মরণ ঘুম – ২
২
গ্যারেজের পাশ দিয়ে একটা সরু রাস্তা ধরে গ্রিনহাউসের দিকে যেতে হয়। ততক্ষণে ড্রাইভার ছোকরা একটা বিশাল সেডান বের করে সেটার ঝাড়পোঁছ শুরু করে দিয়েছিল। গ্রিনহাউসের দরজাটা খুলে আমরা একটা সরু করিডোর গোছের অংশে ঢুকলাম। তৎক্ষণাৎ মনে হল, কেউ আমাকে ঢিমে আঁচে সেদ্ধ করছে। বাটলার বাইরের দরজাটা বন্ধ করে অন্য প্রান্তের দরজাটা খুললেন। ওটা দিয়ে আমি মূল গ্রিনহাউসে ঢুকলাম।
জলীয় বাষ্প আর নানা অর্কিডের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ছিল। কাচের ছাদ আর দেওয়াল সেই বাষ্পে ঢাকা পড়ে গেছিল। সর্বত্র বাষ্প জমে জলের দানা হয়ে টলমল করছিল। সূর্যের আলোও সবজেটে ঠেকছিল ওই গাছের ভিড়ে। মনে হচ্ছিল, যেন রেইন-ফরেস্টে ঢুকে পড়েছি। বাটলার আমাকে ওই গাছপালার মোটা মোটা পাতা আর ডালের ঝাপট থেকে যথাসাধ্য বাঁচিয়ে ভেতরদিকে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, কিছুটা জায়গা ফাঁকা– যেন জঙ্গল সাফ করা হয়েছে। ওখানে একটা পুরোনো লাল টার্কিশ কার্পেট পাতা ছিল। তার ওপরে একটা হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন এক মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ।
ভদ্রলোকের লম্বা আর শীর্ণ চেহারা, মাথায় লেপটে থাকা ক-গাছি সাদা চুল, ফ্যাকাশে মুখ, ধারালো নাক, শুকনো ঠোঁটজোড়া, নীচু কপাল, চ্যাটালো কানের লতি – এগুলো সবই একঝলকে আমার চোখে ধরা পড়ল। তবে দেখার মতো জিনিস ছিল মানুষটির চোখজোড়া। হ্যাঁ, ম্যান্টলের ওপরের ওই পোর্ট্রেইটের মানুষটির চোখজোড়া এঁর মুখেও দেখলাম। তার আগুন অনেকটাই নিভে গেছে, কিন্তু সত্যির মুখোমুখি হওয়ার সাহস সেখানে এখনও আছে। এই মারাত্মক ভ্যাপসা গরমে ভদ্রলোক একটা রংচটা বাথরোব আর তার ওপরে একটা গাউন-গোছের পোশাক পরে ছিলেন। সরু আঙুলগুলো পোশাকটাকে খামচে ধরে ছিল।
বাটলার মানুষটির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মিস্টার মার্লো এসেছেন, জেনারেল।’
বৃদ্ধ কিচ্ছু বললেন না, এমনকী মাথাটুকুও হেলালেন না। উনি স্রেফ আমার দিকে নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে তাকালেন। বাটলার একটা হালকা চেয়ার আমার পেছনে রেখে দিলেন। আমি তাতে বসে পড়লাম।
‘ব্র্যান্ডি, নরিস।’ এবার কথা বললেন বৃদ্ধ। মনে হল, যেন একটা অন্ধকার কুয়োর তলা থেকে আওয়াজটা আসছে। এবার আমার দিকে প্রশ্ন এল, ‘আপনি কীরকম ব্র্যান্ডি পছন্দ করেন?’
‘দিলেই হল।’ আমি বললাম।
নরিস ওই জঙ্গল ভেদ করে বেরিয়ে গেলেন। জেনারেল থেমে থেমে, নিজের গলার আর গায়ের জোর বাঁচিয়ে বললেন, ‘আমি একসময় শ্যাম্পেনের সঙ্গে মিশিয়ে ব্র্যান্ডি নিতাম। যাই হোক, আপনি চাইলে কোট খুলে বসতে পারেন। শিরায় রক্ত-টক্ত আছে এমন মানুষের পক্ষে এই জায়গাটা বড়ো বেশি গরম।’
আমি কোট খুলে রুমাল দিয়ে মুখ আর ঘাড়-গলা মুছলাম। বাস রে! অগাস্ট মাসের সেন্ট লুইসও বোধ হয় হার মেনে যাবে এর কাছে। আপনা থেকেই আমার হাত সিগারেটের প্যাকেটের দিকে এগোল। তারপর খেয়াল হল, কার সামনে বসে আছি। তবে আমার ভঙ্গিটা বৃদ্ধের নজর এড়ায়নি। তাঁর মুখে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল।
‘আপনি চাইলে ধূমপান করতে পারেন। টোব্যাকোর গন্ধ আমার ভালো লাগে।’
আমি সিগারেট ধরিয়ে একগাদা ধোঁয়া ছাড়লাম। বুভুক্ষুর মতো সেই ধোঁয়াটা প্রায় শুষে নিলেন বৃদ্ধ। ওঁর মুখে হাসির রেখাগুলো আরেকটু স্পষ্ট হল।
‘অবস্থা কতটা খারাপ বুঝতে পারছেন?’ শুকনো গলায় বললেন ভদ্রলোক, ‘আমাকে নেশাও করতে হচ্ছে অন্যের মাধ্যমে! আপনি আসলে কোনো মানুষকে নয়, বরং তার ধ্বংসস্তূপটি দেখছেন। আমার দুটো পা আর তলপেট অসাড়। প্রায় কিছুই খেতে পারি না। ঘুম এতই সামান্য যে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না। আমি বেঁচে থাকি শুধু একটু উষ্ণতার জন্য। তাই এই গ্রিনহাউস।’
আমি চুপ করে ছিলাম। বৃদ্ধ নিজের মাথাটা খুব সাবধানে দোলাচ্ছিলেন। আশঙ্কা হচ্ছিল, দুলুনির জোর বাড়লে ঘাড় থেকে মুন্ডুটা খুলে যেতে পারে। ভেজা, ভারী, গরম বাতাস একটা পুরু কম্বলের মতো আমার শরীর ছাপিয়ে মনের ওপরেও চেপে বসছিল। তখনই দেখলাম বাটলার একটা টি-ওয়াগন ঠেলে নিয়ে আসছেন ওই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। আমাদের ব্র্যান্ডি আর সোডা দিয়ে, ভেজা কাপড় জড়ানো আইস বাকেটটা টেবিলে রেখে নরিস চলে গেলেন। আমি আবার দরজা খোলার আর বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম।
গ্লাসে চুমুক দিলাম। বৃদ্ধ নিজের ঠোঁটে জিভ বোলানোর ফাঁকে আমাকে দেখছিলেন। এবার উনি বললেন, ‘আমাকে আপনার সম্বন্ধে কিছু বলুন, মিস্টার মার্লো। ওটুকু জানতে চাওয়ার এক্তিয়ার নিশ্চয় আমার আছে।’
‘আছে, তবে আমার বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। আমার বয়স তেত্রিশ। শিক্ষাদীক্ষা আছে, তবে আমার পেশায় ও সব খুব একটা কাজে দেয় না। একসময় ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মিস্টার ওয়াইল্ডের কাছে কাজ করেছি। ওঁর চিফ ইনভেস্টিগেটর বার্নি ওলস আমাকে ডেকে বললেন, আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন। আমি বিয়ে করিনি।’
‘আর আপনি সামান্য হলেও সিনিক।’ বৃদ্ধর মুখে হাসি ফুটল, ‘ওয়াইল্ডের সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগেনি আপনার?’
‘আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। আমি ওঁর কথামতো কাজ করতাম না। কারো আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে আমার একটু সমস্যা হয়, জেনারেল।’
‘আমারও। আচ্ছা, আপনি আমার পরিবার সম্বন্ধে কী জানেন?’
‘আপনি বিপত্নীক। আপনার দুই মেয়েই কমবয়সি, সুন্দরী, উড়নচণ্ডী। তাদের মধ্যে একজনের এর মধ্যেই তিনবার বিয়ে হয়েছে। ওই তিনজন বরের মধ্যে একজন আবার মদের চোরাচালান করত একসময়। তার নাম ছিল রাস্টি রেগান। ব্যস, এটুকুই আমার পুঁজি।’
‘এর মধ্যে কোন জিনিসটা আপনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বলে মনে হচ্ছে?’
‘ওই রাস্টি রেগানের ব্যাপারটা। তবে মদের চোরাচালান যারা করে, তাদের আমি একটু প্রশ্রয়ই দিই।’
‘আমিও।’ বৃদ্ধর মুখে ক্ষীণ হাসিটা ফিরে এল, ‘আমি রাস্টিকে খুব খুব পছন্দ করি। একমাথা কোঁকড়া চুলের ওই বিশালবপু আইরিশ ছোকরাকে আমি নিজের ছেলে বা তার চেয়েও বেশি কিছু ভাবতাম। তবে হ্যাঁ, প্রথম দর্শনে ওর সম্বন্ধে আমার ভাবনাও আপনার মতোই ছিল– এক ধান্দাবাজ যে একটা বড়ো দাঁও মেরেছে।’
‘আপনি যে ওকে পছন্দ করতেন, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।’ আমি বললাম।
‘রাস্টি আমার কাছে অক্সিজেন হয়ে এসেছিল।’ বৃদ্ধর নীরক্ত আঙুলগুলো আবার পোশাকটা খামচে ধরল, ‘ও আমার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাত। ব্র্যান্ডি গিলত। আইরিশ বিপ্লবের গল্প শোনাত। ও আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিতে অফিসার ছিল। রাস্টি আর আমার মেয়ের বিয়েটা টিকবে না– এটা বুঝে গেছিলাম। বিয়েটা টেকেওনি। এগুলো কিন্তু আমাদের পরিবারের একান্ত গোপন তথ্য, মিস্টার মার্লো।’
‘ওগুলো গোপনই থাকবে।’ আমি বললাম, ‘রাস্টির কী হল?’
‘এক মাস আগে ও চলে গেছে।’ কাঠ কাঠ ভঙ্গিতে বললেন বৃদ্ধ, ‘কাউকে কিচ্ছু বলেনি। এমনকী আমাকেও না। খারাপ লেগেছিল। তবে বুঝি, ওর বেড়ে ওঠাটা তো ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। জানি, ও একদিন আমার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করবে। ইতিমধ্যে আমাকে আবার ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে।’
‘আবার?’
‘যদ্দিন রাস্টি ছিল, তদ্দিন আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করার পরিণাম ভয়ানক হত।’ বৃদ্ধ গাউনের পকেট থেকে একটা খয়েরি খাম বের করলেন, ‘ও আসার আগে, এই ধরুন ন-দশ মাস আগে, আমি জো ব্রোডি নামের একজনকে পাঁচ হাজার ডলার দিতে বাধ্য হয়েছিলাম– যাতে সে আমার ছোটোমেয়ে কারমেনের পেছনে না লাগে।’
‘অ।’
‘তার মানে?’ মানুষটির সরু ভুরুজোড়া কুঁচকে গেল।
‘কিছু না।’
আমার দিকে কিছুক্ষণ ওভাবেই তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ। তারপর বললেন, ‘খাম আর তার ভেতরে কাগজগুলো দেখুন। আর ব্র্যান্ডিটা শেষ করুন।’
আমি হাত মুছে খাম খুললাম। খামের ওপর কারসিভ ধাঁচে বড়ো হরফে লেখা ছিল – জেনারেল গায় স্টার্নউড, ৩৭৬৫ অল্টা ব্রিয়া ক্রেসেন্ট, ওয়েস্ট হলিউড, ক্যালিফোর্নিয়া। খামের ভেতর থেকে একটা খয়েরি রঙের কার্ড আর তিনটে শক্ত মোটা কাগজ বেরোল। হালকা বাদামি লিনেনের কার্ডের ওপর সোনালি রঙে লেখা ছিল– মিস্টার আর্থার গুইন গাইগার। কোনো ঠিকানা ছিল না, তবে বাঁ-দিকে নীচে খুব ছোটো ছোটো করে এটুকু ছিল – দুর্লভ বই আর ডিলুক্স সংস্করণ বেচাকেনা করা হয়। আমি কার্ডটা উলটে দেখলাম। পেছনে হেলানো হস্তাক্ষরে লেখা ছিল, ‘প্রিয় মহাশয়, সঙ্গে যে কাগজগুলো পাঠাচ্ছি সেগুলো নিয়ে আদালতে যাওয়া যাবে না। খোলাখুলিই লিখি, জুয়ার দেনা মেটানোর জন্য টাকা ধার নিতে গিয়ে ওগুলোতে সই করা হয়েছে। আশা করি আপনি কাগজগুলোর গুরুত্ব বুঝবেন। সশ্রদ্ধ, এ জি গাইগার।’
কাগজগুলো ছিল সেপ্টেম্বর মাসের আলাদা আলাদা তারিখের তিনটে প্রমিসরি নোট। ওতে লেখা ছিল, ‘আর্থার গুইন গাইগার চাইলে আমি তাকে বিনা সুদে এক হাজার ডলার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলাম। বিনিময়ে ওই টাকা আমি পেয়ে গেছি। —কারমেন স্টারউড।’
‘কী বুঝলেন?’ জেনারেল জিজ্ঞেস করলেন।
‘এখনও কিছু বুঝিনি। এই আর্থার গুইন গাইগার কে?’ আমি কাগজগুলো সরিয়ে রেখে জানতে চাইলাম।
‘আমার কোনো ধারণাই নেই।’
‘কারমেনের কী বক্তব্য?’
‘আমি ওকে জিজ্ঞেস করিনি। করবও না। ওর কাছে কিছু জানতে চাইলে ও নিজের বুড়ো আঙুলটা কামড়াবে আর টেরিয়ে টেরিয়ে তাকাবে শুধু।’
‘আমার সঙ্গে ওঁর হলে দেখা হয়েছিল।’ আমি বললাম, ‘আমার সঙ্গেও উনি ওই করেছিলেন। তারপর উনি আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন।’
বৃদ্ধ কিছুই বললেন না। ওই গরমে আমি সেদ্ধ হচ্ছিলাম। কিন্তু উনি শান্তভাবে বসে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন শুধু।
‘আমাকে কি ভদ্রভাবে কথা বলতে হবে?’ আমি জানতে চাইলাম, ‘নাকি আমি যেভাবে কথা বলি, সেভাবেই বলব?’
‘আপনার তো এই ধরনের দ্বিধা থাকার কথা নয় মিস্টার মার্লো।’
‘আপনার দুই মেয়ে কি একইসঙ্গে লীলাখেলা করে?’
‘উঁহু। নরকের দিকে যাওয়ার জন্য ওরা আলাদা রাস্তা নিয়েছে। ভিভিয়েন হচ্ছে শৌখিন, প্রশ্রয়ে বখে যাওয়া, বুদ্ধিমতী আর নিষ্ঠুর। কারমেন সেই তুলনায় এক শিশু যে মাছি ধরে তার একটা একটা করে ডানা ছিঁড়তে ভালোবাসে। নীতিবোধ বলে ওদের কিচ্ছু নেই। আমারও নেই। কোনো স্টার্নউডেরই কোনোকালে ছিল না।’
‘ওদের পড়াশোনা কদ্দূর হয়েছে? কী করছে সেটুকু বোঝার ক্ষমতা নিশ্চয় ওদের আছে?’
‘ভিভিয়েন নামকরা স্কুল-কলেজে পড়েছে।’ ধীরে ধীরে বললেন মানুষটি, ‘কারমেন হাফ ডজন স্কুলে পড়েছে, কিন্তু তার পরেও ওর বিদ্যাবুদ্ধি খুব একটা বাড়েনি। চরিত্রদোষ বলতে আমরা যা যা বুঝি তার সবই ওদের আছে। আর হ্যাঁ, ভ্রূ কোঁচকানোর আগে একটা কথা জেনে রাখুন। আমি নীতিবাগীশ নই। তা ছাড়া যে লোক চুয়ান্ন বছর বয়সে এসে বাবা হয়, তার কপালে এ-ই জোটে।’
আমি কথা না বাড়িয়ে ব্র্যান্ডিতে চুমুক দিলাম। বৃদ্ধর গলার কাছে সরু শিরাটা খুব ধীর লয়ে ওঠানামা করছিল। আশপাশটা চুপচাপ হয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর উনি বলে উঠলেন, ‘তাহলে এখন আমার কী করা উচিত, মিস্টার মার্লো?’
‘আমি হলে টাকাটা দিয়ে দিতাম।’
‘কেন?’
‘এই ক’টা টাকার জন্য কেন ঝামেলা করবেন? মানছি যে এই কাগজগুলোর পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে। কিন্তু তাতে কী? আপনার মেয়েদের সম্বন্ধে আপনি নতুন করে আর কী জানবেন, বলুন? এইভাবে আপনার কাছে কেউ-না-কেউ আসবেই। তাতে আপনার বিষয়-আশয় তেমন টসকাবে না।’
‘আমি এত সহজে হার মানার লোক নই।’
‘বুঝলাম। আচ্ছা, ওই জো ব্রোডি কে ছিল, যাকে আপনি পাঁচ হাজার ডলার দিয়েছিলেন?’
‘একজন জুয়াড়ি। আমার ভালো মনে নেই। নরিস, মানে আমার বাটলার জানবে।’
‘আপনার মেয়েদের নিজস্ব সম্পত্তি আছে নিশ্চয়?’
‘ভিভিয়ানের আছে, তবে খুব বেশি নয়। কারমেন এখনও ছোটো, তাই ওর মা-র উইল অনুযায়ী টাকা ও এখনও পায়নি। আমি দু’জনকেই ভালোরকম হাতখরচ দিই।’
‘আপনি চাইলে আমি এই কাজটা করতে পারি।’ আমি বললাম, ‘আমার রেট খুবই কম– দিনে পঁচিশ ডলার, প্লাস খরচাপাতি। তার ওপর আপনাকে এই গাইগারের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য আরও কিছু দিতে হবে, এই আর কি।’
‘বেশ। কারো পিঠে ফোঁড়া পেকে ব্যথা হলে সেগুলো কেটে বাদ দেওয়ার জন্য এটুকু দেওয়াই যায়। তবে আপনি খুব বেশি রক্তপাত ঘটাবেন না নিশ্চয়? ওটা বাদ দিয়ে, আপনার যা ভালো মনে হবে, তাই করবেন। এখন আমি বিশ্রাম নেব।’
ভদ্রলোক হুইলচেয়ারের লাগোয়া একটা বোতাম টিপলেন। দেখলাম, ওখান থেকে বেরিয়ে একটা তার অর্কিডের ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কোথাও চলে গেছে। আমার দিকে উজ্জ্বল চোখ মেলে একবার তাকালেন জেনারেল, তারপর চোখ বুজলেন।
আমি চেয়ারের পিঠ থেকে নিজের কোটটা নিয়ে বনবাদাড় পেরিয়ে গেটের দিকে এগোলাম। দুটো দরজা খুলে বাইরে এসে আগে বড়ো বড়ো গোটাকয়েক শ্বাস নিয়ে নিজের ভেতরে অক্সিজেন চালান করলাম। গ্যারেজের সামনে ড্রাইভার ছেলেটিকে দেখলাম না। নরিস আমার কাছে এসে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আপনি যাওয়ার আগে মিসেস রেগান আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন, স্যার। আর জেনারেল বলেছেন, আপনার খরচাপাতির জন্য যা দরকার সেই অঙ্কের একটা চেক যেন আপনাকে লিখে দিই।’
‘জেনারেল বলেছেন? কখন?’
নরিসের চোখে বিস্ময় ফুটল, তারপর সেটা হালকা হাসির চেহারা নিল, ‘ওঁর হুইলচেয়ারে একটা ঘণ্টা আছে, সেটা টিপেই উনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
‘ওঁর চেক আপনি লিখবেন?’
‘সেই অধিকারটুকু উনি আমাকে দিয়েছেন।’
‘অ। তা ভালো, তবে এই মুহূর্তে আমাকে কিছু দিতে হবে না। মিসেস রেগানের আবার আমার সঙ্গে কী দরকার পড়ল?’
‘আপনার আসার কারণ নিয়ে ওঁর কিছু বক্তব্য আছে।’ মসৃণ গলায় বললেন নরিস।
‘আমি এসেছি, এটাই-বা ওঁকে কে বলল?’
‘ওঁর জানলা দিয়ে গ্রিনহাউস দেখা যায়। উনি আমাদের ঢুকতে দেখেছিলেন। মিসেস রেগান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনার ব্যাপারে। আমি আপনার পরিচয় দিতে বাধ্য হয়েছি।’
‘কাজটা ভালো করেননি।’
‘তার মানে?’ নরিসের নীল চোখ বরফশীতল হয়ে গেল, ‘আপনি আমাকে আমার কাজ শেখাচ্ছেন?’
‘না। তবে আপনার কাজগুলো ঠিক কী কী, সেটা কল্পনা করে আমি প্রচুর আনন্দ পাচ্ছি।’
আমরা একে অপরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর রাগত ভঙ্গিতে নরিস বাড়ির দিকে এগোলেন।
