Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

মরণ ঘুম – ৩২

৩২

যে ভদ্র, শান্ত পরিচারিকার সঙ্গে পাঁচদিন আগে দেখা হয়েছিল, তিনিই এবার আমাকে ওপরের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। আমি চুপচাপ বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। পাশে রাখা ব্রেকফাস্ট টেবিলে রুপোর বাসনগুলো চকচক করছিল। রুপোর তৈরি ছাইদানি উপচে পড়ছিল ছাই। কোথাও কোনো শব্দ ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ পরে ভিভিয়েন রেগান উলটোদিকের দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন। আমার দিকে না তাকিয়ে তিনি একটা চেয়ারে বসে নতুন একটা সিগারেট ধরালেন।

‘তাহলে আপনি একজন অসভ্য বর্বরই বটে!’ ছাদের দিকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন মহিলা, ‘কাল রাতে আপনি একজনকে খুন করেছেন। দয়া করে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। আমার কাছে সব খবর আসে। আর এখন আপনি আমার বোনকে এমন ভয় দেখিয়েছেন যে তার ফিট হয়েছে।’

আমি কোনো কথা বললাম না। ভিভিয়েন আরও কিছুক্ষণ সিগারেট টানলেন। বেশ বুঝতে পারছিলাম, মহিলা ছটফট করছেন। কিন্তু আমি ওঁকে কিছু বলার সুযোগ দিতে চাইছিলাম না। সত্যি বলতে কী, আমার নতুন করে কিছু জানার ছিল না। কিছুক্ষণ ওভাবেই কাটার পর মহিলা আমার দিকে ঠান্ডা, ধারালো চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘গত পরশু রাতে আমাদের দু-জনের মধ্যে অন্তত একজন মাথা ঠান্ডা রেখেছিল— এজন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। ব্যাপারটা আরও কিছুদূর গড়ালে আমি খুব বিপদে পড়তাম। কিন্তু আপনি চুপ করে আছেন কেন? কিছু বলুন।’

‘আপনার বোন কেমন আছেন?’

‘ঘুমোচ্ছে।’ সিগারেটের ধোঁয়া ছুড়ে ভিভিয়েন বোধ হয় ছাদের আকাশে মেঘ বানাতে চাইছিলেন, ‘এমন কিছু হলে ও তারপর ঘুমিয়েই পড়ে। মনে হয়, যেন কেউ ওকে ঘুমপাড়ানি গান শোনায়। আপনি ওর সঙ্গে কী করেছেন?’

‘কিচ্ছু না। জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে আপনাদের বাড়ি থেকে বেরোবার পরেই বাইরের লনে কারমেনের সঙ্গে আমার দেখা হয়। উনি ডার্ট ছুড়ে ছুড়ে বোর হচ্ছিলেন। আমার কাছে ওঁর একটা জিনিস ছিল। একটা ছোট্ট পিস্তল— যেটা নিয়ে উনি ব্রোডির ওখানে গেছিলেন। সেটা ওঁকে ফেরত দিই আমি।’

ভিভিয়েনের চোখজোড়া বড়ো আর কালো হয়ে উঠল, কিন্তু উনি কিছু বললেন না। বুঝতে পারছিলাম, এবার ওঁর চুপ করে থাকার পালা।

‘কারমেন বন্দুকটা ফিরে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। উনি আমাকে বলেছিলেন ওঁকে বন্দুক চালানো শিখিয়ে দেওয়ার জন্য। এই কাজটা তো আর ওই লনে হত না। উনিই আমাকে নিয়ে যান আপনাদের সম্পত্তিতে ওই পুরোনো তেলের কুয়োগুলোর কাছে। আপনি ওখানে গেছেন নিশ্চয়। জানেনই তো জায়গাটা কেমন— অস্বস্তিকর, অদ্ভুত।’

‘হ্যাঁ।’ ভিভিয়েনের গলাটা যেন বহুদূর থেকে আসছিল, ‘জায়গাটা খারাপ।’

‘ওখানে ওঁর টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্য আমি একটা কাঠের চাকায় একটা ক্যান রেখে দিই। কিন্তু তারপরেই কারমেন দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। ওঁর কি মৃগীর ধাত আছে?’

‘আছে।’ ওইরকমই নীচু গলায় বলেন ভিভিয়েন, ‘আপনি কি এটাই বলার জন্য আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন?’

‘এডি মার্স আপনার ব্যাপারে কী জানেন?’

‘কিচ্ছু না।’ ভিভিয়েনের গলাটা ঠান্ডা শোনাল, ‘এই প্রশ্নটা আর কতবার করবেন?’

‘ক্যানিনো বলে কাউকে চেনেন?’

‘নামটা চেনা চেনা লাগছে।’ ভ্রূ কুঁচকে বললেন মহিলা।

‘এডি মার্সের পোষা খুনি। কাল রাতে এক মহিলা আমার ওপর সদয় না হলে আমাকে সেখানে থাকতে হত যেখানে আজ মিস্টার ক্যানিনো শুয়ে আছেন— মর্গে।’

‘মহিলারা আপনার ওপর…’ কথাটা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন ভিভিয়েন। দেখলাম, মহিলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মাথা নেড়ে উনি বললেন, ‘না, এটা নিয়ে ঠাট্টা করার অবস্থায় আমি নেই।’

‘আমিও ঠাট্টা করছি না। এতদিনে আমি সবটা বুঝতে পেরেছি, জানেন।’

‘তাই?’ ক্লান্ত গলায় বললেন ভিভিয়েন, ‘কী বুঝেছেন?’

ধীরে ধীরে, ক্লাসের পিছিয়ে পড়া ছাত্রকে বোঝানোর মতো করে, আমি বলে চললাম।

‘গাইগার আপনার বোনকে ফাঁসিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করেছিল। তবে ও একা ছিল না। ওর পেছনে ছিলেন এডি মার্স। কেন জানেন? মার্স বুঝতে চেয়েছিলেন, আপনার ব্যাপারে উনি যেটা জানেন সেটা দিয়ে জেনারেল স্টার্নউডকেও চাপে ফেলা যায় কি না। যদি সেটা হত, তাহলে কয়েক হাজার নয়, কয়েক লক্ষ ডলারের সওদা হত। কিন্তু জেনারেল চাপে পড়লেন না, বরং আমাকে ডেকে পাঠালেন। ফলে কয়েক লক্ষ ডলারের বদলে রুলে টেবিলে আপনার ঘাড় ভেঙে যা পাওয়া যায়, তাই নিয়েই মার্সকে সন্তুষ্ট থাকতে হল। কী দুঃখের ব্যাপার বলুন তো! অথচ মার্স, আপনি আর মার্সের ওই খুনি ক্যানিনো— শুধু আপনারা তিনজন যা জানতেন, তার দাম যে অনেক। তার এতটাই দাম যে এডি মার্স নিজের বউকে লুকিয়ে রাখলেন আর মোনা মার্সের অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের গ্যারেজেই রাস্টি রেগানের গাড়িটা রেখে দিলেন। উনি আর আপনি ভীষণভাবে চেয়েছিলেন, পুলিশ এই ব্যাখ্যাতেই সন্তুষ্ট থাক যে রাস্টি রেগান আর মোনা মার্স একসঙ্গে কোথাও পালিয়ে গেছেন। নইলে, মানে আসলে রাস্টি রেগান কোথায় আছেন সেটা পুলিশ জানতে পারলে যে ভীষণ বিপদ হবে!’

‘চুপ করুন!’ ক্লান্তভাবে বললেন ভিভিয়েন, ‘আপনার এই কথাগুলো আমার মাথায় হাতুড়ির মতো পড়ছে। বানিয়ে বানিয়ে আর কত গল্প শোনাবেন আমায়?’

‘নাহ, বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলছি না। আসলে নিজের কষ্ট ভোলার চেষ্টা করছি। আজকেই আপনার বাবা আমাকে রাস্টি রেগানের খোঁজ করার জন্য হাজার ডলার দিতে চেয়েছেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে ওই টাকাটা আমার কপালে নেই।’

‘কেন?’

‘মিসিং পার্সনস ব্যুরো এখনও তাঁকে খুঁজে পায়নি। ওদের এত লোকবল, এত জিনিসপত্র। তাই নিয়েও ওরা যাঁকে খুঁজে পেল না, তাঁকে আমি একা কী করে বের করব? তার পাশাপাশি ওরা অবশ্য এও মনে করছে, উনি স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেছেন। অর্থাৎ রাস্টি রেগানকে এডি মার্স খুন করাননি।’

‘এর মধ্যে আবার খুনের প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে?’ সিগারেট ধরাতে গিয়ে ভিভিয়েনের হাতের কাঁপুনিটা আমার নজর এড়াল না।

‘এবার সেই কথাতেই আসছি।’

এক মুহূর্তের জন্য আমার সামনে ভিভিয়েনের মুখটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তারপর স্টার্নউডদের রক্ত আর স্নায়ু কাজ করতে শুরু করল। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে আবার আমার চোখে চোখ রাখলেন মহিলা। আমি উঠে দাঁড়ালাম। মহিলার কাছে গিয়ে ওঁর আঙুলের ফাঁক থেকে সযত্নে সিগারেটটা বের করে নিয়ে ছাইদানিতে রাখলাম। তারপর পকেট থেকে ছোট্ট পিস্তলটা বের করে ওঁর কোলে রাখলাম।

একটা পাথরের মূর্তির মতো বসে রইলেন ভিভিয়েন। আমি কিছুটা দূরে সরে গিয়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালাম। মহিলার চোখ ইঞ্চি ইঞ্চি করে নেমে এসে পিস্তলটার ওপর স্থির হয়ে গেল।

‘ওটা ফাঁকা।’ আমার গলা শুনে একটা ঝাঁকুনি খেলেন মহিলা, ‘ওর পাঁচটা গুলিই আমার ওপর চালিয়ে দিয়েছেন কারমেন।’

মহিলার গলার কাছটা লাফিয়ে উঠল একবার। মনে হল, উনি কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু ওঁর কণ্ঠ ওঁকে সেই অনুমতি দিচ্ছে না।

‘পাঁচ-ছ-ফিট দূর থেকে চালানো গুলি। ফসকানোর কথাই নয়। তবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কী হতে চলেছে, তাই ব্ল্যাঙ্ক ভরে রেখেছিলাম সবকটা ঘরে।’

‘আপনি…’ থরথর করে কাঁপছিলেন ভিভিয়েন, ‘আপনি ভয়ানক! আপনি…’

‘আমি যেই হই না কেন, আপনি ওঁর দিদি। আপনি এই ব্যাপারে কী করবেন?’

‘কোন ব্যাপারে? আপনি এই নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েও কিস্সু করতে পারবেন না। আপনি যেখানে গেছিলেন সেখানে কোনো সাক্ষী ছিল না। তাই আপনার দিকে যে ও গুলি চালিয়েছিল, সেটা আপনি কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবেন না।’

‘আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি— এটা আপনার কেন মনে হল?’ আমি বললাম, ‘আমি তো সেই সময়টার কথা ভাবছিলাম যখন পিস্তলে ব্ল্যাঙ্ক নয়, সত্যিকারের গুলি ছিল।’

ভিভিয়েনের চোখদুটো দেখে আমার কুয়োর কথাই মনে হল। অতল, কুচকুচে কালো দুটো কুয়ো।

‘রেগান এক বিকেল বেলা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন। আমার কী মনে হয়, জানেন? ওই জায়গাটায় গিয়ে রেগানও কারমেনকে বন্দুক চালানো শেখাতে চেষ্টা করেছিলেন। আর তারপর ওঁর সঙ্গেও সেটাই হয়েছিল যেটা আমার সঙ্গে হয়েছিল। পার্থক্য একটাই— ওঁর বেলায় বন্দুকে আসল গুলি ছিল।’

‘কারমেন!’ দম আটকানোর ভঙ্গিতে শব্দটা ছিটকে আসে ঘরের বাতাসে, ‘কিন্তু কেন?’

‘গত পরশু আপনাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে আমি দেখি, কারমেন ম্যানেজারকে ভুজুং দিয়ে সেখানে ঢুকে পড়েছেন। সেও একেবারে আমার বিছানায়, নগ্ন অবস্থায়। আমি ওঁকে প্রায় দুর দুর করে তাড়িয়ে দিই। আমার আশঙ্কা, উনি একই কাজ রেগানের সঙ্গে করতে গেছিলেন। রেগানকে যতটা চিনেছি এই পাঁচদিনে তাতে মনে হয়, উনিও ঠিক আমার মতোই আচরণ করেছিলেন। প্রত্যাখ্যান হজম করা সহজ নয় মিসেস রেগান, বিশেষ করে হাতে যদি বন্দুক থাকে।’

ভিভিয়েন বেশ কয়েকবার মুখ খুললেন। কিন্তু প্রত্যেকবার মুখটা ফাঁকই হল শুধু, কোনো কথা বেরোল না। বেশ খানিকক্ষণ পর উনি বলতে পারলেন, ‘আপনার টাকা চাই, তাই না?’

‘কত দিতে পারবেন?’

‘পনেরো হাজার ডলার।’ ভিভিয়েনের চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়ে ছিল।

‘সেদিন রাস্টি রেগানের পকেটে এই টাকাটাই ছিল বটে। সেটাই ক্যানিনোর মাধ্যমে মার্সের কাছে পৌঁছে যায়, আর তাই লাশটাও মরুভূমির মধ্যে কোনো গর্তে পাথরচাপা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে চিরকালের মতো। কিন্তু ওতে তো আমার খিদে মিটবে না, মিসেস রেগান।’

কয়েকটা কদর্য শব্দ ঠিকরে এল মহিলার নীরক্ত মুখ থেকে। আমি ধীরে-ধীরে মাথা নেড়ে বললাম, ‘আমার দর এডি মার্সের চেয়েও চড়া। দিনে পঁচিশ ডলার আর তেলের দামের জন্য আমি পুলিশের সঙ্গে ঝামেলা পাকাই, লাইসেন্স বাতিল হওয়ার ভয় নিয়ে কাজ করি, মার খাই, মরতে মরতে বাঁচি, আর গালিও শুনি। কিন্তু এইসব আমি কেন করি, জানেন? যাতে এক মুমূর্ষু বৃদ্ধ এটা না জানতে পারেন যে তাঁর মেয়ে একজন খুনি। ভেবে দেখুন মিসেস রেগান, আমাকে এইরকম একজন ‘‘বেজন্মা কুত্তা’’ হিসেবেই দেখতে চান, নাকি সেই রাতে গাড়িতে শুয়ে নাক-ডাকানো ভদ্দরলোকের মতো করে।’

মনে হচ্ছিল, আমার সামনে কোনো মানুষ নয়, বরং একটা পাথরের মূর্তি বসে আছে।

‘আপনার বোনের কী করবেন?’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘ওঁকে অন্য কোথাও নিয়ে যান— যেখানে ছুরি বা বন্দুক নেই। যেখানে ওঁর ওপর প্রতি মুহূর্ত নজর রাখা হবে। কে জানে, হয়তো উনি সুস্থও হয়ে যেতে পারেন।’

ভিভিয়েন উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের আরেক দিকে গিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে আমাকে পাশ কাটিয়ে কিছুটা এগিয়ে থেমে গেলেন। আমার পেছন থেকে ওঁর ভাঙা, ফাঁকা গলাটা ভেসে এল।

‘আপনি যা বলেছেন, সব ঠিক। যেখানে আপনারা গেছিলেন, সেখানেই একটা মজে যাওয়া আর জঞ্জালে ভরা কুয়ো আছে। তার মধ্যে… শুয়ে আছে রাস্টি। আমি মার্সকে দিয়ে ওর লাশ গুম করিয়েছিলাম, কারণ এ ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না আমার সামনে। আমি জানতাম, আমাকে নিংড়ে ছিবড়ে করে দেবে এডি মার্স। কিন্তু আমি আর কী করতে পারতাম? বাবা জানতে পারলে পুলিশকে সবটা বলতেনই। সেই ধাক্কাটা উনিও সামলাতে পারতেন না। চিরকাল সেই দায়টা আমার ওপরেই চেপে থাকত।

আমি রাস্টিকে ভালোবাসিনি, মিস্টার মার্লো। ও ওর মতো থাকত— স্বাধীনচেতা, দিলদরিয়া, সাহসী। আমি আমার মতো থাকতাম। কিন্তু বাবা ওকে খুব পছন্দ করতেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, ওর এই পরিণতি আমি কিছুতেই চাইনি। তবু এমনটাই হয়ে গেল। ভেবেছিলাম, কারমেন এটা মুহূর্তের ঝোঁকে, হয়তো ফিট হয়েছিল বলে করে ফেলেছে। আমি সত্যি আশা করেছিলাম, ও সব ভুলে যাবে। সব্বাই সব ভুলে যাবে— এমনটাই ভেবেছিলাম আমি। কিন্তু সেটা তো আর হবে না, তাই না?’

‘আপনার কাছে ঠিক তিন দিন সময় আছে।’ আমি উঠে দাঁড়ালাম, ‘এর মধ্যে আপনি আপনার বোনকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবেন। এক মুহূর্তের জন্যও বোনকে চোখের আড়াল করবেন না। ওঁকে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে ভরতি করে দেবেন, যেখানে ওঁর সত্যিকারের চিকিৎসা হবে। যদি তিন দিনের মধ্যে এই জিনিস না হয়, তাহলে আমার মুখ-খোলা কিছুতেই আটকাতে পারবেন না।’

‘কিন্তু,’ মহিলা আমার দিকে ঘুরে চোখে চোখ রাখলেন, ‘আপনার কী হবে?’

‘আমাকে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।’

‘আমি চলে গেলে এডি…’ শুকনো গলায় বলতে শুরু করলেন মহিলা। আমি ওঁকে মাঝপথে থামিয়ে বললাম, ‘এডি মার্সের ব্যবস্থা আমি করব ক-দিনের মধ্যেই।’

‘ও আপনাকে মেরে ফেলবে!’

‘দেখা যাবে। ভালো কথা, নরিস জানেন?’

‘উনি কিছু বলবেন না।’

‘আমারও মনে হয়েছিল, উনি জানেন।’

কথা না বাড়িয়ে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলাম। সেখানে কেউ ছিল না। আমি বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এসে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে দূরে পাহাড়ের দিকে তাকালাম। হঠাৎ মনে হল, একবার ঘুমিয়ে পড়লে কোথায় শুয়ে আছি, সেটা নিয়ে কি আমরা কেউ ভাবি? কেউ মার্বেলের বেদির তলায় শোয়, আর কেউ মজা কুয়োয়। রাস্টি রেগান ঘুমিয়ে পড়েছেন। যে মানুষটি এখনও তাঁকে খুঁজে পেতে চাইছেন, তিনিও ঘুমিয়ে পড়বেন আর ক-টা দিনের মধ্যে।

এভাবেই একদিন ঘুমিয়ে পড়ব আমরা সব্বাই।

বড্ড ফাঁকা লাগছিল সব। ফেরার পথে একটা বারে নেমে দু-পাত্তর চড়িয়ে দিলাম। তাতে অবশ্য কোনো লাভ হল না। রুপোলি পরচুলা পরা সেই মহিলার কথা মনে পড়ে গেল মাঝখান থেকে।

না, তাঁর সঙ্গেও আমার আর কখনো দেখা হয়নি।

মূল কাহিনি: দ্য বিগ স্লিপ, লেখক: রেমন্ড শ্যান্ডলার, প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৯