Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ৮

স্টার্নউড ম্যানসনে নিবু নিবু আলো জ্বলছিল। ধারের দরজার পাশে গাড়িটা দাঁড় করালাম। নিজের পকেট খালি করে কারমেনের পাশে রাখলাম। টুপি আর রেইনকোটের আশ্রয়ে মেয়েটা শুধু ঘুমোচ্ছিল না, রীতিমতো নাক ডাকছিল। দরজার পাশে ঘণ্টি বাজালাম। কিছুক্ষণ পর নরিস দরজা খুলে দিলেন।

‘শুভ সন্ধ্যা, স্যার।’ আমার পেছনে দাঁড়ানো প্যাকার্ড গাড়িটায় একনজর বুলিয়ে আমাকে বললেন নরিস।

‘মিসেস রেগান আছেন?’

‘না, স্যার।’

‘জেনারেল নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছেন?’

‘হ্যাঁ। এই সময়েই ওঁর ঘুমটা গভীর হয়।’

‘মিসেস রেগানের পরিচারিকা আছেন?’

‘মাথিলডা? হ্যাঁ, ও আছে।’

‘ওঁকে এখানে আসতে বলুন। কাজটার জন্য কোনো… মহিলাকেই প্রয়োজন। কেন এ-কথা বলছি, সেটা গাড়ির ভেতরটা দেখলেই বুঝবেন।’

‘দেখলাম।’ গাড়ির ভেতরটা দেখে ফিরে এলেন নরিস, ‘আমি মাথিলডাকে ডাকি।’

‘শুভরাত্রি।’ আমি বললাম, ‘বাকিটা আপনি বুঝে নিন।’

‘আপনার জন্য কি একটা ট্যাক্সি ডাকব, স্যার?’

‘একদম না।’ আমি জোর গলায় বললাম, ‘আমি এই মুহূর্তে আদৌ এখানে নেই। আপনি ভুল দেখছেন।’

নরিস মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকালেন। আমি ওখান থেকে বেরিয়ে বৃষ্টিভেজা রাস্তা, ঝুপসি গাছ, সাদা আর কমলা আলোয় ধোয়া ফিলিং স্টেশন– সব পেরিয়ে গন্তব্যের দিকে চললাম। রাস্তায় লোকজন বিশেষ ছিল না। ট্যাক্সি নিতে পারিনি, কারণ কোনো ড্রাইভার আমাকে মনে রাখুক, এটা চাইছিলাম না। প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে গাইগারের বাড়িতে পৌঁছোলাম।

রাস্তায় আর কেউ ছিল না। পাশের বাড়ির সামনে আমার গাড়িটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িতে বসে হুইস্কির বোতল আর অর্ধেকটা সিগারেট শেষ করলাম। তারপর চাবি দিয়ে সদরের তালা খুলে গাইগারের বাড়িতে ঢুকলাম। নিস্তব্ধ বাড়িতে আমার সর্বাঙ্গ থেকে জল ঝরে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ ছিল না। ঘরের আলো জ্বালালাম।

প্রথমেই খেয়াল হল, দেওয়ালে ঝোলানো বেশ কয়েকটা চাদর এখন আর নিজের জায়গায় নেই। আমি ওগুলো গুনিনি, তবে পেছনের ন্যাড়া প্লাস্টার দেখতে পেয়ে ব্যাপারটা বুঝলাম। ক্যামেরা স্ট্যান্ডের কাছে এগোতেই দুটো জিনিস দেখতে পেলাম। এক, বড়ো কার্পেটের বাইরে মেঝের ওপর আর একটা ছোটো কার্পেট পাতা ছিল, যেটা আগে ওখানে ছিল না। দুই, আগে ওখানে যেটা ছিল, সেই জিনিসটা আর নেই।

গাইগারের মৃতদেহ উধাও হয়েছে।

গোটা বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। সব কিছু যে অবস্থায় দেখে গেছিলাম, তেমনই ছিল। গাইগার কোত্থাও ছিল না। বাধ্য হয়ে আমি চাবির গোছা হাতড়ে একমাত্র তালাবন্ধ ঘরটা খুললাম। পালিশ করা কাঠের মেঝে, একটা ছোটো টেবিলে খুব সাধারণ কিছু প্রসাধনী, দুটো লম্বা মোমদানিতে বসানো কালো রঙের লম্বা মোমবাতি, শক্ত আর সরু একটা খাট– সব মিলিয়ে একটা পুরুষালি, শীতল ভাব ছড়িয়ে ছিল ঘরটায়। গাইগারের ঘরের একেবারে উলটো এই ঘর– এমনটাই মনে হচ্ছিল। আমি দরজা তালাবন্ধ করলাম, হাতল মুছে দিলাম, তারপর ক্যামেরা স্ট্যান্ডের কাছে গিয়ে জায়গাটা খুঁটিয়ে দেখলাম। কার্পেটের ওপর দুটো সমান্তরাল দাগ থেকে মনে হল, কেউ শরীরটাকে সদর দরজার দিকেই টেনে নিয়ে গেছে, তারপর বেরিয়ে গেছে।

কে হতে পারে?

পুলিশ নয়। ওরা এখানে এলে এতক্ষণে খেল সবে শুরু হত। চক দিয়ে মৃতদেহের অবস্থান দাগানো, ফিতে টেনে চারদিক ঘিরে দেওয়া, ডাস্টিং পাউডার ছড়িয়ে হাতের ছাপ নেওয়া, ঘন ঘন ফ্ল্যাশবাল্্বের ঝলকানি– এসবে জায়গাটা এখন ভরা থাকত।

খুনি নয়। সে জায়গাটা ছেড়ে ঝটপট পালিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু কারমেন ওকে দেখেছে বা চিনেছে কি না, সে-বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পেরে সে এতক্ষণে এই শহর থেকেই হয়তো পিটটান দিয়েছে।

এমন কেউ শরীরটা সরিয়ে ফেলেছে, যে চায় গাইগার নিহত নয়, বরং নিরুদ্দেশ হয়েই থাকুক।

গাড়িতে বসে বাড়ি ফিরলাম। ডিনার সেরে গাইগারের কোডের মানে বের করতে বসলাম। বেশ কয়েক ঘণ্টা সময়, আর মাপমতো তরল বরবাদ হল। এটুকু বুঝলাম যে নোটবইয়ে প্রায় শ-চারেক মানুষের নাম আর ঠিকানা আছে। এটা যদি ব্ল্যাকমেইলিং রাকেট হয়, তাহলে এদের মধ্যে যে কেউই গাইগারকে খুন করে থাকতে পারে। এই খড়ের গাদায় সূচ খুঁজতে পুলিশের জান বেরিয়ে যাবে।

শুতে গেলাম। স্বপ্ন দেখলাম, রক্তাক্ত চাইনিজ কোট পরা একটা লোক একটি নগ্ন মেয়ের পেছনে ছুটছে, আর আমি একটা ফাঁকা ক্যামেরা হাতে তাদের পেছনে দৌড়োচ্ছি।