Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

সাত – হত্যাকারী কে?

তখন সাড়ে পাঁচটা। যেখানে নেমেছিলাম সেখান থেকে বেশ কয়েকটা ব্লক হেঁটে তবে একটা মনের মতো, ছোটোখাটো হোটেল পাওয়া গেল। ‘হোটেল ক্রফোর্ড’-এর একটা মলিন ঘরে বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে চোখ বুজলাম, তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়।

সকাল দশটায় উঠে সাজগোজ করলাম। ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যােঙ্ক গিয়ে প্রথম কাজ ছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাশিয়ার অ্যালবারিকে ধরা। এলিহু উইলসনের দশ হাজারি চেকটা ওকে সার্টিফাই করতে বললাম। ও আমাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাল। ছোকরা নির্ঘাত বুড়োর বাড়িতে ফোন করে বোঝার চেষ্টা করছিল আমি চেকটা নিয়মমতো আদায় করেছি কি না! অবশেষে সইসাবুদ করা চেকটা পেলাম। সেটাকে খামে ভরে, স্ট্যাম্প লাগিয়ে এজেন্সির সানফ্রানসিস্কো অফিসের ঠিকানায় পোস্ট করে ব্যাঙ্কে ফিরলাম। তারপর অ্যালবারিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এবার বলো, লোকটাকে মারলে কেন?’

‘কাকে?’ অ্যালবারি হেসে বলল, ‘প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনকে?’

‘তুমি এটা মানবে না যে তুমিই ডোনাল্ড উইলসনকে খুন করেছ?’

‘আপনার সঙ্গে ঝামেলা পাকাতে চাই না, সত্যি বলছি।’ হাসিমুখেই বলল ছোকরা, ‘তবে এটা আমি মানব না।’

‘এহ! মেনে নিলেই হত। আমরা এখানে তর্কবিতর্ক করলে লোকে নাক গলাবে।’ আমি অভিযোগ করলাম, ‘ভালো কথা, ওই হেল্্থ টনিকের বিজ্ঞাপনটি কে?’

‘মিস্টার ড্রিটন, ক্যাশিয়ার।’ অ্যালবারির মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল।

‘আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দাও।’

অস্বস্তি অগ্রাহ্য করে ছোকরা ক্যাশিয়ারকে ডাকল। বিপুলদেহী ড্রিটন তাঁর মসৃণ গোলাপি মুখ, গোলাপি টাক ঘিরে রাখা ক-গাছি সাদা চুল, আর রিমলেস চশমা নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। অ্যালবারি জড়ানো গলায় আমার কী পরিচয় দিল তা ও-ই জানে। আমি ছোকরার থেকে নজর না সরিয়েই ড্রিটনের হাত ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘আমি এইমাত্র ওকে বলছিলাম, আমাদের একটা শান্ত, নিরিবিলি জায়গা দরকার জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। নইলে ওর স্বীকারোক্তি আদায় করা যাবে না। আর আমি চাই না ব্যাঙ্কসুদ্ধ লোক আমার চিৎকার শুনুক।’

‘স্বীকারোক্তি?’ ড্রিটনের মুখ হাঁ হয়ে গেল।

‘ঠিক তাই।’ আমি নিজের মুখ, কণ্ঠস্বর, মায় দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাও নির্বিকার রাখলাম, অনেকটা নুনানের মতো, ‘আপনি জানেন না, অ্যালবারিই ডোনাল্ড উইলসনকে খুন করেছে?’

আমি একটা গাধাসুলভ রসিকতা করছি ভেবে ক্যাশিয়ারের চশমার পেছনে একটা মোলায়েম হাসি জন্মাতে শুরু করল। কিন্তু নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টের দিকে তাকিয়ে সেটা মাঝপথে থেমে গেল। অ্যালবারি’র মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। ওর হাসিটা দেখলে তো লোকে ভয়ই পাবে।

জোরে গলাখাকারি দিয়ে ড্রিটন বললেন, ‘ক-দিন আমরা কিন্তু দারুণ আবহাওয়া পাচ্ছি, কি বলেন?’

‘কিন্তু একটা প্রাইভেট চেম্বার টাইপের কিছু পাওয়া কি একান্তই অসম্ভব?’ আমি নড়ার লক্ষণ দেখালাম না।

‘এ…সব কী?’ ড্রিটন নার্ভাস হয়ে অ্যালবারির দিকে ঘুরে বললেন। অ্যালবারি তার উত্তরে কী বলল, তা আমরা কেউই শুনতে পেলাম না। আমিই বললাম, ‘সেরকম কোনো জায়গা না থাকলে আমাকে ওকে নিয়ে সিটি হল যেতে হবে।’

নাকের ওপর দিয়ে হড়কে নামা চশমাটা চেপে ধরে ড্রিটন কোনোক্রমে নিজেকে সামলালেন। তারপর আমাদের বললেন, ‘এদিকে আসুন।’

লবি পেরিয়ে আমরা ‘প্রেসিডেন্ট’ তকমা-আঁটা একটা ঘরের সামনে পৌঁছোলাম। বুঝলাম, এটাও এলিহু উইলসনের একটা বসার জায়গা। ঘরটা স্বাভাবিকভাবেই ফাঁকা ছিল। আমি একটা চেয়ারে অ্যালবারিকে বসিয়ে নিজেও তার পাশে বসলাম। ড্রিটন কিছুক্ষণ উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে অবশেষে আমাকেই বললেন, ‘কী হয়েছে একটু খুলে বলুন তো।’

‘বলছি।’ আমি অ্যালবারির দিকে ঘুরলাম, ‘তুমি ডিনা-র প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডদের একজন। তাদের মধ্যে তুমিই একমাত্র লোক যে সার্টিফায়েড চেকের ব্যাপারটা জেনে সময়মতো মিসেস উইলসন আর থ্যালার, দু-জনকেই ফোন করতে পারতে। উইলসন একটা .৩২ ক্যালিবার বন্দুকের গুলি খেয়েছিল। ব্যাঙ্কে নিরাপত্তার জন্য ওই জিনিসই ব্যবহার করার রেওয়াজ আছে। হতেই পারে যে তুমি ব্যাঙ্কের বদলে নিজের বন্দুক ব্যবহার করেছিলে। তবে আমার মনে হয়, তুমি ব্যাঙ্কের বন্দুকই কাজে লাগিয়েছিলে। মোদ্দা কথা, একজন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে গুলিগুলো ব্যাঙ্কের নামে ইসু হওয়া বন্দুকের সঙ্গে মেলালেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

অ্যালবারি কিছু বলল না। আমি অন্য রাস্তা ধরলাম।

‘মেয়েটার প্রেমে একেবারে মজে গেছিলে তুমি। মনে আছে, তুমিই বলেছিলে, ডিনা মেনে নেয়নি বলেই তোমরা…’

‘না!’ ছেলেটার মুখ লাল হয়ে গেছিল, ‘আর না!’

আমি ঠোঁট বেঁকিয়ে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, ‘তোমাদের মতো শখের অপরাধীদের এটাই ভুল হয়। জীবন খাতার প্রতি পাতায় তোমরা কী হিসেবনিকেশ করেছ, তার কতটা আমাদের সামনে তুলে ধরা যায়, আর কতটা নয়, সেটা তোমরা জান না। তাই সৎ সাজতে গিয়ে তোমরা সব বলে দাও।’

অ্যালবারি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। আমি আবার বললাম, ‘তুমি জান, তুমি খুনি। যদি তুমি ব্যাঙ্কের বন্দুক ব্যবহার করে থাক, তাহলে তোমার ধরা পড়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। যদি তা নাও হয়, তুমি জান যে আমি তোমাকে ধরবই। তবে এখানে অন্য একটা ব্যাপারও আছে।

নুনান এই খুনের জন্য থ্যালারকে ফাঁসাতে চেষ্টা করছে। ও জানে, আদালতে এই চার্জ টিকবে না। তাই ও থ্যালারকে মেরেই ফেলবে। কিং স্ট্রিটে ওর আড্ডায় ঢুকতে পারেনি নুনান। কিন্তু অন্য কোথাও সেই সুযোগ আসতেই পারে। তুমি যদি দোষ স্বীকার না করে আরও একজনের অকারণ মৃত্যুর দায় নিজের কাঁধে নিতে চাও, সেটা তোমার ব্যাপার।’

‘আমি…’ গলাটা শুনে মনে হচ্ছিল, ছেলেটার বয়স কয়েক যুগ বেড়ে গেছে, ‘আমি…’

‘বন্দুকটা কোথায়?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘হার্পার-এর খাঁচায়।’

আমি ক্যাশিয়ারের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বললাম, ‘বন্দুকটা নিয়ে আসবেন?’ ভদ্রলোক বেরোলেন না পালালেন, বোঝা গেল না।

‘আমি ওকে মারতে চাইনি।’ ছেলেটা ভাঙা গলায় বলল, ‘সত্যি বলছি।’

আমি সহানুভূতির ভাব মুখে ফুটিয়ে মাথা ঝাঁকালাম।

‘আমি বলছি, ওকে মারার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না।’ অ্যালবারি বলে চলল, ‘তবে বন্দুকটা সঙ্গে নিয়েই গেছিলাম। আ…আপনি ঠিকই বলেছিলেন। আমি ডিনা-র ওপর ফিদা ছিলাম। আসলে রোজ একরকম লাগত না। কোনো কোনোদিন খুব খারাপ লাগত। উইলসন যেদিন চেকটা সার্টিফাই করাতে এসেছিলেন, সেদিন একটা খারাপ লাগার দিন ছিল। আমার শুধু মনে হচ্ছিল, আমি ডিনাকে পাইনি আমার টাকাপয়সা নেই বলে। আর এই লোকটা ওকে পাঁচ হাজার ডলার দিচ্ছে! আমি ডিনা আর থ্যালারের ব্যাপারটা জানতাম। তাও, উইলসন আর ডিনার মধ্যে কিছু হলেও আমি মাথা ঘামাতাম না হয়তো। কিন্তু ওই চেকটাই আমার মাথায় সব কেমন গোলমাল করে দিল।

আমি সেই রাতে ডিনা-র বাড়ির ওপর নজর রেখেছিলাম। ডোনাল্ড উইলসনকে ঢুকতে দেখলাম। আমার খুব ভয় করছিল। পকেটে বন্দুকটার অস্তিত্ব টের পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, এমন একটা মানসিক অবস্থায় বড়ো কিছু হয়ে যেতে পারে। মনে হল, মিসেস উইলসনকে ফোন করে ব্যাপারটা বলি। কেন মনে হল…? জানি না। কোণের একটা ওষুধের দোকানে গিয়ে আমি প্রথমে মিসেস উইলসনকে, তারপর থ্যালারকে ফোন করলাম।’

‘থ্যালারকে কেন ফোন করলে?’

‘আমার মনে হচ্ছিল, ডিনা আর উইলসনের সঙ্গে যুক্ত সব্বার ওখানে থাকা দরকার। আর কারো কথা মাথায় এলে আমি তাদেরও ফোন করতাম।’

‘তারপর?’

‘আমি আবার নজরদারি শুরু করলাম। মিসেস উইলসন এলেন, তারপর থ্যালার। কেউই কিচ্ছু করল না, শুধু চুপচাপ অপেক্ষা করল। বেশ খানিকক্ষণ পর ডোনাল্ড উইলসন বেরিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। আমি আবার মিসেস উইলসনের গাড়ির দিকে তাকালাম, কিন্তু উনি নামলেন না। থ্যালারও নড়ল না। তখন, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম, কেন আমি ওদের ওখানে চেয়েছিলাম। যাতে ওরাই কিছু করে! যাতে আমাকে কিছু করতে না হয়! ওদের মধ্যে যদি একজনও ওকে অনুসরণ করত, বা কাছে গিয়ে কিছু বলত, আমি বোধ হয়…!

কিন্তু ওরা কিচ্ছু করল না। আমার মনে আছে, পকেট থেকে বন্দুকটা বের করলাম। চোখের সামনে সব কেমন ঝাপসা লাগছিল। আমি কি কাঁদছিলাম? হতে পারে। গুলি করাটা আমার মনে নেই। মানে ঠিক কখন আমি নিশানা স্থির করলাম, কখন গুলি করলাম… এগুলো মনে নেই। তবে গুলির আওয়াজ মনে আছে। এও মনে আছে যে আওয়াজটা বেরোচ্ছিল আমার হাতে ধরা বন্দুক থেকেই। তারপর উইলসন কী করল, কীভাবে পড়ল, সেগুলো কিচ্ছু মনে নেই। আর কিছু হওয়ার আগেই আমি গলি ধরে পেছনে ছুটি। বাড়িতে আসি। বন্দুকটা সাফ করে তাতে আবার গুলি ভরি। পরদিন সকালে পেমেন্ট টেলারের খাঁচার পেছনে বন্দুকটা আবার রেখে দিই।’

সিটি হল যাওয়ার পথে আমি ছেলেটার কাছে মাফ চাইলাম। বললাম, ‘ও-সব বলে তোমার ওই জবরদস্ত অভিনেতার মুখোশটা না সরালে এই কথাগুলো বের করতে পারতাম না।’

ছেলেটা একটু কুঁকড়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘পুরোটা কিন্তু অভিনয় ছিল না। এই ব্যাপারটা সত্যিই তত গভীরে যায়নি বোধ হয় আমার। তবে ডিনা…! আমার নিজেরই এখন সবটা এত তুচ্ছ মনে হচ্ছে, কী বলব!’

আমি, ‘‘ওর’ম মনে হয়,’ ছাড়া কী বলব বুঝে পেলাম না। চিফের অফিসে আগের রাতের ‘অভিযান’-এ আমার সঙ্গী হওয়া, বিড্্ল নামের এক পুলিশকে খুঁজে পেলাম। আমাকে দেখে তার চোখ ছানাবড়া আকার পেলেও কিং স্ট্রিটের ব্যাপার নিয়ে সে কিছু বলল না। আমার কাছ থেকে ব্যাপারটা শুনে সে প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নির অফিস থেকে ডার্ট নামের এক তরুণ উকিলকে জোগাড় করল। অ্যালবারি যখন বিড্্ল, ডার্ট, আর এক স্টেনোগ্রাফারের সামনে আবার ইতিহাস-ভূগোল ব্যাখ্যা করছে, তখন নুনান সদ্য ঘুমভাঙা চেহারায় এসে পৌঁছোল।

‘আরেহ্‌! আপনি এখানে?’ আমাকে দেখে দারুণ খুশি হয়েছে এমন ভঙ্গিতে হাত ঝাঁকিয়ে, পিঠ চাপড়ে নুনান বলল, ‘আমি তো ভেবেছিলাম বদমাইশগুলো কাল রাতেই আপনাকে পেড়ে ফেলেছে। উফ! জোর বাঁচা বেঁচেছেন আপনি। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি, সব ফর্সা। আচ্ছা, ওরা বেরোল কীভাবে?’

‘আপনার দু-জন লোক পেছনের দরজা খুলে দিয়েছিল। তারপর এ বাড়ি, সে-গলি হয়ে পুলিশেরই একটা গাড়িতে ওদের চড়িয়ে বিদায় করেছিল। আমি যাতে আপনাকে কিছু বলতে না পারি সেজন্য ওরা আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেছিল।’

‘আমার দু-জন লোক?’ নুনানের মুখ দেখে মনে হল ও বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি, ‘একটু বর্ণনা দিন তো।’

আমি বর্ণনা দিলাম। নুনান বলল, ‘শোর আর রিওর্ডান। না, আমি খুব একটা অবাক হচ্ছি না। তা… এসব কী ব্যাপার?’

আমি ব্যাপারটা সংক্ষেপে বললাম। অ্যালবারি তখন ওর স্টেটমেন্ট দিচ্ছিল। শুনে নুনানের মুখে মুচকি হাসিটা ফিরে এল।

‘এহেহে! আমি তো হুইস্পারের সঙ্গে বড্ড অন্যায় করে ফেলছিলাম আর একটু হলেই। ওর সঙ্গে দেখা হলে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে হবে। আপনিই তাহলে কেসটা সল্্ভ করে ফেললেন?’ আরেকপ্রস্থ করমর্দনের পর শুনতে হল, ‘তাহলে এবার আপনি শহর ছেড়ে যাচ্ছেন নিশ্চয়?’

‘এখনই না।’

‘কোনো তাড়া নেই।’ আমাকে অভয় দিল নুনান। আমি বেরিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। চুল-দাড়ির কিঞ্চিৎ যত্ন নিলাম। তারপর এজেন্সিতে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে ডিক ফোলি আর মিকি লিঞ্চান-কে পার্সনভিল পাঠাতে লিখলাম। নিজের ঘরে ফিরে, পোশাক বদলে আমি ক্লায়েন্টের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম।

এলিহু উইলসন একটা রোদ-ঝলমল জানালায় কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে ছিলেন। আমার হাতটা ঝাঁকিয়ে ভদ্রলোক আমাকে তাঁর ছেলের হত্যাকারীকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানালেন। একটা ভদ্রগোছের উত্তর দিলাম। কীভাবে এলিহু খবরটা পেলেন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করিনি আমি।

‘কাল রাতে তোমাকে যে চেকটা দিয়েছি,’ এলিহু বললেন, ‘সেটা তোমার কাজের পক্ষে যথেষ্ট নিশ্চয়?’

‘আপনার ছেলে যে চেকটা আগে পাঠিয়েছিলেন, সেটাই এর পক্ষে যথেষ্ট।’

‘তাহলে আমারটা বোনাস ধরে নাও।’

‘নীতিগতভাবে কন্টিনেন্টাল বোনাস বা পুরস্কার নেওয়ার বিরোধী।’

‘জাহান্নমে যাক তোমাদের…’ বুড়োর মুখ লাল হয়ে উঠছিল।

‘আপনি চেকটা দিয়েছিলেন পার্সনভিলে অপরাধ আর দুর্নীতি নিয়ে তদন্তের জন্য। কথাটা কি আপনি ভুলে গেছেন?’

‘ওগুলো ফালতু কথা।’ বুড়ো বিরক্ত হল, ‘কাল রাতে আমরা সবাই উত্তেজিত ছিলাম। ওরকম কোনো তদন্ত করতে হবে না।’

‘মানতে পারলাম না।’

বুড়ো প্রচুর গালাগাল দিয়ে বলল, ‘ওটা আমার টাকা। আমি এইসব আলতু-ফালতু কাজে ওই টাকা বরবাদ করব না। যা করেছ তার জন্য যদি ওই টাকা নিতে না পার, তাহলে আমার টাকা ফেরত দাও।’

‘চেঁচাবেন না।’ আমি বললাম, ‘আমি স্বচ্ছ শহর অভিযান চালাব। তার বেশি না, কমও না। আপনি এটাই চেয়েছিলেন, এটাই পাবেন। এখন আপনি জানেন, আপনার ছেলেকে আপনার ইয়ারদোস্তরা নয়, অ্যালবারি মেরেছিল। তারা জানে, থ্যালার আপনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওদের ফাঁসাচ্ছিল না। আপনার ছেলে মারা গেছে। এখন আপনিও আপনার বন্ধুদের বোঝাতে পারবেন, তাদের বিরুদ্ধে কেউ জেহাদ ঘোষণা করবে না। পার্সনভিল আবার আপনার হাতের খেলনা হয়ে যাবে।

কাল রাতেই আপনাকে বলেছিলাম, আমি জানতাম এমন কিছুই হবে। সেজন্যই আমি এই কেসটা এমনভাবে নিয়েছি যাতে ব্যাপারটা আপনার মেজাজমর্জির ওপর আর নির্ভর না করে। চেকটা আর আটকানো যাবে না। হ্যাঁ, একটা চুক্তির তুলনায় ওই চিঠিটা হয়তো একটু কমজোরি হবে। তবে তার জন্য আপনি আদালতে গেলে আমিও দেখব, প্রেসের হাতে খোরাক হতে আপনার কেমন লাগে।

আপনার পুলিশ চিফ কাল রাতে আমাকে মারার চেষ্টা করেছিল। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি। তাই এবার আমি একটু হিসেব বরাবর করব। আপনার টাকা দিয়েই আমি পয়জনভিলকে ফালা ফালা করে বের করব, এখানে কে কী করছে। আর হ্যাঁ, আপনি যাতে নিয়মিত রিপোর্ট পান, সেটাও আমি দেখব। দেখবেন, ওগুলো পড়ে আপনারও ভালো লাগবে।’

বুড়োর গালাগালে ভনভন করা ঘর ছেড়ে আমি বেরিয়ে এলাম।