মরণ ঘুম – ২৮
২৮
জ্ঞান ফেরার পর চোখ খুলে সামনে শুধু আলো দেখছিলাম। চোখ যথাসাধ্য সরু করে তাকালাম। এবার মনে হচ্ছিল, একটা ল্যাম্পের পাশে একজন মহিলা বসে আছেন। অন্য একটা ল্যাম্পের আলো পড়ছে আমার মুখে। মাথা নাড়াতে গিয়ে ভালোই ব্যথা পেলাম, তবে সেটা প্রত্যাশিত ছিল। তেমনই হাতকড়া, সোফায় শুইয়ে হাত-পা সব একেবারে টাইট করে বেঁধে রাখা— এগুলোও প্রত্যাশিতই ছিল। নড়াচড়া করার চেষ্টা করে বুঝলাম, এডি মার্সের দলবল এই কাজটাও ভালোভাবেই সেরেছে। কান পেতে বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পেলাম না।
‘শুনছেন?’ আমি আস্তে করে বললাম, ‘এখন ক-টা বাজে বলতে পারবেন?’
মহিলা আমার দিকে ঘুরলেন। ঘন নীল চোখজোড়া, রুপোলি চুলের একটা হালকা বলয়, নিখুঁত মুখের গড়ন— এগুলো সবই আমার চোখে ধরা পড়ল। মসৃণ, সুরেলা গলায় মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘দশটা সতেরো। আপনার কি কোথাও যাওয়ার ছিল?’
‘নাহ। আসলে এত তাড়াতাড়ি শোয়ার অভ্যাস নেই। তাও এমন আদর করে শুইয়ে রাখা হয়েছে বলে জানতে চাইছিলাম আর কি।’
‘আপনি কি অন্য কিছু আশা করেছিলেন, মিস্টার মার্লো?’ মহিলার গলায়, কেন যেন, আমি হালকা ঘণ্টার মতো টুং টাং শুনতে পাচ্ছিলাম। নির্ঘাত মার খাওয়ার ফল। নিজের গলাটা শুকিয়ে গেছিল, তাও কথা চালিয়ে গেলাম।
‘সত্যি বলতে কী, আমি একটা ফুট ছয়েক লম্বা পাইন কাঠের বাক্সই আশা করেছিলাম। এখনও বেঁচে আছি দেখেই অবাক হচ্ছি। কিন্তু আপনি আমাকে চেনেন? আর… পারলে আলোটা একটু সরিয়ে দেবেন? চোখে বড্ড লাগছে।’
‘আপনার খানাতল্লাশি নেওয়ার পরেই ক্যানিনো আপনার পরিচয় জেনেছিল।’ মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে ল্যাম্পটা সরালেন, তখন আমি আরেকবার ওঁকে দেখলাম। লম্বা, তন্বী, বাকিটা তো আগেই বলেছি।
‘সেই মহাশয়কে তো দেখতে পাচ্ছি না।’ বলতে বাধ্য হলাম, ‘আমার জন্য গর্ত খুঁড়ছেন বুঝি?’
‘ওদের অন্য কাজ আছে।’
‘মানে? ওরা আপনাকে এখানে রেখে গেছে?’
‘আপনি এই মুহূর্তে ঠিক ততটা বিপজ্জনক অবস্থায় নেই বলেই বোধ হয় এতটা সাহস পেয়েছে।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান! আপনি এখানে বন্দি হয়ে নেই?’
‘মানে?’ মহিলা সত্যিই অবাক হলেন।
‘আমি আপনাকে চিনি মিসেস মার্স।’ হাতের তাস লুকিয়ে রাখার কোনো অর্থ ছিল না তখন, ‘আপনি কি এখানে কয়েদ হয়ে নেই?’
‘আপনি আমাকে চেনেন।’ মহিলা গম্ভীর হয়ে গেলেন, ‘এটা আপনার পক্ষে খুব খারাপ হল, মিস্টার মার্লো। আপনার মৃত্যুর জন্য দায়ী হতে আমার একটুও ভালো লাগবে না।’
‘আপনি তো ইতিমধ্যেই জড়িয়ে গেছেন মিসেস মার্স।’ আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘পুলিশ যাতে রেগানের মৃত্যুর জন্য মার্সকে দায়ী করতে না পারে, বরং অন্য কিছু ভাবে, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই তো আপনার এই অজ্ঞাতবাস।’
‘এডির সঙ্গে রাস্টি-র মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।’ ঠান্ডা গলায় বললেন মহিলা, ‘আমি রাস্টিকে বেশ কয়েক মাস দেখিনি। তা ছাড়া এডি ওরকম লোক নয়।’
‘আপনি স্বেচ্ছায় এডি মার্সের থেকে আলাদা হয়ে গেছেন। এখন যদি আপনি তাঁর সম্বন্ধে এইসব বলেন, ঠিক মানতে পারব না। রইল বাকি রাস্টি রেগানের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক। যে বাড়িটায় আপনি থাকেন সেখানেই কয়েকজন বলেছে, তারা রেগান নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে আপনাদের একসঙ্গে দেখেছে।’
‘তারা মিথ্যে বলছে।’ মহিলা অদ্ভুত প্রত্যয় নিয়ে, ঠান্ডা গলায় বলে চললেন, ‘আর এডির সঙ্গে আমার সম্পর্কে নাক গলানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?’
‘আমার ওটাই কাজ, মিসেস মার্স। আমি একজন ডিটেকটিভ। তাহলে, এডি মার্সকে আপনি ভালোবাসেন বুঝি?’
‘হ্যাঁ, বাসি।’ একইরকম ঠান্ডা গলায় বললেন মহিলা, ‘তা ছাড়া লোকে যদি জুয়া খেলতে চায়, তাহলে তার ব্যবস্থা করে দেওয়াটা তো দোষের না।’
‘আমি শুধু জুয়া খেলার কথা বলছি না।’ মাথার ভেতরটা দপদপ করা সত্বেও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলাম, ‘এডি মার্স একজন পর্নোগ্রাফার, ব্ল্যাকমেইলার, চোরাই গাড়ির ব্যাবসাদার, দু-নম্বরি পুলিশদের আসল বস, এবং একজন খুনি।’
‘এডি খুনি নয়!’ মহিলার নাকের পাটা ফুলে উঠল।
‘নিজে হাতে খুন না করলে বুঝি খুন করা যায় না? ক্যানিনো ওঁর পোষা খুনি। আমার কথা বিশ্বাস না হলে ক্যানিনোকে জিজ্ঞেস করুন, একটি নিরীহ মানুষকে ও আজ রাতেই বিষ খাইয়ে মেরে এসেছে কি না।’
মহিলার মুখে একটা মলিন, অসহায় হাসি ফুটে উঠল। আমি মরিয়া হয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে। তাহলে আমাকে একবার মিস্টার মার্সের সঙ্গে কথা বলতে দিন। তবে সেখানে ক্যানিনো থাকলে মুশকিল। ও লাথিয়েই আমার মুখ-বুক সব সমান করে দেবে।’
মহিলা চুপ করে কী যেন ভাবছিলেন। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর ভেতরের নৈঃশব্দ্য মিলিয়ে মাথাব্যথাটা বাড়িয়ে তুলছিল। থাকতে না পেরে বললাম, ‘রুপোলি চুলটা কি এখনও ফ্যাশনেবল? আমি তো ভেবেছিলাম ওটা বাতিল হয়ে গেছে।’
‘এটা?’ মহিলা হেসে ফেলে এক টানে চুলটা খুলে ফেললেন। আমি দেখলাম, রুপোলি তথা প্ল্যাটিনাম-রঙা পরচুলার নীচে মহিলার মাথার চুলগুলো ছোটো করে ছাঁটা।
‘কেন?’ আমার গলাটা নিজের কানেই আর্তনাদের মতো শোনাল।
‘আমি নিজেই ছেঁটেছি। এডিকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, আমাকে কয়েদ করে রাখতে হবে না। ওকে ভালোবেসেই আমি নিজের চেহারা বদলে এখানে লুকিয়ে থাকব।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মহিলা নিজের হাতের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কোত্থেকে জানি একটা ছুরি নিয়ে এসে আমার হাত-পা-র বাঁধনগুলো কাটতে শুরু করলেন।
‘হাতকড়ার চাবি ক্যানিনোর কাছে।’ মুখের ওপর মহিলার নরম নিশ্বাসের স্পর্শ পেলাম, ‘কিন্তু এই অবস্থাতেও যদি বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করেন, ওরা ফেরার আগে হয়তো রিয়্যাল্টো পৌঁছোতে পারবেন। হয়তো বেঁচে যাবেন।’
আমি উঠে দাঁড়িয়ে টলমল করলাম, তারপর স্থির হলাম। মহিলা নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে, দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে ছিলেন। সারা শরীর জুড়ে স্নায়ুরা বিদ্রোহ করছিল পুরোনো কাজে ফিরে আসতে হচ্ছে বলে। মুখের একটা দিকের সাড়া পাচ্ছিলাম না। সেই অবস্থাতেও বললাম, ‘আপনিও চলুন।’
হিংস্র সাপের মতো উঠে দাঁড়ালেন মহিলা। তারপর বললেন, ‘বেরিয়ে যান! এক্ষুনি! এখন না বেরোলে আর কোনোদিন পারবেন না।’
‘আর এখানে থেকে গেলে আপনিও কোনোদিন বেরোতে পারবেন না।’ কয়েক পা এগিয়ে গেছিলাম বলে মহিলার খুব কাছে চলে এসেছিলাম আমি। ওঁর চোখজোড়ায় নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। শান্ত গলায় বললাম, ‘এখানে আপনার প্রহরী কাম জেলার লোকটি আজ সন্ধেবেলা একজনকে মেরে এসেছে। কিন্তু ও এখনও জানে না যে আমি সেটা জানি। আমাকে আপনি ‘‘ছেড়ে দিয়েছেন’’ জানলে ও কিন্তু বুঝবে যে আমি জানি, আর আমার মাধ্যমে আপনি জানেন। তারপর আপনার জীবনের মূল্য কানাকড়িও হবে না।’
‘ক্যানিনোর সাহস হবে না।’ উদ্ধত ভঙ্গিতে মহিলা মাথা সোজা করলেন, ‘আমি ওর বসের বউ।’
আমি হেসে ফেললাম এবার। তারপর বললাম, ‘একজন খুনির বস লাগে না। সে কারো বশ হয় না। আপনি আর এডি মার্স– দু-জনেই কিন্তু খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমার সঙ্গে চলুন।’
মহিলা অবাধ্যভাবে মাথা নাড়লেন। তারপর আবার কান পেতে কী যেন শুনলেন। আমিও শুনলাম, তবে শুধু বৃষ্টির শব্দ। প্রায় ছুটে গিয়ে দরজা খুলে বাইরে অন্ধকারে তাকালেন মহিলা। জল আর ঠান্ডা হাওয়া ঢুকল ঘরে হু-হু করে।
‘যান।’ আমার দিকে ঘুরে বললেন মহিলা। ওঁর চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছিল। ভেতরের দ্যুতিতে, না চোখের কোণে জমা জলে আলো পড়ে? জানি না। আমি টলতে টলতে এগিয়ে গেলাম। প্রতি মুহূর্তে হাতে-পায়ে সাড় ফিরে আসছিল একটু একটু করে।
‘শুধু একটা কথা আপনার জানা দরকার।’ মহিলার গলাটা আবার শক্ত, ধারালো শোনাচ্ছিল, ‘রাস্টিকে এডি খুন করেনি বা করায়নি।’
‘বুঝেছি।’ মহিলার মুখ থেকে ইঞ্চিকয়েক দূরত্বে ছিল আমার মুখ, ‘সব বুঝেছি মিসেস মার্স।’
বাইরে আসামাত্র মুষলধার বৃষ্টি আর অন্ধকার রাত আমাকে আবার বুকে টেনে নিল। পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
