Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী
0/50
New Courseপেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

বন্ধ দরজা – মণিলাল মুখোপাধ্যায়

সর্বাণী আর মৃন্ময়ী দুই জা। সর্বাণীর ছেলে অপূর্ব। মৃন্ময়ীর ছেলে সৌরভ। পড়াশুনায় অপূর্ব খুবই ভালো। কোনোবার পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেনি। এ ব্যাপারে অপূর্বর মা সর্বাণীর একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পড়ার ব্যাপারে পান থেকে চুন খসার উপায় নেই। একটু এদিক-ওদিক হলেই ছুটে আসে সর্বাণী, অপু, অপু ছ-টা বাজতে চলল, এখনও উঠিসনি। ওঠ, ওঠ। কত বেলা হয়ে গেছে বল তো?

শুধু পড়ার ব্যাপারেই নয়, অপূর্বর স্বাস্থ্য, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, বিশ্রাম সবদিকে সর্বাণীর সজাগ দৃষ্টি।

সৌরভ লেখাপড়ায় তত ভালো নয়। পরীক্ষায় পাস করে ঠিকই কিন্তু গর্ব করার মতো নয়।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করা যায় ছেলেদের প্রতি দুই মা-এর আচরণের মধ্যে। সর্বাণী পড়াশুনার ব্যাপারে সৌরভকেও ছেড়ে কথা বলত না। পড়াশুনার ব্যাপারে সে খুবই স্ট্রিক্ট। মৃন্ময়ী কিন্তু ঠিক উলটো। সর্বাণী অপূর্বকে কড়া কথা বললেই মৃন্ময়ী আস্কারা দেয়। আহা, একটু ঘুমোবে না। বাচ্চা ছেলে। খেলে আসতে দেরি হলে বলত, তা একটু খেলবে বই কী! দিনরাতই তো পড়ছে। টিভি-র কাছে গেলেই সর্বাণী বকাবকি শুরু করে। আর মৃন্ময়ী? ছুটে এসে বলে, দেখুক না টিভি। ছেলেটার তো একটু বিশ্রামের দরকার। ওরও তো একটু আনন্দ করতে ইচ্ছে করে।

দেখে সর্বাণী ছাড়া সবাই ভাববে অপূর্বর প্রতি মৃন্ময়ীর ভালোবাসা নিজের ছেলে সৌরভের চেয়ে কম নয়। সবাই বলাবলি করে, কাকিমা নয় যেন নিজের মা। অপূর্বর বাবা নিরঞ্জনও মৃন্ময়ীকে একটুও সন্দেহ করত না। বরং সর্বাণীর কড়াকড়ির জন্যে মনে মনে রাগ হত। বকাঝকা করলে নিরঞ্জন সামনে থাকত না। সেখান থেকে সরে পড়ত।

সর্বাণী কিন্তু বুঝতে পেরেছিল অপূর্বর প্রতি মৃন্ময়ীর বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসার পিছনে আছে ঈর্ষা। ওর আস্কারা অপূর্বর পা পিছলে যাবার পথ। অথচ কেউ বুঝতে পারবে না মৃন্ময়ীর মনের কথা, এমনকী অপূর্বও নয়। মৃন্ময়ী চায় অপূর্বর ভবিষ্যৎকে রক্ত-মাংসসমেত চিবিয়ে খাওয়া। সর্বাণীর মুশকিল হল কী, ও কাউকে এমনকী অপূর্বর বাবা নিরঞ্জনকেও বোঝাতে পারত না যে মৃন্ময়ী অপূর্বর ক্ষতিই চায়, ভালো চায় না মোটেই। সর্বাণী যখন নিরঞ্জনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথাবার্তা বলে মৃন্ময়ী আড়াল থেকে সব শোনে আর সাফল্যের আনন্দে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।

সেদিন অপূর্ব স্কুল থেকে ফিরে খেলতে গিয়েছিল। ফিরতে মিনিট কুড়ি দেরি হয়েছে। ছুটে যায় সর্বাণী, অপু, কত দেরি করে ফিরলি বল তো! ছ’টা থেকে পড়তে বসার কথা।

ছুটে আসে মৃন্ময়ী, তা বলে একটু খেলবে না? তুমি অযথা ওকে বকাবকি করো। আমি সৌরভকে বলেছি। নিশ্চয়ই খেলবি। একটু-আধটু খেললে কী ক্ষতিটা হবে শুনি?

একটু-আধটু নয়, কুড়ি মিনিট। আরাম, আলস্যকে প্রশ্রয় দিলে ওরা ঘাড়ে চেপে বসবে।

নিরঞ্জনও বাদানুবাদের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, না, না, সর্বাণী। ওটা ঠিক নয়। বউমা তো ঠিক কথাই বলেছে।

সর্বাণী গম্ভীর হয়ে যায়, ঠিক নয়। একটা রুটিন অনুযায়ী না চললে ক্ষতিই হবে।

মৃন্ময়ী হারবে না, একটু-আধটু এদিক-ওদিক হলে কিছু হবে না। রাগ করো না দিদি, তোমার সব তাতেই বাড়াবাড়ি।

—আমারও ওই একই কথা। অত বাড়াবাড়ি ভালো নয়। বলে নিরঞ্জন। সামান্য ব্যাপারটা ক্রমশ আরও খারাপের দিকে যখন এগোতে লাগল তখন নিরঞ্জন ক্লাবে চলে গেল। অপূর্ব ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়তে বসল। সৌরভ ওর বাবার সঙ্গে টিভি দেখতে লাগল।

সর্বাণী যখন নিরঞ্জনকে আসল ব্যাপারটা বোঝাতে ব্যর্থ হল তখন একটা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে লাগল। মৃন্ময়ী এটা লক্ষ করল তারপর সর্বাণীর সামনে জয়ের গর্বে এমন হাসতে শুরু করল যে সর্বাণীর সারা গা-টা চিড়বিড় করতে লাগল। মৃন্ময়ীকে দেখে ওর মনে হল ও একটা রাক্ষসী। ও মায়াবিনী। স্নেহের ছদ্মবেশ ধরে অপূর্বর হাড়গুলোকে চিবোচ্ছে। মৃন্ময়ীর হাসিটা কী বিশ্রী! কী ভীষণ সাংঘাতিক! দাঁতগুলো ভয়ংকর। আর তার মাঝে মাঝে রক্ত লাল টুকটুকি। সর্বাণীর ভয় হয়। একটা দারুণ আতঙ্ক যেন ওকে গ্রাস করে।

মৃন্ময়ী হাসি থামায় তারপর ক্রূর দৃষ্টিতে সর্বাণীর দিকে চায়। চোখ দিয়ে ঝরছে আগুন, কী হল? জিততে পারলে না তো? তুমি কী ভেবেছ অপূর্বকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে? কারও সাধ্য নেই তোমার ছেলেকে রক্ষা করে।

শিউরে ওঠে সর্বাণী, কে তুই সর্বনাশী? কী চাস তুই?

—আমি চাই তোমার অপূর্বর জীবনটাকে কড়মড় করে চিবিয়ে খেতে। হ্যাঁ, আমি তাই চাই। ও পথে পথে ভিক্ষে করবে আর তাই দেখে আমি দু-হাত তুলে নাচব। তারপর একদিন যখন বাড়িতে কেউ থাকবে না, ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যাবে চারধার আমি চুপি চুপি ওর ঘরে ঢুকব তারপর—

চিৎকার করে ওঠে সর্বাণী, চুপ কর, চুপ কর শয়তানি! সত্যি বল কে তুই?

অপূর্ব পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, মা, তুমি চিৎকার করলে?

মৃন্ময়ী সর্বাণীকে কথা বলতে দেয় না, দেখ না বাবা, তোর মাকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারছি না যে পড়াশুনার সঙ্গে একটু-আধটু আনন্দও করতে হবে বই কী। তা ছাড়া যারা পড়াশুনা করে তারা খেলাধুলাও করে। যে রাঁধে সে কি চুল বাঁধে না?

অপূর্ব বলল, মা, আমি পড়তে যাচ্ছি।

—হ্যাঁ হ্যাঁ, পড়তে যা বাবা। বলছি সেই থেকে অত চিৎকার চেঁচামেচি করো না, অপু পড়ছে, তা তোর মা কিছুতেই শুনবে না।

দিন দুই পরের কথা। রাত তখন সাড়ে দশটা। এক আকাশ মেঘ। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝির ঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে সন্ধে থেকে। একটা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। যে-যার বিছানায় শুয়ে পড়েছে। শুধু সর্বাণী খাওয়া-দাওয়ার পর রান্নাঘর পরিষ্কার করছে, আর অপূর্ব পড়ছে। এক সময় ওরও দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল। টেবিলের উপর মাথাটা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। আর ঠিক তারপরই মৃন্ময়ী ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চুপি চুপি ঢুকে পড়ল অপূর্বর পড়ার ঘরে। পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল অপূর্বর টেবিলের কাছে। এরপর মাথাটা ওর চোখের কাছে নিয়ে যায়। স্থির দৃষ্টিতে সর্বাণী রান্নাঘরের কাজ সেরে অপূর্বর পড়ার ঘরে পা দিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল মৃন্ময়ী অপূর্বর মাথার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ওর দিকে চেয়ে আছে কটমট করে।

—মৃন্ময়ী!

তড়িৎ গতিতে মৃন্ময়ী ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। যাবার আগে সর্বাণীর চোখ দুটোর সামনে মুখটা নিয়ে যায়। কী ভয়ংকর চাহনি! চোখ দুটো যেন জ্বলছে! এরপর হাওয়ার বেগে ঢুকে পড়ে নিজের ঘরে। ঘরে খিল দেওয়ার শব্দ বাইরের বাতাসের গর্জনকেও ছাপিয়ে যায়। সর্বাণী নিরঞ্জনকে ঘটনাটা বলল। নিরঞ্জন হাসল, তোমার মৃন্ময়ীফোবিয়া হয়েছে। বউমা অপুকে সৌরভের চেয়ে কম ভালোবাসে না।

সর্বাণীর মানসিক যন্ত্রণা বেড়ে যায়। কেউ ওর কথা বুঝতে চাইছে না।

সকালে জলখাবার দেওয়া হল। মুড়ির সঙ্গে তেলেভাজা। অপূর্বর বাটিতে বেশ ক-টা চপ। অপূর্ব তেলেভাজা খুব ভালোবাসে।

মৃন্ময়ী বাটিটা সামনে রেখে অপূর্বর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলে, অপু, খেয়ে নে বাবা। তোর কাকা এনেছে। তুই ভালোবাসিস তো, তাই তাড়াতাড়ি খা। এখনি

মৃন্ময়ীর কথা শেষ হতে না হতেই সর্বাণী ঝড়ের বেগে ঘরে ঢোকে। ছোঁ মেরে বাটিটা কেড়ে নিয়ে বলে, এতগুলো। তোর শরীর খারাপ করবে। সামনেই পরীক্ষা।

মৃন্ময়ী সোহাগ দেখায়, খেলেই বা দিদি। একদিন দুটো চপ বেশি খেলেই কি শরীর খারাপ করবে? ছেলেটাকে দুটো খেতেও দেবে না?

নিরঞ্জন হাসে, বউমা আমার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। অপুকে কারও চেয়ে কম ভালোবাসে না।

অপূর্ব গোঁ ধরে। দাও, ওমা দাও না। আমি সবকটা খাব।

—অসুখ করবে, বাবা।

—তুমি কী আমাকে খেতেও দেবে না?

মৃন্ময়ী সর্বাণীর হাত থেকে বাটিটা কেড়ে নিয়ে অপূর্বকে দেয়, তুই খা বাবা। বেচারা চপ কত ভালোবাসে। আমি বলছি তুই খা। কিচ্ছু হবে না।

রান্নাঘরে এল সর্বাণী। একটু পরেই ঢুকল মৃন্ময়ী।

নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অপুকে খাইয়ে এলাম। সবগুলো।

এরপর সর্বাণীর দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসে, কী হবে বুঝতে পারছ?

অপূর্বর শরীর খারাপ হল। সর্বাণীর যত্নে সেরে উঠল ঠিকই, তবে পড়াশুনার কিছুটা ক্ষতি হল।

দিন সাতেক পরের কথা। গণিতে অপূর্ব একটু পিছিয়ে পড়ছে। সৰ্বাণী নিরঞ্জনকে বলল, ওর একজন গণিতের মাস্টারমশাই চাই। তুমি একবার জনার্দনবাবুর কাছে যাও। সপ্তাহে একটা দিনও যদি অপুকে বাড়িতে এসে পড়ান তাহলে গণিতে ভালোই করবে। এক্সকুসিভ

নিরঞ্জন জনার্দনবাবুকে ধরে সব বন্দোবস্ত করল। সামনের মাস থেকে পড়াতে আসবে। কথাটা চাপা থাকে না। মৃন্ময়ী সব শুনল। কিছুক্ষণ কী সব ভাবল। ঈর্ষায় মনটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। একটা কিছু করতেই হবে, মনে মনে ভাবে মৃন্ময়ী।

নির্দিষ্ট দিন এল। নিশ্চিন্ত সর্বাণী। নিরঞ্জনও উদ্‌বেগমুক্ত। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও জনার্দনবাবুর দেখা নেই। সর্বাণী টেনশনে ঘরবার করে। নিরঞ্জন বলে, আসবে গো আসবে। উনি আমাকে কথা দিয়েছেন।

ঠিক এই সময় জনার্দনবাবু বাড়িতে ঢোকে। নিরঞ্জন স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে, দেখলে তো। বললাম আসবে।

নিরঞ্জন আর সর্বাণী এগিয়ে যায়, আসুন মাস্টারমশাই আসুন। চলুন। বৈঠকখানায় পড়বে তো?

সর্বাণী বলে, হ্যাঁ, বৈঠকখানায়।

-–না, শোবার ঘরে।

মৃন্ময়ী বেরিয়ে এসে বলে।

সর্বাণী বলল, বৈঠকখানাতেই ভালো। নিরিবিলি হবে।

মৃন্ময়ী সর্বাণীর দিকে একবার তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে চেয়ে বলে, না, না, শোবার ঘরে।

জনার্দনবাবু বলে, তাই হবে। শোবার ঘরেই পড়বে।

জনার্দনবাবু মৃন্ময়ীর ঘরের দিকে এগোতেই সর্বাণী বলে, ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন! অপু এ ঘরে আছে।

—অপুকে তো নয়। মৃন্ময়ীদেবী বললেন, অপু পড়বে না। সৌরভকে পড়াতে হবে। আচ্ছা নমস্কার। চলুন মৃন্ময়ীদেবী।

থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিরঞ্জন আর সর্বাণী।

সপ্তাহ দুয়েক কাটল না হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল সর্বাণী। সংসারটা যেন চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যাবার উপক্রম হল।

সুবিধে হল মৃন্ময়ীর। নিরঞ্জন বাইরে যায় কাজে। রাহুর মতো সে ধীরে ধীরে অপূর্বকে গ্রাস করতে এল। লাটাইয়ের সুতোর মতো প্রশ্রয়ের মাত্রাটা বাড়াতে লাগল। ফলে প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে বসল অপূর্ব। বন্ধুবান্ধব জুটতে লাগল। টিভি খুলে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বসে সন্ধেবেলা। খেলার মাঠ থেকে ফিরে আসতে দেরি হয়। মৃন্ময়ীর আস্কারায় জোঁকের মতো প্রলোভন ওর রক্ত চুষতে শুরু করল। ওর দুর্বলতা ক্যান্সারের মতো বেড়ে চলল। গণিতে ফেল করল অপূর্ব।

মাথায় হাত দিয়ে বসল নিরঞ্জন। সর্বাণীর অভাবটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল। সজল চোখে স্ত্রীর ফোটোর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার অপূর্বকে আমি মানুষ করতে পারছি না সর্বাণী। তুমি ওকে দেখ।

অ্যালার্ম ঘড়িটার মাথাটা টিপে টেবিলের একপাশে সরিয়ে রেখে শুয়ে পড়ল অপূর্ব। ঘুমটা আজকাল আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। ভোরবেলা আর ওঠাই হয় না।

ভোর পাঁচটা। বাড়ির সবাই ঘুমোচ্ছে। বাইরে তখনও ফিকে অন্ধকার। ভেতরে রাত। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বেজে উঠল অ্যালার্ম। ধড়মড় করে উঠে পড়ে অপূর্ব। দু-হাতে চোখ রগড়ায়। ঘুম ভাঙানো ঘড়িটার দিকে চোখ যায়। ত্রস্তপায়ে এগিয়ে যায় ঘড়িটার দিকে। না, তো। মাথাটা রাতে যেমন টিপে বসিয়ে দিয়েছিল সেইরকমই আছে। অথচ ওর মনে হল অ্যালার্ম বাজছিল আর সেই শব্দেই ওর ঘুমটা ভেঙে গেছে। মায়ের ছবিটার দিকে তাকায় অপূর্ব। আজই ওর প্রথম মনে হচ্ছে মায়ের দু-চোখে যেন স্নেহ, ভালোবাসার বন্যা। আপন মনেই বলল, পড়তে বসছি, মা। আগে তোমায় ভুল বুঝেছিলাম। আর তোমায় কষ্ট দেব না।

মৃন্ময়ী লক্ষ করল অপূর্ব আবার আগের মতো সিরিয়াস হয়ে উঠেছে। মনে মনে প্ল্যান আঁটে কী করে ওর উন্নতির পথে কাঁটা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এক ডিশ তেলেভাজা নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোতে যাবে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় ডিশটা হাত থেকে ছিটকে পড়ল, আর নাকে হাত দিয়ে ‘বাবাগো মাগো’ বলে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে দিল।

অপূর্বর স্কুলে থেকে ফেরার সময় হয়েছে। মৃন্ময়ী টেবিলের উপর খাবার রেখে দিল, আর এক গ্লাস জল। জলের সঙ্গে মিশিয়ে দিল ঘুমের ট্যাবলেট। মনে মনে ভাবে, দেখব কীরকম পড়াশুনা করে।

অপূর্ব এসে ওর জন্যে রাখা হালকা খাবার খেয়ে গ্লাসের ঢাকা খুলে দেখল, জল নেই। ভাবল কাকিমা জল রাখতে ভুলে গেছে। ঘড়া থেকে জল গড়িয়ে খেয়ে খেলতে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এসে পড়তে বসল।

মৃন্ময়ী মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়। রান্নাঘরে বসে বসে ভাবে। এমনটা তো হবার কথা নয়। এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। ঠিক এই সময় লোডশেডিং। ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মৃন্ময়ী দেশলাই নেবার জন্যে হাত বাড়ায়, কিন্তু ওর মনে হল দেশলাইটা সরে গেল। উঠে পড়ে হাতড়ে হাতড়ে ঘরের কোণে গেল। ওইখানেই লন্ঠন থাকে। কিন্তু অনেক খুঁজেও পেল না। হঠাৎ একটা দারুণ আতঙ্ক ওকে গিলতে এল। ও উঠে পড়ে দরজা খুঁজতে লাগল। রান্নাঘর থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কোথায় দরজা! চারদিকে শুধু দেওয়াল। জানলা নেই, দরজা নেই, বেরোবার কোনো পথই নেই। হঠাৎ মনে হল কে যেন হাসছে। চিৎকার করে মৃন্ময়ী, কে তুমি? কে হাসছো? কান খাড়া করে শোনে। না, কেউ হাসছে না তো। অপূর্ব পড়ছে। তাহলে কারেন্ট তো যায়নি! এখানেই শুধু অন্ধকার। রান্নাঘরের বাল্বটা কেটে গেছে। কিন্তু দরজা? দরজা কই? এই অন্ধকার থেকে ওধারের আলোর মধ্যে যাবার দরজাটা যখন কিছুতেই খুঁজে পেল না তখন চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।

আজও মানসিক হাসপাতালের ঘরে মৃন্ময়ীর চিৎকার শোনা যায়, দরজা কোথায়? আমি ঘর থেকে বেরোতে চাই। কোথায় দরজা? কে আমার ঘরের দরজা নিয়ে গেল? আমার ঘরের দরজা?

[ ছুটির হাসি (নির্মল বুক এজেন্সী), ২০০৫ (প্রথম প্রকাশকাল অজ্ঞাত) ]