Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ১২

১২

ল্যাভার্ন টেরেসের গাছগুলো গত সন্ধ্যার বৃষ্টিতে ভিজে তরতাজা হয়ে ছিল। পড়ন্ত আলোতেও আমি টিলার ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া সিঁড়ির ধাপগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। অন্ধকারে তিনটে গুলি ছুড়ে এই সিঁড়ি দিয়েই ভাগলবা হয়েছিল খুনি। নীচের রাস্তার ওপাশে দুটো ছোটো ছোটো বাড়ি আছে। ওগুলোর বাসিন্দারা গুলির আওয়াজ শুনেছিল কি? বলা কঠিন, কারণ শুধু গাইগারের বাড়ির সামনে নয়– গোটা ব্লকের কোথাও কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না।

গাইগারের বাড়ির সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে ড্রাইভ করে যাওয়ার সময় একটা কথা মনে হল। কাল রাতে আমি গ্যারেজটা দেখিনি। গাইগারের লাশ কেউ গ্যারেজে নিয়ে লুকিয়ে রাখতে পারে। পরে, ওরই গাড়িতে চাপিয়ে লস এঞ্জেলেসের আশেপাশে শ-খানেক গুহা বা গিরিখাতের কোথাও লাশ লুকোনো হলে বেশ কয়েক দিনের জন্য খুনটা চেপে রাখা যাবে। গাইগারের চাবির গোছা যখন আমার কাছেই আছে, তখন গ্যারেজ দিয়েই অনুসন্ধান শুরু করা যাক।

আমি বাড়ির সামনে পৌঁছোতেই ধারের ঝোপঝাড় থেকে এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। পোশাক পরা থাকলেও কারমেন স্টার্নউডের দৃষ্টিটা গত সন্ধ্যার মতোই দেখাচ্ছিল– দিশাহীন, পাগলাটে, ফাঁকা। মহিলা আবার পিছিয়ে ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেলেন। আমি কিছুটা এগিয়ে গাড়িটা পার্ক করে হেঁটে এলাম। ততক্ষণে মহিলা সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের আঙুলটা কামড়াচ্ছিলেন। কাছে গিয়ে বুঝলাম, মহিলার মুখ উদ্্বেগে ফ্যাকাশে হয়ে আছে।

‘হ্যালো।’ সরু গলায় কথাটা বলে মহিলা আবার আঙুল কামড়ানোয় ব্যস্ত হলেন।

‘আমাকে মনে আছে?’ আমি নরম গলায় বললাম, ‘ডগহাউস রাইলি? যাকে আপনার খুউব লম্বা বলে মনে হয়েছিল!’

মেয়েটা মাথা ঝাঁকাল। ওর মুখে একঝলক হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।

‘চলুন। ভেতরে যাওয়া যাক। আমার কাছে চাবি আছে।’

মেয়েটাকে একপাশে সরিয়ে দরজা খুললাম। খোলা দরজা দিয়ে মেয়েটাকে ভেতরে ঢুকিয়ে, নিজেও ঢুকে ঝটপট দরজা বন্ধ করলাম। দিনের আলোয় ঘরটাকে জঘন্য দেখাচ্ছিল। আমি আর কারমেন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, বড়োলোকের বখাটে মেয়ে প্রিন্সিপালের চেম্বারে হাজিরা দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি এখানে কী করছেন?’

কারমেন নিজের পোশাকটা নখ দিয়ে খুঁটতে লাগল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।

‘কাল রাতে কী হয়েছিল, আপনার মনে আছে?’

‘কী মনে থাকবে?’ মেয়েটার চোখের গভীরে একটা ধূর্ত চাউনি উঁকি দিল, ‘আমি তো অসুস্থ হয়ে কাল রাতে বাড়িতেই ছিলাম।’

‘এই মিথ্যেটা অন্য কাউকে শোনাবেন, আমাকে নয়।’

মেয়েটার চোখ দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। আমি বললাম, ‘কাল রাতে আমি আপনাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে আপনি এখানে– ওই চেয়ারে, কমলা রঙের শালটার ওপর বসে ছিলেন। এগুলো আপনার খুব ভালোভাবে মনে আছে, তাই না?’

ফর্সা রং বলেই তাতে ব্লাশ করার ভাবটা আরও ভালোভাবে ধরা পড়ল। আঙুলটা আবার চিবোতে-চিবোতে মেয়েটা বলল, ‘আপনিই…?’

‘আমিই। কাল সন্ধ্যার কতটা আপনার মনে আছে?’

‘আপনি কি পুলিশের লোক?’

‘না। আমি আপনার বাবা-র বন্ধু।’

একটা ক্ষীণ শ্বাস ছেড়ে মেয়েটা বলল, ‘আপনি কী চান?’

‘খুনটা কে করল?’

মেয়েটার কাঁধ আপনা থেকেই কেঁপে উঠল, কিন্তু ওর মুখের ভাব বদলাল না। ও পালটা প্রশ্ন করল, ‘আর কে কে… জানে?’

‘গাইগারের ব্যাপারে? আমি বলতে পারব না। পুলিশ জানে না– জানলে ওরা এখানে একেবারে জাঁকিয়ে বসত এতক্ষণে। হয়তো… জো ব্রোডি?’

স্রেফ অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছিলাম, কিন্তু তাতেই বেশ দেখার মতো প্রতিক্রিয়া হল। মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘জো ব্রোডি! ওই… ওই…!’

‘একদম সহজ করে বলুন।’ আমি বললাম, ‘ব্রোডিই কি ওকে খুন করেছে?’

‘কাকে?’

‘ঈশ্বর!’ আমার মাথার পেছনে ব্যথাটা এবার সত্যিই বেড়ে গেল। মেয়েটার মুখ দেখে মনে হল, আমার কথা শুনে ও একটু ধাক্কা খেয়েছে। চিবুকটা বুকের কাছে ঈষৎ নামিয়ে এনে ও নীচু গলায় বলল, ‘হ্যাঁ। ব্রোডিই ওকে খুন করেছে।’

‘কেন?’

‘আমি জানি না।’

‘ওর সঙ্গে সম্প্রতি আপনার দেখা হয়েছে?’

‘এক-আধবার।’ মেয়েটার ফর্সা হাতের মুঠোগুলো খুলছিল আর বন্ধ হচ্ছিল, ‘আমি ওকে ঘেন্না করি।’

‘আপনি জানেন ও কোথায় থাকে?’

‘হ্যাঁ।’

‘জো ব্রোডি গাইগারকে খুন করেছে– এটা আপনি পুলিশকে বলতে পারবেন?’

মেয়েটার চোখ আতঙ্কে বিস্ফারিত হল। আমি ওকে আশ্বস্ত করতে চেয়ে বললাম, ‘যদি ওই ফটোর ব্যাপারটা চাপা দেওয়া যায়, তাহলেই বলবেন। বলতে পারবেন?’

মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। সত্যি বলছি, হাসিটা আমার মোটেই ভালো লাগেনি। ওই অবস্থায় মেয়েটা যদি চেঁচাত, কাঁদত, অজ্ঞান হত– তাহলে তার কোনোটাই আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগত না। কিন্তু ওইভাবে হাসার একটাই অর্থ হয়। ও পুরো জিনিসটা দারুণ উপভোগ করছে! নগ্ন আইসিস-এর মতো পোজে ফটো তুলিয়েছে মেয়েটা, সেই ফটো কেউ ঝেড়ে দিয়েছে, ফটো যে তুলেছে তাকে গুলি করে মারা হয়েছে ওর সামনেই– আর ওর কাছে এই পুরো ব্যাপারটা হাসির জিনিস!

হাসিটা ক্রমেই বেড়ে ঠোঁট চোখ হয়ে পুরো মুখে ছড়িয়ে গেল। ব্যাপারটা হিস্টিরিয়ার চেহারা নিচ্ছে দেখে আমি নিরুপায় হয়ে ওর কাছে গেলাম, তারপর ঠাঁটিয়ে এক থাপ্পড় লাগালাম। মেয়েটার হাসি বন্ধ হয়ে গেল, তবে ও রাগ-টাগ করল না। গালে হাত বুলিয়ে ও এবার সিরিয়াস হল।

‘আপনার নাম ডগহাউস রাইলি নয়।’ ক্লাসে পড়া দেওয়ার মতো করে বলল মেয়েটা, ‘আপনি ফিলিপ মার্লো, একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আমাকে ভিভ বলেছে। আপনার কার্ডও দেখিয়েছে।’

‘বাহ, আপনার তো কথা-টথা বেশ মনে থাকে দেখছি।’ আমি বললাম, ‘আপনি ফটোটার খোঁজে আবার এসেছিলেন, কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে পারছিলেন না। তাই তো?’

বাধ্য মেয়ের মতো মাথা ওপর-নীচ করল মেয়েটা।

‘ফটোটা নেই।’ আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘কাল আপনাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে আমি তন্নতন্ন করে খুঁজেছিলাম। হয়তো ব্রোডিই ওটা নিয়ে গেছে। আপনি ব্রোডির ব্যাপারটা বানিয়ে বলছিলেন না তো?’

মেয়েটা সজোরে মাথা এপাশ-ওপাশ করে আপত্তি জানাল।

‘ওটা নিয়ে ভাববেন না।’ আমি বললাম, ‘কাউকে বলবেন না যে আপনি এখানে কাল বা আজ এসেছিলেন। এমনকী ভিভিয়েনকেও বলবেন না। সবটা আপনি রাইলির ওপর ছেড়ে দিন।’

‘আপনার নাম রাইলি…’ মেয়েটা থেমে গেল। তারপর সোৎসাহে মাথা নেড়ে আমার প্রস্তাবে সায় দিল। মেয়েটার চোখ ঘোলাটে ভাব হারিয়ে একটু একটু করে কালো হয়ে উঠল। বুঝলাম, ওর মাথায় কিছু একটা পরিকল্পনা জমাট বাঁধছে।

‘আমাকে এবার বাড়ি যেতে হবে।’ ও এমনভাবে বলল যেন আমরা এতক্ষণ চা খাচ্ছিলাম, আর এবার ওর পড়তে বসার সময় হয়েছে। আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম, কিন্তু নড়লাম না।

মেয়েটা মিষ্টি হেসে সদর দরজার দিকে এগোল। ও হাতলটা ধরামাত্র আমরা দু-জনেই একটা গাড়ির শব্দ পেলাম। মেয়েটা আমার দিকে ঘুরল। আমি স্রেফ কাঁধ ঝাঁকালাম। গাড়িটা ঠিক এই বাড়ির সামনেই এসে থামল। কারমেনের দু-চোখ আতঙ্কে বিস্ফারিত হল। ও তখনও হাতলটা ধরে আছে, এই অবস্থায় কেউ ঘণ্টিটা বাজাল। ওটা অনেকক্ষণ বাজল। অবশেষে দরজার হাতলে চাবি ঢুকল। তৎক্ষণাৎ, প্রায় লাফিয়ে কিছুটা পিছিয়ে এল কারমেন।

দরজা খুলে একটি লোক হনহনিয়ে ঘরে ঢুকল, তারপর আমাদের দেখে থমকে গেল। লোকটার পরনের দারুণ দামি ধূসর সুট, ধূসর চোখ, টুপির আড়ালে উঁকি দেওয়া ধূসর চুল, চকচকে পালিশ করা জুতো, টাইয়ে লাগানো দুটো হিরে, শক্ত সুঠাম চেহারা– এগুলো সবই আমার চোখে ধরা পড়ল।

এডি মার্সকে চিনতে আমার একটুও অসুবিধে হল না।