Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ২১

২১

স্টার্নউডদের ধারেকাছে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তাই নিজের অফিসে বসে আকাশ-পাতাল ভেবে আর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অনেকটা সময় বরবাদ করলাম। লাঞ্চ করার জন্য উঠি উঠি করছি, ঠিক তখনই ফোনটা এল। নরিস, মানে বাটলার ভদ্রলোক জানালেন, জেনারেল অসুস্থ। তবে ওঁকে খবরের কাগজ থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনানোয় ওঁর মনে হয়েছে, আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে।

‘গাইগারের ব্যাপারে— হ্যাঁ, হয়েছে।’ আমি মেনে নিলাম, ‘আমি ওকে মারিনি কিন্তু।’

‘জেনারেল সেটা একবারও ভাবেননি, মিস্টার মার্লো।’

‘আপনি কি জানেন জেনারেল আমাকে কী দিয়েছিলেন?’

‘জানি। তিনটে প্রমিসরি নোট আর একটা কার্ড।’

‘মিসেস রেগান যে ফটোগুলো নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, সেগুলোর ব্যাপারে কি জেনারেল কিছু জানেন?’

‘না, স্যার। ওই বিষয়ে মিসেস রেগান কাল রাতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন।’

‘তাহলে আমি ওই নোট আর কার্ড ফেরত দিয়ে আসছি। ফটোগুলো নষ্ট করে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো।’

‘খুব ভালো, স্যার। তাহলে আমরা কি ধরে নিতে পারি যে আপনার কাজ একেবারে শেষ হয়ে গেছে?’

‘এক্কেবারে!’

‘পারিশ্রমিক হিসেবে জেনারেল আপনাকে পাঁচশো ডলার দিতে চান। সেটা কি যথেষ্ট হবে?’

‘যথেষ্টর চেয়েও বেশি। জেনারেল মহানুভব।’

‘আপনি যদি আগামীকাল আসেন, তাহলে জেনারেল নিজেই আপনাকে মামলাটার নিষ্পত্তির জন্য ধন্যবাদ দিতে পারবেন।’

‘বেশ।’

বুঝতে পারছিলাম, এই ব্যাপারটা আর টানা হোক সেটা কেউই চাইছে না। কাগজে-কলমে আমার কাছে আর কোনো ‘কেস’-ও নেই। কিন্তু…

একে একে ভাবতে বসলাম।

‘রাস্টি’ রেগান কেন উধাও হল? জেনারেল স্টার্নউডের সঙ্গে রেগানের সম্পর্কটা যে গভীর ছিল, সেটা বোঝা যায়। উনি আমাকে না বললেও আমি বুঝে নিয়েছিলাম, রেগানের সন্ধানে উনি মিসিং পার্সন ব্যুরোকে কাজে লাগাবেনই। স্ত্রী-র সঙ্গে বনিবনা না হলেও এক বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে, মাত্র কয়েকবার দেখাসাক্ষাতের পরেই, কাউকে কিছু না বলে পালানোর মতো লোক রেগান নয়। ওকে এডি মার্সই-বা খুন করবে কেন? পনেরো হাজার ডলার বা ঈর্ষা— দুটোর কোনোটাই মার্সের মতো খেলোয়াড়ের জন্য যথেষ্ট কারণ নয়। পুলিশ যে ওর ব্যাপারে আর খোঁজাখুঁজি করবে না, এটা বুঝতেই পারছিলাম। আমিও কি থেমে যাব?

কারমেন স্টার্নউড গাইগারের পর এবার কার সঙ্গে বসে নেশা বা অন্য কিছু করবে— সেটা নিয়ে মাথা ঘামানো আমার কাজ নয়।

মিসেস রেগানও জুয়া খেলা আর ‘ফুলে ফুলে, ঢলে ঢলে’ ছাড়া কিছু করবেন বলে মনে হচ্ছে না।

ক্যারল লুন্ডগ্রেন আপাতত অনেকদিনের জন্য হিমঘরে যাবে। আমি জানি, ও পুলিশের কথামতো ‘অপরাধ’ স্বীকার করবে। পুলিশও গাইগারের বিশেষ ব্যাবসার ব্যাপারটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চেপে দিতে চাইবে।

রইলাম বাকি আমি। একটা খুন চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ধামাচাপা তো দিয়েইছি, সঙ্গে আরও অনেক কিছু বদলে-টদলে দিয়েছি। অথচ হাজতে যাওয়া, নিদেনপক্ষে লাইসেন্স হারানোর বদলে শ-পাঁচেক ডলারের প্রাপ্তিযোগ হতে চলেছে! আমার তাহলে কী করণীয়?

ঘটে সামান্য মালমশলা থাকলেও লোকে এই অবস্থায় শান্তিতে মদ্যপান করে সময় কাটায়। কিন্তু আমি কী করলাম? এডি মার্সকে ফোন করে বললাম, সেদিন রাতে আমি ওর ডেরায় যাব!

ডে কাজেন্স বলে এক ধনী সমুদ্রের তীরে ওই বাড়ি-কাম-হোটেলটা বানিয়েছিলেন। এখন অবশ্য ওটা সাইপ্রেস ক্লাব। লাগোয়া একটা সাইপ্রেস বনের সুবাদেই বাড়িটার এহেন নামকরণ। আমি ওখানে পৌঁছোলাম রাত ন-টা নাগাদ। তখন আকাশে একটা মস্ত চাঁদ উঠলেও হালকা কুয়াশা ছড়িয়ে ছিল চরাচরে। বাড়িটা থেকে বেশ কিছুটা দূরে গাড়ি রেখে হেঁটে গেলাম।

মার্স চাইলেই এই বাড়িটাকে সিনেমার সেটের মতো চোখ-ধাঁধানো কিছু করে রাখতে পারত। কিন্তু সুপ্রাচীন পোশাক পরে থাকা ডোরম্যান, ভেতরে প্রায়ান্ধকার বিশাল লবি, অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কিছু হাসি আর অন্য আওয়াজ, মেহগনি কাঠের ঘোরানো সিঁড়ি— এসব দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম, সাইপ্রেস ক্লাবকে সব দিক দিয়েই ‘অন্যরকম’ করে রাখা হয়েছে। আমার আসার খবর ভেতরে যাওয়ার পর মার্সের দুই নিত্যসঙ্গী এসে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল।

একটা বিশাল, সাজানো-গোছানো ঘর। মেঝে থেকে শুরু করে বড়ো জানলা, ফায়ারপ্লেসে ঢিমে আঁচ তোলা আগুন, কুচকুচে কালো একটা টেবিল— সব মিলিয়ে ঘরটাকে আমার আরও বেশি ঠান্ডা লাগল। তবে ওতে ব্যতিক্রম ছিল কোণে রাখা একটা সিন্দুক, যাতে একটা টাইম-লক লাগানো ছিল। আমি ওটার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে মার্স সহাস্যে বললেন, ‘ওটা না থাকলে পুলিশের বড়ো অস্বস্তি হয়। ওঁদের কর্তারা এলে-টেলে আমাকে ওটা খুলে দেখাতেই হয়, ভেতরে আমি কী রেখেছি।’

আমি ওঁর প্রসারিত হাতটাকে ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘আপনি আমাকে কী যেন খবর দেবেন বলছিলেন?’

‘হচ্ছে হচ্ছে।’ দুটো গ্লাসে ড্রিঙ্ক বানিয়ে বললেন মার্স, ‘তাড়া কীসের?’

আমরা চুপচাপ মদ্যপান করলাম। মার্সের বোধ হয় আমার নীরবতা হজম হচ্ছিল না। উনিই আবার বললেন, ‘আগে কখনো এসেছেন এখানে?’

‘জুয়োটা আমার ঠিক… আসে না।’

‘আপনার এক বন্ধুর কিন্তু আসে।’ চুমুক দিয়ে বললেন মার্স, ‘তিনি এই মুহূর্তে বেশ ভালোই জিতছেন।’

আমি কিছু বললাম না। মার্সের দেওয়া বাক্স থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম।

‘কাল রাতে আপনি ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবে সামলেছেন।’ মার্স কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘কত দেব আপনাকে?’

‘আমি একজন ক্লায়েন্টের হয়েই কাজ করছিলাম, মিস্টার মার্স।’ শান্ত গলায় বললাম আমি, ‘তিনি যা দেবেন তাতে আমার হয়ে যাবে। বরং আমার অন্য কিছু পেলে সুবিধে হত।’

আগুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন মার্স। ওঁর হাতে ধরা গ্লাসের গায়ে আগুনের কাঁপুনি ধরা পড়ছিল।

‘রেগান?’ গ্লাসে একটা বড়ো চুমুক দিয়ে বললেন মার্স, ‘আপনার কি মনে হয় যে আমি ওকে হাপিস করিয়েছি?’

‘না।’ সত্যি কথাই বললাম, ‘রেগান সম্বন্ধে যা জেনেছি তাতে মনে হয়, আপনার বাহুবলীদের সাবড়ে দেওয়ার ক্ষমতা ওঁর ছিল। ভালো কথা, ওদের ওইভাবে আমার কাছে পাঠাবেন না, প্লিজ। আমি লোকটা বিশেষ সুবিধের নই।’

‘মুখ তো ভালোই চলে দেখছি।’ মার্সের ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল, ‘রেগানকে নিয়ে আপনার আগ্রহের কারণ কী?’

‘আমার ক্লায়েন্ট জানতে চান, ওঁর কী হয়েছে।’

‘তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই এই ব্যাপারে।’

‘আপনি যার কথা ভাবছেন তিনি আমার ক্লায়েন্ট নন। আমি তাঁর বাবার কথা বলছিলাম।’

নিজের ঠোঁটটা মুছে রুমালের দিকে তাকিয়ে রইলেন মার্স। মনে হচ্ছিল, উনি ওটাতে রক্তের দাগ খুঁজছেন। আমি বললাম, ‘গাইগার জেনারেলকে ব্ল্যাকমেইল করছিল। ওঁর ধারণা, গাইগারের পেছনে আরও কেউ আছে। আমি জানতে চাই, রেগান কি এতে জড়িত ছিলেন?’

‘গাইগার!’ হেসে উঠলেন মার্স, ‘ও এই ব্যাপারটা সবার সঙ্গে করে। ওই প্রমিসরি নোটগুলো দেখতে ঠিকঠাক, কিন্তু ওগুলো নিয়ে কোর্টে গেলে ও-ই ফেঁসে যাবে! ও সেগুলো পাঠিয়ে ভান করত, ওর হাতে কিচ্ছু নেই। কেউ কেউ ভাবত, তার মানে ওর কাছে তুরুপের তাসটাই লুকোনো আছে! তারা ভয় পেয়ে নোটগুলো অনুযায়ী টাকা দিয়ে দিত। যারা ওর ধাপ্পাটা ধরে ফেলত, গাইগার তাদের ঘাঁটাত না। যদি গাইগারকে নিয়ে আপনি ভাবেন, তাহলে আপনার কেস শেষ।’

‘তাহলে শেষ।’

‘দুঃখের বিষয়।’ গ্লাসটা শেষ করে দিয়ে বললেন মার্স, ‘জেনারেলের উচিত আপনাকে পাকাপাকিভাবে ওই বাড়িতে রেখে দুই মেয়েকে সামলানো। ওদের নিয়ে যে কী পরিমাণ ভুগতে হয়, তা যদি জানতেন!’

‘আপনি কি কথাটা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন?’

‘আবার কী! ওপাশের ঘরে যিনি খেলছেন, মিসেস ভিভিয়েন রেগান, আমাকে কী পরিমাণ ভোগান— সেই নিয়ে আপনার কোনো ধারণা আছে? হারতে হারতে ট্যাঁকখালির জমিদার হয়ে গেলেই উনি আমার কাছ থেকে ধার নেন। সেই ধারের বিনিময়ে উনি যে প্রমিসরি নোটগুলো সই করে আমাকে দেন, সেগুলো নিয়ে আমি কার কাছে যাব? মহিলার নিজের বলতে তো কিছুই নেই। এদিকে জেনারেল যে উইল করে কাকে কী দিচ্ছেন, তাও কেউ জানে না! আর যখন উনি জেতেন, তখন উনি আমার টাকা নিয়েই বাড়ি যান।’

‘পরের দিন তো সেগুলো আবার আপনার কাছেই ফিরে আসে।’

‘কিছুটা আসে।’ মার্স মেনে নিলেন, ‘তবে সব মিলিয়ে মহিলা আমার কাছে মূর্তিমতী ঝামেলা।’

মার্সের কথাটা এতই সৎ শোনাল যে আমি ভাবতে বাধ্য হলাম, ভদ্রলোক আমাকে এসব কেন বলছেন। তখনকার মতো উঠে দাঁড়িয়ে আমি বললাম, ‘একবার তাঁকে, এবং আপনার এই জুয়াখেলার জায়গাটা দেখা যায়?’

‘অবশ্যই যায়।’ মার্স উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনি আর আমি তাহলে বন্ধু— তাই তো?’

‘অবশ্যই।’

‘আপনি তাহলে কিছু নেবেন-টেবেন না?’ মার্সের মুখ দেখে মনে হল, ব্যাপারটা ওঁকে বেশ চিন্তিত রেখেছে, ‘আচ্ছা, বেশ। পরে কখনো ক্যাপ্টেন মাইলসের চক্করে পড়লে তখন নাহয় আমার সঙ্গে কথা বলবেন।’

‘উনিও আপনার পকেটস্থ বুঝি?’

‘ছি ছি!’ চোখ মটকালেন মার্স, ‘উনিও আমার বন্ধু।’

‘অ।’ বেরোবার সময় পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি অন্য কোনো বন্ধুকে একটা ধূসর রঙের প্লিমাউথ সেডানে চেপে আমাকে অনুসরণ করতে বলেছেন?’

‘না তো!’ মার্সের চোখ বিস্ফারিত হল, ‘কেন করাব?’

‘আমার কোনো ধারণাই নেই।’ বলে বেরিয়ে এলাম। মার্সের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, ভদ্রলোক সত্যিই চমকে, এমনকী একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। তার কারণটা কী হতে পারে, তা আমি অনেকে ভেবেও বের করতে পারলাম না।