Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

দশ – অপরাধের সন্ধানে

আধ ঘণ্টা পর বাড়িটা থেকে বেরোলাম। ডিনা ব্র্যান্ড একটা হালকা নীল রঙের গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে বসে ছিল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওর সঙ্গে কথা বলছিল ম্যাক্স থ্যালার। দু-জনেরই মুখ-চোখ দেখে বুঝতে পারছিলাম, কথা নয়, গুলির মতো করে শব্দ দেওয়া-নেওয়া চলছে। এমন ‘ঘরোয়া’ কথায় আমার ঢোকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু মেয়েটা রীতিমতো চেঁচিয়ে, ‘আমি তো ভাবলাম আপনি আসবেনই না!’ বলায় আমাকে বাধ্য হয়ে এগোতে হল।

জুয়াড়ি আমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে বন্ধুত্বর লেশমাত্রও ছিল না।

‘কাল রাতে পরামর্শ দিয়েছিলাম।’ ওর ফিসফিস চিৎকারের চেয়েও জোরে আমার কানে এসে পৌঁছোল, ‘এবার বলছি। নিজের জায়গায় ফিরে যান।’

‘আবারও ধন্যবাদ।’ বলে আমি ডিনার পাশে বসে পড়লাম। গাড়ি স্টার্ট নিল। থ্যালার কাছে এসে বলল, ‘এর আগেও তুমি আমাকে ডুবিয়েছ। তবে এবার তুমি…’

মেয়েটা গাড়ি চালাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘নরকেই যাব গো। তবে তোমার সঙ্গে!’

আমরা শহরের দিকে যাচ্ছিলাম। ব্রডওয়েতে গাড়িটা তুলে ডিনা জানতে চাইল, ‘বুশ কি মরে গেছে?’

‘নিশ্চিতভাবে। ওকে চিত করার পর দেখা গেল, ছুরিটা গলা ফুটো করে বেরিয়ে এসেছিল।’

‘হতভাগার বোঝা উচিত ছিল, দু-নম্বরি লোকেদের সঙ্গে বেইমানি করলে কী হয়। যাকগে। এবার কিছু খাওয়া যাক। আজ রাতে আমি প্রায় এগারোশো জিতেছি। তাতে আমার বয়ফ্রেন্ডের সমস্যা হলে আমি কী করব? ভালো কথা, আপনি কত জিতলেন?’

‘আমি খেলিনি। থ্যালার আপনার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে বুঝি?’

‘খেলেননি?’ মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী ধরনের গাধা আপনি? ওরকম একটা পাকাপোক্ত জিনিস জানা সত্ত্বেও আপনি খেলেননি!’

‘ওটা পাকাপোক্ত ছিল না। মোদ্দা কথা, যা হল তাতে থ্যালার খুশি নয়?’

‘একদম। ওর প্রচুর ধসেছে আজ রাতে। আর আমার ওপর ও চটেছে কারণ আমি শেষ মুহূর্তে অন্যদিকে খেলে দাঁও মেরেছি।’ একটা চাইনিজ রেস্তরাঁর সামনে হিংস্রভাবে গাড়িটা থামিয়ে বলল ডিনা, ‘জাহান্নমে যাক ও!’

মেয়েটার ভেজা চোখ চকচক করছিল। চোখে রুমাল ঘষে, ‘আমার ভয়ংকর খিদে পেয়েছে!’ বলে আমাকে প্রায় টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল ডিনা। নিজের প্লেট, আর আমার অর্ধেকটা সাফ করে ও ঘরমুখো হল। আমিও চললাম।

ড্যান রল্্ফ খাওয়ার ঘরে, সামনে আধ-খালি বোতল আর গ্লাস নিয়ে বসে ছিল। তার সামনে গিয়ে অধৈর্য ভঙ্গিতে ডিনা বলে উঠল, ‘টাকা তুলেছ?’

ড্যান কথা না বাড়িয়ে কোটের পকেট থেকে একটা বান্ডিল বের করে টেবিলে ফেলে দিল। লোভীর মতো করে সেটা তুলে নিয়ে গুনল মেয়েটা। খুশিয়াল মেজাজে টাকাগুলো নিজের ব্যাগে ভরে ও রান্নাঘরে গেল বরফের জোগাড় করতে। আমি বসে সিগারেট ধরালাম। রল্্ফ বোতলের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর জিন, লেমন জুস, বরফ, সোডা এসব নিয়ে মেয়েটা এসে বসল। আমরা যে যার গ্লাসে মনোনিবেশ করলাম।

একটু পর ডিনা রলফকে বলল, ‘ম্যাক্স দারুণ চটেছে। ও জেনেছে, একেবারে শেষ মুহূর্তে তোমার বাজি কার দিকে ছিল। ওর ধারণা, আমি কিছু একটা করেছি। কিন্তু আমি কী করেছি? স্রেফ হেরো পার্টির বদলে জিতনেওয়ালার ওপর বাজি লাগিয়েছি। ঘটে কিছুমাত্র বুদ্ধি থাকলেও লোকে তাই করবে। এর বাইরে আমি কি কিছু করেছি?’

‘না।’

‘তাহলেই বোঝো। আসলে ম্যাক্স ভয় পেয়েছে। ও ভাবছে, ওর সঙ্গীসাথিরা ভাববে, একা আমি নই, ও-ও নির্ঘাত বুশের ওপর বাজি লাগিয়েছিল। তাতে আমি কী করব? মরুক গে! আমি বরং আর এক গ্লাস নিই।’

রল্্ফ আমি আসার পর থেকে গ্লাস ছোঁয়নি। মেয়েটা যখন আবার ড্রিঙ্কস বানাচ্ছে, তখন ও বলে উঠল, ‘থ্যালার এতে খুশি হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তুমি কি অন্য কিছু হবে ভেবেছিলে?’

‘আমি কী ভেবেছিলাম সেটা আমার ব্যাপার।’ তেতো গলায় বলল ডিনা, ‘থ্যালার কি আমার মাথা কিনে নিয়েছে যে আমার সঙ্গে ওভাবে কথা বলবে? ও হয়তো ভাবছে যে আমি ওর সম্পত্তি। তবে সেই ভাবনাটা এবার ভেঙে দিতে হচ্ছে।’

নিজের গ্লাসটা খালি করে সেটা টেবিলের ওপর সপাটে রাখল মেয়েটা। তারপর আমার দিকে ঘুরে বলল, ‘এটা কি সত্যি যে শহর সাফ করতে কাজে লাগানোর মতো দশ হাজার ডলার আপনার কাছে রয়েছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘আর আমি যদি আপনাকে সাহায্য করি, তাহলে সেই দশ হাজার ডলারের কিছুটা আমিও…’

‘তুমি এটা করতে পার না ডিনা।’ রল্্ফ-এর গলাটা ভারী হলেও নরম ছিল। মনে হচ্ছিল ও কোনো বাচ্চাকে বোঝাতে চাইছে, ‘এটা একটা জঘন্য, নোংরা কাজ হবে।’

মেয়েটা ধীরে-ধীরে ওর দিকে ঘুরল। ওর মুখটা কিছুক্ষণ আগের মতো হয়ে গেল, যখন ড্যান রল্্ফ নয়, ওর সামনে ছিল ম্যাক্স থ্যালার।

‘আমি করব। তাতে আমি জঘন্য, নোংরা হয়ে যাব। তাই না?’

রল্্ফ কিচ্ছু বলল না। নিজের বোতলের দিকে তাকিয়ে বসে রইল ও। মেয়েটার মুখ লাল, শক্ত, হিংস্র হয়ে উঠলেও গলার আওয়াজটা ছিল ভীষণ নরম, ‘তোমার মতো একজন ভদ্রলোক, অসুখবিসুখে ভুগলেও ভদ্র তো, আমার মতো একজন জঘন্য, নোংরা মেয়ের সঙ্গে থাকছে। এটা খুউব দুঃখের কথা, তাই না?’

‘অবস্থাটা শোধরানো যেতে পারে।’ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল রল্্ফ। এক লাফে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল ডিনা। রল্্ফ ফাঁকা চোখে ওকে দেখল। ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ডিনা বলল, ‘তাহলে আমাকে এখন আর সহ্য করা যাচ্ছে না, তাই না? আমি এতটাই নোংরা হয়ে গেছি!’

‘আমি বলেছি,’ শান্তভাবে বলল রল্্ফ, ‘এই লোকটার জন্য তোমার বন্ধুদের সঙ্গে বেইমানি করাটা জঘন্য, নোংরা হবে।’

লোকটার সরু কবজি মুচড়ে ধরল ডিনা, যতক্ষণ না লোকটা হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ে। ওর অন্য হাতটা লোকটার চুপসানো গালে সপাটে আছড়ে মাথাটা এদিক থেকে ওদিকে দোলাচ্ছিল, অন্তত আধ ডজনবার। লোকটা চাইলে হাত তুলে নিজেকে বাঁচাতে পারত, কিন্তু ও চায়নি।

মেয়েটা ওকে ছেড়ে দিল। ঘুরে আবার গ্লাস তুলে সোডা আর জিন মেশাতে লাগল। ওর মুখের হাসিটা আমার মোটেও ভালো লাগছিল না।

রল্্ফ উঠে দাঁড়াল। ওর হাতের যেখানটা ডিনা চেপে ধরেছিল, সেখানটা লাল হয়ে ছিল। মুখটা অক্ষত ছিল না। নিজেকে স্থির করে ও ভোঁতা চোখে আমাকে দেখল। তারপর কোটের ভেতর থেকে একটা কালো অটোমেটিক পিস্তল বের করে আমায় গুলি করল। তবে তার জন্য যে গতি আর নিশানা দরকার, দুটোর কোনোটাই ওর ছিল না। আমি ওর দিকে একটা গ্লাস ছুড়ে মারার সুযোগ পেয়েছিলাম। গ্লাসটা ওর কাঁধে লাগল। গুলিটা আমার মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল।

ও পরের গুলিটা চালানোর আগে আমি ওর দিকে ঝাঁপালাম। আমার ধাক্কায় দ্বিতীয় গুলিটা মেঝের দিকে গেল। ওর চোয়ালে সপাটে ঘুসি মারলাম। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ড্যান রল্্ফ।

আমি দ্রুত পেছন ফিরলাম। ডিনা ভারী সাইফনটা তুলে আমার মাথায় বসানোর জন্য তৈরি হচ্ছিল। ওটা লাগলে নিরেট মাথাও ছাতু হত, তাই ‘না!’ বলে চেঁচাতে বাধ্য হলাম।

‘ওকে এভাবে মারার কোনো দরকার ছিল না।’ মেয়েটা গর্জে উঠল।

‘যা হবার হয়ে গেছে। এবার একটু যত্নআত্তি করুন বেচারির।’

আমরা দু-জনে মিলে রল্্ফকে ওর শোয়ার ঘরে নিয়ে গেলাম। লোকটা ‘উহ্‌-আহ্‌’ শুরু করার পর আমি ডাইনিং রুমে ফিরে এলাম। মিনিট পনেরো পর ডিনাও এসে বলল, ‘এখন ঠিক আছে। কিন্তু ওকে ওভাবে মারার কোনো দরকার ছিল না।’

‘ছিল। ওঁর জন্যই। বলুন তো, কেন ভদ্রলোক আমাকে গুলি করতে গেছিলেন?’

‘যাতে হুইস্পারের গুপ্তকথা আমার কাছ থেকে কেনার মতো কেউ না থাকে?’

‘না। আমি আপনার হাতে ওঁকে অপদস্থ হতে দেখে ফেলেছি বলে।’

‘তার মানে?’ অবাক হয়ে বলল মেয়েটা, ‘ওকে মারধর তো আমি করলাম।’

‘ভদ্রলোক আপনাকে ভালোবাসেন। এর আগেও আপনি ওঁর সঙ্গে অভদ্র আচরণ করেছেন। ওঁকে দেখে বুঝলাম, গায়ের জোরে আপনার সঙ্গে উনি পেরে উঠবেন না সেটা উনি বুঝে গেছেন। কিন্তু সেটা আরেকজন পুরুষ জানুক, এটা উনি হজম করেন কীভাবে?’

‘আমার ধারণা ছিল আমি পুরুষদের বুঝি।’ মেয়েটা নালিশ করল, ‘কিন্তু এখন দেখছি, আমি কিছুই বুঝি না! এরা প্রত্যেকে পাগল।’

‘তাই আমি ভদ্রলোককে একটু হলেও আত্মসম্মান ফিরিয়ে দিলাম। কোনো মেয়ের কাছে চড়থাপ্পড় খাওয়া হতভাগ্য নয়, বরং পুরুষ হিসেবেই আমি ভদ্রলোককে ঘুসিটা মারলাম।’

‘যা বলবেন।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল মেয়েটা, ‘এসব বুঝতে গেলে মাথায় ব্যথা হয়। বরং আরেক গ্লাস…’

গ্লাস ফুরোল। আমি বললাম, ‘আপনি বলছিলেন, উইলসনের টাকার একটা অংশ পেলে আপনি আমার সঙ্গে কাজ করতে রাজি। আমিও রাজি। আপনি পাবেন।’

‘কত?’

‘যতটা আপনি কামাতে পারবেন। যে মালমশলা আপনি আমাকে দেবেন, সেটাই ঠিক করে দেবে আপনি কত পাবেন।’

‘যাব্বাবা! তাহলে তো সবটাই অনিশ্চিত।’

‘আপনার ভূমিকাও তো এখনও তেমনই। তাই না?’

‘তাই কি? আমি কিন্তু আপনাকে একদম এক নম্বর জিনিস দিতে পারি। পয়জনভিল আমার মতো করে কেউ চেনে না।’ নিজের স্টকিং-এর দিকে তাকিয়ে হতাশভাবে বলল, ‘আবার ছিঁড়েছে! এরকম যাচ্ছেতাই জিনিস এরা বানায় কেন?’

‘দোষ জিনিসের নয়।’ আমি গম্ভীরভাবে বললাম, ‘দোষ আপনার পায়ের। সাধারণ মেটিরিয়াল অত চাপ নিতে পারে না।’

‘হয়েছে। আর জ্ঞান দিতে হবে না। তা এই স্বচ্ছ শহর অভিযান আপনি কীভাবে চালাবেন, একটু শুনি।’

‘আমি যতটুকু জানি তাতে পার্সনভিল-কে পয়জনভিল বানিয়েছে থ্যালার, পিট দ্য ফিন, লিউ ইয়ার্ড, আর নুনান। এলিহু উইলসন আছে, তবে সে যেহেতু আমার ক্লায়েন্ট তাই তাকে আমি শেষে ধরব। আমাকে এখন এই শহরে হওয়া যাবতীয় অপরাধ খুঁজে বের করে তাদের ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে। তাহলে এদের টাইট দেওয়ার মতো জিনিস পাওয়া যাবেই।’

‘আজকের সাজানো খেলাটা ভেস্তে দেওয়া কি সেজন্যই?’

‘ওটা একটা পরীক্ষা ছিল। দেখছিলাম, কী হয়… লোকে কী করে… এই আর কি।’

‘কী সাংঘাতিক!’ মেয়েটার চোখ আর মুখ দুটোই গোল হয়ে গেল, ‘আমি আজ অবধি কোনো ডিটেকটিভের কথা শুনিনি যে এইরকম করে অন্ধকারে হাতড়ায়। আপনার কি কোনো পরিকল্পনা আদৌ আছে, না সবই এভাবে করবেন?’

‘পরিকল্পনা আছে।’ আমি বললাম, ‘তবে রান্নার স্বাদগন্ধ কি শুধু রেসিপি মেনে হয়? বরং জিনিসটা নাড়াচাড়া করতে করতে কী হচ্ছে, কতটা হচ্ছে, সেই বুঝে পরের ধাপটা ভেবে নেওয়াই অনেক সময় জরুরি হয়ে ওঠে। বুঝলেন?’

‘বুঝলাম। আরেকটা ড্রিঙ্কস নেওয়া খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে আপাতত।’