মরণ ঘুম – ৩১
৩১
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে দেখলাম, নরিস আমার টুপিটা নিয়ে হাজির হয়েছেন। ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘অবস্থা কেমন বুঝছেন?’
‘জেনারেলকে দেখে যতটা খারাপ মনে হয়,’ শান্তভাবে বললেন নরিস, ‘ওঁর অবস্থা ততটা খারাপ নয়, স্যার।’
‘ততটা খারাপ হলে খাট নয়, কফিনের ব্যবস্থা করতে হত।’ আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘একটা কথা বলুন। এই রাস্টি রেগানের কী এমন গুণ ছিল যে সাত ঘাটের জল খাওয়া এমন একজন পোড়-খাওয়া মানুষ ওকে এতটা পছন্দ করে ফেললেন?’
‘যৌবন।’ আমার চোখে চোখ রেখে বললেন নরিস, ‘আর শত ঝড়েও স্থির থাকা একজোড়া চোখ।’
‘যেমনটা আপনার আছে।’ স্বীকার করতে বাধ্য হলাম।
‘কিছু মনে করবেন না, স্যার,’ নরিসের নীল চোখজোড়া ঝিকিয়ে উঠল, ‘ওটা আপনারও আছে।’
‘হুঁ। তা দুই রাজকন্যে কী করছেন?’
নরিস আলতো করে কাঁধ ঝাঁকালেন। আমিও বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম যে আমি এর বেশি কিছু আশা করিনি। বেরিয়ে এসে লনের সবুজ ঘাস, দূরে সুন্দরভাবে ছাঁটা গাছপালা— এইসব দেখে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল, কিছুটা দূরে একটা বেঞ্চে বসে, দু’হাতের মধ্যে মাথা দিয়ে বিষণ্ণভাবে বসে আছে কারমেন।
‘বোর হচ্ছেন বুঝি?’ এগিয়ে গিয়ে বললাম।
ধীরে ধীরে, লাজুক ভঙ্গিতে হাসল কারমেন। তারপর বলল, ‘আপনি আমার ওপর রেগে নেই তো?’
‘আমি তো ভাবছিলাম, আপনি আমার ওপর ভীষণ রেগে থাকবেন।’
‘মোটেই না।’ কারমেন খিলখিল করে হেসে উঠল। ওই হাসি শোনামাত্র আমার মেজাজটা আবার খারাপ হয়ে গেল। দূরে তাকিয়ে দেখলাম, কিছুটা দূরে একটা গাছের গায়ে ডার্ট ছোড়ার বোর্ড লাগানো আছে। তাতে, তার আশেপাশে, এমনকী হাতের কাছে থাকা বেঞ্চে অবধি ডার্ট ছড়ানো রয়েছে।
‘প্রচুর টাকা থাকলে মানুষের এই অবস্থা হয়, সেটা আপনাদের দু-বোনকে দেখার আগে বুঝিনি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কারমেনের দিকে ঘুরলাম, ‘একবার এদিকে আসুন তো।’
কারমেন প্রায় লাফিয়ে আমার দিকে এল। আমি বাড়ি আর আমাদের মধ্যে গাছের আড়াল রেখে পকেট থেকে ওর ছোট্ট পিস্তলটা বের করে ফেরত দিয়ে বললাম, ‘আমি এটা তেল-টেল দিয়ে একদম পরিষ্কার করে রেখেছি। তবে পরেরবার এটা দিয়ে মানুষ মারার চেষ্টা না করলেই খুশি হব। যদি একান্তই সে সব করতে হয়, তাহলে আগে বন্দুক চালানো শিখুন।’
মুগ্ধ বিস্ময়ের দৃষ্টিতে বন্দুকটার দিকে তাকিয়েছিল কারমেন। আমার কথা শেষ হতে ও কেমন একটা ঝাঁকুনি খেল, তারপর আমার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমাকে বন্দুক চালানো শেখান তাহলে।’
‘মানে?’
‘আমাকে বন্দুক চালানো শেখাবেন? আমি সত্যিই শিখতে চাই।’
‘আপনার মাথা খারাপ হয়েছে? এখানে ওসব করলে আর দেখতে হবে না। সোজা পুলিশে ধরবে।’
কারমেন এদিক-ওদিক তাকিয়ে পিস্তলের বাঁটটার ওপর আদর করার মতো করে হাত বোলাল। ওটাকে স্ল্যাকসের ভেতরে চালান করে বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন। পুরোনো তেলের কুয়োগুলোর পাশে একটা ভালো জায়গা আছে, যেখানে কেউ যায় না। ওখানে আমাকে বন্দুক চালানো শেখান।’
মেয়েটার চোখের দিকে ভালো করে তাকালাম। ওইরকম নিষ্পাপ চোখ চট করে দেখা যায় না। হাত বাড়িয়ে বললাম, ‘জায়গাটা দেখি আগে। তারপর ভাবব ওখানে প্র্যাকটিস করা যায় কি না। আপাতত বন্দুকটা আমার কাছে থাক।’
লাজুক ভঙ্গিতে হেসে পিস্তলটা আমাকে দিল কারমেন। তারপর আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। দিনটা রোদ ঝলমলে হলেও আমার সব কেমন ফাঁকা লাগছিল। ওর পেছনে হাঁটার সময় জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভিভিয়েন কোথায়?’
‘এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।’ আবার খিলখিল করে হেসে উঠল কারমেন।
গাড়িতে চেপে আমরা স্টার্নউডদের বাড়ির এলাকা থেকে বেরিয়ে এলাম। বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে থাকা রাস্তা ধরে প্রথমে পুবদিকে লা ব্রিয়া, তারপর দক্ষিণে চললাম। মিনিট দশেক চালানোর পরেই কারমেনের বলা জায়গাটায় পৌঁছে গেলাম আমরা।
‘ওইদিকে।’ হাত তুলে ইশারা করল কারমেন। সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম, পাহাড়ের গা ঘেঁষা একটা এলাকার সঙ্গে বড়োরাস্তাকে জুড়েছে একটা মেঠো পথ। ওটা দিয়ে একসময় যে ট্রাক চলাচল করত সেটা চাকার গভীর দাগ দেখে বোঝা যায়। অন্যসময় ধূলিধূসর হলেও গত ক-দিনের বৃষ্টিতে একেবারে কাদা কাদা হয়ে ছিল রাস্তাটা। দু’ধারের ইউক্যালিপ্টাস গাছগুলো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। চাকার দাগ বরাবর গাড়িটা এগিয়ে নিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের সব আওয়াজ পেছনে পড়ে গেল। মনে হতে লাগল, আমি শহর থেকে অনেক অনেক দূরে একটা বিজন প্রান্তরে এসে পড়েছি।
পরিত্যক্ত ডেরিক, ড্রাম ওঠানামা করার জীর্ণ রোপওয়ে, একগাদা ফাঁকা ড্রাম, জংধরা একরাশ পাইপ— এগুলো সবই বলে দিচ্ছিল যে এই খনি থেকে আর তেল ওঠে না এখন। তেল মেশানো জল জায়গায়-জায়গায় জমে ছিল। তাতে সূর্যের আলো ঠিকরে রামধনু রং ছিটিয়ে দিচ্ছিল।
‘চমৎকার।’ আমি বলেই ফেললাম, ‘এখানেও পার্ক বানানো হবে বুঝি?’
মুখ নীচু করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল কারমেন। বাধ্য হয়ে আমিই বললাম, ‘এখানে নামতে হবে তো? নইলে বলুন, গাড়ি ঘোরাই। এত সুন্দর দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখলে আমার মাথা ধরে।’
‘এখানেই। ভালো না জায়গাটা?’ জানতে চাইল কারমেন।
‘ভীষণ।’
আমি গাড়িটা একটা জীর্ণ আর কাত হয়ে থাকা লোডিং প্ল্যাটফর্মের ধারে দাঁড় করালাম। বেরিয়ে এসে বুঝলাম, শহরের গর্জন এখানে মৌমাছির গুঞ্জন হয়ে আসছে— জায়গাটা এতটাই নির্জন আর একটেরে। গাছগুলো এত বৃষ্টির পরেও ধুলোমাখা বলে মনে হচ্ছিল। চারদিকের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, এখানে অনেক-অনেকদিন কেউ আসেনি। প্ল্যাটফর্মের অন্য প্রান্তের একটা জীর্ণ ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলাম, একগাদা জংধরা জিনিস সেখানেও পড়ে আছে। তার উলটোদিকে, বেশ কিছুটা পেছনে একটা বিশাল কাঠের চাকা পড়ে আছে, যেটা নির্ঘাত একসময় পাইপ ওঠানামা করানোর জন্য তার জড়াতে লাগত। তার পাশেই আছে একটা জলের কুয়ো, তবে সেটা এখন পচা গাছপালা আর জঞ্জালে বোঝাই হয়ে দুর্গন্ধ ছাড়ছে।
ভালো জায়গাই বটে।
গাড়ির কাছে ফিরে গেলাম। কারমেন গাড়িতে হেলান দিয়ে নিজের চুল ঠিকঠাক করছিল। আমাকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘পিস্তলটা দিন।’
ওকে পিস্তলটা দিয়ে আমি একটা জংধরা ক্যান তুলে নিলাম। তারপর বললাম, ‘খুব সাবধান। পাঁচটা ঘরেই গুলি ভরা আছে। ওই বড়ো কাঠের চাকাটা দেখতে পাচ্ছেন? আমি ওখানে গিয়ে এই ক্যানটা ওর ঠিক মাঝে রাখব।’
মেয়েটা ওদিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল। ও বুঝতে পারছে।
‘এখান থেকে জায়গাটা মোটামুটি ত্রিশ ফুট। আমি ক্যান রেখে আপনার পাশে ফিরে না আসা অবধি গুলি চালাবেন না। ঠিক আছে তো?’
খিলখিল করে হেসে উঠে সায় দিল কারমেন।
আমি সামনের জংধরা জিনিসপত্র পাশ কাটিয়ে বড়ো চাকাটার কাছে গেলাম। তার ঠিক মাঝখানে ক্যান রেখে সেটাকে পাশ থেকে দেখলাম। টার্গেট হিসেবে জিনিসটা চমৎকার। নিশানায় লাগাতে না পারলেও গুলি পাশের কাঠে আটকে যাবেই। ফিরে আসার সময়, যখন আমি কারমেনের থেকে ফুট দশেক দূরে, কারমেনের মুখ থেকে হাসিটা মুছে গেল। একটা হিস…স শব্দের সঙ্গে ওর সবকটা ছোট্ট-ধারালো দাঁত আত্মপ্রকাশ করল তক্ষুনি।
আমি থেমে গেলাম। তেলমেশানো জল আমার পায়ের কাছে হাওয়া আর রোদে নড়েচড়ে রং ছড়াতে লাগল।
‘ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক, কুত্তা!’ কারমেনের মুখটা একদম বিকৃত হয়ে গেছিল। হাড়-সর্বস্ব, ক্ষুধার্ত কোনো হিংস্র জন্তুর ভাব ফুটে উঠেছিল ওর মুখে। আমি দেখছিলাম, পিস্তল আমার বুকের দিকে তাক করা রয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ওর হাত রয়েছে একদম স্থির।
আমি হেসে ফেললাম। তারপর হাসতে হাসতেই ওর দিকে এগোলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম, ট্রিগারের ওপর ওর ছোট্ট আঙুলটা চেপে বসছে। যখন আমি ওর থেকে বড়োজোর ফুট ছয়েক দূরে, কারমেন ট্রিগার টিপল— পর পর দু’বার।
বন্দুকটা গর্জন করল। কিন্তু ধোঁয়া বেরোল না, গুলি তো একেবারেই বেরোল না। শুধু শব্দটা ছড়িয়ে গেল জলে, তেলে, জংধরা পাম্প আর ড্রামে, ফাঁকা কুয়োটায়। আমি আবার হেসে উঠলাম।
আবার ট্রিগার টিপল কারমেন। একবার… দু-বার। আমি তখন যে দূরত্বে ছিলাম তাতে গুলি ফসকানো অসম্ভব ছিল। পিস্তলে পাঁচটা গুলি ছিল, আর কারমেন চারবার ট্রিগার টিপেছিল।
আমি ওর ওপর ঝাঁপ দিলাম। তাতেও কারমেন মাথা ঠান্ডা রেখে ট্রিগার টিপল। মুখের পাশে একটা গরম বাতাস লাগল। বারুদের গন্ধও পেলাম একঝলক। ব্যস, আর কিছু না।
‘বাহ! বেশ ভালো চালান তো আপনি।’ বললাম আমি।
কারমেনের হাত থেকে ফাঁকা বন্দুকটা পড়ে গেল। প্রথমে ওর মুখ বেঁকে গেল, তারপর একেবারে ভেঙেচুরে গেল সবটা। ওর গোটা শরীরটা কাঁপতে শুরু করল। চোখের সাদা অংশটা প্রকট হয়ে উঠল। ওর মুখ থেকে ফেনা বেরোতে শুরু করল। শ্বাস টানার মতো অদ্ভুত আওয়াজ তুলে পড়ে গেল কারমেন, তবে আমি সতর্ক ছিলাম বলে ওকে ধরাশায়ী হতে হয়নি।
অজ্ঞান হয়ে গেলেও ওর মুখটা ফাঁক করাতে বেগ পেতে হল। তারপর দাঁতের ফাঁকে একটা রুমাল গুঁজতে গিয়ে গায়ের সবটুকু জোর খরচ করতে হল। ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে গাড়ির পেছনে শোয়ালাম। বন্দুকটা তুলে পকেটে ভরে আমি স্টিয়ারিং-এর পেছনে বসলাম। তারপর ওই মেঠোপথ ধরে ফিরে চললাম স্টার্নউডদের বাড়ির দিকে।
মাঝরাস্তা যাওয়ার পর প্রথমে নড়াচড়া করল, তারপর একেবারে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল কারমেন। উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে ও আমাকেই জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছিল?’
‘কিছু না।’ আমি বললাম, ‘কেন?’
‘আমি না…’ আবার খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করল কারমেন, ‘সব ভিজিয়ে ফেলেছি।’
‘স্বাভাবিক।’ মাথা নেড়ে বললাম আমি।
হঠাৎ কারমেনের চোখে একটা অন্ধকার ভাব ঘনাল, আর তারপরেই ও গোঙাতে শুরু করল।
