Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

ষোলো – বিদায়, জেরি

ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের চারপাশে রীতিমতো ভিড় জমে গেছিল। তাদের ঠেলে ব্যাঙ্কের কাছে যেতেই মলিনবদন ম্যাকগ্র-র সঙ্গে মোলাকাত হল।

‘ছ-জন ছিল। মুখোশ পরা।’ ও নুনানকে বলছিল, ‘আড়াইটে নাগাদ ওরা হামলা করে। পাঁচজন লুটের মাল নিয়ে কেটে পড়ে। শুধু একজন ওয়াচম্যানের গুলিতে মারা যায়। জেরি হুপার। লাশটা ওখানে রাখা রয়েছে। আমরা এর মধ্যে রাস্তা ব্লক করতে বলেছি। আমি পাশের কাউন্টিতে খবর পাঠিয়েও দিয়েছি। ওদের শেষ দেখা গেছিল একটা কালো লিংকন গাড়িতে চেপে কিং স্ট্রিট ধরে উধাও হতে।’

আমরা সবাই জেরিকে দেখতে গেলাম। চাদর তুলে দেখলাম, উপুড় হয়ে পড়ে আছে জেরি। ওর বাঁ-কাঁধের নীচ দিয়ে গুলিটা গেছে।

ওয়াচম্যান একজন নিরীহদর্শন বুড়ো। আপাতত পাদপ্রদীপের আলোয় এসে তার চুপসে যাওয়া ছাতি ছাপ্পান্ন না হলেও অনেকটাই বেড়েছে। গর্বিত মুখে লোকটা বলছিল, ‘কিচ্ছু করার ছিল না। আমি কিছু করিওনি। তবে ওরা যখন পালাচ্ছে তখন আমি চুপচাপ নিজের পুরোনো হাতিয়ারটা বের করে এক রাউন্ড ফায়ার করি। ওই হতভাগাই শেষে উঠছিল গাড়িতে। তা-ই গুলিটা ওই খেল।’

নুনান ‘দারুণ! দারুণ!’ এসব বলে আর পিঠ থাবড়ে লোকটাকে থামাল। ম্যাকগ্র গম্ভীর গলায় বলল, ‘এই শহরে কেউ কাউকে চিনতে পারে না। তবে জেরি ছিল মানে এটা হুইস্পারের কীর্তি।’

‘তুমি তোমার মতো এগোও, ম্যাকগ্র। আমাকে শুধু জানিয়ো, কী ঘটছে।’ আমার দিকে ঘুরে নুনান বলল, ‘আপনি এখানে থাকবেন, না, আমাদের সঙ্গে সিটি হলে ফিরবেন?’

‘কোনোটাই না।’ আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। তবে তার আগে আমাকে একজোড়া শুকনো জুতো পরতে হবে।’

হোটেলের সামনে ডিনা ব্র্যান্ডের গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে দেখতে পেলাম না, তবে নিজের ঘরে গিয়ে দরজাটা খোলাই রেখেছিলাম। কোট আর টুপির ভার কমিয়ে গুছিয়ে বসার পর, দরজায় নক না করেই তিনি ঘরে ঢুকলেন।

‘বাপ রে! আপনার ঘরে ঢুকলেই তো নেশা হয়ে যাবে।’

‘ঘরের নয়, আমার জুতোর দোষ। নুনান আমাকে মদের পুকুরে চুবিয়েছে।’

জানলা খুলে, তার ফ্রেমে বসে পা দুলিয়ে মেয়েটা জানতে চাইল, ‘এমন সুমতি কেন হল ওর?’

‘নুনান ভেবেছিল আপনার ম্যাক্স সেডার হিল সরাইয়ে লুকিয়ে আছে। ও সদলবলে সেখানে হামলা চালায়। আমাকেও টেনে নিয়ে যায়। আমরা গুলিগোলা চালিয়ে বাড়িটার বারোটা বাজাই। ওখানে কিছু ভিনদেশি লোক, বোধ হয় সস্তার মজুর, ছিল। তারা, আর মদভরতি পিপেগুলো ঝাঁঝরা হয়ে যায়। বাড়িটায় আগুন লাগিয়ে নুনান ফিরে আসে।’

‘সেডার হিল সরাই? ওটা তো বছরখানেক, বা তারও বেশি আগে বন্ধ হয়ে গেছে।’

‘সেটা বোঝা যাচ্ছিল। তবে কেউ ওটাকে বেআইনি মদের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছিল। এই যে, তার একপিস্‌ নমুনা আমি নিয়েও এসেছি।’

‘ম্যাক্সকে ওখানে পাননি?’

‘আমরা যখন ওখানে ছিলাম, তখন ও এলিহু-র সাধের ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক সাফ করছিল।’

‘সেটা দেখেছি।’ ডিনা বলল, ‘ওখান থেকে দুটো বাড়ি পরেই বেনগ্রেন-স ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠছি। এমন সময় দেখি, মুখে কালো রুমাল জড়ানো একটা বড়োসড়ো চেহারার লোক এক হাতে বন্দুক, আরেক হাতে ব্যাগ নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরোল। তার পেছনে আরও লোক বেরোতে দেখলাম।’

‘তাদের মধ্যে কেউ কি ম্যাক্স?’

‘উঁহু। ম্যাক্স এসব কাজ নিজে করে না। তার জন্যই ও জেরি আর বাকিদের পোষে। জেরিকে চিনতে পেরেছিলাম। ও আরেকজনের সঙ্গে গাড়িতে বসে ছিল। ব্যাঙ্ক থেকে চারজন বেরোল। তারপর জেরি গাড়ি থেকে নামল। তখনই দু-দিক থেকে গুলি চলল। জেরি পড়ে গেল, বাকিরা গাড়ি চেপে পালাল।’ মেয়েটা ধারালো চোখে আমার দিকে তাকাল, ‘কিন্তু এসব তো হচ্ছে, হবে। আমার টাকাটার কী হবে?’

আমি কুড়ি ডলারের দশটা নোট আর একটা দশ সেন্টের ডাইম বের করে ওকে দিলাম।

‘এটা তো স্রেফ ড্যানকে সেদিন সরিয়ে রাখার জন্য, যাতে আপনি ম্যাক্সকে ধরতে পারেন।’ টাকাগুলো নিজের পার্সে রেখে ও বলল, ‘আর সেদিন যে টিম নুনানের খুনের ব্যাপারে আপনাকে অমন একটা ক্লু আর সাক্ষী দিলাম, তার টাকাটা কবে পাব?’

‘তার জন্য আপনাকে আরও ক-দিন অপেক্ষা করতে হবে। ওর বিরুদ্ধে কেসটা প্রমাণ না হলে ওই জিনিস কিনে কী হবে আমার?’

‘আপনি এই খরচ না করা টাকাগুলো দিয়ে কী করেন?’ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল মেয়েটা। তারপরেই ওর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গলা বাড়িয়ে ও জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি জানেন, ম্যাক্স এখন কোথায় আছে?’

‘না।’

‘ওটা জানার জন্য আপনি কত দেবেন?’

‘কিচ্ছু না।’

‘আপনি আমাকে এক-শো ডলার দিলে আমি আপনাকে বলে দেব।’

‘আমি এইভাবে আপনার ‘‘দুর্বলতার’’ অপব্যবহার করতে চাই না।’

‘পঞ্চাশ ডলার।’

আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝালাম।

‘পঁচিশ ডলার।’

‘আমি ম্যাক্সকে চাই না।’ বলতে বাধ্য হলাম, ‘ও কোথায় আছে আমি জেনে কী করব? আপনি খবরটা নুনানকে দিচ্ছেন না কেন?’

‘হ্যাঁ, তাই দিই, আর টাকা আদায়ের চেষ্টায় বাকি জীবনটা কাটাই।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডিনা বলল, ‘আপনার ঘরে পানীয় কি জুতোতেই থাকে, না বোতলেও?’

আমি ব্যাগ থেকে একটা কিং জর্জের বোতল বের করে বললাম, ‘এখানে বসে এটির সঙ্গসুখ উপভোগ করুন। আমি ততক্ষণে পোশাক বদলে আসি।

পঁচিশ মিনিট পর বাথরুম থেকে বেরোলাম। দেখি ততক্ষণে হাতে গ্লাস, ঠোঁটে সিগারেট, আর হাতে আমার গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগের এক ধার থেকে বের করা একটা মেমোবুক নিয়ে সে গুছিয়ে বসেছে।

‘এগুলো তো আপনার অন্যান্য কেসের খরচাপাতির হিসেব, তাই না?’ চোখ না তুলেই ডিনা জানতে চাইল, ‘অথচ আমার বেলায় আপনি এমন হাড়কেপ্পন হয়ে আছেন! কেন? এই তো একটা ছ-শো ডলার এন্ট্রি, আর পাশে ছোটো করে ‘‘খবর’’ লেখা। তার মানে আপনি খবরের জন্য এরকম টাকা দেন নিশ্চয়? তার নীচেই আর একটা এন্ট্রি, দেড়শো ডলারের, পাশে লেখা ‘‘ওপর’’। তার মানে…? যাকগে। আর এই তো, আর এক দিনের হিসেব, আপনি সারাদিনে প্রায় হাজার ডলার খরচা করেছেন!’

‘এগুলো নির্ঘাত ফোন নম্বর।’ আমি ওর হাত থেকে বইটা উদ্ধার করে বললাম, ‘আপনাকে কেউ সভ্যভব্য করার চেষ্টা করেনি, তাই না? আমার অবর্তমানে আমার ব্যাগেজ এইভাবে ঘাঁটা…!’

‘আমি একটা কনভেন্টে বড়ো হয়েছি।’ চেয়ারটা পেছনে হেলিয়ে, আমার খাটে পা তুলে দিয়ে মেয়েটা বলল, ‘যদ্দিন ওখানে ছিলাম, প্রতি বছর সবচেয়ে ভালো আচারব্যবহারের জন্য প্রাইজ পেতাম। আঠেরো বছর বয়স হওয়ার আগে আমি গালাগাল জানতাম না। প্রথমবার ওসব শুনে আমি প্রায় মূর্ছা গেছিলাম।’

‘আর আমি বড়ো হয়েছি ডকের ধারে একটা পানশালায়।’ ওর পা বিছানা থেকে সরিয়ে আমি বললাম।

‘কিন্তু আপনি বলুন, সিটি হল থেকে লোকেদের মালামাল হওয়ার যে খবরটা আমি ডোনাল্ড উইলসনকে বেচেছিলাম, সেটার জন্য আপনি কত দেবেন?’

‘ওতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আরেকটা হোক।’

‘লিউ ইয়ার্ডের প্রথম স্ত্রীকে কেন পাগলাগারদে পাঠানো হয়েছিল?’

‘নাহ্‌!’

‘আমাদের শেরিফ, কিং, চার বছর আগেও প্রায় হাজার আষ্টেক ডলার দেনায় ডুবে ছিল। এখন শহরতলিতে তাঁর একখানা ছোট্ট সাজানোগোছানো ব্যাবসা হয়েছে। কীভাবে? আমি সবটা আপনাকে দিতে পারব না, তবে কোত্থেকে সেসব পাবেন, তা বলতে পারব।’

‘বলে যান।’

‘না। আপনি আসলে কিছু কিনবেন না, শুধু দেখবেন। কিন্তু কেন? আপনি কি আরও সস্তায় এগুলো কিনতে চান?’

‘আমি এগুলো চাইই না। আমার দরকার ডিনামাইট! ওদের ছত্রভঙ্গ করার মতো জিনিস চাই আমার।’

মেয়েটা সোজা হয়ে বসল। দুষ্টুবুদ্ধিতে ওর বড়ো চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছিল।

‘আমার কাছে লিউ ইয়ার্ডের একটা কার্ড আছে। সেই কার্ড, আর আপনার তুলে আনা মদের বোতলটা যদি পিটের কাছে পাঠাই, তাহলে কেমন হবে? সেডার হিলের গুদামটা তো পিটের ছিল। ওর তো মনে হবে যে ইয়ার্ডের কথাতেই নুনান সেটার বারোটা বাজিয়েছে।’

আমি একটু ভেবে বললাম, ‘উঁহু। বড়ো মোটা দাগের হয়ে যাবে ব্যাপারটা।’

‘আপনি সব জানেন, তাই না?’ ডিনা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘আসলে আপনি আমাকে পাত্তা দিতে চাইছেন না। চাইলে আজ সন্ধেয় আমাকে নিয়ে একটু বেড়াতে বেরোতেন। আমি একটা নতুন ড্রেস কিনেছি। লোকে ওটা দেখলেই ফিদা হবে। আমি তো বোনাস।’

‘কখন বেরোতে হবে?’

‘আটটা নাগাদ আমার বাড়ি চলে আসুন।’ আমার গালে নিজের নরম-গরম হাতটা বুলিয়ে মেয়েটা বেরিয়ে গেল।

একটু পরেই ফোন বাজল।

‘আমার আর ডিকের টার্গেট তোমার ক্লায়েন্টের বাড়িতে মিটিং করছে।’ মিকি লিনেহান ওপাশ থেকে জানাল, ‘আমি যার পেছনে ছিলাম সে তো সারাদিন আমাকে চক্কর কাটিয়েছে। ব্যাপার কী?’

আমি বললাম, কোনো ব্যাপার নেই। বিছানায় লম্বা হয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম, এলিহুর সঙ্গে লিউ ইয়ার্ড আর পিট দ্য ফিন কী আলোচনা করছে, হুইস্পার ফার্স্ট ন্যাশনাল লুটের টাকা নিয়ে কোথায় আছে, নুনান কী ভাবছে…! ভাবতে গিয়ে এতই ক্লান্ত হলাম যে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সাতটা নাগাদ উঠে, হাত-মুখ ধুয়ে আমি ডিনা ব্র্যান্ডের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম।