Accessibility Tools

গ্রীকদের চোখে ভারতবর্ষ – নির্বেদ রায়

আরিয়ানের ‘ইন্ডিকা’ – নির্বেদ রায়

আরিয়ান

আরিয়ানের ‘ইন্ডিকা’

আরিয়ান, অর্থাৎ লুসিয়াস ফ্ল্যাভিয়াস এরিয়ানাসের জন্ম মিসিনিয়ার নিকোমিডিয়ায়। তাঁর পিতা রোমের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন।

আরিয়ান— একজন গ্রীক ঐতিহাসিক, সেনাবাহিনীর অধিনায়ক, সরকারী উচ্চপদে আসীন এবং দার্শনিক মানুষ রোম সাম্রাজ্যের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর লেখা ‘ইন্ডিকা’ আলেকজান্ডারের এবং সেনাপতি মিয়েরকাসের শ্রেষ্ঠ অভিযানের বিবরণ লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখার সূত্র হিসাবে তিনি প্রধানত মিয়েরকাসের বর্ণনাকে আশ্রয় করেছেন। এখন সে বর্ণনাটি প্রায় পুরোটাই হারিয়ে গেছে, তবে আরিয়ানের লেখার সময় আশা করা যায়, গোটা বিবরণটাই পাওয়া যেতো। আরিয়ান তাঁর লেখায় শুধু মিয়েরকাসের বক্তব্যকে আশ্রয় করেননি, নির্ভর করেছেন মেগাস্থিনিসের লেখার উপর, করেছেন ইরেটসথেনিসের লেখাপত্রের উপরেও।

আরিয়ানের ইন্ডিকা একটা সংক্ষিপ্ত সামরিক ইতিহাস। এশিয়া মহাদেশের আভ্যন্তরীণ ইতিহাসের যতটা ছোঁয়া এই লেখায় পাওয়া যায়, তার থেকে বেশি ভারতের ইতিহাস বা আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে হলে ভারতের উপমহাদেশীয় ইতিহাস পাওয়া যায়। ইন্ডিকার বিষয় হিসাবে আরিয়ান বেছে নিয়েছেন আলেকজান্ডারের অভিযান। সময় খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৬ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩, এই চোদ্দ বছর। আরিয়ানের জন্ম ৮৬ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ আরিয়ান যখন বইটি লেখেন তখন ঘটনাপঞ্জী প্রায় ৪৪৫ থেকে ৪৫০ বছর পূর্বে ঘটে গেছে। কিন্তু বইটির আসল গুরুত্ব হল আরিয়ানের গভীর বিশ্লেষণ। ভূগোল, ইতিহাস আর ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ ও তার সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনার ধারা। আরিয়ান লিখেছেন আইওনিক গ্রীক ভাষায়। আলেকজান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ সেনাপ্রধান নিয়েরকাসের’ জলপথে ভারত থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত যাত্রার বিবরণ হচ্ছে ‘ইন্ডিকা’। আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকা জয় করে ফেরার পথে এই অভিযান করা হয়েছিল।

আলেকজান্ডারের অভিযান এবং তার প্রভাব নিয়ে যত লেখা পাওয়া যায়, প্রাচীন আমলের সেই সমস্ত লেখার মধ্যে সব থেকে তথ্যপূর্ণ ও প্রামাণিক।

‘ইন্ডিকা’ একটা সুন্দর ধারণা দেয়। কীভাবে প্রাচীন রোম আর গ্রীসের মানুষ ভারত সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেছিল। ভারত ও ভারতীয় সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনায় সে কথা বিস্তারিত বলা হয়েছে।

আলেকজান্ডার তাঁর জয় করা অঞ্চল সম্পর্কে জানতে খুবই আগ্রহী ছিলেন, ‘ইন্ডিকা’ তার প্রতিফলন।

এই লেখার ক্ষেত্রে জন ওয়াটসন ম্যাকক্রিনডেল এবং আর্নেষ্ট আইলিফ রবসনের অনুবাদ দুটিকে ভিত্তি করেছি। গ্রিক টেকসট দেখেছি এটুকু বলা যাবে হয়তো!

.

আরিয়ান-এর ভারত

১. সিন্ধুনদের পশ্চিমদিকে কোফেন বা কাবুল নদ পর্যন্ত যে এলাকা বিস্তৃত, সেখানে এ্যাসটাসিনিয় (Astacenians) আর এ্যাসাসিনিয় (Assacenians) নামে দুটি ভারতীয় উপজাতি বসবাস করে। কিন্তু সিন্ধুনদের পাড়ে যে সমস্ত ভারতীয়রা বাস করে এরা তাদের মতো নয়। দীর্ঘদেহী, অত সাহসী নয়, অধিকাংশ ভারতীয়দের মতো গায়ের রঙ কালো নয়। অনেক আগে এরা আসিরিয়দের (Assyrians) অধীনে ছিল, তারপর মিডদের (Medes) প্রজা ছিল— ফলে এরা পারসিকদের অধীনেই চলে যায়, তাই তারা ক্যামবাইসিসের (Cambyses) পুত্র সাইরাসকে (Cyrus) কর প্রদান করে। সাইরাসের নির্দেশ অনুসারে। নাইসিয়রা (Nysaeans) ভারতীয় জাতিভুক্ত নয়, কিন্তু যারা ডিওনিসুস (Dionysus)— এর সঙ্গে ভারতে এসেছিল তাদের অংশ। সম্ভবত গ্রীক সৈন্যদের যে অংশ ডিওনিসুসের সঙ্গে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর এখানেই ছিলেন তাদের বংশধর; আর প্রতিবেশী উপজাতিদের যে স্বেচ্ছাসৈনিকের দল সেই যুদ্ধে ডিওনিসুসের সঙ্গে ছিল গ্রীকদের পাশে, যাদের গ্রীকদের সঙ্গে স্থায়ীভাবে তিনি বসতির ব্যবস্থা করেছিলেন। দেশের নাম দিয়েছিলেন নাইসিয়া (Nysaea), নামের উৎপত্তি নাইসা (Nysa) পাহাড়ের থেকে শহরের নামও নাইসা (Nysa)। আর শহর যে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, তার নাম মারস (Merus) নাইসা নয়— এই নামের কারণ ডিওনিসুসের জন্মবৃত্তান্ত। ডিওনিসুসের এই জন্মের কথা কবিদের গানে আছে— গ্রীক আর প্রাচ্যের ইতিহাস যাদের বিষয়, তাদের উপর ছেড়ে দেওয়াই ভাল। অ্যাসাসেনিয়দের মধ্যে পড়ে একটা বড় শহর মাসাকা (Massaca), এখানে অ্যাসাসিয় অঞ্চলের প্রধান বাস করে; আর একটা বড় শহর পিওসেলা (Peucela) পড়ে, সিন্ধুনদের কাছাকাছি, খুব দূরে নয়। সিন্ধুনদের এই পাড় জুড়ে, পশ্চিমদিকে কোফেন (বা কাবুল নদ) নদী পর্যন্ত এই জনগোষ্ঠী বাস করে।

২. কিন্তু ইন্ডাস বা সিন্ধুনদের পূর্বদিকে যে অংশ বিস্তৃত, তাকে আমি ইন্ডিয়া (বা ভারত) বলব, আর এই অংশের বসবাসকারীদের ইন্ডিয়ানস (বা ভারতীয়) বলা হবে। ভারতের উত্তরদিকে সীমা হল টরাস (Taurus) পর্বত। কিন্তু এই দেশে টরাস বলা হয় না, যদিও টরাস পর্বত প্যামফিলিয়া (Pamphylia) লিসিয়া (Lycia) আর সিলিসিয়ার (Cilicia) সংলগ্ন সমুদ্রপার থেকে শুরু হয়ে এশিয়া পার করে আড়াআড়িভাবে পূর্ব মহাসাগরে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু এই পর্বতের নাম একেক জায়গায় একেক রকম; কোথাও প্যারাপামিপাস (Parapamipus) কোথাও হেমোডোস (Hemodas) অন্য কোথাও এর নাম ইমাওন (Imaon) আরও হয়তো অনেক নাম আছে কিন্তু ম্যাসিডনীয়রা (Macedonians) এই পর্বতকে ককেশাস (Caucasus) বলে, এই ম্যাসিডনীয়রা আলেকজান্ডারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছিল সঙ্গী হিসাবে। এটা অন্য এক ককেশাস পর্বত (হিন্দুকুশ), সিথিয়ান (Seythian) বা শকদের দেশের ককেশাস নয়। যে কারণে বলা হয় যে, আলেকজান্ডার ককেশাস পাহাড়ের উল্টোদিক পর্যন্ত এসেছিল। ভারতের পশ্চিম অংশে সিন্ধু নদ, সমুদ্র পর্যন্ত গিয়ে মিশেছে, যেখানে নদীর দুটো মুখ গিয়ে সাগরে পড়েছে নীলনদের মতো ব-দ্বীপ তৈরি করে, ইষ্টার নদীর মতো পাঁচটা শাখা মিলে একটা শাখা তৈরি হয়ে তারপর সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে, এমন নয়। ফলে, নীলনদ যেমন মিশরে ব-দ্বীপ তৈরি করেছে, তেমন সিন্ধুও ব-দ্বীপ তৈরি করেছে, মিশরের থেকে কিছু কম নয়। ভারতীয়রা একে বলে পাট্টালা (Pattala)। দক্ষিণ দিকে এই সমুদ্র ভারতকে বেষ্টন করে আছে, আর পূর্বদিকে সমুদ্রই দেশের সীমা নির্ধারণ করছে। পাট্টালার দক্ষিণভাগ আর সিন্ধুনদের মোহনাগুলো আলেকজান্ডার নিজে, ম্যাসিডনীয় এবং গ্রীকরাও অনেকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, কিন্তু পূর্বদিকে তিনি বিপাশা নদীর (Hyphasis) ওপাশে যাননি। কিছু ঐতিহাসিক বলেছেন যে এই অংশ গঙ্গার এপাড়ে, যেখানে গঙ্গার মোহনায় ভারতের সবচেয়ে বড় শহর পালিমবোথরা অবস্থিত।

৩. আশা করি, আমি এখানে ইরেসটোসথেনিস (Erastosthenes of Cyrene) উপর যে বিশেষভাবে নির্ভর করছি তার কারণ বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়; ইরেসটোসথেনিস ভূগোলের ছাত্র। সিরিনের অধিবাসী ইরেসটোসথেনিস বলেছেন যে সিন্ধুনদের উৎপত্তিস্থল যে ঝরনা, সেখান থেকে সমুদ্র পর্যন্ত ঐ নদীর দৈর্ঘ্য, মোহনা পর্যন্ত হচ্ছে তেরো হাজার ষ্ট্যাড গ্রিক (1 Stad = 180 metres 600 ft) 1 Stad = 150-210 metres। এই দূরত্বের একদিকে আছে টরাস পর্বত। যেখানে সিন্ধুনদের উৎপত্তিস্থল, আর অন্যপ্রান্তে সমুদ্র, নদীর মোহনা যেখানে গিয়ে মিশেছে। অপরদিকে, সেই একই পর্বত থেকে পূর্ব সমুদ্র পর্যন্ত একই দূরত্ব কিন্তু নয়। কারণ এই দিকে এক শৈল অন্তরীপ সাগরের মধ্যে প্রবেশ করে আছে, যার বিস্তার তিন হাজার ষ্ট্যাড। ফলে তিনি পূর্বদিকে ভারতের এই অঞ্চলের দৈর্ঘ্য তেরো যুক্ত তিন, অর্থাৎ ষোলো হাজার ষ্ট্যাড নির্ধারণ করেছেন। এটা তিনি অবশ্য ভারতের প্রস্থ হিসাবে বিচার করেছেন। লম্বা বা দৈর্ঘ্যের মাপ নিতে হলে পূর্ব থেকে পশ্চিমে, পালিমকোথরা শহর পর্যন্ত তিনি ‘রীড’ (Reed = ৯১/২ ফুট ৯ প্রায়; ৬ হিব্র& কিউবিট একটি মাপের হিসাবে) এর হিসাবে দৈর্ঘ্য মেপে বলছেন যে ওখানে একটা রাজপথ আছে, মাপ হবে দশ হাজার ষ্ট্যাড; পরের অংশ কত মাপের সে সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। যদিও যারা সাধারণ লোকের কথা শুনে চলে, তারা বলে যে, শৈল-অন্তরীপ সমুদ্রের মধ্যে এগিয়ে গেছে যেটি, সেটা ধরলে ভারত দশ হাজার ষ্ট্যাডের বেশিই হবে; কিন্তু উত্তরদিকে দূরত্ব কুড়ি হাজার ষ্ট্যাডের মতো।

কিন্তু টিসিয়াস বলেছেন (Clesias of Cnidus) যে ভারতবর্ষ, বাকি এশিয়ার ভূখণ্ডের সমান, যেটা অবিশ্বাস্য; আর ওনেসিক্রিটাসও (Onesicritus) সমানভাবে অবিশ্বাস্য, যাঁর মতে ভারতবর্ষ গোটা পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ বা তিনভাগের এক ভাগ। নিয়েরখাস (Nearchus) তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন যে ভারতের জমি অতিক্রম করে যেতে চার মাস সময় লাগে। মেগাস্থিনিস ভারতের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকের প্রস্থ উল্লেখ করেছেন, যেটাকে অন্যরা দৈর্ঘ্য হিসাবে দেখেছেন, সেটা ষোলো হাজার ষ্ট্যাড সবচেয়ে ছোট বিস্তার যেখানে। আর উত্তর থেকে দক্ষিণে, যাকে তিনি দৈর্ঘ্য হিসাবে দেখেছেন, তার সংকীর্ণতম বা সবচেয়ে কম বিস্তার হল বাইশ হাজার তিনশত ষ্ট্যাড। ভারতের নদীসমূহ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়, এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ হল গঙ্গা আর সিন্ধু, যে কারণে এই নদীর নামে সেদশের নাম হয়েছে; সিন্ধু অথবা গঙ্গা, প্রতিটি নদী মিশরের নীলনদ অথবা সিথিয়ার ইস্টারের চেয়ে বৃহত্তর; আমার নিজস্ব ধারণা হল যে চন্দ্রভাগা (Acesines) নদী, নীলনদ আর ইস্টার (Danube river) এর থেকে বড়। আর এই দুটো নদী একসঙ্গে মিললেও গঙ্গা বা সিন্ধুর থেকে বড় হবে না। যেখানে ঝিলাম (Hydaspes), ইরাবতী (Hydraotes) আর বিপাশা (Hyphasis) এসে সিন্ধুনদে মিশেছে, সেখানে নদী তিরিশ ষ্ট্যাডিয়া বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। হয়তো আরও বিশাল নদ-নদী ভারত দেশটির মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

৪. এই দূরত্ব থেকে বিপাশা নদীর বিস্তৃতি আমি খুব আস্থার সঙ্গে বলতে পারব না, কারণ আলেকজান্ডার, বিপাশা বা হাইফাসিস পেরিয়ে আর অগ্রসর হননি। কিন্তু এই দুটো মহানদী অর্থাৎ গঙ্গা আর সিন্ধু সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মেগাস্থিনিস বলেছেন যে গঙ্গানদী, সিন্ধুনদের চেয়ে অনেক বড়, অন্য সকলে যারা এ সম্পর্কে লিখেছে তারাও একই কথা বলেছে, তারা বলেছে, গঙ্গা তার উৎসমুখ থেকেই বড় নদী হিসাবে বেরিয়েছে, তারপর শাখানদী হিসাবে পেয়েছে কাইনাস এবং ইরেন্নবোয়াস (হিরণ্যবাহু), আর কোসোয়ানাস (কুশবাহা), তিনটে নদী দিয়ে জলযান যাতায়াত করে। আরও তিনটি শাখা সোনুস (কোনা), সিট্টোকাটিস (তিস্তা), সোলোমাটিস (সারাবতী) দিয়েও নদীপথে যাতায়াত করা যায়। এছাড়া রয়েছে কণ্ডোচেটস, (গণ্ডকি), সামবাস, মাগন, আগুরানিস এবং ওমালিস (বিমলা)। এছাড়া একটা বড় নদী কমেনাসেস (কারমানাচা), আর কাকুথিস এবং এ্যাণ্ডোমেটিস (অন্ধলামটি অথবা তমসা) বয়ে চলেছে ভারতীয় মাণ্ডাডিনাই (Mandiadinae) উপজাতি যেখানে বসবাস করে সেখান থেকে, এদের পরে এমিসটিস উপজাতি সাটাডুপাস নগরের কাছে, আর ওক্সিমেগিস যারা প্যাজালির কাছে থাকে, আর একটা ভারতীয় উপজাতি এ্যারিনাইসিস যারা ম্যাথাই-এর অন্তর্ভূক্ত, তারাও গঙ্গায় এসে যুক্ত হয়েছে। মেগাস্থিনিস বলেছেন এদের মধ্যে কোনোটাই মিয়ানডারের থেকে কম নয়। যেখানে মিয়ানডার নদী নৌযাত্রার উপযুক্ত, সে সমস্ত জায়গায়। সুতরাং গঙ্গার বিস্তৃতি সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গাতে অন্তত একশো ষ্ট্যাডিয়া, অনেক জায়গায় এই নদী হ্রদের মত বিস্তার লাভ করেছে। উল্টোদিকের পাড় দেখা যায় না বিশেষ করে যেখানে পাহাড় নেই অথবা জায়গাটা নীচু, অর্থাৎ পাড়ের কোনো সীমা চোখে পড়ে না। সিন্ধুনদের ক্ষেত্রেও তাই; ইরাবতী নদী আর বিপাশা নদী এসে মিশেছে ক্যামবিসথলিয়ানদের অঞ্চলে এ্যাসট্রিবে (astrybae) থেকে, সারাঞ্জে (Sarange) এসেছে সিসিয়ান থেকে, আর এট্টাসেনিয়ানস (Attacenians) থেকে নেইড্রাস এসে মিলিত হয়েছে চন্দ্রভাগা নদীতে (Acesives)। হাইডাসপিস (Hydaspes) বা ঝিলম নদী অক্সিড্রাসাই থেকে সিনেয়াস (Sinarus) নদী অ্যারিসপাই (Arispae) অঞ্চল হয়ে গিয়ে পড়েছে চন্দ্রভাগা নদীতে (Acesines)। চন্দ্রভাগা এসে মাল্লোই অঞ্চলে সিন্ধুর সঙ্গে মিশেছে। কিন্তু তার আগে একটি বৃহৎ নদী টুটাপাস (Tutapus) এর সঙ্গে মিলিত হয়ে তারপর সিন্ধু বা ইন্ডাস নদীতে গিয়ে মিশেছে। এইসব নদ-নদী শাখানদীর নাম অবিকৃত রেখে চন্দ্রভাগা নদী (Akesines) এসে সিন্ধুতে মিশেছে। কোফেন (Cophen) বা কাবুল নদ এসেও সিন্ধুনদে মিশেছে, পিউকেলাইটিসের (Peukelaitis) উপর দিয়ে মালানটোস, সোয়াসটোস আর গারোয়াইকে সঙ্গে নিয়ে।

এর উপরে পেরেনোস আর সাপারনোস এসে পড়েছে সিন্ধুতে, পরস্পরের সঙ্গে খুব বেশি দূরত্ব না রেখে। সোয়ানোস নদীটিও এসে পড়েছে সিন্ধুতে, যদিও সেই সুদূর আবিসারিয়ানস (Abissarians) নামের পাহাড়ী অঞ্চল থেকে নদীটি এসে পড়েছে, কিন্তু এর কোনো শাখানদী নেই। মেগাস্থিনিসের মত অনুযায়ী, এই নদীরা সব নৌ-চলাচলের উপযুক্ত। সুতরাং, আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে সিন্ধু আর গঙ্গা, ইস্টার এবং নীলনদের তুলনায় অনেক বড়। নীল নদের কোনো শাখানদী নেই, যেখান থেকে সে জল পাবে, বরং অনেকগুলো খাল এই নদীর থেকে কেটে সারা মিশরকে জলসিঞ্চন করছে। আর ইস্টারের ক্ষেত্রে বলতে হয় যে, এর উৎস অকিঞ্চিৎকর, বিশেষ কিছু নয়, যদিও অনেক শাখানদী এই নদীতে যুক্ত হয়েছে, তবে তা কোনোমতেই গঙ্গা বা সিন্ধুর সমতুল্য নয়, আর সেই শাখাগুলো কোনোভাবেই সবকটা নৌ-চলাচলের উপযুক্ত নয়। খুব অল্প শাখানদী দিয়ে উপযুক্ত জলপথে নৌ-চলাচল করে। যেমন ধরো ‘ইন’ (Inn) আর ‘সেভ’ (Save), এই দুটো শাখা আমি নিজে দেখেছি। ইন যেখানে ইষ্টার নদীতে এসে মিশেছে সেখানে নরিকান আর রাটিয়েনদের কুচকাওয়াজ অনেকে দেখেছে, যেমন ‘সেভ’-এ পান্নোনিয়ানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত—জায়গার নাম টরামাস (বা আধুনিক সেমলিন)। হয়তো আরও কোনো মানুষ ডানিয়ূব বা ইস্টারের অন্য শাখানদীর কথা জানে, তবে সংখ্যায় খুব বেশি নয়।

৫. আশা করি যদি কেউ ভারতের নদীগুলোর সংখ্যা ও তাদের আকার-আকৃতির বিবরণ দিতে চায়, তাহলে তারা বলতেই পারে। আমি শুধু যা অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি বা জেনেছি তাই বলেছি। মেগাস্থিনিস যেমন আরও নদীর কথা বলেছেন, যে নদীগুলো গঙ্গা বা সিন্ধুনদের মতো পূর্বসমুদ্রে এসে পড়েছে; তারা সব অন্যান্য নদ-নদী আর মেগাস্থিনিস তাদের নামও বলেছেন। শুধু পূর্বদিকের সাগরে নয়, দক্ষিণ দিকের সাগরের অববাহিকার বাইরের দিকেও এই নদীগুলো এসে মিশেছে, সব মিলিয়ে আটান্নটা আর মেগাস্থিনিস বলেছেন, এগুলো সবই জলপথে যাতায়াত করার উপযুক্ত। কিন্তু মেগাস্থিনিসও আমার বিবেচনায় ভারতবর্ষ সর্বত্র ঘুরে দেখেননি, যদিও তিনি ফিলিপের পুত্র আলেকজান্ডার এবং তার সঙ্গে যারা এসেছিল, তাদের থেকে বেশিই দেখেছেন, কারণ তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি ভারতের সবচেয়ে বড় সম্রাট সান্ড্রাকোট্টাস (চন্দ্রগুপ্ত) আর তার চেয়েও বড় রাজা পোরাসের (পুরু-র) সঙ্গে দেখা করেছেন। এই মেগাস্থিনিসই আমাদের জানিয়েছেন যে, ভারতীয়রা কারোকে আক্রমণ করে না, ভারতীয়দেরও কেউ আক্রমণ করে না; কিন্তু মিশরীয় দিগ্বজয়ী সেসোসট্রিস এশিয়ার বৃহত্তর অংশকে অধিকার করে ইয়োরোপের সীমানায় পৌঁছে তাঁর সেনাবাহিনীকে নিয়ে আবার মিশরে ফিরে আসেন; আর সিদীয় বা সিথিয় ইনডাথিরসিস সেই সিথিয়া থেকে শুরু করে এশিয়ার অনেক দেশকে পরাস্ত করে তার বিজয়ী সেনাদল নিয়ে মিশরের সীমানা পর্যন্ত চলে যান, আর আসিরীয় রাণী সেমিরামিস ভারত অভিযানের পরিকল্পনা করেন, কিন্তু ভারত আক্রমণের আগেই তিনি মারা যান। প্রকৃতপক্ষে আলেকজান্ডারই একমাত্র ভারত আক্রমণ করেন। আলেকজান্ডারের আগে ডিওনিসুস (সুরা, উৎসব, সুখ ও গ্রীক থিয়েটারের দেবতা) ভারত অধিকার করেন বলে কথিত আছে, আর ভারতীয়দের পরাস্ত করেন, এ ঘটনা আলেকজান্ডারের আগমনের আগেই ঘটেছে— কিন্তু হেরাক্লেসের (হারকিউলিস) আগমনের ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানা নেই। কিন্তু যে সব অভিযানে ‘বাকখোস’ (ডিওনিসুস) নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার স্মৃতি বা স্মারক হিসাবে নাইসা নগর আর মেরোস পাহাড়; তার উপরে যে আইভি লতার বিস্তার এ সব কিছুই তার নিদর্শন। শুধু তাই নয়, ভারতীয়রাও যখন যুদ্ধে যায়, তখন যে ঢাক-ঢোল কাঁসর বাজিয়ে যায় আর বিন্দু বিন্দু ছোপওয়ালা জামাকাপড় পরে যায়, ঠিক যেরকম বাকখোসের অনুগামীরা ব্যবহার করে সেরকম। অথচ হেরাক্লেসের স্মারক কিন্তু অল্প আর সে সব স্মারক ও তাঁর প্রকৃত স্মৃতি বহন করছে কি না জানা দরকার। কারণ এ্যাওরনস (Aornos) পাহাড় আলেকজান্ডার তাঁর ক্ষমতা দিয়ে দখল করেছিলেন, যেটা হেরাক্লেস পারেননি। আমার মনে হয়, এটা ম্যাসিডনের লোকজনের অহংকার থেকে উৎসারিত, যেমন প্যারাপামিসুস (Parapamisus)— কে ককেসাস নাম দেওয়া। যদিও মূল ককেশাস পর্বতের সঙ্গে এই ককেসাসের কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়া প্যারাপামিসাজি (Parapamisadae) অঞ্চলে একটি বড় গুহা দেখে তারা বলে যে এটা প্রমথিউস অফ টাইটানের সেই গুহা, যেখানে তাকে স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করার জন্য ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। সিবি (Sibae) নামে ভারতীয় উপজাতির এক গোষ্ঠি পশুর চামড়া পরিধান করে, হেরাক্লেসের অভিযানের প্রতীক হিসাবে। এছাড়া তারা মুগুর ব্যবহার করে, আর তাদের গবাদি পশুদের ও ওই মুগুরের চিহ্ন দেওয়া থাকে, এটা হেরাক্লেসের মুগুরের স্মৃতিকে স্মরণ করা। তবে যদি একথা কেউ বিশ্বাস করে, তাহলে সেটা অন্য কোনো হেরাক্লেসের স্মৃতি। তিনি থিবস এর মহাবীর নন, মিশর অথবা টায়ারদ্বীপের মানুষ, অথবা ভারতের কাছাকাছি কোনো জনবহুল দেশের বড় রাজা হতে পারেন।

৬. সুতরাং, যে সব কথা কিছু লোকজন বলেছে বিপাশা (Hyphasis), পেরিয়ে গিয়ে যে সমস্ত ভারতীয়রা থাকে তাদের সম্পর্কে, সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক মনে করাই ঠিক হবে, বিশ্বাস করার খুব প্রয়োজন নেই। কারণ, আলেকজান্ডারের সঙ্গে যারা এসেছিল বা তাঁর হয়ে কাজ করেছিল তারা বিপাশা পর্যন্ত একটা বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ দিয়েছে। এর পরে এদেশ সম্পর্কে আমাদের কোনো প্রকৃত ধ্যানধারণা নেই। মেগাস্থিনিস এর পরে একটি ভারতীয় নদী সম্পর্কে বলেছেন— নদীটির নাম সাইলাস (Silas)। এই নদী একটি ঝরনা থেকে উৎপন্ন হয়েছে তার নামও সাইলাস, সিলিয়নদের (Silaean) আধিপত্য যেখানে আছে, সেই অঞ্চল থেকে নদীটি গেছে। সিলিয়ন নামটাও ওই নদীর সূত্রে পাওয়া আর ওই নদীর জলের বিশেষত্ব হল যে কোনো বস্তু ওই জলের উপর ভাসমান থাকতে পারে না সাঁতারও কাটতে পারে না, ডুবে যায়— পৃথিবীতে এই জলের তুল্য হালকা আর অসার বস্তু নেই। ভারতে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয়। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে— পারাপামিসুস, হেমোডোস আর ইমেয়াস পর্বতমালায় যে বৃষ্টি হয়, তার ফলে সেইসব পাহাড়ী অঞ্চল থেকে জন্ম নেওয়া নদীগুলো বিপুল আকৃতিতে ফেঁপে ওঠে আর প্রবল স্রোতে বইতে থাকে। সমতলেও বৃষ্টি হয়, আর বিস্তীর্ণ জায়গা প্লাবিত হয়। আলেকজান্ডারের সৈন্যদল চেনাব (Akesines) বা চন্দ্রভাগা নদীর কাছ থেকে গ্রীষ্মকালের মাঝামাঝি ফিরে যায়, কারণ প্রবল বৃষ্টিতে নদী ছাপিয়ে জমিতে জল গিয়েছিল। সমতলক্ষেত্র জলময় হয়ে গিয়েছিল। এই বন্যা থেকে নীলনদের বন্যার একটা আভাস পাওয়া যায়, কারণ ইথিওপিয়ার পর্বতমালায় গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয়, সেই বৃষ্টির ফলে নীলনদ ফুলে-ফেঁপে ওঠে আর মিশরের যে সব জায়গা নীলনদের তীরবর্তী অঞ্চল, সেগুলো ভেসে যায়, জল অশান্ত আর কর্দমাক্ত হয়ে ওঠে বছরের ওই সময়ে; সম্ভবতঃ সেটা বরফ-গলা জল নয়, আর পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে যে ইটেসিয় হাওয়া (Etasian wind, blows from May to September) হাওয়া শুকনো বাতাস বয়ে আনে তার প্রভাবও নয়, কারণ, বরফ-গলা জল হতে গেলে বরফে আবৃত শৃঙ্গ প্রয়োজন। ইথিওপীয়ার পাহাড়ে সে বরফ জমে না, উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য, কিন্তু বৃষ্টি হয় ভারতবর্ষের মতো এটা সম্ভব কারণ ইথিওপীয়া আর ভারতের মধ্যে সাদৃশ্য আছে। ভারতীয় নদীতে যেমন কুমির আছে, তেমন ইথিওপীয়া আর মিশরের উপর দিয়ে যে নীলনদ বয়ে গেছে সেখানেও কুমির বাস করে। ভারতের কিছু নদীতে নীলনদের মতোই মাছ আর অন্যান্য বড় জলচর প্রাণী আছে, শুধু জলহস্তী ছাড়া। যদিও ওনেসিক্রিটাস (Onesicritus) বলেছেন যে ওখানে জলহস্তীও আছে। ভারত আর ইথিওপীয়ার লোকজনের চেহারাতেও মিল পাওয়া যায়, দুই জাতির মধ্যে খুব তফাত নেই। ভারতের দক্ষিণ অংশের লোকজনের সঙ্গে ইথিওপীয়দের মিল আছে, উভয়েরই মুখের রঙ ও চুলের রঙ কালো, শুধু ভারতীয়রা ইথিওপীয়দের মতো নাক-চ্যাপ্টা আর চুল ওদের মতো ঘন-কোঁকড়ানো নয়। কিন্তু উত্তর ভারতের ভারতীয়রা বেশির ভাগ মিশরীয়দের মতো দেখতে।

৭. মেগাস্থিনিস বলেছেন, ভারতে একশত আঠারোটি (১১৮) উপজাতি বা গোষ্ঠি আছে। আমি মেগাস্থিনিসের সঙ্গে একমত, যে অনেক উপজাতি আছে; কিন্তু ধারণা করা মুশকিল, কী করে তিনি একেবারে সঠিক সংখ্যা বলে দিলেন, যখন তিনি ভারতের অধিকাংশ স্থানে যাননি, বা ঘুরে দেখেননি, আর এই বিভিন্ন জাতির লোকজন যখন নিজেদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে না। তিনি বলেন যে ভারতীয়রা আগে যাযাবর ছিল, ওদের আদিম ও মূল পরিচয় যাযাবর, যেরকম সাইথিয়রা (Scythians), বিশেষ করে যে সাইথিয়রা কৃষিকাজ করে না, যারা তাদের চার-চাকাওয়ালা মালবাহী গাড়িতে ঘুরে বেড়ায়, একবার এখানে যায় তারপর ওখানে যায়, তবে শহরে ঢোকে না, কোনো মন্দিরেও যায় না ঈশ্বরের উপাসনার জন্য, সিথিয়ার বা সাইথিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ভারতীয়রাও এরকম, কোনো শহর বা মন্দির তৈরি করেনি; যে সব জন্তু জানোয়ার তারা পথে যাতায়াত করতে গিয়ে মারত, তাদের চামড়া দিয়ে পোশাকের কাজ চলত, আর খাওয়ার ব্যবস্থা হতো গাছের ছাল থেকে, যেটার ভারতীয় নাম ‘তাল’, পাম গাছের মতো লম্বা গাছের উপর ফলে, পশমের গুলির মতো। আর যেসব জন্তু তারা শিকার করত, তাদের কাঁচা মাংস তারা খেত, অন্তত ডায়ানোসুস ভারতে না আসা পর্যন্ত। কিন্তু ডায়ানোসুস যখন এলেন, এসে ভারতের অধিপতি হলেন— তখন তিনি শহর প্রতিষ্ঠা করলেন, শহরে আইন কানুন চালু করলেন আর ভারতীয়দের ‘সুরা’ প্রদান করলেন, গ্রীকদের যেমন শিখিয়েছেন সুরার ব্যবহার তেমনই; এছাড়া তিনি ভারতীয়দের জমি চাষ করতে শেখান, নিজে তাদের জন্য শস্যবীজ প্রদান করেন। এর কারণ, যখন ডিমেটর (Demetor) ট্রিপটোলেমোসকে (Triptolemos) সারা পৃথিবীতে বীজ বপন করতে পাঠান, তখন এই অঞ্চলে তিনি আসেননি, অথবা ট্রিপটোলেমোসের আগে এখানে কোনো এক ডায়ানোসুস এসে চাষের বীজ দিয়ে যান। একথাও বলা হয় যে, ডায়ানোসুস ভারতে এসে প্রথম বলদদের হালে যুতে দেন আর অনেক ভারতীয়কে কৃষিকাজ করতে শেখান, যাযাবরের জীবন ছেড়ে। এছাড়া তাদের অস্ত্র দেন, যুদ্ধ করার জন্য। ডায়ানোসুস তাদের অন্যান্য দেবতাদেরও ভক্তি করতে শেখান, অবশ্যই নিজের আরাধনা বাদ দিয়ে নয়; ঝাঁঝর করতাল, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে আর তার সাথে ‘করড্যাক্স’ নৃত্য সহযোগে ডায়ানোসুসের আরাধনা হতো। (করড্যাক্স হল একধরনের লাস্যময় মুখোশ নৃত্য)। ভগবানের আরাধনার জন্য তাদের লম্বা চুল রাখতে হতো, শঙ্কু আকৃতির টুপি পরতে হতো আর সুগন্ধীলেপন করতে হতো। এই কারণে, আলেকজান্ডারের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ও ভারতীয়রা ঢাক-ঢোল আর ঝাঁঝর করতাল বাজাতে বাজাতে গেছিল।

৮. এই সব নতুন নিয়ম আর জীবনযাত্রা প্রবর্তন করে যখন তিনি ফিরে গেলেন, তখন তিনি তাঁর সঙ্গী স্পাটেমবাস (Spatembus)-কে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন, তিনি ‘ব্যাকিক’ আচার-অনুষ্ঠানে ওস্তাদ মানুষ, তিনি রাজা হলেন। স্পাটেমবাসের মৃত্যুর পর তার ছেলে বুদিয়া (Budya) তাঁর জায়গায় রাজা হলেন। বাবা শাসন করেছিলেন বাহান্ন বছর ধরে, ছেলে করেছিলেন কুড়ি বছর, তারপর তাঁর ছেলে জনৈক ক্রেডিউয়াস (Cradeuas), তারপর তাঁর বংশধররা বেশির ভাগ সময়েই রাজা ছিলেন, যদি কখনও বংশের ধারা বাধাপ্রাপ্ত হতো, তখন ভারতীয়রা রাজা নির্বাচন করত গুণসম্পন্ন মানুষ বিচার করে। হেরাক্লেস আসলে এই অঞ্চলের মানুষ ছিল যদিও এতদিন তাঁকে অন্যদেশ থেকে আগত আগন্তুক হিসাবে বলা হয়েছে। সৌরসেনীরা (Sourasenoi) তাঁকে বিশেষ সম্মান দিত। সৌরসেনীদের অধীনে দুটো বড় নগর ছিল– মেথোরা আর ক্লেইসোবোরা (Mothura and Krishnapur)। এইখান দিয়ে বয়ে যায় একটা নদী, নৌচলাচলের উপযুক্ত; নাম ইওবারেস বা আয়োবারেস (যমুনা অথবা সন্নিহিত অঞ্চলের কোনো নদী)। মেগাস্থিনিস আমাদের বলেছেন, হেরাক্লেস যে পোশাক পরতেন সেই পোশাক, ভারতীয়রাও স্বীকার করে, থিবের হেরাক্লিসের পোশাকের মতো। এছাড়া বলা হয় যে থিবের হেরাক্লিসের মতো ভারতীয় হেরাক্লেস বহু বিবাহ করেন, এবং তাঁর বহু সন্তান-সন্ততি হয়, কিন্তু তার একজন মাত্র কন্যা হয়। মেয়ের নাম দেন পাণ্ডিয়া, যেখানে মেয়ে জন্মেছে তারও নাম দেন পাণ্ডিয়া— সেখানে পিতার শেখানো পথে সে রাজত্ব শাসন করতে থাকে, তার অধীনে পাঁচশত হাতি ছিল, বাবা দিয়েছিলেন। আর ছিল চার হাজার ঘোড়সওয়ার আর এক লক্ষ ত্রিশ হাজার সেনা। হেরাক্লেস সম্পর্কে কোনো কোনো লেখক বলেছেন, সারা পৃথিবী আর সমুদ্র, জল আর জমি ঘুরে বেড়িয়ে যখন ভয়ঙ্কর দৈত্যদের বিনাশ করে পৃথিবীকে মুক্ত করছেন তখন সমুদ্রের গভীরে একটি রত্ন পান, যে রত্ন মহিলাদের খুবই পছন্দের। আজ পর্যন্ত আমাদের আমলেও ভারত থেকে রপ্তানি হয়ে এই রত্ন এদেশে আসে আর প্রাচীন গ্রীক পরিবার অথবা আজ রোম্যানরা ওই রত্ন প্রচুর অর্থ দিয়ে কিনে থাকে। হেরাক্লিস ঐ ভারতীয় রত্ন তাঁর মেয়ের জন্য সংগ্রহ করে এনেছিলেন। ‘সাগরের মুক্তো’ বলে ভারতীয়রা এই রত্নকে বলে থাকে।

মেগাস্থিনিস বলেছেন যে এই শুক্তি বা ঝিনুক মাছ ধরার জালের মতো জালে করে ধরা হয়। এরা সমুদ্রেই থাকে, মৌমাছির মতো একসঙ্গে, আর যেসব ঝিনুকে মুক্তো থাকে তাদের মধ্যে মৌমাছির মতো রাজা আর রাণী ঝিনুক পাওয়া যায়। যদি কেউ ভাগ্যক্রমে ‘রাজা’ ঝিনুকটিকে ধরে ফেলে তাহলে বাকি ঝিনুকরাও জালে ধরা পড়ে, আর যদি ‘রাজা’ একবার পালিয়ে যায়, তাহলে অন্য ঝিনুক ধরা খুব কঠিন। আর যে ক’টা ধরা দেয় বা ধরা পড়ে তাদের ভিতরের মাংস নষ্ট হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে ওই কঙ্কাল বা খোলস দিয়ে গয়না প্রস্তুত হয়। ভারতে এই মুক্তোর দাম একই ওজনের সোনার দামের থেকে তিনগুণ বেশি। যে সোনা ভারতের খনি থেকে পাওয়া যায়।

৯. যে দেশে হেরাক্লিসের মেয়ে রাণী, সেই দেশে মেয়েরা সাত বছর বয়সে বিবাহযোগ্যা হয় আর ছেলেরা চল্লিশ বছরের বেশি বাঁচে না। ভারতীয়দের মধ্যে এই সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত আছে। যে হেরাক্লিসের মেয়ে হল তাঁর পরিণত বয়সে। তিনি বুঝলেন যে তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে। এবার কন্যাকে বিবাহ দেওয়া দরকার, অথচ কন্যার উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন তিনি স্বয়ং তাঁর কন্যাকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করেন। তখন মেয়েটির বয়স মাত্র সাত। ভারতীয় রাজা বা রাজপুত্রদের বাদ দিয়ে। কিন্তু আমার মনে হয়, যদি এই অসম্ভব কাজ হেরাক্লিসের করতে হতো না, যদি তিনি তাঁর নিজের বয়সটা একটু বাড়িয়ে নিতেন। তাহলে মেয়েটির পরিণত বয়সে তিনি তাঁকে বিবাহ করতে পারতেন। কিন্তু সত্যিই যদি ওই অঞ্চলে মেয়েদের ওই বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পুরুষদের বয়সও বিচার করতে হবে, দীর্ঘায়ু পুরুষরা চল্লিশ বছরের বেশি বাঁচে না। ফলে যখন এত তাড়াতাড়ি মানুষ বৃদ্ধ হয়ে পড়ে, আর মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছয়, তখন প্রাজ্ঞ ও পরিণত বুদ্ধি হতেও তার বেশিদিন সময় লাগে না। ত্রিশ বছরে সে প্রবীন বয়স্ক মানুষ হয়ে ওঠে, কুড়ি বছর বয়সে সে পূর্ণবয়স্ক আর পনেরো বছরে যে পুরুষত্ব প্রাপ্ত হয়, সুতরাং সেক্ষেত্রে সাত বছরের মেয়ে বিবাহযোগ্যা হবে না কেন? কারণ এদেশে ফল তাড়াতাড়ি পেকে ওঠে, আবার তাড়াতাড়িই নষ্ট হয়ে যায়— একথা মেগাস্থিনিসই আমাদের বলেছেন।

ডায়ানিসুস (Dionysus) থেকে চন্দ্রগুপ্ত (Sandracottas) পর্যন্ত ছ’হাজার বিয়াল্লিশ বছরে একশ’ তিপান্ন জন রাজা রাজত্ব করেছে বলে ভারতীয়রা গুণে দেখেছে। এর মধ্যে তিনবার বিদ্রোহ হয়েছে…তিনশ বছর ধরে, আর একবার একশ কুড়ি বছর ধরে; ভারতীয়দের মতে হেরাক্লিসের পনেরো প্রজন্ম আগে ডায়ানিসুস। কিন্তু এছাড়া আর কেউ ভারত আক্রমণ করেনি, এমনকি ক্যামবাইসিসের সন্তান সাইরাস (Syrus), যিনি সাইথিয়দের বিরুদ্ধে অভিযান করেন আর অন্য সমস্ত গুণাবলীর দিক থেকে এশিয়ার সব থেকে কর্মশক্তিপূর্ণ বলশালী রাজা ছিলেন। তিনিও ভারতবর্ষের বুকে হানা দেননি। কিন্তু আলেকজান্ডার এসেছেন এবং তাঁর বাহিনীর সাহায্যে, যে সমস্ত দেশে তিনি এসেছেন সে সমস্ত দেশ জয় করেছেন; সারা পৃথিবী তিনি জয় করতে সক্ষম ছিলেন। যদি তাঁর বাহিনী সমস্ত পৃথিবীর সব প্রান্তে যেতে রাজি থাকত। কিন্তু ভারতীয়রা কখনো তাদের দেশের বাইরে যুদ্ধের কারণে অভিযান করে না, ঠিক এতটাই তারা ন্যায়নিষ্ঠ ও ধর্মনিষ্ঠ।

১০. আরো বলা হয় যে, ভারতীয়রা মৃত মানুষের স্মৃতিসৌধ বা স্মারক তৈরি করে না, কিন্তু তাঁরা বিশ্বাস করে মানুষের কর্মে, সেই কর্মই তার সবচেয়ে বড় স্মারক, আর মৃত মানুষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় তারা যে গান গায় তার মধ্যে দিয়ে তাদের শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। ভারতের নগরের সংখ্যা এত বেশি যে নির্দিষ্টভাবে তাদের সংখ্যা বলা সম্ভব নয়; যদিও নদী অথবা সমুদ্রের পাড়ে যে সব নগর অবস্থিত, তাদের সবগুলোই কাঠের তৈরি, কারণ ইঁট দিয়ে তৈরি হলে সে সব নির্মাণ টিকবে না, বর্ষার সময় সব ভেঙ্গেচুরে ধ্বংস হয়ে যাবে, আর নাহলে নদীতে যখন প্লাবন আসবে, তখন সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। যদিও সে সব নগর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থিত আর সুউচ্চ বৈশিষ্ট্য নিয়ে অবস্থান করছে, তারা সব ইঁট আর কাদামাটি দিয়ে তৈরি। ভারতের সবচেয়ে বড় নগরের নাম পালিমবোথরা (সম্ভবতঃ পাটলিপুত্র অথবা মগধ); প্রাসিয়ান (প্রাচ্য-আধুনিক পণ্ডিতদের মতে) অঞ্চলের মধ্যে। যেখানে গঙ্গা আর ইরেন্নোবোয়াস (Erannoboas, বা শোন নদী) এই দুই নদী এসে মিশেছে। গঙ্গা ভারতের সর্ববৃহৎ নদী আর ইরান্নোবোয়াস সম্ভবতঃ তৃতীয় বৃহত্তম নদী, যদিও অন্যান্য জায়গার সব নদীর থেকে বড়, কিন্তু গঙ্গায় এসে যখন মিশেছে তখন গঙ্গার থেকে ছোট নদী বলে বোঝা যায়। মেগাস্থিনিস এই শহর সম্পর্কে আরও বিবরণ দিয়েছেন, বলেছেন যে শহরে যেখানে লোকজন বসবাস করে, সেই জায়গা দু-দিকে আশি ষ্ট্যাডিয়া (১ ষ্ট্যাডিয়া = ৬০০ ফুট) পর্যন্ত দীর্ঘ, আর চওড়া প্রায় পনেরো ষ্ট্যাডিয়া। এই পুরো অঞ্চল বেড় দিয়ে আছে এক গভীর পরিখা যা ছয় ‘প্লেথরা’ (৯৭-১০০ গ্রীক ফিট বা ৩০ মিটার) চওড়া আর ত্রিশ কিউবিট (১৭.৪৮ থেকে ২০.৮৩ ইঞ্চি বা ৪৭ ইঞ্চি১ রোম্যান কিউবিট) গভীর, আর যে প্রাচীর নগরকে বেষ্টন করে আছে সেই প্রাচীরে পাঁচশ সত্তরটা প্রহরাস্তম্ভ আর চৌষট্টিটা প্রবেশদ্বার। একটা লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হল যে কোনো ভারতীয় কারো ক্রীতদাস বা দাস নয়, এ ব্যাপারে ল্যাসিডেমোনিয়ার (গ্রীসের একটি অঞ্চল, সেখানে স্পার্টা অবস্থিত) সঙ্গে তাদের চিন্তা মিলে যায়। কিন্তু ল্যাসিডেমোনিয়াতে ক্রীতদাসের জায়গায় হেলট (Helot) ছিল। যারা কার্যত দাস ছিল। কিন্তু ভারতীয়রা যে দাসপ্রথা চালু করেনি, সেটা শুধু ভারতীয় নয়, বিদেশী দাসও তারা রাখত না।

১১. ভারতীয়রা সাধারণত সাতটি শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রাজ্ঞ বা বিদ্বান মানুষ বলতে যাদের বোঝায়, তারা সংখ্যায় অন্য সব জাতের থেকে কম, কিন্তু শ্রদ্ধা আর সম্মানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়। তাদের কোনো কায়িক শ্রম করার প্রয়োজন হয় না; তাদের সাধারণ মানুষের জন্য কোনো কাজকর্ম করতে হয় না বা সকলের কাজে লাগে, এমন কোনো কাজ তারা করে না— শুধুমাত্র দেশের মানুষের তরফে, মানে ভারতীয়দের হয়ে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করা ছাড়া। যখন কেউ ব্যক্তিগতভাবে দেবতার কাছে কিছু উৎসর্গ করতে চায় তখন এই প্রাজ্ঞ মানুষদের মধ্যে একজন এই কাজে উপাধ্যায় বা শিক্ষক হিসাবে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এটা না হলে দেবতার কাছে এই উৎসর্গ গ্রহণযোগ্য হয় না। ভারতীয়রা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারদর্শী, যদিও ঐ প্রাজ্ঞ মানুষরা কেউ একজন এই ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকে। অন্যরা তখন নীরব থাকে। তারা বছরের বিভিন্ন সময় আর ঋতু সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে, কোনো বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে বুঝলে তারা ভবিষ্যদ্বাণী করে, তবে সেটা সমগ্র সমাজের উপর যখন বিপদ আসছে বলে মনে হয়, তখনই করে; কোনো ব্যক্তি একজন বা তার ভালোমন্দ নিয়ে করে না, কারণ হয় তারা ছোট খাট বিষয় নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে না, অথবা ব্যক্তি বা ছোট বিষয় নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা তাদের পক্ষে অসম্মানের। এবার ভবিষ্যদ্বাণী যদি এদের মধ্যে কারো পর পর তিনবার ব্যর্থ হয় তাহলে এদের শাস্তি হয় না। কিন্তু তারা মূক হয়ে যায়, কোনো দিনই তারা আর কথা বলে না। কোনো শক্তিই আর তাদের কথা বলাতে পারে না, যারা একবার নিজেদের এই শাস্তি দেয়। এই প্রাজ্ঞ মানুষরা নগ্ন অবস্থায় জীবনযাপন করে। শীতকালে তারা সূর্যের তাপ আর উন্মুক্ত খোলা হাওয়া উপভোগ করে। আর সূর্য যখন প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়ায় তখন তৃণভূমি আর জলাভূমিতে গিয়ে প্রকাণ্ড বনস্পতির ছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। নিয়ারকাস (Nearchos) বলেছেন এই গাছের বেড় একশ পঞ্চাশ মিটার (পাঁচ প্লেথরা, ১ প্লেথরা ৩০ মিটার) পর্যন্ত হয়। আর একটা গাছের নিচে দশ হাজার মানুষ বিশ্রাম নিতে পারে। বেঁচে থাকার জন্য এই মানুষরা প্রত্যেক মরসুমের ফল খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে, আর গাছের ছাল খেয়ে থাকে, সেই ছাল খেজুরের থেকে কোনো অংশে কম মিষ্টি বা স্বাস্থ্যকর নয়।

এর পরের শ্রেণী কৃষকরা, এরা ভারতের সবচেয়ে বড় শ্রেণী, যারা যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র বা যুদ্ধযাত্রার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে না। এরা চাষ করে। তারা রাজাকে কর প্রদান করে, স্বাবলম্বী বা স্বতন্ত্র নগরকেও কর দেয়; আর ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে যদি যুদ্ধ হয়, তাহলে কোনোপক্ষের সেনাবাহিনী এদের গায়ে হাত তোলে না বা আঘাত করে না, এদের জমিও স্পর্শ করে না। যখন যুদ্ধ চলে, তখন দেখা যায় এক তরফের সেনা অন্য তরফের সেনাদের মারছে, আর তাদের পাশে কৃষকরা জমিতে হাল দিচ্ছে, চাষ করছে, ফল বা চাষের শস্য সংগ্রহ করছে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে।

তৃতীয় শ্রেণী হল পশুপালক। যারা গো-মহিষ আর ভেড়া-ছাগল পালন করে। তারা গ্রাম বা শহর কোনোখানেই বসবাস করে না; যাযাবর বলে পাহাড়ী অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় আর রাজাকে কর দেয়—কর দেয় তাদের পালিত জন্তুর মধ্যে থেকে কোনো গৃহপালিত জন্তু দিয়ে। এরা অবশ্য পাখি আর বন্যজন্তুও শিকার করে।

১২. চতুর্থ শ্রেণী হল পসারী বা দোকানদার এবং কারুশিল্পী বা হস্তশিল্পীর দল। তারা কর্মী, কাজ করে সাধারণের জন্য আর তাদের কাজের জন্য রাজস্ব দেয়। শুধু অস্ত্র বা যুদ্ধের অনুসঙ্গ যখন তৈরি করে তখন রাজ্য থেকে অর্থ লাভ করে। এই শ্রেণীতে নাবিক আর জাহাজ নির্মাতারাও পড়ে।

পঞ্চম শ্রেণীর ভারতীয়রা হল সৈন্যবাহিনী। সংখ্যায় তারা কৃষকদের ঠিক পরেই— তাদের অবাধ স্বাধীনতা, প্রবল উদ্দীপনা আর সাহসী তারা শুধু সামরিক কর্তব্য পালন করে থাকে। তাদের অস্ত্র তৈরি করে দেয় অন্য পেশার লোক, তাদের ঘোড়া সরবরাহ করে অন্য লোক, অন্যান্য লোকজন তাদের শিবির দেখভাল করে যারা তাদের ঘোড়া দেখাশোনা করে, হাতি চালায়, রথ তৈরি করে আর রথের সারথি হিসাবেও কাজ করে, অস্ত্র পরিষ্কার করে, শান দেয়। যুদ্ধের সময় তারা নিজেরাই যুদ্ধেও যোগদান করে, আর যখন শান্তির সময় তখন তারা ফূর্তি আর আনন্দের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়। যে অর্থ তারা সরকার থেকে পায়, সেটা এতটাই যে নিজের ও পরিবারের দেখাশোনা করার পরে অন্যলোকের দেখাশোনাও করতে সক্ষম।

ষষ্ঠ শ্রেণী হলা নজরদার। তারা সমস্ত সমাজের বিভিন্ন কাজে সতর্ক নজরদারি চালায় আর দেশ রাজ্য আর নগরের যাবতীয় ব্যাপারে অবগত করে। যেখানে রাজা নেই, সেখানে কিন্তু জনসাধারণের স্বাতন্ত্র্য আছে। স্থানীয় শাসক বা বিচারপতির শাসক কাছে বিবরণ পেশ করে। কোনোরকম মিথ্যা বিবরণ দেওয়া বেআইনি, আর ভারতীয়রা কখনো তা দেয় না।

সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে উপদেষ্টা বা পার্ষদ। যারা রাজাকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে। আর পড়ে স্বশাসিত অঞ্চলের শাসক (magistrate of self governed area)— রা যারা জনগণের বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করে। সংখ্যার দিক থেকে এটি খুব ছোট একটি শ্রেণী, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানের পরিধি, ন্যায়বিচারের শক্তি এতটাই যে এদের শাসনকর্ত্তা নিয়োগের ক্ষমতা আছে। এই শ্রেণীর থেকে দেশের শাসক (Governors) জেলার শাসক (District Governors) এবং তাদের অধীনস্ত শাসকেরা (Deputies), সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক (Curtadians of treasures), সেনা ও নৌসেনার বিভিন্ন পদাধিকারী, অর্থ দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মচারী (financial Officers) আর কৃষি সম্পর্কিত তত্ত্বাবধায়কগণ এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।

এক শ্রেণীভুক্ত লোক অন্য শ্রেণীতে বিবাহ করতে পারে না। এটা আইনসিদ্ধ নয়। যেমন, একজন গোপালক থেকে মেষপালক, অথবা মেষপালক থেকে কারিগর হয়ে উঠতে পারে না, একটি মানুষ দুটো পেশায় নিযুক্ত থাকতে পারে না, পেশা বা শ্রেণী পাল্টাতেও পারে না। একমাত্র যে কোনো শ্রেণীর মানুষ প্রাজ্ঞশ্রেণীতে যেতে পারে, কারণ এটা সহজ কাজ নয়, প্রচুর পরিশ্রমসাপেক্ষ।

১৩. গ্রীকরা যে ভাবে বুনো জন্তু শিকার করে, ভারতীয়রা সেইভাবেই শিকার করে, শুধু হাতি ছাড়া; এই জন্তু শিকার করতে যে পদ্ধতি তারা অবলম্বন করে সেটা ভারি অদ্ভুত, কারণ এই জন্তুগুলো অন্য জন্তুদের থেকে আলাদা। এই পদ্ধতির বিবরণ হল, শিকারিরা প্রথম একটি জায়গা পছন্দ করে, যে জায়গা সমতল আর র্সূযালোকিত; তারপর সেখানে একটি গোল গর্ত খনন করে, যে গর্তের মধ্যে একটা গোটা সেনাবাহিনী ক্যাম্প করে থাকতে পারে। গর্তটি পাঁচ ফ্যাদম (fathom=6 feet) চওড়া আর চার ফ্যাদম গভীর। গর্ত কেটে যে মাটি উপরে তোলা হয়, সেই মাটি তারা গর্তটির দু’পাশে জমা করে, দেয়াল হিসাবে ব্যবহার করার জন্য। তারপর সেই মাটির দেওয়ালে তারা খনন করে নিজেদের আস্তানা তৈরি করে, আর বাইরের দিকে সেই আস্তানার ছোট ঘুলঘুলি গোছের ফুটো তৈরি করে। সেই ফুটো দিয়ে আলো আসে, আর ফুটো দেখতে পায়। তাদের শিকার কখন ফাঁদে এসে পড়েছে। এরপরে তারা তিন-চারটে সবচেয়ে প্রশিক্ষিত পোষা হস্তিনী ঐ ফাঁদের মধ্যে রাখে, আর একটা সেতু তৈরি করে একটা মাত্র ঢোকার পথ হিসাবে সেতুটাকে রাখে। আর মাটি ও প্রচুর খড় বিছিয়ে সেতুটাকে ঢেকে দেয়। যেন কোনো জন্তু সেটা দেখতে না পায়। এটা জন্তুদের সঙ্গে ছলনা করা। এইসব কাজ হয়ে গেলে শিকারির দল গর্তের বাইরের দিকে ঘেরা মাটির পাঁচিল বা দেওয়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। সকালের দিকে হাতির পালের দেখা পাওয়া যায় না। কারণ, সকালবেলা তারা মানুষের বসবাস যেখানে তার কাছাকাছি আসে না, কিন্তু রাতের বেলা তারা সর্বত্রই ঘুরে বেড়ায়, দল বেঁধে খেতে বেরোয়। দলের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল আর দুর্দান্ত হাতির নেতৃত্বে, যেরকম গাভীর দল বৃষ-র নেতৃত্বে অগ্রসর হয়। হাতির দল যখন পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বেষ্টনীর কাছে আসে, তখন তারা হস্তিনীদের বৃংহন আর গন্ধে আকৃষ্ট হয়, তীব্রগতিতে বেষ্টনীর দিকে ছুটে যায়। বেষ্টনীর বা দেয়ালের চারিদিকে পাক খেয়ে যখন সেতুর মুখে একমাত্র দ্বারপথের খোঁজ পায়, তখন সেই ঢোকার রাস্তা দিয়ে সেতুর উপরে গিয়ে পৌঁছয়। তারপর বেষ্টনীর মধ্যে ঢুকে পড়ে। শিকারির দল তখন দুভাগে ভাগ হয়ে একদল সেতুটাকে সরিয়ে নেয়, যেন হাতি বেষ্টনী থেকে না বেরোতে পারে, অন্য দল দৌড়ে গিয়ে গ্রামে খবর দেয় যে হাতি ফাঁদে পড়েছে। খবর পেয়ে গ্রামের লোক তাদের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত এবং পোষা হাতি নিয়ে বেষ্টনীর দিকে এগিয়ে যায়। প্রথমে গিয়েই তারা বুনো হাতিদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দেয় না, বরং অপেক্ষা করে কতক্ষণে খাবার না পেয়ে আর জলের অভাবে বন্যজন্তুগুলো কাহিল হয়ে পড়েছে। তখন সেতুটা আবার বেষ্টনীর মধ্যে লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, পোষা হাতিরা বেষ্টনীতে ঢুকে পড়ে। প্রথমে বুনো হাতির সঙ্গে পোষাহাতির জবরদস্ত লড়াই চলে বটে, তখন মাহুতরা পোষা হাতির পিঠ থেকে নেমে পড়ে, কিন্তু অনাহার আর তৃষ্ণায় হীনবল বুনোগুলো কিছুক্ষণের মধ্যে হাঁপিয়ে যায়; তখন মাহুতরা পোষাদের নির্দেশ দেয় বুনোগুলোকে ধাক্কা মারার জন্য বা গুঁতোবার জন্য। ঐ ধাক্কা খেয়ে ক্লান্তি বুনো হাতি মাটিতে পড়ে যায়; তখন মাহুতরা তাদের কাছাকাছি আসে, গলায় গোল করে দড়ি পরিয়ে দেয়, আর মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় তাদের উপর চড়ে বসে। একটা ধারালো ছুরি দিয়ে বুনো হাতির গলার চারদিক গোল করে অল্প কেটে সেখানে দড়ি পরানো নিয়ম। যার ফলে মাথা নাড়ালে হাতির ক্ষতমুখে দড়ি ঘষা লেগে ব্যথা করে। তাই হাতি মাথা সোজা করে রাখে, মাথা নাড়িয়ে মাহুতকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে না। তারা বোঝে যে ধরা পড়ে গেছে, এখন পোষা হাতিদের কথা শুনে চলতে হবে। ওদের মতো, পিছনের পায়ে শিকল বা দড়ি বেঁধে।

১৪. যে সব হাতি পূর্ণবয়স্ক নয়, খুবই অল্প বয়স; আর যাদের শারীরিক গঠন দুর্বল, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়— তারা দলে ফিরে যায়। যারা থেকে যায় তাদের গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রামে নিয়ে গিয়ে তাদের প্রথমে কাঁচা সব্জি আর ঘাস খেতে দেওয়া হয়। কিন্তু ধরা পড়ার পর তাদের মন মেজাজ ঠিক থাকে না, তারা খেতে চায় না। গ্রামের লোকজন তখন গোল করে হাতিদের ঘিরে ঢাক-ঢোল আর করতাল বাজাতে থাকে যাতে তাদের মন-মেজাজ ভালো হয়ে যায়, ঘুমিয়ে পড়ে। হাতি হচ্ছে বুদ্ধিমান জন্তু। যখন তাদের পিঠে চড়ে যারা যুদ্ধে যায়, তারা কেউ যদি মারা যায়, তাহলে এমন কাহিনীও জানা আছে যে হাতি তাকে পিঠে করে সমাধিস্থলে নিয়ে যায়, অন্যান্য হাতিরা ঐ হাতিকে ঘিরে থাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। আর অন্যরা কেউ নিহত হলে, বাকি হাতিরা তার শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। একটি হাতি, তার সওয়ারকে ভুলক্রমে হত্যা করে ফেলে, ফলে সে দুঃখ, শোক আর অনুশোচনায় মারা যায় ক’দিন বাদে। আমি নিজে এমন দৃশ্য দেখেছি যেখানে একটি হাতি বড় বড় করতাল বাজাচ্ছে, আর অন্য হাতিরা সেই তালে তালে নাচছে। কী ভাবে? যে হাতি করতাল বাজাচ্ছে তার সামনের দু-পায়ে আর শুঁড়ে করতাল বেঁধে দেওয়া হয়। আর হাতি শুঁড় দিয়ে পায়ের করতালে ছন্দে ছন্দে আঘাত করে, শুঁড়ের করতাল আর দু-পায়ের করতালে আওয়াজ ওঠে আর অন্য হাতিরা গোল হয়ে নাচে সেই তালে, তাদের সামনের পা তুলে তুলে বেঁকিয়ে বিভিন্ন কায়দায়। হাতি বসন্তকালে মিলিত হয়, ঘোড়া এবং বলদের মতোই, যখন স্ত্রী-হাতি বা হস্তিনীর কপালের দু-পাশের রগ থেকে তরল নিঃসৃত হয়, সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে। হস্তিনীর সন্তান প্রসবের সময় ষোলো থেকে আঠারো মাস; ন্যূনতম ষোলো মাস, আর সবচেয়ে বেশি আঠারো মাস সময় তারা সন্তান ধারণ করে; আর একবারে একটি সন্তান প্রসব করে, যেমন ঘোটকী করে। আট বছর পর্যন্ত হস্তীশাবক মা-র স্তন্যপান করে।

সবথেকে দীর্ঘজীবন যাপন করে যে হাতি, তারা দুইশত বছর পর্যন্ত বাঁচে, অবশ্য বহু হাতি তার আগেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। কিন্তু নিরুপদ্রবে বাঁচার বয়স এটাই। তাদের চোখের অসুখ হলে গরুর দুধ দিলে ঠিক হয়ে যায়, অন্য কোনো অসুখ-বিসুখের ওষুধ হল ‘ডার্ক-ওয়াইন’ বা আঙুরের রস থেকে তৈরি গাঢ় বর্ণের সুরা। আর তাদের আঘাতের ক্ষত ঠিক করতে ব্যবহার করা হয় ঝলসানো শূয়োরের মাংস। এইসব প্রতিবিধান ভারতীয়রা ব্যবহার করে হাতির বিভিন্ন অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের জন্য।

১৫. ভারতীয়রা অবশ্য হাতির থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করে বাঘকে। নিয়েরকাস লিখেছেন যে তিনি একটি ব্যাঘ্রচর্ম দেখেছেন বটে, কিন্তু বাঘ দেখেননি। ভারতীয়দের মতে একটা বাঘ, সবথেকে বড় ঘোড়ার সমান হয়। আর বাঘের ক্ষিপ্রতা, শক্তি এবং পরাক্রম অতুলনীয়। যখন বাঘ একটা হাতির মুখোমুখি হয়, তখন অত্যন্ত সহজে সে একলাফে হাতির মাথায় ওঠে আর হাতির কণ্ঠনালী চেপে ধরে হত্যা করে। কিন্তু, আমরা যাদের বাঘ বলে থাকি, নিয়েরকাস বলেছেন সেগুলো আসলে গায়ে বিন্দু বিন্দু বা গোল গোল দাগওয়ালা শিয়াল, যদিও শিয়ালগুলো সাধারণ শিয়ালের তুলনায় অনেক বড় (সম্ভবতঃ লেপার্ডের কথা বলা হয়েছে)। একই কথা বলেছেন পিঁপড়ে সম্পর্কেঃ নিয়েরকাস বলেছেন যে তিনি ওই বিশাল পিঁপড়ে দেখেননি, যে পিঁপড়ে সম্পর্কে কিছু লেখক বলেছেন, তারা ভারতেই বসবাস করে, যদিও তাদের গাত্রচর্ম তিনি দেখেছেন, ম্যাসিডোনিয়ার সেনা ছাউনিতে তাদের বেশ কিছু গাত্রচর্ম তখন আসতো। মেগাস্থিনিস অবশ্য এই পিঁপড়ে সম্পর্কে গল্পকে সমর্থন করেছেন: পিঁপড়ের দল মাটি খুঁড়ে সোনা তুলে আনে, যদিও সোনার খোঁজে তারা এই কাজ করে না। তারা নিজেদের আশ্রয়ের জন্য গর্ত খোঁড়ে, ঠিক যেরকম আমাদের দেশের ছোট ছোট পিঁপড়েরা ছোট গর্ত খুঁড়ে থাকে, অল্প মাটি তুলে ওই গর্ত তারা তৈরি করে। কিন্তু এই পিঁপড়ে তো শেয়ালের থেকে বড় আকৃতির, ফলে তারা সেই অনুপাতে আশ্রয়ের জন্য মাটি খোঁড়ে। এখন ওই মাটির গর্ভে সোনা থাকার জন্য মাটি খুঁড়লে সোনা উঠে আসে। আর মানুষ সেই সোনা সংগ্রহ করতে ছোটে। তবে মেগাস্থিনিস এই বর্ণনা দিয়েছিলেন ‘শুনে’, ‘দেখে’ নয়। যা শুনেছেন তাই লিখেছেন। আমি তাই এই পিঁপড়ের ঘটনার কোনো বিবরণ দিইনি, সরাসরি বাতিল করেছি। কিন্তু নিয়েরকাস যে টিয়াপাখির (শুক বা তোতাপাখি হওয়া সম্ভব) কথা লিখেছেন, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই পাখি ভারতে বাস করে আর মানুষের গলায় কথা বলে। আমি এই পাখি অনেক দেখেছি, আর অন্যদেরও চিনি যারা দেখেছে— তারা কেউ পাখিটির মধ্যে এমন কোনো বিষয় বা গুণাগুণ প্রত্যক্ষ করেনি, যা তাদের বিস্মিত করেছে; এছাড়া বনমানুষ বা বাঁদরের আকার-আকৃতি, তাদের সৌন্দর্য আর ধরার কৌশল কোনোটাই বিশেষ আশ্চর্য্যের বলে মনে হয়নি। ভারতে এই বাঁদরগুলো অন্য সব দেশের মতোই দেখতে ভালো। নিয়েরকাস বলেছেন যে এদেশে সাপ ধরা হয়, মারাও হয়, সাপগুলোর গায়ে বিভিন্ন ধরনের নকশা আঁকা বা ফোঁটা কাটা, অত্যন্ত দ্রুতগামী, নিয়েরকাস বলেছেন, এন্টিজেনিসের (Antigenes) ছেলে পাইথন (Peithon) একটা সাপ ধরেছিল। সেটা ষোলো কিউবিট (চব্বিশ ফুট) দীর্ঘ, যদিও ভারতীয়দের মতে এর থেকে অনেক লম্বা সাপ ভারতে পাওয়া যায়। কোনো গ্রীক চিকিৎসক ভারতীয় সাপের কামড়ের নিদান জানে না, ভারতীয়রা নিজেরাই তাদের সারিয়ে তোলে, যাদের সাপে কামড়ায়। নিয়েরকাস আরও বলেছেন যে আলেকজান্ডার চিকিৎসা শাস্ত্রে সেরা ভারতীয়দের তাঁর ক্যাম্পে রেখেছিলেন আর নির্দেশ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাহিনীর সর্বত্র যে, সাপে কাটলে বা সাপ কামড়ালে সম্রাটের শিবিরে খবর দিতে। এই চিকিৎসকরা অন্যান্য রোগব্যাধির চিকিৎসাতেও পারদর্শী ছিল। যদিও ভারতীয় খুব বেশি ব্যথা-বেদনায় আক্রান্ত হতো না, কারণ ভারতের আবহাওয়া ভালো নাতিশীতোষ্ণ। যদি কখনো কেউ তীব্র ব্যথা বা বেদনায় আক্রান্ত হয় তাহলে প্রাজ্ঞব্যক্তির কাছে যায়, তারা তখন দৈব ক্ষমতার সাহায্যে সেই রোগ ভালো করে দেয়।

১৬. ভারতীয়রা ক্ষৌমবস্ত্র বা পট্টবস্ত্র পরিধান করে। নিয়েরকাস বলেছেন, এই কাপড় গাছ থেকে উৎপন্ন হয়, যেটা আমি আগে বলেছি। এই লিনেন বা পট্টবস্ত্র, হয় অন্যান্য পট্টবস্ত্রের তুলনায় অধিক শ্বেতবর্ণের অথবা এই মানুষদের (ভারতীয়দের) গায়ের রঙ কালো হওয়ার জন্য বস্ত্রের সাদা রঙ আরও উজ্জ্বল সাদা বলে মনে হয়। তারা শরীরের নিম্নাঙ্গে একটা পট্টবস্ত্র পরে, যেটা কোমর থেকে হাঁটু ছাড়িয়ে পায়ের গোড়ালির আর্ধেক অবধি যায়, আর উর্ধাঙ্গের কাপড় কিছুটা গায়ে জড়ানো থাকে, আর কিছুটা মাথায় ভাঁজ করে পরা থাকে। ভারতীয়রা হাতির দাঁতের তৈরি মাকড়ি বা দুল পরে কানে, যদিও বিত্তশালীরাই পড়ে থাকে, সবাই পরতে পারে না। নিয়েরকাস আমাদের বলেছেন, ভারতীয়রা বিভিন্ন রঙ করে তাদের দাড়িতে। দাড়ি বা শ্মশ্রু যাদের সাদা তারা সাদা রঙ করে, যার ফলে আরও সাদা দেখায়; অন্যরা কেউ নীল রঙ করে, কেউ লালচে আভা দেয়, কেউ গাঢ় রং করে, আবার কেউ কেউ ঘাসের মতো সবুজ রঙ করে রাখে। সম্ভ্রান্ত ভারতীয়রা মাথায় ছোট ছাতার মতো আবরণ বা আড়াল ব্যবহার করে থাকেন সূর্যের তাপ থেকে গরমকালে বাঁচবার জন্য। তারা সাদা চামড়ার তৈরি চটিজুতো পরে, খুব পরিচ্ছন্নভাবে তৈরি এই চটিগুলোর তলার অংশ বিভিন্ন রঙের হয়, সোলগুলো উঁচু হয় যার জন্য মানুষটাকে লম্বা মনে হয়।

ভারতীয়দের যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র আলাদা ধরনের। পদাতিক সেনারা ধনুক ব্যবহার করে। ধানুকীর দৈর্ঘ্যের সমান হয় ধনুকের মাপ, মাটির উপরে ভর রেখেই ধনুক চালানো হয়, বাঁ-পায়ের সাহায্যে ধনুক সোজা করে ধরে, তারপর তীর চালায়। প্রায় তিন কিউবিট (এক কিউবিট = 45.72 cms/0.4572 metres/1.5 feet) লম্বা তীর, আর ভারতীয় তীরন্দাজের ছোঁড়া তীর প্রতিহত করতে কোনো ঢাল, বুকের বর্ম বা কঠিন কবচ কাজে লাগে না। তীরন্দাজদের বাঁ-হাতে থাকে ছোট ঢাল—ঢালের চামড়া সংস্কার করা হয়নি। এই ঢাল কিন্তু ষাঁড়ের চামড়া দিয়ে তৈরি হয়। ঢালগুলো যারা বয়ে নিয়ে যায় তাদের মতো চওড়া হয় না। একটু সরু হয়। কেউ কেউ ধনুকের জায়গায় বর্শা নিয়ে যুদ্ধে যায়। কিন্তু সকলেই একটা করে তরবারি সঙ্গে রাখে, চওড়া তরবারি, প্রায় তিন কিউবিট বা তার একটু বেশি লম্বা; তারা মুখোমুখি যখন যুদ্ধ করে তখন এই তরবারি ব্যবহার করে; সাধারণত এরা মুখোমুখি যুদ্ধ করা পছন্দ করে না, ভারতীয়দের মধ্যে এই যুদ্ধ হলে বিশেষ করে— কিন্তু যুদ্ধের সময় দু-হাত দিয়ে ধরে তরোয়াল চালায়, যার ফলে আঘাত সজোরে হয়, আর কার্যকরী হয়। ঘোড় সওয়ারদের সঙ্গে দুটো বর্শা থাকে আর একটা ছোট ঢাল থাকে, সেই ঢাল আবার পদাতিক সেনার ঢাল থেকে আকারে ছোট হয়। ঘোড়ার পিঠে জিন লাগানো থাকে না, গ্রীক বা কেল্টদের মতো ঘোড়ার মুখে লাগাম আঁটা থাকে না, বরং ঘোড়ায় মুখে ষাঁড়ের চামড়ার তৈরি গোল আবরণ থাকে আর লোহা বা পিতলের কাঁটা তার ভিতরে বসানো থাকে, খুর ধারালো কাঁটা নয় তবে ধনী লোকেরা হাতির দাঁতের কাঁটা বসায়। ওখানে লাগামটা লাগানো থাকে, আর সওয়ার যখন লাগাম টানে তখন ওই কাঁটাগুলো ঘোড়ার মুখে এঁটে বসে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

১৭. ভারতীয়রা পাতলা চেহারার, লম্বা মানুষ আর সমস্ত মানুষদের মধ্যে চলাফেরায় সবথেকে হালকা। তারা সাধারণত উট, ঘোড়া আর গাধার পিঠে চড়ে যাতায়াত করে, আর ধনী ব্যক্তিরা হাতিতে চড়ে। ভারতে হাতি হচ্ছে রাজকীয় বাহন, তারপর আসে চার-ঘোড়ায় টানা রথ, তারপর উট আর সবচেয়ে নিরেশ বাহন হচ্ছে একটা ঘোড়ায় চড়ে যদি কেউ যাতায়াত করে। কিন্তু ভারতীয় মহিলাদের, যাদের শালীনতাবোধ খুবই বেশি, কোনো উপহার দিয়ে তাদের লোভাতুর করে তোলা যায় না— একমাত্র হাতি উপহার দিলে তারা নিজেকে ‘দান’ করে। এই দান লজ্জার নয়, গর্বের— কারণ তাদের সৌন্দর্যের পরিমাপ হয় হাতি দিয়ে। মেয়েরা কিছু গ্রহণ করে বা দান করে বিবাহ করে না, যখন তারা বিবাহের উপযুক্ত হয়ে ওঠে, তখন তাদের পিতারা সেরা বরের খোঁজ করে যারা কুস্তি, হাতাহাতি লড়াই, দৌড় বা অন্য কোনো বিষয়ে বিজয়ীর সম্মান লাভ করেছে, তাদের মধ্যে থেকেই শ্রেষ্ঠ পাত্র খোঁজা হয়ে থাকে। ভারতীয়রা শস্য খেয়ে জীবনধারণ করে, তারা চাষ করে শস্য উৎপাদন করে, শুধুমাত্র পাহাড়ী মানুষ ছাড়া, তারা শিকার করা জন্তুর মাংস খেয়ে বাঁচে। ভারতীয় সম্পর্কে এই বিবরণ যথেষ্ঠ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর উল্লেখযোগ্য এই বিষয়ে মেগাস্থিনিস আর নিয়েরকাসের মতো দু’জন বিশিষ্ট মানুষ আমাদের বলে গেছেন।

কিন্তু যেহেতু আমার লেখা ইতিহাসের বিষয়, ভারতবাসীর বীতি-নীতি, নিয়ম-কানুন, প্রথা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা নয়; বরং কোন পথে আলেকজান্ডারের নৌসেনা ভারত থেকে পারস্যে পৌঁছল তার আলোচনা করা, ফলে এই বর্ণনা খুব প্রাসঙ্গিক নয়।

১৮. আলেকজান্ডারের নৌসেনা যখন হাইডাসপিস (ঝিলাম নদী) নদীর পাড়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল, তখন তিনি সমস্ত ফিনিশীয়, মিশরীয় আর সাইপ্রাসের লোকজনদের ডেকে নিলেন, যারা উত্তরদিকে তাঁর অভিযানে অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে থেকে তিনি জাহাজের মানুষ বেছে নিলেন, যারা নাবিকের কাজ করতে জানে আর দাঁড়ী অর্থাৎ দাঁড় বাইতে পারে। সমুদ্র অভিযানে যারা পটু তাদের। সেনাবাহিনীতে অনেক দ্বীপবাসী মানুষ ছিল যারা সারাজীবন সমুদ্র অভিযানে কাটিয়ে এসেছে, তারা ছাড়াও আইওনিয়া আর হাউস্পন্টের (Hellespont, উত্তর-পশ্চিম তুরস্কের একটি সরু জলপথ ঈজিয়ান সাগর আর মারমারা সমুদ্রকে যোগ করেছে, এই সংকীর্ণ জলপথের প্রাচীন নাম) সেনারাও ছিল। জাহাজ সব দু’দিকে তিন-সারি দাঁড় বিশিষ্ট। পোতাধ্যক্ষরা বিভিন্ন স্থানের— ম্যাসিডোনিয়া থেকে নিযুক্ত হয়েছেন হেফায়েসটিয়ান (Hephaestion), তিনি অ্যামিনটরের ছেলে, উনোয়েস এর ছেলে লিওনোটেস (Leonnatus), আগাথোক্লিসের ছেলে লাইসিম্যাকাস (Lysimachus), টিম্যানডারের ছেলে অ্যাসক্লিপিওডরাস (Asclepiodorus), অ্যানেক্সিডোটাসের ছেলে আর্কিয়াস (Archias), সেইলেনাসের সন্তান ওফেলাস (Ophellas), প্যান্টিয়াডেস-এর সন্তান টিম্যানথেস (Timanthes); এঁরা সকলে পেলার বাসিন্দা (‘Pella’ আলেকজান্ডারের জন্মস্থান আর প্রাচীন ম্যাসিডোনিয়ার রাজধানী)।

এ্যামফিপোলিস থেকে নিযুক্ত হলেন এ্যান্ড্রোটিমাস-এর সন্তান নিয়েরকাস (Nearchus), যিনি এই অভিযানের বিবরণ লিখেছেন, আর ল্যারিচাসের ছেলে লাওমেডন (Laomedou), ক্যালিস্ট্রেটাসের ছেলে অ্যান্ড্রোসথেনিস (Androstheues)

ওরেসটিস থেকে এলেন, আলেকজান্ডারের সন্তান ক্রেটিরাস (Craterus) এবং ওরোনটেস-এর ছেলে পারডিক্কাস (Perdiccas)।

ইওরডিয়া থেকে আসেন, লাগুসের ছেলে টলেমিয়াস (Ptolemaeus), আর পিসিয়াসের ছেলে অ্যারিষ্টনাউস (Aristonous)।

পিডনা থেকে এসেছেন, এপিক্যারমাসের ছেলে মেট্রন (Metron) আর সাইমাসের ছেলে নিসারকাইডস (Nicarchidcs)।

এই সমস্ত জায়গা থেকে যারা যুদ্ধে এসেছিল, তাদের ছাড়াও কিছু লোকজন ছিল, যেমন টিমফিয়া থেকে এ্যান্ড্রোমেনিসের ছেলে এট্টালাস (Attalus), মিজা থেকে আলেকজান্ডারের ছেলে পিউসেসটাস (Peucestus), এ্যালকোমেনি থেকে ক্রেটিউযাসের সন্তান পিইথন (Peithon), ঈজিয়া থেকে এ্যানটিপেটারের ছেলে লিওন্নাটুস (Leounatus), এ্যালোরাস থেকে নিকোলাউস-এর সন্তান, প্যানটাউকাস (Pantauchus)।

আর বোরিয়া থেকে জোইলুস এর ছেলে মাইলিয়াস (Mylleas); এরা সবাই কিন্তু ম্যাসিডনের অধিবাসী।

গ্রীকদের মধ্যে যে সব নৌবলাধ্যক্ষ ছিলেন তাঁরা হলেন মিডিয়াস (Medius), অক্সিথেমিপের সন্তান এবং লারিসা-র অধিবাসী; ছিলেন ক্যানডিয়ার অধিবাসী হায়ারোনিমাসের সন্তান ইউমেনেস (Eumenes); কোস-এর অধিবাসী প্লেটোর সন্তান ক্রিটোবুলাস (Critobulus); ম্যাগনেস-এর অধিবাসী মেনোডোরাসের ছেলে থোয়াস (Thoas) এবং ম্যানড্রোজেনেসের ছেলে ম্যাগনেস (Magnes); আর তেওসের থেকে কেবিলাসের ছেলে আন্দ্রোন (Andron)।

সাইপ্রাস থেকে এছাড়া দু’জন নৌ-সেনাপতি ছিল— নিকোক্লিস (Nicoclees) যিনি সোলিতে থাকতেন, এবং প্যাসিক্রেটাসের সন্তান; আর সালামিয়ার অধিবাসী নুটাগোরাসের (Pnutagoras) সন্তান নিথাফোন (Nithaphon)।

আরেকজন পারসিক নৌবলাধ্যক্ষ ফারনোকাস-এর (Pharnouchas) ছেলে বাগোস (Bagoas)-কেও পাওয়া যাচ্ছে।

যে জাহাজে আলেকজান্ডার স্বয়ং থাকছেন, তার চালক হলেন ওনেসিক্রিটাস, অ্যাসটিপালিয়ার অধিবাসী; আর সমস্ত অভিযানের হিসাব-নিকাশের দায়িত্বে থাকছেন ইউয়েগোরাস (Euagoras), যিনি করিন্থিয় ও য়ুকিয়নের সন্তান; অ্যান্ড্রোটিমাসের সন্তান নিয়েরকাস থাকছেন সমস্ত অবি অভিযানের হিসাব-নিকাশের দায়িত্বে থাকছেন ইউয়েগোরাস (Euagoras), যিনি করিন্থিয় ও য়ুকিয়নের সন্তান; অ্যান্ড্রোটিমাসের সন্তান নিয়েরকাস থাকছেন সমস্ত অভিযানের নেতা হিসাবে। তিনি জন্মসূত্রে ক্রিট-এর লোক হলেও, এখন এ্যামফিপোলিসে স্থায়ী বসবাস করেন, স্ট্রাইমন নদীর পাড়ে।

সমস্ত আয়োজন হয়ে যাওয়ার পর, আলেকজান্ডার সমস্ত দেবতাদের পূজা করলেন, তাঁর নিজের দেশের দেবতাদের এবং সাধুসন্তরা তাঁকে যে সমস্ত দেবতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেছিল, তাদের সকলকে তুষ্ট করার জন্য, অর্ঘ্য বা বলি দিয়ে সন্তুষ্ট করেছিলেন সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন আর তাঁর স্ত্রী অ্যামফিট্রাইটকে, গ্রীক জলদেবী নেরিই, সমুদ্রকেও পূজা দেন, পূজা দেন হাইডাসপিস নদীকে (ঝিলম নদী), এ্যাকেসিনেস নদীকে (চেনাব বা চন্দ্রভাগা নদী), যার মধ্যে হাইডাসপিস এসে পড়েছে, আর পুজো দিয়েছেন সিন্ধুনদকে, যেখানে হাইডাসপিস আর অ্যাকেসিনেস দুটোই এসে মিশেছে; আর তিনি খেলাধূলা ও শিল্পবিদ্যারও আয়োজন করেন; প্রতিযোগিতার। তাঁর পূজার বলি বা অর্ঘ্য সমস্ত সেনাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, যে যত নিরাসক্ত, তাকে অবশ্যই প্রথমে দেওয়া হয়।

১৯. এবার নৌ-অভিযানের সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ হলে, আলেকজান্ডার আদেশ দিলেন ক্রেটিরাসকে, যে হাইডাসপেস নদীর একদিক দিয়ে তার সেনাবাহিনীকে এগোবার জন্য, অশ্বারোহী আর পদাতিক দুই বাহিনীকে একসঙ্গে নিয়ে; হেফাইসটিয়ান অন্যদিক ধরে ক্রেটিয়াসের থেকেও বড় সৈন্যবাহিনী নিয়ে তার যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। হেফাইসটিয়ান তাঁর বাহিনীতে দু’শো হাতি নিয়েছেন। আলেকজান্ডার নিজে সঙ্গে নিয়েছেন সমস্ত বাহিনী, যারা বর্শা ও ঢাল হাতে পদাতিক সৈন্য (Peltasts) আর তীরন্দাজদের, অশ্বারোহি সৈন্যও নিয়েছেন, সমস্ত মিলিয়ে আট হাজার সেনার দল, যাদের সহযোদ্ধা সৈনিক বলা হতো। ক্রেটিরাস আর হেফাইসটিয়ানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে তারা যেন স্থলপথে এগিয়ে গিয়ে নৌবহরের জন্য অপেক্ষা করে। আর ফিলিপ, যাকে আলেকজান্ডার দেশের এই অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন, তাকেও অ্যাকেসিনেস নদীর দু-পাড় ধরে এগোতে বললেন। ফিলিপের উল্লেখযোগ্য সেনাবাহিনী ছিল। এক লক্ষ কুড়ি হাজারের মতো। আর তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল সাগরপাড় থেকে যে সব সেনা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন তারা, আর যুক্ত ছিল বর্বর উপজাতি ও প্রাচ্যদেশের উপজাতির দল, যাদের উচ্চপদস্থ সেনানীরা নিয়োগ করেছিল, তারা সকলে। বিভিন্ন ধরনের সব রকম অস্ত্র তাদের সঙ্গে ছিল। এবার নোঙর তোলা হল, জাহাজ হাইডেসপিস (ঝিলম নদী) বেয়ে চললো, যেখানে এ্যাকেসিনেস (চন্দ্রভাগা নদী বা চেনাব নদী) এসে মিশেছে। এখন জাহাজের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আঠারোশ, তার মধ্যে লম্বা, ছিপছিপে যুদ্ধ-জাহাজ যেমন আছে, তেমন গোল বা চওড়া আকারের বাণিজ্যপোত আছে, আর আছে ঘোড়া আর সেনাদের জিনিসপত্র বহন করার ব্যবস্থা।

আর তাঁর নৌবাহিনী কীভাবে নদীতে অবতরণ করে, আর সেপথে উপজাতিসমূহকে কিভাবে পরাজিত করেন, কিভাবে পাঞ্জাবের মালিয়া-রা তাঁকে বিপদে ফেলে আর তিনি ওদের এলাকায় আক্রান্ত হন এবং আহত হন, কীভাবে পিউসেসটাস আর লিওন্নেটাস তাঁকে রক্ষা করে তাদের ঢাল দিয়ে, যখন আলেকজান্ডার পড়ে যান— এ সমস্ত কথা আমি অন্য বিবরণে বিস্তারিত বলেছি, সেটি এ্যাটিক (প্রাচীন এথেন্সে প্রচলিত ভাষা) ভাষায় লেখা।

আমার এখন কাজ হল, নিয়েরকাসের নেতৃত্বে যে অভিযান সিন্ধুনদের মুখ থেকে শুরু হয়ে বিশাল সাগর পাড়ি দিয়ে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত পৌঁছেছিল তার কথা বলা— এই সামুদ্রিক অঞ্চলকে ইরিথ্রিয় সাগর হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়।

২০. এখন এই অভিযানের নিম্নবর্ণিত বিবরণ দিয়েছেন নিয়েরকাস। আলেকজান্ডারের প্রবল ইচ্ছা ছিল যে ভারত থেকে পারস্য পর্যন্ত যে নদীপথ এবং সমুদ্র বিস্তৃত, সে পথ ধরে জলযাত্রা করার, পাড়গুলো আর তার সঙ্গে সেই পাড় সম্পর্কে জানার, দেখার— কিন্তু সে পথে যাত্রা করতে গিয়ে পাছে কোনো জনশূন্য মরুভূমি বা অঞ্চলে গিয়ে উপস্থিত হন, অথবা জাহাজ নোঙর করার কোনো উপযুক্ত জায়গা না পান, অথবা জগতের যা কিছু মানুষের খাওয়া-পড়ার উপযুক্ত, তা থেকে বঞ্চিত থাকেন— যার ফলে তাঁর গোটা সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে; এটা তাঁর বিশাল প্রাপ্তির সঙ্গে বা দিগ্বজয়ের সঙ্গে একসঙ্গে যেতে পারে না, তাঁর সমস্ত আনন্দকে মুহূর্তে মাটি করে দিতে পারে। কিন্তু এই পথ তিনি নিজে পরিত্যাগ করলেও, এই আশ্চর্য আর বিচিত্র আবিষ্কারের নেশা তাঁকে পেয়ে বসেছিল, তিনি উপযুক্ত অধিনায়কের কথা ভাবছিলেন, যাঁর নেতৃত্বে এই অভিযান শুরু হবে, যাঁর কথায় সমস্ত অভিযাত্রী অজানা বিপদের পথে নিঃসঙ্কোচে অকুতোভয় হয়ে এগিয়ে যাবে, যারা ভাববে না, অজানা বিপদের মুখে তাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে, বরং অভিযানের দৃপ্ত মানসিকতাই তাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।

নিয়েরকাস বলেছেন, আলেকজান্ডার এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলেন, যে কাকে তিনি এই অভিযানের নেতা হিসাবে ভাববেন, কিন্তু কাজটা কঠিন ছিল। আলেকজান্ডার নিজে অনেককে বাতিল করেছেন, বিভিন্ন কারণে। কেউ ঝুঁকি নিতে চাইছে না, কেউ ভীতু, কেউ বাড়ি ফিরতে চায়; সবার একটা না একটা আপত্তি আছে শুনে নিয়েরকাস এবার নিজে এগিয়ে এলেন— ‘হে সম্রাট, আমি আপনার এই নৌবহরের দায়িত্ব নিতে চাই। আর যদি ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করেন, তাহলে এই বহর এবং বহররে সমস্ত লোকজন নিয়ে আমি নিরাপদে পারস্য পৌঁছব, যদি অবশ্য এই জলপথ একটানা এখান থেকে পারস্য অবধি থাকে, আর সে পথ পুরোটা জাহাজ চলাচলের উপযুক্ত হয় এবং মানুষের সাধ্যের অতীত না হয়।’

এই কথা শুনে আলেকজান্ডার প্রথমে তাঁর প্রিয় সেনাপতি বা প্রিয়পাত্রকে এই বিপজ্জনক অভিযানে ছাড়তে রাজি হননি, কিন্তু নিয়েরকাসের এই যাত্রার প্রতি একনিষ্ঠতা তাঁকে খুশি করে, তিনি শেষ পর্যন্ত নিয়েরকাসকে অভিযানের প্রধান নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন, এর ফলে যেসব সৈন্য জাহাজে চেপে যাত্রা করার জন্য তৈরি হচ্ছিল, তারাও খুশি হল— কারণ তারা বুঝেছে যে এই অজানা পথ নিশ্চয়ই এত ভয়ঙ্কর নয় যে আলেকজান্ডার তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে দায়িত্ব দিয়ে নির্ঘাৎ বিপদের মুখে ঠেলে দেবেন, নিয়েরকাস নিরাপদে ফিরলে তারাও নিরাপদে ফিরে আসবে। ফলে নিয়েরকাসকে জাহাজগুলোর দায়িত্ব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের পদ্ধতি পাল্টে গেল। যারা একটু আগে দ্বিধায় ছিল, তারা উৎসাহের সঙ্গে সমুদ্রযাত্রার আয়োজনে নেমে পড়ল— দাঁড়ি-মাঝিদের সঙ্গে ক্যাপ্টেনের যে অনন্তকালের ঝগড়াঝাঁটি তার অবসান ঘটল আশু প্রয়োজনের তাগিদে। আর এই উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল, যখন আলেকজান্ডার স্বয়ং সিন্ধুনদের উপর দিয়ে জাহাজে চড়ে অভিযানে অংশ নিলেন। এমনকি সমুদ্রের মধ্যে এসে তিনি গ্রীক সমুদ্র-দেবতা পোসেইডন ও অন্যান্য সমুদ্রের দেব-দেবীদের পূজা করেন এবং তাঁদের বলি উৎসর্গ করেন। সমুদ্রকে তুষ্ট করার জন্য প্রচুর সুন্দর উপহার প্রদান করেন।

তারপর যে বিশ্বাসে নির্ভর করে তাঁরা এত যুদ্ধ জিতেছে, আলেকজান্ডারের সেই অসামান্য ভাগ্য এবং ঐ বিশ্বাস যে আলেকজান্ডার কোনো কিছুতে ভয় পায় না, আর কোনো কিছু তাঁকে আটকাতে পারে না, তিনি যে কাজে হাত দেন সেটি সম্পাদিত হয়। তারা অগ্রবর্তী হয়।

২১. যখন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু শান্ত হয়— সমস্ত গ্রীষ্মকাল ধরে প্রবাহিত হওয়ার পরে; অর্থাৎ সমুদ্রের দিক থেকে স্থলভাগে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, যার জন্য সমুদ্রে কোনো জাহাজ অভিযানে যেতে পারে না, সেই দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ু শান্ত হয়ে গেলে তখন জাহাজ সমুদ্রে যায়।

অভিযান সেই অনুযায়ী শুরু হল এ্যাথেনসের ম্যাজিস্ট্রেটের নির্ধারিত সেফিসোডোরাসের দিন অনুসারে। এ্যাথেনিয়রা ওই দিন বোড্রোমিয়া মাসের বিশতম দিন হিসাবে চিহ্নিত করে। কিন্তু ম্যাসিডোনিয়ার মানুষ আর ভারতীয়রা ওই সময়কে আলেকজান্ডারের রাজত্বের একাদশ বছর হিসাবে ধরে।

নিয়েরকাস নোঙর তোলার আগে দেবরাজ জিউসের পুজো দিয়েছেন। তিনিই অভিযানের রক্ষাকর্ত্তা। আর পুজো দেওয়া ছাড়াও আলেকজান্ডারের অনুকরণে একটা খেলাধূলার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন— তারপর বন্দর ছেড়ে, প্রথম দিন জাহাজ চালিয়ে তারা এসে পৌঁছল সিন্ধু নদীর মাঝে এক জায়গায়, যেটা একটা বৃহৎ খালের পাশে; সেখানে নোঙর করে তারা দু’দিন সেখানে রইলো। তারা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করল সেখান থেকে একশো ষ্ট্যাডিয়া (সাড়ে বারো মাইল) এগোলে ‘ষ্টুরা’ বলে এই জায়গাটা পড়ে। তৃতীয় দিনে বেরিয়ে তারা তিরিশ ষ্ট্যাডিয়া দূরে আর একটা খালের কাছে এসে পড়ল; এখানে জল নোনতা হতে শুরু করেছে— অর্থাৎ, জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল নদীর এই অবধি এসে যায়, আবার ভাঁটায় ফিরে যায় বটে, কিন্তু নোনা জল নদীর জলে মিশে যায়। এই স্থানটির নাম কাউমেরা (Caumara)। এরপর কুড়ি ষ্ট্যাডিয়া এগিয়ে তারা কোরীসটিস (Coreestis) পৌঁছল, তখনও তারা নদীর মধ্যে।

আর খানিকটা এগিয়ে গিয়ে তাদের চোখে পড়ল একটা প্রাচীর, সিন্ধুনদের নিষ্ক্রমণ হয়েছে যেখানে সমুদ্রে, সেখানে। প্রবাল প্রাচীরের মতো সমুদ্রের বুকে — পাড় সেখানে খুবই রুক্ষ, উঁচুনিচু আর ঢেউ প্রবল; কিন্তু যেখানে প্রাচীর একটু কম কঠিন, সেখানে তারা পাঁচ ষ্ট্যাডিয়া লম্বা একটা যাতায়াতের পথ খুঁড়ে বার করল, যেখানে জাহাজগুলো নিরাপদে থাকতে পারে নদী বা সমুদ্রে বান আসলে; তারপর আরও একশ পঞ্চাশ ষ্ট্যাডিয়া যাওয়ার পর তারা ক্রোকালা (Crocala) নামে এক বালুকাময় দ্বীপে এসে পৌঁছল। এখানে অ্যারাবিয় (Arabeans) বলে ভারতীয়রা বসবাস করে; এখানে একটা দিন কাটানো হল। আমি আমার লেখায় এদের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছি, আর বলেছি যে এই নামটি তারা পেয়েছে অ্যারাবিস নদী থেকে, যে নদী ওদের দেশ থেকে সমুদ্রে এসে মিশেছে আর ওরিটান (Oreitans) এবং তাদের দেশের মধ্যে সীমানা নির্দেশ করে দিয়েছে। ক্রোকালা থেকে ডান দিকে আইরাস (Irus) পাহাড় চলে গেছে, সেই পাহাড়কে ডানদিকে রেখে আর বাঁ-দিকে একটা নিচু প্রবাল দ্বীপ, তার মাঝখান দিয়ে যে সরু খাঁড়ি চলে গেছে সে পথ ধরে জাহাজ খানিকটা এগিয়ে একটা বিস্তৃত বন্দর বা পোতাশ্রয় পেল। নিয়েরকাস এই বন্দরের নাম দিলেন ‘আলেকজান্ডার পোতাশ্রয় বা বন্দর’। বন্দরের মুখেই একটা দ্বীপ আছে, মাত্র দুই ষ্ট্যাডিয়া দূরে। দ্বীপের নাম বাইব্যাকটা (Bibacta), কিন্তু গোটা অঞ্চল বা জেলার নাম সাঙ্গাড়া (Sangada)। এই দ্বীপ সমুদ্রের বুকে একটা জায়গা আটকে, সেখানে বন্দর সৃ,ষ্টি করেছে; সারাক্ষণ ধরে সমুদ্রের প্রবল হাওয়া এখানে চলাচল করে। নিয়েরকাস ভয় পেলেন, পাছে স্থানীয় বর্বর অধিবাসীরা তাঁদের আক্রমণ করে, তাই চারিদিকে পাথরের দেয়াল তুলে জায়গাটাকে ঘিরে দিলেন। তিনি তাঁর দলবলসহ এখানে তেত্রিশ দিন ছিলেন, এবং তাঁর বিবরণ অনুসারে গ্রীক সেনার দল গেঁড়ি, গুগলি, শামুক আর রেজর-ফিস বলে একধরনের মাছ খেয়েছিল বেশ তৃ,,প্তি করে। সমুদ্রের নোনাজলের স্বাদও তারা তখন পেয়েছে।

২২. ঝড়-ঝঞ্ঝা কমে গিয়ে আবহাওয়া শান্ত হলে তারা জাহাজ ছাড়ল, প্রায় ষাট ষ্ট্যাডিয়া এগোবার পর একটা জায়গায় এসে নোঙর ফেলল পাড়ের কাছে একটি নির্জন, জনমানবহীন দ্বীপ। সমুদ্রের তরঙ্গ আর ঝড়-ঝাপটা আড়াল করার জন্য এই জায়গাটাকে ব্যবহার করল অভিযাত্রীরা। দ্বীপের নাম ডোমাই (Domai)। পাড়ের কাছে জল নেই, কিন্তু দ্বীপের ভিতরে কুড়ি ষ্ট্যাডিয়া হেঁটে গেলে ভালো জল পাওয়া যায়। পরের দিন সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত জাহাজ চালিয়ে সারাঙ্গা (Saranga)-তে এসে পৌঁছলেন তাঁরা, প্রায় তিনশো ষ্ট্যাডিয়া পার করে, পাড়ে নোঙর করে জলের সন্ধান-বেশি দূর নয়, আট ষ্ট্যাডিয়া দূরে জল পাওয়া গেল পাড় থেকে। এরপর আবার যাত্রা শুরু, এসে পৌঁছলেন এসে এক নির্জন অঞ্চল, সাচালা-তে (Sacala)। তারপর দুটো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে যাত্রা— পাহাড় দুটো এত কাছাকাছি যে জাহাজের দাঁড়গুলো বাইবার সময় পাথরে গিয়ে লাগছিল। প্রায় তিনশ ষ্ট্যাডিয়া এগিয়ে মোরানটোবারি (Morontobary) তে পরের বন্দর। বন্দর এখানে বড়, আকারে বৃত্তের মতো, গভীর আর শান্ত, ভালো আশ্রয়ের স্থান— তবে ঢোকার পথটা সরু, সঙ্কীর্ণ। এখানকার স্থানীয় ভাষায় জায়গাটার নাম, ‘প্রমীলা’ জলাশয় (Ladies Pool), কারণ ওই অঞ্চলের প্রথম সার্বভৌম শাসক একজন মহিলা। পাহাড় দুটো সতর্কভাবে পেরিয়ে আসার পর জাহাজ এসে পড়ে প্রচণ্ড তরঙ্গসঙ্কুল সমুদ্রের মধ্যে, এবং এই যাত্রাপথ খুবই কঠিন। পাহাড় পেরিয়ে ও বিক্ষুব্ধ সাগর পেরিয়ে আসার পরদিন যখন জাহাজ বাঁ-দিকে একটা দ্বীপের গা ঘেঁষে যাচ্ছে, তখন দ্বীপের তীরভূমি আর সমুদ্রের পাড়ের মাঝখানে সে সরু জলরাশি প্রবাহিত হচ্ছিল। তাকে সমুদ্র না বলে খাল বলেই মনে হচ্ছিল। এই খাল সত্তর ষ্ট্যাডিয়া দীর্ঘ, দ্বীপের তীরভূমি গাছ আর বনানীতে আবৃত, গোটা দ্বীপ বিভিন্ন ধরনের অরণ্যে ঢাকা। ভোর হয়ে আসল যখন, তখন একটা জলপথ ধরে তারা এগোল, দ্বীপের বাইরে সরু আর প্রায় একশ কুড়ি ষ্ট্যাডিয়া লম্বা সেই অশান্ত জলপথ ধরে এসে পড়ল অ্যারাবিস (Arabis) নদীর মুখে। এখানে নোঙর করার জন্য বড় বন্দর আছে বটে, কিন্তু খাবার জল নেই একফোঁটা, কারণ অ্যারাবিসের মোহনায় সমুদ্রের জল মিলেমিশে এক হয়েছে. জল নোনতা। যা হোক, তীরে উঠে প্রায় চল্লিশ ষ্ট্যাডিয়া ভিতরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা জলাশয় পাওয়া গেল। সেখান থেকে জল নিয়ে জাহাজে ফেরা হল। বন্দর বা পোতাশ্রয়ের কাছে দ্বীপভূমি বেশ উঁচু আর নিরাবরণ, নেড়া। চারিদিকে সবরকমের মাছ আর ঝিনুক, শুক্তি, গুগলি। এইখানে অ্যারাবিয়দের সীমানা শেষ হয়েছে, শেষ ভারতীয় বসবাস সব এখানেই শেষ, এর পরে ওরিটানদের (Oreitans) সীমানা শুরু হয়েছে।

২৩. অ্যারাবিসের মুখ থেকে এগিয়ে জাহাজ এসে দাঁড়ালো ওরাইটার (Oritae) কুলে, নোঙর ফেলা হলো পাগালা-য় (Pagala), প্রায় দু’শ ষ্ট্যাডয়ি পেরিয়ে এসে। সমুদ্র এখানে তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ, কিন্তু কোনোভাবে নোঙর করা সম্ভব হল। নাবিকের দল দু’ভাগে হয়ে, একভাগ জাহাজে থাকল। আর অন্যরা তীরে জল জোগাড় করতে গেল। পরদিন তারা ভোরবেলাতেই যাত্রা শুরু করল; সন্ধ্যার দিকে কাবানা-য় (Cabana) এসে পৌঁছলো, চারশো ত্রিশ ষ্ট্যাডিয়া পথ পেরিয়ে এসে। এসে নোঙর করল একটা জনমানবহীন অঞ্চলে। এখানে সমুদ্র পাড়ের কাছে খুবই অশান্ত, তাই জাহাজ নোঙর করা হল সমুদ্রের গভীরে, পাড় থেকে দূরে। যাত্রার এই পর্বে এসে দুর্ঘটনা ঘটল। সমুদ্রের দিক থেকে এক আকস্মিক ঝঞ্ঝাবাত্যায় দুটো রণতরী আর একটা যাত্রীবাহী জাহাজ একেবারে গোটা নৌবহর থেকে হারিয়ে গেল, কোনো খোঁজ আর তাদের পাওয়া গেল না। তিনটে জাহাজের যাত্রীরা অবশ্য কেউ মারা যায়নি। পাড় কাছে হওয়ার জন্য সাঁতার দিয়ে এসে পাড়ে উঠেছে। কিন্তু সেদিন মাঝরাতে তারা নোঙর তুলে কোকালা (Cocala) অবধি পাড়ি দিল, প্রায় দুশ’ ষ্ট্যাডিয়া দূরে। জাহাজ এসে সেখানে নোঙর ফেলল, কিন্তু নিয়েরকাস নির্দেশ দিলেন সব সৈন্যসামন্ত, নাবিকদের তীরে নেমে শিবির তৈরি করে সেখানে বিশ্রাম নিতে; সমুদ্রে তাদের অনেক পরিশ্রম গেছে, এখন খানিকটা বিশ্রাম প্রয়োজন। বিশ্রামের জন্য যে শিবির তৈরি করা হল, সেই শিবিরও লোকে স্থানীয় বর্বরদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হল। দেশের এই অঞ্চলে এসে লিওনেট্টাস, যাঁকে আলেকজান্ডার নিয়োগ করেছিলেন ওরিটানদের শায়েস্তা করার জন্য, এক বড় যুদ্ধে ওরিটানদের পরাস্ত করেন। ওরিটানসহ অন্যান্যরাও যারা ওরিটানদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, তারা সবাই পরাস্ত হয়। লিওন্নেটাস ছয় হাজার শত্রু নিধন করেন, তাদের সমস্ত দলপতি ও সর্দার সহ। আর উল্টোদিকে লিওন্নেটাসের পনেরোজন ঘোড়-সওয়ার যোদ্ধা ও কিছু পদাতিক সৈন্য, সংখ্যায় খুব বেশি নয়— তারা মারা যায়। তার মধ্যে গ্যাড্রোসিয়ার (Gedrosia) প্রাদেশিক শাসক এ্যাপোলোফেনিস (Appollophanes) ছিলেন। এ সম্পর্কে আমি আমার ইতিহাসে উল্লেখ করেছি, আর বলেছি যে এই অভিযানের সাফল্য লিওন্নেটাসকে পুরস্কৃত করেছিল, আলেকজান্ডার স্বয়ং তার জন্য স্বর্ণমুকুট প্রদান করেন তাঁকে ম্যাসিডনের অধিবাসিদের সামনে।

এবার জাহাজের শস্যভাণ্ডার মজুত করা হল, নতুন করে খাদ্যভাণ্ডার তৈরি হলো সম্রাট আলেকজান্ডারের নির্দেশে, দশ দিনের খাবার তোলা হল। যেসব জাহাজ যাত্রাপথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের সারানো হল। যে সমস্ত লোকজন সমুদ্রযাত্রা এড়াবার জন্য অসুস্থতার ভান করা শুরু করল, নিয়েরকাস তাদের বেছে নিয়ে, লিওন্নেটাসকে দিয়ে দিলেন, কিন্তু পরিবর্তে নিজের নৌবহরে লিওন্নেটাসের সেনাবাহিনী থেকে উপযুক্ত লোক নিয়ে নিলেন।

২৪. যাত্রা আবার শুরু হল। অনুকূল বাতাসে পাল তুলে এগোলো নৌবহর। পাঁচশো ষ্ট্যাডিয়া যাওয়ার পর জাহাজ এসে নোঙর ফেলল এক জলপ্রবাহের সামনে, নাম ‘টোমেরাস’ (Tomerus); এই নদীর মুখে একটা লেগুণ বা উপহ্রদ আছে, আর সেই হ্রদের সংলগ্ন যে নিম্নভূমি সেখানে একটার সঙ্গে আরেকটা গা-জড়াজড়ি করে বানানো দমবন্ধ করা কুটরি— সেখানে স্থানীয় মানুষ বসবাস করে। এই বর্বর আর হিংস্র মানুষের দল, যেই মুহূর্তে জাহাজের বহরকে সেদিকে আসতে দেখল, তখনই আস্তানা থেকে অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়ল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আর শত্রুদের আক্রমণ করার জন্য। তীরে নামলে শত্রুকে আক্রমণ করার জন্য তারা ভারী, লম্বা বল্লম হাতে নিয়ে বেরোয়; বল্লমের মাথায় লোহার ফলা নেই, লম্বায় প্রায় ছয় কিউবিট অর্থাৎ প্রায় নয় ফুট। তবে লোহার ফলা না থাকলেও, বল্লমের ডগা পুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়লে একই ফল পাওয়া যায়। স্থানীয় বর্বররা সংখ্যায় প্রায় ছশো জন। নিয়েরকাস যখন তাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে দেখলেন, তিনি তাঁর নাবিকদের নির্দেশ দিলেন পাড়ের থেকে দূরে নোঙর ফেলতে, কারণ শত্রুপক্ষের বল্লমগুলো ভারী আর মুখোমুখি লড়াইয়ে কার্যকরী, কিন্তু দূর থেকে ছুঁড়ে মারলে একেবারেই কাজের নয়। এরপর তিনি নির্দেশ দিলেন, সবথেকে হাল্কা চেহারার সৈন্যরা, সবচেয়ে হাল্কা অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে সাঁতরে পাড়ের কাছে গিয়ে যেন অপেক্ষা করে, তারা সাঁতারে রীতিমতো পারদর্শী যেন হয়, আর তারা পাড়ের সামনে গিয়ে যেন তার সঙ্গীদের জন্য অপেক্ষা করে, তারা একসঙ্গে না হওয়া পর্যন্ত যেন তীরে না ওঠে। তারা একসঙ্গে ব্যূহ তৈরি করার পর, তিন সারিতে বিস্তৃত হয়ে তারপর রণহুঙ্কার দিয়ে বর্বরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর এক দল সৈন্য তখন জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেয়। জাহাজ, তীরের কাছে যে সৈন্যরা আছে তারা আর পরে যারা জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে সাগরে সাঁতার কেটে পাড়ের দিকে এগোলো তারা সবাই মিলে একসাথে চিৎকার করে বর্বরদের আক্রমণ করে, জাহাজে বয়ে আনা যন্ত্র থেকে তারা তীর আর পাথর নিক্ষেপ করে। এই প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পড়ে বর্বররা পালায়— আক্রমণের গতি এত দ্রুত আর অস্ত্র আর পাথর এসে এমন গায়ে পড়ছে, যে প্রায় অর্ধনগ্ন বর্বররা সেই আক্রমণের মুখে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হয়ে একদল গ্রীকদের হাতে বন্দি হল, অন্যরা দূরে পালিয়ে গেল, পাহাড়ের আশ্রয়ে পালাল।

যারা ধরা পড়ল তাদের সারা শরীর এমনকি মাথাও ঘন লোমে ঢাকা; তাদের নখগুলো পশুদের থাবার মতো; কারণ শোনা যায় তারা লোহার তৈরি নখের মতো সেই নখ ব্যবহার করে—

মাছ গেঁথে জল থেকে তুলে নেয়, আবার নরম গাছের কাঠ ওই নখ দিয়েই বিভক্ত করে কাজে লাগায়। আরও শক্ত বস্তু তারা তীক্ষ্ন পাথরের সাহায্যে কেটে ফেলে; তারা লোহার ব্যবহার জানে না। পোশাক বলতে তারা বুনো জন্তুর চামড়া ব্যবহার করে, এমনকি বিশাল আকৃতির মাছের মোটা আঁশ-আলা দেহচর্মও ব্যবহার করে।

২৬. ওরিটিওদের (Oreitan) পরে, ভূখণ্ডের আরও ভিতরের দিকে থাকে গ্যাড্রেসিওরা (Gadrosians), যে অঞ্চল অতিক্রম করতে সব থেকে কষ্ট হয়েছিল আলেকজান্ডারের সৈন্যদলকে— এত কষ্ট তাদরে সমস্ত অভিযানের কোথাও করতে হয়নি। আমার ঐতিহাসিক বিবরণের বৃ,হত্তর অংশে এই অভিযানের কথা বিস্তারিতভাবে আছে। এই গ্যাড্রেসিওদের ঠিক নিচের দিকে সমুদ্রের পাড় জুড়ে বাস করে এক মৎস্যভুক (Ichthiyophagi) জনজাতি। নৌবহন তাদের পেরিয়ে চলে গেল। প্রথম দিনে, রাতের প্রহরে, তারা যাত্রা শুরু করে আর বাগিসারা (Bagisara) পৌঁছয়। দূরত্ব ছয়শো ষ্ট্যাডিয়া। এখানে একটা ভালো পোতাশ্রয় আছে, আর একটা গ্রাম আছে, নাম পাসিরা (Pasira), পাসিরা গ্রাম সমুদ্র থেকে ষাট ষ্ট্যাডিয়া ভিতরের দিকে, এখানে অধিবাসিদের নাম পাসিরিয় (Pasireans)। পরদিন তারা আরও তাড়াতাড়ি পাল তুলে বেরিয়ে পড়ল আর একটা শৈল-অন্তরীপ ঘুরে এল, যেটা সাগরের দিকে বিস্তৃত, অন্তরীপটি উঁচু আর দুরারোহ। এখানে তারা গর্ত খুঁড়ে কুয়ো তৈরি করল, কিন্তু জল খুবই অল্প পরিমাণে পাওয়া গেল, তাও ভালো জল নয়, কিন্তু তাদের সেদিনই নোঙর তুলতে হল, কারণ সমুদ্রের ঢেউ পাড়ে খুবই জোরে আছড়ে পড়ছে, এখানে জাহাজ বাঁধা সম্ভব নয়। তারা জায়গাটা ছেড়ে সমুদ্রে এগোলো, পরদিন দুশো ষ্ট্যাডিয়া পার করে কোলতা (Colta)-তে এসে পৌঁছল। ভোরবেলা পরদিন বেরিয়ে ছ’শো স্টাডিয়র এগিয়ে তারা ক্যালিবা (Colyba)-তে এসে নোঙর করল। পাড়ে একাট গ্রাম আছে, তার চারদিকে খেজুর-গাছ চোখে পড়ে, খেজুর-ফল তখনও সবুজ রং-এর হয়ে ফলে আছে। তটভূমি থেকে একশো স্ট্যাড দূরে একটা দ্বীপ— নাম কারনাইন (Carnine)। সেখানকার দ্বীপবাসীর মানুষ নিয়েরকাসের জন্য উপহার নিয়ে এলো, নিয়ে এলো ভেড়া আর মাছ; মাংসের স্বাদ অনেকটা মাছের মতো, অনেকটা সামুদ্রিক পাখির মাংসের মতো খেতে, কারণ ভেড়াগুলো মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে; দ্বীপে কোনো ঘাস জন্মায় না। যাই হোক, পরের দিন তারা যাত্রা শুরু করে দুশো ষ্ট্যাডিয়া এগিয়ে এসে নোঙর করল এক বিস্তীর্ণ তীরভূমিতে এসে, গ্রাম এখান থেকে ত্রিশ ষ্ট্যাড দূরে, নাম সিজা (Cissa) তীরভূমির নাম কারবিস! এখানে তাদের চোখে পড়ল ছোট ছোট নৌকা, যে নৌকা করে জেলেরা মাছ ধরে, কিন্তু জেলেদের কাউকে চোখে পড়ল না, তারা জাহাজগুলোকে আসতে দেখেই পালিয়েছে। ওই অঞ্চলে শস্যদানা বলতে কিছু নেই, আর সেনাবাহিনী আর অভিযাত্রীদের রসদও কমে এসেছিল। তাই কিছু না পেয়ে তারা জাহাজে কয়েকটা ছাগল নিয়েই এগোলো। প্রায় একশ পঞ্চাশ ষ্ট্যাডিয়ার একটা শিলা সমুদ্রের মধ্যে ঢুকে গেছে, সেটাতে অতিক্রম করে তারা একটা শান্ত পোতাশ্রয়ে এসে পৌঁছল। সেখানে খাবার জল পাওয়া গেল, জেলের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে, বন্দরের নাম মোসারনা (Mosarna)।

২৭. এই অভিযানের পর তারা জাহাজগুলোকে পাড়ে তুলে যেখানে যতটুকু প্রয়োজন, সেই মতো জাহাজে মেরামত আর সারাই-এর কাজ করল। ছয়দিন পরে আবার যাত্রা শুরু করে তিনশ ষ্ট্যাডিয়া অতিক্রম করার পর যে অঞ্চলে এসে পৌঁছলো, সেটা ওরিটিয় সীমান্তের শেষ প্রান্ত। জায়গাটির নাম মালানা (Malana)। এই ওরিটানরা বা ওরিটিয়রা, যারা ভিতরের দিকে থাকে, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ভারতীয়দের অনুরূপ, তারা ব্যবহার করে ভারতীয়দের মতো অস্ত্রশস্ত্র, শুধু তাদের ভাষা আর আচার আচরণ আলাদা। অ্যারাবি (Arabii) র তীর ধরে একটানা একহাজার ষ্ট্যাডিয়া আসতে হবে, যেখান থেকে এবার যাত্রা শুরু হয়েছে; আর ওরাইটিয় তীরভূমি থেকে ষোলোশ ষ্ট্যাডিয়া।

নিয়েরকাস আমাদের বলেছেন যে, ভারতীয় তীর ধরে যারা বাণিজ্য করে বা যাতায়াত করে, তাদের ছায়া অন্যভাবে পড়ে, কারণ যখন দক্ষিণদিকে দীর্ঘ পথ তারা অতিক্রম করে, তখন তাদের ছায়াও দক্ষিণমুখী হয়ে পড়ে। কিন্তু সূর্য যখন একেবারে মধ্যাহ্নে তখন কোথাও ছায়া দেখতে পাওয়া যায় না। তখন যেসব তারা-দের এতক্ষণ দেখা যেত, তাদের কেউ কেউ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে লুকিয়ে পড়ে, আর অন্য তারারা পৃথিবীর তটরেখার কাছে দেখা যায়; (সম্ভবত নিয়েরকাস নিজে এই মহাকাশ এবং তারাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন না, কিন্তু এই বিষয় নিয়ে কিছু দ্বিমত আছে।) আমার মনে হয় নিয়েরকাস এই বিজ্ঞানের তথ্য নির্ভর করেছিলেন মিশরের সিরিন (Serene of Egypt) থেকে, যেখানে সূর্য যখন উত্তরায়ণে থাকে, তখন লোকজন একটা কুঁয়োর দিকে দেখায়, সেখানে কোনো ছায়া পড়ে না, মধ্যাহ্নের সময়। ভারত যেহেতু দক্ষিণপ্রান্তে, একেবারে চরম সীমায় সেজন্য সেইখানে এই প্রাকৃতিকে ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরের ক্ষেত্রে তো বটেই, কারণ এটা দক্ষিণ মুখে বহমান। কিন্তু, আর নয়, এই আলোচনা এখানেই বন্ধ করছি।

২৭. নিয়েরকাস জানিয়েছেন, যে এখান থেকে একজন গ্যাড্রোসিয় জাহাজ-চালক তাদের নিয়ে গেছিল। তার নাম হাইড্রাসেস (Hydraces)। সে কথা দিয়েছিল যে কারমানিয়া (Carmania) পর্যন্ত তাদের পৌঁছে দেবে, তারপর থেকে রাস্তা খুব দুর্গম নয়, তবে অঞ্চলগুলো তুলনায় পরিচিত, পারস্য উপসাগর পর্যন্ত। মোসারানা থেকে তারা রাত্রিবেলা জাহাজ ছাড়ল, বালোমাস (Balomus)-এর তীরে এসে পৌঁছল সাড়ে সাতশো ষ্ট্যাডিয়া অতিক্রম করে। তারপর আরও চারশো ষ্ট্যাড দূরে একটা গ্রাম পড়বে—বার্ণা (Barna), অনেক খেজুর গাছ আর সুন্দর একটা বাগান আছে এখানে। বাগানে মেহেন্দি ছাড়াও অজস্র ফুল ফোটে, স্থানীয় মানুষ তাই দিয়ে মালা তৈরি করে। এখানে এসে নৌবহরের লোকজন প্রথম বাগান দেখল, যেখানে স্থানীয় মানুষজন গাছ, ফুল আর ফলের গাছ পুঁতেছে, আর গাছপালার সঙ্গে মানুষজনের ব্যবহারও জন্তুজানোয়ারের মতো নয়। তারপরে আরও দুশো স্ট্যাড তারা অতিক্রম করে এসে পৌঁছল ডেনড্রোবোসা (Dendrobasa)-তে; এখানে সমুদ্রে তারা নোঙর ফেলল। আবার যাত্রা শুরু হতে রাত হয়ে গেল, প্রায় মধ্যরাত— প্রায় চারশো ষ্ট্যাডিয়া তারপর গিয়ে পৌঁছল কোফাস (Cophas) বন্দরে; এখানে জেলেরা ছোট ছোট নৌকো নিয়ে যাতায়াত করে। ছোট নৌকা, খুবই ছোট— গ্রীকরা যেভাবে দাঁড়ের সাহায্যে নৌকা চালায়, দাঁড় আটকে রাখার গোঁজ লাগানো থাকে নৌকায়— সেভাবে নয়, বরং নদীতে যেভাবে একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে মাটি কাটার মতো করে এগিয়ে নিয়ে যায়, সেভাবে নৌকাগুলো যাচ্ছিল। বন্দরের জল পরিষ্কার জল। ভোরবেলা, সূর্যের প্রথম রশ্মি দেখতে পাওয়ার পর (first watch, a nautical term) নোঙর তুলল জাহাজের বহর; পৌঁছল এসে সাইজা (Cyiza), প্রায় আটশো ‘ষ্ট্যাডিয়া যাওয়ার পর। ওখানে একটা তীর আছে যেটা খাঁ খাঁ করছে আর প্রবল জলোচ্ছাস। জাহাজগুলো এখানে দাঁড়িয়ে তাদের প্রত্যেকের খাবার আর রসদ সংগ্রহ করে নিল। তারপর পাঁচশ ষ্ট্যাডিয়া সাগর পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছল একটা ছোট শহরে। শহরটা একটা টিলার পাশ দিয়ে যে সমুদ্র গেছে সেই তীরভূমির কাছে।’

নিয়েরকাসের দেখে মনে হল যে এই জায়গাটিতে চাষবাস হয়। তিনি অ্যানেক্সিডোটাসের ছেলে আর্কিয়াসকে ডাকলেন; আর্কিয়াসের বাড়ি পেল্লা (Pella)-তে, সে নিয়েরকাসের সঙ্গে অভিযানে ছিল। ম্যাসিডোনিয়ার এই লোকটিকে নিয়েরকাস বললেন যে, শহরটাকে চমকে দিয়ে খাদ্যবস্তু জোগাড় করতে হবে— না হলে তারা গ্রীকদের রসদ দেবে না। শহরকে বিস্মিত করার দায় পড়ল আর্কিয়াসের উপর। কারণ অবরোধ করে শহরের দখল নিয়ে শস্যভাণ্ডার লুঠ করতে সময় লাগবে, আর তার জন্য রসদে টান পড়বে।

স্থানীয় অঞ্চলের শস্যভাণ্ডার সম্পর্কে তারা খোঁজ পেয়েছিল তীরের কাছে স্তূপ করে রাখা খড়ের গুদাম থেকে, ওই খড়ের মধ্যেই শস্যের অবশেষ বা শেষ অংশ দেখে, তারা ঠিক করল গোটা নৌবহরকে প্রথমে সমুদ্রযাত্রায় পাঠানোর ‘মহড়া’ দেবে। সেই মতো নিয়েরকাস গোটা বহরকে যাত্রা শুরু করার জন্য, যেন সংকেত পাঠাল। আর্কিয়াস সেই নির্দেশ অনুসারে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করল, কিন্তু নিয়েরকাস স্বয়ং একটা মাত্র জাহাজে চেপে সমস্ত বহরের পিছনে থাকল, ধীরে ধীরে একটা জাহাজ শহরের দিকে এগোলো, যেন শহর দেখতে যাচ্ছে!

২৮. শহরের প্রাচীরের কাছে নিয়েরকাসের জাহাজ পৌঁছবার পর স্থানীয় মানুষরা সাদর অভ্যর্থনা জানাল, শহর থেকে বিভিন্ন উপহারের সঙ্গে এলো মাটির পাত্রে টুনা মাছ। কারণ পশ্চিম দিকে এই অঞ্চলের মানুষ মাছ খায়; মৎসভুক মানুষ এখানেই শেষ দেখা যায়; আর একটা ব্যাপার গ্রীকরা লক্ষ্য করেছে— সেটা হল এরা রান্নাবান্নার ব্যাপারটা জানে, তাই খেজুরের সঙ্গে এরা কিছু পিঠে নিয়ে এসেছে অতিথিদের জন্য। নিয়েরকাস জানিয়েছেন যে তাঁরা কৃতজ্ঞচিত্তে উপহার সামগ্রী গ্রহণ করেছেন এবং শহর দেখার জন্য স্থানীয় মানুষদের কাছে অনুমতি চেয়েছেন, অনুমতি পেয়েওছেন। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা শহরের সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন, তৎক্ষণাৎ তিনি দু’জন তীরন্দাজ সেনাকে দরজার মধ্যে দিয়ে যাতায়াতের পথ আটকে দিতে বললেন, আর স্বয়ং নিয়েরকাস, সঙ্গে আরও দুই সেনা আর একজন ‘দোভাষী’ নিয়ে পাঁচিলের একদম উপরে উঠে গেলেন। ওখান থেকে আর্কিয়াসকে সংকেত পাঠালেন। এবার আক্রমণ করার জন্য। আর্কিয়াসের নির্দেশ আর নিয়েরকাসের সঙ্কেত পেয়ে গোটা গ্রীক নৌবহর বিপুল গতিতে শহর-আক্রমণ করল। গ্রীকদের এই যুদ্ধকৌশল দেখে স্থানীয় মানুষজন প্রথমে হতচকিত হয়ে পড়েছিল। পরে ঘোর কেটে যেতে তারা অস্ত্র আনতে ছুটল। দোভাষী তখন চিৎকার করে বলছে, তোমরা গ্রীকদের খাবার চালান দাও, তাহলে তোমরা রক্ষা পাবে; দোভাষীর সঙ্গে নিয়েরকাসও হুমকি দিচ্ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় মানুষ একদিকে চিৎকার করে তাদের শস্য দেবে না বলছিল, অন্যদিকে প্রাচীরের ভিতর থেকে আত্মরক্ষা করছিল বটে, কিন্তু নিয়েরকাসের তীরন্দাজরা তাদের সহজেই ঠেকিয়ে রাখছিল। যখন শহরের লোকেরা দেখল যে আর বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাবে না, শহর নিয়েরকাসের সৈন্যদের অধীনে প্রায় চলে গেছে, তখন তারা আবেদন করতে লাগল যে, নিয়েরকাস যেন তাদের খাদ্যশস্য নিয়ে যায়, আর শহরটাকে মুক্ত করে দেয়, শহর ধ্বংস করে না দেয়। আর্কিয়াসকে নির্দেশ পাঠায় নিয়েরকাস, যেন শহরের দরজা আর পাঁচিলগুলোকে অধিকারে রাখা হয় আর স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে জনাকয়েক গ্রীক সেনা পাঠায়, যেন কোনোমতে তারা ফাঁকি দিকে তাদের শস্য লুকিয়ে রাখতে না পারে। কিন্তু শস্য বা বার্লি খুব বেশি পেল না গ্রীকরা, বরং শুকনো মাছ থেকে তৈরি ময়দা বা ভুট্টা এমনকি ভুট্টাপত্র, যেটা রুচিকর খাদ্য বলে স্থানীয়দের মধ্যে পরিগণিত, সে সমস্তই যথেষ্ট পরিমাণ সংগ্রহ করল। যখন স্থানীয় মানুষদের জিনিসপত্র, বিশেষত খাবার-দাবার তারা দেখল তখন সৈন্যরা সেখান থেকে তাদের পছন্দের রসদ সংগ্রহ করে জাহাজে ফিরল। কাছাকাছি এক শৈল অন্তরীপ, সেখানে নোঙর ফেলল—ওই জায়গাটিকে স্থানীয়রা মনে করে সূর্যের পবিত্র স্থান, অন্তরীপটার নাম বাগিয়া (Bageia)।

২৯. গভীর রাতে আবার যাত্রা শুরু করে, এক হাজার ষ্ট্যাড গিয়ে তারা পৌঁছল আরেকটি বন্দর তালমেনা-তে। নোঙর করার পক্ষে ভালো জায়গা। তারপর আরও চারশো ষ্ট্যাড গেলে ক্যানাসিস (Canasis)। জনমানবশূন্য এক পরিত্যক্ত নগর। সেখানে একটা কুয়ো চোখে পড়ল, যেটা কাটা হয়েছে, মানুষই কটেছে, তার চারপাশে বুনো খেজুরের বন। এই খেজুরগুলোর মজ্জা বা ভিতরের অংশ খেয়ে সেনা আর নাবিকরা পেট ভরাল। সেনাদের রসদে-খাদ্যবস্তুতে টান ধরেছিল। তারা এতটাই খাদ্যের সংকটে ছিল যে, সারা রাত-দিন ধরে নৌকো চালিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা পরিত্যক্ত চড়া অথবা তীরে এসে নোঙর করত, (খাবারের খোঁজে)। নিয়েরকাস আশঙ্কিত হল এই অবস্থা দেখে, ফলে সে তীর থেকে দূরে সমুদ্রে জাহাজ বাঁধতে বলত, পাছে নাবিকরা চড়ায় নেমে আর জাহাজে ফিরে না আসে, খাবারের খোঁজ করতে করতে জাহাজ ফাঁকা করে চলে যায়। এই সম্ভাবনা এড়াবার জন্য।

পরের নোঙর পড়ল ক্যানাটি (Canate) তে। সাড়ে সাতশো ষ্ট্যাড যাওয়ার পর। এখানে সমুদ্রের পাড় আর সরু সরু জলের ধারা প্রায় কাছাকাছি। সেখান থেকে আটশো ষ্ট্যাড দূরে ট্রইয়া (Troea), এখানে এসে জাহাজ দাঁড়াবার পর চোখে পড়ল ছোট ছোট কয়েকটা দরিদ্র গ্রাম। গ্রীকদের ভয়ে বাসিন্দারা পালিয়েছে— অল্প শস্য আর খেজুর ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া গেল না। গ্রামগুলো খুঁজে আর পাওয়া গেল সাতটা উট, স্থানীয় অধিবাসীরা ওই উটগুলোকে ফেলে পালিয়েছিল। সাতটা উটের মাংস নেহাত কম নয়,সেই মাংস দিয়েই ক্ষুধাবৃত্তি হল সেনাদের। পরদিন ভোরে ঊষাকালে নোঙর তুলে তিনশো ষ্ট্যাডিয়া গিয়ে দাগাসেইরা (Dagaseira) পৌঁছল। এখানে কয়েকদল ভবঘুরে থাকে।

এইপথে এগারোশো ষ্ট্যাড গেলে তবে মৎস্যভুকদের দেশ পেরিয়ে আসা যায়। মৎস্যাসীদের দেশ পেরিয়ে যাবার সময় সেনাদল ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েছিল। তারা তীরের কাছে নোঙর না করে, গভীরতর সমুদ্রে করেছিল, কারণ তীরে প্রবল জলোচ্ছ্বাস। এই মৎস্যভুক (Ichthiphagai…) মানুষরা মাছ খেয়েই বেঁচে থাকে, জীবনধারণ করে। যদিও তাদের মধ্যে দু-একজনই গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরে, কারণ তারজন্য নৌকা দরকার। প্রথমত সেইধরনের নৌকা অতি বিরল, পাওয়া যায় না। আর দ্বিতীয়ত গভীর সমুদ্রে গিয়ে, মাছ ধরার কৌশল এদের অজ্ঞাত। সাধারণতঃ এরা তাই ভাঁটার সময় মাছ ধরে। তার জন্য মাছ-ধরার জালের ব্যবস্থা আছে। বেশিরভাগ জাল দুই ষ্ট্যাডিয়া লম্বা (1 Stadion=600 Greek feet, Herodotus; approx)। এই জাল প্রস্তুত করে তালগাছের ছাল থেকে; তন্তুগুলোকে শণের মতো পাকিয়ে পাকিয়ে এই জাল তৈরি হয়। এইবার যখন সমুদ্র তীর থেকে ভাঁটার টানে সরে যায় দূরে, তখন তীরের মাটি বেরিয়ে পড়ে, একটা মাছও সেখানে চোখে পড়ে না, কিন্তু যেখানে মাটিতে খানা-খন্দ আছে, সেখানে জল জমে থাকে। সেই জলে মাছ থাকে। মানুষগুলো সেই গর্তগুলোর উপরে জাল ফেলে মাছ ধরে, তবে সাধারণতঃ ছোট মাছ, যদিও মাঝেমধ্যে বড় মাছও ধরা পড়ে। ছোট মাছগুলো ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে লোকজন খেয়ে ফেলে, কারণ ওদের গা নরম; কিন্তু বড় মাছদের চামড়া শক্ত, অর্থাৎ মোটা— তাদের সূর্যালোকে রেখে শুকিয়ে ফেলতে হয়, সেই শুকনো মাছ পিষে একধরনের চূর্ণ তৈরি হয়, সেই চূর্ণ থেকে রুটি, এমনকি পিঠেও তৈরি করে তারা।

মানুষ, এমনকি গোরু-মোষ বা অন্যান্য গৃহপালিত জন্তুরাও এই রুটি খেয়ে বাঁচে, কারণ এখানে তৃণ বলে কিছু জন্মায় না।

তবে, শুধু মাছ নয়, কাঁকড়া, শামুক আর ঝিনুক, গেঁড়ি-গুগলি সবই এরা ধরে থাকে। এখানে সমুদ্রে প্রাকৃতিক লবণ থেকে তেল তৈরি হয়। এদেশের যে সব প্রান্তে গাছ বা তৃণ জন্মায় না, সেখানে মানুষজন সব মাছ-খেয়েই জীবনধারণ করে, কিন্তু অল্প সংখ্যায় হলেও কিছু মানুষ চাষ করে, ফসল ফলায়— মাছ বা মানুষের খাদ্যের তালিকায় কিছু স্বাদের তারতম্য ঘটে। এখানকার ধনী মানুষ যারা, তারা কুটীর নির্মাণ করে বসবাস করে। কাঠের জায়গায় তার তিমির হাড় দিয়ে বাড়ির কাঠামো তৈরি করে, দরজা তৈরি করে তিমির সবচেয়ে চওড়া হাড় দিয়ে। এই তিমির হাড় তারা সংগ্রহ করে সমুদ্রের পাড়ে মৃত তিমির দেহ থেকে। অন্য মতে, যে কোনো বড় সামুদ্রিক মাছের দেহাংশ নিয়ে তারা গৃহনির্মাণ করে। তবে, যারা তুলনায় গরীব মানুষ, এবং বেশির ভাগ মানুষ কিন্তু মাছের শিরদাঁড়া ব্যবহার করে কুটীর তৈরির জন্য।

৩০. বৃহৎ তিমির দল বহির্সমুদ্রে ঘোরাফেরা করে, আর বড় মাছেরাও— যেগুলো আমাদের ভেতরের দিকের সমুদ্রে পাড়ের কাছে (ভূমধ্যসাগরের কাছে) ঘোরাফেরা করে তাদের থেকে অনেক বড়। নিয়েরকাস বলেছেন, ভোরবেলা যখন তারা সিজা (Cyiza) পেরিয়ে সমুদ্রে এগোচ্ছেন, তখন দেখলেন যে হঠাৎ হঠাৎ সাগরের জল উপরের দিকে জলস্তম্ভের মতো উঠে যাচ্ছে। তারা হতচকিত হয়ে জাহাজের চালকদের কাছে জানতে চাইলেন, এটা কী ব্যাপার আর কী করেই বা হচ্ছে? জাহাজের চালকরা জানালো যে তিমি যখন সমুদ্রে বিচরণ করে তখন তারা এইভাবে জল অনেক উঁচুতে ছুঁড়ে দেয়; কিন্তু নাবিকরা এতটাই হতবাক আর চমকিত হয়েছে যে তাদের হাত থেকে বৈঠা-দাঁড় সব পড়ে গেছে। নিয়েরকাস তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাতে এগিয়ে গেলেন। যখনই কোনো জাহাজকে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, তখন চিৎকার করে তাদের বলছিলেন যে বৈঠার মুখ তিমির দিকে ঘুরিয়ে রণ হুংকারের মতো চিৎকার করতে আর জোরে জোরে জাহাজ চালাতে — যেন যুদ্ধ সমাগত!

এই বক্তব্যে উজ্জীবিত হয়ে চালক আর নাবিকের দল নৌ-সংকেত অনুসারে জাহাজ চালাতে শুরু করল, আর যখন ঐ দৈত্যাকার জন্তুরা সামনে এসে পড়ত, তখন নির্দেশ অনুযায়ী তারা সবাই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করত, জাহাজ থেকে শিঙা (Bugles) বাজাত আর যারা দাঁড় টানত, তারা প্রাণপণে দাঁড় বেয়ে জল উত্তাল করে দিত। তখন যে সব তিমি জাহাজের সামনে এসে পড়ত তারা ঐ প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে ভয় পেয়ে সাগরে ডুব দিত, আবার কিছুক্ষণ বাদে ভেসে উঠত জাহাজের পিছনে বা পাশে, আকাশে তখন আবার জল ছুঁড়ে দিত; নাবিকরা তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠত আর নিয়েরকাসের এই সাহস আর বিচক্ষণতা প্রভূত প্রশংসা লাভ করেছিল।

এই তিমিদের মধ্যে কোনো-কোনো তিমি আবার সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে পৌঁছে যেত, আর যখন ভাঁটার জল সরে যেত, তখন পাড়ের অল্প জলে বা ডাঙ্গার কাছে আটকে যেত, আর সমুদ্রে ফেরা হতো না। তখন তারা মারা যেত আর তাদের মাংস-চামড়া সব সূর্যের তাপে আর দীর্ঘ সময় পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হয়ে যেত— শুধু হাড় পড়ে থাকত স্থানীয় মানুষের জন্য, যা দিয়ে কুটির তৈরি হতো। তিমির পাঁজরের হাড় দিয়ে ঘরের বড় কড়িকাঠ, ছোট হাড় দিয়ে ঘরের বরগা, চোয়ালের হাড় দিয়ে দরজার কাঠামো তৈরি করা হতো। অসুবিধা হতো না। কারণ তিমিগুলো প্রায় দেড়শো ফুট পর্যন্ত লম্বা হতো (২৫ ফ্যাদম, ১ ফ্যাদম —৬ ফুট)।

৩১. যখন নৌবহর মাছ-খেকোদের পাড়ের সীমা পেরিয়ে এগোচ্ছে, তখন তাদের কানে এলো এক জনশ্রুতি! জনশ্রুতি একটা দ্বীপ সম্পর্কে। দ্বীপটা মূল ভূখণ্ডের থেকে সামান্য দূরে, একশ ষ্ট্যাডের মতো—কিন্তু দ্বীপটি জনমানবহীন। স্থানীয় মানুষ বলে এই দ্বীপ সূর্যের পুণ্যভূমি, দ্বীপের নাম নোসালা। কোনো মানুষ সেখানে যেতে চায় না, যায়ও না— তবে যদি কেউ নিজের অজ্ঞাতসারে দ্বীপে গিয়ে পৌঁছয়, তাহলে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। নিয়েরকাস বলেছেন, যে তাঁর নৌবহরের একটা ছোট জাহাজ, ঐ দ্বীপ থেকে অল্প দূরে গিয়ে হারিয়ে যায়— জাহাজের মাল্লারা ছিল মিশরীয়— কিন্তু বহরের অন্যান্য সেনাধ্যক্ষরা বলে দিল যে লোকগুলো জাহাজসুদ্ধ অদৃশ্য হয়ে গেছে, কারণ তারা না জেনে দ্বীপটায় নেমেছিল!

নিয়েরকাস কিন্তু তার পরেও একটা ছোট রণতরী বা গালী-তে তিরিশটা মাল্লা দিয়ে ঐ দ্বীপ পরিক্রমা করে আসতে লোক পাঠাল। নির্দেশ দেওয়া হল যে দ্বীপে না নামলেও, যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে চিৎকার করে, মৃত বা চেনাশোনা কোনো নাবিকের নাম ধরে ডাকবে। এই সমস্ত ডাকাডাকি করে কোনও উত্তর না আসার পর, নিয়েরকাস নিজেই জাহাজে করে দ্বীপে যাওয়া ঠিক করলেন। গররাজি নৌসেনা আর মাল্লাদেরও যেতে হল তার ফলে। নিয়েরকাস দ্বীপে নেমে সমস্ত গুজব আর জনশ্রুতির অবসান ঘটালেন। রূপকথার সমাপ্তি ঘটল।

এই দ্বীপ সম্পর্কে আরও একটা গল্প প্রচলিত আছে, এখানে একজন নেরেইড (Nereid) বা জলপরী থাকে, যদিও এই জলদেবী বা জলপরীর কোনো নাম এখানে বলা হয়নি (গ্রীক পুরাণ অনুসারে নেরেয়ুস আর ডোরিসের কন্যা। পঞ্চাশজন কন্যা আর এক পুত্র নেরাইটিস— জলে বসবাস)। যে সব জাহাজ এই দ্বীপে আসে, তার নাবিকদের এই জলকন্যা খুব দেখভাল করে, ভালো ব্যবহার করে, তারপর তাদের মাছে রূপান্তরিত করে সমুদ্রে ছেড়ে দেয়। এই কাজ দেখে সূর্যদেব একদিন বিরক্ত বোধ করেন, আর নেরেইড-কে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে বলেন; নেরেইড রাজি হয় কিন্তু সূর্যের কাছে প্রার্থনা করে, যেন তার করা পাপ থেকে সে মুক্তি পায়। সূর্য তার এই প্রার্থনা স্বীকার করে নেন। ফলে যে সমস্ত মানুষ তার জন্য মাছ হয়ে সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তারা আবার মানুষে রূপান্তরিত হয়ে যায়, আর সেই থেকে আজ আলেকজান্ডারের সময় পর্যন্ত একটানা সেই মানুষেরা মৎস্যভুক (Lchthqopagi…) হয়ে এখানে বেঁচেবর্তে আছে।

নিয়েরকাস দেখিয়েছেন যে এগুলো সবই রূপকথা, তার বেশি সত্যতা এর মধ্যে নেই, কিন্তু যে পরিশ্রম আর পড়াশোনা কাজে লাগিয়ে একথা প্রমাণ করতে হয়, আমি তার পক্ষপাতী নই।

৩২. এই মৎস্যভোজীদের পেরিয়ে গেলে, ভিতরের দিকে গ্যাড্রেসিয়-রা (Gadrosians) থাকে। তারা যেখানে বসবাস করে সে জায়গাটি বালুকাময় আর দীন-দরিদ্র অঞ্চল; এখানে আলেকজান্ডার আর তার সেনাদল এসে একসময় যে ভোগান্তির মুখে পড়েছিল, আমার অন্য বইয়ে তার বিস্তারিত বিবরণ আছে। কিন্তু নৌবহর যখন মৎসভোজীদের পেরিয়ে গিয়ে কারমানিয়া-তে (Carmania) পৌঁছে নোঙর করল, তখন কিন্তু তাদের পাড়ের থেকে দূরে সমুদ্রের ভিতরে গিয়ে নোঙর করতে হল, কারণ পাড়ে বিক্ষুব্ধ ঢেউ আর অনেকটা দীর্ঘ জায়গা জুড়ে সেই উত্তাল সমুদ্র বিস্তৃত; পাড়ের সমান্তরালে চলে গেছে।

এখান থেকে নৌবহর যাত্রার পথ বদল করল, পশ্চিমে যাত্রা করছিল, এখন জাহাজের মুখ ঘুরল উত্তর আর পশ্চিমের মাঝামাঝি দিকে। কারমানিয়া কিন্তু মৎস্যভুকদের যে অঞ্চল, তার থেকে বেশি গাছপালা আর তৃণগুল্ম সমৃদ্ধ, অনেক বেশি ফল জন্মায় আর এখানে ঘাস আছে, জলসিঞ্চন হওয়ার মতো জলও আছে। ‘বাড়ীস’ (Badis) জায়গাটা কারমেনিয়ার অন্তর্গত— সেখানে কৃষিকাজ করে অনেক গাছ বেড়ে উঠেছে, শুধু অলিভ বা আমলকি গাছ আর ভালো জাতের আঙুর ছাড়া। এখানে ভুট্টা বা অন্য শস্যও জন্মায়। এরপরে তারা আরও আটশ ষ্ট্যাডিয়া যাত্রা করে এক ঊষর অঞ্চলে এসে দাঁড়াল— সেখান থেকে সামনে দেখা যায় এক অন্তরীপ, সমুদ্রের মধ্যে অনেকটা দূর পর্যন্ত প্রসারিত। দেখে মনে হয়, অন্তরীপটা অতিক্রম করতে পুরো একটা দিন লেগে যাবে নৌবহরের। যে সমস্ত নাবিকদের এই অঞ্চল সম্পর্কে ধ্যানধারণা আছে, তারা বলল, যে অন্তরীপটি আরবের মধ্যে পড়ে, নাম ম্যাসেটা (Maceta); সেখান থেকে আসিরিয়-রা দারুচিনি এবং অন্যান্য মশলা আমদানী করে। যে অন্তরীপ তাদের বিপরীত দিকে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের মধ্যে, সেই শিলাদ্বীপ, যেখানে উপসাগর ভিতরের দিকে ঢুকে এসেছে (আমি এবং নিয়েরকাস দুজনেই এ ব্যাপারে একমত), সেটাই লোহিত সাগর বা রেড সী (পক্ষান্তরে ইরিথ্রিয় সাগর)। তারা যখন এই অন্তরীপ দেখল, তখন ওয়ানসাইক্রিটাস (Onesicritus) তাদের সরাসরি ঐ পথ ধরে এগোতে বলল, ফলে উপসাগরের পাড় ধরে ঘুরে ঘুরে আর এগোতে হল না। নিয়েরকাসের অবশ্য ভিন্নমত, তার বক্তব্য হল প্রধান চালক হিসাবে ওয়ানসাইক্রিটাস মূর্খের মতো কাজ করেছেন। আলেকজান্ডার নৌবহরকে সমুদ্রপথে ভ্রমণ করার জন্য পাঠাননি, তিনি পাঠিয়েছিলেন যাত্রাপথের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সংগ্রহ করার জন্য— এমন নয় যে গোটা সেনাদল স্থলপথে অক্ষত থাকত না, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেত! আলেকজান্ডার চেয়েছিলেন জলপথে যেতে যেতে সমস্ত আনুপূর্বিক বিবরণ সংগ্রহ করতে, যাত্রাপথ, জাহাজ নোঙর করার জায়গা, বন্দর, ছোট বা ক্ষুদ্র দ্বীপ, পথে কোনো উপসাগরের খোঁজ মিললে তার খুঁটিনাটি বর্ণনা, সমুদ্রের তীরে যে সমস্ত শহর আছে তাদের বিবরণ, কোন অঞ্চল শস্যশ্যামল আর কোনটাই বা মরুভূমির মতো নিষ্ফলা!

সুতরাং, আলেকজান্ডারের অঙ্গীকার তাদের ভাঙা উচিত হয়নি, যখন তাদের পরিশ্রমসাধ্য যাত্রা প্রায় শেষ হওয়ার পথে, অন্যান্য উপকরণ ও খাদ্যের অভাব মেটানো হয়েছে, বিশেষ করে নৌবহরের জাহাজগুলোয়। নিয়েরকাস-এর ভয় ছিল, যেহেতু অন্তরীপ দক্ষিণদিকে অনেকটা চলে গেছে, সেজন্য হয়তো তারা যে অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছবে, সেটা হয়তো পানীয় জলশূন্য আর সূর্যের প্রচণ্ড দাবদাহে জ্বলছে। এই মতামতের নির্ধারণ করেন যে, বিভিন্ন অভিজ্ঞ মানুষের কথায় বোঝা যাচ্ছে যে ঐখানকার ছেড়ে আসা অঞ্চল মূলতঃ মরুভূমি বা নিষ্ফলা আর পানীয় জলও সেখানে পাওয়া যায় না।

৩৩. পাড়ের এই অংশ থেকে আবার যাত্রা শুরু। তীর ধরে ধরে একদম পাশ দিয়ে এগোনো। প্রায় সাতশ’ ষ্ট্যাডিয়া এইভাবে তীর ধরে এগিয়ে নিওপটানা (Neoptana) বলে একটা জায়গায় এসে পৌঁছনো গেল। পরদিন ভোরবেলা — এবার জাহাজের সারি এগোলো সমুদ্রের দিকে, আর মাত্র একশ ষ্ট্যাডিয়া এগিয়ে এসে পড়ল অ্যামামিস (Anamis) নদীর মুখে, জায়গাটির নাম হারমোজিয়া (Hermozeia)। এখানে পরিবেশ, মানুষজন বন্ধুত্বপূর্ণ, সমস্ত রকমের ফল এখানে জন্মায়, শুধু জলপাই ছাড়া। জলপাই বা অলিভের গাছ এখানে জন্মায় না। এখানে সবাই জাহাজ থেকে নেমে পড়ল— একটু বিশ্রাম দরকার। তারা স্মরণ করছিল সমুদ্রযাত্রার তাদের যে বিপদ পদে পদে এসেছে তার কথা, যেমন মৎসাসীদের দেশে, তাদের তীরভূমিতে, স্মরণ করছিল। পুরো পথটার মধ্যে মাঝে মাঝে যে নির্জনতা তাদের গ্রাস করছিল সেই ঊষরস্থানের নিরানন্দ মুহূর্তগুলোর কথা, বিভিন্ন জাতির মানুষ আর তাদের পাশবিক প্রবৃত্তির কথা। মনে পড়ছিল, নিজেদেরে অভাব-অভিযোগের কথা।

পাড়ে নেমে কেউ কেউ ভিতরে ঢুকে গেছিল, স্থলের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট গোষ্ঠিতে ভাগ হয়ে— মূল দল ছেড়ে।

সেখানে একজনের সঙ্গে তাদের দেখা হল। লোকটা গ্রীক পোশাক পড়া আর গ্রীক ভাষাতেই কথা বলছিল। লোকটিকে যারা প্রথম দেখেছিল তারা আবেগে কেঁদে ফেলল— এতদিন পরে সমস্ত কষ্ট স্বীকার করার পর একজন গ্রীক নাগরিকের সঙ্গে দেখা হল— এ যেন অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তারপর তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল, যে তার পরিচয় কী? সে উত্তরে জানাল, আলেকজান্ডারের দল থেকে সে আলাদা হয়ে পড়েছে। আলেকজান্ডার বা তাঁর সেনাছাউনি খুব বেশি দূরে নেই বলে সে জানাল। প্রচুর চিৎকার-চেঁচামেচি করে আর তালি বাজাতে বাজাতে সেনাদল লোকটিকে নিয়েরকাসের কাছে নিয়ে এলো। সে সমস্ত ঘটনা আনুপূর্বক নিয়েরকাসকে বলল। সে আরো জানাল যে এখানকার রাজা তাঁর ছাউনিতে আছেন। এখন, আর সেই ছাউনি তীর থেকে পাঁচদিনের স্থলযাত্রা। সে কথা দিল, নিয়েরকাসের সঙ্গে এখানকার প্রশাসকের (Governor) দেখা করিয়ে দেবে। করলেও তাই। নিয়েরকাস লোকটির পরামর্শমতোই স্থলপথে কীভাবে রাজার সঙ্গে দেখা করা হবে তার ব্যবস্থা করলেন। তারপর তিনি জাহাজে ফিরে গেলেন, রাত কেটে গেলে, ভোর হওয়ার পর তিনি জাহাজগুলোকে পাড়ে এনে তাদের প্রয়োজনীয় সারাই বা মেরামতের কাজ, যেগুলো সাগরে পাড়ি দিতে গিয়ে দরকার হয়ে পড়েছে, সেগুলো করে নিতে বললেন। সৈন্যদের বড় অংশ সেখানে রেখে গেলেন। দুটো বেড়া, খুঁটি পুঁতে যেখানে জাহাজগুলো রাখা হয়েছে সেখানে তৈরি করা হল। নদীর পাড় থেকে সমুদ্রের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত একটা মাটির দেওয়াল আর গভীর পরিখাত তৈরি করালেন, যেখানে সমস্ত জাহাজ রাখা আছে সেই জায়গা ঘিরে।

৩৪. নিয়েরকাস যখন এইসব কাজকর্মে ব্যস্ত, তখন প্রশাসক (Governor) ভদ্রলোক ভাবছেন অন্য কথা। তিনি শুনেছেন, আলেকজান্ডার এই অভিযান নিয়ে চিন্তা আর উদ্বেগের মধ্যে আছেন, ফলে নিয়েরকাস যে এখন স্থানীয় রাজার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন আর তিনি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিরাপদ— এই কথা যদি তিনি প্রথম সম্রাটের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন তাহলে আলেকজান্ডার অবশ্যই তাকে প্রচুর পুরস্কার দেবেন। তিনি সেজন্য সবচেয়ে ছোট রাস্তাটা ধরে তাড়াতাড়ি আলেকজান্ডারের কাছে পৌঁছলেন আর বললেন, ‘হে সম্রাট, নিয়েরকাস এসে গেছে, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আর সামান্য সময়ের মধ্যে পৌঁছবে।’ সংবাদ শুনে আলেকজান্ডার খুশি হলেন বটে কিন্তু সম্পূর্ণ বিশ্বাস করলেন না। কারণ, তিনি তাঁর নিজের সূত্র ধরে কোনো খবর পাননি— আবার লোক পাঠালেন বটে কিন্তু লাভ হল না। দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে, তাঁর উদ্বেগ বাড়ছে অথচ ভালো কোনো খবর আসছে না। নিয়েরকাসকে খুঁজতে এবং প্রহরী দিয়ে নিয়ে আসার জন্য সম্রাট একের পর এক দল পাঠাচ্ছেন, কিন্তু হয় তারা পৌঁছতে পারছে না, নয় গোটা দল আর ফিরে আসছে না। ফলে সম্রাট আদেশ দিলেন যে মিথ্যা বলার জন্য লোকটাকে বন্দি করো। আরও অপরাধ হলো, যে লোকটা অযথা একটা ‘মিথ্যা আনন্দের’ পরিবেশ তৈরি করেছিল সেজন্য— আলেকজান্ডারকে এক নজর দেখলে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি কতটা শোকাভিভূত। এর মধ্যে যে সমস্ত অশ্বারোহী আর রথারূঢ় লোকজন নিয়েরকাসকে খুঁজতে বেরিয়েছিল তারা পথে নিয়েরকাস, আর্কিয়াস আর তাদের পাঁচ – ছয়জন সঙ্গীকে দেখতে পেল — এই দলটা নিয়েরকাসের সঙ্গে সমুদ্র থেকে দূরে স্থলভাগের ভিতরে গিয়েছিল। যদিও তারা নিয়েরকাস বা আর্কিয়াস, কারোকেই চিনতে পারেনি— তাদের একদম অন্যরকম মনে হচ্ছিল। লম্বা লম্বা চুল, সমুদ্রের লবণাক্ত জল তাদের গায়ের রঙ পাল্টে দিয়েছে আর এই যাত্রাপথ তাদের বিশীর্ণ ও বিশুষ্ক করেছে, বিনিদ্রায় তারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে; আরও অজস্র পীড়া যা এই দীর্ঘ যাত্রা জুড়ে তাদের সঙ্গী হয়েছে— তা সত্ত্বেও ঐ অশ্বারোহী আর রথারোহীদের কাছে তারা জিজ্ঞাসা করেছে—’আলেকজান্ডার কোথায় আছেন, বা কোথায় থাকতে পারেন?’— অনুসন্ধানকারী দল উত্তর দিল, যেভাবে স্থানীয় মানুষ জিজ্ঞাসা করলে তারা উত্তর দেয় সেভাবে, আর সামনে এগোতে শুরু করল। আর্কিয়াসের মাথায় তখন বুদ্ধি এলো, সে নিয়েরকাসকে বলল, ‘দেখো নিয়েরকাস, এই যে লোকগুলো যারা আমাদের রাস্তা ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে আর এই জনমানবহীন অঞ্চলে, ওরা নিশ্চয়ই আমাদের খোঁজেই এসেছে, তার জন্যেই ওদের পাঠানো হয়েছে। ওরা যে আমাদের চিনতে পারেনি, তার জন্য আমি অবাক হইনি, এই দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় সত্যি আমাদের চিনতে পারা কঠিন। চলো আমরা ওদের কাছে পরিচয় দিই, আর জিজ্ঞাসা করি, কী কারণে ওরা এখানে এসেছে।’

নিয়েরকাস মত দিলেন, আর তাঁর সঙ্গীরা দলটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তারা কোথায় যাচ্ছেন। আর কি জন্যেই বা যাচ্ছেন? দল থেকে উত্তর এলো, ‘নিয়েরকাস আর তাঁর নৌসেনাদের খুঁজতে যাচ্ছি আমরা।’

‘আমি নিয়েরকাস, আর এই হল আর্কিয়াস। তোমরা আমাদের নিয়ে চলো, আলেকজান্ডারকে আমরা অভিযাত্রীদলের কাহিনী আর তার পূর্ণ বিবরণ জানাব।’

৩৫. সৈন্যরা, এই কথা শুনে, তাদের শকটে তুলে নিল আর যে পথে এসেছিল, সে পথেই ফিরে চলল। তাদের মধ্যে উত্তেজনা বশে কেউ কেউ আগেই সম্রাটের কাছে ভালো খবরটা দেবার জন্য দৌড়ল— ‘হে সম্রাট, আপনার কাছে নিয়েরকাস, আর্কিয়াস আর পাঁচ সৈনিক আসছে। আপনার দর্শনলাভের জন্য।’ আলেকজান্ডার এই দূতদের মুখে তাঁর বাকি সৈন্যদলের কোনো খবর পেলেন না, এই কয়েকজনের খবর ছাড়া; ফলে তিনি যে খুব আনন্দিত হয়ে উঠবেন, তা হল না, তিনি ভাবলেন এরা কয়েকজন দৈবক্রমে বেঁচে গেছে, বাকি সৈন্যদল পথে বা পরিক্রমায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ফলে তিনি নিয়েরকাস আর আর্কিয়াসের ফিরে আসার খবরে যতটা খুশি হলেন, তার থেকে বেশি দুঃখিত হলেন সেনাদলটিকে দেখতে না পেয়ে। দূতের মুখে, সেনার মুখে এই খবর শোনার মধ্যেই নিয়েরকাস আর আর্কিয়াস এসে পড়ল আলেকজান্ডারের কাছে, এদের চিনতে সম্রাটের খুবই কষ্ট হলো, অত বড় বড় চুল আর তাদের শীর্ণ চেহারা, পোশাক-আশাকের অবস্থা দেখে তিনি এটাও বুঝলেন যে বাকি দলটার কী হয়েছে বা হতে পারে? আলেকজান্ডার নিয়েরকাসকে তাঁর দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে সম্মান জানালেন, তারপর দেহরক্ষী ও অন্যান্য অমাত্যদের চোখের আড়ালে নিয়েরকাসকে নিয়ে এসে, তার সামনে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলেন — তারপর কান্না থামিয়ে তাঁকে সেনাবাহিনীর নিশ্চিহ্ন হওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি আর আর্কিয়াস ফিরে এসেছ, কিন্তু বাকি সৈন্যবাহিনী নিশ্চিহ্ন হওয়ার সংবাদ আমার মেজাজ আর মানসিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করেছে, এখন আমি জানতে চাইছি— কী করে এই বিপর্যয় হল, আমাকে বল।’

‘হে সম্রাট, আপনার সৈন্য আর নৌবহর দুটোই নিরাপদে আছে। এই কথা জানাতেই আমরা আপনার কাছে এসেছি।’ নিয়েরকাসের এই কথা শুনে আলেকজান্ডারের চোখে আবার জল এসে গেল। তবে এবার আনন্দাশ্রু— সবাই ভালো আছে, নিরাপদে আছে এটা শুনে তার একটু বেশি ভালো খবর বলেই বোধ হয়েছিল। তারপর কান্না থামলে নিয়েরকাসকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওরা সব কোথায় আছে?’

‘আছে আনামিস (Anamis) নদীর মুখে, জাহাজগুলোকে সারাই করার কাজ চলছে।’

আলেকজান্ডার এরপর দেবরাজ জিউস এবং লিবিয়ার দেবতা আমোনকে স্মরণ করলেন। সমস্ত এশিয়া জয় করে তাঁর যা আনন্দ হয়েছিল, এই সেনাদলের নিশ্চিহ্ন হওয়ার সংবাদ শুনে তিনি তার চেয়ে বেশি শোকাহত হয়েছিলেন, তাই ওই সংবাদ ঠিক নয় শুনে তিনি খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন।

৩৬. অঞ্চলের প্রশাসক, যাকে আলেকজান্ডার ভুল আর মিথ্যা সংবাদ দেওয়ার জন্য গ্রেফতার করেছিলেন, সেই লোকটি নিয়েরকাসকে দেখে, তাঁর পায়ে পড়ে গেলঃ

‘আমার দুর্গতি দেখো’, লোকটি বলল, ‘আমি প্রথম তোমার নিরাপদে পৌঁছনোর খবর আলেকজান্ডারকে দিয়েছিলাম। আর আজ আমার অবস্থা দেখো।’ সব শুনে নিয়েরকাস লোকটির জন্য আলেকজান্ডারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। লোকটি মুক্ত হল।

বিশাল সৈন্যবাহিনী আর নিয়েরকাসের নিরাপদে ফিরে আসার জন্য মঙ্গলকামনা করে আলেকজান্ডার পুজো দেন এবং উৎসর্গ করেন দেবরাজ জিউস, যিনি রক্ষাকর্ত্তা সমস্ত বিপদের হাত থেকে, পূজা দেন হেরাক্লিসকে, অ্যাপোলো যিনি সমস্ত অশুভ শক্তিকে বিনাশ করেন, সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন ও অন্য সমস্ত সাগরের দেবতাদের। শরীরচর্চা, কুস্তি এবং অন্যান্য খেলাধুলো আর শিল্পকলার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন আলেকজান্ডার একই সঙ্গে, আর ব্যবস্থা করেন এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার যার পুরোভাগে প্রথম সারিতে ছিলেন নিয়েরকাস। ফুল আর রঙিন ফিতা বর্ষিত হয় নিয়েরকাসের উপর।

শোভাযাত্রা শেষ হওয়ার পর আলেকজান্ডার নিয়েরকাসকে ডেকে বললেন, ‘তোমাকে আর এই দুর্গতি সহ্য করতে হবে না, জীবনের ঝুঁকিও নিতে হবে না, আমি অন্য কোনো নৌসেনাপতিকে পাঠাচ্ছি সে সুসা (Susa) পর্যন্ত নৌবহরকে টেনে নিয়ে আসবে।’ নিয়েরকাস সম্রাটের আদেশ শুনে বললেন, ‘হে সম্রাট, আমি আপনার সমস্ত নির্দেশ মানতে বাধ্য, কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে একটামাত্র অনুগ্রহ চাইছি— আপনি দয়া করে আপনার এই নির্দেশ থেকে নিজেকে বিরত রাখুন, আমাকে ওই নৌবাহিনীর সেনাপতি রেখে যাত্রাটা শেষ করতে দিন, যাতে আমি সুসা-তে এসে যাত্রা শেষ করতে পারি। কেউ যেন একথা বলতে না পারে যে কঠিন যাত্রাপথে, আপনি যাকে দায়িত্ব দিলেন বহু দুঃসাহসিক ঘটনা আর বিপদের মোকাবিলা করে সে যখন এতদূর পৌঁছে গেল, আপনি তখন তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করলেন। কৃতিত্বের দাবীদার হল আরেকটি মানুষ; অথচ যে এতটা পথ অনেক কষ্ট সহ্য করে অতিক্রম করে এলো, সে নয়।’

আলেকজান্ডার আরেকবার কথাটা ভেবে দেখলেন, তারপর নিয়েরকাসের কথাটাই মেনে নিয়ে তাকে বললেন এগোও! এবার তার সঙ্গে একটা সৈন্যদলও পাঠালনে, তার নিরাপত্তার জন্য। তবে দলটা ছোট ছিল, কারণ এখন যে অঞ্চল দিয়ে জাহাজগুলো আসবে, সে সব অঞ্চল আর বিপজ্জনক নয়, বন্ধু অঞ্চল।

যদিও নিয়েরকাসের সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া এরপরও নিরুদ্বিগ্ন হয়নি; স্থানীয় অঞ্চলে নতুন ক্ষত্রপ বা শাসক বসিয়েছিলেন আলেকজান্ডার; তাঁর নির্দেশে ঐ অঞ্চলের শাসনকর্তার মৃত্যু বরণ করতে হয়েছিল, নতুন উত্তরাধিকারী শাসন চালাচ্ছিলেন। কিন্তু কারমানিয়া (Carmania) অঞ্চলের শক্ত ঘাঁটি কিছু তখনও স্থানীয় মানুষদের দখলে ছিল। তেপোলেমাস (Tlepolemus) তখনও রাজ্যের উপর পুরো অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে প্রতিদিন কমপক্ষে দু-বার, কোনো কোনো দিন তিনবার পর্যন্ত মুখোমুখি হতে হতো, আর তখন সময় নষ্ট না করে সাগরের তীরে পৌঁছে গেলে তারা নিরাপদ বোধ করত। নিয়েরকাস এরপর দেবরাজ জিউসকে পূজা দিল এবং উৎসর্গ করল। আর একটি মল্লক্রীড়া এবং খেলাধূলার অনুষ্ঠানের আয়োজন করল।

৩৭. নিয়েরকাস সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষ করে নিয়ে নোঙর তুললেন। জনমানবহীন একটা দ্বীপ আর অশান্ত সমুদ্র পেরিয়ে তারা এবার একটা বড় দ্বীপে এসে নোঙর করলেন। প্রায় তিনশ ষ্ট্যাডিয়া পেরিয়ে এই দ্বীপ; লোকজন বসবাস করে। এই তিনশ ষ্ট্যাডিয়া দূরত্ব হল যেখান থেকে তারা যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেখান থেকে। এর মধ্যে যে জনমানবহীন দ্বীপ পেরিয়ে এসেছেন তার নাম ‘অরগানা’ (Organa), আর যেখানে এসে নোঙর করলেন, সেই দ্বীপের নাম ‘ওয়ারাকটা’ (Oaracta)। আঙুর, খেজুর আর শস্যদানা এখানে উৎপন্ন হয়। দ্বীপের দৈর্ঘ্য আটশ ষ্ট্যাডিয়া।

দ্বীপের প্রশাসক মেজিনেস (Mazenes) তাদের সঙ্গে এলেন সুসা পর্যন্ত স্বেচ্ছায়, জাহাজের দিক-নির্দেশক এবং চালক হিসাবে। স্থানীয় মানুষ বলে এখানে এই অঞ্চলের প্রথম যিনি প্রধান ছিলেন, তাঁর সমাধি রয়েছে এখানেই। নাম ছিল ইরিথ্রিয় (Erythres)। তাঁর নাম থেকে সমুদ্রের নাম হয়েছে ইরিথ্রিস সাগর (Erythreau Sea)। সেখান থেকে নোঙর তুলে আবার সমুদ্রপথে এগোনো, দুইশত ষ্ট্যাড অতিক্রম করে ওই একই দ্বীপের। তারপর আবার একটি দ্বীপ পড়ল, বড় দ্বীপটির থেকে মাত্র চল্লিশ ষ্ট্যাডিয়া এগিয়ে। তবে বলা হয় যে এটি সমুদ্র দেবতা পোসাইডন-এর পবিত্র স্থান, কোনো মানুষের পায়ের ছাপ এখানে পড়া বারণ। ভোরবেলা যখন তারা আবার জাহাজ নিয়ে এগোলো, তখন এমন ভাঁটার টান যে তিনটে জাহাজ সোজা ডাঙ্গায় উঠে আটকে গেল। বাকি জাহাজগুলো সমুদ্রতরঙ্গের উপর দিয়ে গিয়ে কোনোভাবে মাঝসমুদ্রে পৌঁছলো। আটকে পড়া জাহাজগুলো অবশ্য পরবর্তী জোয়ার-এর সময় ভেসে মাঝসমুদ্রে চলে এলো আর পরদিন গিয়ে গোটা বহরের সঙ্গে মিলল। মূল ভূখণ্ড থেকে তিনশ ষ্ট্যাডিয়া দূরে আরেকটি দ্বীপ, সেখানে পৌঁছতে এখান থেকে চারশ ষ্ট্যাডিয়া যেতে হল। তার পরদিন প্রায় ভোরবেলা তারা নৌবহর নিয়ে বেরোনো, বন্দরের দিকে একটা জনবসতিহীন মরুদ্বীপ— পাইলোরা (Pylora)। তারপর সিসিডোনা (Sisidona), এক নির্জন শহরতলী, শুধু জল আর মাছ ছাড়া কিছু নেই; স্থানীয় মানুষ মাছ খেয়েই বাঁচে, এই নিরানন্দ অঞ্চলে আর কিছু জোটে না। এরপরে জলের রাজত্ব, টারসিয়াস (Tarsias) অন্তরীপ, সোজা সমুদ্রের মধ্যে চলে গেছে, তিনশ ষ্ট্যাডিয়া যাত্রা করার পর। এরপর আরো তিনশ ষ্ট্যাডিয়া গেলে পাবে আর এক জনশূন্য দ্বীপ— ক্যাটাইয়া (Cataea), প্রেমের দেবী আফ্রোডাইট (Aphodite) আর বার্তাবাহক দেবতা হারমিস-এর (Hermes) পবিত্র স্থান এই দ্বীপ। তিনশ ষ্ট্যাডিয়া নৌপথ! প্রতি বছর স্থানীয় মানুষ ভেড়া আর ছাগল পাঠাতো দ্বীপে, দুই দেব-দেবীকে উৎসর্গ করে, সেই জন্তুগুলো দেখা যায়, বন্য হয়ে উঠেছে। সময় আর অনুর্বর জমি, এই পরিবেশ তার জন্য দায়ী।

৩৮. কারমানিয়া এই পর্যন্ত বিস্তৃত, তারপর শুরু হয়েছে পারস্য। কারমানিয়া সমুদ্রতীর ধরে এই যাত্রা তিন হাজার সাতশ ষ্ট্যাডিয়া। স্থানীয় মানুষজন পারসিকদের মতো জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, যুদ্ধে সজ্জিত হয় পারসিকদের মতো করে; তারা তো পারসকিদেরই প্রতিবেশী। এখান থেকে বেরিয়ে গ্রীকরা এগোলো পারস্যের অধিকৃত অঞ্চল ধরে; পবিত্র দ্বীপ থেকে এসে পৌঁছল একটি বন্দরে, বন্দরটি তৈরি হয়েছে ছোট্ট এক মরুদ্বীপের মধ্যে, ইলাস বা ইয়াস (Ilas/Eas) নামের এই অঞ্চলে বন্দরটির নাম সেকানড্রাস (Cecandrus)। চারশ ষ্ট্যাডিয়া দীর্ঘ যাত্রাপথ। ভোরবেলা তারা আবার যাত্রা করল আরেকটি দ্বীপের দিকে, এখানে লোকজন আছে, জাহাজগুলোকে বন্দরে বেঁধে তারা এগোলো দ্বীপের ভিতরে। নিয়েরকাস বলেছেন, এখানে ভারত মহাসাগরের মতোই মুক্তো তোলা হয় সমুদ্রের জল থেকে। দ্বীপের প্রান্তসীমা ধরে চল্লিশ ষ্ট্যাডিয়া জাহাজ চালিয়ে এসে তারা নোঙর করল। পরের নোঙর ফেলল এসে এক উঁচু পাহাড়ের সমীপে; নাম— ওকাস (Ochus), এটা নিরাপদ একটি বন্দর, পাড়ে সমস্ত জেলরে দল মাছ ধরছে। তারপর আরও চারশ পঞ্চাশ ষ্ট্যাডিয়া গেলে অ্যাপোসটানা (Apostana) পড়ল; অনেক ডিঙি ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিকে-ওদিকে; সমুদ্র থেকে ষাট ষ্ট্যাডিয়া দূরে একটা গ্রাম আছে। রাত্রে এখান থেকে রওনা হয়ে তারা একটা উপসাগরে এসে পড়ল, যে উপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে বহু গ্রাম আছে। যে দূরত্ব তারা পেরিয়ে এসেছে, সেটা চারশ ষ্ট্যাডিয়া। তারা এবার নোঙর ফেলল একটা পাহাড়ের নিচে এসে, যেখানে পাম-গাছ জন্মায়, আর জন্মায় গ্রীসে পাওয়া যায় যে সব গাছ, সেই সমস্ত গাছপালা। এখান থেকে তীর ধরে প্রায় ছশ ষ্ট্যাডিয়া গেলে গোগানা (Gogana) বলে একটা অঞ্চল পড়ে, লোকজনের বসবাস আছে এখানে, সেখানে এসে তারা এরিয়ন (Areon) নামে একটি পাহাড়ী নদীর মুখে নোঙর করল। নদী বর্ষায় জলে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। ওখানে নোঙর করা মুশকিল, কারণ নদীর মুখটা সংকীর্ণ আর ভাঁটার চারদিকে অগভীর চড়া জেগে ওঠে। ফলে এখান থেকে নোঙর তুলে আটশ ষ্ট্যাডিয়া গিয়ে আরেকটা নদীর মুখে জাহাজ বাঁধল। নদীর নাম সিতাকাস (Sitacus)। এখানেও ভালো জায়গা পেল না নোঙর করার জন্য। সত্যি বলতে, পারস্য দেশ জুড়ে যে সমুদ্রযাত্রা, সেটা অগভীর চড়া, সমুদ্রের ফেনিল আর বিপুল তরঙ্গমালা এবং অগভীর হ্রদে পূর্ণ। এখানে তারা খাদ্যশস্যের একটা বড় জোগান পেয়ে গেল, রাজার নির্দেশেই জোগানটা এলো— তারা মোট একুশটা দিন এখানে ছিল। জাহাজগুলোকে প্রয়োজন মতো সারিয়ে নিল, অন্যগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে যথাযথ অবস্থায় নিয়ে এলো।

৩৯. তারপর আবার যাত্রা শুরু করে তারা। এসে পৌঁছয় হাইয়ারেটিস (Hieratis) শহরে, এখানে অনেক লোকজন বসবাস করে। দূরত্ব পেরিয়ে এলো প্রায় সাড়ে সাতশ ষ্ট্যাডিয়া, এসে নোঙর করল যেখানে সেটা একটা খাল, নদী থেকে সেখানে জল এসে জমা হয়, আর সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। নাম হেরাটেমিস (Heratemis)। সূর্য ওঠার পর তারা যাত্রা করল, আর খানিকক্ষণ পরে পাহাড়ী নদীর তীব্র স্রোতে এসে পড়ল। নদীটার নাম পাডাগ্রণ (Padagron)। এখানে এসে গোটা অঞ্চল এক উপদ্বীপে পরিণত হয়েছে (উপদ্বীপ মানে এক বৃহৎ অঞ্চল, যার তিনদিক জলে ঘেরা; ভারতীয় উপদ্বীপ যেমন।) এই জায়গায় অনেক বাগান আছে, যে বাগানে সমস্ত ফলের গাছ পাবে। জায়গাটির নাম মেসামব্রিয়া (Mesambria)। কিন্তু মেসামব্রিয়া থেকে বেরিয়ে দুশ ষ্ট্যাডিয়া গেলে তারা এসে দাঁড়ায় গ্রানিস (Granis) নদীর উপর টাওসি (Taoce) নামের জায়গাটিতে। এখান থেকে দুশ ষ্ট্যাডিয়া দূরে, নদীর মুখ থেকে ভিতরের দিকে, পারস্যের রাজকীয় প্রাসাদ। এই পথে যেতে যেতে নিয়েরকাস একটা তিমি দেখতে পান, পাড়ের কাছে আটকে পড়েছে, নিরুপায় ও অসহায় অবস্থায়। নাবিকদের মধ্যে কেউ তিমিটাকে পার হয়ে যাওয়ার সময় মেপে দেখেছে প্রায় নব্বই কিউবিট (1 cubit = 18 inches to 21 inches), চামড়া খসখসে আঁশযুক্ত, আর এক কিউবিট স্থূল; আর শরীরে অনেক সামুদ্রিক আগাছা, ঝিনুক, শামুক লেগে রয়েছে বা জন্মেছে। নিয়েরকাস বলেছেন, তিমির পাশে তারা অনেক শুশুক (dolphin) ঘুরতে দেখেছেন, যেগুলো ভূমধ্যসাগরের শুশুকদের চেয়ে বড় আকারের।

এবার তারা এসে পৌঁছল রোগোনিস-এ (Rogonis) রোগোনিস একটা পাহাড়ী নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে বর্ষায়। এখানে একটা চমৎকার বন্দর আছে, সেখানে নোঙর করল নৌবহর। দুইশ ষ্ট্যাডিয়া সাগর পেরিয়ে এসে বন্দরটা পেল তারা। তারপর আরও চারশ ষ্ট্যাডিয়া নোঙর তুলে যাত্রা করল নৌবহর; এসে পৌঁছল আবার এক পাহাড়ী নদীর পাড়ে, নাম ব্রিজানা (Brizana), এখানে ক্যাম্প করে নেমে এলো সৈন্যদল, নাবিকরা। জাহাজ ঠিকঠাক করা হল। তবে জাহাজ বাঁধার পক্ষে মুশকিল এই জায়গাটা, চড়া আর অগভীর সমুদ্র, পাড়ের কাছে সমুদ্রের মধ্যে টিলা আর পাথর— মাথাগুলো এখান থেকেই দেখা যায়। যখন জোয়ার আসে তখন জাহাজে যাওয়া-আসা করতে পারে, কিন্তু ভাঁটার সময় জাহাজ চলাচল করতে পারে না, আটকে থাকে। আবার জোয়ার আসলে তারা বেরিয়ে পড়ে, এসে পৌঁছয় ওরোয়াটিস (Oroatis) নদীর নদীতে। নিয়েরকাসের মতে, এই পাড় ধরে যত নদ-নদী সমুদ্রে এসে মিশেছে, তার মধ্যে এটা সর্ববৃহৎ।

৪০. পারসিকদের বসবাস এই পর্যন্ত, এরপর সুসিয়রা (Susiora), থাকে (যারা Susa অঞ্চলের অধিবাসী)। সুসিয়দের উপরের দিকে বাস করে একটি স্বাধীন উপজাতি, উক্সিয় (Uxiaus)। আমার আগের লেখা ইতিহাসের বিবরণে আমি এদের ‘দস্যু’ বলেছি। পারস্য জুড়ে যে তীরভূমি, সেই তীর ধরে চার হাজার চারশ ষ্ট্যাডিয়ন পথ অতিক্রম করে তারা এসেছে।

পারস্য দেশ তিনটে জলবায়ু অঞ্চলে বিভক্ত। যে অঞ্চল লোহিত সাগর সন্নিহিত তার আবহাওয়া শুকনো, বালুকাময় আর অনুর্বর, এই জলবায়ু, এলাকার উত্তাপজনিত। এর পরে যে অংশ উত্তরের দিকে, সেখানে জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ, দেশ জুড়ে প্রচুর ঘাস, তৃণভূমি আর ফল উৎপন্ন হয়। শুধু অলিভ বা জলপাই ছাড়া; সমস্ত রকমের বাগানের চাষ হয় এখানে, পরিশুদ্ধ জল নদী থেকে প্রবাহিত হয়। হ্রদও আছে এখানে, পাখিরা এই নদী আর হ্রদে বসবাস করে, উড়ে বেড়ায় বহু সংখ্যায়; ঘোড়া এবং অন্যান্য গৃহপালিত জন্তুর চারণভূমি, অরণ্য আছে আর সেই অরণ্যে আছে অনেক বন্য জন্তুর দল। এর পরের অংশ, আরও উত্তরে—তুষারাবৃত আর ঝোড়ো হাওয়া বইছে নিরন্তর।

নিয়েরকাস এখানে আমাদের একটা আশ্চর্য কথা বলেছেন। কিন্তু কারণ আছে। তিনি কৃষ্ণসাগরের পাশাপাশি অঞ্চল থেকে পাঠানো কয়েকজন দূতের কথা বলেছেন, যাঁরা পারস্য পেরিয়ে আলেকজান্ডারের কাছে অসম্ভব কম সময়ের মধ্যে পৌঁছে গেছে এবং সম্রাটকে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে তাদের এই স্বল্প সময়ে পৌঁছবার কারণঃ

আমি বলেছি, সুসিয়দের নিকটতম প্রতিবেশী হল উক্সিয়রা; যেরকম মার্ডিয়রাও (Mardiars), দস্যু প্রকৃতির, তারা পারসিকদের প্রতিবেশী, আর কোসিওরা থাকে মিড-দের পাশে (Cossaears) ও (Medes)। এই সমস্ত জাতি এখন আলেকজান্ডারের অধীনে। শীতকালে যখন এরা নিশ্চিন্তে থাকে যে, এখন কেউ আক্রমণ করবে না, ঠিক তখনই আলেকজান্ডার আক্রমণ চালিয়ে তাদের পরাভূত করেন। তিনি তারপর নগর প্রতিষ্ঠা করেন, যার ফলে যাযাবর জাতিরা সমস্ত চাষবাস আর কৃষিকাজ শুরু করে। ফলে চাষের জমি আর শস্য, এই সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি হওয়ার জন্য একে অপরকে আক্রমণ করতে যায় না। তাদের শাসনকর্ত্তা ও নিয়োগ করা হয়েছে এই কারণে, ওরোয়াটিস (Oroatis) থেকে নৌবহর ছাড়ল, ফলে সুসিয় অঞ্চলও ছেড়ে গেল। পরবর্তী যাত্রা সম্পর্কে নিয়েরকাস বলেছেন, তিনি বিগত যাত্রাপথের মতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আর দিতে পারছেন না। শুধু যে সমস্ত পোতাশ্রয় বা আশ্রয়স্থলে বহর গেছে আর যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গা পর্যন্ত— এইটুকু দিতে পারবেন। কারণ এখানকার অধিকাংশ অঞ্চল জলাভূমিতে ঢাকা, সমুদ্র বিক্ষুব্ধ, তীরে নোঙর ফেলা বিপজ্জনক; ফলে বাকি পথ যেতে হবে সমুদ্রের গভীর দিয়ে। ফলে তারা বেরোল বটে নদীর মুখ থেকে, যে নদীর মুখে তারা নোঙর করেছিল, কিন্তু পারস্য সীমান্ত থেকে এই যাত্রাপথে তারা পাঁচদিনের খাবার জল নিয়ে নিল। জাহাজের চালকরা বলেছিল যে আর খাবার জল এখানে পাবেন না।

৪১. পাঁচশ ষ্ট্যাডিয়া জাহাজ চালিয়ে আসার পর তারা একটা হ্রদের মুখে এসে নোঙর করল। জায়গাটা মাছে পরিপূর্ণ, নাম কাটাডারবিস (Cataderbis) মুখে একটা ছোট দ্বীপ আছে, নাম মারগাসটানা (Margasta)। ভোরবেলা তারা যখন যাত্রা করতে বেরোল তখন একটা জাহাজের পর আরেকটা জাহাজ, এইভাবে সরলরেখায় এগোলো। এইভাবে চড়া আর অগভীর জল পেরিয়ে তারা এগোলো। চড়ার দুপাশে কাঠের খুঁটি দিয়ে সীমানা নির্দিষ্ট করা আছে, যেমন লিউকাস (Leucas) আর আকামানিয়া (Acamania) দ্বীপের মাঝখানে যে জল প্রণালী আছে, সেখানে যেমন পথনির্দেশক স্তম্ভ লাগানো আছে, ফলে জাহাজ ঠিক পথে যেতে পারে, চড়ার জমিতে না ঠেকে যায়। তবে লিউকাসের কাছে যে চড়া বা অগভীর সমুদ্র আছে। সেটা বালুকাময়, ফলে আটকে যাওয়া জাহাজ আবার জলে ভাসতে পারে। বর্তমানে ব্যাপারটা আলাদা পাড়ের দুদিকেই গভীর কাদা, আঠালো কাদা রয়েছে, ফলে কোনো এক দিকে জাহাজ আটকালে, মুক্ত হওয়ার কোনো পথ নেই, সেটা গেল! প্রথমত, খুঁটি দিয়ে ঐ কাদা সরানো যায় না, আর জাহাজের থেকে লাফিয়ে পড়ে মানুষ যে টেনে আনবে জাহাজটাকে জলের মধ্যে তারও কোনো উপায় নেই— কারণ কোমর অবধি কাদা।

ছয়শ ষ্ট্যাডিয়া এইভাবে বহু বাধা অতিক্রম করে জাহাজগুলি কে নিয়ে এসে তারা নোঙর করল। সমস্ত লোকজন যে যার জাহাজে বসেই রাতে আহার করার কথা ভাবছিল, কিন্তু রাতে ভাগ্যক্রমে তারা গভীর সমুদ্র পেয়ে গেল, পরের দিনও সাগরের গভীরতা থাকার ফলে তারা সারা দিনরাত দাঁড় টেনে নয়শ ষ্ট্যাডিয়া অতিক্রম করল। এসে নোঙর ফেলল ডাইটোডিস (Didotis) বলে একটা গ্রাম ব্যাবিলনীয়ার (Babylonia) অন্তর্গত, ইউফ্রেটিস নদীর মুখে, সেখানে এখানে ব্যবসায়ীর পাশের অঞ্চল থেকে ফ্র্যাঙ্ককিনসেনস (frankinscence) বা সুগন্ধী রেসিন এবং অন্যান্য সুবাসিত গন্ধ দ্রব্য বা মশলা জোগাড় করে যা আরবে পাওয়া যায়। ইউফ্রেটিসের মোহনা থেকে ব্যাবিলন হল তিন হাজার তিনশ’ ষ্ট্যাডিয়া, নিয়েরকাসের বিবরণে।

৪২. এখানে এসে তারা শুনল যে আলেকজান্ডার সুসা-র দিকে আসছেন। সুতরাং তাদের ফিরতে হল, জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে পাসিটাইগ্রিসের (Pasitigris) দিকে, যাতে আলেকজাণ্ডারের সঙ্গে তাদের দেখা করা সম্ভব হয়। তারা জাহাজদের পিছনের দিকে মু)খ ফিরিয়ে দিল, বাঁদিকে পড়ল সুসিয়ার ভূমিক্ষেত্র। তারা এগোতে লাগল যে হ্রদটির মধ্য দিয়ে, টাইগ্রিস নদী সেই হ্রদে এসে পড়েছে। আর্মেনীয়া (Armenia) থেকে নিনাস (Ninus) শহর পার করে প্রবাহিত হয়েছে টাইগ্রিস। একসময় নিনাস ছিল বিরাট এক বর্ধিষু শহর, ইউফ্রেটিস আর টাইগ্রিস-এর মাঝখানে বলে বলা হতো ‘নদী মধ্যবর্তী’ শহর। হ্রদের থেকে নদী পর্যন্ত যেতে পাঁচশ ষ্ট্যাডিয়া পড়ে, সুসিয়ার একটা গ্রাম এগিনিস (Aginis) যেটা সুসা থেকে আরও পাঁচশ ষ্ট্যাডিয়া যেতে হয়। সুসিয় অঞ্চলের থেকে পাসিট্রাইগ্রিসের মুখ পর্যন্ত দু-হাজার ষ্ট্যাডিয়া দূরত্ব হবে। পাসিট্রাইগ্রিস থেকে তারা জাহাজ ছাড়ল, লোকজন আছে। উর্বর জমি— একশ পঞ্চাশ ষ্ট্যাডিয়া যাওয়ার পর নৌবহর দাঁড় করানো হল। সম্রাট কোথায় সে খবর নেওয়ার জন্য যাদের পাঠিয়ে ছিলেন, তাদের প্রতীক্ষায়। এর মধ্যে নিয়েরকাস ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন, তাদের জীবন রক্ষার জন্য। খেলাধূলার আয়োজন করেন; সমস্ত অভিযাত্রীরা আনন্দিত হয়ে ওঠে, যার ফলে।

এর মধ্যে খবর এসে যায়, আলেকজান্ডার এ পথেই অগ্রসর হচ্ছেন, আবার জাহাজ নোঙর তুলে এগোলো, এবার এসে থামল নৌকো দিয়ে তৈরি সেতুর কাছে, যে সেতু তৈরি করা হয়েছে আলেকজান্ডারের সৈন্য পারাপার করার জন্য। পার হয়ে সুসায় এসে পৌঁছবার উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর। এখানে দুই বাহিনীর মিলন হল। আলেকজান্ডার তাঁর সেনাবাহিনী আর নৌবাহিনীর সৈন্য আর জাহাজের মঙ্গল অবলোকন করে ঈশ্বরকে উৎসর্গ করেন, খেলাধূলা অনুষ্ঠিত হয়। আর নিয়েরকাস শিবিরে এসে পৌঁছবার পর সেনারা তাঁকে রঙিন ফিতে আর ফুল ছুঁড়ে অভিনন্দন জানায়।

নিয়েরকাস আর লিওন্নেটাস (Leonnatus) কে সম্রাট সোনার মুকুট পরিয়ে দিলেন। নিয়েরকাস পুরস্কৃত হলেন নৌবহরকে নিরাপদে অভিযান করিয়ে নিয়ে আসার জন্য আর লিওন্নেটাস হলেন ওরাইটানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য, এছাড়া অন্য যে সব স্থানীয় মানুষ ওরাইটান (Orietan) দের আশেপাশে বসবাস করে তাদের পরাভূত করার জন্য। আলেকজান্ডার তার নৌ সেনাদলকে নিরাপদে ফিরে পেলেন। যারা সিন্ধুনদের মুখ থেকে তাদের যাত্রা শুরু করেছিল।

৪৩ লোহিত সাগরের (Red Sea or Erythrean Sea) দক্ষিণে ব্যাবিলন পেরিয়ে গিয়ে আরবের প্রধান অংশ পড়ে, যেটা একদিকেই বিস্তৃত; যেদিকে সমুদ্র ফিনিশিয় (Phoenician) আর সিবিয়া-প্যালেষ্টাইনের তীর ছুঁয়ে আছে, আর সন্ধ্যার মুখে সূর্যাস্তের সময় মিশরের উপর দিয়ে একটা সীমান্তরেখা টানে ভূমধ্যসাগরের দিকে। কিন্তু মিশরের মধ্যে দিয়ে একটা উপসাগর গেছে। আর সেই উপসাগর গিয়ে মিশেছে সমুদ্রে, আর সমুদ্র গিয়ে পড়েছে ইরিথ্রিয়—সাগরে ফলে এটা প্রমাণ করে যে ব্যাবিলন থেকে মিশর পর্যন্ত একটা অভিযান ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু এ পথে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযান করেনি সেনাদল নিয়ে, কারণ এ পথে প্রচণ্ড গরম আর মরুভূমি পড়ে। শুধু কিছু লোক গেছে যারা খোলা সমুদ্রে যাতায়াত করতে অভ্যস্থ। তবে ক্যামবাইসিসের সেনাদল, যারা মিশর থেকে সুসা নিরাপদেই পৌঁছেছিল। তাছাড়া ল্যাগাসের পুত্র টলেমি যে সৈন্যদের সেলুকাস নিকেটরের কাছে পাঠিয়েছিল ব্যাবিলনে; তাদের আরবের ঐ সঙ্কীর্ণ যোজক ভূখণ্ডটি পার হতে মোট আটদিন সময় লেগেছিল। এই জায়গাটা জলহীন একটা অনুর্বর অঞ্চল। তারা উটের পিঠে জল বোঝাই করে যত জোরে পারে উটগুলোকে দৌড়তে বাধ্য করেছিল, তাও শুধুমাত্র রাতের বেলায়, কারণ দিনের বেলায় অসহ্য গরম, সূর্যের উত্তাপ আর মরুভূমির উত্তাপে তারা সকালে যে বেরোতে পারত না, তাই নয়— ওই গরমে তারা আশ্রয় ছেড়ে যেতে পর্যন্ত পারত না। যতদূর পর্যন্ত জায়গাজমি এই অঞ্চলের বাইরে ছিল, যেমন যে যোজকটির কথা আমরা বলেছি, সেটা বিস্তৃত ছিল আরব্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত লোকজন ছিল না উত্তরভাগে। শুধু মরু অঞ্চল যা মিশর দিয়ে বয়ে গেছে, মানুষ শুরু করেছে, আর জলপথে প্রদক্ষিণও করেছে আরবের বেশিরভাগ অংশ এই আশায় যে সুসা এবং পারস্যের কাছ দিয়ে যে সমুদ্র চলে গেছে সেই পর্যন্ত পৌঁছে যাবে বলে, অবশ্য যতটা পানীয় জল তারা জাহাজে ভর্তি করে নেবে, সেই জলটুকু যতক্ষণ থাকবে, যাত্রা সেই পর্যন্ত হবে— তার বেশি নয়। কিন্তু যে অভিযাত্রীদের আলেকজান্ডার ব্যাবিলন থেকে পাঠিয়েছিলেন লোহিতসাগর (Red Sea or Erythrean sea) এর দক্ষিণ দিকের পাড় ঘেঁষে, বলেছিলেন ওইদিকের সমস্ত অঞ্চল আবিষ্কার করতে, তারা কয়েকটা দ্বীপ আবিষ্কার করে যেগুলো তাদের পথে পড়েছিল, আর সম্ভবত আরবদেশের মূল ভূখণ্ডের কয়েকটা ক্ষুদ্র জায়গা দেখেছিল মাত্র। কিন্তু যে অন্তরীপ নিয়েরকাস দেখেছিলেন কারমানিয়ার (Carmania) ঠিক উল্টোদিকে, পর্যটকদের একজনও সেই অন্তরীপকে ঘুরে আসেনি, প্রদক্ষিণ করেনি। কিন্তু যদি একবার ওটা দেখে আসতে পারত, তাহলে আমার বিশ্বাস যে আলেকজান্ডারের মতো অনুসন্ধিৎসু ও উদ্যোগী সম্রাট প্রমাণ করে ছাড়তেন যে সমুদ্রপথে এবং স্থলপথে— দুইভাবেই ঐ অন্তরীপ প্রদক্ষিণ করা যায়। তার মধ্যে, হান্নো নামের এক লিবিয়ার অধিবাসী কার্থেজ থেকে যাত্রা শুরু করে ‘পিলারস অফ হারকিউলিস’ পেরিয়ে বহির্সমুদ্রে এসে পড়ে; লিবিয়া তার বাঁদিক রেখে সে জাহাজ চালাল পূর্বদিকে, পঁয়ত্রিশ দিন ধরে ওই পথে তারা গেছিল বলে শোনা যায়। কিন্তু যখন সে দক্ষিণ দিকে খুরলো, তখন সমস্তরকম অসুবিধা আর বিপদের মুখোমুখি হল— জলের কষ্ট, প্রচণ্ড গরম আর অগ্নিবর্ষী স্রোতধারা সমুদ্রে প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু সাইরিন (Cyrene) শহর আফ্রিকার মরভূমি অঞ্চলে হলেও উর্বর, তৃণ গুল্ম আচ্ছাদিত আর জলসিক্ত অঞ্চল, ফল আর জন্তুজানোয়ার প্রচুর। এখানে উর্বর অঞ্চল বেড়া দিয়ে রয়েছে মৌরীর গাছ, সেই গাছের বেড়া টপকে শুরু হয়েছে মরু অঞ্চল।

আমার ইতিহাসের বিবরণ এখানেই শেষ হল— ম্যাসিডনের অধিবাসী ফিলিপের পুত্র আলেকজান্ডার সম্পর্কিত বিবরণ।