পনেরো – সেডার হিল সরাই
দুপুরের একটু পর মিকি লিনেহান ফোন করে আমার ঘুম ভাঙাল।
‘এসে গেছি।’ চনমনে গলায় মিকি বলল, ‘অভ্যর্থনা সমিতি কই গেল?’
‘দড়ি কলসির জোগাড় করছে। তোমরা কোথাও চেক-ইন করে, চুপচাপ আমার হোটেলে এসো। ৫৩৭ নম্বর ঘর।’
মানিকজোড়ের আগমনের আগেই আমি তৈরি হয়ে নিয়েছিলাম। মিকি লিনেহানের থলথলে চেহারা দেখে কমিক্সের কোনো চরিত্রের কথা মনে হয়। ও মুখেও একটা মানানসই রকম ন্যালাখ্যাপা টাইপের হাসি ঝুলিয়ে রাখে। ডিক ফোলি স্পেশাল হিল পরে লম্বা হওয়ার চেষ্টা করে, রুমালে সেন্ট ঢালে, পড়ুয়া টাইপের একটা বিরক্ত মুখ করে রাখে। এরা দু-জনেই অপারেটিভ হিসেবে দারুণ।
‘গুরুদেব তোমাদের এই কাজটা নিয়ে কিছু জানিয়েছেন?’ আমি আগে জানতে চাইলাম।
‘গুরুদেব’ মানে কন্টিনেন্টালের সানফ্রান্সিসকো ব্রাঞ্চের ম্যানেজার। ভদ্রলোককে পন্টিয়াস পাইলেটও বলা হয়, কারণ হাসিমুখে আমাদের উনি এমন সব কাজে পাঠান যাতে হাত দেওয়া মানে আত্মহত্যার শামিল। অত্যন্ত ভদ্র, নম্র, বয়স্ক এই মানুষটির মতো শীতল এবং নির্মম লোক আমি বিশেষ দেখিনি।
‘তুমি সাহায্য চেয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছ, এ ছাড়া উনি এই কাজের ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানেন বলে মনে হয় না।’ মিকি বলল, ‘এটুকু বলেছেন যে গত ক-দিন তুমি কোনো রিপোর্ট পাঠাওনি।’
‘রিপোর্টের জন্য ওঁকে আরও ক-দিন অপেক্ষা করতে হবে। ভালো কথা, তোমরা এই পার্সনভিল সম্বন্ধে কিছু জান?’
ডিক মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না’ বোঝাল। মিকি বলল, ‘লোকে এটাকে ‘পয়জনভিল’ বলে শুনেছি। মনে হয়েছে, কথাটা স্রেফ উচ্চারণের দোষ বা ইয়ার্কি নয়।’
আমি গত ক-দিনে যা জেনেছি, আর যা যা করেছি, তার একটা খতিয়ান দিলাম। এর মধ্যেই ফোন এল। ওপাশ থেকে ডিনা ব্র্যান্ডের অলস গলাটা ভেসে এল।
‘কী খবর? হাত কেমন আছে?’
‘একটু পুড়েছে শুধু। কালকের জেল-ভাঙা নিয়ে আপনার কী মত?’
‘এতে আমার কোনো হাত বা মত নেই।’ মেয়েটা বলল, ‘আমার যা করণীয়, করেছি। নুনান যদি ওকে ধরে রাখতে না পারে তাতে আমি কী করব? আমি বিকেলে শহরে আসব টুপি কিনতে। না, পরাব না, পরব। আপনার সঙ্গে কি তখন দেখা হতে পারে?’
‘কখন?’
‘এই ধরুন, তিনটে নাগাদ।’
‘ঠিক আছে। আমি অপেক্ষায় থাকব। আপনার দু-শো ডলার দশ সেন্টও রেডি রাখব।’
‘রাখুন। আমি ওইজন্যই আসছি। আপাতত টা-টা।’
আমি আবার নিজের জায়গায় বসে গল্পের বাকিটা বললাম। মিকি লিনেহান কয়েকটা অপশব্দ উচ্চারণ করে বলল, ‘এইবার বুঝেছি কেন তুমি রিপোর্ট পাঠাওনি। তুমি যা করছ, গুরুদেব সেগুলোর একটাও মেনে নেবেন না।’
‘যেটা করতে চাইছি সেটা ঠিকমতো হলে আমাকে… খারাপ জিনিসগুলো নিয়ে খুব বেশি কিছু রিপোর্টে লিখতে হবে না।’ আমি বললাম, ‘তা ছাড়া এজেন্সির নিয়মকানুন আমিও জানি, যথাসম্ভব মানিও। কিন্তু যে মন্দিরে যা অর্ঘ্য। এখানে আমাকে একটা কাজ করতে হচ্ছে। তার জন্য যা করণীয়, আমি তাই করব। সব কথা রিপোর্টে লেখা উচিত নয়। তাই তোমরাও যা রিপোর্ট পাঠাবে, আমাকে জানিয়েই পাঠাবে।’
‘আমাদের কী কী নিয়ম ভাঙতে হবে, সেটা শুনি।’ মিকি জানতে চাইল।
‘তোমার লক্ষ্য পিট দ্য ফিন। ডিকের জন্য আছে লিউ ইয়ার্ড। তোমাদের কোনো বাঁধাধরা কাজ নেই। আমি যা করছি, মানে যখন যেটা করা উচিত বলে মনে হচ্ছে, তাই করবে। আমার ধারণা, এই দুই মক্কেল নুনানের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করবে যাতে ও আর হুইস্পারের পেছনে না লাগে। কিন্তু নুনান কী করবে সেটা আন্দাজ করা মুশকিল। তা ছাড়া ভাইয়ের খুনের বদলা নেওয়ার ব্যাপারটাও আছে।’
‘বুঝলাম, শুধু তুমি কেন এসব করছ, আর আমাকে কী করতে হবে সেটা বাদে।’ মিকি বলল, ‘আমার কিন্তু সবই মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।’
‘আপাতত তুমি পিটকে চোখে চোখে রাখো। আমার এমন কিছু চাই যা দিয়ে পিট আর ইয়ার্ড, ইয়ার্ড আর নুনান, পিট আর নুনান, পিট আর থ্যালার, ইয়ার্ড আর থ্যালার… এদের সবার মধ্যে বিভাজন তৈরি করা যায়। সেটা করা গেলে এরা নিজেরাই একে-অন্যের পিঠে ছুরি মেরে আমাদের কাজ করে দেবে। নুনান আর থ্যালারের শত্রুতা দিয়ে ব্যাপারটা শুরু করা গেছে। কিন্তু অন্যদের মধ্যেও এটা করা না গেলে ব্যাপারটা ঝিমিয়ে যাবে।’
‘তোমার বান্ধবী… মানে যার ফোন এসেছিল…?’ ডিক নাক কুঁচকে জানতে চাইল।
‘আমাকে ডিনা হয়তো আরও কিছু দিতে পারবে, পয়সা নিয়ে। কিন্তু এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে আদালত অবধি এদের টানা যাবে না। আইন-আদালত এদের পকেটে। তা ছাড়া আমাদের হাতে খুব বেশি সময়ও নেই। সানফ্রান্সিসকোয় বসে গুরুদেব এসবের গন্ধ পেলে আমাদের গল্প শেষ। তাই এভিডেন্স নয়, আমাদের রেজাল্ট চাই।’
‘আমাদের সম্মানিত ক্লায়েন্ট, মিস্টার এলিহু উইলসনকে নিয়ে কী করবে?’ মিকির সরল প্রশ্ন।
‘হয় বরবাদ করব। নয় আমাদের দিকে আসতে বাধ্য করব। আপাতত তোমার পক্ষে হোটেল পার্সন, আর ডিকের জন্য ন্যাশনাল, এই দুটোই নিরাপদ থাকার জায়গা। আমার চাকরি খেতে না চাইলে যা করার তাড়াতাড়ি করো। আর যা বলছি সেগুলো নোট করে নাও।’
এলিহু উইলসন, ওর সেক্রেটারি স্ট্যানলি লুইস, ডোনাল্ড উইলসনের বউ, ডোনাল্ড উইলসনের সেক্রেটারি তথা স্ট্যানলির মেয়ে, ডিনা ব্র্যান্ড, ড্যান রল্্ফ, নুনান, ম্যাক্স থ্যালার ওরফে হুইস্পার, ওর ডান হাত জেরি এবং ডিনা ব্র্যান্ডের প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ড ও শ্রমিকনেতা বিল কুইন্ট– এইসব গণ্যমান্যদের নাম, ধাম, সংক্ষিপ্ত বিবরণ ওদের নোট করালাম। তারপর আরেকবার তাড়া দিয়ে, আর পয়জনভিলে যে নিজের বানানো আইনকানুন ছাড়া আর কিছুই চলে না সেটা আবারও বুঝিয়ে ওদের বিদায় দিলাম।
ব্রেকফাস্টের পর সিটি হলে গেলাম। নুনানের সবজেটে চোখগুলো ঘুমের অভাবে ছাইরঙা ঠেকছিল। তবে মুখ ফ্যাকাশে হলেও আমার আপ্যায়নে ও ত্রুটি দেখাল না।
‘হুইস্পারের কোনো খবর…?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘একটা খবর আসবে বলে মনে হচ্ছে।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল নুনান, ‘বসুন।’
‘ওর সঙ্গে আর কে কে পালিয়েছে?’
‘জেরি হুপার আর টোনি আগোস্তি ছাড়া বাকি সবকটাকেই আবার ফাটকে পুরেছি। আসল লোক হল জেরি। ও-ই হুইস্পারের হয়ে সব কিছু করে। বক্সিং ম্যাচের রাতে ইকি বুশকে ছুরিটা ও-ই মেরেছিল।’
‘দলের বাকিদের কী খবর?’
‘আর তেমন কাউকে পাইনি তো। শুধু ওই বাক্ ওয়ালেস, মানে যাকে আপনি গুলি করেছিলেন ডিনা ব্র্যান্ডের বাড়িতে, সে এখনও হাসপাতালে।’
নুনান আবারও ঘড়ির দিকে তাকাল। বেলা দুটো। ঠিক তখনই ফোন বাজল। প্রায় ঝাঁপিয়ে ফোনটা ধরল নুনান।
‘বলছি! হ্যাঁ… বেশ… বেশ… ঠিক আছে!’
ফোনটা রেখে নুনান ওর ডেস্কের ডান দিকে একগাদা বোতাম পরপর বাজাল। একটু পরেই ঘরটা পুলিশ অফিসারে ভরে গেল।
‘সেডার হিল সরাই।’ থেমে থেমে বলল নুনান, ‘মন দিয়ে শোনো সবাই। বেটস্, তুমি তোমার টিম নিয়ে আমার পেছনে যাবে। টেরি, তুমি ব্রডওয়ে ধরে বাড়িটার পেছন দিক দিয়ে আসবে। পথে ট্র্যাফিক বা অন্য ডিউটিতে থাকা সব্বাইকে নিয়ে নেবে। ডাফি, তুমি ইউনিয়ন স্ট্রিট ধরে খনির দিকে যাওয়ার পুরোনো রাস্তাটা ধরে আসবে। ম্যাকগ্র ওর টিম নিয়ে হেডকোয়ার্টার্স সামলাবে। বাকি সব্বাইকে ওখানে যেতে হবে। ব্যস!’
টুপিটা নিজের মাথায় চাপিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতেও নুনান ঘুরে আমাকে বলল, ‘চলে আসুন! এই তো সুযোগ।’
ওর সঙ্গে নীচে, ডিপার্টমেন্টের গ্যারেজে গেলাম। আধডজন গাড়ির ইঞ্জিন আদুরে বেড়ালের মতো ঘড়ঘড় করছিল। নুনান একটা গাড়িতে ড্রাইভারের পাশে বসল। আমি আরও চারজন ডিটেকটিভের সঙ্গে পেছনে বসলাম। অন্য গাড়িগুলোতেও লোকে গাদাগাদি করে বসল। মেশিন গানে গুলি ভরা হল। রাইফেল আর বস্তা বস্তা গুলি বিতরণ হল।
আগে চিফের গাড়িটাই বেরোল। বেরোল না বলে মহাপ্রস্থান করল বলাই ভালো। ঝাঁকুনিতে দাঁতে দাঁত লেগে গেল। গ্যারেজের দরজা, রাস্তার ট্রাক, জনাদুয়েক পথচারী, সবাইকেই আধ ইঞ্চির জন্য ফসকে গাড়িটা কিং স্ট্রিট ধরে ছুটল সাইরেন বাজিয়ে। অন্য গাড়িগুলো সভয়ে আমাদের পথ ছেড়ে দিল। পেছন ফিরে দেখলাম, আরও একটা পুলিশের গাড়ি আমাদের পেছনে চলেছে। তিন নম্বরটা ব্রডওয়ের দিকে বেঁকছে। নুনান হৃষ্টচিত্তে একটা চুরুট দাঁতের ফাঁকে গুঁজে বলল, ‘আরও জোরে, প্যাট।’
ভয়ে প্রায় জমে যাওয়া এক মহিলার গাড়িকে শেষ মুহূর্তে এড়িয়ে, দুটো গাড়ির মাঝখান দিয়ে গাড়িটাকে বের করে প্যাট মৃদু অনুযোগ জানাল, ‘ঠিক আছে। তবে ব্রেকের অবস্থা ভালো না।’
আমার পাশে বসা এক ডিটেকটিভ বলল, ‘চমৎকার!’ কথাটা ঠিক আন্তরিক শোনাল না।
শহরের প্রান্তে ভিড়ভাট্টা কম ছিল। কিন্তু রাস্তা খারাপ বলে আমরা সবাই একে-অপরের কোলে বসার সুযোগ পেলাম। শেষ দশ মিনিট রাস্তা এমনই উঁচুনীচু ছিল যে প্যাট গাড়ির ব্রেক নিয়ে কী বলেছিল, সেটাও আর আমাদের মাথায় ছিল না।
অবশেষে আমরা একটা গেটের সামনে থামলাম। গেটের ওপরে একটা লজ্ঝড়ে বোর্ড ‘সেডার হিল সরাই’ ঘোষণা করছিল। গেট থেকে ফুট বিশেক দূরে ছিল উক্ত প্রাসাদ, মানে সবুজ রঙের একটা কাঠের বাড়ি। তার চারপাশে আবর্জনার স্তূপ। দরজা আর সবকটা জানালা বন্ধ। গাড়ি থেকে নামলাম আমরা সবাই। পেছনের গাড়িটাও ততক্ষণে এসে গেছিল। সেখান থেকেও সৈন্যসামন্ত নামল। নুনান একপ্রস্থ আদেশ দিল।
বাড়িটাকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলা হল। গেটের কাছে মেশিন গান নিয়ে কয়েকজন রইল। আমরা ক-জন রাস্তা ধরে, আবর্জনার মধ্যে দিয়ে বাড়িটার সামনে পৌঁছোলাম। আমার পাশে বসা ডিটেকটিভটি একটা বড়ো কুড়ুল দিয়ে দরজাটা কোপাতে তৈরি হল।
একটা জানলার ফাঁক দিয়ে আওয়াজ আর আগুনের ঝলক এল। কুড়ুল আর ডিটেকটিভ, দু’জনেই ধরাশায়ী হল। আমরা পালালাম।
আমি আর নুনান গেটের বাইরে, রাস্তার ধারে একটা খাতে লুকিয়ে ছিলাম। যথেষ্ট গভীর বলে আমরা মোটামুটি সোজা হয়েও গুলির নাগালের বাইরে থাকতে পারছিলাম। নুনান এর মধ্যেই দারুণ খুশি হয়ে বিড়বিড় করছিল, ‘ও আছে! ও এখানেই আছে!’
‘গুলিটা জানলার নীচের ফাঁকটুকু দিয়ে এসেছিল।’ আমি ওকে সাবধান করার চেষ্টা করলাম, ‘এ জিনিস কিন্তু সবাই পারে না।’
‘আরে, মেশিনগান দিয়ে যখন বাড়িটাকে ঝাঁঝরা করে দেব, তখন সব সমান হয়ে যাবে।’ দরাজ গলায় বলে উঠল নুনান, ‘ডাফি অন্য দিক দিয়ে এসে পড়বে কিছুক্ষণের মধ্যেই। টেরি শেনও পিছিয়ে থাকবে না।’
পাথরের আড়াল থেকে একটা লোক উঁকি মারছিল। নুনান তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই যে, ডোনার! পেছনদিকে গিয়ে ডাফি আর টেরির জন্য অপেক্ষা করো। ওরা এলেই বলবে, যা কিছু আছে সব দিয়ে বাড়িটাকে ফুটিফাটা করে দিতে। কিম্বল কোথায়?’
ডোনার পেছনের একটা গাছ দেখাল। আমরা নীচ থেকে শুধু তার ওপরের অংশটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম।
‘ওকে বলো চাক্কি পিসিং শুরু করতে। নীচ থেকে একটু একটু করে ওপরে উঠবে। একদম মাখনের মতো করে বাড়িটাকে ওড়ানো চাই।’
ডোনার হাওয়া হয়ে গেল। নুনান ওই খাতটার মধ্যেই হাঁটাচলা করে, মাঝেমধ্যে মাথা এক চিলতে বের করে দেখে বা আদেশ-নির্দেশ দিয়ে সময় কাটাতে লাগল। শেষে একটা চুরুট ধরিয়ে, আমাকেও একটা দিয়ে ও বলল, ‘এবার আর হুইস্পারের রক্ষে নেই। ও শেষ।’
গাছের পাশ থেকে মেশিন-গানটা কয়েকবার আওয়াজ তুলল, অনেকটা গানের আগে গলা সাফ করার মতো করে। তারপর ওটা পুরোদমে কাজ শুরু করল। ধোঁয়ার একটা রিং ছেড়ে নুনান আমাকে বলল, ‘হবে। এতেই হবে।’
মেনে নিতে বাধ্য হলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দূর থেকে আরেকটা, তারপর আরও একটা মেশিন-গানের আওয়াজ যুক্ত হল এই শব্দব্রহ্মে। নুনান খুশিয়াল গলায় বলল, ‘পাঁচ মিনিট এরকম চললেই ও বুঝবে, নরক জায়গাটা কেমন।’
পাঁচ মিনিট ফুরোলে আমি বললাম, একবার জায়গাটা দেখা দরকার। নুনান রাজি হল। খাত থেকে উঠে আমরা বাড়িটা দেখলাম। ওটা একইরকম নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছিল, তবে দেওয়াল, দরজা, জানলা দিয়ে আরও জল-হাওয়া ঢোকার ব্যবস্থা হয়েছে ওতে, এটুকু বোঝা গেল। ওখান থেকে গুলিগোলা আসছিল না, তবে মেশিন-গানগুলো বাধ্য ছাত্রের পড়া দেওয়ার মতো করে ওটাকে ঝাঁঝরা করে চলছিল।
‘আপনার কী মনে হয়?’ নুনান আমার মতামত চাইল।
‘মাটির নীচে কোনো ঘর থাকলে তাতে যদি কেউ লুকিয়ে থাকে?’
‘তাহলে একবার দেখে নেওয়া যাক।’ বলে পকেট থেকে একটা বাঁশি বের করে তাতে ওজনদার ফুঁ দিল নুনান। হাত নেড়ে আর চিৎকার করেও ও অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইল। একটু একটু করে গুলি থেমে জায়গাটা চুপচাপ হল।
আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলাম।
একতলা মদে থইথই করছিল। পুরো জায়গাটা যত পিপে আর অন্য জিনিসে ভরা ছিল তাদের সবকটা মেশিন-গানের গুলিতে ফুটো হয়ে গেছিল। সেখান থেকেই যে সোমরসের এই বন্যা তৈরি হয়েছে, বোঝা যাচ্ছিল। জল ঠেলে এগোনোর মতো মদ ঠেলে এগোলাম আমরা। তীব্র গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করছিল। তবু আমরা বাড়িটার আগাপাশতলা ঘুরলাম। না, জ্যান্ত কাউকে পাওয়া গেল না। মজুরের পোশাক পরা চারজন বিদেশি গোছের লোককে পাওয়া গেল, গুলির তোড়ে প্রায় টুকরো টুকরো অবস্থায়।
‘লাশগুলো এখানেই থাক। এখান থেকে বেরোও সবাই!’
আমরা সোৎসাহে ওর আদেশ পালন করলাম। বেরোনোর আগে একনম্বরি লেবেল লাগানো দু-নম্বরি মদের একটা বোতল আমি পকেটস্থ করলাম। নুনানের গলাটা একইরকম চনমনে শোনালেও ফ্ল্যাশলাইটের এক ঝলকে ওর চোখজোড়া দেখে ফেলেছিলাম। সেগুলো আতঙ্কে প্রায় সাদা হয়ে গেছিল।
বাইরে বেরিয়েই আমরা খাকি পোশাকের এক পুলিশকে পেলাম। মোটরসাইকেল থেকে প্রায় গড়িয়ে রাস্তায় নেমে সে চেঁচাতে চেঁচাতে আমাদের দিকে ছুটে আসছিল।
‘ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক লুট হয়েছে!’
নুনান অজস্র গালাগাল দিল। তার ফাঁকে ফাঁকেই ও বোঝাল, আমাদের এক্ষুনি শহরে ফিরতে হবে। বাকিরা রওনা হল। মৃত ডিটেকটিভের শরীরটাও তোলা হল। নুনান আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভালোই বোকা বানাল আমাদের। এটা ম্যানেজ করা কঠিন হবে।’
আমি সহমত হয়ে বাইরে এসে প্যাটের সঙ্গে হাবিজাবি বকলাম। কিছুক্ষণ পর নুনান আর ওর সঙ্গীরা গাড়িতে বসল। গাড়ি যখন বাঁক নিচ্ছে তখন একপলকের জন্য বাড়িটার দিকে চোখ গেল। খোলা দরজা দিয়ে আগুনের শিখা তখন সবে দেখা যাচ্ছে।
