ভূতের নাচ – সমুদ্র পাল
ভূতের নাচ
ভূতেরাও মানুষের মতোই হাসে, গায়-বা নাচে। কিন্তু ভূতের নেত্য বা নাচ দেখা সকলের ভাগ্যে ঘটে না। ভূতের হাসি, ভূতের গান বা ভূতের নাচ শোনা বা দেখা বহু ভাগ্যেই সম্ভব।
ভূতের দেখাই পাওয়া যায় না, তায় আবার ভূতের নাচ! কিন্তু সেদিন বটতলায় আড্ডা মারতে গিয়ে শুনলুম যে— কেবলপুরের কেনারাম চাকলাদার নাকি সত্য সত্যই ভূতের নাচ বা ভূতের নেত্য দেখেছিল।
আড্ডার আসরে কেবলপুরের কেনারামের কথাটা ফস্ করে বলে ফেলেছিলেন হরিচরণ তর্কবাগীশ মশায় ৷
অন্য কেউ একথা বললে আমি ফস্ করেই কথাটা উড়িয়ে দিতুম। কিন্তু হরিচরণ তর্কবাগীশের কথাটা এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে পারলুম না।
তর্কবাগীশ মশাই রাশভারি লোক। আমাদের এ অঞ্চলের একজন মান্যগণ্য ব্যক্তি। আজেবাজে কথা তিনি সচরাচর বলেন না। যদিও কেবলপুরের কেনারামের কথাটা এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে পারলুম না, আবার পুরোপুরি বিশ্বাসও করতে পারলুম না। তাই তর্কবাগীশ মশাইকে জিগ্যেস করলুম।
—আচ্ছা, তর্কবাগীশ মশাই—আপনি যে কেবলপুরের কেনারামের ভূতের নাচ দেখার ব্যাপারটা বললেন, এ-কথাটা কি অন্য কারো মুখ থেকে শুনেছেন?
—আরে না। একথা আমি কেবলপুরের কেনারামের স্বমুখেই শুনেছি। ছেলেবুড়ো সকলেই জানে।
—কথাটা আপনি বলছেন বলেই বিশ্বাস করছি, অন্য কেউ এ ধরনের গপ্পো বললে মোটেই বিশ্বাস করতুম না কিন্তু।
—আমার কথাই বা বিশ্বাস করার দরকার কি? তোমার সন্দেহ হয় কেবলপুরে চলে যাও ।
—কেবলপুরের কেনারাম কি এখনও জীবিত আছেন?
—নিশ্চয়ই। ভূতের নাচ দেখার পর থেকেই কেনারামের নামডাক চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
—আচ্ছা, কেবলপুর এখান থেকে কতদূর ?
—খুব বেশি দূর নয়, সাতাশ ক্রোশ রাস্তা মাত্র ।
—সাতাশ ক্রোশ রাস্তা কি কম হোল তর্কবাগীশ মশাই ?
—তুমি হাসালে ভাই, এই বিজ্ঞানের যুগে সাতাশ ক্রোশ রাস্তা কি খুব বেশী ?
—তা নয়।
—তোমার যদি সত্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্য থাকে তবে তুমি যে কোনোদিন কেবলপুরে গিয়ে ব্যাপারটা জেনে আসতে পারো।
—কিন্তু সাতাশ ক্রোশ পথ হেঁটে যাওয়াই যে মুশকিল।
—সাতাশ ক্রোশ হেঁটে যেতে হবে কেন ভাই। ট্রেনে যাবে একবালপুর। তারপর আর মাত্র সাত ক্রোশ পথ বাকী থাকে।
—তারপর ?
—সাত ক্রোশেরও সবটা পথ তোমায় হেঁটে যেতে হবে না ভাই, চার ক্রোশ পথ পর্যন্ত বাসে যেতে পারো, মাঝের তিন ক্রোশ পথ হেঁটে যেতে হবে।
নরহরি গড়গড়ি আমায় জিগ্যেস চুপে চুপে করলেন। ভূতের নেত্যর ব্যাপারটা জানার জন্য তুমি কি কেবলপুরে যাবে ঠিক করেছো ?
—তা’ যাব বলেই তো ভাবছি।
—কবে যাবে?
–কেন, আপনিও সঙ্গে যাবেন নাকি?
—তা গেলে মন্দ হয় না, একটা ব্যাপারে রহস্যের সমাধান হয়। ভূত সমস্যারও সমাধান হয়।
—পুজোর ছুটিতে আমি কেবলপুরে যাবো বলেই ঠিক করেছি।
—কবে যাবে আমায় কিন্তু জানিও, ভূত দেখার সখ আমার অনেকদিনের; সেই সঙ্গে উপরি-পাওনা হিসাবে যদি ভূতের নেত্য দেখা সম্ভব হয় মন্দ কি!
—যদি ব্যাপারটা সত্যি হয়, যদি কেবলপুরের কেনারাম সত্যি সত্যি ভূতের নাচ দেখাতে পারে—তবে আবার ভয় পাবেন না তো?
—“ভয় কাকে বলে জানে নাকো নরহরি। ভয়কে নিশ্চয়ই আনিব যে জয় করি।।”
—বেশ, কেবলপুরে যাওয়ার আগে আপনাকে নিশ্চয়ই জানাব।
সেদিনের আড্ডার আসর আর বেশীদূর এগোল না। ঠিক হলো, যদি, কেবলপুরে যাই, তবে অবশ্যই নরহরি গড়গড়িকে সঙ্গে নিয়ে যাব। পুজোর ছুটির আর বেশী বাকি ছিল না। গাঁয়ের স্কুলে মাস্টারি করি পুজোর ছুটি বলতে লম্বা ছুটি।
অতএব কেবলপুরে যাব বলে একরকম ঠিকই করে ফেললুম। নরহরি গড়গড়িকে কথা দেওয়া আছে। অতএব হাজির হলাম গড়গড়ির বাড়ি।
—গড়গড়িমশায় বাড়ি আছেন ?
—হ্যাঁ, আছি। তা হঠাৎ কি মনে করে?
—এরই মধ্যে ভুলে গেলেন, কেবলপুরে যাওয়ার কথা । -তবে কি জানো ভাই, আমি কয়েকটা দিন খুব ব্যস্ত আছি। তা তুমি কবে রওনা হবে ঠিক করেছ?
—আগামী বুধবার দিন ভোরের ট্রেনেই রওনা হবো বলে ভাবছি।
—কিন্তু বুধবার পর্যন্ত যে আমি খুবই ব্যস্ত থাকব।
—তা! কবে আপনার সুবিধে হবে বলুন।
—আমি বলি কি, তুমি বুধবার দিন রওনা হয়ে যাও, আমি বৃহস্পতিবার ভোরের ট্রেনে রওনা হবো ।
—ঠিক যাবেন তো?
—নিশ্চয়। ভূতের নেত্য দেখার আমারও সখ কম নয় ।
—কিন্তু আমি যদি আপনার সঙ্গেই একদিন পিছিয়ে বৃহস্পতিবার ভোরের ট্রেনে রওনা দিই।
বৃহস্পতিবার কোনো কারণে যদি আটকা পড়ে যাই, তখন তোমার যাওয়ায় বাধা পড়ে যাবে। তাই বলছি, তুমি ভাই বুধবারেই রওনা হয়ে যাও—শুভ কাজে বিলম্ব করা ঠিকল নয় ।
—আপনি ভয় পাচ্ছেন না তো?
—মোটেও না, মোটেও না। তবে কি জানো, আমি নানাকাজে ব্যস্ত মানুষ।
—বুঝেছি।
নরহরি গড়গড়ির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলুম। বুঝতে পারলুম নরহরি গড়গড়ি আমার সঙ্গী হচ্ছেন না, কেবলপুরে আমাকে কেবল একাই যেতে হবে। যারা মুখে খুব বেশী তড়পায়, কাজের বেলা তারা ডুব দেয়। নরহরি গড়গড়ির মুখের তড়পানিই সার। ভূতের নাচ দেখা দূরে থাকুক, ভূত দেখতেও তিনি রাজী নন। আসলে তিনি বড্ড ভীতু।
অতএব বুধবার ভোরের ট্রেনে একাই বেরিয়ে পড়লুম। আমার গন্তব্য স্থান হ’লো কেবলপুর। উদ্দেশ্য—কেবলপুরের কেনারামের সাক্ষাৎ লাভ। ট্রেনে একবালপুর ষ্টেশনে পৌঁছতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। ছোট্ট স্টেশনে। সামান্য কজন লোকই নামল। কুলি পাওয়াও মুশকিল।
অতএব নিজের বোঁচকা নিজের কাঁধেই তুলে নিলুম। আমি ঐ অঞ্চলের লোক নই, স্টেশনমাস্টার তা বুঝতে পেরেছিলেন। অতএব গাড়ি ছেড়ে দিয়েই তিনি আমার কাছে এলেন।
—আপনি এ অঞ্চলে বুঝি নতুন ?
—তা বলতে পারেন।
—কোথায় যাবেন ?
—কেবলপুরে যাব। কেবলপুরে কেনারামবাবুর ওখানে যাব। চেনেন?
—কেবলপুরের কেনারামবাবুকে কে না চেনে বলুন? উনি কি আপনার আত্মীয় ?
—না আত্মীয় নন।
—তবে?
—আমি কেনারামবাবুর কাছে ভূতের নাচের ব্যাপারটা জানতে চাই।
—আপনার সাহস তো সাংঘাতিক!
–এতে সাহসের কী দেখলেন মশাই?
—সাহসের কথা নয়, কেনারামবাবুই সাংঘাতিক লোক। পুলিশরা পর্যন্ত ওকে ভয় করে।
– কেন ?
—ওর সম্বন্ধে অনেক ভয়ানক গল্প শোনা যায়।
—কি রকম?
—কেনারামবাবুর বাড়ির আশেপাশে নাকি অনেক নরকঙ্কাল পাওয়া গেছে, তাছাড়া……
—তাছাড়া আর কী?
—তাছাড়া মাঝে মাঝে মাঝরাতে কেনারামবাবুর বাড়ির ছাদে রুম্ ঝুম্ ঝুম্ নাচের শব্দ শোনা যায় ।
—বলেন কী?
—ঠিক বলছি মশায় ৷
—কেনারামবাবুর অবস্থা নিশ্চই ভালো।
—আগে মোটেই ভালো ছিল না। সামান্য একখানা কুঁড়েঘর আর মাত্র দু’বিঘা জমি ছিল।
—আর এখন?
—কুঁড়েঘরের জায়গায় এখন দেখতে পাবেন বিরাট বাগানবাড়ি, তিন বিঘের পুকুর সহ বিরাট তেতলা বাড়ি।
–ঐ বাড়িতেই কি কেনারামবাবুর ছেলে মেয়ে বউ থাকে?
–আরে না মশায়, ওর বউ যেদিন ভূতের নাচ দেখেছে—সেদিন ভয়ে হার্টফেল করে মারা গেছে।
—আর ছেলে মেয়েরা?
—তারা ঐ বাড়িতেই থাকে না। তারা ওখান থেকে দু’মাইল দূরে আর একটি দোতলা বাড়িতে থাকে। অবশ্য ও বাড়িটিও কেনারামবাবুরই, এবং সব খরচই বহন করেন কেনারামবাবু।
–বাগানবাড়িতে কেনারামবাবু কি একাই থাকেন ?
—তা একরকম একাই। একটি কানাখোঁড়া ভৃত্য ওঁর সারাক্ষণের সঙ্গী।
—আর একটি মাত্র প্রশ্ন, মাস্টারমশায়।
—বলুন।
–কেনারামবাবু এত অর্থ কোথায় পেলেন ?
—সেটাই তো মশায় রহস্য। কেউ কেউ বলে কেনারামবাবুর সবকিছুই হয়েছে— ভূতেরা নাচে বলে।
—তার মানে?
—কেনারামবাবু ভূতের নাচের আসরে মাদল বাজান, পরিবর্তে পান প্রচুর মোহর। অবশ্য যাঁরা অবিশ্বাসী তাঁরা বলেন—ওসব বাজে কথা, আসলে কেনারামবাবু হলেন একজন ডাকাতের সর্দার।
—তা পুলিশ এ ব্যাপারে কোনো তদন্ত তল্লাশ করে নি?
—তা করেছিল বৈকি মশায়, কিন্তু কেনারামবাবু ভূতের নাচ দেখিয়েই সবাইকে বোবা করে রেখেছেন। দারোগারা বরং কেনারামবাবুকে দেখতে পেলে—দূর থেকেই সেলাম ঠোকে। ওঁর ধারে-কাছেও এগোয় না। একবার এক অ্যাংলো দারোগা খুব গরম দেখিয়ে রাতের বেলা কেনারামবাবুর বাগানবাড়িতে হানা দিয়েছিল। কেনারামবাবু তখন তাঁর বাড়ির ছাদে ভূতের নাচের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে মাদল বাজাচ্ছিল—অতো ভূত একসঙ্গে দেখে অ্যাংলো দারোগা থ। অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সাতদিন পরে তার জ্ঞান ফিরে আসে বটে—তবে সে আর সুস্থ হতে পারে নি। মাঝে মাঝেই “ঘোস্ট, ঘোস্ট” বলে চেঁচিয়ে ওঠে। এখন সে সম্পূর্ণ পাগল। শুনেছি বর্তমানে সে রাঁচীর পাগলা গারদে।
—তবে তো ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমি কেনারামবাবুর বাড়ি যাবো। নিশ্চয়ই যাবো। সে কারণেই অতোদূর থেকে আসা।
—ভূতের নাচ দেখতে গিয়ে মারাও পড়তে পারেন মশায়, তা জানেন?
–এমনিতেই তো কত লোক অহরহ মারা যাচ্ছে, ভূতের নাচ দেখে যদি মারা যাই—তবে তাকে সৌভাগ্য বলেই মেনে নেব।
—আপনি কি সি.বি.আই.-এর লোক?
—না, না, মশাই না। একজন সাধারণ স্কুলমাস্টার। এখন বলুন কেবলপুরের বাস কখন পাব ?
—বিকেল চারটেয়। কিন্তু সে বাস তো কেবলপুর পর্যন্ত যাবে না, রশুলপুর থানা পর্যন্ত যাবে। রশুলপুর থানা থেকে আরও তিন ক্রোশ পথ হেঁটে যেতে হবে। কেবলপুর পৌঁছতে আপনার যে সন্ধ্যে হয়ে যাবে মশাই।
—তাছাড়া আর উপায়ই বা কী? ভগবান ভরসা করে ভূতের নাচ দেখতে বেরিয়েছি! এখন যা থাকে কপালে।
—আমি বলি কি আজ রাতটা এখানেই থাকুন, কাল ভোরের বাসে আপনাকে তুলে দেব, সকাল সকালও তা হলে কেবলপুরে পৌঁছুতে পারবেন। অজানা, অচেনা জায়গা— রাতের বেলা যাওয়া মোটেই ঠিক নয় মশায়, তারপর আবার যে কাজে যাচ্ছেন……..
—এখানেই বা থাকি কোথায়? এখানে তো কোনো হোটেল আছে বলে মনে হয় না।
—মশায়, আজ রাতে আপনি আমার অতিথি হবেন। দু’জনে বেশ গল্প করে কাটানো যাবে। আপত্তি আছে?
—না, আপত্তি আর কি। তবে আপনার বাড়ির লোকের আপত্তি হবে না তো?
—না, না। আমার গিন্নী বরং খুশীই হবেন, ছেলে আর বৌমা থাকে বোম্বেতে। বাড়িতে কেবল আমি আর গিন্নী। আর কথা বলার দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। তা মশায়, আপনি দাবা খেলা জানেন ?
—জানি বৈকি।
—তবে আর কি? সময় বেশ ভালোই কাটবে। চলুন মশাই।
—আমাকে আপনি আপনি বলে সম্বোধন করবেন না। আমি আপনার ছেলের বয়সী।
–ঐ হোল। ছেলেরা বড় হ’লে বন্ধু হয়। তখন তাকে আপনি বলতে হয়। হেঁ হেঁ । অতএব সেদিন আর কেবলপুরে যাওয়া হোল না। একবালপুরের স্টেশনমাস্টারের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করতে হোলো। দাবা খেলে সময়টা ভালোই কাটল।
পরদিন ভোরের বাসে আমায় তুলে দিলেন মাস্টারমশায়। লক্কর বাস, তাতে বেজায় ভীড়। স্টেশনমাস্টার সঙ্গে থাকায় বাস কণ্ডাক্টর একটু খাতির করল। বসবার একটা আসনও জুটিয়ে দিল ড্রাইভারের কেবিনে।
প্রায় সকাল সাড়ে সাতটার সময় রশুলপুর থানার স্টপেজে বাস দাঁড়াল। সঙ্গের বোঁচকা নিয়ে নেমে পড়লুম। একটা মিষ্টির দোকান থেকে চা আর জলখাবার খেয়ে নিলুম। ওখান থেকে তিন ক্রোশ পথ হেঁটে গেলেই আমার গন্তব্যস্থল কেবলপুরে গিয়ে পৌঁছব।
অতএব জলখাবার খেয়ে কেবলপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলুম। দু’জন সহযোগীও পাওয়া গেল। অথচ তাঁদের কাছে আসল কথাটা প্রকাশ করলুম না।
তবুও কেবলপুরের কেনারামবাবুর বাগানবাড়ি যাব শুনলে—ওঁরা নিশ্চয় ঘাবড়ে যাবেন। ওঁদের মধ্যে একজন জিগ্যেস করলেন : কেবলপুরে কার বাড়ি যাবেন স্যার?
—যাব কোনো একটা বাড়ি, একটা বিশেষ তদন্তের জন্য। আগে থেকে সেকথা বলা উচিত হবে না ।
গাঁয়ের লোক দুটো তাই আর কোনো কথা জিগ্যেস করল না। সঙ্গী হিসাবে লোক দু’টো মন্দ নয়।
বলা বাহুল্য, ওঁরা সঙ্গে না থাকলে, আমার কেবলপুরে একা যাওয়া খুবই মুশকিল হতো। বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে, শ্মশানের পাশ দিয়ে—আঁকাবাকা সরু পথ এগিয়ে গেছে। গোরুর গাড়ির পথে গেলে ঘুরপথে যেতে হবে। আমরা চলেছি সর্টকাট পথ দিয়ে।
সকাল ন’টার সময় আমরা কেবলপুরের বাজারে গিয়ে হাজির হলুম।
বাজার বলতে কেবল দু’খানা চালাঘরের সমষ্টি। একটি চালাঘরে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান । সঙ্গী দু’জন বললেঃ কর্তা এবার আমরা যাই। পরাণের চায়ের দোকানে কেবলপুর গ্রামের সব হদিশই পেয়ে যাবেন কর্তা।
অতএব পরাণের দোকানে গিয়ে এক গেলাস চায়ের অর্ডার দিলাম। এখানে কাপডিশের বালাই নেই। ছোট ছোট কাঁচের গেলাসে চা খেতে হয়, অথবা মাটির ভাঁড়ে। চা নয়, চিনির সরবৎ বলাই ঠিক হবে। চায়ের কোন গন্ধ মালুম পেলুম না। তবু চা ভেবে নিয়ে খেয়ে বেশ সান্ত্বনা লাভ করলুম।
চা-এর গেলাসে শেষ চুমুক দিয়ে দোকানীকে জিগ্যেস করলুম : তোমার নাম বুঝি পরাণ।
—আজ্ঞে কর্তা। সবাই আমার নাম পরাণ বলে ডাকে বটে—আসলে আমার নাম পেরাণ কুমার মণ্ডল।
হেসে বললুম : ওই পরাণও যা, পেরাণও তাই, আবার প্রাণও তাই।
—তা যা বলেছেন, আজ্ঞে।
—আচ্ছা, বলতে পারেন- কেনারামবাবুর বাগানবাড়িটা কোথায়?
—কি বললেন ?
—কেনারামের বাগানবাড়ি ।
—কেনারামবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চান ?
—হ্যাঁ।
—তবে কর্তা একটা কথা বলে রাখি।
—কি কথা ?
—সানঝের পরে আর ওবাড়িতে থাইকবেন না ।
আমি যেন কিছুই জানি না, এমন ভাবে জিগ্যেস করলুম : কেন?
—তাও জানেন না দেখছি, ওখানে রোজ রেতে তেঁনাদের নেত্য হয়।
—তেঁনাদের মানে ?
পরাণ দু’হাত জোড় করে দু’বার রাম নাম উচ্চারণ করে বলল : তেঁনাদের মানে ভূত-পেত্নীদের।
–আমি সে নাচ দেখব বলেই তো অ্যাদ্দুর থেকে এসেছি।
—কর্তা! কথাটা হেইসে উড়িয়ে দেবেন না। সত্যি ঐ বাগানবাড়িতে রোজ রেতে তেঁনাদের নেত্য হয়। আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হয় আপনি এ গ্রামের যাকে ইচ্ছে জিগ্যেস করতে পারেন।
—ভয় পাবার কিছু নেই, আমি সব কিছু জেনে শুনেই এসেছি। আমি কেনারামবাবুর চেলা হতে চাই।
—বেশ। বটতলার পাশ দিয়ে কিছুটা এগোলেই একটা বাঁশবাগানের পরে ডান হাতি পাবেন একটা ডোবা। ঐ ডোবা ছাড়িয়ে গেলেই বাঁ হাতি বাগানবাড়ির পাঁচিল দেখতি পাবেন। কিছুটা এগোলেই সদর ফটক পাবেন।
—কতক্ষণ লাগবে।
—খুব সামান্য। মাত্র এক ডাকের রাস্তা।
— চলি ।
চায়ের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দোকানে যারা বসেছিল তারা প্রায় সকলেই আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। তারা হয়তো ভাবছিল আমার মতো নির্বোধ বা দুঃসাহসী এ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কেউ নেই। অথবা এমন নির্বোধ ব্যক্তি সহসা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সকলেই অবাক বিস্ময়ে চুপ। আমি পেছন দিকে না তাকিয়েই এগোতে থাকলাম।
পরাণ ঠিকই বলছিল, এক ডাকের রাস্তাই বটে! এক ডাকের রাস্তা মানে প্রায় মাইলখানেক। বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে সকাল বেলাই আমার গা ভয়ে ছম্ছম্ করছিল।
এতবড়ো বাঁশবাগান এর আগে আমি কখনও দেখিনি। বাঁশবাগানের ভেতর থেকে কখনও খিল্ খিল্ হাসি, কখনও বাচ্চা ছেলের কান্নার শব্দ—সকাল বেলাতেই আমাকে ভয়ে প্রায় আধমরা করে ফেলেছিল।
একবার ভাবছিলুম ফিরে যাই, যেখান থেকে এসেছি সেখানেই—ভূতের নেত্য দেখার কোনো দরকার নেই ।
আবার ভাবলুম—‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে।’ ভূতের নেত্য দেখার যখন সুযোগ পেয়েছি—তখন ভূতের নেত্য দেখেই মরব। যায় যদি প্রাণ যাক। যদি ভাগ্যগুণে বেঁচে ফিরতে পারি, তবে সবাইকে ডেকে অন্ততঃ সোচ্চার কণ্ঠে বলতে পারব : শুধু ভূতই দেখিনি ভাই স্বচক্ষে ভূতের নেত্যও দেখে ফিরে এসেছি। বাঁশবাগানের মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে নানা ধরনের নানা চীৎকার শুনতে পাচ্ছিলুমতখন মাঝে মাঝেই ভয়ে চমকে উঠছিলুম।
গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতে করতেই এগিয়ে চলছিলুম।
পথে একটা লোকও চোখে পড়ল না। মনে হলো—সচরাচর এই পথ দিয়ে লোক যাতায়াত করে না। দিনের বেলাতেই এই, রাতের বেলা এই পথ দিয়ে যাতায়াতের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
নেহাত বাধ্য না হলে কেউ এ পথ দিয়ে যাতায়াত করে না। বাঁশবাগানের দিকে তাকালেই ভয়ে গা ছম্ছম্ করে ওঠে, মনে হয় কতকগুলি অশরীরী আত্মা যেন ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যেন বিনা আমন্ত্রণেই ওদের এলাকায় ঢুকে পড়েছি, অনাহুত হয়ে।
কোনোক্রমে বাঁশবাগানটা পেরোতেই ভয় কিছুটা কাটল। ডান হাতে একটা ডোবা। ডোবার ওপাশে কতকগুলি শকুন চুপচাপ বসে আছে।
ডোবায় জল নেই বললেই চলে। ডোবাটা পেরোতেই বাঁ হাতে কেনারামবাবুর বাগানবাড়ির পাঁচিল দেখতে পেলুম। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর সদর ফটক। সদর ফটক ভেতর থেকে তালা বন্ধ ।
কোনো লোক নেই গেটের কাছে। বেলও নেই যে টিপব। ইলেকট্রিক নেই—অতএব ইলেকট্রিক বেল থাকবে কেন ?
সচরাচর এ ধরণের বাগানবাড়ির ফটকে দারোয়ান থাকে—এক্ষেত্রে দারোয়ানের বালাই নেই, থাকার কথাও নয় ।
অতএব গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চীৎকার করতে লাগলুম : কেনারামবাবু বাড়ি আছেন? কেনারামবাবু বাড়ি আছেন?
ওদিক থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়েগেটের ওপর হাত দিয়ে শব্দ করতে লাগলুম। ঝন্ ঝন্ করে উঠল।
দু’একবার এমন ঝন্ ঝন্ শব্দ হতেই, বাড়ির ভেতর থেকে একটা খোঁড়া ও কানা লোক খোঁড়াতে খোঁড়াতে গেটের কাছে এগিয়ে এল—কে? কাকে চাই ? গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে জবাব দিলুম : আমি বহুদূর থেকে এসেছি। বিশেষ প্রয়োজনে
আমি কেনারামবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।
—ওনার ঘুম থেকে উঠতে দেরী হবে, আপনি কি অপেক্ষা করবেন ?
—নিশ্চয়ই। অ্যাদ্দুর থেকে এসেছি যখন, দেখা না করে যাই কি করে ?
—আপনি বোধ হয় এ গাঁয়ে নতুন ?
—হ্যাঁ।
—এখানে আপনার আত্মীয়স্বজন কেউ আছে কি ?
—না।
—ঠিক আছে, ভেতরে আসুন — বারোটা বাজতে দেরী নেই। ঠিক বারোটার সময় কর্তা দোতলা থেকে নামবেন — তখন আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব’খন।
অতএব লোকটা গেট খুলতেই আমি ভেতরে ঢুকে পড়লুম। লোকটা আবার গেট বন্ধ করল। বিরাট তেতলা বাড়ি বটে, কিন্তু কখনও রং করা হয়েছে বলে মনে হয় না । বাইরে দেওয়ালগুলো কালচে আর শ্যাওলায় ভরা। দেখলে ভূতুড়ে বাড়ি বলেই মনে হয়, বাইরের অপরিচিত কেউ অন্ততঃ তাই ভাববে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এ-বাড়িতে কোনো মানুষ বাস করে। পোড়ো বাড়ি বা ভূতুড়ে বাড়ি বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। বাড়ির চারপাশ আগাছায় ভর্তি। লোকটাকে বললুম : এই আগাছাগুলো কাটো না কেন?
লোকটাকে দেখতে ভূতের মতো। কানা, খোঁড়া, সেই সঙ্গে সামনের দু’টো দাঁত মুলোর মতো ঠোঁটের বাইরে ঠেলে বেরিয়ে আছে। রাতের বেলা দেখলে যে কেউ ভূত বলেই ভাববে।
লোকটা দাঁত বার করে হেসে বলল : আগাছা মানুষের অপছন্দ হতি পারে, কিন্তু তাঁনাদের ভারী পছন্দ। তা আমি একবার আগাছা কেটে সাফ করতি চেয়েছিলাম, কর্তাবাবু বারণ করলে। তাই আর আগাছা কাটা হয়নি।
–এ বাড়িতে বুঝি তুমি আর কেনারামবাবুই থাকো !
—আজ্ঞে। এ-বাড়িতে আর অন্য কে মরতি আসবি? ভূতেদের সঙ্গে সঙ্গে থাকৃতি থাকৃতি আমরা আর মানুষ নেই—ভূত হইয়ি গেছি বাবু !
—তোমার নাম কি ?
—রসিক।
—দেখতে চেহারাটা তোমার ভূতের মতো হ’লেও আসলে তুমি রসিকই বটে। তা এ-বাড়িতে কদ্দিন আছো ?
—সেই ছোটো বেলা থেকে। বাবু আমাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিলেন। তখন বাবুর অবস্থাও ভালো ছিল না। কুঁড়েঘর আর দু’বিঘে মাত্র জমি। আর সম্বলের মধ্যে একটা মাত্র মাদল।
—তোমার বাবু মাদল-বাজাতে পারেন?
—তা পারেন বৈকি। ঐ মাদলের দৌলতেই তো তেঁনাদের সঙ্গে আলাপ হয়।
—তা ঐ মাদলটা কেনারামবাবু কোথায় পেলেন ?
—শুনেছি এক বুড়ো সাঁওতাল কর্তাবাবুকে ওটা দান করেছেন।
কথা বলতে বলতেই আমরা ঘরের ভেতরে ঢুকলুম, ঘরেও চামচিকে আর বাদুড়দের আড্ডাখানা। রসিককে জিগ্যেস করে কোনো লাভ নেই, হয়তো বলবে : চামচিকে আর বাদুড়ও তাঁনাদের পছন্দ।
নীচতলায় অনেকগুলো ঘর, কিন্তু কোনো ঘর বাসযোগ্য নয়। ঘরগুলোর মধ্যে বৈঠকখানা ঘর বরং তুলনামূলকভাবে সাফ, একপাশে একটি তক্তাপোশ, তক্তাপোশে সতরঞ্চি পাতা, আর সতরঞ্চির ওপর তেলচিটে পড়া একটি তাকিয়া। আর কয়েকটি হাতলযুক্ত চেয়ার। বৈঠকখানা ঘরটি খুলে দিয়ে রসিক বলল : আপনি বরং এই ঘরটিতে বিশ্রাম নিন। দূর থেকে আইছেন। আমি বরং আপনার জইন্যে এক কাপ চা নিয়ে আসি । —এখানে চা’ও পাওয়া যায় নাকি?
—সব কিছুই পাওয়া যায়। কিন্তু সব করতি হয় একা আমাকেই। শনি ও মঙ্গলবার মাছও পাবেন। কারণ কর্তাবাবু কালোঘোড়ায় চড়ে ঐ দুদিন হাটে যান—বাজার কইরে নিয়ে আসেন। ছেলেপুলেদের দেইখে আসেন।
—তোমার মনিব অর্থাৎ কেনারামবাবুর সঙ্গে কখন দেখা হতে পারে ?
—বাবুকে আপনার কথা বলতি হবি, নইলে বাবু বেলা বারোটার আগে নীচে নামেন না।
—এতক্ষণ কি করেন ?
—-ঘুমোন ।
—কেন, রাতে ঘুমোন না ?
—তাঁনাদের জন্যে কি আর আমার বাবুর রাতে ঘুমুবার জো আছে?
—কেন ?
—তাঁনারা সারারাত নেত্য করেন, আর আমার বাবুকে মাদল বাজাতি হয় সারারাত’ ধরে। তারপর তেনারা চইলে গেলে বাবু ঘুইমে পড়েন, ওঠেন বেলা বারোটায় ৷
—রোজ রাতেই কি তারা নেত্য করেন?
—করেন বৈকি। তবে মাঝে মাঝে বাদও যায়।
—তুমি তাদের দেখেছো ?
—দেখেছি বৈকি। পেরথমে তো খুব ভয় পাইয়ে গেছি। আমি ছিলুম নিচে, তাঁনাদের নাচ চলছিল ছাদের উপরে। দু’টো ভূত আমাকে নিয়ে গেল। প্রথমে ভূত দেখেই অজ্ঞান হইয়ে পইড়ে গিয়েছিলুম। অজ্ঞান অবস্থাতেই দু’টো ভূত আমাকে নাচের আসরে টেইনে নিয়ে গিয়েছিল।
—তারপর?
–সে নাচ দেখে আমি ভয়ে আর আতঙ্কে আবার ভিরমি খেয়ে পড়লুম। পরদিন সকালে আমার জ্ঞান ফেরছিল, দেখলুম মাথার কাছে বাবু বইসে রইয়েছেন। বাবু আমায় অভয় দিয়ি বইললেন : কোনো ভয় নেই। ওদের আমি মানা করে দিয়েছি—তোকে আর তারা টেনে নে যাবে না। তা তোরই বা অ্যাতো ভয় পাওয়ার কি আছে? আমি যে ওদের নাচের সঙ্গে রোজ মাদল বাজাই আমি কি মরে গেছি? ওঁরা কিন্তু বাবুর কথা শুইনেছেন। আমাকে আর সেই থেকে কোনো রেতে টেইনে নে যায়নি।
বেলা একটার সময় কেনারামবাবু নিচে নেমে এসেছিলেন। আমি আমার উদ্দেশ্যের কথা জানাতেই তিনি বেশ কিছুক্ষণ অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বলা বাহুল্য, আমিও কেনারামবাবুর মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়েছিলুম। সাদামাটা দোহারা চেহারা কেনারামবাবুর। গোঁফটি দেখার মতো, মোটা থেকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে।
গায়ের রং কালো। মাথায় বাবড়ি চুল। এককালে বেশ জোয়ানই ছিলেন মনে হয়। এখনও এই পঞ্চাশ বছর বয়সেও তাঁকে যুবাই বলা যায় ৷
তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, বয়সের ভারে অথবা নিয়মিত রাত্রি জাগরণের ফলে অথবা অন্য কোনো কারণে কিছুটা কাবু হয়ে পড়েছেন। আর চোখ দুটো জবা ফুলের মতো টকটকে লাল।
কেনারামবাবুকে আমার কেবলপুরে আসার আসল উদ্দেশ্যের কথা খুলে বললেও উনি যেন আমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না, তাই আবার জিগ্যেস করলেন : সত্যিই কি আপনি ভূতের নাচ দেখার জন্যে অ্যাদ্দুর ছুটে এসেছেন?
—হ্যাঁ।
—আশ্চর্য!
—এতে আশ্চর্যের কিছু নেই কেনারামবাবু। ছোটোবেলা থেকেই আমি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় । অজানাকে জানার ইচ্ছে, রহস্য উদ্ঘাটনের আকাঙ্ক্ষা আমাকে যেন মাঝে মাঝেই তাড়া দেয়। মনের তাড়াতেই কাজকর্ম ফেলে আমি এখানে ছুটে এসেছি।
—এমন একটি সাহসী লোকেরই আমার দরকার ছিল। এ বাড়িটিকে ভূতের বাড়ি বলে সবাই এড়িয়ে চলে। আমাকেও ভূতের চেলা ভেবেই দূর থেকে গড় করে । একটা কথা বলার মতো লোকও পাইনে। আপনি আবার ভূতের নাচ দেখে ভয় পাবেন না তো?
—আপনি যদি অভয় দেন ভয় পাবো কেন ?
–জানেন, ওঁদের ভয় পাওয়ার কিস্যু নেই, ওঁরা জ্যান্ত মানুষের চেয়ে অনেক ভালো। অনেক উপকারী। এই কথাটাই আমি আমার ছেলেপুলেদের বোঝাতে পারিনি। অথচ জানেন, ওদের দৌলতেই আজ আমার স্বচ্ছল অবস্থা। নইলে আমি কি ছিলুম!
—আপনি যদি আপনার জীবনের কথা বলেন, খুব বাধিত হই। ওদের সঙ্গে কি করেই বা আপনার দেখা হলো? ওরা আপনার কিভাবে উপকার করল। আপনার যদি আপত্তি না থাকে—সব কিছুই খুলে বলুন।
—বলব, বলব, —সবই আপনাকে খুলে বলব। আপনি যখন অ্যাদ্দুর থেকে কষ্ট করে এসেছেন। তার আগে একটু তামাক খেয়ে নি। ওরে রসিক, তামাক দিয়ে যা………
রসিক এসে তামাক দিয়ে গেল। তিনি হুকোতে বেশ কয়েকবার টান দিয়ে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে তাঁর জীবনের সব কথা বলতে শুরু করলেন :
—জানেন, খুবই সাধারণ অবস্থা ছিল আমার। মাত্তর দু’বিঘে জমি। এতে কি খাওয়া চলে? তাই মাঝে মাঝে অন্যের জমিতেও কাজ করতে যেতুম। যা কিছু মজুরী পেতুম কোনো রকমে দু’টো পেট অর্থাৎ আমার আর স্ত্রীর পেট চলে যেত। আত্মীয়স্বজনদের অবস্থা আমার চেয়ে অনেক ভালো ছিল, তাই তাঁরা প্রায় সকলেই আমায় ঘেন্না করত! পাছে কিছু চেয়ে বসি—এই ভয়ে ধারে-কাছে কেউ আসত না। তবু দুঃখেকষ্টে চলে যাচ্ছিল কোনোরকমে। চেহারাটা ছিল দস্যির মতো। একবার পুলিশের লোকেরা আমাকে ডাকাত সন্দেহ করে তিনদিন হাজতে আটকে রাখল। বেদম পেটাল। কিন্তু আমি তো আর আসলে ডাকাত ছিলুম না। আমাকে সদরেও চালান দিয়েছিল।
সদরের সাহেব পুলিশ ইনস্পেকটার আমার কথাবার্তা শুনে এবং আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিলেন।
তিনদিন না খাওয়া অবস্থায় জঙ্গুলে পথ ধরে বাড়ি ফিরেছি। ঘরের জন্যও চিন্তায় আকুল, নতুন বিয়ে করা বৌ বাড়িতে। ঘরে চাল বাড়ন্ত।
চার-পাঁচ দিন বাড়ি নেই—কি করছে, কি খাচ্ছে, কে জানে? মনে ভীষণ চিন্তা । জঙ্গুলে পথ ধরে নানান চিন্তা করতে করতে চলেছি, হঠাৎ ঝোপের আড়ালে একটা গোঙানীর শব্দ পেয়ে থমকে দাঁড়ালুম।
এই জঙ্গলে, এই সময়ে, কে গোঙাচ্ছে? কে জানে ?
আওয়াজটা লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলাম। ঝোপটা পেরুতেই দেখতে পেলাম—এক বুড়ো সাঁওতাল শুয়ে শুয়ে কঁকাচ্ছে—পাশে একটা মাদল।
সাঁওতাল বুড়োর বয়স কম করেও নব্বুই হবে, মাথার সব চুলগুলোই শনের মতো সাদা। গোঁফ, দাড়ি এমনকি ভুরুর চুলগুলোও পেকে গেছে। গায়ের চামড়াও তুবড়ে গেছে। বুড়ো হাতের ইশারায় আমাকে কাছে ডেকে জিগ্যেস করলে : তুর নাম কি রে?
–কেনারাম।
—ভগবানই তুকে এখানে লিয়ে এসেছে। আমি আর বাঁচতে লারব। তু আমাকে জল খিলাতে পারিস—তুর উপকার হবে।
বুড়োর অবস্থা দেখে দয়া হলো। অতএব দূর গ্রাম থেকে মাটির কলসী করে জল নিয়ে এলুম। বুড়ো ধুঁকছিল, প্রায় শেষ অবস্থা ।
কোনো রকমে কিছুটা জল খাওয়ানো গেল। জল খেয়ে বুড়ো বলল : তুরে ধন্যবাদ জানাই, ভাগ্যি তুই এসেছিলি, তাই শেষ সময়ে জলটুকু খেতে পেলুম। আমি আর বাঁচব লাই। তুই আমার মাদলটা লিয়ে যা—তু’র ভাগ্য ফিরে যাবে।
বুড়োর কথা শুনে আমার হাসি পেল, বললুম : এই মাদলের দৌলতে তোমার ভাগ্য যখন ফিরল না, তখন আমার ভাগ্য ফিরবে কি করে?
বুড়ো ধীরে ধীরে বলল : আমার কথা তু শুন। আমার ভাগ্য ফিরে গেছিল, এই মাদলের দৌলতে আমি সাত রাজার ধনও পেতুম, তাঁনারা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছিল বটেক। আমরা ছেলেপুলেরা এখন তা ভোগ করছে। বুড়ো হইয়ে গেছি, আর এখন তেঁনাদের সঙ্গে সারারাত নাচতে পারি না। আর ছেলেপুলেরা তা পছন্দও করছে না ।
সমাজের মাতব্বর আমাকে গাঁ থেকে তাইড়ে দিয়েছে। ভেবেছিলুম অন্য কুথাও গিয়ে আবার মাদল বাজিয়ে ভেল্কী দেখাব। তা আর হল কই? এখন মারা যেতিছি। আমার কথা শুন, শনিবার বা মঙ্গলবার অমাবস্যা রাতে খোলা জায়গায় এই মাদলটা বাজাতি শুরু করবি। কিছুক্ষণ বাজাতি থাকলিই তেঁনারা আসবেক মুটেও ভয় পাবি না। সারা রাত ধরে নাচতি হবি কিন্তুক।
—তাঁনারা কে?
—ভূত-পেত্নীর দল ; তুকে ঘিরে উরা নাচবেক, ভয় পাবি না মুটে। নাচ শেষে ভোর রেতে উরা চইলে যাবে। যাওয়ার আগে তুকে অবশ্যই কিছু দিয়ে যাবেক। উতেই তোর সংসার খরচ চইলে যাবে। তুর কুনো ভাবনা থাকবেক না। ভয় পাবি না মুটে। উরা জ্যান্ত মানুষ থিকা অনেক ভালো, দু’একটা অবিশ্যি খারাপ আছে। তবে উদের সর্দারকে বলে দিলে দিব্যি উচিত শিক্ষে দিয়ে দিবেক। কুনো ভয় নাই তুর। আমার সময় হইয়ে গেল। আমি যেতিছি।
বুড়ো দু’বার ঢোক গিলে কাৎ হয়ে গেল।
পাশের গ্রামের লোকেদের সাহায্যে বুড়োকে নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে দাহ করলুম। মুখাগ্নিও করলুম আমিই। তারপর বুড়োর দেওয়া মাদল নিয়ে বাড়ি এলুম।
—তারপর ? বাড়ি ফিরে এসে মাদল কবে বাজালেন ?
—ছ’দিন পরেই ছিল অমাবস্যা, তাছাড়া শনিবার। অতএব রাতে খেতে গিয়ে বউকে বললুম : বউ, তুই দরজা দিয়ে শুয়ে পড়। আমি সামনের মাঠে গিয়ে মাদল বাজাচ্ছি। দেখি ভাগ্য ফেরানো যায় কিনা !
বউ বলল : আমার কিন্তু ভীষণ ভয় করছে, শেষে না আবার কিছু অমঙ্গল হয় ! .আমি বউকে বললাম : রোজ রোজ আধ-পেটা খাওয়ার চেয়ে একবার চেষ্টা করে দেখি। আর সহ্য হয় না। ভয় করলেই ভয়, ভয় না করলে কিসের ভয়?
আজ এখানে যে তেতলা বাড়ি দেখছেন, এখানে ছিল আমার কুঁড়েঘরখানা। বর্ষায় জল পড়ত, ঝড়ে ভয় হতো। ছিল দু’বিঘা জমি। এখন আমার দু’হাজার বিঘে জমি। সদরেও একটা দোতলা বাড়ি আছে। সবই ওদের দৌলতে।
–আপনি মাদল নিয়ে প্রথমে যখন অমাবস্যার রাতে বাজালেন, তখন কি হলো বলুন ?
–বউ দরজা দিয়ে শুয়ে পড়ল, আর আমি মাদলটা বাগিয়ে ধরে মাঠে দাঁড়িয়ে বাজাতে লাগলুম। বাজাতে বাজাতে ঘেমে নেয়ে উঠলুম। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তায় অমাবস্যা। কিন্তু আমার যেন কেমন নেশা ধরে গিয়েছিল। মাদল বাজাতেই থাক্কুম ধিতাং ধিতাং বোল মাদলে তান তোল।
বেশ কিছুক্ষণ বাজানোর পর, দূরে কাদের যেন খিল্ খিল্ হাসি শুনতে পেলুম। প্রথমে ভয় পেয়ে গেলুম। কিন্তু জেদ চেপে গেল, আরও জোরে জোরে বাজাতে থাকলুম । ধিতাং ধিতাং ধিতাং মাদল বাজাতে বাজাতে নিজেও নাচতে থাকলুম।
কিছুক্ষণ পরে দূরের দিকে তাকিয়ে দেখলুম—শয়ে শয়ে চোখ যেন জ্বলছে। বাঁশবনের ওধারে, কেওড়া গাছের ওধারে, এমনিক গাব গাছের ওধারে শয়ে শয়ে চোখ—অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে উঠছে। অন্য লোক হ’লে ঐসব দেখেই ভয়ে মূর্ছা যেত। কিন্তু মরীয়া হয়ে অসীম সাহসে ভর করে মাদল বাজাতে থাকলুম।
কিছুক্ষণ পরে লক্ষ্য করলুম সেই অন্ধকারে জ্বলে ওঠা হাজার হাজার চোখগুলো ক্রমশঃ যেন আমার দিকে এগিয়ে আসছে। চোখগুলো যেন চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেলছে। ওরই মধ্যে শুনতে পেলুম পেঁচার কর্কশ চীৎকার, বাদুড়ের ডানার ঝপটপি; শকুন-বাচ্চাদের ওঁয়াও ওঁয়াও কান্না। আমার শরীরের রোমগুলো আপনা থেকে খাড়া হয়ে উঠল।
তবু নেশার ঘোরে মাদল বাজাতে থাকলুম। কিছুক্ষণ পরে টের পেলুম, মাদলের তালে তালে আমার চারপাশে অশরীরী আত্মাগুলো নাচছে। পায়ের নীচের মাটিও যেন সেই সঙ্গে কাঁপছে। সারারাত ধরে মাদল বাজালুম। সারারাত ধরে ওরা নাচল।
মাঝে মাঝে ওদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ চীৎকার করে উঠল : বাঁহ বা, বাঁহ বা বেশ, বেশ। ঘুরে ঘুরে মাঁদর বাঁজাতে বাঁজাতে নাচো বাঁওয়া।
আমার মধ্যে যেন একটা কি হয়ে গেল—সারারাত ধরে কি করে যে মাদল বাজালুমনিজেও বুঝতে পারিনি। যেন আমাকে মাদল বাজানোর নেশায় ধরে বসেছিল। কাণ্ডজ্ঞান হারিয়েই মাদল বাজাচ্ছিলুম, আমার চারপাশ দিয়ে যে ভূত-পেত্নীরা নাচছিল, সে-খেয়ালও আমার ছিল না। আমি যেন কেমন হয়ে গিয়েছিলাম।
নেশার ঘোরেই বাজিয়েছিলুম সারারাত। কি পাব কি পাব না তা জানতুম না। ভূতপেত্নীরা আমার মাদলের বাজনা শুনে—আমার ঘাড়টিও মটকে দিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ওরা কখন যে চলে গেল, তাও টের পাইনি।
আমি মাদল বাজাতে বাজাতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলুম, ভোরবেলা স্ত্রীর ডাকে জ্ঞান ফিরে এল। স্ত্রী আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক। আমি যেন আর আগের মতো নেই। চোখ দু’টো জবাফুলের মতো লাল, গায়ে যেন বিষম জ্বর।
—মাদলটা তুলতে গিয়ে দেখি মাদলের নীচে পড়ে আছে দশ-পনেরোটা মোহর! সেই থেকে ভাগ্যের চাকাটা ঘুরে গেল।
আমার স্ত্রী বলল : যা পেয়েছো তাই যথেষ্ট, আর ওদের জন্যে রাত জেগে মাদল বাজাবার দরকার নেই।
কিন্তু আমি ভূত-পেত্নীদের ছাড়তে চাইলে ওঁরা আমাকে ছাড়বে কেন? পরদিন রাতে বাড়িতে শুয়ে রয়েছি। বউ ঘুমিয়ে পড়েছে, আমার তখনও ঘুম আসেনি। রাত তখন বারোটা হবে।
আমার মনে হলো কারা যেন বাইরে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে! আমি চীৎকার করে জিগ্যেস করলুম : বাইরে কারা দাঁড়িয়ে, জবাব দিন।
ওদের মধ্যে থেকে কে যেন নাকি সুরে জবাব দিল : আঁমরা!
—চিনতে পাচ্ছি না তো, নাম বলুন।
–আমাদের কি নাম আছে, যে নাম বলব? বাঁইরে আঁয় ঠিক চিনতে পারবি।
—বলুন না, আপনারা কে?
—আমরা হলুম তাঁরা, যাঁরা কাল রাতে এঁসেছিলুম রে! বুঝতে পারলুম তেঁনারা এসে গেছেন, অতএব আমাকে উঠে গিয়ে ওদের নাচে সঙ্গে তালে তালে মাদল বাজাতে হবে।
তবু বললুম : বউ যে বারণ করছে!
ওধার থেকে কে যেন বলল : বউ বারণ করলে শুনবি কেঁন? আমরা তোঁকে সোঁনার মোহর দেঁব। বঁউকে গয়না গঁড়িয়ে দিস। তাহলেই সে মুখ বুজে থাকবে—মুখে রা কাড়বে নাঁ।
অতএব, বউ-এর নিষেধ না শুনে সেদিনও মাদল বাজালুম, ওরাও তালে তালে নাচতে থাকল। সে কী নাচ ভূতদের। বাজাতে বাজাতে আমি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লুম, কিন্তু ওঁরা কেউ পরিশ্রান্ত হল না, অতএব সারারাত একনাগাড়ে বাজিয়েই যেতে হলো।
ক্রমে ক্রমে ওদের নাচের সঙ্গে মাদল বাজানো আমারও নেশার মতো হ’য়ে গেলো। অর্থাৎ আমার বেশ নেশা হয়ে দাঁড়াল।
বউ কিন্তু আমার এই অবস্থা দেখে ভয়ানক ঘাবড়ে গেল। বললে: যথেষ্ট হয়েছে, আর আমাদের টাকার দরকার নেই, ওই মাদলখানা পুড়িয়ে ফেলে চল আমরা অন্য কোথাও চলে যাই।
কিন্তু চলে যাই বললেই তো আর চলে যাওয়া হয় না।
কুঁড়েঘরের জায়গায় তেতলা বাড়ি হলো, বহু জমিজমা কিনে ফেললুম—বলতে গেলে তেঁনাদের দৌলতেই।
আশেপাশের লোকেরা আমার এই হঠাৎ বড়লোক হওয়াতে হিংসেয় জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল।
শত্রুতা আমার সঙ্গে আশেপাশের লোক কম করেনি, কিন্তু ভূতদের দৌলতে কেউ আমার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি। পাশের গ্রামের মহাদেব মণ্ডলও শত্রুতা কম করেনি। মহাদেব ছিল ডাকাত দলের সর্দার। এক রাতে প্রায় দু’শ লেঠেল নিয়ে আমার বাড়িতে হানা দিয়েছিল। ওর লোভ হয়েছিল আমার ধনদৌলতের ওপর। ভূতের ব্যাপারটা মহাদেব একদম বিশ্বাস করেনি, নইলে অমাবস্যার রাতে এভাবে দলবল নিয়ে আমার বাড়িতে হানা দিত না। সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত, তায় মঙ্গলবার।
আমার স্ত্রী নিচের ঘরে ঘুমুচ্ছিলেন, আমি ছাদের ওপর মাদল বাজাচ্ছি, আর ভূতপেত্নীরা নাচছে। এমন সময় মহাদেব মণ্ডল দলবল নিয়ে আমার বাড়ি আক্রমণ করলো,
সঙ্গে দু’শ লোক।
সদর দরজা ভেঙে ফেলতেই, আমার স্ত্রী ছুটে এল ওপরে আমাকে খবর দিতে। আমার স্ত্রী কখনও ছাদে গিয়ে ভূতেদের নাচ এর আগে দেখেনি। তাঁর দেখা বারণও ছিল। ভূতের সর্দার একদিন আমায় বলেছিল : তোঁর স্ত্রী যেন কখনও ওঁপরে না আসে, এঁকে আমাদের দেখতে বিতিকিচ্ছিরি, তাঁরপর আমাদের নাঁচ দেঁখলে—ভঁয়েই মাঁরা যাবে। মানুষের মেয়ে তো !
আমি বলেছিলুম। আমিও তো মানুষ।
ভূতের সর্দার হেসে বলেছিল : আমাদের নাচ দেখতে দেখতে তোর সেঁ অঁব্যেস হঁয়ে গেছে—তোর ভয় থাকবে কেঁন?
কিন্তু সে-রাতে মহাদেব মণ্ডল তার দলবল নিয়ে আমার বাড়ি চড়াও হওয়াতে— আমার স্ত্রী সাময়িকভাবে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন, ফলে চাকরটাকে খবর দিতে না বলে—উনি নিজেই ওপরে চলে এসেছিলেন।
ফলে যা হবার তাই হ’লো নীচে ডাকাত দল, ওপরে ভূতের নাচ। সহ্য করতে পারবে কেন? ভূত-পেত্নীদের দেখে উনি গোঁ গোঁ করতে করতে হার্টফেল করে মারা গেলেন । আমি ছাদের একপাশে নেশার ঘোরে মাদল বাজাচ্ছিলুম—একদল ভূত-পেত্নী মাদলের তালে তালে নাচছিল। নিচে হইচই, স্ত্রীর মৃত্যু—কোনো-কিছুই আমি টের পাইনি। ভূতের সর্দার এগিয়ে এসে আমায় বললে : ওঁরে সব্বনাশ হইয়েছে, তোর স্ত্রী ওপরে কি কারণে এঁসেছিল, আমাদের নাঁচ দেখে হঠাৎ হাঁট:ফেল করে মইরে গেঁছেরে! অতএব মাদল ফেলে রেখে আমি সিঁড়ির কাছে ছুটে এসে দেখি—আমার স্ত্রীর দেহে প্রাণ নেই।
তবুও পেত্নীরা তাঁর সেবা-যত্ন করে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু ভূতের সর্দার আমার স্ত্রীর নাড়ী পরীক্ষা করে বললেন : শেষ হইয়ে গেছে। এঁকে আঁর বাঁচানো যাবে না।
ইতিমধ্যে একটা ভূত এসে বলল : কেঁনাবাবু! তোমাদের বাঁড়িতে বুঝি ডাকাত পড়েছে, নীচেঁ ভীষণ হইচই হচ্ছে।
ভূতের সর্দার খুঁজন তাগড়া ভূতকে কাছে ডেকে বললো : ডাকাতদের বাঁড়ি থেকে তাইড়ে দিয়ে আঁয়, এমন শিক্ষে দিয়ে আয়—যাঁতে এ বাঁড়িতে কোনদিন যেন ডাকাতি করতে না আঁসে।
অতএব ছ’জন তাগড়া ভূত ডাকাতদের মোকাবেলা করতে সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে গেল। নিচে বিরাট হইচই।
পরদিন ভোরে, ভূতেরা চলে যেতেই, আমি নিচে নেমে দেখলুম, সব ঠিক আছে। শুধু সদর দরজা ভাঙা।
চাকর বেটা দিব্যি নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে তখনও। সারারাত যে এত কাণ্ডকারখানা ঘটে গেছে—কিছুই টের পায়নি। ঘুম বটে!
লোকমুখে খবর পেলুম—মহাদেব বেটা শেষ। তার দেহ পাওয়া গেছে ডোবার ধারে, আর মুণ্ডু পাওয়া গেছে সাত মাইল দূরে সাতগাঁয়ে !
ডাকাতদলের অন্য কারও কোনো পাত্তা নেই, কাল রাতে সারা অঞ্চল জুড়ে নাকি প্রবল ঝড়ের তাণ্ডব চলেছে। বহু গাছ-গাছালি উপড়েছে।
এবং আমার বাগান-বাড়িতে সে-ঝড়ের কোনো রেশ লাগেনি।
ছেলে-মেয়েদের ডাকলুম, আত্মীয়স্বজনদের ডাকলুম, কারণ আমার স্ত্রীর সৎকার করার ব্যবস্থা করতে হবে। দু’জন ছাড়া কোন আত্মীয়ই এল না, কি করবো ভাবছি। এমন সময় চারটে বেহারী কুলি এসে হাজির হলো।
একটা কুলি আমার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল : কেনাবাবু আমরা আসলে কিন্তু সেই। তোমার স্ত্রীর দেহ শ্মশানে বয়ে নিয়ে যাওয়ার লোক জুটছে না বলে–সর্দার আমাদের পাঠিয়ে দিয়েছেন। কাউকে বলো না যেন আমরা ভূত। অতএব ভূতেদের সাহায্যেই স্ত্রীর দেহ শ্মশানে নিয়ে গেলুম, দাহ করা হলো যথারীতি।
ছেলেপুলেরা আমার গঞ্জের বাড়িতে চলে গেল। তারা কেউ এ বাড়িতে থাকতে রাজী নয়। মাদল বাজানোও শিখতে রাজী নয়।
বড়ো ছেলে তো স্পষ্টই বলল : তুমি মাদল আর ভূতদের নিয়েই থাক, আমরা এ বাড়িতে আর আসছিনে।
গঞ্জের বাড়িতেই স্ত্রীর শ্রাদ্ধ-শান্তি করে এ বাড়িতে ফিরে এলুম।
একদিন দুপুরবেলা ঘুমিয়ে রয়েছি। চাকরটা এসে বলল : বাবু পেত্যয় যাবেন না, কর্তামাকে এই মাত্তর দেখতে পেনু!
—কোথায় দেখলি ?
রান্নাঘরের ওপাশের জানালার কাছে তিনি দাঁইড়ে আছেন। আমাকে ইশারা কইরে ডাকলেন। আমি ভয়ে রাম নাম করতে লাগলুম।
আমি চাকরটাকে বকুনি লাগিয়ে বললুম : তোর দেখার ভুল। গত মাসেই তো কর্তমাকে শ্মশানে পুড়িয়ে এলুম। শ্রাদ্ধও হয়ে গেল তাঁর।
—কি জানি বাবু, আমার কিন্তু ভীষণ ভয় লাগতিছে।
কিন্তু পরদিন দুপুরে যথারীতি ঘুমিয়ে আছি, হঠাৎ দরজাটা খুলে যেতেই দেখি— লাল ডুরেশাড়ি পরা একটা বউ, আমার শোবার ঘরে এসে ঢুকল।
আমি চেঁচিয়ে উঠলুম : কে গা তুমি? বউটি ঘোমটা সরাল, চেয়ে দেখি আমার বউ নয়নতারাই বটে।
কিন্তু তাই বা কি করে সম্ভব? আমি তো গত মাসেই রে দেহ দাহ করে এসেছি, তবে কি আমার বউ পেত্নী হয়ে গেল, ঠাকুর-দেবতায় যার এত ভক্তি, হার্টফেল করে মরলেই বা, সে পেত্নী হবে কেন ?
হার্টফেল করে মরা আর অপঘাতে মরা এক জিনিস নয়। মনে খটকা লাগল । নয়নতারা খোনা গলায় বলল : আঁমি কিন্তু মাঝে মাঝেই আসব, এখানেই থাকব। তুমি ছাড়া অন্য কেউ আঁমায় দেখতে পাবে না। কাউকে কিছু বলবে নাঁ। আমি শুয়েছিলুম, নয়নতারা আমার পা টিপতে লাগল, কী শীতল দু’টো হাত—মনে হলো বরফের চেয়েও ঠান্ডা!
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম টের পাইনি।
রাতের বেলা ভূত-পেত্নীরা এল ছাদে নাচতে। আমি ভূতের সর্দারকে একপাশে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করলুম : আমার বউ নয়নতারা বোধ হয় পেত্নী হয়ে গেছে সর্দার।
ভূতের সর্দার কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে আমায় বলল : কি করে বুঝলি, কেঁউ কি এঁয়েছিল ?
—কাল আমার চাকর রসিক রান্নাঘরের জানালার পাশে তাঁকে দেখেছিল, আমি তখন বিশ্বাস করিনি। আজ সে আমার শোবার ঘরে এসেছিল, আমার পা টিপছিল !
ভূতের সর্দার আরও কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল : ও তোর বউ নয় রে, এঁকটা পেত্নী। তোর বঁউ সেঁজে এঁসেছিল, যা আর আসবে না।
সেই থেকে আর পেত্নীটার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।
কেনারামবাবু তাঁর বক্তব্য শেষ করে বললেন : আপনি বহুদূর থেকে এসেছেন, খাওয়াদাওয়া করে বিশ্রাম নিন। রাতে তেঁনাদের দেখতে পাবেন অবশ্য যদি দেখতে চান!
—দেখব বলেই তো এসেছি।
খেয়েদেয়ে কতক্ষণ ঘুমিয়েছি কে জানে? সেদিনও শনিবার, অমাবস্যা। সন্ধ্যের পরই ছাদে অনেকের চলাফেরার শব্দ পেলুম।
রসিক ফিসফিসিয়ে বলল : বাবু তেঁনারা এসে গেছেন, আমাদের বাবু একটু পরেই মাদল নিয়ে ছাদে যাবেন, নাচও শুরু হবে।
রাত বারোটাতেই মাদলের আওয়াজ পেলুম, ভয় হচ্ছিল মনে মনে—এই বুঝি শেষ রাত! তবু ওপরে উঠে গেলুম, ধীর পায়ে। যে দৃশ্য দেখলুম—তা এ জীবনে ভুলতে পারব না।
কেনারামবাবু মাদল বাজাচ্ছেন—আর প্রায় শ’খানেক ভূত ও পেত্নী তাঁকে ঘিরে তালে তালে নাচছে।
এ দৃশ্য কতক্ষণ দেখেছিলুম জানি না, দু’টি ভূত আমাকে নাচের আসরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে এল।
—ভঁয় কি মশায় আসুন, আমাদের সঁঙ্গে বেঁচে আঁনন্দ পাবেন !
আনন্দ আমার ধাতে সইল না, ওঁদের এগিয়ে আসতে দেখেই জ্ঞান হারালুম। পরদিন সকালে চোখ মেলে দেখি, আমি রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে একটা বেঞ্চিতে শুয়ে রয়েছি আমাকে এখানে সম্ভবতঃ কেনারামবাবুর সেই ভূতের দলই রাতারাতি পৌঁছে দিয়ে গেছে—নতুবা এখানে কি করেই বা এলুম?
—সমাপ্ত—
