Accessibility Tools

ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

দ্বিতীয় অধ্যায়—দুইটি তরঙ্গ উঠি

শ্যালদা স্টেশনে আজ যেন লোকজনের গাদি লেগেছে। সেই যবে মার্চ মাসের শুরু থেকে এই পোড়া শহরে প্লেগের উপদ্রব শুরু হয়েছে, লোকজন আর কলকেতায় থাকতে চাইছে না। যাদের সামান্য সামর্থ্য আছে, তাদের কেউ পশ্চিমে, কেউ-বা উত্তরের দিকে পা বাড়াচ্ছেন। সরকারের অবশ্য চেষ্টার কসুর নেই। কিন্তু ব্ল্যাক টাউনে মানুষের গা লাগালাগি ভিড়। না আছে নিকাশি ব্যবস্থা, না আছে পানীয় জল। এদিকে সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে যেতে গররাজি। কারা যেন গুজব ছড়াচ্ছে, হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ‘নেটিভ’দের মাথা থেকে একরকমের তেল বার করে নিচ্ছে ইংরেজ চিকিৎসকরা। তাতে প্লেগ না গেলেও মানুষ প্রাণে মারা যাচ্ছে। অতএব উপায় একটাই। প্রাণ নিয়ে যে যেদিকে পারো পালাও, নয়তো পচে মরো।

এককালে হাওড়াই ছিল এখানকার একমাত্র বড়ো স্টেশন। সেখানে যেতে গেলে পল্টুন ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে যেতে হত। মাননীয় ইংরেজ বাহাদুর এদানি তাই শিয়ালদহের নিচু জলাজমিতে প্রায় দশ মানুষ মতো গর্ত করে, মাটি ফেলে এই স্টেশন বানিয়েছেন। তবে স্টেশন বলতে একটা বড়ো টিনের চালাঘর আর কয়েকটা বাঁধানো প্ল্যাটফর্ম বাদে বিশেষ কিছু নেই। দুপুরের গরমে তেতে ওঠা সেই চালাঘরে পশ্চিমা হিন্দুস্থানি, মাথায় গাঁটরি নিয়ে সতর্ক বেহারি আর আসামগামী মানুষজন শুয়ে-বসে রয়েছে। একটু সরে বসতে বললেই বিজাতীয় ভাষায় গাল পাড়ছে। টিকিট নেবার ভয়ানক গোল, ততোধিক বেবন্দোবস্ত। ভিড় সামলাতে পুলিশের একজন মাঝে মাঝেই লাইনে ছপটি মারছেন আর তেড়ে উঠে “লাইন সিধা রাকখো” বলে হাঁকছেন। ছোটোখাটো চেহারার ফতুয়াধারী এক যুবক হাতে কার্পেটের ব্যাগ নিয়ে অনেকক্ষণ ভিড়ের মধ্যে দিগভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিল। বেচারি সদ্যবিবাহিত। তাও স্বেচ্ছায় নয়। পরিস্থিতির গতিকে। আর সামলে উঠতে না উঠতে এই প্লেগের উপদ্রব। এখন এই কিশোরী বধূটিকে নিয়ে যে সে কী করবে, মধ্যে মধ্যে ভেবে উঠতে পারে না। স্টেশনে এসে এত গোল দেখে বধূটি কেবলই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কোনও কথার উত্তর দিচ্ছে না। কোনও মেয়ে কাঁদলে কী করতে হয়, তা বেচারার জানা নেই। অনেক ভেবে সে স্থির করল বউয়ের নিশ্চিত খিদে পেয়েছে। না হলে প্রথমবার একসঙ্গে দুজনে পাহাড় দেখতে যাচ্ছে, এতে কাঁদবার কী আছে? গোটা ইস্টেশন ঘুরে তাই সে খাবারের খোঁজ করছে। এই ভিড়ে খাবার পাওয়াও দুষ্কর। অতি কষ্টে শালপাতার দোনায় করে কিছু পুরি-সবজি আর জিলিপি নিয়ে যখন ফিরল, তখনও তার বউটি মাথায় ঘোমটা টেনে শক্ত হয়ে এক কোণে বসে। সামনে হোল্ডঅল, ট্রাঙ্ক আর বেতের ঝুড়ি ভরা গরম জামাকাপড়। বউটির চোখদুটো এখনও জবাফুলের মতো টকটকে লাল।

“অ্যাই দ্যাখো কাণ্ড! এখনও কান্না থামল না তোমার? এই নাও, ধরো ধরো। গরম গরম ভাজিয়ে আনলাম। এবার খেয়ে নাও দেখি!” বলে শালপাতার ঠোঙাটি সে বাড়িয়ে দিল। অপর পক্ষ থেকে সেটা নেবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখা দিল না। বউটি আরও জড়োসড়ো হয়ে একটু সরে বসল। যুবক একটু ইতস্তত করে হাত বাড়িয়েই রইল।

“খিদে পায়নি? তবে কাঁদছিলে যে বড়ো?”

কথায় যেন আগুনে ঘি পড়ল। নবীনা বধূটির চোখের জল কূল ছাপিয়ে গাল বেয়ে টপটপ করে কোলে রাখা আলতামাখা কচি হাতদুটোকে ভিজিয়ে দিল। সেই কোলেই শাড়ির স্তূপীকৃত আঁচল পুঁটুলি করে রাখা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বধূটি যা বলল তা থেকে অতি কষ্টে “আপনি আমাকে পিসিমার কাচে পাঠিয়ে দিন”-টুকু উদ্ধার করতে পারল যুবক।

এবারে কান্নার কারণ কিছুটা মাথায় ঢুকল যুবকের। স্বামী-স্ত্রীর যে সহজ বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, বিবাহের আকস্মিকতার জন্য সে সুযোগ তারা পায়নি। এমনকী বাসর বা ফুলশয্যাটুকুও না। একসঙ্গে ঘর পাতার আগেই প্লেগের ভয়ে কলকাতা থেকে এতদূর তাদের পালাতে হচ্ছে। প্রায় অচেনা এক পুরুষমানুষের সঙ্গে এতটা পথ পাড়ি দিতে ভয় হওয়াই স্বাভাবিক; বিশেষ করে এই মেয়ে ছোটো থেকে কোনও দিন চেনা গণ্ডির বাইরে এক পা রাখেনি। মেয়েটির প্রায় গোটা পরিবার এক ভয়ানক অভিশাপের মতো এক রাত্রে নিকেশ হয়ে যায়। যুবকটি পাকেচক্রে সেই তদন্তেই জড়িয়ে পড়ে। রহস্য উদ্ধার হয়। তারই অনুষঙ্গে অনাথা এই মেয়েটিকেও প্রায় দায়ে পড়েই বিয়ে করতে হয়েছে তাকে। মেয়েটির কাছের মানুষ বলতে এক বিধবা পিসিমা। তবে তাঁর না, মূলত দারোগা প্রিয়নাথ মুখুজ্যের পীড়াপীড়িতে মেয়েটিকে বিয়ে করতে সে একপ্রকার বাধ্যই হয়। প্রিয়নাথ নিজে টিকিট কেটে এই যুগলকে দার্জিলিং পাঠাবার বন্দোবস্ত করেছেন। শুধু করেননি, দার্জিলিংয়ে তাঁর পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়িতে ছুটি কাটানোর ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। মহানুভব মানুষ।

কিন্তু এই গোটা ঘটনায় মেয়েটির অনুমতি যে কেউ নেয়নি, বা তার মনের কথা কেউ জানতে চায়নি, তা আজ, এই শিয়ালদহ স্টেশনে বসে যুবকের মাথায় এল।। খাবারের পাতাটাকে একপাশে রেখে যুবক এই প্রথম তার স্ত্রীর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। এই দারুণ ভিড়েও যেন তারা দুজন একা, এইভাবে মৃদুস্বরে শুধাল, “কেন? তোমার বরটিকে একেবারে পছন্দ হয়নি বুঝি?”

মেয়েটি উত্তর দিল না। শুধু তার কান্নার পরিমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। যুবকের মুখ যেন একটু শুকিয়ে আসে। সামান্য বিব্রত হয়েই বিড়বিড় করে বলল, “তবে তাই হোক। চলো তবে তোমায় বর্ধমানের পিসিমার বাড়িতেই দিয়ে আসি। আমার চালচুলো নেই, চাকরিবাকরি নেই, দেখতেও তেমন ভালো নই…”

ঠিক এইখানে “আমি কি তা বলেচি নাকি?” বলে মৃদু প্রতিবাদ ভেসে এল ঘোমটার আড়াল থেকে। খুবক যেন এতে আরও অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “তবে?”

এতদিনের জমে থাকা সব কথা যেন বাঁধ ভেঙে স্রোতের মতো বেরিয়ে এল, “আমাদের বিয়ে হয়েচে আজ এই এক হপ্তা হল। এই কদিনে একদণ্ডের জন্য ভালো করে আমার সঙ্গে কতা কয়েছেন? না একবারের জন্য মুক তুলে চেয়েচেন? আমি বুজেচি, নিতাও দায়ে পড়ে আপনি আমায় উদ্ধার করেচেন। আমার ঘাট হয়েছে। এবারে আমায় রেহাই দিন।”

এই ছোট্ট মেয়েটির মুখে যে এতগুলো কথা ধরে, তা যুবকের চিন্তার বাইরে। কেমন একটা স্তম্ভিতের মতো সে খানিক বসে রইল। তারপর এদিক ওদিক চেয়ে দেখল আশেপাশে চেনা কেউ আছে কি না। ছিল না। থাকার কথাও না। এবার আরও একটু সরে এসে অতি ধীরে, যেন কোনও পাপকার্য করতে যাচ্ছে, এমনভাবে তার ডান হাত ধীরে ধীরে বালিকা বধূটির পিঠ বেয়ে কাঁধের কাছে এসে স্থির হল। স্পষ্টতই শিহরন জাগল মেয়েটির শরীরে। যুবক তা টের পেল। জীবনে প্রথমবার। যুবক কী বলবে ভেবে পেল না। তারপর তার মনে পড়ে, কিছুদিন আগেই জোড়াসাঁকোর এক নবীন কবির লেখা কয়েকটি লাইন পড়েছিল সে। লাইনগুলো পড়ে পড়ে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। প্রায় শক্ত হয়ে থাকা মেয়েটির কানের কাছে গুনগুন করে সে আউড়ে চলে-

অধরের কানে যেন অধরের ভাষা।
দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে।
গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটি ভালবাসা
তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধর-সঙ্গমে!

ঘোমটার আড়াল থেকে জড়ানো কণ্ঠে জবাব আসে, “এ মা!! ছি ছি! থামুন। আপনার পায়ে পড়ি। লোকে শুনে ফেললে কী বলবে?”

এই নব্য দাম্পত্য প্রেম পেকে ওঠার আগেই রেল কোম্পানির বেরসিক ঘোষক টিনের চোঙা মুখে নিয়ে জানিয়ে গেল আর আধঘণ্টার মধ্যে এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে দার্জিলিং মেল ট্রেন ছাড়বে। সওয়ারিরা যেন টিকিট নিয়ে প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত হয়।