মরণ ঘুম – ২৩
২৩
কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া রাস্তায় হালকা পায়ের শব্দ ভেসে এল। পুরুষের নয়, কোনো মহিলা এগিয়ে আসছিলেন। একটু পরে তাঁর চেহারার আদলটা দেখতে পেলাম। মুখটা স্পষ্ট না হলেও উদ্ধত ভঙ্গিটা চিনতে একটুও কষ্ট হল না। গাছের পেছন থেকে লোকটাও বেরিয়ে ঠিক মহিলার সামনে এসে দাঁড়াল তখনই। মনে হল, ঘুরপাক খাওয়া কুয়াশায় যেন মিশে গিয়েও আবার আলাদা হল দুটো শরীর।
‘চেঁচাবেন না।’ লোকটা বলে উঠল, ‘শুধু ব্যাগটা আমাকে দিয়ে দিন।’
মহিলা একটা শব্দও না করে ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন। ব্যাগটা হাতে নিয়ে লোকটা সেটা খুলে কিছু দেখল। তারপর খুকখুক করে হেসে বলল, ‘সবই আছে দেখছি। ভালো।’
লোকটা আমার খুব কাছে এসে পড়েছিল। ইতিমধ্যে আমি ওই কাশি আর হাসির মাঝামাঝি শব্দটা চিনে ফেলেছিলাম। পকেট থেকে নিজের পাইপটা বের করে সেটাই তুলে বললাম, ‘নোড়ো না লেনি।’
লোকটা এক মুহূর্ত থমকে গিয়েই হাত তুলছিল। আমি আরেকটু এগিয়ে বললাম, ‘উঁহু। আমি তোমাকে কী বললাম? একদম নোড়ো না।’
ওর পেছনে মহিলা নড়ছিলেন না। কুয়াশাভেজা পাতা থেকে জলের ফোঁটা চুঁইয়ে পড়ার মৃদু শব্দ পাচ্ছিলাম। লোকটাকে বললাম, ‘দু-পায়ের ফাঁকে ব্যাগটা রেখে সরে যাও।’
লোকটা ব্যাগ নীচে নামিয়ে রাখল। আমি প্রায় লাফিয়ে ওর কাছে গেলাম, তারপর ওর পকেটে হাত ঢুকিয়েই বের করে নিলাম। একটা অটোমেটিক আমার হাতে এসে গেছিল।
‘চলে যাও, লেনি।’ আমরা এত কাছে ছিলাম যে আমাদের শ্বাস মিশে যাচ্ছিল, ‘আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে।’ হিসহিসিয়ে উঠল লেনি। তারপর কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। আমি ব্যাগটা হাতে নিয়ে মহিলার দিকে এগিয়ে গেলাম।
‘বাব্বা!’ কুয়াশার মধ্যেও মহিলার মাথার চুল আর চোখ জোড়ায় অতলান্ত অন্ধকার দেখতে পাচ্ছিলাম, ‘আপনি কি এখন আমার বডিগার্ড হয়েছেন নাকি?’
‘তাই মনে হচ্ছে।’ আমি ব্যাগটা এগিয়ে দিলাম, ‘নিন, ধরুন। আপনার সঙ্গে গাড়ি আছে।’
‘আমি আজ একজনের সঙ্গে এখানে এসেছিলাম।’ গলায় ব্যঙ্গ আর হতাশা মিশিয়ে বললেন ভিভিয়েন, ‘কিন্তু তিনি ঘুমোচ্ছেন। যাকগে, আপনি এখানে কেন?’
‘এডি মার্স আমাকে আসতে বলেছিলেন।’
‘এডি আপনাকে চেনে?’ মহিলার ভ্রূজোড়া ঊর্ধ্বমুখী হল, ‘কেন আসতে বলেছিল আপনাকে?’
‘ওঁর ধারণা হয়েছিল, ওঁর স্ত্রী যে মানুষটির সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারেন, তাকে আমি খুঁজছি।’
‘আপনি সত্যিই এমন কাউকে খুঁজছেন?’
‘না।’
‘তাহলে এসেছিলেন কেন?’
‘এটা জানতে যে ওইরকম ধারণা ওঁর কেন হল।’
‘জানতে পারলেন?’
‘না।’
‘আপনার সঙ্গে কথা বলা আর রেডিয়োর ঘোষকের সঙ্গে ঝগড়া করা একই ব্যাপার।’ মহিলা রেগে গেলেন, ‘আমি যা জানতে চাই, আর আপনি যা বলেন— দুটো পুরোপুরি আলাদাই থেকে যায়। মেনে নিচ্ছি, আপনার বলা সেই ‘মানুষটি’ আমার স্বামী। তাই তাঁকে খুঁজে পাওয়া নিয়ে আমার মধ্যে আগ্রহ থাকা উচিত। কিন্তু আপনি তো ওকে খুঁজছেন না বলেই জানতাম।’
‘সত্যিই খুঁজছি না। কিন্তু লোকে এটা ভাবছে।’
‘অ।’ বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন মহিলা, ‘চলুন। গ্যারেজে যাই। আমার সঙ্গে যিনি এসেছিলেন তিনি ঘুম থেকে উঠেছেন কি না— সেটা দেখে আসি।’
মনে হচ্ছিল, সশস্ত্র ছিনতাইকারীর ব্যাপারটা মহিলার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। আমি চুপচাপ ওই ভেজা রাস্তা ধরে ওঁর সঙ্গে চললাম। কিছুক্ষণ পরেই কুয়াশার এলাকা ফুরিয়ে গেল। চকচকে গাড়ি আর উজ্জ্বল আলোয় ভরা বড়ো জায়গাটা নির্ঘাত এককালে আস্তাবল ছিল। প্রায় ঘোড়ার মতোই লম্বাটে মুখের একজন আধবুড়ো গোছের লোক তেল-ঝুল লাগা স্মক পরে টুলে বসে ঝিমোচ্ছিল। এবার সে আমাদের দিকে এগিয়ে এল।
‘আমার ‘‘বন্ধুটি’’ কি জেগেছেন?’ একটা বড়ো ক্যাডিলাকের দিকে ইশারা করে বললেন ভিভিয়েন।
‘না, ম্যাডাম।’ দুঃখিত ভঙ্গিতে গাড়ির পেছনের সিটে উঁকি দিয়ে মাথা নাড়ল লোকটা, ‘আমি একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুইয়ে রেখেছি ওঁকে। উনি… এখনও বিশ্রাম নিচ্ছেন।’
‘মিস্টার ল্যারি কবের সঙ্গে আপনার পরিচয় নেই, তাই না মিস্টার মার্লো?’ পেছনের সিটে শুয়ে মুখ হাঁ করে ঘুমোনো সুবেশ ভদ্রলোকটিকে দেখিয়ে বললেন ভিভিয়েন, ‘প্রচুর অর্থ। প্রচুর শখ। আমাকে নিয়ে অনেক কামনা-বাসনা। কিন্তু স্কচের বোতল দেখলেই বেচারি একেবারে ভেসে যায়। কী দুঃখের বিষয় বলুন তো!’
‘তাই তো দেখছি।’ আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘ওঁর ড্রাইভার কোথায়?’
‘উনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছিলেন।’ লোকটা বলে উঠল, ‘আমি কি ওঁর বাড়িতে ফোন করে বলব, কোনো ড্রাইভার পাঠাতে?’
‘সত্যি?’ ভিভিয়েন লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সেটাই করুন তাহলে। নইলে এইভাবে মুখ হাঁ করে থাকতে থাকতে ও যদি মরে যায়, লোকে হয়তো ভাববে যে বিখ্যাত ধনী ল্যারি কব তেষ্টা পেয়েই মারা গেছেন।’
‘ওঁকে একবার শুঁকলেই সেই ভুল ভেঙে যাবে।’ লোকটা গজগজ করল। আমার বেশ সহানুভূতিই হল বেচারির জন্য। গাড়ি সামলানোর তুলনায় এইসব মাতালদের সামলানো অনেক কঠিন। ভিভিয়েন ব্যাগ থেকে একমুঠো নোট বের করে লোকটার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। লোকটার চোখ প্রায় ঠিকরে এসেছিল টাকার পরিমাণ দেখে। ও চুপচাপ নোটগুলো নিয়ে একটা ফোনের দিকে এগোল।
‘আপনিই বরং আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিন, মিস্টার মার্লো।’
‘আমার গাড়িটা বাইরের রাস্তায় রাখা আছে।’
‘তাতে কী?’ মহিলা আমার হাত ধরে বললেন, ‘কুয়াশায় হাঁটতে আমার দারুণ লাগে। কত ইন্টারেস্টিং লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়!’
গাড়ি অবধি সময়টা মহিলা আমার গায়ে প্রায় লেপটে রইলেন। থরথর করে কাঁপছিলেন ভিভিয়েন। বেশ বুঝতে পারছিলাম, এতক্ষণ ধরে ওঁর ভেতরে জমে থাকা উত্তেজনা আর আশঙ্কা ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি শান্তভাবে গাড়িতে উঠলাম। ওঁকে পেছনের সিটে বসিয়ে, ধীরেসুস্থে লাস ওলিন্ডাস পেরিয়ে মূল শহরের দিকে এগোলাম। অনেকক্ষণ ধরে বন্ধ দোকানপাট আর নির্জন শহর দেখার পর একটা কাফে গোছের দোকান নজরে পড়ল, যেটা তখনও খোলা ছিল।
‘আসুন।’ আমি গাড়ি থামিয়ে ভিভিয়েনের দিকের দরজাটা খুলে বললাম, ‘দেখি, কী পাওয়া যায় এখানে।’
গাড়ির অন্ধকারেও মহিলার ফ্যাকাশে চিবুক নজরে পড়ছিল। গাড়ি থেকে নেমে মহিলা বললেন, ‘আমি এই মুহূর্তে কড়া কিছু চাইছি মিস্টার মার্লো। তেমন কিছু কি এই দোকানে পাওয়া যাবে?’
‘আপাতত কালো কফি আর দু-চামচ ব্র্যান্ডি দিয়েই কাজ চালান।’ বলে আমি দোকানটায় ঢুকলাম।
কফির ব্যবস্থা হল, কিন্তু ওখানে মদ খাওয়া নাকি বে-আইনি। আমি নিজের পকেট থেকে ব্র্যান্ডির বোতলটা বের করায় মনে হল দোকানের বুড়ো মালিকের স্ট্রোকই হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে আমি তাঁকে শুনিয়ে-শুনিয়ে ভিভিয়েনকে বললাম, ‘এই শহরে আইন ব্যাপারটা সাংঘাতিক, জানেন তো। এডি মার্সের নাইটক্লাবের লবিতে একসময় দু’জন পুলিশ বসানো থাকত। তাদের কাজ ছিল এটা দেখা যে লোকে যেন মদ নিয়ে ঢুকতে না পারে। ফলে বেচারিরা ওখান থেকেই চড়া দামে বেআইনি মদ কিনে গিলতে বাধ্য হত।’
কাজ হল। লোকটা এডি মার্সের নাম শুনেই এক কোণে গিয়ে রাস্তার দিকে মুখ করে বসে রইল। তবে ওর কানটা রইল আমাদের দিকেই। আমি কফিতে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ভিভিয়েনের ফর্সা, সুন্দর, ক্রূর মুখটা দেখছিলাম। শেষ অবধি প্রশ্নটা করেই ফেললাম, ‘মার্স আপনার ওপরে এত তিতকুটে হয়ে আছে কেন, মিসেস রেগান?’
‘আমি আজ ওর থেকে কত জিতেছি, নিজেই তো দেখলেন।’ সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা বের করে ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন ভিভিয়েন, ‘তা ছাড়া কালকের ব্যাপারটার জন্য আমি ওর থেকে পাঁচ হাজার ডলার ধার নিয়েছিলাম। সেটাও এখনও ফেরত দিইনি। এরপর আর ব্যাপারটা মিষ্টি থাকে কী করে?’
‘মানছি।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু এটা টাকা পয়সার ব্যাপার নয়। আমার ধারণা, আপনার সম্বন্ধে কিছু একটা জিনিস উনি জানেন। সেটা কী?’
‘প্রশ্নটা বড্ড বোকা বোকা হয়ে গেল মিস্টার মার্লো।’ আমার চোখে চোখ রেখে বললেন মহিলা, ‘আরও বুদ্ধিদীপ্ত আর সরস করুন প্রশ্নটা। ওগুলোই তো আপনার বৈশিষ্ট্য— তাই না?’
‘জেনারেল কেমন আছেন?’ আমি লাইন বদলালাম।
‘ভালো না। আজ বিছানা থেকে উঠতেই পারেননি। আচ্ছা, আপনি এই প্রশ্নগুলো এবার থামাবেন?’
‘জেনারেল এই ব্যাপারের কতটা জানেন?’
‘বোধ হয় সবটাই জানেন।’
‘কে জানাবে ওঁকে? নরিস, মানে আপনাদের বাটলার?’
‘না। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ওয়াইল্ড। উনি আজ বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আপনি ফটোগুলো নষ্ট করে দিয়েছেন তো?’
‘করেছি। আপনি আপনার বোনকে নিয়ে ভাবেন?’
‘ওকে নিয়েই ভাবি, মিস্টার মার্লো। আর বাবাকে নিয়েও ভাবি, তবে সেই ভাবনাটা অন্যরকম।’
‘কীরকম?’
‘মৃত্যুর আগে উনি যদি ভাবেন যে আমরা ওঁর মানসম্মান সব শেষ করে দিয়েছি, তাহলে সেটা আমাকে সত্যিই দুঃখ দেবে। হ্যাঁ, আমাদের চলন-বলন ঠিক অভিজাত সমাজের বেঁধে দেওয়া মাপ অনুযায়ী নয়। কিন্তু আমরা ‘‘কলঙ্কিনী’’ বলে সাব্যস্ত হলে সেটা জেনারেল স্টার্নউডের পক্ষে বড্ড বেশি অপমানজনক হবে।’
‘কে বলে আপনারা কলঙ্কিনী?’
‘আপনি নির্ঘাত এমন কিছুই ভাবেন।’
‘আপনার ক্ষেত্রে নয়। অভিনয় যত ভালোই হোক না কেন, আমি একটু-আধটু হলেও মানুষ চিনি।’
মহিলা চুপচাপ কফির কাপে চুমুক দিলেন। আমি ওঁর এবং নিজের জন্য সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়া ছেড়ে, নীচু গলায় ভিভিয়েন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার বন্দুক আছে নিশ্চয়? আচ্ছা, আপনি কি খুনি?’
‘মানে?’
‘আমি কাগজ পড়েছি ঠিকই। কিন্তু ওই গল্পগুলো আমার বিশ্বাস হয়নি।’
‘গাইগার?’ আমি হাত তুলে বললাম, ‘না। আমি ওকে বা ব্রোডিকে মারিনি। ওদের মারার মতো লোকের কোনো অভাব ছিল না। ওরা আমাকে মারতে চাইলে অবশ্য আমাকেও কিছু করতে হত।’
‘দেখা হওয়ামাত্র আমার মনে হয়েছিল, জানেন তো মিস্টার মার্লো।’ সিগারেটটা ওঁর দু-আঙুলের ফাঁকে পুড়ে ছোটো হয়ে আসছিল, ‘আপনি হলেন সেইসব ঠান্ডা চোখের, ঠান্ডা বুকের, ঠান্ডা রক্তের মানুষদের একজন— যাঁদের কাছে কাজটাই শেষ কথা।’
‘গোলমেলে স্বভাবের বহু লোককে আপনি চেনেন, মিসেস রেগান। তারপরেও আমার সম্বন্ধে আপনার এই মূল্যায়ন দেখে বড্ড দুঃখ পেলাম।’
‘চলুন।’ কাপটা ঠক করে টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন ভিভিয়েন, ‘এখান থেকে বেরোনো যাক।’
সমুদ্রের ধারের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানোর সময় শ্যাওলা আর আঁশটে গন্ধের সঙ্গে হু-হু করে হাওয়া ঢুকছিল গাড়িতে। ডেল রে পেরোনোর পর ভিভিয়েন বললেন, ‘বিচ ক্লাবের রাস্তায় চলুন। আমি সমুদ্র দেখব কাছ থেকে।’
আজ্ঞা পালন করলাম। ওই রাস্তাটায় কুয়াশা প্রায় ছিলই না। সামনে রেললাইন আর রাস্তার ক্রসিং-এ একটা হলুদ আলো দপদপ করছিল। ওখান থেকে ডান দিকে এগোলাম। একটু দূরে বিচ ক্লাবের আলো দেখা যাচ্ছিল। রাস্তার একধারে পার্ক করা গাড়ির সারি, আর অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের ছলাত-ছল। গাড়িটা ওখানেই দাঁড় করালাম।
‘কাছে আসুন।’ ভিভিয়েনের গাঢ় গলাটা শুনতে পেলাম। আমি স্টিয়ারিং ছেড়ে পেছন দিকে বেঁকলাম। মহিলা আমার শরীরের ওপর নিজের ভার ছেড়ে দিলেন। ওঁর রুক্ষ চুলগুলো আমার মুখে ঘষা খাচ্ছিল। চুল সরিয়ে ওঁকে চুমু খেলাম। মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলেন, যতক্ষণ না ওঁর শরীরের কাঁপুনিতে আমার শরীরও সাড়া দিতে শুরু করল। আমার দু-চোখে নিজের ঘন কালো চোখটা রেখে ভিভিয়েন বলে উঠলেন, ‘খুনি!’
অনেকক্ষণ, আর অনেকগুলো চুমুর পর ভিভিয়েন নিজেকে আমার থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। তারপর ভারী, দমচাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কোথায় থাকেন?’
‘হোবার্ট আর্মস। কিলমোরের কাছে, ফ্র্যাংকলিনে।’
‘আমি ওই জায়গাগুলো দেখিনি।’
‘দেখবেন?’
‘হ্যাঁ।’ মহিলার শ্বাস পড়ছিল খুব দ্রুত।
‘এডি মার্স আপনার ব্যাপারে কী জানে?’
মহিলা ছিটকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। ওঁর দুটো চোখ বিস্ফারিত হতে হতে এতটাই বড়ো হয়ে গেল যে গাড়ির ভেতরের আধো-অন্ধকারে সেখানে সাদাটে রং ছাড়া কিছু দেখাই যাচ্ছিল না।
‘আপনি…’ দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন মহিলা।
‘চুমু খেতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু আপনার বাবা তো আমাকে এই কাজটা দেননি।’
মহিলা আমাকে কয়েকটা ছাপার অযোগ্য গালি দিলেন। আমি মাথা দুলিয়ে বললাম, ‘আমি বরফের স্তূপ নই, মিসেস রেগান। আর পাঁচটা মানুষের মতো আমার শরীরেরও কিছু চাহিদা আছে। কিন্তু আপনার অভিনয়টা যে এবারও ধরে ফেললাম। এডি মার্স আপনার ব্যাপারে কী জানে?’
‘আপনি আরেকবার এই প্রশ্নটা করলে আমি কিন্তু গলা ফাটিয়ে চেঁচাব।’ ভিভিয়েনের শরীর কাঁপছিল থরথর করে।
‘চেঁচান।’ আমি ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকালাম। ওইভাবে অতক্ষণ বসে থাকায় ঘাড়টা টনটন করছিল।
‘এইরকম আচরণের জন্য লোকে গুলি খেয়েছে, মিস্টার মার্লো।’ আমার থেকে যথাসম্ভব পিছিয়ে গিয়ে বললেন মহিলা।
‘লোকে কিছু না করেই গুলি খেয়েছে, মিসেস রেগান। আলাপ হওয়ার মুহূর্তেই আমি বলেছিলাম, আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ওটাই আমার কাজ। আমি ওটাই করি। ব্যাপারটা বুঝুন।’
মহিলা ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বের করলেন, তারপর দাঁত দিয়ে ওটা ছিঁড়তে লাগলেন। আমি সামনে তাকিয়ে রুমালটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করার শব্দ শুনলাম। কিছুক্ষণ পর প্রশ্ন এল, ‘আপনার কেন মনে হচ্ছে যে এডি আমার ব্যাপারে ‘কিছু’ জানে?’
‘উনি আপনাকে টাকাগুলো প্রায় দিয়েই দিচ্ছিলেন। সেগুলো আপনার কাছ থেকে, একটু অন্যভাবে ফেরত পাওয়ার জন্য যখন উনি ওঁর এক বাহুবলীকে পাঠালেন, তাতেও আপনি অবাক হননি। এমনকী তার হাত থেকে আপনার টাকাগুলো বাঁচানোর পরেও আপনি আমাকে ধন্যবাদটুকু দেননি। আপনি জানতেন, পুরোটাই একটা নাটক। আর সেটা করা হচ্ছিল আমার স্বার্থে।’
‘এডি আমাকে জিতিয়ে দিচ্ছিল? ও বুঝি ইচ্ছেমতো এরকম করতে পারে?’
‘পাঁচবারের মধ্যে চারবার এটা হয়, মিসেস রেগান। আমি এইজন্যই জুয়া খেলতে ঠিক পছন্দ করি না।’
‘আপনার সাহস আছে, মিস্টার মার্লো।’ ভিভিয়েনের গলাটা তখনও ভারী শোনাচ্ছিল, ‘মাথাটাও বেশ ঠান্ডা। নইলে আমাকে চুমু খাওয়ার পরেও নিজেকে সামলাতে পারতেন না।’
‘চুমুগুলো খেতে কিন্তু সত্যিই ভালো লেগেছিল।’
‘আমার সঙ্গে একটা ছুরি থাকলে আপনার গলা কেটে দেখতাম, কী বেরোয় ভেতর থেকে।’ ঠান্ডা গলায় বললেন ভিভিয়েন, ‘আপাতত আমাকে দয়া করে বাড়ি নিয়ে যাবেন কি?’
তাই করলাম। পুরো রাস্তা মহিলা আমার সঙ্গে একটা কথাও বললেন না। স্টার্নউডদের বাড়ির কাছে এসে গাড়ি থামালাম। ভিভিয়েনই ঘণ্টি বাজালেন। নরিস এসে দরজা খোলামাত্র উনি পেছনদিকে না তাকিয়েই ভেতরে চলে গেলেন। নরিস একবার আমার দিকে তাকিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।
আমি বাড়ি ফিরলাম।
