মরণ ঘুম – ১৬
১৬
যে জানলাটার কাচে গুলি লেগেছিল, সেটাকে কাছ থেকে দেখলাম। কাচটা ছ্যঁাদা করে গুলি বেরোয়নি, বরং ওই অংশটাই চুরমার হয়েছে। পাশের প্লাস্টারে একটা ছোটো গর্ত দেখে বুঝলাম, গুলিটা ওখান দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ঝটপট পর্দা টেনে জায়গাটা ঢেকে দিলাম। কারমেনের পিস্তলটা বের করে দেখলাম। একটা .২২ ক্যালিবারের ব্যাংকার্স স্পেশাল, হলো পয়েন্ট কার্ট্রিজের জন্যই বানানো। বাঁটে একটা ছোট্ট রুপোলি প্লেটে লেখা ছিল, ‘কারমেনকে দিলাম, ওয়েন’।
মেয়েটা কারো মাথা চিবোতে বাকি রাখেনি বোধ হয়!
আমি ব্রোডির কাছে বসে ওর মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। অ্যাগনেস একটা ছোট্ট আয়নায় নিজের মুখের চেহারা ঠিকঠাক করছিল তখন। ব্রোডি হতাশ ভঙ্গিতে বলল, ‘আর কী জানতে চান?’
‘টাকা জোগাড়ের জন্য বুড়োর বদলে মিসেস রেগানকে ধরেছিলেন কেন?’
‘মাস ছ-সাত আগে বুড়োর কাছ থেকে কিছু টাকা জোগাড় করেছিলাম। আবার ওঁর কাছে যেতে সাহস হয়নি। যদি পুলিশ ডাকেন…’
‘মিসেস রেগান ওঁর বাবাকে ব্যাপারটা বলতে পারেন— এটা একবারও মনে হয়নি?’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ব্রোডি। তারপর বলল, ‘আপনি মিসেস রেগানকে কতটা চেনেন?’
‘এখনও অবধি মোটে দু’বার ওঁর সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছে। বুঝতে পারছি, আপনি ওঁকে আমার চেয়ে ভালো চেনেন।’
‘মহিলার স্বভাবটা একটু উড়ু উড়ু টাইপের। আমি ভেবেছিলাম, কয়েকটা জিনিস উনি নিজের বাবাকে জানাতে চাইবেন না। তা ছাড়া পাঁচ হাজার ডলার তুলতে ওঁর খুব একটা কষ্ট হওয়ার কথা নয়।’
‘ব্যাখ্যাটা আপাতত মেনে নিতেই হচ্ছে। ভালো কথা, আপনি কী করেন? মানে এসব নয়, কী করে পেট চালান?’
‘বিমার দালালি। ওয়েস্টার্ন আর সান্তা মনিকা ক্রসিং-এর ফুলওয়াইডার বিল্ডিং-এ আমার অফিস। কিন্তু গত মাস দুয়েক আমি কোনো কাজকর্ম পাইনি। কীভাবে যে চালিয়েছি…!’
‘বইগুলো কি আপনার অ্যাপার্টমেন্টেই আছে?’
‘মাথা খারাপ!’ ওর আচরণে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসছিল পুরোদমে, ‘ওগুলো গুদামে রাখা আছে। গাইগারের দোকান থেকে সরাসরি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ওই জিনিস এলে লোকে পাঁচকথা বলবেই।’
‘আপনার বুদ্ধি আছে।’ মন থেকেই বললাম, ‘ওই ফটোর প্লেট পেলেন কীভাবে?’
‘এই শুনুন!’ এবার সোজা হয়ে বসল ব্রোডি, ‘আপনি যা চেয়েছিলেন, তা পেয়েছেন। সেও আবার কোনোরকম খরচাপাতি না করেই পেয়েছেন। এবার বিদেয় হোন। আপনার ক্লায়েন্টকে গিয়ে যা খুশি বোঝান। আমার আর কিচ্ছু বলার নেই।’
আমি ব্রোডিকে খুঁটিয়ে দেখলাম। ওর মুখ নির্বিকার থাকলেও হাত কাঁপছিল। বললাম, ‘এখানে ঠিক কী হয়েছিল সেই নিয়ে আমাদের সবাইকে একটাই গল্প বানাতে হবে কিন্তু। যেমন ধরুন, কারমেন এখানে আসেনি। ওটা একটা দিবাস্বপ্ন ছিল।’
‘দিবা দুঃস্বপ্ন!’ ব্রোডি খিঁচিয়ে উঠল, ‘বেশ। তাই হবে, তবে…’
দু-আঙুল জুড়ে ও যে ভঙ্গিটা করল সেটা বিশ্বসুদ্ধ সবাই চেনে। উত্তরে সবাই যা বলে, আমিও তাই বললাম, ‘কিছু পাবেন। হাজার-ফাজার নয়, তবে পাবেন। এবার বলুন তো, প্লেটটা কোত্থেকে পেলেন?’
‘একজন আমাকে দিয়েছে।’
‘তাই নাকি?’ আমি হাসলাম, ‘যে দিয়েছে, তাকে আপনি নিশ্চয় আগে কখনো দেখেননি। আবার দেখা হলে চিনতেও পারবেন না— তাই তো?’
‘লোকটার পকেট থেকে ওটা পড়ে গেছিল।’ ব্রোডি চোখ সরু করে বলল।
‘চমৎকার। কাল রাতে কোথায় ছিলেন সেই ব্যাপারে অ্যালিবাই আছে তো?’
‘আলবাত। আমি এখানেই ছিলাম। অ্যাগনেস আমার সঙ্গে ছিল, তাই তো অ্যাগনেস?’
অ্যাগনেস যেভাবে ব্রোডি-র দিকে তাকাল সেটা দেখে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। হো হো করে হেসে আমি উঠে দাঁড়ালাম। তারপর ব্রোডিকে বললাম, ‘নিজের গলায় যে দড়িটা পরাচ্ছেন সেটার মাপ, রং, দাম— এগুলোও ভেবে রাখুন। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির সুবিধেই হবে।’
বড়ো ডেস্কটার পাশে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ব্রোডি-র দুটো বন্দুকই বের করলাম। সেগুলো সুন্দরভাবে টেবিলের ওপর সাজিয়ে আমি সোফা থেকে নিজের টুপিটা নিয়ে মাথায় চড়ালাম। তারপর দরজার কাছে গেলাম।
‘শুনুন!’ পেছন থেকে ব্রোডি আর্তনাদ করল। আমি ওর দিকে ফিরলাম। ব্রোডি আর অ্যাগনেস যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, সেই দৃষ্টিটা আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ধূর্ততা, ভয়, আর অসহায় রাগের ককটেল ওটা। অ্যাগনেস নিজের মাথা থেকে একটা চুল টেনে ছিঁড়ল।
‘আপনি আদৌ পুলিশের কাছে যাবেন না।’ ব্রোডি কড়া গলায় বলে উঠল, ‘আপনি স্টার্নউডদের হয়ে কাজ করছেন, তাই না? আমার কাছে ওদের ব্যাপারে যা সব জিনিস আছে তাতে ওরা আমাকে ছুঁতেও পারবে না। যা খুশি তাই করুন!’
‘আপনি বরং ভেবে দেখুন কী বলবেন।’ আমি বিরক্ত হওয়ার ভাব ফুটিয়ে বললাম, ‘একবার বললেন আমাকে বিদায় হতে। যখন বেরিয়ে যাচ্ছি, তখন আবার এ সব শোনাচ্ছেন। আপনি আমার কাছে ঠিক কী চাইছেন?’
‘আপনি আমার কিস্সু করতে পারবেন না!’ ব্রোডির মুখ লাল হয়ে উঠছিল।
‘মাত্র দুটো খুন আপনার ওপরে চাপানো যাবে।’ আমি বললাম, ‘আপনার কাছে বোধ হয় ওটা খুব একটা বড়ো ব্যাপার নয়। তাহলে আসি?’
ব্রোডি লাফিয়ে উঠল। বেশি নয়, হয়তো ইঞ্চিখানেক। কিন্তু ওই পরিবেশে আমাদের মনে হল, ও বোধ হয় ছাদ ছুঁয়ে ফেলবে। ওর মুখ কেমন যেন সবুজ আর ছাই রঙের মাঝামাঝি হয়ে গেছিল। অ্যাগনেস সোফার হাতলে মুখ গুঁজে একটা আর্ত চিৎকার করে উঠল। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
‘আপনি বসুন।’ ব্রোডি ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, ‘এর মধ্যে দুটো খুন কোত্থেকে এল?’
আমি দরজায় হেলান দিয়ে বললাম, ‘কাল রাতে সাড়ে সাতটা নাগাদ আপনি কোথায় ছিলেন?’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ব্রোডি। তারপর নীচু গলায় বলল, ‘আমি একটা লোকের ওপর নজর রাখছিলাম।’
‘কার ওপর?’
‘গাইগার। ওর ব্যাবসায় পার্টনার হয়ে ঢুকতে চাইছিলাম আমি। ভেবেছিলাম, এখানকার কোন মহারথী-র আশীর্বাদ ওর মাথায় আছে, সেটা জানতে পারলে ওকে চাপ দেওয়া সহজ হবে। কিন্তু ক-দিন ধরেই দেখেছি, মেয়েরা ছাড়া কেউ ওর বাড়িতে আসে না।’
‘ভুল দেখেছিলেন। যাইহোক, কাল রাতে কী হল?’
‘তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। গাইগারের বাড়ির সামনে ওর গাড়িটা ছিল। সেখান থেকে একটু সামনে আরেকটা গাড়ি রাখা ছিল। গাইগারের বাড়ির পেছনে, কিছুটা নীচে যে রাস্তাটা আছে, আমি সেখানেই নিজের গাড়িতে বসে ছিলাম। আমার গাড়ি থেকে কিছুটা এগিয়ে ওই রাস্তাতেই একটা বড়ো গাড়ি পার্ক করা ছিল। গাড়িতে কেউ ছিল না। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যেও বেরিয়ে জানলার কাচে আলো ফেলে বুঝেছিলাম, গাড়িটা ভিভিয়েন রেগানের নামে রেজিস্টার করা। বেশ কিছুক্ষণ ওখানে রইলাম। কিছুই হল না। আমি কেটে পড়লাম— ব্যস।’
‘হতে পারে।’ আমি সায় দিলাম, ‘ওই গাড়িটা এখন কোথায় জানেন?’
‘আমি কী করে জানব?’
‘শেরিফের গ্যারেজে। লিডো-র মাছধরার জেটির নীচে, প্রায় বারো ফুট গভীর জলের মধ্যে থেকে গাড়িটা তোলা হয়েছে। তাতে একটি লোকের মৃতদেহও পাওয়া গেছে। লোকটাকে কিছু দিয়ে জোরে মারা হয়েছিল। ওর থ্রটলটাও অর্ধেক নামানো ছিল।’
‘এটা…’ ব্রোডি ঘন ঘন শ্বাস ফেলছিল, ‘এটা আপনি আমার ঘাড়ে চাপাতে পারবেন না।’
‘কেন পারব না? গাড়িটা মিসেস রেগানের। উনি কাল রাতে ওখানে ছিলেন না— তার সাক্ষী আছে। গাড়িটা চালাচ্ছিল স্টার্নউডদের ড্রাইভার ওয়েন টেলর। ওয়েন কারমেনকে ভালোবাসত। ও গাইগারের বাড়িতে গেছিল গাইগারকে ভয় দেখাতে, যাতে গাইগার কারমেনের সঙ্গে উলটোপালটা কিছু না করে। পেছনের একটা দরজা খুলে ও ভেতরে ঢুকে দেখল, গাইগার কারমেনের ওই বিশেষ পোজে ফটো তুলছে। ওয়েনের হাতে বন্দুক ছিল। এইসব অবস্থায় যা হয়, তাই হল। গুলি চলল। গাইগার খুন হল। ওয়েন ফটোর প্লেট নিয়ে পালাল। আপনি ওর পিছু নিয়ে ওর কাছ থেকে প্লেট জোগাড় করলেন। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তো আপনার পক্ষে ওটা পাওয়া সম্ভব নয়।’
‘ঠিক।’ ব্রোডি খসখসে গলায় বলল, ‘কিন্তু ওকে আমি মারিনি। কেন মারব? আমি গুলির আওয়াজ শুনেছিলাম। গুলি যে চালিয়েছে তাকে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাড়িতে বসে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যেতেও দেখেছিলাম। আমি ওর পিছু নিলাম। বিভারলি হিলস পেরিয়ে যাওয়ার পর ভেজা রাস্তায় ওর গাড়ির চাকা স্কিড করছিল। বাধ্য হয়ে ও একধারে গাড়ি থামাল। আমি ওর কাছে গিয়ে পুলিশ সাজলাম। ছোকরা বন্দুক বের করেছিল। কিন্তু ও এতটাই নার্ভাস ছিল যে এক ঝটকায় ওর বন্দুকটা নীচে ফেলে দিতে আমার সমস্যা হয়নি। ওর মাথায় ব্ল্যাকজ্যাকের এক ঘা দিতেই ও অজ্ঞান হয়ে গেল। আমি ওর তল্লাশি নিয়ে বুঝলাম ও কে। তখনই প্লেটহোল্ডারটা আমি দেখি। সেটা বের করেও নিই।’
‘তারপর?’ আমি সোফায় বসে বললাম।
‘ড্রাইভারের পরিচয় পেয়ে আর প্লেটটা দেখে আমার সব ঘেঁটে গেল। বোঝার চেষ্টা করছিলাম, ঠিক কী হয়েছে গাইগারের বাড়িতে। তখনই ছোকরার জ্ঞান ফিরল। আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ও অন্ধের মতো গাড়িটা চালিয়ে দিল। কোথায় গেল, কীভাবে গেল— আমি আর কিছুই জানি না।’
‘ও-ই যে গাইগারকে মেরেছে, এটা কখন বুঝলেন?’
‘গুলির শব্দ শুনেই মনে হয়েছিল। প্লেটটা ডেভেলপ করার পর দুয়ে দুয়ে চার করেছিলাম আমিও— ওই যেভাবে আপনি বললেন। আজ সকালে যখন গাইগার ওর দোকানে গেল না, এমনকী ফোনও ধরল না, তখন নিশ্চিত হয়ে গেলাম। ঠিক করে ফেললাম, ওর বইগুলো এই তালে সরিয়ে ফেলা যাক। স্টার্নউডদের সঙ্গে আমার পেয়ার-মোহব্বত অনেকদিনের। ভাবলাম, এই সুযোগে ওদের কাছ থেকেও কিছু কামিয়ে নেওয়া যাক।’
‘এই অবধি তো ঠিকই আছে।’ আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম, ‘গাইগারের লাশ কখন সরালেন?’
‘আপনি খেপেছেন!’ ব্রোডি আবার লাফিয়ে উঠল, ‘ওই জায়গায় তো পুলিশের থিকথিক করার কথা তখন। আমি সেখানে গিয়ে লাশ গায়েব করব?’
‘কেউ একজন লাশটা সরিয়েছে।’
ব্রোডি-র মুখ দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, ও আমার কথা বিশ্বাস করছে না। নির্বিকার ভঙ্গিতে ও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তখনই আবার দরজার ঘণ্টিটা বাজতে শুরু করল। ব্রোডি উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কে রাখা বন্দুক দুটোর দিকে তাকাল। তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘আবার এসেছে!’
‘যদি এসেও থাকে,’ আমি ওকে সান্ত্বনা দিলাম, ‘এখন ওর কাছে আর কোনো বন্দুক নেই। কিন্তু আপনার কোনো বন্ধুও তো এসে থাকতে পারে, তাই না?’
‘চুলোয় যাক!’ লম্বা লম্বা পা ফেলে টেবিল থেকে কোল্টটা তুলে নিল ব্রোডি, ‘আমি এ জিনিস আর সহ্য করতে পারছি না।’
কোল্টটা নিজের ডান হাতে নিয়ে, সেটাকে থাইয়ে চেপে ধরে বাঁ-হাত দিয়ে দরজার হাতল ঘোরাল ব্রোডি। দরজাটা ফুটখানেক ফাঁক হল। ওই ফাঁকে নিজের শরীরের ভর কিছুটা ছেড়ে ব্রোডি সামনে ঝুঁকল।
একটা অস্ফুট প্রশ্ন শুনলাম, ‘ব্রোডি?’
ব্রোডি কী বলল, সেটা আমি শুনতে পাইনি। পরের দুটো আওয়াজ ভোঁতা শোনাল, মানে বন্দুকটা ওর শরীরে ঠেকিয়েই গুলি চালানো হয়েছিল। ব্রোডি এবার শরীরের পুরো ভার দরজার ওপর ছেড়ে দিল। ওই ভারে দরজাটা সপাটে বন্ধ হল। ওর শরীরটা দরজা বেয়ে ঘষটে নেমে এল। পায়ের ধাক্কায় কার্পেটটা একটু পিছিয়ে গেল। ওর মাথাটা দরজার ধারে আটকে ছিল। ও নড়ছিল না। কোল্টটা তখনও ওর ডান হাতে ধরা ছিল।
প্রায় এক লাফে আমি দরজার কাছে পৌঁছোলাম। ব্রোডি-র শরীরটা গড়িয়ে একপাশে সরালাম, যাতে দরজা খোলা যায়। বেরিয়ে করিডোরে এলাম। উলটোদিকে একটু দূরের একটা ঘরের দরজা খোলা ছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে এক বয়স্ক মহিলা ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। হাত তুলে তিনি হলের সোজাসুজি দিকটা দেখিয়ে দিলেন। আমি ওদিকে ছুটলাম। শুনতে পাচ্ছিলাম, ধুপ ধাপ করে কেউ দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। আমি যখন নীচে লবিতে পৌঁছোলাম, তখন সামনের দরজাটা বন্ধ হচ্ছে। দ্রুত সরে যাওয়া পায়ের শব্দ পাচ্ছিলাম। দরজা খুলে একলাফে বাড়ির বাইরে এসে পড়লাম।
লেদার জার্কিন পরা একটা লম্বা লোক কোনাকুনি দৌড়ে পার্ক করা গাড়িগুলোর মাঝের জায়গাটা পার হচ্ছিল। লোকটা আমার দিকে ঘুরল। আমি আগুনের ঝলক দেখলাম। পাশের দেওয়াল থেকে পরপর দুটো ভারী আওয়াজ এল।
এক স্থানীয় ভদ্রলোক আমাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কী হচ্ছে এখানে?’
‘গুলি চলছে।’
‘বাপরে!’ বলে ভদ্রলোক প্রায় গুলির মতোই অ্যাপার্টমেন্ট হাউসে ঢুকে পড়লেন। আমি নিজের গাড়ি অবধি হেঁটে গিয়ে স্টার্ট দিলাম। তারপর গাড়ি চালিয়ে ধীরেসুস্থে টিলা বেয়ে নীচে নামলাম। অন্য কোনো গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার শব্দ পাইনি বলে লোকটাকে ধরার একটা প্ল্যান ছকে ফেলেছিলাম। সেই অনুযায়ী প্রায় দেড় ব্লক গিয়ে আমি একটা ক্রসিং-এ আবার গাড়ি ঘুরিয়ে এদিকেই এলাম। দুটো গাড়ির মধ্যে পার্ক করার জায়গা খুঁজে নিয়ে আমি নীচু হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কারমেনের রিভলভারটাই বাধ্য হয়ে হাতে নিয়েছিলাম। হালকা শিসের শব্দ কানে আসছিল। শিস্ দেওয়া মানুষটির পায়ের শব্দ একদম কাছে এলে আমি সোজা হয়ে তার কাছে পৌঁছে বললাম, ‘দেশলাই আছে?’
লোকটা… না, ছেলেটা বিদ্যুদ্্বেগে পেছন ফিরল। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই ওর ডান হাত জার্কিনের মধ্যে ঢুকল। তবে আমার হাতও ফাঁকা নেই দেখে ও নিজের হাতটা সাবধানে বের করে আনল।
রাস্তা থেকে ছলকে আসা আলোতেও ছেলেটার চোখজোড়া ভারি সুন্দর লাগছিল। শুধু চোখ নয়, ঈষৎ ফ্যাকাশে কিন্তু ধারালো মুখ, কোঁকড়ানো একমাথা চুল, ছিপছিপে চেহারা দেখে ওই ‘সুন্দর’ বিশেষণটা ওর সম্বন্ধে নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করা যায় – এটা আমাকে মানতেই হল।
গাইগারের দোকানের সেই ছেলেটা!
‘বড্ড ভালোবাসতে ওকে, তাই না?’ আমি বললাম।
মুখের একটা পেশিও না কাঁপিয়ে আমাকে কয়েকটা গালাগাল দিল ছেলেটা। আমরা ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম স্টেজের সেটিং-এর মতো। দূর থেকে সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। ছেলেটা একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। আমি সেই সুযোগে ওর গায়ের একদম কাছে গিয়ে রিভলভারটা ওর পেটে ঠেকিয়ে বললাম, ‘পুলিশ, না আমি?’
ছেলেটা সামান্য টলে গেল। তারপর দাঁত খিঁচিয়ে বলল, ‘আপনি কে?’
‘গাইগারের বন্ধু।’
‘দূর হও, হতভাগা!’
‘এই বন্দুকটা ছোটো।’ আমি ধীরে ধীরে বোঝালাম, ‘কিন্তু এটা দিয়েও তোমার নাভিতে গুলি করলে হাঁটার অবস্থায় ফিরতে তিন মাস লাগবে। তারপর না হয় গ্যাস চেম্বার অবধি রাস্তাটা হেঁটে যেয়ো।’
আবার আমাকে গালাগাল দিয়ে ছেলেটা জার্কিনে হাত ঢোকাতে গেছিল। আমি নলটা ওর পেটেই প্রায় ঢুকিয়ে দিলাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতটা আবার বের করে নিল ছেলেটা। নীচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কী চান?’
আমি ওর জার্কিনে হাত ঢুকিয়ে অটোমেটিকটা বের করে নিলাম। তারপর রিভলভারের ইশারায় ওকে আমার গাড়িটা দেখিয়ে বললাম, ‘চলো।’
ছেলেটা গাড়ির পেছনের দরজা খুলছিল। আমি ওকে বললাম, ‘স্টিয়ারিং-এর পেছনে যাও। তোমাকে চালাতে হবে।’ ছেলেটা ড্রাইভারের জায়গায় বসল। আমি ওর পাশে বসে বললাম, ‘ধীরে ধীরে গাড়িটাকে চালাও। পুলিশের গাড়িটাকে পাশ দিয়ে যেতে দাও, যাতে ওরা ভাবে আমরা সাইরেনের শব্দ পেয়ে ওদের সাইড দিচ্ছি।’
ছেলেটা সেভাবেই চালাল। আমি কারমেনের বন্দুক সরিয়ে রেখে অটোমেটিকটা বের করে ওর পাঁজরে ঠেকিয়ে রাখলাম। পুলিশের গাড়ি দুটো প্রচুর আলো আর আওয়াজ ছড়িয়ে আমাদের ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল। পরের ক্রসিং-এ পৌঁছেই আমি বললাম, ‘এবার গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি চলো। তোমার বাড়ি। লাভার্ন টেরেস।’
ছেলেটা কোনো কথা না বলে গাড়ি ঘোরাল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার নাম কী?’
‘ক্যারল লুন্ডগ্রেন।’ নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে বলল ছেলেটা।
‘তুমি ভুল লোককে গুলি করলে ক্যারল। জো ব্রোডি গাইগারকে মারেনি কিন্তু।’
ছেলেটা আমার উদ্দেশে ওর অতি প্রিয় কয়েকটা গালি ওইরকম নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতেই আবার ছুড়ে দিল। আমরা লাভার্ন টেরেসের দিকে চললাম।
