ব্রহ্মপদার্থ – ১০
(১০)
১৯৯৩ সাল। শীতকাল। এবারে কালো গুহামুখ এসে থামল জঙ্গলের ভেতরে। সেখান থেকে যাত্রীরা সবাই বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মাত্র অন্তর্ধান হল গুহামুখ সময় যন্ত্র। জঙ্গল হলেও খুব একটা গভীরে নয়। আবছা গ্রাম দেখা যাচ্ছে।
“কাকে খুঁজতে হবে এখানে?” দুর্গা জিজ্ঞেস করল।
সকলে রামানুজের দিকে তাকাল। রামানুজ মুচকি হেসে বলল, “এবার আগে এই সময়ের গুরুদেবের সঙ্গেই দেখা করতে হবে।”
গুরুদেব হো হো করে হেসে উঠলেন, “আমার সঙ্গেই আমার দেখা! এই সময় কেমন ছিলাম নিজেরই মনে নেই।”
কাঞ্চন বলল, “আমি তখন একেবারেই নেই।”
দুর্গা তাল মেলাল, “আমিও নেই ওই সময়ে।”
“চলো আশ্রমে যাই।” রামানুজ ওদের বলল।
গ্রামের রাস্তায় যখন হাঁটতে শুরু করল তাদের দিকে অনেকের ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে। রামানুজ বস্তাটা কাঁধে করে নিয়ে চলেছে। কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে যে এতেই আছে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী পদার্থ।
নয়ের দশকের জামাকাপড়ের সঙ্গে বাকিদের জামাকাপড়ের মিল থাকলেও রামানুজের আঁটোসাঁটো পোশাক একেবারেই আলাদা। আর তাছাড়া গুরুদেবকে এবারেও অনেকে চিনতে পেরেছে বলে কেউ কিছু বলছে না।
সোজা আশ্রমে এসে উঠল তারা। উঠোনে দাঁড়িয়ে একজন ছাত্রকে ডেকে গুরুদেব কিছু একটা বলতেই সে ছুটল ভেতরে। গুরুদেব সামনে ছিলেন না। ছাত্রটি তাঁকে ডাকতে তিনি প্রায় দৌড়ে এলেন।
এ এক দৃশ্য বটে। এই সময়কালের গুরুদেব এগিয়ে চলেছেন ভবিষ্যতের গুরুদেবের দিকে। দুজন মুখোমুখি দাঁড়ালেন। একে অপরকে নিরীক্ষণ করে চলেছেন। একজন দেখছেন ভবিষ্যতে তিনি কেমন হবেন আর অপরজন দেখছেন অতীতে কেমন ছিলেন।
“ভেতরে আসুন… এসো।”
এই সময়কালের গুরুদেব ভবিষ্যতের জনকে ডাকলেন। সঙ্গে বাকিরাও এল।
কার্যালয়ে এসে বসল সকলে। উৎসাহী আশ্রমবাসীদের জন্য দরজা বন্ধ করে বসলেন তারা।
ভবিষ্যতের গুরুদেব সমস্ত ঘটনা যথা সম্ভব সংক্ষেপে বললেন। এই সময়কালের গুরুদেব বললেন, “আমার জীবদ্দশায় যে আবার এই যন্ত্রটা চালাবার প্রয়োজন পড়বে সেটাই তো ভাবিনি। আর কেউ না জানুক আমি তো জানি যে এই সময়যাত্রা সম্ভব। কিন্তু আবার কর্কটের সঙ্গে দেখা হবে ভেবেই অস্থির লাগছে।”
রামানুজ বলল, “এই সব আটকানো যেতে পারে। যদি আমরা আজ কৈটভের মা আর বাবার বিয়েটাই না হতে দিই সেক্ষেত্রে কৈটভের জন্মটাই মিথ্যে হয়ে যাবে। এখান থেকে কাহিনি অন্য ধারায় বইতে থাকবে।”
বর্তমান সময়কালের গুরুদেব বললেন, “আপনারা সবাই নিশ্চিন্ত থাকুন। এই বিয়ে হচ্ছে না। ফলে এই সময়রেখার আগে ও পরে কৈটভের অস্তিত্ব শূন্য হয়ে যাবে।
সকলেই এটা শুনে আশ্বস্ত হলেন। ভবিষ্যতের গুরুদেব বললেন, “আসি এখন। আমাদের অনেক কাজ বাকি।”
আশ্রমের উদ্যানে এসে দাঁড়াল সকলে। রামানুজ বলল, “এবার সরাসরি ১৯৭৫ সালে যেতে হবে। ব্রহ্মপদার্থ পরিবর্তনের আগের দিন, জগন্নাথ পুরী ধাম।
আশ্রমের উদ্যানের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে সবুজ তরল ছিটিয়ে দিলেন গুরুদেব। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কালো গুহামুখের সৃষ্টি হল। সকলে তার
ভেতরে যেতেই গুরুদেব আর একটা টেস্ট টিউব কালো যন্ত্রের উপর ভাঙলেন।
পরবর্তী কিছুসময়ের মধ্যে আশ্রমের সকলের চোখের সামনে থেকে উবে গেল সমস্ত গুহামুখটা। গুরুদেব হাসিমুখে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন তাঁরই করা আবিষ্কারের সাফল্য।
তারপর গুরুদেব ডাকলেন তাঁর অতি বিশ্বস্ত দুই আশ্রমীকে। “ভামরি ও কুলুটভা-কে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আয়।”
“কেন গুরুদেব? কিছু হয়েছে?”
“হয়নি, হবে। বিয়ে আটকালেও বাচ্চা হতে পারে। তার চেয়ে সাপের মা-বাবাকে মেরে দেওয়াই ভালো। ওসব বুঝবি না তোরা। আমাদের শাস্তি কক্ষে নিয়ে যা ওদের। আমি আসছি একটু পর।”
১৯৭৫ সাল একটা সাল বটে। পুরীর রাস্তার পাশে একটা খোলা মাঠে যখন নামল ওরা তখন মাঠ থেকে লাইন দেখা যাচ্ছে।
“কীসের লাইন ওটা?” কাঞ্চন স্বভাব সুলভ প্রশ্ন করে।
“শোলে রিলিজ করেছে। তখন মানে এখন এই ১৯৭৫-এ তো সব সিঙ্গেল স্ক্রিন ছিল। টিকিটের মারামারিটা আলাদা লেভেলের হত। আচ্ছা গুরুদেব হিসেব মতো আর কতটা টাইম আছে?”
রামানুজের প্রশ্নে গুরুদেব বললেন, “আমাদের ২০২৪-এর হিসেবে সময় আর প্রায় নেই। তাতেই এখানের চুরি শেষ করে আবার ফিরতে হবে ২০৩৫ সালে। প্রধান কারিগর আর কিছু সেকেন্ড পরেই প্রতিস্থাপন করবেন ব্রহ্মপদার্থ।”
ওরা আলো থাকতে থাকতেই পৌঁছে গেলেন পুরীর মন্দিরের সেই গুপ্ত প্রকোষ্ঠের কাছে।
বেদি সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে হলে রাতের বেলাতেই করতে হবে। সুতরাং ওরা এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগল।
তখন মোবাইল নামক মারণাস্ত্র হাতে না থাকায় মানুষজন একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে, কানে একটা হেডফোন না দিয়ে হাঁটছে, বিশুদ্ধ হাওয়ায় শ্বাস নিচ্ছে, প্রকৃতিকে অনুভব করছে।
রামানুজ চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষদের দেখছিল যা আজকের
দিনে প্রায় দুর্লভ।
রাত বাড়ল। লোক চলাচল কমে এল। একসময় যখন এদিকটা একেবারে শুনশান হয়ে গেল তখন চার মূর্তি ধীরে ধীরে বেদিটার কাছে গিয়ে বসল।
কাঞ্চন আর দুর্গা বেদিটার দুদিকে টানতেই খুলে গেল রাস্তা। রামানুজ বলল, সবাই ঢুকে লাভ নেই। বরং আমি যাচ্ছি। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফিরব।”
গুরুদেবও বললেন, “হ্যাঁ। এটাই ভালো হবে। সবাই গেলে দেরি হবে।”
রামানুজ ঢুকে গেল ভেতরে। সে বেদিটাকে ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল। বাকিরা শহরের দিকে চলে গেল। আজ রাতে একটা যা হোক আস্তানা খুঁজে নেবে তারা।
রামানুজ দেখল এবারে এই রাস্তা অনেকটাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ২০৩৫ সালে এই একই রাস্তা অনেক বেশি ধুলোময় ছিল। সে কোনোভাবে এগোতে থাকে টর্চের সাহায্যে। পিঠের মধ্যে সে বেঁধে নিয়েছে বস্তাটা।
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস। কৈটভ অস্থির হয়ে উঠেছে।
“আর কতক্ষণ সময় বাকি? আমার মনে হয় ওরা এতক্ষণে চুরি করে ফেলেছে ব্রহ্মপদার্থ।”
ঠাকুরদার মাথায় একজন নাতি ছাতা ধরে আছে। তিনি একটা চেয়ারে বসে আছেন। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাবছিলেন। ওই অবস্থাতেই বললেন, “আরো সাত মিনিট বাকি আছে। যা হবে সাত মিনিট পর। মিথ সংঘ নিজের কথা পালটায় না কৈটভ।”
“কিন্তু ততক্ষণে ওরা যদি আমাদের ফাঁকি দিয়ে পালায়।” ঠাকুরদা হাসলেন।
“আমার আর গুরুদেবের মধ্যে একটাই পার্থক্য। গুরুদেব আবিষ্কার করে থেমে যান, আর আমি আবিষ্কারকে আপডেট করি। কই হে বাক্সটা আনো।”
একজন নাতি একটা কালো বাক্স নিয়ে এল। ঠাকুরদা সেটা হাতে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় খুলে ফেললেন। সিনহা সাহেবও উৎসুক হয়ে পড়লেন সেটা দেখার জন্য। কিন্তু কাছে এলেন না।
কৈটভ বাক্সটা হাতে নিয়ে দেখল একটা গোল চাকতি।
“এটা কী? কী হয় এটা দিয়ে?”
ঠাকুরদা নির্লিপ্ত থেকে বললেন, “টাইম ট্র্যাকার।”
কৈটভের চোখ চকচক করে উঠল, “তার মানে…”
ঠাকুরদা কেড়ে নিলেন তার মুখের কথা, “তার মানে ওরা কোথায় কোথায় গেছে তা সহজেই আমরা জানতে পারব। চিন্তার কোনো কারণ নেই।”
হাসি ফুটল কৈটভের চোখে। এ হাসি প্রশান্তির নয়, সর্বগ্রাসী হাসি।
২০২৫-এর নিরিখে এই ছোটো ঘটনা চলার মধ্যেই ১৯৭৫-এ একদিন কেটে গেছে। ২০৩৫ এ কেটেছে কয়েক সেকেন্ড মাত্র। এ এক আজব সময়ের ডাইমেনশন।
রামানুজ এখন লুকিয়ে দেখছে প্রধান কারিগর মই বেয়ে উঠেছেন পুরোনো শ্রীবিগ্রহ থেকে ব্রহ্মপদার্থ বের করবেন বলে। সেটা তিনি হাতে নেওয়া মাত্র নীল আলোয় ভরে উঠল গর্ভগৃহ। এরই মধ্যে রামানুজ দেখল একটা ছোটো বাচ্চাও আছে আজ গর্ভগৃহে।
রামানুজের মনে পড়ল বাল্মীকি মহারাজের কথা। বাচ্চাটা যে শিশু বাল্মীকি তাতে সন্দেহ নেই। এরই মাঝে বাইরে একটা শব্দ হল।
প্রধান কারিগর কেঁপে উঠলেন। কেউ একজন তাঁকে ডাকলেন, “বাইরে এসো। অযাচিত মানুষ ঢুকে পড়েছে। ব্রহ্মপদার্থ রেখে বাইরে এসো।”
প্রধান কারিগর কিছু বুঝে উঠতে না পেরে বাচ্চাটিকে বললেন, “বাল্মীকি তুমি দস্তানা পড়েছ?”
“হ্যাঁ দাদা মহারাজ।”
“চোখে কাপড় দিয়েছ?”
“হ্যাঁ দাদা মহারাজ।”
“তোমার হাতে আমি ব্রহ্মপদার্থ দিচ্ছি। সাবধানে ধরে রাখতে হবে? ভবিষ্যতে তোমাকেই সামলাতে হবে এই গুরু কাজ। আজ তার শুরুয়াত হচ্ছে। পারবে?”
বাচ্চাটি দৃঢ় স্বরে বলল, “পারব দাদা মহারাজ।”
প্রধান কারিগর শিশু বাল্মীকির হাতে ব্রহ্মপদার্থ দিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য গর্ভগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
রামানুজ কালবিলম্ব না করে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বেরিয়ে এল প্রকোষ্ঠ থেকে। ব্রহ্মপদার্থকে এই প্রথম সে নিজের চোখে দেখল। নীল আলোর প্রখরতায় চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত পদার্থ।
যত তাড়াতাড়ি রামানুজ কাজটা করবে ভেবেছিল সেটা তত তাড়াতাড়ি করা গেল না। ব্রহ্মপদার্থকে নিজের চোখে দেখছে সে। এ এক আশ্চর্য হৃদপিণ্ড। ক্রমাগত তড়িৎ সৃষ্টি হচ্ছে এর চারদিকে। শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটছে। পদার্থটা কাঁপছে শিশুর হাতে।
রামানুজ নতজানু হল এই পদার্থের সামনে। সে শ্রীকৃষ্ণের হৃদয়কে প্রণাম করল।
তারপর ধীরে ধীরে বস্তা থেকে বের করল ২০৩৫ সালের ব্রহ্মপদার্থ। দু-দুটো ব্রহ্মপদার্থের আলোয় দৃষ্টি ধরে রাখতে পারা যাচ্ছে না। এক হাতে ১৯৭৫-এর ব্রহ্মপদার্থ তুলে নিয়ে অন্য হাতে রেখে দিল ২০৩৫-এর অধিক শক্তিশালী ব্রহ্মপদার্থ। বস্তায় ঢুকিয়ে নিল ১৯৭৫-এর ব্রহ্মপদার্থটিকে।
শিশু বাল্মীকি কিছু বুঝতেও পারল না। রামানুজ তখনই শব্দ পেল, প্রধান কারিগর আসছেন। সময় আর নেই।
এক্ষুনি ঢুকেই রামানুজের সঙ্গে ধাক্কা খাবেন তিনি। রামানুজ আঁতকে উঠল। প্রধান কারিগর ততক্ষণে ঢুকে পড়েছেন।
রামানুজ এক লাফে প্রকোষ্ঠের দিকে সরে গেল। মাইক্রোসেকেন্ডের জন্য দুজনের ধাক্কা লাগল না।
প্রধান কারিগর শিশু বাল্মীকির হাত থেকে তুলে নিলেন ব্রহ্মপদার্থ। রামানুজ কোনো শব্দ না করে ধীরে ধীরে প্রকোষ্ঠে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
সকলের চোখ বাঁধা থাকায় কেউ ধরতে পারল না।
প্রকোষ্ঠের বাইরের রাস্তার দিকে পা বাড়াল রামানুজ। কিছুদূর চলার পরেই সে দেখতে পেল প্রকোষ্ঠে কয়েকজন মানুষ। সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
অন্ধকারে এমনিতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। সে বস্তাটা পিঠের সঙ্গে বেঁধে নিল। হাতে নিল রিভলভার। একজন মানুষ এদিকেই এগিয়ে আসছে।
পকেট থেকে টর্চটা বের করল এবার। ততক্ষণে লোকটা আরও এগিয়ে এসেছে। টর্চটা জ্বালতেই রামানুজ আশ্চর্য হয়ে গেল।
“গুরুদেব আপনি?” গুরুদেব এগিয়ে এসেছেন ততক্ষণে।
“কাল শহরে যাবার পথে মনে হল কয়েকজন আমাদের সন্দেহ করছে। তবে এর পেছনে কাঞ্চনের একটা মুর্খামি আছে। সে শোলে সিনেমার একটা পোস্টার নিয়েছিল দেওয়াল থেকে খুলে। তখনই ওরা পিছু নিয়েছিল। তাই আর শহরে যাইনি। ওদের রাস্তায় ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ করে আমরা এই এলাকায় চলে আসি আর বেদি সরিয়ে প্রকোষ্ঠে ঢুকে পড়ি। নিরাপদভাবে চব্বিশ ঘণ্টা কাটানো দিয়ে কথা। কাটিয়ে দিলাম।
“তাহলে ভেতরে আসেননি কেন? আমি সারাদিন ওখানে একা ছিলাম।” গুরুদেব হেসে বললেন, “এখন আড্ডা মারার সময় নয়, তাই আসিনি। এবার চলো।”
সকলেই গুরুদেবের কথায় হেসে ফেলল। গুরুদেব বললেন, “এবার আবার ভবিষ্যত যাত্রা। ২০৩৫-গিয়ে বাল্মীকি মহারাজের হাতে তুলে দিতে হবে ১৯৭৫-এর ব্রহ্মপদার্থ।”
হঠাৎ রামানুজ গুরুদেবের হাত ধরে ফেলল, “আমি ব্রহ্মপদার্থ দেখেছি গুরুদেব। এটা অসম্ভব শক্তিশালী একটা বস্তু। কোনোভাবে এটা কৈটভের হাতে লাগলে অনর্থ হয়ে যাবে।”
“সেই সমস্যা দূর করতেই তো তুমি প্যারাডক্সের আশ্রয় নিয়েছ। অল্টারনেট কাহিনি অতীতে এতক্ষণে নিশ্চয়ই শুরুও হয়ে গেছে। ২০১১-তে হেমন্তাই কৈটভকে জঙ্গলে যেতে দেয়নি। ১৯৯৩-এ কৈটভের মা-বাবার বিবাহ ঘটেনি। ইতিহাস পালটে গেছে। আমার মনে হয় আমরা ফিরে গেলেও ওরা আর কিছুও করতে পারবে না। শুধু মৃত কৈটভ আর গন্দবেরুন্দার খোলস আমাদের হাতে চলে এলে কৈটভ শক্তিহীন হয়ে পড়বে।”
রামানুজ মাথা নাড়ল।
“আমিও তাই চাই গুরুদেব। যা যা করার করে দিলাম। চলুন ২০৩৫ সালে।”
ওরা যখন যাত্রার প্রস্তুতি করছে তখন ২০২৪-এ কৈটভ সময় দেখছে।
“আর এক মিনিট বাকি।”
“আপনাকে আমি কয়েকজনকে নিয়ে আসতে বলেছিলাম। ওরা কোথায়?”
ঠাকুরদা বললেন, “এখনও এক মিনিট সময় বাকি।”
“আমি কিন্তু এরপর আর অপেক্ষা করব না।”
“আমি আর তোমাকে অপেক্ষা করতে বলবও না।”
“আমার কৈটভ বাহিনী কোথায়?”
ঠাকুরদা নাতিদের হাত দিয়ে ইশারা করলেন। ওরা কয়েকজন গুহামুখের পিছন দিকে চলে গেল।
কুড়ি সেকেন্ডের মাথায় একটা বাক্স নিয়ে হাজির হল তারা। বাক্সটাকে রাখা হল গুহামুখের ঠিক সামনে।
ঠাকুরদা পকেট থেকে নিজের লাইটারটা বের করে একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর লাইটারের মাথাটা উলটে একটা বোতামে টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে বাক্সটা বড়ো হতে লাগল। পূর্ণাঙ্গ হবার পর কৈটভ-সহ সকলে দেখল একটা গরাদের সৃষ্টি হয়েছে।
তার ভেতরে রয়েছে কৈটভ বাহিনী। প্রত্যেকেই মৃত কৈটভের কারণে অধিক শক্তিশালী এবং অধিক হিংস্র। বহুদিন পর ওরা ওদের ঈশ্বর কৈটভকে দেখতে পেয়েছে। গরাদের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে ওরা শব্দ করতে লাগল।
সিনহা ভয় পেয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। ফোর্স নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নিল। কিন্তু সিনহা সবাইকে অস্ত্র সংবরণ করতে বলল।
কৈটভ ঠাকুরদার দিকে তাকাল। তিনি শুধু নিজের হাতের লাইটারটা দেখিয়ে বললেন, “এনলার্জার। আমার আবিষ্কার। ওদের প্রথম থেকে এখানে এনে প্রকৃত সাইজে রেখে দিলে কাজে বিঘ্ন ঘটত।”
কৈটভ বাঁকা হাসি হাসল। দু-হাত দেখিয়ে তালি দিল। প্রশংসা করল ঠাকুরদার। ঠাকুরদা শব্দ করে হাসলেন।
কৈটভ এগিয়ে গেল তার কৈটভ বাহিনীর দিকে। ওরা কৈটভকে দেখতেই দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে এগিয়ে এল। গরাদের ভেতরে থাকায় কেউ কৈটভকে ছুঁতে পারছে না। তাদের ঈশ্বর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এর জন্যই তারা এখনও জীবিত।
“আজ আবার ধ্বংসলীলা চালাতে হবে। তৈরি হও তোমরা।” কৈটভ বাহিনী হুংকার দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
ততক্ষণে ২০৩৫-এ পৌঁছে গেছে রামানুজ। সোজা ওরা অবতরণ করেছে সুড়ঙ্গের ভেতরে। বাল্মীকি মহারাজ অপেক্ষা করছিলেন। তাদের দেখেই বললেন, “আপনারা এত তাড়াতাড়ি এলেন কীভাবে? এই মাত্র তো গিয়েছিলেন।”
রামানুজ দৌড়ে তাঁর হাতে ১৯৭৫ সালের ব্রহ্মপদার্থটা দিল। “আপনি আগে এটা যথাস্থানে দিয়ে আসুন। পরে সব বলছি।”
বাল্মীকি মহারাজ আর দেরি করলেন না। দস্তানা পরে সোজা বেরোলেন প্রকোষ্ঠের বাইরে। এখনও প্রধান কারিগরের হাতে আছে কৃত্রিম পদার্থ। সন্তর্পণে সেটা সরিয়ে বসিয়ে দিলেন আসল ব্রহ্মপদার্থ। তারপর ফিরে এলেন প্রকোষ্ঠের ভেতরে। দরজা আটকে দিলেন।
বাল্মীকি মহারাজ এগিয়ে গেলেন রামানুজের দিকে। বললেন, “ভরসার মর্যাদা রাখলেন। ভালো লাগল। আগামীতে আবার দেখা হবে যেদিন আবার পরিবর্তন করবেন এই ব্রহ্মপদার্থ।”
রামানুজ বাল্মীকি মহারাজের হাতে হাত রাখলেন, “আমাদের অভিযানে সঙ্গ দেবার জন্য আভূমি প্রণাম। আর আপনার মনের সুপ্ত ইচ্ছেটাও শেষ পর্যন্ত পূরণ করতে পারলাম বলে ভালো লাগছে।”
এই কথায় বাল্মীকি মহারাজের চোখ ছোটো হল। রামানুজ তাঁর কানের সামনে এসে লুকিয়ে বলল, “শেষ পর্যন্ত নিজের চোখে ব্রহ্মপদার্থ দেখতে পেলেন।”
এরপর জোরে বলল, “আসি তাহলে। আবার দেখা হবে।” বাল্মীকি বুঝলেন যে কেন রামানুজের গ্রাউন্ড ওয়ার্কটা এত ভালো। কেন তাঁকেই সে বেছে নিয়েছিল এই অভিযানে সেটাও স্পষ্ট হল।
গুরুদেব-সহ বাকিরা বাল্মীকি মহারাজকে বিদায় জানালেন। সবুজ তরল ছিটিয়ে দেওয়া মাত্র উপস্থিত হল কালো গুহামুখ।
ওঁরা ২০২৪-এ ফেরার জন্য গুহামুখে প্রবেশ করলেন।
শোলের পোস্টার থেকে শাহরুখের ডাংকির দুনিয়ায় প্রবেশ করতে চলেছে সবাই। বর্তমানে ফিরে আসছে সবাই। বড়ো রাস্তায় টাঙানো রয়েছে ডাংকির পোস্টার।
