কাছে নিয়ে যায়। রাজা ছাড়া অন্য কেউ এই তেল কাছে রাখতে পারে না। এই তেল, কাঠ বা কোনো জীবন্ত প্রাণীর ওপর ছড়ালে আগুন জ্বলে ওঠে, আর সে আগুন নেভাতে প্রচুর ঘন-কাদার প্রয়োজন হয়।
৪৭. সেডার অথবা সাইপ্রেস গাছের মতো একধরনের লম্বা গাছ ভারতে আছে। পাতাগুলো খেজুর গাছের পাতার চেয়ে চওড়া। গাছটির কাণ্ড আর পাতার মাঝে কোনো কৌণিক ব্যবধান নেই (axil) আর গ্রীক ও রোমানদের যে পাতাগুল্ম দিয়ে সম্মান জানানোর জন্য শিরোভূষণ (laurel) দেওয়া হয়, সেই ধরনের পাতা থাকলেও কোনো ফল থাকে না। ভারতে একে ‘কারপিয়ন’ বলে আর গ্রীসে ‘সুগন্ধি গোলাপ’ বলা হয়। গাছটি বিরল জাতের গাছ, আর সে-গাছ থেকে যে ফোঁটা ফোঁটা তেল পড়ে, সেই তেল ভারতীয়রা পশমের গোলায় সংগ্রহ করে, আর সেই পশম নিঙড়ে পাথরের পাত্রে সঞ্চয় করে থাকে। এই তেল অল্প লালচে রঙের, কিছুটা ঘন, কিন্তু ভারি সুন্দর তার গন্ধ। ওদের মতে এই গন্ধ প্রায় পাঁচ ষ্ট্যাড (১৮৫ থেকে ১৯২মি. =১ ষ্ট্যাড) অবধি পাওয়া যায়। এই সুগন্ধি কেবলমাত্র রাজা আর তার আত্মীয়দের কাছেই থাকে। ভারতের রাজা একবার পারস্যের সম্রাটকে এই সুগন্ধী উপহার দিয়েছিলেন, টিসিয়াস সেটা দেখেছেন এবং নিজে তার ঘ্রাণ নিয়েছিলেন। এককথায় তা অপূর্ব। তার কোনো বিবরণ দেওয়া যায় না, কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করাও সম্ভব নয়।
৪৮. ভারতীয়দের পনির আর সুরা অত্যন্ত সুমিষ্ট, তিনি নিজে খেয়ে দেখেছেন, এটা তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা বলেই টিসিয়াস বলেছেন।
৪৯. তিনি আরও বলেছেন যে, ভারতে একটি প্রস্রবণ আছে, যাঁর পরিসীমা ৩০.৫ ফুট। একটি চতুষ্কোণ আকারের। জল যে পাথরের ওপর আছে সেটা তিন হাত গভীর, কিন্তু জলের নিজের গভীরতা প্রায় আঠারো ফুটের বেশি। ভারতের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত লোকজন, ছেলে-মেয়ে-শিশু সকলে এই জলধারায় স্নান করে। তারা জলের মধ্যে ঝাঁপ দেয় যেভাবে আমরা হাঁটি সেইভাবে অর্থাৎ, পা নিচের দিকে, মাথা উপরে রেখে— আর সঙ্গে সঙ্গে জল তাদের ছুঁড়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। শুধু মানুষ বলে নয়, অন্যান্য জীবজন্তু, জীবিত বা মৃত সবার ক্ষেত্রেই এই ঘটনা ঘটে। জল স্পর্শ করার পরই তাদের শুকনো জমিতে ফিরিয়ে দেয়। শুধু লোহা, সোনা, রুপো আর ব্রোঞ্জ ছাড়া; এগুলো জলের মধ্যে ডুবে যায়। এই জল খুব ঠান্ডা আর স্বাদে মিঠে। এই প্রস্রবণ এত আওয়াজ করে যে শুনলে মনে হয় কেটলির মধ্যে জল ফুটছে। এই জলে কুষ্ঠ রোগ আর যাবতীয় খোস-পাঁচড়া সেরে যায়। ভারতীয়রা এই প্রস্রবণকে ‘ব্যালাড’ আর গ্রীকরা ‘প্রয়োজনীয়’ বলে।
৫০. ভারতের উঁচু পাহাড়ের ওপর, যেখানে বাঁশ, নল-খাগড়া জন্মায়, সেখানে একদল মানুষ বাস করে, সংখ্যায় তারা তিরিশ হাজার। তাদের মহিলারা সারা জীবনে একবার সন্তান প্রসব করে, সেই সন্তানদের ওপরের আর নিচের সারির দাঁত খুব সুন্দর হয়। জন্মাবার সময় থেকে ছেলে-মেয়ে দুজনেরই মাথা আর ভ্রূ-তে সাদা চুল থাকে— তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত। ওদের শরীরের সর্বাঙ্গের রোম ত্রিশ বছর বর্যন্ত সাদা থাকে। তারপর ধীরে ধীরে কালো হতে শুরু করে। ষাট বছর বয়স হলে এদের পুরো মাথার চুল কালো হয়ে যায়। এদের প্রত্যেক হাতে আর প্রত্যেক পায়ে আটটা করে আঙুল হয়। তারা যোদ্ধা, যুদ্ধ করা পছন্দ করে। ভারতীয় রাজার এইরকম পাঁচ হাজার সৈন্য আছে, যারা তীর-ধনুক আর বর্শা ছুঁড়তে পারদর্শী। টিসিয়াসের মতে, এদের কান বিরাট আকারের— প্রায় কনুই পর্যন্ত বিস্তৃত, আর গোটা পিঠ ঢাকা পড়ে। একটা কান দিয়ে অন্য কান-কে ছোঁয়া যায়।
৫১. এইসব লেখা টিসিয়াস লিখেছেন আর বলেছেন যে এ সব সত্য কথা। আরও বলেছেন যে, তিনি এই ঘটনাগুলোর বেশ কিছু নিজের চোখে দেখেছেন, আর কিছু অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া, যে নিজেই সেটা দেখেছে। তিনি আরও বলেছেন যে, অনেক কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনা তিনি বাদ দিয়েছেন, যেগুলো ব্যক্তিগতভাবে সে লোকগুলো দেখেনি, কিন্তু শুনেছে। এগুলো তাঁর বিবরণের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।
