মরণ ঘুম – ১০
১০
গাইগারের প্রতিবেশী দোকানদার আগের দিনের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে গাইগারের দোকানে ঢুকতে দেখে এবারও লোকটার মুখে একটা তির্যক হাসি ফুটল। সেই মহিলাও প্রায় একইরকম ভঙ্গিতে আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তবে এবার হাসিটা আরও আলগা মনে হচ্ছিল।
‘কী যেন লাগবে বলেছিলেন?’ মহিলার হাসিটা কাছ থেকে দেখে বুঝলাম, উনি আদৌ হাসছেন না। ভদ্রভাবে দাঁত খিঁচোচ্ছেন শুধু।
‘মিস্টার গাইগার।’ আমি হাসিমুখে বললাম, ‘আছেন তো?’
‘উনি… মানে… না। না, উনি নেই। আপনার কী লাগবে… বলুন।’
আমি চোখ থেকে চশমাটা খুলে সযত্নে সেটা পকেটে ভরলাম। যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম যাতে মহিলা ভয় না পান।
‘ওই ফার্স্ট এডিশনের ব্যাপারগুলো স্রেফ কথার কথা ছিল।’ আমি ফিসফিস করলাম, ‘বোঝেনই তো এইসব কারবারে সতর্ক থাকা কত জরুরি। আমার কাছে একটা জিনিস আছে, যেটা মিস্টার গাইগার চাইছিলেন। উনি ওটা অনেকদিন ধরে খুঁজছেন।’
‘তাই বলুন।’ মহিলার হাতের আঙুলগুলো অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে ওঁর ঢেউ-খেলানো চুলে খেলে বেড়াচ্ছিল, ‘আপনি একজন সেলসম্যান। বরং কাল আসুন। আমার ধারণা, আগামীকাল উনি থাকবেন।’
‘আমি এই লাইনেরই লোক, ম্যাডাম।’ অধৈর্য ভঙ্গিতে বললাম, ‘বেকার কেন ঝোলাচ্ছেন? উনি কি অসুস্থ? তাহলে বলুন, আমি ওঁর বাড়িতেই যাচ্ছি।’
‘আপনি… মানে… আসলে…’ মহিলার গলা আটকে গেল। আমার চোখের সামনে মহিলার মুখটা মেক-আপ ইত্যাদিসহ একেবারে ভেঙে পড়ল। তারপর, একটু একটু করে, স্রেফ মনের জোরে উনি সেই ভাঙা টুকরোগুলো আবার জোড়া লাগালেন। তার ওপর হাসির একটা প্রলেপ দিলেন। মুখটা প্রায় আগের অবস্থাতেই ফিরে এল, তবে কয়েকটা কোণ বেঁকে রইল– এই আর কি।
‘না।’ একটা বড়ো শ্বাস নিলেন মহিলা, ‘উনি আপাতত শহরে নেই। বাড়ি গিয়ে লাভ হবে না। আপনি বরং… কালকেই একবার খোঁজ নিন।’
আমি আরও কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তখনই পার্টিশনের দরজাটা ফুটখানেক মতো ফাঁক হল। যে লম্বা সুপুরুষ ছেলেটাকে কাল সন্ধেবেলায় দেখেছিলাম, সে-ই মুখ বাড়াল। ছেলেটার মুখ ফ্যাকাশে লাগছিল। আমাকে দেখেই ও দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল। কিন্তু তার মধ্যেই আমি একটা জিনিস দেখে ফেলেছিলাম। ওর পেছনেই নতুন ওভার-অল পরা একটা লোক একগাদা প্যাকিং বাক্স, খবরের কাগজ আর স্তূপীকৃত বই নিয়ে কাজ করছিল। এর একটাই মানে হয় – গাইগারের অন্তত কিছু স্টক সরানো হচ্ছে।
দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলে আমি আবার চশমাটা পরলাম। মহিলাকে বললাম, ‘তাহলে কালই আসব। আপনাকে একটা কার্ড দিলে হয়তো ভালো হত, কিন্তু বোঝেনই তো…’
‘বুঝি।’ মহিলা সামান্য শিউরে উঠে বললেন।
আমি দোকান থেকে বেরিয়ে বুলেভার্ড ধরে এদিক-ওদিক ঘুরে একটা সরু গলিতে ঢুকলাম। গলিটা গাইগারের দোকানের পেছন দিয়ে গেছে। ওখানে একটা ছোটো ট্রাক দাঁড়িয়েছিল। নতুন ওভার-অল পরা লোকটা তখন ওই ট্রাকে একটা বাক্স রাখছিল। আমি পরের ব্লক অবধি হেঁটে একটা ট্যাক্সি পেলাম। নিতান্ত কমবয়সি চালক মন দিয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল।
‘একটা কাজ আছে।’ ওকে একটা ডলার আগাম দিয়ে বললাম, ‘একটা গাড়ির পিছু নিতে হবে।’
‘পুলিশ?’ আমার আপাদমস্তক দেখে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।
‘প্রাইভেট।’
‘দারুণ।’ ম্যাগাজিনটা একপাশে রেখে সহাস্যে বলল ছেলেটা। আমি ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম।
বেশ কিছুটা দূর থেকে ট্রাকটাকে দেখতে গিয়েই কাল হল। মোটামুটি ডজনখানেক বাক্স ট্রাকে রেখে ওই ওভার-অল পরা লোকটা একরকম হঠাৎই স্টিয়ারিঙের পেছনে বসে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। গলি থেকে বাঁ-দিকে ঘুরে, ফ্র্যাংকলিন, ভাইন, ওয়েস্টার্ন ঘুরে ব্রিটানি প্লেস অবধি আমরা কোনোক্রমে গাড়িটাকে চোখে চোখে রাখতে পেরেছিলাম। তারপর ওটা স্রেফ গায়েব হয়ে গেল।
রান্ডাল প্লেস যেখানে জিভ বের করার মতো একটুকরো জমি দিয়ে ব্রিটানি প্লেসকে ধরেছে, সেখানে একটা অ্যাপার্টমেন্ট হাউস আছে। সেটার বেসমেন্ট গ্যারেজের দরজা ব্রিটানির দিকে খোলে। ওটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি ছোকরাকে বাছা বাছা শব্দে বোঝাচ্ছিলাম যে ও কোনো কম্মের নয়। ছেলেটা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলার চেষ্টা করছিল যে ট্রাকটা খুব বেশি দূরে যেতেই পারে না। তখনই গ্যারেজের আধো-অন্ধকারে আমি ট্রাকটাকে দেখলাম। ওটার পেছনের দরজাটা খোলা ছিল।
অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের সদর দরজার সামনে ট্যাক্সি থামিয়ে নামলাম। লবিতে কাউকে দেখলাম না। দেওয়ালের গায়ে সাঁটানো বেশ ক-টা মেইলবক্স দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। নামগুলোর ওপর চোখ বোলাতে গিয়ে দেখলাম ৪০৫ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হলেন শ্রীযুক্ত জোসেফ ব্রোডি। মনে পড়ল, জো ব্রোডি নামের কাউকে পাঁচ হাজার ডলার খেসারত দিয়েছিলেন জেনারেল স্টার্নউড, যাতে সে কারমেনকে উত্ত্যক্ত না করে। মন বলছিল, এ-ই সেই জো ব্রোডি।
একটা লিফট দেখলাম। তার পাশ দিয়ে সরু সিঁড়ি নেমে গেছে বেসমেন্টে। নেমে দেখলাম, লিফটের দরজা খুলে ওই ওভার-অল পরা লোকটা হাঁসফাঁস করতে করতে প্যাকিং বাক্সগুলো তার ভেতরে সাজিয়ে রাখছে। আমি একপাশে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ওর কাজ দেখলাম কিছুক্ষণ ধরে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপারটা লোকটার পছন্দ হল না।
‘ওজনের ব্যাপারটা খেয়াল রাখবেন।’ আমি বললাম, ‘লিফটটা কিন্তু আধটনের বেশি ওজন নেয় না। কোথায় যাচ্ছে এই বাক্সগুলো?’
‘ব্রোডি, চারশো পাঁচ।’ লোকটা হাঁফাতে হাঁফাতে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি ম্যানেজার?’
‘হুঁ। তা মালপত্র তো ভালোই আছে মনে হচ্ছে।’
‘বই।’ লোকটা হিংস্রভাবে বলল, ‘এক এক বাক্সে আরামসে চল্লিশ কিলো বই। আমার পিঠের কী অবস্থা হচ্ছে, ভাবতে পারছেন?’
‘সে আপনার ব্যাপার। তবে ওই যা বললাম– ওজনের ব্যাপারটা মাথায় রাখবেন।’
লোকটা শেষ অবধি ছ’টা বাক্স নিয়ে লিফটে চড়ল। আমি লবি হয়ে প্রথমে ট্যাক্সিতে, তারপর তাতে চেপে নিজের অফিসে ফিরে গেলাম। ছোকরাকে একগাদা টাকা দিলাম। ও আমাকে একটা কার্ড দিল। সচরাচর আমি এগুলো পত্রপাঠ ডাস্টবিনে চালান করি, কিন্তু এটা রেখে দিলাম।
সাততলায় দেড়খানা ঘর আমার। পার্টিশন দিয়ে দু-ভাগ করা একটা ঘরের অর্ধেকটা নিয়ে আমার রিসেপশন। আমি অফিসে না থাকলেও রিসেপশনে তালা লাগানো থাকে না। কোনো ক্লায়েন্ট যাতে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারেন, সেজন্যই এই ব্যবস্থা।
সেদিন একজন আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
