Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ২০

২০

মিসিং পার্সনস ব্যুরো-র ক্যাপ্টেন গ্রেগরি মাইলস বেশ পরিপাটি স্বভাবের মানুষ। আমার কার্ডটা উনি অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন, তারপর টেবিলে এমন করে রাখলেন যাতে তার কিনারাগুলো টেবিলের ধারের সঙ্গে একেবারে সমান্তরাল হয়ে থাকে। পাইপ ধরালেন। সেটা মুখে গুঁজলেন। তারপর নিজের ভারী শরীরটা চেয়ারসুদ্ধ জানলার দিকে ঘুরিয়ে, বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রাইভেট ডিটেকটিভ! তা বেশ। আপনার জন্য কী করতে পারি?’

‘আমি জেনারেল গায় স্টার্নউডের হয়ে কাজ করছি।’ আমি বললাম, ‘৩৭৬৫ অল্টা ব্রিয়া ক্রেসেন্ট, পশ্চিম হলিউড।’

‘কাজ করছেন!’ মুখ থেকে পাইপ না সরিয়েই জানতে চাইলেন মাইলস, ‘কী নিয়ে?’

‘তার সঙ্গে আপনাদের কাজের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।’ আমি বললাম, ‘উনি একে ধনী, তায় ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি-র বাবা-র বন্ধু। তাই আপনারা আছেন জেনেও উনি যদি আমাকে কাজে লাগান— তাতে আপনাদের অসম্মান করা হয় না। তবে আপনি হয়তো আমার কাজে একটু সাহায্য করতে পারবেন।’

বাইরে তাকিয়েই বললেন মাইলস, ‘আমরা জেনারেলের কোনো কাজে ‘‘আছি’’— এটা কে বলল আপনাকে?’

আমি চেয়ারটা পেছনে ঠেলে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর বললাম, ‘আপনার সময় নষ্ট করব না ক্যাপ্টেন। আসি তাহলে?’

ভদ্রলোক নড়লেন না। ক্লান্ত চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আপনি ডি এ-কে চেনেন?’

‘চিনি। আমি ওঁর হয়ে একসময় কাজও করেছি। ওঁর অফিসের চিফ ইনভেস্টিগেটর বার্নি ওল্্স-কে আমি আরও ভালোভাবে চিনি।’

ফোনটা তুলে নিলেন মাইলস, তারপর বললেন ডি এ-র অফিসে ওল্্সের সঙ্গে ওঁকে কথা বলাতে। মিনিট পাঁচেক কাটল, ফোনটা আর্তনাদ করে ওঠা অবধি সময়টা ভদ্রলোক ওইরকম ক্লান্ত চোখে আমাকে মেপে গেলেন। ফোন ধরে উনি ওল্্সের কাছ থেকে আমার ঠিকুজিকুষ্ঠি, বিশেষত বর্ণনা জানলেন। তারপর গভীর মনোযোগ দিয়ে পাইপে নতুন তামাক ঠেসে আর মুখাগ্নি করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী জানতে চান আপনি?’

‘আপনারা কদ্দূরে এগোলেন, মানে আদৌ যদি এগিয়ে থাকেন আর কি।’

মাইলস অনেকক্ষণ ধরে কিছু ভাবলেন। শেষে বললেন, ‘রেগান?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওকে চেনেন?’

‘না। যাঁরা ভদ্রলোককে চেনেন তাঁদের কাছে বর্ণনা শুনেছি। আইরিশ, বয়স ত্রিশের বেশি হলেও দেখতে-শুনতে বেশ ভালো। এককালে মদের চোরাচালান করত। বউয়ের সঙ্গে ঠিক বনিবনা হয়নি। মাসখানেক আগে থেকে নিখোঁজ।’

‘হুঁহ!’ নাকের মধ্যে থেকে একটা আওয়াজ করলেন মাইলস, ‘জেনারেল ওইরকম লোককে খুঁজে বের করার জন্য পয়সা খচ্চা করে ডিটেকটিভ লাগিয়েছেন! বরং ভালো হয়েছে যে আপদ গেছে।’

‘কী করবেন বলুন? রেগান জেনারেলের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন, ওঁকে সঙ্গ দিতেন। তাই উনি ওঁর প্রতি একটু বেশিই দুর্বল।’

‘বুঝলাম। কিন্তু আপনি এমন কী করতে পারবেন, যেটা আমরা পারব না?’

‘কিচ্ছু না।’ আমি দু-হাত তুলে ওঁকে আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করলাম, ‘কিন্তু একটা অদ্ভুত ধরনের ব্ল্যাকমেইলের ব্যাপার চলছে স্টার্নউডদের পরিবারকে নিয়ে। আমি জানতে চাই, রেগান তাতে জড়িয়ে আছেন কি না।’

‘আপনাকে সাহায্য করতে পারলে খুশিই হতাম।’ কাঁধ ঝাঁকালেন মাইলস, ‘কিন্তু ও সত্যিই নিরুদ্দেশ। জানি, আমাদের নজর এড়িয়ে বেশিদিন পালানো যায় না। তবে…’

ঘণ্টি বাজিয়ে এক মধ্যবয়সি মহিলাকে ডেকে টেরেন্স রেগানের ফাইলটা আনতে বললেন মাইলস। আমরা একে অপরের দিকে চেয়ে রইলাম। তারপর সবুজ মলাটের একটা ফাইল এসে পৌঁছোল।

‘ও ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে বেপাত্তা।’ নাকের ওপর একটা মোটা ফ্রেমের চশমা এঁটে কাগজ উলটে বললেন মাইলস, ‘সেদিন ওদের ড্রাইভারের ছুটি ছিল। তাই ও কখন গাড়ি নিয়ে বেরোল, এটা কেউই দেখেনি। গাড়িটা দিনচারেক পর সানসেট টাওয়ার্সের কাছে কাসা ডে ওরো-তে পাওয়া যায়। গ্যারেজ যে সামলায়, সে-ই পুলিশকে ফোন করে বলে যে ওখানে এমন একটা গাড়ি আছে যার মালিক ওখানে থাকে না। আমরা গাড়িটা বেশ ভালোভাবেই দেখেছি, কিন্তু হাতের ছাপ-টাপ কিছু পাইনি। তবে ব্যাপারটা সন্দেহজনক লেগেছিল।’

‘যেহেতু এডি মার্সের বউ নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে ওখানেই থাকতেন।’ আমি পাদপূরণ করলাম।

‘হ্যাঁ।’ আমি ব্যাপারটা জানি বলে মাইলস একটু বিরক্তই হয়েছেন দেখলাম, ‘খোঁজ নিতে গিয়ে সেটাই জানা গেল। উনিও প্রায় ওই সময়েই উধাও হন। সবচেয়ে বড়ো কথা, ওই বাড়ির কোনো কোনো বাসিন্দা এও বলেছেন যে মিসেস মার্সের সঙ্গে নাকি রেগান, বা ওর মতো দেখতে কাউকে কয়েকবার দেখাও গেছিল।’

‘মিস্টার মার্সের এই নিয়ে কী বক্তব্য?’

‘ওঁরা আলাদা থাকতেন, তবে দু’জনের সম্পর্ক ভালোই ছিল। আপাতত একটাই থিয়োরি আমাদের মাথায় আছে।

রেগানের সঙ্গে পনেরো হাজার ডলার ছিল। এটা ওর নিজের রোজগার, স্টার্নউডের কাছ থেকে ও এক পয়সাও কখনো নেয়নি। এই টাকাটার জন্য, তা ছাড়া নিজের প্রাক্তন পরিচয়ের সুবাদে ও কারো টার্গেট হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ওর সঙ্গে বন্দুক ছিল। ওকে টাইট করা খুব সহজ কাজও হত না। অনেকেই ওকে ভয়-টয় পেত। তা ছাড়া গাড়িটা ওই বাড়ির গ্যারেজে পাওয়া গেছিল বলে মনে হয়, যে ওকে হাপিশ করেছে সে ওর আর মিসেস মার্সের ব্যাপারটা জানত। স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ হয় এডি মার্সের ওপর। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখেও ওই লোকটির সঙ্গে এই অন্তর্ধানের কোনো সম্পর্ক পাইনি আমরা। তা ছাড়া সব সূত্র থেকেই এটা জানা গেছে যে মিসেস মার্স কী করছেন না করছেন তাই নিয়ে মিস্টার মার্সের খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। ঈর্ষা বা পয়সা— দুটোর কোনোটা দিয়েই এডি মার্সকে এর মধ্যে জড়ানো যাচ্ছে না।’

‘কোনো ফটো আছে?’

‘রেগানের ফটো আছে।’ ফাইল থেকে একটা ফটো বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরেন মাইলস, ‘কিন্তু মিসেস মার্সের কোনো ফটো নেই। ব্যাপারটা এমন আরও বেশ কিছু কারণে ঘেঁটে আছে।’

আমি রেগানের ফটোটা দেখলাম। চকচকে প্লেট থেকে যে মানুষটি আমার দিকে তাকিয়ে ছিল তার সম্বন্ধে দুটো জিনিস একেবারে লাফিয়ে আমার সামনে চলে এল। প্রথমত, ফটোতে আইরিশদের সচরাচর হাসিখুশি দেখায়, কিন্তু এর মুখে একটা বিষণ্ণ আর ক্লান্ত ভাব ফুটে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, এর সঙ্গে ঝামেলা করলে বিপদ আছে। ফটোটা ফেরত দিয়ে দিলাম। ভিড়ের মধ্যেও এই মুখ আমি চিনে নিতে পারব।

‘যদি এডি না হয়, তাহলে কে?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘আমাদের অনুমান,’ পাইপ ঠুকে পুরোনো ছাই ফেলতে ফেলতে বললেন মাইলস্‌, ‘রেগান আর মিসেস মার্স— এঁরা দু’জনে মিলে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। মহিলার সঙ্গেও গয়না-টয়না ভালোমতোই ছিল। এঁরা দু-জন মিলে চুপচাপ কোথাও গা ঢাকা দিলে খুঁজে পাওয়া শক্ত। এমনিতেই গাড়িটা না পাওয়া গেলে তো আমরা ওটুকুও বুঝতে পারতাম না। আমাদের লোকেরা এদিক-ওদিক দেখছে, তবে সবটাই করতে হচ্ছে চুপচাপ, গোপনে। কারণটা বুঝতেই পারছেন। ‘‘বড়ো’’ ঘরের ব্যাপার বলে কথা!’

‘মহিলা এডিকে বিয়ের আগে কী করতেন?’

‘বারে কাজ করতেন, গাইয়ে হিসেবে।’

‘তাহলে সেই সময়কার ফটো থাকবেই। ওগুলো দিয়ে খুঁজলে হয় না?’

‘এডি মার্স চান না আমরা ওঁর স্ত্রীকে খুঁজি।’ ক্লান্তভাবে বললেন মাইলস, ‘তা ছাড়া আমরা ওদের এক-না-একদিন পাবই।’

‘তদ্দিন জেনারেল স্টার্নউড বেঁচে থাকবেন না।’

‘তাতে আমি কী করব?’ স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন মাইলস, ‘কেন? আপনার কি ধারণা, আমরা ওঁদের দু-জনকে পাব না? ওঁদের কী হয়েছে?’

‘মরুভূমি আর সমুদ্র— দুটোর কোনোটাই এখান থেকে খুব একটা দূরে না ক্যাপ্টেন।’ আমি উঠে দাঁড়ালাম, ‘আপনার থিয়োরি সত্যি হতেই পারে। কিন্তু বড়ো ঘরের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে রেগান কেন অন্যের বউকে নিয়ে ভাগলবা হবে, সেও আবার মাত্র কয়েকবার দেখা হওয়ার পরেই, এটা আমার মাথায় ঢুকছে না। রেগানের শরীরটা পেতে হলে তাই আপনাকে ওই দুটো জায়গাতেই খুঁজতে হবে বলে আমার ধারণা।’

বিরসবদনে আমার সঙ্গে হাত মেলালেন মাইলস।

আমি সিটি হল থেকে বেরিয়ে আসার পর একটা ধূসর রঙের প্লিমাউথ সেডান আমাকে অনুসরণ করল। ওটাকে বারকয়েক আমার কাছে আসার সুযোগ দেওয়ার পরেও ওটা দূরেই রইল। আমি বাধ্য হয়ে নিজের কাজে গেলাম।